পর্ব-৯
বেনারসির বিখ্যাত দাক্ষিণাত্য যাত্রার উদ্দেশ্য পরিষ্কার, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শাজাহানের কাছে জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর খবর পৌঁছতে হবে। মাঝের সময়টায় আসফ খান দাওয়ার বক্সকে সিংহাসনে বসাচ্ছেন , বসিয়েই দুহাতে তলোয়ার চালিয়ে সেই তখ্তকেই আগলাতে হচ্ছে। দাওয়ার বক্স তো পুতুল বাদশাহ মাত্র, আসফই সব। সেই চাপে পড়ে আসফ শাজাহানের কাছে আর এক দ্রুতগামী বাহক মারফত বার্তা পাঠাচ্ছেন '' তাড়াতাড়ি , পারলে উড়ে আসুন। ফিতনার সর্বনাশ থেকে বাঁচান জাহানকে। '' এরকমই লিখছে জাহাঙ্গীরনামা। কুড়িদিন লেগেছিল বেনারসির শাজাহানের কাছে পৌঁছতে থুড়ি মহবত খানের কাছে পৌঁছতে।
বেনারসি এসে মহবতের কাছে জানাল আসফের বার্তা , দেখাল আসফের আঙটি। নিশ্চিত হয়েই তবে না সেপাইসালার মহবত খান তাকে পাঠাবেন শাজাহানের কাছে। ষোলোশো সাতাশের তৃতীয় সপ্তাহে শাজাহান জানলেন জাহাঙ্গীরের মৃত্যু সংবাদ। দ্বিতীয় বার্তাবাহক কবে এসেছিল জানা যাচ্ছে না।চারদিনের শোক পালন শেষে জ্যোতিষীর গণনা করা শুভদিনে আগ্রা রওনা হচ্ছেন শাজাহান।
পঞ্চম শতকের ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানী আর্যভট্টের সূত্রাবলী বা সপ্তম শতকের ব্রহ্ম গুপ্তের ব্রহ্মস্পুট সিদ্ধান্ত এসবের প্রভাব ইসলামি আরব জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের ওপর ভালোই ছিল। আর ছিল গ্ৰীক-রোমান বা হেলেনীয় ও পারসিক প্রভাব। সমস্ত বইই আরবীয় ভাষায় অনুবাদ হয়। এছাড়াও মরুচারী বেদুইনদের পর্যবেক্ষণ আরব্ধ জ্যোতির্জ্ঞানমালাও তাঁরা নথিভুক্ত করেন। ইসলামে নামাজ পাঠের সময় মক্কার দিক নির্ধারণের জন্য জ্যোতির্বিজ্ঞানের ব্যবহারিক প্রয়োগ হতো। চাঁদের গতির সাপেক্ষে রমজানের সময় গোনা তো এখনো সুবিদিত। এসবের জন্য জ্যোতির্নিরীক্ষার যন্ত্রপাতির উন্নতি ,নিরীক্ষা পদ্ধতির উন্নতি, ক্যালেন্ডার বানানোর কাজ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে মহাজাগতিক চাঁদ -তারা-সূর্যের প্রভাব পৃথিবীর জীবজগত আর নানা ঘটনাকে কীভাবে ভড়কাচ্ছে এসব জানা রাজা-বাদশাহ বা প্রজার কাছেও জরুরি হয়ে পড়ছে মধ্যযুগে, চর্চা চলছে জ্যোতিষের। কিছু ইসলামী ধর্মবেত্তা আর দার্শনিক অবশ্য আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন শক্তি জীবজগত বা ঘটনাকে টলাতে পারে অতএব এটা ইসলাম বিরোধী বলে জ্যোতিষচর্চাকে মান্যতা দিতেন না। জ্যোতিষ চর্চার ফলে উদ্ভব হচ্ছে রাশি চিহ্ন বা জোডিয়াক সাইনের যা ছবিতে এঁকে রাখলে সে ছবিতে নাকি ঐশ্বরিক ক্ষমতা ভর করে। ফলে সাম্রাজ্যের- রাজ্যের প্রতীকে বা ইনসিগনিয়াতে এখনো মধ্যে যুগের ঐতিহ্যে এসব রাশির আঁকাআঁকি তখনকার মতোই। মোঘল সাম্রাজ্যের ইনসিগনিয়াতেও রাশি চিহ্ন সম্মত মাছের প্রতীক ক্ষমতার রক্ষক হয়েছিল অনেক দিন।মোঘল বাদশাহরা নিরীক্ষা ভিত্তিক জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চায় উৎসাহ দিতেন। সেই সঙ্গে তাঁদের জ্যোতিষ নির্ভরতাও সুবিদিত।প্রথম দিকে বাবর বা হুমায়ুনের আমলে টলেমিও পদ্ধতিতে গ্রেকো-আরবীয় প্রথায় জ্যোতিষ গণনা হতো। জন্ম থেকে যুদ্ধ আর মৃত্যু সবই যে গ্রহ রত্নের খেলা এ বিশ্বাস বদ্ধমূল ছিল মোঘল বাদশাহদের মধ্যে। আকবর এর থেকে বেরিয়ে এসে অনেকটা বাস্তবসম্মত পন্থায় সিদ্ধান্ত নিতেন কিন্তু তিনিও ভবিষ্যতবেত্তাদের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন।জাহাঙ্গীরের আমলে দরবারের দৈনন্দিন কাজেকম্মে জ্যোতিষ আবার পুরোদমে ফিরে এল । এই জ্যোতিষীরা হিন্দুই হতো কি ? বা বলা যেতে পারে হিন্দুস্থানের বাদশাহের দিনক্ষণ ঠিক করবেই বা কেন অন্য কেউ ? জাহাঙ্গীরের জ্যোতিষী জটিক রাইয়ের নাম জানা গেছে যিনি আবার আকবরেরও রাজ জ্যোতিষী ছিলেন। । শাজাহানের জ্যোতিষী কে ছিলেন ? শাজাহানের দরবারে জ্যোতিষী ছিলেন ব্রাহ্মণ দৈবজ্ঞ বলভদ্র, উনি হয়নরত্ন বইটা লেখেন। পরে উনি সুজার কাছে বাংলায় ছিলেন। ত্রয়োদশ শতক থেকে সংস্কৃত ঐতিহ্যে সম্পৃক্ত হেলেনীয় -আরব-পারসিক তাজিক জ্যোতির্গনণা পদ্ধতির গুরুত্ত্বপূর্ণ বই এটা। এই ঘরানার বইগুলো সমন্বয়বাদী মিশ্র গঙ্গা -যামুনি হিন্দুস্থানী তেহজিবের অনন্য নমুনা যার প্রভাব জ্যোতিষে আজও বহমান।এই বইগুলোতে সংস্কৃতর সঙ্গে মিশে গেছে আরবী -ফার্সি নানান লব্জ। সেপাইসালার খান আব্দুল রহিম খান ই খানানও অবধি ভাষাতে দোঁহা ছাড়াও এই সংস্কৃত -আরবী -ফার্সি সংমিশ্রত ঘরানার দুটো জ্যোতিষশাস্ত্রের বই লেখেন খেত কৌতুকম আর দ্ববিশদ যোগাবলী ( खेत कौतुकम , द्वाविशद योगावली) । আবার আবুল ফজলের আইন ই আকবরিতে আকবর ও পরবর্তী মোঘল যুগের জ্যোতিষ চর্চায় অন্য অনেক কিছুর মতোই হিন্দুস্থানী প্রভাবে মিশ্র ঘরানার জ্যোতিষ চর্চা দেখা যাচ্ছে। আবুল ফজলের আইন ই আকবরির বর্ণনা অনুযায়ী আকবর গ্রীক ও ভারতীয় দুই পদ্ধতিতেই শাহাজাদাদের কুষ্ঠী তৈরি করতে বলেন। তিনি শাজাহানের কুষ্ঠী বর্ণনা করলেন ,'' ঐশ্বরিক ছাব্বিশতম দাই (মাস) , চারটে চব্বিশ মিনিটে, তুলা রাশিতে , মোটা রাজার( মেওয়ারের রাজা উদয় সিংহ, শাজাহানের দাদু - মা জগত গোঁসাইয়ের বাবা ) মেয়ের গর্ভে এক ছেলের জন্ম হল শাহাজাদা সেলিমের হারেমে। তার নাম সুলতান খুররাম।" তবে ঔরঙ্গজেবের জীবনচর্চায় কোরান ভিত্তিক অনুশাসন , শরিয়তি বিধি সম্মত আইনের শাসন , ন্যায় বিধানের দার্শনিক চর্চা এসবের কিছুবা বাস্তববাদী যুক্তি কাঠিন্য তাঁকে নিয়ত জ্যোতিষ নির্ভরতা থেকে দূরে রেখেছিল। দারা শিকোহকে অনেক বেশি দৈব ক্ষমতার অধিকারী দরবেশ ও সাধুসঙ্গ করতে দেখা গেছে।
উত্তরে আগ্রার দিকে শাজাহানের বিশাল বাহিনী রওনা দিয়েছে। তাঁর সঙ্গে সেপাই লস্কর নিয়ে যাচ্ছেন মহবত খান। এইসব দেখেই স্থানীয় রাজা , ভূস্বামীরা তাঁর কাছে পেশকস স্বরূপ টাকা-পয়সা , সোনা-রুপোর দামি দামি উপহার দিচ্ছে। তাঁরা সবাই স্বীকার করল আনুগত্য। শাজাহানও এবার বিভিন্ন সুবায় অনুগতদের নিয়োগ সহ নানা রাজপুরুষ নিয়োগের ফরমান জারি করতে শুরু করে দিলেন। এই যাত্রা পথেই তাঁর তখ্তে বসার কাজ সারা হয়ে যেতে থাকে।বাবা জাহাঙ্গীরের মতোই শাজাহানকেও নিজের বাবার সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী ঝামেলায় জড়াতে হয়েছিল। শাজাহানের এই যাত্রার সময় মোঘল সাম্রাজ্যের সামরিক শক্তি বিন্যাস কেকেমন ছিল ? বড় সেপাইসালারদের মধ্যে খান আব্দুল রহিম খান ই খানান আর আসফ খান ছিলেন যথাক্রমে তার দুই বেগমের দাদাশ্বশুর আর শ্বশুর। প্রথমজন আত্মীয়তার চাপে পড়ে শাজাহানের বিদ্রোহে সায় দিয়েও শাহী শিবিরের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে শাহাজাদার