স্বকৃত নোমানের গল্প: দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তর

 




ধ্যরাতে যাত্রা করে আমরা ভোরে এসে পৌঁছাই তুরাগ নদের তীরে। সেই প্রাচীন নদ, আগিলা দিনে যাকে বলা হতো কহরদরিয়া। আমার দাদা বলতেন, কহরদরিয়া মানে কষ্টসাগর। মেলা কষ্ট সয়ে পার হতে হতো এই নদ। সেই বিশাল নদ এখন জীর্ণশীর্ণ সরু খাল, যার তীরে দাঁড়ালে পেট উল্টে যেতে চায়, নাড়িভুঁড়িতে পেঁচ লেগে যায়।

আমার পেটে মোচড় দিচ্ছিল খুব। সাধারণত সকালের নাশতার আগে আমাকে টয়লেটে যেতে হয় না। কী যে হলো আজ! তুরাগের দুর্গন্ধেই কি পেট এমন অশান্ত হয়ে উঠল! না, তা মনে হচ্ছে না। এ নিশ্চয়ই গতরাতে হোটেলে খাওয়ার ফল। আমার পেট বুঝতে পারে কোনটা হোটেলের খাবার, আর কোনটা বাড়ির। হোটেলের খাবার পড়লেই পেট শুরু করে গণ্ডগোল।

প্রায় পনেরো মিনিট খোঁজাখুজির পর পেয়ে যাই টয়লেট। তুরাগতীরের এক মসজিদের টয়লেট। দরজা খোলাই ছিল। মুসল্লিরা ফজর পড়ে ফিরে গেছে, মিম্বারের কাছে হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে মুয়াজ্জিন। আমাকে দেখতে পায়নি। দেখলে নিশ্চয়ই বাধা দিত কিংবা টাকা দাবি করত। কাজ সেরে আমি নিঃশব্দে বেরিয়ে পড়ি দশ টাকা বাঁচিয়ে। শরীরাটা বেশ হালকা লাগছে। আহ্ শান্তি!

সঙ্গীরা ততক্ষণে চলে গেছে মেলা দূরে। বাঁকটা পেরোলেই তারা হয়ে যাবে অদৃশ্য। আমার সামনে-পেছনে কোনো মানুষ নেই। নির্জন রাস্তা। এই নির্জনতায় আবার ভারী হয়ে ওঠে আমার শরীর, ভয়ে ধুকপুক করে বুক। যদি আন্দোলনকারী সন্দেহে সরকারি দলের লোকেরা হামলা করে! যদি পুলিশ গ্রেপ্তার করে! সরকার তো এখনো বহাল। বহাল রাখতে সরকারি বাহিনী যে কারো ওপর হামলা করতে পারে, গ্রেপ্তার করতে পারে, গুলিও ছুড়তে পারে। গত কুড়ি দিনের আন্দোলনে কত মানুষ হতাহত হয়েছে, তার কোনো হিসাব নেই।

আমি ছুট দিই। প্রায় দশ মিনিট একটানা ছুটে সঙ্গীদের ধরি। সঙ্গীরা তখন আলাপ করছিল সরকার পতন বিষয়ে। আমাদের তরুণ নেতা ইসরাফিল সবাইকে আশ্বস্ত করছিল এই বলে যে, ফ্যাসিস্টের পতন নিশ্চিত। গদি এবার ছাড়তেই হবে, কেউ ঠেকাতে পারবে না। বুকে হিম্মত রাখো সবাই, ভয় পেও না। পুলিশ কজনকে অ্যারেস্ট করবে? আর্মি কত গুলি চালাবে? যত যাই ঘটুক, জয় আমাদের হবেই।

হঠাৎ এক কিশোর স্লোগান ধরে, জ...য়...বাংলা...! সবাই হতচকিয়ে যায়। কেউ কেউ হেসে ওঠে। এক যুবক কয়েকটা কিল-ঘুষি লাগিয়ে দেয় কিশোরটির পিঠে। কেননা জয়বাংলা ফ্যাসিবাদের স্লোগান। আমরা কেন এই স্লোগান দেব? আমাদের সংগ্রাম তো জয়বাংলার বিরুদ্ধে, আমাদের স্লোগান তো ইনকিলাব জিন্দাবাদ। সবাই স্লোগান ধরে, ইনকিলাব ইনকিলাব, জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ। দিয়েছি তো রক্ত, আরও দেব রক্ত...। আমিও সবার কণ্ঠে কণ্ঠ মিলাই। ঝাঁকড়া চুলের এক তরুণ, যে আমাদের সঙ্গে খানিক আগে যোগ দিয়েছে, গতরাতে দেখা স্বপ্নের বর্ণনা দেয়। সে দেখেছে, ক্যান্টনমেন্ট থেকে একটা বুনো ষাঁড় গর্জন করতে করতে ডিক্টেটর ভবনের দিকে ছুটছে। তেলতেলে গা, হেলে পড়া কুঁজ। তার গর্জনে সন্ত্রস্ত্র মানুষেরা দিগ্বিদিক ছুটছে। ডিক্টেটর পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছে নগরীর এক পরিত্যক্ত বাড়িতে।

