হারুকি মুরাকামির গল্পঃ কাহো


ইংরেজি থেকে বাংলা ভাষান্তর -
উৎপল দাশগুপ্ত

“জীবনে নানা ধরণের মেয়ের সঙ্গেই আমি ডেটে গিয়েছি,” লোকটা বলল, “তবে বলতেই হবে তোমার মত এমন কুৎসিত কাউকে আমি দেখিনি।”

কথাটা উঠল, ডেজ়ার্টের পরে ওরা যখন কফির জন্য অপেক্ষা করছিল।

লোকটার কথাগুলো মাথায় ঢুকতে একটু সময় লাগল। তিন কি বড়জোর চার সেকেন্ড। মন্তব্যটা এল যেন মেঘে বজ্রপাতের মত, অভিপ্রায়টা কাহো তখনই বুঝে উঠতে পারল না। আবেগবর্জিত, উদ্বেগজনক এই কথাগুলো বলার সময়ে লোকটা হাসছিল। অমায়িক, বন্ধুসুলভ হাসি। বলার মধ্যে কৌতুকের সামান্যতম আভাসও ছিল না। তবে রসিকতা করছিল না; বলার সময় গলাটা বেশ গম্ভীরই শোনাচ্ছিল।

প্রতিক্রিয়া দেখানোর জন্য করার একটাই উপায়ের কথা ওর মাথায় এল, কোল থেকে ন্যাপকিনটা নিয়ে টেবিলের ওপর ছুঁড়ে দিয়ে, পাশের চেয়ার রাখা ব্যাগটা তুলে নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে একটিও কথা না বলে রেস্তোরাঁ ছেড়ে চলে যাওয়া। এরকম একটা পরিস্থিতি মোকাবেলা করার সম্ভবত এটাই সেরা উপায়।

তবে কী কারণে জানে না, কাহো সেটা করে উঠতে পারল না। একটা কারণ হল – যেটা পরে ওর মনে হয়েছে – ও আসলে হকচকিয়ে গেছিল; অন্য কারণটা হল কৌতুহল। রেগে তো গেছিলই – সত্যিই ওর রাগ হয়েছিল। আর হবে নাই বা কেন? তবে তার চেয়েও বড় কথা হল, ঠিক কী বার্তা লোকটা ওকে দিতে চাইল সেটাও জানার ইচ্ছে হল। ও কি প্রকৃতই এতটাই কুৎসিত? তাছাড়া এই মন্তব্যের আড়ালেও কি আরও কিছু থাকতে পারে?

“তোমাকে কুৎসিততম বলার মধে কিছুটা অতিরঞ্জন রয়েছে,” একটু থেমে লোকটা যোগ করল। “তবে তোমার মত অতি সাধারণ মহিলা আর যে আমি দেখিনি, সে ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই।”

ঠোঁট দুটো কুঁচকে, অপলকে লোকটাকে দেখতে দেখতে, নীরবে লোকটার মুখের ভাবটা পড়বার চেষ্টা করল।

এরকম একটা কথা লোকটাকে বলতেই বা হল কেন? যে কোনো ব্লাইন্ড ডেটে (এটা কতকটা সেরকমই ছিল) অন্য ব্যক্তিটিকে তোমার যদি তেমন পছন্দ নাও হয়, তুমি তার সঙ্গে আর যোগাযোগ না করলেই পারো। সেটাই তো সহজবোধ্য। তাই বলে সরাসরি তারই মুখের ওপর অপমান করতে হবে কেন?

লোকটি কাহোর থেকে বয়সে বছর দশেকের বা তারও বেশি বড়ই হবে, সুপুরুষ, নিদাগ, নিখুঁত পোশাক পরিচ্ছদ। ওকে ঠিক কাহোর শ্রেণীতে ফেলা যায় না, যদিও ভাল পরিবারের সন্তান বলেই মনে হয়। চেহারাটা নজরকাড়া – এতে কোনও ভুল নেই। ।আরও ইঞ্চি দুয়েক লম্বা হলে অভিনেতা হিসেবে মানিয়ে যেত। যে রেস্তোরাঁতে নিয়ে এসেছে, সেটাও বেশ আরামদায়ক আর কেতাদুরস্ত, খাবারদাবারও সুস্বাদু, মার্জিত। বাচাল বলাটা ঠিক হবে না তবে কথাবার্তা চালিয়ে নিয়ে যাবার মত এলেম আছে – কোনোরকম অস্বস্তিকর নীরবতার সামনে পড়তে হয়নি। (তবে খুবই আশ্চর্যের ব্যাপারটা হল, সেদিনের কথা পরে কখনো ভাবতে গিয়ে কী যে কথাবার্তা হয়েছিলে সেটা মনেই করতে পারেনি।) লোকটি যে ওর প্রতি একটু একটু আগ্রহ বোধ করতে আরম্ভ করেছে, ডিনারের সময় সেটাও লক্ষ্য করেছে। অস্বীকার করতে পারবে না সেকথা। আর তারপরেই বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত – এই ঘটনা ঘটল। কী এমন হয়েছিল ওখানে?

“তুমি হয়ত খুবই অবাক হচ্ছ,” খুব শান্ত গলায় বলেছিল, টেবিলে দুটো এসপ্রেসো দিয়ে যাওয়ার পরে। যেন ও কাহোর মনের কথাটা পড়ে ফেলেছিল। এসপ্রেসোতে একটা ছোটো শুগার কিউব ফেলে নিঃশব্দে নাড়ছিল। “কী ভেবে কে জানে, যাকে আমার কুৎসিত মনে হল – কিংবা হয়ত এভাবে বলা উচিত – যার মুখটা আমার পছন্দ হয়নি – তার সাথেই ডিনার সেরে ফেললাম। ওয়াইনের প্রথম গ্লাসটা শেষ করার পরেই আমার উচিত ছিল ওখানেই সন্ধ্যেটার দাঁড়ি টেনে দেওয়া। দেড় ঘন্টা সময়, তিন পদের ডিনার, পুরোটাই জলে গেল, তাই নয় কি? আর কেনই বা আমাকে সন্ধ্যে যাপনের শেষ প্রান্তে এসে এরকম কথা আমাকে বলতে হল?”



