মৃত্যুর মুখ সে প্রথমে দেখতে পায় আয়নায়, নিজের মুখ দেখতে গিয়ে। তারপর সে ওটা দেখতে থাকে ছায়াচ্ছন্ন নানা ঘরে, পাথুরে থামের আড়ালে, বিশাল বাড়িটার অজস্র জ্যামিতিক কোণে, নিজের হাতের পান্ডুর তালুতে আর চেতনার অতল অন্ধকার গহবরে। এবং ক্রমে এমন একটা আতঙ্কের স্বাদ অনুভব করতে শুরু করে যা তার দীর্ঘ জীবনে সে এর আগে কখনও করেনি। নিজের জীবনকে সে চমৎকার উপভোগ করেছে। বস্তুত, উপভোগ করা ছাড়া জীবনের আর কোনও অর্থ বা উপযোগিতা থাকতে পারে বলে সে বিশ্বাস করেনি। ইন্দ্রিয়জ অভিজ্ঞতার বাইরে কোনও কিছুর অস্তিত্ব স্বীকার করা মানুষের একটা আশ্চর্য স্বভাব ছাড়া আর কিছু নয় বলে সে ঈশ্বর বা ধর্ম নিয়ে কখনও মাথা ঘামায়নি। সুস্থ, সতেজ এবং যথাসম্ভব অকলঙ্কিত একটা নৈতিক জীবনই পরস্পরকে সুখী করার একমাত্র উপায় বলে সে বিশ্বাস করেছে। যিশুকে সে কখনওই তেমন গুরুত্ব দেয়নি। তবে প্রাচীন খ্রিস্টানদের এই মতকে গুরুত্ব দিয়েছে যা ঘোষণা করে জগৎ ও পশুর সৃষ্টি হয়েছে মানুষের জন্য, মানুষের উপভোগের জন্য। সে কখনও কারও ক্ষতি করেনি। নিজে বিত্তবান হওয়া সত্ত্বেও দরিদ্রদের ঘৃণা করেনি। নিশ্ছিদ্র ব্যস্ততা ও ইয়ার-বন্ধুদের সংসর্গের চাপ থাকা সত্ত্বেও সে মাঝেমাঝে অপ্রয়োজনীয় জাতের বই পড়ার সময় বার করে নিত। মাঝেমাঝে, বিশেষ করে নিজের সীমাহীন বাড়িটায়, সে নিরঙ্কুশ একাকিত্ব উপভোগ করতে ভালবাসত। মেয়েদের সান্নিধ্য তাকে কখনওই ক্লান্ত করেনি। কুকুর পোষাকে সে তেমন পছন্দ করত না। তবে ঘোড়াদের ভালবাসত। তার বাড়িতে একটা বড় আস্তাবল আছে।
মৃত্যুর মুখ নিজে দেখার আগে অবশ্য চিকিৎসকরাও পূর্বাভাস দিয়েছিল। এখন এ সম্পর্কে সে নিশ্চিত। নিশ্চিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যে ভাবনাটা তার প্রাণের ক্ষীণ শেকড়বাকড়গুলোকে কিছুক্ষণের জন্য পর্যুদস্ত করে দিয়েছিল তা হল, নিজের মৃত্যু সম্পর্কে অনেক আগেই তার চিন্তাভাবনা করা উচিত ছিল। তাহলে হয়ত এখনকার ভীতি ও আঘাত অনেকটা কম হত। অবশ্য ভাবলেও, তার এখন মনে হচ্ছিল, মৃত্যুকে জীবনের একটা অর্থহীন পরিণতির বেশি কোনও গুরুত্ব সে হয়ত দিত না। তার হঠাৎ মনে হল, জীবনের চূড়ান্ত পরিণতিটা অর্থহীন হলে জীবন নিজে অর্থপূর্ণ হতে পারে না। এত বছর এমন কোনও দীর্ঘ পথ দিয়ে সে হেঁটেছে, যার শেষে কোথাও পৌঁছনো যায় না।
