রঞ্জনা ব্যানার্জী
শনিবার ১৩ ই জুলাই দেরি করে বিছানা ছেড়েছিলাম। চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে সবে ফোন হাতে নিয়েছি অমনি সুপর্ণার খুদে বার্তা ভেসে উঠল স্ক্রিনে, ‘প্রবাল দা’ চলে গেছেন।‘ কোথায় একটা কী ঘটে গেল যেন! জোর ধাক্কা খেলে যেমন ব্যথা অনুভব করতে খানিক সময় যায় আমার তেমনই অবশ লাগছিল। অথচ প্রবাল দা চলে যাবেন জানতাম, সেই জানাই কেবল সত্যি হলো।
অমন দীর্ঘদেহী মুখর মানুষটি বিছানায় নিস্তেজ পড়ে আছেন- এই দৃশ্য কিছুতেই আমি কল্পনায় আনতে পারিনি। এমন জীবন প্রবাল দা নিজেও হয়তো চাননি । গত বছর তাঁর ফেইসবুকে প্রশ্ন করেছিলেন,
“Quantitative
Qualitative
অমোঘ উচ্চারণ।
কোনটা নেবেন?”
নানা জন নানা উত্তর দিয়েছিলেন। আমি পড়তে পড়তে থমকালাম, একজনের মন্তব্যের উত্তরে প্রবাল দা’ লিখলেন, “বস্তু হলে বোধ হয় লোকে প্রথমটা চায়, আর যা ছোঁয়া যায় না তার বেলায় দ্বিতীয়টা।‘ আমি জেনে গিয়েছিলাম প্রবাল দা’ নিথর জীবন চান না। তাঁর মগজে যে টিউমারটি বসত গেড়েছিল তাকে হটাতে হলে এমন হওয়ার আশঙ্কা ছিল।
সুপর্ণার মেসেজ ফের পড়ি। কলকাতার সময় সকাল দশটা মানে আমার শুক্রবার ১২ই জুলাই রাত দেড় টা। কী অদ্ভুত! প্রবাল দা’ যখন চলে যাচ্ছেন জীবন ছেড়ে আমি তখন অন্য আকাশে আরেকটি ভোরের অপেক্ষায় রাত পার করছি। আহা! প্রবাল দা’র সঙ্গে আমার আর দেখা হলো না।
কদিন ধরে এখানে অবিরাম বৃষ্টি ঝরছিল। প্যানপ্যানে বৃষ্টি। পি,ই,আই লাল মাটির দ্বীপ। প্যাচপ্যাচে কাদা বিশ্রী দেখায়। ১৩ তারিখ সকালে বৃষ্টি ছিল না। আকাশে ছেঁড়া ত্যানার মতো ময়লা মেঘ ভাসছিল। মেঘের দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম, কত জায়গার জল উবে মেঘ হয়। এপারের মেঘ ভেসে চলে যায় ওপারে। কার জলে কে জল মিশিয়েছিল সেই ইতিহাস ভুলে বৃষ্টি হয়ে নেমে আসে জমিনে। মানুষও কি তেমন করে দেহ ছাড়লে হাওয়ায় মিলিয়ে ভুলে যায় কোন পোশাকে সে এই পৃথিবীতে এসেছিল? যতদিন শ্বাস ততদিনই আশ- দেহ ছাড়লেই কি সকল চিহ্নের অবসান? খানিক পরে সুপর্ণাকে ফোন দি। কেন , কী, কখন - সবই তো জানা। তাও ঘুরেফিরে একই কথা শুনি কিংবা বলি দুজনে এবং আমাদের শোকের গা থেকে দুঃখ খসাই। প্রবাল দা’ কখনই চাইতেন না তাঁকে নিয়ে আহা-উঁহুর আর্দ্রকথা হোক ।
সুপর্ণার সংগে আমার যোগাযোগের সূত্রও ছিলেন প্রবাল দা’। আর প্রবাল দা’র সঙ্গে আমার সংযোগ ঘটিয়েছিলেন অপরূপা সেই শ্রীময়ী, শ্রীমতি চিত্রা দাশগুপ্ত।
