প্রতিভা সরকার এসময়ের একজন শক্তিশালী কথাকার। ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রী এবং অধ্যাপক তিনি। অনেক বছর কাটিয়েছেন উত্তরবঙ্গে, ফলে সেই ভূখণ্ডের মানুষ, সমাজ এবং প্রকৃতির সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পৃক্তি। আশির দশকে ‘মধুপর্ণী’ ও অন্যান্য পত্রপত্রিকায় নিয়মিত লিখলেও, একসময় এই জগৎ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। দীর্ঘ বিরতি শেষে ফের সক্রিয় লেখালিখিতে এসেছেন বিগত কয়েক বছর। ‘ফরিশতা ও মেয়েরা’, ‘মানসাই’ ‘খাঁচার ভেতর অচিন পাখি’ ইত্যাদি তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। “গভীর মমতায় তিনি এঁকে চলেছেন মূলত মেয়েদের, সাধারণ মানবী তারা, কিন্তু দিব্য বিভায় উদ্ভাসিত তাদের ঘামে ভেজা মুখ।“ গল্প উপন্যাসরচনার পাশাপাশি প্রবন্ধ, মুক্তগদ্য এবং অনুবাদে তিনি সক্রিয় রয়েছেন। পাঠকের জন্য গল্পপাঠের এবারের আয়োজনে রইলো সাহিত্যিক প্রতিভা সরকারের একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ এবং সম্পাদনা করেছেন নাহার তৃণা।
গল্পপাঠ: আজ থেকে প্রায় বছর ত্রিশ আগে উত্তরবঙ্গের সেরা গল্পসম্ভারে প্রতিভা সরকারের গল্প অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। তারপর দীর্ঘ একটা সময় পর্যন্ত আপনি আর লিখেননি। দীর্ঘ বিরতির পর লিখতে বসে কেমন অনুভূতি হয়েছিল?
প্রতিভা সরকার: আটের দশকে উত্তরবঙ্গে বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিনে লেখালেখি করেছিলাম বিখ্যাত পত্রিকা মধুপর্ণীর সম্পাদক প্রয়াত অধ্যাপক অজিতেশ ভট্টাচার্যের স্নেহচ্ছায়ায়। খুব উৎসাহ দিতেন আর নিজের বাড়িতে প্রত্যেক সপ্তাহে সাহিত্য সভার আয়োজন করতেন। প্রত্যেকটি পঠিত লেখা কাটাছেঁড়া হত সেইসব আসরে। প্রখ্যাত লেখক শ্রী ভগীরথ মিশ্রও তাঁর সাহিত্যিক জীবন শুরু করেছিলেন বালুরঘাট শহরে, মধুপর্ণীর সঙ্গে।
গল্পকার হিসেবে অল্পবিস্তর পরিচিতি তখনই লাভ করেছিলাম। শিলিগুড়ি কলেজের অধ্যক্ষ ও খ্যাতিমান সাহিত্যিক প্রয়াত হরেন ঘোষের সম্পাদনায় উত্তরবঙ্গের শ্রেষ্ঠ গল্প নামে একটি সংকলনে আমার লেখা ছোট গল্প জায়গা করে নেয়।
ঠিকই, তারপর অনেকদিন স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে লেখা হয়ে ওঠেনি। টুকটাক ফরমায়েসি গল্প, ছোট প্রবন্ধ, এই সব ছাড়া। যেদিন প্রত্যয় জন্মাল, আমি আবার লিখছি, লিখতে পারব, নিজেই খানিক বিমূঢ় বোধ করেছিলাম। তারপর নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গের দশা হল আর হাতে খুব লেখা আসতে থাকল।
গল্পপাঠ: লেখালিখিতে ফিরে আসার পেছনে কারো অনুপ্রেরণা ছিল?
প্রতিভা সরকার: অনুপ্রেরণার ক্ষেত্রে বলতেই হবে, গুরুচন্ডা৯ ব্লগে লেখালিখির জন্য ঈপ্সিতা পাল খুব চাপ দিতেন। ওঁর জন্যই অনেক লেখা হয়েছে আমার। তখন ওঁদের সঙ্গে আমার রাজনৈতিক মতামতের খুব তফাৎ ছিল না। ফলে গল্প, ফিচার, রাজনৈতিক নিবন্ধ, সবই তেড়ে লিখে গেছি। যখন তফাৎ হল, তখনও ওঁরা আমাকে যথেষ্ট স্পেস দিয়েছেন, এখনও শর্তহীন ভাবে লেখা ছাপেন। আমারই আর রাজনৈতিক মতামত প্রকাশ করতে ইচ্ছে করে না। সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখে শুধু মনান্তরই হয় দেখেছি। কেউ কাউকে পাল্টাতে পারে না। তার থেকে যে লেখাকে সৃষ্টি বলা যাবে তার মধ্যেই নিজেকে উজাড় করে দেবার চেষ্টায় আছি।
গল্পপাঠ: কোন বয়সে আপনি বুঝতে পেরেছিলেন যে আপনি একজন লেখক হতে চান? আপনার লেখক জীবনের পথচলা, এর মোড় ও পরিবর্তনগুলো কি আপনাকে বিস্মিত করেছে?
প্রতিভা সরকার: আমার মধ্যে চূড়ান্ত বিস্ময়বোধ আছে, আর আছে নতুন সবকিছুর প্রতি তীব্র আগ্রহ। এই আগ্রহ আমাকে প্রচুর ছুটিয়ে মারে। যা অ-দৃষ্ট তা দেখলে এবং ভালো লাগলে একেবারে হাঁ হয়ে যাই। ফিরে ফিরে যাই তার কাছে। অনেক কলা ( ক্র্যাফট) আমার শিখতে ইচ্ছে করে। সঙ্গীত, সাহিত্য, আঁকা, সূর্যের নিচে যা-কিছু ভালো সমস্ত আয়ত্তে আনতে ইচ্ছে করে। ১৫ বছর গুরু আশিস ভট্টাচার্য মহাশয়ের কাছে গানের তালিম নিয়েছি। একদম ছোট বেলা থেকে রেওয়াজ করেছি। অধ্যাপনা করতে গিয়ে কলেজে প্রত্যেক বছর নাটকে মূল চরিত্রগুলির কোনও না কোনওটিতে অভিনয় করে এসেছি। শ্রুতিনাটকে আমার টিমের পুরস্কার ছিল বাঁধা। সদ্য প্রয়াত অধ্যাপক হরিমাধব মুখোপাধ্যায় ত্রিতীর্থে অভিনয় করবার জন্য বলেছিলেন। সব ছেড়ে লেখাই যখন রইল, তখন নিজেকে বললাম, চল মুসাফির, তোমার জন্য গন্তব্য নির্দিষ্ট হয়ে গেছে। আক্ষেপ হয়, দেরিতে বোঝার জন্য। কিন্তু এখন তো আর মনেও করতে পারি না, কবে আমি বাহির হলেম তোমারই গান গেয়ে…! এইটুকুই শুধু জানি, সে আজকে নয়!
