৬. ত্রাণকর্তা
কবে কখন আমার মৃত্যু ঘটবে অথচ সেটা আমি আগাম জানতে পারবো না, এই মহা আতঙ্ক আমাকে জ্বালিয়ে মারতো। আমার বউ বলতো, এমন অহেতুক আতঙ্ক তৈরির জন্য আমার বাবাই দায়ি, কারণ মা যখন মৃত্যু শয্যায়, বাবা তখন জবরদস্তি করে আমাকে মায়ের সামনে নিয়ে গিয়ে বসান এবং তাঁকে বিদায়চুম্বনে বাধ্য করেন। তখন আমি মাত্র দশ বছরের বালক, ওই বয়সের একটা বাচ্চার মনে মৃত্যুর ছায়া কতটা আতঙ্কের ছাপ ফেলে সেটা সবার জানা। আমি বলছি না বউয়ের দাবীটা ভুল, তবে আমার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ভিন্ন। বউ যেটা জানেনা, সেটা হলো স্বচক্ষে একজন লোককে খুন হতে দেখেছি, সম্পূর্ণ দুর্ঘটনাক্রমে দৃশ্যটা আমি দেখে ফেলি। যেটা ছিল অভূতপূর্ব বিচারের নিষ্ঠুর মহড়া: দুজন লোক এক লোকের গলায় ফাঁস বেঁধে দেয় তারপর তার গলার নলিটা ধারালো ছুরিতে কেটে ফেলে, পুরো ব্যাপারটা ঘটে সিনেমা হলের পুরুষদের শৌচাগারের ভেতর; আমি সেটা কীভাবে দেখলাম? তখন আমি শৌচাগারের মলত্যাগের খোপে কাজ সারতে ব্যস্ত ছিলাম, ওরা বাইরের দিকে প্রস্রাবাগারে থাকায়, লোক দুটো আমাকে দেখতে পায়নি। দিব্যি হালকা হচ্ছিলাম, হঠাৎ শুনতে পেলাম: “দোহায় তোমাদের আমাকে খুন করো না…।” দরজার জাফরি দিয়ে তাকিয়ে দেখলাম একটা ছুরি আমূলে একজনের গলার নলিতে ঢুকে গেল এবং রক্তের ধারায় ভেসে গেল জায়গাটা; তীব্র একটা আর্তনাদ সাথে দুজনের দ্রুত পায়ে পালিয়ে যাওয়ার শব্দ শুনতে পেলাম। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্হলে পৌঁছে আমাকে অচেতন, বলা ভালো প্রায় আধমরা অবস্হায় পায়; তাদের ভাষ্যমতে, হঠাৎ দেখা ভয়াবহ ঘটনার অভিঘাতে ওরকম হয়েছিল। প্রায় একমাস আমি জীবন-মৃত্যুর মাঝে ঝুলে ছিলাম।
তাই বলে ভাববেন না যে নিজের গলাটা কখন কাটা পড়ে এমন একটা ভয়ে আমি ভীত থাকি। ঠিক আছে, যদি ভাবতে চান কে আর বাধা দেবে, ওটা আপনাদের নিজস্ব স্বাধীনতা। কেউ যদি কারো গলায় ছুরি চালিয়ে হত্যার দৃশ্য দেখে, যৌক্তিকভাবে সে চিন্তা করবে একই ব্যাপার তার ক্ষেত্রেও ঘটতে পারে। তবে এটাও মনে করা যৌক্তিক যে সিনেমা হলের শৌচাগারে আরো একজনের গলার নলি কাটার মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি হওয়াটা প্রায় অসম্ভব, সেটা কাকতলীয়ভাবে কিংবা কপালের দোষে যেভাবেই হোক।
