বিরহিলিও পিনিয়েরার গল্প: একটা স্বপ্নের নক্সা




অনুবাদ: উৎপল দাশগুপ্ত


স্বপ্নে আমার মনে ছিল যে আমার বন্ধুর জন্য কয়েকটা চিঠি নিয়ে যেতে হবে যেগুলো আমার ঠিকানায় ওর জন্য পাঠানো হয়েছে। সন্ধে ছ’টার মত হবে তখন। রাস্তা পেরিয়ে শহরের পুরনো দিকটায় আসতে না আসতেই আমি ওর মুখোমুখি হয়ে গেলাম। সংগীত বিদ্যালয়ে যাবার জন্য অনেকটা পথ যেতে হবে। সেখানেই যাবার জন্য রওনা দিয়েছিল। ওকে ডাকলাম আমি, কিন্তু কোনো জবাব দিল না। বেশ জোরে জোরে হাঁটছিল। ওর পেছন পেছন যেতে বেশ অসুবিধেই লাগছিল। বৃষ্টির ছাঁট লেগে দুজনেই ভিজে যাচ্ছিলাম, যেটা হওয়ারই কথা। দৌড়ে দৌড়ে যাচ্ছি আমরা দুজনেই। বলল, আগে ওকে কিছু খেয়ে নিতে হবে। কাছাকাছি একটা জায়গা ওকে দেখালাম, কিন্তু আমার দিকে না তাকিয়েই উল্টোদিকে যেতে লাগল। বেশ কষ্ট করেই ওর পেছন পেছনই যেতে লাগলাম। ওকে থামানোর জন্য বললাম যে চিঠিগুলো খুব জরুরি বলেই আমার মনে হচ্ছে। জবাবে বলল, ওর কিছুই এসে যায় না, পরে কখনো চিঠিগুলো পড়বে। তবুও জোর দিয়ে বলেই চললাম চিঠিগুলো কিন্তু খুবই জরুরি। এটা আমার একটা ছুতোই ছিল (চিঠিগুলো নয়, ওগুলো যে জরুরি সেটা বোঝানো – আসলে চিঠিগুলো একেবারেই ফালতু); আমি আসলে যে কোনো ব্যাপারে ওর মনযোগ আকর্ষণ করতে চাইছিলাম, যাতে ও আমার প্রতি কৃতজ্ঞ বোধ করে, কৃতজ্ঞ বোধ করে আমাকে যদি এক পেয়ালা কফি আর একটা রোল খাওয়ায়। আমরা বেশ অবিশ্বাস্য কয়েকটা মোড় ঘুরলাম। যেসব রাস্তা দিয়ে গেলাম, বৃষ্টির জন্য সেগুলো আর প্রায় চেনাই যাচ্ছে না। মনে হল ঘরগুলোয় ঢুকবার আগে আমরা পুরনো শহরের প্রত্যেকটা রাস্তাই ঘুরে এসেছি। দরজা হোক, কী দেওয়াল হোক কী জানলা, আমরা অনায়াসে ঢুকে গেছি। এই ভাবে আমরা বিশদ গ্যালারিওয়ালা একটা বাড়িতে ঢুকে পড়লাম। অনেকটা মেজ়ানাইনের মত গড়ন, মেঝেতে ছোট ছোট কাঠের টুকরো আলগা করে লাগানো। অনেকটা আদিম মানুষ যেভাবে নদীর দু’পাড়ে কাঠ ঝুলিয়ে সেতু বানিয়ে নেয়। খেয়াল রাখতে হবে যে গ্যালারির মাঝামাঝি জায়গায় লোহার রেলিং লাগিয়ে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। খেয়াল করলাম যে সেই রেলিং-এর উলটো দিক থেকে আমরা ঘরে ঢুকছি। আলগা কাঠের টুকরোগুলো অনেক জায়গাতেই তুলে ফেলা হয়েছে। কিংবা হয়ত ভেঙে ছোট ছোট টুকরো হয়ে গেছে। পাঁচ থেকে সাত বছরের কতগুলো বাচ্চা এখনো গ্যালারির পরের অংশে, যে সব জায়গা থেকে খুলে আসেনি, সেই জায়গায় মনের আনন্দে লাফালাফি করছে।

