রিপন হালদারের গল্প: মাংস





খাঁচা থেকে সাদা ধবধবে জিনিসটা বের করতেই চিৎকার শুরু করে।শুধু চিৎকার নয়। ছটফটানি। থেকে থেকে এমন ছটফট করছে জিনিসটা যে মনেহয় দোকানদারের পাঁচ আঙুলের শক্ত প্যাঁচ থেকে উড়েই চলে যাবে। সাদা পাখনার গুঁড়ো সেই ওড়ার চেষ্টার ফলে ছিঁড়ে ছিঁড়ে পেজা তুলোর মত সারা দোকানে উড়ে বেরাচ্ছে।

না, শেষ পর্যন্ত পারে না। ছোট্ট গলাটা দুই আঙুলে ধরে দোকানি মোটা কাঠের উপর রাখল। আর উঁচিয়ে ধরল লোহার দা। ধপ। একবা্রে নেমে এল দা-টা। ছিটকে মাথাটা আলাদা হয়ে গেল। পড়ে গেল কাঠের স্তম্ভের নিচে। তুলে উঠিয়ে রাখল দোকানকার।মাথাটার চোখ মুখের মাটি মুছল রক্ত মাখা ন্যাকড়ায়

মাথা আলাদা হয়েও তখনো জিনিসটার বাকি দেহ কাঁপছে। দোকানদার তখন সেটা ছুঁড়ে দিল বড় একটা ড্রামের ভিতর। প্লাস্টিকের ড্রাম ঝমঝম করে বাজছে।

দোকানদার কপালের ঘাম মোছে কাঁধের গামছা দিয়ে, শালা সামান্য একটা জিনিস কাটতে কাল ঘাম বেরিয়ে গেল!

-আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে ।তাড়াতাড়ি দিন!

-দেখতেই তো পাচ্ছেন! এখনো মরেনি! ছটফটানি বন্ধ হোক আগে!

একথার পর আমার আর কথা বলা সাজে না। কিন্তু অন্যান্য দিন তো এত সময় লাগে না! আজ যেন একটু বেশি বেশি ছটফট করছে! আরে যাবি তো সেই ভাতের থালায়! একটু আগে আর পরে!

প্রায় মিনিট তিনেক পরে জিনিসটার কম্পঝম্প মনেহয় থামল। দোকানদার ড্রাম থেকে বের করল রক্তে মাখা সাদা জিনিসটার গলা কাটা দেহ।

দা-টা দিয়ে কয়েকবার আস্তে করে বারি দিল ওটার পিঠে। তারপর কলার ছোকলা ছাড়ানোর মত ধীরে ধীরে ছাড়াচ্ছে তার চামড়া।ছাড়ানোর পর পাশের লাল হয়ে যাওয়া বালতিতে ডোবাল। পরক্ষণে উঠিয়েও নিল। সদ্য জন্মানো শিশুর দেহের মত দেখতে লাগছে জিনিসটা।

-কতোটা নেবেন?

দোকানদারের কথায় হুস ফেরে। বললাম, সাত শোর মত।সলিড না। হাড় দেবেন আর একটা লেগ পিস যেন থাকে। ও হ্যাঁ, চর্বি দেবেন না!

-সে আর আমাকে বলতে হবে না! দোকানদার লেগ পিস কাটতে কাটতে বলে, এত দিনে আমি আপনার চয়েস বুঝে গেছি।তবে সামান্য চর্বি থাকা দরকার বুঝলেন! স্বাদ ভালো হয়। কেউ কেউ তো শুধু চর্বি নিয়ে যায় কেজি কেজি। বলে চর্বি খেতেই নাকি সবচেয়ে ভালো। মুখে তুলেই সোজা গলায় চালান করে দেওয়া যায়। চাবাচাবির দরকার হয় না। তবে চর্বি খেত আমার বাবা। দোকানদার এবার জিনিসটার বুকের মাঝখানটায় একটু জোরেই দা বসিয়ে দিল। তারপর দা রেখে হাত দিয়ে চিরে দুই ভাগ করে ফেলল।এরপর হাড়ের দিক কাটতে থাকে।

যা বলছিলাম, আমার বাবার সবকটা দাঁতই শেষের দিকে পড়ে গিয়েছিল। দিলাম বাঁধিয়ে। কিন্তু সমস্যা। মাংস খেতে পারে না। সেকি চিৎকার! খালি বলত, আমার দাঁতগুলান গেলো কই! আহ হারে, আমার দাঁত! কত কত খাসির রান এই দাঁত দিয়া ছিঁড়ছি! কই গেল সেইসব দিন! হাড় চিবাইয়া গুড়া ছাতু কইরা ছাড়তাম!

