তৃষ্ণা বসাকের গল্প: শহিদনগর







ক্তজবা ভেসে যাচ্ছে অঝোর শ্রাবণে…
এক লক্ষ ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল জুড়ে—
কীভাবে মুছে ফেলবে তরুণ জবার দাগ!
.
হোসেন, আহাদ, তাহমিদ, রিয়া গোপ…
দেবদূতের মতো ছোট-ছোট নিষ্পাপ শিশুদের—
হত্যা করা হল কোন অপরাধে?
.
সত্যকে মিথ্যা দিয়ে ঢেকে দিচ্ছে দুর্যোধন-মেঘ
এখন সময় সত্য উচ্চারণের, স্রোতের প্রতিকূলে—
থেকেও যে নির্দ্বিধায় সত্য উচ্চারণ করতে পারে
সেই তো প্রকৃত সাহসী— এই সময়ের অর্জুন।
.
এই রক্তাক্ত জনপদে সময়ই সবচেয়ে বড় বিচারক
বন্দুকের নল একদিন ঘুরে যাবে হন্তারকের দিকে।

(রক্তাক্ত শ্রাবণ, শাহেদ কায়েস)

ওরা এক এক করে ফিরে আসছে। যাদের জন্যে এই শহরের অশ্রু ঝরেছিল এক সময়। যারা অকালে ঝরে গেছে বলে একটা গ্রুপ পর্যন্ত খোলা হয়েছিল ফেসবুকে, অলীক সেই গোরস্থানে একেকজন গিয়ে সময়ে অসময়ে শোক জানিয়ে আসত, সাদা সাদা কবরের ওপর সাদা সাদা ফুলের স্তবকের মতো লিখে আসত শোকোচ্ছ্বাস।

‘টিংকু, অমর রহে’
‘শালবনী আজো তোমাকে আমরা ভ্লিনি’
‘’জুব্বার, তোমার শাহাদাত বৃথা যাবে না’

কেউ কেউ এতে সন্তুষ্ট না হয়ে কবিতা লিখবে, খুব স্বাভাবিক। আর সেইসব কবিতা এত বেশি হবে যে তা ফেসবুক পেজ উপছে উঠবে ওপাড়ার পাত্রপুকুরের মতো। তখন সেসব নিয়ে একটা সংকলন প্রকাশের প্রস্তাব দেবে কেউ। কে দিয়েছিল, সেটা অত গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু একবার সে কথ উঠলে লুফে নেবে অসংখ্য লোক। ফলে সংকলন হচ্ছেই, সেটা সবাই জেনেই গেছিল একরকম। শহিদ স্মৃতি জাগরণ কবিতা সংকলন –এমন নাম দেওয়াও হয়ে গেছিল। যদিও সে নাম অনেকেরই পছন্দ হয়নি। তার পর অনেক কথা উঠল, অনেক নাম এল, ছোট কিউট সব নাম। একজন খুব আউট অব দ্য বক্স কিছু বলল। সে বলল যেহেতু এই সংকলনের মধ্যেই এবার থেকে শহিদরা বাস করবে, তাহলে এর নাম থাক শহিদনগর। এই একটি ব্যাপারে সবার দেখা গেল একমত। তবে অনেকেই এর সঙ্গে কবিতা সংকলন জুড়তে চেয়েছিল, কিন্তু তাতে বেশিরভাগের মত নেই। ফলে শহিদনগর নামটিই বিপুল গরিষ্ঠতায় পাস হয়ে গেল।

