দৈনিক খবরের কাগজগুলো টেবিলে রেখে তাড়াহুড়ো করে নতুন ম্যাগাজিনগুলো ড্রয়ার টেনে ঢোকাতে লাগল। ড্রয়ার ভরে গেল। তবু চেপে চুপে ঢুকিয়ে চাবি দিয়ে দিল। এখনো সব ক’টা ম্যাগাজিনে স্ট্যাম্প মারা হয়নি, একবার যদি স্টুডেন্টরা হাতে পায় না ছিঁড়ে আর ফেরতের আশা করা ভুল। স্ট্যাম্প আর প্যাডটা যথাস্থানে রেখে টেবিলে ফেরত দেওয়া বইগুলোকে নিয়ে র্যাকে নম্বর অনুযায়ী রাখতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। এখন হেডমিস্ট্রেসের নির্দেশ মতো কয়েকটা পত্রিকা আসে স্টাফেদের জন্য। সেগুলো সরিয়ে বাকিগুলো স্টুডেন্টদের ইস্যুর জন্য রেডি করতে আজ বিকেল গড়িয়ে যাবে। কারণ পর পর ক্লাস। সেই শেষে দু’টো অফ পিরিয়ড।
ইলেভেনের মেয়েরা ধীরে ধীরে ‘স্যার আসছি’, ‘স্যার আসতে পারি’, বলে ঢোকা শুরু করল লাইব্রেরিতে। কমলাক্ষ প্রতিদিনের মতো ক্লাস ক্যাপ্টেন স্মৃতিকণাকে ডেকে ফেরত বই আর ইস্যু বইয়ের নামের তালিকা সাদা পাতায় লিখে জমা দিতে বলল। মেয়েরা ততক্ষণে লাইব্রেরির কোণায় কোণায় ছড়িয়ে পড়ে কেউ পড়াশুনার বই, কেউ গল্পের বই, কেউ জি-কের বই, কেউ গানের বই বাছতে লাগল। কমলাক্ষের মাথায় এই সময় হঠাৎ করে চলে এল একটা নতুন গল্পের প্লট। টেবিলে বসে স্মৃতিকণার বলা নামগুলো টিক্ দিতে দিতে গল্পটাকে সাজিয়ে নিচ্ছিল মনে মনে। সম্বিত ফিরল ফোর্থ পিরিয়ডের ঘন্টার আওয়াজে।
কমলাক্ষ রোজকার মতো স্মৃতিকণাকে বলল, খবরের কাগজ যারা পড়ছিল, তাদের বলো কাগজ যেন ঠিকঠাক পাতা ধরে সাজিয়ে ভাঁজ করে পেপার ওয়েট চাপা দিয়ে রাখে। প্রায়দিনই বিনোদনের পেজটা এদিক ওদিক হয়ে যাচ্ছে দেখছি।
স্যারের কথাটা বন্ধুদের জানাতে স্মৃতিকণা বড়ো টেবিলটার দিকে এগিয়ে গেল। এই পিরিয়ডটা আজ নেই। ছাত্রীরা হলঘরে নাচ- গান প্র্যাকটিশ করতে যাবে বলে গেল। সামনে কী অনুষ্ঠান আছে মনে করার চেষ্টা করল কমলাক্ষ… লাইব্রেরি ফাঁকা হয়ে যেতে আবার ম্যাগাজিনগুলো ড্রয়ার খুলে বার করে স্ট্যাম্প দিতে শুরু করল। স্ট্যাম্প দেওয়া শেষ হলে ডেট। ডেট লেখা শেষ হলে ম্যাগাজিন রেজিস্টারে এন্ট্রি করে নিল। ঘড়িতে এখন একটা পনেরো। মানে টিফিনের ঘন্টা পড়তে এখনো পঁচিশ মিনিট বাকি। কমলাক্ষ স্টাফেদের জন্য আলাদা করে রাখা ম্যাগাজিনগুলো বগলদাবা করে ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে নিল। লাইব্রেরি লক্ করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে সবে টিচার্স রুমের দিকে বাঁক নেবে এমন সময় ক্লাস টেনের ঋদ্ধিমার, ‘স্যার’ ডাক শুনে থমকে দাঁড়াল। পিছন ফিরে দেখল, ঋদ্ধিমা মেয়েদের দঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসছে।
—স্যার, আপনি যে কবিতাটা বেছে দিয়েছিলেন আমি সেটাকে সাদা ফুলস্কেপ কাগজের একদিকে লিখে রেখেছি। আপনি কি এখন নেবেন?
