অনুবাদ- ফারহানা আনন্দময়ী
বাবা চোখে আর কোনোদিন দেখতে পাবেন না- এটাই ঘটলো শেষপর্যন্ত। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এই সিদ্ধান্তেই অটল থাকলেন যে, বাবার এখন যে বয়স তাতে অস্ত্রোপচার করবার চাপ নিতে পারবেন না তিনি। ঝুঁকিতে পড়বে তার জীবন। তো, বাবা এখন পুরোপুরি অন্ধ একজন মানুষ। আশি বছরের মতো একটি সম্মানজনক বয়সের অন্ধ। সোজাসাপ্টা কথা বলা আমাদের একজন পারিবারিক বন্ধু বাবাকে বললেন, “ওহে বুড়ো মানুষ, জগতের যা কিছু সুন্দর, আশি বছর পর্যন্ত তুমি চোখভরে দেখে নিয়েছ। এখন না হয় আগামী পাঁচ কিংবা দশ বছর পৃথিবীর মন্দ জিনিসগুলো আর দেখতে পাবে না। তুমি তো সৌভাগ্যবান মানুষ হে।"
এইসব হিসেবনিকেশে বাবা মোটেও সান্ত্বনা পেলেন না। বরং এই জায়গা থেকে নিজের ভাবনাকে বিচ্যুত করবার লক্ষ্যে তিনি আমার মাকে অন্ধত্বের শিল্পরূপ বোঝাবার দিকে অধিকতর মনোযোগ দিলেন; অন্ধের মতো চলার প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করলেন। আমার ঘরে বসে শুনতে পাই তার হাসির আওয়াজ। মা অন্ধ সেজে হাঁটতে গিয়ে ঘরের আসবাবের সাথে যখন ধাক্কা লাগে, টেবিলের ওপরে রাখা আমার বোনের কফির মগটা যখন ছিটকে গিয়ে পড়ে- বাবা হাসতে থাকেন আর বলেন, “তুমি কখনোই একজন ভালো অন্ধনারী হতে পারবে না।"
সত্যি বলতে কী, অন্ধ সেজে থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করার পরেও মা এই নতুন পরিস্থিতিটা কিছুতেই নিজের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারছেন না। তার উপর তিনি বাবার সাথে চালাকি করছেন। প্রথমে বাবা ওই সুযোগটুকু মাকে দিয়েছেন যে, চোখ বুজে মা হাঁটতে পারবেন। কিন্তু একটা সময় এসে বাবার মনে হলো, মা তাকে ঠকাচ্ছেন। ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন বাবা। মা তখন কান্নাকাটি শুরু করলেন; বললেন, "আচ্ছা, ঠিক আছে, আমি আবার করছি।" কিন্তু বাবা আর তাকে বিশ্বাস করতে পারলেন না। একটা মোটা কাপড় ভাঁজ করে মায়ের চোখ শক্ত করে বেঁধে দিয়ে বললেন, “যাও, হাঁটো তো। এবারও নিশ্চয়ই তুমি ধাক্কা খাবে জিনিসপত্রের সাথে।" সাথে এটাও বললেন, “এমনকি, এবার তুমি ওই ফুলদানিটা ভেঙে ফেলতে পার, যেটা আমাদের বিবাহবার্ষিকীতে তোমাকে উপহার দিয়েছি আমি। এক সপ্তাহও যায়নি, তুমি স্বর্গের শপথ করে বলেছ, ওটা কখনোই তুমি ভাঙবে না। না, না, মারিয়া, তুমি আসলে কখনোই একজন ভালো অন্ধনারী হতে পারবে না।“
অন্যদিকে বাবা এই বিষয়ে তার নাতনিকে নিয়ে দারুণ উচ্ছ্বসিত। সে দুর্দান্ত ভালো এক অন্ধনারী! তুমি তার হাতের দিকে তাকাও, দেখবে কীভাবে আকড়ে ধরেছে তারা! দেয়াল হাতড়ে হাতড়ে, দেয়ালে ভর করে নিজের শরীরটাকে নিয়ে সে সারাঘরময় একটা পথ কেটে নিয়েছে। বাবার কাঁপতে থাকা শরীরটা নাতনিকে ঠিকই অনুসরণ করতে পারছে এবার।
অবশেষে, আজকে আমাদের বাড়িতে একটা উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে; বাবার অন্ধ হবার একবছর পূর্তি উপলক্ষে। আমাদের আত্মীয়স্বজনেরা এবং প্রতিবেশীরা এসেছেন। সবার হাতেই যার যার চোখে বাঁধার জন্য ঠুলি বাবা বিলি করেছেন। অনেক প্রাণবন্ত ছিল আজকের এ আয়োজন। এবং সবচেয়ে বিস্ময়কর যেটা, তা হলো, কেউই ভুলভাল নড়াচড়া করছেন না। এবার কেকের ওপরের মোমবাতিগুলো ফুঁ দিয়ে নেভালেন বাবা- একাশিটা মোমবাতির মধ্যে ষোলোটা! এরপর অতিথিরা সবাই শ্যাম্পেন হাতে নিয়ে বাবার উদ্দেশে উল্লাসধ্বনি দিলেন, আর তখন, বাবা এমনকি একপাক নেচেও নিলেন।
তাহলে কি এখন বলাই যায়, দৃষ্টিশক্তি হারানোও ভীষণভাবে অকেজো একটি দুর্ভাগ্য!
-----------
মূলগল্প: The employ of darkness.
অনুবাদক পরিচিতি: ফারহানা আনন্দময়ী। জন্ম ২১ অক্টোবর, জন্মশহর খুলনা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাজীবন সম্পন্ন করে বর্তমানে চট্টগ্রামের বাসিন্দা। একটি প্রতিষ্ঠানে খণ্ডকালীন কাজ করেন। কবিতায় হাতেখড়ি এবং লেখালেখির জগতে প্রবেশ। ইতোমধ্যে প্রকাশ পেয়েছে চারটি কাব্যগ্রন্থ- ‘মেঘ অরণ্য’, ‘ইচ্ছেসবুজ’, ‘দীর্ঘায়ু চাইনি, আনন্দায়ু দাও’ এবং ‘কবিতাস্নানে যাই’। মুক্তগদ্য এবং অনুবাদ গল্প ছাপা হয়েছে বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকার সাময়িকীতে এবং ওয়েব পত্রিকায়। পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষাভাষী লেখকদের গল্পের অনুবাদ নিয়ে সম্প্রতি ‘একজোড়া সপ্তর্ষি’ শিরোনামে একটি অনূদিত গল্পসংকলন প্রকাশিত হয়েছে।


1 মন্তব্যসমূহ
স্বচ্ছন্দ চলন। অনুবাদ বলে মনেই হয় না।
উত্তরমুছুন