এরপর চলতে লাগল কবিতা সম্পাদনার কাজ। কাজ শুরুর পাশাপাশি এটা প্রকাশের তোড়জোড়ও করে রাখা উচিত, এমন মত দিল কেউ কেউ। খুবই দামি কথা নিঃসন্দেহে। আগে থেকে ভেবে না রাখলে উদবোধকের ডেট পাওয়া শক্ত। তখন প্রশ্ন উঠল কাকে ডাকা হবে । অনেকেই আছেন সেলিব্রিটি কবি, গায়ক, নেতা, আর কত খুচরো সেলেব গলিতেই পাওয়া যায় আজকাল।। কিন্তু আগে থেকে বুক করে না রাখলে তাদেরও ডেট পাওয়া শক্ত। কিন্তু মুশকিল অন্য জায়গায়। যাকেই ডাকার কথা ভাবা হচ্ছে, দেখা যাচ্ছে সেই খুনী। সে যাকে বা যাদের খুন করেছে, তাদের স্মৃতির উদ্দেশ্যেই এই কবিতার সংকলন।
-ব্যাপারটা খুব চাপের হয়ে যাচ্ছে বস। হিসেব মিলছে না। যত লোক শহিদ হয়েছে, খুনির সংখ্যা তার থেকে বেশি।
-যাহ্‌! তাই হতে পারে নাকি?
- বুঝতাছস না? এখন নিজেকে খুনি হিসেবে ডিক্লেয়ার করার ধুম পড়ে গেছে। এইটায় বেশি লাইক কমেন্টস পড়তাসে। রিল ভাইরাল, যদি একটা লাইভ খুন দেখাইতে পারো।

কে বলল কথাটা? চমকে এদিক ওদিক তাকায় সবাই। হুডিতে মুখ প্রায় ঢেকে আছে, শুধু জ্বলজ্বল করা চোখ দুটিই দৃশ্যমান শুধু। একটা পুরানো অশথ তলায় বসে কথা হচ্ছিল। সেখানে কয়েকটা কাটা মুণ্ডু পড়ে আছে, সবাই ইতস্তত করছিল বসবে কিনা। এই হুডি ঢাকা লোকটাই আশ্বাস দিয়ে বলেছিল ‘ঘাবড়াইয়েন না। ওগুলো সব ধর্মের মুণ্ডু । সেই যে যার কল বাতাসে নড়ে’
ওরা আর না ভেবে বসে পড়েছিল। সেই যেদিন থেকে ঠিক হয়েছে, একটা অফলাইনে সভা হওয়া খুব দরকার, সেদিন থেকে ওরা হাঁটতে শুরু করেছে। এমন একটা জায়গা চাই, যেখানে রাষ্ট্রের নজরদারি ক্যামেরা বসানো নেই, যেখানে আত্মহত্যাপ্রবণ তরুণ বা আদেখলে জনতা নেই, যেখানে ফেক প্রোফাইলে ঢুকে পড়া স্বরাষ্ট্র সচিবের মেয়ের শ্বশুরের ভায়রা ভাই নেই।
তারা মাঝে মাঝে অনলাইনে শহিদ স্মরণ করেছে, সেখানে অপরাধের মধ্যে হনুলুলু, ক্রোয়েশিয়া, নাকাচাকা, ইনামিনা - এইসব দেশের কবিরা আমন্ত্রিত ছিলেন। তাঁরা দু চারটি অশ্রুসজল কবিতা পড়তেন, সেই অশ্রু রাষ্ট্রের পক্ষে নাকি এত ভারি, তারা কন্টেন্ট কন্ট্রোল করতে লাগল। আর তাই এরা এখন গাছতলায় বসে আছে। জায়গাটা চমৎকার। পাশেই গোরস্থান, তার পাশে শ্মশান, জীবিত লোক কেউ আসেনা। আর অজস্র কাটা মুণ্ডু। সে ধর্মের হোক ছাই না হোক।

এখন কথা হল…
এখন কথা হল উদ্বোধন করবে কে?
এই প্রশ্নটা ভাবাল সবাইকে। অশ্বত্থ তলায় বসে ছিল যারা। ঝুরিগুলো যাদের কাঁধে নেমে এসেছিল, আর তা ধরে দোল খাবার কথা ভেবেছিল যারা। একটু দুললে ক্ষতি কী? সবাই তো দুলছে এখন, দুলতে দুলতে এক ডাল থেকে অন্য ডালে চলে যাচ্ছে। আবার দুলতে দুলতে অন্য ডালে। সেখানে তারা যদি পৃথিবীর এক প্রান্তসীমায় অশ্বত্থের ঝুরি ধরে ঝুলতে চায়…

