১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বাংলাদেশের ইতিহাসে কালরাত্রি হিসেবে খ্যাত। পাকিস্তানী বাহিনী অপারেশন সাচলাইট নামে চালিয়েছিল বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ। শুধুমাত্র ঢাকা শহরেই সেদিন পাকিস্তানী বাহিনী ১০লক্ষ বাঙালিকে হত্যা করেছিল। জগন্নাথ হল শুধু নয়, সে রাতে আক্রান্ত হয়েছিল ইকবাল হল, এস এম হল, ফুলার রোডের শিক্ষক আবাসন, পলাশী ও নীলক্ষেতের বস্তিগুলো। রাজবাগ পুলিশ লাইন ইত্যাদি। জগন্নাথ হল হত্যাযজ্ঞ তারই একটি অংশ।
আবুল ফজলের বয়ানে সেই ভয়াল রাতের সাক্ষ্য
জগন্নাথ হল হত্যাযজ্ঞ
আমার বয়স তখন ২৩ বছর। পাকিস্তান ডাক বিভাগে চাকরী করি, সিলেট থাকি। ঢাকায় গিয়েছিলাম একটা উচ্চতর প্রশিক্ষনে। ১ লা মার্চ থেকে জগন্নাথ হলে আমার বন্ধুদের সাথে থাকা শুরু করি। জেনারেল সিআর দত্ত’র ভাগ্নে শিশুতোষ আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আমাদের আরেক বন্ধু মুশতাক ও তার সাথে একই হলে থাকত।
২৫ মার্চে আমরা তিন বন্ধু এক সাথে রাত ৮টার দিকে হলে ফিরি। আমরা থাকতাম মেইন বিল্ডিংয়ের পাশে টিনের এক্সটেনশনে। পাকিস্তান আর্মি প্রথমে মেইন বিল্ডিং এর জানালা লক্ষ্য করে মর্টার শেল ছুঁড়ে। এরপর গুলীর শব্দ। তখন বুঝি- উই আর বিয়িং এটাকড।
জগন্নাথ হলের আগে- দে এনটার্ড টু দ্যা বিল্ডিং অফ প্রফেসর গুহ ঠাকুরতা। ঐ বিল্ডিংয়ে প্রথমে ঢুকেছে, বিল্ডিংয়ের তালা গুলী করে উড়িয়ে দিয়েছে। আমি একটু সাহসী ছিলাম, ক্রল করে করে এগিয়ে গিয়ে জানালা দিয়ে দেখেছি। হলের ছাদে আমাদের পতাকা লক্ষ্য করে গুলী করছে। আক্রোশ, প্রবল আক্রোশে বাংলাদেশের পতাকার দিকে গুলী করছে। পতাকার দিকে গুলী ছুঁড়ছিলো আর সবদিকে ট্রেসার বুলেট।
ট্রেসার বুলেটে এক্সটেনশনের চালে আগুন লেগে গেলে আমরা প্রথমে টয়লেটে ঢুকে আত্মরক্ষার চেষ্টা করি। আমি, শিবু, সুভাষ, নিরেন, মুশতাক। হঠাৎ দেখি- খুব সাফোকেটেড আর প্রচন্ড গরম। এখান থেকে কোনভাবে এস্কেপ করে পাশের সুইপার কলোনিতে ঢুকে যাই, শিশুতোষ ছিল মেইন বিল্ডিংয়ে। এমনিতে আমার সাধারন চেহারা আর পরনে লুঙ্গি আর গেঞ্জি- গেঞ্জিটা ইচ্ছে করে ছিঁড়ে ফেলি যেনো দেখে ওদের মতোই মনে হয়। সামনে একটা আর্মি দাঁড়ানো, বাকীরা মেইন বিল্ডিংয়ে অপারেশন করছে। ঐদিকে মর্টার শেল মারছে, মর্টার শেলের আঘাত থেকে বাঁচতে যারা বের হচ্ছে তাঁদেরকে পাখীর মতো গুলী করে মারছে। ওয়ান টু ওয়ান শট।
এগুলো আমার চোখের সামনেই। মাঠটা তো আমার চোখের সামনে। প্রথমে আধঘন্টা কি একঘন্টা- সঠিক সময় আমি বলতে পারবোনা, কতোটা সময় গেছে- কারন এ সময় তো গননা করার কোন ব্যাপারই ছিলোনা। কতোক্ষন পরেই দুজন আর্মি আসছে।এসে বললো- ‘সব মর্দ লোক আলাদা হু যাও’। হল বিল্ডিংয়ের এখানে এনে আমাদেরকে দাঁড় করিয়ে বলছে- ‘তুমছে কৌই বিহারী হে?’ সুইপারদের অনেকেই ক্লেইম করেছে- ‘আমরা বিহারী’ । এদেরকে আবার আলাদা করলো।
বাকীদেরকে আলাদা করে নিয়ে গেলো অধ্যাপক গুহঠাকুরতার বিল্ডিংয়ে। নিয়ে তুললো তিনতলায় ডঃ মনিরুজ্জামানের ফ্ল্যাটে। এই ফ্ল্যাট থেকে আমি ডঃ মনিরুজ্জামান, উনার এক ভাগ্নে, উনার ছেলে- তিনটা ডেডবডি পেয়েছি। হি ওয়াজ প্রফেসর অফ স্ট্যাটিসটিক, দাঁড়িওয়ালা ফর্সা মানুষ। অন্যরা ক্যারি করলো বাকীগুলো। ডেডবডিগুলো আমরা আনলাম, প্রথমে আনলাম এসেম্বলি গেটের কাছে, ধাপে ধাপে আনলাম। আনলাম মানে- ভলান্টারি না, উই ওয়ার ফোর্স টু ডু দ্যাট। ওখান থেকে গেট পর্যন্ত আনছি। হলের দিকে ডেড বডির আরেক স্তুপ। আমাদেরকে যখন স্তুপের সামনে নিয়েছে তখন দেখলাম ঐ সুইপারদেরও ডেডবডি। কিল্ড, অলরেডি বিন কিল্ড। বুঝতে পেরেছিল- এরা আসলে বিহারী নয়।
