অনুবাদঃ নৃপেন্দ্রনাথ সরকার
“আমি ওদের মনের একটা জানালা খুলে দিতে চাই,” সহজিয়া লেখনশৈলীর ক্ষমতা সম্বন্ধে হারুকি মুরাকামি
একজন কৃতি কাহিনীকারের বয়ানে নিজস্ব শৈলী, সৃজনশীলতা এবং কী ভাবে তিনি সাহিত্যিক প্রতিবন্ধকতা থেকে নিজেকে দূরে রাখতে পেরেছেন
হারুকি মুরাকামি
শনিবার ৫ নভেম্বর ২০২২ ০৫.০০ সংস্কর/ দ্য গার্ডিয়ান
-------------------------------
আমার প্রথম উপন্যাস, “হিয়ার দ্য উইন্ড সিঙ” ১৯৭৯ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। পৃষ্ঠা সংখ্যা ২০০ এরও কম। তবুও এটি সম্পূর্ণ করতে অনেক মাস এবং অনেক প্রচেষ্টা লেগেছে। বড় কারণটা ছিল সীমিত সময়। আমি একটি জ্যাজ ক্যাফে চালাতাম, এবং ঋণ পরিশোধের জন্য সকাল থেকে রাত পর্যন্ত আমার ২০ বছর কাজ করতে হয়েছিল। কিন্তু আসল সমস্যাটি হল, আমি কীভাবে একটি উপন্যাস লিখব সে সম্পর্কে আমার ধারণা ছিল না। সত্যি কথা বলতে, যদিও আমি সব ধরণের জিনিস পড়ার মধ্যে নিমগ্ন হয়ে পড়েছিলাম, যেমন, আমার প্রিয় রাশিয়ান উপন্যাস এবং ইংরেজি ভাষার পেপারব্যাকগুলির অনুবাদ। কিন্তু আমি কোনও সমন্বিত উপায়ে আধুনিক জাপানি উপন্যাস ("গুরুত্বপূর্ণ") পড়িনি। আমার কোন ধারণা ছিল না যে সেই সময়ে জাপানি সাহিত্য কী ধরনের ছিল বা কীভাবে আমার জাপানি ভাষায় কল্পসাহিত্য লেখা উচিত।
বেশ কয়েক মাস ধরে, আমি শুধু অনুমানে কাজ করেছিলাম, যা একটি সম্ভাব্য স্টাইল বলে মনে হয় তা গ্রহণ করে। এটি নিয়েই ব্যস্ত ছিলাম। কিন্তু যখন আমি ফলাফলটি ফিরে দেখি তখন আমি খুশী হলাম না। "খুবই দুঃখের," হাহাকার করে বললাম, "ব্যর্থ প্রচেষ্টা।" আমি যা লিখেছিলাম তা একটি উপন্যাসের আনুষ্ঠানিক প্রয়োজনীয়তা পূরণ করে বলে মনে হয়েছিল। আদতে এটি ছিল খুবই বিরক্তিকর এবং সামগ্রিলভাবে আমি আশাহত হয়েছিলাম।
পেছন ফিরে তাকিয়ে বলতেই পারি যে আমি একটি ভাল উপন্যাস সৃষ্টি করতে পারিনি। এটা ভাবা রীতিমত ভুল ছিল যে আমি, যে জীবনে কখনো কিছু লিখিনি, খুবই ভাল একটা কিছু লিখে ফেলব। প্রথমত শুরুতেই ভাল "উপন্যাসের" মত কিছু লেখার চেষ্টা করা সম্ভবত একটি ভুল ছিল। "চটকদার কিছু তৈরি করার চেষ্টা ছেড়ে দাও," নিজেই নিজেকে বলেছিলাম। “’উপন্যাস’ আর ‘সাহিত্য’ নিয়ে প্রচলিত নির্দেশগুলো সরিয়ে রেখে স্বাধীনভাবে নিজের স্বতঃস্ফূর্ত অনুভূতি আর চিন্তাভাবনাতেই মনোনিবেশ করব না কেন?”
