সুদেষ্ণা দাশগুপ্তর গল্প : অসুখ


গারো দিন পর টাবলুর ফোনটা এলো। এ ক’দিন মনটা বড়ো খচখচ করছিল। বারবার কাকুর কথা মনে পড়ছিল। কাকিমার কথাও। এটা ঠিক যে বাবা মারা যাবার পর অসহায় মা’র পাশে একটিবারের জন্যও কাকু এসে দাঁড়াননি। সেই সময়ে বয়স কম থাকলেও এটা বুঝতে পারছিলাম যে কাকুর সম্পর্কে মামাবাড়ি থেকে শুরু করে পাড়া-প্রতিবেশি সবাই নিন্দে করেছিল খুব। তবে গৌহাটিতে যখন বদলি হয়ে গেলাম তখন কাকু বেশ ভালো ব্যবহার করেছিলেন। ছুটির দিন প্রায়ই দুপুরে কাকুর কাছে যেতাম, খাওয়া-দাওয়া করে একেবারে বিকেলে ফিরতাম। কাকুই আসতে বলতেন। কাকুর ছেলে টাবলুও আমাকে পছন্দ করত বুঝতাম। তবে ওকে আমার একটু অন্য ধরণের লাগত। পাশে বসে আমার সাথে গল্প করছে আবার একটু ছাড়া-ছাড়াই উঠে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে যেত, আবার ফিরেও আসত। বুঝতাম খুব সিগারেটের নেশা হয়েছে। কলেজে পড়ে। কুড়ি-একুশ বছর বয়েস, এখনই এরকম দেখে খারাপ লাগত। তবে যাতায়াত করলেও কাকুর পরিবারে খুব একটা একাত্ম আমি হতে পারিনি। ছোটবেলার কিছু স্মৃতি মনে গভীর দাগ কেটেছিল। বিয়ের পর আমাদের পারিবারিক নানা গল্প শুনে বর্ণা বলল,

“বুঝলে না? তখন যে তুমিও অফিসার হয়েছ! গৌহাটির ফ্যান্সি-বাজারের মতো জায়গায় ব্রাঞ্চ-ম্যানেজার, সেটার একটা সম্মান আছে তাই তোমার কাকু তোমায় অ্যক্সেপ্ট করেছিলেন, এ তো জলে মতো সোজা।”

বড়মামা ক্লার্ক ছিলেন বলে একবার নাকি কাকু তাঁকে খুব অবজ্ঞা করেছিলেন। আর বাবা যখন পারকিনসন্স অসুখে পঙ্গু হয়ে যান আর মা তারপর নার্সের চাকরি নিলেন, তখন থেকেই নাকি কাকু আর তেমন বাবা-মা’র সাথে সম্পর্ক রাখতেন না। এসব অনেক আগেকার কথা। তবে বাড়িতে বলাবলি হতো তাই বর্ণাও সব জানে।

অফিসার হয়েছি বলেই কিনা জানি না, গৌহাটি’তে গিয়ে কাকুকে যা দেখছি তার সাথে ছোটোবেলায় দু’একবার দেখা কাকুর একেবারেই মিল পাচ্ছিলাম না। রিটায়ার্ড কাকুকে কেমন যেন অসহায় দেখতে লাগছিল। সঠিক কারণটা বুঝতে পারতাম না। টাবলুকে নিয়ে কেমন একটা সন্ত্রস্ত ভাব টের পেতাম সব সময়েই। ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে হয়ত আমি আর টাবলু কথা বলছি। ওর বিভিন্ন দিকে উৎসাহ। বিশেষ করে ইতিহাস বিষয়ে। আর্কিওলজিক্যাল কাজ কোথায় কী হচ্ছে সেসব ব্যাপারে টাবলু খুব ওয়াকিবহাল। আমি যে এসব ব্যাপারে খুব কিছু জানতাম তা নয়, তবে খবরের কাগজে কিছু বেরোলে সেটা আমারও চোখে পড়ে, আমি পড়ি। কাকুর যে এসব ব্যাপারে কোনো আগ্রহ নেই, তা বেশ বুঝতাম। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার উনি ঠায় বসে থাকতেন আমাদের সামনে। কখনও আবার টাবলুর কথায় বাগড়া দিতেন,

