(এক)
কি জ্বালাতন! হতচ্ছাড়ি কোকিলটার চেঁচানিতে সেই মাঝ রাত থেকে দু’চোখের পাতা এক করতে পারলাম না! কুহু কুহু কুহু কুহু – কোঁ-কোঁ-কোঁ-কোঁ – ক্রর –র – ক্রর –র –র –র – উহ কী ডাক! যেন ধমকাচ্ছে! কোকিলের ডাক যে কত কর্কশ হতে পারে – এই ডাক না শুনলে কেউ বিশ্বাসই করবে না।
শুনেছি কোকিল নাকি ডিমে তা দিতে পারে না। তাই কাকের বাসায় ডিম পাড়ে, আর কাকের ডিমগুলোকে ভেঙ্গে ফেলে। মনে হয় কাকগুলোকে বকে বকে ঘুম থেকে তুলে দিচ্ছে – যা এবার ডিমে তা দিতে বোস।
আমার যে ঘুম নিয়ে কি সমস্যা, কি বলব। বিছানায় শুয়ে শুধু এপাশ ওপাশ করতে থাকি। শ্যামলের তো শুতে না শুতেই নাক ডাকতে থাকে। সেটাও এক জ্বালা! ও তো স্বীকারই করবে না ওর নাক ডাকে। বলে, “কই শুনতে পাইনা তো!” মাঝে মাঝেই আমাকে ওষুধ খেয়ে ঘুমোতে হয়। এরপর কোকিল যদি তারস্বরে মাঝরাত থেকে মার্তণ্ড রাগিনী ভাঁজতে শুরু করে তবে যাই কোথায়? এই চিৎকার এখন রোজ কান ঝালাপালা করে দেবে। বসন্তকাল না!
শোবার ঘরের জানালার পাশে কৃষ্ণচূড়া গাছটা – সেখানেই আস্তানা। গাছটা অবশ্য আমার খুবই পেয়ারের। এই সময় লাল লাল ফুলে ভরে যায়। কি ভালই যে লাগে! জানালা খোলা থাকলে ঘর ভরে হাওয়া। গরম কালে জানালা খোলাই থাকে। ফ্যান চালাতেও হয়না। এত হাওয়া। এসময়ে অবশ্য রাতে বন্ধ করে দিই। গাছটা শ্যামলের বাবা লাগিয়েছিল। অনেকদিন আগে। আমি এসে থেকেই গাছটাকে দেখছি। তা আমার আর শ্যামলের বিয়ের পর প্রায় সাড়ে তিন বছর কেটে গেল।
মজা পুকুরের ওপারে একটা রাধাচূড়া গাছও ছিল। এই সময় ওতে হলুদ ফুলে ছেয়ে যেত। বছরখানেক হল গাছটা কাটিয়ে বিক্রি করে দিয়েছে। পঞ্চপাণ্ডবরা। ওদের বাবা গাছটা লাগিয়েছিলেন। এদিকে লাল ফুল – আর ওদিকে হলুদ – কি চমৎকার লাগত! একদিন সকালে ঠক ঠক আওয়াজ শুনতে পেয়ে জানালা দিয়ে দেখি তিন চারটে লোক গাছটাকে কাটছে। শ্যামলকে বললাম গিয়ে খবর নিতে। প্রথমে তো যেতেই চাইছিল না। তাড়া খেয়ে গেল পরে। গাছটাকে নাকি ভাইরা বিক্রি করে দিয়েছে। বললাম, “বল না গাছটা না কাটতে।”
“ওরা আমার কথা শুনবে কেন? গাছটা তো ওদের।”
“তা বলে এতদিনের গাছটা কেটে ফেলবে?”
“পয়সার দরকার যে ওদের।”
দু’ঘন্টা মধ্যে জলজ্যান্ত গাছটা মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। কান্না চাপতে পারছিলাম না। সারাদিন থম মেরে গেছিলাম। কিছু মুখে দিতে পারিনি। খালি জায়গাটা দেখলে এখনও বুকের ভেতরটা টনটন করে ওঠে।
শ্যামলের কাছে শুনেছি পঞ্চপাণ্ডবরা একসময় অবস্থাপন্ন ছিল। মানে ওদের বাবা পয়সাওলা লোক ছিলেন। ছেলেগুলো একেকটা অপগণ্ড। তেমন কিছুই করে না। মাঝে মাঝে পাড়া মাথায় করে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করে। এমন তার ভাষা – কান পাতা দায়। মারামারি হাতাহাতিও লেগেই আছে। পাড়ার কোন লোক যদি নোংরা ফেলবার জায়গা মনে করে মজা পুকুরের দিকে কিছু ছুঁড়ে ফেলে, তাহলে পাঁচ ভাই এককাট্টা হয়ে বেরিয়ে এসে তার গুষ্টির তুষ্টি করে ছেড়ে দেয়।
ওই মজা পুকুরটা যে ওদের। বিয়ের পর শ্যামল বলেছিল।
(দুই)
“ওই মজা পুকুরটা হল পঞ্চপাণ্ডবদের।”
“পঞ্চ পাণ্ডব _?”
“ওই হল আর কি। পাঁচ ভাই ওরা।”
“কোথায় থাকে?”
“পুকুরের ডানদিকের বাড়িটা __”
“ওই পোড়ো বাড়িটা বলছ?”
“যত্ন না নিলে যা হয়। একসময় ভালই ছিল।”
“বড় আছে বাড়িটা। এক সাথেই থাকে – পাঁচ ভাই?”
