২০২৪-র বারোই নভেম্বর, আমাদের অগ্রজ মনোজ মিত্রর মহাপ্রয়াণ ঘটে গেছে। ৮৫ পেরিয়ে ৮৬-তে পা দিতেন, এই বাইশে ডিসেম্বর। সেই ১৯৫৯-এর মৃত্যুর চোখে জল নাটকের বৃদ্ধ বঙ্কিম ( তখন তিনি ২১) এত বছর ধরে বঙ্কিম, ্মাতলা, গজমাধব, বাঞ্ছারাম বেঁচে থাকার নানা কৃতকৌশলে বেঁচে ছিল। আর পারল না তারা। মনোজ মিত্রর নাটকে জীবনের সত্য আর মঞ্চের মায়াজাল মিলে মিশে গেছে। বাঞ্ছারাম বৃদ্ধ হয়েছিলেন কিনা জানি না, দশ বছর আগে ২০১৪-র ষোলই আগস্ট, তখন তিনি ৭৫ পার, একাডেমি মঞ্চে সাজানো বাগান নাটক হলো, বাঞ্ছারাম আবার মঞ্চে এল, বুড়ো বাঞ্ছা ধীরে ধীরে সিধে হয়ে উঠেও দাঁড়াল। ১৯৭৭-এ যে নাটকের শুরু, এখনো সেই বাঞ্ছারাম মঞ্চে স্বমহিমায় বিরাজ করছেন। অন্য অভিনেতারা বাঞ্ছা কাপালি হয়ে উঠছে। কিন্তু মনোজ মিত্রর মঞ্চ তাঁরই রয়ে যাবে। সে অভিনয় যে দেখেছে, সে আর অন্য কারো অভিনয়দেখতে চাইবে না। বাঞ্ছারাম একজনই। তিনিই এর স্রষ্টা। সাজানো বাগান নাটক চিরায়ত মর্যাদা পেয়ে গেছে।
এখন ১২ই ডিসেম্বর, ১২ই জানুয়ারি পার হয়ে দুমাস কেটে গেল, বিশ্বাসই হয় না তিনি নেই। গোটা একটা মানুষ নিঃশেষ হয়ে গেল। যাক। যা সত্য মেনে নিতে হবে। গত কয়েকমাস ঝড় গেল। আমাদের আর এক ভাই উদয়ন মারা গেলেন, গত তিরিশে আগস্ট, ২০২৪। ভাইদের ভিতরে বন্ধন ছিল অটুট। ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ছিল অপরিসীম। উদয়ন(বাবলু) এর মৃত্যুর খবর তিনি জানেননি। না জেনেই চলে গেলেন। এক বাড়িতেই অবিবাহিত উদয়ন আর তিনি থাকতেন। উদয়ন লেখাপড়া নিয়েই বেঁচে ছিল। এখন আমি একা। আমি এখন বড়দার নাটকগুলি নতুন করে পড়ছি। রক্তস্নাত কুরুক্ষেত্র , অশ্বত্থামা নাটকের কথাটি বলি। একজন লেখক, নাটককার ব্যক্তির নন, সমষ্টীর। তাঁর নাটক পাঠেই তাঁকে আমার শ্রদ্ধা নিবেদন। অশ্বত্থামা কাব্য নাটক নয়, কিন্তু কাব্য সুষমায় ভরা। সংলাপ উদ্ধৃত করি।
অশ্বত্থামা: ( গভীর ক্লান্তিতে ) মহারাজ, এই চৈত্র নিশীথ, আমার মর্মে মর্মে কী হাহ ছড়ায়! কী ঘোর চতুর্দশী নিশি...প্রবল বায়ু মহারাজ, আমাকে উদ্ধার করো্্আমি বড় একা (থেমে ) একটা পাহাড়, কয়েকটি নদী, শুষ্ক প্রান্তর...কী দুর্গম অন্তহীন পথ অতিক্রম করে এসেছি...দু’চোখে তপ্ত বালুকা...দাও মহারাজ আলিঙ্গন দাও… মহারাজ, তুমি আমাকে ঘিরে থাকো। দূর করো যতো লজ্জা সংশয় ভয়...শক্তি দাও ! ( পেটিকা উন্মোচনে অগ্রসর হয় ) কে, কে বলে রে হত্যা...কে বলে রে গুপ্ত ঘাতক আমি...নীতিহীন অবিবেচক ? ওরে মূর্খ, মানুষেরই দেখিস নীতি নেই...দেখিস না এই ধরণীর গাছে একটি পাতা নেই...তড়াগে নেই জলকণা ! কাতারে কাতারে মৃতদেহ শ্মশান শকুনি ! এমন রিক্ত নিঃস্ব বিধবা ধরিত্রী! ওরে কোথা হতে আসে নীতি...কোথায় বাস করে পুণ্য ! (থেমে) মহারাজ, বলো মহারাজ, এই শেষ রক্ত! বলো মহারাজ, আর হিংসা নয়, আর ধ্বংস নয়-সৃজন ! এই মুহূর্তে একটা বৃহৎ সৃজনের বাসনা আমায় অস্থির করে তুলেছে! বলো মহারাজ, এই ধরিত্রীর তৃণমূলে জল দেব, তাকে লালন করব ! অনাবৃত ধরণীর উলঙ্গ রূপ ঢেকে দেব পল্লবিত বিকাশে…