কুনজরে পড়েন। পরে সম্ভবত মহবত খানের হস্তক্ষেপে সরাসরি জাহাঙ্গীরের পক্ষে চলে যান। ষোলোশো সাতাশের অক্টোবর মাসের এক তারিখেই রহিমের মৃত্যুর খবর জানা যাচ্ছে। আসফ খান তো শাজাহানের হয়ে লাহোরের তখ্ত পাহারা দিচ্ছেন। জাহাঙ্গীর- নূর জাহানের বিশ্বস্ত ইব্রাহিম লোধির বংশজ খান ই জাহান লোধি হচ্ছেন আর এক গুরুত্বপূর্ণ সেপাইসালার। জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পরবর্তী ডামাডোলে নূর জাহানের নিস্পৃহতার কারণেই হয়তো খান ই জাহান লোধিও শাজাহানকে আগ বাড়িয়ে কোন আনুগত্য জানাতে এলেন না, রইলেন নিরপেক্ষ, পরে শাজাহানের শাহী শিবিরে যোগ দেন দ্বিধা নিয়েই। ওই দ্বিধা অবশ্য পরে বিদ্রোহে রূপ পেল । আর এক সেপাইসালার শরিফ উল মুলক থাট্টার কেল্লা থেকে স্বয়ং বেগম মুমতাজ মহলের শিবিরে তোপ দেগে ছিলেন।কী ভাগ্গি গোলাটা গর্ভবতী বেগমের ও জেনানার অন্যদের কাঁপুনি ধরিয়ে কিছুটা দূরেই ফাটে ! তাঁকে শাজাহান অবশ্যই মনে রাখবেন আর ফরমান দেবেন কোতল করার। সেই নির্দেশ জাহাঙ্গীরের আপনা সেপাইসালার মহবত খান , এখন যিনি শাজাহানের পক্ষে সঙ্গে ফৌজ নিয়ে চললেন তখ্তের দখলদারি কায়েম করতে, তাঁর মারফতই পৌঁছে যেতে পারে আসফ খানের কাছে। বাকি রইলেন রাজপুত সেপাইসালার -রাজারা। শাজাহান রাজা জয় সিংহের কাছে খবর পাঠাচ্ছেন জাহাঙ্গীরের মৃত্যু সংবাদ দিয়ে। জানালেন ,তিনিই তখ্তে বসতে চলেছেন।
দারা ,সুজা আর ঔরঙ্গজেব দেখল কয়েক দিন আগেও যাঁকে নজরবন্দি করে রাখা হয়েছিল সেই দাওয়ার বক্সকেই তখ্তে বসাচ্ছেন মামা আসফ খান। তাঁরা দরবারে গিয়ে অভিবাদন জানাল আদব মতো। এসব তাঁদের আগেই শেখানো হয় ঠাকুর্দা জাহাঙ্গীরের দরবারে নিজেদের পেশ করার সময়। সুজা তো জাহাঙ্গীরের কাছে থেকে থেকে আগে থেকেই আদবে চোস্ত হয়ে উঠেছিল।
শাজাহানের বাহিনী গুজরাটের বুক চিরে মেওয়ারের দিকে রওনা দিচ্ছে। যথারীতি পথে নতুন ,পুরোন সব বন্ধুরাই এসে আনুগত্য জানায়। মুতামদ খানের ইকবাল নামায় জানা গেল শাজাহান তাঁর বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মী রাজা বাহাদুরকে আসফ খানের কাছে পাঠালেন এক ফরমান নিয়ে। ফরমানের উদ্দেশ্য পরিষ্কার- শেষ মুহূর্তে এসে আসফকে কোন দোনামোনা করলে চলবে না। শেষ মুহূর্তের আনুগত্যের প্রমান বলতে তিনি কী বোঝেন তাও পরিষ্কার করে দিচ্ছেন শাজাহান- যদি আসফ, দাওয়ার বক্স , অপদার্থ শাহরিয়ার ,জাহাঙ্গীরের ভাই দানিয়েলের দুই ছেলে তাহমুরাস আর হোশাংকে ’নেই রাজ্যের পথিক’’ করতে পারেন তবে বাদশাহ আর তাঁর শুভাকাঙ্খীদের দুশ্চিন্তা মুক্ত হয়ে দিলের বোঝ হাল্কা হবে। অন্ধ বা প্রায়ান্ধ করে চোর কুঠুরিতে আটক করলেও যে সব আপদ দূর হয় না এটা খুসরুকে দেখে শেখেন শাজাহান। এমনকি বিষ দিয়ে গুপ্তহত্যা করেও খুসরুর জনপ্রিয়তা কমার বদলে বেড়েই গিয়েছিল তাই এবার যা করতে হবে তা হবে ফরমান টারমান জারি করেই , প্রকাশ্যে। সব উজির আমিররা বুঝবে বাদশাহ তাঁর ক্ষমতার রাস্তায় কাউকে সরাইখানায় দাওয়াত দেবেন না। যে সামনে এসে দাঁড়াতে চায় বা চাইতে পারে কোন দিন, সবার জন্য ক্ষমাহীন কোতলের একটাই দাওয়াই। এছাড়াও আসফের ওপর হয়তো পুরোটা নির্ভর করতে পারছিলেন না খানিকটা নূর জাহানের কারণেও। কী জানি আসফ -নূর জাহান না জোট বেঁধে দাওয়ার বক্সের পক্ষে দাঁড়িয়ে যান !