কাহো নীরবে টেবিলের অপর দিকে বসে থাকা লোকটার মুখের দিকে চেয়ে রইল। দু’হাতে কোলের ওপর রাখা ন্যাপকিনটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরল।

“কৌতূহলটা চেপে রাখতে পারিনি, তাই হয়ত,” বলল লোকটা। “তোমার মত আটপৌরে একটা মেয়ে কী রকম করে ভাবে, আর এতটা আটপৌরে ভাব তোমার জীবনকে কীভাবে প্রভাবিত করে, এসবই জানতে ইচ্ছে করছিল হয়ত।”

“তা কৌতুহল চরিতার্থ হল কি?” কথাটা কাহো মনে মনেই বলল, মুখে কিছু জানতে চাইল না।

“আমার কৌতুহল চরিতার্থ হল কিনা?” কফিতে চুমুক লাগিয়ে লোকটা জিগ্যেস করল। একটা ব্যাপার পরিষ্কার – ওর ভাবনাটা পড়ে নিয়েছে। পিঁপড়েখেকোরা যেমন লম্বা লকলকে জিভ দিয়ে চেটে উইয়ের ঢিবি সাফ করে দেয়, ঠিক তেমনি।

পেয়ালাটা পিরিচে নামিয়ে রেখে, কাঁধটা ঈষৎ ঝাঁকিয়ে নিজের প্রশ্নের জবাব নিজেই দিল, “না, হয়নি।”

হাতের ইশারায় ওয়েটারকে ডেকে বিল মিটিয়ে দিল। কোবোর দিকে ফিরে, হালকা করে একটা ‘বাও’ করল, তারপর কোনোদিকে না তাকিয়ে সোজা রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়ে গেল। একবারের জন্যও পিছন ঘুরে তাকাল না।

.

সত্যি বলতে কী, ছোটবেলা থেকেই কাহো নিজের মুখ নিয়ে বিশেষ মাথা ঘামায়নি। যে মুখটা আয়নায় দেখতে পেত, সেটা ওর তেমন সুন্দর বলেও মনে হয়নি, আবার বলার মত কুৎসিতও লাগেনি। এর জন্য ওর কোনও দুঃখও ছিল না, বা আনন্দ করার মত কিছু আছে বলেও মনে হয়নি। জীবনের ওপর চেহারার প্রভাব পড়তে পারে, এরকম কথা কখনোই মনে হয়নি আর তাই এই ব্যাপারে একদম উদাসীন থেকেছে। অথবা বলা যেতে পারে, সত্যিই প্রভাব পড়েছে কিনা সেটা জানবার সুযোগই হয়নি। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান, স্বাভাবিকভাবেই, ওঁদের স্নেহ ভালবাসায় কোনো কমতি ছিল না, ্তাই ও সুন্দর কি সুন্দর নয় সেটা কখনোই হিসেবের মধ্যে রাখা হয়নি।

কৈশোর পর্যন্ত চেহারা নিয়ে কাহোর এই উদাসীনাতা থেকেই গেল। লক্ষ্য করত বেশিরভাগ বান্ধবীই নিজেদের রূপ নিয়ে বড় বেশি উদ্বিগ্ন, মেক-আপের যত রকম কারিকুরি হয়, সমস্ত কিছুর প্রয়োগ করে নিজের আকর্ষণীয় করে তোলার চেষ্টা করত, আর ওদের এই তাগিদের কারণটা কিছুতেই ওর মাথায় ঢুকত না। আয়নার সামনে দাঁড়াত খুব অল্প সময়ের জন্য। উদ্দেশ্য ছিল মুখটাকে সাফসুতরো রাখা। এমন কিছু কঠিন কাজও ছিল না সেটা।

একটা সহশিক্ষামূলক সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে ও পড়াশোনা করেছে, অল্প কিছু ছেলে বন্ধুও ওর ছিল। ক্লাসের ছেলেদের পছন্দের সহপাঠিনী বেছে নেবার জন্য যদি ভোট নেওয়া হত, ওর জেতবার আশা ছিল শূন্য – ও সেই বস্তুই নয়। তবুও প্রতি ক্লাসে দু’চারজন ছেলে থাকত, কোনো অজানা কারণে, তাদের ওর প্রতি আগ্রহ ছিল এবং সেটা জানিয়ে দিতেও সঙ্কোচ করত না। এই আগ্রহের কোনও ব্যাখ্যা কাহোর জানা ছিল না।

এমনকি, হাইস্কুলের গণ্ডী পেরিয়ে টোকিওর আর্ট স্কুলে ভর্তি হবার পরেও ওর পুরুষ বন্ধুর অভাব হয়নি। তাই নিজের রূপ নিয়ে মাথা ঘামানোর প্রয়োজনই ওর হয়নি। ভাগ্যটা ওর ভালই বলা যায়। ওর যেসব বান্ধবীরা ওর চেয়ে অনেক বেশি সুন্দরী, যারা নিজেদের সুন্দর দেখানো নিয়ে রীতিমত উদ্বিগ্ন থাকত, এমনকি অনেকেই আবার ব্যয়সাধ্য প্লাস্টিক সার্জারিও করিয়ে ফেলত, তাদের মতিগতি দেখে ও অবাক হয়ে যেত। এসবের কী যে প্রয়োজন সেটা ওর মাথাতেই ঢুকত না।

আর সেই জন্যই ছাব্বিশ বছরের জন্মদিনের অল্পদিন পরেই, এই লোকটা যখন অসভ্যের মত বলে দিল, ও নাকি কুৎসিত, কাহো রীতিমত দিশেহারা হয়ে পড়ল। বিস্মিত তো হলই, তার সাথে সাথে হতভম্বও হয়ে পড়ল।

.

ওর সম্পাদিকা, মাচিদা নামের এক ভদ্রমহিলা, উনিই ওর সঙ্গে লোকটার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। মাচিদা কান্দার একটা ছোট প্রকাশনী সংস্থায় কাজ করতেন, প্রধানত বাচ্চাদের বই প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত। কাহোর চেয়ে বয়সে চার বছরের বড়, দুটি সন্তানের জননী, কাহোর সৃজন করা বাচ্চাদের বইয়ের সম্পাদনা করতেন। কাহোর ছবির বইগুলির তেমন কাটতি ছিল না, তবে এই সব বই থেকে আর বিভিন্ন পত্রিকার জন্য ছবি এঁকে খরচ চালিয়ে নেবার মত উপার্জন ওর হয়ে যেত। সেই ডেটের ঠিক আগেই কাহোরই বয়সী একটি ছেলে, যার সঙ্গে ওর বছর দুয়েকের মেলামেশা, তার সঙ্গে ওর ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল, বেশ মনমরা হয়েই ছিল সেই জন্য। ছাড়াছাড়িটা মনের মধ্যে একটা তিক্ততার রেশ রেখে গেছিল। কিছুটা এরই ফলে ও মনের মত কাজ করে উঠতে পারছিল না। মাচিদা ওর জন্য একটা ব্লাইন্ড ডেটের বন্দোবস্ত করে দেন। হয়ত তোমার চালচলনে একটু উদ্যম আনা দরকার, উনি বলেছিলেন।

লোকটার সঙ্গে দেখা করতে যাবার তিনদিনের মাথায় মাচিদা ওকে ডেকে পাঠালেন।

“তা কেমন হল তোমার ডেট?” সময় নষ্ট না করে সরাসরি জিগ্যেস করলেন।

কাহো অনিশ্চিতভাবে “হুম” বলে জবাবটা এড়িয়ে গেল, তারপর নিজে থেকেই একটা প্রশ্ন করল। “মানুষটা ঠিক কেমন ধরণের বলে আপনার মনে হয়?”