খুব বেশি দিন আগের কথা নয়। এই সেদিন, তাও সাত বছর পার। ২০১৭ সাল। মেসেঞ্জারে কেউ একজন পাঠিয়েছিল সেই ভিডিওক্লিপ। বর্ষীয়ান এক শিল্পী উদাত্ত গলায় গাইছেন : ‘আজি তোমায় আবার চাই শুনাবারে’। কোনো আড়ম্বর নেই; এলোচুল, ঘরের শাড়ি পরা, সামনে গীতবিতান খোলা- চোখ নেই সেদিকে। প্রার্থনার মতো নিজেতেই বিভোর হয়ে গাইছেন। বয়সের আঁচড় তাঁর গলায় বসেনি একটুও। অথচ এই অনায়াস নিরাভরণ নিবেদনে রবিঠাকুর যেন সাড়ম্বরে আসন পেতেছেন তাঁর সুরে এবং স্বরে। নাম শ্রীমতি চিত্রা দাশগুপ্ত। ব্যস, আর কোনো তথ্য নেই। এর মধ্যেই বেশ ক’জনকে এই ক্লিপ পাঠিয়ে দিয়েছিলাম আমি। তাদেরও প্রশ্ন কে ? কোথায় বাস? কোন দেশেতে? অতএব যাঁর উঠোন থেকে এই গান ছড়ালো তাঁর কাছেই বন্ধুতার আর্জি পাঠাই। দু’লাইন লিখে মেসেঞ্জারে জানাই আমার মুগ্ধতার কথা এবং শিল্পীকে আমার প্রণাম পৌঁছে দেওয়ার বিনীত অনুরোধ রাখি।
প্রায় সংগে সংগেই উত্তর আসে: শিল্পী নেই ইহলোকে। তিনি তাঁরই সন্তান এবং ২০১৫ তে মাতৃহারা হয়েছেন।
পরে জেনেছিলাম চিত্রা দেবীর আদিনিবাস কুমিল্লায়।আর যে গানটি আমাদের বিনে সুতোর মায়ার বাঁধনে বাঁধল, সেই গান চিত্রা দেবীর চলে যাওয়ার এক/ দু’বছর আগের গাওয়া, তখন তাঁর বয়স ছিল ৮৪ কিংবা ৮৫। তখনও বুঝিনি চিত্রা দেবীর গান আমায় পৌঁছে দিয়েছে এক অনন্য আনন্দযজ্ঞের ঠিকানায়। সেই যজ্ঞের পুরোহিত তাঁর এই পুত্র, প্রবাল দাশগুপ্ত, যিনি পরবর্তীতে সর্বার্থেই আমার দাদা বনে গিয়েছিলেন এবং তাঁর ফেইসবুক পেইজ ক্রমশ হয়ে উঠেছিল আমার জানবার ,দেখবার এবং ভাববার মাধুকরীর উঠোন।
২০১৭ থেকে ২০২৪ বড্ড কম সময়। যেখানে সমান কাঁধে লক্ষ পা হেঁটেও মানুষ চেনা দায় সেখানে এক্কেবারে না-দেখে কেবল ফোনে , হাতে গোনা কয়েকবার কথা বলেই কীভাবে যেন জানা হয়ে গিয়েছিল এই যোগাযোগ আমার জন্যে নিয়তির অনন্য উপহার। কত কী জেনেছি, পড়েছি এবং ভাবতে শিখেছি তাঁর কল্যাণে!
ভ্রমণ, সিনেমা, থিয়েটার, রাজনীতি, রবীন্দ্রনাথ , চিত্রকলা সবেতেই প্রবাল দা’র ছিল নিবীড় আগ্রহ। মাঝে মাঝে একই গান অনেক শিল্পীর গলায় শুনতেন এবং জানাতেন কী কারণে সেই গানটি সেই বিশেষ শিল্পীর কন্ঠে মান্যতা পেল। সুরের আলতো ছোঁয়া কিংবা শব্দ প্রক্ষেপনে গানের অর্থ কতভাবে পাল্টে যেতে পারে চিনেছি প্রবালদা’র সঙ্গে এই অন্তর্জালের যাত্রায়!