তারপর থেকে বাবাকে শুধু চর্বি দিতাম। মুরগি খাসি সব চর্বি চলত। বড় কাসার বাটি ভর্তি করে ঝাল ঝাল চর্বি রান্না করে দেওয়া হত। আর বাবা কী করত, এক চুমুকে পায়েসের মত তা প্রায় সঙ্গে সঙ্গে চুমুক দিয়ে খেয়ে ফেলত। তারপর খালি বাটি মেঝেতে ছুঁড়ে দিয়ে চিল্লাত, আর কই?

এক-দেড় কেজি চর্বি খাওয়ার পর আর কারো পেটে জায়গা থাকে, বলেন?

-সে তো অবশ্যই। একটু তাড়াতাড়ি দিন না! আমাকে আবার অফিসে যেতে হবে!

-এই তো হয়ে গেছে। লেগ পিসের সাইজ কেমন হবে? বড় না মাঝারি?

-বড় বড়! বউ আবার ছোট পিস সহ্য করতে পারে না।


টাকা দিয়ে ব্যাগটা স্কুটির পাদানির দিকে রেখে চালিয়ে দিলাম জোরে।বাড়ি ফিরতে মিনিট দশেক মত লাগল। বউ তো রেগে আগুন। এই তোমার সময় হল? এখন রাঁধব কখন আর খাবেই বা কখন?

-আমি অফিস থেকে ফিরে রাতেই খাব।গরম করে দিও একটু।এখন ডাল ভাজা যাহোক কিছু দাও।তাড়াতাড়ি! আমি স্নান করে আসছি।


বেলঘরিয়া থেকে নেমে অটোতে অফিসের দিকে যেতে যেতে তিন তিনটা মাংসের দোকান পড়ে। দুটো খাসির, একটা মুরগির। প্রতিদিনের মত আজো দেখা যাচ্ছে বড় বড় খাসির মাংসের দেহ ঝোলানো আছে। এত বড় যে মনে হচ্ছে গরুর দেহ। কে জানে সত্যি সত্যি গরুর মাংস কিনা।

মাংসের বড় পিসের আড়ালে চলে গেছে দোকানদারের মুখ। শুধু লুঙ্গি গোটান তার মোটা থাই দেখা যাচ্ছে। এমন ভাবে সেটা রয়েছে যে মনে হচ্ছে ওর থাইটাও ঝোলানো মাংসের অংশ।

কেন জানি না আজ অফিসে কাজে মন বসছে না। সামনে কম্পিউটারের পর্দা। কত হিসাব! অ্যাকাউন্টসের সব কাজ আমাকেই দেখতে হয়। মাল্টি-ন্যাশনাল কম্পানি। হেড অফিস মুম্বাইয়ে।তারও উপরে যে হেড অফিস সেটা আমেরিকায়। কয়েকজন আমেরিকায় শিফটও করে গেছে এই অফিস থেকে। আমারও যে ইচ্ছে করছে না তা নয়। কিন্তু বউয়ের আপত্তি।আমেরিকায় নাকি গরু আর শুওর ছাড়া নাকি কোনো মাংস পাওয়া যায় না! কে যে বউকে এইসব বোঝায়! বলে, তুমি ভাবতে পার! এত বড় একটা প্রাণিকে ওরা কী নিষ্ঠুর ভাবে মারে! ওরা নাকি বাছুরের জিভ দিয়ে বার্গার বানায়! ছিঃ! মানুষ নাকি এরা! আমাদের কৃষ্ণের বাহনকে নিয়ে এইসব যে দেশে হয় সেইখানে আমি যাব!

আমার বউয়ের পছন্দের পোশাক জিনস টপ। শাখা পলা ছেড়েছে আমার মা-বাবা মারা যাবার পরপরই।হাতে দামি আইফোন চব্বিশ ঘণ্টা। কানে ব্লুটুথ হেডফোন।চুল কালার ও কার্লি করে কাটা। কয়েক মাস পরপর হাজার দশেক যায় তার জন্য। সত্যি চমৎকার দেখায়। কিন্তু ঘরে আবার গোপাল আছে। আর আশ্চর্যের বিষয় মুরগির মাংস সপ্তাহে অন্তত দুইদিন তার চা-ই চাই।

কিছুই বলা যায় না। বললেই অশান্তি। বন্ধুর বাড়ি যাবার ভয় দেখায়। হ্যাঁ বন্ধুর বাড়ি! বাপের বাড়ি নয়।সেই ছোট্ট বেলার বন্ধু নাকি সে। এখনো নিয়মিত যোগাযোগ আছে। তার বাড়ি যাওয়া খাওয়া দাওয়া, সিনেমা মিউজিক কন্সার্ট ।সব চলে সেই ছোটবেলার ব্যাচেলার বন্ধুর সঙ্গে।

-কিন্তু বিয়েটা তুমি আমাকে করলে কেন?