গল্পপাঠ: 'মালা-ডি' গল্পের বীজ কোত্থেকে পেয়েছেন?
প্রতিভা সরকার: আমার বাড়িতে চিরকালই পোষ্য থেকেছে। গাছপালা থেকেছে। প্রথমটি আর নেই, কারণ বাইশ বছর সঙ্গ দিয়ে যে চলে গেছে, তার শূন্যস্থান নতুন কাউকে দিয়ে পূর্ণ করবার ইচ্ছেই মরে গেছে। সেই শোক কাটিয়ে ওঠবার জন্য আমাকে এখনও ওষুধ খেতে হয়। কিন্তু আগ্রহ তো মরেনি। পশুপাখিদের নিয়ে আলোচনা, রিল, সিনেমা দেখা, সবই আমাকে টানে। সেইরকম এক আলোচনায় কারও কাছে শুনেছিলাম কুকুরকে মালা-ডি খাওয়াবার কথা। আর গল্প তো ভারী অদ্ভুত জিনিস, একটি শব্দ বা একটি চাহনিকে আশ্রয় করেই সে কোথায় ডালপালা ছড়িয়ে দেবে, তা সে-ই জানে। ওই কথা শুনে মালা-ডি গল্পের ভাবনা মনে এল।
গল্পপাঠ: স্বাতীর মধ্যে মাতৃত্বের বাৎসল্য দেখিয়ে তাকে জিতিয়ে দেবার পথে কেন হাঁটলেন না লেখক? সেক্ষেত্রে শুধু যে মাতৃত্বের জয় হতো, তা তো নয়- মনুষ্যত্বও জিতে যেত– এ গল্প লেখার সময় সেরকম ভাবনায় কী লেখক আলোড়িত হয়েছিলেন? না হলে কেন নয়?
প্রতিভা সরকার: মাতৃত্ব, মনুষ্যত্ব কি সবসময় বাস্তবে জেতে ? কখনও জিতে গেলে তা কি ব্যতিক্রম নয়? মানুষের মন তো একরৈখিক নয়। কত যে জটিল বাঁক সেখানে! আমি শিল্পের জন্য শিল্পে বিশ্বাসী নই, কিম্বা এইভাবে বলি যে আমিই তার যোগ্য নই। তাই আপাত অর্থহীন মায়াময় ব্যক্তিগত গদ্য লেখায় আমার পারদর্শিতা জিরো। অথচ ঐরকম অনেক লেখাই আমি পড়ে মুগ্ধ হয়ে গেছি। কিন্তু আমি ব্যক্তিগত ভাবে চিরকাল মানুষের মনের বিচিত্র গোলকধাঁধা অনুভব করে বিস্মিত হয়েছি, সেই আলোছায়াকেই ধরতে চেয়েছি প্রাচীন ক্যামেরার মতো আমার কলমে। যাতে স্পষ্ট ছবি না উঠে কোথাও একটু কুয়াশা জমে থাকে আর সেটাই পাঠককে চিন্তার খোরাক যোগায়।
গল্পপাঠ: আন্তর্জালিক প্রসারে অনলাইনে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার দাবি করা হয়। এ নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
প্রতিভা সরকার: আন্তর্জাতিক বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা অন লাইনে হয় তো। অন্তত তার ভিতটুকু গড়ে ওঠে। ধরুন, কোনও একটি বইয়ের আলোচনা পড়ে এমন অভিভূত হলাম যে তখনই আনিয়ে নিলাম। কে সাহিত্যে নোবেল পেলেন, কে বুকার, তাদের কার কী বৈশিষ্ট্য, সব জানিয়ে দেয় অন্তর্জাল। বই আনাতেও সাহায্য করে। অনেকগুলো গ্রুপ আছে, যাতে অন্তর্ভুক্ত হতে পেরে খুব উপকৃত হয়েছি। এত ভালো সাহিত্য আলোচনা হয় সেখানে !
তবে এটাও ঠিক যে সমাজ মাধ্যমে আসল জিনিস খুঁজে বার করতে ঢের সময় নষ্ট হয়। হয়ত একটা সিরিয়াস কিছু পড়ছি, মাঝখানে দুম করে একটা মেসেজ এল, একটা ছবি, সেরেংগেটির একটি ভালো রিল চোখে পড়ে গেল, কিম্বা আমির মীরের দুকলি গান শুনে সব ভুলে গেলাম।
গল্পপাঠ: 'ভাইবোন' গল্পটি লেখার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে জানার আগ্রহ হচ্ছে - সংক্ষেপে কিছু বলুন।
প্রতিভা সরকার: প্রত্যেকটি গল্পের নিজস্ব প্রাণ আছে। যতই পাঁয়তারা কষে লিখতে বসি না কেন, যা ভেবেছিলাম শেষে যে তা-ই দাঁড়াবে, এরকমটা প্রায় হয়ই না বলা চলে। ভাইবোন গল্প লেখার সময় শুধু একটি ছবি ছিল আমার চোখের পাতায়। ডোমেদের ধর্মঘটে ব্যতিব্যস্ত মফস্বলি শ্মশান পার্টিকে ফিরিয়ে দিয়ে সকালে লাশ নিয়ে যেতে বলেছে, তাই বাড়ির বাইরের তুলসি তলায় জমাট অন্ধকারের ভেতর বৃদ্ধার মৃতদেহ শায়িত। পিশাচযোনি প্রাপ্তির ভয়ে ছাদের নিচে তা আর ঢোকানো যাবে না। আমি এই ঘটনা নিজে চোখে দেখিনি, শুধু শুনেই ছবিটা আর চোখ থেকে মুছতে পারিনি। তিনি তো কারও মা, কারও শ্বশ্রুমাতা, কারও পিতামহী, কিন্তু নিজের ঘরে আর তাকে কেউ ক্ষণিকের জন্যও ফেরাবে না। গল্পটা শুরুর সময় শুধু এই নিষ্ঠুর ছবিটাই ছিল আমার কাছে। তারপর গল্পটা এগিয়েছে নিজের ছন্দেই। শেষে দেখি যে সন্তান সবচেয়ে দুর্ব্যবহার করেছিল, তার চরিত্রের বিভিন্ন শেডগুলিই মুখ্য হয়ে দাঁড়াল।
এটাই ভাইবোন গল্পের প্রেক্ষাপট।
গল্পপাঠ: মানুষের স্বভাবজাত ব্যবহার ও দ্বন্দ্বের এই গল্পটি(ভাইবোন) কি আপনি এক বৈঠকে লিখেছেন, না কি দীর্ঘ সময় ব্যয় করে এর আখ্যান বুনেছেন?