আমারে তখন বলছে- ‘জয় বাংলা কও, আভি জয় বাংলা কও’ । বিদ্রুপ করে বলছে- ‘ তোমহারা শেখ আবি এয়সা হালত হো রা হায়’। এভাবেই সারা রাত চলেছে। প্রত্যেকটা গ্রুপ যাদেরকে দিয়ে লাশ বহন করিয়েছে সারা রাত, তাদেরকেও ওখানে দাঁড় করিয়ে গুলী করে মেরে ফেলেছে। আমরা ছিলাম লাস্ট গ্রুপ। সুভাষ, নিরেন, শিবু এই তিনজনকে মেরেছে লাস্ট ব্যাচে- সকাল বেলা। আমার বন্ধু শিশুতোষের ডেডবডি আমি ক্যারি করেছি। প্রথম ও দ্বিতীয় তলার সিঁড়ির মধ্যে তাঁর ডেডবডি পরে ছিলো। এন্ড দ্যাটস দ্যা অনলি ডেড বডি আই ক্যারিড ভলান্টিয়ারি। মুশতাক লাকিলি এস্কেপ করতে পেরেছিল।
তারপর ভোরের দিকে ওদের ব্রেকফাস্ট আসছে। তখন ওরা টিনের মগে চা খাচ্ছে। সামনে একজন গান ম্যান, পিছনে একজন অফিসার। আমাদেরকে গুলী করার জন্য সামনের জন্য স্টেনগান তুললো, ঠিক তখন পেছনের অফিসার বলছে- স্টপ স্টপ। পেছনে তাকিয়ে দেখি- পুকুর থেকে হাত ধুয়ে, হাতে তখনো কিছু রক্ত লাগানো এক আর্মি উঠে আসছে। আমাদেরকে তখন গুলী করলে পেছনের আর্মির গায়ে লাগতে পারে। সেজন্য স্টপ বললো আর গানম্যান একটু কনফিউজ হয়ে চোখ ফেরালো।
এই যে সময়টুকু পেলাম- আই টুক এডভান্টেজ অফ ভেরি প্রিসিয়াস মোমেন্ট এণ্ড আই স্লিপট ইন দ্যা স্টেক, স্টেক অফ ডেথ, স্টেক অফ কর্পসেস।আহত কেউ কেউ তখনো চিৎকার করছে, কিন্তু এগুলো খেয়াল করার মতো নয় তখন। খেয়াল করলে আরো আগেই মরে যেতাম। আমি যে ডেডবডির উপরে পরেছি সেটা জগন্নাথ হলের একজনের গার্ডের- আমারই ক্যারি করা ডেডবডি। এই ডেডবডিটা ক্যারি করতে আমার সবচেয়ে বেশী কষ্ট হয়েছিলো, হেভি অ্যান্ড প্রফিউজলি বিল্ড। তখনো তার শরীর ব্লিড করছে আর আমার মুখ গিয়ে পরেছে তার বুকে। আমি তখন একেবারেই ইয়ে হয়ে গেছি এবং তখনো দেখছি ওরা টুশ টাশ করে বাকীদের গুলি করছে।
কিছুক্ষন পর ওরা যখন চলে গেলো- আমি ওরকমই শুয়ে আছি, শুনছি গাড়িগুলো যাওয়ার আওয়াজ। মানে আর্মি এক্সিট হচ্ছে। তারপর শুনলাম- বস্তি থেকে মহিলারা প্রচন্ড চিৎকার করে, হাহাকার করে আসছে। যখন বুঝছে আর্মি চলে গেছে তখন ওরা জগ নিয়ে, পানি নিয়ে ছুটে আসছে। একজন আমার মুখে ঝাপটা মেরেছে, মৃত ভেবে। পরে এখান থেকে বের হয়ে ফ্রন্ট বিল্ডিংয়ের একটা কোয়ার্টারে অনেকক্ষন ছিলাম।
২৬ মার্চ তো শুক্রবার ছিল। জুম্মার নামাজের পর পাকিস্তান আর্মি কেইম ব্যাক টু ক্যাম্পাস। তারা একজন মোল্লা নিয়ে আসলো। ডেডবডিগুলো এরকম স্ক্যাটারড তখনো। মোল্লাকে এগুলো দেখালো। কি যেনো কথা বললো, মোল্লাকে নিয়ে চলে গেলো। এরপরই দ্যা টুক এ বুলডোজার এন্ড স্মেসড অল । আমরা জানালা দিয়ে দেখলাম। এটা আসলে নিষ্ঠুরতম দৃশ্য।
যেভাবে তারা আমাদের উপর গুলী চালালো, যেভাবে হত্যা করলো, যেভাবে মৃতদেহের উপর দিয়ে বুলডোজার চালালো- এটা চেঙ্গিস খান, হালাকু খানের নৃশংসতাকে ছাড়িয়ে যায়। তাদের যে ঘৃণা এবং আক্রোশ। বিশেষ করে স্বাধীন বাংলার পতাকা তখন বিল্ডিংগুলোতে উড়ছে- ঐদিক লক্ষ্য করে তারা গুলী ছুঁড়ছে। পতাকাটাও, যার কোন প্রান নাই- সেই পতাকার প্রতিও তাদের আক্রোশ।
[ সংরক্ষিত ভিডিও থেকে লিখিত]


0 মন্তব্যসমূহ