—না না আমি নেব না। তোমাকে ‘স্বজন’ পত্রিকার যে সংখ্যাটা পড়তে দিয়েছি, সেটার পিছনে ওদের পত্রিকা-দপ্তরের ঠিকানা লেখা আছে। সেই ঠিকানায় পাঠিয়ে দিও। ঠিক আছে?
—আচ্ছা, স্যার।
।।দুই।।
কমলাক্ষ বাংলায় অনার্স পাশ করে তখন চুটিয়ে টিউশন করছে। আর বছরের পর বছর এস এস সি দিয়ে যাচ্ছে। একবারও যে ক্লিক করেনি তা নয়। সেই একবারই। তবে ইন্টারভিউ বোর্ড থেকে বাতিল। সেবারই ‘স্বজন’ পত্রিকার সীতেশদা কমলাক্ষকে অপশনটার কথা বলেছিল। চান্সও হয়ে গেল। কল্যাণী ইউনিভার্সিটি থেকে বি লিব কোর্সটা করতেই ঝক্কাস্ করে হয়ে গেল চাকরিটা। কিন্তু হল তো হল একটা মেয়েদের স্কুলে! তবে বাড়ির কাছে এই যা রক্ষে। এমনি তে ঠিকই আছে, তবে মেয়েদের স্কুলে একা একটা পুরুষের চাকরি করা কী যে বিড়ম্বনার তা কমলাক্ষ একটা বছর যেতে না যেতেই হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে। হঠাৎ হঠাৎ কোন দিক থেকে যে মেয়েলি হাসির ঝড় বইবে তা কমলাক্ষ কেন, কোনো মনস্তত্ত্ববিদের পক্ষেও বোধহয় বোঝা সম্ভব নয়।
এইসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে কমলাক্ষ যেই টিচার্সরুমে ঢুকেছে হঠাৎ পিটি ম্যাডামের চিৎকার, এই তো বাবু কর কমলাক্ষ এসে গেছেন। আপনি কিন্তু অনেকদিন বাঁচবেন, স্যার। এই আপনার কথাই হচ্ছিল এতক্ষণ।
অঙ্ক দিদিমণিও ফুট কাটলেন, আরে উনি হচ্ছেন লেখক মানুষ। লেখকদের লেখা যতদিন পাঠকদের মনে বেঁচে থাকবে, ততদিনই তাদের আয়ু। কি বলেন কমলাক্ষবাবু!
কথা শেষ হতে না হতেই গোটা টিচার্সরুম হাসিতে ফেটে পড়ল। হাসি থামার আগেই টিফিনের লং বেল পড়ল। কমলাক্ষ সমস্ত হাসি ঠাট্টা উপেক্ষা করে একরাশ বিরক্তি নিয়ে বয়ে আনা পত্রিকার গোছাটা টেবিলে রাখল। সঙ্গে সঙ্গে গোটা চার-পাঁচ হাত চুড়ির ঝনক তুলে খামচা খামচি করে পত্রিকাগুলো টেনে নিল। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কমলাক্ষ ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিল। পিছনে দরজার দিক থেকে ভেসে এল সঙ্গীতা ম্যাডামের গলার স্বর।
—কী কমলাক্ষদা, এবার কোন কোন শারদীয়ায় আপনার লেখা থাকছে?
কমলাক্ষ পিছন ফিরে সঙ্গীতা ম্যাডামের মুখোমুখি হয়ে বলতে লাগল, ‘স্বজন’, ‘অনিলেখা’, ‘এরপর’…
পিটি ম্যাডাম কমলাক্ষের মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে বলে উঠল, কী! কী বললেন! স্ব-জ-ন! অনিলেখা!, এসব নাম তো বাপের জন্মেও শুনিনি। এরা কোথা থেকে প্রকাশ পায়?