“পার্টিশন হয়ে গেছে। প্রত্যেকের ভাগে একটা করে ঘর পড়েছে। বড় ভাইয়ের দুটো।”
“রান্নাঘর? হেঁশেলও নিশ্চয়ই আলাদা?”
“বড় ভাইয়ের ভাগে পড়েছে রান্নাঘরটা। মেসোমশাই ওর হেঁশেলেই খেতেন কিনা। মাসীমা মেসোমশাইয়ের ঘরটাও বড়দাই পেয়েছে।”
“বাকি চার ভাই?”
“টানা বারান্দা ভাগ করে যে যার রান্নাঘর বানিয়ে নিয়েছে।”
“বাথরুম পায়খানা?”
“বড় ভাই আগেররটাই ব্যবহার করে। বাকি ভাইরা উঠোনে বানিয়ে নিয়েছে।”
“বড় ভাই তাহলে আরামেই আছে বল! ভায়ে ভায়ে ঝগড়াঝাঁটি হয়না?”
“দু’একদিনেই টের পেয়ে যাবে।”
(তিন)
আমাদের বাড়িতে একটা গ্র্যাণ্ডফাদার ক্লক ছিল। পেন্ডুলাম দেওয়া ঘড়ি। ঘন্টায় ঘন্টায় ঢং ঢং করে সময়ের জানান দিত। সপ্তাহে একদিন দম দিতে হত। দম দেবার জন্য দুটো ফুটো ছিল। একটা ঘড়ির জন্য। অন্যটা পেণ্ডুলামের ঢং ঢং চালু রাখার জন্য। জন্মের আগে থেকেই ছিল। ঠাকুরদার কেনা। স্যুইস মেড। জ্ঞান হওয়া ইস্তক বাবাকে প্রত্যেক সপ্তাহে দম দিতে দেখেছি। শেষের দিকে কখনও আমি, কখনও বাবা। পাঁচ বছর আগে বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে আমি। ঘড়িটা আমাদের পরিবারেরই একজন ছিল।
গোলটা বাধল বহ্নি আসার পর থেকে। ওর আবার ঘুম নিয়ে সমস্যা। প্রথম দিন বিয়েবাড়ির কোলাহলে সারাদিন ঠিক খেয়াল করতে পারেনি। রাতে যখন আমরা শুয়ে পড়লাম – বাড়ি একেবারে নিঃঝুম হয়ে গেছে – ঢং করে আওয়াজ শুনে চমকে উঠল।
“কিসের আওয়াজ হল?”
বললাম, “সাড়ে বারোটা বাজল।”
“তার মানে আবার ঢং হবে?”
“হ্যা বারোটায় বারো বার – প্রতি আধঘন্টায় বাজতে থাকবে।”
বেচারা সেদিন সারারাত ঘুমোতে পারেনি। আধঘন্টার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়তে হবে ভেবে ভেবে ভোর পাঁচটার পাঁচবার ঢং ঢং শুনে ঘুমের আশা ছেড়ে উঠে পড়ল। অতএব পরের দিন থেকে সেই ঘড়ির মুখ বন্ধ করে দিতে হল।
এই সাড়ে তিন বছরে সমস্যাটা কমেনি বরং বেড়েছে। শেষ ভেড়া গোনা হয়ে যায়, কিন্তু দু’চোখের পাতা এক হয়না। নানা রকম টোটকা, আয়ুর্বেদি, ইউনানি আর হোমিওপ্যাথিতে হতাশ হয়ে এখন অ্যালোপ্যাথিক ঘুমের ওষুধই আশ্রয়। আজকাল অভিযোগ করে আমার নাক ডাকার জন্য ও ঘুমোতে পারেনা।
আমি বলি, “কই আমি তো শুনতে পাইনা।” রেগে যায়।
“তোমার সবেতেই ঠাট্টা। নিজে তো এখুনি ভোঁস ভোঁস করে ঘুমোবে।”
এখানে একটা কথা বলে নেওয়া ভাল। বহ্নি প্রায়ই বলে আমি নাকি রগচটা। রেগে গেলে আমি নাকি মানুষ খুন করতে পারি। বহ্নির সাথে ঝগড়া, রাগারাগি কখনও হয়নি সেটা বলা ঠিক হবে না। বরং বলা যেতে পারে মাঝে মাঝেই হয়। রেগে গিয়ে ও অনেক সময় আমাকে আঁচড়ে কামড়েও দিয়েছে। তবে আমি কিন্তু গান্ধীগিরির আশ্রয় নিই। হাসি ঠাট্টা করে ওকে ঠাণ্ডা করার চেষ্টা করেছি। নয়তো চুপ করে গেছি।
তবে রগচটা আমি বটেই। মানুষ খুন করতে পারি কিনা জানিনা। কিন্তু রাগের বশে দু’একবার এমন কিছু করেছি, যাতে পরে নিজেরই অনুশোচনা হয়েছে। বার বার মনে হয়েছে কাজটা না করলেই ভাল হত। কিন্তু তখন তো তির ছোঁড়া হয়ে গেছে, ফিরিয়ে নেবার উপায় নেই! তবে সাধারণত মাথা আমার খুব ঠাণ্ডা।
