পূর্ণিমা গেছে ক’দিন আগে। সন্ধের দিকে এখন ক’ঘড়ি চাঁদ দেখা যায়। তারপরে তার আভাটাই যা থাকে কিছুক্ষণ। সেই আলোয় ঠাউরে ঠাউরে ঝামা পাথরের চাঙড় বেয়ে জলে নেমে পড়ল ভোলা। বাইরে থেকে ফিরে পা না ধুয়ে ঘরে গেলেই বউ মলিনা আচারবিচারের বচন শুরু করবে। সময় অসময় বুঝবে না। বিকেল বিকেল বেরিয়েছিল ভোলা। টর্চটা নিতে ভুলেছে। ঠিকায় জমিন নেওয়ার খোঁজে গিয়েছিল। হয়নি। কপাল। এ কপালে লাঙল চষলেও কিছু উঠবে না।
আনমনার মতো এক পা দিয়ে অন্য পা-টা ডলে নিয়ে ঝুঁকে পড়ে মাথায় কয়েক ফোঁটা জল ছিটিয়ে নিল ভোলা। ছোটবেলায় মা-ঠাকুমারা করে দিত। তাহলে নাকি বাতাসিয়া লাগে না। তাদের ধারণা, পুকুরের জলটাই তখন গঙ্গাজলের কাজ করে। বড়ো হতে হতে এসব অভ্যেসে দাঁড়িয়ে যায়। তবে বাতাসিয়া তো তার লেগেই গেছে বলে মনে হয় ভোলার।
ন’টা পেরিয়ে গেছে হবে। তার মানেই পাড়াগাঁয়ে গভীর রাত। তার ওপর যদি শীতকাল হয় তো কথাই নেই। খাওয়াদাওয়ার পাট চুকিয়ে নিয়ে খিড়কি দোর, সদর দোরে খিল এঁটে, আলো নিভিয়ে মানুষ ঢুকে পড়ে লেপের ভেতর।
ঘরের আলো নিভে গেলেই গ্রাম একেবারে ঘুরঘুট্টি অন্ধকারে। রাস্তার ধারে পোস্ট আছে। আলো নেই। তার মধ্যে তাল, নারকেল, শিরীষ বড়ো বড়ো গাছগুলো দাঁড়িয়ে থাকে, নিঃশব্দে শ্বাস ফেলে। একা পথে মানুষ গেলে গা ছমছম করবে তার।
কয়েকটা পাথরে পা ফেলে ফেলে আবার পাড়ে উঠে আসে ভোলা। দাঁড়ায় আম গাছটার নীচে। পাশেই নারকেল গাছের গোড়ায় ঘুঁটেপোড়া ছাইয়ের ঢিবি। ওখানে বসে থালাবাসন, কালিধরা হাঁড়ি-কড়াই মাজে মলিনা। জায়গাটায় গর্ত হয়ে গেছে। সেই গর্তে আঁজলাখানেক জল বেঁধে থাকে সবসময়। ছাই মিশে মিশে জলটা কালো। তাতে একটা খড়ের লুটি। এখন যদিও সবই অন্ধকারে মিশে।
ঝুরঝুর করে মাথায় এক লথা আমচনা পড়ল। গাছে গাছে এ বছর আমের বউল ধরেছিল খুব। কিন্তু কুয়াশা হওয়ায় আমচনাগুলো সব পুড়ে কালো পড়ে যাচ্ছে। এইভাবে হিম পড়তে থাকলে আমের আর নামগন্ধ থাকবে না। ঘাড় ঘুরিয়ে গাছগুলো লক্ষ করে ভোলা। কিছুই দেখা যাচ্ছে না। শুধুই বুদা বুদা অন্ধকার। পাতার ফাঁকফোকরে কোনও পাখি বা বাদুড়ের ডাল বদলের ঝুড়-মুড় আওয়াজ আর ঝিঁঝির ডাক। অকারণে কয়েকটা ব্যাং ডেকে মরছে।
নিশ্চিন্তে বিছানা নিয়েছে গাঁয়ের মানুষ। ভোলার মতো চিন্তার পাহাড় তো আর সকলের মাথায় চেপে নেই। চাপা দীর্ঘশ্বাস পাঁজরার ভেতরে খুঁট মারতে থাকে। সে ঘরের দিকে এগোতে যাচ্ছিল। থমকে গেল।
ওখানে, ওই হাবাল গাছটার কাছে জলে গাবুস করে একটা শব্দ হল না? হ্যাঁ, আবারও শুনল বলে মনে হল। নিমেষে শরীরের ভেতর একটা শিহরণ বয়ে যায় ভোলার। তাহলে কি সে যা ভাবছে তাই? আগে কতবার আশায় বুক বেঁধে একা এসে দাঁড়িয়েছে নির্জনে। কখনও তো কিছু চোখে পড়েনি বা ওইরকম শব্দও শোনেনি! আজ কি তাহলে সেই দিন?