—এগুলো লিটিল ম্যাগাজিন। ‘অনিলেখা’র নাম শোনেননি? ‘অনিলেখা’র সম্পাদক কে জানেন?...
—আরে মশাই রাখুন আপনার ‘অনিলেখা’। লিখুন তো দেখি ‘সাপ্তাহিক কাল’ বা ‘নান্দনিক’-এ। সাপ্তাহিক কাল আর নান্দনিক পত্রিকা দুটো হাতে তুলে দেখিয়ে পিটি ম্যাডাম কথাগুলো ঢিলের মতো ছুঁড়ে দিল কমলাক্ষের দিকে।
এটা যদি স্কুল না হয়ে বাইরে কোথাও হতো তবে কমলাক্ষ না জানি কী না বলতো পিটি ম্যাডামকে। এটা কর্মস্থল বই তো নয়, মহিলাদের কর্মস্থল। তাছাড়া সকাল থেকে যে নাছোড় গল্পটা কমলাক্ষের মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে, তার প্রথম কয়েকটা বাক্য লিখে কমলাক্ষকে ক্ষান্ত থাকতে হয়েছে সময়ের অভাবে। পরের একগাদা বাক্য মাথার মধ্যে ভিড় করে আসছে। তাই কমলাক্ষ আর কোনো তর্ক বিতর্কে গেল না মহিলা মহলে। কমলাক্ষ পাশ কাটিয়ে টিচার্স রুম থেকে বেরিয়ে আসছিল, এমন সময় সঙ্গীতা ম্যাডাম বললেন, ঠিকই তো বলেছেন পিটি ম্যাডাম। এই পত্রিকাগুলোতে পাঠিয়ে দেখুন না একবার।
কমলাক্ষ ধীরে ধীরে বেরিয়ে এল ঘরটা থেকে। কিন্তু তখনো কানে অনুরণিত হচ্ছিল, সঙ্গীতা ম্যাডামের কথাটা, ‘পাঠিয়ে দেখুন না একবার’, ‘পাঠিয়ে দেখুন না একবার’…
কমলাক্ষ এই স্কুলে লাইব্রেরিয়ানের চাকরি নিয়ে আসা অবধি প্রথমদিন থেকে এই সঙ্গীতা ম্যাডামের প্রতি কেমন একটা আলাদা অনুভূতি হয়। সঙ্গীতাও যে অন্য ম্যাডামদের মতো কখনো তাকে অ্যাম্বারাস করেনি তা নয়। তবুও সঙ্গীতা ম্যাডাম অন্যান্যদের থেকে কোথাও যেন আলাদা। যদিও এই সঙ্গীতা ম্যাডামের জন্যই এই স্কুলে জানাজানি হয়ে গেছিল যে কমলাক্ষ লেখালেখি জগতের মানুষ। তারপর থেকে টিচার্সরুমে কমলাক্ষের লেখালেখির বিষয়টা যেন একটা খোরাকের বিষয় হয়ে উঠেছে। তাতে অবশ্য কমলাক্ষের খুব একটা কিছু এসে যায় না, কারণ কমলাক্ষ যখন চাকরি করত না তখনও আত্মীয়-বন্ধুদের কাছে ‘এই লেখালেখি থেকে কত খোরাকি আসে’ শুনেও খোরাকের পাত্র হতো। তাই এ আর নতুন কী!
