মার্গারেট মিচেলের ধারাবাহিক উপন্যাস: যেদিন ভেসে গেছে






অনুবাদ: উৎপল দাশগুপ্ত

পর্ব: ৩৮

স্কারলেট সবই বুঝতে পারে, দুশ্চিন্তা নিয়েই দিন কাটায়। দুশ্চিন্তাকে সঙ্গী করেই রাত্রে ঘুমোতে যায় – নতুন করে আবার কোন বিপদ ঘনিয়ে আসবে কে জানে? ও আর ফ্র্যাঙ্ক যে ইয়াঙ্কিদের সুনজরে নেই, সেটা জানে। টোনির জন্য। যে কোনও মুহুর্তে ওদের জীবনে দুঃসময় ঘনিয়ে আসতে পারে। আবার যদি সব কেঁচে গণ্ডুষ করতে হয়, তাও এমন অসময়ে, তাহলে সমূহ বিপদ। বাচ্চাটা হওয়ার প্রতীক্ষা করা, মিলটা লাভের মুখ সবে দেখতে আরম্ভ করেছে, শীতের ফসল ঘরে তোলার আগে পর্যন্ত টারা ওর পাঠানো অর্থের ওপর নির্ভর করে আছে। ধর যদি সব চলে যায়! আবার যদি নতুন করে সব কিছু শুরু করতে হয়! পাগলা এই দুনিয়ায় পুঁজি বলতে তো একটাই ওর সম্বল! লাল ঠোঁট, সবুজ চোখ আর প্যাঁচালো মাথাকেই ইয়াঙ্কিদের আর ওদের শয়তানিকে ঘায়েল করার জন্য কাজে লাগাতে হবে। আতঙ্কে, দুশ্চিন্তায় ওর মনে হতে লাগল কেঁচে গণ্ডুষ করার চেয়ে মরে যাওয়াই ভাল।

১৮৬৬ সালের বিধ্বস্ত, টালমাটাল বসন্তে, স্কারলেট উঠে পড়ে লাগল মিলটা যাতে উপার্জনক্ষম হয়ে ওঠে। অ্যাটলান্টায় অর্থের জোগান কম নেই। যে সুযোগের অপেক্ষায় ও ছিল, পুনর্নির্মাণের জোয়ার ওকে সেই সুযোগ এনে দিল। জেলের বাইরে যদি থাকতে পারে, তাহলে ওর বিশ্বাস, এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ও যথেষ্ট অর্থোপার্জন করতে পারবে। মনে মনে নিজেকে বারবার সাবধান করল – পা ফেলতে হবে খুব সাবধানে, ঝগড়াঝাঁটি বাধালে চলবে না, নম্র হতে হবে, মুখ বুজে অপমান হজম করতে হবে, অবিচার হলেও মুখ খোলা চলবে না, সাদাই হোক কি কালো, কাউকে চটানো চলবে না – লোকসান হতে পারে ওর। বেয়াদব, স্বাধীন নিগ্রোদের অন্যদের থেকে ও কিছু কম ঘেন্না করে না। রাস্তা দিয়ে যাবার সময় ওদের মুখ থেকে টিটকারি শুনলে, বা ওদের অসভ্যের মত হাসতে দেখলে ওর শরীর মন রাগে রী রী করে ওঠে। কিন্তু একবারের জন্যেও ওদের দিকে অবজ্ঞার দৃষ্টিতে তাকায় না। ঘেন্না করে কার্পেটব্যাগার আর স্ক্যালাওয়াগদেরও – কেমন হেসে খেলে ওরা টাকাপয়সা কামিয়ে বড়লোক হয়ে যাচ্ছে আর ওকে রীতিমত লড়াই করে যেতে হচ্ছে, কিন্তু ভুলেও কখনো ওদের নামে বিষোদ্গার করে না। বোধহয় অ্যাটলান্টাতে এমন কাউকেই পাওয়া যাবে না যাদের চাইতে ইয়াঙ্কিদের ও বেশি ঘেন্না করে না, ওই নীল ইউনিফর্ম নজরে আসলেই ওর রক্ত টগবগ করে ফুটতে থাকে, কিন্তু পরিবারের একান্ত বৃত্তেও কখনোই ওদের নিয়ে কোনোরকম কটূক্তি করে না।

তেমন হঠকারী মূর্খ তোমরা আমাকে পাওনি, বিরস মনে ভাবে স্কারলেট। হারিয়ে যাওয়া দিন আর হারিয়ে যাওয়া মানুষ নিয়ে বুক চাপড়ে কান্নাকাটি করতে যার ইচ্ছে করে করুক না কেন। ইয়াঙ্কিদের অপশাসন আর ভোট দেবার অধিকার কেড়ে নেওয়া নিয়ে যে যতখুশি রাগ দেখাক না কেন। মনের কথা গলগল করে উগরে দিয়ে যার খুশি জেলের ঘানি টানুক না। আর কু ক্লুক্স ক্ল্যানে ঢুকে যার ফাঁসি যেতে ইচ্ছে হয় যাক না। (কী ভয়ঙ্কর নাম রে বাবা! কেবল নিগ্রোদেরই নয়, স্কারলেটের কাছেও খুবই আতঙ্কের।) স্বামী ওই দলে আছে বলে অন্যদের বউরা যতই দেমাকে ফেটে পড়ুক না কেন। ঈশ্বরের অসীম কৃপা, ফ্র্যাঙ্ক কখনোই ওই দলে গিয়ে ভেড়েননি! অন্যরা যত ইচ্ছে তর্জনগর্জন করুক, যা ওদের হাতেই নেই তাই নিয়ে যত ইচ্ছে চক্রান্ত করুক, মতলব ভাঁজুক। ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার মধ্যে শুধু শুধু অতীতকে টেনে আনার কোনও মানে হয়? আসল সমস্যাটা যখন অন্নসংস্থানের, মাথার ওপরে ছাদের, জেলে যাওয়া থেকে নিজেদের বাঁচানোর, তখন ব্যালট দিয়ে কোন চতুর্বর্গ লাভ হবে? আর হে ঈশ্বর, অন্তত জুন মাসটা পর্যন্ত আমাকে ঝামেলার হাত থেকে বাঁচাও!

কেবল জুন মাস পর্যন্ত! স্কারলেট জানে যে সেই মাস থেকে আন্ট পিটির বাড়িতে বাধ্য হয়েই নিভৃতবাস করতে হবে, সতদিন না ওর বাচ্চার জন্ম হচ্ছে। এই রকম অবস্থায় বাইরে বেরনোর জন্য ইতিমধ্যেই লোকে বলাবলি করতে আরম্ভ করে দিয়েছে। অন্তঃসত্ত্বা থাকার সময় ভদ্রঘরের কোনো মেয়েই জনসমক্ষে আসে না। ফ্র্যাঙ্ক আর পিটি ইতিমধ্যেই কেবল ওর হাতে পায়ে ধরতে বাকি রেখেছেন যাতে ও লোকজনের সামনে বের না হয়, যাতে ও নিজে বা ওর জন্যে ওঁরাও না অস্বস্তিতে পড়েন। জুন মাস থেকে বেরনো বন্ধ করবে বলে ও ওঁদের কথা দিয়েছে।

কেবল জুন মাস পর্যন্ত! জুন মাসের মধ্যে মিলটাকে মোটামুটি দাঁড় করিয়ে দিতে পারবে, যাতে ও না থাকলেও কোনো অসুবিধে না হয়। জুনের মধ্যে টাকাপয়সাও কিছু জমিয়ে ফেলতে হবে যাতে কোনো বিপর্যয় ঘটলেও কাটিয়ে উঠতে পারে। কত কিছু করার বাকি, অথচ হাতে মাত্র কটা দিন সময়! দিনগুল আরও একটু লম্বা হলে ভাল হত। টাকা এবং আরও টাকা উপার্জনের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় ও এখন প্রতি মিনিটের হিসেব করতে শুরু করল।

ভীরু স্বভাবের ফ্র্যাঙ্কের পেছনে লেগে লেগে স্টোরটাও এখন আগের চেয়ে ভাল কারবার করছে। অনেক পুরনো বকেয়া উসুলও করে ফেলেছেন। তবে ওই করাতের কলের ওপরেই ওর সব থেকে বেশি ভরসা। আজকের দিনের অ্যাটলান্টা বিশাল এক মহীরুহের মত, কেটে ধুলোয় শুইয়ে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু আবার নতুন করে মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে শুরু করেছে, বলিষ্ঠ অঙ্কুর সহ, নতুন ঘন পত্রপল্লবে শোভিত হয়ে, অসংখ্য ডালপালা বিছিয়ে। নির্মাণসামগ্রীর চাহিদা অনেক, জোগান অপ্রচুর। চেরাই কাঠ, ইট, পাথরের মূল্য আকাশছোঁয়া। মিলটা স্কারলেট সারাদিন চালু রাখে, একেবারে সেই সকাল থেকে লন্ঠনের আলো না জ্বলে ওঠা পর্যন্ত।

দিনের খানিকটা সময় স্কারলেট মিলেই কাটায়, সতর্ক নজর রাখে চারধারে, ছিঁচকে চৌর্যবৃত্তি যে চলছেই, এটা ওর বিশ্বাস, আপ্রাণ চেষ্টা করে সেসব রোধ করবার। তবে বেশিরভাগ সময় স্কারলেট শহরের মধ্যেই ঘোড়ার গাড়ি করে টহল দেয়। বাস্তুকার, ঠিকাদার, রাজমিস্ত্রী এমনকি অপরিচিত মানুষদের সঙ্গেও দেখা করে, যারা অদূরভবিষ্যতে নতুন ভবন তৈরি করাবার কথা ভাবছে। মালপত্র, সামগ্রী যেন ওরা কেবল ওর কাছে থেকেই কেনে সেটা নিয়ে একরকম জোর করেই কথা আদায় করে নেয়।

খুব অল্পদিনের মধ্যেই অ্যাটলান্টার পথেঘাটে স্কারলেট খুব পরিচিত এক মুখ হয়ে উঠল, নিজের বগীগাড়িতে একজন মর্যাদাসম্পন্ন, অনিচ্ছুক বৃদ্ধ ডার্কি চালকের পাশে বসা, কোল থেকে গলা পর্যন্ত একটা পোশাকে শরীর ঢাকা, দস্তানা পরা হাতদুটো কোলের ওপর জড়ো করা। সবুজ রঙের সুন্দর এই ক্লোকটা আন্ট পিটি ওকে বানিয়ে দিয়েছিলেন, যাতে ওর শরীরটা আড়াল করে রাখা যায়, আর মাথায় পরার জন্য ওর চোখের মণির রঙের সাথে মিলিয়ে সবুজ রঙের একটা চওড়া টুপি। ব্যবসার কাজে স্কারলেট এই মানানসই পোশাক পরেই যায়। গালে হালকা করে রুজ়ের ছোঁয়া থাকে, পোশাক থেকে কোলোনের মৃদু সুবাস বেরোয়, সব মিলিয়ে বেশ আকর্ষণীয়ই লাগে ওকে। অবশ্য বগীগাড়ি থেকে যতক্ষণ না নামতে হয়, ততক্ষণ ওর শরীরের বেঢপ স্ফীতি কারো নজরে পড়ে না। নামার প্রয়োজন কালেভদ্রেই পড়ে, কারোর দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেই ওরা দ্রুত ওর বগীর কাছে কথা বলার জন্য এগিয়ে আসে আর সৌজন্যবশত, বৃষ্টি হলেও মাথা খালি রেখেই ব্যবসার কথা সেরে নেয়।

চেরাই কাঠের ব্যবসা থেকে অনেক অর্থ উপার্জনের যে সুযোগ আছে, সেই কথাটা কেবল স্কারলেট নয়, আরও অনেকেই ধরে ফেলেছে। কিন্তু প্রতিযোগীদের ও পরোয়াই করে না। করিতকর্মা হিসেবে নিজের ওপর এক সচেতন গর্ব আছে ওর, প্রতিযোগীদের থেকে ও যে কোনো অংশে কম নয় এই বিশ্বাস ওর আছে। ও হল জেরাল্ডেরই মেয়ে, তাই বেচাকেনার দাঁওপ্যাঁচ বোঝার সহজাত প্রবণতা ওর রক্তে রয়ে গেছে। এখন দায়ে পড়ে সেই প্রবণতা আরও ধারালো হয়েছে।

প্রথম প্রথম অন্যান্য কারবারিরা ওকে নিয়ে হাসাহাসি করত, মহিলা হয়ে ব্যবসা করার ধৃষ্টতায় করুণার হাসি। তবে ইদানিং হাসি বন্ধ হয়ে গেছে ওদের। ওকে রাস্তায় দেখতে পেলেই মনে মনে গালি দেয়। ব্যাপারটা হল, মহিলা বলেই ও বেশ কিছু সুবিধে পেয়ে যেত। প্রয়োজনে অসহায় মহিলা বলে নিজেকে দেখিয়ে মানুষের মন গলিয়ে ফেলত। নীরব থেকেও নিজেকে ভীরু কিন্তু মরিয়া মহিলা হিসেবে প্রতিপন্ন করতে ওর কোনো সঙ্কোচই হত না। নিষ্ঠুর পরিস্থিতির কবলে পড়ে অসহায় একজন মহিলাকে আজ এই অরুচিকর কাজে নেমে পড়তে হয়েছে, ওর কাছ থেকে কাঠ কিনলে হয়ত ওকে অনাহারেই দিন কাটাতে হবে। তবে এই বিপন্ন মহিলা সাজার কৌশল কাজ না করলে, মুহূর্তের মধ্যে শীতল মস্তিষ্কের ব্যবসায়ী হয়ে যেত, এবং জেনেবুঝে লোকসানে সওদা করেও নতুন খদ্দের ভাঙ্গিয়ে আনত। ধরা পড়ার ভয় না থাকলে, উৎকৃষ্ট মানের চেরাই কাঠের দামে নিকৃষ্ট মানের চেরাই কাঠও বেচে দিত, এমনকি অন্যান্য চেরাই কাঠ ব্যবসায়ীদের নামে মিথ্যে কুৎসা রটাতেও রুচিতে বাধত না। যেন অপ্রিয় কথাটা তুলতে ওর সঙ্কোচ বোধ হচ্ছে, দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলত যে অমুকের চেরাই কাঠের দামই শুধু আকাশছোঁয়া নয়, কাঠও অত্যন্ত নিম্নমানের, পচা আর গাঁঠযুক্ত কাঠ চেরাই করে বানানো।

এইভাবে মিথ্যে রটনা প্রথমবার যখন করেছিল, স্কারলেটের খুব বিবেকের দংশন হয়েছিল, নিজেকে খুব অপরাধী মনে হয়েছিল – কী করে এই রকম মিথ্যে এত সহজে ওর মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, আর চকিতে একটা ভাবনা মনে এসে বিচলিত করে দিয়েছিল – মা কী বলতেন?

মেয়ে মিথ্যে কথা বললে আর লোক ঠকালে এলেনের কী প্রতিক্রিয়া হত সেই ব্যাপারে স্কারলেটের মনে বিন্দুমাত্র সংশয় নেই। বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে যেতেন, বিশ্বাস করে উঠতে পারতেন না, স্নিগ্ধ কণ্ঠে সততা, প্রতিবেশীদের প্রতি কর্তব্য নিয়ে উপদেশ দিতেন, কিন্তু স্নিগ্ধ কণ্ঠে হলেও প্রতিটা কথা মর্মে গিয়ে বিঁধত। পলকের জন্য মায়ের মুখটা মনে ভেসে উঠতেই স্কারলেট শিউরে উঠল। তারপর মুখটা অস্পষ্ট হতে লাগল, নির্দয়, নির্লজ্জ, লোলুপ আবেগে ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। টারার দুর্দিনে ওর মধ্যে এই ধরণের আবেগের সূত্রপাত হয়েছিল, বর্তমানের অনিশ্চিত পরিস্থিতি এই সব আবেগকে দৃঢ় করে তুলেছে। ফলে আগের মতই এই বাধাটাও কাটিয়ে উঠতে ওর সময় লাগল না – কেবল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবল, এলেন যেরকম চেয়েছিলেন ও সেরকম হয়ে উঠতে পারেনি, তারপর সেই অব্যর্থ মন্ত্র – “এসব নিয়ে পরে ভাবা যাবে” – উচ্চারণ করে অস্বস্তিটা মন থেকে দূর করে দিল।

সেদিনের পর থেকে কারবারের সময় এলেনের কথা মনে আসতেই দিত না, অন্যান্য চেরাই কাঠ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চোরাগোপ্তা পথে ব্যবসা ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য আর কখনও অনুশোচনা বোধ করেনি। বুঝে নিয়েছিল মিথ্যে বলে ব্যবসা ভাগিয়ে নিলেও ওর কোনো বিপদ নেই, দক্ষিণের সৌজন্যবোধ ওকে রক্ষা করে যাবে। দক্ষিণের একজন ভদ্রমহিলা একজন ভদ্রলোক সম্বন্ধে মিথ্যে বলতেই পারেন, তাই বলে দক্ষিণের একজন ভদ্রলোক কখনোই একজন মহিলা সম্বন্ধে মিথ্যে কথা বলবেন না, এমনকি সেই ভদ্রমহিলাকে মিথ্যেবাদী বলেও গাল পাড়বেন না। অন্যান্য করাতিরা ভেতরে ভেতরে জ্বলতে থাকেন, পারিবারিক বৃত্তে হয়ত গলা চড়িয়ে ওর গুষ্ঠি ুদ্ধার করে ছাড়েন, হয়ত মনে মনে প্রার্থনাও করেন যে ঈশ্বর যেন মাত্র পাঁচ মিনিটের জন্য হলেও মিসেজ় কেনেডিকে একবার পুরুষমানুষ বানিয়ে দিন!

