মার্গারেট মিচেলের উপন্যাস: যেদিন ভেসে গেছে

 



অনুবাদ: উৎপল দাশগুপ্ত

পর্ব- ৩৯




ট্রেনটা বেশ দেরি করেই পৌঁছল। স্কারলেট অবশেষে যখন জোনসবোরোতে এসে নামল, তখন জুন মাসের গাঢ় নীল গোধূলি আলোয় চারপাশ ছেয়ে আছে। যে অল্প কয়েকটা স্টোর আর আবাস এখনও টিকে আছে, সেখান থেকে ল্যাম্পের হলদেটে আলো দেখা যাচ্ছে।

বড় রাস্তার ওপর অট্টালিকাগুলোর মাঝে মাঝে অনেকটা করে ফাঁক। এই সব ভিটে হয় গোলাবর্ষণে ধূলিসাৎ করে দেওয়া হয়েছে, আর নয়ত আগুন লাগিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। ধ্বংসপ্রাপ্ত অন্ধকার অট্টালিকাগুলো স্কারলেটের দিকে নীরবে তাকিয়ে আছে। ব্যালার্ড স্টোরের বাইরে কাঠের ছাউনি দেওয়া জায়গায় কয়েকটা ঘোড়া আর খচ্চর বাঁধা। ধূলিধূসর লাল রঙের পথটা জনশূন্য আর নিষ্প্রাণ। শব্দ বলতে রাস্তার প্রান্তের একটা পানশালা থেকে গোধূলির নিথর বাতাসে ভেসে আসা উচ্চকিত কথাবার্তা আর মদে জড়ানো অট্টহাসির আওয়াজ।

লড়াইয়ের সময় জ্বালিয়ে দেওয়া ডিপোটা নতুন করে তৈরি করা হয়নি। তার বদলে জলঝড়ের হাত থেকে বাঁচবার জন্য কাঠ দিয়ে একটা মাথার ওপর ছাউনি বানিয়ে দেওয়া হয়েছে, পাশগুলো ঘিরে দেওয়া হয়নি। স্কারলেট ছাউনির তলায় গিয়ে ছোট একটা পিপের ওপর বসল। পিপেগুলো নিশ্চয়ই বসার জন্যেই রাখা।

উতলা হয়ে পথের ওপর নজর রাখল – উইল বেন্টীনের প্রতীক্ষায়। ওকে এখান থেকে নিয়ে যেতে উইলের আসা উচিৎ। জেরাল্ডের মৃত্যুসংবাদ জানিয়ে ওর অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত বার্তা পাওয়ার পর স্কারলেট যে প্রথম ট্রেন ধরেই চলে আসবে, এটা ওর বোঝা উচিৎ।

খবরটা পাওয়ার পর এমন তাড়াহুড়ো করে স্কারলেট রওনা দিয়েছে যে কাপড়ের ঝোলার মধ্যে একটা রাত্রিবাস আর টুথ-ব্রাশ ছাড়া কিছুই নিয়ে আসেনি, এমনকি অন্তর্বাসও না। মিসেজ় মীডের কাছ থেকে ধার করা আঁটসাঁট কালো পোশাকে ওর বেশ অস্বস্তি হচ্ছিল। অত তাড়াহুড়োতে নিজের জন্য শোকাবাস কেনবার সময় পর্যন্ত ছিল না। আজকাল মিসেজ় মীড খুব রোগা হয়ে গেছেন। আর এখন স্কারলেটের গর্ভাবস্থার প্রায় মাঝামাঝি পর্যায়। ফলে ওই পোশাকে ওর অসুবিধে আরও বেড়ে গেছে। জেরাল্ডের মৃত্যুতে শোক পাওয়া সত্ত্বেও, নিজের বর্তমান চেহারা সম্বন্ধে ও যথেষ্ট সচেতন এবং বিরক্ত। চেহারাটা বেঢপ হয়ে গেছে, চোখমুখ আর গোড়ালির কাছটা ফুলে গেছে। কেমন দেখতে লাগছে ওকে, এটা নিয়ে এতদিন ওর খুব একটা মাথাব্যথা ছিল না। এক ঘন্টার মধ্যেই অ্যাশলের সঙ্গে দেখা হবে, চিন্তা তো সেটা নিয়েই। এই শোকের মধ্যেও অন্য কারোর সন্তান গর্ভে নিয়ে অ্যাশলের সঙ্গে দেখা হবে ভাবতেই অস্বস্তি হচ্ছে। অ্যাশলেকে ও ভালবাসে, অ্যাশলেও ওকে ভালবাসে, আর এই অবাঞ্ছিত সন্তান ওর আনুগত্যহীনতাকে প্রকাশ করছে। ছিপছিপে চেহারা আর চলাফেরার সাবলীল দ্রুততা না থাকা অবস্থায় অ্যাশলের মুখোমুখি হতে ওর যতই অনিচ্ছা থাক না কেন, সেটা যে আটকানো যাবে না, এই মোদ্দা কথাটা ও বুঝে নিয়েছে।

স্কারলেট ক্রমশ অধৈর্য হয়ে উঠতে লাগল। উইলের এখানে চলে আসা উচিৎ ছিল। বুলার্ডে গিয়ে ওর খোঁজ নিতেই পারে, কিংবা যদি বোঝে কোনও কারণে ও আসতে পারেনি, তাহলে আর কাউকে ওকে টারা পৌঁছে দিতে বলতেই পারে। কিন্তু বুলার্ডে যেতে মন চাইছে না। শনিবারের রাত; কাউন্টির অর্ধেক লোক ওখানে থাকবে। আঁটসাঁট কালো পোশাকে ওর বেঢপ চেহারাটা কারও চোখে পড়ুক সেটা ও চায় না। চেহারাটা ঢেকে ফেলার বদলে, বেঢপ ব্যাপারটা ওই পোশাকে আরও স্পষ্ট হয়ে পড়েছে। এছাড়া জেরাল্ডের চলে যাওয়ায় ওদের সমবেদনার কথাও ও সহ্য করতে পারবে না। কোনও সমবেদনার প্রয়োজন নেই ওর। ভয় হচ্ছে কেউ জেরাল্ডের কথা তুললেই চোখের জল আর বাঁধ মানবে না। কাঁদতে চায় না স্কারলেট। জানে যে একবার কাঁদতে শুরু করলে, যে রাতে অ্যাটলান্টার পতন ঘটেছিল আর রেট ওকে শহরের বাইরে অন্ধকার রাস্তায় একা ফেলে চলে গেছিলেন, সেই রকম ভয়াবহ কান্নায় ও ভেসে যাবে। কিছুতেই থামাতে পারবে না।

না, ও কাঁদবে না, কিছুতেই কাঁদবে না! গলার মধ্যে আবার বেদনা ডেলা পাকিয়ে উঠছে। খবরটা পাওয়ার পর থেকে বারবার এরকম হচ্ছে। কেঁদে কী লাভ? কাঁদলে দুর্বল হয়ে পড়বে, সব গুলিয়ে যাবে। জেরাল্ডের শরীর যে ভাল চলছিল না – উইল বা মেলানি বা অন্য মেয়েরা কেন ওকে লেখেনি? কেন? কেন? কেন? তাহলে তো পরের ট্রেনেই টারা চলে আসতে পারত, জেরাল্ডে্র সেবা শুশ্রূষা করতে পারত! দরকার পড়লে অ্যাটলান্টা থেকে ডাক্তার নিয়ে যেতে পারত!

মূর্খ! সব মূর্খের দল! ওকে ছাড়া ওরা কি এক পাও চলতে পারে না? এক সঙ্গে দুটো জায়গায় থাকা তো ওর পক্ষে সম্ভব নয়! ঈশ্বর জানেন, অ্যাটলান্টাতে থেকেও ওদের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছিল!

অধীর, অস্থির হয়ে পিপের ওপর বসে শরীরটা মোচড়াতে লাগল। এখনও উইলের পাত্তা নেই। গেল কোথায়? পেছন দিকে রেল লাইনের ওপর থেকে কাঠকয়লার মড়মড় আওয়াজ শুনতে পেল। ঘুরতেই অ্যালেক্স ফোন্টেনের সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে গেল। পিঠে এক বস্তা ওটস নিয়ে রেল লাইন পেরিয়ে একটা ওয়াগনের দিকে যাচ্ছে।

“আরে! স্কারলেট না?” বলে ও চেঁচিয়ে উঠল। পিঠ থেকে বস্তাটা নামিয়ে দৌড়ে এল হাত মেলানোর জন্য। চোখমুখ আনন্দে উজ্জ্বল। “কী ভাল লাগছে, তোমার সাথে দেখা হয়ে! উইলকে দেখলাম কামারশালায়, ঘোড়ার নাল লাগাচ্ছে। ট্রেন তো দেরি করে এল, তাই ভাবল সময় পেয়ে যাবে। ডেকে আনব ওকে?”

“হ্যাঁ, প্লীজ় অ্যালেক্স,” দুঃখের মধ্যেও হেসে বলল। কাউন্টির একজনের সঙ্গে দেখা হয়ে খুব ভাল লাগছে।

“আর হ্যাঁ – স্কারলেট,” অপ্রস্তুত মুখ করে বলল, স্কারলেটের হাত এখনও ওর হাতে ধরা। “তোমার বাপির জন্য খুব দুঃখিত।”

“অনেক ধন্যবাদ,” স্কারলেট জবাবে বলল। মনে মনে ভাবল, প্রসঙ্গটা না তুললেই ভাল করত। কথাটা শুনেই জেরাল্ডের লালচে মুখ আর হেঁড়ে গলার কথা মনে পড়ে গেল।

“যদি কিছুটা শান্তি পাও, তাহলে বলতে পারি, এখানে আমরা সবাই ওঁর জন্য গর্ববোধ করি,” অ্যালেক্স বলে চলল। উনি – কী ভাবে বলি – একজন সৈনিকের মত - বীরের মত, উনি মৃত্যুবরণ করেছেন!”