অসংখ্য ধূসর, স্থবির ধাঁধাগুলির কাল্পনিক ছবি মাথার ভেতর দেখতে দেখতে সে হঠাৎ বিছানা থেকে নিচে নেমে এল। একটু হাঁটাচলার শক্তি এখনও অবশিষ্ট আছে বলে সে খানিকটা নিশ্চিত হল। আর সিদ্ধান্ত নিল আজ মাঝরাতেই গোপনে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যাবে, তারপর চুপচাপ মরার জন্য একটা সম্পূর্ণ নির্জন জায়গা বেছে নেবে। ওরকম একটা নির্জন জায়গা তার জানা আছে। আসলে নিজের আতঙ্কিত মুখটা অন্যদের দেখাতে সে লজ্জা পাচ্ছিল। তাছাড়া সকলের অসহায়, সহানুভূতিপূর্ণ দৃষ্টির সামনে একটু একটু করে মরার ভেতর গৌরবেরও কিছু নেই, (অবশ্য মৃত্যু কি কোনওভাবে গৌরব দান করে মানুষকে? যা আদপে উদ্ভট ও নিরর্থক তা কাউকে গৌরব দান করবে কী করে ? )
নিজের সমস্ত অতীতকেই হাস্যকর মনে হচ্ছিল বলে মাঝরাতের অনেক আগেই বাড়ি ছেড়ে বেরোবার সময় তার প্রকান্ড বাড়িটার জন্য (বাড়িটার নকশা সে তৈরি করিয়েছিল ভেনিসে ভ্রমণ করার সময় জনৈক ইতালীয় স্থপতিকে দিয়ে), তার আত্মীয়দের জন্য, তার ঘোড়াদের জন্য কোনও মায়া বা দুঃখ তার হয়নি। সম্ভব হলে, তার মনে হল, মুখ ঘুরিয়ে সে শুধু হা হা করে একটা অট্টহাসি ত্যাগ করত। টিপ টিপ করে বৃষ্টি পড়ছিল। বর্ষাকাল ছিল তার প্রিয়তম ঋতু। বাড়ির বাইরে পা দিয়ে সে একবার আকাশের দিকে তাকাল। একবার ভাবল আরও কিছুদিন পর সে মারা গেলে কোনও দোষের হত না। এই বর্ষাটা কেটে গেলে। চারদিকে প্রাচীর তোলা বাড়ির বাঁ-পাশে বড় বড় ইউক্যালিপটাস গাছ, যার নিচে আস্তাবলটা। দরজা খুলে সে বার করে নিয়ে এল একটা খয়েরি ঘোড়া। সম্ভবত মনের আতঙ্কিত অবস্থার জন্যই সে সম্পূর্ণ ভুলে গিয়েছিল যে মেসোপটেমীয়দের সম্বোধন একটু শুধরে (তারা ঘোড়াদের বলত 'পাহাড়ের জন্তু”) সে ঘোড়াদের সম্বোধন করত 'মেঘের জন্তু' নামে। তার চিরকালই মনে হয়েছে, ঘোড়া নামক জন্তুটির পৃথিবীতে আগমন হয়েছে কোনও কালো, উড়ন্ত মেঘের ভেতর থেকে লাফ দেওয়ার ফলেই।
অন্ধকার, পিচ্ছিল রাস্তা দিয়ে ঘোড়াটা তাকে নিয়ে চলেছে। ঘোড়ার পিঠে বসে থাকতে থাকতে জীবনে এই প্রথম তার মনে হল সে ঘোড়াটাকে চালাচ্ছে না, ঘোড়াটাই তাকে চালাচ্ছে। সে প্রাণপণে মনের আতঙ্ককে চেপে রাখার চেষ্টা করছিল। ঘোড়ায় চড়া তাকে কোনও আনন্দ দিচ্ছিল না। বৃষ্টিতে ভেজা তাকে কোনও আনন্দ দিচ্ছিল না। অথচ এটাই যে তার জীবনের শেষ ঘোড়ায় চড়া বা শেষ বৃষ্টিতে ভেজা সে নিশ্চিত বুঝতে পারছিল।
সারারাত ঘোড়াটা নেহাত খারাপ ছোটেনি। ফলে তার গন্তব্যে সে পৌঁছে গেল ভাল করে ভোর হবার আগেই। দূর থেকেই সে দেখতে পেল লম্বা লম্বা ঘাস ও জঙ্গলের ভেতর থেকে উঁকি মারা পোড়ো বাড়িটার মাথা। চুম্বন না দিয়েই সে তার প্রিয়তম ঘোড়াকে বিদায় করল। তাকে নির্দেশ দিল দ্রুত আবার আস্তাবলে ফিরে যেতে। তার এখানে আসার ব্যাপারে সে কোনও সাক্ষী রাখতে চাইছিল না।
