উপল মুখোপাধ্যায়ের ধারাবাহিক উপন্যাস: আলমগীর








পর্ব- ৭

শাজাহান আর মুমতাজ বাধ্য হয়েছিলেন দারা আর ঔরঙ্গজেবকে শাহী দরবারে পাঠাতে। তাগিদটা নূর জাহানের দিক থেকেই বেশি ছিল। জাহাঙ্গীর যায় যায় অবস্থায়, ক্ষমতার দাবিদার অনেক। শাজাহান তো বিদ্রোহই করে বসেছেন , ময়দানে আছেন শাহাজাদা পারভেজ, মৃত খুসরুর ছেলে দাওয়ার বকস আর বেগম নূর জাহানের ঘোড়া নিজের জামাই শাহাজাদা শাহরিয়ার। তাই শাজাহানের দুই ছেলেকে আটকে রাখলে অনেক সুবিধে হবে তখ্তের লড়াইয়ে এমনটাই ছিল নূর জাহানের ভাবনা। শাহজাহান কোলের ছেলে মুরাদ সহ বাকি ছেলেপিলেদের আর মুমতাজ ও জেনানার অন্যদের নিয়ে মালিক অম্বরের এলাকা নাসিকের দিকে যাচ্ছেন। রোহতাস আর অসিরগড় কেল্লা ফিরিয়ে দিচ্ছেন শাহী হেপাজতে।

ঠিক সেসময় ষোলোশো ছাব্বিশের ষোলোই মার্চ একটা ঘটনা ঘটল যা সাম্রাজ্যের ভিত কাঁপিয়ে দিতে পারত।ইতিহাসকার বাককরির দাখিরাতুল খাওয়ানিন , মুতামদ খানের ইকবালনামা ই জাহাঙ্গীরি, মুহম্মদ হাদি প্রভৃতি সূত্র থেকে জানা গেল বসন্তের সকালে ঐদিন সপরিবারে লাহোর থেকে কাবুল যাচ্ছেন বাদশাহ জাহাঙ্গীর।

পথে ঝিলম নদীর দুপাড়ে মোঘল শাহী শিবিরের সারিসারি তাঁবু পড়েছে। বাদশাহের শিবিরের ভেতর বিশাল রাজপুত সেনাদল নিয়ে ঢুকে পড়েন মহবত খান। রাগে ফুঁসছেন তিনি। অল্প কিছু ফৌজের পাহারায় ছিল খাস বাদশাহের শিবির সেসব পাত্তা না দিয়েই ঢুকে পড়েছেন সেপাইসালার।সোজা জাহাঙ্গীরের হারেমের দিকে হাঁটা দিলেন তিনি সসৈন্যে । কোন আদবের তোয়াক্কা না করে সোজা পৌঁছে যাচ্ছেন জাহাঙ্গীরের নাকের ডগায় , বারণ করলেও তো শোনেনই না- বাদশাহ নাকি তাঁর পরিবারকে বেইজ্জত করেছেন। উল্টে খোলা তলোয়ারের মুখে বাধ্য হচ্ছেন জাহাঙ্গীর তড়িঘড়ি সাজানো এক হাতিতে চাপতে সঙ্গে যাচ্ছে দরবারের কয়েকজন মাত্র লোকজন : গন্তব্য শাহী শিবির থেকে মাইল কয়েক দূরের এক ছন্নছাড়া আটপৌরে তাঁবুর শিবিরে। মহবত খানের রাজপুত ফৌজের ডেরায় অপহৃত হলেন হিন্দুস্থানের বাদশাহ।

এরপর দ্রুত ঘটনা ঘটে শাহী ফৌজের বড় অংশটাই সেপাইসালার আসফ খানের নেতৃত্বে তাঁবু গেড়েছিল নদীর ওপারে। তারা কিছু টেরটি পাওয়ার আগেই মহবতের ফৌজ পুড়িয়ে ফেলল সংযোগের সেতু দুইপাড় বিচ্ছিন্ন হল শুধু একটা অস্থায়ী সরু সেতু বানিয়ে রাখা হল কড়া পাহারায়। একেবারে পাকাপোক্ত ভাবেই জাহাঙ্গীরের অপহরণ কাণ্ড সমাপ্ত হচ্ছে বলে ধরেই নেওয়া যাবে সাধারণবুদ্ধিতে। কিন্তু মালিকা এ হিন্দ তো অনেকেই হয়েছিল নূর জাহান হয়েছিল কয়জনা ? তাই দেখা যাচ্ছে দুই বোরখা পরা আওরাত এগিয়ে যাচ্ছে নতুন তৈরি করা সরু সেতুটার দিকে। পাহারাদার রাজপুতরা কেনই বা পাত্তা দিতে যাবে মহিলাদের। বোরখা তুলে দেখার, বেইজ্জত করার জন্য জন্মায়নি কোন রাজপুত সন্তান। তারা ফিরেও তাকাল না ওই দুজনের দিকে। এর মধ্যে একজন ছিলেন বেগম নূর জাহান আর অপরজন ওনার অপরলিঙ্গ প্রধান জাওয়াহির খান। ধরেই নেওয়া যায় ভালোরকম হাতিয়ারবন্দ ছিলেন তাঁরা দুজনেই , মহড়া নিতে গেলে যে রাজপুতের মহড়া নিতে হতো। সাময়িক উত্তেজনা সামলে অভিজ্ঞ মহবত খান বুঝতে পারলেন বেগমকে হেপাজতে না নিয়ে বড় ভুল তিনি করলেন। অবশ্য তখন আর কিছু করার ছিল না নূর জাহান ঝিলমের অপর পারে ভাই আসফ খানের তাঁবুতে মিটিঙে বসে গেছেন। গভীর সলা করছেন জাহাঙ্গীর উদ্ধার সেনা অভিযানের।সঙ্গে সব অভিজ্ঞ সেপাইসালার , আমির , উজিররা। '' তোমাদের আপদার্থতায় লজ্জা পাচ্ছেন আল্লাহতালা , লজ্জা পাচ্ছে সারা হিন্দুস্তানের প্রজারা……. সবচেয়ে ভালো হবে কালই সব ফৌজকে একজুট করে নদী টপকে বদমাশদের খতম করা আর বাদশাহের সামনের মাটি চুম্বন করলে,দাস হিসেবে। '' আদেশ করেন সহ শাসক নূর জাহান। সবাই সহমত হয়।

