শঙ্খদীপ ভট্টাচার্য-এর গল্প : সারমেয়টি আনদালুসিয়ান



মিনিট পাঁচেক আগে দুটো মৃতদেহ দেখেছি। একটি সম্ভবত হার্ট আটাক। রাস্তার ধারে উপুড় হয়ে পড়েছিল দেহটা ক্ষয়াটে ঘাস আর কিছু নুড়িপাথরের ওপর হাত রেখে। এক দেখায় ধারদেনায় নাজেহাল তবু বেপরোয়া এক মাতালকে উলটে দিলে যেমন দেখায় তেমনই দেখাচ্ছিল। চেহারা পোশাকও মাতালের যেমন হয় আর কী। আরও খুঁটিনাটি মানে মুখ চোখ হাত নাকের গড়ন, মাতাল শব্দটা কানে বাজলেই যা কিছু চোখের সামনে যে আকারে আঙ্গিকে প্রকট হয়, তেমনই ধরে নেওয়া যায়। খয়েরি প্যান্টটা বেশ কিছু জায়গায় ছেঁড়া, অনেকটা নিচের দিকে নেমে গিয়ে শরীরের যে অংশ মানুষ ঢেকে রাখে তাকেই উদোম করেছে। মুকুন্দপুর সরকারি হাসপাতালের ব্রঠ ডেড রুমে এভাবেই পড়েছিল আটান্ন বছরে থমকে যাওয়া বেওয়ারিশ মৃতদেহটা। পাশে আরেক জন। সাধারণ চেহারার সাবঅলটার্ন একটি মেয়ে। তবে ধর্ষিতা নয়। সুইসাইড কেস। দেখে মনে হয় হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে সে মরার মতো ঘুমোচ্ছে গলায় দড়ি দেওয়ার সাড়ে সাত ঘন্টা পর। এই মেয়েই সেই মেয়ে কিনা তা সনাক্ত করতে তার দাদা এসেছে। সঙ্গে মাও। কান্নার সুরে তারতম্য থাকলেও দুজনেই স্পষ্টত কাঁদছেন। ঘরটা খুবই ছোট। মেরেকেটে দুটো বডিকে কোনওমতে রাখা যায়। কাঁদতে কাঁদতে মেয়েটির মা আচমকা বেসামাল হয়েও কোনরকমে নিজেকে সামলে নিলেন সেই মাতালের উন্মুক্ত পিঠটা খামচে ধরে। আশপাশের মানুষ তাকিয়েছে সেদিকেই। এমনকি দরজার সামনে গুটিয়ে থাকা ঘেয়ো কুকুরটা পর্যন্ত। হসপিটালের কর্মচারীরা কিন্তু নির্বিকার। মগজ আর চোখের দেখার যোগসাজশে এসব দৃশ্য তাদের ভীষণ গা সওয়া। এইরকম পরিবেশের কাছাকাছি থাকা মানুষেরা, যারা আগেও এসেছেন কিংবা আজই প্রথম, তাদের কারও মুখে হাসি নেই। মৃতদেহ দেখে তাৎক্ষণিক বেসামাল হওয়ার পর প্রিয়জনেরা তো অপেক্ষা করেন, সাত দিন, তিন মাস বা কয়েক বছর, স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে। স্বাভাবিক বলতে, তারা আবার খোলামনে হাসবেন, বাজারে গিয়ে প্রসাধন কিনবেন বিয়ের অনুষ্ঠান উপলক্ষে, বলে উঠবেন, আজ এই দিনেই তো আমার মেয়েটা..., কিন্তু ডুকরে কেঁদে উঠবেন না, বেসামাল হবেন না, যেন আর পাঁচটা কথার মতোই রোজকার সাধারণ ডায়ালগ। সময় আর মগজের যোগসাজশে এমনটা তো হয়, হয়েই থাকে, এখানে দার্শনিক এপিস্টেমোলজির কোনও হাতই নেই।