জায়গাটার চূড়ান্ত নির্জনতা ও নৈঃশব্দ্য তার মস্তিষ্কের ভেতর বয়ে চলা আতঙ্ককে যেন হঠাৎ মুখরিত করে তুলল। সে পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছিল তার মাথায় ছুটে যাওয়া নদীটার শব্দ। ধূসর গাছ ও ডালপালা দু-হাতে সরিয়ে সে তাড়াতাড়ি ঢালু জমিতে নেমে গেল, তারপর পা বাড়াল পোড়ো বাড়িটার দিকে। তার একটাই সান্ত্বনা, এখানে তার লজ্জাজনক আতঙ্ক দেখার জন্য কেউ নেই।
গোলাকার বাড়িটার (অনেকে বলে ওটা নাকি এক সময় মন্দির ছিল, তবে এ নিয়ে যথেষ্ট মতভেদ আছে) কপাটহীন একমাত্র দরজা এখনও নিজের আদল অক্ষুণ্ণ রেখেছে কিন্তু জানলার দুটোই ঘন গাছপালার আড়ালে ঢাকা পড়ে গিয়েছে। ফলে ঘরটার ভেতর চাপা অন্ধকার, যা লোকটার পছন্দ হল, কারণ বাইরের জীবন ও জগতকে সে সম্পূর্ণ ভুলে যেতে চাইছিল। সম্ভব হলে নিজের মাথার ভেতর হাত ঢুকিয়ে ( সে ভাবছিল) এতদিন বেঁচে থাকার সমস্ত হাস্যকর স্মৃতি সে মুছে দিত। মেঝেয় এবড়োখেবড়ো মাটি বেরিয়ে এসেছে। চোখে সরাসরি আলো পড়া এড়ানোর জন্য সে দরজাটার দেওয়ালের দূরতম বাঁকে (ঘরটায় স্বভাবতই কোনও কোণ ছিল না) শুয়ে পড়ল। এবং আতঙ্কিত দৃষ্টিতে ওপরের বৃত্তের দিকে তাকিয়ে আরও ভয় পেতে লাগল, কারণ তার মনে হচ্ছিল সে যেন ব্রহ্মান্ডের ছাদের নিচে শুয়ে আছে, অথচ সে ভুলে যেতে চাইছে ব্রহ্মাণ্ডকেই, যা একদিন তার নিরর্থক প্রাণটাকে সৃষ্টি করেছিল। এমন কোনও জায়গা কি নেই, যা ব্রহ্মান্ডের বাইরে অবস্থিত এবং যেখানে কোথাও জীবন ও মৃত্যুর নিরর্থক খেলাটা অনুষ্ঠিত হয় না?
বৃত্তটাকে ভুলতে সে চোখ বোজে। কিন্তু আতঙ্ক থেকে মুক্ত হল না। আতঙ্কটার সঠিক উৎস ধরার চেষ্টায় সে কিছুক্ষণ ঠান্ডা মাথায় ভাবল। এবং লক্ষ্য করল উৎসটা পরিষ্কার : মারা যেতে সে ভয় পাচ্ছে অথচ খুব শিগগির তাকে মারা যেতে হবে। সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে প্রতিটি মানুষই ভয় পায়, অথচ প্রতিটি মানুষই ভুলে যায় জন্মাবার আগে সে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্নই ছিল। এই সত্যটা সম্পর্কে সে ভাবল কিন্তু সত্যটা তাকে শান্ত করল না। কোনওদিনই ছিলাম না, এটা নিয়ে ভয়ের কিছু থাকতে পারে না, কারণ কোনওদিনই না থাকার অবস্থাটা কল্পনাতে আনাও সম্ভব নয়। কিন্তু একদিন ছিলাম আর মৃত্যুর পর থাকব না, এটা স্পষ্টভাবে কল্পনা করা সম্ভব। কিছুই নেই, এটা ততটা অর্থহীন নয়, যতটা অর্থহীন এটা যে একটা কিছু এই মুহূর্তে আছে কিন্তু পর মুহূর্তে থাকবে না। এটা মানুষের নিয়তি যে শান্তিতে বাঁচতে হলে সব কিছুরই একটা অর্থ খুঁজে পেতে হবে তাকে। এবং শান্তিতে মরতে হলেও তাই। কিন্তু কোনও অর্থ, কোনও তাৎপর্যই সে খুঁজে পাচ্ছিল না। মৃত্যুকে সে হয়ত তত ভয় পাচ্ছে না, একবার সে ভাবল, যতটা পাচ্ছে মৃত্যু সম্পর্কিত অর্থহীনতাকে।