নিজের স্বাধীন অনুভূতিকে ব্যক্ত করার ভাবনাটা বলতে যতটা সহজ, ব্যবহারিকভাবে তাঁর প্রয়োগ করা ততটা সহজ নয়। নতুন উদ্যমে কিছু শুরু করার আগেই যে কাজটা আমাকে করতে হল সেটা হল আমার পাণ্ডুলিপির স্তুপ আর ঝর্ণা কলমটিকে বর্জন করা। যতক্ষণ পর্যন্ত সেগুলো আমার সামনেই বিরাজমান ছিল, আমার সমস্ত কর্মকাণ্ডকেই ‘সাহিত্য’ বলে মনে হত। তার বদলে আমি তাক থেকে পুরনো একটা অলিভেট্টি টাইপরাইটার নামিয়ে নিলাম। তারপর, পরীক্ষামূলকভাবেই, ঠিক করলাম ইংরেজিতে আমার উপন্যাসের শুরুটা লিখব। মনে হল, কী সাংঘাতিক কিছু করতে চলেছি। প্রচলিত নিয়মের বাইরে গিয়ে কিছু যদি করতেই হয় তাহলে সেটা সর্বাত্মক হতে বাধা কোথায়?
একটি বিদেশী ভাষায় আমার চিন্তাভাবনা এবং অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে আমার সীমিত শব্দাবলীতে আটকে যেতে থাকি।
বলাই বাহুল্য, ইংরেজী ভাষায় আমার দক্ষতা সীমাবদ্ধ, তেমনি আমার শব্দভাণ্ডারও গুরুতরভাবে সীমিত। আমি কেবল সংক্ষিপ্ত, সহজ বাক্যে লিখতে পারি। অসংখ্য চিন্তাভাবনা আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। কিন্তু আমি সেগুলি আমার মাথায় আসার সাথে সাথে একীভূত করার চেষ্টাও করতে পারছি না। আসলে লেখার ভাষাটি সহজ হতে হবে, আমার ধারণাগুলি সহজে বোঝা যায় এমনভাবে প্রকাশ করতে হবে। কিন্তু অনেক সময় আমার লেখা বর্ণনা থেকে আনুসাঙ্গিক অনেক সৌন্দর্য সামগ্রী বাদ পড়ে যাচ্ছে। তারপরেও আমি স্বল্প পরিসরে একটা যথাযথ রূপ দিতে চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমার লেখাগুলো অমার্জিত এবং অতি সাধারণ গদ্য লেখার স্তরে রয়ে গেল। এতদসত্যেও এভাবেই আমি নিজেকে প্রকাশ করার জন্য সংগ্রাম করেছি। তবে ক্রমান্বয়ে আমার লেখায় একটি স্বতন্ত্র ছন্দ ফুটে উঠতে শুরু করে।
আমি জাপানে জন্মেছি এবং বেড়ে উঠেছি, তাই জাপানি শব্দভাণ্ডার এবং রীতিনীতি, সংক্ষেপে সেই ভাষার বাগধারা, এই আমি নামের সত্তাকে আঁকড়ে ধরে থাকে এবং ফেটে বেরতে চায়। যখন আমি আমার চিন্তাভাবনা এবং অনুভূতিগুলিকে শব্দের মধ্যে প্রকাশ করার চেষ্টা করি, তখন সেই বাগধারা পাগলের মত আমার মাথায় পাক খেতে থাকে এবং প্রায়শই আমি-সত্তাটি ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায়। এত সীমাবদ্ধতা নিয়ে একটি বিদেশী ভাষায় লেখার প্রচেষ্টা আমাকে সেই বাধাটি ভেঙ্গে দিয়েছিল। এর ফলে, সীমিত শব্দভাণ্ডার নিয়ে এবং ব্যাকরণসম্মত কাঠামোর সীমাবদ্ধ অভিজ্ঞতাকে সম্বল করে কীভাবে নিজস্ব চিন্তাভাবনা এবং অনুভূতিকে দক্ষতার সঙ্গে সমন্বয়িত করে প্রকাশ করা সম্ভব সেই ব্যাপারে আমার সম্যক উপলব্ধি হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত আমি বুঝে গেছিলাম যে অনেক কঠিন শব্দ প্রয়োগ করে গালভরা বাক্য লিখে মানুষের মনে প্রভাব সৃষ্টি করার কোনো প্রয়োজনই নেই।
