অনুবাদ: ফজল হাসান
অনেক বছর যাবত আমি আমার বন্ধু ওয়াল্টারকে দেখিনি। মাঝে মধ্যে সে লিখত, কিন্তু তার নির্বিকার, অগভীর সেই সব চিঠিতে কিছুই থাকত না। আমি হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম যখন আমি শুনেছি যে, সে বিয়ে করেছে। কারণ যেদিন থেকে তার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছে, তখন থেকেই জানতাম আমাদের পরিচিত কোনো মেয়ের প্রতি কখনই তার উৎসাহ ছিল না। সে ছিল চোখে পড়ার মতো সুদর্শন এবং অনেক মেয়ে তার প্রেমে হাবুডুবু খেয়েছে, কিন্তু সে সবাইকে প্রত্যাখান করেছে। আমাদের অন্যসব পরিচিতরা তাকে পছন্দ করত না: আমি ছিলাম তার একমাত্র বন্ধু।
ওয়াল্টারের বিয়ের পাঁচ বছর পরে সে আমাকে লিখেছে যে, আমি যেন তাদের ওখানে বেড়াতে যাই এবং তার, তার স্ত্রী এবং শিশু ছেলের সঙ্গে সমুদ্রের ধারে বাড়িতে থাকি। এছাড়া সে কিছু গোপন বিষয়ের ইঙ্গিত দিয়েছে, যেগুলো আমার সঙ্গে আলাপ করতে চায়।
সেই সময় আমি আমার মায়ের সঙ্গে থাকতাম। আমার একটা চাকুরী ছিল, তবে বলতে গেলে সেই চাকুরী আমাকে তেমন কিছু দিত না। তাই বন্ধুর বাড়িতে যাওয়ার জন্য আমি মায়ের কাছে টাকা চেয়েছিলাম। মা আমাকে অপচয়কারী আর অবিবেচক হিসেবে দোষারূপ করেছেন এবং আমাদের মধ্যে বাক-বিতন্ডা হয়েছে। তারপর আমি আমার এক চাচার কাছ থেকে টাকা ধার করেছি এবং ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েছি। ভ্রমণের সময় আমি ওয়াল্টারের কথা ভেবেছি, এবং আমি তাকে পুনরায় দেখতে পারার আনন্দে বিভোর হয়েছিলাম। তবে আমি শঙ্কিত ছিলাম, কেননা বছরের পর বছর ধরে যখনই তার কথা ভেবেছি, তখনই আমি একই শঙ্কা এবং উদ্বেগ অনুভব করেছি। আমি সম্ভবত ভয়ে ছিলাম যে, সে আমার মধ্যে আকাঙ্ক্ষা এবং অতীতের আকুলতার অনুভূতি জাগিয়ে তুলতে পারে এবং কোনোভাবে আমার জীবনকে খাটো করে দেখতে পারে, ঠিক যেমন আমি সেই ধরনের জীবন গড়ে তুলছিলাম। এছাড়া তার স্ত্রীর ব্যাপারেও আমার কৌতূহল ছিল। আমি কল্পনাও করতে পারিনি তিনি কেমন হবেন এবং তাদের মধ্যে কী ধরনের সম্পর্ক থাকতে পারে।
দুপুরের তীব্র গরমে আমি সম্প্রতি রঙ করা এক স্টেশনে পৌঁছি। ওয়াল্টার দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়েছিল এবং তার হাত ছিল প্যান্টের পকেটের ভেতর। সে এক বিন্দুও বদলায়নি। তার পড়নে ছিল সুতির প্যান্ট এবং ছোট হাতার সাদা সার্ট, যা গলার কাছে খোলা ছিল। তার প্রশস্ত, রোদে পোড়া মুখে হাসির ঢেউ খেলে যায়। সে আমার দিকে এগিয়ে আসে এবং আমার হাতের সঙ্গে করমর্দন করে। আমি জানতাম সে আমাকে যান্ত্রিক ভাবে অভিবাদন জানাবে, এবং আমরা কোলাকুলি করব না, যদিও বিষয়টি আমাকে নিরুৎসাহিত করেছে। রাস্তায় আমি তাকে তার সমস্যার কথা জিজ্ঞেস করতে শুরু করি; আমার স্যুটকেস তার দিকে সরানোর সময় সে এক কথায় বলল যে, পারিবারিক সমস্যা এবং ভিলমা, তার স্ত্রী, চাইছিল আমি যেন আসি।
