পরস্পরবিরোধী দুই সামাজিক শক্তি বা প্রবণতা যখন হেস্তনেস্ত মোকা- বিলায় দাঁড়ায় তখনই সংকটের সূত্রপাত হয়। মানুষ, ঘটনা, পরিস্থিতি— নানা উপাদান পেছনে থাকে। ফলে সংকটের তালিকা করা দায়। সেই জন্যে প্রধান কোনো একটি উপাদানের উপর জোর দেওয়া হয়। এবং সেইভাবে সংকটের নামকরণ ঘটে । যথা, জাতীয় সংকট, রাজনৈতিক সংকট, পারিবারিক সংকট ইত্যাদি ।
হাল আমলে নৈতিক সংকটের একটা বড়ো উদাহরণ : উৎকোচ বা ঘুষ। দেশী-বিদেশী বহু সমাজচিন্তাবিদ তথা অর্থনীতিবিদ অনুন্নত দেশে এই ব্যাধির উল্লেখ করে থাকেন। সুইডিশ অর্থনীতিবিদ গুনার মিরদাল একাধিক বার বলেছেন যে দুর্নীতি থেকে সূত্রপাত স্বৈরাচারের । অনুন্নত দেশে এই ফাটল ধরে হাজির হয় সামরিক শাসন ।
উৎকোচ প্রধানত টাকা-পয়সা বা সম্পদের লেনদেন। কিন্তু তা অর্থনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিণাম সুদুরপ্রসারী। চৈতন্যের দিগন্ত ক্রমশ সংকুচিত হয়। ব্যক্তিমানুষ ব্যক্তিত্ব হারিয়ে আকারহীন পিণ্ডের দোসর বনে যায় ৷ কবন্ধের জুলুম শুরু হয় সর্বক্ষেত্রে।
সংকট-সমাধানের কথা বহুজন ভেবে থাকেন । কিন্তু সেইখানে পথও মসৃণ অথবা সমস্যা সহজ নয়। সামাজিক মর্যাদার ক্ষেত্রে সম্পত্তি- সম্পদের এক বিশেষ ভূমিকা আছে। এই গাজর গর্দভের সম্মুখে ইনসেনটিভ বা প্রয়োজক হিসেবে ঝুলন্ত না রাখলে তার চলৎশক্তি খোলে না। শাস্ত্রকারগণ কর্মযোগীর কথা বলেছেন, যারা ফলের কোনো তোয়াক্কা না রেখেই ব্রত-সম্পাদনে সদা মোতায়েন থাকেন । আদর্শ হিসেবে তোফা। কিন্তু সাধারণ মানুষের জন্যে সাধারণ প্রয়োজকের কথা ভাবতে হয় ।
তখন সামাজিক পুরস্কারের নিশান টানানো ছাড়া পথ থাকে না। ইউ- টোপিয়ার নকশা আঁকা সহজ । বাস্তব রূপে তা পাওয়া দায়। লোভ বজায় রেখে মানুষকে নির্লোভ করার দায়িত্ব হয়ত সকল যুগেই থাকবে । খ্যাতি, যশ, মান—গুণান্বিত লোভেরই এক দিক। সামাজিক পুরস্কার যতখানি নির্বস্তুক হয়ে উঠবে জীবনযাপনের বস্তুভিত্তির উপর, সেই সমাজের পরাকাষ্ঠা ততখানি। একথা বর্তমানে সকলে স্বীকার করেন ।
উৎকোচ-প্রসঙ্গে এই কাহিনীর সূত্রপাত ।
এতৎসঙ্গে অবিশ্যি স্মর্তব্য— বারাঙ্গনা মাত্রেই ছিল একদা অরণিত কুমারী ।
দুই
নায়কের নাম এই কাহিনীতে উহ্য। তাকে আমরা রাজপুরুষ বলব । বড়ো নয়, তবে পদ অফিসারের। যদিও কোনো এক বিভাগের কর্মচারী নিয়ে কথকতা, তবু এমন নৈতিক সংকট কেবল ওই এক বিভাগেই সীমাবদ্ধ নয়। জীবিকার নানা পর্যায়ে এমন দুর্বিপাক দেখা দিতে পারে। বেতন দাতাও এই গণ্ডির মধ্যে পড়ে। তারও জীবিকা আছে ৷ এমন ব্যাপক অর্থেই জীবিকা শব্দটি এখানে গৃহীত। লেখক, প্রকাশক, সংবাদপত্রের মালিক, সম্পাদক, ফার্মের স্বত্বাধিকারী, বিজনেস হাউসের পরিচালক অগয়রহ—যে-কেউ বিভিন্ন রূপে এমন নৈতিক-সংকটের মুখোমুখি হতে পারে। শুধু কাহিনী-কথনের সুবিধার জন্যে এক ব্যক্তি বা বিভাগের উল্লেখ আছে ৷ তাই কারো নাম খুঁজতে যাবেন না। সব বিমূর্ত। কোথাও পেশা, কোথাও সম্পর্কের সড়ক ধরে সকল সম্বোধন সম্পাদিত । কলেজে তাদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। তারপর দশ বছর লা-পাত্তা। রাজপুরুষ অবাক হয়ে যায়, এক সাবেক সহপাঠী বাড়ি এসে উপস্থিত ।
কারো অবয়বে তেমন অদলবদল ঘটে নি। সুতরাং নিমেষে চেনা-পর্ব সমাপ্ত ।
— তুমি ! ? ! ? ?
—তুমি ! ! ! ? ? ?
-বসো বসো। বাড়ি চিনলে কী করে ?
—গেজেটেড অফিসারদের বাড়ি কাক-পক্ষী চেনে ।
—কোথা ডুব দিয়ে ছিলে এতদিন ?
–বলব বইকি। সজনি, সব ধীরে-ধীরে ।
সহপাঠী এবং রাজপুরুষ অনেক অতীত ইতিমধ্যে চায়ের কাপের উপর ছড়িয়ে দিয়েছিল।
রাজপুরুষ কমপিটিটিভ পরীক্ষায় বসেছিল, ফল খুব ভালো হয় নি । শেষে কাস্টমস--শুল্কবিভাগে এক হিল্লে হয়। সহপাঠীর কোনো স্থায়ী জীবিকা নেই। যখন যা জোটে গা ভাসিয়ে দেয় ।
ছুটির দিন ছিল না বলে সেদিন আসর জলদি ভেঙে যায়। পরবর্তী শনিবারের বিকেলও রোববারে সব অন্ধকার দূরীভূত। দশ বছর আর গত দশ বছর থাকে নি। পুরাতন সাহচর্য নতুন হয়ে উঠল। এক মাসে উভয়ের আরো মজলিস বসল। সহপাঠী আসর গুলজারে অদ্বিতীয় । পুরাতন সকল খেই পাকড়াতে কারো বিলম্ব হয় নি।
একদিন রাজপুরুষের আপিসে টেলিফোন বেজে উঠল ৷
—হ্যালো। রাজপুরুষের হাতে রিসিভার ।
--অবসর আছে ?
অন্য পারে প্রশ্নকর্তা সহপাঠী ।
--আছে। তোমার জন্যে আছে ।
--অফিসার মানুষ। আমাদের মতো টোটো কোম্পানি নও। তাই আগেভাগে নোটিশ।
–এসো। চা খেয়ে যাও ৷
—আচ্ছা। ছেড়ে দিচ্ছি।
সহপাঠী অতঃপর হাজিরা দিয়েছিল। হাতে এক সুশোভন ব্রিফকেস । যদিও চায়ের কাপের উপর বর্তমানে রাষ্ট্রীয় পলিসি ঠিক হয়, সহপাঠী সেদিন তার উদ্দেশ্য উহ্য রেখেছিল। শুধু সাহচর্যের লোভেই তার উৎপাত—-বিদায় নিয়েছিল, এমন ভাব পেছনে রেখে ।
তিনদিন পরে এবার আপিল নয়, বাড়ি চড়াও সহপাঠী।
--কী খবর, ওল্ড বয় ? রাজপুরুষ অভ্যর্থনা জানায় ।
—খবর আছে বইকি।
--একটু বসো। চা আনিয়ে নিই ।
পরিস্থিতি তরল করতে সেদিন সহপাঠীর কোন সংকোচ ছিল না । শুল্কবিভাগে তার একটা জরুরি কাজ আটকেছে। জীবিকার কোন বাঁধা রাস্তা নেই। জাবনা অনুযায়ী বাথান বদল। বর্তমানে সে ‘উজানী ট্রেডার্স' নামে এক ফার্মের সঙ্গে জড়িত। তাদের একটা কেস আছে কাস্টমসে ৷
—উজানী ট্রেডার্স ? না, তেমন কোন ফাইল এখন আমার কাছে আসে নি ।
—আসে নি। তবে আসতে পারে ৷ তুমি ঠিক জানো আসে নি ? সহপাঠী সন্দেহ প্রকাশ করে ।
—বহু ফাইল পাশ হয় । তবে ও-নামে কিছু আসে নি। যদি আসে—
—ধরে রেখো । আর আমাকে খবর দিও ।
--কেসটা কী ?