“তোমার তো এসব বিষয় নয়, তুমি বরং ব্যাঙ্কিং রিক্রুটমেন্ট পরীক্ষার বিষয়গুলো জেনে নাও। যদি পাশ করতে পারো তাহলে একটা কিছু তো জোগাড় করতে হবে নাকি?” টাবলুর মুখটা কেমন নিস্প্রভ হয়ে যায়। পকেটে হাত ঢুকিয়ে ও বাড়ির বাইরে চলে যায়, ফিরে আসে দশ মিনিটের মধ্যে। বুঝি, সিগারেট খেয়ে এলো। ও এসে আমার পাশেই বসে। অন্য কোনো আলোচনা শুরু করতে যায়, কাকু তখন ওকে বলে, “যাও মা চা করছে, চা নিয়ে নিজের ঘরে যাও।”

পরক্ষণেই কাকিমা ট্রে-তে তিন কাপ চা নিয়ে ঢুকলেন। আমাকে আর কাকুর হাতে দিয়ে নিজেও নিয়ে আমাদের কাছে বসলেন। আমার খারাপ লাগছিল টাবলুকে কেন আমাদের মাঝে বসে চা খেতে দেওয়া হলো না। আমার মুখ দেখে কাকু কী বুঝলেন জানি না। বললেন,

“টাবলুর বন্ধুরা খুব একটা ভালো না, টাবলুরও পড়াশুনোয় মন নেই।” কাকুর কথার কোনো সামঞ্জস্য খুঁজে পাই না। ছেলের বন্ধুরা খারাপ যখন, তবে তো তার বাড়ির লোকেদের সাথে আরও বেশি করে সময় কাটালে ভালো। বিশেষ করে এখন আমি এসেছি, ও আমার সাথে কথা বলতে ভালোও বাসে। চা মুখে বিস্বাদ ঠেকে। তবু কাকিমা বানিয়ে এনেছেন, তাই যাহোক করে খেয়ে নিই। কাপ হাতে খাবার টেবিলে রাখতে যাই, আর তার সামনেই টাবলুর ঘরে ঢুকে ওকে বলতে গেলাম যে ---আমি যাচ্ছি।

“টা-বলু” বলে ডাকতেই ড্রইংরুম থেকে কাকু প্রায় ছুটে এসে আমায় থামান,

“চয়ন—ঠিক আছে, আমি টাবলুকে জানিয়ে দেব। তুমি কি বেরোচ্ছো? সাবধানে যেও।” আশ্চর্য লাগে আমার, খানিক বিরক্তি নিয়েই আমি বেরিয়ে আসি।

তার কিছুদিন পর আমি আমার কাঙ্খিত কলকাতায় বদলি হয়ে আসি, ফিরে আসি বাড়ি। বাড়ি বলতে মা-বাবা কেউ তো বেঁচে নেই আর। আমাকে লেখাপড়া শিখিয়ে কষ্টেসৃষ্টে একটা ছোট ফ্ল্যাট মা কিনতে পেরেছিলেন, তালা বন্ধ সেই আস্তানার দরজা খুলে ঢুকি। কলকাতায় ফিরে বর্ণার সাথে বিয়েটাও চট করে সেরে ফেলি। বিয়েতে কাকুরা কেউ আসেননি, তবে বর্ণার নাম করে ভালো অ্যামাউন্টের আশীর্বাদি পাঠিয়েছিলেন। খুব ছোটোতে বাবা, তারপর মা মারা যেতে যে কাকু কিছু একটা উপহার পাঠানো তো দূরের কথা, একবার আসেননি পর্যন্ত। তার এই ভোল-বদলে অবাক হই বেশ।

“চলো না গো আমরা গৌহাটি গিয়ে কাকু-কাকিমাকে প্রণাম করে আসি।” যৌথ-পরিবারে বড়ো হয়ে ওঠা বর্ণাকে অনেক বুঝিয়ে নিরস্ত করি। বর্ণা ফোন করে গৌহাটিতে। ওর কথা আমি শুনতে পাচ্ছি। কাকু-কাকিমার সাথে কথা বলে টাবলুকে চায় আলাপ করার জন্য।