আমরা যখন তাদের বাড়ি পৌঁছি, তখন ভিলমা বাচ্চা ছেলেকে নিয়ে সমুদ্র সৈকত থেকে ফিরছিল। ভিলমা দীর্ঘাঙ্গী মহিলা, স্ফীত আকৃতির দিক থেকে; তখনো তার কালো চুল ছিল ভেজা এবং মুখমন্ডলে বালু লেগে ছিল। তার পড়নে ডোরাকাটা পোশাক, যা হাঁটুর ঠিক ওপর পর্যন্ত। তার এক হাতে ছিল হাতে বোনা খড়ের টুপি এবং অন্য হাতে ছিল লাল ভিনাইল ব্যাগ। ছেলেটি আমার কাছে খুবই ছোট মনে হয়েছে, যদিও তার বয়স চার বছর হওয়ার কথা। সে দেখতে সুন্দর, তবে দূর্বল এবং ফ্যাকাশে। তার কাঁধ অবধি ঘন স্বর্ণকেশী কোঁকড়ানো চুল।
সমুদ্রের ধারে ছিল ওয়াল্টারদের দোতলা বাড়ি। আমার রুম ছিল উপরের তলায় এবং বাগানের দিকে মুখ করা, সমুদ্র সৈকতের দিকে ছিল না। বাড়িটি গাছ-গাছালির ছায়ায় সম্পূর্ণ আচ্ছাদিত, মনোরম ছিল। সেখানে পাকা পীচ ফলের তাজা সুঘ্রাণ ছড়িয়েছিল। আমরা বারান্দায় বসে দুপুরের খাবার খেয়েছি; মরিচা রঙের লিনেন পর্দা বাতাসে সরে গিয়েছে এবং সমুদ্রের চমৎকার নীল রঙ দেখা যাচ্ছিল, এমনকি আকাশ ও সাগর পাড়ে চকচকে রঙ করা বিশ্রামাগার। ছোট্ট ছেলেটি খেতে চাচ্ছিল না। তার মা ক্লান্ত গলায় আদরের ভঙ্গিতে ছেলেকে চামচ দিয়ে খাওয়াচ্ছিলেন। ওয়াল্টার শান্ত ভাবে রুটি ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে এবং ফাঁকা দৃষ্টিতে শূন্যে তাকায়। তারপর হঠাৎ করে সে মুখ খোলে এবং বলল যে, খাবার জঘন্য হয়েছে এবং যদি সুস্বাদু হত, তাহলে অবশ্যই সে খেত। ছোট্ট ছেলেটি একজন থেকে আরেকজনের মুখের দিকে তাকায় এবং সেই সময় তাকে ভয়ার্ত দেখাচ্ছিল। ‘পারিবারিক দৃশ্য,’ ওয়াল্টার বলেছিল, পরে যখন আমরা একা ছিলাম। ‘এ বিষয় নিশ্চিত যে, আমাদের দুজনের মধ্যে বনিবনা হচ্ছে না, কিন্তু আমরা অন্তত কিছুটা ভান করি। সবকিছুই ক্রমশ খারাপের দিকে যাচ্ছে—মনে হচ্ছে সে কারোর প্রেমে পড়েছে।’ আমি ওয়াল্টারকে জিজ্ঞেস করি, কার সঙ্গে এবং সে অস্পষ্টভাবে জবাব দেয়। ‘একজন সঙ্গীত শিল্পী,’ সে অপ্রীতিকর হাসি মুখে বলল।
যেদিন আমি তাদের বাড়িতে পৌঁছেছি, সেদিনই ভিলমা আমার সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলেন। তখন সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল এবং ওয়াল্টার কিছু সময়ের জন্য বাইরে গিয়েছিল। ভিলমা আমার দিকে মুখ করে বসেন। তিনি নিজের সম্পর্কে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে এবং খোলামেলাভাবে কথা বলতে শুরু করেন। তবে আমার মনে হচ্ছিল তিনি নিরুপায় হয়ে কথা বলছিলেন। আমি খুবই অস্বস্তি বোধ করি। ওয়াল্টারের সঙ্গে তিনি এতগুলো বছর এসব সহ্য করেছেন। আমি ওয়াল্টারকে চিনি। তাই এ বিষয়টি আমাকে অবাক করেনি। এখনো তার বয়স কম এবং বিয়ের সময় তার কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না, ভিলমা