আত্মীয়-বন্ধুদের মুখে ঝামা ঘষে কমলাক্ষ যখন এই স্কুলে জয়েন করেছিল লাইব্রেরিয়ান পোস্টে তখন বাইরের খোরাক রূপ নিল অন্য এক মেয়েলি খোরাকের ঝড়ে। প্রথম প্রথম ঝড়ের দাপট এতই বেশি মনে হচ্ছিল যে এক সময় কমলাক্ষ ভেবেই নিয়েছিল, তার বোধহয় আর এই স্কুলে চাকরি করা হবে না। একদিকে গোটা স্কুলের মহিলামহল, অন্যদিকে কমলাক্ষ একা। চাকরি পাবার কিছু মাসের মধ্যে একদিন স্কুলের গভর্নিং বডির মিটিং-এ হেডমিস্ট্রেস জানালেন, দিদিমণিদের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে জ্ঞানদাসুন্দরী দেবী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সেক্রেটারি জানিয়েছেন পরের সেশনে স্কুলের দুই পুরুষ স্টাফের (এক লাইব্রেরিয়ান কমলাক্ষ কর আর দুই দারোয়ান ঝন্টু পাশোয়ান) জন্য আলাদা টয়লেট বানানো হবে। এটা শীঘ্র বানানো হয়েও গেল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যখন কমলাক্ষ ধীরে ধীরে নিজেকে সামলে নিচ্ছিল ঠিক তখনই কমলাক্ষের লেখক পরিচয়টি নতুন স্কুলের সকলের কাছে উন্মুক্ত করে দিয়েছিল সঙ্গীতা ম্যাম।
সেদিন ছিল শিক্ষক দিবস। তাই সঙ্গীতা ম্যামের সঙ্গে আরো শিক্ষিকাবৃন্দ ও ছাত্রীদের অনুরোধ অগ্রাহ্য করতে পারেনি কমলাক্ষ। গোটা স্কুলের সকলের হাততালির আহ্বানে ব্যাগে রাখা খাতা থেকে একটা অণুগল্প পাঠ করেছিল। সেদিনের পর থেকে আবার টিচার্স রুমের আবহাওয়া ঘুরে গেল।
।।তিন।।
এই ঘটনা কমলাক্ষের সাহস ও আত্মবিশ্বাস দুই-ই বাড়িয়ে দিল। সেই আত্মবিশ্বাসে ভর করে পুরোনো লেখার খসরা থেকে দু’টো ভালো গল্প মাজা-ঘষা করতে শুরু করল। দিন সাতেক বাদে দেবী সরস্বতীর পায়ে ঠেকিয়ে দু-দু’টো বিগ হাউসে নিজে গিয়ে গল্প দু’টো ড্রপ করে দিল। এরপর মাত্র দেড়মাসের অপেক্ষা। একদিন স্কুলের লাইব্রেরির টেবিলে বসে একবাঞ্চ লেটেস্ট ম্যাগাজিনে স্ট্যাম্প দিতে দিতে কমলাক্ষ স্থির হয়ে গেল। যেন স্বয়ং বাল্মীকি ক্রৌঞ্চ পক্ষীর নিধন দৃশ্য অবলোকন করছেন। কমলাক্ষ ড্রয়ারের চাবি খুলে স্ট্যাম্প না দিয়ে, এন্ট্রি না করে ম্যাগাজিনটা সোজা ড্রয়ারের কৃষ্ণগহ্বরে চালান করে দিল। সেই শুরু, এর মাত্র দশদিন যেতে না যেতেই আবারো বাল্মীকির শরাহত ক্রৌঞ্চ দর্শন। আসলে কমলাক্ষ এই দেড়মাসে ওই প্রথম দু’টো গল্প মেয়েমহলের নামজাদা পত্রিকায় দিয়ে যে ক্ষান্ত হয়েছিল তা তো নয়। এই দেড়মাসে কমলাক্ষ কম করে ছ-ছ’টি গল্প অতি যত্নের সঙ্গে হাতে