আমার এক বন্ধু ছিল শান্তি। যখন স্কুলে পড়তাম। সবাই বলত আমরা দুজনে নাকি বুজ়ম ফ্রেন্ড। শান্তি ক্লাসে না আসলে ফাঁকা ফাঁকা লাগত। স্কুলের পরেও আমরা অনেকক্ষণ একসঙ্গে ঘোরাফেরা করতাম। ও আমাদের বাড়িতে আসত। মুড়ি মাখা খেত। আমিও ওদের বাড়ি যেতাম। মুড়ি তেলেভাজা খেতাম।
একবার স্কুলের ফুটবল ট্যুর্নামেন্টে আমি আর শান্তি দুপক্ষে খেলেছিলাম। আসলে আমরা দুজনেই ভাল খেলতাম। তাই একই টীমে রাখা হয়নি। হাফ টাইমের আগেই শান্তি আমাদের দলকে একটা গোল দিল। খেলা যখন প্রায় শেষের দিকে, তখনও আমরা গোল শোধ করতে পারিনি। প্রচণ্ড টেনশন হচ্ছিল। রাগও। হঠাৎ কি হল – শান্তির ডান পা লক্ষ্য করে সজোরে কিক করলাম। বেচারা আর কোনদিন ফুটবল খেলতে পারেনি। খুব কষ্ট পেয়েছিলাম।
(চার)
বিছানার মায়া ত্যাগ করে বহ্নি উঠে পড়ে। জানালাটা খুলে দেয়। কোকিলটা আর ডাকছে না। কৃষ্ণচূড়া গাছটা ফুলে ফুলে লাল হয়ে আছে। মজা পুকুরের ওপারে দৃষ্টি ফেলল। যেখানে রাধাচূড়া গাছটা ছিল, সেখানে এখন শুধু ওর গুঁড়িটা মাটির থেকে একটু ওপরে জেগে আছে। এদিক ওদিক থেকে দু’একটা কচি সবুজ পাতা বেরিয়েছে। ওটা কি আবার একদিন বড় হয়ে ফুল ফোটাতে শুরু করবে? করলেও তার অনেক দেরি। একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস পড়ল। বিছানাটা ঝেড়ে বেডকভার পেতে দিল।
বাথরুমে গিয়ে চোখেমুখে জলের ঝাপটা দিল। চা করে থার্মোফ্লাস্কে রাখা আছে। মর্নিং ওয়াকে যাবার আগে শ্যামল বানিয়ে রেখে যায়। চা আর বিস্কুট নিয়ে বিছানায় জানালার ধারে বসল। মোবাইলটা অন করল। মিনি একটু বাদেই এসে পেছনের দরজায় নখ দিয়ে আঁচড়াবে। দুধ খাবার জন্য। বহ্নি উঠলে ও যেন কী করে টের পেয়ে যায়।
মিনি ওদের পোষা বেড়াল। সাদা আর ছাই রঙের মিশেল। একেবারেই বাচ্চা – মাস চারেক বয়েস হবে। সারাদিন বহ্নির পায়ে পায়ে ঘুরবে আর মিউ মিউ করবে। রাতে বাগানেই থাকে। শ্যামলকে দেখলেই পালিয়ে যায়।
অথচ ওকে শ্যামলই বাড়িতে নিয়ে এসেছিল। মর্নিং ওয়াক থেকে ফেরার পথে বাচ্চাটা মিউ মিউ করতে করতে ওর পায়ে পায়ে দৌড়াচ্ছিল। ও দয়াপরবশ হয়ে বাড়ি নিয়ে এসে দুধ খাওয়াল। তারপর থেকে ও শ্যামলেরই পায়ে পায়ে ঘুরত – যতক্ষণ না ও অফিস বেরিয়ে যায়। ততক্ষণ বহ্নিকে পাত্তাই দিত না। শ্যামল চলে যাবার পর ও মাঝে মাঝে এসে সজোরে ম্যাও করে বহ্নিকে জানান দিত ওর খিদে পেয়েছে।
এক শীতের সকালে মিনির মিউ মিউ শুনে শ্যামলের মনে হল ওর ঠাণ্ডা লেগেছে। কোলে তুলে ভাল করে পরীক্ষা করে বলল নাক দিয়ে নাকি জল পড়ছে আর চোখ দুটো ফুলে গেছে। ব্যস, খানিকটা অম্রুতাঞ্জণ নিয়ে ঘসে দিল ওর নাকে। ছাড়া পেয়ে বেড়ালের সে কি দৌড়! তারপর থেকেই শ্যামলের ধারেকাছে ঘেঁসে না। এখন বহ্নিই সব। ঘটনাটা মনে পড়লে বহ্নির হাসি পেয়ে যায়। মাঝে মাঝে শ্যামল বেশ ছেলেমানুষি করে ফেলে।
আনুগত্যের এই স্থান পরিবর্তন শ্যামল মোটেই খোলা মনে মেনে নেয়নি। মিনি হয়ত দু’চারদিনের মধ্যেই শ্যামলকে ক্ষমা ঘেন্না করে আপোস করে নিত। কিন্তু ওকে দেখলেই শ্যামল এমন কটমট করে তাকায় যে বেচারা পালাবার পথ পায় না।
চা খাওয়া শেষ হয়ে গেছে। মোবাইলটা নিয়ে খুট খুট করতে করতে মিনির প্রতীক্ষা করতে লাগল। মনে হল বিট্টি ঢুকল। বাসন ধোবে, ঘর ঝাড়ামোছা করবে। কি আশ্চর্য! মিনির হলটা কি? নাকি মর্নিং ওয়াকে বেরোনোর সময় শ্যামল আবার ভাব করে দুধ খাইয়ে গেছে?