কিন্তু ঝুরি স্পর্শ মাত্র কে যেন বলে উঠল ‘আমাকে স্পর্শ কোরো না, স্পর্শ করলেই মস্তক খসে পড়বে’
এদের নতুন মস্তক, এখনো মায়া রহিয়া গেছে, চমকে সরে বসল সবাই। ইতিমধ্যে চা এসে গেছিল। গোরস্থানের পরে যে শ্মশান, সেখানে এখনো বৈদ্যুতিন চুল্লি বসেনি। চিতা কখনোই নেভে না, তাই চা তৈরি করা খুব সহজ। মৃত্যুকে চুম্বন করা সেই চা পান করতে করতে ওরা ভাবছিল, কে কথাটা বলল। যদিও চা শেষ করার পর উদ্বোধনের কথাটাই মনে পড়ল। একটা করে নাম উঠল, সে নাম বাতিল হয়ে গেল। কারণ প্রত্যেকেই কোন না কোন ভাবে কাউকে মেরেছে।

-এত হত্যার মাঝখানে আমাদের একজন কম ঘাতক কে ভাবতে হবে।
-মানে লেসার ইভিল?
আবার সবাইকে চমকে দিয়ে কে যেন বলে উঠল ‘ এ জগত মহা হত্যাশালা’
শুধু বলাই না, সেই কথাটি প্রতিধবনিত হতে থাকল চারদিকে। অথচ যতদূর জানা আছে এখানে কোন পাহাড় নেই।
তার ওপর এই কথাটি, সেই যার ‘নাম বলতে নেই’ তার। যার নাম কেবলই সিলেবাস থেকে বাদ দেবার দাবী ওঠে।

-ভাই, ইগনোর মার, নাহলে তো সভার কাজ করাই যাবে না। শহরে ফিরলে আমরা আবার বিচ্ছিন্ন হয়ে যাব।
-ঠিক। আচ্ছা উদ্বোধনের কথা বাদ দে, প্রথমে শহিদের তালিকা ঠিক করে নিই।
তালিকাতে প্রথমেই ঘাপলা।
-আরে ঋজু, ঋজু কেন? ও সেদিনই ডিক্লেয়ার দিছে, দিব্যি বেঁচে আছে ও। জি এফ -র সঙ্গে স্ট্যাটাস দিছে।
-হতেই পারে না। ঋজু গুলি খাইছে।
-গুলি খাইতেই পারে, কিন্তু মরে নাই। অরে দেখা গেছে আরব সাগরের তীরে, লিওপোল্ড কাফেতে নবলব্ধ বালিকা বন্ধুর সঙ্গে কফি পান করতে।
-লিওপোল্ড কাফে! সে তো অনেক দূর! তাছাড়া সেই কাফেও তো গুলি খাইসিল।
-গুলি খাইসিল, কিন্তু আবার বাঁইচা উঠসে।
-আমরা গুলি খাই, কিন্তু আবার বাঁইচা উঠি।
-ঐ দেখ, কারা আসতাসে, চুপ চুপ, লুকিয়ে পড়ি আয়। আমাগো নিতে আসছে মনে হয়।