“কাকিমা টাবলু আছে? ওকে দিন না একটু, ফোনেই আলাপটা সেরে রাখি।” ও-প্রান্তে কী কথা হয় শুনতে পাই না। কিন্তু বর্ণা মুখ কাঁচুমাচু করে পাশে এসে বসে। বুঝলাম, টাবলুর সাথে কথা হয়নি। নতুন বউ-এর কাছে নিজের পরিবার নিয়ে গ্লানি বোধ করতে হবে এমন কিছু জানতে চাই না আমি। খানিক পরে বর্ণা নিজের থেকেই বলে, কাকিমা নাকি ---“হ্যাঁ ধরো, টাবলুকে ডাকছি”, আর এরপরেই বর্ণা শোনে কাকু কাকিমাকে বকাবকি করছেন ---তোমার কী কোনো আক্কেল নেই, বলে দাও টাবলু বাড়িতে নেই। এরপর বর্ণা আর গৌহাটি যাবার বায়না করে না। আমার ওঁদের প্রতি বিরূপতা বর্ণার মধ্যেও সঞ্চারিত হয়। তবে টাবলুকে যে কেন আগলে রাখেন কাকু, বা বলা যেতে পারে সরিয়ে রাখেন, তার কোনো কারণ মাথায় আসে না।

এর পরের ঘটনা একেবারেই আকস্মিক। গৌহাটির সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন না হলেও বিজয়া, নববর্ষে ফোন করে প্রণাম, শুভেচ্ছা জানানো ছাড়া আর তেমন কিছু ছিল না। আমাদের মেয়ে ঝুমুর হওয়ার পর আমরা একটা বড়ো ফ্ল্যাটে চলে আসি। এখানেই একদিন কাকু ফোন করেন। গলা শুনেই বুঝি শরীর ভালো নয়।

“চয়ন, আমার একটা সিভিয়ার অপারেশন হবে কলকাতার প্রাইভেট এক হাসপাতালে। গৌহাটিতে করানোর সাহস পাচ্ছি না। টাবলুর মামারা থাকবে। তুমিও যদি হাসপাতালে সেইসময় সময় করে যেতে পারো, তাহলে তোমার কাকিমার একটু ভরসা হয়। টাবলু তো শুধু বয়েসেই বেড়েছে, বুদ্ধি-সুদ্ধি কিছু হয়নি। তাছাড়া ওর নিজেরই নানা কমপ্লিকেশনস আছে।”

আমি চারদিন ছুটি নিই। বর্ণা গা করে না দেখা করতে যাওয়ার। ওর এইসময় পরীক্ষার খাতা দেখার খুব চাপ, তাছাড়া ঝুমুরের স্কুল। আমিও চাইনি যে ও যাক। হাসপাতাল আমাদের এখান থেকে অনেক দূরে।

বিকেলের ভিজিটিং আওয়ার্স-এ কাকুকে দেখতে গেলাম। আগামীকাল অপারেশন। অসহায়তার কথা তো বাদই দিলাম, বেড-এ শুয়ে থাকা ভীতু একজন কে দেখে কাকু বলে বিশ্বাসই হচ্ছিল না। বাবার ভাই-বোনদের মধ্যে কাকুই পড়াশুনোয় সবচাইতে মেধাবী ছিলেন। তাই নিজের মা-বাবার কাছে একটু বেশিই আদর পেয়েছিলেন। দাদা-দিদিকে তেমন গ্রাহ্য করতেন না। আই-এ-এস পরীক্ষায় পাশ করার পর তার মাত্রা বেড়ে গিয়েছিল বহু গুণ। আপাদমস্তক একজন বড়ো অফিসারের মেজাজ ছিল ঘরে-বাইরে সর্বত্র।

কথা বলতে পারলেন না কাকু, আমার দিকে হাত বাড়ালেন। হাত ধরে থাকলাম অল্পক্ষণ। পায়ের কাছে একটা টুল রাখা, কাকিমা স্থির বসে আছেন। বিয়ের পর থেকে এই মানুষটা কাকুর নির্দেশ পালন করতে করতে নিজস্বতা হারিয়েছেন বলে মনে হয়েছিল এতদিন, কিন্তু আজ চেহারা দেখে তেমন ভেঙেপড়া লাগল না। খানিক যেন প্রত্যয়ী। ওঁকে বলি,

“আপনি কীভাবে ফিরবেন? টাবলু আসেনি?”