—কোন একটা অ্যানোমালি অর্থাৎ অসংগতি আছে । আমার সব জানা নেই । পরে বলব ।
রাজপুরুষ আশ্বাস দিয়েছিল, 'তুমি ইন্টারেসটেড। উজানী ট্রেডার্স – নাম মনে থাকবে বইকি। তবে খোঁজ নিও ।'
--তা নেব বইকি। আমার তো যখন-যা-পাই-ধরে-খাই-গোছের জীবিকা । খোঁজ নিতেই হবে ।
—আমি চট করে কিছু করে বসব না, তুমি যখন ভেতরে আছো ।
--ধন্যবাদ ।
ধাইয়ের কাছে কোঁক চাপা থাকে না। রাজপুরুষের কাছে দু-তিন দিনের মধ্যে সব হদিস পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল।
দেখা যায়, ‘উজানী ট্রেডার্স' লাইসেন্স-অধীন কিছু মাল আমদানি করে। পরিমাণে অসংগতি ত আছেই, তাছাড়া বাজারে মালের চলতি যা দাম ইনভয়েসে দাম তার চেয়ে ঢের কম। একে আণ্ডার-ইনভয়েস বলে। ইনসপেক্টার এইসব গরমিল অনুযায়ী রিপোর্ট দিয়েছে। আইনত অপরাধ। মাল বাজেয়াপ্ত, জেল, জরিমানা, লাইসেন্স বাতিল — সব-কিছু হতে পারে। অফিসার বিচারকর্তা।
সহপাঠী বাড়ি এসে ধরনা দিলে। একদম ককানো অনুরোধ : বাঁচাও ৷
—আমি কী করতে পারি ? বাঁধা আইন ৷
— তুমি পার ।
--তোমার খাতিরে ওদের জরিমানা করে ছেড়ে দেওয়া যায় ।
–- তা হলে ব্যবসার আর থাকবে কী ? লাইসেন্স বাতিল । আমারও রুজি গেল ।
—ব্যবসা থাকবে না কেন ?
--বাজারে সুনাম গেলে আর ব্যবসা থাকে ?
—ইনসপেকশানের সময় ধরাধরি করে নি কেন, ভেতরে যখন গলদ?