তরুণ দৃঢ় কণ্ঠে বলে, এই স্বপ্ন নিশ্চয়ই ডিক্টেটরের পতনের ইশারা। আমার স্বপ্ন কখনো মিথ্যে হয় না। এবার ডিক্টেটরের পতন হবেই, আমি শিওর।

নীল জিন্সের প্যান্ট পরা যে তরুণ এতক্ষণ আমার পাশাপাশি হাঁটছিল, মাঝেমধ্যে আমার সিনার সঙ্গে যার সিনা লেগে যাচ্ছিল, সে তার পাশের তরুণটিকে জিজ্ঞেস করে, আচ্ছা, ডিক্টেটর কী জিনিস?

সম্ভবত ডাক্তার।

পেছন থেকে আরেক তরুণ বলে ওঠে, না না, ডাক্তার না, ডক্তর। ডাক্তার ও ডক্তরের মধ্যে ফারাক আছে।

বাঁশের লাঠি হাতে সামনের তরুণটি, যার মাথায় পাতাকা বাঁধা, অট্টহাসি দিয়ে বলে, ছাগলের দল! ডিক্টেরের অর্থ বোঝে না। লেখাপড়া কিছু করো নাই, না কি!

আর তখন ওঠে শোরগোল। দাঁড়িয়ে পড়ে সবাই। কেননা সামনে আর্মির ব্যারিকেড। শতাধিক সশস্ত্র সৈনিক। তাদের একজন, সম্ভবত ক্যাপ্টেন, হ্যান্ড মাইকে আমাদের হুঁশিয়ার করে, আপনারা আইন লঙ্ঘন করবেন না। কেউ ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা করবেন না। করলে আমাদের ওপর নির্দেশ আছে গুলি চালানোর।

আমাদের অকুতোভয় নেতা ইসরাফিল দুরন্ত সাহসে বুক চিতিয়ে দাঁড়ায়। চোখ তাঁতিয়ে আঙুল নাড়িয়ে বলে, গুলির ডর দেখাবেন না স্যার। করেন গুলি। দেখি কত গুলি আছে আপনাদের স্টকে। কতজন মারবেন? আমরা মৃত্যুর পরোয়া করি না। ফ্যাসিস্টের পতন না ঘটিয়ে আমরা ঘরে ফিরব না।

ইসরাফিল ঘুরে দাঁড়ায়। আমাদের উদ্দেশে বলে, কেউ ভয় পাবে না। আমরা এই ব্যারিকেড ভাঙবই। এমন কোনো বাপের বেটার জন্ম হয়নি যে আমাদের রুখবে।

সবাই আবার স্লোগান ধরে, আপস না সংগ্রাম, সংগ্রাম সংগ্রাম। স্বৈরাচারের গদিতে, আগুন জ্বালাও একসাথে। স্লোগান দিতে দিতে সবাই ছুট দেয়, ভেঙে দেয় ব্যারিকেড। সরে দাঁড়িয়ে পথ করে দেয় আর্মি। তাদের এই নমনীয় আচরণ দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয় আমাদের সাহস। আমরা বুঝতে পারি তারা যে আমাদের পক্ষ সমর্থন করছে। আমারা আরও নিশ্চিত হই স্বৈরাচার যে আর গদিতে থাকতে পারছে না।