খুব কম সময়ের জন্য তখ্তে বসলেও দাওয়ার বক্স যে একদম চুপচাপ বসে ঘুমিয়ে কাটাচ্ছিলেন এমনটা কিন্তু নয়। তিনি শের শাহ উপাধি গ্রহণ করলেন। জারি করেন নানা ফরমান। মজার ব্যাপার একটা ফরমানে অধীনস্থ বিকানিরের রাজা সুরজ সিংহকে জানানো হচ্ছে জাহাঙ্গীরের মৃত্যুতে শের শাহ তখ্তে বসেছেন নূর জাহান বেগমের কৃপায়। ফরমানটায় বেশির ভাগ জায়গা জুড়েই বেগমের প্রশংসা। এর থেকে শাজাহানের আশংকা যে অমূলক ছিল না এটা বোঝা গেলেও ওটার খবর তাঁর কাছে পৌঁছেছে কিনা অজানা। আরেক অধীনস্থ আমেরের রাজা জয় সিংহকেও অধীনতা স্বীকারের আদেশ দিয়েছিলেন দাওয়ার বক্স তবে আগেই জানা গেছে শাজাহানের বার্তাও তার কাছে পৌঁছল। অনেক যুদ্ধের অভিজ্ঞ শাজাহানকেই বেছে নেন রাজা।
ষোলোশো আটাশের উনিশে জানুয়ারি লাহোরের দরবার কক্ষে শাজাহানের নামে শুত্রুবারের নামাজের আগে খুতবা পাঠ করলেন আসফ খান। দাওয়ার বক্সকে কয়েদ করা হচ্ছে। দোসরা ফেব্রুয়ারি শাজাহানের বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মী রাজা বাহাদুর ময়দানে নামে। একে একে খুন করে শাহরিয়ার , দাওয়ার বক্স আর ছোট ভাই গার্শপকে , দানিয়ালের দুই ছেলে তাহমুরাস আর হোশাংকে। খুনের লহরের সাক্ষী থাকে লাহোরের কেল্লা। ঠিক তার পরদিনই তেসরা ফেব্রুয়ারি আগ্রায় সিংহাসন আরোহন করছেন শাজাহান। তাঁর হাতি সার্নকের পিঠের ওপর চড়ে আগ্রার রাস্তা দিয়ে যাচ্ছেন দুদিকে পয়সা ছড়াতে ছড়াতে। দু পাশে প্রজারা তাঁর নামে জয়োধ্বনি দিচ্ছে। আগ্রা কেল্লায় ঢুকে পড়ল সোনা- চাঁদির ঝলমলে হাওদা চাপানো শাহী হাতির দল। ঘোড়ায় চড়ে যাচ্ছে বিশালদেহী ঘোড়সওয়াররা। ঝলমলে পোশাক পরা অভিজাতের দল সবাই যে যার পদমর্যাদা অনুযায়ী সার দিয়ে দাঁড়িয়ে , বসে শাহী দরবার আলো করে যত ভীষণ রকম খুনের দাগ ঢাকতে উঠে পড়ে লাগল।
দারা , সুজা আর ঔরঙ্গজেবকে নিয়ে আসফ খান লাহোর থেকে আগ্রার দীর্ঘ পথে কবে রওনা দিলেন ? সেটা জানা না গেলেও সে যাত্রা যে বিশাল সেপাই লস্কর নিয়ে বাদশাহী চালেই হয় এতে সন্দেহ নেই। তৈমুরের অন্য বংশজদের ঝাড়েবংশে কোতল করে জ্যোতিষীর ঠিক করা তিথিতে তখ্তে বসেছিলেন শাজাহান। সেই অনুষ্ঠানে আসফ খান তিন নাতিকে নিয়ে বাদশাহের সঙ্গে মিলিত হচ্ছেন। দু বছর পর শিল্পী বিচিত্রর আঁকা ছবিতে দেখা গেল দারা শাজাহানের সামনে মাথা ঝুঁকিয়ে আর তাঁর দুই কাঁধে হাত দিয়ে যেন তুলে ধরছেন বাদশাহ। একটু তফাতে আসফের সামনে দাঁড়িয়ে বড় ভাই সুজার সঙ্গে লম্বায় একটু খাটো ঔরঙ্গজেব। ছবিটা ত্রিস্তর একদম ওপরে সকলের মাথার ওপর শাজাহান , তাঁর তিন ছেলে আর আসফ ,তার ওপর খোদাই করা বাণী সাহিব-কিরান মানে গ্রহ-নক্ষত্রের নিয়ন্তা। তাঁদের মাথার ওপর চাঁদোয়ায় গনগনে সূর্য শাহী দাপটে বিরাজমান।আল্লাহের রসুল রাজা সলোমন মানুষ,জিন আর জানোয়ারের রাজা আর তাঁর মতোই শক্তিশালী বাদশাহ শাজাহান। পৃথিবী -জাহানের কেন্দ্রে যদি বাদশাহ তার নিচের স্তরেই এক খাড়াই ডান্ডার ছবি যা হল পৃথিবীর অক্ষের মহাজাগতিক প্রতীক কুতুব। সেটা পাহারা দেয় দুই উলেমা, তাঁদের দুজনকে ছবির পেছনে রেখে, মাঝের উঁচু এক তলকে ঘিরে আর একদম নিচের স্তরে যত জাগতিক কেত্তন। দাঁড়িয়ে থাকে দরবারী উজির , আমির -ওমরাহ , রাজার দল তাঁদের কেউ ইরানি ,তুরানি , আফগানি , কেউবা রাজপুত বোঝা যায় পোশাকে আশাকে হয়ত বা রঙে। কোথাও কোন মহিলার ছবি নেই। মনে পড়ে আকবরের দরবারের এক ছবির যেখানে ধাত্রী মা মহাম আনগা বাদশাহের সবচেয়ে কাছে সসম্মানে বসে আছেন। সহ শাসক হলেও জাহাঙ্গীরের দরবারে নূর জাহানের প্রকাশ্য উপস্থিতির ছবি নেই যেমন এই তখ্তে বসার ছবিতে মুমতাজ মহল ভ্যানিশ।
