রোজ পাঁচটা করে পেপার আসে মহসিন মাস্টারের বাড়িতে। অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক। শিক্ষকতা করে জীবনের অর্ধেকের বেশি সময় কাটিয়ে দিলেও পেপার পড়ার অভ্যাসটা তার পুরাতন না। গত দশ বছর ধরে পড়ছেন, তবে একা না, সঙ্গে স্ত্রীও যোগ দিয়েছেন। একটা ঘটনা তাড়া করতে করতে তারা খবরের কাগজে আসক্ত হয়ে উঠেছেন। ৫টা কাগজই দেশের শীর্ষস্থানীয়। এর মধ্যে একটা ইংরেজিও আছে।
পেপার আসে বেশ সকালেই। কিন্তু দুজনে সকালের নাস্তা সেরে গোসল করে পেপার নিয়ে বসেন। বিষয়টা তাদের কাছে প্রার্থনার মতো দাঁড়িয়ে গেছে। অনেকটা সময় নিয়ে দুজনে প্রতিটা পাতা উল্টিয়ে-পাল্টিয়ে দেখবেন। যেহেতু কোনো সন্তান নেই, তাই সংসারে কারো জন্যে কোনো তাড়া নেই তাদের। প্রতিটা পেপার, প্রতিটা পাতা, প্রতিটা কলাম ভালো করে পড়বে দুজনে। পড়া শেষ হলে মহসিনের স্ত্রী রাবেয়া ক্যাচিটা আনবেন। লাল কালি দিয়ে দাগ দেওয়া খবরগুলো মহসিন ওর হাতে একটা একটা করে তুলে দেবেন, তিনি বেশ যত্ন নিয়ে কাটবেন। ছবি থাকলে ছবিসহ, না থাকলে শুধু খবরটুকু। একটুও এদিকসেদিক হবে না। এতো সময় নিয়ে কাটবেন যেন তাড়াতাড়ি কাটলে ভালো লাগা দ্রুতই ফুরিয়ে যাবে। বিরক্ত হওয়ার বদলে মহসিন আরো আগ্রহ নিয়ে দেখবেন। ফেলে আসা যৌথজীবনে স্ত্রীর আর কোনো কাজ তিনি এত আগ্রহ নিয়ে দেখেননি।
সবগুলো ধর্ষণ এবং ধর্ষণসংক্রান্ত খবর মহসিন রাবেয়ার হাতে তুলে দেবেন, রাবেয়া একটা একটা করে কাটবেন। একটা একটা করে ধর্ষণের খবর কাটবেন আর ওর চোখেমুখে আলো খেলে যাবে। একটা একটা করে ধর্ষণের খবরের কাটিং মহসিন হাতে নেওয়া মাত্রই মহসিনেরও চোখেমুখে সেই আলো ঝিলিক মারবে। যত বেশি ধর্ষণের খবর, তত বেশি খুশি ওরা। কোনো খবরে যদি লেখা থাকে বছরের পর বছর ধর্ষণের বিচার না পেয়ে পথে পথে ঘুরছে ধর্ষণের শিকার কন্যার পিতা, মাতা। তখন মহসিন চিৎকার করে হাসতে হাসতে বলবেন, ধর্ষণের বিচার? ধর্ষণের আবার বিচার হয় নাকি? এটা কি বিচার হওয়ার মতো কোনো অপরাধ?