বললেন। তার দিকে তাকিয়ে আমি বয়স অনুমান করি। তাকে দেখে মনে হয় তিনি মোটেও যুবতী নন। সত্যি, আমি বলব যে, ওয়াল্টারের চেয়ে তার বয়স বেশি। তার ছিল ফুরফুরে কালো চুল এবং সরু, গভীর নীলাভ চোখ। দীর্ঘ আকৃতির নাক এবং গায়ের রং শ্যামলা থাকা সত্ত্বেও সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন সুন্দরী। ‘আর এখন এখানে আমার এক পুরানো বন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়েছে ... ভ্রাস্তি। সে খুবই মার্জিত এবং ভীষণ দয়ালু। সে টের পেয়েছে যে, আমার সাহায্যের প্রয়োজন এবং সে আমার প্রতি সহানুভূতিশীল। আমি জানি না কেন সে ওয়াল্টার অথবা আমার ছোট্ট ছেলেকে হুমকি দেবে। সে শুধু আমার বন্ধু।’ ভিলমার সততা এবং আত্মবিশ্বাস আমাকে তোষামোদ করার পরিবর্তে অথবা খোলামেলা হওয়ার বদলে আমাকে বরং বিব্রত করেছিল। তিনি আরও বলেছেন যে, বিষয়টি জটিল করে তুলেছে তাদের আর্থিক পরিস্থিতি এবং ছোট্ট ছেলের শারীরিক প্রতিবন্ধকতা—তার জন্য একটি শান্ত পারিবারিক পরিবেশের প্রয়োজন রয়েছে।
তারপর আমি ভ্রাস্তির সঙ্গে দেখা করি। আমি জানতাম যে, সাধারণত সে প্রতিদিন আসে, কিন্তু যখন সে জানতে পেরেছে যে আমি সেখানে আছি, তখন তার প্রায় সহজাত লজ্জা তাকে দূরে সরিয়ে রাখে। তার বয়স পঞ্চাশের কোঠায়, মাথায় ধূসর-কোঁকড়ানো চুল এবং পাতলা ও কুঁচকানো মুখ। সে খুবই কম কথা বলেছে; ভিলমার পাশে বসেছিল। সে তার স্কার্ফের ঝালর নিয়ে অস্থির হয়ে ওঠে এবং ভিলমাকে সেলাই করতে দেখে। সে ছোট্ট ছেলেটিকে কাছে নেওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু ছেলেটি দূরে সরে যায়। তারপর একসময় ভ্রাস্তি খপ করে তার হাত ধরে ফেলে। তারপর সে তার ভাঙা, কামড়ানো আঙুলের নখ দিয়ে আলতো করে ছেলেটির চুলে বিলি কাটতে থাকে।
‘একজন সঙ্গীতশিল্পী, সত্যিকারের সঙ্গীতশিল্পী,’ প্রথমবার সে যখন এসেছিল, তখন ভিলমা আমাকে নিঃশ্বাস ছেড়ে বলেছিল। ‘কিন্তু তাকে বাদ্যযন্ত্র বাজাতে রাজি করানো ভীষণ কঠিন কাজ।’
ভ্রাস্তিকে আমি বাদ্যযন্ত্র বাজাতে অনুরোধ করি, কিন্তু সে বারবার না, না বলে অস্বীকৃতি জানায়, যদিও তাকে দেখে মনে হচ্ছিল সে বাজানোর জন্য মুখিয়ে আছে। শেষপর্যন্ত সে পিয়ানোর সামনে বসে এবং মোৎসার্টের নীরস ও কেতাবিভাবে পিয়ানো বাজায়, যা মনে হচ্ছিল অনন্তকাল ধরে বেজে চলেছে।
ভিলমা বারবার ভ্রাস্তিকে রাতের খাবার খেয়ে যেতে অনুরোধ করেন এবং প্রতিবারই ভ্রাস্তি না বলেছে, সে পারবে না। তবে সে স্পষ্টতই ভিলমার অনুরোধ রক্ষা করতে চেয়েছিল, কিন্তু ভয় পেয়েছিল, কেননা ভিলমা জোরাজুরি করা বন্ধ করবেন এবং তারপর তাকে চলে যেতে হবে। রাতের খাবারের সময় সে কাটা চামচ ও ছুরি নিয়ে রীতিমতো কসরত করেছে এবং পান করেছে মাছের মতো, সারাক্ষণ গ্লাসে মদিরা ঢেলেছে। তারপর সে