লিখে পরপর কোনো না কোনো বহুপঠিত গ্ল্যামারাস পত্রিকায় পোস্ট করেই গেছে কীভাবে তা বোধহয় স্বয়ং কমলাক্ষ ছাড়া আর কারো জানা নেই। দেড়মাসে কমলাক্ষ যখন রাতের পর রাত স্বপ্ন দেখত কীভাবে নিজের প্রকাশিত গল্পের ম্যাগাজিনটা নির্লিপ্তভাবে টিচার্সরুমের টেবিলে সবার সামনে সঙ্গীতার দিকে লক্ষ্য করে ঠেলে দেবে, ঠিক তখনই একের পর এক ম্যাগাজিন কমলাক্ষের ড্রয়ারে নিক্ষিপ্ত হল। মাঝে মাঝে যে টিচার্সরুমে কেউ না কেউ কমলাক্ষকে এই ম্যাগাজিন গুলোর কথা জিজ্ঞেস করত না তা কিন্তু নয়। তার উত্তরে কমলাক্ষ কখনো জানাতো, না তো এ সপ্তাহে এখনও ওটা আসেনি তো।
কখনো বলতো, এবারেরটা সিনিয়ার স্টুডেন্টদের হাতে স্ট্যাম্প দেবার আগেই পড়ে গেছিল। ওরা কে যে কোথায় ওটা গায়েব করে রেখেছে তা ট্রেস করতে পারা যাচ্ছে না।
তাছাড়া মাঝে পুজোর ছুটি থাকায় কমলাক্ষ কিছুটা স্বস্তি পেল। আর পুজোর পর স্কুল খুলেই পুজোসংখ্যা, পার্ব্বনী, শারদীয়ার ভিড়ে এমনিতেই টিচার্সরুমে সাপ্তাহিকীদের কদর কম ছিল। যেদিন যেদিন কমলাক্ষ ড্রয়ারে কোনো ম্যাগাজিন গায়েব করে ভয়ে ভয়ে টিচার্সরুমে ঢুকত, সেদিন সব শিক্ষিকাই প্রতিদিনের মতো একযোগে কমলাক্ষকে দেখে হেসে উঠত অথবা কোনো আওয়াজ দিত। কমলাক্ষের কিন্তু সেইদিনগুলোতে মনে হত, এরা কি জেনে গেল না কি!
আবার খানিকবাদে যখন বুঝতে পারত, না ব্যাপারটা ম্যাগাজিন গায়েব সংক্রান্ত নয়, তখন কিছুটা স্বস্তি পেত। তখন মনে মনে ভাবত, মেয়েলি ব্যঙ্গের হাসি আর মেয়েলি স্বভাবের হাসির সূক্ষ্ম পার্থক্য বোঝে এমন পুরুষ আর যেই হোক সে নয়।
।।চার।।
এর মধ্যে মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিকের টেস্ট পরীক্ষা শেষ হয়ে গেল। মাধ্যমিকের সীট পড়ল স্কুলে। তার ঠিক এক সপ্তাহ আগে মেয়েদের অ্যাডমিট দেবার জন্য হেডমিস্ট্রেস কমলাক্ষ আর সঙ্গীতাকে দায়িত্ব দিলেন। স্কুলের বিভিন্ন ঘরে ক্লাস চলছিল বলে টিচার্সরুমে বসেই ওরা দুজনে অ্যাডমিট বিলি করছিল। সকাল থেকে বেশ কিছু মেয়ে অ্যাডমিট নিয়ে চলে গেছিল। টিফিন টাইমে এল ঋদ্ধিমা আর সুদীপ্তা। ঋদ্ধিমা অ্যাডমিট নেবার পর সব দিদিমণিদের প্রণাম সেরে ব্যাগ থেকে এক গোছা ম্যাগাজিন বার করে টিচার্সরুমের টেবিলে রেখে কমলাক্ষের উদ্দেশ্যে বলল, স্যার প্লিজ, আপনি এগুলোতে যদি অটোগ্রাফ না দেন তাহলে আমি কাউকেই বিশ্বাস করাতে পারব না, যে লেখক কমলাক্ষ কর-ই আমাদের স্কুলের লাইব্রেরি স্যার।