অস্বত্থামা নাটকে পঞ্চ পাণ্ডব ভ্রমে পাণ্ডবের পঞ্চ শিশু পুত্রকে হত্যা করে তাদের মুণ্ড একটি পেটিকায় ভরে অশ্বথহামা ফিরেছিল দ্বৈপায়ন হ্রদের কূলে দুর্যোধনের কাছে। এই নাটক ততো অভিনীত হয়নি, কিন্তু পাঠের জন্য এর কোনো তুলনা নেই। সংলাপ এমন সৌন্দর্যমণ্ডিত, যে মনে হয় কাব্য পাঠ করছি। আর স্তম্ভিত হই যখন টের পাই অগণিত হত্যা, রক্তপাত, মৃত্যুর বিপক্ষে তাঁর বলার কথা এইভাবে বলছেন। তখন , সেই গত শতাব্দীর ছয়ের দশকের শেষ দিক এবং সাতের দশকের অনেকটাই, আমাদের সেই যৌবনকালে এই দেশ ভ্রাতৃহত্যায়, হানাহানিতে ক্রুক্ষেত্র হয়ে গিয়েছিল সত্য।
মনোজ মিত্রের নাটক সাহিত্য পাঠের স্বাদ দেয়। তাঁর সংলাপে যেমন, বহুমাত্রিকতা, যেমন নাট্যগুণ তেমনি সাহিত্যের গুণ। রসবোধ অসামান্য। ঘরানাটি চার্লি চ্যাপলিনের। তুচ্ছ, অতি তুচ্ছ মানুষের জীবন নিয়ে ব্যঙ্গ বিদ্রূপের ভিতর লুকিয়ে থাকে চোখের জল। অনেক উদাহরণ দেওয়া যায়। পূর্ণাঙ্গ পরবাস নাটক সবচেয়ে বড় উদাহরণ। আবার একাঙ্ক টাপুর টুপুর, গাঁ থেকে কলকাতায় এসে এক রেস্টুরেন্টে ধোকা অর্বাচীন দম্পতি! ভুলতে পারি না। অনন্য একটি ছোটগল্প এই একাঙ্ক, শুধু সংলাপে লেখা। তাঁর নাটকের নাট্য কাহিনির গভীরতা, নাট্য কাহিনিতে জীবনের অতল তল ছুঁয়ে যাওয়া, এসব আমাদের নাট্য সাহিত্যকে দিয়েছে এক বিরল মাত্রা। মঞ্চ ব্যতীত নাটক পাঠ তো উঠে গিয়েছিল। অথচ আমি নিজেই তো ডাকঘর, বিসর্জন, রক্তকরবী ঘুরে ঘুরে পড়ি। পড়ি চাঁদ বনিকের পালা। আবার যা নেই ভারতে বা চাকভাঙা মধু, সাজানো বাগান, অশ্বত্থামা, অলকানন্দার পুত্রকন্যাও। একাঙ্ক নাটকগুলি তো এক এক বিন্দু সোনার বিন্দু। অসামান্য ছোটগল্পের স্বাদ’ টাপুর টুপুর’, ‘প্রভাত ফিরে এস’ ইত্যাদি নাটকে। মনোজ মিত্রের নাটকে সাহিত্যের সেই আস্বাদ পাওয়া যায়। অশ্বত্থামা নাটক পাঠ একটি কাব্য পাঠের অভিজ্ঞতা দেয়। তেমন অভিনয় না হয়েও এই নাটক উচ্চারিত হয় এর সাহিত্যগুনে। এবং অবশ্যই রক্তপাত, হত্যার বিপক্ষে থাকার ক্রমাগত উচ্চারণে। ১৯৭১-৭২ এ রচিত এই নাটকে সেই সময় রয়েছে রূপকে। ৫০ বছর বাদে পড়তে বসেও দেখছি, সেই রক্তপাত হিংসার বিপক্ষে এই উচ্চারণ যেন সমসাময়িক। এইভাবে সাহিত্য ক্লাসিক হয়। এই নাটক বিরল কাব্য সুষমায় পরিপূর্ণ। দুই পর্বের এই নাটকের প্রথম পর্ব “গোধূলি পর্ব”। সেই পর্বে অশ্বত্থামা সেই দ্বৈপায়ন হ্রদের তীরে অভিষিক্ত হন কৌরবের সেনাপতি রূপে। দ্বিতীয় পর্বে অশ্বত্থামা যায় নিদ্রিত পাণ্ডব শিবিরে পঞ্চ পাণ্ডবকে হত্যা করতে। পাঁচটি শিশুকে হত্যা করে অন্ধকারে। পাঁচটি মুণ্ডর পেটিকা নিয়ে দ্বৈপায়ন হ্রদের তীরে ফেরে। অশ্বত্থামার হাহাকার যবনিকা নামে। অশ্বত্থামার মহত্ব কিসে, হত্যার রাজনীতি, রক্তপাতের বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে এই নাটক। প্রতিটি সংলাপ অন্তরে বিদ্ধ করে। এই প্রসঙ্গে আবার ফিরে আসছি।