।।২।।


২০গ- আর কতদূর মা? এই পথ কি শেষ হবার নয়? আমরা তো কোথাও যাই না কোনদিন। কিন্তু দিদা বলেছিল, সেটাই পথ, যার শেষ আছে।
২০ ঘ- দিদা আরও বলেছিল, পথে জল আর রুটি পাওয়া যাবে।
২০ খ- সব পথ না, কোন কোন পথ মধু আর মাখন দিয়ে তৈরি হয়,
২০ ক- আমরা জ্বলন্ত পেট নিয়ে বেরিয়েছি,
আমরা আবার জ্বলন্ত পেটের কাছেই পৌছব,
এর মাঝে কত নদী নালা, পাহাড়। গ্রাম, রেললাইন
২০গ- ওটা তো শহর ছিল, যেখানে আমাদের চোখে কী যেন ছেটানো হল?
২০ ঘ- ওরা কি পুলিশ বাবা, যারা আমাদের চোখে কী যেন ছিটিয়ে দিল?
২০ গ- আমাদের চোখ জ্বলে উঠল
২০ ঘ- আমাদের চোখ জ্বলে উঠল তখুনি আর জ্বলেই চলেছে
২০ গ-আমরা কিছুই দেখতে পাচ্ছি না বাবা
২০ ঘ- পথের কোন কিছুই দেখতে পাচ্ছি না আমরা সত্যি। নিশ্চয় অনেক গাড়ি, নতুন নতুন, কাচ লাগানো দোকান, হাঁটুর কাছে ছেঁড়া জিনস যা আমি কিনতে চেয়েছিলাম।
নানারঙ্গের ওই জীবন, কাঁধের কাছে ফ্রিল দেওয়া, আমি কিনতে চেয়েছিলাম,
ওই যে মুখে দিলে চকচক করে আর ফর্সা দেখায়, আমি কিনতে চেয়েছিলাম
২০গ- আর খাবার! কত খাবার। পথের দুপাশে নিশ্চয় কত খাবারের দোকান, আমি নাম জানি না অত খাবারের। ভাত ছাড়া রুটি ছাড়া পৃথিবীতে অত খাবার কেন মা, কাদের জন্যে?
কিন্তু চোখ জ্বালা করছে বলে কিছুই দেখতে পাচ্ছি না সেসব
২০ খ- শোন বাছা,কখনো কখনো পথ না দেখতে পেলেই ভালো। যারা পথ দেখতে পেয়েছিল, পথ দেখাতে চেয়েছিল অন্যদের, তারা কেউ বেঁচে নেই, কিংবা জেলের কুঠুরিতে ধুঁকছে। তাই বলি অন্ধ মানুষের মতো চলো, অন্ধ মানুষকে সবাই ভালবাসে।
২০ গ- মানে চোখ থাকবে, তবু অন্ধ হয়ে চলব?
২০ ঘ- মানে আমরা দেখব না কিছুই?
২০ গ- এত বড় বড় বাড়ি আকাশ চাটা, উড়ালপুল
২০ ঘ- মাটির নিচ দিয়ে রেল, মাথার ওপর দিয়ে ট্রেন
২০ গ- উঁচু উঁচু দোকান, দোকানে চলন্ত সিঁড়ি
২০ঘ- আকাশে নাক গলানো মানুষের মূর্তি আর তার পায়ের নিচে আমাদের খেলার জায়গা?
২০ গ –মা আমরা কি ওখানে খেলতে পাব না, পারব না কি আমরা ওখানে খেলতে?
২০খ- থাম বাছা, এত আমি জানি না। এত জানলে হাঁটা যায় না, এই নে, রুটি খা
২০ গ- রুটি রুটি! কিন্তু এ রুটি তো পচে গেছে মা,