মহবত খানও নিজের লোকদের জড়ো করে প্রতিআক্রমণ মোকাবিলা করার প্রস্তুতি সারতে লাগলেন। ওপর ওপর জাহাঙ্গীরের সঙ্গে যথাযথ মর্যাদায় ভাব বিনিময় করছিলেন। জাহাঙ্গীরও বহু লড়াইয়ের যোদ্ধা , মাথা ঠাণ্ডা রেখে অপেক্ষা করা ছাড়া যে গত্যন্তর নেই সে ভালোই বুঝে মেজাজ সামলে ছিলেন।যুদ্ধের আগের মুহূর্তে ঝিরঝির বয়ে চলেছিল ঝিলম নদীর জল। কারুর সময় ছিল না তার দিকে নজর করে। সবাই অপেক্ষা করে আছে যুদ্ধের , প্রস্তুতি নিচ্ছে।এক ফাঁকে সূর্যও ডোবার প্রস্তুতি নিলো বটে ।

----- কী হল বল তো ?

----- কী আর বলি ......

----- বলবেই।

----- শাহাজাদা পারভেজের সঙ্গে খুব জমে উঠেছে যে .....

----- কার ?

----- মহবত খানের।

----- স্বাভাবিক শাহাজাদা শাজাহানের বিদ্রোহ দমন করতে ছুটে বেড়াচ্ছেন তাঁরা - সারা হিন্দুস্তানের সবদিক চোষে ফেলছেন বাদশাহের নির্দেশে।

----- উঁহু ঠিক হল না।

----- কী ! বাদশাহ জাহাঙ্গীরের ফরমানে দায়িত্ব পেয়েছেন তাঁরা।

----- ওই পর্যন্ত ঠিক ছিল।

----- কোন পর্যন্ত ? কী বলতে চাইছ খুলে বল ।

----- সবটা খুলব না। সবটা বলব না।

----- যতটুকু বলবে বল ।

-----মহবত খান বাদশাহের সব নির্দেশ মানছেন কি ?

------ সেকি ?

----- জাহাঙ্গীর তো মনে করেন শাহাজাদা শাজাহানকে সরিয়ে সুবে বাংলার পুনর্দখল নিয়ে যা পাঠানো উচিত ছিল দরবারে , যা পেশকস দেওয়ার কথা ছিল মহবতের তা তিনি পাঠাননি।

----- কী পাঠালেন না ?

----- যত হাতির বহর , যত টাকার খাজনা।

----- কিছুই কী পাঠালেন না ?

----- পাঠিয়েছেন বটে তবে বাদশাহ সন্তুষ্ট নন মোটেই।

----- বাদশাহ না নূর জাহান ?

----- তুমি কি মহবতের সঙ্গে বেগমের অতীত তিক্ততার কথা বলছ ?

----- কেন বলবো না ?

----- বলবে না কারণ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আঁতাত বদলায় মোঘল সাম্রাজ্যে।

----- তা বলে অতীত ....

------ ভুলে যাবে। বর্তমান নিয়ে ভাবো। এখন তিনজনের তিনজনকে দরকার।

----- কোন তিনজন ?

----- জাহাঙ্গীর -নূর জাহান আর মহবত খান। দুজনই বলতে পারো।

শাজাহান আর মালিক অম্বর মিলে দাক্ষিণাত্যে মোঘল -বিজাপুর যৌথ ফৌজকে কোনঠাসা করেছিলেন । কয়েক মাস ধরে যুদ্ধ হচ্ছিল। যতই সন্দেহ থাক, ষোলোশো পঁচিশের শেষে লড়াইয়ে হেরে গেলে আবার সেই মহবত আর পারভেজকেই সুবে বাংলা থেকে আহমদনগর আর বুরহানপুরের ঘেরাবন্দি ভাঙতে পাঠাচ্ছেন জাহাঙ্গীর। ওই দুই কেল্লা আর বাণিজ্যকেন্দ্র ঘিরে বসেছিল শাজাহান আর অম্বরের ফৌজ । পারভেজ-মহবতের বিশাল শাহী ফৌজ অবরোধ মুক্ত করতে নর্মদা পৌঁচচ্ছে সেই দেখে শাজাহান প্রমাদ গুনে জাহাঙ্গীরের কাছে আত্মসমর্পনের চিঠি পাঠিয়েছিলেন। আগেই জানা গেছে সেসময় তিনি বেশ অসুস্থও বটে।

এর মধ্যে আরেকটা ঘটনা ঘটে যা মহবত খানের সঙ্গে বাদশাহের সম্পর্কে চিড় ধরালো। সেসময় মোঘল অভিজাত সম্প্রদায়ের লোকজনকে ছেলেপুলের বিয়ের জন্য বাদশাহের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন নিতে হোত। নিজের মেয়ের বিয়ের অনুমোদন নেননি মহবত। ব্যাস আর যায় কোথায় ! জাহাঙ্গীরের মেজাজ সপ্তমে ! এক বিখ্যাত সুফি পরিবারের ছেলের সঙ্গে সঙ্গে মেয়ের সম্বন্ধ স্থাপন করেন মহবত। জামাই বেচারাকে অশেষ ভোগান্তি পোয়াতে হল। তার হাত দুটো গলার সঙ্গে বেঁধে , মাথার পাগড়ি টান মেরে খুলে , রাস্তায় ঘুরিয়ে লাহোরের ফাটকে পুরল শাহী সেপাই লস্কর। বিয়েতে যা গয়নাগাঁটি ,টাকা পয়সা দেওয়াথোয়া হয় সব বাজেয়াপ্ত হয় বাদশাহের ফরমানে। এখানেই শেষ থাকে না মহবত বেইজ্জতির ,তাঁর মেয়েকেও দরবারে উপস্থিত হওয়ার আদেশ দিলেন শাহেনশাহ। মহবতের রাগের আরো কারণ ছিল এতসব কিছু ঘটে গেল তাঁর সম্পূর্ণ অজান্তে।