খালি চায়ের কাপটা নিয়ে বহ্নি উঠে দাঁড়াল। শ্যামল ফিরে এসেই চানে ঢুকবে। তার মধ্যেই ব্রেকফাস্ট রেডি করে ফেলতে হবে। অফিস বেরোতে দেরি হলে বাবুর মেজাজ গরম হয়ে যাবে। তখন ওর চোখদুটো দেখলে মনে হবে যেন মানুষ খুন করে ফেলতে পারে। যদিও এই সাড়ে তিন বছরে, রাগারাগি অনেক হলেও শ্যামল বহ্নির গায়ে হাত তোলেনি কখনও।
ফ্রিজ খুলে সব্জির বাস্কেটটা বের করল। আর তখনই মোবাইলটা বেজে উঠল। অচেনা নম্বর।
“হ্যালো?”
“কেমন আছ?” ওপারে পুরুষ কণ্ঠ।
“কে বলছেন?”
“সে কি – চিনতে পারলেনা?” ওদিকে মৃদু হাসি।
“বিমানদা -- ? নম্বর কোথায় পেলে?”
বহ্নির সব কিছু কেমন গুলিয়ে যেতে লাগল।
(পাঁচ)
কয়েকদিন আগে বিমানের সঙ্গে দেখা হল। আমি খেয়াল করিনি। ওই পেছন থেকে ডাকল। “কেমন আছিস শ্যামল?” ঘুরে ওর দিকে তাকিয়ে একটু অবাকই হলাম। বিমানের চেহারাটা রাজপুত্রের মত। ফর্সা, লম্বা, ঋজু। কেতাদুরস্ত থাকতে পছন্দ করে। আজ যেন চেহারায় ক্লান্তির ছাপ। চুলটা সামান্য হলেও উস্কোখুস্কো। অন্তত দু’দিনের বাসি পোশাক। সেই কবে কলকাতা ছেড়ে চলে গিয়েছিল।
“ভালোই। তুই কবে ফিরলি?”
“এই তো – কাল রাতে।”
তারপর মামুলি কথাবার্তা চলতে লাগল। অনেকদিন পরে দেখা হলে যা হয়। শেষে বলল, “বহ্নি কেমন আছে?” বললাম, “বিন্দাস!” আমাদের বিয়ের খবরটা জানে তাহলে।
বলল, “ওর মোবাইল নম্বরটা দে তো – কথা বলার ছিল।”
“চলে আয় না বাড়িতে।”
“হ্যাঁ, সে যাব। তবু নিয়েই রাখি --”
বিমানের সঙ্গে আলাপ বহ্নিদের বাড়িতেই। বহ্নির বাবা আর আমার বাবা বন্ধু। বাবা মারা যাওয়ার পরও গেছি। বিমান পাড়ার ছেলে। লেখাপড়া বেশি দূর করেনি। জমি বাড়ির দালালি করে। নানা ধান্দায় পরামর্শ নিতে আসত। অবিনাশকাকু পুলিসে চাকরি করতেন।
কদিন বাদেই দেখি আপনি আজ্ঞে ছেড়ে আমার সাথে তুই তোকারি শুরু করল। বাধ্য হয়ে আমিও। একবার বলল, “একটা বাড়ি আছে – সস্তায়। নিয়ে নে।” বললাম, “বাড়ি তো আমার আছেই।”
“আরে এখানে নয় দীঘায়। বীচের থেকে বেশি দূর নয়। দোতলা। অনেকটা জমি। খুব সস্তা।”
“কত সস্তা?”
“পঁচাত্তর হাজার।”
“বলিস কী? নিশ্চয়ই ভূত আছে বাড়িতে!”
“তাতে তোর কী আসে যায়? তুই তোর মত থাকবি। ভূত ভূতের মত!”
এই হল বিমান।
ইতিমধ্যে ভেতরে ভেতরে অন্য একটা ব্যাপার দানা বাঁধছিল। অবিনাশকাকু বা কাকিমা কেউ তার আভাসমাত্র পাননি। একদিন যখন বহ্নি ঘোষণা করল “আমি বিমানদাকে বিয়ে করব” তখন দুজনেরই মাথায় হাত। বোঝানোর চেষ্টা করলেন বিমানের চালচুলো কিছু নেই, লেখাপড়াও তেমন কিছু করেনি। কিন্তু বহ্নি অনড়। ফলে বিমানের এ বাড়িতে আসার ওপর, আর এলেও বহ্নির সাথে খোলামেলা দেখাসাক্ষাত হওয়ার ব্যাপারে একটা ভদ্র নিষেধাজ্ঞা জারি হল।
একদিন সকালবেলা বহ্নির ঘরে খোঁজ করতে এসে ওর মা টেবিলের ওপর একটা চিরকুট পেলেন। “আমি বিমানদার সঙ্গে চলে গেলাম। তোমরা চিন্তা কোরো না।” বহ্নি ঘরে নেই। ত্রিসীমানায় কোথাও নেই। অবিনাশকাকু সঙ্গে সঙ্গে বিমানের বাড়িতে লোক পাঠালেন। বিমানও নেই। নিশ্চিন্ত হয়ে বসার লোক অবিনাশকাকু নন। পুলিশ ডিপার্টমেন্টের লোকদের দিয়ে কলকাতা জুড়ে জাল ছড়িয়ে দিলেন। ফলে সন্ধ্যের আগেই বিদ্রোহিণী মেয়ে আবার মা-বাপের হেপাজতে।
এরপর বহ্নি বাড়িতে প্রায় নজরবন্দি হয়ে থাকল। বিমানের ও বাড়িতে যাওয়ার ওপর কড়া নিষেধাজ্ঞা বহাল হল। অবশ্য সেদিনের পর থেকে বিমানও নাপাত্তা। প্রায় মাসখানেক পরে অবিনাশকাকু আমাকে ডেকে পাঠালেন।
“তুমি তো আমাদের ঘরের লোক, শ্যামল। তোমার কাছে কী আর লুকোব?”