আশপাশের এলাকা থেকে আমাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে বিস্তর মানুষ। আমি সামনে উঁকি দিই। ফাঁকা রাজপথ। ডানের সড়ক ধরে সাইরেন বাজিয়ে হাই স্পিডে ছুটছে একটা অ্যাম্বুলেন্স। এবার উঁকি দিই পেছনে। দেখার চেষ্টা করি মিছিলের শেষ মাথা। না, ঠিক নজরে আসে না। হাজার হাজার মানুষ। অবিশ্রান্ত গতিতে, একই ছন্দে একই তালে চলছে তাদের পা। হাঁটতে হাঁটতে ভাবি, ভোর থেকে যারা আমাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে, ক্রমাগত দিচ্ছে এবং দেবে, সবাই কি আমাদের মতো টাকা পেয়ে এই আন্দোলনে নেমেছে? নিশ্চয়ই পেয়েছে। আমরা পেলে তারা পাবে না কেন? কিন্তু মানুষ তো কেবল এখানে নামেনি, সারা দেশে নেমেছে। সবাই কি টাকা পেয়েছে? নিশ্চয়ই পেয়েছে। নইলে আমরা কেন পেলাম? কত মানুষ নেমেছে? তিন কোটি? তিন কোটি না হোক, এক কোটি তো হবেই। এক কোটি মানুষকে পাঁচ হাজার টাকা করে দিলে কত হয়? নাহ্, এত টাকার হিসাব আমার মাথায় ধরে না। আমার মনে হয় না সবাই টাকা পেয়ে সরকার পতন আন্দোলনে নেমেছে। বয়স্ক যে লোকটি, যার চোখেমুখে পরাক্রম, মনে হয় না সে টাকায় বিক্রি হয়েছে। হয়তো সে স্বৈরশাসনে অতীষ্ট। লাঠি হাতে যে তরুণ পুলিশকে গালাগাল করছে, মনে হয় না সে টাকার লোভে এমন দুঃসাহস দেখাচ্ছে। হয়তো সে পুলিশ বা র‌্যাবের হাতে নির্যাতিত। যে তরুণী কোমরে ওড়না পেঁচিয়ে মুষ্ঠিবদ্ধ হাত উঁচিয়ে স্লোগানের পর স্লোগান দিচ্ছে, মনে হয় না সে টাকা পেয়েছে। হয়তো সে সরকারি দলের পাণ্ডাদের হাতে নিপীড়িত। যে লোকটা ক্র্যাচে ভর দিয়ে ঘেমেনেয়ে একাকার হয়ে হাঁটছে, মনে হয় না সে টাকার লোভে এত কষ্ট স্বীকার করছে। হয়তো সে সত্যিকারের দেশপ্রেমিক। দেশকে সে স্বৈরশাসকমুক্ত করতে বদ্ধপরিকর।

প্রায় দেড় ঘণ্টা অবিশ্রান্ত পথ চলার পর আমরা আবার মুখোমুখি হই প্রতিরোধের। কয়েক শ সশস্ত্র আর্মি রোধ করে আমাদের পথ। সামনে কাঁটাতারের ব্যারিকেড, পেছনে আর্মি। ক্যাপ্টেন আমাদের সতর্ক করে, কেউ এক কদমও এগোনোর চেষ্টা করবেন না। এটা আমার অনুরোধ না, আদেশ। আশা করি এই আদেশ লঙ্ঘন করে কেউ সুইসাইড করবেন না।

দুরন্ত সাহসী ইসরাফিলকে এই প্রথম ভড়কাতে দেখি। সে বুঝতে পারে গোঁয়ার্তুমিতে যে এবার কাজ হবে না। আর্মির সঙ্গে গোঁয়াতুর্মি চলে না। ইতোপূর্বে যারা গোঁয়াতুর্মি করেছে তাদের পাছা লাল হয়ে গেছে। ফলে আমাদের পিছু হটা ছাড়া উপায় থাকে না। কিন্তু আমরা পিছু হটি না। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে স্লোগান দিতে থাকি। ক্রমে বাড়তে থাকে বিক্ষুব্ধ জনতা। কোথাও দাঁড়ানোর জায়গা থাকছে না। স্লোগান দিতে দিতে কেউ বসে পড়ে রাস্তায়, কেউ ঢুকে পড়ে আশপাশের গলিতে।