অ্যালেক্স ঠিক কী বলতে চাইছে? – স্কারলেটের সব কিছু কেমন জট পাকিয়ে গেল। কেউ গুলি করেছিল ওঁকে? নাকি টোনির মত কোনও স্ক্যালাওয়াগের সঙ্গে লড়াই বেঁধে গিয়েছিল? নাহ্‌ এখন আর বেশি জানার দরকার নেই। ও আরও কিছু বলতে শুরু করলেই, স্কারলেট কেঁদে ফেলবে। কিন্তু ওয়াগনে ওঠার আগে ও কাঁদতে চায় না, যাতে উইল ছাড়া অন্য কেউ ওকে কাঁদতে দেখতে না পায়। উইল ভাইয়ের মত। ও দেখতে পেলে কিছু এসে যাবে না।

“এই ব্যাপারে আমি এখন কোনও কথা বলতে চাই না, অ্যালেক্স,” স্কারলেট কথা না বাড়তে দিয়ে বলে দিল।

“তোমাকে আমি এক ফোঁটা দোষ দেব না, স্কারলেট,” বলতে বলতে অ্যালেক্সের মুখ রাগে লাল হয়ে উঠল। “ও যদি আমার বোন হত, আমি – কী ভাবে বলব স্কারলেট – কোনও মহিলার সম্বন্ধে আগে আমি কখনও এমন কড়া কথা বলিনি, তবে আমার মনে হয় কেউ ওকে – স্যুয়েলেনকে – আছোলা বেতের চাবুক দিয়ে পেটালে যদি ওর কোনও শিক্ষা হয়!”

কী হাবিজাবি কথা বলে যাচ্ছে ছেলেটা, স্কারলেট অবাক হল। এই ব্যাপারে স্যুয়েলেন কী দোষ থাকতে পারে?

“বলতে খারাপই লাগছে তোমায় – এখানকার সব মানুষই ওর ব্যাপারে খুবই ক্ষুব্ধ। এক – উইল ওর পাশে দাড়িয়েছে – হ্যাঁ আর মিস মেলানিও – উনি তো মহৎ মানুষ – কারুর মন্দই উনি দেখতে পান না, আর – ”

“বললাম না, এখন এসব নিয়ে কথা বলতে চাই না,” স্কারলেট শীতল স্বরে বলল। তবে অ্যালেক্স গায়েই মাখল না। স্কারলেটের রুক্ষ হয়ে ওঠার কারণটা ও যেন বুঝে গেছে, আর সেটাই চিন্তার ব্যাপার। বাইরের কারুর কাছ থেকে নিজের পরিবারের নিন্দা শুনতে কারই বা ভাল লাগে? নিজের অজ্ঞতাই বা অন্যের কাছে কেন প্রকাশ পেয়ে যাবে? কে জানে উইল পুরো ঘটনাটা স্কারলেটকে জানায়নি কেন?

অ্যালেক্সের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি থেকে স্কারলেট নিজেকে আড়াল করতে চাইছিল। ওর অবস্থা যে অ্যালেক্স ঠিকঠাক আন্দাজ করে ফেলেছে, সেটা বুঝতে পেরে খুবই অস্বস্তি হচ্ছিল। কিন্তু পড়ন্ত আলোয় অ্যালেক্স ওর মুখের দিকে চেয়ে খুব আশ্চর্য হয়ে ভাবছিল, স্কারলেটের চেহারার এমন আমূল পরিবর্তনের পরেও কী করে ওকে চিনে ফেলল। সন্তানসম্ভবা বলেই হয়ত ওকে এত আলাদা লাগছে। এই সময় মেয়েদের খুবই বিচ্ছিরি দেখায়। তাছাড়া বৃদ্ধ পিতার মৃত্যুতে যথেষ্ট আঘাতও পেয়েছে। খুবই আদরের মেয়ে ছিল ওঁর। কিন্তু না, পরিবর্তনটা আরও একটু গভীর। আগেরবার যেরকম দেখেছিল ওকে, এখন তার থেকে নিঃসন্দেহে অনেক বেশি ভাল দেখাচ্ছে। দিনে অন্তত তিনবার ভরপেট খাবার জুটিয়ে নেওয়ার সামর্থ্য ওর আছে। ফাঁদে পড়া বুনো চাউনিটাও কিছুটা হলেও কেটে গেছে। নিরাপত্তাহীনতা আর বেপরোয়াভাবটা কেটে গিয়ে এক ধরণের কাঠিন্য চোখে এসে বাসা বেঁধেছে। কর্তৃত্ব, আত্মবিশ্বাস আর দৃঢ়তা ফুটে বেরোচ্ছে – যখন হাসছে, তখনও। বুড়ো ফ্র্যাঙ্ক তার মানে আনন্দেই আছে! ঠিকই, ও অনেক বদলে গেছে। স্কারলেট খুবই সুন্দরী একজন মহিলা, তবে সেই কমনীয়, মিষ্টি ভাবটা যেন ওর মুখ থেকে হারিয়ে গেছে। মোহময় দৃষ্টি হেনে ছেলেদের কাবু করে ফেলা – যেরকমটা দেখে ও অভ্যস্ত – হায় রে, সেটাই আর নেই!

বদল তো আমাদের সবার মধ্যেই এসেছে, তাই না? মোটা কাপড়ে বানানো নিজের পোশাকের দিকে নজর পড়ল অ্যালেক্সের, তিক্ততা অনুভব করল। রাতে বিছানায় শুয়ে ঘুম আসতে চায় না – মায়ের অপারেশন কী ভাবে করাবে, মৃত জো’য়ের বাচ্চা ছেলেটার পড়াশোনার কী বন্দোবস্ত করবে, আরেকটা খচ্চর কেনবার টাকা কোথা থেকে আসবে – এসব নিয়ে তোলাপাড়া চলতে থাকে মনের ভেতর। মনে হয় লড়াইটা জারি থাকলেই বোধহয় ভাল ছিল, অনন্ত কাল ধরে চললেই হয়ত ভাল ছিল! যুদ্ধের পরিণতি তখন অজানা ছিল। বাহিনীতে থাকার সময় দু’মুঠো খাবার অন্তত জুটত। হুকুম করার মত কাউকে না কাউকে পাওয়া যেতই। এত সব সমস্যা নিয়ে জেরবার হতে হত না, যে সব সমস্যার আসলে কোনও সমাধানই নেই। লড়াইতে মরে যাওয়ার ভয় ছাড়া আর কিছু নিয়েই ভাবনা ছিল না। ডিমিটি মুনরো ছিল। অ্যালেক্স ওকে বিয়ে করতে চেয়েছিল। এত মানুষের বোঝা কাঁধে নিয়ে সেই আশা এখন দুরাশায় পর্যবসিত। কী ভালই না বাসত মেয়েটাকে! ওর গালের রক্তিমাভা আর চোখের তারায় খুশির আবেশ হারিয়ে যাচ্ছে। টোনিকে যদি টেক্সাসে পালিয়ে যেতে না হত! আরও একটা কর্মঠ হাত অনেক কিছুই বদলে দিতে পারত। ওর আদরের রগচটা ছোট ভাইটা আজ পশ্চিমের কোন শহরে হয়ত কপর্দকশূন্য হয়ে দিন গুজরান করছে। সত্যিই, ওরা সবাই পালটে গেছে! কেনই বা পালটাবে না? একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল।

“তুমি আর ফ্র্যাঙ্ক টোনির জন্য যা করেছ, তার জন্য ধন্যবাদ দেওয়াই হয়নি,” অ্যালেক্স বলল। “তোমরাই তো ওকে পালাবার সুযোগ করে দিয়েছিলে, তাই না? আমরা খুবই কৃতজ্ঞ। ঘোরানো প্যাঁচানো সূত্র থেকে জেনেছি টেক্সাসে নিরাপদেই আছে ও। জানাজানি হওয়ার ভয়ে তোমাদের লিখতে পারিনি – জিজ্ঞেস করতেও পারিনি – তোমরা টোনিকে কিছু অর্থসাহায্য করেছিলে কি? আমি ঋণশোধ – ”

“ওহ্‌, অ্যালেক্স চুপ কর! এখন এসব কথার সময় নয়!” স্কারলেট চেঁচিয়ে উঠল। এই প্রথম টাকার কথা শুনেও নির্লিপ্ত থাকল।

অল্পক্ষণ অ্যালেক্স কোনও কথা বলল না।

“দেখি, উইলের খোঁজ করি,” তারপর বলে উঠল। “হ্যাঁ, কাল শেষ কাজের সময় আমরা সবাই থাকব।”

যেই ও ওটসের বস্তাটা তুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য পেছন ফিরেছে, নড়বড়ে চাকাওয়ালা একটা ওয়াগন পাশের একটা গলি থেকে বেরিয়ে ওদের সামনে এসে ঘ্যাঁচ করে থামল। বসার জায়গা থেকেই উইল হাঁকল, “দেরি হয়ে গেল স্কারলেট, খুব দুঃখিত।” তারপর কোনোরকমে কষ্টেসৃষ্টে নেমে এসে কাঠের পা নিয়ে ঠকঠক করতে করতে এসে নীচু হয়ে স্কারলেটের গালে চুম্বন করল। এর আগে উইল কখনও স্কারলেটকে চুম্বন করেনি, নামের আগে ‘মিস’ কথাটা জুড়ে দিতেও ভোলেনি। একটু অবাক হলেও স্কারলেট মনে মনে খুব খুশিই হল। যত্ন করে চাকা বাঁচিয়ে উইল ওকে ওয়াগনে বসিয়ে দিল। স্কারলেট নীচের দিকে তাকিয়ে বুঝল এটা সেই আগের ঝরঝরে ওয়াগনটাই, যেটাতে চেপে অ্যাটলান্টা থেকে ওরা পালিয়ে এসেছিল। গাড়িটা এতদিন ধরে সচল কী করে থাকল? উইল খেয়াল করে সময়ে সময়ে মেরামত করে গেছে। তবে গাড়িটা দেখে পালিয়ে আসার স্মৃতি মনে পড়ে যাওয়ায় শরীর খারাপ করতে লাগল। যদি জুতো কেনার টাকা না থাকে, যদি আন্ট পিটির টেবিল থেকে খাবার নাও জোটে, তাহলেও টারার জন্য নতুন একটা ওয়াগন চাই। আর এটাকে জ্বালিয়ে ফেলতে হবে।