তারিখের পাতায় লেখা না হলেও তিন ছেলেকে ফিরে পেয়ে মুমতাজ মহল বা জেনানার অন্য মহিলাদের আনন্দ, উচ্ছাস অনুমান করা যেতেই পারে। শাজাহান বাদশাহ হতে, মুমতাজ হয়েছিলেন পাদশা বেগম। সাতি উন্নিসা পেলেন হারেমের দেখভালের দায়িত্ব। সাতি উন্নিসার নিত্য কাজ ছিল যত অনাথ মেয়ে ,বৌয়ের সঙ্গে মোলাকাত। প্রায়োজন অনুযায়ী তাঁদের আবেদন পাদশা বেগমের কাছে পেশ হতো। বেগম সেগুলো হিন্দুস্থানের বাদশাহ বা পাদশা গাজি শাজাহানের কাছে পাঠাতেন অনুমোদনের জন্য। দেখা যাচ্ছে কাউকে জমি দেওয়া হচ্ছে , কাউকে দৈনিক ভাতা আর কাউকে বা নগদ বিদায়। যেসব মেয়েরা বিয়ের যুগ্গি অথচ অভাবের তাড়নায় বিয়েথা হয়নি , তাঁদের পারিবারিক মর্যাদা অনুযায়ী শাড়ি গয়না দিয়ে উপযুক্ত পাত্রস্থ করা হতো। এটা নিয়মিত ভাবে চালু করেন নূর জাহান এখন তাঁর ভাইঝি মুমতাজ সে ধারা অব্যাহত রাখছেন।জানা যায় একবার নূর জাহান বেগম একদিনে এরকম পাঁচশো মেয়ের বিয়ে দিলেন।
এভাবে মোঘল ইতিহাসে তুলনামূলক ভাবে কম সামনে আসা বাদশাহের প্রেমের সঙ্গিনী বলে পরিচিত মুমতাজ মহলের কি একটা পর্বান্তর ঘটে ? শাজাহানের বিদ্রোহের সময় দীর্ঘদিন যেভাবে সারা ভারতের কোনায় কোনায় ছুটে বেড়াতে হয়েছিল মুমতাজকে তাতে তাঁর ব্যক্তিত্বে অনেক পরিবর্তন আসাটাই স্বাভাবিক। সবচেয়ে জরুরি ছিল শাজাহানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে অনেক দূরের কোন কেল্লা থেকে এই যোগাযোগ রাখার ব্যাপারটা একতরফা হওয়া সম্ভব নয়।নিজস্ব কিছু বাছাই করা লোককে চালনা করতে হতো মুমতাজকে। এই নেটওয়ার্ক পরিচালনার অভিজ্ঞতা যুদ্ধ পরিচালনার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী।ষোলোশো বাইশ থেকে ছাব্বিশের শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহের প্রায় পাঁচ বছরে কোনো কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে শাজাহানের সঙ্গে মুমতাজেরও অবদান ছিল কি ? শাজাহান বাবা জাহাঙ্গীরের মতো নিজের হাতে দিনের ঘটনার লিপিকার বা তীব্র অনুসন্ধিৎসা তাড়িত প্রকৃতি জ্ঞানের দিনলিপি প্রয়াসী ছিলেন না। সেক্রেড সভরেনিটির- স্বর্গীয় আশীষ বাহক ধুমাধার প্রতিনিধি হতে চেয়েছিলেন , হতে চেয়েছিলেন একক ও অনন্য , হয়েও ছিলেন। এই প্রশ্নেই বাবার সঙ্গে তাঁর সংঘাত, কিছুতেই নূর জাহানকে সহ শাসকের ভাগ দেওয়া সম্ভব ছিল না শাজাহানের পক্ষে। তাঁর আমলের ইতিহাস পাদশানামা বইটাও পাকা ওস্তাদদের দিয়ে লিখিয়েছেন। সে ইতিহাস নূর জাহানের স্মৃতিকে মুছে দিতে তৎপর, তেমনই চুপ থাকছে মুমতাজের ভূমিকা সম্পর্কেও। ফলে অনুসন্ধানে এক অন্য মুমতাজকে পাওয়া যেতেই পারে যাঁর নিজস্ব ইতিহাস আছে, তা শাহী তারিখের পাতায় পাতায় থাকুক আর না থাকুক।
তখ্তে বসে অনেক সুবেদারকে সরাতে হয়েছিল শাজাহানকে। নিজের নামাঙ্কিত মুদ্রা চালু করে, নূর জাহানের নামাঙ্কিত মুদ্রা তুলে নিলেন তিনি। শ্বশুর আসফ খান সম্মানিত হচ্ছেন প্রধান উজির পদে , খেতাব পাচ্ছেন ইয়ামিন উদ দৌলা বা সালতানাতের দক্ষিণ হস্ত। মহবত খান হলেন প্রধান সেপাইসালার।
---- সবই তো বুঝলাম কিন্তু....
---- কিসের কিন্তু ?
---- না এত রক্তপাত ....
---- সেতো হবেই। জান না - ইয়া তখ্ত ইয়া তাবুত ?
---- জানি কিন্তু সেটাও সাধারণ ধর্ম ছিল কি ?
---- কীরকম ?
---- হুমায়ুন কী করলেন ?
---- কী করলেন হুমায়ুন ?
---- তখ্তে বসতে মামা মাহদি খাওয়াজার বিরোধিতা করতে হয় হুমায়ুনকে। উপেক্ষা করা হল তাঁর বৈরিতার । চার বছরের মাথায় সৎ ভাই মির্জা হিন্দালের প্রথম নিকাহ হয় ওনার বোনের সঙ্গেই। পরবর্তী সময়েও মামা ভাগ্নের সম্পর্ক অটুট রয়ে যাচ্ছে। কিন্তু পনেরোশো তিপান্নতে বিদ্রোহী ভাই মির্জা কামরানকে অন্ধ করে দিলেন হুমায়ুন।
---- তবে ?