এই ঘটনার পর মহবতের সঙ্গে মোঘল দরবারের আঁতাত একরকম ভেঙে গিয়ে আসফ খান -নূর জাহান একটা জোট হয়। এতদিন হয়ত আসফ বিদ্রোহী শাহজাদা শাজাহানের শ্বশুর হবার কারণে ভাই-বোনের যে সম্পর্ক শীতল হয়েছিল তা মেরামত হল। আসফ খানের পক্ষেও কি শাজাহানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মহবতের পরপর জয় আর ক্রমোত্থান ভালো ভাবে মেনে নেওয়া সম্ভব ? ফরমান জারি করে মহবত খানকে দাক্ষিণাত্য থেকে ফিরিয়ে আনছেন জাহাঙ্গীর , সুবে বাংলার বাকি খাজনা আর হাতি নিয়ে দরবারে আসার তলব হচ্ছে। দূত মারফত মহবত জানাচ্ছেন যা হাতি পাঠানোর, তিনি আগেই পাঠিয়েছেন আর টাকার হিসেবে নিয়ে তানামানা করছেন তিনি । জাহাঙ্গীর অভিজ্ঞ খান ই জাহান লোধিকে দাক্ষিণাত্যের দায়িত্ব দেন। এটা আবার শাহাজাদা পারভেজ মানতে পারেননি, দাক্ষিণাত্যের সুলতানশাহীর প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথাবার্তার সময় লোধিকে সঙ্গে রাখতেন না।এরপর থেকে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত আর কোন উল্লেখ নেই শাহাজাদা পারভেজের। অন্ধকারে চলে গেলেন তিনি ।

বাদশাহ সপরিবারে বেরিয়ে পড়েছেন কাবুলের দিকে সঙ্গে আছেন নূর জাহান, আসফ ,শাহাজাদা শাহরিয়ার, লাডলি বেগম আর তাঁর সদ্যোজাত শিশু। । মহবতও চলমান দরবারে হাজিরা দিতে রওনা দিলেন ।

মহবত এবার খোলাখুলি জাহাঙ্গীর বিরোধিতা শুরু করলেন। উত্তরে ফিরে আসার আগের মূহুর্তেও খুসরুকে তাতাচ্ছেন তিনি। রাজস্থান সীমান্তে মেওয়াট রাজ্যের এক ভারতীয় মুসলিম পরিবারের মেয়ের সঙ্গে নিকাহ হয়েছিল মহবত খানের। বড় মনসবদার হিসেবে ভালোরকম যোগাযোগ রাখতে হতো রাজপুত যোদ্ধাদের নানা গোষ্ঠীর সঙ্গে। তাঁদেরকে মেয়ের লাঞ্ছনার কথা বললেন তিনি। '' ও আমাদেরও মেয়ে , আমরা বেঁচে থাকতে ওকে দরবারে সকলের সামনে দাঁড়াতে দেব না কিছুতেই। '' প্রতিজ্ঞা করল রাজপুতরা। হাজার চারেক রাজপুত মহবতের সঙ্গী হয়। সব মিলিয়ে ছ হাজার ফৌজ নিয়ে মহবত পাঙ্গা নিতে চললেন বাদশাহের।

লাহোরে পৌঁছলেন যখন শাহী বহর তার বেশ কদিন আগেই কাবুল রওনা দিয়েছে। লাহোরে নিজের লোকেরা খবর দেয়, বাদশাহের কাছে যেতে না যেতে আসফ খান তাঁকে গ্রেফতার করার মতলব করেছেন। মহবতের রাগ আরো বাড়ে। জাহাঙ্গীরকে অপহরণের ছক পাকা করে ফেললেন। বিশ্বস্ত এক সেপাইসালারকে এক হাজার সওয়ার নিয়ে আগে গিয়ে ঝিলম পারাপারের সেতুর দখল নিতে বললেন। আর দরবারকে অন্ধকারে রাখতে বার্তা গেল যে মহবতের সেনারা শাহী ফৌজের তাগত বাড়াতে যোগদান করছে।

সত্যিই মহবত খানকে পাকড়াও করার একটা মতলব করেছিল মোঘল দরবার। প্রথমে মহবতকে দরবারে আসতে দেওয়া হবে কোন সেনা ছাড়া, তারপর জাহাঙ্গীর তাঁকে নিয়ে যাবেন সেতুর কাছে তখন সেপাইরা মহবতকে পাকড়াও করে সেতু উড়িয়ে তাঁর ফৌজের থেকে বিচ্ছিন্ন করবে। এই মতলবটা কার্যকরী করতে বন্দোবস্ত করাও হয়। ঝিলমের একপাড়ে আসফ খান ও তাঁর ফৌজ তাঁবু ফেলে সঙ্গে শাহী তোষাখানা আর মালখানা বা অস্ত্রাগার ।অন্য পাড়ে বাদশাহ আর তার হারেম সঙ্গে অল্প কিছু সেপাই আর অপরলিঙ্গের পাহারাদার। মহবতের সঙ্গে যে এত বিশাল বাহিনী থাকবে এটার আগাম কোন খবর শাহী দিদবান বা গুপ্তচর নেটওয়ার্কের নজর কী করে এড়িয়ে গেল এটা এক বিস্ময়ই বটে। উল্টে মহবত এসব খবর আগে থেকে পেয়ে,ভালো করে শিবিরের অবস্থানের ছানভিন করে, বিশাল বাহিনী নিয়ে হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়ে, সব ভেস্তে দিলেন। সেতুর দখল তো তাঁর অগ্রগামী ফৌজ আগেই নিয়েছিল। হল যেটা , জাহাঙ্গীর, নূর জাহান, শাহরিয়ার ,লাডলি সহ গোটা হারেম আসফ আর ফৌজের মূল অংশের থেকে বিপজ্জনক ভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে মহবতের সেনার হাতে বন্দী হলেন। হাতের বাইরে চলে গেল পরিস্থিতি।