উইল গাড়িতে উঠেই কথা বলতে শুরু করে দিল না বলে স্কারলেট মনে মনে কৃতজ্ঞ বোধ করল। জীর্ণ খড়ের টুপিটা ওয়াগনের পেছনে ছুঁড়ে ফেলে, ঘোড়ার উদ্দেশ্যে শিস্‌ দিল, ঘোড়াটা চলতে শুরু করল। উইল ঠিক আগের মতই আছে, লম্বা, রোগা, গোলাপি চুল, নরম চোখ, গাড়ি টানা পশুর মতই শান্ত প্রকৃতির।

গ্রামের সীমানা ছাড়িয়ে ওরা টারার লালমাটির রাস্তায় পড়ল। আকাশের কিনার ধরে এখনও হালকা গোলাপি আভা। পালকের মত ভেসে থাকা হালকা মেঘে সোনালি আর ফ্যাকাসে সবুজের খেলা। গোধূলি আলোয় চরাচরে শান্ত নিস্তব্ধতা। গ্রামের এই তাজা বাতাস, লাঙলচষা জমি আর গ্রীষ্মের রাতের মাধুরী ছেড়ে এতগুলো মাস কী করে থাকতে পারল? কী সুন্দর গন্ধ এই সোঁদা লালমাটির, কত চেনা, কত আপন – ইচ্ছে হল নেমে গিয়ে মুঠোভরে তুলে আনে। পথের দু’ধারে বৃষ্টির জল পড়া হানিসাক্‌লের সবুজ ঝাড় থেকে মৃদুমন্দ সুবাস ভেসে আসছে। স্কারলেট প্রাণভরে সুবাস নিল। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম সৌরভও এর কাছে তুচ্ছ। মাথার ওপর দিয়ে চিমনির ওপর বসে থাকা এক ঝাঁক সোয়্যালো পাখি সহসা দ্রুত ডানা মেলে উড়ে গেল। ভয় পেয়ে লোমশ সাদা লেজ তুলে একটা খরগোশ রাস্তার ওপর দিয়ে দৌড়ে পালাল। খেতের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় লাল মাটি ফুঁড়ে মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা তুলোর গাছ দেখে পুলকিত হল। কী ভাল লাগছে সব কিছু! কুয়াশাচ্ছন্ন জলাভূমি, লাল মাটি, বেড়ে উঠতে থাকা তুলোর ফসল, ঢালু জমিতে বাঁকা রেখার মত সবুজের সারি, কালো প্রাচীরের মত ঘিরে থাকা কালো কালো পাইন গাছের সারি! এত সব কিছু ছেড়ে অ্যাটলান্টায় এতদিন ছিল কেমন করে?

“স্কারলেট, মিস্টার ও’হারার কথা বলার আগে – বাড়ি পৌঁছনোর আগে সবটাই বলব – একটা ব্যাপারে তোমার মতামত জানতে চাই। ধরে নিচ্ছি, তুমিই এখন পরিবারের মাথা।”

“কী ব্যাপারে, উইল?

শান্ত সংযত দৃষ্টি নিয়ে স্কারলেটকে এক মুহুর্ত দেখল।

“আমি চাইছি স্যুয়েলেনকে আমার বিয়ে করাটা তুমি মেনে নাও।”

স্কারলেট বসার আসনটা আঁকড়ে ধরল। কথাটা শুনে এমন চমকে গেল যে পেছন দিকে প্রায় পড়েই যাচ্ছিল। বিয়ে করা! স্যুয়েলেনকে! ফ্র্যাঙ্ক কেনেডিকে কেড়ে নেওয়ার পর স্যুয়েলেনকে আর কেউ বিয়ে করে ফেলতে পারে, এটা তো ও ভাবতেই পারেনি! কার এমন দায় পড়েছে স্যুয়েলেনকে বিয়ে করতে?

“হে ভগবান! উইল!”

“তাহলে ধরে নিতে পারি তো, তোমার আপত্তি নেই?”

“আপত্তি? না, তা নেই – কিন্তু তুমি যে আমাকে চমকে দিলে! তুমি স্যুয়েলেনকে বিয়ে করবে? আমি যে সব সময় ভাবতাম, ক্যারীনকেই তুমি ভালবাস, উইল!”

ঘোড়ার দিকে নজর রেখে উইল লাগামটা আলগা করল। ওর হাবভাবে কোনও পরিবর্তন লক্ষ্য করল না স্কারলেট, তবে একটা দীর্ঘশ্বাস চাপল বলে মনে হল।

“হয়ত ঠিকই ভেবেছিলে,” উইল বলল।

“ও কি তোমাকে বিয়ে করতে রাজি নয়?”

“ওকে আমি জিজ্ঞেসই করিনি।”

“খুব বোকা তুমি, উইল! ক্যারীনকে বল। ওর মূল্য দুজন স্যুয়েলেনের সমান!”

“স্কারলেট, ইদানিং টারাতে কী কী ঘটে চলেছে, তুমি সেসব কিছুই জান না। বেশ কয়েক মাস ধরে তুমি আমাদের দিকে খুব একটা নজর দাওনি।”

“ও তাই বুঝি! আমি নজর দিইনি?” স্কারলেট চটে উঠল। “অ্যাটলান্টাতে কী করছি বলে তোমার ধারণা? জুড়িগাড়িতে বসে ঘুরতে বেরচ্ছি আর বলড্যান্স পার্টিতে যাচ্ছি? প্রত্যেক মাসে টাকা পাঠাইনি আমি? ট্যাক্স দিয়ে দিইনি? ছাদ মেরামত করিয়ে দিইনি? নতুন লাঙল আর খচ্চর কেনার টাকা দিইনি? আমি কি – ”

“দাঁড়াও, দাঁড়াও! তোমার ওই আইরিশ মেজাজ দেখিয়ে সংযম হারিয়ে ফেল না,” শান্ত গলায় বাধা দিল ওকে। “একজনও কেউ যদি জানে তুমি কী করেছ, সেটা হলাম আমি। তুমি দুজন পুরুষমানুষের কাজ একা হাতে সামলেছ।”

ক্ষতে কিছুটা প্রলেপ পড়ল। জিজ্ঞেস করল, “ঠিক আছে, তাহলে কী বলতে চাইছ?”

“একথা ঠিক, তোমার জন্য আমাদের মাথা গোঁজার ঠাঁইটা বেহাত হয়নি, রান্নাঘরে খাবারেরও অভাব হয়নি – আস্বীকার করছি না সেটা। কিন্তু টারাতে কী হচ্ছে, কার মাথায় কী চিন্তাভাবনা চলছে, সেসব নিয়ে তুমি খুব একটা ভাবনি। না, তোমাকে আমি দোষ দিচ্ছি না, স্কারলেট। তুমি ওরকমই। কারা কী ভাবল, তা নিয়ে কোনোদিনই তোমার কিছু এসে যায়নি। তোমাকে যেটা বলতে চাই, সেটা হল, ক্যারীনকে আমি কখনওই বলব না, কারণ বলাটা বৃথা হবে। ও আমার সঙ্গে ছোট বোনের মতই ব্যবহার করে – অন্য কারুর চাইতে আমার কাছেই মনের কথা খুলে বলতে পারে। কিন্তু ওর মৃত প্রেমিককে ও এখনও ভুলতে পারেনি, কোনোদিন ভুলতে পারবেও না। তোমাকে এটাও জানাতে চাই, চার্লস্টনের একটা কনভেন্টে যাওয়ার তোড়জোড় ও করছে।”

“তুমি কি মশকরা করছ?”

“হুম, জানি, কথাটা শুনে তুমি অবাক হবে, তবে একটা অনুরোধ করব, স্কারলেট, ওর সঙ্গে তর্কাতর্কি কোরো না, বা বকাবকিও কোরো না, বা হেসোও না। ওকে যেতে দাও। মন ওর ভেঙে গেছে। এটাতেই ও কিছুটা সান্ত্বনা পাবে।”

“নিকুচি করেছে! কত লোকের মন ভেঙে গেছে! ওরা কি সব কনভেন্টে পালিয়ে গেছে? এই আমাকেই দেখ না! আমার স্বামীও তো মারা গেছেন!”

“কিন্তু তোমার মন তো ভেঙে যায়নি,” ওয়াগনের পেছন থেকে এক টুকরো খড় তুলে নিতে নিতে শান্ত গলায় উইল বলল। খড়টা আস্তে আস্তে চিবোতে লাগল। মন্তব্যটা শুনে স্কারলেটের মুখে বাক্যস্ফূর্তি হল না। সত্যি কথা শুনলেই ওর এরকমটা হয়ে থাকে। সত্যিওটা যতই অপছন্দের হোক না কেন, বুনিয়াদি এক সততা থেকে সত্যিটা মনে মনে স্বীকার করে নিতে বাধ্য হয়। একটুক্ষণ চুপ করে রইল, ক্যারীনকে নান হিসেবে কল্পনা করার চেষ্টা করল।

“কথা দাও, তুমি ওর সঙ্গে ঝামেলা করবে না।”

“ঠিক আছে, কথা দিলাম,” বলে অবাক চোখে ওর দিকে তাকাল। উইলকে যেন নতুন এক চোখ নিয়ে দেখল। ক্যারীনকে উইল ভালবাসে – এতটাই ভালবাসে যে ওর চলে যাওয়াটায় যেন সহজভাবে হয়, সেটাই নিশ্চিত করতে চাইছে। অথচ স্যুয়েলেনকে বিয়ে করতে ওর কোনও আপত্তি নেই।

“আচ্ছা উইল। এই স্যুয়েলেনের ব্যাপারটা কী বলত! তুমি তো ওকে ভালবাসতে না, ঠিক কিনা?