ডেক্যাটুর রোডের একজন দরিদ্র শ্বেতাঙ্গ মিল মালিক একবার চেষ্টা করেছিলেন স্কারলেটেরই অস্ত্র দিয়ে ওকে ঘায়েল করতে। সর্বসমক্ষে উনি বলতে লাগলেন যে স্কারলেট একজন মিথ্যেবাদী, একজন ছ্যাঁচড়া মহিলা। লাভের থেকে লোকসানই বেশি হল ওঁর। একজন খানদানী মহিলার বিরুদ্ধে একজন গরীব সাদা চামড়া এই ধরণের অকথা কুকথা বলে যাবে – নাহয় স্কারলেটের আচার আচরণ মোটেই মহিলাসুলভ নয় – এটা কারোরই পছন্দ হল না। স্কারলেট নীরব ঔদ্ধত্য দেখিয়ে ওঁর মন্তব্যগুলো অগ্রাহ্য করল, কিন্তু সুযোগের অপেক্ষায় থাকল। সেই ভদ্রলোকের সমস্ত খদ্দেরদের নিজের সততা প্রমাণ করার জন্য এত সস্তায় উচ্চমানের মাল সরবরাহ করতে লাগল (ভেতরে ভেতরে বেশ আক্ষেপ যে হল না তা নয়) যে কিছুদিনের মধ্যেই সেই ভদ্রলোক একেবারে পথে বসে গেলেন। তারপর ফ্র্যাঙ্ককে রীতিমত বিচলিত করে ওই মিলটাও জলের দরে কিনে ফেলল।

তবে মিলটা হাতে আসার পর এক অদ্ভুত জটিল সমস্যা তৈরি হল। বিশ্বস্ত একজন লোক খুঁজে পাওয়া, যার হাতে মিলটা চালানোর দায়িত্ব দেওয়া যায়। মিস্টার জনসনের মত আরেকজন লোক ওর পছন্দ নয়। ওর সতর্কপ্রহরার পরেও উনি যে ওকে না জানিয়েই এখনও কিছু চেরাই কাঠ বিক্রি করে দেন, সে ব্যাপারে ও নিশ্চিত। তবে ঠিকঠাক একজন লোক পাওয়াটা খুব কঠিন হবে না বলেই ওর ধারণা। কত মানুষই তো আজকাল হতদরিদ্র হয়ে পড়েছেন, রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো কত মানুষ, এঁদের অনেকেই একসময় বড়লোক ছিলেন, কিন্তু এখন কিছুই করছেন না! ফ্র্যাঙ্ক তো প্রতিদিনই অভুক্ত প্রাক্তন জওয়ানদের কাউকে না কাউকে অর্থসাহয্য করে থাকেন, পিটি আর কুকিও অস্থিচর্মসার ভিখারিদের জন্য খাবার বেঁধে দিয়ে থাকেন।

তবে কী এক অজ্ঞাত কারণে – সেটা স্কারলেট নিজেও বুঝতে পারে না – এই ধরণের লোক ওর পছন্দ নয়। “এক বছর পরেও যারা একটা কোনো কাজ জুটিয়ে নিতে পারেনি, তেমন লোক আমার চাই না,” স্কারলেট মনে মনে ভাবল। “ওরা যদি এখন পর্যন্ত সন্ধিকালীন অবস্থার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে না পেরে থাকে, তাহলে আমার সঙ্গেও মানিয়ে নিতে পারবে না। কেমন খয়াটে, বাপে খেদানা মায়ে তাড়ানো চেহারা সব। এই রকম পরাস্ত হয়ে যাওয়া লোক আমার চাই না। রেনি বা টমি ওয়েলবার্ন বা কেল্‌স হোয়াইটিং বা সিমনস ভাইদের একজন বা ওদের মতই চালাকচতুর, উৎসাহী লোকই আমার দরকার। আত্মসমর্পণের পরে পরে জওয়ানদের চোখেমুখে সেই ‘কী আর এসে যায়’ জাতীয় হতাশা দেখা যেত, সেটা এদের মধ্যে দেখা যায়নি। ওদের দেখলেই মনে হয় অনেক কিছুই এসে যায় ওদের, অনেক কিছুতেই এসে যায় ওদের।”

কিন্তু ওকে খুব অবাক করে, সিমনস ভাইয়েরা – যারা একটা ইটের ভাটা শুরু করেছে, আর কেলস হোয়াইটিং – যে ওর মায়ের রান্নাঘরে বানানো একটা তেল বিক্রি করছে, যেটা নাকি মাত্র ছ’বার লাগালেই যে কোনও নিগ্রোর কোঁকড়া চুল একেবারে সিধে হয়ে যাবে – মিষ্টি হেসে ধন্যবাদ জানিয়ে সবিনয়ে ওর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে দিল। একই ব্যাপার ঘটল আরও দশ বারোজনের জনের ক্ষেত্রেও, যাদের কাছে ও ওর প্রস্তাব নিয়ে গেছিল। তখন বাধ্য হয়েই ওকে মজুরি বাড়ানোর কথা ভাবতে হল, কিন্তু তা সত্ত্বেও কাউকেই রাজি করাতে পারল না। মিসেজ় মেরিওয়েদারের এক ভাইপো তো মুখের ওপর বলেই দিল, ঠ্যালাগাড়ি চালাতে ওর একেবারে ভাল লাগে না, কিন্তু হাজার হলেও ঠালাগাড়িটা ওর নিজের, আর স্কারলেটের অধীনে কাজ করার চাইতে স্বাধীনভাবে ঠ্যালাগাড়ি চালিয়ে উপার্জন করাটাই ওর কাছে শ্রেয়।

একদিন বিকেলে স্কারলেট ওর গাড়ি রেনে পিকার্ডের পাই ওয়াগনের পাশে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করিয়ে রেনে আর কুঁজো টমি ওয়েলবার্ন – যে কিনা বন্ধুর সঙ্গেই বাড়ি ফিরছিল – দুজনকেই ডাকল।

“এই রেনে, শোনো না, তুমি আমার মিলে কাজ করতে তো পারই, তাই না? পাই ওয়াগন চালানোর চেয়ে একটা মিল চালানো তো অনেক বেশি সম্মানের। আমার তো মনে হয়, তোমার লজ্জাই লাগে।”

“লজ্জা লাগে – আমার? আরে লজ্জাশরমের বালাই তো কবেই ঘুচিয়ে দিয়েছি!” এক গাল হাসল রেনে। “সম্মানের সঙ্গে কে আছে বলতো? সেই সব দিনগুলোতে আমিও কিছু কম সম্মানের সঙ্গে ছিলাম না, যতক্ষণ না যুদ্ধ বেঁধে গিয়ে নিগ্রোদের সঙ্গে সঙ্গে আমাকেও মুক্তি দিয়ে দিল। আভিজাত্যের পেছনে দৌড়ে আমি কিছুতেই আবার অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়তে চাই না। আমি এখন মুক্ত বিহঙ্গ! আমার এই পাই ওয়াগনটাকে আমি ভালবাসি! আমার এই খচ্চরটাকেও আমি ভালবাসি! আমি ওই ইয়াঙ্কিদেরও খুব ভালবাসি, ওরা দয়া করে মাদাম বেল মেয়ারের পাই কেনে। না, স্কারলেট, না! আমাকে পাইদের রাজা হয়েই থাকতে দাও! সেটাই আমার ভবিতব্য! আমি ভাগ্যে বিশ্বাস করি, নেপোলিয়নেরই মত!” বেশ নাটকীয় ভঙ্গীতে চাবুক চালিয়ে বাতাস কাটল।

“কিন্তু তুমি তো আর পাই বিক্রি করবে বলে ভাবনি, যেমন টমি কখনোই ভাবেনি একদল বর্বর আইরিশ রাজমিস্ত্রির সঙ্গে ওকে মল্লযুদ্ধে করতে হবে! আমি যে কাজের কথা বলছিলাম – ”

“তুমিই কি কোনোদিন ভেবেছিলে যে তোমাকে করাতের কল চালাতে হবে?” ঠোঁট বাঁকিয়ে জিগ্যেস করল টমি। “হ্যাঁ, আমি দেখতে পাই ছোট্ট স্কারলেট ওর মায়ের কোলে বসে পড়া মুখস্ত করছে – ‘খারাপ কাঠের জন্য ভাল দাম পেয়ে গেলে খবরদার ভাল কাঠ বিক্রি কোরো না।’”

কথাটা শুনে মজা পেয়ে রেনে হো হো করে হেসে উঠল। টমির কুঁজো পিঠে থাবড়া মারল।

“নির্লজ্জের মত কথা বোলো না তো,” স্কারলেট বরফ শীতল গলায় বলল। টমির মন্তব্যে মজা পাওয়ার কী আছে ভেবে পেল না। “অবশ্যই, করাতের কল চালাতে হবে কখনো ভাবিনি।”

“কথাটা নির্লজ্জ শোনাবে মনে করে বলিনি। কিন্তু একটা করাতের কল তো তুমি চালাচ্ছই, সে তুমি আগে কখনো ভেবেছিলে কী ভাবনি সেটা বড় কথা নয়। আর স্বীকার করতেই হবে, ভালই চালাচ্ছ। আসলে কী জানো, আমাদের কেউই ঠিক যে কাজ আমরা করতে চেয়েছিলাম সেটা করছি না, তবে যে কাজে লেগেছি সেটাই আমাদের চালিয়ে যাওয়া উচিত। দরিদ্র দেশের দরিদ্র নাগরিক আমরা, বসে বসে হাপুসনয়নে কেঁদে মরছি, কারণ জীবনটা যেরকম হবে বলে ভেবেছিলাম, সেরকম হয়নি। আচ্ছা স্কারলেট, একজন উদ্যমী কার্পেটব্যাগারকেও তো তুমি কাজে লাগাতে পার? ঈশ্বরের কৃপায় ওদের তো অভাব নেই!”

“কার্পেটব্যাগারে আমার কোনও আগ্রহ নেই। হাতে ছ্যাঁকা লাগার ভয় না থাকলে বা ধরা পড়ার ভয় না থাকলে, ওরা সব কিছু চুরি করে ফাঁক করে দেবে। তেমন করিতকর্মা ওরা যদি হতই তাহলে নিজের জায়গা ছেড়ে এখানে আমাদের হাড়মাস চিবোনোর জন্য চলে আসবে কেন? একজন ভাল লোক দরকার আমার, ভদ্র বাড়ির ছেলে, চালাকচতুর হবে, আলসে হবে না আর – ”

বুঝলাম, তোমার চাহিদা খুব বেশি নয়। তবে যে মজুরি দিতে চাইছ, তাতে এরকম একজন লোক পাওয়া মুশকিল। তুমি যেরকম লোক চাইছ – একমাত্র যারা বিচ্ছিরি রকমের বিকলাঙ্গ হয়ে পড়েছে, তারা ছাড়া – সকলেই কিছু না কিছু করছে। হয়ত বেমানান কিছু, কিন্তু বেকার হয়ে বসে নেই। নিজেই স্বাধীনভাবে কিছু করছে, একজন মহিলার অধীনে থেকে নয়।”

“একটু তলিয়ে ভাবলেই বুঝতে পারবে ছেলেদের বাস্তববুদ্ধি খুব একটা নেই, ঠিক কিনা?”

“হয়ত তাই, তবে দম্ভটা একটু বেশি পরিমাণেই আছে,” টমি খুব বিনয়ের সঙ্গে বলল।

“দম্ভ! দম্ভ কথাটা শুনতে বেশ লাগে, তবে যতক্ষণ জীবনটা গড়গড়িয়ে চলতে থাকে আর তোমার পকেটে রেস্ত থাকে,” তীক্ষ্ণকণ্ঠে স্কারলেট বলে উঠল।

ছেলে দুজন জোরে জোরে হেসে উঠল, একটু জোর করেই যেন। স্কারলেটের মনে হল পুরুষসুলভ অহমিকায় ওরা দুজনে একজোট হয়ে ওর কাজের প্রতি ওদের অসহমত ব্যক্ত করল। যাদের যাদের কাছে স্কারলেট ওর প্রস্তাব নিয়ে গেছে আর যাদের যাদের কাছে যাবে বলে ভাবছে, মনে মনে তাদের নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে ওর মনে হল টমি সত্যি কথাই বলছে। সত্যিই ওরা সকপ্লেই ব্যস্ত, কিছু না কিছু নিয়ে, অনেক খাটছে, যুদ্ধের আগে ওদের দ্বারা এতটা পরিশ্রম সম্ভব হবে বলে ওরা ভাবতেও পারেনি। ওরা যা করতে চায়, বা সহজেই যে কাজ করা যায়, বা যেসব কাজ করবার জন্য ছোট থেকে তৈরি হয়েছে, সেরকম কোনো কাজই ওরা করছে না। কিন্তু কোনো না কোনো কাজে লেগে পড়েছে। সময়, পরিস্থিতি কোনোটাই অনুকূল নয়, তাই বাছবিচার করার সুযোগ নেই। যদি ওদের মনে আশা ভঙ্গের হতাশা থেকেও থাকে, পুরনো দিনের স্মৃতি ওদের বেদনা দিতেও থাকে, সেটা ওরা ছাড়া আর কেউ বলতেও পারবে না। ওরা এক নতুন সংগ্রামে লিপ্ত হয়ে পড়েছে, আগের সংগ্রামের থেকেও এই সংগ্রাম অনেক বেশি কঠিন। কিন্তু তা সত্ত্বেও ওদের মধ্যে আবার নতুন করে জীবনকে উপভোগ করার ইচ্ছে জেগে উঠেছে, যুদ্ধ ওদের জীবনটাকে দু’টুকরো করে দিলেও, সেই একই রকম গরজ নিয়ে, একই রকম মনের জোরের সাথে ওরা উজ্জীবিত হয়ে উঠেছে।

“স্কারলেট,” টমি একটু কিন্তু কিন্তু গলায় বলল, “একটু আগেই তোমাকে এত কথা শুনিয়ে দিলাম, তারপর তোমার অনুগ্রহ চাইতে আমার খারাপই লাগছে, তবুও অনুগ্রহটা চাইব বলেই ঠিক করেছি। হয়ত তোমারও কিছুটা সুরাহা হবে। আমার শালা, হিউ এলসিং, জ্বালানি কাঠ ফেরি করে খুব একটা কিছু করতে পারছে না। ইয়াঙ্কিরা ছাড়া আর সকলেই নিজের নিজের জ্বালানি কাঠ নিজেরাই কেটে আনে। এলসিংদের পুরো পরিবারটাই যে খুব অনটনের মধ্যে আছে, সে তো আমি নিজেই জানি। আমি – আমি যতটুকু পারি সাহায্য করছি, কিন্তু বুঝতেই পারছ, ফ্যানির খেয়ালও আমাকে রাখতে হয়, তারপর স্পার্টাতে আমার মা আর দুই বিধবা বোন আছেন, তাদেরও দেখাশোনার দায়িত্ব আমার ওপরেই। হিউ কিন্তু ভাল ছেলে, তুমি ভাল লোকের কথা বলছিলে না, ও খুবই ভাল ছেলে, আর তুমি তো জানোই কত সৎ।”

“কিন্তু – দেখ হিউয়ের মধ্যে সেই লড়াকু মনোভাবটাই নেই, নাহলে জ্বালানি কাঠ ফেরি করেও নেহাত মন্দ রোজগার করত না।”

টমি অস্বস্তিতে কাঁধ ঝাঁকালো।

“নেতিবাচক দিকটাই কেবল তোমার নজরে পড়ে, স্কারলেট,” হিউ বলল। “তবুও হিউয়ের ব্যাপারে একটু ভেবে দেখো। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও ওর চেয়ে খারাপ কেউও জুটতে পারে। ওর সততা আর ওর পরিশ্রম করবার ইচ্ছে, হয়ত ওর লড়াকু শক্তির অভাবকে পুরিয়ে দেবে।”

স্কারলেট কোনও জবাব দিল না। এই ব্যাপারে তর্কাতর্কি করতে ইচ্ছে করল না। তবে ওর হিসেবে এমন গুণ খুব কমই আছে যা লড়াকু শক্তির অভাবকে পুরিয়ে দিতে পারে।

এরপর বেশ কিছুদিন ধরে খোঁজাখুঁজির ব্যর্থ চেষ্টা করে আর উৎসাহী কার্পেটব্যাগার নিয়োগ না করার সিদ্ধান্তে অনড় থেকে, শেষমেশ ঠিক করল টমির পরামর্শটাই মেনে নেওয়া যাক। তাই একদিন হিউ এলসিংকে ডাকল। উদ্যোগী আর করিতকর্মা বলে যুদ্ধের সময় ওর খুব সুনাম হয়েছিল, কিন্তু দু’দুটো গুরুতর চোট আর চার বছরের লড়াই ওকে হতোদ্যম করে ফেলেছে, আর শান্তির এমন নির্মম রূপ দেখে একজন শিশুর মত থতমত খেয়ে গেছে। ফেরি করতে বেরনোর সময় আজকাল ওর চোখেমুখে হারিয়ে গিয়ে ভয়ে জড়সড় হয়ে যাওয়া কুকুরের মত হাবভাব। স্কারলেটের ঠিক এই ধরণের লোক নিয়োগ করার ইচ্ছে ছিল না।

“একদম বোকা লোক একটা,” স্কারলেট ভাবে। “ব্যবসাপাতি মাথায় কিছ ঢকে কিনা কে জানে? আমার তো মনে হয় দুই আর দুই যোগ করতেও জানে না। কোনোদিন শিখে নিতে পারবে কিনা সন্দেহ। তবে মানতেই হবে খুব সৎ, আমাকে অন্তত ঠকাবে না।”

স্কারলেট আজকাল নিজে সৎ থাকার তাগিদটা তেমন অনুভব করে না। তবে নিজের ব্যাপারে খুব একটা দাম না দিলেও, অন্যদের সৎ হওয়ার গুরুত্ব বুঝতে আরম্ভ করেছে।