গ্যালারির প্রথম অংশটা যখন প্রায় অর্ধেকটা পেরিয়ে এসেছি, বন্ধুর কাছে স্বীকার করেই নিলাম যে গ্যালারিটা যেন চেনা চেনা লাগছে। আমার কথাটা ও অনায়াসে অগ্রাহ্য করল, কারণ ও তখন রেলিং-এর ডাণ্ডাগুলো আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে ফেলে দেখছে। কোথাও কোনো ছিটকিনি দেখতে পাওয়া গেল না, তাই আমরা ওটাকে খোলার চেষ্টা করলাম না, কারণ ওটা খোলাই যাবে না। আচ্ছা, গ্যালারির ওই দ্বিতীয় অংশটা আমাদের আসার প্রতীক্ষা করছে না? ছোট ছোট বাচ্চাদের দুষ্টুমির ফলে ওখানকার কাঠের আলগা টুকরোগুলোর অনেকগুলোই খারাপ হয়ে গেছে। কাঠের আলগা টুকরোর ফাটলের মধ্যে দিয়ে আমরা এক ঝলক দেখে নিলাম। বুঝলাম আমাদের নিচে হয় একটা পুকুর আর নয়ত একটা শুকিয়ে যাওয়া কুয়ো রয়েছে। মনে হল যেন অতল। (খুব অবাক হলাম না। কারণ হয় আমাদের দৃষ্টি খুবই সীমাবদ্ধ আর নয়ত নদীগুলো বেশ গভীর।) আমার বন্ধু যে পিছু হঠবার কথা মোটেই ভাবছে না, সেটা বুঝতে আমার অসুবিধেই হল না। আর আমাকে কফি আর রোল কিনে খাওয়ানোর খরচটা ওকেই দিতে হবে এটা আমি মনে মনে ঠিকই করে ফেলেছিলাম, আমি খুব মনযোগ দিয়ে ওর ওপর নজর রাখছিলাম আর কীভাবে বেরিয়ে আসা যায় সেই ব্যাপারে ওকে উৎসাহিত করতে চাইছিলাম। বরং বলতে পারি যে বেরিয়ে আসবার রাস্তাটা আমি নিজেই খুঁজছিলাম। এই গ্যালারিটার কাছেই একেবারে এরকমই আরেকটা গ্যালারি দেখতে পাওয়া যাচ্ছিল। একটাই শুধু তফাৎ। এটার কোনো মেঝেই ছিল না। অর্থাৎ ভাবটা এরকম যে এই জায়গা দিয়ে হেঁটে হেঁটে এসো, ঘোরাঘুরি কর, বা এসে আবার চলে যাও। তবে সত্যি কথাটা আসলে, আসতেও পারবে না, আবার চলেও যেতে পারবে না, বা ফাঁক ফোকর দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারবে না, বা ঘোরাঘুরিও করতে পারবে না। অল্পক্ষণের মধ্যেই বুঝে গেলাম যে স্থপতি এসব বানাতে গিয়ে কোনোরকম ভুল করেননি। বানানোর সময় শুধু শুধু জায়গার কোনো অপচয় করেননি। তা সত্ত্বেও গ্যালারিটা পুরোপুরি কার্যকরী। বাড়িটার মতই গ্যালারিটাও কার্যকরী। এটাই সত্যি। প্রথম গ্যালারির বাঁদিকের দেওয়ালের একটা ঘুলঘুলি দিয়ে মাথা গলিয়ে দিলাম। আসলে ডানদিকের দেওয়ালটা বেশ ভারি সীসার পর্দা দিয়ে ঢাকা। ওটাকে তুলে ধরা বা সরানোর কাজটা বেশ কঠিন। মাথা গলিয়ে উঁকি মেরে দেখলাম গজ তিনেক দূরে কালো আর হলুদ রঙের মার্বেল পাতা। বেশ চকচকে মার্বল। বুঝতে পারলাম ওই মার্বলের জন্যই দ্বিতীয় গ্যালারির মেঝেটা বেশ বিকৃত হয়ে গেছে। আমার বন্ধু আর আমি ঘুলঘুলির ভেতর দিয়ে কোনোরকমে ভেতরে ঢুকলাম। মানে দুজনেই দুটো আলাদা আলাদা ঘুলঘুলি দিয়ে ঢুকলাম। তিন ইঞ্চি চওড়া একটা খাড়াইয়ে এসে দাঁড়ালাম। ওখান থেকে ঝাঁপ দিয়ে যাওয়াটা বেশ অসম্ভব। তিন গজের মতো ফাঁকা জায়গা থাকলে যে কোনো লোকই ফস্কে গিয়ে শক্ত মেঝেতে পড়ে যেতেই পারে। আর ওই মার্বেল পাতা জায়গাটা তিন গজ চওড়া তো হবেই। পড়ে গেলে পিঠের হাড় একেবারে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে আর নত থেঁতলে মরেও যেতে পারে। এরকম বিপদ হতে পারে সেটা বুঝতেও সময় লেগে যেতে পারে – হয়ত নৃত্য চলার সময় বা কোনো মেয়ের রুমাল পড়ে গেলে সেটা খোঁজার সময়। তবে আমরা খাড়া যে অংশে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি কালো আর হলুদ মার্বেলের মেঝে – এই দুটোর মাঝখানের জায়গাতে লক্ষ করলাম কাজ চালাবার মত একটা সিঁড়ি আছে। কোনো কারুকাজ করা কিছু নয়। তবে কাজে লাগানো যাবে। ওখান দিয়ে কালো আর হলুদ মার্বেলের মেঝে পর্যন্ত যাওয়া যেতেই পারে। সিঁড়িটা অবশ্য একটু বেকায়দার, নামতে অসুবিধে হবে। কোনোরকমে গোড়ালির ওপর ভর দিয়ে ভারসাম্য রেখে নিচে নামতে হবে।