কথাটা বলার পর ছড়িয়ে পড়তে যা দেরি, উপস্থিত দিদিমণিরা যে যেদিক দিয়ে পারল টেবিলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সব ক’টা পত্রিকা নিয়ে তার আগাপাস্তালা চাটতে লাগল চোখ দিয়ে। কিছুক্ষণ বাদেই ধেয়ে এল চাপা হাসির ঢেউ। পিটি ম্যাম আরো সরেস। তিনি তো প্রত্যেকের হাত থেকে থেকে ম্যাগাজিন গুলো নিয়ে নিয়ে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে নোটিস পড়ার ঢঙে পড়তে লাগলেন প্রতিটা ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ নিবন্ধের নাম। কান চাপা না দিলেও কমলাক্ষের শ্রবণ ইন্দ্রিয়টি হয়তো লজ্জায় আপনা থেকেই দ্বার রুদ্ধ করে বসে রইল। কিন্তু কমলাক্ষ অন্যান্য ইন্দ্রিয় দিয়ে শুনতে পাচ্ছিল পিটি ম্যামের উচ্চকৃত স্বর, ‘বয়ঃসন্ধিকালে মেয়েদের কোন কোন অঙ্গের বিকাশ ঘটে?’ ‘মেনোপজের সময়ে মেয়েদের খিটখিটে ভাব হয় কেন?’ ‘সমকামিতা’, ‘লিঙ্গ-পরিবর্তন করতে কী কী অপারেশন করা হয়?’ ‘পুরুষদের স্পার্ম কাউন্ট কমছে কেন?’ ‘নারী ধর্ষণের বিচারে কী কী মেডিকেল টেস্ট করা হয়?’…
হাসির চাপা আওয়াজে ভরা ঘরে কমলাক্ষ কান লাল করে টেবিলের ওপর পড়ে থাকা পত্রিকাগুলোর নিচে লেখাগুলো পড়ছিল; গল্পঃ রবি ফসলের দেশে — কমলাক্ষ কর, কিংবা ছোটগল্পঃ অপরূপ খিলান — লেখকঃ কমলাক্ষ কর, অথবা এবারের সংখ্যায় কমলাক্ষ করের ছোটগল্প ‘এই ঘর অবিকল’…
সম্বিত ফিরতে কমলাক্ষ টিচার্স রুমের বাইরে গেল। ঘরের ভিতরের চাপা হাসিটাও তখন ফেটে পড়ল জলপ্রপাতের মতো। কমলাক্ষ টয়লেটের দিকে যেতে দেখল লেডিস টয়লেট থেকে সঙ্গীতা বেরোচ্ছে। সঙ্গীতা কখন যে উঠে বেরিয়ে গেছে কমলাক্ষ খেয়ালই করেনি। সঙ্গীতা নিচু স্বরে বলল, বিগ হাউসে ছাপানোর যখন এত শখ তখন বেছে বেছে মেয়েমহলের পত্রিকা ছাড়া আর কোন পত্রিকা ছিল না?
অবাক বিস্ময়ে সঙ্গীতার ভেজা মুখের দিকে তাকিয়ে কমলাক্ষ দেখতে পাচ্ছিল কীভাবে জলের রেণুরা ছড়িয়ে পড়ছে কপাল থেকে চোখে, নাক থেকে ঠোঁটে, কান থেকে ঘাড়ে, গলা থেকে বুকে…
রুমাল দিয়ে মুখ মুছে সঙ্গীতা বলল, এত কল্পনাশক্তি যার সে কমলাক্ষের বদলে অমলাক্ষ হয়ে লেখা পাঠালে ক্ষতি তো কিছু ছিল না!
কমলাক্ষ বিধ্বস্ত গলায় আমতা আমতা করে বলল, এতদিন লিটিল ম্যাগাজিনেই লিখতাম…
সঙ্গীতা কমলাক্ষকে থামিয়ে বলল, আমি জানি, ‘অনিলেখা’র সম্পাদক বিজন রায় আমার দাদা।
—বিজনদা আপনার দাদা? আপনি কি তবে কবি লেখিকা রায়?