“দুঃখের ব্যাপার হল যে জনি গ্যালাঘার টমি ওয়েলবার্নের নির্মাণকার্যে আটকে পড়েছে,” ভাওল ও। “ঠিক ওরই মত একজন লোক আমার দরকার। লোকটা সহজে মচকায় না, আর সাপের মতই কুটিল। তবে সৎ থাকলে আখেরে যদি লাভের সম্ভাবনা দেখতে পায়, ও সৎই থাকবে। দুজনেই আমরা দুজনকে বুঝতে পারি, তাই দুজনে হাত মেলাতে পারলে, ভালই ব্যবসা করা যাবে। হোটেলটার নির্মাণ শেষ হলে হয়ত ওকে পাওয়া যাবে, ততদিন আমাকে হিউ আর মিস্টার জনসনকে দিয়ে কাজ চালিয়ে নিতে হবে। নতুন মিলটার দায়িত্ব যদি হিউকে দিয়ে দিই, আর মিস্টার জনসন পুরনো মিলটা যেমন চালাচ্ছেন তেমনই চালান, তাহলে আমি শহরে থেকে বিক্রির ব্যাপারটা দেখতে পারব, আর ওরা চেরাই কাঠ তৈরি আর বোঝাই করার কাজটা সামলাবে। যতক্ষণ না জনিকে পাওয়া যাচ্ছে। সারাক্ষণ শহরে থেকে গেলে মিস্টার জনসনের আমাকে ঠকানোর ঝুঁকিটা নিতেই হবে। লোকটা যদি চোর না হত! চার্লস যে জায়গাটা আমার জন্য রেখে গেছে, তাঁর অর্ধেকটায় আমি একটা লাম্বার-ইয়ার্ড বানাতে পারি। বাকি অর্ধেকটায় একটা পানশালা বানানোর কথায় ফ্র্যাঙ্ক কী চেঁচামেচিই না করলেন! তবে হাতে একটু টাকা এলেই, পানশালাটা আমি ঠিক বানাবো, উনি যতই আপত্তি করুন না কেন। ফ্র্যাঙ্কের বড় বেশি বেশি চক্ষুলজ্জা! এত সময় থাকতে, হে ঈশ্বর, এখনই কি আমার বাচ্চা হওয়ার ছিল! আর ক’দিনের মধ্যে এত মোটা দেখাবে আমাকে! হে ঈশ্বর, বাচ্চাটা যদি এখন না হত! আর হে ঈশ্বর, ওই হতচ্ছাড়া ইয়াঙ্কিগুলো একটু যদি আমাকে নিশ্চিন্তে থাকতে দিত! যদি – ”

যদি, যদি আর যদি! যেন জীবনে যদি ছাড়া আর কিছুই নেই, কোনোকিছুরই কোনো ঠিকঠিকানা নেই, নিরাপদে থাকার জো নেই, সব কিছু হারিয়ে ফেলে আবার অনাহার আর ঠাণ্ডায় কষ্ট পাওয়ার আতঙ্ক! ফ্র্যাঙ্কের রোজগার অবশ্য কিছু বেড়েছে এখন, তবে ঠাণ্ডা লাগার ধাত, প্রায়ই সর্দিকাশিতে বিছানা নিতে হয়, বেশ কিছুদিনের জন্য। ধর যদি উনি হঠাৎ পঙ্গু হয়ে যান! নাহ্‌, ফ্র্যাঙ্কের ওপর বেশি ভরসা করাটা ঠিক হবে না। নিজেকে ছাড়া আর কারোর ওপরে বা অন্য কোনোকিছুর ওপরেই ভরসা করাটা উচিত হবে না। অথচ নিজের রোজগারপাতি বড়ই সামান্য বলে মনে হয়। ইয়াঙ্কিরা এসে একদিন সব যদি কেড়েকুড়ে নিয়ে যায়, তাহলে ওর কী করার থাকবে? সেই যদি, যদি আর যদি!

প্রতি মাসে যে আয় হয় তাঁর অর্ধেক টাকা টারাতে উইলের কাছে চলে যায়, খানিকটা যায় রেটের ঋণ পরিশোধের জন্য, আর বাকি যা হাতে থাকে সেটা ও গোপনে মজুত করে। কোনও কৃপণ ব্যক্তিই ওর মত ঘন ঘন নিজের মজুত করা সোনা গুনতে থাকে না বা ওর মত হারিয়ে ফেলার আতঙ্কে সিঁটিয়ে থাকে না। ব্যাঙ্কে ভরসা করে টাকা রাখতে পারে না, যদি ব্যাঙ্কে লালবাতি জ্বলে, কিংবা ইয়াঙ্কিরা যদি বাজেয়াপ্ত করে নেয়। তাই যতটা সম্ভব হয়, টাকাকড়ি নিজের কাছেই রাখে, ব্লাউজ়ে গুঁজে। বাকি টাকা ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে বাড়ির মধ্যে নানা জায়গায় লুকিয়ে রাখত, চুলার ইট সরিয়ে, নিজের টুকিটাকি জিনিস রাখবার জায়গায়, বাইবেলের দুটো পৃষ্ঠার মধ্যিখানে। এক একটা সপ্তাহ কেটে যায় আর ও আরও বেশি করে খিটখিটে হয়ে ওঠে, কারণ বিপর্যয় কিছু ঘটলে লোকসানটা আরও বেশি ডলারের ওপর দিয়ে যাবে।

ফ্র্যাঙ্ক, পিটি আর চাকরবাকরেরা ওর বিস্ফোরণগুলো অসম্ভব সহানুভূতির সঙ্গে সহ্য করেন। এসব গর্ভাবস্থার উপসর্গ বলেই ওঁরা ধরে নিয়েছিলেন, কিন্তু আসল কারণটা আন্দাজই করতে পারেননি। ফ্র্যাঙ্ক জানেন যে গর্ভবতী মহিলাকে একটু তোয়াজ করেই চলতে হয়, তাই অহমিকা দূরে সরিয়ে রেখে, মিল চালানো বা এই রকম সময়ে শহরে ঘোরাঘুরি করা যা কোনও ভদ্রমহিলারই করার কথা নয়, এই সব প্রসঙ্গ আর তুলতেনই না। ওর আচরণ ওঁর পক্ষে যথেষ্ট বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, কিন্তু মনে হল আর কটা দিন একটু সহ্য করে নেওয়াই ভাল। বাচ্চাটা আসার পর, ওঁর মনে হল, স্কারলেট সেই আগের মতই মিষ্টি একটা মেয়ে হয়ে যাবে, যাকে উনি ভালবেসেছিলেন। কিন্তু যতই উনি ওকে তুষ্ট রাখার চেষ্টা করুন না কেন, স্কারলেটের খামখেয়ালিপনা বেড়েই চলল, যেন ওকে ভূতে ধরেছে।

কিন্তু কিসে ভর করেছে, কেন এমন উন্মাদের মত ব্যবহার করছে ও, সেটা কেউই বুঝতে পারলেন না। গৃহবন্দী হওয়ার আগেই যাতে ব্যবসাটা যতটা সম্ভব গুছিয়ে নেওয়া স্কারলেটের কাছে একটা নেশার মত হয়ে পড়েছিল, আর যত বেশি সম্ভব টাকাকড়ি কামিয়ে নেওয়া, যাতে নতুন করে বিপর্যয় নেমে এলেও – আর যেভাবে ইয়াঙ্কিদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে, সেটা নামা অসম্ভব নয় – নগদ টাকার সুরক্ষার একটা বলয় যেন থাকে। টাকাপয়সাই আজকাল ওর একমাত্র ধ্যানজ্ঞান। বাচ্চাটার কথা যদি ভুল করেও মনে পড়ে যায়, তখন ওর আসার সময়হীনতার কথা ভেবে নিষ্ফল আক্রোশে জ্বলে যায়।

“মৃত্যু, খাজনা আর বাচ্চার জন্ম! কোনোটারই সময় অসময় জ্ঞান নেই!”



***

স্কারলেট একজন মেয়ে হয়ে কিনা একটা করাতের কল চালাতে আরম্ভ করে দিল – অ্যাটলান্টার নাগরিকমহলের লজ্জায় একেবারে মাথা কাটা যাবার জোগাড়, তবে যত দিন যেতে লাগল, সকলে বুঝে গেলেন যে বাড়াবাড়ি করার ব্যাপারে ও কোনও সীমারেখা মেনে চলবার পাত্রীই নয়। অসাধু উপায়ে ব্যবসা করার প্রবণতা দেখে ওঁরা একেবারে হতচকিত হয়ে পড়লেন, বিশেষ করে ওর মা বেচারি সম্ভ্রান্ত রোবিল্যার বংশের সন্তান! আর সবাই যখন জানেই যে ও সন্তানসম্ভবা, তখন প্রকাশ্য স্থানে ওর চলাফেরাটা নির্লজ্জতারই নামান্তর। সম্মানীয় যে কোনও শ্বেতাঙ্গ মহিলাই, এমনকি অনেক নিগ্রো মহিলাও যখনই বুঝতে পারেন যে তিনি অন্তঃসত্ত্বা, ঘরের বাইরে আর পা রাখেন না। মিসেজ় মেরিওয়েদার তো রাগের মাথায় বলেই ফেললেন যে স্কারলেট যা শুরু করেছে, প্রকাশ্য রাস্তাতেই ওর বাচ্চার জন্ম হয়ে না যায়।

স্কারলেটকে কেন্দ্র করে নানারকম সমালোচনা তো চলছিলই, কিন্তু ওকে নিয়ে ওঠা নতুন একটা গুজবে সমালোচনার ঝড় বয়ে গেল। স্কারলেট কেবলমাত্র ইয়াঙ্কিদের সঙ্গে কারবার করেই ক্ষান্ত হয়নি, ভাবটা এমন দেখাচ্ছে যেন এই কারবার করতে ওর ভালও লাগছে!

মিসেজ় মেরিওয়েদার এবং দক্ষিণের আরও অনেকেই উত্তর থেকে আসা নবাগতদের সঙ্গে কারবার করছেন, তবে তফাৎ এইখানেই যে এটা করতে ওঁদের মোটেই ভাল লাগছে না, আর হাবেভাবেও ওঁরা সেটা বুঝিয়েই দেন। তবে স্কারলেট যা করছে, এবং করছে বলে শোনা গেছে, সেটাকে মোটেও ভাল বলা যায় না। ও নাকি সত্যি সত্যিই ইয়াঙ্কি অফিসারদের বউদের বাড়ি যায় চায়ের আমন্ত্রণ রক্ষা করতে! একমাত্র নিজের বাড়িতে ওদের আমন্ত্রণ জানানো ছাড়া আর কিছুই ও করতে বাকি রাখেনি। শহরবাসীরা মনে করেন, আন্ট পিটি আর ফ্র্যাঙ্কের আপত্তি না থাকলে হয়ত সেটা করতেও ওর বাধত না।

ওকে নিয়ে যে শহরে জোর আলোচনা চলছে সেটা স্কারলেট জানত, কিন্তু পাত্তা দিত না। পাত্তা দিলে ওর চলবে না। ইয়াঙ্কিদের আজও ও ঘৃণা করে, ওরা যেদিন টারায় আগুন লাগাতে এসেছিল, সেদিনের থেকে ওদের প্রতি ঘৃণা একবিন্দুও কম হয়নি, কিন্তু সেই ঘৃণা ও লুকিয়ে রাখতে শিখেছে। এটা বুঝে গেছে, অনেক টাকা উপার্জন করতে হলে, ইয়াঙ্কিদের কাছ থেকেই সেটা করতে হবে, আর এটাও বুঝেছে যে একমাত্র হাসলে আর মিষ্টি করে কথা বললেই ওদের কাছ থেকে মিলের জন্য ভাল ব্যবসা পাওয়া যাবে।

তারপর একদিন যখন ও খুব বড়লোক হয়ে যাবে আর টাকাপয়সা এমনভাবে লুকিয়ে ফেলতে পারবে যাতে ইয়াঙ্কিরা কোনোভাবেই সেটার হদিস পাবে না, সেদিন ওদের মুখের ওপর বলে দেবে ওদের সম্বন্ধে ওর কী ধারণা, বলে দেবে যে ওদের কতটা ঘৃণা করে, কতটা অপছন্দ করে, কতটা অবজ্ঞা করে। কী আনন্দই না হবে সেদিন! তবে সেই সময় যতক্ষণ পর্যন্ত না আসে, ওদের সঙ্গে মানিয়ে চলাটাই সুবুদ্ধির কাজ। আর একে যদি অ্যাটলান্টার মানুষের কাছে কপটতা বলে মনে হয় তবে তাঁরা প্রাণ ভরে সমালোচনা করুন!

স্কারলেট খেয়াল করেছিল, ইয়াঙ্কি অফিসারদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করা হাতের নাগালে থাকা পাখি শিকার করার মতই সহজ। প্রবাসভূমিতে প্রতিকূল আবহাওয়ায় নির্বাসিতের মত নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করতে হয় এদের। এদের অনেকেই মার্জিত নারীসঙ্গ পাওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকে। অথচ এমন একটা শহরে ওদের থাকতে হচ্ছে যেখানে সম্ভ্রান্ত মহিলারা ওদের দেখতে পেলেই ছোঁয়া বাঁচিয়ে রাস্তার একধারে সরে যান আর এমনভাবে তাকিয়ে থাকেন যেন সুযোগ পেলেই ওদের মুখের ওপর থুতু ছিটিয়ে দেবেন। শুধু মাত্র বেশ্যা আর নিগ্রো মহিলারা ওদের সঙ্গে হেসে কথা বলে। কাজকর্ম যাই করুন না কেন, স্কারলেট সম্ভ্রান্ত বংশের একজন ভদ্রমহিলা, ওঁর সুন্দর করে হেসে কথা বলা আর চোখের সবুজ দীপ্তি দেখে ওরা বিগলিত হয়ে পড়ে।

অনেক সময় গাড়ির মধ্যে বসে স্কারলেটকে ওদের সঙ্গে কথা বলতে হয়, গালে টোল ফেলে হাসতে হয়, আর তখন ওদের প্রতি বিরাগটাও এত বেশি করে অনুভব করতে থাকে যে ওদের মুখের ওপর গালি দেবার ইচ্ছেটাও ভীষণ প্রবল হয়ে ওঠে। কিন্তু কোনোমতে নিজেকে সামলে নেয়, আর এটাও ওর নজর এড়ায় না যে একজন ইয়াঙ্কি পুরুষকেও নিজের অঙ্গুলিহেলনে নাচিয়ে আমোদ পাওয়া দক্ষিণের যে কোনো পুরুষমানুষকে নাচিয়ে আমোদ পাওয়ার মতই সহজ। তবে এক্ষেত্রে ব্যাপারটা আমোদের জন্য করা নয়, নিছকই ব্যবসা হস্তগত করার মতলবে। দক্ষিণের একজন রুচিশীল সম্ভ্রান্ত মহিলা, বর্তমানে কিছু অসুবিধের মধ্যে আছেন – নিজের এইরকম একটা ভাবমূর্তি তৈরি করে নিয়েছে। খানদানি গাম্ভীর্যের মুখোশ পরে থাকে যাতে শিকাররা ওর থেকে একটা সম্ভ্রমপূর্ণ দূরত্ব রেখে চলে। তবে ওর অমায়িক ব্যবহারে ইয়াঙ্কি অফিসারদের স্মৃতিতে মিসেজ় কেনেডি একজন আন্তরিক এবং উষ্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবেই ভাস্বর হয়ে থাকেন।

এই ‘উষ্ণ আন্তরিক ব্যবহার’ আখেরে খুব কাজে লাগল – ঠিক যেমনটা স্কারলেট চেয়েছিল। অ্যাটলান্টায় কত দিন থেকে যেতে হবে সে ব্যাপারে নিশ্চিত হতে না পেরে, গ্যারিসনের অনেক অফিসারই নিজের নিজের স্ত্রী আর পরিবারকে আনিয়ে নিয়েছেন। হোটেল আর বোর্ডিং হাউসগুলো একেবারে ভরে যাওয়ায়, থাকবার জন্য ওঁরা ছোট ছোট বাড়ি তৈরি করে নিতে লাগলেন। তার জন্য যে চেরাই কাঠের প্রয়োজন সেগুলো ওঁরা সহৃদয় মিসেজ় কেনেডির কাছ থেকেই কিনতে আগ্রহী হতেন, কারণ শহরের আর কোনও করাত মিলের মালিকদের কাছ থেকে ওঁরা মিসেজ় কেনেডির মত উষ্ণ আন্তরিক ব্যবহার পেতেন না। কার্পেটব্যাগার আর স্কলাওয়াগরাও সদ্য উপার্জিত অর্থ দিয়ে সুন্দর সুন্দর বাড়ি আর স্টোর বানাচ্ছে। তারাও অনুভব করল জিনিসপত্র স্কারলেটের কাছ থেকে কেনাই বেশি সুখকর, কারণ প্রাক্তন কনফেডারেট জওয়ানরা মুখের ওপর অভদ্রতা না করলেও আচার আচরণের শীতলতা দিয়ে ঘৃণা উজাড় করে দেয়।

উষ্ণতাটা বেশ লাভজনক বলেই প্রতিপন্ন হল – ঠিক স্কারলেট যেমনটি চেয়েছিল। গ্যারিসনের অনেক অফিসারই, এই শহরে ওঁদের কতদিনের মেয়াদ সেই ব্যাপারে নিশ্চিত না হলেও, নিজেদের স্ত্রী এবং পরিবারকে অ্যাটলান্টায় আনিয়ে নিয়েছিলেন। হোটেল আর বোর্ডিং হাউজ়গুলো কানায় কানায় ভর্তি, ফলে নিজেদের জন্য ওঁদের ছোট ছোট বাড়ি নিতে হচ্ছিল, আর এর জন্য ওঁরা মিসেজ় কেনেডির কাছ থেকেই মালপত্র কিনতে চাইছিলেন, কারণ মিসেজ় কেনেডির কাছ থেকে ওঁরা যেরকম সহৃদয় ব্যবহার পান, সেটা আর কারও কাছে পান না। কার্পেটব্যাগার আর স্ক্যালাওয়াগরাও, যারা নিজেদের সদ্যপ্রাপ্ত সম্পদ দিয়ে জমকালো অট্টালিকা স্টোর আর হোটেল বানানোর তালে ছিল, তারাও দেখল মিসেজ় কেনেডির সঙ্গে ব্যবসা করাটাই বেশি আনন্দদায়ক, কারণ প্রাক্তন কনফেডারেট সৈন্যরা অমায়িক ব্যবহার করলেও, সেই ব্যবহার এতই শীতল ছিল যে সেটা ঘৃণারই নামান্তর বলে মনে হত।