হ্যাঁ, এখনও তো শীতকাল! বাচ্চাদের মতো আনন্দে লাফিয়ে উড়তে ইচ্ছে করছে ভোলার। মনে নতুন করে আশাটা আবার চাগাড় দিয়ে ওঠে। সে আস্তে আস্তে পা ফেলে তুলো গাছটার আড়ালে গিয়ে দাঁড়ায়।
সামনে যে তাদের পৈতৃক পুকুরটা, তার দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে হাবাল গাছটার ছায়ায় ঠান্ডা কালো জল টুপুর-টুপুর করছে । ওখান থেকেই উঠেছিল টাকাগাগরা!
সেবারও ছিল শীতেরই সময়। দাদু শরৎ গায়েন দুপুরে খাওয়ার পর পুকুরে এঁটো হাত ধুতে গিয়ে দেখে, পুকুরের দক্ষিণ দিকের পাড়ে তিনটে চকচকে গাগরা পরপর বসে রোদ পোহাচ্ছে। দাদু তক্ষুনি ছুট্টে ঘরে গিয়ে থালা থেকে কিছুটা সুকুড়ভাত এনে পা টিপে টিপে গিয়ে গাগরাগুলোকে লক্ষ্য করে ভাত ছুড়ে মারে। গাঁ-ঘরের দিকে সকলেই জানে, টাকাগাগরা একমাত্র সুকুড়ভাতেই আটকে পড়ে। গায়ে এঁটো ভাত লাগা মানে তারা আর নড়তে চড়তে পারে না।
চোখের সামনে দুটো গাগরা গাবুস-গুবুস আওয়াজ করে হাবাল গাছের ছায়ার জলে ডুবে যায়। একটা গাগরায় সুকুড়ভাত লেগে গিয়েছিল, সেটা পাড়েই বসে থাকে। দাদু ছুটে গিয়ে ঢাকনা খুলে দেখে, টাকা ভর্তি গাগরা!
হাতের তালুর মতো ছোট গাঁ কমলপুর। শাঁখের আওয়াজের মতো খবরটা ছড়িয়ে যেতেই হুলুস্থুল পড়ে যায়। মাঘেও যেন লোকের গায়ে শীত নেই! টাকার গরমে পারলে গরম জামাকাপড় ছেড়ে ফেলে দলে দলে মানুষ শরতের বাড়ির দিকে দৌড়োয়। তাদের মধ্যে সকলেই যে গরীব তা নয়, অবস্থাপন্নরাও আছে। সকলের মনে কৌতূহল— কেমন সে গাগরা? কত টাকা থাকে তাতে! যা পেয়ে লোকে রাতারাতি বড়লোক হয়ে যায়! একবার গাগরাটাকে চোখের দেখা দেখবে।
তাদের মধ্যে কেউ বলে, “শরতের কপাল ফিরে গেল গো। ওর আর এ জীবনে কষ্ট থাকবেনি।”
কেউ বলে, “ও জিনিস পাওয়া মানে ভালোর ভালো, মন্দও বটে। টাকাগাগরা সবাইকে নাকি দেখা দেয় না, আর যাকে দেয় তার আসলে মন বিড়ায়। নিজের লোভ সামলাতে পারল তো ভালো, নয়তো টাকাগাগরার ফাঁদে পড়িয়া কত লোক অকালে প্রাণ হারায়। পূর্বপুরুষ কয়ে গেছে জানো না, যাদের পুকুরে টাকাগাগরা থাকে তাদের ওপর নাকি অপদেবতার দৃষ্টিও রয়!” যে লোকটা পুরনো কথা উসকে বের করছিল সে যেন নিজেই শিউরে ওঠে।
আর একজন বলে, “দেবতার আশীব্বাদ হোক কি অপদেবতার কোপ, অত টাকা একসাথে পাওয়ার পর আমার মরেও দুঃখ রইবেনি।”
অন্যজন বলে, “মরেই যদি যাবি তাহালে টাকাগাগরা পেয়ে লাভ কী! ভোগ তো করতে পারলুনু?”