---- এই নির্মম সিদ্ধান্ত নিতে যথেষ্ট দ্বিধাগ্রস্ত হুমায়ুনের মনোবেদনার কথাও লিখছেন তাঁর বোন গুলবদন বেগম অনেকদিন পরে পনেরোশো আশির শেষ দিকে ভাইপো আকবরের অনুরোধে। তবে দরবারের অভিজাতরা চরম শাস্তির পক্ষে দাঁড়িয়ে গেল।
গুলবদন বেগমের বই আহবল -ই হুমায়ুন বাদশাহের ফারুকির ইংরিজি তর্জমার বাংলা (Princes of Mughal Empire Munis D Faruqui page251)
শেষে ,সব খান আর সুলতানরা , সে অভিজাত বা আম জনতা ,বাচ্চা বা বুড়ো , ফৌজি বা সাধারণ প্রজা যাঁরাই মির্জা কামরানের হাতে ভোগা খেয়েছে সবাই এক সঙ্গে জড়ো হয়ে শাহেনশাকে বলে ,'' পাদশা হলে আর হুকুমতের মালিক হলে ,কেউ শুধু ভাই থাকতে পারে না। ভাইকে ছাড়লে তখ্ত ছাড়তে হবে ,শাহেনশাহ যদি হুকুমত চালাতে চান , ভুলে যান ভাই হবার কথা।‘’উত্তরে শাহেনশাহ বলেন, '' কী বলেন বুঝি , তবু করতে মন চায় না। ‘’ সকলেই গলা চড়ায় , বলে ,'' দরবার যা বলে সেটাই সঠিক রাস্তা শাহেনশাহের।'' এভাবে বাদশাহের হাত বাঁধা পড়ে।
---- তবে হুমায়ুন সব দরবারী অভিজাতকে হস্তখত করিয়ে নিলেন যে মির্জা কামরানকে অন্ধ করার ফরমানে সায় আছে সবার। আসলে মোঘল শাসন মতাদর্শে পরবর্তী সপ্তদশ শতকে অনেক পরিবর্তন দেখা গেল ।
---- কেমন ?
---- হুকুমত আর ভ্রাতৃবন্ধনের দোলাচল উবে গিয়ে তথাকথিত ন্যায়বিধানের নির্মম রথের চাকায় গুঁড়িয়ে গেল রক্তের টানও। রথ যদি থাকে তবে রশি থাকবে না এ আবার হয় নাকি ?
----- কোনটা রথ আর রশিই বা কেডা ?
----- বিজয়ী বাদশাহ যদি হন রথ তবে রশি হল রাষ্ট্রীয় মতাদর্শের হুক্কাহুয়া আমলা শাহী , কাজী , উজির আর তারিখ রচনাকারা। বাদশাহ শাজাহানের কোতলকারী ভূমিকা দু হাত তুলে সমর্থন জানিয়েছেন তেনারাই। পরবর্তী কালে ঔরঙ্গজেবের যাবতীয় ভাই-ভাইপো কোতলের কাণ্ডও যেন জলভাত হয়ে গিয়েছিল সমসময়ে। তবে এরও একটা শুরু আছে আর তা হল জাহাঙ্গীরের আমলে।
মোঘল দরবারের গুরুত্বপূর্ণ অভিজাত মুহাম্মদ বাকিরের মাউইজাহ-ই জাহাঙ্গীররির (১৬১২)ফারুকির ইংরিজি তর্জমার বাংলা( Princes of Mughal Empire Munis D Faruqui page253)
বিজয়ী বাদশাহরা অনাঘ্রাতা কুমারী ক্ষমতাকে ভোগ করবেন যখন ঝলসানো তলোয়ার জীবনের ফলক থেকে মুছে দেবে ঘৃণ্য শত্রুর নাম । শত্রুর লোলুপ ভাণ্ড বিজয়ের পাথরাঘাতে ভেঙেই জগতখ্যাত বাদশাহরা কামনাঘন পাত্র আবেশে ঠোঁটে তুলবেন।
তিরিশ বছরের ব্যবধানে গুলবদন বেগমের বর্ণিত মতাদর্শগত অবস্থানের সঙ্গে জাহাঙ্গীরের আমলের মতাদর্শগত অবস্থানের আশমান জমিন ফারাক লক্ষণীয়। প্রথমটি যদি বাদশাহের মানবিক গুণাবলিকে সামাজিক চুক্তিতে বাঁধার কথা বলে তো দ্বিতীয়টি চূড়ান্ত সম্প্রসারণকামী ধর্ষকামী মনোবৃত্তির পরিচায়ক। রাজ করার ইচ্ছেকে নানা অনুষঙ্গে যৌন লালসার সমার্থক করে তবেই না খুন- খারাবার ধর্ষকাম চরিতার্থ হয় !এই মতাদর্শের দেউলিয়া দশা প্রকট হয়েছিল শেষ শক্তিশালী মোঘল বাদশাহ ঔরঙ্গজেব আলমগীরের মৃত্যুর পরপরই। বিশেষ করে সতেরোশো বারোয় তাঁর ছেলে বাহাদুর শাহ -এক মারা যাবার পরের পর্যায়ে।ফলাফলের দিক থেকে দেখলে - দরবারের আদব কায়দা আর প্যাঁচ পয়জারের ব্যস্ত অনভিজ্ঞ , যুদ্ধে আনাড়ি, শাহাজাদারা , একসময়ের মোঘল ঐতিহ্যের সহমতের আদর্শকে বিসর্জন দিয়ে, নিজেরাই নিজেদেরই শেষ করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে , শক্তিশালী কেন্দ্রের পতন ডেকে আনল। তবে এর পেছনে আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ কারণও অবশ্যই ছিল।
শাজাহানের বিশ্বস্ত রাজা বাহাদুর লাহোরের কেল্লায় ঢুকে নিধন যজ্ঞ চালান। শাজাহান ওই লোকটিকে মোঘল দরবারের অনুষ্ঠান পরিচালকের দায়িত্ব দিলেন , উপাধি দেওয়া হলো মির তুজুক। পরে রাজা বাহাদুর আরো সম্মানের উপাধি পেলেন হলেন খিদমত -পরস্ত খান , এমন এক খান যাঁর কাছে রাজসেবাই ধর্ম। বাদশাহকে ক্ষমতা পেতে সাহায্য করলে এসব গালভরা উপাধি আর চোদ্দগুষ্টি গুষ্টিসুখ উপভোগ করার জন্য প্রচুর টাকাকড়ি পাওয়াটায় নতুনত্ব কী ? দেখার হল , ওই মধ্যযুগেও কি কেউ কোন অন্যস্বরে কথা বলেছে রাজা বাহাদুর সম্পর্কে ? একটা গল্প তলে তলে গোপন লোকশ্রুতি হিসেবে খুবই চালু ছিল না হলে প্রায় দেড়শো বছর পর এক বইতে তার উল্লেখই বা থাকবে কেন ? শানাওয়াজ খান আর তাঁর ছেলে আব্দুল হাই সতেরোশো চল্লিশ থেকে আশির মধ্যে লিখলেন মসির -উল -উমারা , মোঘল সালতানাতের সমস্ত রাজপুরুষ আর সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের জীবনীর সংকলন, ফার্সিতে দুহাজার সাতশো পাতার পেল্লায় বই। সেই বইতে উল্লেখ করা হয় গল্পটা ।
----- কেমন গল্প যা অনেক দিন বেঁচে থাকে ?