অতএব, সুন্দরী বলে, আকর্ষণীয়া বলে, এবং প্রয়োজনে স্কারলেট নিজেকে নিরুপায় এবং নিঃসঙ্গ একজন মহিলা হিসেবে পেশ করতে পারে বলে, ওঁরা সকলেই খুশি হয়েই ওর মিলের চেরাই কাঠ আর ফ্র্যাঙ্কের স্টোর থেকে অন্যান্য মালপত্র কিনতেন। এমন সাহসী অথচ অসহায় একজন মহিলা, ভোলাভালা একজন স্বামীই যাঁর একমাত্র অবলম্বন, ওঁর দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়াটাই ওঁদের কাছে কর্তব্য মনে হত। ব্যবসার শ্রীবৃদ্ধির সাথে সাথে স্কারলেট বিশ্বাস করতে শুরু করল যে ইয়াঙ্কিদের টাকাকড়ি দিয়ে শুধুর বর্তমানটাই নিরাপদ করতে পেরেছে তাই নয়, ইয়াঙ্কিদের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে যাওয়ায় একই সঙ্গে ভবিষ্যতটাও নিরাপদ হয়ে যাচ্ছে।

ইয়াঙ্কি অফিসারদের সঙ্গে সম্পর্কটা যে স্তরে রাখবে বলে মনে মনে ঠিক করে নিয়েছিল, কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল কাজটা আশাতীতভাবে সহজ, কারণ ওঁদের সকলের মনেই দক্ষিণের প্রতিটি মহিলার সম্বন্ধেই শ্রদ্ধামিশ্রিত এক ভয় কাজ করত, কিন্তু ওঁদের স্ত্রীরা এমন একটা সমস্যার তৈরি করলেন যার জন্য স্কারলেট একেবারেই প্রস্তুত ছিল না। ওঁদের এড়িয়ে যেতে পারলেই স্কারলেট স্বস্তি পেত, কিন্তু সেটা সম্ভব হল না, কারণ অফিসারদের বউয়েরা ওর সঙ্গে দেখা করার জন্য বদ্ধপরিকর। দক্ষিণের এবং দক্ষিণের মহিলাদের রকমসকম নিয়ে ওঁদের মধ্যে গভীর কৌতুহল, আর স্কারলেটের সঙ্গে দেখা না করতে পারলে সেই কৌতুহল মেটানোর সুযগ কেমন করে পাবেন! অ্যাটলান্টার অন্যান্য মহিলারা তো ওঁদের দেখলেই মুখ ঘুরিয়ে নেন, এমনকি গির্জায় দেখা হলেও সৌজন্যমূলক অভিবাদন করতেও অস্বীকার করেন, তাই ব্যবসায়িক প্রয়োজন যখন স্কারলেটকে ওঁদের বাড়িতে যেতে হত, তখন ওঁরা মনে করতেন ঈশ্বর যেন ওঁদের প্রার্থনায় সাড়া দিয়েছেন। কখনো যদি কোনো ইয়াঙ্কির বাড়ির সামনে গাড়ি দাঁড় করিয়ে গৃহকর্তার সঙ্গে কড়িবর্গা বা থাম নিয়ে কথাবার্তা বলতে যেত, ওঁর স্ত্রী বেরিয়ে এসে আলোচনায় যোগ দিতেন কিংবা ওকে ঘরে এসে বসে এক পেয়ালায় চা পানের জন্য সনির্বন্ধ অনুরোধ করতে থাকতেন। ব্যাপারটা অরুচিকর ঠেকলেও, স্কারলেট পারতপক্ষে আমন্ত্রণ অস্বীকার করত না, কারণ ঘুরপথে ফ্র্যাঙ্কের স্টোর থেকে মালপত্র কেনবার পরামর্শ দেওয়ার এত বড় সুযোগ হাতছাড়া করে কীভাবে? তবে অত্যন্ত ব্যক্তিগত সব ব্যাপারে প্রশ্ন করলে বা দক্ষিণের নিকৃষ্ট সংস্কৃতির সঙ্গে ওঁরা মানিয়ে নিয়ে চলছেন এরকম একটা ভাব দেখালে স্কারলেটকে প্রায়ই কঠিন ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হত।

এই সব ইয়াঙ্কি মহিলারা বাইবেলের পরেই টম কাকার কুটির বইটাকেই আপ্তবাক্য হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন। দক্ষিণের প্রতিটি মানুষ যে ব্লাডহাউন্ড পুষতেন পলাতক নিগ্রো ক্রীতদাসদের ধরে আনার জন্য, সেটা নিয়ে ওঁদের অসীম কৌতুহল। স্কারলেট বলল ও জীবনে একবারই মাত্র একটা ব্লাডহাউন্ড দেখেছে আর সেটা মোটেই ম্যাস্টিফ জাতীয় বিশাল আর হিংস্র কুকুর নয়, নিতান্তই ছোটোখাটো নিরীহ একটা প্রাণী, কথাটা ওঁদের বিশ্বাসই হচ্ছিল না। যে গরম লোহার ছ্যাঁকা দিয়ে ক্রীতদাসদের কপালে ছাপ মেরে দেওয়া হত আর ক্যাট-ও’-নাইন টেইলের চাবুক১ যেটা দিয়ে পিটিয়ে ক্রীতদাসদের মেরে ফেলা হত, সেসব নিয়ে ওঁরা স্কারলেটের কাছে জানতে চাইতেন। ক্রীতদাসীদের যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার করার ব্যাপারে ওঁরা যখন জানতে চাইলেন, স্কারলেটের মনে হল এঁদের রুচি অত্যন্ত নিম্নমানের আর এঁরা অত্যন্ত অশিক্ষিত। কথাটা আরও গায়ে লাগল এই কারণে যে ইয়াঙ্কি সৈন্যরা অ্যাটলান্টায় ঘাঁটি গেড়ে বসার পর থেকে মিউল্যাটো২ বাচ্চার সংখ্যায় বিশাল বৃদ্ধি ঘটেছে।

অ্যাটলান্টার অন্য কোনও মহিলাকে এঁদের গোঁড়ামিতে আর অজ্ঞতায় ভরা কথাবার্তা শুনতে হলে ওঁরা রাগে ফেটে পড়তেন, কিন্তু স্কারলেট নিজেকে সামলে রাখে। রাগের থেকেও ওঁদের আচরণে ওর ঘেন্নাই বেশি হয়, সেটাই হয়ত ওকে রাগ সাওমলে রাখার ব্যাপারে সাহায্য করে। হাজার হলেও ওঁরা তো আদতে ইয়াঙ্কিই, আর ইয়াঙ্কিদের থেকে এর চাইতে ভাল কিছু আশা করাটাই তো বোকামি। ফলে ওর রাজ্য নিয়ে ওঁদের হঠকারী আচরণ, এখানকার জনগণ, আর তাদের নীতিবোধ নিয়ে ইয়াঙ্কিদের তামাশা – এসব স্কারলেট গায়ে মাখত না, কেবল ভেতরে ভেতরে একটা অবজ্ঞা পুষে রাখত। কিন্তু তারই মধ্যে এমন একটা ঘটনা ঘটে গেল যে স্কারলেট রাগে ফেটে পড়ল, নিজেকে সামলাতে পারল না। প্রয়োজন হলে যে স্পষ্ট কথা মুখের ওপর বলে দিতে দ্বিধা করবে না, সেটা বুঝিয়ে দিল। এই ঘটনা থেকে উত্তর আর দক্ষিণের ফাটলটা কতখানি গভীর সেটা স্কারলেট উপলব্ধি করতে পারল আর এটাও বুঝল যে কোনোভাবেই এই ফাটল ভরাট করা সম্ভব নয়।

একদিন বিকেলে, আঙ্কল পিটারের সঙ্গে বাড়ি ফেরার পথে একটা বাড়ি – যেখানে তিনজন ইয়াঙ্কি অফিসারের পরিবার গাদাগাদি করে থাকছিলেন, স্কারলেটের মিলেরই চেরাই কাঠ দিয়ে ওঁদের নিজস্ব বাড়ি তখনও তৈরি হচ্ছে – সেই বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। তিনজন গৃহিণীই সেই সময় রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে, ওকে দেখতে পেয়েই হাত নেড়ে গাড়ি থামাতে বললেন। গাড়ির কাছে এসে ওঁরা নাকি গলায় স্কারলেটকে অভিবাদন জানালেন। এই নাকিসুর শুনলেই স্কারলেটের অস্বস্তি হত, মনে হত ইয়াঙ্কিদের বাকি সবকিছু ক্ষমা করে দিতে পারলেও এই নাকিসুর কিছুতেই ক্ষমা করা যায় না।

“আপনার কথাই ভাবছিলাম, মিসেজ় কেনেডি,” মেইন থেকে আসা লম্বা ছিপছিপে একজন মহিলা বলে উঠলেন। “এই অভিশপ্ত শহরটা সম্বন্ধে আমার কিছু জানার আছে।”

অ্যাটলান্টাকে নিয়ে এই বিদ্রুপটা স্কারলেট হজম করে ফেলল, যদিও উপযুক্ত ঘৃণার সঙ্গে, তারপর কাঠকাঠ হয়ে একটু হাসার চেষ্টা করল।

“কী জানতে চান, বলুন?”

“আমার আয়া, ওর নামে ব্রিজেট, উত্তরে ফিরে গেছে। বলে কিনা এই শহরে, এই ‘নেইগুর’দের – ও ওদের এই নামেই ডাকত – সঙ্গে আর একটা দিনও কাটাতে পারবে না। এদিকে বাচ্চারা আমাকে এমন জ্বালাতন করতে শুরু করেছে না! অন্য একজন আয়া পাওয়ার ব্যাপারে যদি একটু সাহায্য করেন। কোথায় গিয়ে বলতে হবে – কিছুই তো জানি না।”

“সেটা আর এমন কী সমস্যা,” স্কারলেট একটু হেসে বলল। “গাঁয়ের থেকে সবে এসেছে যার মাথাটা ওই ফ্রীডমেন’স ব্যুরো এখনো চিবিয়ে খেতে পারেনি, এমন একজন ডার্কি পেলেই হবে। এদের মত ভাল আয়া আর হতেই পারে না। এই গেটের সামনে দাঁড়িয়ে যেসব ডার্কি মহিলা এদিক দিয়ে যাবে, তাদের ডেকে জিগ্যেস করুন, আপনি নিশ্চয়ই কোনও – ”

মহিলা তিনজন একেবারে আঁতকে উঠলেন।

“বলেন কী, আমার বাচ্চাদের একটা কালা নিগারের ভরসায় ছেড়ে দেব?” মেইন থেকে আসা মহিলা চেঁচিয়ে উঠলেন। “আমি একজন ভাল আইরিশ মেয়ের খোঁজ করছিলাম।”

“আমার ধারণা, অ্যাটলান্টায় আইরিশ কাজের মেয়ে আপনি পাবেন না,” স্কারলেট ঠাণ্ডা গলায় জবাব দিল। “আমি ব্যক্তিগতভাবে বলতে পারি সাদা চামড়ার কাজের লোক আমি কখনো দেখেছি বলে মনে পড়ে না, আর এরকম কাউকে বাড়িতে কাজে লাগানোর বিন্দুমাত্র ইচ্ছে আমার নেই। তাছাড়া,” গলার স্বরে ব্যঙ্গটাকে লুকিয়ে রাখতে পারল না, “আমি আপনাকে ভরসা দিয়ে বলতে পারি যে ডার্কিরা নরখাদক নয় আর যথেষ্টই বিশ্বাসযোগ্য।”

“না, বাবা না! এমন কাউকে আমি ঘরের ত্রিসীমানার মধ্যে দেখতে চাই না। যতসব আজগুবি ধারণা!”

“আমি ওদের মুখই দেখতে চাই না তো বিশ্বাস করা! তার ওপর আবার বিশ্বাস করে আমার বাচ্চাদের দেখাশোনা ওদের ওপর বিশ্বাস করে ছেড়ে দেওয়া – ”

ম্যামির বয়সের ভারে জীর্ণ হাতদুটোর কথা মনে পড়ে গেল স্কারলেটের। এলেনের, ওর নিজের আর ওয়েডের যত্ন নিতে নিতে খসখসে হয়ে গেছে। ওই কালো হাতের জাদু জানবে কেমন করে উড়ে এসে জুড়ে বসা এই লোকগুলো? ওই হাতের ছোঁয়ায় প্রাণ জুড়িয়ে যায়, মন স্নিগ্ধ হয়ে ওঠে। ওই হাত জানে কী করে আদর করতে হয়, গায়ে হাত বুলিয়ে দিতে হয়। এরা কী জানবে? স্কারলেট একটু হাসল।

“ভাবতে অবাক লাগছে, আপনারা এই রকম ভাবেন, অথচ আপনারাই তো উঠে পড়ে লেগেছিলেন ওদের স্বাধীন করার জন্য!”

“রক্ষে কর বাছা! অন্তত আমি বাবা এসবে মধ্যে ছিলাম না,” মেইনের মহিলা হেসে উঠলেন। দক্ষিণে আসার আগে পর্যন্ত আমি কখনো নিগার দেখিনি, আর যদি আর কখনো দেখতে নাও পাই, আমার কিচ্ছু এসে যাবে না। ওদের দেখলেই আমার গা গুলিয়ে ওঠে। বিশ্বাস করে ওদের একটাকে – ”

কিছুক্ষণ ধরেই স্কারলেট লক্ষ্য করছিল আঙ্কল পিটার খুব টানটান হয়ে বসে ঘোড়ার কানের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ফোঁস ফোঁস করে শ্বাস টানছে। যখন মেইনের সেই মহিলা হঠাৎ জোরে হেসে উঠে সঙ্গিনীদের আঙ্গুল দিয়ে পিটারকে দেখাতে লাগলেন, তখন বাধ্য হয়েই স্কারলেটকে ওর দিকে নজর ঘোরাতে হল।

“ওই বুড়ো নিগারটাকে লক্ষ্য কর – ঠিক একটা কোলাব্যাঙের মত ফুলছে,” উনি হি হি করে হেসে উঠলেন। “ওই নিগারটা নিশ্চয়ই আপনার বুড়ো কোনো পালতু জানোয়ার, ঠিক কিনা? আপনারা, দক্ষিণের মানুষরা, নিগারদের সঙ্গে কী রকম ব্যবহার করা উচিত সেটাই জানেন না। লাই দিয়ে একেবারে মাথায় তুলে দিয়েছেন!”

পিটার জোরে শ্বাস নিল, ওর বলিরেখা চিহ্নিত কপালে গভীর ভাঁজ। কিন্তু দৃষ্টি সামনের দিকেই নিবদ্ধ। জীবনে কোনও সাদা চামড়ার মানুষের মুখ থেকে ওকে ‘নিগার’ বলতে শোনেনি। নিগ্রোরা নিজেদের মধ্যে অবশ্যই কথাটা ব্যবহার করে থাকে। কিন্তু সাদা চামড়ার মানুষড়া কখনোই বলেন না। তার ওপর আবার অবিশ্বাসী, ‘পালতু জানোয়ার’ বলা! যে পিটার কিনা বহু বছর ধরে হ্যামিলটন পরিবারের একজন সম্মানিত এবং অপরিহার্য সদস্য!

পিটারের অভিমানটা স্কারলেট লক্ষ্য নয়, অনুভব করতে পারল। ওই কালো থুতনিটা অপমানে কেঁপে কেঁপে উঠছে। একটা চণ্ডাল রাগ পেয়ে বসল ওকে। এই মহিলাদের কনফেডারেট সেনাবাহিনীকে খাটো করে দেখানো, জেফ ডেভিসের নামে কলঙ্ক রটানো, আর দক্ষিণের মানুষদের ওপর ক্রীতদাসদের খুন করার, ওদের ওপর অত্যাচার করার হাজারটা অভিযোগ মনে মনে ঘৃণা পুষে রেখে চুপচাপ শুনে গেছে। আখেরে যদি লাভ হয়, নিজের মহত্ব আর সততা নিয়ে যে কোনো কুৎসাও হজম করে ফেলতে পারে। কিন্তু অর্বাচীনের মত মন্তব্য করে ওঁরা বিশ্বস্ত একজন বৃদ্ধ নিগারকে নিষ্ঠুরভাবে আঘাত করায় বারুদে যেন জ্বলন্ত দেশলাই পড়ার মত অবস্থা হল ওর মনে। পলকের জন্য ওর চোখ চলে গেল পিটারের কোমরে গোঁজা বড় ঘোড়া পিস্তলটার দিকে, ওটা তুলে নেবার জন্য হাত নিসপিস করতে লাগল। এদের খুন করে ফেলা উচিত, এই সব অসভ্য, অহংকারী, মূর্খ দখলদারদের। তারপর মনে হল এখনও ইয়াঙ্কিদের ব্যাপারে ওর মনোভাবটা আসলে কী, সেটা মুখের ওপর বলে দেবার সময় আসেনি, দাঁতে দাঁত চেপে, চোয়ালের পেশি ফুলিয়ে নিজেকে সম্বরণ করল। সেই দিন আসবে, অবশ্যই আসবে! তবে এখনও তার দেরি আছে।

“আঙ্কল পিটার আমাদের পরিবারেরই একজন,” ও বলে উঠল, গলা কাঁপছে। “শুভ সন্ধ্যা। পিটার, গাড়ি চালাও।”

ঘোড়ার পিঠে পিটার চাবুকটা এমন সজোরে চালাল যে বেচারা জানোয়ারটা চমকে উঠে লাফ দিল, গাড়িটাও টাল সামলাতে না পেরে লাফিয়ে উঠল। স্কারলেট শুনতে পেল সেই মেইনের মহিলা খুব অবাক হয়ে বলছেন, “ওঁর পরিবারের একজন? নিশ্চয়ই উনি বলতে চাইলেন না যে ওটা ওঁর আত্মীয়? গায়ের রঙ তো একেবারে নিকষ কালো।”

নির্বংশ হোক ওরা! এই দুনিয়া থেকে ওরা মুছে যাক! যদি কখনো আমার অনেক টাকাপয়সা হয়, ওদের মুখের ওপর আমি থুতু ছেটাবো! আমি –

পিটারের দিকে তাকাল, নাকের পাশ দিয়ে চোখের জলের ধারা গড়িয়ে নামছে। পলকের মধ্যে ওর জন্য একটা কোমল অনুভূতি বোধ করল, ওর অপমানে বেদনাতুর হয়ে উঠল, চোখ জ্বালা করে উঠল। একজন শিশুর সঙ্গে কেউ যেন অত্যন্ত নিষ্ঠুর আচরণ করে তাঁকে কাঁদিয়ে দিয়েছে। ওই মহিলারা আঙ্কল পিটারকে কষ্ট দিয়েছে – যে পিটার মেক্সিকোর যুদ্ধের পুরো সময়টাই বৃদ্ধ কর্নেল হ্যামিল্টনের পাশে পাশে থেকেছে, ওর বাহুতে শুয়েই উনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন, মেলি আর চার্লসকে ও নিজের হাতে মানুষ করেছে, কৌশলহীনা, নির্বোধ মিস পিটিকে পালিয়ে যাওয়ার সময় আগলে আগলে রেখেছে, আবার আত্মসমর্পণের পর ম্যাকন থেকে যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলের ভেতর দিয়ে একটা ঘোড়া জোগাড় করে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে। আর ওরা বলে কিনা নিগারকে ওরা বিশ্বাস করতে পারে না!