অনেক পরে, আমি জানতে পারি যে লেখক আগোটা ক্রিস্টোফ এমন একটি শৈলীতে বেশ কয়েকটি বিস্ময়কর উপন্যাস লিখেছেন যেগুলির একটিতে অনুরূপ প্রভাব ছিল। ক্রিস্টোফ ছিলেন একজন হাঙ্গেরিয়ান নাগরিক যিনি ১৯৫৬ সালে হাঙ্গেরি ছেড়ে সুইজারল্যান্ডে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি ফরাসি ভাষায় লিখতে শুরু করেছিলেন। তিনি এটি অনেকটা প্রয়োজনের তাগিদেই করেছিলেন, কারণ হাঙ্গেরিয়ান ভাষায় উপন্যাস লিখলে তার ভরণপোষণের খরচ চলত না। একটি বিদেশী ভাষায় লেখার মাধ্যমে যে তিনি একটি শৈলী বিকাশে সফল হন তা নতুন এবং এককভাবে তার নিজের। ছোট ছোট বাক্যের উপর ভিত্তি করে একটি শক্তিশালী ছন্দ, শব্দচয়ন করেছিলেন যার মধ্যে কোন গোলকধাঁধা ছিলনা। লেখা ছিল সহজ সরল এবং বর্ণনা ছিল পরিস্কার এবং আবেগপ্রবণ মুক্ত। তার উপন্যাসগুলির মূল দিকগুলো রহস্যের আবরণে আচ্ছাদিত থাকত। পরে, যখন আমি প্রথম তার কাজের আকৃষ্ট হই, তখন এটি আমাকে বেশ নস্টালজিক করেছিল, যদিও তার সাহিত্যের বিষয় স্পষ্টতই আমার থেকে আলাদা।
'আমি যে উপন্যাসগুলি সৃষ্টি করতে চেয়েছিলাম সে সম্পর্কে আমার পরিষ্কার ধারণা ছিল।'
বিদেশি ভাষায় লিখলে রচনার মধ্যে যে অদ্ভুত একটা প্রভাব লক্ষ্য করা যায় সেটা আবিষ্কার করে এবং তাঁর ফলস্বরূপ একান্তই নিজস্ব একটি সৃজনশীল ছন্দময়তা অর্জন করে, অলিভেট্টি টাইপরাইটারটি তাকে ফেরত পাঠিয়ে দিয়ে আবার এক তাড়া পাণ্ডুলিপির কাগজ আর ঝর্ণা কলমটি বের করে ফেললাম। তারপর যে উপন্যাসের প্রায় একটি অধ্যায় আমি ইংরেজিতে লিখেছিলাম, সেটিকে জাপানিতে ‘ভাষান্তরের’ কাজে লেগে পড়লাম। ‘প্রতিস্থাপন’ বললেই বোধহয় ঠিক বলা হয়, কারণ সেটি আক্ষরিক অনুবাদ ছিল না। এর ফলস্বরূপ, জাপানি ভাষায় নতুন একটি শৈলীর উত্থান ঘটল। এই শৈলীটি একানতভাবেই আমার নিজস্ব, আমিই এটি আবিষ্কার করেছি। “এখন বুঝতে পেরেছি,” মনে মনে ভাবলাম। “এইভাবেই আমার লেখা উচিত।” সত্যোপলব্ধির মুহূর্ত সেটি।