কাকিমা একাই ফিরবেন জেনে ওকে আমি পৌঁছে দিতে নিয়ে আসি গাড়িতে। কাকিমা বলেন যে টাবলু কলকাতায় এসেছে, মামাবাড়িতেই আছে। দু-সপ্তাহের ছুটি নিয়ে এসেছে।

“ছুটি মানে? ও কী করছে?” কাকিমা জানান, টাবলু চারবছরের ওপর কাজে যোগ দিয়েছে। সরকারি চাকরি।

“সে কী! এতো ভালো খবরটা তো জানতেই পারিনি, টাবলু সরকারি চাকরি করছে! বাহ খুব ভালো খবর।”

আজ কাকিমা অনেক কথা বলেন।

“আসলে টাবলু তো ক্লার্কের চাকরি পেয়েছে তাই তোমার কাকুর দুঃখ। কাউকে জানাতে চায় না ছেলের চাকরির বিষয়ে।”

যে মানুষটা হাসপাতালে শুয়ে আছে, কাল একটা বড়ো অপারেশন, তার মানসিকতা নিয়ে আলোচনা করতে ইচ্ছে করে না। আমরা দুজনেই চুপ করে থাকি। শুধু কাকিমাকে গাড়ির থেকে নামানোর সময়ে বলি,

“কাল টাবলুর সাথে আসবেন কাকিমা, ছেলের কাছে থাকা দরকার।” কাকিমা ঘাড় হেলিয়ে “হ্যাঁ” বলেন। বুঝি উনিও তেমনটাই ঠিক করে ফেলেছেন।

বাড়ি ফিরে খুব ক্লান্ত লাগছিল। গরমও পড়েছে খুব। তাড়াতাড়ি স্নান করে আসি। বর্ণা ঝুমুরকে পড়াচ্ছে।

“আবার হাত থেকে পেন্সিল ফেলে দিলে, রাইটিং এরকম বেঁকে যাচ্ছে কেন তোমার?”

টেবিলের পাশ থেকে পেন্সিল তুলে ঝুমুরের হাতে দিই। ওর নরম চুলে হাত রেখে বলি,

“ঝুমুরের কি ঘুম পেয়ে গেছে নাকি? বিকেলে খুব সাইকেল চালিয়েছো, হ্যাঁ?” বর্ণাকে বললাম ওকে এখন ছেড়ে দিতে। চার বছরের মেয়েকে এত চাপ দিতে হবে না। বর্ণা যথারীতি রেগে ওঠে,

“না গো, ও প্রায়ই পেন্সিল ফেলে দেয়।” বর্ণা খাবার গরম করতে গেলে আমি ঝুমুরের সাথে গল্প শুরু করি।

“কেন মা তুমি লিখছ না মন দিয়ে। স্ট্রেট লাইন ড্র করে জিগজ্যাগ করছ। পেন্সিল কেউ ফেলে দেয়?”

ঝুমুর প্রতিবাদ করে যে ও ইচ্ছে করে ফেলেনি, হাত থেকে পড়ে গেছে। মনে মনে হাসি। এই বয়েস থেকেই তাহলে মেয়ে তৈরি হচ্ছে মা’র সাথে ফাইট করার জন্য।

“দুষ্টু হচ্ছো কিন্তু ঝুমুর। চলো মা খেতে ডাকছে।”

গম্ভীর মুখে বর্ণা ঝুমুরকে খাওয়ায়। আমিও আর দেরি করি না। কাল সকাল সাড়ে দশটায় কাকুকে ও-টি’তে নিয়ে যাবে। তার খানিকটা আগে আমি পৌঁছতে চাই। শুয়ে পড়ি। বর্ণাকে খাতা দেখতে হবে।

কাকিমারা আমার আগেই এসে গেছিলেন হাসপাতালে। টাবলুর এক মামা’ও এসেছেন। যদিও তিনি বেশিক্ষণ থাকেন না, দুপুরের পর আবার আসব ---জানিয়ে অফিসের জন্য বেরিয়ে গেলেন। কাকুকে ও-টি’তে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আমরা তিনজন রিসেপশনে বসে। কাকিমা দেওয়ালে লাগানো স্পিকারের দিকে তাকিয়ে। থমথমে পরিবেশ কাটাতে আমি টাবলুর সাথে কথা বলতে শুরু করি। ফুলশার্ট পরে এসেছে ও। শার্ট-প্যান্ট দুটোই বেশ ঢোলা। আজকের ছেলেরা ঠিক কী এরকম পরে, কে জানে! এক সময় ওর সাথে আমার বেশ ভাব হয়েছিল, আজ বেশ আড়ষ্ট। যদিও অস্থিরতার ভাব আছে, যা আগেও ছিল। বসে থাকলে দু’টো হাতের আঙুলগুলো একে অপরের সাথে ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে জড়ো করে রাখছে। মাঝেমাঝেই উঠছে, পায়চারি করছে, তখন ডান হাত পকেটের মধ্যে। এই স্বভাব ওর আগেও ছিল, গৌহাটিতে দেখেছিলাম।