----- জান না ?
----- জানি।
----- তবে ?
----- বিশ্বাস হয় না।
----- কখন ?
----- যখন সে গল্প জোরে শোনা গেল।
----- আর আস্তে শোনা গেলে ?
আস্তে আস্তে ফিসফাস আওয়াজ হতে থাকে লাহোরের ওয়াল সিটি জুড়ে। সেখানে এক লাহোরওয়ালাকে দেখা যাবে। কি তাঁর নাম ? জানা যায় না। শুধু জানা যাচ্ছে তিনি লাহোরের অলিগলি ধরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন । কথা বলছেন , খাচ্ছেন , চা খাচ্ছেন , কাবাব, চাট খাচ্ছেন ঘুরে ঘুরে আবিষ্কার করছেন মহম্মদ রফি সাহেবের দলিজ , ওপি নাইয়ার সাহেব কোথায় থাকতেন। কোথায় হাতিদের রাখার জন্য এক হাভেলি রচনা করেছিল মোঘল আমলে , শিখ আমলে। ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া চুল নাচিয়ে সব দেখান লাহোরওয়ালা। খুঁজে বার করতে থাকেন অজানা মন্দির কোথায় বিশাল দরজা বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আছে , কোথায় শেতলার থান বানিয়ে পুজো করত সবাই লাহোরের ঘুপচির মধ্যে। বসন্ত রোগ ,মা শেতলার দয়া, না হওয়ার পুজো করত মুসলমান। তারপর বাবরি ভাঙল এখানেও শেতলার থান উঠে গেল , পাড়ার লোক অনবরত রিইউজ করছে মন্দিরকে।,সেখানে শেতলার থান ফিসফাস করছিল আজও তাই লাহোরওয়ালা সেখানে পৌঁছে যান। কোথায় দেশভাগে ছেড়ে যাওয়া জৈন টোলা , খান্না ম্যানসন হাভেলির মাথায় ধুলো পড়ে পড়ে ফিসফাস করছে একটা ফলক আর তাতে লেখা ওঁম। অনেক কষ্টে উচা দেয়ালের ওপর উঠে সে সেই ওঁম অক্ষরটার ওপর ধুলো ঝাড়তে থাকেন লাহোরওয়ালা তাতে অক্ষরটা উজ্জ্বল হল কারণ সে পাথরে খোদাই , যদিও তার মালিকরা কবেই চলে গেছে টুকরো করে কাটা হিন্দুস্থানের অপর পারে।
এমনি এক ফিসফাস গল্পের খোঁজে লাহোরের কেল্লায় যাওয়া যেতে পারে আর হঠাৎ প্রবল হাওয়া দেয় , সেখানে পাখিরা ওড়ে , কালো কালো কবুতর , ঘুরে ঘুরে উড়তে দেখা গেল অনেক পাখির সঙ্গে । পাখিরা ঘন মেঘের সঙ্গে মিশে যাওয়াতে মেঘেদের আরো কালো কালো লাগে।
ষোলোশো আঠাশের দোসরা ফেবুয়ারি , শহর লাহোরের থেকে কিছু দূরে কেল্লায় এক ঘুপচিতে বেতখত হয়ে যাওয়া বাদশাহ দাওয়ার বক্স দাবা খেলছিলেন ভাই গার্শপের সঙ্গে। সময় ? এই তো মুশকিল , সময় নিয়ে কে ভেবেছে সে দিন ! গার্শপ কথাটার মানে দানবহন্তা কিন্তু হিন্দুস্থানী প্রথায় দাবাতে রাক্ষস খোক্কস মারার গল্প নেই। দাওয়ার বক্স বাবা শাহাজাদা খুসরুকে প্রায়ান্ধ দেখেছেন বরাব্বর , গার্শপও। তারপর বাবা পেটের ব্যথায় ছটফট করতে করতে মারা যান বুরহানপুরের কেল্লায় সেও দেখেছেন দুই ভাই। সেটা বিষ দিয়ে সবাই জানে, তারপর থেকে এই দুই ভাই অনবরত বিষেরই অপেক্ষা করে থাকেন । কোথাও কি আর্তনাদ শোনো গেল? খুব তাড়াতাড়ি , খুব ধারালো উঁচুমানের ইস্পাত দিয়ে বানানো ছুরি দিয়ে নলি কাটলে একরকমের হাওয়া বিদারী আওয়াজ হয়। আসলে সেটা আওয়াজ কিনা সন্দেহ আছে , শব্দের ধাতবতা তাতে নেই শুধু হওয়াতে হাওয়া মেশে না হলে যুদ্ধের এতো আর্তনাদ সব কানে সারাক্ষণ বেজেই চলতো। তাই ওই সামান্য আওয়াজে দিমাগ খারাপ হল না দুই শাহজাদার। কখন যে রাজা বাহাদুর তাঁর বিশ্বস্ত গোটা কয় চেলাকে নিয়ে হাজির হয়েছেন টেরটাও পেলো না তারা। ফলে বাধ্য হয়েই রাজা বাহাদুরকে শাহাজাদাদের খেলা থামানোর জন্য গলা খাঁকারি দিতে হচ্ছে। এ দুজনের যেন মৃত্যু মুখে কোন উত্তাপ নেই। রাজা বাহাদুর বললেন , '' হুজুর। " দাওয়ার বক্স এই লোকটাকে বাবার ঘর থেকে বার হয়ে যেতে দেখেছিলেন বুরহানপুরের কেল্লায়। তারপরই তার বাবা শাহাজাদা খুসরু মারা যান কয়েক ঘন্টার মধ্যে ছটফট করতে করতে। এ আসার মানেটা কী তিনি বুঝতে পারলেন। এমনিতেই দাওয়ার বক্স অচঞ্চল , বিশেষত কিছুদিন বাদশাহ হবার পর কারুর দিকে না না তাকিয়ে আদেশ করতে শিখেছেন, তাই দাবার টেবিল থেকে মাথা না তুলে বললেন , ''আর একটু খেলব।''
----- না হুজুর।
----- কেন ?