তবে রীতিমত দুঃসাহসের সঙ্গে এই বিপজ্জনক সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসার কৃতিত্বর জন্য আমরা কেউই নিজের নিজের পিঠ চাপড়ে দিতে পারলাম না। সেটা করবার সময়ও ছিল না। জমিতে পা রাখতে না রাখতেই দেখতে পেলাম – একটা লোক – বামনের থেকেও বেঁটে লোকটা – যে দরজাটা কালো হলুদ মার্বেলের মেঝে থেকে বেশ দূরে, ওই দরজা দিয়েই আসছে। রণ-পা লাগিয়ে হাঁটছে। রণ-পা দুটো দ্বিতীয় গ্যালারির মতই উঁচু হওয়ায়, ওকে খুব একটা কসরৎ আর করতে হবে না, যে কোনো ঘুলঘুলির মধ্য দিয়ে অনায়াসে গলে যেতে পারবে। ঠিক সেই কাজটাই ও করল। একটা ঘুলঘুলি দিয়ে শরীরটা গলিয়ে দিয়ে, তিনটে বাচ্চাকে ধরে ফেলল, আর তারপর কালো হলুদ মার্বেল দিয়ে ঢাকা উঠোনের মাঝখান লক্ষ্য করে যেতে লাগল। ডানদিকের রণ-পায়ের প্রান্ত দিয়ে ট্র্যাপডোরের মত একটা দরজার পাশের স্প্রিং-এ চাপ দিয়ে ঘোরালো। দরজাটা খুলে গেল। একটা বাচ্চাকে সেই ফাঁক দিয়ে একটা খাঁচার মধ্যে ছুঁড়ে দিল। বাকি বাচ্চাদুটোকেও পাশের দুটো খাঁচায় ছুঁড়ে দিল।

অগত্যা আমরা খাঁচাগুলো দেখার চেষ্টা করতে লাগলাম। কিন্তু বামনটা মিনমিনে গলায় (আসলে ও এতই বেঁটে যে গলার আওয়াজটা মিনমিনে শোনাচ্ছে) বলে উঠল যে আমরা কিছুই দেখতে পাব না, কারণ প্রত্যেকটা লোকই (হ্যাঁ, প্রত্যেক খাঁচায় সত্যিই একজন করে মানুষ আছে) খাঁচার রঙ আর গঠনটা এমনভাবে অনুকরণ করে নিয়েছে যে কেউ ধরতেই পারবে না এইসব খাঁচার ভেতরে মানুষরাই থাকে। অবশ্য লুকিয়ে কেউ যদি ঢুকে থাকে সে ছাড়া। তারপর লোকটা বুঝিয়ে বলল যে সামান্য কিছু টাকা খরচ করার সামর্থ্য থাকলে যে কেউ যতদিন খুশি পছন্দের পশু হয়ে খাঁচায় থেকে যেতে পারে। বলল যে বেশ রমরমিয়ে ওর ব্যবসাটা চলছে। ও নাকি দুজন মহিলাকে নিয়ে কাজটা শুরু করে। ওই দু’জন নাকি বেড়াল আর ইঁদুর হয়ে খেলতে ভালবাসে। তখন থেকে প্রাণীজগতের অনেক প্রাণীকেই অন্তর্ভুক্ত করা গেছে। সবাইকেই না করতে পারলেও প্রায় অনেককেই। বলা যায়। ‘অবশ্য পুনরাবৃত্তির ব্যাপারগুলো না গুনেই বলছি,’ লোকটা বলল।