মাচিদা বললেন, “সত্যি বলতে কি, আমিও ওর সম্বন্ধে খুব একটা কিছু জানি না। এই বন্ধুর বন্ধু জাতীয় ব্যাপার আর কি। বয়স, মনে হয়, চল্লিশের কাছাকাছি হবে, অবিবাহিত, বিনিয়োগ সংক্রান্ত কোনো কিছু নিয়ে কারবার। ভাল বংশের সন্তান, আর কাজের ব্যাপারে সুনাম আছে। যতদূর জানি, কোনো অপরাধমূলক ইতিহাস নেই। একবার ওর সঙ্গে দেখা হয়েছিল, কয়েক মিনিট কথাও হয়েছিল, সুপুরুষ আর বেশ হাসিখুশি বলেই মনে হয়েছিল। একটু বেঁটের দিকে, সেটা অবশ্য ঠিক। তা টম ক্রুজ়ও তো তেমন লম্বা নন। অবশ্য টম ক্রুজ়কে সামনাসামনি দেখা আমার হয়ে ওঠেনি।”

“তা কী এমন ব্যাপার হল যে সুপুরুষ, হাসিখুশি, কর্মক্ষেত্রে সুনাম থাকা একজন লোককে ব্লাইন্ড ডেটে যেতে হল?” কাহো জানতে চাইল। “ওর সঙ্গে ডেটে যাওয়ার জন্য তো মেয়েদের লাইন লেগে যাবার কথা, তাই না?”

মাচিদা বললেন, “আমারও তো এটাই মনে হয়েছে। বেশ বুদ্ধিমান আর কাজে কর্মে দড়, তবে এটাও শুনেছি লোকটা্র মাথায় নাকি একটু ছিট আছে। কথাটা তোমাকে আগে থেকেই জানাতে চাইনি, কারণ আগে থেকেই বিরূপ কোনো ধারণা নিয়ে ওর সঙ্গে তোমার দেখা হোক, সেটা আমার কাম্য ছিল না।”

“মাথায় একটু ছিট আছে,” কাহো কথাটার প্রতিধ্বনী করল। মাথা ঝাঁকাল। সত্যিই কি ওকে মাথায় একটু ছিট আছে বলা যায়?

“ফোন নম্বর দেওয়া নেওয়া হয়েছে? মাচিদা জানতে চাইলেন।

জবাব দেওয়ার আগে কাহো একটু বিরতি নিল। ফোন নম্বর দেওয়া নেওয়া? “নাহ্‌, সেটা করা হয়নি,” শেষ পর্যন্ত বলেই দিল।

.

এর তিনদিন বাদে মাচিদা আবার ফোন করলেন।

“সুদর্শন মিস্টার সাহারার ব্যাপারে ফোন করছি। কথা বলতে পারবে?” বললেন উনি। যার সঙ্গে ব্লাইন্ড ডেটে গেছিল সেই লোকটার নাম সাহারা। উচ্চারণটা, যেভাবে মরুভূমির নামটা উচ্চারণ করা হয়ে থাকে, ঠিক তাই। কাহো ছবি আঁকার কলমটা নামিয়ে রেখে ফোনটা বাঁ হাত থেকে ডান হাতে চালান করল। “ঠিক আছে, বলুন।”

“কাল রাতে, আমাকে ফোন করেছিল ও,” মাচিদা বললেন। “বলল তোমার সঙ্গে আবার দেখা করতে চায়, আর জানতে চাইছিল যে তোমরা দুজনে একটু কথাবার্তা বলতে পার কিনা। বেশ আন্তরিক ভাবেই কথাটা বলল বলে মনে হল।”

কাহো বিষম খেল, বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। ও আমার সঙ্গে আবার দেখা করতে চায় যাতে আমরা কিছু কথাবার্তা বলতে পারি? কাহো নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না।

“কাহো-চ্যান,” মাচিদাকে উদ্বিগ্ন শোনাল। “আমার কথা শুনতে পাচ্ছ?”

“হ্যাঁ, আমি শুনছি,” কাহো জবাব দিল।

“তোমাকে ও পছন্দ করে বলেই মনে হল। তাহলে কী বলব ওকে?”

শুভবুদ্ধি ওকে না বলে দেবার পরামর্শ দিল। মুখের ওপর ওই বিশ্রী কথাগুলো লোকটা তো বলেইছে। এরকম একটা লোকের সঙ্গে কোন যুক্তিতে আরও একবার দেখা করতে হবে? কিন্তু চট করে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছিল না। বেশ কিছু সংশয়, তালগোল পাকিয়ে, ওর মাথার মধ্যে ঘোরাফেরা করছে।

“একটু ভেবে দেখার সময় পাওয়া যাবে?” মাচিদাকে জিগ্যেস করল। “আমি আপনাকে ফোন করব।”

.

কাহো শেষ পর্যন্ত সাহারার সঙ্গে আরও একবার দেখা করতে গেল, সেই শনিবারের অপরাহ্ণে। সাক্ষাতটা দিন থাকতে থাকতে হতে হবে, অল্প সময়ের জন্য হবে, খাবার এবং পানীয়ের পাট থাকবে না, এমন কোনো জায়গায় যেখানে নিরিবিলিতে কথা বলা যায়, যদিও আশেপাশে অন্য লোক থাকলে আপত্তি নেই – কাহো এইসব শর্ত রেখেছিল, মাচিদার মারফৎ লোকটিকে জানানো হল।

“দ্বিতীয় ডেটের পক্ষে উদ্ভট যত শর্ত,” মাচিদা মন্তব্য করলেন। “বড় বেশি সাবধান হচ্ছ তুমি।”

“হয়ত তাই,” কাহো বলেছিল।

“ব্যাগের ভেতর হাতুড়ি কিংবা ওই জাতীয় কিছু লুকিয়ে নিয়ে যাচ্ছ না তো আবার?” কথাটা বলে মাচিদা প্রাণ খুলে হাসলেন।