এই পাহারার মধ্যে থেকেও জান কবুল করে মহবতের রাজপুত সৈন্যের চোখে ধূলো দিয়ে পালালেন নূর জাহান। এখন তাঁকে দেখা যায় ঝিলমের অপর পাড়ে ভাইজান আসফ খান ও অন্য সেপাইসালারদের নিয়ে আক্রমণের পরিকল্পনা করতে।

কিছুক্ষণ পর উত্তেজনা প্রশমিত হলে মহবত বুঝলেন নূর জাহানকে ছেড়ে রাখা ভালো হয়নি। খোঁজ পড়ল বেগমের কিন্তু বেগমকে আর পাওয়া যায় না। সম্ভবত দরবারের খাজাঞ্চি মুতামদ খানই সটকে পড়ে ওনাকে সব জানান।নূর জাহান নাগালের বাইরে বুঝেই মহবত আরো সতর্ক হলেন। তাঁর নজর পড়ে শাহাজাদা শাহরিয়ারের প্রতি। নূর জাহানের সঙ্গে কি কেটে পড়লেন শাহাজাদাও ? তড়িঘড়ি বাদশাহকে এনে ফেললেন শাহরিয়ার আর লাডলি বেগমের শিবিরে সেখানে জাহাঙ্গীর দিন দুয়েক সতর্ক পাহারায় কাটান।

নূর জাহান , আসফ খান ও অন্য আমিররা চুলচেরা বিশ্লেষণ করে চলেন। ওপারে বাদশাহকে আটকে রাখা হয়েছে সারি সারি তাঁবুর একদম শেষ প্রান্তে। ঝিলম নদী খুবই খরস্রোতা আর গভীর , রাজপুত সেনাদের নজর এড়িয়ে তুরন্ত পার হওয়া অসম্ভব। সভায় সেতু তৈরি আর নৌবিদ্যা পারদর্শী মুঘোল বিশেষজ্ঞরা অন্য কথা বলেন। তাঁদের মতে ঝিলম নদী কোন কোন জায়গায় বেশ অগভীর। সেসব জায়গা চিহ্নিত করে ফৌজ , হাতি-ঘোড়া , তোপ-বন্দুক সাজানো শুরু হয়।

বাককরি জানাচ্ছেন অপহরণের ঘটনার দুদিনের মাথায় ষোলোশো ছাব্বিশের আঠেরোই মার্চ হাতির পিঠে বন্দুক হাতে নূর জাহান মোঘল ফৌজের প্রতি আক্রমণে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

ঝিলমও ক্ষেপে ওঠে হাতির ডাক ,ঘোড়ার চিঁহি আর রামসিঙ্গার কানফাটানো আওয়াজে। নৌবিদদের অনুমান ভুল প্রমাণ করে বাস্তবে দেখা গেল নদীর কিছু জায়গা বেশ গভীর , তার ওপর তীব্র স্রোত, যুদ্ধ তো পরের কথা ওপারে পৌঁছনই দায়। আসফ খান আর তাঁর ছেলে বন্দুক -তলোয়ার নিয়ে বাছাই করা সওয়ার আর সেপাইসালার , আমিরদের সঙ্গে করে স্রোতের সঙ্গে প্রচুর লড়ে ওপারে নেবেই ধুম হাতাহাতি লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েন। মহবত খানের কোন এক ছেলে মতান্তরে ভাই, পাঙ্গা নিতে এলে তাঁকে কোতল করে ফেললেন আসফের ছেলে শায়েস্তা খান। এই ঘটনায় অভিজ্ঞ সেপাইসালার আসফ খান প্রমাদ গোনেন , এরপরও আক্রমণ অব্যাহত রাখলে মহবত খান হয়তো প্রতিক্রিয়ায় তাঁর কব্জায় থাকা জাহাঙ্গীরকেই কোতল করে বসবেন। তারচেয়ে আপাতত পিছিয়ে যাওয়াই ভালো। এই ভেবে ফিরে যায় মোঘল ফৌজের বড় ভাগ-কলামটাই। নূর জাহান তাঁর হাতিতে চড়ে অনবরত গুলি চালাতে চালাতে এগিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে আসফের কোন যোগাযোগ থাকা ওই তুঙ্গ মুহূর্তে সে যুগে সম্ভবও ছিল না কারণ মূল যুদ্ধটাই লড়তে হচ্ছিল খরস্রোতা ঝিলমের জলে ,খবর পৌঁছন অসম্ভব। । বেগমের বাহিনী কোন রকমে জলে ডোবা থেকে নিজেদের বাঁচাতে বাঁচাতে লড়ছিল। পিঠের জিন আর কম্বলের ওজন জলে ভিজে ভিজে একসা হয়ে কয়েকগুন বেড়ে ডুবিয়ে দেয় ঘোড়াদের। অপর পাড়ে মহবত খানের সুশৃঙ্খল বাহিনীর সওয়াররা সারিসারি দাঁড়িয়ে , হাতিরা দুর্ভেদ্য দেওয়াল তুলে আছে তার ফাঁক থেকে নিরবিচ্ছিন্ন গুলি গোলা ছুটে আসছে , ঝাঁকে ঝাঁকে তীর এসে ফুঁড়ে দিচ্ছে শরীর। অনড় অচল বাহিনী শাহী ফৌজকে ঝিলমের জলে নাকানি চোবানি খাওয়াচ্ছিল। ঝিলমই সাথ দেয় মহবতকে। এই অসম লড়াইয়ে নূর জাহান হারালেন তাঁর দুই বিশ্বস্ত অপরলিঙ্গের বীর নাদিম আর জাওয়াহিরকে।