-হোয়াট ডু ইউ মিন? চিপ! হি ইজ জাস্ট ফ্রেন্ড ইউ ফুল!

হ্যাঁ আমি ফুলই। নিষ্কর্মা, গন্ধহীন ফুল। সব মরসুমে ফোটে। কিন্তু কোনো কাজে লাগে না।



-কী ব্যাপার শুভ? এনিথিং রং?

-না না। তা এবার তো তোমার পালা! কবে যাচ্ছ?

-আরে দাঁড়াও! অত ফাস্ট হয় নাকি! বসকে আরেকটু তেল মাখাতে হবে। রাজি হয়েও যেন হচ্ছে না।

-ঠিক জায়গায় মাখিও।দরকার হলে মুখ দিয়েও…

-বললে তাও মাখাব। তোমার জায়গায় থাকলে কবে ফ্লাইটের টিকিট পেয়ে যেতাম! কী পাও বলো তো এই দেশে?

-বাদ দাও আমার কথা। বিয়েটা ফেলে রেখেছ কেন? সোনাক্ষি তো সেই কবে থেকে বসে আছে!

-সত্যি বলব? হাসি তার মুখে।

-শিওর!

-ওকে না আর ভালো লাগছে না! কাউকে আবার বোলো না যেন! তুমিই বলো রোজ রোজ সেই এক মাংস ভালো লাগে!

কথাটা বলে এমন ভাবে হাসল শ্যাম খুব অশ্লীল লাগল। আমি উত্তরে শুধু একটু হাসলাম। কী আর বলতে পারি। তাছাড়া কী বলো তো, শ্যাম আবার বলে, ওখানে গেলে তো এক সে বরকর এক জিনিস পাবো! সো এখনই এইসব ঝামেলায় জড়িয়ে কী লাভ বলো!

আবারো হাসি ছাড়া কিছুই ফেরত দিতে পারলাম না।

টিফিনে পিওন এসে বলে গেল আজ সবার বাইরে খাওয়া বন্ধ। বস খাওয়াবে। এটা বস মাঝেমধ্যেই করেন। জোমাটো সুজুগিতে অফিসের সবার জন্য খাবার অর্ডার করে দেন। কোনো অনুষ্ঠান ছাড়াই। তবে মন ভালো থাকলে। আসলে ইন্ডিয়ার ব্রাঞ্চগুলোর মধ্যে কোলকাতার ব্রাঞ্চ এখন টপ করছে। তারপর থেকেই বস এত উদার!

একটা নাগাদ এসে গেল বাক্স বাক্স খাবার।চিকেন রোস্ট আর বাটার নান। সবই ঠিক আছে কিন্তু চিকেনের পিসগুলো অস্বাভাবিক ভাবে বড়। একেকটা বড় গোছের আস্ত মুরগি দিয়ে একেকটা রোস্ট বানানো হয়েছে।প্রায় এক-দেড় কেজি ওজন হবে একেকটার। প্লেটে এমন ভাবে রাখা যে মনে হচ্ছে মুরগিটা উবু হয়ে বসে আছে সারা গায়ের ঝাল মশালার গন্ধ নিয়ে। সুযোগ পেলেই হয়ত উড়াল দেবে। কিন্তু কীভাবে! ওর ডানাই তো নেই!

কেমন যেন লাগছে পরিবেশটা। এমন না খাদ্যের জন্য প্রাণিহত্যার বিরুদ্ধে আমি। কিন্তু সকাল থেকে আজ এমন কিছু ঘটছে কেমন যেন সব গোল পাকিয়ে যাচ্ছে।

-কী হলো খাচ্ছ না কেন শুভ? স্বয়ং বস এসে হাজির।

-এই তো শুরু করব স্যার!

-নো নো! আই অ্যাম নট ইয়োর স্যার! অনলি ফ্রেন্ড! ক্লিয়ার?

-ওকে স্যার। ওকে!