ধর্ষণেরও আজকাল বিচার চায়? মানুষের কাণ্ডজ্ঞান দেখে বাঁচি না! বলে হেসে উঠবেন রাবেয়াও।
কাটিংগুলো এবার তারা আলাদা করেন। একদিকে রাখেন নতুন ধর্ষণ, আরেক দিকে রাখেন পুরাতন ধর্ষণের ফলোআপ, আরেক দিকে রাখেন ধর্ষণসংক্রান্ত কলাম বা কোনো এনজিও অথবা সংগঠনের সমীক্ষা। ওদের আগ্রহ মূলত নতুন ধর্ষণের দিকে।
আজ কত? ক্যাটাগরি অনুযায়ী আলাদা করার কাজ শেষ করে মহসিন জানতে চান।
বারোটা। রাবেয়া উত্তর দেন। ওরা নতুন ধর্ষণের ঘটনাটা কেবল গোণে।
গতকালের থেকে দুটো কম হলো যে! মহসিন এমন করে বলেন যেন এতে ওর মনটা খারাপ হয়ে গেছে। এশিয়া কাপে বাংলাদেশ মাত্র ২ রানে হেরে যাওয়াতেও এত কষ্ট পাননি এই ক্রিকেটপ্রেমী লোকটা।
সব খবর তো আসে না। কত খবরের চাপ মফস্বলের পাতায়। সব ধর্ষণের খবর ছাপতে পারে নাকি? কত গুরুত্বপূর্ণ খবর বাদ যায়, আর সামান্য ধর্ষণ...। রাবেয়া এমন করে বলেন যেন মনে হয় স্বামীকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন।
তা ঠিক। অনেকে আবার নানা কারণে রিপোর্টও করে না। চেপে যায়। নিশ্চয় সংখ্যাটা আরও বেশি হবে। মাত্র ১২! এত কম তো হওয়ার কথা না। মহসিনকে এখন কিছুটা নির্ভার মনে হয়।
পেপারগুলো সরিয়ে ধর্ষণের খবরের কাটিংগুলো এবার দুজনে নাড়াচাড়া করতে থাকেন। অনেকক্ষণ ধরে দেখে যেন কোনো আনন্দের সংবাদে তাদের চোখ এটে আছে। মেয়েটার ট্যালেন্ট পুলে বৃত্তি পাওয়ার খবর পত্রিকায় ছাপা হলে এভাবে ওরা দেখেছিল। এরপর মেয়েটা যখন ভার্সিটির ভর্তি পরীক্ষায় মেধা তালিকায় দ্বিতীয় হলো, কোসিং থেকে ছবিসহ পেপারে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছিল, বিজ্ঞাপনটা মনে হচ্ছিল বাবা মা চোখের সামনে টাঙিয়ে রাখে চব্বিশটা ঘণ্টা। মহসিন মাস্টার কাটিংটা তার এক ছাত্রকে দিয়ে লেমিলেটিং করিয়ে স্ত্রীর হাতে তুলে দেন। বলেছিলেন, বৃত্তিপাওয়ার ওই খবরটার সঙ্গে রেখে দাও।
আজও তিনি পেপারের কাটা অংশগুলো একত্রিত করে রাবেয়ার হাতে তুলে দেন। দিয়ে বলেন, ধর্ষণের আগের কাটিংগুলোর মধ্যে রেখে আসো। না বললেও রাবেয়া রাখতে যাবেন, রাখার জন্যই তো কাটা; কিন্তু বলাটা তার অভ্যাস।
রাবেয়া কাটিংগুলো নিয়ে যাবেন শোবার ঘরে। আলমারির সবচেয়ে বড় ড্রয়ারটা খুলবেন। এক ড্রয়ার সরিয়ে রাখা হয়েছে, আরেকবার ভর্তি হওয়ার পথে। প্রতিদিন নতুন কাটিং রাখার সময় আগের কাটিংগুলো নেড়েচেড়ে দেখাটা ওর অভ্যাস। রাবেয়া নেড়েচেড়ে দেখেন। প্রতিদিনকার মতো মহসিন পিছনে গিয়ে দাঁড়ান। এই দৃশ্যটা দেখতে দুজনেরই ভালো লাগে। ধর্ষণের খবরে ভরে উঠেছে তাদের আলমারির ড্রয়ার।
রাবেয়া ড্রয়ারটা খোলা রেখে উঠে দাঁড়াবেন। বিছানার নিচ থেকে আরো কিছু পেপার কাটিং বের করবেন—সেই কবেকার, লেমিলেশন করা। এক কিশোরী মেয়ের ছবির উপর হাত বোলাতে থাকবেন ধীরে ধীরে, যেন সময় এখানে নিশ্চল। নিচে পড়ে থাকে কিছু পেপার কাটিং। বছর দশেক আগের। কোনো একটাতে মহসিন মাস্টার এবং রাবেয়া খাতুনেরও ছবি ছাপা হয়েছে। দুজন একা দাঁড়িয়ে। বিচারের দাবি নিয়ে। বুকে প্ল্যাকার্ড। মহসিন এই কাটিংটা হাতে নিয়ে হাসবে। রাবেয়াকে দেখিয়ে বলবে, দেখো, বোকা দুজন মানুষের কাণ্ড দেখো। ধর্ষণ কি বিচার পাওয়ার মতো কোনো অপরাধ? দুজন বেকুব নাকি দিনের পর দিন বিচার চেয়ে যাচ্ছে! সমাজের শৃঙ্খলা নষ্ট করছে! এটা কোনো কথা হলো?