কাকিমা বললেন, “হ্যাঁ বাবা, মেয়েটার এমন দুর্মতি হল – পাড়ায় মুখ দেখানো ভার।”
তারপর একথা সেকথা – নানা রকম টালবাহানার পর আসল কথাটা পাড়লেন। কাকিমা।
“বহ্নিকে তুমি বিয়ে কর বাবা।”
বহ্নির মত রূপসী মেয়েকে বউ হিসেবে পাওয়া রীতিমত ভাগ্যের ব্যাপার। কিন্তু বহ্নি আমাকে মেনে নেবে কেন? আর ও তো নিজের পছন্দ সদর্পে ঘোষণা করেই দিয়েছে। বিমান তো রীতিমত সুপুরুষ। সেই তুলনায় আমি – কুচ্ছিত না হলেও – কাছেই লাগি না।
বললাম, “বহ্নি রাজী হবে কেন?”
“হবে বাবা। আমরা ওর মতামত জেনেই বলছি।”
“ঠিক আছে, ডাকুন তাহলে। আমি নিজে ওর মতামত জানতে চাই। তাছাড়া কিছু কথাও বলবার আছে।”
(ছয়)
আজ নিয়ে পাঁচদিন হল। মিনি ফেরেনি। কি যে হল? একেবারেই বাচ্চা তো। নির্ঘাত দূরে কোথাও চলে গিয়ে পথ চিনতে পারেনি। বেড়াল, এই যা ভরসা। নিশ্চয়ই দু’চারদিনের মধ্যে পথ চিনে চলে আসবে। খুব ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। পায়ে পায়ে এমন দৌড়ে বেড়াত! মিউ মিউ করত। মুখ দিয়ে পায়ের কাছে সালোয়ারের খুঁট ধরে টানত। মানে, চল আমার সঙ্গে। যেতে শুরু করলেই আগে আগে ছুটতে থাকত। আর ঘাড় ঘুরিয়ে দেখত আসছি কিনা। নাহ কোন কিছুতেই মন লাগাতে পারছি না। পথ চেয়ে থাকি। কখন ফিরে আসে। শ্যামলকে বলতে বলল, “দেখ মহারানি হয়ত অন্য কোথাও বেশি আদর পেয়েছেন। তাই তোমাকে ভুলে গেছেন।” বুঝলাম এখনও মিনির আনুগত্য পরিবর্তন ও মেনে নিতে পারেনি।
এর মধ্যে আবার অন্য এক ঝামেলা শুরু হয়েছে। বিমানদা কোত্থেকে আমার মোবাইল নম্বর পেয়ে, মাঝে মাঝেই ফোন করছে। “একবার তোমার সাথে দেখা হওয়া দরকার।” শ্যামল জানতে পারলে কী মনে করবে! ও তো সবই জানে। বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়া – তারপর আবার লজ্জার মাথা খেয়ে ফিরে আসা। মিথ্যে বলব কেন? শ্যামলকে বিয়ে করে আমি তো খারাপ নেই। আমার পছন্দ অপছন্দের ব্যাপারে খুব খেয়াল। বায়না আবদার হাসিমুখে সহ্য করে।
তখন যে কি ভূত মাথায় চেপেছিল! মাকে বললাম যে বিমানদাকে ছাড়া কাউকে বিয়ে করব না। মা চোখ কপালে তুলে বাবাকে বলল। তারপর সেকি বকাবকি! বাবা খেপচুরিয়াস হয়ে বিমানদাকে বাড়িতে আসতে মানা করে দিল। মা আমাকে প্রায় নজরবন্দি করে ফেলল। পালিয়ে যাবার প্ল্যান করলাম। শেষরক্ষা আর হল কোথায়? এসপ্ল্যানেডের বাস গুমটির কাছে ধরা পড়ে গেলাম। শুনেছিলাম বিমানদা কোথায় নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে। এতদিনে ফিরেছে তাহলে।
হয়ত ভালই হয়েছে। বিমানদার থেকে শ্যামল পাত্র হিসেবে নিশ্চয়ই ভাল। লেখাপড়ায় চৌকশ। ভাল চাকরি করে। বিমানদার মত বোহেমিয়ান নয়। মা বাবা হয়ত ঠিকই বলেছিল। বিমানদাকে বিয়ে করলে হয়ত আখেরে পস্তাতে হত। শ্যামলকে বিয়ে আমি নিজের ইচ্ছেতেই করেছি। মা বাবা কোন চাপ দেয়নি। শ্যামলও বিয়ের আগে কথাবার্তা বলে আমার মন বুঝে নিয়েছিল।
এখন কী যে করি। দেখা করার জন্য এত করে বলছে! বলছি বাড়িতে এস। বলে না আলাদা করে কথা বলা দরকার। বেচারা। শ্যামলের মুখোমুখি হতে লজ্জা পাচ্ছে? যে যাই বলুক। মানুষটা মোটেই খারাপ নয়। পাড়ার লোকের কাছে মুখ দেখানোর ভয়েই নিশ্চয়ই পালিয়ে গেছিল। শ্যামলকে বলব?