মস্তিষ্কের ভেতর বয়ে চলা নদীটার কল্লোলধ্বনি এত জোরে জোরে বাজতে লাগল তার কানে যে সে উঠে বসল। তার ভয় হচ্ছিল আর কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সে মারা যাবে। মৃত্যু ও শুয়ে থাকার ভঙ্গির মধ্যে কোথাও সাদৃশ্য আছে বলে সে উঠে পায়চারি করতে লাগল, কারণ তার মনে হচ্ছিল যতক্ষণ সে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে, মৃত্যুও ততক্ষণ দূরে থাকবে। অসুস্থ, অশক্ত ও ক্লান্ত শরীর নিয়ে সে ঘরটার এলোমেলো মেঝেয় হোঁচট খেতে খেতে পায়চারি করে গেল এবং ক্লান্তির শেষ সীমায় পৌঁছনোর পর ভাঙা, পচে যাওয়া ইটের দেওয়াল ধরে মাথা নামিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। বসতে বা শুয়ে পড়তে সে ভয় পাচ্ছিল, যদিও তার অসুস্থতা ও ক্লান্তি তাকে বাধ্য করল আবার শুয়ে পড়তে।
একটু আগে জগৎ ও জীবনের যাবতীয় স্মৃতি সে ভুলে যেতে চেয়েছিল, কিন্তু মৃত্যুর চিন্তা ভোলার জন্য সে শেষপর্যন্ত জগৎ ও জীবনের স্মৃতিতেই আশ্রয় নিল। সে জোর করে নিজের সুন্দর শৈশবের কথা ভাবতে লাগল। তারপর সুন্দরতর যৌবনের কথা। যৌবনকে যা সবচেয়ে মহিমান্বিত করে তা আয়না (অবাক হয়ে সে ভাবত এই বস্তুটি আবিষ্কৃত হওয়ার আগে মানুষের যৌবন হয়ত অবহেলিতই থেকে যেত } এবং আয়নার সামনে নিজের দেহসৌষ্ঠব নিয়ে দাঁড়াবার মুহূর্তে সে লক্ষ্য করত নিজের অস্তিত্ব নিয়ে সার্থকতার অনুভবে আয়নাটা নিজেই যেন শিহরিত হচ্ছে। সময়ের ছুটন্ত পা কেউ কখনও দেখেনি। ফলে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে বুঝতেই পারত না তার প্রখর যৌবন ক্রমশ পশ্চিমের দিকে হেলছে। কিংবা বুঝলেও-- জীবনের মায়া খুবই ধাঁধাময়-- সে নিজের প্রৌঢ়ত্বকেও এক সময় ভালবাসতে লাগল। (এটা আশ্চর্যের নয় যে একজন অশীতিপর বৃদ্ধও নিজের বাঁচার সপক্ষে যুক্তি বার করার ক্ষমতা রাখে।) কাজের খাতিরে সে প্রায় সারা পৃথিবী ভ্রমণ করেছে। ওটা করার সময় শুধু কাজই করেনি, পৃথিবীকে উপভোগও করেছে। তার মনে পড়ছিল পিরামিড দেখার স্মৃতি, রোমানস্তম্ভ দেখার স্মৃতি, তানিসিয়ানের হলুদ বালিতে উটের ছুটন্ত পায়ের স্মৃতি। ক্রাহোর ঘন সবুজ বা কালো জঙ্গলের ভেতর ঘুরতে ঘুরতে তার কিছুক্ষণের জন্য মনে হয়েছিল সে যেন কোনও গাছের অন্ধকার স্নায়ুর ভেতর ঢুকে পড়ে হেঁটে চলেছে। কোনওরকম ঈশ্বরবোধ ছাড়াই তিব্বতের এক গুহামঠের অভ্যন্তরীণ দৃশ্য দেখে সে বিস্ময়ে আবিষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তার মনে পড়ছিল মরক্কোর মরুঝড়, কানাডার রাস্তায় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্যবান ছাত্রছাত্রীদের বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, টোকিয়োর