২১ বছর বয়সে, বঙ্কিম, ৩৭-এ গজমাধব( পরবাস ) ৩৯ এ বাঞ্ছারাম ( সাজানো বাগান ) এই তিন বৃদ্ধ আমাদের মঞ্চে মিথ হয়ে গেছে অনেকটা। এখানে তিনিই অভিনেতা। তিনিই নাটককার। আবার ১৯৭২-র নাটক ‘চাকভাঙা মধু’ ( প্রযোজনা ঃ থিয়েটার ওয়ার্কশপ )-র জটা, মাতলা বা আরো পরের নাটক রাজদর্শন( প্রযোজনাঃ বহুরূপী ) বা অন্য অনেক নাটকে বৃদ্ধ এক চরিত্র নিয়েই নাটক হয়ে ওঠে জীবনের এক অনুপম ভাষ্য। মনোজ মিত্রর নাটকে বৃদ্ধ হলেন বহুদর্শী। জীবনকে দেখেছেন তিনি বহুবছর ধরে। সেই দেখাই যেন তাঁর নাটকের দর্শন। এক জীবনে মানুষের যত বয়স বেড়েছে, বার্ধক্যের দিকে মানুষ যত এগিয়েছে, ত্রিকালদর্শী সেই চরিত্র হয়ে উঠেছে বার্ধক্যের কারণেই অনেকটা নিরূপায়। এই নিরূপায়তার গল্পই বলেছেন তিনি তাঁর নাটকে। মৃত্যুর চোখে জল-এর বঙ্কিম বা ‘পরবাস’ নাটকের গজমাধবকে মনে তো পড়বে। গজমাধব আমাদের নাট্য সাহিত্যে এক অদৃষ্ট-পূর্ব চরিত্র। কিন্তু যে বঙ্কিম একান্ত নিরূপায়, নিজের ওষুধের শিশি বোতল নিয়ে কোনোক্রমে বেঁচে থাকতে চায় যে, সেই বৃদ্ধই চাকভাঙা মধুতে এসে ( জটা ) বেঁচে থাকাকে একটু সহনীয় করে তুলতে নানা কৃতকৌশল অবলম্বন করে। শোধ নিতে চায় অঘোর ঘোষের মৃত্যু ঘটিয়ে দিয়ে। জোতদার অঘোর ঘোষ এসেছিল সাপের কামড় খেয়ে সেই তল্লাটের বড় সাপের ওঝা মাতলার কুটিরে। নিয়ে এসেছিল তার পুত্র। মাতলার বুড়ো কাকা জটা শোধ নিতে চায়। অঘোর তাদের সব নিয়েছে। এবার যেন ফেরত নেবে। আসলে শ্রেণী চরিত্রের তফাতে জটা আর বঙ্কিম আলাদা হয়ে যায়। কিন্তু বেঁচে থাকার অদম্য বাসনা তাদের একই রকম। চাকভাঙা মধু এখন ইতিহাস। বাংলা মঞ্চ অমন প্রযোজনা আগে দ্যাখে নি। অমন নাটকও নয়। আমাদের নাটকের ছকটাই ভেঙে গিয়েছিল চাকভাঙা মধুতে। জটা মাতলা আর মাতলার গর্ভবতী মেয়ে বাদামী, এই তিনজনের শেষ দুজন চায় অঘোর বাঁচুক। জটা তার দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছিল আহত বিষধর কে বাঁচিয়ে রাখা মানে নিজেদের মরণ ডেকে আনা। এই দ্বন্দ্ব, বাঁচাব না মারব, নিয়েই নাটক। থিয়েটার ওয়ার্কশপের সেই প্রযোজনা ( নির্দেশনা ঃ বিভাস চক্রবর্তী ), আর বিভাস চক্রবর্তী, অশোক মুখোপাধ্যায়, মানিক রায় চৌধুরী ও মায়া ঘোষের অভিনয় এখনো আমার স্মৃতিতে অমলিন। বৃদ্ধ বঙ্কিম বাঁচত শিশি বোতল নিয়ে, জটার বাঁচা আর মরা যখন একাকার তখন সে শোধ নিয়ে বাঁচতে চায়। সে হল সুন্দরবনের হতভাগ্য ভূমিহীন, না খেতে পেয়ে চারপেয়ে হয়ে যাওয়া মানুষ। ফলে সে আর বঙ্কিম তো আলাদা হবেই। এরপর ১৯৭৫-এর নাটক পরবাস, সেখানে উচ্ছেদ হওয়া ভাড়াটে গজমাধব নানা কৃত-কৌশলে থেকে যেতে চায় তার বহুকালের পুরোন আশ্রয়ে। এ নাটক তাই হয়ে ওঠে অসামান্য ব্যঞ্জনাময়। গজমাধবই যেন বাঞ্ছারাম হয়ে ওঠে সাজানো বাগানে। তার আগে বা পিছে লেখা কেনারাম বেচারাম হয়ে সাজানো বাগান। সাজানো বাগানের পর রাজদর্শন, কিনু কাহারের থেটার...