অসংলগ্ন কথা বলতে শুরু করে এবং কাঁপছিল। ওয়াল্টার অন্য দিকে তাকিয়েছিল, একরাশ বিরক্তি নিয়ে। তার স্ত্রীর পাশে ভ্রাস্তি এবং ছোট্ট ছেলেটি। তাকে অস্বাভাবিক ভাবে কম বয়সী এবং স্বাস্থ্যবান দেখাচ্ছিল; সে ছিল দীর্ঘ দেহী এবং তার ছিল প্রশস্ত কাঁধ ও পেশীবহুল বাহু। তার মধ্যে এক ধরনের প্রশান্তি বিরাজ করছিল, যা কোনোভাবে সারা ঘর ভরিয়ে দিয়েছে। ভ্রাস্তি ওয়াল্টারের অন্য পাশে বসেছিল। তার চোখেমুখে ছড়িয়ে ছিল একধরনের ভয়, অপরাধীর হাসি এবং ওয়াল্টারের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সাহস সে পাচ্ছিল না। কিন্তু শুরু থেকেই আমার সঙ্গে ছিল তার সৌহার্দ্যপূর্ণ এবং খোলামেলা সম্পর্ক।
কয়েকদিন পরে নিজেকে ফুরফুরে ও স্বাস্থ্যবান লাগছিল এবং আমি ভালো সময় পার করছিলাম। বন্ধুর বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার চিন্তাটা আমার মাথা থেকে দূরে সরে যায়। আমি চাচাকে চিঠি লিখে আরও টাকা পাঠাতে অনুরোধ করেছি। তিনি পাঠিয়েছেন, তবে আমি যে পরিমান আশা করেছিলাম, তার চেয়ে কম। আমার মা-ও চিঠি লিখেছেন এবং অনুযোগ করেছেন কীভাবে আমি তাকে একা রেখে এবং আমার কাজকর্ম ফেলে চলে এসেছি। আমার কাজ, শহর এবং আমার মায়ের কথা ভেবে মন খারাপ হয়েছিল। আমি সেই সব চিন্তা করা এড়িয়ে যাই। আমি অনুভব করি যে, অনেক অনেকদিন ধরে আমি নিজের ঘর ছেড়ে বাইরে আছি। অন্যরা কখনই আমার ছেড়ে আসা সম্পর্কে কিছুই উল্লেখ করেনি এবং এমনকি স্মরণও করেনি যে, তারা আমার উপদেশ চেয়েছিল। আমি কিছুই দেইনি এবং কেউই বিষয়টি উপস্থাপন করেনি। আমি বুঝতে পেরেছি, ভ্রাস্তির প্রতি ভিলমার প্রেম নিছক কাল্পনিক। তিনি শুধু একমাত্র লোকটিকে আঁকড়ে ধরেছেন এই ভেবে যে, সে তাকে উদ্ধার করবে: সম্ভবত তার হৃদয়ের গভীর থেকে। তিনি জানতেন তার অনুভূতি কতটা বাধ্য আর অবাস্তব ছিল এবং সেই কারণে তিনি আরও বেশি কষ্ট পাচ্ছিলেন।
আমি যখন চাচার কাছ থেকে টাকা পেয়েছি, তখন সেখান থেকে বেশ অনেকগুলো টাকা ওয়াল্টারকে দিয়েছি এবং সে তা গ্রহণ করেছে। ভিলমা জানতে পেরেছেন এবং আমাকে ধন্যবাদ দিয়েছেন। তখন তার চোখে অশ্রু ছিল। তিনি বলেছেন যে, আমি নিজেকে একজন ভালো বন্ধু হিসেবে প্রমাণ করেছি। ‘আমি কখনই ভুলব না,’ তিনি বলেছেন।
সকালে আমি তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে জেগে উঠেছি এবং আমার ঘরের জানালা গলিয়ে বাইরে তাকিয়েছি: আমি বাগান দেখেছি, সেখানে গাছের সবুজ পাতা ঢেকে রেখেছে শিশির, লাল আর হলুদ ফুল, বাগানের দীর্ঘ বিস্তৃতি এবং আরও দেখেছি হালকা কুয়াশায় ঢাকা দূরের পাহাড়। আমি নিচে নেমে যাই। সমুদ্র সৈকত বিরান দেখাচ্ছিল এবং বালু, যা সূর্যের আলো তখনো স্পর্শ করেনি, স্যাঁতস্যাঁতে ও শীতল ছিল। আমি ওয়াল্টারকে দেখতে পেয়েছি—সে সব সময় আমার আগে ওঠে—পানি থেকে উঠে হাঁটা