প্রতিভা সরকার: কোন গল্পই আমি এক বৈঠকে শেষ করতে পারিনি। ক’দিন লাগবে তা মূলত নির্ভর করে গল্পটির ওপর। কারণ শুরু করার পর সে যে আমার সচেতন নির্দেশ মান্য করবেই, এরকমটা প্রায়ই হয় না। বরং তার নিজের ভেতর থেকেই উঠে আসে পথ, যাতে আমাকে যাত্রা করতে হয়। আমি তাকে অনুসরণ করি মাত্র। হয়ত নিজেরই অবচেতন আমাকে তখন তাড়িয়ে বেড়ায়। গল্পের ভুবনের বাইরে কতটা কাজের চাপ থাকে তার ওপরও লেখার গতি নির্ভর করে। লিখতে থাকলে বা লেখা নিয়ে চিন্তার সময় সাংসারিক বা ব্যবহারিক কাজের ডাক আমার খুবই বিরক্তি উৎপাদন করে। খিটখিটে হয়ে যাই। কাছের লোকেদের ওপরই সেই বিরক্তির ভার গিয়ে চাপে। বিশেষ করে উপন্যাস লেখার সময় এইরকম খুবই হয় দেখেছি।
ভাইবোন গল্পটি লিখতে চার পাঁচদিন লেগেছিল মনে হয়। ভুলে গেছি।
গল্পপাঠ: ‘পুত্রার্থে’ গল্পে পুত্রবধূর প্রসঙ্গ একেবারেই গুরুত্ব পেল না- পুত্রের বয়ানের পাশাপাশি পুত্রবধূর কাছ থেকেও পাঠকের কিছু শোনার আগ্রহ হতে পারে– এমন ভাবনার বিপরীতে কী বলবেন আপনি?
প্রতিভা সরকার: পুত্রার্থে এক মা আর তার সন্তানের মধ্যকার আকর্ষণ বিকর্ষণের গল্প। সেখানে পুত্রবধূ খুব গুরুত্বপূর্ণ কেউ নয়। সে নেহাতই পার্শ্বচরিত্র। ধরতাই দেবার জন্য আছে। ছোট গল্পে তো সব চরিত্রকে সমান জায়গা দেওয়া যায় না, চড়া আলো পড়ে মূল চরিত্রগুলির মুখে। ঘটনা বা ঘটনার অভাবও একটা নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে রাখতে হয়।এই মাত্রাবোধই গল্প ঢালাইয়ের জান। লেখার সময় খুব সতর্ক থাকি, যেন অনেক ঘটনা, অনেক চরিত্র এসে মূল ফোকাসটিকে না নড়িয়ে দেয় ! এই কারণেই পুত্রার্থে গল্পে মা আর ছেলের মধ্যেই মূল প্রবাহকে সীমিত রেখেছি। পুত্রবধূকে ততটা জায়গা দিইনি।
গল্পপাঠ: সাধারণত আপনি কোন পুরুষে লিখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন ?
প্রতিভা সরকার: উত্তম পুরুষে সাধারণত আমি লিখি না। এটা ঠিক যে নিজের প্রত্যেক লেখায় লেখক নিজে কিছু কিছু ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকেন। কিন্তু তাই বলে তিনিই তো সবটা নন। অভিজ্ঞতা, কল্পনা, সবকিছুই থাকে। তাই উত্তম পুরুষে লিখতে আমার কেমন যেন বাধো বাধো লাগে। মনে হয় মিথ্যাচার করছি। খুব হাস্যকর এই মনে হওয়া, কিন্তু হয়। তবে একেবারেই লিখিনি তা নয়। ছোট গল্প কয়েকটি লিখেছি। সেগুলোতে ‘আমি’ খুব বেশি করেই উপস্থিত। সেগুলো লিখতে গিয়ে আমার মনে হয়েছে চার্চে কনফেশন বা স্বীকারোক্তির কথা। নিজের কাছ থেকে যে সব কথা নিজেই লুকিয়ে রাখতে চেয়েছি, উত্তম পুরুষ ব্যবহার করতে গিয়ে কখন যেন নিজের কাছে তা-ই বলে বসেছি।
আর একটা কারণ আছে, সেটা আমার ক্ষেত্রে হয়ত প্রযোজ্য নয়, কিন্তু এইরকম অনেক দেখেছি, বয়সে ছোটদের কাছে শুনেছি, যে মহিলা লেখক আমি আমি করে লিখলে, কিছু পাঠক পড়তে পড়তে তাঁকেই কল্পনা করেন এবং মেসেঞ্জারে এসে শুধিয়ে যান, এই অভিজ্ঞতা সত্যি আপনার ? কি করে এটা হল? আপনার মুখটাই চোখের সামনে বার বার ভেসে উঠছিল, জানেন!
বাঙালি পাঠকের অকারণ ফ্যান্টাসি আর কৌতূহলও মেয়েদের উত্তম পুরুষ ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটা বাধা। তবে আজকাল মেয়েরা এসবকে আর পাত্তা দেন না ।
গল্পপাঠ: ২০২১ এর নোবেলজয়ী সাহিত্যিক আবদুল রাজ্জাক গুরনাহের মতে স্মৃতি খুব জরুরি। এটাই সব কিছুকে বাস্তব করে তোলে। তাঁর এই ভাষ্যের সঙ্গে কি আপনি সহমত ?হলে কেন, না হলেই বা নয় কেন ?
