শঙ্খদীপ মুসাফিরানার গল্প: উড়ে যা





জীবন এমনই যে না চাইতেই খারাপ-ভালো সকল স্বাদের আস্বাদন করিয়ে নেয়। আর তা যদি হয় সজ্ঞানে ছেড়ে দেওয়া কোনো সুখবস্তু, তাহলে তো কথাই নেই! কোনো এক অজ্ঞাত ব্যবস্থাপনা বারংবার এমনভাবে সেই সুখবস্তুকে আমাদের সামনে এনে দাঁড় করায়, তা থেকে ত্যাগীর মনে হতে বাধ্য কি সুখের প্রত্যাশী হয়ে সে ছেড়েছিল বিশ্বের এই শ্রেষ্ঠলভ্যকে! সেই হাতছানির ভাব এমন যেন আর একবার সুযোগ দেওয়া হল ভেবে দেখার — ফিরে দেখার — পূর্বচিন্তিত সিদ্ধান্ত ঠিক ছিল না ভুল! তাতে দীর্ঘসূত্রতায় লাভ হল না লোকসান! গতিপথ কী আবারও সে দিকে ফেরালে ভালো হবে, নাকি এ সুখবস্তুর লোকসান সয়ে যাওয়ায় অন্যত্র কোনো লাভ হবে অধিকতর!


এমনই এক কর্তব্যবিমূঢ়তার দোলাচলে দাঁড়িয়ে আছে কথাকলি।


রাস্তার ওপার থেকে দেখলে এ বাড়ীর পাঁচিলের গায়ে ধাক্কা খেয়ে দৃষ্টি আটকাবে প্রায় ‘শতাব্দী-প্রাচীন’ খেতাব পেতে চলা একটি আম গাছে – আপনাদের জ্ঞাতার্থে, যেটা আমি। নিজের মুখে নিজের প্রশংসা করা উচিত না, কিন্তু আমার বিশালতা আপনাকে একবার না একবার হলেও থমকে দেবে, এ চিন্তায় যে এ আমগাছ না অন্যজাতের বট-অশ্বত্থ ধরনের কিছু। দোতলার পশ্চিমের ঘরের একটি জানলা ঠিক আমার পিছনের দিকে। আমার উত্তরের এক শাখা এবং তাতে ঝাড় হয়ে থাকা ঘন পাতা এমনভাবে জানলাটির গা ঘেঁষে থাকে যে খুব শ্যেনদৃষ্টি না হলে সেই জানলা মানুষের চোখে পড়া দুষ্কর।


পুরোনো বনেদি বাড়ি। তাই জানলা যেমন শুরু হয়েছে মেঝের কিছু ওপর থেকেই, শেষও হয়েছে প্রমাণ-মানুষ উচ্চতাকে একটু ছাড়িয়ে। সেখানেই কথাকলি দাঁড়িয়ে আছে। হাতে গরম চায়ের কাপ। কাপের চা থেকে যে পরিমাণ ধোঁয়া উঠছে তাতে সন্দেহের কোনো অবকাশ থাকে না যে চা’টি বেশ গরম। কিন্তু সেই কাপের গায়ে দৃঢ়ভাবে জাপটে থাকা কথাকলির হাত দেখে মনে হচ্ছে, কি এক অমানুষিক স্বজ্ঞায় সে সেই গরম চায়ের সমস্ত লীনতাপ টেনে নিচ্ছে নিজের শরীরে। তার ঈষৎ কুঞ্চিত ভ্রু-যুগল ও আমাকে ছাড়িয়ে রাস্তার ওপাশে হারিয়ে যাওয়া দৃষ্টি দেখে যেন মনে হচ্ছে প্রতিমুহূর্তের তপ্ততার উৎস্রোত তাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে তার অতীতের মুহুর্তগুলিকে। চোখের সামনে ভেসে উঠছে তার আর সায়মের শত সহস্র মধুর স্মৃতি। কত খুঁটিনাটি কথা, ঘটনা মনে থেকে যায় আমাদের, তা কি আমরাই জানি? মন অন্তর্মুখী হলে, বাহ্যিকতার অভাব, সেগুলিকে আমাদের সামনে এনে দেয় অপ্রত্যাশিতভাবেই। তখন যেন আরো মনে হয়, এমন লগ্নতাকে কেমন করে উপেক্ষা করা গেছিল? কিসের আশায়?


কিরে তুই এখানে? চা দিয়ে গেছে?


কথাটা কানে না গেলেও, হঠাৎ শব্দের নবস্রোত চিন্তায় ছেদ ফেলল কথাকলির। "উঁ?" শব্দে সে জানান দিল, কি হয়েছে!


তমালী এসে দাঁড়ালো কথাকলির পাশে। একা একা কি করছিস এখানে?