সেটা করলে খুব একটা খারাপ হয় না, কাহো মনে মনে ভাবল।


আগেরবার যখন ওদের দেখা হয়েছিল, সাহারা গাঢ় রঙের সুন্দর স্যুট আর টাই পরে এসেছিল, যেন বাড়ি ফেরার পথে ঢুঁ মেরে যাচ্ছে, তবে এবারে পরনে সপ্তাহান্তের ঢিলেঢালা পোশাক – বাদামি রঙের চামড়ার মোটা জ্যাকেট, আঁটসাঁট জিনস, আর বহুব্যবহারে জীর্ণ একজোড়া বুট। সানগ্লাসটা বুক পকেটে গোঁজা। সব মিলিয়ে বেশ ফিটফাট আবির্ভাব।

কাহো নির্দিষ্ট সময়ের থেকে একটু দেরিতেই পৌঁছল, হোটেলের লবিতে গিয়ে দেখল সাহারা আগেই এসে গেছে, ফোনে কাউকে বার্তা পাঠাচ্ছে। কাহোকে দেখতেই ওর ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটে উঠল, সেলফোনের চামড়ার ঢাকনাটা বন্ধ করে দিল। পাশের আসনে একটা মোটরসাইকেলের হেলমেট রাখা।

“১৮০০ সিসি’র BMW-তেই চড়ি আমি,” সাহারা বলল। “যত BMW আছে তার মধ্যে সব চেয়ে বেশি ডিস্প্লেসমেন্ট এটারই, ইঞ্জিনটাও খুব ভাল আর সব চেয়ে গুরুগম্ভীর আওয়াজ।”

কাহো কিছু বলল না। তুমি BMW মোটরসাইকেলই চড় কি ট্রাইসাইকেলে কি গরুর গাড়িতে – তাতে আমার কী – নিজের মনেই বিড়বিড় করল।

“মনে হচ্ছে মোটরসাইকেলের ব্যাপারে তোমার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই, তবুও মনে হল জানিয়ে রাখা ভাল, তোমারই অবগতির জন্য,” সাহারা আরও যোগ করল।

এই লোকটা জানে কী করে আমার ভাবনাগুলো পড়ে নিতে হয়, কাহোর আবার মনে হল।

একজন খাদ্য পরিবেশিকা চলে এল, ও কফির অর্দার দিল, সাহারা অর্ডার দিল ক্যামোমিল চায়ের।

“একটা কথা জানতে ইচ্ছে হচ্ছে, তুমি কি কখনও অস্ট্রেলিয়া গিয়েছ?” সাহারা জিগ্যেস করল।

কাহো মাথা ঝাঁকাল। ও কখনো অস্ট্রেলিয়া যায়নি।

“তুমি মাকড়শা পছন্দ কর?” সাহারা দু’হাত দিয়ে বাতাসে একটা পাখার মত একটা কিছু এঁকে জিগ্যেস করল। “আর্কানিড? ওই যাদের আটটা করে ঠ্যাং থাকে সেই প্রজাতির?”

কাহো জবাব দিল না। মাকড়শাকে ও অন্য সব কিছুর চাইতে বেশি ঘেন্না করে, তবে সেকথা ফাঁস করে দিতে চায় না।

সাহারা বলল, “যখন আমি অস্ট্রেলিয়া গেছিলাম, একটা মাকড়শা দেখেছিলাম বেসবলের দস্তানার মত বড়। ওটা দেখা মাত্রই মার শরীর শিরশির করে উঠেছিল। শিহরিত হয়েছিলাম। তবে স্থানীয় লোকরা খুব আগ্রহের সঙ্গে ওগুলোকে বাড়িতে আসতে দিত। কেন জান?”

কাহো চুপ করে রইল।

“কারণ ওরা ছিল নিশাচর আর ওরা আরশোলা খেত। বলতে পার ওরা প্রয়োজনীয়, উপকারী পোকা। তবুও মাকড়শা আরশোলা খাচ্ছে ব্যাপারটা একবার কল্পনা করে দেখ। খাদ্য শৃঙ্খলার চাতুর্য আর চমৎকারিত্ব দেখে আমি সর্বদাই অবাক হয়ে যাই।”

কফি আর হার্বাল চা এসে গেল, আর দুজনেই নিজের নিজের পানীয় সামনে রেখে কোনো কথা না বলেই বসে রইল।

“মনে হয় তোমার একটু অদ্ভুতই লেগেছে,” কয়েক মিনিট বাদে সাহারা বলল, লৌকিকতা দেখানো স্বরে। “এই আমি তোমার সঙ্গে আবার এভাবে দেখা করতে চেয়েছি বলে।”

কাহো এবারও জবাব দিল না। দেবার সাহস হল না।

“তবে স্বীকার করে নেওয়া ভাল, আমার সঙ্গে আবার দেখা করতে রাজি হয়েছ দেখে আমি নিজেই খুব অবাক হয়েছি,” সাহারা বলল। “এর জন্য আমি কৃতজ্ঞ, তবুও তোমাকে অপমানকর কথাগুলো বলে দেওয়ার পরেও তুমি রাজি হয়ে গেলে দেখে আমি অত্যন্ত বিস্মিত হয়েছি। না – আমি যা বলেছিলাম সেটাকে অপমানকর বললে কম বলা হয়, অপমান করার সীমাও ছাড়িয়ে গেছিলাম। ওটা ছিল ক্ষমার অযোগ্য অপমান, একজন নারীর মর্যাদায় আঘাত। নারীদের আমি যখন এরকম একটা কথা বলে দিই, ওদের বেশিরভাগ নারীই আমার সঙ্গে আবার দেখা করতে অস্বীকার করেছে। সেটাই তো স্বাভাবিক।”

ওদের বেশিরভাগই – কাহো মনে মনে কথাটার পুনরুক্তি করল। হতচকিত হয়ে পড়ল।

“ওদের বেশিরভাগই?” এই প্রথম ও কথা বলল। “অর্থাৎ বলতে চাইছ তোমার সঙ্গে দেখা করতে আসা প্রতিটি নারীকেই তুমি একই কথা বলে থাক? তুমি বলতে চাইছ ...”

“ঠিকই ধরেছ,” সাহারা তৎক্ষণাৎ স্বীকার করে জিল। প্রতিটি মেয়ে, যাদের সঙ্গে দেখা করি, প্রত্যেককেই তোমাকে যে কথাগুলো বলেছি, সেটাই বলে থাকি – ‘তোমার মত এত কুৎসিত কাউকে আমি দেখিনি।’ সাধারণত ডিনার করতে করতে, ঠিক যখন ডেজ়ার্টটা পরিবেশন করা হল। এই সব ব্যাপারে সঠিক সময়টা বেছে নেওয়াটা খুব জরুরি।”

“কিন্তু কেন?” কাহো শুকনো গলায় জিগ্যেস করল। “তোমাকে এরকম একটা কাজ করতে হবে কেন? আমার মাথায় ঢুকছে না। বিনা কারণে তুমি মানুষকে আঘাত কর? সময় আর টাকা খরচ কর শুধু ওদের অপমান করবার জন্য?”