“আমি না পারি, আমার পরে যারা রইবে তাদের জীবনে তো দুঃখকষ্ট রইবেনি।”
দাঁড়িয়ে থেকে থেকে পা ধরে গেছে ভোলার। সে তুলো গাছের গুঁড়ি আঁকড়ে বসে পড়ল। মশাগুলো বিনবিন করছে। ওরাও সুযোগ পেয়ে গেছে আজ। আন্দাজে হাত চালিয়ে কতগুলোকে ডলে দিল। মাথা মুড়ি দেওয়া গায়ের চাদরটা টেনেটুনে দিল পা অবধি। সে এখন খটাশের মতো জুলজুল চোখে চেয়ে আছে। আওয়াজটা যেখান থেকে আসছে সেই দিকে তার লক্ষ্য।
পুকুর থেকে ওঠা টাকাগাগরা নিয়ে পাড়ার লোকে নানান কথায় ডুব দিয়েছিল। তাদের কথা ছাপিয়ে হঠাৎ একটা কান্নার আওয়াজ ওঠে। শরতের মা চারুবালা ছেলের ওপর লুটিয়ে পড়ে আছাড়িপিছাড়ি খাচ্ছে আর কাঁদতে কাঁদতে বলছে, “এ তোমরা দেখো গো… বাছার আমার কী হলা গো… কেন তুই লোভে পড়িয়া টাকাগাগরা নিতে গেলি রে বাপ… আইজ তাহালে এমন দিন আমাকে দেখতে হত না রে বাপ…”
সকলে হতভম্বের মতো দেখল— শরৎ এক হাতে ছাতি চেপে ধরে হাঁ করা মুখে টেনে টেনে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করছে। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার নাক-মুখ দিয়ে রক্ত বেরিয়ে এসে শরীর এলিয়ে গেল।
ছেলেকে ওই অবস্থায় দেখে সৃষ্টিধরও পাশে গড়িয়ে গেছিল সেদিন। দেখে মনে হবে ভাত খেয়ে বাপ ছেলের পাশে ঘুমোচ্ছে। সেই ঘুম থেকে সৃষ্টিধরকে আর কেউ ওঠাতে পারেনি।
“ছেলেটার শোক বাপ আর নিতে পারল না গো! তাই এতবড় কাণ্ডটা আইজ চোখের সামনে ঘটে গেল।”
“আমি তো আগেই কয়েছিলাম, ওসব জিনিস ভোগ করা সহজ কথা না। টাকাগাগরা আইজ অবদি যাকে যাকে দেখা দিছে তার ভালো হয়নি।”
“আমার কী মনে হয় জানো, বাকি যে দুটো গাগরা পুকুরে ডুবে গেছে তারাই শরৎকে ডেকে নিল। না হলে নাক-মুখ দিয়ে রক্ত উঠবে কেন?”
ভিড়ের মধ্যে ভিন্ন কথাও বলেছিল কেউ, “আমি তো শুনেছি যে স্টোক-ফোক হয়ে গেলেও নাকি নাক-মুখ দিয়ে রক্ত বেরোয়। শরতের বোধহয় তাই হয়েছে। তাই দেখে বুক ধড়ফড়িয়ে বাপও গেল। ওকে বলে হাট অ্যাটাক।”
এ কথা যে লোকটি তুলেছিল তাকে প্রায় কেউ পাত্তাই দিল না। শরৎকে টাকাগাগরাই নিয়ে গেছে। বাকিদের এমনটাই বিশ্বাস হয়েছিল। কিন্তু যেজন্যে তাদের আসা সেই টাকাগাগরা তারা তখনও কেউ চোখেই দেখেনি। শরতের কাছে যে জানতে চাইবে তার আর উপায় নেই। মনের দুঃখ বুকে নিয়েই যে যার বাড়ি ফিরে গেল। সে দুঃখ বাপ-ছেলে মরে যাওয়ার নাকি টাকাগাগরা দেখতে না পাওয়ার, তা আর কে বলবে এতদিন পরে? হতে পারে দুটোরই।
শরৎ গায়েনের ঘরে তখন শোকের ওপর শোক। টাকাগাগরার কথা আর কারও মাথায় নেই। দিন পনেরো পরে সব ক্রিয়াকর্ম যখন চুকেবুকে গেল তখন টাকাগাগরার খোঁজ পড়ল। সারা ঘরে তন্নতন্ন করে খোঁজা হল কিন্তু গাগরা পাওয়া গেল না! শরতের মা, ঠাকুমা আবারও বিলাপে বসল।
কেউ কেউ মনে মনে খুশি হল। কেউ আবার সেই খুশি চেপে রেখে সামনে এসে চারুবালাকে কয়েকটা সান্ত্বনার কথাও বলল, “স্বামী গেল, ছেলে গেল, ও টাকা লিয়া তুমার আর কী হবে বউ। যে যাওয়ার সে তো গেছে। তুমার যা সব্বোনাশ হওয়ার সেও তো হয়েইছে। টাকা লিয়া তুমার কি আর সুখ ফিরবে বউ?”