একটু ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করব তার যো আছে? সকাল থেকেই আজ পঞ্চপাণ্ডবদের বাড়িতে তুলকালাম চলছে। দু’তিনদিন ধরে ওদের মজা পুকুর থেকে পচা গন্ধ আসছিল। আজ আবিষ্কার হয়েছে কে বা কারা নাকি প্লাস্টিকে মুড়ে একটা মরা বাচ্চা ফেলে দিয়ে গেছে। ভাইগুলো আর তাদের বউরা পাড়া মাথায় করে অশ্রাব্য গালিগালাজ করে চলেছে। টার্গেট পাড়ার লোকেরাই। পাড়ার একজন মুরুব্বি গোছের লোক থানায় খবর দিয়ে এসেছে। খুনের ঘটনাও হতে পারে।
নাহ শ্যামলকে এখন কিছু জানাব না। বিমানদা যখন সেটা চাইছে না। তাহলে মানুষটার ওপর অবিচার করা হবে। আবার ফোন করলে দেখা করার একটা সুবিধেজনক জায়গা আর সময় ঠিক করে নেব।
(সাত)
ব্রেকফাস্টের টেবিলে বহ্নি শ্যামলকে বলল, “শোন, আজ দুপুরে আমি একটু বেরোব।”
“মায়ের কাছে যাবে?”
“নাহ, একজন বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে যাব।”
“বন্ধু? কোথায় থাকে?”
“তারাতলা মোড়ের কাছে।”
“ঠিক আছে। গাড়ি পাঠিয়ে দেব?”
“না – না। সে আমি চলে যেতে পারব। ফিরতে দেরি হতে পারে – চিন্তা কোরো না।”
“বেশি দেরি হলে তো চিন্তা হবেই।”
“বাব-বাহ! চোখে হারাও! টেবিলে খাবার ঢাকা দেওয়া থাকবে। খেয়ে নিও।”
“যো হুকুম!”
মিনির পাত্তা নেই। সাত দিন হয়ে গেল। বহ্নি তবু আশায় বুক বেঁধে আছে, মিনি ফিরে আসবে। এই ক’দিন আগে মরা বাচ্চা পাওয়া নিয়ে পাড়ায় এত হইচই। পঞ্চপাণ্ডবদের এত গালাগালি। কেউ আবার পুলিশে খবর দিল। শেষে কি দেখা গেল? না একটা মরা বেড়াল কেউ প্লাস্টিকে জড়িয়ে ওই মজা পুকুরে ফেলে দিয়েছে। ওটা মিনি নয়ত? বহ্নির বুক কেঁপে উঠল। তা কেমন করে হবে? ওটা নিয়ে যাবার সময় এক ঝলক দেখেছিল। বেশ বড় বলেই মনে হয়েছিল। মিনি তো এইটুকুন! একেবারেই বাচ্চা। নাহ এসব ভেবে এখন মাথা খারাপ করবে না।
অনেক কাজ রয়েছে। বেরোনোর আগে শ্যামলের জন্য বিকেলের খাবার রেডি করে ফেলতে হবে। শ্যামলের এই অতিরিক্ত কৌতুহল না দেখানোর অভ্যেসটা বহ্নির খুব পছন্দ। বন্ধুর কাছে যাচ্ছে। যথেষ্ট। মা কোথাও একা বেরোলে বাবার কাছে কত প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হত! কে বন্ধু, নাম কী, ঠিকানা কী, কেন হঠাৎ দেখা করার ইচ্ছে হল – বাপ রে! একেবারে পুলিশি জেরা শুরু হয়ে যেত! বহ্নি তো এত প্রশ্ন করলে কেঁদেই ফেলত। সব কিছু বানিয়ে বানিয়ে বলা যায় নাকি? তাহলে বলেই দিতে হত যে বিমানদার সাথে দেখা করতে যাচ্ছে। বিমানদারই একান্ত অনুরোধে। বিমানদা কী ভাবত? যে মেয়েটাকে ভালবেসে বিয়ে করতে চেয়েছিল, তাকে একটুও ভরসা করা যায় না। বিমানদা কি এখনও বহ্নিকে ভালবাসে? এত অপমানের পরে? কে জানে?
বহ্নি কাছাকাছি কোথাও দেখা করতে চেয়েছিল। বাড়িতে এলেও আপত্তি ছিল না। বিমানদা কিছুতেই রাজি হল না। তারাতলার মোড় খুব অনেক দূর নয়। তবুও যাওয়াটা ঝামেলার। একটা বাসে হবে না। আর তাছাড়া জায়গাটা কখনওই পছন্দ নয় বহ্নির। সব সময় জ্যাম লেগেই আছে। আর এখন তো ডায়ামন্ড হারবার রোডে মেট্রোর কাজ চলায় যাচ্ছেতাই অবস্থা। অবশ্য ওকে স্টেট ব্যাঙ্কের কাছে দাঁড়াতে বলেছে। মোড় অব্দি যেতে হবে না।
শাড়ি না সালোয়ার কামিজ? এটা ঠিক করতে মাঝে মাঝে বহ্নি জ্বালাতন হয়ে যায়। শ্যামলের তো কোন কিছুতেই আপত্তি নেই। এমন কি জীন্সেও নেই। না জীন্সের প্রশ্নই ওঠে না আজ। সালোয়ার কামিজটা পরলে ম্যানেজ করা সুবিধে। বিমানদাও ওকে সালোয়ার কামিজে দেখেই বেশি অভ্যস্ত। কিন্তু এখন তো ও আর বিমানদার সেই বহ্নি নয়। বহ্নি এখন শ্যামলের বউ। তাই শাড়ি পরাটাই উচিত। আবার বাস পাল্টানো আছে। শাড়ি পরে সামলাতে পারবে?
