বিরহিলিও পিনিয়েরার দুটি গল্প

 


অনুবাদ: ইন্দ্রাণী দত্ত


যুদ্ধু

কাঁটায় কাঁটায় সকাল এগারোটায় যুদ্ধ শুরু হবে নাকি। ইতিমধ্যেই বাহিনীপ্রধানরা নিজ নিজ সেনাদের পারদর্শিতা আর বীরত্বর গুণগানে এতটাই মুখর এবং উত্তেজিত যে সাধারণ যুক্তি বুদ্ধি গুলিয়ে ফেলে আপনার মনে হবে দুই দলই যুদ্ধে জিতবে- এ যেন একেবারে অবশ্যম্ভাবী। যুক্তি বুদ্ধির কথাই উঠল যখন, এটুকু বলাই যায় যে আশ্চর্য কিছু ঘটছিল যাতে আসন্ন লড়াইয়ের ভিন্ন কোনো পরিণতির সম্ভাবনা উঁকি দিয়ে যাচ্ছিল। যেমন ধরুন, ঐ যে আর্মি জেনেরাল - পাহাড়ের ওধারে সুরক্ষিত পরিখায়- হাতে স্টপওয়াচ- স্পষ্টতই অস্থির দেখাচ্ছে তাঁকে। বেলা এগারোটা বেজে পাঁচ মিনিটেও তিনি বুঝেই উঠতে পারছেন না তাঁর প্রতিরক্ষার প্রান্তসীমা এখনও অটুট না কি শত্রু বায়ুসেনারা তা ইতিমধ্যে দুর্বল করে ফেলেছে। এই রকম ঘটনা এতই অস্বাভাবিক আর এযাবৎ ঘটে যাওয়া যাবতীয় লড়াইয়ের আদর্শগত পরিপন্থী যে তাঁর ভয় করে উঠল এমন , ফোনই করে বসলেন শত্রু বাহিনীপ্রধানকে। পাহাড়ের ঠিক নিচে যেখানে আদিগন্ত সমতল শুরু হয়েছে, সেখান থেকে অপরপক্ষের জেনেরালের গলায় একেবারে একই উৎকণ্ঠা। আরো পাঁচ মিনিট কাটল, দুপক্ষের রক্ষণপ্রাচীর বিন্দুমাত্র টাল খেলো না। অথচ এ সবই অতি আবশ্যক এই মুহূর্তে- প্রস্তুতিমূলক মহড়া ছাড়া যুদ্ধ শুরু সম্ভবই নয়। ব্যাপারস্যাপার জটিল থেকে জটিলতর হতে লাগল। সাঁজোয়া গাড়ির চালকরা বেঁকে বসলেন এবার - কেউই আক্রমণ শুরু করতে রাজি নন। দুই জেনেরাল দ্রুত নিষ্পত্তি চাইছিলেন গোটা পরিস্থিতির; অতএব তুমুল গোলাবর্ষণের হুকুম হল। কিন্তু পরিস্থিতি যে কে সেই। লড়াইয়ে অনীহা প্রসঙ্গে দুই অধিনায়ক সহমত হলেন এবারে; সৈন্যদলের মনোবল তলানিতে- মেনে নিলেন না কেউই। বরং নিজেরাই পরস্পরকে আক্রমণে উদ্যত হলেন - তাঁদের একক লড়াই সামরিক শৃঙ্খলা এবং আনুগত্যর দৃষ্টান্ত হয়ে থাকুক। সাঁজোয়া গাড়িতে প্রকাণ্ড দুই দৈত্যের মতো একে অপরের দিকে ধাবিত হলেন অধিনায়কদ্বয়। সংক্ষিপ্ত সঙ্ঘর্ষ এবং দুজনেই ফৌত।