কত নাটক। বেঁচে থাকার কৌশল আর অদম্য স্পৃহাই হয়ে ওঠে সমস্ত নাটকের মূলমন্ত্র। বেঁচে থাকার কথাই নানা ভাবে ঘুরে আসে। আর সেই বেঁচে থাকা এক ত্রিকালজ্ঞ বৃদ্ধের। তার বেঁচে থাকা শেষ অবধি যেন মানব সভ্যতার বেঁচে থাকা হয়ে ওঠে। সাজানো বাগান যেন সেই কথাই বলেছে শেষ পযর্ন্ত। বৃদ্ধের বেঁচে থাকা আর একটি শিশুর জন্ম সমার্থক হয়ে ওঠে। মনোজ মিত্রর নাটকে মানুষের আশ্রয়হীনতার আতঙ্ক ঘুরে ঘুরে এসেছে। রূপক হয়ে এসেছে। আজ সমস্ত পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে দেখুন, ভিটে মাটি ছেড়ে দেশান্তর যাত্রাই যেন মানুষের ভবিতব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশান্তরের ভয়ে মানুষ আত্মহত্যাও করছে। এই কথাই তিনি সারাজীবন বলতে চেয়েছেন গজমাধব, কেনারাম, বাঞ্ছারামের চরিত্রের ভিতর দিয়ে। ভারতবর্ষের ভেঙে তিনটি দেশ এখন। ভারত পাকিস্তান আর বাংলাদেশ। পশ্চিমবঙ্গ মানুষের ভারে নুয়ে আছে। এই মানুষের অনেকটাই পূর্ব বঙ্গ থেকে শিকড় ছিন্ন করে এদেশে আসা মানুষ। উদ্বাস্তু জীবন, শিকড় ছিন্ন হয়ে যাওয়া অগণিত মানুষের একজন হয়ে তিনি তাঁদের কথাই যেন লিখছেন। সুতরাং স্বাধীনতার ৭৭ বছর পার হয়েছে। দেশভাগেরও ৭৭ বছর। বাঙালির শিকড় হারানোরও ৭৭ বছর। মনোজ মিত্র সারাজীবন ধরে সেই কথাই লিখেছেন তাঁর নাটকে। আমার মনে আছে ‘কেনারাম বেচারাম’ নাটকের নগেন পাঁজার কথা। এই নাটক রঙমহল থিয়েটারে ( অধুনা লুপ্ত, শপিং মলে পরিবর্তিত ) জহর রায়ের পরিচালনায় বাবা বদল নামে অভিনীত হয়েছিল অনেকদিন। ১৯৭০ নাগাদ হবে। নগেন পাঁজার ভূমিকায় ছিলেন জহর রায়। নগেন এক অদ্ভুত মানুষ। হারিয়ে যাওয়া মানুষকে উদ্ধার করে স্বস্থানে ফিরিয়ে দেয়, কিংবা ফিট করে দেয়। সেই নাটক আরো সংশোধিত হয়ে কেনারাম বেচারাম। এই নাটকের নগেন পাঁজাও এক ঘর ছাড়া মানুষ, তার ঘর ফিরিয়ে দেবে কে ? নগেন পাঁজা কি এমনি একটি মানুষ, কাজটুকুই তার পরিচয় ? তাকে তার শিকড়ে ফিরিয়ে দিতে কেউ নেই। দেশভাগ বহু পরিবারকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছিল। নগেন পাঁজার তেমন কোনো ইতিহাস ছিল কি না নাটকে বলা না থাকলেও, এই নাটক শেষ অবধি সেই বেদনারই আর এক রূপ। ঐ সময়ে একটি নাটক লিখেছিলেন তিনি, ‘কোথায় যাব’। সেই নাটক পরে হয়ে ওঠে ‘পরবাস’। ‘পরবাস’ নাটকের গজমাধব যাবে কোথায় ? সেও তো শিকড়চ্ছিন্ন এক মানুষ। পরিণত বয়সে নানা কৌশল করে তার আশ্রয়টুকু বাঁচিয়ে রাখতে চায়। এই আশ্রয় আর শিকড় হারানোর বিপক্ষেই দাঁড়ায় বাঞ্ছারাম সাজানো বাগান নাটকে। পার্টিশন নিয়ে ভারতীয় সাহিত্যে অনেক লেখা হয়েছে। পশ্চিম সীমান্তের ক্রন্দন সাদাত হোসেন মান্টো, ভীষ্ম সাহনি, রাজিন্দর সিং বেদী প্রমুখ লেখকের লেখায় পড়েছি আমরা। পুবের পার্টিশন অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রফুল্ল রায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাসে পড়েছি। মনোজ মিত্রর নাটকগুলি পার্টিশন সাহিত্য হিশেবেই গণ্য হতে পারে। কিন্তু তা বুঝতে রূপকটিকে সন্ধান করতে হবে আনুপূর্বিক পঠনের ভিতর দিয়ে। তিনি উচ্ছিন্ন মানুষের কথাই উচ্চারণ করেছেন সমস্ত জীবন ধরে। আর তা এতই শিল্পীত, এতই অন্তর্ভেদী যে বেদনাটি ছেয়েই থাকে পাঠের পর। আর যদি নিরূপায় মানুষের কথা বলি, সেই মানুষই তাঁর নাটকের বিষয়। অশ্বত্থামার হাহাকারে অশ্বত্থামা নাটকের যবনিকা নামে। অশ্বত্থামায় আবার ফিরি। তার কাব্য সুষমার কথা বলি।