সাহারা মাথাটা সামান্য হেলিয়ে বলল, “কেন করি – সেটাই তো আসল প্রশ্ন। বুঝিয়ে বলতে গেলে ব্যাপারটা জটিল হয়ে যাবে। তার চেয়ে আমরা এই রকম মন্তব্যের প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে, সেটা নিয়েই বরং আলোচনা করি। যে মেয়েদের আমি কথাটা বলি তাদের প্রতিক্রিয়া দেখে আমি প্রতিবারই অবাক হয়ে যাই। তুমি হয়ত ভাববে, ওই খারাপ কথাগুলো মুখের ওপর বলে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বেশিরভাগ মানুষই রাগে ফেটে পড়বে, কিংবা হেসে উড়িয়ে দেবে। সেই ধরণের মানুষও আছে। তবে সংখ্যায় খুব বেশি নয়। বেশিরভাগ মেয়েই ... সহজ করে বলতে গেলে, আহত হয়। গভীরভাবে এবং দীর্ঘ সময়ের জন্য। কখনো কখনো উদ্ভট কিছু বলেও বসে। এমন উদ্ভট কিছু যার মানে বোঝা কঠিন।”

আবার কিছুক্ষণের জন্য নীরব হয়ে থাকার পালা চলল। কিছুক্ষণ পরে কাহোই নীরবতা ভঙ্গ করল। “আর তুমি বলতে চাইছ এইসব প্রতিক্রিয়া দেখে তুমি আনন্দ পাও?”

“না, ঠিক আনন্দ পাই না। আমার কেবল অদ্ভুত লাগে। যে সব মেয়েরা প্রকৃতই সুন্দরী, কিংবা সাধারণদের তুলনায় বেশি সুশ্রী, তাদের মুখের ওপর যখন বলে দেওয়া হয় যে ওরা কুৎসিত, কী অদ্ভুতভাবে ওরা হতবাক হয়ে যায় বা আঘাত পায়।”

কফিতে ও চুমুকও লাগায়নি, ধোঁয়া উঠছে, ধীরে ধীরে ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে।

“আমার মনে হয় তুমি অসুস্থ,” কাহো দৃঢ়স্বরে জানিয়ে দিল।

সাহারা ঘাড় নাড়ল। “আমারও তাই মনে হয়। সম্ভবত, তুমি ঠিকই বলেছ। হয়ত আমি সত্যিই অসুস্থ। নিজের হয়ে কোনো কৈফিয়ত দাখিল বা সেরকম কিছু করছি না, তবে একজন অসুস্থ মানুষের চোখে পৃথিবীকেটা আরও বেশি অসুস্থ মনে হয়। ঠিক কিনা? এটা জেনে রাখ – চেহারাবাদকে মানুষ আজকাল খুব কঠোরভাবে আক্রমণ করছে। বেশিরভাগ লোকই বেশ জোর গলায় সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার নিন্দে করে। একবার ‘কুৎসিত রমণী’ কথাটা সর্বসমক্ষে উচ্চারণ করে দেখ, তোমাকে মার খেতে হবে। কিন্তু টিভিতে একবার দেখ। আর পত্রপত্রিকায়। প্রসাধন দ্রব্য, প্লাস্টিক সার্জারি, স্পা চিকিৎসা নিয়ে বিজ্ঞাপনে ভরা। তুমি কেমন দেখতে তাতে কিছুই এসে যায় না। হাস্যকর, অর্থহীন দ্বিচারিতা। প্রহসনেরই নামান্তর।”

“তাই বলে বিনা কারণে অন্যকে আঘাত করারও কোনো যুক্তি নেই, আছে কি?” কাহো পালটা জবাব দিল।

“হ্যাঁ, তুমি ঠিকই বলেছ,” সাহারা বলল। আমি অসুস্থ। সেটা অস্বীকার করার জায়গাই নেই। তবে অনেক সময় অসুস্থ হওয়াটাও উপভোগ্য – ব্যাপারটাকে যে যেমনভাবে নেয়। অসুস্থ লোকদেরও একটা নিজস্ব জগত আছে যেটা কেবলমাত্র অসুস্থ লোকরাই উপভোগ করতে পারে। যেন ভারসাম্যহীন মানুষদের ডিজ়নিল্যান্ড। ভাগ্যক্রম সেই দুনিয়াটা উপভোগ করার মত অর্থ এবং সময় দুটোই আমার আছে।”

একটি শব্দও খরচ না করে কাহো উঠে দাঁড়াল। ব্যাপারটাতে দাঁড়ি টানবার সময় হয়ে গেছে। লোকটার সঙ্গে কথা চালিয়ে যাওয়া ওর পক্ষে অসম্ভব।

“এক সেকেন্ড দাঁড়াও,” কাহো উঠে দাঁড়াতেই সাহারা বলে উঠল। “আরো অল্প একটু সময় দিতে পারবে আমাকে? বেশিক্ষণ লাগবে না। পাঁচ মিনিটই যথেষ্ট। কিছুক্ষণ থেকে আমার কথাগুলো শুনে গেলে ভাল লাগবে আমার।”

কাহোর মধ্যে কয়েক সেকেন্ডের দ্বিধা, তারপর আবার বসে পড়ল। ইচ্ছে একেবারেই ছিল না, তবে লোকটার গলায় এমন কিছু ছিল যা ও এড়িয়ে যেতে পারল না।

“যে কথাটা তোমাকে বলতে চাইছিলাম সেটা হল তোমার প্রতিক্রিয়া অন্য সবার চাইতেই ভিন্ন ছিল,” সাহারা বলল। “তোমাকে যখন ওই বীভৎস কথাগুলো বলে আঘাত করা হল, তুমি আতঙ্কিত হয়ে পড়নি, রাগ দেখাওনি, হেসে উড়িয়ে দাওনি আর তুমি কষ্ট পেয়েছ বলেও মনে হয়নি। এই সব মামুলি আবেগে ভেসে না গিয়ে তুমি কেবল আমার দিকে চেয়ে রইলে। যেন মাইক্রোস্কোপের তলায় কোনও ব্যাক্টিরিয়াকে পর্যবেক্ষণ করছ। তুমিই একমাত্র মানুষ যে ওভাবে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করল। আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম। ভাবলাম, এই মেয়েটা ব্যথা পেল না কেন? এমন কিছু কি আছে যা ওকে গভীরভাবে আঘাত দিতে পারে, আর তাই যদি হয়, কী সেটা?”