হোটেলের পর্দা, রেলওয়ে প্ল্যাটফর্মে মালয়েশিয়ার একটি মেয়েকে। কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে প্ল্যাটফর্মের ছাদের কাচের আলোয় সে মেয়েটিকে দেখেছিল দৌড়ে একটা কামরায় উঠে পড়তে। ট্রেনটা সঙ্গে সঙ্গে ছেড়ে দেয়। জানলার ধারে বসার পর একটু নার্ভাস হয়ে যাওয়া মেয়েটির দৃষ্টি তার দিকে পড়তে মেয়েটি হেসে ফেলেছিল। এবং তারপর সে নিজে একদৃষ্টিতে তাকিয়েছিল ধীরে ধীরে প্ল্যাটফর্ম অতিক্রম করতে থাকা একটা দীর্ঘ ট্রেনের দিকে। এটা ভেবে সেদিন সে বিস্মিত ও আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল যে এই মেয়েটির সঙ্গে তার আর কখনওই দেখা হবে না। অসাক্ষাতের কারণ হিসেবে সে ঠিক মৃত্যুর কথা ভাবেনি। সে তখন ভাবছিল জীবনেরই অদ্ভুত নিয়মের কথা : এমন কত মুখ আমরা রোজ দেখি, যার সঙ্গে আর দ্বিতীয়বার দেখা হবে না। তার কাছে মেয়েটিকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে একমাত্র তার স্মৃতিই। প্ল্যাটফর্মের নিঃসঙ্গ বেঞ্চে বসে সেদিন বিষণ্ন মনে সে মেয়েটির মুখকে নিজের স্মৃতিতে গভীরভাবে খোদাই করেছিল, যাতে তাকে কখনওই না ভোলে।
কিন্তু মৃত্যু তো স্মৃতিকেও নিশ্চিহ্ন করে দেয়, স্মৃতিরাও তো কোথাও সঞ্চিত হয়ে থাকে না, তার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তার কাছে মেয়েটিরও মৃত্যু ঘটবে। হঠাৎ আসা এই ভাবনাটা তাকে আবার এত অস্থির ও ভীত করে তুলল যে সে উঠে বসতে বাধ্য হয়। সমস্ত বেঁচে থাকা, সমস্ত আকাঙ্ক্ষা, সমস্ত স্মৃতির অকস্মাৎ একটা ভয়ঙ্কর, কালো ও নিঃশব্দ বিলীন হয়ে যাওয়া ছাড়া জীবন আর কিছু নয়।
বাইরে জোরে জোরে বৃষ্টি হচ্ছিল। অতীতে বৃষ্টির শব্দকে তার এত ভাল লাগত (বস্তুত বর্ষাকালের মতো ঘ্যানঘ্যানে ঋতুকে এত পছন্দ করার জন্য তার বন্ধুরা তাকে নিয়ে হাসিঠাট্টা করত) যে তার ইচ্ছে করত ফোঁটাগুলোকে আলিঙ্গন করে শুয়ে থাকতে। কিন্তু এখন বৃষ্টিপাতের শব্দ তার মস্তিষ্ক ও স্নায়ু সহ্য করতে পারছিল না। পোড়োবাড়িটার ফাটল ধরা ছাদ দিয়ে বৃষ্টির জল মেঝেয় গড়াতে লাগল। ছাট আসছিল কপাটহীন দরজা দিয়েও। কানে আঙুল ঢুকিয়ে সে বৃষ্টির শব্দকে প্রতিহত করতে চাইল। কিন্তু তার ফলে শুনতে শুরু করল নিস্তব্ধতারই এমন বিপজ্জনক, শূন্যগর্ভ শব্দ যে সে কান থেকে আঙুল সরিয়ে ফেলল। বৃষ্টির শব্দগুলোকে তার মনে হচ্ছিল হালকা, কোমল, সংখ্যাহীন পায়ে মৃত্যুরই নৃত্য, যা বহুদূর থেকে ছুটে আসছে তার দিকে। ঠিক এই মুহূর্তে সে তার দীর্ঘ জীবনের সবচেয়ে বড় ও প্রথম অযৌক্তিক কাজটা করল : বৃষ্টির শব্দকে চাপা দেওয়ার জন্য সে প্রবলভাবে চিৎকার করতে লাগল ।