‘যে প্রজাতির পশুর চাহিদা অদ্ভুতভাবে বেশি সেটা হল বাঘ। এখানে তিন হাজার খাঁচায় পুরুষমানুষরা বাঘ হয়ে আছে। মাঝে মাঝে আমাকে ধোঁয়া দিয়ে ওদের নির্জীব করে ফেলতে হয়। কারণ ওদের গর্জন শুনে অনেক পুরুষ এবং মহিলারাই – যারা, ধরা যাক, হরিণ বা শেয়াল বা খরগোশ বা ভেড়া হয়ে থাকে – তারা রীতিমত ভয় পেয়ে যায়।’ এই গ্যালারিতে জায়গাটা যে খুবই সীমাবদ্ধ এই কথাটা না বলে আমি আর পারলাম না। লোকটা হেসে বলল যে প্রয়োজন মত এই অট্টালিকা সম্প্রসারিত হয়ে যায়। ‘তা আপনি দামটা কত রেখেছেন?’ বেশ চেঁচিয়ে কথাটা জানতে চাইলাম। লোকটার উচ্চতা যেরকম জোরে না বললে শুনতেই পাবে না! ‘কত দাম রেখেছেন?’ লোকটা জবাব দিল, ‘মানবতার অশেষ ভালোবাসা।’ আরও অনেক কথা জানতে চাওয়াই আর হল না। ঠিক তখনই একটা মালগাড়ি এসে ঢুকল। নানান ধরণের খাবারে ভরা। ছিল পাখির খাওয়ার মত বীজ, তিলের বীজ, গিনি ঘাস, খড়, তাল (শুয়োরদের খুব প্রিয়), ভুট্টা (মুরগিদের প্রিয়), নানান ধরণের ফুলের বিশাল গুচ্ছ, যেখান থেকে মৌমাছিরা মধু খেতে পারবে। বামনটা খাওয়ারগুলো বিলি করতে লেগে গেল। লোকটা অগুন্তি খাঁচা খুলছে সেটা আমরা দেখতে পেলাম। না খুললে আমরা দেখতেই পেতাম না যে খাঁচাগুলো আছে ওখানে।

মালগাড়িটা ঢোকবার জন্য দরজাটা হাট করে খুলে দেওয়া। সেই সুযোগটা নিয়ে আমরা হুটোপাটি করে একটা ঘরে এসে পড়লাম। ওখানে চারটে কালো রঙের লোক মিলে একটা জনপ্রিয় নাচের সুরটা ভাজছে। সেটা আর শেষ হবার নামই নেই। যেই শেষের অংশটা গাওয়া হয়ে যাচ্ছে, তাল না কেটে আবার প্রথম অংশে চলে আসছে। ওদের মধ্যে একজন আমাদের জানাল যে ওরা গান গাওয়া বন্ধ করবে না, কারণ কোনও একজোড়া প্রেমিক-প্রেমিকা – যাদের নাচবার ইচ্ছে আছে – তারা হয়ত ঘরে ঢুকে খুব মন খারাপ করে, হতাশ হয়ে ভাববে যে গানবাজনার আসর শেষই হয়ে গেছে। ভাবলাম লোকটা আমাকে নিয়ে রসিকতা করছে। তবে ঘরের কোণার দিকে তাকিয়ে দেখলাম বেশ অনেক জোড়া প্রেমিক-প্রেমিকা নেচেই চলছে। ‘ওরা কেউ গোণার চেষ্টাই করে না,’ লোকটা বলল। ওরা সবাই বদ্ধকালা, কোনও আওয়াজই শুনতে পায় না। যখনই পুনরাবৃত্তির ব্যাপারটা চলে আসে তখনই ঢোলকগুলোতে এত জোরে চাপড় মারা হয় যে আগুনের ফুল্কি বেরতে থাকে। যারা নাচছে তারা তো কিছুই শুনতে পায় না। ওদের বুক ধড়ফড় করতে থাকে। হার্টফেল করে খুব তাড়াতাড়ি মরে যায়।’