“পিটার,” ভাঙ্গা গলায় স্কারলেট বলল, পিটারের শীর্ণ বাহুতে হাত রেখে। “তোমাকে কাঁদতে দেখে আমার খুব লজ্জা করছে। ওদের কথায় একদম কান দিও না। আসলে তো ওরা ওসভ্য ইয়াঙ্কিই!”

“ওরা আমার সামনে এমন ভাব করে কথা বলছিল যেন আমি একটা খচ্চর, ওদের কথা বুঝতেই পারব না – যেন আমি একটা আফ্রিকান, কাকে নিয়ে ওরা কথা বলছে আমি কিছুই বুঝব না,” পিটার সশব্দে নাক সিটকালো। “আর ওরা আমাকে নিগার বলে ডাকল, সাদা চামড়ার কেউ কখনো আমাকে নিগার বলেনি, ওরা আমাকে বুড়ো পালতু জানোয়ার বলল, বলল যে নিগারদের বিশ্বাস করা যায় না! আমি – আমাকে বিশ্বাস করা যায় না! কিন্তু বুড়ো কর্নেল মরবার সময় আমাকে বলেছিলেন, ‘পিটার, তুমি! আমার ছেলেমেয়েদের তুমি দেখো। মিস পিটিপ্যাটের বয়সও বেশি নয়, ওকেও আগলে রেখো!’ বলেছিলেন, ‘আর ওর বুদ্ধিশুদ্ধিও খুবই কম,’ এত বছর ধরে আমি ওঁকে আগলে রেখেছি – ”

“একমাত্র এঞ্জেল গেব্রিয়েল এলেই বোধহয় এর থেকে বেশি কিছু করতে পারতেন,” স্কারলেট সান্ত্বনা দিয়ে বলল। “তোমাকে ছাড়া আমরা ভাল থাকতেই পারতাম না।”

“হ্যাঁ ম্যা’ম, অনেক ধন্যবাদ। ম্যা’ম আমি জানি, আপনিও জানেন, কিন্তু ওই ইয়াঙ্কিগুলো সেটা জানে না, জানতে চায়ও না। আচ্ছা মিস স্কারলেট, ওরা আমাদের ব্যাপারে নাক গলায় কেন? আমাদের, কনফেডারেটদের ওরা তো বুঝতেই পারে না।”

স্কারলেট কিছু বলল না, কারণ তখনও মনে মনে ও রাগে ফুঁসছিল কারণ ওই ইয়াঙ্কি মহিলাদের মুখের ওপর যথাযোগ্য জবাব দিয়ে মনের ঝাল মিটিয়ে নিতে পারেনি বলে। দুজনে চুপচাপ বাড়ির দিকে এগিয়ে চলল। পিটারের নাক টানা বন্ধ হয়েছে, কিন্তু ওর নিচের ঠোঁট খুব উদ্বেগজনকভাবে সামনের দিকে ঝুলে পড়েছে। প্রাথমিক আঘাতটা সামলে নিয়ে রাগটা ওর ক্রমশ বেড়ে চলেছে।

স্কারলেট ভাবতে লাগল – কী আজব চিড়িয়া এই ইয়াঙ্কিগুলো রে বাবা! ওই মহিলাগুলো ভাবল যে পিটারের গায়ের রঙ কালো বলে ওর একজোড়া কানও নেই, ওদের নিজেদেরই মত বেদনা অনুভব করার মত আবেগও নেই। ওরা জানেই না নিগ্রোদের কত তোয়াজ করে রাখতে হয়, ঠিক বাচ্চাদের মত। ওদের পথ দেখাতে হয়, তারিফ করতে হয়, গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে হয়, আবার দরকার পড়লে বকাবকিও করতে হয়। নিগ্রোদের ওরা বোঝে না, বোঝে না ওদের সঙ্গে ওদের প্রাক্তন মালিকদের সম্পর্কটাও। তা সত্ত্বেও ওদেরই মুক্তি দেওয়ার জন্য গোটা একটা লড়াই বাধিয়ে বসল। অথচ মুক্ত করে দেবার পর ওদের সঙ্গে কোনো সম্পর্কও রাখতে চায় না, একমাত্র দক্ষিণের মানুষদের বিরুদ্ধে নিগ্রোদের তাতিয়ে দেওয়া ছাড়া। ওরা না করে নিগ্রোদের পছন্দ, না করে বিশ্বাস, এমনকি ওদের বোঝেও না। আর এদিকে গলা ফাটিয়ে রটিয়ে বেড়াচ্ছে দক্ষিণের মানুষরা নাকি নিগ্রোদের সঙ্গে মিলে মিশে থাকতেই পারেনি।

ডার্কিদের নাকি বিশ্বাস করা যায় না! সাদা চামড়ার অনেক মানুষর থেকেও স্কারলেট ওদেরই বেশি ভরসা করে, অন্তত ইয়াঙ্কিদের থেকে তো বটেই। ওদের আনুগত্য, ওদের অক্লান্ত পরিশ্রম করার ক্ষমতা, ওদের ভালবাসা – এত সহজেই কি ভোলা যায়, অঢেল টাকা ঢেলেও কি কেনা যায়? ইয়াঙ্কি আক্রমণের পরেও যে অল্প কয়েকজন বিশ্বাসী নিগ্রো টারাতে থেকে গেছে, তাদের কথা মনে হল। ওরা তো পালিয়েও যেতে পারত বা আরামে জীবন কাটাবার জন্য ট্রুপে গিয়ে নাম লেখাতেও পারত! কিন্তু ওরা থেকে গেছে। ডিলসির কথা ভাবল, তুলোর খেতে ওর সঙ্গে হাতে হাত লাগিয়ে হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করেছে। পোর্ক, নিজের জীবন বিপন্ন করে পড়শিদের মুরগি খামার থেকে মুরগি চুরি করে এনেছে, কেন? না যাতে পরিবারের কেউ অভুক্ত না থাকে! ম্যামি অ্যাটলান্টা থেকে ছুটে এসেছে, যাতে ও কোনো ভুল কাজ না করে বসে! পড়শিদের চাকরদের কথা ভাবল, শ্বেতাঙ্গ প্রভুদের অনুগত থেকে তাঁদের পরিবার পরিজনদের দেখাশোনা করেছে, যখন পরিবারের পুরুষমানুষদের লড়াইয়ের ময়দানে চলে যেতে হয়েছে। লড়াইয়ের পরিস্থিতি ভয়ঙ্কর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবারের লোকজনের সঙ্গে ঘরছাড়া হয়েছে, লড়াইয়ে যাঁরা জখম হয়েছিলেন, তাঁদের সেবা করেছে, মৃতকে সমাধিস্থ করেছে, শোকার্তদের সান্ত্বনা দিয়েছে, অক্লান্ত পরিশ্রম করেছে, ভিক্ষে করেছে, চুরি করেছে, শুধু পরিবারের লোকেদের পাতে কিছু খাবার তুলে দেবার জন্য। এমনকি এখনও, ফ্রীডমেন’স ব্যুরোর এত লোভ দেখানো সত্ত্বেও, ওরা এখনও ওদের শ্বেতাঙ্গ পরিবারের সঙ্গেই থেকে গেছে, ক্রীতদাস থাকার সময়ের থেকেও আরও বেশি করে পরিশ্রম করছে। কিন্তু ইয়াঙ্কিরা এসব কিছুই বোঝে না, কোনোদিন বুঝবে বলেও মনে হয় না।

“অথচ এরাই তোমাদের স্বাধীন করে দিয়েছে,” কথাটা জোরে জোরে বলল।

“না ম্যা’ম, ওরা আমাকে স্বাধীন করেনি। ওই সব পাজি লোকদের আমাকে স্বাধীন করে দিতে দেব না,” পিটার সরোষে বলল। “আমি এখনও মিস পিটিরই আছি, আমি মরে যাবার পর উনি আমাকে হ্যামিলটনদের কবরখানাতেই কবর দেবেন – যেটা আমার নিজের জায়গা … যখন আমি এই সমস্ত কথা আমার মিসকে বলব, দেখবেন উনি কত কষ্ট পান … যখন বলব আপনি কীভাবে ওই ইয়াঙ্কি মহিলাদের সামনে আমাকে অপমান হতে দিয়েছেন!”

“আমি তো সেরকম কিছু করিনি,” ভয় পেয়ে স্কারলেট চেঁচিয়ে উঠল।

“করেছেন বৈকি, মিস স্কারলেট,” ঠোঁট আরও ফুলিয়ে পিটার বলে উঠল। “আসল কথাটা হল, আপনার বা আমার, ইয়াঙ্কিদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার কী দরকারই নেই, যাতে ওরা আমাকে অপমান করতে পারে? আপনি যদি ওদের সঙ্গে কথা না বলতেন, তাহলে ওরা আমাকে খচ্চর বা আফ্রিকান ভাবার সুযোগ পেত? আপনিও আমার হয়ে কিছু বলেননি।”

“হ্যাঁ, বলেছি তো!” নিন্দেটা স্কারলেটের গায়ে লাগল। “তুমি যে আমাদের পরিবারেরই একজন, বললাম কিনা?”

“ওটাকে আমার হয়ে কথা বলা বলে না। ওটা তো যেটা সত্যি সেটাই শুধু বলেছেন,” পিটার বলল। “মিস স্কারলেট, ইয়াঙ্কিদের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে চলার কোনো দরকার নেই। আর কোনও ভদ্রমহিলা তো রাখছেন না। মিস পিটিকে আপনি কখনো দেখবেন না ওই পাজিগুলোর সাথে মেলামেশা করতে। আর ওরা আমাকে নিয়ে যা যা বলেছে, ওঁকে যখন বলব, উনি একটুও খুশি হবেন না।”

পিটারের নিন্দা শুনে স্কারলেট আঘাত পেল, ফ্র্যাঙ্ক বা আন্ট পিটি বা পাড়াপড়শিদের কথাতেও এরকম আঘাত পায়নি। এতটাই বিরক্ত হল, ইচ্ছে করছিল বুড়ো ডার্কিটাকে ধরে নেড়ে দিতে যাতে ওর ফোকলা পাটি দুটো আটকে যায়। পিটার যা বলল, সেটা সত্যি, কিন্তু তাই বলে একজন নিগ্রোর কাছ থেকে, বিশেষ করে পরিবারের এক নিগ্রোর মুখ থেকে এসব কথা শুনতে ওর খারাপই লাগল। চাকর-বাকরদের চোখে নিচু হয়ে যাওয়াটা বেশ অপমানের দক্ষিণের একজন মানুষের পক্ষে।

“বুড়ো পালতু জানোয়ার!” পিটার গজগজ করল। “মিস পিটিকে বলব এরপর থেকে আমাকে যেন আপনাকে কোথাও না নিয়ে যেতে বলেন। আর নয়, ম্যা’ম!”

“আন্ট পিটি চাইবেন, তুমি আমাকে যেমন নিয়ে যাচ্ছ, তেমনই নিয়ে যাবে,” একটু কড়া গলায় ও বলল, “বাস, আর এসব কথা শুনতে চাই না।”

“আমার পিঠে ব্যথা হতেই পারে,” পিটার মুখ ভার করে শাসালো। “এই তো এখুনিই আমার পিঠে এত ব্যথা হচ্ছে যে সোজা হয়ে বসতেও কষ্ট হচ্ছে। ব্যথা নিয়ে আমার মিস আমাকে কখনোই গাড়ি চালাতে দেবেন না … মিস স্কারলেট, ওই পাজি, সাদা চামড়ার ইয়াঙ্কিগুলোর কাছে ভাল সেজে থেকে আপনার কিছুই লাভ হবে না, আপনার নিজের লোকেরা যদি না মেনে নেয়।”

জল কতদূর গড়াতে পারে, তার একদম নির্ভুল ইঙ্গিত। একরাশ রাগ চেপে রেখে স্কারলেট চুপ হয়ে গেল। ঠিকই তো, দখলদাররা ওকে মেনে নিয়েছে, কিন্তু ওর আত্মীয়স্বজন, পাড়াপড়শিরা মেনে নেয়নি। শহরে ওকে নিয়ে কী ধরণের কথাবার্তা চলছে, সবই জানে। এমনকি পিটারও এখন থেকে সবার সামনে দিয়ে ওকে নিয়ে ঘোরাঘুরিটা মেনে নেবে না। শেষ ভরসার জায়গা বলতে এটাই একমাত্র টিকে ছিল।

এতদিন পর্যন্ত লোকে যাই বলুক না কেন, ও গ্রাহ্যই করত না। কিছুটা হয়ত ওর সহজাত একগুঁয়েমির জন্য, খানিকটা অবজ্ঞায়। কিন্তু পিটারের কথায় ও তীব্র অপমান বোধ করল আর ভেতরে ভেতরে জ্বলতে লাগল। মনের মধ্যে একটা প্রতিরোধ গড়ে উঠল। হঠাৎ করে ওর মনে হল প্রতিবেশীদের ও ঠিক ততটাই ঘৃণা করে যতটা করে ইয়াঙ্কিদের।

“আমি কী করি না করি, তাতে ওদের কী?” মনে মনে ভাবল। “ওরা নিশ্চয়ই ভাবে ইয়াঙ্কিদের সঙ্গে মিশে আমি খুব আনন্দ পাচ্ছি আর খেতমজুরদের মত খেটে মরছি। একটা কঠিন কাজকে ওরা আমার জন্য আরও কঠিন করে তুলেছে। ওরা কী ভাবল, আমার কিচ্ছু এসে যায় না। এসব নিয়ে মাথা ঘামাতেও চাই না। মাথা ঘামানোর উপায়ই নেই এখন। তবে একদিন – আমারও দিন আসবে – ”

হ্যাঁ, আমারও দিন আসবে! পৃথিবীটা আবার যখন সুস্থ, স্বাভাবিক হয়ে উঠবে তখন ও নিশ্চিন্ত মনে আবার এলেনের মতই মহান একজন লেডি হয়ে উঠবে। তখন ও ঠিক লেডিদের মতই পরনির্ভরশীল, গৃহমুখী হয়ে উঠবে আর সকলেই ওকে মেনে নেবে। আবার যখন ওর অনেক টাকা হবে, কী চমৎকার ব্যাপারই না হবে! তখন ও নিশ্চিন্ত মনে স্নেহশীল হতে পারবে, ভদ্রতা রক্ষা করতে পারবে, ঠিক এলেন যেমন ছিলেন। তখন ও অন্যদের প্রতি সহানুভূতি দেখাতে পারবে, সামাজিক রীতি মেনে চলতে পারবে। ভয় ওকে দিন রাত তাড়া করে বেড়াবে না, জীবন শান্ত হয়ে উঠবে, ত্বরাহীন হয়ে উঠবে। ছেলেমেয়েদের সঙ্গে খেলাধুলো করতে পারবে, ওদের পড়াশুনোর দিকে নজর দিতে পারেবে। উষ্ণ মন্থর অপরাহ্ণে লেডিরা আড্ডা দিতে আসবে, ওদের পেটিকোটের খসখস আওয়াজ আর তালে তালে তালপাতার পাখা চালানোর সাঁই সাঁই আওয়াজ শুনতে পাবে। ও চা আর সুস্বাদু স্যান্ডউইচ, কেক পরিবেশন করে অতিথি আপ্যায়ন করবে। ঘন্টার পর ঘন্টা অলস মনে আড্ডা মারবে। যারা আর্ত, যারা ভাগ্যহীন তাদের প্রতি দয়া দেখাবে, গরীবদের কাছে ঝুড়ি ভর্তি করে খাবার নিয়ে যাবে, অসুস্থ মানুষের জন্য সুপ নিয়ে যাবে, আর ওর বিলাসবহুল জুড়িগাড়িতে করে গরীবদের ‘হাওয়া খাওয়াতে’ নিয়ে যাবে। একেবারে দক্ষিণের মানুষ একজন লেডি বলতে যা বোঝেন, ও ঠিক সেইরকমই একজন লেডি হয়ে যাবে, যেমন ওর মা ছিলেন। তখন সকলে ওকেও ভালবাসবেন, যেমন ওঁরা ওর মাকে ভালবাসতেন। ওঁরা প্রশংসা করে বলবেন যে ও কত পরার্থপর, যেন সাক্ষাৎ ‘মা লক্ষ্মী’!”