না, আমার আতঙ্কের কারণ সেটা নয়। সিনেমা হলের বাথরুমে যখন দুজন লোক গলায় ছুরি চালিয়ে একজনের মৃত্যু নিশ্চিত করছিল ঠিক তখন যে ভয়টা আমার মধ্যে গেড়ে বসেছিল, একবাক্যে সেটা বলতে চাইলে এভাবে বলা যায়: কখন আসবে আমার মৃত্যুর সময়? আশি বছরের এক বৃদ্ধের কথাই ধরুন, যিনি মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়ার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত; আমার মনে হয় তার মনে নিরন্তর এই ভাবনাটা ঘুরপাক খায়- অদ্যই কী শেষ রজনী? নাকি আগামি কাল? পরশু ভোর তিনটেতে নয় তো? যখন ভাবছি পরশু ভোর তিনটায় হতে পারে, সেটা কী এক্ষুনি ঘটে যাবে? শৌচাগারে খুন হওয়া লোকটা জেনে গিয়েছিল এবং অনুভব করেছিল তার সময় ফুরিয়েছে- মৃত্যু ধেয়ে আসছে। ঠিক তখন সেটা অনুধাবনে সে সক্ষম হয়ে গিয়েছিল যখন সে উচ্চারণ করেছিল “দোহায় তোমাদের আমাকে খুন করো না”, উচ্চারণের ওই মুহূর্ত থেকে গলায় ছুরিটা বিঁধে যাওয়ার আগ মুর্হূত পর্যন্ত সময়টা তার জন্য যেমন মহার্ঘ ছিল তেমন মৃত্যুর ঝুঁকিতে ভরপুরও কম ছিল না।
জীবনের পড়ন্ত বেলায় এসে আমি এখন বিছানায় একা শুয়ে ( বউ গত বছর মারা গেছে, সে বেঁচে থাকলেও আমার ‘মৃত্যুর ক্ষণ’ বিষয়ে বেচারীর পক্ষে কোনো সুরাহা করা আদৌও সম্ভব হতো কিনা ঘোর সন্দেহ আছে) শুয়ে মস্তিষ্কের অবশিষ্ট স্মৃতিগুলোকে জড়ো করার চেষ্টা করছি।
এটা সবার জানা যে নব্বই বছরের এক থুত্থুড়ে বুড়োর জীবনটা গন্তব্যে পৌঁছে যাওয়া পর্যটকের মতো। পার্থক্য হলো, পর্যটক জানে সে কটার সময় গন্তব্যে পৌঁছাবে, কিন্তু বুড়োর সেটা অজানা। তবে এ নিয়ে তাড়াহুড়ো করেও লাভ নেই।
সেদিন যখন শৌচাগারে লোকটির গলা কেটে খুন করা হচ্ছিল, আমি তখন সবে বিশে পা দেওয়া তরুণ। সম্ভাবনাময় অনন্ত জীবন আমার সামনে প্রসারিত। যৌবনের উদ্দামতায় ভেসে যাওয়ার এক সময় তখন আমার। যে কারণে সেদিনের সেই রক্তাক্ত দৃশ্য আর মৃত্যু নিয়ে পীড়াদায়ক প্রশ্নগুলো মন থেকে মুছে যেতে সময় লাগেনি।
যৌবনের পরিপূর্ণতায় যখন মানুষ থাকে তখন সেটা শুধুই বেঁচে থাকবার আনন্দ নিয়ে বাঁচার সময়। বাঁচার আনন্দ নিয়ে তখন বলে ওঠা যায়: “ আহা আমি কী চমৎকার স্বাস্হ্যের অধিকারী। আমার শরীরের প্রতিটা রোমকূপ থেকে যেন প্রাণশক্তি ঝরে পড়ছে। ক্ষিদের মুখে আস্ত একটা গরু খেয়ে ফেলাটা আমার জন্য কোনো ব্যাপারই না। দিনে আমি পাঁচবার রমণে পারদর্শী, ক্লান্তিহীন ভাবে বিশঘন্টা টানা কাজ করে যেতে পারি…” এবং সেই মুহূর্তে মৃত্যু কী, কেন মরতে হয় ইত্যাদি ভাবনায় কেউ মাথা ঘামাতে চাইবে না। বাইশ বছর বয়সে যখন বিয়ে করি, তখন আমার গভীর প্রণয়াসক্তি দেখে এক রাতে বউ আমায় জিজ্ঞেস করেছিল: “যখন বুড়ো হবে তখনও কী তুমি আমার সঙ্গ এভাবেই আকাঙ্ক্ষা করবে?” উত্তরে পাল্টা বলেছিলাম, “ তুমি কী ভাবো বৃদ্ধ কাকে বলে তুমি সেটা সঠিকভাবে জানো?”