প্রতিভা সরকার: হ্যাঁ, স্মৃতি তো খুব জরুরি বটেই। সাহিত্য তো আর তাৎক্ষণিক ভাবে সৃষ্টি হয়না বরং ওয়ার্ডসওয়ার্থ সাহেব অনেকটা ঠিক, ইমোশনস রিকালেক্টেড ইন ট্র্যাঙ্কুইলিটি, শেষ শব্দটা অবশ্য অপ্রিহার্য নয়। ট্র্যাঙ্কুইলিটি এখন আর কোথায় ! বাণিজ্য যুদ্ধ পৃথিবীকে কোথায় নিয়ে দাঁড় করাবে, কে জানে ! ব্যাপক অসততা আর দুর্নীতিতে কেউ ঠিক থাকতে পারে ? তাই ট্র্যাঙ্কুইলিটি না থাকলেও সাহিত্য সৃষ্টি হবে। বিক্ষিপ্ত মন, বিক্ষুব্ধ চেতনা বরং সেই মেজাজকে আরও সার্থকভাবে চারিয়ে দিতে পারে।
গুরনাহ সাহেবের সঙ্গে ভারতীয় লেখকদের একটা জায়গায় তো চূড়ান্ত মিল, আমরা ঔপনিবেশিকতার প্রত্যক্ষ শিকার। সে কারণে একই অপমা্নজনক পরিস্থিতি, এক অত্যাচার, নিপীড়ন এবং মানসিকতার মধ্য দিয়ে যাবার অভিজ্ঞতাগুলি একরকম। সেই স্মৃতি বহন করে নিয়ে যাবার মধ্যে শুধু তাকে জিইয়ে রাখা নয়, উত্তরপুরুষকে তা ভুলতে না দেবার একটা ব্যাপার আছে। দেশভাগের স্মৃতি নিয়ে শুধু বাংলায় যে পরিমাণ সাহিত্য, সার্থক সাহিত্য রচিত হয়েছে তা ভাবা যায় না। ব্রিটিশ শাসনের অবদমন ও তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের লেখা ঢোঁড়াইচরিতমানস এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা।
গল্পপাঠ: সাহিত্যের অনেক বোদ্ধা মনে করেন বিশ্ব সাহিত্য পাঠ না করলে সাহিত্যচর্চায় এক ধরনের ভ্যাকুয়াম তৈরি হয়। এ প্রসঙ্গে আপনার মতামত কি?
প্রতিভা সরকার: নিশ্চয়ই হয়। নিজের বহুভাষিক দেশে অন্য ভাষাতে কী লেখা হচ্ছে তাতে আমার যেমন আগ্রহ, তেমনি গোটা পৃথিবীতেই সাহিত্যচর্চা কী রূপ নিচ্ছে তা জানার প্রচণ্ড তাগিদ অনুভব করি। বিশ্ববীক্ষণ যদি অপূর্ণ থাকে, তাহলে লেখকের দৃষ্টির প্রসারতাও কমে যায়, আমার তো এইরকমই মনে হয়। তবে সবচেয়ে আগে নিবিড় করে জানতে হবে নিজের প্রতিবেশ ও নিজের দেশকে। দেশ মানে তো কেবল বড় বড় শহর অট্টালিকা,ঝাঁ চকচকে রাস্তা নয়। নয় কেবল নদী পাহাড় মরুভূমি বা দ্বীপপুঞ্জ। এইসবের মধ্যমণি যে মানুষ, যাকে নাহলে প্রকৃতির সমস্ত আয়োজন অপূর্ণ থেকে যায়, তাকে জানাটাই শেষ কথা। সে প্রকৃতিরই অচ্ছেদ্য অঙ্গ, আবার আত্মাও বটে।
তবে সত্যিকারের প্রতিভাধর যে সাহিত্যিক, তাঁর যেন তৃতীয় নয়ন থাকে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় নাকি দশদিনের অভিজ্ঞতায় পদ্মানদীর মাঝি লিখেছিলেন। আবার সাম্প্রতিক কালেও একেবারে দেশজ উপাদান যে লেখার উপজীব্য সেরকম সাহিত্যখন্ডের বিশ্বজয়ের কথা আমরা জানি। এমনকি ঝুম্পা লাহিড়ি, অমিতাভ ঘোষেরা তাদের বিপুল আন্তর্জাতিক সাহিত্যপাঠের অভিজ্ঞতা নিয়েও দেশজ উপাদানকে অবহেলা করেন না। আমার মনে হয় বিশ্বসাহিত্য পাঠ আমাদের ওয়াকিবহাল রাখে, নতুন প্রকাশভঙ্গির খোঁজ দেয়, যে শেকড় দৃঢ়ভাবে নিজস্ব মাটিতে প্রোথিত তাকে অভূতপূর্ব পুষ্টি দেয়।
গল্পপাঠ: কুয়াশার পাখি অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়ে হঠাৎ শেষ হয়ে গেল।গল্পটিকে এভাবে ওপেন এন্ডেড রাখবেন, এটা কি পূর্বপরিকল্পিত নাকি লিখতে লিখতেই মনে হয়েছে এখানে থেমে যাবেন ?
প্রতিভা সরকার: কুয়াশার পাখি এক কিশোরীর গল্প যে দাদুর খামারবাড়িতে বেড়াতে এসে তার জীবনে প্রথম বারের মতো পুরুষের আপাদমস্তক নগ্নতা দেখে ফেলে। সে শিহরিত হয়, আবার অপরাধবোধে ভোগে। তার এই “কনফিউশন”, দ্বান্দ্বিক বিব্রত মানসিকতাকে আর কোথায় নিয়ে যাওয়া যেত ? গল্পটি যেন প্রথম থেকেই ঠিক করে নিয়েছিল ও ওপেন এন্ডেড হয়েই ছাড়বে।
গল্পপাঠ: সাহিত্যে আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে আপনার মতামত জানতে চাই। “কুয়াশার পাখি” গল্পে ব্যবহৃত আঞ্চলিক ভাষাটি কোন অঞ্চলের ?
প্রতিভা সরকার: আমার মনে হয় নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটসংলগ্ন কাহিনিতে সেই জনপদের ভাষা ব্যবহার করলে তার বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ে। তবে তা অত্যন্ত শ্রমসাধ্য কাজ। আমার একটি বড় খাতা এই শ্রমের সাক্ষী। আঞ্চলিক ভাষার নামে বিকৃত মনগড়া বাক্যসমষ্টি ব্যবহার করলে তা অত্যন্ত বেদনাদায়ক হয়।
উত্তরবঙ্গে পূর্ব পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ আমলে, এমনকি ব্রিটিশ আমলেও প্রচুর মানুষ এসেছেন, যারা “বাঙ্গাল” উত্তরাধিকার বহন করেন। তাদের দেশজ ভাষা স্থানীয় রাজবংশী এবং অন্যান্য ভাষার সঙ্গে মিলে মিশে এক মিশ্র ভাষার জন্ম দিয়েছে। কুয়াশার পাখি এবং দাঙ্গা পরবর্তীতে আমি এই ভাষার ব্যবহার করেছি। আমার অনেকটা সময় উত্তরবঙ্গে কেটেছে। এই ভাষা আমার নিজের ভাষা।
গল্পপাঠ: বলা হয়ে থাকে, সাহিত্যের শেষ কথা মানুষ অন্বেষণ। এই বক্তব্যের সঙ্গে আপনি কতটা সহমত ? সাহিত্যে এই অন্বেষণের গন্তব্যকে আপনি কীভাবে চিহ্নিত করবেন ?