ভালোবাসতেন মানুষ। চেনা হোক কিংবা অচেনা, বর্ণধর্মশ্রেনি নির্বিচারে সকলকে মর্যাদা দিতেন। তাঁর ভালোবাসা অথবা সান্ত্বনার কিংবা সাহায্যের হাতটি সকলের জন্য অবারিত ছিল ।
প্রবাল দা’ পড়তেন খুব। তাঁর সেইসব পাঠের প্রসাদ আমরাও পেতাম, ঋদ্ধ হতাম। দারুণ সব অনুবাদ করতেন। তাঁর ফেইসবুক বন্ধুদের স্রেফ নিজস্ব আনন্দপাঠের সঙ্গী করবার জন্যেই এই শ্রমসাধ্য কাজটি তিনি করে যাচ্ছিলেন। আমি তাঁকে গল্পপাঠের অনুবাদটিমে যুক্ত হওয়ার অনুরোধ জানিয়েছিলাম। তিনি নিজের মতো করে অবসর জীবন উপভোগ করছিলেন। মনের আনন্দে লিখবেন, পড়বেন, দেখবেন, ঘুরবেন - এককথায় কোনো দিন-তারিখের ফাঁদে যুক্ত হতে চান-না বলেছিলেন। কিন্তু ততদিনে আমি তাঁর বোন হয়ে গেছি তাই ঢেঁকি কীভাবে উগড়ান? অতঃপর আমার অনুরোধে গল্পপাঠের জন্যে বেশ ক’টি স্বাদু অনুবাদ করে দিয়েছিলেন ।
অসুস্থ হওয়ার খবর শুনে আমি ফোন করেছিলাম দাদাকে। খুব সহজ গলায় দুঃসংবাদটি দিয়েছিলেন। বলেছিলেন অপারেশনে ঝুঁকি আছে। অমন কর্মমুখর জীবনবাদী মানুষটির জীবনে এমন দুঃসময় আসতে পারে বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল ।
গত একবছর ধরে ফেইসবুকে ক্রমশ তিনি অনিয়মিত হচ্ছিলেন। পোস্টের সংখ্যা কমছিল। তাঁর সর্বশেষ অনুবাদটি ছিল মান্টোর ছোটগল্প। ইংরেজিতে , ‘ন্যাকেড ভয়েস’ শিরোনামের গল্পটির প্রবাল দা বাংলায় ভাষান্তর করেছিলেন, ‘বিবস্ত্র স্বর’ নামে। শিরোনামটি আমায় মুগ্ধ করেছিল, গল্পের অনুবাদও ছিল বরাবরের মতো স্বচ্ছন্দ। ফেইসবুকের লেখা বেদখল হতে কতক্ষণ? আমি গল্পপাঠের জন্য চেয়ে নিয়েছিলাম গল্পটি। দাদা খুশি হয়েছিলেন। এক বছর আগে ২০২৩ এর মে মাসে দাদার সঙ্গে এই গল্পটি নিয়েই মেসেঞ্জারে আমার শেষ কথা হয় । তার পরের মাসেই দাদার অপারেশন হলো। সার্জারির পরে দাদা আর স্বাভাবিক জীবনে ফেরেননি।
একটা মানুষ কী দ্রুত প্রবল মুখর থেকে পাথরের মতো স্থবির হয়ে গেলেন!
প্রবাল দা’র করা শেষ অনুবাদটি বাংলাদেশের ‘ শব্দঘর’ নামের ম্যাগাজিনের এবছরের (২০২৪) মার্চ সংখ্যায় জায়গা করে নিয়েছিল।
প্রবাল দা’ নিজেকে সবসময়ই সাধারণের তালিকাতে রাখতে স্বস্তি বোধ করতেন। গল্পপাঠের জন্য তাঁর পরিচিতি চেয়েছিলাম। উনি লিখে দিলেন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকুরে। প্রবাল দা’ পশ্চিম বঙ্গ ফিন্যানশিয়াল কর্পোরেশনের জি.এম ছিলেন। আমি বললাম দাদা ‘চাকুরে’ না লিখে কর্মকর্তা লিখি। দাদা বলেছিলেন, কর্মকর্তা শব্দটি বড় উন্নাসিক।
রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবনের ধ্রুবতারা ছিলেন। ‘পনের আনা’ পড়িয়েছিলেন ফেইস বুকে পোস্ট দিয়ে। সেই প্রবন্ধে রবিঠাকুর এক জায়গায় বলেছিলেন, “ট্রেনের সব গাড়িই যদি রিজার্ভ গাড়ি হইত তাহা হইলে সাধারণ প্যাসেঞ্জারদের গতি কী হইত?” আমাদের প্রবাল দা’ সাধারণ প্যাসেঞ্জার ছিলেন না। জনারণ্যেও তাঁর আপন আলোটির আভাস চেনা যেত। তাই অমন মাঝপথে কথা থামিয়ে তিনি নীরব হয়ে গেলেও আমার মতো অনেকের মনেই তাঁর বিভা কখনই ম্লান হবে না। রবিঠাকুরের গানে, সমর সেন বা জীবনানন্দের কবিতায়, কিংবা শম্ভু মিত্রের মতো দৃঢ়চেতা অভিনেতার নতুন কোনো গল্প শুনলে অথবা অচেনা কোনো নদীর ধারে দূরের মেঘে হঠাৎ চোখ পাতলেই প্রবাল দা সটান ছলকে দাঁড়াবেন মনের উঠোনে এবং বলে উঠবেন : জীবন যাপনের নয় বরং উদযাপনের।


0 মন্তব্যসমূহ