নূর জাহান গুলি চালাতে চালাতে বিপজ্জনক ভাবে প্রায় অপর পাড়ে চলে যান। তাঁকে সাহায্য করার জন্য প্রয়োজনীয় ফৌজ ছিল না। তাঁর হাতিও শুঁড়ে তলোয়ারের কোপ আর পেছনে দুটো বর্শা বেঁধার যন্ত্রনায় চিৎকার করছিল। মাহুত হাতির মুখ ঘুরিয়ে জলের গভীরে চলে যাবার সিদ্ধান্ত করে সেখান থেকে হাতি আস্তে আস্তে সাঁতরে ওপারে ফিরে যায়। সে সময় কিছু শাহী বন্দুকবাজ তীব্র গুলিবর্ষণ করে নদীর পাড়টা আটকে রেখেছিল যাতে অরক্ষিত বেগমের পিছু না নিতে পারে মহবতের ফৌজ।সাহসী বেগম না হয় অন্য পাড়ে অক্ষত পৌঁছলেন কিন্তু সেই জানকসম করা লোকগুলোর কী হয় কেউ জানে কি ? স্বর্গীয় আশীর্বাদপুষ্ট রাজা-বাদশাহদের বাঁচাতে তারা, ইতিহাসের চিরকালের পদাতিক বোড়েরা , কচুকাটাই হয়ে থাকবে।

এই যুদ্ধ বৃত্তান্তটা শেষ হবে না আর এক অপরলিঙ্গের মানুষের বীরত্বগাথা বাদে। তিনি হলেন জাঙ্গীরের দরবারের অনুষ্ঠান পরিচালক ফিদাই খান। নূর জাহান ফিরে গেলেও , আসফ খান কৌশলগত পশ্চাতপসারণ করলেও ফিদাই খানের নেতৃত্বে একদল ঘোড়সওয়ার ঝিলমের একধার দিয়ে বাদশাহের কাছে পৌঁছনোর মরিয়া চেষ্টা চালালো। সে দলের ছজন জওয়ান নদীর ঠাণ্ডা জলে ডুবে মরল।অনেকে ঘায়েলও হল কিন্তু বাকিরা মহবতের ফৌজের বেষ্টনী ভেঙে শাহরিয়ারের শিবিরের কাছে পৌঁছে যায়। তাদের ছোঁড়া তীর শিবিরের আশপাশে এসে পড়ে , বাদশাহকে যেখানে আটকে রাখা হয়েছে তার কাছাকাছি এক উঠোনে পৌঁছে গেল ওই সাহসী সওয়ারদের দস্তা, অনুগত এক দরবারীকে মেরেও ফেলল ভুলক্রমে। দমবন্ধ উত্তেজক এক লড়াইয়ে ফিদাই খানের আরো চার সেপাই মারা যায়। ফিদাই খান দেখলেন আর পারবেন না।পালাতে গিয়ে ঘোড়া জখম হলে সম্ভবত উনি একাই ঝিলম নদী পার হন সাঁতরে,ফিরে আসেন শাহী শিবিরে।

ক্ষতবিক্ষত হাতির পিঠ থেকে নেমে এলেন নূর জাহান। ফিরে এলেন আসফের শিবিরে। মুখোমুখি কী কথপোকথন হয়েছিল তাঁদের এটা জানা যায় না। আদৌ কথা বলার মতো অবস্থায় ছিলেন তাঁরা নাকি যে যার মতো করে আপাতত নিরাপদ হতে চাইছিলেন ? ব্যর্থ যুদ্ধের পর , বেপরোয়া আক্রমণের পর বল্গা ছাড়া ভায়োলেন্সকে কেই বা ডাকতে চায়। যা জানা যায় তাহল, আসফের নেতৃত্বে যে মোঘল ফৌজ বাদশাহের সঙ্গে ছিল তা সম্পূর্ণ ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। অনেক আমির ও দরবারের সদস্য পালিয়ে যায়। আসফ খান তাঁর ছেলেকে নিয়ে শদুয়েক সওয়ার সহ আটোকের কেল্লায় আশ্রয় নিয়ে পরবর্তী আক্রমণের জন্য লোকজন জড়ো করছিলেন। কোন একসময় নূর জাহান ঝিলম নদীর অপর পাড়ে জাহাঙ্গীরের শিবিরে ফিরে গেলেন। আবার মোঘলদের চলমান তাঁবু কাবুলের দিকে চললো তফাৎ একটাই, যা কিছু সিদ্ধান্ত সবই মহবত নিচ্ছেন, ওপর ওপর জাহাঙ্গীর বা তাঁর পরিবারের সঙ্গে কোন বেয়াদবি করছেন না। এমনকি নূর জাহান পালিয়ে গিয়ে যখন আসফের সঙ্গে তাঁকে আক্রমণের ফন্দি করছেন তখনো বাদশাহকে বেগমের কাছে বার্তা পাঠাতে দিয়েছিলেন। যাত্রাপথে নূর জাহানকে একেবারে বাদ দিয়ে জাহাঙ্গীরকে সামনে রেখে লাগাম নিজের হাতে রাখার বার্তা দিচ্ছিলেন মহবত খান। পুতুল বাদশাহের এক প্রতিরূপ দেখা গেল। ষোলোশো ছাব্বিশের এপ্রিলে অপহরণের পর চারশো মাইল চলে কাবুলে পৌঁছোচ্ছে মোঘলরা।

কাবুলে পৌঁছনোর পর বাইরে থেকে সবই স্বাভাবিক ভাবে চলতে দেন মহবত। সমস্ত কার্যকলাপই করছেন বাদশাহ: প্রপিতামহ বাবরের সমাধিকে যাচ্ছেন , হুমায়ুননামার রচয়িতা বিদূষী পিসি গুলবদন বেগমের সমাধিতে শ্রদ্ধা জানালেন। ক্ষমতা বৃত্তের আপাত বাইরে থেকেও গোপনে নূর জাহান বেগম আমির ওমরাহদের ফিরিয়ে আনতে দেদার টাকা ছড়াচ্ছেন যার পরিমান জানা যায় তিন লাখ টাকার মতো। নতুন অপরলিঙ্গ প্রধান হোশয়ার খানকে নির্দেশ পাঠাচ্ছেন লাহোরে, দু হাজার সওয়ার আর হাজার পাঁচ পদাতিক সেনা তৈরি থাকছে সেখানে। এসব চলছে অত্যন্ত গোপনে ,জাহাঙ্গীর মুখে মহবতের সঙ্গে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলছেন।