প্রতিভা সরকার: হ্যাঁ, আমি সহমত। মানুষের থেকে আগ্রহোদ্দীপক আর কী ! তার মানসিকতা, বিভিন্ন সম্পর্কের পরত এতো আশ্চর্য এবং অনুধাবনযোগ্য, যে সেই মনোরাজ্যে একটু প্রবেশাধিকার পেলেই মনে হয়, সত্য সবসময়ই কল্পনার থেকে বেশি অভাবিত।
কী ভাবে চিহ্নিত করব আর ! লেখায় তাকে বার বার নিয়ে এসে, মঞ্চে যেমন তীব্র আলো পড়ে অভিনেতার ওপর, তেমনি ভাবে তার মহত্ত্ব, দীনতা সমস্ত কিছুকে অকপটভাবে অবারিত করব। এই উচ্চাশার যোগ্য করে তুলতে হয় নিজেকে। কিন্তু সময় বড় কম।
গল্পপাঠ: গল্পের চরিত্র গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আপনি কী ধরনের কৌশল বা পদ্ধতি ব্যবহার করে থাকেন ? বলতে চাইছি, গল্পভাবনা মাথায় আসার পর চরিত্রগুলি নিয়েও কি আগাম ভাবনাচিন্তা করে তাদের গড়ে তোলেন, নাকি লিখতে লিখতেই তারা মূর্ত হয়ে ওঠে ?
প্রতিভা সরকার: আমার ক্ষেত্রে লেখালিখি অত নিয়মের নিগড়ে বাঁধা নয়। আমি স্বভাবেও বেশ ঢিলেঢালা। জিনিস হারিয়ে ফেলি। একই রুটিনে দিন কাটাই না। খুব কঠোর নিয়মানুবর্তিতা আমার জন্য নয়। আজ লিখে পরের একমাস নাও লিখতে পারি। প্রথমে গল্পভাবনা না এসে একটি চরিত্রের রূপরেখাও আসতে পারে। সমগ্র ভাবনা না এসে কাহিনির একটি খুব তুচ্ছ বীজ উপ্ত হতে পারে। সেটাই পরে ডালপালা মেলে দেয়। বিশেষ করে ছোট গল্পের ক্ষেত্রে এটাই হয়। কোনও একটি সূত্র মিললে সময় করে বসে যাই। হাত আপনিই যেন চলতে শুরু করে।
গল্পপাঠ:“দাঙ্গা পরবর্তী” গল্পে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের কথা এসেছে, বাংলাদেশি পাঠকমাত্রেই আলোড়িত হবেন। এরকম একটি গল্প লেখার প্রস্তুতি কেমন ছিল? একটা নতুন দেশের অভ্যুদয় আর পরাগায়ণের যে বর্ণনা এই গল্পে উঠে আসে– পাশাপাশি টুনু চরিত্রটির সাবালকত্ব প্রাপ্তির যে ছবিটি আপনি এঁকেছেন, এককথায় তা অনবদ্য ! শিল্পীর মতো শব্দে শব্দে এইরকম একটি ছবি কীভাবে আঁকলেন ?
প্রতিভা সরকার: সময় পরিস্থিতি এত দ্রুত পালটায়, নিজেরই আশ্চর্য লেগে যায়। এখন যে বাংলাদেশ, শুনতে পাই সে মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করতে চায়। ইতিহাস মুছে দিতে চায়। ব্যতিক্রম সর্বত্র আছে। ওখানে আমার পরিচিত অনেকেই অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে এইসবের বিরুদ্ধে বলতে বা লিখতে পিছপা হন না। সেই মুক্তচিন্তার মানুষ ছাড়া তৌহিদি জনতা এই গল্প পড়ে আলোড়িত হবে ? সেই অভ্যুদয় আর পরাগায়ণকে মিলিয়ে পড়বে ?
এই সচেতন বিস্মরণের বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকে এই ধরনের সাহিত্যসৃষ্টি। সেইজন্যই বলছিলাম স্মৃতি ক্ষেত্রবিশেষে আয়ুধের কাজ করে। কলম তরবারি হলে স্মৃতি তাতে শান দেবার পাটা।
কীভাবে এঁকেছি বলতে পারব না। একটি সৃষ্টি সম্পূর্ণ হলে তাকে নিয়ে ভাবা বন্ধ করে দিই। নাহলে নতুন বিষয়কে মগজের কুঠুরিতে ঠাঁই দিতে সুবিধে হয়।
গল্পপাঠ: আপনার প্রথম উপন্যাস মানসাই-এর জন্মকথা নিয়ে কিছু বলুন।
প্রতিভা সরকার: আমি যখন স্কুলের নিচু ক্লাসে পড়ি, তখন আমার শহরে প্রথম রাজনৈতিক হত্যাটি সংঘটিত হয়। এক সাম্যবাদী পার্টির রাজনৈতিক কর্মীকে অন্য দলের গুন্ডারা খুন করে। তাও প্রকাশ্য দিবালোকে। ওই ছোট শহরে এই ঘটনার অভিঘাত হয়েছিল মারাত্মক। লোকে ঘরের ভেতরেও গলা নামিয়ে এইসব আলোচনা করত। আমরা কিছু না বুঝেই হাঁ করে সেইসব শুনতাম। সেই আতঙ্কের কোনও তুলনা হয় না। জীবনে প্রথম যেন অশুভের মুখোমুখি হওয়া। তারপর তো এ ধরনের খুনখারাপি জল্ভাত হয়ে গেল।
ছোট্ট মেয়েটির মনে সেই ঘটনার যে কী অমোচনীয় ছাপ পড়েছিল, তা বুঝলাম মানসাই লিখতে গিয়ে। বাঁধভাঙা স্রোতের মতো চলে এল স্মৃতির জোয়ার, যা দেখেছি, শুনেছি, তার সঙ্গে অধ্যয়নকে মিশিয়ে লেখা হল মানসাই।
গল্পপাঠ: শিরোনাম হিসেবে খুব পরিচিত নয়, এমন একটি নদীর নাম বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ কোন কারণ রয়েছে কি ? উপন্যাসটিকে পুরোপুরি রাজনৈতিক আখ্যান হিসেবে অভিহিত করা যায় কি ?