বৃষ্টি থেমে গিয়েছিল। তবু সে চিৎকার করে যাচ্ছিল। গলা ও ফুসফুস ক্লান্ত হওয়ার জন্য এক সময় চিৎকার বন্ধ করতে বাধ্য হল, কিন্তু তার কানে তখন আপনিই চিৎকারের শব্দ বেজে যাচ্ছিল। ওরকম মানসিক অবস্থায় তার উপলব্ধি হল যে মৃত্যুভীতি থেকে মুক্তি দিতে পারে একমাত্র আত্মহত্যাই। ভাবনাটা তাকে কোথাও একটু উজ্জীবিত করেছিল, একটু শান্তি দিয়েছিল। কিন্তু এটা প্রমাণ হতে বেশিক্ষণ লাগল না যে অবিরাম আতঙ্ক ও যন্ত্রণা তার মস্তিষ্ক থেকে আত্মহত্যার জ্ঞানটা কেড়ে নিয়েছে। সে মরতে চাইছে। কিন্তু কী করে সফলভাবে মরতে হয় সেই জ্ঞানটা হারিয়ে ফেলেছে।
বাস্তবে যা করা বা পাওয়া অসম্ভব হয়ে যায়, স্বপ্ন তা সম্ভবপর করে তোলে। লোকটার করুণাশীল স্বপ্নগুলো তাকে দিয়ে রোজই নানাভাবে আত্মহত্যা করিয়ে নিত, যাতে জেগে ওঠার পর ওই জ্ঞান বা স্মৃতির সাহায্যে সে বাস্তবে আত্মহত্যা করতে পারে। যেমন তার এক স্বপ্ন তাকে স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে নিজের পোশাক ঘরটার সিলিঙের এক জায়গায় বেঁধে সে গলায় ফাঁস লাগাতে পারে। সিলিঙটা বৃত্তাকার হওয়ার দরুণ ব্যাপারটা শক্ত মনে হতে পারে বলে স্বপ্নটা বিদ্যুতের আলোয় স্পষ্ট করে দেখিয়ে দিয়েছিল ঠিক কোন জায়গায় কাপড়টা বাঁধতে হবে। এবং স্বপ্নে লোকটাও সহজে ঝুলে পড়তে সক্ষম হয়েছিল। অন্য এক ঘুমে তার স্বপ্ন তাকে এখান থেকে কিছু দূরে অবস্থিত এক গভীর, খরস্রোত নদীর তীরে নিয়ে যায়। এবং সাঁতারজ্ঞানহীন সে তাতে এত সাবলীলভাবে ঝাঁপ দেয় যে নদীটার ঘোর অন্ধকার বিছানায় নেমে আসতে তার বেশিক্ষণ লাগেনি। ভাঙা ইট ও জানলায় পা দিয়ে বাড়িটার চূড়ায় উঠে নিচের গর্তে ঝাঁপ দেওয়ার জ্ঞানটাও স্বপ্ন তাকে দিয়েছে, যদিও এরকম পদ্ধতিতে মৃত্যু আসতে একটু সময় নিয়েছিল। তীক্ষ্ণ, এবড়োথেবড়ো দেওয়ালে মাথা ঠুকে ঠুকে মরার সহজতম জ্ঞানটাও তার এক স্বপ্ন তাকে দিয়েছে। পেছনের গভীর জঙ্গলের ভেতর একটা বিষগাছ আছে। এক স্বপ্নে সে ওটার পাতাগুলো চিবিয়ে মারা যায়। এবং সবচেয়ে জটিল, ভয়ঙ্কর ও অবাস্তব এক স্বপ্নে সে নিজেই নিজেকে পাচ্ছিল। (নিজের সমস্ত শরীরকে গ্রাস করার পর সম্ভবত অবচেতনের কোনও অবিচ্ছেদ্য সংস্কারের জন্যই তার একবার ভয় হয়েছিল যে সে তবু শুধু চেতনাপিন্ড হয়েই বেঁচে থাকবে।)