ওই বয়সে, ওই সময়ে, তার কিংবা আমার কারোই স্পষ্ট করে জানা ছিল না বৃদ্ধ বয়সটা আদৌও কেমন, সেই সময়ে আমাদের চৌহদ্দিতে বৃদ্ধ বয়সের ভারাক্রান্তের ব্যাপারটা স্পর্শের বাইরেই ছিল। বিষয়টা নিয়ে তখন আমরা বরং নিজেরা একচোট হাসাহাসি করেছিলাম এবং বন্য ভালোবাসায় দুজনেই ভেসে গিয়েছিলাম।
কিন্তু পঞ্চাশে পা দেবার পরপরই নিজের মধ্যে বুড়োত্বের লক্ষণ দেখতে শুরু করলাম, এবং বৃদ্ধ বয়সের নানা জটিলতা নিয়ে চিন্তার পাশাপাশি মৃত্যুর দিন-ক্ষণ নিয়ে ভাবিত হয়ে পড়লাম। বেঁচে ছিলাম বটে, কিন্তু একই সঙ্গে যেনবা একটু করে মরতেও শুরু করলাম। আর একটা অসুস্হ,লোলুপ কৌতূহল আমাকে নিরন্তর তাড়িত করতে শুরু করলো সেই সর্বনাশা মুহূর্তটির মুখোমুখি হতে। যেহেতু আমাকে মরতেই হবে অন্তত এটা তো নিশ্চিত হয়ে নেওয়া যাক অমোঘ সেই সময়টা কখন আসবে, ঠিক যেভাবে আমি আমার দাঁত ব্রাশের সময়টা জানি।
বয়স বাড়ার সাথে পাল্লা দিয়ে আমার ভেতর এই ভাবনা ব্যাপকভাবে আসনপীড়ি হয়ে বসতে থাকলো, একটা মাত্রায় পৌঁছালে যাকে আমরা বাতিকগ্রস্ত বলে থাকি। সদ্য যখন সত্তরে পা দিয়েছি, তখন অপ্রত্যাশিতভাবে জীবনে প্রথম প্লেনে চড়বার সুযোগ এলো। আমার একমাত্র ভাইয়ের স্ত্রীর পাঠানো তারবার্তাটির মাধ্যমে জানতে পারলাম ভাই মৃত্যু শয্যায়। সে কারণে তড়িঘড়ি তখন প্লেনে চেপে বসতে হলো। প্লেন ওড়ার দুইঘন্টার মধ্যে আমরা বাজে আবহাওয়ার সম্মুখীন হলাম। ঝড়ের দাপটে আমাদের প্লেনটা তখন পালকের মতো পলকা। বিজ্ঞজনেরা ঝড়ের খপ্পরে পড়া উড়োজাহাজ সম্পর্কে যা যা বলেছেন তার সবটাই তখন ঘটে চলেছে। যাত্রীদের চোখেমুখে ভয়াবহ আতঙ্কের ছাপ, বিমানবালারা ত্রস্ত পায়ে আসা-যাওয়ায় ব্যস্ত, মেঝেতে নানারকমের জিনিস পড়ছে অনবরত, নারী আর শিশুদের সম্মিলিত আর্তনাদের পাশাপাশি অন্যান্য যাত্রীরা ঈশ্বরের কৃপা ভিক্ষায় সরব–ওই রকম এক মুহূর্তে চল্লিশ হাজার ফুট উচ্চতা থেকে পৃথিবীর সবটাই তখন যেন আমার চোখের সামনে বড়বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠলো।
“ঈশ্বর কে ধন্যবাদ”, মনে মনে বলেছিলাম। ধন্যবাদ এই জন্যে যে, ধেয়ে আসা মৃত্যুর মুহূর্তটিকে সাদরে গ্রহণের জন্য সেই প্রথমবারের মতো নিশ্চিত চিত্তে নিজেকে প্রস্তুত করতে সক্ষম হয়েছিলাম। যে কোনো মুহূর্তে প্লেনটা টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়ার বিপদ ঘটলে নিজেও ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবো- এরকম এক ভয়াবহ বিপদের মধ্যেও আসন্ন বিপদটা ঠিক কতক্ষণে ঘটবে তার হিসাব-নিকাশের কাজটা তখন আমি নির্দ্ধিধায় শুরু করতে প্রস্তুত ছিলাম। কতক্ষণে ঘটবে সেটা- দশ মিনিট? আটত্রিশ মিনিটের মাথায়? যখনই ঘটুক সেটা তখন অবান্তর। আমি তখন সপাটে এটা বলার জন্য তৈরি- “মৃত্যু, তুমি আচমকা এসে মোটেও আমায় ভড়কে দিতে পারবে না।”