সহপাঠী চেপে গিয়েছিল। ওদের চেনা ইনসপেক্টর ইতিমধ্যে বদলি হয়ে যায়। ফলে, এই গণ্ডগোল । চোরের দশ দিনের জায়গায় এবার গেরস্থর এক দিন এসে গেছে। গেরস্থ এখানে শুল্কবিভাগ ।
মাকু ঠেলাঠেলি চলল দু-তিন দিন ।
পুরাতন ঘনিষ্ঠ সহপাঠীর অনুরোধ। ফাটা অসোয়াস্তির মধ্যিখানে পড়ে- ছিল রাজপুরুষ ।
ভালো ছাত্র ছিল কলেজে। পাঠ্যপুস্তকের বাইরে রাজপুরুষের চোখ যায় নি, এমন অপবাদ কেউ দেবে না। সামাজিক সমস্যাবলী তার ধী-শক্তিসমীপে আছাড় খেত বইকি। কিন্তু তেমন আমল পেত না । তার সহপাঠী অনেকে রাজনীতি নিয়ে বেশ মশগুল ছিল। রাজপুরুষ তর্কচ্ছলে সময় কাটানোর নিমিত্ত হিসেবে তাদের গ্রহণ করত। তার বেশি না। সামাজিক দায়িত্ব মানুযের আছে। কিন্তু সেই বোঝা বইতে লাখ-লাখ মাথা প্রয়োজন । সেখানে একটি মাথা না থাকলে কী আসে যায়? এবঙবিধ আঁচড় লাগত রাজপুরুষের মনে। অন্যদিকে 'কেরিয়ার’- গঠনের উচ্চাশার কোনো ভেলকি তার সামনে ছিল না। চার বছর চাকরি হয়ে গেল। সে উপরি-রোজগারের কথা কোনদিন ভাবেনি। যদিও তার কানে পড়ত ঊর্ধ্বতন-অধস্তন সহকর্মীদের কপাল-চমকানোর কথা। শুল্কবিভাগে আইন আছে। সেই মাপকাঠি দিয়ে ফাইলের উপর বিচরণ এবং মন্তব্য-দান ছাড়া একটি অফিসারের আর কী কাজ থাকতে পারে ? অন্য কিছু ভাবত না রাজপুরুষ।
সহপাঠীর অনুরোধ তার কাছে প্রথম ধাক্কা এবং তা আশ্চর্যজনক । তার অধস্তন কোনো সহকারী তার কাছে বায়না ধরে নি কোনদিন। যদিও স্বভাবে পরিহাস-প্রিয়, কিন্তু আপিসে রাজপুরুষ রীতিমত আমলা অর্থাৎ ব্যুরোক্র্যাট। আপিসে গল্প করা ছিল তার ধাতের বাইরে । সবাই জানত, বড়ো রাশভারি অফিসার ।
সহপাঠী পরদিনই বাড়িতে এল ধরনা দিতে। অসোয়াস্তি আছে, তবু রাজপুরুষ কোন ত্রুটি রাখে না অভ্যর্থনায়। অবিশ্যি সব কথা শেষে গিয়ে এক জায়গায় ঠেকে ।
—কী করবে ভাবছ ? সহপাঠীর প্রশ্ন ।
—কিছু করা যাবে না ।
--আমার একটা অনুরোধ রাখো ।
--অনুরোধ কী করে রাখব ?
--তুমি ইচ্ছে করলে পার ।
অন্দর থেকে এই সময় একটা কালো রঙের পুডল্ ছিটকে বেরিয়ে এসেছিল। এইজাতীয় খুদে সাইজের কুকুর কয়েকবার রোয়াব ঝেড়েই ঠাণ্ডা হয়ে যায় । রাজপুরুষ ওটাকে সামলে নিজের কোলে তুলে নিলে । কুকুরের কালো পশমী জঙ্গলে বিচরণশীল তার পাঁচ মুহূর্তে তার সামনে আর অন্য কোনো কাজ ছিল না। বেকার নয়। সে এত্তেলা দিলে ৷
--তুমি পার । খুব ঠেকা। তাই তোমার কাছে এত অনুরোধ। নচেৎ— রাজপুরুষের জবাব দিতে বিলম্ব ঘটে। সময় যেন চোখ বুজে আছে, আদর-লোভী পুড়লের তৎকালীন চোখের মতো।
কিন্তু উত্তর শেষ পর্যন্ত দিতে হয়। 'আমার পালটা অনুরোধ । উজানী ট্রেডার্স নিয়ে তুমি আমাকে আর কিছু বোলো না। হাজার হাজার অসোয়াস্তি রাজপুরুষ গলা থেকে নিমিষে উগরে দিলে ।