বসে মশা তাড়াতে তাড়াতে ভোলার চোখ মাঝে মাঝে পিছনে ঘুরে যাচ্ছিল। ওই দিকেই তার ঘর। রাত বাড়ছে, মেয়েদুটো এখন কী করছে কে জানে? মাকে আর মানতে চায় না তারা। সন্ধে হলেই পড়ালেখা বাদ দিয়ে পাশের বাড়িতে চলে যায় টিভি দেখতে। খাওয়াদাওয়া হয়ে গেছে কি ওদের? খাবে আর কী? রোজ সেই আলু ভাতে নয়তো ভেঁড়ু ভাতে ভাত।
এই সময় ভোলার মনে হল, মলিনা হয়তো ভাতের থালা নিয়ে বসে আছে তার জন্য। এঁটো থালা থেকে চাট্টি সুকুড়ভাত যে নিয়ে আসবে তার উপায় নেই। দেরি হচ্ছে দেখে মলিনা আবার খুঁজতে বেরিয়ে পড়বে না তো তাকে? আর ঠিক তখনই যদি টাকাগাগরাগুলো আসে! নিজে কোনও শব্দ না করে মশার কামড় খাচ্ছে। শেষে সব ভেস্তে যাবে না তো? এখান থেকে নড়া যাবে না। গাগরা দেখলে সোজা গিয়ে জাপটে ধরবে। কিছুই দেখা যাচ্ছে না, এই হল গোলমাল। কোনও কিছু নামছেও না, উঠছেও না। সব যেন থমকে রয়েছে। অথচ শব্দটা যে সে শুনেছিল তাতে কোনও ভুল নেই। কী হল তাহলে ব্যাপারটা?
শরতের বাড়ির ঘটনাটা কিছুদিন পাড়ার ঘরে ঘরে রটনা হয়ে ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে সবই অতীতে চলে যায়। কমলপুরের মানুষও যখন সেই কথা ভুলতে বসেছে, সেই সময়ে নতুন ঘটনা শোনা যেতে লাগল। শরতের বাড়ির পিছনে অচিন্ত্য খাটুয়ার বাপ নাদু খাটুয়া নাকি মাটির ঘর ভেঙে পাকার বাড়ি তৈরিতে নেমেছে! আত্মীয়কুটুম ডেকে ভালোমন্দ খাওয়াদাওয়া, সে এক এলাহি ব্যাপার! দেখতে দেখতে পুকুরে কাঠের ঘাট বদলে শান বাঁধানো ঘাট তৈরি করল! শুধু তাই নয়, বড়ো বড়ো বন্দের জমিন কিনছে, তার ওপর আবার এই বাজারে মেয়ে-বউয়ের গয়নাও নাকি গড়াচ্ছে শোনা যাচ্ছে।
গাঁ ঘরে বেশিরভাগই খেটে খাওয়া দিনমজুরির মানুষ। সেখানে রাতারাতি একজন বড়োলোক হয়ে যায় কী করে? লোকের মনে খটকা। নাদু এত টাকা পাচ্ছে কোথা থেকে?