আসলে যে ও কখনোই মহানুভব হতে চায় না, দানশীলা হতে চায় না, বা দয়ালু হতে চায় না, সেটা মাঝে মধ্যে উপলব্ধি করলেও, এই সব দিবাস্বপ্ন দেখার আনন্দ কখনও কম হত না। ওর একমাত্র উদ্দেশ্য হল এই সব গুণাবলী যে ওর মধ্যে আছে, সেটা সকলে মনে করুক। কিন্তু ওর স্থুল চোখে এই দুটোর মধ্যে পার্থক্য করার ক্ষমতা ছিল না। কোনো একদিন ওর অনেক টাকা হবে আর সবাই ওকে মেনে নিতে বাধ্য হবে, সেটাই যথেষ্ট।

কোনো একদিন! কিন্তু এখন নয়। লোকে যাই বলুক না কেন, এই মুহূর্তে সম্ভব নয়। এই মুহূর্তে একজন মহান লেডি হয়ে ওঠার মত অবস্থা নয়।

পিটারের কথার নড়চড় হল না। আন্ট পিটি সত্যি সত্যিই অস্থির হয়ে পড়লেন, আর পিটারের ব্যথা এক রাতের মধ্যে এতই বেড়ে গেল যে আর কোনোদিনই গাড়ি চালাল না। ফলে স্কারলেটকে নিজেই গাড়ি চালিয়ে একা একা যেতে শুরু করল। হাতের কড়াগুলো মেলাতে শুরু করেছিল, আবার বেড়ে গেল।

***

বসন্তের মাসগুলো ধীরে ধীরে কেটে যেতে থাকে। এপ্রিল মাসের কনকনে বৃষ্টি থেমে গিয়ে মে মাসের উষ্ণ বাতাস শরীর জুড়িয়ে দিতে লাগল। সপ্তাহের দিনগুলো কেটে যায় বিশাল কর্মব্যস্ততায়। তার ওপর গর্ভাবস্থার অগ্রগতির ফলে অসুবিধেগুলো ক্রমশ বেড়েই চলে। পুরনো বন্ধুবান্ধব যতই ওর প্রতি শীতল হয়ে ওঠে, ওর পরিবারের লোকজন ততই বেশি বেশি সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠেন, ওঁদের সনির্বন্ধ অনুরোধের ঠ্যালা সামলাতে গিয়ে ওর পাগল পাগল লাগে, ওর অস্থিরতার সঠিক কারণটা বুঝতেই চান না। এই অস্থিরতা আর লড়াইয়ের সময় একমাত্র একজন মানুষই ওর পাশে ছিলেন যাঁর ওপর ভরসা করা যায়, পৃথিবীর একমাত্র ব্যক্তি যিনি ওর সমস্যা ঠিকমত বুঝতে পারেন, আর সেই ব্যক্তিটি হলেন রেট বাটলার। ব্যাপারটা খুবই অদ্ভুত যে এত মানুষ থাকতে ওঁর মত হঠকারী এবং সাক্ষাৎ শয়তান একজন মানুষকে এই ভূমিকায় দেখতে পাবে। যা ওঁর কাছ থেকে কোনোদিনই আশা করেনি, এবং কারো কাছ থেকে পায়নি, সেই সহানুভূতিটাই ওঁর কাছ থেকে পেয়ে গেল।

মাঝে মাঝেই উনি অবশ্য শহর ছেড়ে উধাও হয়ে যান, নিউ অরলিয়্যানসের রহস্যময় সফরে। যাবার কারণটা নিয়ে উনি ওকে ভেঙ্গে কিছু বলেননি, তবে ও একরকম নিশ্চিতই ছিল এর মধ্যে একজন মহিলা বা বেশ কিছু মহিলাঘটিত কিছু ব্যাপার আছে, আর এর জন্য মনে মনে একটু হিংসেও যে হয়নি তা নয়। অবশ্য আঙ্কল পিটার ওর গাড়ি চালাতে অস্বীকার করার পর থেকে, ওঁর নিউ অরলিয়্যানস অভিযানগুলোর মধ্যে বিরতিগুলো ক্রমশ দীর্ঘতর হয়ে উঠেছে, আজকাল বেশিরভাগ সময়ই উনি অ্যাটলান্টাতেই কাটান।

শহরে যথন থাকেন, ওঁর বেশিরভাগ সময়ই কেটে যায় গার্লস অফ দ্য পিরিয়ড সেলুনের দোতলার কুঠরিগুলোতে জুয়ো খেলে বা বেল ওয়াটলিং-এর পানশালায় অপেক্ষাকৃত পয়সাওয়ালা ইয়াঙ্কি আর কার্পেটব্যাগারদের সঙ্গে টাকা কামাবার ফন্দী এঁটে। শহরের মানুষ ওঁর স্যাঙ্গাতদের থেকেও ওঁকেই বেশি অপছন্দ করতেন। বাড়িতেও আজকাল কমই আসেন, হয়ত ফ্র্যাঙ্ক আর পিটি স্কারলেটের এই রকম অবস্থায় একজন পুরুষমানুষের সঙ্গে দেখা করলে অসন্তুষ্ট হতে পারেন, সেটা ভেবেই হয়ত। কিন্তু ঘটনাচক্রে প্রায় প্রতিদিনই স্কারলেটের সঙ্গে ওঁর দেখা হয়েই যায়। অনেকদিনই এমন হয় যে যখন স্কারলেটের গাড়ি পীচট্রী স্ট্রীট আর ডেকাটুর স্ট্রীট, যেখানে ওর মিল, সেই নির্জন পথটা পাড়ি দেবার সময় ওঁকে ওর গাড়ির দিকে ঘোড়া চালিয়ে আসতে দেখা যায়। ঘোড়ার রাশ টেনে ধরে উনি ওর সঙ্গে গল্প করতে করতে চলেন, আবার কখনও নিজের ঘোড়া ওর বগির পেছনে বেঁধে দিয়ে স্কারলেটের হাত থেকে লাগাম তুলে নিয়ে ওকে শহর পরিভ্রমণে সঙ্গ দেন। মুখে স্বীকার করতে না চাইলেও, ইদানিং স্কারলেট অল্পেই ক্লান্ত হয়ে পড়ছে, তাই ঘোড়ার রাশ উনি যখন নিজের হাতে তুলে নেন, স্কারলেট মনে মনে খুবই কৃতজ্ঞ বোধ করে। উনি সর্বদাই শহরে ঢোকার মুখ পর্যন্ত ওকে পৌঁছে দিয়ে চলে যান। কিন্তু ওঁদের এই সাক্ষাতের কথা পুরো অ্যাটলান্টা শহরই জেনে গেছে। ফলে স্কারলেটের সামাজিক বিধিনিষেধ অগ্রাহ্য করার দীর্ঘ তালিকায় এই ব্যাপারটাও যুক্ত হয়ে চর্চার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মাঝে মধ্যে ওর সন্দেহ হয় যে এই হঠাৎ দেখা হয়ে যাবার ব্যাপারগুলো কি সত্যিই কাকতালীয় না তার চেয়ে বেশি কিছু! যত দিন যাচ্ছে আর নিগ্রোদের বেয়াদবি নিয়ে উত্তেজনা বাড়ছে, এই সাক্ষাতগুলো ততই ঘন ঘন হয়ে পড়ছে। এখন যখন ওকে সবচাইতে খারাপ দেখাচ্ছে, তখনই বা কেন উনি ওর সাথে দেখা করার জন্য এত উদগ্রীব হয়ে পড়েছেন? ওকে নিয়ে কোনও মতলব আছে বলেও তো মনে হয় না, আগে কখনও হয়ত ছিল, তবে সেটা নিয়েও কেমন যেন সন্দেহ হচ্ছে আজকাল। ইয়াঙ্কি জেলে ওর দুর্গতির কথা নিয়ে মশকরাঅ বহুদিন হল করেননি। অ্যাশলের বা ওর অ্যাশলের প্রতি ওর দুর্বলতারও কোনো উল্লেখ করেননি, এমনকি ‘ওর প্রতি লালসা আছে’ জাতীয় কোনও অসভ্য মন্তব্যও করেননি। এসব নিয়ে ও একেবারেই নাড়াঘাঁটা করতে চায়নি, তাই এই ঘন ঘন সাক্ষাতকারের ব্যাপারে কোনও কৈফিয়তও তলব করেনি। শেষমেশ ও আন্দাজ করে নিল, অ্যাটলান্টায় জুয়ো খেলা ছাড়া ওঁর কোনো কাজই নেই আর ভদ্র বন্ধুবান্ধবও খুব একটা নেই, তাই কেবলমাত্র সঙ্গ পাওয়ার লোভেই ওর সাথে ঘন ঘন দেখা করতে আসেন।

তবে কারণ যাই হোক না কেন, ওঁর সঙ্গ স্কারলেটের ভালই লাগে। খদ্দের হারানো, ধারে বিক্রি হওয়া মালের টাকা আদায় করতে না পারা, মিস্টার জনসনের ওকে ঠকিয়ে নেবার ফন্দিফিকির, হিউয়ের অযোগ্যতা – এই সব নিয়ে ওর সব রকম হাহাকার উনি খুব মন দিয়ে শোনেন। ওর সব সাফল্যের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন, যেখানে ফ্র্যাঙ্ক কেবল একটু প্রশ্রয়ের হাসি হেসেই ক্ষান্ত দেন, আর পিটি ‘আরে করেছ কী!’ বলে দায়সারা আনন্দ প্রকাশ করেন। কখনো কখনো মনে হয় উনি নীরবে কিছু কিছু ব্যবসা ওকে পাইয়ে দেন, কারণ যত বড়লোক ইয়াঙ্কি আর কার্পেটব্যাগার আছে সবার সঙ্গেই ওঁর খুব দোস্তি, তবে এই ব্যাপারে ওঁর কোনও হাত থাকতে পারে সেই কথা সর্বদাই অস্বীকার করেন। উনি কেমন ধরণের মানুষ সেটা ও ভাল মতই জানে, আর ওঁকে কখনোই বিশ্বাস করে না, কিন্তু ছায়াময় রাস্তার বাঁক ধরে ওঁর বিশাল কালো ঘোড়ায় চড়ে ওঁকে আসতে দেখলেই ওর মন ভাল হয়ে যায়। যখন উনি গাড়িতে উঠে ওর হাত থেকে লাগামটা নিতে নিতে রঙ চড়ানো টিপ্পনী কাটেন, তখন শরীরের গড়নটা বেঢপ হওয়া সত্ত্বেও নিজেকে আবার অল্পবয়সী, হাসিখুশি আর আকর্ষণীয় বলে মনে হয়। যে কোনো বিষয় নিয়েই ওঁর সঙ্গে খোলাখুলি কথা বলা যায়। লুকোছাপা করতে হয় না। যেমন ফ্র্যাঙ্ক – এমনকি অ্যাশলের সঙ্গেও প্রায়ই হয়ে থাকে – ওঁর সঙ্গে কথা বলার বা আলোচনা করবার সময় বিষয়ের কখনোই অভাব হয় না, সত্যের খাতিরে এই কথাটা স্বীকার করে নিতেই হবে। তবে একথা ঠিক যে অ্যাশলের সঙ্গে কথা বলার সময় সম্মান, মর্যাদা ইত্যাদি নিয়ে অনেক জ্ঞানগর্ভ বাণী শোনার ভয়ে, অনেক প্রসঙ্গ উত্থাপনই করতে পারে না, ফলে সব আলোচনাই গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে। রেটের মত এমন একজন বন্ধু পাওয়া সত্যিই খুব স্বস্তির ব্যাপার, ইদানিং যখন অজানা কোনো কারণে ওর সঙ্গে ভদ্র ব্যবহার করবেন বলে ঠিকই করে নিয়েছেন। খুবই স্বস্তির ব্যাপার, বিশেষ করে আজকাল ওর বন্ধুবান্ধবের সংখ্যা এতই কমে গেছে যে বলার নয়।

“আচ্ছা রেট,” আঙ্কল পিটারের জবাব দিয়ে দেওয়ার অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই স্কারলেট উচাটন স্বরে জিগ্যেস করল, “এই শহরের লোকেরা আমাকে এত ঘেন্না করে কেন বলতে পারেন, আর আমাকে নিয়ে যা তা কথা বলে? বোঝাই মুশকিল ওদের আক্রোশ কাকে নিয়ে বেশি – আমাকে নিয়ে না কার্পেটব্যাগারদের নিয়ে! আমি তো কেবল নিজের কাজ নিয়েই ব্যস্ত থেকেছি, আর কারও পাকা ধানে মই তো দিইনি, আর – ”

“কারও পাকা ধানে মই যদি না দিয়ে থাক, সে তো তোমার সুযোগ ছিল না বলে, আর সেটা হয়ত ওরা একটু একটু বুঝেও ফেলেছে।”

“আপনার সব কিছুতেই তামাশা! ওরা যে আমাকে পাগল করে দিচ্ছে। দোষের মধ্যে আমি অল্প কিছু টাকা কামানোর চেষ্টা করছি আর – ”

“তোমার দোষ হল তুমি আর পাঁচজন মহিলার থেকে আলাদা হবার চেষ্টা করছ, আর কিছুটা হলেও সেই চেষ্টা সফলও হয়েছে। আগেই তো বলেছি তোমাকে, সমাজের চোখে এ ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। আলাদা হবার চেষ্টা কর আর জাহান্নামে যাও! এই যে একটা মিলকে তুমি সফলভাবে চালিয়ে নিয়ে চলেছ, স্কারলেট, যে সব পুরুষমানুষ সেটা করতে পারেনি, তাদের অপমানিত বোধ করার জন্য সেটাই যথেষ্ট কারণ। মনে রাখবে, একজন সদ্বংশজাত নারীর স্থান গৃহের অভ্যন্তরে এবং এই ব্যস্ত নিষ্ঠুর পৃথিবীর সম্পর্কে জানার চেষ্টা করা তার জন্য সমীচীন নয়।”

“যদি আমি গৃহের অভ্যন্তরে থাকতাম, তাহলে তো অভ্যন্তরে থাকবার মত গৃহই আমার থাকত না।”

“এর থেকে তোমাকে বুঝে নিতে হবে যে সেই ক্ষেত্রে তোমার উচিত ছিল সুশীল নারীর মত মাথা উঁচু রেখে খিদেয় জ্বলতে থাকা।”

“এ হে হে হে, কী আবদার! মিসেজ় মেরিওয়েদারকেই দেখুন না। উনি পাই বানিয়ে ইয়াঙ্কিদের কাছে বিক্রি করছেন, সেটা তো মিল চালানোর থেকেও খারাপ! মিসেজ় এলসিং সেলাইয়ের কাজ করছেন আর বাড়িতে ভাড়াটে রাখছেন! আর ফ্যানি চিনেমাটির বাসনের ওপর এমন সব হাবিজাবি নক্সা এঁকে বিক্রি করছে, যেগুলো কারোরই কাজে লাগে না কিন্তু কিনছে, ওকে সাহায্য করার জন্য আর – ”

“তুমি মোদ্দা কথাটাই বুঝলে না, বাছা। ওরা যা করছে সেটাকে সফল হওয়া বলেনা, তাই এই দক্ষিণের পুরুষদের পেল্লায় অহমিকাবোধকে আঘাত করতে পারেনি। পুরুষরা সহানুভূতি দেখিয়ে বলতেই পারবে, ‘আহা বেচারিরা, কী কঠোর পরিশ্রমই না করতে হচ্ছে ওদের! বেশ বেশ, এমন একটা ভাব দেখাব যেন খুবই সুরাহা হচ্ছে!’ তাছাড়া তুমি যে ভদ্রমহিলাদের কথা বললে, তাঁরা কেউই এই সব কাজ করা থেকে আনন্দ পাচ্ছেন না। আর এটাও ওঁরা বুঝিয়ে দিচ্ছেন যে কাজগুলো ওঁরা ততদিনই করবেন যতদিন না ওঁদের এই সমস্ত অনারীসুলভ কাজ থেকে রেহাই দেবার জন্য কিছু পুরুষমানুষ এগিয়ে আসেন। ফলে সবাই এঁদের জন্য সহানুভূতি বোধ করেন। অথচ কাজ করে তুমি যে আনন্দ পাচ্ছ সেটা তো দিনের আলোর মতই পরিষ্কার, আর এটাও পরিষ্কার যে তোমার কাজে একজন পুরুষমানুষ এসে নাক গলাক, সেটাও তুমি পছন্দ করবে না। অতএব তোমার জন্য কেউ সহানুভূতি বোধ করে না। আর অ্যাটলান্টার মানুষ এর জন্য তোমাকে কোনোদিনই ক্ষমা করবে না। সহানুভূতি দেখাতে পারলে যে ভারি আনন্দ পাওয়া যায়।”

“মাঝে মধ্যে গুরুতর ব্যাপার নিয়ে এত ঠাট্টা তামাশা না করলেও তো পারেন!”

“প্রাচ্যদেশের প্রবাদটা শোনোনি – ‘কুকুর তো ঘেউ ঘেউ করবেই, তবে তীর্থযাত্রীর দল ঠিকই এগিয়ে যান?’ ওদের ঘেউ ঘেউ করতে দাও, স্কারলেট, তোমার এগিয়ে যাওয়া কেউ আটকাতে পারবে বলে মনে হয় না।”

“আমি যদি অল্পবিস্তর টাকা কামাই করতে পারি, তাতে ওদের কী?”

“একই সাথে সব কিছু পাওয়া যায় না, স্কারলেট। হয় তুমি অমহিলাসুলভ ধ্যানধারণা কাজে লাগিয়ে অর্থোপার্জন কর আর প্রত্যেকের আক্রোশের শিকার হও, আর নয়ত গরীব থেকে ভালোমানুষি কর, আর অনেক বন্ধুবান্ধব লাভ কর। তোমার রাস্তা তুমি নিজেই বেছে নিয়েছ।”

“গরীব আমি থাকতে চাই না,” ও তাড়াতাড়ি বলে উঠল। “কিন্তু – পছন্দটা ঠিকই করেছি, তাই না?”