তারপর স্তব্ধতা পৃথিবীময় ।
কিন্তু সহপাঠী নাছোড়বান্দা। সে বেশ শান্ত এবং জোরালো কণ্ঠে বললে, 'ওল্ড ফ্রেণ্ড তুমি । আমি সব তাস খুলে ধরছি তোমার সামনে। তুমি আমার জন্যে একটা কিছু করবে— এই আশায়।’
-- আমি—! রাজপুরুষ যেন ককিয়ে উঠল ।
এই ‘ডীল’ যদি হয়, পার্টি বিশ হাজার টাকা খরচে রাজি। আমি ভেবে রেখেছি, আমার দিন-গুজরানের জন্যে পাঁচ হাজার রেখে দেব। বাকি পনেরো হাজার তোমার । এখন তুমি ভেবে দেখো৷ সহপাঠীর কণ্ঠস্বর আগের মতো শান্ত এবং জোরালো ।
বক্তা চলে গিয়েছিল। সেদিন আর কোনো কথা হয় নি ।
রাজপুরুষ ধাক্কা খেয়েছিল। পনেরো হাজার টাকা একসঙ্গে রোজগার ? বিনা মেহনতে! পৃথিবীতে এইজাতীয় ব্যাপার ঘটে সে শুনেছে, পড়েছে ।
কিন্তু এমন চাক্ষুষ দেখে নি। দেখার ত কিছু বাকি নেই। বাকি স্রেফ একটা 'নড'। বাকি স্রেফ সম্মতিসূচক ঈষৎ শিরোভঙ্গি ।
দেওয়ালের কান থাকে। শত শত পোস্টার দেখেছিল রাজপুরুষ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়। লোকের কানাঘুষা ত থামবে না । পেছন থেকে মন্তব্য চলবে, সামনাসামনি না হোক। অধস্তন সহকর্মীরা কি ভাববে ? তাদের ইঙ্গিতময় চোখ-ঠারাঠারি রাজপুরুষ তখনই দেখতে গেলে।
সহপাঠী এক ধন্দে ফেলে গেল । চব্বিশ ঘণ্টা রেহাই নেই হাতছানি থেকে। পনেরো হাজার টাকা? মানে অনেক কিছু। সাহিত্য-রসের প্রতি রাজপুরুষের তেমন আকর্ষণ ছিল না কোনোদিন। তাই বলে কল্পনার দৌড় থেমে রইল না। পার্থিব কত সুখের হাতছানি সঙ্গে । সবচেয়ে বড়ো কথা, বহু ধরণের নিরাপত্তা আর্থিক নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত। আত্মীয়- স্বজনের মধ্যে কৃতিত্ব ব্যক্তিত্বের পরিধি দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে অনেক দুর ঠেলে দেয় । অন্যদিকে আপিসের মধ্যে কানাঘুষা এবং হঠাৎ ব্যক্তিত্বের ওজন- চুপসানো কৃত্রিম ভার নিয়ে দৈনন্দিন জীবিকা অর্জনের কশাঘাত ৷ বহু মানুষের সামনে ছোটো হওয়া কি বিধেয় ?
এক কথায়, আত্মদ্বন্দ্বে বিক্ষত রাজপুরুষ ।
কয়েক দিনের মধ্যে এবং তা দৈব ব্যাপার বলা চলে, রাজপুরুষ হঠাৎ কূল পেয়ে গেল।
হাতে কোনো কাজ ছিল না। তাই ছুটির ঘণ্টা দুই আগে সে বাড়িতে ফিরেছিল। রাজপুরুষের পিতা ছিলেন গোছালো সংসারী মানুষ । ছেলে মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে সদা-উৎকণ্ঠিত। রাজপুরুষের বর্তমান বাড়ি পৈতৃক- সূত্রে পাওয়া। উপর নীচে চার-কামরার দোতলা। নীচে ডাইনিঙ রুম । অপর কামরা ভৃত্যাধীন। উপরে বেড-রুম। অন্য কক্ষ ড্রয়িংরুম। এখনও বাড়িতে কোন ছেলেপুলে আসে নি। সুতরাং প্রশস্ত বাসভূমি ৷