কাবুলের পাহাড়ি রুক্ষ ভূমিতে বাদশাহের জন্য একটা সংরক্ষিত চারণভূমি ছিল। সেই চারণভূমি রক্ষার দায়িত্বে ছিল সরাসরি শাহী তোষাখানা থেকে মাইনে পাওয়া আহাদিরা। এরা মূলত শাহী পরিবারের রক্ত সম্বন্ধীয় অথবা দুধর্ষ পার্বত্য আদিবাসী যোদ্ধা হতো। বেশি মাইনে পাওয়া বাদশাহের অনুগত বা খাস বাহিনী ছিল আহাদিরা। মহবত খানের রাজপুত সেনাদের কজন ওই চারণভূমিতে যায়। সেখানে আহাদিরা তাদের আটকাতে এল। প্রচুর তর্কাতর্কি হয় , রাজপুতরা এক আহাদি রক্ষীকে টুকরো করে কেটে দিয়ে আসে। নিহত লোকটার পরিবার বাদশাহের কাছে প্রতিকার চেয়ে হতাশ। এ সুযোগ কাজে লাগলেন নূর জাহান। দুধর্ষ আহাদি তীরন্দাজ বাহিনী আচমকা রাজপুত শিবির আক্রমণ করে মহবতের ঘনিষ্ট বেশ কিছু সেপাইসালার সহ নশো সৈন্যকে মেরে ফেলল।মহবত খান নিজে যুদ্ধে যেতে গিয়েও প্রাণের ভয়ে পেছিয়ে আসেন ,এমনই ছিল আক্রমণের তীব্রতা।

এরপরই মহবত ভয়ে নিজেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করেন।শাহী ক্ষমতার মধ্যে থেকে নিজের সামরিক জোর দেখিয়ে চালকের ভূমিকা নিয়েছেন কিন্তু কত দিন ধরে রাখতে পারবেন ?

----- আহাদিরা।

----- কী করল তারা ?

----- শাহী ক্ষমতার নানা রূপ। মনসবদার , তার অধীনে সওয়ার ,পাদিগান-পদাতিক , বন্দুকচি -বন্দুকবাজরা, শামশেরবাজ-তলোয়ারে ভেলকি ওড়ায় যারা ,মির ই অতিস -গোলন্দাজ প্রধানের অধীন নানা তোপের বহর,মীর ই বহর- এডমিরালের অধীন নৌবহর আর নীচু তলার কিন্তু 'হেন কর্ম নেই যা করতে পারিনা' সেই একান্ত দাস চেলার* দল - সবাই কে।

----- কী ?

----- সবাইকে ছাপিয়ে যায় মহবতের বাহিনী -মূলত রাজপুত বাহিনী। মুঘল আগ্রাসনের বর্শামুখ সেই রাজপুত। কিন্তু যুদ্ধ

*যুদ্ধ বন্দীদের বাছাই করা শক্ত সামর্থ্য ছেলেদের চেলা বলা হতো । অনেকটা সাধু সন্ন্যাসীর চেলার মতো অনুগত অর্থে তারা বাদশাহের অনুগত ।

----- কিন্তু কী ?

----- হেরে যায় দুধর্ষ ,এখনকার ভাষায় এলিট ফোর্স ,আহাদিদের দাপটে , কিন্তু কেন ?

----- আহাদিরা মোঘলদের রক্ত সম্বন্ধীয় বলে ?

----- জানি না।

----- জাহাঁবাজ তীরন্দাজ বলে ?

------ জানিনা।

----- বেশি মাইনে পাওয়া বিশেষ বাহিনী বলে ?

----- জানি না।

----- তবে জানোটা কী শুনি ?

----- শাহী ক্ষমতার সব ধরণগুলো অজানা ছিল বলেই হয়তো মহবত .....

----- কী বলছ কিছুই বুঝছি না!

----- আমিও বুঝিনি মহবত খানের এই হার আর তাঁর দোলাচলের কারণ।

---- তবে থাক।

বাদশাহ যা পরামর্শ দেন সব মেনে নিতে শুরু করলেন মহবত। আবার বাদশাহের কথাই তাঁর কথা হতে শুরু করবে কি ? জাহাঙ্গীর সুসম্পর্কের অভিনয় চালিয়ে আসতে আসতে ক্ষমতার রাশ নিজের হাতে ফিরিয়ে নিতে থাকেন।নূর জাহানের সঙ্গে কথা বলেই মানসিক চাপ সৃষ্টি করছিলেন মহবতের ওপর। নূর জাহান সম্পর্কে মহবতকে সাবধান করতেন , আসফের ছেলে শায়েস্তা খানের বেগম সেপাইসালার খান ই খানান আব্দুল রহিমের নাতনির রাগের গল্প শোনাতেন - মেয়েটা নাকি পেলেই মহাবাত খানকে বন্দুক ফুঁড়ে দেবে ! এসব নানা খেলা চালাতে চালাতে ঝিলমের ধারে আবার অনুগত বাহিনীকে তৈরি রাখার নির্দেশ দিলেন নূর জাহান যাতে ফিরতি পথেই চূড়ান্ত পাঙ্গা নিয়ে মহবতেকে পুরোপুরি বাগে এনে ফেলা যায় ।

বাদশাহ কাবুলে থাকা কালীন ষোলোশো ছাব্বিশের তেরোই মে মালিক অম্বরের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়। চির শত্রুর মৃত্যুর সে খবর পৌঁছলেও উৎসবের আয়োজন করার বাস্তবতা ছিল না নজরবন্দী জাহাঙ্গীর বা নূর জাহানের।

দাক্ষিণাত্যেও একধরণের স্থিতাবস্থা চলে। কিছু ফৌজ নিয়ে শাহাজাদা পারভেজ বুরহানপুর ছিলেন। এর মধ্যে বাদশাহের কাছে দুঃসংবাদ এল যে শাহাজাদা গুরুতর অসুস্থ। ।দাক্ষিণাত্যের ভারপ্রাপ্ত সেপাইসালার খান জাহান লোধি খবর পাঠাচ্ছেন শাহাজাদা মাঝে মাঝেই জ্ঞান হারাচ্ছেন আন্ত্রিক রোগে।হাকিমরা সেসময়ের প্রথায় তাঁর মুখে আর মাথায় আগুনের ছেঁকা দিয়ে সুস্থ করার চেষ্টা করছেন। হাকিমদের মতে অতিরিক্ত মদ্যপানের জন্যই এই দশা। তাই তাঁর পক্ষে কোন সমরাভিযান চালানো অসম্ভব। শাজাহান মালিক অম্বরের এলাকা নাসিকে ঘাঁটি গেঁড়ে নতুন আঁতাত গড়া আর ফৌজ যোগাড়ের তালে, তিনিও কোমর বেঁধে নেমে পড়ার অবস্থায় নেই। ফলে মোঘল সালতানাতের সীমায় অনেকগুলো স্বাধীন রাজ্য বহালতবিয়তে থেকে যায় এই রাজনৈতিক শূন্যতার পরিবেশেও।