স্বীকার করছি বন্য এক আনন্দে আমি বুঁদ হয়েছিলাম। এক মুহূর্তের জন্য আমার মনে হয়নি শেষ সময় আগত তাই সর্বময়ের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করি, চট করে গোটা জীবনের একটা পর্যালোচনা করে নেই, নিজের কৃতকর্মের ভুলত্রুটি নিয়ে আক্ষেপ করি; কিংবা এরকম সময় যেটা স্বাভাবিক (সাধারণ শরীরবৃত্তীয় কর্মকাণ্ড), সেটাই করি অর্থাৎ বমি করে ভাসিয়ে দেই। আমি ওসবে মন না দিয়ে আমার সবটা মনোযোগ জড়ো করে কখন প্লেনটা চুরমার হয়ে ভেঙে পড়ে তার অপেক্ষায় থাকলাম। প্লেনটার সাথে নিজেরাও ছিন্নভিন্ন হওয়ার সময় যেন মহার্ঘ সেই মুহূর্তটা উপস্হিত হয়েছে সেটা অনুভর করতে পারি, বলতে পারি হ্যাঁ, মৃত্যু এসেছে, এসে হাত বাড়িয়েছে।
বিপদটা কেটে গেলে একসহযাত্রী আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন: “ত্রাহি মধুসূদন অবস্হাতেও আমি আপনাকে লক্ষ করেছিলাম, সবাই যখন ভয়ে আধমরা- আপনি তখন দিব্যি ছিলেন- যেন যা ঘটছিল সেটা খুবই স্বাভাবিক কিছু।” ভদ্রমহিলার কথার প্রত্যুত্তরে আমি কেবল খানিক হাসলাম। তার মুখ জুড়ে তখনও উদ্বেগের চিহ্ন লেপ্টে ছিল, নিজের চিত্তদাহটা ভালোভাবেই আড়ালে সক্ষম হয়েছিলাম। যে ঘটনার তাড়নায় ভূমি থেকে চল্লিশ হাজার ফুট উঁচুতে জীবনে প্রথম বারের মতো নিজের ভেতর অনিন্দ্য যে রূপান্তরটি ঘটে গেল, সেই অনুভূতিটা গির্জার কোনো পাদ্রি বা মহান সাধুসন্তদের জীবনে ঘটে যাওয়ার সম্ভাবনার সাথে তুলনা করা যায় বলে ধারণা।
কিন্তু প্রতিদিন তো আর কেউ চল্লিশ হাজার ফুট উঁচুতে ঝড়ো তাণ্ডবের মাঝে পড়া প্লেনে নিজেকে খুঁজে পায় না। ওটা সম্ভব নয়। আমার এই দীর্ঘ জীবনে ওটাই ছিল একমাত্র স্বর্গীয় ঝলক। বাস্তবে বরং উলটোটাই হয়ে থাকে। আমরা প্রত্যেকে নিজেদের গড়া নরকে বসবাসে বাধ্য হই। যার দেয়ালগুলো দুশ্চিন্তায় মোড়া, ছাদগুলো আতঙ্কে ছাওয়া আর জানলাগুলো যেন অতলগহ্বর… আর এর ভেতরে ম্লান আলোর নিচে একেক জন জমতে থাকা মানুষের জীবন, নিভু নিভু আলোটা প্রাণশক্তিটুকুও বুঝি শুষে নিতে চায় ভয়ার্ত প্রশ্নের চেহারা ধরে:”কোন সময়ে?” “কোনো এক মঙ্গলবার বা শনিবারে?” “হেমন্তে বা বসন্তে?”