এই দেখো সবুজ শ্যাওলার মতো, দেখো সাদা সাদা পোকা, মা, মাগো ওই পোকাগুলোকেও কি চলে যেতে হচ্ছে, আর ওরা পথ খুঁজে পাচ্ছে না, এই রুটির ওপর নিচ, ধারের দিক –এত হেঁটেও পথ খুঁজে পাচ্ছে না পোকাগুলো?
২০ ঘ- হিহি! রুটিটা যেন দেশ! আর আর ওই পোকাগুলো! ঠিক আমরা! পোকা পোকা তুই একটা পোকা বাবা পোকা মা পোকা!
২০ গ-চুউউউপ! ওই কারা যাচ্ছে মা, সারিসারি, ওদের জামা কাপড় কেমন যেন, একটা বই দেখিয়েছিল সন্ধের ইস্কুলে। সেইরকম। ওরা কি মরে গেছে ও মা?
২০খ- অমন বলতে নেই। মরে গেলে কি কারো খিদে পায়? দেখছিস না ওই বাচ্চাগুলো খিদেয় কাঁদছে?
২০ঘ- ওরা কি ভাষায় কথা বলছে বোঝ তুমি?
২০খ- খিদের একটাই ভাষা, কান্নার একটাই ভাষা। কেউ তা বোঝে না, কেউ জানে না কিছু। কিন্তু খিদে জানে, কান্না জানে, জানে এই সময়ের বিষ হাওয়া।
২০গ- বুঝি না তোমার কথা মা। আর কত হাঁটব বল? আমাদের সেই গ্রাম, কুসুমডিহা, সে কতদূর? দাঁড়াও ওদের জিগেস করি ওরা কোথায় চলেছে?
কোথায় চলেছ ও মানুষ, এতজন মিলে কোথায় চলেছ? কোন সময়ের মানুষ তোমরা?
দি-১- আমরা কোথায় চলেছি সে কি আমরাই জানি! জানতাম, কিন্তু ভুলে গেছি।
দি-২- খালি ফালতু বাকোয়াশ! আমরা চলেছি দিল্লি থেকে তুঘলকাবাদে। রাজধানী সরিয়ে দিয়েছেন বাদশা। হুকুম জারি হয়েছে সবাইকে চলে যেতে হবে সেখানে এক্ষুনি। কেউ থেকে গেলেই কোড়া মারবে।
দি-৩ কোড়া! হাহা! শিককাবাব বানিয়ে টাঙ্গিয়ে রাখবে প্রধান সড়কে। কত লোক মরে পড়ে আছে পেছনে। ভাই বেরাদর দোস্ত। লাশ, লাশ জমে উঠেছে পাহাড়ের মতো।
দি ৪- যা পেছনে পড়ে রইল তা লাশের নগর
দি৩- যেখানে চলেছি সেও লাশের নগর হবে।
দি-২ আর এর মধ্যের সময়টুকুই আমরা জিন্দা আছি। শ্বাস নিচ্ছি, বাতচিত করছি।
দি-১ তা তোমারা কোথায় চলেছ? হায় আল্লা কী একটা জানবর, ওটা আমাদের চেপে দিয়ে চলে যাবে নাকি?
২০ক- নেমে আসো, সবাই হাইওয়ে থেকে নেমে আসো, ট্রাক যাচ্ছে সারি সারি ট্রাক, পিষে দিয়ে চলে যাবে, মায়া করবে না, দয়া করবে না।
দি-১ –জান বাঁচল যাই হোক
দি-২ – এত খুশদিল হবার কিছু নেই। ওই দৈত্যের মতো গাড়ি মারবে, নইলে খিদে মারবে, নয়তো তুফানি। মোটকথা আমাদের মারার জন্যে সব ব্যবস্থা মজুত।
২০-ঘ- এসব কথা ভালো লাগে না মা। তুই আমাদের গ্রামের কথা বল। কুসুমডিহা। সেখানে কেমন গাছপালা, ঠান্ডা ঠান্ডা হাওয়া। আর থালা ভরা ভাত, ভাতের ওপর গরম ডাল