আমার নব-আবিষ্কৃত শৈলীতে আমার সেই “বিরক্তিকর” উপন্যাসটির পুনর্লিখন করলাম। গল্পের ধারা কমবেশি অক্ষত থাকলেও প্রকাশের ধরন ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তবে পাঠকের কাছে এর প্রভাব ছিল ভিন্ন স্বাদের। “হিয়ার দ্য উইন্ড সিঙ” উপন্যাসটা অবশ্য আকারে ছোট ছিল। এটি যেভাবে বেরোলো তাতে আমি সম্পূর্ণরূপে খুশী ছিলাম না। যখন আমি এটি পুনরায় পড়ি, তখন এটিকে আমার অপরিপক্ব এবং ত্রুটিপূর্ণ বলেই মনে হল। আমি যা বলার চেষ্টা করছিলাম তার মাত্র ২০-৩০% প্রকাশ পেয়েছে। বলা বাহুল্য, এটি ছিল আমার প্রথম উপন্যাস। আমার মনে হলো - আমি একটা নতুন পদ্ধতিতে লিখতে পারলাম। এটা আমার জন্য একটা বড় পদক্ষেপ হিসেবেই অনুভব করলাম।
সংগীত পরিবেশন করতে যে আনন্দ অনুভূতি জাগে, নতুন শৈলীতে সাহিত্য রচনা করতে গিয়ে তার চেয়েও বেশী আনন্দ অনুভব করছি, এমন এক অনুভূতি যা আজও আমার মধ্যে গেঁথে আছে। মনে হচ্ছে শব্দগুলো আমার মাথা থেকে না এসে যেন আমার শরীর থেকে বেরিয়ে আসছে। ছন্দ বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় সুর খুঁজে বের করে নতুন সুর সংযোজন করার আনন্দ অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ। যখন আমি প্রতি রাতে রান্নাঘরের টেবিলে বসে আমার নতুন স্টাইলে লেখা আমার উপন্যাসের দিকে ফিরে তাকাই, আমার মনে হয় সদ্য আবিস্কৃত একটি যন্ত্র ধরে রেখেছি। আহা কী আনন্দ! আমার ৩০ তম জন্মদিনে এই অভিনব পুরষ্কার!
যেসব উপন্যাস সৃষ্টি করব বলে মনে করি, গোড়া থেকেই সেগুলি সম্বন্ধে আমার সুস্পষ্ট ধারণা থাকে। মনে হতে থাকে, আমি আমার ‘মূল’ কণ্ঠস্বর এবং শৈলীটি আবিষ্কার করে ফেলেছি, যা আগে থেকেই জানা ছিল তার সঙ্গে সংযোজন নয় বরং তার থেকে বিযুক্ত করে। একবার ভাবুন, জীবনের চলার পথে আমরা কত ধরণের জিনিস সংগ্রহ করে ফেলি। এটিকে তথ্যের অতিরিক্ত বোঝাই বলুন বা লটবহরের আধিক্য, নিজেকে সৃজনশীল্ভাবে ব্যক্ত করতে গেলে, চয়ন করবার মত বহু বিকল্প আমাদের সামনে এসে পড়ে, এবং এদের পরস্পরবিরোধী ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় বিভ্রান্ত হয়ে আমরা অচল যন্ত্রের মত স্থবির হয়ে যাই। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ি। সর্বশ্রেষ্ঠ উপায়টি হল তথ্যভাণ্ডার থেকে অপ্রয়োজনীয় তথ্যগুলিকে ছেঁটে ফেলা, যাতে মনকে আবার আমরা স্বাধীনভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি।
কিছু কিছু বিষয় থাকে যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কিছু আবার তেমন প্রয়োজনীয় নয়, কিছু একেবারেই অপ্রয়োজনীয়। তাহলে, কীভাবে আমরা সেই বিষয়বস্তুগুলির মধ্যে পার্থক্য করতে পারি?