আত্মহত্যার জ্ঞানটাও যে হারিয়ে ফেলেছে তার মতো অভিশপ্ত মানুষ আর হয় না। মৃত্যুভীতি তাকে যত করুণ ও হতভাগ্য করে দিয়েছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি করুণ ও হতভাগ্য সে হয়ে উঠল ইচ্ছেমতো না মরতে পারার জন্য। ঘুমের ভেতরই কিংবা স্বপ্নের ভেতরই সে খানিক শান্তি পায়। কিন্তু জেগে উঠেই এমন আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে পড়ে যে ক্রমাগত চিৎকার করে যেতে বাধ্য হয়। অস্থিরভাবে সে কখনও কখনও বাইরে বেরিয়ে আসে বাড়িটার ভেতর থেকে। একবার হাঁটতে হাঁটতে সে উপস্থিত হয়েছিল নদীটার কাছে। তীরে দাঁড়িয়ে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল বৃষ্টির জলে দু-কূল প্লাবিত নদীটার দিকে। জলের ভেতর নিমজ্জিত নিজের প্রতিবিম্বও দেখতে পেয়েছিল। কিন্তু স্বপ্নটা দেখার কোনও স্মৃতি তার মনে পড়েনি ।
আত্মহত্যার ব্যর্থ আকাঙ্ক্ষায় সে কয়েকদিন বা কয়েক শতাব্দী কাটিয়ে দিল। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে বুকের ওপর পাহাড়ের মতো ভারি ও শ্বাসরোধকারী মনে হচ্ছিল বলে সে প্রতিটি জীবন্ত মুহূর্তকেই ভাবছিল এক একটা শতাব্দী। আত্মহত্যার জ্ঞান সে ভুলে গিয়েছে অথচ মৃত্যুও আসছে না। কিংবা সে আসলে তখনও চেতনার গভীরে পালন করছিল মৃত্যুভীতিটাই। মনের এরকম বহুমাত্রিক, জটিল, দুর্জ্ঞেয় অবস্থার মধ্য দিয়ে সে সময় কাটাচ্ছিল। বেঁচে থাকার দীর্ঘ, বৈচিত্র্যময় স্মৃতিগুলোর প্রায় কিছুই তার মনে আর ভেসে উঠছিল না। প্রিয় খয়েরি ঘোড়াটার নরম, লোমশ মুখটা তার আর মনেই আসছিল না। আর মনেই আসছিল না মালয়েশিয়ার রেলওয়ে প্ল্যাটফর্মে দেখা সেই মেয়েটির মুখ, যা সে সযত্নে নিজের স্মৃতিতে খোদাই করেছিল। সে মনে মনে প্রার্থনা করছিল জগতে আর কখনওই যেন কেউ না জন্মায়। অভিশাপ দেওয়ার জন্য একটা গোটা মধ্যরাত জেগে শুয়ে শুয়ে (এবার স্বপ্ন দেখতেও সে যেন ভয় পেতে শুরু করেছিল) সে কালো আকাশ ও অর্থহীন নক্ষত্রসমষ্টির ভেতর কাউকে খুঁজছিল। কিন্তু সেখান থেকে কোনও অপরিচিত মুখই তার দৃষ্টিতে ভেসে ওঠেনি। তবে, আরও কয়েকটা ভীতিকর ও যন্ত্রণাদায়ক দিন ও রাত কাটানোর পর, এক সন্ধেয়--- ছাদের ওপর যখন ঝমঝম করে বৃষ্টির শব্দ বাজছে— শুয়ে শুয়ে সে হঠাৎ হেসে ফেলেছিল। ভীতিও এক সময় ক্লান্ত করে দেয় বলেই হয়ত সে হাসতে সমর্থ হয়েছিল। ওই মুহূর্তে বৃষ্টির শব্দকে সে আর ভয় পাচ্ছিল না। তার চোখের সামনে দিয়ে ঘরটার ভেতর একটা বিষধর সাপ ভেজা শরীর নিয়ে এসে আশ্রয় নেয় । কিন্তু সে তখন সম্পূর্ণ অসহায়ভাবে ব্যস্ত ছিল দরজার বাইরের আবছা আলোয় মানুষের ভাষাজাত কিছু শব্দকে ক্রমাগত জলে ভেসে যেতে দেখতে। শব্দগুলোকে সে যেন চোখে দেখতে পাচ্ছিল। এবং অস্ফুটস্বরে উচ্চারণ করার সময় সে যেন ওগুলোকে চোখে দেখে দেখেই পড়ছিল। সে উচ্চারণ করেছিল, ঈশ্বর ছাড়া মানুষ হয়ত বাঁচতে পারে। কিন্তু মরতে পারে না।'
এবং সঙ্গে সঙ্গে সে মারা যায় ।


1 মন্তব্যসমূহ
ভালো লাগল। বেশ কিছু এলিমেন্ট চমৎকৃত করল।
উত্তরমুছুন