তাকে কেউ জিজ্ঞেস করলে সে মিটমিটিয়ে হেসে বলে, “ঘর ভাঙার সময় পূব্বপুরুষের রেখে যাওয়া টাকাকড়ি পেয়েছি দেয়ালের ভেতর থেকে।”
আসল কথা চেপে যায় নাদু। বড়োঘরের মেয়ে বিয়ে করেছিল। একমাত্র মেয়ে। শ্বশুর ছিল না। একা শাশুড়ি। সেও মারা গেল গতবছর। গয়নাগাটি, জমি, বাড়ি সবই এসে পড়ল বউয়ের হাতে। নাদু তারই কিছু কিছু ভাঙিয়ে নিজের দিকে এনে ফেলেছে। স্ত্রীধন কি তার ধন নয়? সে কথা জ্ঞাতিবর্গকে খোলসা করতে যাবে কেন নাদু? তারা তাই ভেতরে ভেতরে গুমরে মরছে।
“তোর পূব্বপুরুষ আবার কবেকার বড়োলোক ছিল! তাহলে নুন আনতে পান্তা ফুরোয়? আর বড়োলোক হলে সে কথা আমাদের বাপ-ঠাকুদ্দারা জানত না? তাদের কাছে তো কোনওদিন কিছু শুনিনি!”
নাদু না বললেও কানাঘুষোয় যারা জানতে পেরেছিল তারাও কিন্তু বিশ্বাস করল না। শ্বশুরঘরের সম্পত্তি পেয়ে কারও কপাল খুলে যাওয়া অত সোজা নয়। আর যাদের মনে হল এমন হতে পারে, তারাও মুখ এঁটে রইল। যা রটছে রটুক না। হঠাৎ বড়োলোক হলে কথা তো সইতেই হবে। যারা হয় না তাদের বুকে কষ্ট নেই?
পাড়ার লোকে তখন দুইয়ে দুইয়ে চার করে নেয়। শরৎ গায়েনের ঘর থেকে যে টাকাগাগরা পাওয়া যায়নি সে গাগরা আসলে কে সরিয়েছিল এবার বোঝা যাচ্ছে। এই কথা চারুবালার কানে যেতেই সে কপাল চাপড়ে শাপসম্পাত করতে বসে। “ওরে আবাগির পো রে… ও সুখ তোর বেশিদিন সইবেনি রে… আমার পোর মুখ দিয়া রক্ত ওঠা টাকা তোরা ভোগ করতে পারবিনি রে… তোর ও মুখ শিগগির লুকাইবে…”
পঞ্চাশ বছর বয়েস হতে চলল ভোলার, এইসব গাল আর গল্প— দুই-ই শুনে শুনে বড়ো হয়েছে। মা, ঠাকুমাকে কতবার দুঃখ করে বলতে শুনেছে, তারা জমিদার হয়ে জীবন কাটাতে পারত। তার বদলে তাদের ফাঁকা মালসার দশা। একমুঠো ভাতের জন্যও হিমশিম খেতে হয়। আর তাদেরই টাকা নিয়ে লোকে বড়োলোকি করছে।
ইচ্ছে করলেই যেন সব ফিরিয়ে নিতে পারত ভোলা। গ্রামের মাথারা তো অনেকবার তাকে সেই পরামর্শও দিয়েছে। নাদু খাটুয়া তখন আর বেঁচে নেই। আছে তার ছেলে অচিন্ত্য। তাও তারা বলেছে, “লোকজন নিয়ে অচিন্ত্যর বাড়ি ঘেরাও কর ভোলা, আমরা আছি তোর পাশে।” ওদের কথায় ভোলার পাত্র নয় ভোলা। ওরা আজ তার পক্ষে তো কাল অন্যের। ঝামেলা চায় না ভোলা। তার বদলে সে নিজের মধ্যে একটা উদার ভাব বয়ে বেড়াচ্ছে।
খাটুনির কাজে ছোটো থেকেই ভয় ভোলার। প্রাইমারি টপকে হাইস্কুলে যেতে পারেনি। অনেকদিন অবধি মা, ঠাকুমার হেঁশেলে খেয়ে, ঘুরে দিন কাটিয়েছে। মাঝে মাঝে এটা সেটা করেছে। কিন্তু বিয়ের পর আর পালিয়ে বেড়ানোর উপায় রইল না। মলিনা সবসময়ের সঙ্গী। তার সামনে বেকার বসে থাকার জো নেই। পরপর দুই মেয়ে হল, তাদের দায়িত্ব। আর গা এলিয়ে থাকা যায় না। চাষের, ধান কাটার কাজের পাশাপাশি ঘর ছাওয়া, বাগান তাড়ার কাজও করতে শুরু করে ভোলা। আর আটমাসি চাষে লোকের জমিন নিয়ে চাষ আরম্ভ করল। কিন্তু মাঠে এখন ধানও ভালো হয় না। বেশি ফলন ফলানোর জন্য সার, বিষ ঢেলে ঢেলে মাটি নষ্ট হয়ে গেছে। কয়েক বছর পরে আর হয়তো ফসল পাওয়াই যাবে না। যাদের জমিন আছে, থেকেও পতিত পড়ে থাকবে। তখন হয়তো আরও অনেক জিনিসের মতো নকল চালের ভাত খেতে হবে!