একটি প্রচলিত রীতি হল নিজেকেই প্রশ্ন করা, “এটা করে কি আনন্দ পাচ্ছি?” যে কাজটি আপনি গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন অথচ কাজটিতে আগ্রহ পাচ্ছেন না, স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দ পাচ্ছেন না বা উপভোগ করছেন, তাহলে কোতথাোদএটা গলদ আছে বলেই ধরে নিতে হবে। সেরকম মনে হলে, আপনাকে আবার নতুন করে ভাবতে হবে, বিজাতীয় বিষয়গুলি এবং অপ্রাকৃত উপাদানগুলি বাতিল করতে হবে।
শুনতে যত সহজ লাগে, কার্যক্ষেত্রে ততই কঠিন।
‘হিয়ার দ্য উইন্ড সিঙ’ নবাগত লেখকদের জন্য সাহিত্য পুরস্কার পাওয়ার ঠিক পরেই আমার একজন উচ্চবিদ্যালয়ের সহপাঠী জাজ় কাফেতে এল আমার উপন্যাসটি নিয়ে ওর অভিমত জানাতে। “যদি ব্যাপারটা এতই সরল হয়, তাহলে আমিও একটি উপন্যাস লিখে ফেলতে পারি,” নাক সিটকিয়ে কথাটা বলেই ও চলে গেল। খুব স্বাভাবিকভাবেই আমি একটু অপ্রতিভ বোধ করলাম, তবে ও কী বলতে চেয়েছে সেটাও বুঝতে পারলাম। “ছেলেটি খুব অসঙ্গত কিছু বলেনি,” আমার মনে হল। “হয়ত সকলেই এরকম ভাল কিছু লিখে ফেলতেই পারে।” এক জায়গায় বসে মাথায় যা এসেছে উগরে দিয়েছি, এটুকুই তো আমি করেছি। কোনো জটিল শব্দ নেই, গালভরা কোনো বাক্যবন্ধ নেই, কোনো সুষ্ঠু শৈলীও নেই। মনের মধ্যে আসেয়া ভাবনাগুলিকে একসাথে গুছিয়ে লিখে গেছি। আমার সেই সহপাঠী বাড়ি গিয়ে সত্যিই একটি উপন্যাস লিখে ফেলেছিল, তবে সেই ব্যাপারে আমি আর কিছুই শুনতে পাইনি। হয়ত মনে করেছিল আমার উপন্যাসের মত এলেবেলে উপন্যাস লেখার দুনিয়াতে ওর লেখার কোনো প্রয়োজনই নেই। সেটাই যতি সত্যি হয় তো বলব সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছিল।
আজ পেছনে ফিরে মনে হচ্ছে, একজন উচ্চাকাঙ্ক্ষী লেখকের কাছে “এতই সরল” লেখার ব্যাপারটা হয়ত ততটা সরল ছিল না। অপ্রয়োজনীয় ব্যাপারস্যাপার মন থেকে সরিয়ে দেওয়া নিয়ে ভাবা কিংবা বলা খুবই সহজ, কিন্তু বাস্তবে তার প্রয়োগটা কিন্তু কঠিন। আমি অবশ্য বিশেষ ঝামেলা না করেই এই সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পেরেছিলাম, কারণ আমাকে একজন লেখক হতেই হবে এরকম কোনো সংস্কার আমার মধ্যে ছিল না, ফলে সেরকম কোনো উচ্চাশা আমার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।