প্রতিনিয়ত এভাবে আমি জমতে জমতে বোধশূন্য হতে থাকি, পুড়তে থাকি তারচেয়েও অধিকমাত্রায়। নিজেকে জাদুঘরে প্রদর্শনযোগ্য কোনো অলৌকিক কাহিনির চরিত্র মনে হয়, একই সাথে মনে হয় অপুষ্টিতে ভোগা এক প্রাণ। আমি নিশ্চিত আমার শিরায় শিরায় রক্ত নয় পুঁজ বইছে; শরীরময় দগদগে খোস-পাঁচড়া, বেগুনি রং ধরা হাড়গুলো এলোমেলো হয়ে শরীরের স্বাভাবিক গঠনকে বিকৃত করে তুলেছে। পাছার হাড়ের দশা হয়েছে উপচে ওঠা নদীর দুই পাড়ের মতো, শুষ্ক শরীরে জেগে ওঠা কুণ্ঠার হাড় যেন (মাংসহীন) জাহাজের একপাশে নোঙরের মতো ঝুলছে; মাথার খুলিতে কেউ বুঝি হাতুড়ি পিটিয়ে তোবড়ানো নারকেলের আকৃতি করে দিয়েছে।
তা সত্ত্বেও মাথার ভেতর সেই একই ভাবনা বুড়বুড়ি কাটতে থাকে। চিন্তাটা ঘুরপাক খেয়ে ভাবতে বাধ্য করে; এক্ষুনি, ঠিক এই মুহূর্তে, নিজের শোবার ঘরের বিছানায় হাতপা ছড়িয়ে শুয়ে আছি, আর মাথার উপর ঝুলছে মৃত্যু, মৃত্যুচিন্তা সঙ্গে নিয়েই ভাবতে থাকি মনে হয় দেয়ালে ঝোলানো মৃত বাবার ছবিটা হতে পারে মৃত্যুদূত, যে আমার দিকে তাকিয়ে বলছে: “তোমাকে হতবাক করতে যাচ্ছি, পুরস্কারে ভূষিত হতে যাচ্ছো তুমি, কিন্তু সেটা কখন তোমার কখনোই তা জানা হবে না, আমাকে দেখছো দেখো কিন্তু কখন যে তোমার দিকে ঘুষি হাঁকাবো ঘুণাক্ষরেও টেরটি পাবে না বাছাধন…”
তার জবাব দেবার জন্য আমি আরো গভীরভাবে বাবার ছবিটার দিকে তাকালাম এবং বললাম: “ সে সুযোগ তুমি পাবে না। যে মুহূর্তে তুমি একচুল নড়বে আমি তৎক্ষণাৎ বুঝে যাবো এবং তুমি কিছু করে ওঠার আগেই সচিৎকারে জানতে চাইবো: “এসে গেছে সেই সময়?” আর তাতে তুমি হার মানতে বাধ্য হবে। ঠিক সেই মুহূর্তে, সেই মুহূর্তে যখন বাস্তবতা এবং অসঙ্গতি পরস্পর একাকার হয়ে থাকে, আমি পায়ের শব্দ পাই, সেটাও একই ভাবে বাস্তব আর অবাস্তবতার অংশ। ছবি থেকে চোখ সরিয়ে বিছানামুখী আলমারির আয়নায় ভাবলেশহীন ভাবে তাদের প্রতিফলিত হতে দেই। আয়নার মধ্যে এক যুবকের চেহারা ফুটে উঠতে দেখি- শুধু তার মুখটুকুই দেখা যাচ্ছে, কেননা বিছানার পায়ের কাছে এবং আয়নার মাঝখানে একটি ভাঁজ করা পর্দার কারণে তার শরীরের বাকি অংশ আমার দৃষ্টিসীমার আড়ালে চলে গেছে।