“নিশ্চয়ই ভালবাসতাম – এক অর্থে বলা যেতেই পারে,” খড়ের টুকরোটা মুখ থেকে বের করে গভীর আগ্রহ নিয়ে দেখতে লাগল, যেন ওর মধ্যেই সত্যিটা লুকিয়ে আছে। “তুমি যেরকম ভাব, স্যুয়েলেন অতটা খারাপ নয়। আমরা দুজনেই দুজনকে মানিয়ে নিতে পারব, স্কারলেট। স্যুয়েলেনের প্রয়োজন হল একজন স্বামীর আর কয়েকটা সন্তান – যা সব মেয়েরই প্রয়োজন।”

এবড়োখেবড়ো রাস্তা ধরে ওয়াগনটা হোঁচট খেতে খেতে চলল। বেশ কিছুটা সময় দুজনেই নীরব। স্কারলেটের মাথায় হাজারটা চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। বাইরে থেকে যেরকম মনে হচ্ছে ব্যাপারখানা অত সোজা নয়। ভেতরে ভেতরে আরও গভীর কোনও ব্যাপার আছে নিশ্চয়ই। বিশেষ করে শান্ত মৃদুভাষী উইল ঘ্যানঘ্যানে স্যুয়েলেনকে বিয়ে করতে চাওয়ার মধ্যে।

“আসল কথাটাই তো আমাকে বললে না, উইল। দেখ আমি হলাম পরিবারের মাথা এখন। সব কথা জানার অধিকার আমার আছে।”

“ঠিক কথা বলেছ,” উইল বলল, “আশা করি তুমি বুঝবে। টারা ছেড়ে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। এটা আমার বাড়ি, স্কারলেট, আমার একমাত্র নিজের বাড়ি। যে বাড়িকে আমি ভালবাসি, এর প্রত্যেকটা ইটকে আমি ভালবাসি। নিজের মনে করেই, এখানে আমি কাজ করে গেছি। আর যখন তুমি কোনো কিছুর জন্য কিছু কর, তুমি সেটাকে ভালবেসে ফেলবেই। কি বলতে চাইলাম, বুঝেছ?”

উইল কী বলতে চাইল স্কারলেট বুঝেছে। উইলের মুখে শুনল, যে সব জিনিসের জন্য স্কারলেট প্রাণ পর্যন্ত পণ করতে পারে, ঠিক সেই সব জিনিস উইলেরও প্রিয়। পরম শ্রদ্ধায় আর ভালবাসায় ওর মন ভরে উঠল।

“দেখ, আমি এই ভাবে ভেবেছি। তোমার বাপি চলে গেছেন। ক্যারীন নান হয়ে চলে যাবে। বাড়িতে পড়ে থাকব শুধু স্যুয়েলেন আর আমি। স্যুয়েলেনকে বিয়ে না করে আমার টারায় থাকা অসম্ভব। লোকজন কী বলাবলি করবে, সে তো তুমি আন্দাজই করতে পার।”

“কেন – কেন উইল – মেলানি আছে আর অ্যাশলে – ”

অ্যাশলের নাম শুনতেই উইল ঘুরে গিয়ে স্কারলেটের দিকে তাকাল। ওর ফ্যাকাসে চোখ দেখে মনের ভেতর ডুব দেওয়া অসম্ভব। উইল যে ওর অ্যাশলের ব্যাপারে সব কিছু জানে, কথাটা আবারও ওর মনে হল। বোঝে সব, কিন্তু তার জন্য ভর্ৎসনাও কখনও করেনি, বা মেনে নিয়েছে বলেও জানায়নি।

“খুব শিগগিরই ওরা চলে যাবে।”

“চলে যাবে? কোথায়? টারা যেমন তোমার বাড়ি, সেরকম ওদেরও তো!”

“না, এটা ওদের বাড়ি নয়। আর এই ভাবনাটাই অ্যাশলেকে কুরে কুরে খাচ্ছে। এটা ওর বাড়ি নয়, আর তেমন কিছু রোজগার করে উঠতে পারে না, যাতে এখানে থেকে যেতে পারে। চাষবাসের ব্যাপারেও খুব আনাড়ি, আর সেটা ও বুঝতে পারে। চেষ্টার ত্রুটি নেই ওর, তবে চাষবাসের কাজ করার জন্য ও তৈরি হয়ে ওঠেনি, সেটাও ও ভালমতই বুঝতে পারে, যেমন আমি বুঝতে পারি। জ্বালানির কাঠ কাটতে গিয়ে নিজের পায়েই কোপ দিয়ে বসতে পারে। আলের ভেতর দিয়ে লাঙল সোজা রেখে টানতেও পারে না, এমনকি বিউও কাজটা ওর থেকে ভাল করতে পারবে। ও কী কী করতে পারে না, তার তালিকা বানাতে গেলে একটা মহাভারত হয়ে যাবে। কিন্তু এর জন্য ওকে দোষ দেওয়া যাবে না। এসব কাজ করবার জন্য ও বড় হয়নি। আর ওর কেবল মনে হচ্ছে একজন মহিলার বদান্যতায় টারায় মাথা গোঁজবার জায়গা পেয়েছে, প্রতিদানে তেমন কিছুই করতে পারছে না।”

“বদান্যতা? কথাটা কি কখনও – ”

“না, মুখে কিছু বলেনি। কিন্তু তুমি তো অ্যাশলেকে জান। আমি বুঝতে পারি। কাল রাতে, আমরা যখন তোমার বাপির কাছে বসেছিলাম, ওকে বললাম যে আমি স্যুয়েলেনকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছি, স্যুয়েলেনও রাজি হয়েছে। তখন অ্যাশলে বলল কথাটা শুনে ওর বুক থেকে একটা বোঝা নেমে গেল। টারাতে থাকতে ওদের একদম ভাল লাগছে না, তবুও মিস্টার ও’হারার মৃত্যুর পরে, মনে হয়েছিল, ওর আর মিস মেলিকে হয়ত থেকেই যেতে হবে, যাতে লোকজন আমাকে আর স্যুয়েলেনকে নিয়ে কুৎসা করতে না পারে। তারপর জানাল, ওরা টারা ছেড়ে যাবার কথা ভাবছে আর কিছু একটা কাজ জুটিয়ে নেওয়ার কথাও ভাবছে।”

“কাজ? কী ধরণের কাজ? কোথায়?”

“কী কাজ তো জানি না – তবে বলল ও উত্তরে যাওয়ার কথা ভাবছে। নিউ ইয়র্কে ওর একজন ইয়াঙ্কি বন্ধু আছে। ও নাকি ওখানে কোন ব্যাঙ্কে কাজ করে লিখেছে।”

“না, এ হতেই পারে না!” গভীর এক বেদনাবোধ থেকে স্কারলেট চেঁচিয়ে উঠল। উইল ঠিক আগের মত করেই ওর দিকে তাকাল।

“উত্তরে গেলে হয়ত সব দিক থেকে মঙ্গলই হবে।”

“না, আমার তা মনে হয় না।”

মনের ভেতর তীব্র আলোড়ন চলছিল ওর। অ্যাশলে উত্তরে চলে যেতে পারে না! তাহলে ওকে আর কখনও দেখতে পাবে না। কত মাস হয়ে গেল, অ্যাশলের সঙ্গে দেখা হয়নি। ফলের বাগানের সেই ঘটনার পরে কথাও আর হয়নি। তবুও একটা দিনও যায়নি, যেদিন ওর অ্যাশলের কথা মনে পড়েনি, ওরই ছাদের তলায় অ্যাশলের আশ্রয় পাওয়াতে ও খুশি হয়ে ওঠেনি। উইলকে প্রত্যেক ডলার পাঠানোর সময় আনন্দিত হয়ে ভেবেছে এর ফলে অ্যাশলের জীবনটা আরও একটু সহনশীল হয়ে উঠবে। চাষী হিসেবে অ্যাশলে আনাড়ি – সত্যি কথা। এর থেকে অনেক ভাল আর মহান কাজ করবার জন্যই অ্যাশলে প্রস্তুতি নিয়েছে – কথাটা ভেবে স্কারলেটের বুক গর্বে ফুলে উঠল। প্রভুত্ব করার জন্য অ্যাশলের জন্ম। বিশাল অট্টালিকায় থাকবে, তেজি ঘোড়ায় চড়বে, কবিতার বই পড়বে, কী কাজ করতে হবে সে নিয়ে নিগ্রোদের নির্দেশ দেবে। না হয় বড় অট্টালিকাটা নেই, ঘোড়া নেই, নিগ্রোরাও নেই – তার জন্য কি সবকিছু হেরফের হয়ে যাবে? চাষবাস আর জ্বালানি কাঠ টুকরো করার জন্যে তো অ্যাশলের জন্ম হয়নি! বোঝা গেছে, এই জন্যেই অ্যাশলে টারা ছেড়ে চলে যেতে চায়!