“অর্থাৎ তুমি যা করছ,” কাহো বলল, “এই ধরণের দেখাসাক্ষাৎ নামক বাহুল্যের আয়োজন করে চলেছ, অসংখ্যবার, শুধু মেয়েদের প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য? তাই তো?”

লোকটা মাথা হেলাল। “না, অসংখ্যবার বলা ঠিক হবে না, শুধু যখন সুযোগ আসে। আমি ডেটিং অ্যাপ বা ওই জাতীয় কিছু কখনোই ব্যবহার করি না। যে ব্যাপারগুলো সহজে করা যায়, সেগুলো খুব একঘেয়েও হয়। আমি যাদের চিনি তারা পরিচয় করিয়ে দেয়, আর আমি কেবল সেই সব মেয়েদের সঙ্গেই দেখা করি যাদের ব্যাকগ্রাউন্ডটা আমার জানা থাকে। একটু সেকেলে, ওমিয়াই-ধাঁচের, আগে থেকে ঠিক করে নেওয়া দেখাশোনাটাই সব চেয়ে ভাল। এই সেকেলে ব্যাপারটা আমার বেশ রোমাঞ্চকর লাগে।”

“আর তারপরে তুমি মেয়েটাকে অপমান কর?” কাহো বলল।

সাহারা জবাব দিল না। কেবল মুখে একবার হাসি ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেল। নিজের বুকের কাছে দু’হাতের তালু চিতিয়ে নিয়ে কিছুক্ষণ ধরে দেখল। যেন দেখতে চাইছে ওর তালুর রেখায় কোনো বদল এসেছে কিনা।

“ভাবছিলাম তুমি যদি আমার সঙ্গে মোটরসাইকেলে করে ঘুরতে যেতে,” চোখ তুলে জানতে চাইল। “তোমার জন্য বাড়তি একটা হেলমেটও নিয়ে এসেছিলাম। আবহাওয়াটাও ভালই আছে আজ, দুজনে মিলে আশেপাশে ঘুরতে গেলে ভালই লাগবে। ওডোমিটারে দেখাচ্ছে আমি সবে পাঁচ হাজার কিলোমিটার পেরিয়ে এসেছি, আর এর horizontally opposed engine, BMW যেটার বড়াই করে থাকে, একেবারে নিখুঁতভাবে টিউন করা।”

অস্বীকার করার উপায় নেই, কাহো ভেতরে ভেতরে এক অদম্য রাগে ফুঁসছিল। বেশ অনেকদিনের মধ্যে এতটা রেগে যায়নি। কিংবা হয়ত এটাই প্রথমবার। দুজনে মিলে আশেপাশে ঘুরতে গেলে ভালই লাগবে! নিজেকে কী মনে করে লোকটা?

“আমার ইচ্ছে নেই,” কাহো বলল, আবেগটাকে বেরিয়ে আসতে না দিয়ে, কণ্ঠস্বরকে যথাসম্ভব শান্ত রেখে। “যে কাজটা এই মুহূর্তে আমার সব থেকে আগে করতে ইচ্ছে করছে, সেটা কী আন্দাজ করতে পার?”

সাহারা মাথা ঝাঁকাল। “কী সেটা?”

“আমার আর তোমার মধ্যে একটা দূরত্ব বজায় রেখে চলা, দূরত্বটা সামান্য হলেও থাকবে। আর যে কলুষ আমার ওপর লেপে দেওয়া হয়েছে সেটা মুছে ফেলতে হবে।”

“বেশ,” সাহারা বলল। “ভাল কথা। তাহলে বোধহয় এখন আশেপাশে ঘোরার ইচ্ছেটা দুর্ভাগ্যক্রমে মুলতবি রাখতে হবে। কিন্তু তোমার কী মনে হয়? তোমার কি মনে হয় আমার থেকে কিছুটা দূরত্ব রাখার ইচ্ছেটা কাজ করবে?”

“কথাটার মানে কী?”

কোথাও একটি শিশু কেঁদে উঠল। লোকটা সেদিকে তাকাল, তারপর আবার সোজাসুজি কাহোর দিকে।

“মানে বুঝতে বেশি সময় লাগবে বলে মনে হয় না,” ও বলল। “যেসব মানুষের প্রতি আমার আগ্রহ জন্মায়, তাদের আমি অত সহজে ছেড়ে দিই না। আর এটা শুনে তুমি অবাক হতেই পার, তবে দূরত্বের কথাই যদি বল, আমরা কিন্তু খুব একটা দূরে নেই, তুমি আর আমি। জেনে রাখ, মানুষ কিন্তু সহজে শৃঙ্খল ছিঁড়ে ফেলতে পারে না। যে যতভাবেই এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করুক না কেন, যতই ভাবুক তার কিছুই এসে যায় না, তবুও। কোনোকিছুকে গ্রাস করে ফেল কিংবা নিজেই গ্রাস হয়ে যাও – দুটোই কিন্তু একই মূদ্রার দুটো দিক। সামনের আর পেছনের, জমার আর খরচের। দুনিয়াটা এভাবেই চলে। আমার মনে হয়, খুব সম্ভব, আমাদের আবার দেখা হবে, কোথাও না কোথাও।”


এই লোকটার সঙ্গে আবার কখনোই আমার দেখা হবার দরকার নেই, কাহো মনে মনে ভাবল। সেটাই যে হবে, দৃঢ় এবং দ্রুত পদক্ষেপে দরজার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে কাহোর মনে হল। মাচিদা যখন আমাকে ফোন করেছিলেন, আমার পরিষ্কার করে জানিয়ে দেওয়া উচিত ছিল। “অনেক ধন্যবাদ, কিন্তু না,” আমার বলা উচিত ছিল। “ওই লোকটার সঙ্গে আর কোনোদিনই দেখা করতে চাই না।”

একটা কৌতুহল। এই কৌতুহলটাই আমাকে ওখানে টেনে নিয়ে গেল। মনে হয় আমার জানার ইচ্ছে হয়েছিল লোকটার আসলে কোন উদ্দেশ্য সাধন করতে চাইছে, কী ওর বাসনা। ভুল করেছিলাম। ও কায়দা করে ওই কৌতুহলের টোপ দিয়ে আমাকে টেনে নিয়ে গেছিল, ঠিক যেমন মাকড়শারা করে। শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠাণ্ডা স্রোত নেমে গেল। একটু উষ্ণতার সন্ধানে যেতে হবে আমাকে, মনে মনে ভাবল। ইচ্ছেটা এর চাইতে জোরালো হতেই পারে না। দক্ষিণের কোনো দ্বীপে, যেখানে শ্বেতশুভ্র সৈকত থাকবে। ওখানে শুয়ে পড়ব, চোখ বন্ধ করে দেব, মন থেকে সমস্ত ভাবনা সরিয়ে দেব, সূর্যালোক আমার সর্বাঙ্গ ধুয়ে দিয়ে যাবে।