(আট)
বেরোতে একটু দেরিই করে ফেললাম। বেরোনোর আগে হাজারটা জিনিষ মনে পড়বে – এটা নেওয়া হয়নি – ওটা নেওয়া হয়নি। আবার সেগুলো খুঁজতে খুঁজতে দেরি হয়ে যায়। দু’একবার বাড়ির চাবি নিতে ভুলে গেছি। শ্যামলকে অফিস থেকে ছুটে আসতে হয়েছে। ও বলে আমি নাকি একটুও অরগ্যানাইজ়ড নই। ভুল বলে না। যদিও আমি তখন সহিংস প্রতিবাদ করি।
শাড়িই পরলাম। লেমন কালারের প্রিন্টেড একটা শিফনের শাড়ি। সিঁথেয় সিঁদুরের হালকা আঁচড় দিলাম। কপালে একটা ছোট টিপ। চোখে রে-ব্যানের সানগ্লাস। সেদিনের পর বিমানদাকে দেখিনি। একেবারে সিনেমার হীরোর মত দেখতে ছিল। লম্বা, ফর্সা। পেটানো চেহারা। এখনও কি সেরকমই আছে? এই সাড়ে তিন বছর কোথায় ছিল? কেমন ছিল? আমাকে মনে পড়ত? নিশ্চয়ই পড়ত। নইলে ফিরে এসেই আমার মোবাইল নম্বর জোগাড় করে ফেলল কেন? কার কাছে পেল? বাবার কাছ থেকে নিশ্চয়ই নয়?
টালিগঞ্জ ফাঁড়ি আসতে অনেক সময় লেগে গেল। এমন ঢিকিয়ে ঢিকিয়ে চালাচ্ছিল বাসটা! রেল ওভারব্রিজের তলায় বেশ জ্যাম ছিল। নামতে না নামতেই পর্ণশ্রী যাবার বাস এসে গেল। তারাতলা হয়ে যাবে। কী ভিড়! ছেড়ে দিই? পরের বাসটায় যাব? নাহ, এমনিতেই দেরি হয়ে গেছে। বেচারা এসে দাঁড়িয়ে থাকবে। কোন রকমে উঠে, ঠেলেঠুলে লেডিজ় সীটের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। এত চাপ আসছে চারদিক থেকে। ট্যাক্সি নিয়ে নিলেই হত। বাসে চড়ার অভ্যেস কতকাল চলে গেছে। তার ওপর এরকম ঠাসা ভিড় বাস!
এ রাস্তাও জ্যাম। বাস এগোচ্ছেই না। এইরে মোবাইল ফোনটা বাজছে। নিশ্চয়ই বিমানদা করছে। পৌঁছে গেছে নিশ্চয়। কিন্তু এর মধ্যে ওটা বের করা সম্ভব নয়। থাক একটু দাঁড়িয়ে। এমন উদ্ভট জায়গায় ডেকেছে! বাসটা আবার চলতে শুরু করেছে। একদম ঘেমে গেছি। কেন যে ট্যাক্সি নিলাম না! হঠাৎ বাসে করে বিমানদার সাথে দেখা করতে যেতে ইচ্ছে করল কেন? কেন? কেন? কেন? আগে আমরা বাসে করে অনেক জায়গায় গেছি তাই? জানিনা!
নিউ আলিপুর পেরোল। রাস্তাটা চওড়া এখন। মিলিটারি ক্যাম্প। এরপর স্টেট ব্যাঙ্ক। “রোককে ভাই, নামব!” নামলাম বাস থেকে। আহ কি শান্তি। রাস্তা ক্রস করে স্টেট ব্যাঙ্কের সামনে এসে দাঁড়ালাম। কই এখনও আসেনিতো। ফোনটা দেখি। না, বিমানদা নয়, শিপ্রা। শিপ্রা ফোন করেছিল। ঘড়ি দেখলাম। আড়াইটেতে বন্ধ হয়ে আছে। মোবাইলে সময় দেখলাম। তিনটে পঞ্চান্ন। মানে দেরি হয়নি! চারটেয় এসে দাঁড়ানোর কথা আমার। যাক ভাল সময়েই এসেছি। বেশি দাঁড়াতে হবে না।
এখনও এলো না বিমানদা! সোয়া চারটে বেজে গেল! সময়ের ব্যাপারে বিমানদা তো খুব পাকা ছিল। ও তো সব সময় আগেই চলে আসত। কী বোকা বোকা লাগছে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে। দু’চারটে লোক ঘুরে ঘুরে তাকাচ্ছে! একজন তো আবার চোখ দিয়ে একটা চটুল ইশারা করে গেল। কী করি? একটা ম্যাগাজ়িন সঙ্গে আনলে হত। রাস্তার দিকে হাঁ করে চেয়ে থাকতে হত না।
চারটে চল্লিশ! কী হল? বিমানদা তো এরকম কখনও করেনি। এবার একটা ফোন করি। নাহ, বেজেই যাচ্ছে। ধরল না। আচ্ছা বিপদে পড়লাম তো! একি? গাড়িগুলো সব দাঁড়িয়ে গেল কেন? রাস্তা তো চওড়া! জ্যাম হবার কথা নয়। বাস গাড়ি অটো সব দাঁড়িয়ে পড়েছে! ওদিক দিয়েও কিছু আসছে না! কিছু সমস্যা হয়েছে? একটা পুলিশের গাড়ি চলে গেল। হুটার বাজিয়ে। বিমানদা আসলে খোঁজ নেওয়া যেত। ও তো ফোনই ধরছে না। কতবার চেষ্টা করলাম।
কী? অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে? কোথায়? মোড়েই? রান-ওভার? লরির নীচে? ওহ মাই গড? বেঁচে আছে? স্পট ডেড? ওহ! আমার তো মাথাটা ঘুরতে শুরু করেছে। বিমানদা কিংবা শ্যামল থাকলে ভাল হত। আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না। ফিরেই যাই। এই ট্যাক্সি!