অ্যাশলেকে কিছুতেই জর্জিয়া ছেড়ে যেতে দিতে পারে না স্কারলেট। দরকার হলে ফ্র্যাঙ্কের ওপর জোর খাটিয়ে স্টোরে একটা চাকরি করে দিতে হবে। যে ছেলেটা এখন কাউন্টারে বসছে, তাকে না হয় বিদেয় করে দেবে ফ্র্যাঙ্ক। কিন্তু না, হল চষার কাজের মতই, কাউন্টারের পেছনে বসাটাও অ্যাশলের উপযুক্ত কাজ নয়! উইল্কস পরিবারের একজন কিনা দোকানদার! হতেই পারে না! অন্য কিছু ভাবতে হবে – আরে হ্যাঁ – ওর মিলই তো আছে! কথাটা মনে আসতেই একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে হাসল। প্রস্তাবটা ও স্বীকার করবে তো? এটাকেও কি বদান্যতা মনে করবে? কথাটা এমনভাবে তুলতে হবে যেন অ্যাশলে ভাবে কাজটা নিলে স্কারলেটের বিশাল উপকার হবে! মিস্টার জনসনকে ছাড়িয়ে দেবে আর সেই জায়গায় অ্যাশলে পুরোনো মিলের দায়িত্ব নিয়ে নেবে। নতুন মিলে হিউ যেমন আছে তেমনিই থাকুক। অ্যাশলেকে বোঝাতে হবে শারীরিক অসুস্থতা আর স্টোরে কাজের চাপের জন্য ফ্র্যাঙ্ক ওকে সাহায্য করতে পারেন না। নিজের বর্তমান শারীরিক অবস্থার কথাও আরেকটা কারণ হিসেবে দেখিয়ে বোঝাতে হবে স্কারলেটের ওর সাহায্যের কত দরকার।

অ্যাশলেকে বোঝাতেই হবে এই অবস্থায় ওর সাহায্য ছাড়া ও এক পাও এগোতে পারবে না। মিলের অর্ধেক মালিকানাও অ্যাশলেকে দিয়ে দেবে – অবশ্যই যদি নিতে রাজি থাকে – শুধু ওকে যাতে কাছাকাছি রাখতে পারে, ওর মুখে যাতে হাসি ফোটে, যাতে কোনও অসতর্ক মুহুর্তে ওর চোখের ভাষায় ভালবাসার আকুতি ধরা পড়ে। তবে নিজে থেকে কখনও অ্যাশলেকে দিয়ে ভালবাসার কথা বলানোর জন্য জোর করবে না, সেই ব্যাপারে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে ফেলল। এছাড়া ভুল করেও ওর অর্থহীন আত্মাভিমান – যার আসন অ্যাশলের কাছে প্রেমের চেয়েও ওপরে – সেটা ভেঙে ফেলবার চেষ্টা করবে না। তবে এই কঠোর প্রতিজ্ঞার কথা আকারে ইঙ্গিতে ওকে বুঝিয়ে দিতে হবে। কে জানে, বুঝতে না পারলে হয়ত ওর প্রস্তাব গ্রহণই করবে না, পাছে সেই আগের মতই অবাঞ্ছিত লজ্জাকর কোনও দৃশ্যের অবতারণা ঘটে।

“অ্যাটলান্টাতেই ওর জন্য আমি কাজের ব্যবস্থা করে দিতে পারব।”

“সে তোমার আর অ্যাশলের ব্যাপার,” কথাটা বলে উইল খড়ের টুকড়োটা আবার মুখে চালান করে দিল। “এবার গা ঝাড়া দিয়ে উঠে পড় তো, শেরম্যান! স্কারলেট, তোমার বাপির কথা বলার আগে, আরও একটা কথা বলতে চাই। তুমি স্যুয়েলেনের ওপর চড়াও হও, সেটা আমি চাই না। যেটা ও করে ফেলেছে, সেটা হয়েই গেছে। তুমি যদি ওর সব চুল টেনে ছিঁড়েও ফেল, মিস্টার ও’হারা আর ফিরে আসবেন না। তাছাড়া ও ভাল হবে মনে করেই কাজটা করেছিল।”

“কথাটা আমিও তোমাকে জিজ্ঞেস করব ভাবছিলাম। স্যুয়েলেনকে নিয়ে কী এমন ব্যাপার হয়েছে? হেঁয়ালি করে অ্যালেক্স কী সব বলে গেল – ওকে নাকি চাবুক মারা উচিৎ! কী করেছে ও?”

“সত্যি কথা, লোকজন বেদম ক্ষেপে আছে ওর ওপর। এই তো আজ বিকেলেই, জোন্সবোরোতে যাদের সঙ্গে দেখা হল, ওরা তো পেলে ওকে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলে আর কি! তবে হয়ত ধীরে ধীরে ওদের রাগ পড়ে যাবে। নাও এখন কথা দাও, তুমি ওর ওপর হামলে পড়বে না। উঠোনে মিস্টার ও’হারা শুয়ে আছেন, আমি চাই না এই সময় কোনও ঝগড়াঝাঁটি হোক।”

“আচ্ছা! ও চায় না কোনও ঝগড়াঝাঁটি হোক!” স্কারলেট ক্রুদ্ধ মনে ভাবল। “এমনভাবে কথা বলছে যেন টারা এখন ওরই হয়ে গেছে!”

পরমুহুর্তেই জেরাল্ডের কথা মনে পড়ল, নিথর হয়ে উঠোনে শুয়ে আছেন। স্কারলেট কাঁদতে শুরু করল, বুকভাঙা কান্নায় ভেঙে পড়ল। উইল স্কারলেটকে বাহুর মধ্যে টেনে নিল, সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টায়, কিন্তু কোনও কথা বলল না।

উইলের কাঁধে স্কারলেটের মাথা রাখা, বনেটটা তেরছাভাবে ঝুলে পড়েছে, অন্ধকার নেমে আসা রাস্তা দিয়ে হোঁচট খেতে খেতে ওরা ধীরে ধীরে এগোতে লাগল। জেরাল্ডের গত দুটো বছরের রূপটা স্কারলেট ভুলেই গেছে – বৃদ্ধ অন্যমনস্ক এক ভদ্রলোক দরজার পানে এক ভদ্রমহিলার প্রতীক্ষায় সতৃষ্ণ নয়নে চেয়ে আছেন – যিনি আর কখনওই ওই দরজা দিয়ে প্রবেশ করবেন না। মনে পড়ে যাচ্ছে জেরাল্ডের সেই প্রাণচঞ্চল, পুরুষোচিত রূপটা – এক মাথা শুভ্র কেশ, আনন্দের আতিশয্যে বেসামাল, মুহুর্মুহু পায়ের আস্ফালনে মাটি কাঁপিয়ে দিচ্ছেন, উদ্ভট সব চুটকি বলে লোকজনকে হাসানোর চেষ্টা। ওঁর উদার স্বভাবের কথা। বাপি ছিলেন ওর শিশুর চোখ দিয়ে দেখা সব চেয়ে আশ্চর্যজনক মানুষ। তর্জনগর্জন করতে করতে ঘোড়ায় নিজের সামনে বসিয়ে বেড়া ডিঙোতেন। দুষ্টুমি করলে রেগে গিয়ে বকুনি লাগাতেন। কেঁদে ফেললে উনিও কেঁদে ফেলতেন। কয়েকটা টাকা হাতে দিয়ে শান্ত করবার চেষ্টা করতেন। মনে পড়ে চার্লসটন কিংবা অ্যাটলান্টা থেকে ফেরার পথে কত কত উপহার নিয়ে ফিরতেন, যার একটাও ওর পছন্দ হত না। আদালতে এত্তলা দেওয়ার দিনগুলোতে জোন্সবোরো থেকে রাত শেষ হওয়ার আগেই বাড়ি ফিরতেন – একেবারে মাতাল হয়ে – আর হেঁড়ে গলায় “The Wearin’ o’ the Green” গাইতে গাইতে। কথাটা মনে পড়ে কষ্টের মধ্যেও হেসে ফেলল। আর ভোরবেলা এলেনের মুখোমুখি হওয়ার সময় কী লজ্জাই না পেতেন! আর এখন তো উনি এলেনের কাছেই চলে গেছেন।

“বাপির শরীর যে ভাল নেই, আমাকে জানাওনি কেন? তাহলে আমি তাড়াতাড়ি চলে – ”

“উনি অসুস্থ ছিলেন না – এক মুহুর্তের জন্যেও অসুস্থ ছিলেন না। আমার রুমালটা নাও, লক্ষ্মীটি। সব বলছি তোমাকে।”

উইলের রুমালটা নিয়ে স্কারলেট নাক ঝাড়ল। অ্যাটলান্টা থেকে আসার সময় একটা রুমাল পর্যন্ত সঙ্গে আনেনি। তারপর উইলের বাহুতে ঠেস দিয়ে বসল। উইল, সত্যিই কী ভাল, কোনও কিছুতেই বিচলিত হয়ে পড়ে না।

“ব্যাপারটা এই রকম, স্কারলেট। তুমি আমাদের সময়ে সময়ে টাকা পাঠিয়ে যেতে। অ্যাশলে আর আমি ট্যাক্সের টাকা মিটিয়ে দিতাম। সেই টাকায় আমরা খচ্চর কিনেছি, বীজ কিনেছি, আরও যা যা লাগে, এমনকি কয়েকটা শুয়োর আর মুরগিও কিনেছি। মিস মেলি ওই মুরগিগুলোর দেখভাল করতেন, খুব ভাল করেই করতেন। উনি নমস্য মহিলা। এর পর টাকা খুব একটা বাঁচত না। তাই অদরকারী শখের কোনও জিনিস কেনার কথা ভাবতেই পারিনি। এটা নিয়ে কারোর মনেই কোনও অভিযোগ ছিল না। একমাত্র স্যুয়েলেন ছাড়া।

“মিস মেলানি আর মিস ক্যারীন বাড়িতেই থাকতেন। ওঁদের পুরোনো পোশাকই পরতেন, বেশ গর্বের সঙ্গেই পরতেন। স্যুয়েলেনকে তো আপনি জানেনই। মুখ বুজে এসব মেনে নেওয়ার মেয়েই নয়। যতবারই ওকে নিয়ে ফেয়্যাটভিল বা জোন্সবোরো যেতাম, সেই একই পুরোনো পোশাক পরে যেতে ওর সম্মানে বাধত। বিশেষ করে যখন দেখতে পেত কার্পেটব্যাগারদের বউরা – মেয়েরা কেতাদুরস্ত পোশাক সবাইকে দেখিয়ে দেখিয়ে পরে। নচ্ছার ইয়াঙ্কিগুলো – যারা ওই ফ্রীডমেন’স ব্যুরো চালায় – ওদের বউরা সেজেগুজে থাকে! কাউন্টির লেডিরা কিন্তু পুরোনো হয়ে যাওয়া খারাপ দেখতে পোশাকে শহরে যাওয়াটা সম্মানের কাজ মনে করে থাকে – এটাই বোঝাতে যে ওদের কিছু এসে যায় না আর এটা ওদের কাছে গর্বের ব্যাপার। কিন্তু স্যুয়েলেন এটা মেনে নিতে রাজি নয়। ওর চাই একটা ঘোড়া আর সওয়ারি গাড়ি। বলে তোমারও তো নাকি আছে একটা!”