আমরা পাঁচজন, যারা এসেছি তেলিহাটি থেকে, ঢুকে পড়ি বাঁয়ের গলিতে। এক চা-দোকানের সামনে পাতা মুখোমুখি দুটি টুলে গিয়ে বসি। দোকান বন্ধ। খোলা থাকলে কলা-রুটি কিছু খাওয়া যেত। খিদা পেয়েছে প্রচণ্ড। এমনই খিদা, মিটবে না কলা-রুটিতে। ভাত খেতে হবে পেট ভরে। কিন্তু ভাত পাব কোথায়? আশপাশে কোনো হোটেল-রেস্টুরেন্ট নেই। গলির ভেতরে গেলে পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু ভাত কি পাওয়া যাবে? সবে তো দশটা। অন্তত এগারোটার আগে তো হোটেলে ভাত চালু হওয়ার কথা নয়। বাতাসে ভাসছে কালাভুনার গন্ধ। আশপাশের কোনো বাসায় বুঝি কালাভুনা হচ্ছে। সেই গন্ধে দ্বিগুণ উসকে ওঠে আমার খিদা। কোথাও রেস্টুরেন্ট পেলে কালাভুনা দিয়ে ভাত খাব। কালাভুনা আর মসুর ডাল দিয়ে ভাত জগতের শ্রেষ্ঠ খাবার। ভাত খেয়ে এক প্লেট দই খাব। তারপর খাব কোক। টাকার চিন্তা নেই। কাল বিকেলে হিশাম যে পাঁচ হাজার দিয়েছিল তার এক টাকাও খরচ হয়নি। হিশাম নিশ্চয়ই আরও বেশি পেয়েছে। কমপক্ষে দশ হাজার। বেশিও হতে পারে। কারণ ইসরাফিলের সঙ্গে তার সরাসরি যোগাযোগ, কোনো ভায়া নেই। তাই সে আমাদের চেয়ে বেশি পাওয়াটা স্বাভাবিক। এমনও হতে পারে, আমাদের জন্য বরাদ্দ ছিল দশ হাজার, সে অর্ধেক মেরে দিয়েছে। অসম্ভব নয়। পার্টির নেতারা এমনই করে। এটা ওপেন সিক্রেট। সবাই জানে, কিন্তু কেউ কিছু বলে না। আমাদেরও কিছু বলার নেই।

হিশাম আমাদের নিয়ে রওনা হয় রেস্টুরেন্টের খোঁজে। গলি ধরে আমরা হাঁটতে থাকি পূর্ব দিকে। পূর্ব না দক্ষিণ ঠিক নিশ্চিত হতে পারি না। এই শহরে এলে আমি দিক হারিয়ে ফেলি, উত্তর-দক্ষিণ বুঝে উঠতে পারি না। বড় বড় দালানের বাধায় দেখা যাচ্ছে না সূর্য। দেখা গেলেও কি বুঝতে পারতাম? মনে হয় না। উত্তরকে মনে হতো দক্ষিণ, পূর্বকে মনে হতো পশ্চিম। আশপাশের দোকানপাট বন্ধ। হরতাল-অবরোধ কিংবা আন্দোলন-সংগ্রামের সময় এমনই হয়—দোকানপাট খোলে না, গাড়ির চাকা ঘোরে না। অফিস-আদালত আর মিল-কারখানাও বন্ধ থাকে। কেবল এই নগরীতে নয়, কদিন ধরে সারা দেশেই যানবাহন বন্ধ। বিস্তর বাস ট্রাক কার মাইক্রোতে আগুন দেওয়া হয়েছে, আগুন দেওয়া হয়েছে ট্রেনেও। হামলা হয়েছে শত শত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আর মিল-কারখানায়। হামলা করতে হবে, পুড়িতে দিতে হবে, ধ্বংস করে দিতে হবে—আন্দোলন-সংগ্রামের এটাই নিয়ম। নইলে আন্দোলন সফল হয় না, সরকারের পতন ঘটানো যায় না।

প্রায় দেড় কিলোমিটার হাঁটার পর পেয়ে যাই মাঝারি মানের এক রেস্টুরেন্ট। ক্যাফে নূরমণি। কাস্টমার নেই তেমন। সবে তো সাড়ে এগারোটা, বারোটা বাজলে হয়তো একটা সিটও ফাঁকা থাকবে না। কেননা এদিকটা স্বাভাবিক। আন্দোলনের আঁচ পড়েনি। রিকশা চলছে, অটো চলছে, মানুষজন সদাইপাতি করছে। কারো চেহারায় কোনো উদ্বেগ নেই, কোনো উৎকণ্ঠা নেই। দেশে কী হচ্ছে, এই নগরীতে কী হচ্ছে, যেন কারোরই কিছু জানা নেই। এমনকি জানার চেষ্টাও নেই।