“যদি টাকা রোজগার করাটাই তোমার মূল লক্ষ্য হয়।”

“হ্যাঁ, ন্য সব কিছুর থেকে টাকা রোজগার করাটাই আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”

“তাহলে বাছাই করা তোমার তো হয়েই গেছে। তবে তার জন্য কিছু মাসুল তো দিতেই হবে – তুমি যা যা চেয়েছ, তার বেশিরভাগের জন্যই তোমাকে মাসুল দিতে হয়েছে। সেটা হল একাকীত্ব।”

এই কথাটা ওকে কিছুক্ষণের জন্য নীরব করে দিল। খুব সত্যি কথা। ও যে কত একা, সেটা একটু ভাবতে বসলেই ও টের পায় – মেয়েলি সাহচর্য বঞ্চিত। যুদ্ধের দিনগুলোতে একা লাগলেই এলেনের কাছে চলে যেতে পারত। এলেনের মৃত্যুর পরে, মেলানিকে সর্বদা পাশে পেয়েছে, যদিও ওর আর মেলানির মধ্যে মিল কিছুই নেই, কেবল টারাতে কঠোর পরিশ্রমটুকু ছাড়া। এখন তো আর কেউই নেই, আন্ট পিটির তো একটু আধটু আড্ডা দেবার বাইরে জীবন সম্বন্ধে কোনো খবরই রাখেন না।

“মনে হয় – আমার কী মনে হয় জানেন,” একটু কিন্তু কিন্তু করে বলতে শুরু করল, “মহিলা বন্ধুত্বের কথা যদি ধরি, আমি বোধহয় সব সময়েই একা ছিলাম। আমি যে কাজ করছি, তার জন্যই অ্যাটলান্টার মহিলারা আমাকে পছন্দ করেন না, তা কিন্তু পুরোপুরি ঠিক নয়। আমাকে ওঁরা পছন্দই করেন না। সত্যি সত্যিই কোনো মহিলা আমাকে কোনোদিন পছন্দ করেছেন বলে আমার মনে হয় না, অবশ্যই আমার মা ছাড়া। এমনকি আমার বোনেরাও। জানি না কেন, যুদ্ধ বাধবার আগে, এমনকি চার্লিকে বিয়ে করারও আগে, আমি যাই করি না কেন, ওঁরা সেটা মানতে পারতেন না – ”

“তুমি বোধহয় মিসেজ় উইল্কসের কথা ভুলে গেলে,” রেট বললেন আর ওঁর চোখ ভর্তি নষ্টামির হাসি। “উনি তোমার সব কাজে দৃঢ়ভাবে পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। আমার তো মনে হয়, একমাত্র যদি খুন না করে বস, উনি তোমার সব কাজই মেনে নেবেন।”

বিরস মনে স্কারলেট ভাবল – “এমনকি খুনটাও মেনে নিয়েছে,” তারপর ঘৃণা মেশানো অবজ্ঞায় হেসে উঠল।

“ও, মেলির কথা বলছেন!” ও বলে উঠল, তারপর দুঃখিত মুখে বলল, “মেলিই একমাত্র মেয়ে যে আমার কাজগুলো মেনে নেয়, তবে এতে আমার কৃতিত্ব খুব একটা নেই, আসলে ওর ঘটে কোনো বুদ্ধিই নেই। ঘটে বুদ্ধি থাকলে – ” থতমত খেয়ে ও থেমে গেল।

“ঘটে বুদ্ধি থাকলে তোমার কিছ কিছু কাজ উনি মেনে নিতে পারতেন না,” কথাটা রেট পুরো করে দিলেন। “যাই হোক মনে হয়, এই ব্যাপারে তুমি নিশ্চয়ই আমার চেয়ে ভাল বলতে পারবে।”

“আপনার মনে হওয়ার নিকুচি করেছে, আর আপনার অভদ্র আচরণেরও!”

“তোমার এই অন্যায় এবং রূঢ় আচরণ আমি যথোপযুক্ত নীরবতা দিয়ে অগ্রাহ্য করে আমাদের আগের আলোচনায় ফিরে যাচ্ছি। একটা ব্যাপারে মনস্থির করে নাও। তুমি যদি ব্যতিক্রমী হও, তোমাকে একাকীত্ব মেনে নিতেই হবে, আগের প্রজন্মের মানুষদের থেকেই শুধু নয়, তোমার সমবয়সীদের কাছ থেকেও এবং তোমার সন্তানদের প্রজন্মের কাছ থেকেও। ওরা তোমাকে কখনোই বুঝবে না, তুমি যাই কর না কেন, ওরা বিস্মিত হবেই। তবে তোমার ঠাকুমা দিদিমারা হয়ত তোমাকে নিয়ে গর্ব করবেন, বলবে্ন, ‘ দেখেছো! যেমন বাবা, তার তেমনি মেয়ে!’ আর তোমার নাতি নাতনীরা একটু হয়ত হিংসে মেশানো দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলবে, ‘ঠাকুমার দুঃসাহসের বলিহারি!’ ওরা মনেপ্রাণে তোমার মত হবার চেষ্টা করবে।”

মজা পেয়ে স্কারলেট হেসে উঠল।

“মাঝে মাঝে আপনি খুব খাঁটি কথা বলে ফেলেন! আমার দিদিমা রোবিল্যারের কথাই ধরা যাক না কেন। আমি দুষ্টুমি করলেই ম্যামি আমাকে ওঁর নাম করে ভয় দেখাত। গ্র্যান্ডমা ছিলেন বরফের মত ঠাণ্ডা প্রকৃতির মানুষ, আর আদবকায়দা নিয়ে খুবই কড়া ছিলেন, নিজের এবং অন্যদেরও। এদিকে নিজে তিনি তিন তিনবার বিয়ে করেছিলেন আর কত যে ড্যুয়েল লড়া হয়েছিল ওঁকে নিয়ে তার কোনো হিসেবই নেই। উনি রুজ় লাগাতেন, আর সবচাইতে বিস্ময়ের ব্যাপার হল উনি শরীর দেখানো পোশাক পরতেন আর – কী বলি – পোশাকের নিচে প্রায় কিছুই পরতেন না।”

“আর তুমি নিশ্চয়ই ওঁর খুব গুণমুগ্ধ ছিলে, যদিও তুমি তোমার মায়ের মত হয়ে ওঠার চেষ্টাই করেছিলে! আমার একজন বাটলার ঠাকুর্দা ছিলেন, উনি ছিলেন একজন জলদস্যু।”

“সত্যি বলছেন? ওই চোখ বেঁধে পাটাতনের ওপর হাঁটিয়ে নিয়ে গিয়ে সলিল সমাধি দিয়ে দেওয়া ধরণের?

“আরে মালকড়ি হাতাবার সুযোগ থাকলে চোখ বেঁধে পাটাতনের ওপর দিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে গিয়ে সলিল সমাধিস্থ করানোটা ওঁর কাছে কোনো ব্যাপারই ছিল না, একথা জোর দিয়ে বলতে পারি। সে যাই হোক, উনি এত টাকা কামিয়েছিলেন যে আমার বাবাকে রীতিমত বড়লোক বানিয়ে গেছিলেন। পরিবারের লোকেরা অবশ্য ওঁকে ‘সমুদ্রের ক্যাপটেন’ হিসেবেই সর্বদা অন্যদের কাছে উল্লেখ করতেন। আমার জন্মের বহু আগেই উনি খুন হয়ে যান, পানশালার এক হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়ে। বলতে পার, ওঁর মৃত্যুতে পরিবারের লোকজন হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছিলেন, কারণ ওই বুড়ো মানুষটা সারাক্ষণ মদে ডুবে থাকতেন, ভুলেই যেতেন সমুদ্রের ক্যাপটেনের চাকরি থেকে ওঁর অবসর নেওয়া হয়ে গেছে, আর স্মৃতি রোমন্থন করে এমন সব গল্প শোনাতেন যে ওঁর ছেলেমেয়েদের লোম খাড়া হয়ে উঠত। তবে আমার আদর্শ ছিলেন উনিই, বাবার চেয়ে ওঁকেই আমি বেশি নকল করার চেষ্টা করতাম। আমার বাবা ছিলেন নিপাট ভদ্রলোক, খুব ভালমানুষ আর প্রখর আত্মসম্মানবোধ, সাধু সাধু ভাব – তাহলেই বোঝো ব্যাপারটা কোনদিকে গড়ায়। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, ছেলেমেয়েরাও তোমার কাজ মেনে নেবে না, ঠিক যেমন মিসেজ় মেরিওয়েদার, মিসেজ় এলসিং আর তাঁদের গুষ্ঠি তোমাকে মেনে নিতে পারেননি। তোমার ছেলেমেয়েরা, খুব সম্ভব, নরমসরম মনের হবে, খুঁতখুঁতে হবে, কড়া ধাতের মানুষদের ছেলেমেয়েরা যেমন হয়। তার ওপর সব মায়েদের মতই তুমিও নিশ্চয়ই চাইবে, তোমাকে যে লড়াই করতে হয়েছে তার আঁচ যেন তোমার ছেলেমেয়েদের গায়ে না লাগে – এটা ওদের আরও বিগড়ে দেবে। সেটা করা ভুল হবে। লড়াই মানুষকে গড়ে অথবা ভাঙ্গে। অতএব তোমার কাজের মান্যতা পাওয়ার জন্য নাতিনাতনিদের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

“কে জানে আমাদের নাতিনাতনিরা কেমন ধারার হবে!”

“এই যে তুমি ‘আমাদের’ কথাটা বললে, তুমি কি বলতে চাইছ তোমার আর আমার পারষ্পরিক নাতিনাতনি হবে? ছিঃ, মিসেজ় কেনেডি!”

কথাটা যে বেফাঁস মুখ থেকে বেরিয়ে গেছে, মুহূর্তের মধ্যে ধরে ফেলে, স্কারলেট লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। লজ্জা ওঁর রসিকতার জন্যে ততটা নয়, নিজের শারীরিক স্ফীতি নিয়ে সচেতন হয়ে পড়ার জন্যে যতটা। ওর বর্তমান অবস্থা নিয়ে ওরা দুজনেই ইশারা ইঙ্গিত এড়িয়ে গেছে; ওঁর সঙ্গে ঘোরার সময় ক্লোকটা দিয়ে সদাসর্বদাই উঁচু করে বগলের তলা পর্যন্ত ঢাকা থাকে, এমনকি গরমের দিন হলেও। নিজেকে মেয়েলি সান্ত্বনা দিয়ে বিশ্বাস করাতে চাইত যে এইভাবে ঢাকা থাকলে ওর শারীরিক অসামঞ্জস্যতাটা ধরা যায় না। কিন্তু নিজের শারীরিক অসামঞ্জস্যতা সম্বন্ধে সহসা সচেতন হয়ে, আর ওঁর চোখেও যে সেটা এড়ায়নি সেটা বুঝতে পেরে, নিজের অবস্থার জন্য একই সঙ্গে রাগ আর লজ্জা দুটোই হতে লাগল।

“এই মুহূর্তে আপনি এই গাড়ি থেকে নেমে যান, ইতর কোথাকার!” স্কারলেট বলল, ওর গলা কাঁপছে।

“সেরকম কিছু করবার ইচ্ছেই আমার নেই,” খুব শান্ত গলায় জবার ফিরিয়ে দিলেন। “বাড়ি পৌঁছনোর আগেই অন্ধকার ঘনিয়ে আসবে। পরের ঝর্ণাটার কাছেই একটা নিগ্রো বস্তি হয়েছে, তাবু খাটিয়ে, ঝুপড়ি বানিয়ে থাকে ওরা। শুনেছি খুবই শয়তান ওরা, আর আবেগপ্রবণ কু ক্লুক্সকে নাইটশার্ট পরে ঘোড়া চেপে আজ সন্ধেবেলা বেরনোর সুযোগ তুমি কেন দিতে যাবে, সেটা কিছুতেই আমার মাথায় আসছে না।”

“নেমে যান,” লাগামটা ধরে হ্যাঁচকা টান মেরে ও চেঁচিয়ে উঠল। সহসা একটা বমি বমি ভাব এসে ওর মাথা ঘুরে গেল। উনি তাড়াতাড়ি ঘোড়াটা দাঁড় করালেন, চট করে দুটো সাফ রুমাল ওর হাতে ধরিয়ে দিলেন, আর বেশ কায়দা করে ওর মাথাটা গাড়ির কিনারায় নিয়ে ধরে রইলেন। বিকেলের রোদটা গাছের নবীন পাতার ফাঁক দিয়ে তেরছা করে পড়ে কয়েক পলকের জন্য বিরক্তিকর সোনালি সবুজ আভা ছড়িয়ে দিল। বমির ভাবটা কেটে যাবার পর হাতের ওপর মাথা রেখে স্কারলেট তীব্র মনস্তাপের সঙ্গে বিলাপ করতে লাগল। প্রথমত, একজন পুরুষমানুষের সামনে বমি করে ফেলেছে – একজন নারীর পক্ষে যথেষ্টই দুর্ভাগ্যজনক একটা ঘটনা, আর এর ফলে ওর গর্ভবতী হওয়ার খবরটা ওঁর কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল – সেটাও একজন মেয়ের কাছে রীতিমত অবমাননাকর। ওঁর মুখের দিকে চোখ তুলে আর কোনোদিন তাকাতে পারবে না। আর একেবারে রেটেরই সামনে এসব হবার ছিল – মেয়েদের যিনি সম্মান দিতেই জানেন না? বিলাপ করতে করতে ভাবল এখুনি কুরুচিকর একটা রসিকতা শুনতে হবে, যা চেষ্টা করলেও সারা জীবনে ভুলতে পারবে না।

“বোকামো কোরো না,” খুব শান্ত গলায় বললেন। “আর এই কান্নাকাটি যদি তুমি লজ্জা পেয়ে করে থাকো, তাহলে বলব তুমি যে সত্যিই বোকা তাতে কোনো সন্দেহই নেই। ছেলেমানুষী কোরো না, স্কারলেট। এটা তোমার জানা উচিত, আমি তো আর অন্ধ নই, তাই আমি জানতাম যে তুমি অন্তঃসত্ত্বা।”

স্কারলেট অস্ফুটে ‘ওহ’ বলে দুহাতে আরক্ত মুখ ঢেকে ফেলল। কথাটা শুনে রাজ্যের অস্বস্তি ওকে পেয়ে বসল। ওর গর্ভাবস্থা নিয়ে ফ্র্যাঙ্ক সর্বদাই লজ্জা লজ্জা মুখে ‘তোমার অবস্থা’ বলে উল্লেখ করে থাকেন। জেরাল্ড খুব কৌশল করে ‘ওর একটা খবর আছে’ বলে প্রয়োজনে এই রকম অবস্থার উল্লেখ করতেন। আর মহিলারা সাধারণত কারও গর্ভাবস্থাকে ‘শরীরটা ভাল নেই’ বলে সুকৌশলে প্রসঙ্গটা এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করেন।

“যদি তুমি ভেবে থাকো ওই গরম ক্লোকটা দিয়ে নিজেকে ঢেকে রাখার প্রচেষ্টার কারণটা আমি বুঝতে পারিনি, তাহলে তুমি সত্যিই ছেলেমানুষ। অবশ্যই আমার জানা ছিল। নইলে, তুমি কী ভেবেছিলে, যে আমি – ”

সহসা উনি থেমে গেলেন। দুজনেই নীরব হয়ে গেলেন। লাগামটা হাতে তুলে নিয়ে ঘোড়ার পেটে একটা গোঁত্তা মারলেন। তারপর ধীর মন্থরস্বরে ওর সঙ্গে কথা বলতে বলতে চললেন। ওঁর এই শান্ত মন্থর কণ্ঠ স্কারলেটের কানে মধুর লাগল, ধীরে ধীরে ওর মুখের আরক্তিম ভাবটা কেটে যেতে লাগল।

“তুমি যে এতটা ঘাবড়ে যাবে, আমি ভাবিইনি, স্কারলেট। ভেবেছিলাম তুমি বুঝদার মানুষ, কিন্তু আমাকে সত্যিই হতাশ করলে। আমি কি ধরে নিতে পারি যে নারীসুলভ শালীনতাবোধ এখনও তোমাকে নাড়া দেয়? মনে হচ্ছে এসব কথা তুলে আমি ভদ্রলোকের মত কাজ করিনি। আর আমি যে ভদ্রলোক নই সে তো আমি জানিই, কারণ তাহলে একজন গর্ভবতী মহিলাকে দেখে আমার যেরকম বিব্রত হওয়া উচিত ছিল সেটা তো হয়নি। আমার মনে হয় ওদের আর পাঁচজন সাধারণ মানুষের মত করেই দেখা সম্ভব। একবার আকাশের দিকে চোখ তুলে, তারপর আবার মাটির দিকে চোখ নামিয়ে আর তার ফাঁকে আড়চোখে এক ঝলক ওর কোমরের দিকে নজর ঘুরিয়ে নেওয়াটা আমার কাছে সর্বদাই মনে হয়েছে চরম অশালীনতার প্রকাশ। কেন করব সেটা? এটা তো খুব স্বাভাবিক একটা অবস্থা! আমাদের চেয়ে ইউরোপীয়রা এই ব্যাপারে অনেক এগিয়ে আছে। ওঁরা আসন্ন মাতৃত্বের জন্য ওকে শুভ কামনা জানান। যদিও আমি অতটা করতে বলছি না, তবু দেখেও না দেখার ভান করে থাকাটার মধ্যে সমঝদারিত্ব নেই। খুবই স্বাভাবিক একটা অবস্থা, আর এর জন্য মেয়েদের গর্বিত হওয়া উচিত। কিন্তু তার বদলে ওরা নিজেদের গৃহবন্দি করে চোখের আড়ালে চলে যায়, যেন কোনও অপরাধ করে ফেলেছে!”

“গর্বিত হওয়া!” ধরা গলায় স্কারলেট আর্তনাদ করে উঠল। “গর্ব – হুঁহ্‌!”

“বাচ্চা হবে বলে তোমার মনে কোনো গর্ববোধ নেই?”

“হে ঈশ্বর, একেবারেই নেই! আমি – আমি বাচ্চাদের ঘৃণা করি!”

“মানে তুমি বলতে চাইছ – ফ্র্যাঙ্কের বাচ্চা?”

“না – সে যারই বাচ্চা হোক!”

আবার বেফাঁস কথা বলে ফেলে মুহূর্তের জন্য নিজের ওপর বিরক্ত হয়ে উঠল। কিন্তু কথাটা যেন ওঁর কানেই যায়নি, এমনভাবে কথাবার্তা চালিয়ে যেতে লাগলেন।

“তাই যদি হয়, তবে আমাদের মধ্যে মিল নেই। আমি বাচ্চাদের ভালবাসি।”

“ওদের আপনি ভালবাসেন?” কথাটা শুনে এতই অবাক হয়ে গেল যে লজ্জাশরমের মাথা খেয়ে চোখ তুলে চেঁচিয়ে উঠল। “কী মিথ্যুক আপনি!”