কিন্তু লোকটার আবেগপ্রবণ ব্যাখ্যা আর বেশিক্ষণ শোনা হল না। ঠিক তখনই রাস্তার দিকের দরজাটা – বা বলতে পারেন আমরা যে দরজাটা রাস্তার দিকের বলে ধরে নিয়েছিলাম – সেটা নিঃশব্দে খুলে গেল। আমরা ঠিক করে নিলাম আমরা ওই দিক দিয়েই বেরিয়ে যাব। অবশ্য প্রেমিক যুগলেরা নাচবার জন্য আসার সময় দরজার সামনে ওদের দেখা পাওয়া যেতে পারে এই ভাবনার জন্য কয়েক সেকেন্ড দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলাম। অবশ্য আমাদের আশায় জল ঢেলে দিয়ে ওখান দিয়ে কাউকেই ঢোকানো হল না। দরজার পাল্লাটা কব্জার ভরসায় এমন ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ করে খোলা থাকল, যে মনে হচ্ছিল সে কোনো মুহূর্তেই খুলে বেরিয়ে আসবে। আমার বন্ধু আর আমি তখনও ইতস্তত করছিলাম। তবে অসংখ্য বদ্ধকালা প্রেমিকজোড়ের মধ্যে থেকে তিনটে জোড় এমন হুড়মুড় খেয়ে পড়ে গেল যে ধাক্কা খেয়ে আমরা প্রায় বিদ্যুতগতিতে বেরিয়ে গেলাম। বন্ধুটি তো একেবারে রাস্তায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। বাড়িটার সামনের দিকে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে লাগল। বলল, ‘মনে হচ্ছে অষ্টাদশ শতাব্দীর ...’

সবে কথাটা বলতে শুরু করেছে, তবে সেটা গিলে ফেলতে হল, কারণ অট্টালিকাটা কিছুতেই দশ বছরের আগে বানানো হয়েছে বলে মনেই হচ্ছিল না। দারোয়ানটা (হ্যাঁ, একজন দারোয়ান ছিল) বোঝাতে লেগে গেল যে অট্টালিকাটা নিজের খেয়াল মত নক্সা খাড়া করে তৈরি করে ফেলে, তারপর আবার ভেঙে ফেলে, অর্থাৎ নির্মাণ আর পুননির্মাণ চলতেই থাকে। এই অট্টালিকার চূড়ান্ত কোনও রূপ বা বাঁধাধরা কোনও নক্সা বলে কিছু হয় না। আমরা প্রায় ধরেই নিয়েছিলাম যে ওই দারোয়ানটা আর বামনটা একই লোক হতে পারে। ব্যাপারটা বোঝার জন্য আমরা কয়েকটা হাস্যকর সাদৃশ্য তৈরি করে ফেলেছিলাম, অথচ তার সঙ্গে গঠন সংক্রান্ত বাস্তবতার সঙ্গে খাপই খাওয়ানো যাচ্ছিল না। বিশেষ করে গির্জাটি দেখার পরে আমাদের এই তত্ত্বকে বাতিলই করে দিতে হল। সেই সময় দুজন মহিলা গির্জার ভেতরে যাচ্ছিলেন। ওঁরা আমাদের সঙ্গে আসার জন্য আমন্ত্রণ জানালেন। সেখানে কোনও বেদী ছিল না, তবে মাঝামাঝি জায়গায় একটা স্ফটিকের গর্ভগৃহের মত কিছু একটা ছিল আর ওখান থেকে উষ্ণ বাষ্পীভূত কালো কফি বেরিয়ে আসছিল।

যাজক দর্শনার্থীদের দ্রুত পায়ে খালের পাশ দিয়ে চলে আসার জন্য আমন্ত্রণ জানাচ্ছিলেন। যাঁরা যাজকের আমন্ত্রণ গ্রহণ করছিলেন তাঁদের হাতে চিনেমাটির একটি করে বড় পেয়ালা ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছিল। যেন খালের পাশ দিয়ে যেতে যেতে বৃত্তের ছন্দ না ভেঙে পেয়ালা ডুবিয়ে কফি তুলে পান করতে পারেন। সেই সময়ের খুব চালু আর্জেন্টিনার ট্যাংগোর সুর বাজানো হচ্ছিল।