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শেষের দিকে। উরুভঙ্গ হয়ে দুর্যোধন দ্বৈপায়ন হ্রদে আশ্রয় নিয়েছে। অশ্বত্থামা যুদ্ধ বিরতির রাতের অন্ধকারে যাবে পঞ্চ পাণ্ডবকে হত্যা করতে। কৌরবের পরাজয় নিশ্চিত হয়ে গেছে, কৃপাচার্য তাঁর পুত্র অশ্বত্থামার মুখোমুখি, আছেন ভোজরাজ কৃতবর্মা।
কৃপাচার্য: অশ্বত্থামা, আমি বুঝতে পারিনি, শোক রজনীর সংবাদ এদের কাছে এতো লোভনীয় হবে।
কৃতবরমা: অশ্বত্থামা...একটি রাত্রি...জীবনে একবার আসছে।
কৃপাচার্য: চলে এসো অশ্বত্থামা।
অশ্বত্থামা:..বেলা ডুবে যায়, গোধুলী হারায়...
কৃতবর্মা: হ্যাঁ হ্যাঁ, এগিয়ে আসে সে রাত্রি, পরম রাত্রি!
কৃপা: হ্যাঁ হ্যাঁ বিকট হাঁ করে নেমে আসে এক কৃষ্ণকায় দানব...
অশ্ব: আঁধার ঘনায় শিলায় শিলায়…
কৃতবর্মা: আঁধার...আঁধার নামছে! প্রশস্ত লগ্ন…
অশ্ব: শৈলচূড়ে গুল্মলতায়
কৃত: আঁধার ঘনায় পেঁচার চোখে…
অশ্ব: রাত্রি নামে নদীর কূলে… বৃক্ষশাখায়...চরাচরে…
এমন আশ্চর্য সংলাপ বাংলা নাটকে বিরল। অশ্বত্থামা অভিনয় হয়েছিল ১৯৭৪ সাল নাগাদ। কয়েক রজনী অভিনয় হয়েছিল। তারপর কেন হয়নি জানি না। দর্শক নেয়নি এই নাটক। বিভাস চক্রবর্তী সম্প্রতি স্মরণ সভায় বললেন। তখন বাঙলা ছিল ভ্রাতৃঘাতী হানাহানিতে রক্তস্নাত। সেই কথাই রূপকে এসেছিল। স্মৃতি বলে সেই প্রযোজনা ছিল সার্থক, অশোক মুখোপাধ্যায়, মনোজ মিত্র এবং সুদীপ্ত বসু ছিলেন অভিনয়ে। স্বদেশে এবং বিদেশে এই নাটকের পাঠ হয়েছে কম না। প্রথম পাঠ রবীন্দ্রসদনে। অশ্বত্থামা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। আর ছিলেন অশোক মুখোপাধ্যায় এবং মনোজ মিত্র স্বয়ং। এই নাটক পাঠ শোনাও ছিল বিরল অভিজ্ঞতা। কয়েক বছর আগে কৌশিক সেন অশ্বত্থামা প্রযোজনা করেন। দেখা হয়নি। তারপর তো মহামারী এসে গেল।
কত বিষয় নিয়েই না আমরা তর্জায় মাতি। সমাজে বুদ্ধিজীবীর ভূমিকা। রাষ্ট্র কীভাবে বুদ্ধিজীবীর সমগ্র গ্রাস করে, কৃপাচার্যর একটি সংলাপ স্মরণ করি ঃ
“ আমি যে একজন অন্নদাস শাস্ত্রজীবী। ...কোনোদিন নিঃসংশয়ে প্রতিবাদ করতে পারিনি। নীরবে গুমরে গুমরে যা বলে করে যাই। (অল্পক্ষণ থেমে থাকে ) তখন ভরা শ্রাবণের ঝরঝর বর্ষণ চলেছে! সারাটা বেলা এক মুঠো খুদ আর একটু পিটুলিগোলা ছাড়া কিছু জোটেনি! তোমার মা তাই তোমাদের ভাইবোনদের ভাগ করে দিচ্ছেন। আমি স্থির থাকতে পারলাম না...তোমার বাবাকে নিয়ে এলাম হস্তিনায়… তখন ভেবেছিলাম, মহাপরোপকারী রাজা বুঝি বা দীন দরিদ্রের বন্ধু,--বুঝি সে চায় ভারতে শাস্ত্রবিধি চর্চা হয়, জ্ঞান গরিমার বিকাশ ঘটে...দু’হাত বাড়িয়ে তাই আমাদের ব্রাহ্মণ পরিবারটিকে কাছে টেনে নিল! মূর্খ ছিলাম ! বুঝিনি রাজার উদ্দেশ্য কখনো এমন জলের মতো স্বচ্ছ নয়। বুঝিনি রাজা ধীরে ধীরে তার শক্তি সংগঠিত করছে। সব দিয়ে সর্বস্ব কিনে নিচ্ছে। বুঝিনি একদিন তোমাকে আমাকে তোমার পিতাকে হাতে অস্ত্র নিয়ে তার হয়ে লড়তে হবে।”
অশ্বত্থামা: দুর্যোধনের অন্ন...সে কি তবে নিঃশর্ত নয় !