প্রতিভা সরকার: মানসাই আমার ছোটবেলার নদী, যার সম্বন্ধে অজস্র কথা উপকথা চালু রয়েছে। যে বর্ষায় হয়ে উঠত ভয়ংকরী, রাতে তার গর্জন শুনতে শুনতে আমরা ভাইবোনেরা পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে ভাবতাম কাঠের পুল উপড়ে নিয়ে যাবে মানসাই, আমরা সবাই ভেসে যাব। আবার পুজোর পর এই নদীতেই নৌকাবিহার করে বিসর্জন দেখার সুখ এখনও যেন চোখের পাতায় মায়াকাজলের মতো লেপটে আছে। অনেকটা পথ চলে আসার পর এখন মনে হয় জীবন সত্যিই মানসাইয়ের মতো জলধারা, যার ভাঙা গড়া, বন্যা খরা, সব মিলিয়ে সে একটি অস্তিত্বের মতো অস্তিত্ব, আবার ফেটে যাবার জন্য নিরুপায় অপেক্ষারত এক বৃহৎ বুদবুদও বটে। জীবনের এই দ্বৈত সম্বন্ধে আমাকে প্রথম পাঠ দিয়েছিল মানসাই। এই উপন্যাসের প্রীতিলতাও কি নদীর কাছ থেকেই এই শিক্ষা নিয়েছিল ? তাহলে সেও আর এক নদী, আর এক মানসাই ।
আমি খুব সচেতনভাবে মানসাইকে একটি রাজনৈতিক উপন্যাস হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছি। পেরেছি কিনা সে তো পা্ঠক বলবেন।
গল্পপাঠ: আপনার গল্প কিংবা উপন্যাসের শক্তিশালী এক অনুষঙ্গ আপনার ভাষা। এমন ভাষাশৈলী রপ্ত করার পেছনে আপনার অনুশীলন পর্ব নিয়ে যদি কিছু বলেন।
প্রতিভা সরকার: প্রথম অনুশীলন পর্ব শুরু হয় আমার পিতামহের কাছে। তদানীন্তন বার্মা ফেরত এই মানুষটি গুণের সাগর ছিলেন। যেমন তার হাতের কাঠের কাজ তেমনি তার বন্দুকের টিপ। চার বছর বয়সে রামায়ণ মহাভারত তোতাপাখির মতো সুর করে স্মৃতি থেকে বলতে পারতাম তাঁরই জন্য। তাঁর হাতে লেখা শিকারের গল্প এখনও সযত্নে রাখা আছে আমার কাছে।
এছাড়া আমাদের বাড়িতে খুব বই পড়বার চল ছিল। আমরা একই বিষয়ের ওপর কবিতা লিখে বাবার অফিস থেকে বাড়ি আসবার প্রতীক্ষায় থাকতাম। যারটা ভালো হবে সে পুরস্কৃত হবে।
বইয়ের নিচে বই লুকিয়ে আমি কত যে উপন্যাস পড়েছি ! ক্লাস সিক্সেই আশাপূর্ণাকে না বুঝে গোগ্রাসে গিলেছি। পড়েছি ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে। সব মিলিয়েই হয়ত আমার ভাষা আমার হয়ে উঠেছে। এর বেশি কিছু আর আছে বলে মনে হয় না।
গল্পপাঠ: অনেক পাঠক মনে করেন “ ছোটগল্প শিল্পরূপটাই আপনার খাসতালুক।” উপন্যাসের ক্ষেত্রে পাঠকের প্রতিক্রিয়ায় তার বিস্তৃতি সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল হয়েছেন কি ?
প্রতিভা সরকার: হ্যাঁ, এইরকম শুনেছি। কিন্তু উপন্যাসের প্রচুর প্রতিক্রিয়া পাই। চেনা অচেনা সকলেই দেন। প্রায় প্রতি হপ্তায় একটি করে আলোচনা পাই মেসেঞ্জারে। আমি আবার সপ্তাহান্তে সেগুলো পোস্ট করব বলে জমিয়ে রাখি। সবাই প্রশংসা করেন, বিরূপ মন্তব্য দু একটি পেয়েছি, কিন্তু তারা ঠিক যুক্তি দিয়ে বোঝাতে পারেননি ত্রুটিমুক্তির জন্য কী কী করা উচিত। উল্টোদিকে শুধু ভালো লেগেছে বলে কেউ ছেড়ে দেননি, বিস্তারিত লিখেছেন, কেন ভালো লেগেছে। আমার উপন্যাস এবং ছোটগল্পও বহুপঠিত। আমি এই অনুযোগ করতেই পারব না যে এখনকার পাঠক উদাসীন। প্রতিক্রিয়া দিতে অলস। বরং এই প্রশ্রয়ের জন্য তাদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ।
তবে কিনা আমার সেরা উপন্যাসটি আমি এখনও লিখে উঠতে পারিনি। চেষ্টায় আছি।
গল্পপাঠ: গুনিন ও বেলেহাঁস কী ধরনের বই ? বইটির বিষয়বস্তু নিয়ে আমাদের কিছু বলুন।
প্রতিভা সরকার: এটি একটি গল্পসংকলন। বোধহয় তেরটি গল্প আছে। আমি প্রবাসে আছি। তাই বইগুলো হাতের কাছে নেই। এতে নানা ধরনের গল্প আছে। সব সাধারণ মানুষের গল্প। রাজরাজড়া, ভুত প্রেত কিছুই নেই। তবু এটি বহু মানুষ পড়েছেন।
গল্পপাঠ: আপনার দ্বিতীয় উপন্যাস খাঁচার ভিতর অচিন পাখি। এটি নিয়ে কিছু বলুন।
প্রতিভা সরকার: না না, অচিন পাখি আমার ছ’ নম্বর উপন্যাস। তবে চিন্তাভাবনার দিক থেকে এটি তৃতীয় । এর আগে রসিকার ছেলে বেরিয়েছে। কমলেকামিনীর কিসসা বেরিয়েছে। একটি মৃত্যু ও পুনর্জন্ম, রেশমকীটের গান আর অচিন পাখি একসঙ্গে বইমেলার আলো দেখেছে।
এটিও একটি রাজনৈতিক উপন্যাস। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস নিয়ে লিখিত।
গল্পপাঠ: গল্প উপন্যাসের পাশাপাশি আপনি অনুবাদেও দারুণ স্বাচ্ছন্দ্য। যদি এই তিন মাধ্যমকে আপনার পছন্দ অনুযায়ী সাজাতে বলা হয়, আপনি কী ভাবে সাজাবেন ?