কড়া নাড়তে কিশোর ভ্রিত্য দরজা খুলে দিয়েছিল। রাজপুরুষ হনহন করে উপরে উঠে যায়। সিঁড়ি থেকেই তার চোখে পড়ল বেডরুমের দরজা ঈষৎ গোলা! অথচ এই সময়ে বন্ধ থাকার কথা। বাড়িতে কেউ এলে তা জানালা দিয়ে দেখার বন্দোবস্ত আছে। সেই অনুযায়ী উপরের দরজা খোলা হয়। একা-একা থাকার ঝামেলা অনেক। স্ত্রী রাজপুরুষের চেয়ে সেদিক থেকে ঢের বেশী হুঁশিয়ার। দরজার পাল্লা ঈষৎ খোলা দেখে আশঙ্কিত, কৌতুহলী ; সন্দিগ্ধ রাজপুরুষ সন্তর্পণে অকুস্থলের দিকে এগিয়ে গেল। তিন-চার ইঞ্চি ফাঁক দুই পাল্লার মধ্যে। রাজপুরুষ দু-চোখ দূরবীন বানিয়ে নিলে। লঙশটে ধরা পড়ল - গৃহিণী একদম বিবস্ত্র । দিগম্বরী আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে। হাতে চিরুনি। শাড়ির স্তুপ খাটের উপর। পাশে উবু বসে আছে কালো পুডল, তার সারমেয়-দৃষ্টি নিয়ে মনিবের দিকে। চুলে চিরুনি চালানোর কালে মাঝে-মাঝে কুকুরের দিকে চেয়ে দিগম্বরী মুচকি হেসে আবার নিজেকে ড্রেসিং টেবিলের দর্পণে সোপরদ্দ করছিল। রাজপুরুষ হতভম্ব। নীরব দর্শক। ফোকাসের উপর অবিচল দৃষ্টি । এক সময় সেও মুচকি হেসে ফেলে। এমন দিগম্বরী সে দিনে কখনও দেখে নি। এক সময় ধৈর্য-টলমল রাজপুরুষ দ্রুত পাল্লা ঠেলে হেঁকে ওঠে ‘আরে, এ কী ? ? !’
সহধর্মিণী প্রায় আঁতকে উঠেছিল কোনো আততায়ীর আশঙ্কায়। কিন্তু ঝটিতি নিজেকে সামলে নেওয়ার পূর্বে শাড়ির স্তূপ সামলাতে থাকে এক কোণে সরে এবং মুখ খোলে, “এ-ই তুমি। এমন হঠাৎ অসময়ে - ” ।
— দরজা খুলে রেখে — এসব কী খেয়াল চেগেছিল-? অন্য জনের প্রশ্ন ।
—দরজার কথা খেয়াল ছিল না। গৃহিণী তখন দ্রুত বসনের তলায় প্রবেশার্থী। আরো যোগ করলে, – তুমি বুঝি আড়ি পেতে দেখছিলে ?
--দরজা খোলা। চোরের ভয়। বদমাশের ভয়—
—বদমাশের ভয় নেই। এক তুমি ছাড়া ।--আর । বাক্য অসমাপ্ত । উঠল স্বামীর দিকে চোরা চাউনি হেনে।
—কিন্তু দিগম্বরী হওয়ার সাধ কেন ? রাজপুরুষের গলার আওয়াজ তরল হয় না।
- -মানুষের কখন কী খেয়াল হয় তার বাঁধাধরা কোনো আইন আছে নাকি ? প্রায়-সংযত-বসন স্ত্রী মুখ ঝামটা দিয়ে উঠল।
—কিন্তু দিগম্বরী হওয়ার বাসনা কেন ? রাজপুরুষ অস্বাভাবিকতা মেনে নিতে পারছিল না ।
গৃহিণী এবার গলায় কিঞ্চিং ঝাল মিশিয়ে নিলে, --কী ঘাট হয়েছে তাতে শুনি? বিবস্ত্র হয়েছি তো কুকুরের সামনে। মানুষের সামনে ত না ৷
ইতিমধ্যে পূর্ণ সংযত বসন স্ত্রী স্বামীর মুখোমুখি এসে দাঁড়ায় এবং আপ্ত- কণ্ঠে বলে,— কুকুরের সামনে উলঙ্গ হওয়া দোষের কিছু না। মানুষের সামনে হলে ঘোর অপরাধ। বুঝেছেন, মিস্টার ?
কৌতুক-দৃষ্টি আবার নিক্ষিপ্ত ।
রাজপুরুষ হঠাৎ সঙ্গিনীকে আলিঙ্গনে বাঁধে। এবং একটু পরেই পাশ খানিক শিথিল করে বলে-- আগে হাতে হাত মেলাও। তারপর স্ত্রীকে একদম আলিঙ্গন পাশ থেকে নিষ্কৃতি দেয় সামনাসামনি ঈযৎ তফাতে ঠেলে ।
--হাত মেলাব ? আমি ?