যদি সত্যিই আমার উপন্যাসে মৌলিক কিছু থাকে, আমি মনে করি এটি স্বাধীনভাবে চিন্তা করার নীতি থেকে উদ্ভূত। এখন আমার বয়স মাত্র ২৯ বছর। কোন বিশেষ কারণ ছাড়াই, আমি ভেবেছিলাম, "আমি একটি উপন্যাস লিখতে চাই!" আমি কখনই একজন লেখক হওয়ার পরিকল্পনা করিনি এবং আমার কোন ধরণের উপন্যাস লেখা উচিত তা নিয়ে কখনও গুরুতর চিন্তাভাবনা করিনি, যার অর্থ আমি কোনও বিশেষ সীমাবদ্ধতার মধ্যে ছিলাম না। আমি যা অনুভব করেছিলাম সেটাই প্রতিফলন করতে আমি একটা কিছু লিখতে চেয়েছিলাম। আমার আত্মসচেতন বোধ করার দরকার ছিল না। আসলে, লেখালেখি ব্যাপারটা মজার – লিখতে গিয়ে আমি মুক্ত এবং অম্লান স্বাধীনতাবোধ অনুভব করি।
এটা আমার বিশ্বাস সমস্ত সৃজনশীল অভিব্যক্তির মূলে রয়েছে একটি সমৃদ্ধ এবং স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দ।
আমি মনে করি (বা আশা করি), মুক্ত এবং স্বাভাবিক সংবেদনশীলতা আমার উপন্যাসের কেন্দ্রে রয়েছে। এটাই আমাকে লিখতে অনুপ্রাণিত করে। সব সময় এটাই আমার চালিকা শক্তি। এটা আমার বিশ্বাস যে সমস্ত সৃজনশীল অভিব্যক্তির মূলে রয়েছে একটি সমৃদ্ধ, স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দ। সর্বোপরি, মৌলিক চিন্তা ভাবনা থেকেই একটি কাজের আকৃতি গড়ে উঠে। তা থেকেই অন্যদের সাথে সংযুক্ত হওয়ার স্বাভাবিক আবেগ সৃষ্টি হয়। এর মধ্যে এক রকম স্বাধীনতার অনুভূতি পাওয়া যায়। সেটা কি সীমাহীন আনন্দ নয়?
সম্ভবত বিশুদ্ধ আবেগের ফলে লেখায় এর নিজস্ব ফর্ম এবং প্রাকৃতিক শৈলী মনের অজানতেই চলে আসে। ফর্ম এবং শৈলী, সেই অর্থে, কৃত্রিমতা থেকে অনেক দূরে। একজন মেধাবী ব্যক্তি তার বুদ্ধিমত্ত্বার প্রতিটি সত্ত্বা ফর্ম এবং শৈলীর বিকাশের জন্য ব্যবহার করতে পারে, প্রতিটি ধাপে চিত্রের মত একে নিতে পারে, কিন্তু যদি তার সেই স্বাভাবিক আবেগের অভাব থাকে তবে সে ব্যর্থ হতে পারে বা ব্যর্থ না হলে এমন কিছু তৈরি করতে পারে যা স্থায়ী হবে না। এটি একটি উদ্ভিদের মতো হবে যার শিকড় মাটির সাথে দৃঢ়ভাবে সংযুক্ত হবে না: যদি খুব কম বৃষ্টি হয় তবে এটি তার জীবনীশক্তি হারাবে এবং শুকিয়ে যাবে, এবং যদি খুব বেশি বৃষ্টি হয় তবে এটি উপরের মাটির সাথে ভেসে যাবে।
এটি সম্পূর্ণরূপে আমার মতামত, কিন্তু আপনি যদি নিজেকে যতটা সম্ভব স্বাধীনভাবে প্রকাশ করতে চান, তাহলে সম্ভবত "আমি কী চাইছি?"এরকম জিজ্ঞাসা করে শুরু না করাই ভাল। বরং জিজ্ঞাসা করা ভাল, "আমি যদি কিছু না চাইতাম তাহলে আমি কী হতে পারতাম?" এবং তারপর নিজের সেই দিকটি কল্পনা করার চেষ্টা করুন। "আমি কি খুঁজছি?" জিজ্ঞাসা করাটা সবসময়ই আপনাকে ভারী বিষয় নিয়ে চিন্তা করার দিকে নিয়ে যায়। আলোচনা যত জটিল হবে, স্বাধীনতা ততই খর্ব হবে এবং আপনার লেখার অগ্রগতি ততই ধীর হবে। আপনার অগ্রগতি যত ধীর হবে এবং আপনার লেখা তত কম প্রাণবন্ত হবে।
যখন এটি ঘটবে, আপনার লেখা কাউকে মুগ্ধ করবে না - সম্ভবত আপনার জন্যও এটি প্রযোজ্য।