প্রতিভা সরকার: অনুবাদ করার কাজটি আমার খুব প্রিয়। গল্পপাঠকে ধন্যবাদ, তাদের প্রেরণাতেই বেশিরভাগ অনুবাদ করেছি। আমি সবার প্রথমে রাখব উপন্যাস। তারপর ছোট গল্প এবং অনুবাদ।
গল্পপাঠ: অনুবাদের ক্ষেত্রে মূল লেখায় লেখক তার যে কৃষ্টি-সংস্কৃতি বা আচার আচরণের প্রকাশ ঘটিয়ে থাকেন, অনুবাদক সেখান থেকে সরে গিয়ে নিজের মতো সেটা প্রকাশ করতে পারেন কি ? উদাহরণ; একজন হিন্দু লেখক যিনি তার গল্পে সৌজন্যমূলক সম্বোধনে নমস্কার কথাটি ব্যবহার করেছেন, একজন মুসলিম অনুবাদক কি সম্বোধনটিকে সালামে রূপান্তরিত করতে পারেন ? ভাইসভার্সা।
প্রতিভা সরকার: এই প্রশ্নটি খুবই ইন্টারেস্টিং। অনেক সময়ই অনুবাদ করতে গিয়ে খুব ভারী ভারী বিদেশি নামকে আমার সংক্ষেপ করতে ইচ্ছে হয়েছে। কারণ অনেক পাঠককে দেখেছি ওই নাম মনে রাখতে হবে ভেবে পড়াই বন্ধ করে দিয়েছেন। মুশকিল হচ্ছে নামও কিন্তু কৃষ্টি সংস্কৃতির অঙ্গ। কী ভাবে অনুবাদে একেবারে অচেনা পরিবেশ, রীতি রেওয়াজকে সহজবোধ্য ও কৌতূহলদ্দীপক করা যায়, তা নিয়ে ভাবনাচিন্তার অবকাশ আছে।
গল্পপাঠ: অনুবাদ নিয়ে আপনার কোনও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা রয়েছে কি ?
প্রতিভা সরকার: সময়ের খুব টানাটানি। মনের মতো উপন্যাসটি, যা এখনও ভবিষ্যতের গর্ভে রয়েছে, তাকে সাকার করে তবে বিষয়টা নিয়ে ভাবব।
গল্পপাঠ: একজন রাজনীতি সচেতন লেখক হিসেবে “ সাহিত্যের রাজনীতি”কে কীভাবে দেখেন ?
প্রতিভা সরকার: সাহিত্যের রাজনীতি? সে অতি বিষম বস্তু। এ জগতের বেশির ভাগ মানুষ দলভিত্তিক রাজনীতি সচেতন। বোঝাই যাচ্ছে, সেটি সবসময় আদর্শ প্রণোদিত হতে পারে না। বরং তা ব্যক্তিগত স্বার্থপ্রণোদিত। নিজস্ব রাজনীতির বাইরে দেশের রাজনীতি সম্বন্ধে সুস্পষ্ট ধারণা আছে প্রত্যেকের। কিন্তু তবু আদর্শের নামে সঙ্গবদল এখানে আকছারই ঘটে। এবং অবশ্যই ব্যক্তিস্বার্থে ঘটে। আমি প্রখর রাজনৈতিক জীব। কিন্তু পুরনো সৌজন্য মেনে চলি। একই পাড়ায় বিভিন্ন মতের মানুষ বাস করেন। বিপরীত বিশ্বাসের জন্য আরেক জনের ঘোর বিপদে পাশে দাঁড়াব না, এই মেরুকরণে আমার বিশ্বাস নেই। আমি নিজের মতো থাকি। আমার কোনও দল নেই । আমি কারও মদতপুষ্ট নই। আমার সাহিত্য রাজনীতিভিত্তিক, কিন্তু অনেক স্বপ্নভঙ্গের পরে এখন আমার মতাদর্শে বিশ্বাসী কাউকে দেখলেই বিগলিত হই না। কারণ জানি, মতাদর্শের বাইরে তিনি আবার “সাহিত্যের রাজনীতি”- কেই বেশি গুরুত্ব দিতে পারেন। কোনও মার্কড গ্রুপে আমি একারণেই থাকতে চাই না। আমি স্তাবকতা করতে পারিনা। কিন্তু কৃতজ্ঞতা স্বীকারে সদা স্বতঃস্ফূর্ত । অতি অল্প হইল বলে তাতে যদি ক্ষমতাবানেরা রুষ্ট হন, আমি নাচার।
তের বছর ধরে লাগাতার লিখছি। মাত্র দু তিনজন বিখ্যাত সাহিত্যিক উৎসাহ দিয়েছেন। ভালো লাগা, মন্দ লাগা জানিয়েছেন। বই আলোচনা করেছেন, ভূমিকা লিখেছেন। তাঁদের কাছ থেকে অনেক শিখি। কিন্তু এর বাইরে অকারণ বিরোধিতা, মিথ্যে নিন্দেমন্দ, গালাগালি আমার কপালে প্রচুর জুটেছে। মিথ্যে কথায় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির কান ভারী করা হয়েছে। সাময়িকভাবে খুব কষ্ট পেয়েছি। আবার লিখতে বসে সব ভুলে গেছি। কিন্তু এইসব আমাকে কিছুটা চিরস্থায়ী বিষণ্ণতা দিয়েছে। আগের মতো প্রাণখোলা হাসি হাসতে পারি না যেন আর।
গল্পপাঠ: নারী লেখকের লেখাজোখা পাঠে পুরুষ পাঠকের একধরনের অনীহা কাজ করে। এখানে একটা জরিপের কিছুটা তুলে ধরলে বিষয়টা স্পষ্ট হবে। ২০২১ সালে সর্বোচ্চ বিক্রি হওয়া ১০টি নারী লেখকের বই এর জরিপে দেখা গেছে(যেখানে জেন অস্টিন থেকে শুরু করে মার্গারেট অ্যাটউড রয়েছেন) পুরুষ পাঠক ১৯% এবং নারী পাঠক ৮১%। অন্যদিকে পুরুষ লেখকদের ১০টি শীর্ষ বইয়ের জরিপে(যেখানে চার্লস ডিকেন্স, জেআরআর টলকিয়েন, লি চাইল্ড এবং স্টিফেন কিং রয়েছেন) পুরুষ পাঠক ৫৫% এবং নারী পাঠক ৪৫%-- এরকম বাস্তবতায়, একজন নারী লেখক হিসেবে পুরুষ পাঠকের এই অনীহা প্রসঙ্গে আপনার অভিজ্ঞতা জানতে আগ্রহী।
প্রতিভা সরকার: তাচ্ছিল্যই এই অনীহার জন্য দায়ী বলে মনে হয়। মেয়েরাও যে লিখতে পারে, এটা মানতে অনেক নারী এবং পুরুষের এখনও প্রবল দ্বিধা হয়। যখন আমার প্রথম বইটি বাজারে আসে, সেটি একটি প্রবন্ধের বই ছিল, সেটি আজ অবধি বিক্রি হয়ে চলেছে, কিন্তু তখন থেকেই শুনছি মেয়েরাই নাকি আমার লেখা বেশি পড়েন। সত্যি হলে এতে আমি খুবই খুশি। মেয়েরা নিশ্চয়ই আমার লেখায় নিজেদের খুঁজে পান, তাই পড়েন। তবে প্রচুর পুরুষের কাছ থেকেও আমি প্রতিক্রিয়া পাই। এবং আমার দৃঢ় বিশ্বাস, ভালো বই পেলে যারা পড়ুয়া, নারী পুরুষ নির্বিশেষে তারা পড়বেন।
গল্পপাঠ : ধরুন, কোথাও কোনো জম্পেশ আড্ডায় বসেছেন। অকস্মাৎ আপনার মাথায় লেখার কোনো বিষয় উঁকি দিলো– সেই মুহূর্তে কী করেন?