কাকুর অপারেশন বেশ ঝুঁকির যদিও, অপারেশন না করেও উপায় নেই। ম্যালিগন্যান্সি ধরা পড়েছে। খাদ্যনালির খানিকটা বাদ দিতে হবে। খুব ডিটেইলস আমি জানতে চাইনি। ঘন্টা দেড়েক পর আমি বলি, “চলুন কাকিমা, একটু চা খেয়ে আসবেন, এখানে ভালো ক্যান্টিন আছে। টাবলু তোমার নিশ্চয়ই খিদে পেয়েছে।” কাকিমা রাজি হল না আসতে। টাবলু আর আমি বেরোই। প্রথমে নিচে নেমে আসি। পকেট থেকে সিগারেট বের করে ওর দিকে বাড়িয়ে দিই। দোনোমনো করলেও ও নেয়। তখনই লক্ষ্য করি ওর ডান হাত কাঁপছে। আমি সেদিকে তাকিয়ে আছি বুঝতে পেরে ও এবার বাঁ হাতে সিগারেট ধরে। ডান হাত পকেটে ঢোকায়। বাবার শরীর-খারাপ নিয়ে ও মনে হয় খুবই নার্ভাস। টাবলুর কাঁধে হাত রাখি। চা খেয়ে রিসেপশনে এসে বসি। অপারেশনের পর কাকুকে কেবিনে এনে রাখা হয়েছে, তবে এখনো ঘোর কাটেনি। আর ডাক্তার এখনও কিছু বলতে পারছেন না। তবে অপারেশন ঠিক মতোই হয়েছে।

পরের ক’টা দিনও গেছি। কাকু খুব দুর্বল। কথা তেমন বলছেন না। শরীরে নানা নল লাগানো। কবে যে ছাড়বে তাও জানা যায়নি। টাবলু সম্পর্কে অনেক কথা কাকিমার কাছ থেকে জানতে পারি। স্কুলে পড়ার সময় থেকে টাবলু ড্রাগস-এর নেশা ধরে। তারপর থেকে ওর মধ্যে নানা জটিলতা দেখা যায়।

“তোমরা এ ব্যাপারে ওর কখনো ট্রিটমেন্ট করাওনি? কাউনসেলিং?” আমার প্রশ্নে কাকিমা ঘাড় নেড়ে ‘না’ বলেন।

“তোমার কাকু কাউকে জানাতে চাননি। অফিসে ওঁর যা পোজিশন তাতে জানাজানি হলে একটা কেলেঙ্কারি হবে বলে উনি মনে করতেন। মাঝেমধ্যে টাবলু ভায়োলেন্ট হয়ে যেত, তাই কোনো ডাক্তারের সাথে কথা বলে ওকে নার্ভ ঠান্ডা রাখার ওষুধ খাওয়ানো হতো। সেও ছেলেকে না জানিয়ে, খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে।” কাকিমা অকপটে সব কিছুই বললেন, যা কাকু গৌহাটিতে আমার কাছে লুকিয়ে গিয়েছিলেন। তবে টাবলু সেসব ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু ওর ডান হাতের তালু নড়ে। এ নিয়ে কাকুর খুব অস্বস্তি। ড্রাগসের কু-প্রভাব বিভিন্ন সময়ে কাগজে, পত্রিকায় চোখে পড়ে। শরীরের কোনো অংশ অস্বাভাবিক ভাবে কাঁপে বলে জানতাম না।

কটা দিন দ্রুত কেটে গেল। অপারেশনের পাঁচদিন পর কাকু মারা গেলেন। কাকিমার ভাইয়েরা বললেন, কলকাতাতেই শ্রাদ্ধের কাজ করে যেতে। ঝুমুরকে বর্ণার মা’র কাছে রেখে আমি আর বর্ণা শ্রাদ্ধে গেলাম। কাকিমা আর টাবলুকে বর্ণা প্রথম দেখল। কেউই বিশেষ কথা বলেনি। এই সময়ে আর কীই বা কথা থাকে! তবে ও যে কাকিমাকে অপছন্দ করেনি, তা বোঝা যাচ্ছিল।

“তোমার কাকিমার জন্য খুব খারাপ লাগছিল জানো, একজন ডিকটেটরের সাথে সারা জীবন কাটালেন। ছেলেটাও ওর বাবার জন্য কেমন ইনডিসাইসিভ দেখেছ। এই উঠছে, এই বসছে, বেরিয়ে যাচ্ছে। জানি না, কাজ ঠিক করে করতে পেরেছে কিনা!”