২০-গ আর আমরা ছুটে ছুটে যাই কালীর দোকানে। কালীকাকা বলে তোমরা সুজনের বেটাবেটি না? তারপর মুঠো ভরে লজেন্স দ্যায় মা, টক টক ইমলি লজেন্স। এই এত্ত!

।।৩।।

ওদের চোখে সামনে দিয়ে চলে যায় কাফেলা। এক নয় একাধিক।
কিছু সময়ের জন্য ওদের কবিতা বৈঠক মুলতুবি থাকে।
তারপর একজন মুখ খোলে।
-যারা চলে গেল, তারা কেউ বাঁইচা নাই।
-তারা এক সময়ের লোকও নয়।
-আমাদেরও এরকম হয়েছে না? আমরা শহর থেকে বাইরে চলে এসেছি, কেবলই আসছি।
-আমাদেরও কেউ চলে আসতে বাধ্য করেছে।
-কিন্তু আমরা বাঁইচা আছি, এটা তো সত্যি।

আবার স্বর বাজে ‘আসলে কেউ বেঁচে নেই, বাঁচার মতো দেখায়!’

সেই স্বরে এখন আর কেউ চমকায় না, বরং একটি মেয়ে রেগে উঁচু গলায় বলে ‘ মোটেই বাঁচার মতো দেখায় না, সত্যি বেঁচে আছি। বেঁচে আছি বলেই না আমরা এই কাজটা করে যেতে চাই।‘
-ব্যাক টু ওয়ার্ক। চলো আমরা তালিকাটা সম্পূর্ণ করি।
-কিন্তু আমরা জানব কী করে কে জীবিত, কে মৃত? তাহলে তো আবার আমাদের ওদের হিসাবের ওপর নির্ভর করতে হবে। আর তা করতে গেলে, আমরা ধরা পড়ে যাব। ওদের তথ্য ভাণ্ডারে ক্লিক করলে বা কাউকে ফোন করলেই আমাদের ওরা ট্র্যাক করতে পারবে। আর তারপর শুরু হবে

-কিছু শুরু হবে না। শোনো কোন তালিকা দেবার দরকার নেই। শুধু লিখব শহিদ স্মরণে

‘শহিদ স্মরণে নিজের মরণে রক্তঋণ শোধ করো।‘

সবাই এবার চমকে তাকায়। গাছটাই কথা বলছে তাহলে? এই অশ্বত্থ গাছটা?
- এখনো এই উপমহাদেশে কথা বলা গাছ আছে তাহলে?

-শোন গাছ আছে, শ্মশান আছে গোরস্থান আছে- আর কোন ভরসা আমাদের দরকার নেই। এখানেই হবে আমাদের অনুষ্ঠান।
-কিন্তু একটা চ্যানেলে দেখাচ্ছে আমরাও নাকি মরে গেছি।
-মরে গেছি তো গেছি। আরে এখানে বেঁচে উঠব বলে ওখানে মরে গেছি।
-শোন, ঐ শহর, যা আমরা ফেলে এসেছি, তার নাম দেওয়া যাক শহিদনগর। সেই জানাজা আমরা এখানে বার করব। আমরা যারা মরে গেছি, কিন্তু বেঁচে উঠছি, আর ফিরে আসছি প্রতি মুহূর্তে দ্বিগুণ হয়ে, তারা একদিন ওদের কাছে সঠিক তালিকাটা দেখতে চাইব। ইনশাল্লাহ!

***

লেখক পরিচিতি: তৃষ্ণা বসাক একজন প্রতিষ্ঠিত কবি, গল্পকার, ঔপন্যাসিক ও অনুবাদক। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.ই. ও এম.টেক । তাঁর গ্রন্থের সংখ্যা ৪০ -র অধিক। বিশেষ উল্লেখযোগ্য-লাইব্রেরি শার্ট খোলো, কোটি যোগিনীর গলি, চরের মানুষ, চন্দ্রাবতী, চিন্তাচর্চা, আত্মারামের নতুন খাঁচা, অজিত সিং বনাম অজিত সিং, টিস্যু পেপারের পানসি ইত্যাদি।

পেয়েছেন ইলা চন্দ স্মৃতি পুরস্কার (বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ) ২০১৩,সোমেন চন্দ স্মারক সম্মান (পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি) ২০১৮,সাহিত্য কৃতি সম্মান (কারিগর) ২০১৯,কবি মৃত্যুঞ্জয় সেন স্মৃতি সম্মান ২০২০,নমিতা চট্টোপাধ্যায় সাহিত্য সম্মান ২০২০ সহ বহু পুরস্কার। তিনি মৈথিলী, মালয়ালম ও হিন্দি ভাষা থেকে বাংলায় অনুবাদ করেন। বর্তমানে কলকাতা ট্রান্সলেটর্স ফোরামের সচিব।





একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