----- হুকুম হুজুর।
----- কার ?
----- শাহেনশার হুজুর।
----- কবে থেকে ?
----- কালই বাদশাহ শাজাহানের নাম খুতবা পড়া হয়েছে হুজুর। বান্দা হুকুম তামিল করতে এয়েচে।
দাওয়ার বক্স বোঝেন। রাজা লোকটা যখনি আসবে মৃত্যু দাঁড়িয়ে থাকে। সে মৃত্যুর খুবই তাড়া তাই যা করার রাজাকে তাড়াতাড়ি করতেই হয় আরকি । কিন্তু গার্শপ না বেয়াদবি করে ! ভয়ে চিৎকার না করে ওঠে! তাই অত্যন্ত শান্ত চোখে ভায়ের দিকে চেয়ে বিদ্রুপ করে ওঠেন দাওয়ার বক্স ,'' ওরে এ মালটা দিলদার রাজা নয়, বদ নসিব কাজা -নিয়তি। '' এর পরপরই দুই শাহজাদাকে পরপর বা একসঙ্গে গলার নলি কেটে দিলে আরো কিছু হাওয়া ফিসফিসিয়ে বেরিয়ে গেল, কোন আর্তনাদ হয়নি। দাওয়ার বক্সের টিটকিরির গল্পটা পাক খেয়ে ঘুরে ফিরে গোটা হিন্দুস্থানে শাহী গুমরের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে রয়ে যায় দেড়শো বছর।গোপনে উচ্চারিত সে কিস্সা সরব হচ্ছে , শানাওয়াজ খান আর তাঁর ছেলে আব্দুল হাই লিখে রাখছেন মসির -উল -উমারা বইতে।
লাহোরওয়ালাকে এইসব তারিখ বেত্তান্ত জিজ্ঞাসা করাতে উনি লাহোরের গলিঘুঁজি দিয়ে হাঁটতে বললেন যেন হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে যাওয়া যায় তারিখের অন্দরে । একবার হাঁটতে শুরু করলে কি থামা যায় ? হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে যাচ্ছেন দাতা দরবার থেকে ভাট্টি গেট। সেখানে বড় বড় মাটির তন্দুর তৈরি ও বিক্রি হচ্ছে , বিক্রি হচ্ছে বাহারি হুঁকো আর গড়গড়া। গজনীর মামুদের কাছে পেশাওয়ারের যুদ্ধে সাতাশে নভেম্বর একহাজার একে হেরে রাজা জয়পাল জহর ব্রতের আগুনে আত্মাহুতি দিলেন মরি গেটের একদম পাশের একটা জায়গায়। সেখানে থেমে যাচ্ছেন লাহোরওয়ালা আর লিখে রাখা এক ফলক দেখিয়ে লাহোরের এই বীর সন্তানের কথা বলতে থাকেন , বলতেই থাকছেন তিনি। দাওয়ার বক্সের টিটকিরির গল্পটা শুনেছেন কিনা জানতে চাইলে কয়েক পংক্তি আউড়ে দিলেন উনি আর তাতে আর যাই হোক লাহোর আর যত লাহোরির সম্পর্কে একটা ধারণা তো পাওয়া গেল। জনাবের পেশ করা শায়েরি শাহী লড়াইয়ের বাইরে অনেক চওড়া দিল ইতিহাস চিনিয়ে দেয়। সেখান থেকে আস্তে আস্তে মাজারের ধূপের ধোঁয়া হয়ে দম পখত খুশবু ফেনিয়ে দিচ্ছে মাথা ও দিল। জনাব যেন মেহফিল বসিয়েছেন-
উঁচ্চে বুরজ লহোরদে যিথে
বুলদে চার মিশাল
এথে মিঁয়া মিরদে বস্তি
এথে শা জামাল
এক পাশে দা দাতা মালক
এক থা মাধো লাল।
উঁচু ওই লাহোরের বুরুজের
হল চার বাতিঘর
এখানে থাকেন পির মিঁয়া মির
আর পির শা জামাল
এদিকের মালিক হলেন পির দাতা
অন্য দিক পির মাধোলালের
লাহোরওয়ালার গমগমে অথচ ফিসফাস উচ্চারণ কেলেহ এ লাহোরের দেওয়াল ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাবে। মুছে দেবে কালচে হয়ে আসা রক্তের দাগ।
*****
অতিরিক্ত তথ্যসূত্র : ABUL FAZL'S VISION OF ASTRONOMY IN HISTORICAL PERSPECTIVE KantaSinghaniaAnnals of the Bhandarkar Oriental Research Institute, Vol. 90 (2009), pp. 81-97 JSTOR


0 মন্তব্যসমূহ