কৃপাচার্য: রাজার অন্ন, হা পুত্র, এতো গুরুপাক...তার ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া আর বিষক্রিয়ায় চিরদিন স্তব্ধ হয়ে আছি! লজ্জায়, ঘৃণায়...কতোবার ভেবেছি, এই বাঁধন ছিঁড়ে বেরিয়ে আসি...।
পাতার পর পাতা উদ্ধৃত করা যায়। নাটক, গল্প , উপন্যাস তো কাহিনি কথন নয়। তা সমাজজীবন, ব্যক্তিজীবন আর রাষ্ট্রের সম্পর্ক নিরূপন করে। অশ্বত্থামা সময়কে ধারণ করলেও এখনো সর্বাংশে সত্য, এই পঞ্চাশ বছর বাদেও। রাষ্ট্রের দাঁত নখ সারা পৃথিবীতেই ক্রমশ তীক্ষ্ণ হয়েছে।
অশ্বত্থামা যেন বিসর্জন নাটকের উত্তরসুরী। হত্যা। রক্তপাত আগ্রাসনের বিপক্ষে এই নাটক। হাহাকারের নাটক। সেই সময়, গত শতকের ৭০ দশক ছিল অসংখ্য সন্তানের রক্তে স্নাত। কত সন্তান হারা মায়ের কান্না আমরা শুনেছি। কত মা তাঁর সন্তান হারিয়েছিলেন, রাজনীতির করাল্গ্রাসে পড়ে পুত্রকন্যারা উধাও হয়ে গিয়েছিল। রাষ্ট্রীয় হিংসায় মরেছিল কত। মহাভারতের এই অংশটি পঞ্চপাণ্ডবের পাঁচটি শিশুর হত্যা নিয়ে। মায়েদের ক্রন্দন কুরুক্ষেত্রের প্রান্তরে ছড়িয়ে যেতে থাকে। সাহিত্য তো সময়কে ধারণ করে গোপনে। সেই ধারণ এই নাটকের মতো আর কোথাও হয়নি। মনে পড়ে যায় অসীম রায়ের অসংলগ্ন কাব্য উপন্যাসের কথা। মনে পড়ে যায় লাতিন আমেরিকার গল্প উপন্যাসের কথা। অশ্বত্থামা নাটকে অশ্বত্থামা শেষ অবধি নিরূপায় এক হত্যাকারী। হত্যা তার নিয়তি। শেষ কয়েক সংলাপে তার হাহাকার তুলনাহীন।
মহাভারত এবং রামায়ণ তাঁর নাটকের বিষয় হয়েছে বারবার। ‘যা নেই ভারতে’ নাটকের কথা ভাবি। সেই নাটকে মহাভারতের প্রচলিত পাঠ তিনি ভেঙে দিয়েছেন। পাণ্ডবরা বহিরাগত। আর শতপুত্রের জননী গান্ধারী, তাঁর পুত্ররা সব জঙ্গলে এক আদিবাসী রমণী ( পিশাচিনী ) পালিত, রাজপ্রাসাদের অবাঞ্ছিত সন্তান। প্রচলিত পাপ। এই নাটক ভারতীয় নাট্য সাহিত্যে অনন্য। পাঠেও যেমন মুগ্ধকর, সুন্দরমের প্রযোজনাও তেমন মুগ্ধকর। অন্য একটি নাটক ভেলায় ভাসে সীতা। এই নাটকে সীতাকে ভেলায় ভাসিয়ে লঙ্কাপুরীর দিকেই ঠেলে দেন রামচন্দ্র। তাঁর সন্দেহ থেকে জন্ম এই ঘটনার। অপূর্ব এক প্রযোজনা দেখেছিলাম রবীন্দ্রভারতী রিপারটরি থিয়েটারের। নির্দেশনা ছিল ত্রুণ প্রধান মহাশয়ের। মিথ ভাঙা, প্রচলিত পাঠের বিপরীতে গিয়ে অন্তর্নিহিত সত্যকে উদ্ধার করা, এই হলো তাঁর নাটক। তা তিনি করেছেন সময়কে চিহ্নিত করার জন্য। মিথ, পুরান, ইতিহাস যা-ই সাহিত্যের বিষয় হোক, তার ভিতরে সময় আত্মগোপন করে থাকে। তা নিবিষ্ট পাঠক, দর্শক আত্মস্থ করেন। পৌরাণিক দেবতারা আছেন তাঁর নাটকে। শিবের অসাধ্যি থেকে ‘নরক