আর দৌঁড়ের মাঝামাঝি গতিতে আমার দিকে আসতে থাকে। তার গায়ে শুধু হাতে বোনা কাপড় ছিল এবং পেছন থেকে মনে হয়েছে সে নগ্ন। সে নিজেকে আমার পাশে বিছিয়ে দেয়, ভেজা মাংসল শরীর নিয়ে আড়মোড়া ভাঙে এবং আঙুল দিয়ে চুলের মধ্যে বিলি কাটে। সম্ভ্রান্ত পরিবারের একজন আমেরিকান মহিলা, যার বিশ্রামের জায়গা আমাদের কাছাকাছি ছিল, ওয়াল্টারের প্রতি বিমোহিত ছিল এবং তাকে একা দেখলে সব সময় কথা বলতে আসত। তার প্রতি ওয়াল্টার সামান্য ভদ্র ছিল এবং এড়িয়ে চলে যেত। সে মহিলার নাম রেখেছিল ‘টিয়া পাখি’। তার কাছে সবার জন্য ডাকনাম ছিল এবং সে ভ্রাস্তিকে ‘বুড়ো ভাম’ অথবা ‘মিস্টার তোতলা’ নামে ডাকতো। সে ছোট্ট ছেলেটিকে ভ্রাস্তির এসব নাম পুনরাবৃত্তি করত, যেন ছেলেটি ফিকফিক করে হাসে।
ভিলমা এবং ছেলেটি অনেক দেরি করে সাগর পাড়ে আসে। ওয়াল্টার ছেলেটির ঘাড় ধরে টেনে নিয়ে পানিতে চুব দেয় এবং সে হাসতে থাকে। পরমুহূর্তেই সে ভয়ে চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে। বাবাকে সে প্রচন্ড ভালোবাসে এবং ভিলমা স্পষ্টতই ঈর্ষান্বিত।
তারপর আমি লক্ষ্য করি অস্বাভাবিক একটা কিছু ঘটেছে: ভিলমা রাতের খাবারের জন্য সঙ্গীত শিল্পীকে নিমন্ত্রণ জানানো বন্ধ করে দিয়েছেন এবং তিনি শিল্পীকে দেখেছেন অথবা দেখেননি, সে সম্পর্কে তাকে উদাসীন বলে মনে হয়েছে। অবশেষে ভ্রাস্তি বিষয়টি অনুধাবন করতে পেরেছে এবং আমার মনে হচ্ছিল সে বিষয়টি নিয়ে কষ্ট পাচ্ছে। ভিলমা তাকে আর পিয়ানো বাজানোর জন্য অনুরোধ করেন না অথবা অত্যধিক পরিমানে মদিরা পান করার সময় বাধা দেন না। একবার ভিলমার সামনে যখন ওয়াল্টার তাকে ‘মিস্টার তোতলা’ উল্লেখ করেছে, তখন ভিলমা প্রচন্ড হাসিতে ফেটে পরেছিলেন।
ভিলমা যা কিছুই করেছেন কিংবা বলেছেন, সবকিছুই আমাকে খুশি করার চেষ্টা ছিল। যখন তিনি ঘরদোর পরিস্কার করার জন্য এদিক-ওদিক ছুটাছুটি করতেন কিংবা সমুদ্র সৈকতে ছোট্ট ছেলেকে ধাওয়া করতেন অথবা সূর্য স্নান করার জন্য বালুর ওপর তোয়ালে বিছিয়ে শুয়ে থাকতেন, তখন আমি বুঝতে পারতাম তিনি সেসব কাজ ভ্রাস্তির জন্য করছিলেন না, বরং আমার জন্য।
বন্ধুর বাড়ি ছেড়ে তৎক্ষণাৎ আমার চলে যাওয়া উচিৎ ছিল। কিন্তু আমি যেতে পারিনি। প্রথমে আমি নিজেকে বলেছি যে, এই সবের কোনো কিছুই সত্য না এবং আমি এমন সব জিনিসের ব্যাখ্যা দিচ্ছিলাম, যার আসলে কোনো অস্তিত্ব নেই। যাহোক, ভিলমার সঙ্গে একা থাকার বিষয়টি আমি এড়িয়ে যেতে থাকি। আমি দিনের অনেকটা সময় ওয়াল্টারের সঙ্গে গ্রামাঞ্চলে ঘোরাঘুরি করে কাটাই।
