বিরহিলিও পিনিয়েরার গল্প : রূপান্তর


অনুবাদ: কুলদা রায়
খন যমজেরা তাদের ষষ্ঠ জন্মদিন উদযাপন করল, তখন তাদের বাবা-মা শিশু হয়ে গেলেন।

অবশ্যই, অল্প কিছু ঘটনার ছাড়া এটা ঘটেনি; অল্প কিছু— যেমন বলা যায়— অস্বাভাবিক দৃশ্য ছিল। কিন্তু এই পূর্ববর্তী ঘটনাগুলি ও দৃশ্যগুলিকে ব্যাখ্যা করার আগে, অবশ্যই বলা যায় যে যমজের বাবা-মারা স্বাভাবিক মানুষ ছিলেন।

ছিলেন অত্যন্ত স্নেহশীল বাবা-মা, তাদের জমজ ছেলেমেয়েকে পেয়ে তারা নিজেদেরকে ঈশ্বরের আশীর্বাদপূষ্ট মনে করতেন।

তারা বলতেন: " খুব কম বিবাহিত জীবনই এমন আনন্দ পেয়ে থাকে।”

যেদিন যমজেরা জন্মগ্রহণ করেছিল, সেদিন মা তার গৃহকর্মী মহিলাকে বলেছিলেন, "তুমি জানো না আমি কতটা ঈর্ষা করি আমার যমজদের। আহা আমি যদি তাদের একজন হতে পারতাম।"

গৃহকর্মী হাসতে হাসতে ছুটে গেল। সুখী মা তাকে কী বলেছে সেটা সে সুখী বাবাকে জানাল।

গৃহকর্মীর বিহবল অবস্থা দেখে বাবা কিন্তু তাকে বললেন: "সে ঠিক আমার মতো ভাবছে।"

শুভবোধ থেকেই এসব কথা কিন্তু বলা হয়েছিল। ফলে এই উচ্ছ্বাস স্বাভাবিক অবস্থার চূড়ান্তে পৌঁছে গিয়েছিল।

যখন যমজেরা তাদের প্রথম জন্মদিন উদযাপন করল, তখন একটি বড় উৎসবের আয়োজন করা হয়েছিল।

বাপ্তাইজের সময়, ধর্ম-অভিভাবক স্নানপাত্রে যমজদের ধরে রেখেছিলেন, মা-বাবা তাদের মাথায় পবিত্র জল ঢালছিলেন।
জন্মদিনের কেকের দুটি মোমবাতি নিভিয়ে দেওয়ার সময় হয়ে এসেছিল।

মৃদু বাতাস এলে মোমবাতির সামনে কী করতে হবে সেটা জমজদেরকে নির্দেশ দিচ্ছিলেন ধর্ম-আভিভাবক আর মাসিপিসিরা। তাদের বাবা-মাই মোমবাতি দুটি নিভিয়ে দিয়েছিলেন।

কিন্তু, কেউই তাতে অবাক হয়নি। এটা কোনো অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়—সোজা কথায় সহজভাবেই সবাই গ্রহণ করল। এবং সবাই হেসে ফেলল। তারা সবাই আবার মোমবাতি জ্বালাল, যমজেরা সেগুলি নিভিয়ে দিল, এবং স্বাভাবিকভাবেই চলতে লাগল উৎসব।

কিছু দিন পর, আর্তুরোর (পুরুষ যমজ) ধর্মবাবা তাকে একটি খেলনা রাইফেল উপহার দিলেন, এবং ওলগার (মহিলা যমজ) ধর্মমা তাকে একটি পুতুল দিলেন।
ধর্মবাবা-মা যেতে না যেতেই ওলগা ও আর্তুরোর বাবা-মা খেলনাগুলি লুকিয়ে ফেললেন।
তাদেরকে জিজ্ঞাসা হলে তারা বলতেন যে যমজেরা খেলনাগুলি ভেঙে ফেলেছে। এবং তারা সেগুলো ভবিষ্যতে চেয়ে বসত তখন আর কেউই কিছু দিত না।

দ্বিতীয় বছর এল; আবার চারটি মোমবাতি সহ একটি কেক এলো। আবার গত বছরের দৃশ্য দেখা গেল। আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরা বিড়বিড় শুরু করেছিল। কিন্তু তারা সহজভাবেই সব করে যাচ্ছিলেন।

তৃতীয় বছরে, যমজেরা — আগের বছরের ঘটনা মনে রেখে — প্রতিবাদ জানাল। কিন্তু তাদের বাবা-মা (মোমবাতি) নিভিয়ে দিলেন। ফুঁএর তোড়ে এসব কান্নাকাটি উবে গেল। তিন বছরের শিশুদের সঙ্গে অনেক কিছু করা যায়।

ওলগাকে কষ্টের প্রতিমূর্তি হতে তার মা শিখিয়েছিলেন। সে ছোট হাত দুটো বুকের উপর রেখে দিনরাত অন্ধকার ঘরের কোণা দিয়ে হাটত । লামারমূরের লুসিয়া নাটকের উন্মাদ দৃশ্যের মতো সে আর্তনাদ করত।