বেশ কয়েক সপ্তাহ কেটে গেছে। ওই লোকটাকে নিয়ে, সাহারাকে নিয়ে, সমস্ত ভাবনা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, মন থেকে দূর করে দিতে চেয়েছে। জীবনের এই অর্থহীন পর্বকে ঠেলে সরিয়ে দাও, ওর জীবনে যে পর্বটা একেবারেই অপ্রয়োজনীয়, তার পুনরাবৃত্তি আর কিছুতেই ঘটতে দেবে না। তা সত্ত্বেও, রাত্তিরবেলা, টেবিলে বসে কাজ করতে করতে লোকটার মুখটা অতর্কিতে, অপ্রত্যাশিতভাবে ভেসে ওঠে। সামান্য হাসি হাসি মুখে, কোনো কারণ ছাড়াই লোকটার লম্বা লম্বা সরু সরু আঙ্গুলগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে।

আয়নার সামনে আরও বেশি করে সময় কাটাতে লাগল, আগে যতটা কাটাত তার চেয়ে অনেকটাই বেশি। বাথরুমের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকত, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে নিজের মুখের খুঁটিনাটি লক্ষ্য করত, যেন নিজের সত্তাকে নিশ্চিত করতে চাইত। এবং ওর মনে হ্ত যে এর কোনো কিছুতেই ওর বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। নিশ্চিতভাবে ওরই মুখ এটা, তবুও এজেকোনও বিশেষত্ব খুঁজে পেল না যা নির্দেশিত করতে পারে যে এটা ওরই মুখ। এমনকি ওর বন্ধুরা যারা প্লাস্টিক সার্জারি করিয়ে নিয়েছিল, তাদের ও হিংসে করতে আরম্ভ করল। ওরা জানত – অন্তত জানত বলেই ওরা বিশ্বাস করত, মুখের কোন অংশটা সার্জারি করে বদলে নিতে পারলে ওরা আরও সুন্দরী হয়ে উঠবে, নিজেদের চেহারা নিয়ে আরও বেশি নিশ্চিন্ত হতে পারবে।

আমার নিজেরই জীবন হয়ত একটা মধুর প্রতিশোধ নিচ্ছে – এই ভাবনাটা মন থেকে সরাতে পারল না। সঠিক সময়ে জীবন আমার কাছে পাওনাটা সেটা ঠিক বুঝে নেবে। জমা আর খরচ। কাহো ব্যাপারটা বুঝে গেছে। সাহারা নামের ওই লোকটার সঙ্গে যদি দেখা না হত, ও কখনোই এই ভাবে ভাবত না। লোকটা হয়ত পরম ধৈর্যসহকারে, জীবনের দীর্ঘতম প্রতীক্ষায় বসে আছে এই আশায় যে আমি আবার ওর মুখোমুখি হব, কাহো মনে মনে ভাবল। বিশাল একটা মাকড়শার মত অন্ধকারে, শিকারের প্রতীক্ষায়।


কখনো-সখনো বিরাট একটি মোটরসাইকেল, নিশুতি রাতে, ওর অ্যাপার্টমেন্টের সামনের রাস্তা দিয়ে ছুটে যেত, সবাই যখন গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন। যখনই একটা ইঞ্জিনের অনুচ্চ কম্পনের শব্দ ওর কানে ভেসে আসত, ওর শরীরেও খুবই মৃদু কম্পন লাগত। শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুততর হয়ে যেত, বাহুমূল থেকে বিন্দু বিন্দু শীতল স্বেদ ঝরতে থাকত।

“তোমার জন্য বাড়তি একটা হেলমেটও নিয়ে এসেছিলাম,” লোকটা বলেছিল।

কল্পনায় দেখত ওই BMW মোটরসাইকেলটির পেছনের আসনে ও বসে আছে। আর সেই শক্তিশালী যন্ত্র ওকে কোথায় নিয়ে যাবে সেটা কল্পনা করতে থাকত। কী রকম জায়গায় ওটা আমাকে নিয়ে যেতে পারে?

“দূরত্বের কথাই যদি বল, আমরা কিন্তু খুব একটা দূরে নেই, তুমি আর আমি,” লোকটা বলেছিল।


সেই আজব ব্লাইন্ড ডেটের ছ’মাস বাদে কাহো বাচ্চাদের জন্য নতুন একটি বই লিখল। একদিন রাত্রে, ও স্বপ্ন দেখছিল, একটি গভীর সমুদ্রের তলদেশে রয়েছে ও, যখন জেগে উঠল, মনে হল যেন আচমকা ওকে সমুদ্রপৃষ্ঠে নিক্ষেপ করা হচ্ছে, সমুদ্রের তলদেশ থেকে ওপরে ভেসে উঠছে। কালক্ষেপ না করে লেখার টেবিলে গিয়ে গল্পটি লিখে ফেলল। শেষ করতে বেশি সময় লাগল না।

গল্পটি একটি মেয়েকে নিয়ে, যে ওর নিজের মুখের সন্ধানে বেরিয়েছিল। কোনো একটি বিন্দুতে মেয়েটি ওর মুখটি হারিয়ে ফেলেছিল; ও যখন ঘুমিয়ে ছিল তখন কেউ সেটা চুরি করে নিয়ে গেছে। অতএব ওটা ফেরত পেতে কিছু তো ওকে করতেই হবে।

কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারছিল না, ওর মুখটা দেখতে কেমন ছিল। এমনকি এটাও জানত না সেটা সুন্দর মুখ ছিল না কুৎসিত, গোলগাল না সরু। বাবা-মাকে জিগ্যেস করল, ভাইবোনদের কাছে জানতে চাইল, কিন্তু কেন জানি না, কেউই মনে করতে পারল না ওটা কোন ধরণের মুখ ছিল। কিংবা হয়ত কেউ ওকে বলতেই চাইল না।

তাই মেয়েটি ঠিক করে নিল সেই মুখের সন্ধানে ও একলাই বেরিয়ে পড়বে। এখনকার মত একটি মুখের হদিশ পেল যেটি ওকে মানিয়ে যাবে, তাই নিজের মুখ যেখানে ছিল সেখানে ওটি সেঁটে দিল। কাজ চালানোর মত একটি মুখ না থাকলে, যাবার পথে যাদের সঙ্গে দেখা হবে, তারা ওকে উদ্ভট কেউ বলে ভাবতে পারে।