হিশামের চোখেমুখে আনন্দ। তার কাছে খবর আছে ফ্যাসিস্টের পতন অতি সন্নিকটে। সবকিছু ঠিকঠাক, যে কোনো সময় পতন। পতন হলেই রাজপথ দখলে নেবে জনতা, সবাই জমায়েত হবে ইউনিভার্সিটি এলাকায়। ঢুকে পড়বে পার্লামেন্ট আর ডিক্টেটর ভবনে। হিশামের আনন্দ আমাকেও স্পর্শ করে। আমিও হই সমান আনন্দিত। কিন্তু পার্লামেন্ট ভবন বুঝলেও ডিক্টেটর ভবন কী, আমার ঠিক বুঝে আসে না। আমি হিশামকে জিজ্ঞেস করি। হিশাম বলে, আরে বোকা ভাত খা। ধৈর্য ধর, সময় হলে সবই বুঝবি।

বল না ভাই! এমন করিস ক্যান?

হিশাম বলে না, গোগ্রাসে খেতে থাকে। অভিমানবশত আমিও আর জিজ্ঞেস করি না। আমার অভিমান টের পায় হিশাম। বলে, প্রধানমন্ত্রীর বাড়ি বোকা, প্রধানমন্ত্রীর বাড়ি। ইংলিশে বলে ডিক্টেটর ভবন।

প্রধানমন্ত্রীর নাম আবার ডিক্টেটর হইলো কবে থেইকা!

ধুর ছাগল! সে কীসের প্রধানমন্ত্রী? সে তো ভয়ংকর ডিক্টেটর। খুনী স্বৈরাচার।

ও!

কালাভুনা কই? দিল না ক্যান?

নাই।

বালের হোটেল। রসা বেটার। খা, পেট ভরে খা। আবার কখন খেতে পাবি ঠিক নাই। টাকার চিন্তা করিস না, সব ঠিকঠাক থাকলে আরও পাবি। ইসরাফিল ভাইর সাথে কথা হইছে। পার হেড দশ হাজার। আগে পাঁচ, পরে পাঁচ। তোরা আরও পাঁচ পাবি। তখন যত ইচ্ছা কালাভুনা খাবি।

দ্বিগুণ বেড়ে যায় আমার আনন্দ। মেসিয়ারকে আরও এক প্লেট মাংস দিতে বলি। একটা নরম হাড্ডি চিবুতে চিবুতে ভাবি ডিক্টেটর ভবনের কথা। সত্যি যদি সরকার পতন হয়, সত্যি যদি জনতা ঢুকে পড়ে ডিক্টেটর ভবনে, তবে আমিও ঢুকব। জীবনে কখনো প্রধানমন্ত্রীর বাড়ি দেখিনি। আমার বাবা দেখেনি, দাদা দেখেনি, বাবার দাদাও দেখেছে কিনা সন্দেহ। আজ আমি দেখব। বাবার হয়ে দেখব, দাদার হয়ে দেখব, চৌদ্দ গোষ্ঠীর হয়ে দেখব। প্রধানমন্ত্রীর বাড়ি নিশ্চয়ই প্রাচীনকালের রাজবাড়ির মতো। যেমন ভাওয়াল রাজবাড়ি। কারুকার্য খচিত বড় বড় সব দালান। শত শত কামরা। কামরার সামনে বিশাল বিশাল বারান্দা। আছে নাটমন্দির, আছে হাওয়া মহল, আছে বড় বড় দিঘি। আর আছে বিপুল ধনরত্ন। হীরা মণি মুক্তা আর সোনা রুপা। আর আছে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা। প্রাচীনকালের রাজবাড়িতে তো থাকতো। ভাওয়াল রাজবাড়িতেও ছিল। প্রধানমন্ত্রীর বাড়িতেও থাকার কথা। প্রধানমন্ত্রী মানে তো রাজা। রাজার বাড়িতে ধনরত্ন টাকাপয়সা থাকবে না, এ হয় না। এক খণ্ড সোনা, কেবল এক খণ্ড সোনা পেলেই আমি খুশি। সাহার দোকানে বেচে দেব। সেই টাকায় বিদেশ চলে যাব। সৌদি কিংবা দুবাই। দেশে থেকে কিচ্ছু হবে না। এক টুকরো হীরা পেয়ে গেলে তো আমিই রাজা। এক জীবন কাটিয়ে দেওয়া যাবে আরাম-আয়েশে। কোনোভাবে টাকার ভাণ্ডারে ঢুকতে পারলে তো আর কথা নেই, যেভাবেই হোক টাকা আমি নিয়ে আসবই। প্রথমে ভরব পকেট, তারপর ব্যাগ। পকেটে পলিব্যাগটা আছে কিনা দেখি। আছে। রাতে কী ভেবে ভাঁজ করে পকেটে ঢুকিয়ে রেখেছিলাম। অন্তত কুড়ি লাখ আঁটবে এই ব্যাগে। হাজারি নোট হলে বেশি আঁটবে।