হ্যাঁ, আমাদের পৌঁছোতে খানিক দেরি হয়েছে। ফেরার পথে ঝুমুরকে নিতে গিয়ে বর্ণার বাপের বাড়ি গিয়ে দেখি আরেক বিপত্তি। ঝুমুর শুয়ে আছে, কান্নাকাটি করে চোখমুখ ফোলা। টিভিতে কার্টুন দেখতে দেখতে খাবে বলে ও নাকি সোফাতে প্লেট নিয়ে বসেছিল, আর সেই প্লেট হাত থেকে পড়ে গিয়ে পায়ের নখে চোট লেগেছে। কেটেও গেছে। মা আর কাজের মেয়ে-আয়ার ওপর চোটপাট করে বর্ণা মেয়েকে কোলে নিয়ে গাড়িতে এসে বসে।

“ঝুমুর কার্টুন দেখার সময় তুমি কিচ্ছু খেয়াল রাখো না। সোফার কোণায় ধাক্কা লেগেছিল প্লেটের?” মা’য়ের প্রশ্নে ঝুমুর ‘না’ বলে।

“আমার হাত থেকে এমনি এমনিই পড়ে গেল।” আমাদের দুজনের মনটা খুব খারাপ। ঝুমুরকে ঘুম পাড়িয়ে বর্ণা খাবার টেবিলে ডাকে। কেউই খাই না তেমন।

“তোমায় একটা কথা বলি, ঝুমুরকে কাল ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যাব।” চোট পাবার পর ঝুমুরকে ডেটল লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেরকম ব্যথা আর নেই। তাই বর্ণাকে বলি,

“ডাক্তার দেখানোর কী আছে? আমরা ছিলাম না ও ভয় পেয়ে গেছে। কাল ঘুম থেকে উঠেই সব ভুলে যাবে। কাল বরং ওকে স্কুলে পাঠিও না।”

“না ব্যাপারটা অত হালকাভাবে নিও না। স্কুলের মিসও সেদিন বলেছে যে ওর হাত থেকে নাকি প্রায়ই পেন্সিল পড়ে যায়।”

ঝুমুরের সর্দি-কাশি, জ্বর হলে যে চাইল্ড-স্পেশালিস্টের কাছে নিয়ে যাই আমরা, সেই ডাক্তারের কাছেই নিয়ে গেলাম। ইনি ঝুমুরের সাথে কথা বলে অন্য স্পেশালিস্টের কাছে রেফার করে দেন। ডাক্তার ঝুমুরকে ছেড়ে আমাদের অনেক প্রশ্ন করেন। জানতে চান আমাদের ফ্যামিলি-হিস্ট্রি। আমার খুব ভয় করছিল, কী হয়েছে আমাদের বাচ্চা মেয়েটার! কেন জানি না, টাবলুর হাত নড়ছে, সেই দৃশ্যটাই মনে পড়ছে। কী যা-তা ভাবছি! ও তো একটা ড্রাগ-অ্যডিক্ট ছিল।

“আপনাদের দুজনের মধ্যে কী কারুর ফ্যামিলিতে পারকিনসন্স ডিজিজ় বা অন্য নার্ভের অসুখ আছে? বা কারুর হয়েছিল বলে জানেন?” আমি বোকার মতো ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে থাকি।

বর্ণার জবাব শুনি,
“হ্যাঁ, আমার শ্বশুরমশাইয়ের ছিল বলে শুনেছি। ও ছোট থাকতেই উনি মারা গেছেন।”

এবার বাবার বেঁকে যাওয়া শরীরের ছবি ভেসে ওঠে। আমি বর্ণার হাতটা চেপে ধরি। তবে ডাক্তার আমাদের আশ্বস্ত করেন, ভয়ের কিছু নেই। এই অসুখে ভালো চিকিৎসা আছে।