ষোলোশো ছাব্বিশের জুন মাস নাগাদ শাজাহানের কাছে জাহাঙ্গীরের অপহরণের খবর যায় । শাজাহান ও মুমতাজের দারা শুকোহ আর ঔরঙ্গজেবকে বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়ায় আফশোস হওয়া স্বাভাবিক। সুজাও সম্ভবত গোটা অপহরণের সময়টায় বাদশাহের সঙ্গে চরম বিপদের মুখে ছিলেন। এছাড়া এই রাজনৈতিক -সামরিক ডামাডোলের মধ্যে থেকে হয় বাবার সঙ্গে অথবা মহবত খানের সঙ্গে নতুন আঁতাতের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে শাজাহানও কিছু ফৌজ নিয়ে উদ্দেশ্যহীন বেরিয়ে পড়েন। যাওয়ার পথেই শাজাহানের দিশাহীন ফৌজ আরো ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ল। মাত্র শ পাঁচেক লোক থেকে গেল তাঁর সঙ্গে। এ অবস্থায় শাহী দরবারে কল্কে পাবেন না বুঝে শাহাজাদা গনগনে থর মরু পার হয়ে সিন্ধের থাট্টার দিকে চললেন সঙ্গে গর্ভবতী মুমতাজ। তিন ছেলে বাদে অন্য বাচ্চারা তাঁদের সঙ্গেই ছিল। মোঘল সীমান্তবর্তী থাট্টা থেকে শাজাহান সাফাভিদ সাম্রাজ্যের সমর্থন আদায়ের ভরসায় আবার বিদ্রোহ শুরু করলেন।

ষোলোশো ছাব্বিশের অগাস্ট মাসে মহবত খানের নেতৃত্বেই মোঘল শাহী বাহিনী কাবুল থেকে লাহোর রওনা দিচ্ছে। পথে লাহোর হয়ে দারা শুকোহ আর ঔরঙ্গজেবকে নিয়ে একটা ছোটোখাটো ঘোড়সওয়ারের দল তাঁদের সঙ্গে মিলিত হয়। জাহাঙ্গীরের লাল রঙ্গা দরবারী তাঁবুতে ঢুকেই তিন বার কুর্নিশ করছেন দুই শাহাজাদা , তাঁদের ডান হাত প্রতিবার মাটি ছুঁয়েছিল। কুর্নিশের পর শাহাজাদাদের জমিন বস বা মাটিতে চুমু খেতে হল। তারপর তাঁরা সঙ্গে আনা মূল্যবান পেশকস- উপহারের সঙ্গে বাবার দেওয়া তিন লাখ টাকা নজরানাও দেন দরবারে । এসব বলছেন মুতামদ খান তাঁর ইকবাল নামা বইতে। যেরকম নিখুঁতভাবে বাচ্চা দুই শাহাজাদা আদব মানেন তা দেখে বোঝা যায় দুরুদুরু বুকে অনেকবার করে শেখানো কায়দায় দরবারি রীতি মেনেছিলেন তাঁরা কারণ সামান্য ভুলচুকই বেয়াদবি বলে ধরা হতো আর কপালে অশেষ দুর্ভোগ ছিল। বাচ্চাদের বেয়াদবি শাজাহানের বেয়াদবি হিসেবে গণ্য হবারও ভয় ছিল কারণ দুই ছেলেকে জাহাঙ্গীরের কাছে জামিন রেখেও সেসময় শাজাহান আবার বাবার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। সেসব অবশ্য কিছুই হল না, দুজনই পরীক্ষায় পাস দিয়ে নূর জাহানের কড়া নজরদারিতে শাহী হেপাজতে চলে গেলেন ।

ষোলোশো ছাব্বিশের সেপ্টেম্বরের শেষে শাহী বহর যখন সেই অপহরণের জায়গা ঝিলম নদীর তীর থেকে দিন দুয়েক দূরে - মহবত খানের কাছে দুটো বার্তা পরপর গেল, পাঠাচ্ছেন বাদশাহ মতান্তরে নূর জাহান। এক্ষেত্রেও চিঠির বয়ান নিয়ে কোন বিতর্ক নেই। প্রথম চিঠিতে লেখা হচ্ছে মহবত যেন সেদিন তাঁর বাহিনীর দৈনিক কুচকাওয়াজ বন্ধ রাখেন কারণ বাদশাহ নিজে বেগম নূর জাহানের ঘোড়সওয়ার বাহিনীর কুচকাওয়াজ পরিদর্শন করবেন। দুই বাহিনী একসঙ্গে হাতিয়ারবন্দ হয়ে ময়দানে থাকলে সে ময়দানে জং শুরু হতে আর কতক্ষণ ? কথাটা মহবতেরও মনে ধরে। আগে থেকে জানিয়ে দিয়ে বাদশাহ তাঁর ওপর আস্থারই প্রমাণ দিচ্ছেন এমনটাই ভাবেন তিনি।