ভোলা ভাবে, গাছের আড়াল ছেড়ে উঠে গিয়ে একবার দেখবে? নাঃ, এগিয়ে গেলে ভুল হয়ে যেতে পারে। তার চেয়ে এখানে ঘাপটি মেরে বসে থাকাই ঠিক। এলে আয় বাবা এইবেলা। জীবন তো ফুরিয়ে এল। আর কবে?
মাঘ মাসের শেষ হতে চলল, অনেক চেষ্টাচরিত্র করেও মাঠে এখনও ধানের একটা গোজ পুঁততে পারেনি ভোলা। নিজের গ্রাম ছাড়াও আশপাশের গ্রামগুলোতে হন্যে হয়ে খোঁজ করেছে। কোনও লাভ হয়নি। এ গ্রাম ও গ্রাম রোজ হাঁটতে হাঁটতে গ্রামগুলোও ছোটো মনে হয়। খবর পেয়ে আজও দু’জায়গায় গিয়েছিল। এ বছর কেউই জমিন ঠিকায় দিচ্ছে না। আগের বর্ষার চাষটায় ধান ভালো পায়নি চাষিরা। সেই ধান থেকেই তো সারাবছরের খোরাকি করে রাখে তারা। এ বছর কারও ঘরেই করা-চাউল হয়নি। মাসে মাসে রেশনে চাল, আটা, গম দিচ্ছে, তাই কিছুটা রক্ষে। যাদের জমিন বেশি— বর্ষার ধানে তাদের খোরাকি হয়ে যেত, আটমাসি চাষ করত না। টাকার বদলে অন্যকে জমিন ঠিকায় দিয়ে দিত। তারাও এ বছর শ্যালো চাষ করবে। ধরায় পড়েছে শুধু ভোলা। বউ-বাচ্চার মুখে দু’বেলা দু’মুঠো ভাতের জোগান যে কোথা থেকে করবে সে। সমস্যা অনেক, সমাধান কই?
ভোলা মরিয়া হয়ে ভাবতে থাকে। বাকি দুটো টাকাগাগরার একটাও যদি হাতে লেগে যায় তার, বাপের মতো কোনও ভুল করবে না সে।
দু’বাঁশের সমান গভীর জল তাদের পুকুরটায়। কখনই ওই জল কমে না। বরং বর্ষাকালে বেড়ে যায়। ঠাকুমার মুখে শুনেছিল, পুকুর ছেঁচার জন্য তাদের পুকুরে দু-একবার মেশিন বসেছে কিন্তু জল তার যেমন কে তেমন! কোথা থেকে যে জলের জোগান আসে কেউ জানে না। লোকে বলে, ও পুকুরে নিশ্চয়ই ঘোগ আছে। হতে পারে। নীচের সেই ঘোগের চোরাপথ দিয়েই জল ঢোকে। তাই ও পুকুর কোনওদিন জলশূন্য হবে না।
তবে কি পুকুরের একেবারে তলায় ঘুরে বেড়াচ্ছে টাকাগাগরাগুলো? আচ্ছা, যদি ওগুলো এক্ষুনি উঠে আসে পুকুর থেকে? গা থেকে টুপটুপ করে জল গড়িয়ে পড়বে, সঙ্গে অনেক টাকা! তাদের আর কোনও কষ্ট থাকবে না তাহলে। কিন্তু লোকে যে বলে ওরা নাকি এক জায়গায় থাকে না। তবে কি অন্য কোথাও, অন্য কারও পুকুরে চলে গেছে? সেখান থেকে উড়ে আসবে? না কি ওপর থেকে নামবে টাকাগাগরাগুলো?