“সওয়ারি গাড়ি নয়, পুরোনো বগিগাড়ি একটা,” স্কারলেট মেজাজ দেখাল।

“ঠিক আছে, বগিগাড়িই ধরে নিলাম। আরেকটা কথাও আমার বলার আছে। তোমার ফ্র্যাঙ্ক কেনেডিকে বিয়ে করে ফেলাটা স্যুয়েলেন সহ্য করতে পারেনি। জানিনা ওকে দোষ দেওয়া যায় কিনা এর জন্য। নিজের বোনের সঙ্গে কেউ এমন জঘন্য চাল চালে না।”

স্কারলেট ওর কাঁধ থেকে মাথা সরিয়ে নিল। সাপের মত ফোঁস করে উঠল, যেন এখুনি ছোবল মারবে।

“কী বললে? জঘন্য চাল? মুখটা একটু সামলে কথা বললে বাধিত হব, উইল বেন্টীন! ফ্র্যাঙ্কের যদি ওর থেকে আমাকে বেশি পছন্দ হয়, আমার কী করার থাকে?”

“তুমি খুব সেয়ানা মেয়ে, স্কারলেট। আর আমার কি মনে হয় জানো, ওঁর তোমাকে পছন্দ করে ফেলার ব্যাপারে আর কিছু না হলেও তোমারও একটূ হাত আছে। মেয়েরাই পারে এটা করতে। তবে আমার ধারণা তুমি ওঁকে জাদু করে বশ করেছ। জেদ ধরলে তুমি সব কিছুই দখল করে ফেলতে পার। তবুও উনি ছিলেন স্যুয়েলেনের প্রেমিক। এই তো, তোমার অ্যাটলান্টা যাওয়ার এক সপ্তাহ আগেও স্যুয়েলেন ওঁর একটা চিঠি পেয়েছিল। কত মিষ্টি মিষ্টি কথা লিখেছিলেন। আরও একটু টাকা জমিয়েই ওঁরা যে বিয়ে করে ফেলবেন, সে কথাও ছিল। আমি জানি, কারণ স্যুয়েলেন চিঠিটা আমায় দেখিয়েছে।”

স্কারলেট কোনও কথা বলল না। ও জানে উইল একেবারে সত্যি কথাটাই বলছে। বলার মত কিছু খুঁজে পেল না। ভাবতেই পারেনি, এত লোক থাকতে, শেষমেশ উইলই ওর বিচার করতে বসবে। তাছাড়া ফ্র্যাঙ্ককে যে মিথ্যে কথাটা বলেছিল, তার জন্য ওর মোটেও বিবেকদংশন হয়নি। কোনও মেয়ে যদি তার প্রেমিককে আগলে রাখতে না পারে, তাহলে তাকে ওর হারানোই উচিৎ।

“দেখ উইল, উল্টোপাল্টা কথা বোলো না,” অবশেষে মুখে কথা ফুটল। “ধর স্যুয়েলেন ফ্র্যাঙ্ককে বিয়ে করল – টারা বা আমাদের জন্য এক পয়সাও ঠেকাত?”

“আমি শুধু বলেছি, জেদ ধরলে তুমি সব কিছুর দখল নিতে পার,” ঘাড় ঘুরিয়ে শান্ত হেসে উইল বলল। “আমারও মনে হয় না বুড়ো ফ্র্যাঙ্কের একটা পয়সাও তাহলে আমরা দেখতে পেতাম। তবে তাতে সব কিছু বদলে যায় না। এখনও বলব, চালটা জঘন্যই ছিল। লক্ষ্যলাভের জন্য তুমি যদি চালটাকে সঠিক বলতে চাও, সে তোমার ব্যাপার। আমি রাগ করার কে? তবে জানিয়ে রাখলাম, সেদিন থেকে স্যুয়েলেন রোঁয়া ফুলিয়ে আছে। বুড়ো ফ্র্যাঙ্কের প্রেমে যে খুব হাবুডুবু খাচ্ছিল, সে আমার মনে হয় না, তবে আঁতে লেগেছে খুব। সারাক্ষণ ঘ্যানঘ্যান করে, তুমি নাকি ওকে এখানে বন্দী করে ফেলে রেখে নিজে অ্যাটলান্টায় থাকছ, আর ভাল ভাল ড্রেস পরে ঘোড়ার গাড়ি চেপে ফুর্তি করে বেড়াচ্ছ। তুমি তো জানোই, ও পার্টিতে যেতে ভালবাসে, ভাল ভাল ড্রেস পরতে ভালবাসে। তাই ওকে দোষ দিতে পারি না। মেয়েরা এরকমই হয়।”

“যাই হোক, মাসখানেক আগে ওকে জোন্সবোরো নিয়ে গেলাম। সকলের সঙ্গে দেখাসাক্ষাত করার জন্য ওকে ছেড়ে দিয়ে, আমি আমার কাজগুলো করবার জন্য চলে গেলাম। ওকে নিয়ে যখন বাড়ি ফিরলাম, তখন ওর ভাবভঙ্গিতে আড়ষ্টতা। তবে ওর চোখমুখ দেখে বুঝলাম কোনও একটা ব্যাপারে ও খুব উত্তেজিত, আর যে কোনও মুহুর্তেই ফেটে পড়তে পারে। ভাবলাম হয়ত কারোর সঙ্গে দেখা হয়েছে যার শিগগিরই – মানে হয়ত জবর কোনও গুজব শুনে এসেছে – আমি আর অত মাথা ঘামাইনি। তারপর এক সপ্তাহ ধরে ঘরের মধ্যে ছটফট করে বেড়াল, কী এক উত্তেজনায় যেন ফেটে পড়ছে, মুখে কথাবার্তাও বেশি নেই। মিস ক্যাথলিন ক্যালভার্টের সঙ্গে দেখা করতে গেল – স্কারলেট, মিস ক্যাথলিনকে দেখলে তুমি কেঁদে কুল পাবে না। বেচারা! ওই নীচ ইয়াঙ্কি হিল্টনটাকে বিয়ে করার থেকে ওর মরে যাওয়াই বোধহয় ভাল ছিল। তুমি কি জানো, ওই লোকটা ওদের বাড়িটা বন্ধক দিয়ে আর উদ্ধার করতে পারেনি? বাড়ি ছেড়ে ওদের চলে যেতে হবে।”

“না, আমি জানি না, জানতে চাইও না। আমি বাপির কথা জানতে চাই।”

“আসছি সে কথায়,” উইল শান্তভাবে বলল। “ফিরে যখন এল, তখন ও বলল আমরা সবাই নাকি হিল্টনকে ভুল বুঝেছি।

“ওকে মিস্টার হিল্টন বলে উল্লেখ করল, আর বলল ও নাকি খুবই চালাকচতুর লোক। কথাটা শুনে আমরা খুব হাসলাম। তারপর থেকে তোমার বাপিকে বিকেলের দিকে হাঁটাতে নিয়ে যেতে শুরু করল। মাঠ থেকে ফেরার সময়, অনেকদিনই লক্ষ্য করেছি, তোমার বাপিকে নিয়ে কবরখানার পাঁচিলের কাছে বসে আছে, হাত পা নেড়ে কী সব বোঝানোর চেষ্টা করছে। বুড়োমানুষটা ওর দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন আর মাথা ঝাঁকাচ্ছেন। ওঁর অবস্থাটা কেমন হয়ে গেছিল সেটা তো তুমি জানোই, স্কারলেট। দিনে দিনে আরও অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছিলেন। উনি কোথায় আছেন, আমরাই বা কারা – সেসব উনি বুঝতেই পারতেন না। একদিন দেখি তোমার মায়ের সমাধির দিকে আঙ্গুল দিয়ে ও কিছু দেখাল, আর বুড়োমানুষটা কেঁদে ফেললেন। যখন বাড়ি ফিরল, খুশি আর উত্তেজনায় ডগমগ করতে করতে, আমি ওকে দু’চারটে কথা শুনিয়ে দিলাম – বেশ কড়া ভাষায়। বললাম, ‘মিস স্যুয়েলেন মায়ের কথা টেনে এনে আপনার বাপির মনে দুঃখ দিচ্ছেন কেন? অনেক সময় উনি তো বুঝতেই পারেন না যে আপনার মা আর বেঁচে নেই, আর আপনি কিনা ওঁর কষ্টটা বাড়িয়ে দিতে চাইছেন!’ শুনে ও মাথা ঝাঁকিয়ে হাসল। বলল, ‘তুমি নিজের চরকায় তেল দাও। একদিন না একদিন আমি যা করছি তার জন্য তোমরা খুশিই হবে।’ গতকাল রাতে মিস মেলানি আমাকে বললেন যে স্যুয়েলেন ওঁকে কী করতে চাইছে সেটা বলেছিল। তবে ও যে সত্যিই সেটা করতে চলেছে সেটা বিশ্বাসই করতে পারেননি। আমাদেরও কিছু জানাননি, কারণ ওর মতলবটা শুনে উনি নিজেই খুব বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন।”

“মতলবটা কী? আসল কথাটা খুলে বলবে কি? বাড়ির কাছাকাছি তো এসে গেছি। বাপির সম্বন্ধে আমি জানতে চাই।”

“বলার চেষ্টাই করছি,” উইল বলল। “বাড়ির এত কাছে পৌঁছে গেছি। এখানে দাঁড়িয়ে কথাটা শেষ করে নেওয়াই বোধহয় ভাল হবে।”

লাগাম টেনে ধরে ঘোড়াটা থামাল, তার ঘোঁত করে নাক দিয়ে শব্দ করল। কমলা রঙের হেজ – অযত্নে যেটা এখন ঝোপে পরিণত হয়েছে – সেই ম্যাকিন্টশদের সম্পত্তির সীমানায় ওরা দাঁড়াল। গাছপালার অন্ধকারের ফাঁক দিয়ে স্কারলেট চিমনিগুলোকে আবছাভাবে দেখতে পেল, ধ্বংসস্তুপের মাঝখানে এখনও ভূতের মত মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। মনে হল উইল থামবার জন্য অন্য কোনও জায়গা বেছে নিলে ভাল করত।

“মোদ্দা কথা হল, ইয়াঙ্কিরা যে সব তুলো জ্বালিয়ে দিয়েছে আর মালপত্র লুটপাট করে নিয়ে পালিয়েছে, আর যে সব বেড়া আর গোলাঘর ভেঙে দিয়েছে, স্যুয়েলেনের মতলব হল ওদের কাছ থেকে তার জন্য ক্ষতিপূরণ আদায় করা!”