-আবার স্যার! বলে তিনি ঘোষণা করেন, দেন লেটস সেলিব্রেট আওয়ার গ্রোথ! বলে বস হাঁটতে হাঁটতে তার প্লেটের মুরগির পিসটার মধ্যে একটা কামড় বসিয়ে দিলেন।যেন বুভুক্ষু সিংহ কামড় বসাল মরা গরু বা মোষের দেহে।পার্থক্য এখানে রক্তের বদলে শিকারির মুখে মশলা আর তেল মাখামাখি।

খাওয়ার সময় বসের চোখমুখ এমন উজ্জ্বল চকচক করছে যে মনে হচ্ছে এইমাত্র একটা মহৎ কিছু করে দেশ উদ্ধার করে ফেলেছেন।সঙ্গে ফিচেল হাসি। চকচকে মুখে চাকুর মত ধারাল হাসি। তারপর আবার মুখ ডুবে গেল মাংসের দেহে। এইবার তার সরু মুখটা পুরোটাই খাদ্যটার খোদলে ঢুকে গেল। মনে হচ্ছে বসের মাথায় রোস্টের হেলমেট লাগানো। ছদ্ম চিৎকার তার, হেল্প মি! হেল্প মি! হি অর শি উইল সোয়ালো মি! বলেই আবার মুখটা বের করে আনেন। মাথার চুলে আর সারা মুখে গালে কানের পাশে তার মাংসের তেল মশলা।ততক্ষণে ডান হাতে একটা পা ছিঁড়ে ফেলেছেন খাদ্যটার। ভয়ংকর দেখাচ্ছে।


বাড়ি ফিরলাম সাতটা নাগাদ। যথারীতি ঘরে টিভি চলছে। সোফায় রাই। পাশে ঘনিষ্ট ভাবে বসা তার সেই ছোট্ট বেলার বন্ধু।দূর থেকে মনে হচ্ছে বন্ধুর কোলেই রাইয়ের ছোট খাটো দেহটা বসে আছে।

আমাকে দেখেও সরে গেল না। রাই জানাল, শোনো ও আজ আমাদের সঙ্গে খাবে।

আমি কিছু না বলে বাথরুমে চলে গেলাম। ফিরে বসলাম টিভির সামনে। খবরের চ্যানেল চলছে।ব্রেকিং নিউজ। রেপ ও মার্ডারের খবর। রিপোর্টার জানাচ্ছে, এমন ভাবে মেয়েটিকে গণধর্ষণ করা হয়েছে যে তার যৌনাঙ্গের সবকটা হাড় ভেঙে গেছে।

রাই খাবার নিয়ে আসল এখানেই। সামনের ছোট নিচু টেবিলে মাংস আর সরু চালের ভাত।

লেগ পিসের হাড়টা বাটি থেকে এমন ভাবে উঁচিয়ে আছে যে মনে হচ্ছে ওটা টিভিতে দেখানো নিহত মেয়েটির মুখ-ঝাপসা ছবিটার কোমরের নিচে ঢুকে যেতে চাইছে।

***
লেখক পরিচিতি: রিপন হালদার। লেখালেখির শুরু কবিতা দিয়ে দু'হাজার সালের পর। দুটো কবিতার বই প্রকাশের পরে গদ্যে সরে আসা। আগ্রহ নতুন ধরনের গল্প উপন্যাসে। ভালো লাগে বাংলার গ্রাম ঝিল মাটির নির্জন পথে ঘুরতে। লেখার প্রেরণা বিশ্বসাহিত্য, সিনেমা, সঙ্গীত। প্রকাশিত গ্রন্থঃ বৃষ্টির কথা হচ্ছে (কবিতা) অংকফুল (কবিতা) এখানে অমল নামে কেউ থাকে না (গল্প) আগামীকাল এইসব লিখেছিলাম (উপন্যাস ও গল্প)।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

6 মন্তব্যসমূহ

  1. দারুন লাগলো স্যার।।। প্লীজ স্যার আপনি যদি সম্ভব হয় এই গল্প টা আবার লিখবেন।।। শেষের পার্ট টা সব থেকে ভালো লাগলো আমার।।।
    ছোট গল্প হলেও অসাধারণ লাগলো ♥️🙏🏽

    উত্তরমুছুন
  2. খুব ভালো লাগলো শিক্ষক মহাশয়। অসাধারণ শেষ এর দিকটা।

    উত্তরমুছুন
  3. আর একবার মুগ্ধ করলে রিপন ।

    উত্তরমুছুন
  4. গল্পটা খুব ই অসাধারণ আর খুব ভালো লাগলো স্যার...আপনি আমাদের এরকম অনেক নতুন নতুন গল্প উপহার দেন তার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই 🙏🙏.....দুর্দান্ত গল্প । ❤️❤️

    উত্তরমুছুন