বেনসন টানতে টানতে আর ভুঁড়ি নাচাতে নাচাতে আমরা আবার ফিরে আসি গলির মাথায় চা-দোকানটার সামনে। টুল দুটি দখল হয়ে গেছে। ঠাসাঠাসি করে বসে আছে মানুষজন। সবার চোখেমুখে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা। কেননা আর্মি আরও কঠোর হয়েছে, এগুতে দিচ্ছে না কাউকে। এগুলেই গুলি করার হুঁশিয়ারি দিচ্ছে। রাজপথে টহল দিচ্ছে বিস্তর সাঁজোয়া। লোকজন বলাবলি করছে, সরকার পতন অনিশ্চিত। এত রক্ত, এত আন্দোলন-সংগ্রাম সবই বৃথা।

এক যুবক মাওলানা, যে এতক্ষণ বদরের যুদ্ধে গায়েবি ফেরেশতার সাহায্যের কথা বলছিল, দৃঢ়কণ্ঠে বলে, মোটেই বৃথা হবে না। জালিম শাসকের পতন হবেই ইনশাল্লাহ। এত রক্ত বৃথা যেতে পারে না। সরকারি বাহিনী কোনোভাবেই ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না জনতার এই ঢল। আমরা রক্তের ঢল বইয়ে দেব, রাজপথ লাল করে দেব। ফায়সালা আসবে আরশ থেকে। নাসরুম মিনাল্লাহি ওয়া ফাতহুন কারিব।

পান চিবুতে থাকা পাকা চুলের এক মুরুব্বি মাথা নাড়াতে নাড়াতে বলে, আমার মন কচ্ছে না জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়াইব আর্মি। আমি তাগের চোখ দেখছি, চোখের ভাষা বুইঝবার চেষ্টা করছি। আমার মন কচ্ছে তারাও চায় এই সরকারের পতন।

জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় না বটে আর্মি। তখন বেলা প্রায় তিনটা। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এই খবর, সরকারের পতন হয়েছে, হেলিকপ্টারে চড়ে পালিয়ে গেছে ফ্যাসিস্ট। লাখো জনতা ঢুকে পড়ছে নগরীতে, দখলে নিয়েছে রাজপথ, ঢুকে পড়ছে সংসদ ভবন, গণভবন ও প্রাধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে।

আমি হিশামকে জিজ্ঞেস করি, গণভবন আবার কোনটা?

ওই যে ডিক্টেবর ভবন, কইলাম না তোরে!

তুই না কইলি সেটা প্রধানমন্ত্রীর বাড়ি!

আরে কইলাম তো ইংলিশে কয় ডিক্টেটর ভবন, বাংলায় গণভবন।

মুহূর্তে লাখো মানুষ নেমে পড়ে রাজপথে, স্লোগান দিতে দিতে ভেঙে ফেলে ব্যারিকেট। অস্ত্র নামায় আর্মি, মিশে যায় জনতার সঙ্গে। আমি হিশামকে খুঁজি। কোথাও দেখতে পাই না তাকে। হারিয়ে গেছে জনতার ভিড়ে। সামনে বা পেছনে আছে কোথাও। আমরা চারজন পরস্পরের হাত ধরে ছুটতে থাকি। আমাদের গন্তব্য অজানা। এই শহর আমাদের অচেনা। ইউনিভার্সিটি কোন দিকে, সংসদ ভবন কোনদিকে, গণভবনই-বা কোনদিকে, আমরা কিছুই জানি না। উল্লসিত জনতার পায়ে পা মেলাতে থাকি। তারা যেদিকে যাবে আমরাও যাব সেদিকে।