মৃতদেহের সংখ্যা বেশি হওয়ায়, আজ নয়, কাল দুটো বডিরই পোস্ট মর্টেম হবে। আজ বৃহস্পতিবার, তেইশে জুন, দুহাজার বাইশ। সময় দুপুর একটা বেজে সাতাশ মিনিট। এই দিনেই কিছুটা কাক ভোরের দিকে, তার পরিচয় তখনও বডি শব্দে রূপান্তরিত হয়নি, তখনও পর্যন্ত সে জীবিত, প্রাণোচ্ছল, মদও গিলে নেয়নি অসহ্য পরিমাণে যতটা শরীরে মিশলে মানুষ সম্ভবত মারা যায়। সে কেবেলের তারের ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া কাঠবিড়ালিকে দেখে কী যেন এক এতদিনের অনাবিষ্কৃত উপলব্ধির ছোঁয়ায় অস্ফুটে কেবল চোখের উল্লাসে বলে উঠেছিল, ওহ্। মারা টারা গেলে কেউ তার জন্য কাঁদবে না সে তা জানত। এই অনুভবের জন্য প্রয়োজনীয় মানসিক স্থিরতা সে জিনের মাধ্যমে পেয়েছে। তার বাবা ছিলেন শিক্ষক। রসায়ন পড়াতেন বড়ো যত্ন করে। সেও সামান্য লেখাপড়া শিখেছিল বটে ছোটকালে কিন্তু সেই ছোটকাল থেকে সরতে সরতে চল্লিশ বছর পর গুমুত ভরা নর্দমা পরিস্কার করার একশোদিনের কাজ সে আর করতে চায়নি। সে কেবল ভাবার চেষ্টা করেছিল, কী সেই প্রক্রিয়া, যা আড়ালে থেকে একজন শিক্ষকের ছেলেকে জঘন্য নর্দমায় নামতে বাধ্য করে, স্বাভাবিক করে তোলে আরও অনেক কিছু। ক্রমে মারা যাওয়ার দিকে অগ্রসর হওয়াটা অবশ্যাম্ভাবী হয়ে দাঁড়ায়। কেউ এগিয়ে আসে না, হাত বাড়ায় না তাকে বাঁচিয়ে তুলতে, এমনকি সে নিজেও নিজেকে অবহেলা করে। সে কেবলই ভাবে, কেন এমন হয়। আজ ভোরের দিকে এইসবের কারণ খুঁজতে আবার ব্যর্থ হয়ে সে স্পষ্ট শুনতে পেয়েছিল একান্ত নিজস্ব হাহাকার রব। প্রচন্ড যন্ত্রণায় সে ওহ্ বলে উঠেই, কাঠবিড়ালিকে দেখে সেই উচ্ছাস, ছেলেবেলার বাবার আদর, তার খুচরো আবদার আর গতরাতের মুখঝামটা সহযোগে পেটে লাথি খাওয়ার চিন্তার জাক্সটাপসিজনকে সমূলে দুরমুশ করতে জ্ঞান হারিয়ে যাওয়া অব্দি সে ঢকঢক করে গিলে নিয়েছিল সস্তার চোলাই মদ। আর ঠিক তখনই মেয়েটিও প্রস্তুত হচ্ছিল মজবুত দড়ি আর সঠিক স্থান খুঁজে পাওয়ার পরেই সুইসাইড---হ্যাঁ এই সুইসাইড তার কাছে একটা অ্যাডভেঞ্চারাস উত্তরণ। সে এই অ্যাডভেঞ্চারের ওই পারটা দেখতে চায়। সে তো সবে সাবালিকা কিন্তু তার বাবা মৃত্যুকে ভয় করতেন। তিনি জানতেন, ম্যানহোলের অন্ধকারে নামার আগে পোকামাকড়ের গতিবিধি পরখ করে নিতে হয়। সেগুলি জীবন্ত মানে গুমুত সাফ করা যায়। কিন্তু সেদিন মরা আরশোলাটাকে তার মনে হয়েছিল জীবন্ত। পেটে মদ ভরে নিলে বিষাক্ত গন্ধ নাকে তেমন আসে না। সেই মদ এবং মগজের যোগসাজশে ম্যানহোলের ভিতরের প্রায়ান্ধকারে তিনি দেখেছিলেন মৃত এবং বৃহৎ একটি আরশোলার উদ্যাম গতি। ওহ্ বলে উঠেই তিনি নেমে পড়েছিলেন। তার ঈষৎ নীলাভ বডির চারপাশে তখন কতরকম গ্যাসের নিস্পৃহ ব্যাপন। সেইসকল গ্যাসের অন্তর্বর্তী অণু পরমাণু আর তারও গভীরে ইলেক্ট্রনের ঘূর্ণন বড়ো যত্ন নিয়ে পড়ান রসায়নের শিক্ষকেরা। মেয়েটি রসায়ন বোঝে না। রবীন্দ্রনাথের নাম শোনেনি। সে জানত না, ১৯২৯ সালে আন্তোনিও গ্রামশি নামের এক মানুষ জেলের ভিতর বসে বিভোর হয়ে ভেবেছিল, সাবঅলটার্নের কথা। মেয়েটি মাটির দিকে তাকায়। তারপর তাকায় আকাশের দিকে। পেটে হাত বোলায়, ভিতরে বাড়তে থাকা ভ্রুণের বয়স এখন তিন মাস। চার ইঞ্চির ভ্রণ। হাত পা চোখ নাক গজিয়ে গিয়েছে। মেয়েটি পেটে হাত রেখে দেখতে পায় উলঙ্গ শিশু হাত পা ছোঁড়া। গ্রামে সে এমন অনেক দেখেছে। তনুশ্রীর মেয়েটাকে তো মাসখানেক আগেই কোলে নিয়ে মা মা খেলেছে। অস্ফুটে মেয়েটি বলে ওঠে, ওহ্। সুইসাইড প্রক্রিয়াটি সফলভাবে সম্পন্ন করার একপ্রকার উত্তেজনা দেখা যায় তার মধ্যে। এই উত্তেজনা, যার গাঢ় অর্থ গবেষণার বিষয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মনঃস্তাত্ত্বিক বিভাগে তা ক্রমে আরও বেশি গাঢ় হয়ে উঠেছিল ভোর শেষে সকালের দিকে।