অন্য ভাবে বলা যায়, যদি আপনি কোন কিছু প্রত্যাশা না করেন,তাহলে আপনার জীবন সহজ হবে এবং আপনি একটা প্রজাপতির মতই মুক্ত হবেন। আপনাকে যা করতে হবে তা হল আপনার হাতের বন্ধন খুলে ফেলুন এবং এটিকে আরও উপরে উঠতে দিন। আপনার লেখা অনায়াসে গতি পাবে। মানুষ সাধারণত নিজের সত্ত্বা প্রকাশে সচেষ্ট হয় না। তারা কেবল বেঁচেই থাকে। তবুও, তা সত্ত্বেও, আপনি কিছু বলতে চান। সম্ভবত এই "তা সত্ত্বেও" এর স্বাভাবিক প্রেক্ষাপটে আমরা অপ্রত্যাশিতভাবে নিজেদের সম্পর্কে প্রয়োজনীয় কিছু দেখতে পাই।
আমি চল্লিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে কথাসাহিত্য লিখছি; তবুও আমি কখনই বুঝতে পারিনি যা সাধারণত "লেখকের ব্লক" হিসাবে পরিচিত। লিখতে ইচ্ছে করে কিন্তু পারছি না এই ব্যবপারটা আমার অজানা। এটা শুনে মনে হতে পারে যেন আমার প্রতিভা উপচে পড়েছে, কিন্তু আসল কারণটা অনেক সহজ: আমি সত্যি না চাইলে কখনোই লিখি না, লিখি তখনই যখন লেখার ইচ্ছাটা প্রবল হয়। যখন আমি সেই ইচ্ছা অনুভব করি, আমি বসে লিখতে শুরু করি। যখন আমি এটি অনুভব করি না, আমি সাধারণত ইংরেজি থেকে অনুবাদের দিকে ফিরে যাই। যেহেতু অনুবাদ মূলত একটি প্রযুক্তিগত কাজ, তাই আমি প্রতিদিন এটিকে অনুসরণ করতে পারি, এটা আমার সৃজনশীল ইচ্ছা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা; তবুও একই সময়ে এটি আমার লেখার দক্ষতা বাড়াতে একটি ভাল উপায়। আমার মন-মেজাজ ভাল থাকলে আমি প্রবন্ধ লেখার দিকেও যেতে পারি। আমি অন্যান্য প্রজেক্টগুলি থেকে বেরিয়ে এসে বলি, "কী এমন ব্যাপার!", "উপন্যাস না লিখলে আমি তো আর মরে যাচ্ছি না।"
কিছুক্ষণ পর অবশ্য লেখার ইচ্ছা খুব বাড়তে থাকে। আমি অনুভব করতে পারি, বরফ গলা জল যেমন বাঁধে চাপ সৃষ্টি করে, আমার মধ্যেও যেন লেখার উপাদান তৈরি হচ্ছে এবং চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। তারপর একদিন (একটি উল্লেখযোগ্য প্রেক্ষিত), যখন আমি সেই চাপটি আর নিতে পারি না, আমি আমার ডেস্কে বসে লিখতে শুরু করি। প্রতিশ্রুত পাণ্ডুলিপির জন্য সম্পাদকেরা অধৈর্যভাবে অপেক্ষা করছে এটা আমার চোখে কখনওই ভাসে না। আমি প্রতিশ্রুতি দিই না, তাই আমার সময়সীমা মেনে চলার বাধ্যবাধকতা নেই। ফলস্বরূপ, “লেখকের ব্লক” এবং আমি একে অপরের অপরিচিত। আপনি আশা করতে পারেন, এটি আমার জীবনকে অনেক সুখী করে তোলে। একজন লেখক না চাইলেও লিখতে হবে, এটা অবশ্যই ভয়ঙ্কর চাপ সৃষ্টি কারক। (আমি কি ভুল হতে পারি? বেশিরভাগ লেখক কি আসলেই এই ধরনের চাপে উন্নতি করেন?)