আমাদের হাঁটাহাঁটি করার সময় ওয়াল্টার কদাচিৎ মুখ খোলে। একটা খাড়া বিশাল পাথর, যা সমুদ্র থেকে উঠে এসেছে, এবং ভারতীয় বন্য ডুমুর ও খেজুর গাছ পাথরটি ঘিরে রয়েছে। আমরা সেখানে শুয়ে সূর্য ডোবার দৃশ্য দেখতে থাকি; আমি কল্পনাও করতে পারি না যে, আমাদের একে অপরকে না-দেখার বছরগুলো ওয়াল্টারের জন্য কেমন ছিল, সে কী করতে পারত কিংবা বিশ্বাস করত অথবা আশা করতে পারত। কিন্তু আমি জানি যে, তাকে কোনো প্রশ্ন করা মূল্যহীন। সে, তার পক্ষ থেকে, আমাকে কিছুই জিজ্ঞেস করেনি। আমি জানতাম যে, আমার সম্পর্কে আমি যা বলতে পারতাম, তাতে সে মোটেও আগ্রহী হবে না। অন্য কারোর কাছ থেকে এমন অনীহা দেখলে আমি আসলেই মন খারাপ করতাম, হতাশায় ভুগতাম। কিন্তু ওয়াল্টারের বেলায় এটা পুরোপুরি স্বাভাবিক। আমি অপমানিত বোধ করিনি, কারণ আমি আগের চেয়ে আরও ভালো করে বুঝতে পেরেছিলাম যে, সে অন্যদের থেকে কতটা আলাদা এবং নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে, এমনকি কেন তার সঙ্গে অন্যদের সমস্ত সম্পর্ক অদ্ভূত রূপ নিয়েছিল, যা অনেককে হতবাক করেছে, কিন্তু আমাকে পারেনি। সে ছিল বিশাল, নিঃসঙ্গ এক মহীরুহ, যার ডালপালা বাতাসে দোল খায় এবং যার শেকড় মাটির গভীর থেকে রসদ সংগ্রহ করে, কিন্তু অন্য কিছুর ওপর নয়। আর আমি অনুভব করেছি যে, ওয়াল্টারের অনুভূতি তার আশেপাশের জিনিসের জন্য উদ্ভব হয়নি, তবে রহস্যময় কিছুর জন্য হয়েছে, যেগুলো আমাদের জানা নেই, যেমন মাটি আর বাতাসের মতো।
অনেক সময় ওয়াল্টার আমার সঙ্গে তার ছেলের প্রসঙ্গে আলাপ করত এবং আমি জেনেছি যে, ছেলেকে সে অত্যন্ত ভালোবাসে। সে বলেছে, ছেলেকে বড় করার জন্য ভিলমা যোগ্য নয়। সে দেরিতে ওঠে এবং কখনই ছেলেকে পানিতে সাঁতার কাটার কিংবা টুপি ছাড়া সূর্যের আলোয় খেলা করার অনুমতি দেয় না। আর তারপর—সে যেভাবে ছেলেকে পোশাক পড়ায় এবং তার কোঁকড়ানো চুল বড় হতে দেয়, তা ঠিক নয়। তাকে দেখলে মনে হয় সে যেন কোনো এক অভিনেত্রীর ছেলে।
আমি শেষপর্যন্ত মনোস্থির করেছি যে, চলে যাব এবং কথাটা তাদের বলেছি। ওয়াল্টার আশ্চার্য্যান্বিত হলো না, এমনকি মন খারাপও করল না। কিন্তু ভিলমা আমার দিকে এমন হতাশার দৃষ্টি মেলে তাকাল যে, আমার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল। আমার জীবনে খুব বেশি সংখ্যক নারী আমাকে ভালোবাসেনি। সুতরাং এ সব আমাকে এক ধরনের নির্দিষ্ট, অস্পষ্ট আনন্দ দিয়েছে। কিন্তু তারপরই আমি লজ্জা বোধ করি। সব কিছু পরিষ্কার করার জন্য আমি সেখানে গিয়েছিলাম এবং আমি সেগুলো জটিল করে তুলেছি, বা অপূরণীয় ক্ষতি করেছি। আমি উপরের তলায় আমার কক্ষে যাই এবং স্যুটকেস গোছাতে শুরু করি। তখন রাত ছিল; পরদিন সকালেই আমি চলে যাব। ইতোমধ্যে ওয়াল্টার বিছানায় চলে গেছে।