আজ তেইশে জুন। তিয়াশার জন্মদিন। আজ ম্যাগ্রেগর ওয়াইস, দ্যোলুজ আর ফ্রয়েডের ওপর তুলনামূলক অধ্যয়নের নতুন পেপারটি সাবমিট করেছেন। চাইনিজ রেস্টুরেন্টে সপরিবারে ডিনার সেরে তিয়াশার বাবা পেটে হাত বুলিয়ে বললেন, “ওহ্, বড্ড বেশি খাওয়া হয়ে গেল। এইসব পাস্তা মাস্তা খাইয়ে তোরে আমার বারোটা বাজাচ্ছিস। কাল আর কলেজ যেতে পারব না মাইরি।“

“সেকী! কাল তোমার সেমিনার না?”

“হ্যাঁ, ম্যাগ্রেগর ওয়াইসের নতুন পেপারটা...ওহ্.. যা লিখেছেন না... ম্যাসিভ... ওটা হজম করে ফেললাম কিন্তু শালা এই খাবার আর হজম হচ্ছে না।“

তিয়াশার মামা বললেন, “আমার বন্ধুর কাছে একটা বই দেখেছিলাম বুঝলে, দাঁড়াও বলছি, ইডিপাস না কী যেন...”

“অ্যান্টি-ইডিপাস, ক্যাপিটালিজম অ্যান্ড সিজোফ্রেনিয়া?”

“ হ্যাঁ হ্যাঁ ঠিক।“

“অসাধারণ বই। পরেরটা আরও ভাল। আ থাউস্যান্ড প্লাটিউস। তোর বন্ধু পড়েছে? এসব পড়ে টড়ে নাকি?“

“ ধুস। ও মাল কিছু পড়ে টড়ে না। ওর বুকশেলফ থেকে বইটা বার করেছিলাম, বইয়ের সাথে শ খানেক আরশোলাও বেরোল। গোটা বুকশেলফ আরশোলার ডিমে গিজগিজ করছে। মানে আরও আসছে আগামীতে। ওর বইয়ের র‍্যাক হল গিয়ে আরশোলাদের তীর্থক্ষেত্র। খায় দায় আর মনের সুখে ডিম পাড়ে।“

“বন্ধু কী করে, লেখেটেখে নাকি?”

“ না না, আঁতেল মার্কা শর্ট ফিল্ম বানায়। কেউ দেখে ফেখে না। নিজেই দেখে, ও মাল নিজেই বোঝে। এইত্তো কদিন আগেই গেছিলাম ওর বাড়ি। কী একটা সিনেমা দেখালো। বাপরে বাপ। ওটা থেকে ও নাকি খুব ইনস্পায়ার্ড। আমার দৌড় বড়ো জোর ঋত্বিক ঘটক। কিন্তু ওই সিনেমাটা দেখে আমি মানে...এত ট্যান এত ট্যান খেলাম...”

“কী সিনেমা?”