সে'সময় তেপায়ায় ঝোলানো ছোটো আয়নায় দাড়ি কামাচ্ছে সৈনিক, একটা পেল্লায় বেড়াল ছেতরে পড়া প্যারাশুট ঘিরে পাক খেয়ে চলেছে। আর সমতলে সেনাবাহিনীর পেয়ারের কুকুরটি অলসভঙ্গিতে পাহাড়ের সেনাধিনায়কের একটি হাত চিবোচ্ছে। বেলা সোয়া বারোটাতেও যুদ্ধ শুরু হবে না- এ এখন সহজেই অনুমেয়।

মূল গল্প:The Battle, 1944

একটি অবিনাশী মিলন

আমাদের প্রেম ক্রমশ পচে যাচ্ছিল। আমাদের হাত থেকে তো বটেই , আমাদের মুখগহ্বর, অক্ষিকোটর সর্বোপরি হৃদয় থেকে পিছলে বেরিয়ে যাচ্ছিল গোটা ব্যাপারটাই। ওর স্তন আর আমার বুকে আশ্রয় নেয় না, আমিও ওর দিকে ধাবিত হই না বহুদিন। আমরা যেন পরস্পরের থেকে সরিয়ে নিচ্ছিলাম নিজেদের - প্রেমের সম্পর্কে এর থেকে ভয়ংকর কিছু আর হয় না। সম্পর্ক এমনই বিষাক্ত যে একে অপরকে যেন আছড়ে ভাঙছিলাম বিছানায়।

হাল ছাড়ি নি তবু। সহজ সমাধান খুঁজে পেলাম। এক জালা আলকাতরা কিনে এনেছি। আর ও আমার অভিপ্রায় বুঝে নিয়ে, সঙ্গে সঙ্গে নগ্ন হয়ে আলকাতরায় ডুব দিয়েছে। ঘন কালো, সান্দ্র তরলে ওর শরীর দোল খাচ্ছে এখন। যে মুহূর্তে বুঝলাম ওর শরীরের সমস্ত খাঁজেখোঁজে আলকাতরা ঢুকে গিয়েছে, জালা থেকে উঠে এসে বাগানের মার্বেল টালিতে গিয়ে সটান শুয়ে পড়তে বললাম ওকে। এবারে আমার পালা, বাকি আলকাতরায় ডুব দিয়ে, বাগানে ওর পাশে শুয়ে পড়লাম; জড়িয়ে ধরলাম পরস্পরকে। সূর্য ঝলসাচ্ছিল মাথার ওপর। ভরা দুপুর। একটু কমসম ধরে হিসেব করলেও, আমার অনুমান, বিকেলের মধ্যেই আমাদের চিরমিলন সুসম্পন্ন হবে।

মূল গল্প: Indestructible Union, 1962
*****

অনুবাদক পরিচিতি: ইন্দ্রাণী দত্ত। শঙ্খ ঘোষ বলেছিলেন, "আমরা যখন সত্যিকারের সংযোগ চাই, আমরা যখন কথা বলি, আমরা ঠিক এমনই কিছু শব্দ খুঁজে নিতে চাই, এমনই কিছু কথা, যা অন্ধের স্পর্শের মতো একেবারে বুকের ভেতরে গিয়ে পৌঁছায়। পারি না হয়তো, কিন্তু খুঁজতে তবু হয়, সবসময়ই খুঁজে যেতে হয় শব্দের সেই অভ্যন্তরীণ স্পর্শ,"  ইন্দ্রাণী শব্দের সেই অভ্যন্তরীণ উৎসটিই খুঁজে চলেছেন।  এযাবত প্রকাশিত তিনটি গল্পসংকলন, 'পাড়াতুতো চাঁদ', 'সূর্যমুখী এরোপ্লেন,' 'হরিণের কাছাকাছি,' এবং একটি উপন্যাস, 'চাররঙের উপপাদ্য'।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

2 মন্তব্যসমূহ

  1. এত সাবলীল অনুবাদ কম ই পড়েছি।
    অসাধারণ শব্দচয়ন। ভাষার ওপর ঈর্ষণীয় দখলদারি।

    উত্তরমুছুন