রাবেয়া এবার রেগে যাবেন। রেগে গেলেও হাসবেন। হাসতে হাসেতে উচ্চকণ্ঠে বলবেন, হ্যাঁ ধর্ষণ কোনো অপনাধ না। খুব সামান্য ঘটনা।
প্রতিটা বাড়ির কেউ-না-কেউ যেদিন ধর্ষণের শিকার হবে, তখন দেশের মানুষ নিশ্চয় সেটা বুঝবে। মহসিন তাল দেবেন। নিজেও পাগলের মতো হাসতে থাকবেন।
এবার দুজনে খোলা ড্রয়ার থেকে ধর্ষণের খবরের কাটিংগুলো হাতে নিয়ে ছিটিয়ে দেবেন মাথার উপর। ঘরভর্তি হয়ে যাবে ধর্ষণে। বিছানায়, বিছানার কোণায়, বিছানার নিচে, ড্রেসিং টেবিলে, মেঝেতে, চেয়ারের পায়ার কাছে, দেয়ালের ঝুলে, ঝুলন্ত ঘড়িতে—ধর্ষণ লেপ্টে যাবে, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যাবে। দুজনের হাসি তখনো থামবে না। এরপর দুজনে পাগলের মতো খাওয়াদাওয়া ভুলে খুব যত্ন করে একটা একটা করে ধর্ষণের খবরের পেপার কাটিংগুলো কুড়িয়ে বিছানায় জড় করবেন। সবগুলো পেয়ে গেলে মহসিন আয়রনটা আলমারির উপর থেকে নামাবে। হালকা আঁচে একটা একটা করে ধর্ষণের খবর আয়রন করে রাবেয়ার হাতে দেবে, রাবেয়া মাত্রই ভূমিষ্ট হওয়া শিশুর মতো সাবধানে ধরবে। এই মুহূর্তে তার চোখের সামনে অনেক বছর আগে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে কোনো শিশুর প্রথম দেখা চেহারাটি ভেসে উঠবে।
রাবেয়া হাউমাউ করে কেঁদে উঠবে। মহসিন আয়রন করা থামিয়ে যোগ দেবে সেই কান্নায়।
সহসা রাতটা শেষ হয়ে যাচ্ছে দেখে ওদের চোখেমুখে আলো খেলে যাবে। সকাল হলেই নতুন পেপার আসবে।
*****
লেখক পরিচিতি:মাজাফফর হোসেন ্একাধারে গল্পকার, ঔপন্যাসিক-প্রাবন্ধিক, অনুবাদক এবং একজন সুবক্তা। শিল্প সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় তিনি অত্যন্ত সাবলীল। মোজাফফর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে সাংবাদিকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। বর্তমানে বাংলা একাডেমির অনুবাদ উপবিভাগে কর্মরত। প্রধানত কথাসাহিত্যিক। দুই বাংলার অন্যতম পাঠকপ্রিয় ছোটগল্পকার। পাশাপাশি সাহিত্য সমালোচক ও অনুবাদক হিসেবেও তাঁর পরিচিতি আছে। 'তিমিরযাত্রা' উপন্যাসের জন্য কালি ও কলম সাহিত্য পুরস্কার, 'পাঠে বিশ্লেষণে বিশ্বগল্প' বইয়ের জন্য ব্রাক ব্যাংক সমকাল সাহিত্য পুরস্কার, 'অতীত একটা ভিনদেশ' গল্পগ্রন্থের জন্য তিনি এক্সিম ব্যাংক-অন্যদিন হুমায়ূন আহমেদ কথাসাহিত্য পুরস্কার এবং 'স্বাধীন দেশের পরাধীন মানুষেরা' গল্পগ্রন্থের জন্য আবুল হাসান সাহিত্য পুরস্কার অর্জন করেছেন। এছাড়াও তিনি প্রতিভা প্রকাশ সাহিত্য পুরস্কার, অরণি সাহিত্য পুরস্কার ও বৈশাখি টেলিভিশন পুরস্কারে ভূষিত হন। মোজাফফরের গল্প ইংরেজি, হিন্দি, ইতালি, নেপালি ও স্প্যানিশ ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তাঁর সাম্প্রতিক দুটি গ্রন্থ হলো: 'কল মি লাইকা' এবং
'ব্রাহ্মসমাজে ইসলাম, সাহিত্যের সক্রিয়তাবাদ ও অন্যান্য।'.jpg)

2 মন্তব্যসমূহ
গল্পের ফর্ম ইউনিক।গভীর অর্থবহ। খুব ভালো লাগলো।
উত্তরমুছুনঅভিজিৎ জানা
খুবই ভালো লাগলো। অন্যরকম গল্প।
উত্তরমুছুনদেব চক্রবর্তী