ছুটতে ছুটতে আমরা যখন গণভবনের অদূরে লেকের ওপর ঝুলন্ত সেতুটার কাছে এসে পৌঁছাই, তখন কেউ একজন বলে, এই সে বাড়ি, যেখানে থাকত পতিত স্বৈরাচার। আনন্দে আমি লাফিয়ে উঠি। আমরা গণভবন পৌঁছে গেছি! হই-হুল্লোড় করতে করতে আমরা ছুটতে থাকি। যত দ্রুত সম্ভব আমাদের ঢুকে পড়তে হবে গণভবনে। প্রথমে খুজতে হবে সেই রত্নভাণ্ডার, যেখানে রক্ষিত আছে বহুমূল্যের হীরা মণি মুক্তা আর সোনা রুপা। তারপর খুঁজতে হবে টাকার ভাণ্ডার। কিন্তু এতক্ষণে কিছু কি অবশিষ্ট আছে? আমাদের আগে তো হাজার হাজার মানুষ এসেছে। তারা কি সব লুট করে নিয়ে যায়নি? আমরা কি কিছু পাব? আমি কি কিছু পাব? তবু দেখা যাক। পেলেও তো পেতে পারি। জোর কদমে আমরা হাঁটতে থাকি।

হঠাৎ খেয়াল করি আমার তিন সঙ্গী নেই। হিশামের মতো তারাও হারিয়ে গেছে ভিড়ে। কিংবা হারিয়ে গেছি আমি। তাদের নাম ধরে ডাকতে ইচ্ছে করে। কিন্তু ডেকে যে কোনো লাভ হবে না বুঝতে পারি। অগুণতি মানুষের হই-হুল্লোড়ে কেউ শুনতে পাবে না আমার ডাক।

লেকের শেষপ্রান্তে কৃষ্ণচ‚ড়া গাছটার তলায় গিয়ে আমি থামি। খুব ক্লান্তি লাগছে, আর চলতে চাইছে না দুই পা। একটু বিশ্রাম দরকার। কৃষ্ণচূড়ার বেদিতে বসতে গিয়েও বসি না। কেননা বিশ্রাম নিতে গেলে যদি রত্নভাণ্ডারের সব রত্ন লুট হয়ে যায়! যদি টাকার ভাণ্ডারের সব টাকা লুট হয়ে যায়! আমি আবার হাঁটা ধরি। গভভবন থেকে নানা জিনিসপত্র নিয়ে বেরিয়ে আসছে মানুষ। যে যা পারছে লুটে আনছে। কারো মাথায় চেয়ার, কারো মাথায় সোফা। কেউ নিয়েছে কম্বল, কেউ নিয়েছে তোষক। কারো হাতে গ্লাস, কারো হাতে থালা। এক যুবকের কোলে একটা ছাগল, এক তরুণীর হাতে একটা রাজহাঁস। বোরখাপরা এক মহিলার ডান হাতে দুটি কড়াই, বাঁ-হাতে দুটি পাতিল। এক মৌলবির দুই বগলে দুটি বালিশ আর কাঁধে একটা টিভি মনিটর। এক যুবতীর হাতে দুটি শাড়ি, মাথায় একটা সুটকেস। এক কিশোরের মাথায় একটা বেসিন, আরেক তরুণের মাথায় একটা কমোড।

আমি ভেবে পাই না এরা কেন নিয়ে যাচ্ছে এসব। এরা কি পাগল হয়ে গেল! নিলে তো রত্নভাণ্ডরের রত্ন নেবে, টাকার ভাণ্ডারের টাকা নেবে। কোথায় রত্ন, কোথায় টাকা! নাকি লোকজন আগেই সব নিয়ে গেছে? নেওয়ার মতো আর কিছু নেই বলেই বুঝি সবাই এসব নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমার মনে বলে আছে, নিশ্চয়ই আছে। ষোল বছরের প্রধানমন্ত্রীর ধনরত্ন টাকাপয়সা এত জলদি ফুরিয়ে যাওয়ার কথা নয়। হয়তো এখনো কেউ আবিষ্কার করতে পারেনি হীরা মণি মুক্তা আর সোনা রুপার ভাণ্ডার। খুঁজে পায়নি টাকার ভাণ্ডার। পেলেও হয়তো ভাঙতে পারেনি ভাণ্ডারের দরজা।

সঙ্গীদের খুঁজতে খুঁজতে আমি হাঁটি। হাঁটতে হাঁটতে গণভবনের গেটের কাছাকছি গিয়ে শুনতে পাই একদল তরুণের হই-হুল্লোড়। তাদের কারো হাতে সায়া, কারো হাতে ব্লাউজ, কারো হাতে ব্রা। সেসব উঁচিয়ে তারা উল্লাস করছে, আর একদল লোক তাদের ছবি তুলছে। এসব অন্তর্বাস কার? নিশ্চয়ই পতিত স্বৈরাচারের। নিয়ে যাক, সব নিয়ে যাক। স্বৈরাচারের সব চিহ্ন মুছে দিক। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমি তাদের উল্লাস দেখি। তাদের উল্লাসে আমিও উল্লসিত হই।