একটু পরেই আমি দরজায় মৃদু শব্দ শুনতে পেলাম এবং ভিলমা ভেতরে প্রবেশ করেন। আমার কোনো সাহায্যের প্রয়োজন আছে কি না, তা জানার জন্য তিনি এসেছেন। ইতোমধ্যে আমি সব কিছু গুছিয়ে ফেলেছি, কেবল একটা ছোট্ট ব্যাগ গোছানো বাকি আছে, আমি ব্যাখ্যা করে বললাম। তিনি বিছানার ওপর বসেন এবং আমার দিকে তাকিয়ে থাকেন। তখন আমি আমার শেষ জিনিসপত্র এবং বই গুছিয়ে রাখছিলাম। হঠাৎ তিনি অত্যন্ত শান্তভাবে কাঁদতে শুরু করেন। আমি তার কাছে যাই এবং তার হাত নিজের হাতে মুঠোয় চেপে ধরি। ‘ভিলমা, কী হয়েছে?’ তিনি তার মাথা আমার কাঁধে কাত করেন, দুহাতে আমাকে জড়িয়ে ধরেন এবং চুমো খান। আমিও চুমু খাই। আমি বুঝতে পারিনি সেই সময় আমার কী করা উচিৎ ছিল। কিন্তু আমি বুঝতে স্পষ্ট পেরেছিলাম যে, আমি এই মহিলাকে ভালোবাসি, যেমন তিনিও আমাকে ভালোবাসেন। আমি তার সমস্ত শরীরে চুমো খেয়েছি।
পরদিন সকালে যখন জেগে উঠেছি, তখন আমি এত বেশি ক্লান্ত ছিলাম যে, বিছানা ছেড়ে উঠতে আমাকে ভীষণ কষ্ট করতে হয়েছে। আমি বিরক্ত এবং ঘৃণা বোধ করি। ওয়াল্টারকে ঘটনা না জানিয়ে আমি যেতে পারি না। আমি কখনই ভেবে দেখিনি যে, বিষয়টি উত্থাপন করা ভালো অথবা খারাপ হবে কিনা। আমি শুধু জানতাম যে, তাকে ঘটনা না বলে আমি কিছুতেই আসতে পারব না। আমি দেখলাম সে সমুদ্র সৈকতে বালুর ওপর শুয়ে আছে এবং তার হাত দুটি ঘাড়ের নিচে ভাঁজ করে রাখা আছে। রাতের বেলা প্রচন্ড দমকা হাওয়া ছিল এবং সমুদ্র ছিল উত্তাল। উঁচু ঢেউয়ের ফেনা সৈকতে আছড়ে পড়ছিল, একের পর এক।
আমাকে দেখে ওয়াল্টার উঠে দাঁড়ায়। ‘তোমাকে ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে,’ সে বলল। আমরা বালুর পর হাঁটতে শুরু করি। আমি এতটাই অপমানিত বোধ করছিলাম যে, আমি কোনো কথা বলতে পারছিলাম না। ‘তুমি কিছু বলছ না কেন? আমি জানি। তুমি ভিলমার সঙ্গে রাত কাটিয়েছ,’ সে বলল। আমি চুপ করে থাকি এবং আমরা একজন আরেকজনের চোখের দিকে তাকাই। ‘হ্যাঁ, ভিলমা আমাকে বলেছে। সেসব মানুষের মধ্যে সে একজন, যাদের মধ্যে সততার প্রবল উপস্থিতি রয়েছে। তার এই স্বভাব ছেড়ে সে কিছুতেই বাঁচতে পারবে না। কিন্তু ওর সম্পর্কে খারাপ কিছু চিন্তা করো না। বিষয়টা দুঃখজনক। সে জানেও না তার আর কী প্রয়োজন? সুতরাং এখন তুমি বুঝতে পারছ, আমাদের দুজনের মধ্যে সম্পর্কটি কেমন?’ ওয়াল্টারের গলার স্বর হালকা এবং তিক্ত শোনায়। আমি তার কাঁধের ওপর হাত রাখি। ‘কিন্তু আমি পরোয়া করি না,’ সে বলল, ‘যদি তুমি শুধু জানতে যে, আমি সবকিছু থেকে কতটা দূরে নিজেকে অনুভব করি। আমিও জানি না, আমি কী চাই।’ সে হালকাভাবে শরীর দোলায়। ‘আমি, আমি জানি না।’
এমনকি ভ্রাস্তি আমাকে বিদায় জানাতে এসেছে এবং তারা সবাই—তারা ছোট্ট ছেলেটিকেও ঘুম থেকে জাগিয়েছে—আমাকে স্টেশনে নিয়ে আসে। ভিলমা একটি শব্দও উচ্চারণ করেনি। তাকে ফ্যাকাশে এবং স্তম্ভিত দেখাচ্ছিল।
আমি ট্রেনে উঠি এবং বিদায় জানানোর জন্য ঘুরে দাঁড়াই। তখনই আমি তাদের সবাইকে শেষ বারের মতো দেখতে পেলাম। ছোট্ট ছেলেটির ঝাঁকড়া চুল বাতাসে উড়ছিল। ভিলমা ও ভ্রাস্তি তাদের নরম টুপি নাড়িয়ে বিদায় জানায়। একসময় ওয়াল্টার ঘুরে হাঁটতে শুরু করে এবং সবাই তাকে অনুসরণ করে।