(নয়)
কাল রাতে শ্যামলও অনেক দেরিতে ফিরেছে। বহ্নি রাতে ভাল করে ঘুমোতে পারেনি। শরীরটা খারাপ লাগছিল। তার ওপর বিমানদার ওপর খুব রাগ হচ্ছিল। কী আক্কেল? একটা মেয়েকে এতক্ষণ ওখানে একলা দাঁড় করিয়ে রেখে – আসা নেই – একটা ফোনে খবর দেওয়া নেই! ওর মুড দেখে শ্যামল আর ওকে ঘাঁটায়নি। বিমানদার ওপর অভিমানে শুয়ে শুয়ে চোখ ফেটে জল আসছিল বহ্নির।
শ্যামল যথারীতি মর্নিং ওয়াকে বেরিয়ে গেছে। থার্মোফ্লাস্কে চা রেখে গেছে। পাশে চা খাবার মগ আর বিস্কুটের কৌটো। আজ কোকিলটা ডাকেনি। অন্তত বহ্নি শুনতে পায়নি। তাহলে কি ভোর রাতে ঘুমিয়ে পড়েছিল? মাথাটা খুব ধরে আছে। বাইরে আকাশটা মেঘলা। সকালটা কেমন যেন থম মেরে আছে। বহ্নির মনটা আরও ভারি হয়ে গেল। বিমানদাকে কখনও মাপ করবে না। হাজার বললেও আর দেখা করতে যাবে না। একটা ফোনও তো করতে পারত। ও এতবার কল করল। নিশ্চয়ই নজরে পড়েছে।
সদর দরজায় একটা আওয়াজ হল। বহ্নি উৎকর্ণ হয়ে উঠল। মিনি ফিরে এল নাকি? বিট্টি এসে আনন্দবাজারটা দিল। তারপর কাজে চলে গেল। হেডলাইনগুলোয় চোখ বোলাতে লাগল। বাঁদিকে মাঝামাঝি ছোট করে কালকের অ্যাক্সিডেন্টের খবরটা। বিস্তারিত এগারো পাতায়। পাতা ওল্টালো বহ্নি। দুটো কলাম জুড়ে খবর। ঘটনাস্থলের একটা ছবিও দিয়েছে। ইনসেটে মৃতব্যক্তির ছবিটা দেখে চমকে উঠল বহ্নি। চোখ ফেটে ঝর ঝর করে জল বেরিয়ে এল। হাউ হাউ করে কাঁদতে শুরু করল। কাগজটা ভিজে গেল। বিট্টি কিছু জিজ্ঞেস করতে এসেছিল। বৌদির অবস্থা দেখে চুপচাপ চলে গেল। কান্নার বেগ প্রশমিত করে খবরটা পড়ল। ভিড়ের মধ্য থেকে হঠাৎ ছিটকে এসে লরির তলায় পড়ে যায়। তখনি সব শেষ। পুলিসের সন্দেহ স্বাভাবিক মৃত্যু নয়। ভিড়ের মধ্যে থেকে কেউ ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছে। হয়ত কোন পুরোনো শত্রুতার জের। লোকটার সন্ধান পাওয়া যায়নি। পুলিস খোঁজ চালিয়ে যাচ্ছে।
আবার দরজায় শব্দ। শ্যামল এল। মর্নিং ওয়াকের টী-শার্টটা খুলতে খুলতে বলল, “বিমান কী বলল কাল?” তারপর বহ্নির মুখের দিকে তাকিয়ে চুপ করে গেল। শ্যামল জানত? অথচ কিছু বলেনি! অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে বহ্নি কাগজটা এগিয়ে দিল। খবরটাতে চোখ বুলিয়ে শ্যামল আস্তে আস্তে পাশে এসে বসল। তারপর হাত বাড়িয়ে বহ্নিকে কাছে টেনে নিল।
মিনি আর ফিরবে না। বিমানদাও আর কখনও ফোন করে ডাকবে না। বহ্নির বুকে হাহাকার। তারপর একটু শান্ত করল নিজেকে। শ্যামল তো আছে। শ্যামলের কাঁধে মাথা রেখে ও কেঁদেই চলল।
***


0 মন্তব্যসমূহ