—হ্যাঁ।
কমলাক্ষের চোখের সামনে ভেসে উঠল অজস্র পত্রিকার কবিতার পাতায় লেখিকা রায়ের নাম। কমলাক্ষের গল্পগুলো এইসব বাণিজ্যিক পত্রিকাগুলোতে প্রকাশের পর ‘অনিলেখা’র দপ্তরে বসে পত্রিকাগুলো ওল্টাতে ওল্টাতে একদিন বিজনদা বলেছিলেন, কমলাক্ষ তুমি ছদ্মনামে পাঠাতে পারতে। এগুলোতে প্রকাশের পর এই অঞ্চলের লিটল ম্যাগাজিনগুলোর কাছেও তুমি বাণিজ্যিক পত্রিকার লেখক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে গেলে, ভায়া। এই তো দেখোনা আমার বোন লেখিকা রায় ছদ্মনামে কত বাণিজ্যিক পত্রিকায় লিখে চলেছে।
।।পাঁচ।।
সঙ্গীতা পাশ কাটিয়ে টিচার্সরুমের দিকে চলে গেল। সঙ্গীতার যাবার পথের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল কমলাক্ষ। সম্বিত ফিরল ঋদ্ধিমার ‘স্যার’ ডাকে। ঋদ্ধিমা কাঁচুমাঁচু করে বলল, সরি স্যার, আমি…মানে…ঠিক বুঝতে পারিনি, এমন হয়ে যাবে…
কমলাক্ষ দেখল ঋদ্ধিমার হাতেধরা ম্যাগাজিনগুলোর অবস্থা সঙ্গীন। পিন ছিঁড়ে মলাট আলগা হয়ে ঝুলছে। ওরা দুমড়ে-মুচড়ে ফেলেছে মেয়েটার সযত্নে রাখা ম্যাগাজিনগুলো। কমলাক্ষ হাত বাড়িয়ে বলল, ওগুলো আমায় দাও।
কমলাক্ষ লাইব্রেরিতে গিয়ে ড্রয়ারের অন্ধকার গহ্বরে সযত্নে রাখা পত্রিকাগুলো বার করে ঋদ্ধিমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, এগুলো তোমার কাছে রাখো।
ঋদ্ধিমা বিহ্বল হয়ে নিজের হাতে ধরা পত্রিকা আর স্যারের হাতে ধরা পত্রিকা দু’টোই দেখতে লাগল। কোথাও থেকে একটা হঠাৎ হাওয়া এসে ঋদ্ধিমার হাতে ধরা পত্রিকার ওপরের কভারের কিছুটা উড়িয়ে দিচ্ছিল। লেখকসূচিতে কমলাক্ষ কর নামটা ভেসে উঠছিল বার বার। কমলাক্ষ বলল, ওহো, তোমার তো আবার অটোগ্রাফ চাই। বলেই নিজের হাতে ধরা পত্রিকাগুলোয় সই করতে লাগল। ঋদ্ধিমা দেখছে টেবিলে বসে তাদের লাইব্রেরি স্যার স্বাক্ষর করে চলেছেন। প্রতিদিনের চেনা লাইব্রেরি স্যার না আড়ালে থাকা লেখক কমলাক্ষ কর! মানুষটা আসলে কে? সই পর্ব শেষ হলে কমলাক্ষ পত্রিকাগুলো ঋদ্ধিমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, কি এবার খুশি তো?
ঋদ্ধিমা পত্রিকাগুলো বুকে চেপে ধরে চলে যাচ্ছে। টিচার্সরুম থেকে কি এখনও হাসির আওয়াজ ভেসে আসছে! হঠাৎ ঋদ্ধিমা ঘুরে ফিরে এল, স্যার, আমি কিন্তু আপনার গল্পগুলো সত্যিই পড়েছি। আর আমার সত্যি খুব ভাল লেগেছে, স্যার।
শেষ বেলার রোদ এসে বুড়ি ছুঁয়েছে ঋদ্ধিমার গাল। কমলাক্ষ ভাবছে এ কে? ক্লাস টেনের ঋদ্ধিমা না এক পাঠক! কে কার কাছে এসেছে? একজন পাঠক কি একজন লেখকের কাছে এসেছে? না কি একজন লেখক তার পাঠকের কাছে পৌঁছেচে?