পুরো ভ্রমণ সম্পর্কে আমি কেবল এসবই ভাবতে পারি। শহরে ফিরে আসার পর আমি অনেকদিন শুধু তাদের কথা ভেবেছি এবং আমার জীবনে অন্য কোনো মানুষের সঙ্গে এমন যোগাযোগহীন সম্পর্ক অনুভব করিনি। আমি ওয়াল্টারকে কয়েকবার চিঠি লিখেছি, কিন্তু সে একবারও জবাব দেয়নি। পরে আমাদের পরিচিতরা আমাকে বলেছে যে, ছোট্ট ছেলেটি মারা গেছে। ওয়াল্টার এবং ভিলমার মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটেছে এবং ভিলমা সেই সঙ্গীত শিল্পীর সঙ্গে বাস করে।
*****
গল্পসূত্র: ‘সমুদ্রের ধারে বাড়ি’ গল্পটি নাতালিয়া গিনজবুর্গের ইংরেজিতে ‘হাউজ অ্যাট দ্য সী’ গল্পের অনুবাদ। ইংরেজিতে গল্পটি ক্যাথরিন জেসন সম্পাদিত ও অনূদিত ‘নেইম অ্যান্ড টিয়ারস্ অ্যান্ড আদার স্টোরিজ; ফরটি ইয়ার্স অব ইতালিয়ান ফিকশন’ গল্প গ্রন্থে অন্তর্ভূক্ত।
লেখক পরিচিতি: নাতালিয়া গিনজবুর্গ ১৯১৬ সালে ইতালির সিসিলি দ্বীপে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্প লেখক, অনুবাদক, নাট্যকার এবং প্রাবন্ধিক। তাকে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইতালীয় লেখক হিসেবে গণ্য করা হয় এবং তিনি ইতালির যুদ্ধোত্তর সাংস্কৃতিক শিল্প বিকাশের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। তিনি অল্প বয়সেই লেখালেখি শুরু করেন। মাত্র ১৭ বছর বয়সে ‘সোলারিয়া’ ম্যাগাজিনে তার প্রথম গল্প প্রকাশিত হয়। তিনি বেশ কয়েকটি সুপরিচিত উপন্যাস লিখেছেন, যেমন ভয়েসেস ইন দ্য ইভিনিং (১৯৬১), ফ্যামিলি লেক্সিকন (১৯৬৩) এবং অল আওয়ার ইয়েসটারডেস (১৯৮২)। উল্লেখ্য, ফ্যামিলি লেক্সিকন উপন্যাসটি ১৯৬৩ সালে ইতালির মর্যাদাপূর্ণ ‘স্ট্রেগা প্রাইজ’ লাভ করে। এছাড়া তিনি ‘ভিলন আন্তর্জাতিক পুরস্কার’ (১৯৬৩) ও ‘বাগুট্টা পুরস্কার’ (১৯৮৪) পেয়েছেন। তিনি ১৯৯১ সালে আমেরিকান একাডেমি অব আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেস-এর ‘ফরেন অনারারী মেম্বার’ হওয়ার গৌরব অর্জণ করেন। তার অধিকাংশ রচনা ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে। তিনি ফ্লবার্ট ফ্লবার্ট এবং মার্শেল প্রস্ত্রের রচনা অনুবাদ করেছেন। রাজনীতি, যুদ্ধ, নির্বাসন, ট্র্যাজেডি, প্রেম এবং ক্ষতি তার লেখালেখির মূল বিষয়। তিনি ১৯৩৮ সালে লিওন জিনজবুর্গকে বিয়ে করেছিলেন, যিনি ছিলেন ফ্যাসিবাদী শাসনের কঠোর সমালোচক এবং জার্মান সৈনিকেরা গ্রেপ্তার করে এবং তিনি বন্দীদশায় মারাত্মক নির্যাতনের শিকার হয়ে ১৯৪৪ সালে মারা যান। পরে ১৯৫০ সালে নাতালিয়া ইংরেজি সাহিত্যের পণ্ডিত গ্যাব্রিয়েল বালদিনির সঙ্গে পুনরায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তিনি ১৯৮৩-১৯৮৭ সাল পর্যন্ত ইতালির জাতীয় সংসদের সদস্য ছিলেন। তিনি ১৯৯১ সালে মারা যান।


0 মন্তব্যসমূহ