“অ্যান আনদালুশিয়ান ডগ। একুশ মিনিটের শিয়ার মেন্টাল টর্চার। তুমি দেখো পারলে। তুমি তো সাইকোলজি নিয়ে কাজ করো। বিচিত্র সব সিন। একটা রেজর দিয়ে একটা মেয়ের চোখের মাঝখানটা কেটে দিল বুঝলে। তারপর কাটা একটা হাত রাস্তার মাঝে। হাতের ভিতর থেকে পোকা বেরোচ্ছে। পিয়ানোর ওপর মরা গাধা। যা নয় তাই। কোনো লিঙ্কই নেই একটা সিনের সাথে আরেকটার। বলল এসবের নাকি মানে আছে। ও তো জাতে মাতাল তালে আঁতেল। ঠিক বুঝেছে।“

“কী সিনেমা? নতুন? নেটফ্লিক্সে আছে?”

“না না। ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট। চ্যাপলিনের সিনেমার মতো। সাইলেন্ট। দাঁড়াও গুগলে দেখে বলছি কোন সালের। হ্যাঁ, নাইন্টিন টোয়েন্টি নাইন। বলছে, The classic Un Chien andalou, মানে ওই An Andalusian Dog by the director Luis Buñuel and the Surrealist artist Salvador Dalí, financed by Buñuel’s mother filled with grotesque but highly suggestive images. পারলে দেখো সিনেমাটা রাজীবদা, যদি কিছু উদ্ধার করতে পারো। গাধা, কাটা চোখ, কাটা হাত, পিয়ানো তারপর আরও আছে সব তো আবার দিদির সামনে বলা যাবে না...”

“এই বুবুন এবার থামবি তুই। যা খেলাম এবার সব বমি হয়ে যাবে তো। তিয়াশাকে ঘুম পাড়াতে হবে। কান্নাকাটি শুরু করলে তোর আদরের রাজীবদা সামলাবে কিন্তু। ওহ্ শুনছো, এই বিলটা দিতে বলো না জলদি।” তিয়াশার মা বললেন।

আজ ২৪শে জুন শুক্রবার, দু হাজার বাইশ।

রাজীব মাঝরাতে উঠে পড়ে। ঘুমের ওষুধ খাওয়ার পরেও আজকাল তার ঘুম ভেঙে যায়। তার পরিবার আছে, পরিবারে সুন্দরী স্ত্রী, রয়েছে আদুরে তিয়াশা, বেডরুমে রাজীবের পছন্দের সেগুন আসবাব, সপ্তাহান্তে ডিনার ইনভিটেসন, তার শিৎজু জাতের পরম সুন্দর নাদুসনুদুস কুকুর আছে কিন্তু ঘুম নেই। সিগারেট মুখে সে আকাশের অন্ধকারের দিকে তাকায়, চোদ্দ তলা নিচে নিওন আলোর দিকে তাকায়, কল্পনা করে, তার শরীরটা মাধ্যাকর্ষণের টানে চোদ্দ তলার ব্যাল্কনি থেকে এবড়োখেবড়ো পাথরের ওপর পড়ল। মস্তিষ্ক ফেটে যাওয়ার একটা থাড শব্দ। রাজীব চোখ বন্ধ করে। এ রকম মারাত্মক সব চিন্তা আজকাল তার মাথায় ঘোরে। কেন আসে, কোথা থেকে এইসব চিন্তা আসে সে বোঝে না। চ্যাটজিপিটিকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে জিজ্ঞেস করেও তেমন কোনও লাভ হয়নি। রাজীব কেবল বোঝে, অবচেতনে এইসব জমা হয়ে একটা স্তুপের আকার নিচ্ছে দিনেদিনে, যেভাবে আঞ্চলিক ট্র‍্যাশ ক্যানগুলো আস্তে আস্তে ভরে ওঠে যাচ্ছেতাই গারবেজে। এইসবের উৎস কী, সে তার যাবতীয় মনঃস্তাত্ত্বিক জ্ঞানের ব্যবহারে বোঝার চেষ্টা করেন। মোবাইলে মেসেজ এসেছে। অ্যান আনদালুশিয়ান ডগ সিনেমাটার ইউটিউব লিঙ্ক। বুবুন পাঠিয়েছে। নির্ঘাত হুইস্কি নিয়ে বসেছে ছেলেটা।

মৃত্যুর নেপথ্যে ঘন বিষাদ আর তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ক্রমিক সুদীর্ঘ আরও বেশি ঘন বিষাদের রেশ যেহেতু পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পোস্ট মর্টেমেও ধরা পড়ে না তাই উপসংহারে পাওয়া গেল সিভিয়ার স্ট্রোক আর শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যাওয়ার লিখিত বয়ান। বেওয়ারিশ বডিটা কাঠের আগুনেই পুড়ে ছাই হল। শ্মশানে আজ ইলেক্ট্রিক চুল্লিটা কাজ করছে না। মেয়েটিকে কবর দেওয়া হল তিনপল্লীর গোরস্তানে।