—হ্যাঁ, তুমি লাখ কথার এক কথা বলেছ। রাজপুরুষ স্ত্রীর উপর নিবন্ধ-দৃষ্টি অনুরোধ প্রসারিত রাখে “বাকিটা আবার উচ্চারণ করো।”
বিস্মিত সহধর্মিণী ধীরে ধীরে বলতে থাকে পুনরায়, “কুকুরের সামনে উলঙ্গ হওয়া দোষের কিছু না। মানুষের সামনে অবিশ্যি অপরাধ।”
তারপর উভয়ের হাতের ঝাঁকুনি আর সহজে থামে না ৷
সহপাঠী পরদিন হাজির হয়েছিল। একবার দুপুরে আপিসে, সন্ধ্যায় বাড়িতে, ঘোড়েল ব্যক্তি। অনভ্যাসের ভয় থাকে। সহপাঠী হিম্মত জুগিয়েছিল। পনেরো হাজার টাকা ত নস্যি। যে-কোনো অফিসারের ঘর থেকে বেরুতে পারে। রাজপুরুষের ভয়টা কোথায়? সে ধনীর সন্তান। তার স্ত্রী ধনীর দুলালী। উপরন্তু। চাকরি চার বছরের পনেরো হাজারের হিসেব দিতে হবে নাকি ? যদি ফেউ লাগে ৷ দুর্নীতি- দমন বিভাগের কেউ ? সই-করা-নোট-যোগে যদি ফাঁসিয়ে দেয়। পুরাতন সহপাঠীকে অবিশ্বাস ? সে নিজে ট্যাকসি করে এসে পাওনা মিটিয়ে যাবে। সংকোচের কিছু নেই। আর উপরে ছুটতে হবে। কালেক্টর আছে। সবার উপরে বোর্ড-অব-রেভেন্যু —রাজস্ব বোর্ড আছে। তখন খরচ হয়ত বেশি। কিন্তু তার পনেরো হাজার—আর থাকল না। অত টাকা কি বানে ভেসে আসে ? লোক- নিন্দার ভয় ? কিন্তু লোক কোথায় ?
কুকুরের সামনে বিবস্ত্র হওয়া অপরাধ নয়।
পরবর্তী অধ্যায়।
সহপাঠী জিতে গেল ।
তবু কাহিনীর সামান্য জের আছে। তা-ই পরিশেষে বিবৃত ৷
অন্ধকারে বিরাট মাঠে ভয় পেলে মানুষ গান ধরে। হিন্দু মন্ত্র জপে, মুসলমান পড়ে দরুদ । দুই বাহনই জাগতিক কাজে জবর লাগে । রাজপুরুষ নিশ্চিন্ত হয়ে গিয়েছিল। পুরাতন সহপাঠীর সঙ্গে রাখী বন্ধন হ'ল নতুন করে । কলেজ-জীবন আবার বাতাসে নিঃশ্বাস ফেলছিল। কত সন্ধ্যা অভিজাত হোটেলে কেটে গেল। রাজপুরুষ বীয়ার পান করে । সহপাঠী আরো কঠিন পদার্থে তৈরি। তার প্রয়োজন হয় আরো কড়া চোলাই। রাজপুরুষের গৃহিণী এ-সবের শরিক নয়। টাকা বাড়ির মধ্যে কোথাও ছিল। কিন্তু সে জানে না। রাজপুরুষ একদিন ভাবলে, গৃহিণীকে সুখ-সন্ধ্যার ভাগী করা উচিত। কপোত-কপোতীর সংসার । এক সন্ধ্যা ঘরে উনুন না জ্বালিয়ে বাইরে দুজনে স্বচ্ছন্দে খেয়ে নিতে পারে । খরচ বেশি। সেই টাকায় ঘরে আরো ভালো খাওয়া যায়। তার জন্যে অত ভাবনার কিছু নেই আর। সেদিন সহপাঠী অবিশ্যি বাদ থাকবে । তাকে ছাড়াই এক সন্ধ্যা নীড় ছেড়ে তারা বিবাগী ডানা মেলে দেবে। সেদিন আপিস থেকে ফেরার সময় রাজপুরুষ এক শিশি দামি পারফিউম কিনে ফেললে স্ত্রীর জন্যে। পরবর্তী সন্ধ্যার পরিকল্পনা বাড়ি গিয়ে করা যাবে । কোথাও ক্যাবারে নাচ দেখা যেতে পারে । না, একদম অদ্দূর লাফ দিলে গৃহিণী সন্দেহ করবে। তার চেয়ে কোনো অভিজাত হোটেলে দামি ভোজনই উত্তম ।