বিহ্বল স্যারকে রেখে ঋদ্ধিমা চলে যাচ্ছে সারা গায়ে আলোর রেণু মেখে। কমলাক্ষ ভাবছে, ছদ্মনামে তার কোন লজ্জা সার্থক ভাবে ঢাকা যেত কি? লিটল ম্যাগাজিনই হোক আর বাণিজ্যিক পত্রিকা, ফসল তো তারই — নিজের পরিশ্রমের ফসল। এই রবি শস্যের দেশের উর্বর মাটির বিপুল ফসলের ভিড়ে তার ফসলটিও তো ফসলই। ফসলের সার্থকতা ক্ষুধা নিবারণে। শুধু কী তাই! ফসলের বুকে যে শস্য আছে সঠিক মাটিতে পড়লে তা থেকে মাথা তুলবে নতুন চারা।
জ্ঞানদাসুন্দরী দেবী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের লাইব্রেরি স্যার শ্রী কমলাক্ষ কর এই রকম একটি নতুন চারাকে পড়ন্ত বেলার আলোকবৃত্তে ঢুকে পড়তে দেখলেন।
***
লেখক পরিচিতি: মৌসুমী ঘোষ বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী। ‘সাইন্যাপস পত্রিকা’ নামে একটি লিটল ম্যাগাজিনের যুগ্ম সম্পাদক। ‘জ্বলদর্চি’ নামক লিটিল ম্যাগাজিনের ‘ছোটোবেলা’ ওয়েব সংস্করণের বিভাগীয় সম্পাদক। ‘মৌসুমী যে অণুগল্পগুলি লিখেছিল’ নামে অণুগল্পের বই ও ‘সোনালি খড়ের বোঝা’ ও ‘জাঙ্গুলিক’ নামে ছোটগল্পের দুটি বই। ‘যেসব গল্পের কোনো মানে হয় না’ নামক যুগ্ম গল্পের বইএর লেখিকা। ‘বহুস্বর’ পত্রিকা আয়োজিত ‘অনন্ত কুমার সরকার স্মৃতি, ২০১৭’ ছোটগল্প প্রতিযোগিতায় প্রথম, ‘আমি বাংলায় কথা কই’ গ্রুপ আয়োজিত স্বাধীনতা দিবসের (২০২১) ছোটগল্প প্রতিযোগিতায় প্রথম। ‘গল্পসল্প’র আটচালা’ আয়োজিত ‘উৎপল গঙ্গোপাধ্যায় স্মৃতি ২০১৯ অণুগল্প প্রতিযোগিতায় প্রথম, চক্রবর্তী-চ্যাটার্জী ও ‘দেব সাহিত্য পরিষদ’ আয়োজিত ‘উত্তরাধিকার কাদের হাতে’ অণুগল্প প্রতিযোগিতা ২০২১ দ্বিতীয়, ‘পথের আলাপ’ আয়োজিত ছোটগল্প প্রতিযোগিতা ২০২০ অন্যতম সেরা দশে স্থান লাভ। ‘বইসই’ আয়োজিত অনলাইন অণুগল্প প্রতিযোগিতা, ২০২৩ সেরা দশে স্থান পায়। সানন্দা, কিশোরভারতী, আজকাল রবিবাসিরীয়, দৈনিক স্টেটসম্যান, সুখবর, তথ্যকেন্দ্র, আরম্ভ, দ্য ওয়াল পত্রিকায় নিয়মিত ছোটগল্প প্রকাশ। ত্রিপুরার স্যন্দন পত্রিকার শারদীয়া সংখ্যা প্রকাশিত হয় উপন্যাসিকা 'প্রেক্ষাগৃহ'।

2 মন্তব্যসমূহ
অন্য স্বাদের গল্পটি পড়ে খুব ভাল লাগল
উত্তরমুছুনপড়লাম। বেশ ভালো লাগল। একদম অন্য রকম ভাবনা। কমলাক্ষ চরিত্রটির নির্মাণ যথাযথ। গল্পের নাম 'আলোর রেণু' হলে আরো ভালো লাগত।
উত্তরমুছুন