“আপনার বাবার সময় তেমন আধুনিক চিকিৎসা ছিল না। মেয়েকে নিয়ে আপনাদের ভয়ের কিছু নেই। ওর সেরকম কিছুই সিরিয়াস নয়। ওষুধ সামান্য লিখেছি ওর জন্য কটা ব্যায়াম বলে দিচ্ছি। সেটা যেন রেগুলার করে সেদিকে খেয়াল রাখবেন।”

সকালে বর্ণা, আর বিকেলে অফিস থেকে বাড়ি ফিরে আমি মন দিয়ে ঝুমুরকে সেই ব্যায়ামগুলো করাতাম। বকাবকি না করে খেয়াল রাখতাম ওর হাত থেকে কিছু পড়ে যাচ্ছে কি না। ক’মাসের মধ্যেই রেজাল্ট নজরে পড়ে। স্কুল থেকে মিসের কমপ্লেন আসা বন্ধ হয়। ঝুমুর এখন হাত থেকে আর কিছু ফেলে দেয় না। তবে তিন মাস ছাড়া-ছাড়া আমরা ওকে চেক আপ করিয়ে আনি। মেয়ের সাথে ডাক্তার-আংকেলের বেশ ভাবও হয়ে গেছে।

এবার বিজয়ায় গৌহাটিতে ফোন করব কি না বুঝে উঠতে পারছিলাম না। কাকু মারা যাবার পর বছর কাটেনি এখনও। কাকিমার ফোন আসে। আমাদের খবর নেন। জানান, টাবলু মনমরা হয়ে থাকে। অফিস ছাড়া আর কোথাও বেরোয় না। হাত নিয়ে বিব্রত থাকে। অফিসে কাজের সময় কেউ না কেউ নাকি তাকিয়ে থাকে ওর হাতের দিকে।

ফোন না সেই রাতে আমি টাবলুকে মেসেজ করি। ফোনে কথা বলতে ও অস্বস্তি বোধ করত। নিজের অসুখ নিয়ে কখনও তো আমার সাথে আজ পর্যন্ত ও আলোচনা করেনি। লিখি যে, ওর এই অসুখের তো সেভাবে কোনোদিনও চিকিৎসা হয়নি। কাকুর ধারণা হয়েছিল, নেশার কারণে হয়েছে। এখানে আমার চেনা ডাক্তার আছে। দরকার হলে ভালো চিকিৎসা করানো যাবে। ক’দিনের ছুটি নিয়ে কলকাতায় ওকে আসার জন্য বলি। বর্ণা আমার পাশে ছিল, আপত্তি করেনি।

ওদিক থেকে কোনও উত্তর আসছিল না। মেসেজ যে পড়েছে, বুঝেছি। ফোন শেষ অব্দি এলো এগারো দিন পর। গলায় দ্বিধা থাকলেও টাবলু জানায় যে ও আসবে। তাড়াতাড়িই।

“দাদা আমি ছুটির অ্যাপ্লিকেশন দিচ্ছি, তারপরে জানাচ্ছি কবে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করবে।”

মন থেকে একটা ভার নামে। ওকে আর জানাই না ওর জেঠুর অসুখের কথা।

***

লেখক পরিচিতি: সুদেষ্ণা দাশগুপ্ত জন্ম বর্তমান ঝাড়খণ্ডের শিল্পনগরী সিন্দ্রিতে। আদিবাড়ি ওপার বাংলার ময়মনসিংহ। তাঁর জীবনের বড়ো অংশ কেটেছে উত্তর ভারতের বিভিন্ন শহরে। পড়াশোনা মূলত ঝাড়খণ্ড ও বাংলায়। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করেছেন প্রায় দুই দশক। এখন পাকাপাকি কলকাতার বাসিন্দা। সাহিত্যের জগতে খুব অল্পদিনের মধ্যেই পাঠকের নজর কেড়েছেন সুদেষ্ণা। গত কয়েক বছরে দুই বাংলার ছোট-বড়ো নানা পত্রিকায় ছাপা হয়েছে ছটগল্প। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি সুদেষ্ণা কলকাতার বিশিষ্ট একজন বাচিক-শিল্পীও। বিশেষ সম্মাননা এবং সংবর্ধনায় ভূষিত হয়েছেন বাংলাদেশে। কলকাতা দূরদর্শনের সঞ্চালিকা হিসেবেও কাজ করে থাকেন তিনি। বর্তমানে মঞ্চ নাটকেও যুক্ত হয়েছেন।  



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