পরদিন সকাল । ছুটির দিন। একটু দেরিতে দম্পতি চা খেতে বসেছিল ৷ রোববার কি ছুটির দিন তারা নীচে ডাইনিংরুমে চা খেতে যায় না । উপরে ভৃত্য ট্রলিযোগে সাজিয়ে আনে। আহার্য- তালিকা অন্যান্য দিনের চেয়ে একটু লম্বা হয়। ভোজনে ব্যস্ততা থাকে না। ছুটির দিন। খ্রীষ্টান ঈশ্বরের মতো সবাই বিশ্রামারথী।
কেটলি থেকে রাজপুরুষ চা ঢালছিল। ছুটির দিন রুটিন উলটে যায় । গৃহিণী যেন সম্রাজ্ঞী । হুকুম-তামিলের ভার মিস্টারের উপর ।
রাজপুরুষ প্রস্তাব উত্থাপন করলে—আজ সন্ধ্যায় বাইরে খেলে কেমন হয় ?
—খুব ভালো ৷ একঘেয়েমিও কাটে।
-গুড ।
—কিন্তু খরচ ?
--একবেলার লাট। কত আর যাবে ?
--তোমার হিসেব তুমি বোঝ গে ।
—তুমি প্রচণ্ড বাক-পটীয়সী ।
--সার্টিফিকেট দিচ্ছ ?
--না।
--নমুনা কোথা পেলে ?
—প্রতিদিন পাই । তবে সেদিন একটা কথা বলেছিলে বটে !
রাজপুরুষ এই সময় চায়ের কাপ স্ত্রীর হাতে তুলে দিলে। অন্য কাপে চুমুক দিতে-দিতে বললে—সেদিনের বাণীমন্ত্র আবার শোনাও ।
—কোন দিনের ?
–সেই দিগম্বরী অপরাহ্ণের। রাজপুরুষ স্মিত হাসির জের কক্ষময় ছড়িয়ে দিলে ।
--যাঃ! অপর পক্ষ তাচ্ছিল্যতায় সব উড়িয়ে দেওয়ার পক্ষপাতী ।
--একবার বলো না । রাজপুরুষ গলায় মিনতি মাখায়।
সংকোচে আড়ষ্ট গৃহিণী প্রথমে আঁচল দিয়ে ঠোঁটের হাসি আড়াল করে । এবং হঠাৎ আঁচল সরিয়ে গড়গড় করে বেশ জোরেই বলে ফেলে— কুকুরের কাছে ন্যাংটো হওয়া যায়, মানুষের কাছে না।
রাজপুরুষ অতি আনন্দিত, উৎসাহিত মন্তব্য যোগ করে— দামী কথা । দামী মন্ত্র ।
স্ত্রী স্বামীর চোখে চোখ ফেলে বলে—স্যার, কথার আর একটু বাকী থেকে গেছে।
বলো, বলো। স্বামীর যেন তর সয় না ৷
—কুকুরের সামনে কুকুর নিশ্চিন্তে ন্যাংটো থাকে ।
এটুকু উচ্চারণের পর স্ত্রী থিক থিক হাসি আরম্ভ করে।
-- ও–। প্রলম্বিত এই স্বরবর্ণের উপর রাজপুরুষ গোটা বাক্যের মর্মার্থ উপলব্ধির চেষ্টা করতে লাগল সেই নির্বিবাদ ছুটির সকালে।
পশুর নিকট উলঙ্গ থাকতে মানুষের কোনো লজ্জা থাকার কথা নয় ৷
এক পশু বেমালুম ন্যাংটো থাকে অন্য পশু-সমীপে ।


0 মন্তব্যসমূহ