গুলজার’ নাটকে তা আমরা দেখতে পাই। নরক গুলজার নাটকের চরিত্ররা হলেন দেবতারা, ব্রহ্মা, চিত্রগুপ্ত, মহেশ্বর, নারদ ইত্যাদি। এই নাটক ছিল জরুরি অবস্থার বিপক্ষে। একটা কথা স্মরণ করতে হবে ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থার সময়, যখন আইন করে মানুষের মুখ বন্ধের ব্যবস্থা হয়েছিল এই দেশে, নেমে এসেছিল প্রবল নিষেধাজ্ঞা, তিনিই লিখেছিলেন নরক গুলজার নাটকের সেই মিথ হয়ে যাওয়া গানঃ ,
‘ কেউ কথা বলো না, কেউ শব্দ করো না, ভগবান নিদ্রা গিয়েছেন, গোলযোগ সইতে পারেন না…’। এই গানের সুর দিয়েছিলেন দেবাশিস দাশগুপ্ত। সমস্ত রকম সেনসরশিপের বিপক্ষেই সেই গান। তিনি সরাসরি রাজনীতি করেননি কোনোদিন। ক্ষমতার কাছে মাথা নামিয়ে দাঁড়াননি, ক্ষমতার বিপক্ষেই কথা বলেছেন নাটকে। তা রূপকাশ্রয়ী হয়ে এসেছে সব নাটকেই। নরক গুলজারের সেই গান এখনো সত্য। এই গান ক্ষমতার বিপক্ষে সব সময়ই সত্য।
তাঁর একাঙ্ক নাটক এক একটি গল্পের মতো। মৃত্যুর চোখে জল, টাপুরটুপুর, পাখি, প্রভাত ফিরে এস, আঁখিপল্লব, কাকচরিত্র, কোথায় যাব ( পরে এই একাঙ্ক পরিবর্ধিত হয়ে পূর্ণাঙ্গ নাটক ‘পরবাস’ হয় ), এমনি অনেক একাঙ্কর কথা বলা যায়।
আমি এই লেখাটিতে মঞ্চের কথাই বললাম। চলচ্চিত্রাভিনয়ের কথা বলছি না। তপন সিংহই তাঁকে সিনেমায় নিয়ে আসেন বাঞ্ছারামের বাগান ছবিতে। তারপর তপন সিংহর অনেক ছবিতে অভিনয় করেছেন। আদালত ও একটি মেয়ে, হুইল চেয়ার, বৈদূর্য রহস্য…, সব স্মৃতিতে নেই। সত্যজিৎ রায়ের ঘরে বাইরে, গণশত্রু ছবিতে অভিনয় করেছিলেন তিনি। আরো আছে। গবেষকরা বলবেন। তবে নাটক সাজানো বাগান এবং সিনেমা বাঞ্ছারামের বাগান দুই আদৃত। সাজানো বাগান বাংলা নাটকে একটি মাইল ফলক। এতদিনে বাঞ্ছারাম বৃদ্ধ হয়েছে। সিনেমাটি রয়ে গেল। কিন্তু বাংলা থিয়েটার থিয়েটার ঐ অভিনয় থেকে বঞ্চিত হবে।
তাঁর গদ্য ভাষা অনুপম। যদি ‘গল্পনা’ এবং ‘ভাসিয়ে দিয়েছি কপোতাক্ষ জলে’ এই দুটি বই পাঠক পড়েন, টের পাবেন কী অনিন্দ্য সুন্দর গদ্য শৈলীতে তা লেখা। আর জীবনের কত গভীরে তিনি যেতে পারেন। এই দুটি বইয়ে আমাদের বাবা, মা, আমাদের ঠাকুমা ঠাকুরদা, আমাদের সাতক্ষীরে, ধূলিহর, বেতনা, কপোতাক্ষ দুই নদীর কথা আছে। আছে টাঙ্গাইল, কালিহাতি,যমুনা নদীর কথা। আছে উত্তরবঙ্গের লালমনিরহাটের কথা। তা যেন আছে ছবি হয়ে। নানা রঙে আঁকা রয়েছে তা। একটু উদ্ধৃত করিঃ
আমাদের গ্রাম আমাদের নদী সব ফেলে এসেছিলাম সেই দেশ ভাগের পরপর, সেই কথা তিনি স্মরণ করেছেন গল্পনা-- গ্রন্থে