“ইয়াঙ্কি?”

“শোননি তুমি? ইউনিয়নের প্রতি সহানুভূতিশীল যাদের সম্পত্তি ধ্বংস হয়েছে, আবেদন করলে ইয়াঙ্কি সরকার তাদের ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে।”

“নিশ্চয়ই শুনেছি,” বলল স্কারলেট। “কিন্তু তার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কী?”

“অনেক কিছু – স্যুয়েলেনের মতে। জোন্সবোরো যেদিন নিয়ে গেলাম – মিসেজ় ম্যাকিন্টশের সঙ্গে ওর দেখা হয়ে গেল। কথাবার্তার ফাঁকে ফাঁকে মিসেজ় ম্যাকিন্টশের পরে থাকা দামী কাপড়ের ড্রেসটার দিকে ওর নজর পড়ল। পোশাকটার ব্যাপারে জিজ্ঞেস না করে ও থাকতে পারেনি। মিসেজ় ম্যাকিন্টশও ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে আষাঢ়ে গল্প ফেঁদে বসলেন। ওঁর স্বামী নাকি ফেডারাল গভর্নমেন্টের কাছে ক্ষতিপূরণের দাবী পেশ করেছিলেন। ওঁরা ইউনিয়নের বশংবদ সমর্থক। কনফেডারেটদের কোনওদিনই সাহায্য বা আশ্রয় দেননি। তা সত্ত্বেও ওঁদের সম্পত্তি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল।”

“সাহায্য করা বা আশ্রয় দেওয়া – একজন লোককেও – ওঁদের ধাতে ছিল না!” স্কারলেট ফট করে বলে উঠল। “স্কচ-আইরিশ১!”

“হতে পারে কথাটা সত্যি। আমি ওঁদের চিনিনা। যাই হোক, সরকার ওদের ভালই টাকাপয়সা দিয়েছে – কত হাজার ডলার সে ভুলে গেছি। তবে ভাল টাকাই পেয়েছে। কথাটা স্যুয়েলেনের মনে লাগল। অনেক চিন্তাভাবনা করল এক সপ্তাহ ধরে। আমাদের কিছুই বলেনি – জানত আমরা হেসে উড়িয়ে দেব। কিন্তু কাউকে তো বলতে হবে। তাই মিস ক্যাথলিন আর ওই সাদা খচ্চর হিল্টনের কাছে গেল। হিল্টন ওর মাথায় নানারকম মতলব ঢুকিয়ে দিল। বোঝালো যে তোমাদের বাপির জন্ম তো এই দেশে হয়ইনি। নিজেও লড়াইতে যাননি আর পুত্রসন্ত্রানও ছিল না যে লড়াইতে যেতে পারত। কনফেডারেসির কোনও দফতরের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন না। মিস্টার ও’হারাকে ইউনিয়নের প্রতি সহানুভূতিশীল প্রমাণ করতে কোনও সমস্যাই হবে না। এমন সব আজগুবি কথা ওর মাথায় ঢুকিয়ে দিল যে বাড়ি ফিরে এসেই আদা জল খেয়ে মিস্টার ও’হারাকে রাজি করানোর তোড়জোড় আরম্ভ করে দিল। স্কারলেট, আমি জোর দিয়ে বলতে পারি, তোমার বাপি ও কি নিয়ে কথা বলছে, অর্ধেক সময় সেটাও বোঝেননি। আর ও এটারই সুযোগ নিয়ে ওঁকে দিয়ে লৌহাবরণ শপথ নেওয়ানোর চেষ্টা করছিল। ওঁর অজান্তেই।”

“বাপিকে দিয়ে লৌহাবরণ শপথ নেওয়ানো!” স্কারলেট চেঁচিয়ে উঠল।

“দেখ, গত কয়েকমাস ধরে ওঁর স্মৃতিশক্তি খুবই ক্ষীণ হয়ে পড়েছিল। আমার ধারণা, স্যুয়েলেন এটারই সুযোগ নিতে চাইছিল। আমরা ঘুণাক্ষরেও এরকম কিছু সন্দেহ করিনি। কিছু একটা মতলব যে ভাঁজছে সেটা আন্দাজ করেছিলাম, কিন্তু এটা বুঝতে পারিনি যে ও আসলে মেয়েদের ভিখিরির মত অবস্থা হওয়ার জন্য তোমাদের মৃতা মা’কে দিয়ে বাপিকে তিরস্কার করানোর চাল চেলেছে – যখন কিনা ইয়াঙ্কিদের কাছ থেকে সহজেই এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজার ডলার ক্ষতিপূরণ আদায় করা যেতে পারে!”

“এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজার ডলার,” স্কারলেট নিজের মনে বিড়বিড় করে উঠল। শপথ নেওয়ার ব্যাপারে ওর রাগ ধীরে ধীরে কেটে যেতে লাগল।

বাপ রে! সে তো অনেক টাকা! কেবল ইউনাইটেড স্টেটস সরকারের কাছে আনুগত্যের শপথ নিলেই মিলবে! কী বলতে হবে না স্বাক্ষরকারী সর্বদা সরকারের প্রতি সহানুভুতিশীল থেকেছে আর শত্রুদের সাহায্য বা আশ্রয় দেয়নি। এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজার ডলার! ওই ছোট্ট মিথ্যে বলার জন্য এত টাকা! নাহ্‌, স্যুয়েলেনকে দোষ দেওয়া যায় না! হে ভগবান! ওকে চাবুক মারার কথা বলতে গিয়ে অ্যালেক্সের মনে এই ব্যাপারটাই ছিল? আর কাউন্টির ওকে আস্ত না রাখার ব্যাপারটাই বা কী? কী বুদ্ধু এরা - সক্কলেই! অতগুলো টাকা পেলে কী অসম্ভবই না সম্ভব করে ফেলা যায়! কাউন্টির যে কেউ পারে! আর একটা ছোট্ট মিথ্যে বলায় কী এসে যায়? ইয়াঙ্কিদের কাছ থেকে যদি এক ডলারও আদায় করা যায় সেটা ন্যায্য প্রাপ্তিই, কী করে পেলে তাতে কিচ্ছু যায় আসে না।

“গতকালের কথা, দুপুর দুপুর তখন, অ্যাশলে আর আমি কাঠ টুকরো করছি, স্যুয়েলেন ওয়াগনটা বের করল, তারপর তোমার বাপিকে নিয়ে শহরের উদ্দেশ্যে রওনা দিল, কাউকে কিছু না বলেই। ব্যাপারটা কী হতে পারে তা নিয়ে মিস মেলির একটা আবছা ধারণা ছিল। উনি মনে মনে প্রার্থনা করতে লাগলেন হয়ত শেষ মুহুর্তে স্যুয়েলেন মত পালটে ফেলবে। কিন্তু আমাদের কিছু জানালেন না। আসলে স্যুয়েলেন যে এমন কোনও কাজ করতে পারে সেটা উনি ভাবতেই পারেননি।

“কী ঘটেছে সেটা আজ জানতে পারলাম। ওই খচ্চর হিল্টনটা – শহরের স্ক্যালাওয়াগ আর রিপাবলিকানদের সঙ্গে ওর কিছু দহরম মহরম আছে – স্যুয়েলেন ওদের কিছু ঘুষ দিতে রাজি হয়েছিল – কত টাকা জানা নেই – যদি মিস্টার ও’হারাকে ইউনিয়নের অনুগত বলে মেনে নিতে ওরা আপত্তি না করে আর একজন আইরিশম্যান হওয়া সত্ত্বেও লড়াইতে ভাগ নেননি এই কথাটা তুলে ধরে ওঁর নাম সুপারিশ করে দেয়। তোমার বাপিকে শুধু ওই শপথ বাক্য পাঠ করতে হবে আর ওয়াশিংটনে যে কাগজপত্র পাঠানো হবে সেগুলোতে সই করতে হবে।