নূর জাহানের সংখ্যায় ছোট খাস এক সওয়ার বাহিনী ছিল। এই ডামাডোলেও মহবত তাদের উপস্থিতি নিয়ে কোন সন্দেহই করেননি , বলা যায় উপেক্ষাই করেন। জটিল শাহী ক্ষমতা কাঠামো সম্পর্কে আরেকবার ভুলটা হল তাঁর। আসলে ওই কুচকাওয়াজের বাহানায় বেগমের ঘোড়সওয়ার দলে আরো দুহাজার জন সওয়ার অন্তর্ভুক্ত করা হল জাহাঙ্গীরের উপস্থিতিতে। দ্বিতীয় চিঠিতে বলা হচ্ছে ঝিলম নদীর তীরে মহবত যেন আগে পৌঁছে যান , বাদশাহ আসবেন পেছন পেছন। এতো ঠিকই আছে -একটু ভাবেন মহবত খান, রাজি হয়ে যাচ্ছেন এই শর্তে যে আসফ খানকে যেতে হবে তাঁরই সঙ্গে ,তাঁরই কড়া নজরে থেকে। কিন্তু সমান্তরাল অন্য একটা পথে দ্রুত ঘোড়ার আওয়াজ শোনা যায় যে । জাহাঙ্গীর কি যৌবনের ফুর্তি ফিরে পেলেন ? তার সঙ্গে সঙ্গে যাচ্ছেন নূর জাহান ও অন্য মোঘল অভিজাতরা। রাতে না থেমে একটানা ঘোড়া ছুটিয়ে শাহী বহর আগেই পৌঁছে গেল ঝিলমের তীরে, দুদিনের রাস্তা একদিনে পার করল।ইতিহাসকার হাদি বলছেন বাদশাহ , নূর জাহান আর অন্যরা নৌকায় নদীর অপর পারে চলে যাচ্ছেন আর সেখানে বেশ কিছু আমির ওমরাহ আর গোপনে জমায়েত করা ফৌজ অভ্যর্থনা করছে তাঁদের। মহবত পৌঁছে দেখেন বাদশাহ তাঁর নাগালের বাইরে , এক বিশাল ফৌজ ঘিরে রয়েছে তাঁকে যার সংখ্যা তাঁর নিজের বাহিনীর থেকে অনেক বেশি।

খতম হল অপহরণের খেলা , মূলত নূর জাহানের সামরিক কৌশলেই হার মানতে হচ্ছে তাঁকে , অভিজ্ঞ সেপাইসালার মহবত খানকে। কারও ব্যাখ্যায় নূর জাহানের আয়েশার মতো এই বিদ্রোহিনী হওয়া, ফিতনার নৈরাজ্যের আগুন ছড়ানো , নেহাতই বেকুবি।কাবার প্রান্তরের মতো বীরশ্রেষ্ঠ আলি কি তাঁকে ভৎসনা করবেন ? যেমন হতমান ,পরাজিত ,আহত আয়েশাকে করেছিলেন আলি, 'রাসুলিল্লাহ কি এই কম্মোটি করতে বললেন তোমায় ? চুপটি করে ঘরের কাজে মন দিতে বলেছিলেন কিনা ?' ভৎসনা করেছিলেন নারীর নির্দিষ্ট সীমা লঙ্ঘনের অপরাধে ।

-----কিন্তু এক্ষেত্রে তো পরাজিত নন নূর জাহান , নন হতমানও বা আহত?

----- তবু।

----- তবে কেন ফিতনার অভিশাপ আর আগুন জ্বালানোর অভিযোগ ?

----- তবু।

----- অজেয় জুলফিকার তলোয়ার কি ফিতনার আগুন নেভাতে ঝিলমের জলটিকে লালটি করে তুলবে ?

----- তবু।

----- এ প্রশ্নের এক ব্যাতিক্রমী উত্তর দিয়েছিলেন জাহাঙ্গীর।

----- তবু।

----- নারীর প্রশ্নে কেন এতো সংশয় ?

----- তবু।

----- এমনকি বাদশাহের কথাও শুনবেনা ?

----- তবু।

----- স্বর্গীয় আশীর্বাদপুষ্ট শাহেনশাহ নুরুদ্দিন জাহাঙ্গীর ?

----- ছি ছি বলছো কী , তাঁর কথা শুনবো না , বলছো কী !

----- শোনোনিই তো !

----- কে বলেছে ?

----- ইতিহাস-তারিখ বলছে।

----- বলছে ?

----- তবে তারিখ আরো বলল ....

----- কী ?

----- হিন্দুস্থানের মিশ্র তহজিবের শাহেনশা জাহাঙ্গীর বললেন, ' কিহ হাস্তি তু শারিক -ই মান বা শাহী।'

----- কোথায় বললেন ?

----- কামি শিরাজির ওয়াকি উজ জামান -ফতেহ নামা ই নূর জাহান বেগমের একশো একান্ন পাতায় জাহাঙ্গীরের উচ্চারণ লিপিবদ্ধ আছে।

----- এর মানে কী ?

----- শুনবে ?

----- শুনব।

----- সুপ্রিয়া গান্ধীর ইংরিজি অনুবাদের বাংলায় ,'শাসক হলেম তুমি -আমি দুজনায়।‘

হয়ত দুরন্ত ঘোড়ার পিঠে পাশাপাশি ছুটে যেতে যেতে নূর জাহান বেগমের ছোঁড়া তীরে ঘায়েল হওয়া হরিণের দিক থেকে মুখ ফিরিয়েই এই মন ফেরানো উচ্চারণ , কিছুবা হয়ত রোমান্সও। কিন্তু ওই লাইনগুলো বড্ড বেশিদিন অকারণে একটু আড়ালেই রয়ে গেছে ,সহ শাসকের প্রশ্রয় প্রেমিকাকে দেওয়ার উদাহরণ ইতিহাসে কটা আছে এ নিয়ে তুমুল বাওয়ালের প্রত্যাশা কি নেহাতই অধরা থেকে যাবে? এ সংশয়ের মুহূর্তে আবারো উচ্চারিত হচ্ছে ,' কিহ হাস্তি তু শারিক -ই মান বা শাহী ' আর তা ইতিহাসে উশৃঙ্খল ,মাতাল , খামখেয়ালি প্রেমিক বলে পরিচিত জাহাঙ্গীর আর সমুন্নত নূর জাহানেরই অনন্য এক যৌথ উচ্চারণ এতে আর সংশয় থাকছে না।

----------
অতিরিক্ত তথ্যসূত্র : Kami Shirazi Waqui uz zaman( Fatah nama –I Nur Jahan Begum ): A Contemporary Account of Jahangir ed. Transiated W.H.Sddiqui (Rampur : Rampur Raza Library 2003)



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