যখন আমি "মৌলিকতা" সম্পর্কে চিন্তা করি তখন আমি আমার ছেলেবেলার দিনগুলিতে ফিরে যাই। আমার মনে পড়ে আমার ঘরে আমার ছোট্ট ট্রানজিস্টর রেডিওর সামনে বসে প্রথমবারের মতো শুনছি, “Beach Boy” (Surfin’ USA) এবং Beatles (Please Please Me)। "কি দারুন!" আমার মনে পড়ছে, "কি দারুন!" "এটি কী চমৎকার! আমি এরকম কিছু শুনিনি!” আমি অভিভূত হয়ে পড়ি। তাদের সঙ্গীত আমার আত্মায় একটি নতুন জানালা খুলে দেয়। এমন এক সমীরণ প্রবাহিত হয়, যার শ্বাস আমি আগে কখনও নিইনি। আমি গভীর প্রশান্তি অনুভব করি, এবং অনুভূতির এক বিশেষ উচ্চতায় ভাসতে থাকি। বাস্তবের সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত হয়ে আমার পা যেন মাটি ছেড়েছে। "মৌলিকতা" আমার নিকট এরকমই খাঁটি এবং সারল্যে ভরপুর।
আমি সম্প্রতি নিউ ইয়র্ক টাইমস-এ বিটলসের আমেরিকান আত্মপ্রকাশ সম্পর্কে লেখা এই লাইনটি দেখেছি: "তারা একটি সুর রচনা করেছে যা নবীন, উদ্যমী এবং নিঃসন্দেহে তাদের নিজস্ব।" এই শব্দগুলি মৌলিকতার সেরা সংজ্ঞা প্রদান করতে পারে। "নবীন, উদ্যমী, এবং নিঃসন্দেহে আপনার নিজের।"
“মৌলিকতা” শব্দে সংজ্ঞায়িত করা কঠিন, তবে এটি যে মানসিক অবস্থার উদ্রেক করে তা বর্ণনা করা এবং পূণরায় তৈরী করা সম্ভব। আমি যতবার আমার উপন্যাস লিখতে বসি ততবারই আমি সেই মানসিক অবস্থাটি অর্জন করার চেষ্টা করি। এর কারণ এটি এত আশ্চর্যজনকভাবে উদ্দীপনার সঞ্চার করে যে মনে হয় আজকের দিনটি থেকে একটি নতুন এবং ভিন্ন দিনের জন্ম হচ্ছে।
যদি সম্ভব হয়, আমি চাই আমার বই পড়ার সময় আমার পাঠকরা একই আবেগ উপভোগ করুক। আমি তাদের আত্মার মধ্যে একটি জানালা খুলতে চাই যেন বিশুদ্ধ বাতাস তাদের অন্তরে প্রবেশ করে। এটা ভেবে এবং আশা নিয়েই আমি সহজ এবং মৌলিক লেখা লিখি।
এটি হারুকি মুরাকামির ‘বৃত্তি হিসেবে উপন্যাস রচনা’ (Novelist as a Vocation) বইটির ফিলিপ গ্যাব্রিয়েল এবং টেড গসেনের ইংরেজিত অনুবাদের একটি সম্পাদিত নির্যাস। প্রকাশক হারভিল সেকার।


0 মন্তব্যসমূহ