তা কী করে হয়! তাহলে রাত হলেই পুকুর থেকে গাবুস-গুবুস আওয়াজ আসে কেন? সেই শব্দ শুনে লোকে তো বলে তাদের পুকুরে এখনও টাকাগাগরা আছে। পুকুরে একা নেমে গা ধুতে ভয় করে। ভোলা ভেবে ভেবে কূলকিনারা পায় না।
এই যে সে এখানে বসে আছে, টাকাগাগরাগুলো কি দেখতে পাচ্ছে তাকে? মানুষ দেখলে তো ওরা আবার সামনে আসে না। সেইজন্যই কি ওরা জল থেকে পাড়ে উঠছে না? কিন্তু সে তো এখন অন্ধকারে মিশে রয়েছে। তবে তার চোখ সওয়া হয়ে গেছে সব। পুব পাড়ে সারি দিয়ে নারকেল গাছ, কোনায় গোরু বাঁধার ডোঙা। এখন তারা গোয়ালে। ডোঙার পাশে কলা গাছের ঝাড় শুরু হচ্ছে। তার ঠিক পরেই হাবাল গাছটা। হাবালপাতা দিয়ে লম্বা, চোঙা বাঁশি বানিয়ে কত বাজিয়েছে সে ছোটবেলায়। ও গাছের কড়িকাঠ ভালো হয়। কিন্তু টাকাগাগরা যদি অন্য কোথাও চলে যায়? ওই গাছের নীচেই তো পুকুর। সে কথা ভেবেই কোনওদিন গাছে কুড়ুল বসায়নি ভোলা।
নাঃ, কোথাও কিছু নেই। ভোলা হতাশ মনে মাথা নামিয়ে আনে। উঠে দাঁড়ায়। তারপর ঘরের দিকে যাবে বলে পা বাড়িয়েও একবার পিছন ফিরে চমকে ওঠে। ঠিকরে ওঠে চোখের ঢ্যালাদুটো।
আরে, ওপর থেকে ওগুলো কী নামছে! নিজের চোখকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছে না ভোলা! গাগরা! টাকার গাগরা। সারি বেঁধে নামছে! দুটো নয়তো! তিনটে গাগরাই! ওরা কি তবে তিনটে ছাড়া থাকে না? আবার একটা কোত্থেকে এসেছে তাহলে! তার বাপ শরৎ গায়েন কি কোনও গাগরা পায়নি সেবার? কেউই পায় না? গাগরা কি তাই বাড়ে-কমে না কখনও?
গায়ের লোমগুলো টিকরে উঠেছে। হঠাৎ যেন শীতটা বেড়ে গেছে। কিন্তু চাদর খসে যাচ্ছে গা থেকে। সেই ছোটো থেকে শোনা গল্পের টাকাগাগরা! কত আশার জিনিস তার চোখের সামনে!
উড়তে উড়তে তারা পুকুরে নামল। এবার নাচের ভঙ্গিতে জলে দোল খাচ্ছে! কোথা থেকে একটা হালকা আলো এসে পড়েছে ওদের গায়ে। সেই আলোয় গাগরার জ্যোতি যেন ঠিকরে পড়ছে! ওগুলো কি সোনার? না কি পিতল-কাঁসা হবে? তাহলে ভেতরে টাকাগুলো কীসের? সোনা, রূপো না কি নোটের? কত টাকা আছে ভেতরে!