প্রতিভা সরকার: আগে তো ভুলে যেতাম। এখন দু একটি শব্দ ফোনে লিখে রাখার চেষ্টা করি, পরে যদি গোটা চিন্তাটা মনে পড়ে যায়।
গল্পপাঠ: এই মুহূর্তে কোন বইগুলো পড়ছেন?
প্রতিভা সরকার: এই মুহূর্তে আমি ভ্রমণে বেরিয়েছি। ফাঁক ফোঁকরে পড়ছি নিখিল নাথ রায়ের জগত শেঠ এবং The Great Nicobar Betrayal. দ্বিতীয়টির লেখক পঙ্কজ শেখসারিয়া।
গল্পপাঠ: সময় নিয়ে আমাদের প্রশ্নগুলোর উত্তর লিখে পাঠানোর জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। গল্পপাঠের পক্ষ থেকে আপনার জন্য অনেক অনেক শুভকামনা।
প্রতিভা সরকার: এই সাক্ষাৎকারে মন খুলে কথা বলার সুযোগ দেবার জন্য গল্পপাঠ কর্তৃপক্ষকে অনেক ধন্যবাদ। ধন্যবাদ বার বার অনুবাদের সুযোগ দেবার জন্য।


12 মন্তব্যসমূহ
অনেক প্রশ্নের উত্তর পেলাম যেগুলো গল্প পড়তে পড়তে মনে এসেছিল। ধন্যবাদ গল্পপাঠকে এবং অবশ্যই লেখিকাকে।
উত্তরমুছুনধন্যবাদ জানবেন। নামহীন হয়ে মন্তব্য বেরুলে ভাল লাগে না। তাই মন্তব্যের নিচে যদি নিজের নামও লিখে দেন তাহলে বেশ হয়।
মুছুনখুব ভালো লাগলো এই আলাপচারিতা পড়ে।আমি খুব সাধারণ মেয়ে, বাংলা সাহিত্যের বাইরে বিদেশী লেখা অনুবাদ ছাড়া বেশি পড়িনি। লিখেছি আরও কম। লেখিকাকে ধন্যবাদ যে কি করে লেখাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় বা কিভাবে চালনা করতে হয় বা, কিভাবে লেখা নিজেই লেখকের ওপর কর্তৃত্ব বিস্তার করে এগুলো আমি শিখলাম ---হয়তো কিছু কাজেও লাগাতে পারবো।
উত্তরমুছুনঅনেক ধন্যবাদ দ্বিতীয় নামহীনকে। অনুরোধ রইল কারো কাছ থেকে কিছু না শেখবার। চলতে চলতে পথ আপনিই তৈরি হয়ে যাবে, দেখবেন।
উত্তরমুছুনসাক্ষাৎকার ভালো লাগল। আরও কিছু প্রশ্ন আসা উচিত ছিল। মহিলা লেখকদের ক্ষেত্রে এ-ই প্রশ্নগুলো আসা উচিৎ। তাদের কাজের জায়গা এবং সংসারের মধ্যে কিভাবে সমণ্বয়সাধন করা হয়। রসিকার ছেলের মতো উপন্যাসের রসদ তো শুধু বাহির থেকে আসে না। অন্তরের অনুভব ছাড়া হওয়া সম্ভব নয়। সেই অনুভূতি কিভাবে পাওয়া যায়। এইসব জানার খুব ইচ্ছা থাকল।
উত্তরমুছুনগল্পপাঠ কর্তৃপক্ষ আরও কিছু প্রশ্ন রেখেছিলেন। ঠিক এইগুলো নয়, তবে অন্য বিষয়ে। পুনরক্তি হতে পারে ভেবে আমিই সেগুলো বাদ দিয়েছি। তবে সে অন্য প্রসঙ্গ।
উত্তরমুছুনপ্রতিভা সরকার
খুব ভালো লাগলো অমূল্য আলাপচারিতা, গভীরভাবে উপলব্ধি পারলাম প্রিয় সাহিত্যিক ও মানুষটির চিন্তাভাবনা যার অনেকখানিই ছিলো অজানা। ভালো থাকবেন, শুভেচ্ছা আর শ্রদ্ধা জানাই। লিখে চলুন, পাঠক আপনার সাথে
উত্তরমুছুনজয়ন্ত সেনগুপ্ত
আন্তরিক ধন্যবাদ জানবেন।
মুছুনপ্রতিভা সরকার
'ফরিশতা'-র কাল থেকেই এই লেখকের লেখাপত্র নিরবচ্ছিন্ন ভাবে অনুসরণ করছি। তাঁর রচনাসমূহের 'হয়ে ওঠা'র ধারাটিও লক্ষ করি সতর্কভাবে। তাঁর ভাষা ব্যবহার ও বর্ণনার আঙ্গিক সমসাময়িক অন্যান্য উত্তম গল্পকারদের থেকে আলাদা। নির্লিপ্ত থেকেও কোনও আলোকিত উচ্ছ্বাসকে কী ভাবে পাঠকের অন্দরমহলে সঠিক পৌঁছে দেওয়া যায়, তাঁর গদ্য শৈলী সেটা প্রমাণ করতে পারে। বিষয় বেছে নেওয়া ও তার অপার বৈচিত্র্য তাঁর আরেকটি উল্লেখযোগ্য সিদ্ধি। অবিমিশ্র রাজনৈতিক বিশ্বাস এবং করুণাময় সত্ত্বার চারিত্র্য এই লেখকের সব রচনায় প্রত্যক্ষ হয়ে ওঠে।
উত্তরমুছুনসাক্ষাৎকারটির প্রশ্নাবলী ও তার লিপিবদ্ধ প্রতিক্রিয়া সংহত ও চমৎকার। জয় হোক,
ধন্যবাদ জানাই এই মূল্যবান মন্তব্যের জন্য।
উত্তরমুছুনপ্রতিভা সরকার
অনেক অজানা তথ্য জানলাম। অনেক ধন্যবাদ
উত্তরমুছুনভালবাসা ইন্দ্রাণী।
মুছুনপ্রতিভা সরকার