“শপথ বাক্যটা ওরা গড়গড় করে খুব তাড়াতাড়ি পড়ে গেল, উনি কোনও কথা বললেন না – ভালমতই এগোচ্ছিল ব্যাপারটা – তারপর ওঁর সই করার পালা। আর তখনই বাধল গোল। বৃদ্ধ ভদ্রলোক ঠিক তখনই এক মিনিটের জন্য নিজের মধ্যে ফিরে এলেন, তারপর মাথা ঝাঁকালেন। ওতে ঠিক কী লেখা আছে, সেটা উনি আন্দাজ করতে পেরেছিলেন কিনা সে ব্যাপারে আমার সন্দেহ আছে, কিন্তু ব্যাপারটা ওঁর ঠিক পছন্দ হয়নি, আর স্যুয়েলেনের নাছোড়বান্দা ভাবটাও মেনে নিতে পারেননি। স্যুয়েলেনের এতদিনের পরিশ্রম বিফলে যেতে বসায়, ওর আর মাথার ঠিক থাকল না। অফিস থেকে বেরিয়ে রাস্তার এদিক থেকে ওদিকে এলোমেলো গাড়ি চালাতে চালাতে ওঁকে বোঝাতে লাগল যে উনি মেয়েদের এত কষ্ট করতে দেখেও কিছু করছেন না, এর জন্য মা কবর থেকেই কান্নাকাটি করছেন। শুনতে পেলাম উনি নাকি ওয়াগনে বসে শিশুর মত কেঁদে ফেললেন – এলেনের নাম শুনলেই উনি যেমন কেঁদে ফেলেন। পুরো শহরে কান্নার ব্যাপারটা রাষ্ট্র হয়ে গেল। অ্যালেক্স ফোনটেন কারণটা জানতে ছুটে এল। স্যুয়েলেন ওকে যা নয় তাই বলে গালি দিল আর বলল নিজের চরকায় তেল দিতে। অ্যালেক্স রেগেমেগে চলে গেল।

“জানি না কী ভাবে মতলবটা ওর মাথায় এল, কিন্তু বিকেলে স্যুয়েলেন এক বোতল ব্র্যান্ডি জোগাড় করে মিস্টার ও’হারাকে নিয়ে অফিসঘরে গিয়ে বসল। তারপর গেলাসের পর গেলাস ওঁকে ঢেলে দিতে লাগল। কী বলব স্কারলেট, প্রায় এক বছর হতে চলল, টারাতে আমাদের কাছে কোনও রকম মদ জাতীয় পানীয় ছিলই না – এই একটু ব্ল্যাকবেরি ওয়াইন আর স্কাপারনঙ ওয়াইন – ডিলসি যা বানায় সেটা ছাড়া। মিস্টার ও’হারার অভ্যেস ছিল না। ফলে কিছুক্ষণের মধ্যেই ওঁর প্রচণ্ড নেশা হয়ে গেল। ঘন্টা দুয়েক ধরে কানের কাছে স্যুয়েলেনের ঘ্যানর ঘ্যানর শুনে শেষে বললেন ও যাতে যাতে বলবে উনি সই করে দেবেন। আবার শপথের কাগজটা বের করে ওঁর সামনে রাখা হল। সই করবার জন্য উনি কলম তুলে নিয়েছিলেন। আর ঠিক তখনই স্যুয়েলেন ভুলটা করে বসল। বলল, ‘আশা করি এখন থেকে স্ল্যাটেরি আর ম্যাকিন্টশরা আর আমাদের সামনে চাল মারতে পারবে না!’ আসলে স্কারলেট, ওদের ছোট ছোট খুপরিবাড়িগুলো ইয়াঙ্কিদের জ্বালিয়ে দেওয়ার জন্য ওয়াশিংটন থেকে এমির বরের মারফৎ বিশাল অঙ্কের ক্ষতিপূরণ আদায় করে নিয়েছে।

“ওদের কাছে শুনলাম যে স্যুয়েলেন যেই ওই নামগুলো নিয়েছে, তোমার বাপি কাঁধ ঝাঁকিয়ে সিধে হয়ে বসলেন, তারপর ওর দিকে কটমট করে চাইলেন। তখন আর একটুও অন্যমনস্ক নন, বললেন, ‘স্ল্যাটারি আর ম্যাকিন্টশরা এই রকম কিছু একটা দস্তখৎ করেছে?’ স্যুয়েলেন খুব ঘাবড়ে গিয়ে হ্যাঁ না করে তোতলাতে লাগল। তখন উনি বাজখাঁই গলায় চেঁচিয়ে বললেন, ‘আমাকে বল তোমরা, ওই শয়তান অরেঞ্জম্যানটা২ আর ওই বদমাশ ভিখিরিটা এই রকম একটা কাগজে সই করেছে? তখন ওই হিল্টন ব্যাটা খুব মোলায়েম স্বরে বলল, ‘হ্যাঁ স্যর, ওরা সই করেছিল আর অনেক টাকা পেয়েছিল, যেমন আপনিও পেতে চলেছেন।’

“আর তারপরেই বুড়ো ভদ্রলোক ষাঁড়ের মত হুঙ্কার ছাড়লেন। অ্যালেক্স ফোনটেন বলেছে ও নাকি রাস্তার মোড়ের পানশালা থেকে ওঁর হুঙ্কার শুনতে পেয়েছিল। কেটে কেটে বলেছিলেন, ‘ভেবেছ কী তোমরা? ওই শয়তান অরেঞ্জম্যান আর ওই ভিখিরি সাদা লোকটা – ওরা যে নোংরা পথে হেঁটেছে, আমিও সেই পথ ধরে হাটব?’ তারপর কাগজটা দু’টুকরো করে স্যুয়েলেনের মুখের ওপর ছুঁড়ে দিয়ে গলা ফাটিয়ে ‘আজ থেকে তুই আমার মেয়ে নোস!’ বলেই কাউকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই ঝড়ের বেগে অফিস থেকে বেরিয়ে গেলেন।

“অ্যালেক্স বলল যে উনি রাস্তা দিয়ে বুনো ষাঁড়ের মত তাড়া করে দৌড়চ্ছিলেন। বলল যে বুড়ো ভদ্রলোককে তোমার মা মারা যাবার পর এই প্রথম নিজমূর্তিতে ফিরে আসতে দেখল। প্রচণ্ড নেশাগ্রস্তের মত গলা ফাটিয়ে গালিগালাজ করতে করতে ছুটছিলেন। অ্যালেক্স বলল, এমন বাছা বাছা গালি নাকি আগে কখনও শোনেনি। রাস্তায় অ্যালেক্সের ঘোড়া দাঁড় করানো ছিল। কাউকে কিছু জিজ্ঞেস না করেই উনি সেই ঘোড়ায় চড়ে প্রত্যেক নিঃশ্বাসে গালি দিতে দিতে ঘোড়া ছুটিয়ে দিলেন, এত জোরে যে ধুলোর ঝড়ে তোমার দম বন্ধ হয়ে আসবে।

“যাই হোক সন্ধ্যে হওয়ার মুখে অ্যাশলে আর আমি দাওয়ায় বসে রাস্তার দিকে তাকিয়ে খুব দুশ্চিন্তা করছি। মিস মেলি ওপরে নিজের ঘরে বিছানায় শুয়ে কেঁদেই যাচ্ছেন। আমাদের কোনও কথার জবাব দিচ্ছেন না। ঠিক এমন সময়, রাস্তার থেকে দুপদাপ শব্দ ভেসে এল আর কারও উল্লাসের আওয়াজ – ঠিক শেয়াল শিকার করে কেউ যখন ফেরে, তেমনই। অ্যাশলে বলল, “কী অদ্ভুত! মিস্টার ও’হারার গলা মনে হচ্ছে! যুদ্ধের আগে, ঠিক এমন ভাবেই উনি আমাদের সঙ্গে দেখা করতে আসতেন!’

“তারপর আমরা ওঁকে দেখতে পেলাম। অনেক দূরে যেখানে ঘাসজমির সীমানা শেষ হয়েছে, সেখানে। ওখানে উনি নিশ্চয়ই বেড়া ডিঙিয়ে ছিলেন। টিলার ওপর দিয়ে পাগলের মত ঘোড়া ছুটিয়ে আসছেন। গলা ফাটিয়ে গান গাইতে গাইতে, যেন দুনিয়ার কোনো কিছুকেই উনি পরোয়া করেন না। তোমার বাপির যে অত গলার জোর আমি জানতামই না। ‘পেগ ইন অ্যা লো-ব্যাকড কার’ গানটা গাইতে গাইতে আর টুপি দিয়ে পাগলের মত ঘোড়াকে গুঁতো মারতে মারতে আসছেন। টিলার একেবারে ওপরে পৌঁছেও লাগামের রাশ টেনে ধরলেন না। মনে হল ঘাসজমির বেড়ার ওপর দিয়ে ঝাঁপ লাগাবেন। প্রচণ্ড ভয়ে আর উত্তেজনায় আমরা লাফিয়ে উঠলাম। উনি বললেন, ‘দেখ এলেন!’ আমি এটা কেমন টপকে যাই!” ঘোড়াটা কিন্তু বিপদের আঁচ পেয়ে থেমে গেল, ঝাঁপটা লাগাবে না! কিন্তু তোমার বাপি ধাক্কা সামলাতে না পেরে ছিটকে পড়ে গেলেন, ঠিক মাথার ওপর। কষ্ট পাননি। আমরা গিয়ে দেখি উনি আর বেঁচে নেই। মনে হয় ঘাড়টা ভেঙে গেছিল।”

উইল স্কারলেটের মুখ থেকে কিছু শোনবার জন্য এক মিনিট অপেক্ষা করল। যখন ও কিছু বলল না, তখন লাগাম তুলে নিয়ে বলল, “উঠে পড়, শেরম্যান”, তারপর বাড়ির উদ্দেশ্যে চলা শুরু করল।


টীকা:

১ স্কচ-আইরিশ – অষ্টাদশ এবং উনিবিংশ শতাব্দীতে আমেরিকায় চলে আসা উলস্টার স্কটদের বংশধর। স্কচরা কৃপণস্বভাবের জন্য বিখ্যাত।

২ অরেঞ্জম্যান – ১৭৯৫ সালে আয়ার্ল্যান্ডের উত্তরদিকে প্রতিষ্ঠিত একটা গোপন সমিতি (সিক্রেট সোসাইটি) যারা ব্রিটিশ শাসন আর প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মকে রক্ষা করতে সচেষ্ট হয়েছিল। অর্থাৎ আয়ার্ল্যান্ডের ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতার বিপক্ষে ছিল।



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