মেয়েটি হাঁটতে হাঁটতে সারা দুনিয়া চষে ফেলল। উঁচু উঁচু পাহাড় পেরোলো, গভীর সব নদী পার হল, বিশাল মরুভূমি হেঁটে অতিক্রম করল, বিপদসংকুল জঙ্গলের ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলল। নিজের মুখটি খুঁজে পেলে ঠিক যে চিনে নিতে পারবে, এই ব্যাপারে ও নিশ্চিত ছিল। কারণ এটাই আমার অস্তিত্বের সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ অংশ, নিজেই নিজেকে বলল। যেতে যেতে অনেক মানুষের সঙ্গে ওর দেখা হল, বিচিত্র সব অভিজ্ঞতা হল। হাতির একটা পালের পায়ের তলায় পড়ে প্রায় পিষে যেতে বসেছিল, বিরাট একটা মাকড়শা ওকে আক্রমণ করেছিল, আর বুনো ঘোড়ারা তো লাথি মেরে ওকে প্রায় কাবুই করে ফেলেছিল।

এইভাবে সর্বত্র হাঁটতে হাঁটতে, অসংখ্য মুখ পরখ করতে করতে অনেকগু্লো দিন কেটে গেল, তবুও নিজের মুখ আর খুঁজে পায় না। চোখে যেগুলো পড়ল সেগুলো সবই অন্যদের মুখ। কী করবে ভেবেই পাচ্ছিল না। আর বুঝতেই পারেনি কখন কিশোরী থেকে ও একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীতে রূপান্তরিত হয়ে গেছে। নিজের মুখটা কোনোদিনই কি খুঁজে পাবে না? হতাশা ওকে গ্রাস করল।

একদিন উত্তরাঞ্চলের একটি অন্তরীপের চূড়ায় বসে ব্যর্থ মনে হাপুসনয়নে কাঁদছিল, এক দীর্ঘদেহী যুবক, পরনে পশমের কোট, ওর সামনে এসে হাজির হল, ওর পাশে বসে পড়ল। সমুদ্রের বাতাসে ওর দীর্ঘ কেশ ধীরে ধীরে আন্দোলিত হচ্ছিল। যুবকটি ওর মুখের পানে তাকাল, তারপর এক গাল হেসে বলল, “এর আগে কখনো তোমার মত অনিন্দ্যসুন্দর মুখের অধিকারী কোনও নারী আমার চোখে পড়েনি।”

ততদিনে সেঁটে নেওয়া মুখটাই ওর নিজের আসল মুখ হয়ে উঠেছে। নানা প্রকারের অভিজ্ঞতা, অনেক ধরণের আবেগ আর ভাবনা মিলে মিশে গিয়ে ওর মুখটা সৃষ্টি করেছে। এটা ওরই মুখ, একমাত্র ওরই মুখ। সে ওই যুবকটিকে বিয়ে করে ওই উত্তরাঞ্চলেই পরম সুখে দিন কাটাতে লাগল।

কাহো নিশ্চিতভাবে বুঝতে পারে না ঠিক কোন কারণে – বইটা বাচ্চাদের হৃদয়ে একটি স্ফুলিঙ্গের কাজ করল , বিশেষ করে কিশোরী মেয়েদের হৃদয়ে। এই সব কিশোর পাঠকপাঠিকারা অধীর উৎসাহে, নিজের মুখের সন্ধানে সেই মেয়েটির অভিযান আর ওর কঠোর অভিজ্ঞতার পেছন পেছন ঊর্ধশ্বাসে ছুটে চলতে লাগল, আর মেয়েটি যখন নিজের মুখ খুঁজে পেল এবং মানসিক শান্তি বোধ করল তখন পাঠকপাঠিকারাও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। খুব সরল ভাষায় লেখা, সঙ্গে সাদাকালো রেখাচিত্রে কাহোর আঁকা প্রতীকী ছবি।

আর ওই গল্পটি – লেখার সঙ্গে ছবি দিয়ে সাজিয়ে তোলা ওই গল্পটি – কাহোর হৃদয়াবেগেও এক ধরণের শান্তি এনে দিল। এই পৃথিবীতে আমি যে আমার মত হয়েই বাঁচতে পারি এটা ও উপলব্ধি করতে পারল। ভয় পাবার মত কিছুই নেই। সাগরের তলায় থাকার স্বপ্নটা থেকেই এটা ও শিখেছে। মাঝরাতের উদ্বেগ ধীরে ধীরে আবছা হয়ে আসতে লাগল। যদিও একেবারেই চলে গেছে, সেটা বলতে পারবে না।

লোকজনের মুখে মুখে বইটির কথা ছড়িয়ে পড়তেই এবং সংবাদপত্রে বইটির একটি ইতিবাচক পর্যালোচনা বের হওয়ায়, সেটির বিক্রি উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে লাগল। মাচিদা তো ভীষণ উত্তেজিত।

“আমার তো মনে হচ্ছে বাচ্চাদের এই বইটা দীর্ঘ সময়ের জন্য সেরা বিক্রির তালিকায় থেকে যাবে। সত্যিই এরকম মনে হচ্ছে আমার,” মাচিদা বললেন। “তোমার অন্যান্য বইয়ের থেকে একেবারে আলাদা, প্রথমে তো খুবই অবাক হয়েছিলাম। আমি তো ভেবেই পাচ্ছি না, কোথা থেকে পেলে এই বইয়ের পটভূমিটা?”

জবাব দেওয়ার আগে কাহো একটু ভেবে নিল। “অতল অন্ধকারের গহ্বর থেকে,” কাহো বলল।

(জাপানি থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন ফিলিপ গেব্রিয়েল)

লেখক পরিচিতিঃ

হারুকি মুরাকামি – জাপানি লেখক। জন্ম ১২ জানুয়ারি ১৯৪৯। তাঁর লেখা উপন্যাস এবং ছোটগল্প কেবল জাপানে নয়, সারা বিশ্বে সমাদৃত। বিশ্বের পঞ্চাশটি ভাষায় তাঁর লেখা অনুবাদ করা হয়েছে। তাঁর উল্লেখযোগ্য কিছু উপন্যাস হল – ‘নরওয়েজিয়ান উড’, ‘দ্য ওয়াইন্ড-আপ বার্ড ক্রনিক্‌ল’, ‘কাফকা অন দ্য শোর’। বর্তমান রচনাটি তাঁর ‘ফার্স্ট পারসন সিঙ্গুলার’ সঙ্কলনের ‘ক্রীম’ গল্পের অনুবাদ। মুরাকামি বহু পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