এ কী! পা উঠছে না কেন? মাটি যেন টেনে রেখেছে। শরীরে যত জোর আছে তার পুরো লাগিয়ে দুড়মুড়িয়ে ছুটতে শুরু করে ভোলা। ওই যাঃ। তার পায়ের শব্দে টাকাগাগরাগুলো আবার ওপর দিকে উড়তে শুরু করেছে। ডানা নেই কিন্তু উড়ছে। ভোলা পড়ি কী মরি করে অন্ধকারে হোঁচট খেতে খেতে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে যায় সেই হাবাল গাছটার কাছে। হাতে সুকুড়ভাতও নেই যে ছুড়ে মারবে, গাগরাগুলোকে আটকাবে। অসহায়ের মতো পড়েই থাকে সে। সামনেই যদুপতিদের বাঁশ জঙ্গল শুরু। ওদিকে আর পথ নেই। টাকাগাগরাগুলো উড়তে উড়তে আকাশে মিলিয়ে যাচ্ছে।
আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ায় ভোলা। যেন কী করবে বুঝতে না পেরে গা হাত-পা ঝাড়ে। মুখ তুলে তাকায় আকাশের দিকে। তারপর মাথা নামিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বাড়িমুখো হাঁটে। তার ফুটো কপাল। ওসব যারা পায় তারা লক্ষ্মীঠাকুরের কাছের কেউ হবে। আরও একবার আকাশে দেখে ভোলা। কিছু তারা দেখা যাচ্ছে শুধু। ওরা তো নতুন কিছু নয়। তাও অনেক দূরের জিনিস।
ভোলা আর কিছু দেখতে পায় না। যদি পেত তাহলে জানতে পারত, টাকাগাগরার জন্য সে এখন একা জেগে নেই। পাশের পাড়ার সুশীল জানার চোখেও ঘুম নেই। শুধু চাষবাস করে সংসার টানা দায়। পুকুরপাড়ে সেও যেন কী খুঁজছে। গ্রাম মেম্বার পুলিন সামন্ত দোতলা পাকাবাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে। মন অস্থির। আকাশের দিকে তাকিয়ে। দেখছে আকাশপথে কিছু উড়ে যাচ্ছে নাকি! স্কুলমাস্টার অনিল গড়াই খেয়েদেয়েও নিশ্চিন্তে বিছানায় গড়াতে পারেনি। বারান্দার রেলিং ধরে আকাশপানে চেয়ে। খানিক দূরে অচিন্ত্য খাটুয়ার ছেলে পিন্টু খাটুয়া উঠোনে ঘুরপাক খাচ্ছে আর থেকে থেকে মাথার ওপর চোখ ঘুরিয়ে আনছে। কিছু যদি চোখে পড়ে যায়। কেউ তো জানে না টাকাগাগরা কোথায় কখন নেমে আসে। আরও কতজন যে কোথায় রাত জাগছে তাই বা কে জানে।
***
[লেখাজোকা, অক্টোবর-ডিসেম্বর, ২০২৩]
লেখক পরিচিতি: মৃত্তিকা মাইতির জন্ম পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব মেদিনীপুর জেলার খেজুরির কাদিরপুর গ্রামে। পারিবারিক পরিস্থিতি সুস্থির না থাকায় তেমন কোনও প্রথাগত শিক্ষা পাওয়া হয়ে ওঠেনি। তাঁকে স্বশিক্ষিত বলা যায়। বৃত্তিমূলক শিক্ষাও অর্জন করেছেন সেভাবেই। ধান চাষ, তাঁত বোনা থেকে শুরু করে আশ্রমিক স্কুল, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের চাকরি, প্রেসের কাজ, পত্রিকার কাজও করেছেন বেশ কিছু দিন। বর্তমানে একটি প্রকাশনার সংস্থার সঙ্গে যুক্ত।
লেখালেখির শুরু ২০১৭ সালে। গল্প ও গদ্য লিখেছেন বেশ কিছু লিটল ম্যাগাজিনে। গল্প প্রকাশিত হয়েছে,‘দেশ’, ‘সাপ্তাহিক বর্তমান’, ‘বর্তমান’, ‘আজকাল’, ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’, ‘সুখবর’, ‘লেখাজোকা’, বাংলাদেশের ‘কালি ও কলম’ এবং অন্যান্য পত্রপত্রিকায়। ‘দ্য ওয়াল’ ওয়েব পোর্টালে লিখেছেন ধারাবাহিক উপন্যাস। যা পরে ‘পাখিঘর’ নামে বই হয়ে প্রকাশিত হয়। দ্বিতীয় উপন্যাস ‘অদৃশ্য জনপদ’ প্রকাশিত হয় ‘লেখাজোকা’ পত্রিকায়। প্রথম প্রকাশিত বই ‘পাখিঘর’ (উপন্যাস)। প্রকাশিত হয়েছে একটি গল্পগ্রন্থ ‘নতুন পালক’।
গল্পের জন্য পেয়েছেন ‘শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় ছোটগল্প সম্মান’ ‘লেখাজোকা পুরস্কার’ ও তরুণ গল্পকার হিসেবে পেয়েছেন ‘কবিতা এবং’ পত্রিকার সম্মাননা।
একইসঙ্গে গ্রাম ও শহর নিবিড়ভাবে দেখার ফলে এই দুই ভুবনেরই জীবন ও মানুষ উঠে আসে তাঁর লেখায়।


0 মন্তব্যসমূহ