তিনমাস এক দিন বয়েসে থমকে যাওয়া ভ্রূণটির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে থাকা ছেলেটি ভেজা চোখে ভাঙাচোরা মন্দিরটার সামনে বসেছিল। তাকিয়েছিল কুকুরটার দিকে। কুকুরটার পাঁজর গোনা যায়। অপুষ্ট। বাচ্চাগুলোর অবস্থাও তাই। যেটুকু দুধ অবশিষ্ট রয়েছে তাই শুষে নিচ্ছিল প্রাণপণে। ছেলেটি সবই দেখছিল অথচ অতীত বর্তমান আর আগামীর মধ্যে কোনও যোগাযোগ তৈরি করতে পারছিল না। সে অর্থে ছেলেটি বেজায় নির্বোধ। তার ভেজা চোখে অবাক বিস্ময় থাকলেও খুব বুদ্ধির ছাপ নেই। সে জানে, তার মোবাইলে লম্বা লিস্ট কাস্টোমারের। অনেক ফাইফরমাশ খেটে এই কাজটা সে জোগাড় করেছে। মাইনে নেই, নিম্নমানের কমিশন আছে। দুদিন হল সে একটা ফোনও করেনি। কেমন একটা থিতিয়ে গিয়েছে। পৃথিবী তার কাছে এই মুহুর্তে বীভৎস গোলকধাঁধা। তা হোক কিন্তু এবার কাজে না ফিরলেই নয়। মালিক আবার সবকিছু ট্র‍্যাক করে। আজ ফোন করে অন্ততপক্ষে পাঁচজনকে অফারটা গছাতে না পারলে এই কাজটাও হাতছাড়া হবে। চোখের জল মুছে ফোন করে সে।

বুবুন এখন উপুড় হয়ে শুয়ে। বারমুডা প্যান্টটা নিচের দিকে নেমে গিয়েছে। উন্মুক্ত ফরসা পিঠে প্রেমিকার একদিনের বাসি আঁচড়ের দাগ দূর থেকেও চোখে পড়ে। সকাল শেষ হয়ে সময় এখন প্রায় দুপুরের দিকে। বুবুন ঘুম থেকে উঠতে চায় না। সে বিছানায় অনর্থক গড়াগড়ি দেয়। বালিশটাকে জড়িয়ে ধরে। মুখটাকে শিমুল তুলোর নরমে গুঁজে দেয়। তিনদিন হল ল্যাপটপ খোলেনি। কিছুই ভালো লাগছে না। কেন ভালো লাগছে না সে বুঝতে পারে না। গতকাল রাতেই তো হইহই করে আড্ডা দিল দিদির সঙ্গে, রাজীবদার সঙ্গে কত রকমের কথা। কাল তো জয়ির সঙ্গেও... কিন্তু কন্ডোম ছিল না। ঝিমঝিম হ্যাঙওভারে জয়ির পিরিয়ডের সময়টা হিসেব করে দেখল প্রেগন্যান্সির একটা সম্ভাবনা থেকেই যায়। জয়িকে ফোন করতেও প্রবল অনীহা। ফোনের আলাপে একঘেয়েমি ঠাসা। দুর্বোধ্য এক অনুভূতি খালি বিছানার দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে বুবুনকে। সে চোখ বন্ধ করে। বিছানায় মিশে যেতে চায়, কথাহীন শব্দহীন চারদেয়ালের কাঠামোতে আটকে থেকেই। আরও অনেকক্ষণ পর্যন্ত ঘুমোতে চায় মরার মতো। মোবাইলটা বেজে ওঠে। সাদা রঙের অচেনা কিছু নম্বর আইফোনের স্ক্রিনে। সে কলটা রিসিভ করে অচেনা বলেই। চমকে দেওয়ার মতো, অ্যাড্রিনালিন উত্তেজক কিছু শুনতে পেলে সে বিছানা থেকে উঠে পড়ার একটা অজুহাত পাবে।

“হ্যালো”

“স্যার আমি আরবান ডিলাইট থেকে বলছি। একটা অফার ছিল। আপনার নাম্বার লটারিতে সিলেক্টেড হয়েছে---”

ওহ্ বলে ফোনটা কেটে বালিশে মুখ ডুবিয়ে বুবুন চোখ বন্ধ করে। বিড়বিড়িয়ে বলে ওঠে, “শালা কুত্তার বাচ্চা। আনদালুসিয়ান ডগ। ”


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