তবে আমি তার(মুখটার) প্রতি খুব একটা মনোযোগ দিইনি- কিছু একটা হবে, ধরে নিয়ে এড়িয়ে গেছি, কিন্তু আমি যদি কম বয়সী কেউ হতাম তাহলে এই অবাস্তবতা নিয়ে হয়তো শোরগোল পাকাতাম- অর্থাৎ যে বয়সে মানুষ পরিপূর্ণভাবে বাঁচে সেই যৌবনে নিজের শোবার ঘরে অনাহুত আগন্তুকের আবির্ভাব যে কাউকেই বিস্মিত করবে নয় আতঙ্কিত। কিন্তু আমার এই বয়সে এবং জড়তায় ভরা এমন অবস্হায় আমি যেনবা নিজেকেই খুঁজে পেলাম, এক আগন্তুক আর তার মুখটা ছিল বাস্তব-অবাস্তবের অংশ বিশেষ, যা বিশেষ এক বয়সে পৌঁছালে মেনে নিতেই হবে।
অপরিচিত আগন্তুক এবং তার মুখটা হয়তো আমার ঘরের ভেতর ছত্রখান হয়ে থাকা হাজারটা জিনিসেরই একটা অথবা মাথার ভেতর ঘোট পাকানো ভুতুড়ে চিন্তার কারসাজি। তাই আবারও বাবার ছবিটার দিকে তাকালাম, তারপর যখন আবারও আয়নাতে চোখ রাখলাম- অপরিচিত মুখটাকে আর দেখতে পেলাম না। আরো একবার ছবিটার দিকে তাকিয়ে মনে হলো বাবার মুখ জুড়ে কেমন একটা রাগের চিহ্ন; মুখটা বাবারই, এটা যতটা সত্যি, একই সাথে ওটা অন্য কারোও হতে পারে, সেটাও সত্যি- মানানসই এমন এক ট্র্যাজেডি থেকে উঠে আসা তৈরি কোনো চরিত্র যেন।
কে জানে…বাস্তব আর অবাস্তবের এই সীমানায় সবই সম্ভব, সবকিছু ঘটে চলেছে, আবার কিছুই যেন ঘটছে না। সেই সময়ে, আমি চোখ বন্ধ করে চেঁচিয়ে বলতে লাগলাম: “এখন, এখন…হঠাৎ আমি বিছানার মাথার কাছটায় কারো পায়ের শব্দ শুনতে পেলাম। চোখ খুলে দেখি সেই অপরিচিত আগন্তুকের মুখ, তার শরীরটা দশাসই-প্রায় আধক্রোশ সমান লম্বা। আমি ভাবলাম: “বাহ্ আয়নার মধ্যেও দেখা যাচ্ছে সেই মুখটাই…” আমি দেয়ালে ঝোলানো বাবার ছবিটার দিকে তাকালাম। ঠিক তখন কেউ যেন আমাকে অচেনা লোকটার দিকে তাকাতে বললো। ভেতরের সেই কণ্ঠকে এড়াতে পারলাম না, আরো একবার তার দিকে তাকালাম। এখন লোকটা তার হাতের ঝকঝকে ছুরিটা গলায় চালাবে বলে ধীরে ধীরে আমার উপর ঝুঁকে পড়লো যেন তাকে নিবিড়ভাবে দেখে নিতে পারি। বুঝতে বাকি থাকলো না অপরিচিত এই আগন্তুক আসলে আমায় উদ্ধার করবে বলেই এসেছে। মৃত্যুর মুহূর্তটা এগিয়ে আসার অনেকক্ষণ আগেই এটা নিশ্চিত হতে সক্ষম হই যে আমার মৃত্যুর নিদির্ষ্ট ক্ষণটি কখন। উদ্যোত ছুরিটা যখন আমার গলার নলি কেটে গভীরে ঢুকে যাচ্ছিল, রক্তের স্রোত পেরিয়ে আমি আমার ত্রাণকর্তার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলাম: “আমাকে উদ্ধারের জন্য ধন্যবাদ! “
—----------
রচনাকাল: ১৯৬৭
মূলগল্প: ‘দ্য ওয়ান হু কেম টু সেভ মি’, মূলভাষা থেকে অনুবাদ ড্যানিয়েল ডাব্লু কুন।

0 মন্তব্যসমূহ