‘নদীর নাম বেত্রবতী। ধুলিহরের লােকে ডাকত বেতনা। রূপে গুণে যে খুব মনকাড়া তা নয়, তবে বেত্রবতীর উৎপত্তিতে কবিচিত্তহারী কপােতাক্ষ আর দুরন্ত ভৈরব নদ। মা-বাপের নামডাকেই তার যতটুকু যা গৌরব। তবে তার সবচেয়ে বড় পরিচয়টা বুঝি, জন্মের পরপরই সে শুনেছে সাগরের ডাক। বঙ্গোপসাগরের জোয়ার-ভাটায় তাল মিলিয়ে নাচে বেতনা। জোয়ারে তার ফুলে ফুঁসে ওঠা আর ভাটায় তার হু হু করে চুপসে ফতুর হয়ে যাওয়া— নিত্য চলে ঘড়ি মেপে। ধূলিহর ছাড়িয়ে আরও বিশ-পঁচিশ মাইল দক্ষিণে সুন্দরবনে ঢুকে আর মাথা ঠিক রাখতে পারেনি যৌবনবতী বেতনা, চারদি্কে ছোটবড় নদীনালার হাতছানি। যাকেই সামনে পেয়েছে, তাকেই বুকে টেনে নিয়ে মরণ ঝাঁপটি মেরেছে উপসাগরে।
ধুলিহরের লােকবসতি থেকে মাইল দু-আড়াই দূরে বইছে নদী। দুকুলে বিস্তীর্ণ ধানবন, যতদূরে চোখ যায়। অনেক ঘুরে পৌঁছতে হয় নদীর ঘাটে। সেখানে হঠাৎ এক ঝাঁক সুপুরিগাছ। লােকে ঘাটের নাম রেখেছে সুপুরিঘাট। বিকেলবেলা জেলেরা গাছে গাছে বেঁধে ভিজে জাল টানা দিয়ে রেখে গেছে। জালঝাড়া শামুক গুগলি কুচোচিংড়ি, পুঁটি আর ট্যাপামাছ ছড়িয়ে আছে এদিক ওদিক। সারাক্ষণ একটা আঁশটে গন্ধ সেঁটে আছে বাতাসে। কাক বক চিল ওড়াউড়ি করছে গাঙের আকাশে। শুধু জেলেরা আর ওই মাঠের ধানচাষি ছাড়া এদিকে কেউ বড় একটা আসতে চাইত না, কোনদিন নৌকো চাপতেও না। আমাদের কাছে অনেক আনন্দের ছিল সাতক্ষীরায় গিয়ে স্টিমার কি নৌকো চড়ে মামাবাড়ি যাওয়া। তবে হ্যাঁ, একদিন না একদিন কিন্তু সবাইকেই আসতেই হত বেতনার সুপুরিঘাটে, ধূলিহরের শ্মশানে। ---ওই দেখা যায় মানুষ সমান উঁচু মাটির পাঁচিল তুলে ঘেরা স্বর্গ- মর্ত্যের মাঝখানের সেই স্টেশান--- গলগল করে নীল ধোঁয়া উঠছে ঘেরির মধ্যে থেকে---খোল কত্তালের সঙ্গে শােনা যাচ্ছে হরি-হরিবােল—’
‘গল্পনা’ গ্রন্থে তিনি গল্পের মতো করে ছোটবেলার কথা লিখেছেন। আর একটি বই আছে, ‘ভাসিয়ে দিয়েছি কপোতাক্ষ জলে’। সেই বই আমাদের দুই ভাইয়ের। আমি লিখেছিলাম আমাদের দেশের বাড়ি, ফিরে একবার দেখার কাহিনি। গ্রাম ধূলিহর, এখন জেলা সাতক্ষীরা। বাংলাদেশ। আর দাদা লিখেছিলেন ১৯৪৭-এর আগের পূর্ববঙ্গের ছেলেবেলার কথা। সেই ছেলেবেলা, হিন্দু-মুসলমানে একসঙ্গে থাকা, দেশ ভাগ হয়ে গেলে এপারে চলে আসা, তার হৃদয়-স্পর্শী বিবরণ আছে সেই বইয়ে। গত বছর প্রকাশিত ‘মনোজাগতিক’ গ্রন্থটি নাট্যজীবনের কথা। স্বাধীনতার পর বাঙলা নাটকের ইতিহাস নিশ্চয়। তবে তা পশ্চিম বঙ্গের। অভিজ্ঞতায় এই পশ্চিমই ছিল। দেশ যে দিখণ্ডিত। বাঙালি দ্বিখণ্ডিত। পুবের নাটক নেই। আছে বন্ধু মামুনুর রশিদের কথা, সৈয়দ সামসুল হকের কথা। হ্যাঁ এ ভাবে তা অখণ্ড বাংলার কথা।


0 মন্তব্যসমূহ