এর পরে যা হল তাকে আলোর গতিতে বজ্রপাত হওয়া বলাই যায়। ফিরে যাওয়ার সময় আমার বন্ধু পা হড়কে বৃষ্টির জন্য তৈরি হওয়া পাঁকে পড়ে একেবারে ডুবে গেল। নির্দয়ভাবে বৃষ্টি পড়তেই থাকল। নিজেকে পাঁকে পড়ে থাকতে দেখে ও আমাকেও ওখানে ফেলে দেবার জন্য টানাটানি করতে লাগল। তবে আমি একটা ল্যাম্পপোস্টকে গায়ের সব জোর লাগিয়ে আঁকড়ে ধরে তারস্বরে সাহায্যের জন্য ডাকাডাকি করতে লাগলাম। হলুদ উর্দি পরা দুটো পুলিশ সাড়া দিল। ওদের উর্দিগুলো রীতিমত মধ্যযুগীয় শৈলীর। আমাদের দুজনকেই সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের সামনে হাজির করালো। আমার বন্ধুর বিচার করে অবিলম্বে ওকে তেত্রিশ বছরের জন্য শহর থেকে নির্বাসন দেওয়া হল। তারপর আমাকে যে কর্মচারী কোট পরীক্ষা করে দেখে তার কাছে নিয়ে যাওয়া হল। লোকটা আমাকে সেখানেই আমার কোটটা খুলিয়ে একজন অভিনেতার কোট পরিয়ে দিল। গতকাল সন্ধ্যেবেলা অভিনয় করার সময় তিনি ওই কোটটাই পরেছিলেন। সেই অভিনয় আমার খুবই ভাল লেগেছিল। সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ সেই ভদ্রমহিলা নিজের হাতে সেই পোশাকটা আমাকে পরিয়ে দিলেন। তারপর ওঁর বন্ধুদের অভিবাদন করবার জন্য আমাকে আদেশ দিলেন। আমি প্রত্যেকেই অভিবাদন জানালাম। তারপর যখন একটা আয়নার সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম, আমি মুখটা ঢেকে ফেললাম। যখন রাস্তাটা ছেড়ে যাচ্ছিলাম, বন্ধু আমার সামনে চলে এল। ওর সঙ্গে একজন চিনেলোকও ছিল। বন্ধু বলল যে নির্বাসন থেকে ফিরে আসার পর ও আমাকে হত্যা করবে বলে ঠিক করে ফেলেছে। কারণ আমি কিছুতেই ওই মায়াবী কাদায় ডুবে যেতে রাজি হইনি। ও আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল আর ওই চিনেলোকটা আমাকে ছোরা মারবে বলে তৈরি হচ্ছিল। আমি চেঁচামেচি করতে আরম্ভ করলাম। পুলিশরা আমাকে বাঁচাবার জন্য ছুটে চলে এল। আমাদের দুজনকে আবার সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের সামনে হাজির করা হল। এবারে আমার বন্ধুকে সারাজীবনের জন্য নির্বাসন দেওয়া হল। ওরা যখন ওকে নিয়ে যাচ্ছিল, খুব স্পষ্টভাবে আমার মনে পড়ে গেল যে আমার একমাত্র কাজ হল বিশ্রাম না নিয়ে ওর পেছন পেছন দৌড়ানো, যাতে ও আমাকে এক পেয়ালা কফি আর একটা রোল কিনে দিতে পারে।

১৯৪৪
--------
অনুবাদকের পরিচিতি: উৎপল দাশগুপ্ত, জন্ম কলকাতায়। আদিবাড়ি ওপার বাংলার শ্রীহট্টের পঞ্চখণ্ডে এবং অসমের করিমগঞ্জে। অবসরপ্রাপ্ত ব্যাঙ্কার। কর্মজীবনের শুরু ভারত সরকারে অর্থ মন্ত্রক থেকে। কর্মসূত্রে দিল্লী, উত্তর প্রদেশের বিভিন্ন জায়গায় এবং অসমে কাটিয়েছেন। অল্প লেখালেখি আর অনুবাদের কাজ করেন। তবে নিজের লেখালেখির চাইতেও বই পড়তে বেশি ভালবাসেন, বিভিন্ন বিষয়ে। ঘুরে বেড়াতে, অবসর সময়ে গান শুনতে ভালবাসেন। শখের ফটোগ্রাফি করে থাকেন। কলকাতায় থাকেন।

[অনুবাদকের বানানরীতি অক্ষুণ্ন রাখা হয়েছে।]

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