সহসা আমার তৃষ্ণা পায়। খুব তৃষ্ণা। বারবার গলা শুকিয়ে যাচ্ছে, মুখ শুকিয়ে যাচ্ছে, ঠোঁট শুকিয়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ আগেই তো পানি খেলাম। আধা লিটারের এক বোতল। তবু তৃষ্ণা! অবশ্য যে গরম, আর যে পরিমাণ হাঁটাহাটি, তাতে শরীর পানিশূন্য হয়ে যাওয়াটা স্বাভাবিক। এক ঢোক পানি খাওয়া দরকার। কিন্তু কোথায় পাব? কোথাও পানিওয়ালাকে দেখতে পাই না। বেচাকেনা খানাপানি ভুলে মানুষ এখন উল্লাসে মত্ত। গণভবনের ভেতরে নিশ্চয়ই টিউবকল আছে। ভেবে আশ্বস্ত হই। দেখতে থাকি তরুণদের উল্লাস। দেখতে দেখতে হঠাৎ আমার মনে হয়, এরা, উল্লাসরত এই তরুণেরা, যেন তেলিহাটিতে আমাদের ঘরে ঢুকে, আমাদের ঘর লুট করে আমারই দাদির সায়া, আমারই মায়ের ব্লাউজ আর আমারই বোনের ব্রা নিয়ে উল্লাস করছে।

আমার গলাটা আরও শুকিয়ে যায়, মুখটা আরও শুকিয়ে যায়, ঠোঁটটা আরও শুকিয়ে যায়। আমার ক্লান্তি লাগে, নিদারুণ ক্লান্তি লাগে। চারদিকে উল্লসিত লাখো মানুষের ভিড়। কে জানে কেন, ভিড় ঠেলে আমার আর গণভবনে ঢুকতে ইচ্ছে করে না। আমি খেয়াল করি, গণভবন দেখার সাধ আমার মরে গেছে। আমাকে টানছে আমার বাড়ি। যেন আমার হাত ধরে টানছে, পা ধরে টানছে, চুল ধরে টানছে। কেবলই মনে হচ্ছে উল্লাসরত তরুণদের মতো একদল তরুণ আমাদের বাড়িতে হানা দিয়ে লুটপাট চালাচ্ছে। সেই লুটপাট থামাতে, লুটেরাদের হাত থেকে স্বজনদের রক্ষা করতে জলদি আমাকে পৌঁছতে হবে বাড়ি।


রচনাকাল : ১৫.০৩.২০২৫

*****


লেখক পরিচিতি: স্বকৃত নোমান বাংলা ভাষার কথাশিল্পী। উপন্যাস ও গল্প তার সাহিত্য-সাধনার ক্ষেত্র। একই সঙ্গে তিনি প্রাবন্ধিকও। ১৯৮০ সালের ৮ নভেম্বর ফেনীর পরশুরাম উপজেলার বিলোনিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। জ্ঞানার্জন ও শিল্পসৃজন তার জীবনের আনন্দ। প্রকাশিত উপন্যাস : রাজনটী, বেগানা, হীরকডানা, কালকেউটের সুখ, শেষ জাহাজের আদমেরা, মায়ামুকুট, উজানবাঁশি, মহুয়ার ঘ্রাণ, ইহযৌবন, আচার্য ও তার অলীক পাণ্ডুলিপি। গল্পগ্রন্থ : নিশিরঙ্গিনী, বালিহাঁসের ডাক, ইবিকাসের বংশধর, বানিয়াশান্তার মেয়ে, কয়েকজন দেহ। দুই খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে তার উপন্যাস সংগ্রহ এবং এক খণ্ডে গল্পসংগ্রহ। এছাড়া রয়েছে বিভিন্ন বিষয়ে তার আরও বই। এইচএসবিসি-কালি ও কলম পুরস্কার, ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল হুমায়ূন আহমেদ তরুণ সাহিত্যিক পুরস্কার, এক্সিম ব্যাংক-অন্যদিন হুমায়ূন আহমেদ সাহিত্য পুরস্কার, আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার এবং বাংলা একাডেমি প্রবর্তিত রাবেয়া খাতুন কথাসাহিত্য পুরস্কারসহ ভূষিত হয়েছেন নানা পুরস্কার ও সম্মাননায়।







একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