অন্যদিকে, আর্তুরোকে নেপোলিয়ন হিসেবে রূপান্তরিত করেছিল তার বাবা। এই নেপোলিয়ন হলেন সেই এক নেপোলিয়ন যিনি ওয়াটারলু যুদ্ধে পরাজিত হয়েছেন, সব কিছু থেকে নিরাশ, মূর্তিমান গম্ভীর, আকস্মিকভাবে হয়ে পড়েছেন বয়স্ক।

শৈশবের প্রাণশক্তি এবং নিষ্পাপ থাকার কারণে, আর্তুরো জানত না যে সে একজন পরাজিত নেপোলিয়নকে অনুকরণ করছে, তেমনি অলগা জানত না সে কষ্টের মূর্তি। কিন্তু... দিন গুনুন, যতক্ষণ না তাদের বয়সের সঙ্গে আরো কিছু বছর যুক্ত হচ্ছে, এবং আমরা দেখতে পাবো সেই স্বভাবগুলো গড়ে উঠেছে। তাদের চরিত্রগুলো নিজেদের মধ্যে গেঁথে নিয়েছে শিশুরা।

নিজের পিঠে নিজের হাত রাখার মতো শুধু একটি ভঙ্গী্তেই অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল আর্তুরো। অলগা তার হাহাকার এমনভাবে বলত যা হৃদয় ছিঁড়ে ফেলত।

এ কথা না বললেও চলে, জন্মদিনের উৎসবগুলি স্থগিত হয়ে গিয়েছিল। 
বাবা-মা এবং যমজেরা একদিন তাদের গ্রাম্য বাড়িতে চলে গেল।

তখন পিতামাতারা নিজেদের রূপান্তর ঘটালেন। যেমন ওলগাকে তার মা মেঝের উপর প্রসূতি-বিছানায় শোয়ালেন। তিনি মেয়ের ছোট বিছানাটি দখল করতে পারে। আর্তুরোর জায়গা হলো একটি ক্যাম্প খাটে। আর বাবা তার ছেলের বিছানায় শুয়ে পড়লেন।

সে সময় বাবা-মা শিশুর মতো ওয়াও উয়াও কেঁদে উঠত। শিশুর মতো তারা নিজেদের বিছানা ভিজিয়ে ফেলত। তারপর তারা রান্নাঘরে গিয়ে তাদের নিজেদের জন্য শিশুখাদ্য-- দুধ গরম করত এবং শিশুর বোতলে ভরে চুষে খেতো।

শিশু বয়সে আর্তুরো রুটির গুড়ো খেতো আর ওলগা পান করত আনসিন্থ রস। ঠিক তেমনি জমজ শিশুদের মতো করে (বাবা-মা) দুজনেই এসব খেতেন।

আর কিছু দিন পরে, বাবামা বড়দের মতো কথা বলা বন্ধ করে দিলেন। তখন তারা তারস্বরে এমন সব শব্দ উচ্চারণ করত  যা বোঝা মুশকিল ছিল।

ওলগা অবিরামভাবে হাহাকার করে যেতো। আর্তুরো ‘ওহ!’শব্দটি আয়ত্ত করে নিল। আমি সত্যিই বলতে পারব না যে নেপোলিয়ন এই ‘ওহ’ বলতেন।

যেদিন তারা তাদের দশম জন্মদিন উদযাপন করল, বাবা-মা তাদের পিঠ মুছে দিতে বললেন জমজদেরকে। বাবা-মা দুজনেই প্যান্ট ময়লা করে ফেলেছিলেন এবং পরিধান করছিলেন প্যাম্পার। এটি ছিল আর্তুরো এবং অলগার পিতামাতার শৈশবের শুরু।

দিনগুলি বছর হতে লাগল। এভাবে, বিশ বছর পার হয়ে গেল। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল করা হল এবং পুলিশ গ্রামের বাড়িতে ঢুকে পড়ল। তারা চারজন মূর্খ লোককে বাইরে নিয়ে এলো: দুজন বৃদ্ধ এবং দুটি শিশু। শিশু দুজন বারবার বলতে লাগল যে, তারা কষ্টের মূর্তি এবং নেপোলিয়ন; বৃদ্ধ দুজন বলল- অলগা এবং আর্তুরো তাদের বাবা-মা।
---------------

অনুবাদক পরিচিতি: কুলদা রায় জন্ম বাংলাদেশের গোপালগঞ্জে, ১৯৬৫ সালে। পড়াশোনা করেছেন ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষিবিশ্ববিদ্যায়ে। ধানের আমিষ বৃদ্ধি নিয়ে গবেষণা করেছেন তিনি। কুলদা মূলত গল্পকার। এছাড়াও কথাসাহিত্য বিষয়ে গদ্য লিখে থাকেন। তাঁর লেখায় স্মৃতির সঙ্গে ওতোপ্রতোভাবে জড়িয়ে থাকে দেশভাগ, মুক্তিযুদ্ধ। এছাড়া, ঘটমান সামাজিক-রাজনৈতিক নানা বিচ্যুতি সপাটে তাঁর গল্পের আখ্যানে স্হান করে নেয়। কুলদা রায়ের প্রকাশিত গ্রন্থ: বৃষ্টি চিহ্নিত জল, কাঁঠাল পাতার ঘর, মার্কেজের পুতুল ও অন্যান্য গল্প, যে সুচিত্রা সেন কিডন্যাপ হয়েছিল, রবীন্দ্রনাথের জমিদারগিরি ও অন্যান্য বিতর্ক ইত্যাদি।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