“আমি বাচ্চাদের ভালবাসি, আর ছোট ছোট বাচ্চারা, যতক্ষণ না বড় হয়ে উঠে বড়দের মত মিথ্যে বলা, ঠকানো আর অন্যান্য নোংরা বদভ্যাসগুলো রপ্ত করে নেয়, আমি ওদের খুব ভালবাসি। এটা তোমার কাছে নতুন কোনো খবর নয়। ওয়েড হ্যাম্পটনকে যে আমি খুবই পছন্দ করি, যদিও ওর যেরকম হয়ে ওঠা উচিত ছিল, সেরকম ও হয়নি তবুও, সেটা তুমি জানো।”

কথাটা সত্যি বটে, স্কারলেট অবাক হয়ে ভাবে। ওয়েডের সঙ্গে খেলাধুলো করে উনি যে আনন্দ পান, সে তো বোঝাই যায়। প্রায়ই ওর জন্য উপহারও নিয়ে আসেন।

যাই হোক, আমরা শেষ পর্যন্ত এই আপত্তিকর বিষয়টা আলোতে নিয়ে আসতে পেরেছি, আর তুমিও স্বীকার করে নিচ্ছ যে অনতিদূর ভবিষ্যতে তুমি একটি সন্তানের জন্ম দিতে চলেছ। দুটো ব্যাপারে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে তোমাকে যে কথাগুলো বলতে চাইছি, সেগুলো এবার বলা যেতে পারে। প্রথমত, একা একা গাড়ি চালিয়ে যাওয়াটা বিপজ্জনক। তুমিও জানতে কথাটা। এটা নিয়ে তোমাকে বারবার সাবধান করা হয়েছে। ধর্ষিতা হওয়ার ব্যাপারে তোমার কোনও মাথাব্যথা না থাকলেও এর পরিণতি কী হতে পারে সেটা ভেবে দেখতে পারো। তোমার গোয়ার্তুমির কারণে এমন একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে যে তোমার কিছু সাহসী সহনাগরিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার তাগিদে কয়েকটা ডার্কির ঘাড় মটকে দিতে পারেন। ফলে ইয়াঙ্কিরা ওঁদের ছোঁ মেরে তুলে নেবে, আর কাউকে হয়ত ফাঁসিতেও লটকে যেতে হতে পারে। একটা কথা কি কখনও ভেবে দেখেছ যে মহিলাদের তোমাকে পছন্দ না করার একটা কারণ হল তোমার আচরণের কারণে হয়ত ওঁদের স্বামীদের বা পুত্রদের গর্দান ফাঁসির দড়িতে ঝুলে লম্বা হয়ে যেতে পারে? আরও একটা কথা, কু ক্লুক্স যদি নিগ্রোদের ওপর আরও হামলা চালিয়ে যেতে থাকে তবে ইয়াঙ্কিরা অ্যাটলান্টায় আরও কড়াকড়ি শুরু করে দেবে, এমন কড়াকড়ি, যে শেরম্যানের উপদ্রব তার তুলনায় দেবদূতের মর্তে আগমনের মত লাগবে। জেনে বুঝেই আমি এসব কথা বলছি, কারণ ইয়াঙ্কিদের সঙ্গে আমার খুবই দহরম মহরম। বলতে লজ্জাই করছে, কিন্তু ওরা আমাকে ওদেরই একজন বলে মনে করে আর আমার সমনেই সব ব্যাপারে খোলাখুলি আলোচনা করে। কু ক্লুক্সকে ওরা নিকেশ করে দিতে চায়, তার জন্য যদি পুরো শহরটা জ্বালিয়েও দিতে হয় বা দশ বছর বয়স হয়ে যাওয়া যে কোনো পুরুষকে ফাঁসিতেও ঝুলিয়ে দিতে হয়, তাতেও আপত্তি নেই। এসব হলে তোমারই ক্ষতি হবে, স্কারলেট। তোমার টাকাকড়ি সব যাবে। আর একবার লেগে গেলে সেই আগুন কোথায় গিয়ে থামবে, কেউ জানে না। সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে নেওয়া হবে, বেশি বেশি খাজনা গুণতে হবে, সন্দেহজনক মহিলাদের জরিমানা করা হবে – আমি নিজের কানে ওদের এই সব পরিকল্পনার কথা শুনেছি। কু ক্লুক্স – ”

“কু ক্লুক্সের কাউকে আপনি চেনেন? আচ্ছা, টমি ওয়েলবার্ন বা হিউ বা – ”

উনি অধৈর্যভাবে ঘাড় নাড়লেন।

“আমি কী করে জানব? আমি তো বিশ্বাসঘাতক, ঘরের শত্রু বিভীষণ, স্ক্যালাওয়াগ। আমার কি জানার কথা? তবে ইয়াঙ্কিরা কাদের কাদের সন্দেহ করে সেটা আমি জানি, ওঁরা একটাও ভুল পদক্ষেপ নিলেই, ধরে নিতে পার ওঁরা ফাঁসির দড়িতে ঝুলে পড়েছেন। অবশ্য আমি জানি যে প্রতিবেশীরা ফাঁসিতে ঝুলে পড়লেও তোমার কিছু এসে যায় না। তবে তোমার মিলটা হাতছাড়া হয়ে গেলে তোমার যে খুব দুঃখ হবে সেটাও আমি জানি। তোমার চোখের ওই একগুঁয়ে দৃষ্টিই আমাকে বলে দিচ্ছে, আমার কথা তোমার বিশ্বাস হচ্ছে না, উলুবনে মুক্তো ছড়ানোই হচ্ছে আমার। তবে আমার পরামর্শ হল একটা পিস্তল সব সময় কাছে রাখবে – আর হ্যাঁ, শহরে থাকলে, চেষ্টা করব যাতায়াতের সময় পাশে থাকতে।”

“রেট, সত্যি করে বলুন তো – আমি যাতে নিরাপদ থাকি, সেই জন্যেই কি আপনি – ”

“আপনার অনুমান অভ্রান্ত, প্রিয়তমে। আমি যে শৌর্যের বড়াই করিয়া থাকি, তাহাই আপনাকে নিরাপত্তা দানের নিমিত্ত এই অধমকে অনুপ্রাণিত করিয়াছে!” কালো চোখে দুষ্টুমির হাসি, চেহারা থেকে আন্তরিকতার সমস্ত চিহ্ন নিমেষে অদৃশ্য। “কিন্তু কী কারণে? কারণ আপনার প্রতি আমার গভীর প্রেম, মিসেজ় কেনেডি। হ্যাঁ, আমি নীরবে আপনাকে কামনা করিয়া গিয়াছি, এবং দূর হইতে নিজেকে আপনার আরাধনায় নিয়োজিত করিয়াছি; এবং মহান অ্যাশলের ন্যায় এই অধমও নিজেকে একজন সম্মানিত ব্যক্তি বলিয়াই মনে করে, তাই ইহা আপনার নিকট গোপন রাখিয়াছিলাম। দুর্ভাগ্যবশত আপনি ফ্র্যাঙ্কের সহধর্মিণী, তাই আমার সম্ভ্রমবোধ ইহা প্রকাশ করিয়া বলিতে বাধা দান করিয়াছে। ক্বচিৎ কখনো মিস্টার উইল্কসের সম্ভ্রমবোধেও যেমন ফাটল ধরে, তদ্রূপ এই অধমের সম্ভ্রমবোধেও এই ক্ষণে ফাটল ধরিয়াছে তাই আমার গোপন আবেগ প্রকাশ করিয়া ফেলিলাম এবং আমার – ”

“ঈশ্বরের দোহাই, এবার চুপ করুন!” স্কারলেট বাধা দিয়ে বলল। যথারীতি রেগেও উঠল, ওঁর এই ধরণের হাসি মস্করায় নিজেকে বড় হাস্যাস্পদ লাগে। তাছাড়া অ্যাশলে আর ওর সম্ভ্রমবোধ নিয়ে আরও কোনো আলোচনা চলুক সেটাও ওর কাম্য নয়। “আরও একটা কী কথা যেন আমাকে বলবেন বলছিলেন?”

“এটা কী করলে! আমি যখন আমার রক্তাক্ত হৃদয়ের বেদনার ভার লাঘব করার চেষ্টা করছি, তখনই তুমি কথার মোড় অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে চাইছ? বেশ, অন্য কথাটা হচ্ছে এই রকম।” পলকের মধ্যে ওঁর চোখ থেকে দুষ্টুমির হাসি মিলিয়ে গেল, আবার উনি গম্ভীর এবং শান্ত হয়ে উঠলেন।

“আমি চাই যে এই ঘোড়াটা নিয়ে তুমি একটু ভাবনা চিন্তা কর। খুব একগুঁয়ে ঘোড়া আর ওর মুখটা একেবারে লোহার মত শক্ত। ওকে চালিয়ে নিয়ে যেতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়, ঠিক কিনা? একবার যদি ওটার লাফ দেবার ইচ্ছে হয়, তুমি হয়ত সামলাতে পারবে না। খানাখন্দে পড়লে বাচ্চাটা তো শেষ হয়ে যাবেই, তুমিও যেতে পার। তাই তোমাকে খুব শক্তপোক্ত একটা কার্ব-বিটের৩ বন্দোবস্ত করতে হবে, আর নাহলে আমাকে এর বদলে একটা শান্ত ঘোড়ার বন্দোবস্ত করতে দাও যার মুখ এতটা শক্ত হবে না।”

ওঁর ভাবলেশহীন, স্নিগ্ধ মুখের দিকে তাকাতেই ওর বিরক্তি সম্পূর্ণ মিলিয়ে গেল, ওর গর্ভাবস্থা নিয়ে আলোচনার ফলে যে বিব্রত অবস্থা তৈরি হয়েছিল সেটাও কেটে গেল। একটু আগেই যখন লজ্জায় ওর মরে যেতে ইচ্ছে করছিল, উনি অত্যন্ত সহৃদয়তার সঙ্গে ওকে শান্ত করবার চেষ্টা করছিলেন। এখনও উনি স্নেহশীল আর আন্তরিকতার সঙ্গেই ঘোড়াটাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা করছেন। ও সর্বান্তকরণে ওঁর প্রতি কৃতজ্ঞ বোধ করল। সর্বদা উনি ঠিক এরকমই থাকতে পারেন না কেন, সেটা ভেবে অবাক হল।

“ঘোড়াটাকে চালানো খুবই কঠিন,” ম্রিয়মাণ স্বরে ওঁর সঙ্গে একমত হল। “ওর লাগাম টানার জন্য মাঝে মাঝে সারারাত আমার হাতে খুব যন্ত্রণা হয়। একে নিয়ে আপনি যেটা ভাল মনে করেন সেটাই করুন, রেট।”

ওঁর দু’চোখে আবার দুষ্টুমি খেলতে লাগল।

“কথাটা খুবই মিষ্টি আর মেয়েলি শোনালো, মিসেজ় কেনেডি। কর্তৃত্বব্যঞ্জক যে সুরে তুমি কথা বলতে অভ্যস্ত, একেবারেই সেরকম নয়। সঠিক কৌশল জানা থাকলে তোমাকেও পোষ মানানো যায়।”

ওর ভুরু কোঁচ হয় উঠল, মেজাজটাও সপ্তুমে চড়ে ফিরে এল আবার।

“এখুনি আমার গাড়ি থেকে নেমে যান বলছি, নইলে এই চাবুক দিয়েই আপনাকে আঘাত করব। কেন যে আপনাকে সহ্য করি জানি না – কেন যে কখনো কখনো আপনার সঙ্গে ভদ্রতা করে ফেলি! আপনার ভদ্রতা সভ্যতার কোনও জ্ঞানই নেই। চরিত্র বলেও আপনার কিছু নেই। আসলে আপনি – আপনি একটা – নেমে জান বলছি। মজা করে বলছি না কিন্তু।”

তারপর উনি যখন নেমে গাড়ির পেছনে গিয়ে নিজের ঘোড়ার বাঁধন খুলে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে বিকেলের পড়ন্ত আলোয় ওর দিকে তাকিয়ে বিগলিত মুখে হাসলেন, স্কারলেটও এগিয়ে যেতে যেতে নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না।

হ্যাঁ ঠিকই, মানুষটা খুবই অসভ্য, কপট, ওঁর সঙ্গে সম্পর্ক রাখাটাও মোটেও নিরাপদ নয়। অসতর্ক কোনো মুহূর্তে বেফাঁস কিছু বলে একটা ভোঁতা অস্ত্রও যদি ওঁর হাতে তুলে দিয়েছ কি কখন যে সেটা ধারালো ছুরির মত তোমার ওপর নেমে আসবে, তুমি আন্দাজও করবে না। কিন্তু মানুষটা তোমাকে এমন নাচিয়ে দিতে পারেন যেন – যেন লুকিয়ে লুকিয়ে তুমি এক গ্লাস ব্র্যান্ডি পান করে বসে আছ!

গত কয়েক মাসে, স্কারলেট ব্র্যান্ডি পান করার উপকারিতা ধরে ফেলেছে। সন্ধেবেলা বৃষ্টিতে ভিজে, গায়ে গতরে ব্যথা নিয়ে বাড়ি ফেরার পর, ম্যামির তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বাঁচিয়ে টেবিলের ওপরের ড্রয়ারে তালা দিয়ে লুকিয়ে রাখা বোতলটা ওকে যতটা স্বস্তি দেয় আর কোনো কিছুই সেটা দিতে পারে না। ওর এই অবস্থায় যে মদ্যপান করা ঠিক নয় সেটা নিয়ে ওকে সতর্ক করার কথা ডঃ মীডের মাথায় আসেনি, কারণ উনি কল্পনাও করেননি যে ভদ্রবাড়ির কোনও মেয়ে আঙ্গুর থেকে তৈরি ওয়াইন থেকেও কড়া কোনও পানীয় গ্রহণ করতে পারে। অবশ্য বিয়ে-শাদিতে এক গ্লাস শ্যামপেন বা খুব ঠাণ্ডা লেগে বিছানা নিলে হুইস্কি, মধু আর লেবু দিয়ে বানানো গরম শরবত খেতে পারে। কিছু লক্ষ্মীছাড়া অবশ্যই মহিলা আছেন, যাঁরা পরিবারের সম্মান ধুলোয় লুটিয়ে দিয়ে মদ্যপান করে থাকেন। এই দলে য়ারও আছেন, কিছু উন্মাদ এবং বিবাহবিচ্ছিন্না মহিলা এবং এমন কিছু মহিলা, যাঁরা মিস সুস্যান বি এন্টনির মতই বিশ্বাস করেন যে মেয়েদেরও ভোট দেবার অধিকার থাকা উচিত। কিন্তু ডাক্তারবাবুর স্কারলেটের চালচলনে যতই আপত্তি থাকুক না কেন, ও যে মদ্যপানও করতে পারে সেই সন্দেহটা করেননি।

স্কারলেট খেয়াল করে দেখেছে, সাপারের আগে জল না মিশিয়ে ব্র্যান্ডি খেয়ে নিলেই দুর্দান্ত কাজ হয়, তারপর কফি চিবিয়ে বা কোলোন দিয়ে কুলকুচি করে নিলেই গন্ধটা চাপা দেওয়া যায়। পুরুষমানুষরা যখন তখন মদ্যপান করে মাতলামি করলেও কোনো দোষ হয় না, অথচ মেয়েদের মদ্যপান নিয়ে ওরা কেন যে এত বোকার মত কথা বলে কে জানে? মাঝে মাঝে ওর পাশে শুয়ে ফ্র্যাঙ্কের নাক ডাকিয়ে ঘুমোনোয়, দারিদ্র্যের আর ইয়াঙ্কিদের ভয়ে, টারার জন্য মন কেমন করে, বা অ্যাশলেকে কাছে পাবার আকুলতায় কিছুতেই ওর ঘুম আসতে চায় না। একমাত্র ব্র্যান্ডির বোতলটাই ওকে পাগল হয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করেছে। ব্র্যান্ডির সেই সুপরিচিত, মনকাড়া স্বাদ, গলা দিয়ে নামতে নামতে উষ্ণ অনুভূতিতে বুঁদ করে দেওয়া – ওর দুশ্চিন্তাগুলো ফিকে করে দেয়। আর তিন দাগ পেটে পড়লেই স্কারলেট বুক ঠুকে নিজের কাছে বলতে পারে, “এই সব নিয়ে কালকেই না হয় ভাবা যাবে, মাথাটা তখন ঠাণ্ডা থাকবে।”

কিন্তু এমন কিছু রাতও আসত যকন ব্র্যান্ডিও ওর বেদনার্ত হৃদয়কে শান্ত করতে পারত না। মিল হাতছাড়া হবার ভয় বা টারার জন্য মন কেমন করা – তার চাইতেও তীব্র একটা বেদনা ওকে অস্থির করে তুলত। অ্যাটলান্টা শহরের কোলাহলমুখরতা, শহরের নতুন নতুন অট্টালিকা, অচেনা মুখের সারি, শহরের সরু সরু রাস্তায় ঘোড়া আর ওয়াগনের ছড়াছড়ি আর মানুষের ভিড় – ওর দমবন্ধ হয়ে আসে। অ্যাটলান্টা ওর প্রাণের শহর – কিন্তু টারার সুনিবিড়, নিস্তরঙ্গ, শান্ত পল্লীজীবন, সেই জীবন যত কঠিনই হোক না কেন, তার আস্বাদই আলাদা! অ্যাশলের কাছাকাছি থাকতে পারে, চাইলেই ওকে দেখতে পারা, ওর কণ্ঠস্বর শুনতে পারা আর হৃদয়ের অভ্যন্তরে অনুভব করতে পারা যে অ্যাশলে ওকে ভালবাসে! মেলানির পাঠানো প্রতিটা চিঠি থেকে জানতে পারে যে ওরা ভাল আছে, উইলের কাছ থেকে পাওয়া ছোট ছোট চিরকুট থেকে চাষের জমিতে হাল চালানো, রোপণ, তুলো চাষ এসবের খবর পেতে পেতে ওর বাড়ি যাওয়ার জন্য মন উতলা হয়ে উঠল।

এই জুন মাসে বাড়ি যাব আমি। এর পরে তো এখানে আমি আর কিছুই করতেই পারব না। মাসদুয়েকের জন্য বাড়ি থেকে ঘুরে আসি, কথাটা ভাবলেই ও মনে মনে চাঙ্গা হয়ে ওঠে। জুন মাসে বাড়ি ওকে যেতেই হল, কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণে। সেই মাসের প্রথমেই উইলের কাছ থেকে ছোট্ট একটা চিরকুট পেল যে জেরাল্ড আর নেই।
***

টীকা:

১ ক্যাট-ও’-নাইন টেইল – একটা বিশেষ ধরণের চাবুক যাতে ন’টা চামড়ার দড়ি থাকে।

২ মিউল্যাটো – শ্বেতাঙ্গ আর কৃষ্ণাঙ্গ মিলনে জন্মানো সন্তান।

৩ কার্ব বিট – ঘোড়া নিয়ন্ত্রণ করার জন্য এক ধরণের বেড়ি, যা ঘোড়ার পায়ে লাগানো হয়।
















একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