কথাকলি কাজের অজুহাতী গল্প দিয়ে তমালীকে নিরস্ত্র করল; যদিও সে জানে তমালীর কথাকলির এখানে দাঁড়িয়ে থাকার কারণে খুব একটা আগ্রহ নেই। সে এমনিই কথার কথা জিজ্ঞাসা করেছিল। তাতে এত মিথ্যা বলার দরকার ছিল না হয়ত, তবু সত্যি কথা বললে, বিনাকারণে জটিলতা বাড়ত। দুদিন পর মেয়েটার বিয়ে। তার নিজের অজস্র ভাবনা চিন্তা, ভয়, উদ্বেগ মনের মধ্যে ঘূর্ণিপাকে ঘুরছে। আর এমনিতেও কিছু চিন্তা তো একান্তই নিজের, জীবনের মতই, জীবনের লড়াইয়ের মতই। কাউকে বলে সাময়িক স্বস্তি হতে পারে, তবে সে লড়াই লড়তে হয় নিজেকেই, এ সারসত্য কথাকলি এই দু'তিন বছরে বিদেশে গিয়ে ভালোই উপলব্ধি করেছে। যদিও এ সত্য উপলব্ধি করতে প্রত্যেককেই বিদেশে যেতে হয় বা হবে, এমন নয়, কিন্তু এমন একটা পরিস্থিতি অবশ্যই প্রয়োজন যেখানে স্রোতের বিপরীতে ভেসে থাকাতে খড়কুটো পর্যন্ত মিলবে না। বিদেশ তেমনই একটা জায়গা। অন্তত যাদের কোনো আত্মীয়স্বজন বিদেশে নেই, একা নিজের দায়িত্বে নিজেকে নিয়ে চলা সেসব জায়গায় এক মোক্ষম অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের ক্ষেত্র।


চা খাওয়া হলে নীচে চ। কাল যে মেহেন্দি পরাবে সে আসবে। মেহেন্দি পরবি তো? আজ পরে নিস। একদিনে ওদের ওপরও চাপ পড়ে যাবে নয়ত... এক নি:শ্বাসে বলে গেলো তমালী।


না না, আমি মেহেন্দি পরব না। আমার ওসব ভালো লাগে না।


ন্যাকামো করিস না। একবারই বিয়ে করব... আর তুই আমার বেস্ট ফ্রেণ্ড হয়ে মেহেন্দি পরবি না! চ... চ... তাড়াতাড়ি চা শেষ কর!


বস না একটু! চা'টা একটু আয়েস করে খাই! কতদিন যে এমন আদা দেওয়া চা খাইনি!


আচ্ছা খা... আমি বসছি।


কথাকলি তমালীকে জিজ্ঞাসা করে, হ্যাঁরে তোর ভয় করছে না!


তমালী একটু অপ্রস্তুতের হাসি হাসে। যেন কেউ তার গুপ্ত কিছু জেনে ফেলেছে। সে বলে, হ্যাঁ একটু তো করছেই!


তুই তো সাম্যকে চিনিস... তাও?


সাম্যকে চিনি। তবু, সম্পর্কের প্রতি কটা নামে তো শুধু অক্ষর বদলায় না, মানুষের চরিত্রও বদলে যায়! তাই একটু ভয় হচ্ছে... সাম্য কতটা বদলে যাবে! আজ বা কাল না হোক... সময়ের সাথে সাথে!


আর তুই বদলাবি না?


হয়ত বদলাবো! আমিও যদি বদলাই আর সাম্য যদি অপরিবর্তিত থাকে, তাহলেও তো সম্পর্কেকে চরিত্রটা আর আগের মত থাকে না। তখন আমিই বা কি করে দেখবো এই বিষয়টাকে?


কোন বিষয়টাকে? বিয়ে?


না না... শুধু বিয়ে না, এই সাম্য... আমি... আমাদের সম্পর্ক... এই সব আর কি!


এত অনিশ্চিয়তা নিয়ে কিভাবে বিয়ের পিঁড়িতে বসছিস তুই?


বসছি এইভেবে যে অতীতে যা ভেবেছিলাম আজকের সময়কে নিয়ে, তা মেলেনি। এখন তো মনে হচ্ছে জীবন সব মিলিয়ে গড়ে মোটামুটি ভালোর দিকেই আছে, তাই আজ যা ভাবছি… ভেবে ভয় পাচ্ছি… কাল তো তা না হয়ে অনেক ভালো কিছুও হতে পারে...


প্রোবাবিলিটি তো বলে খারাপও হতে পারে!


হ্যাঁ... কিন্তু খারাপের কথা ভেবে কি পথ চলা যায়! আর ভুলে যাস না, প্রোবাবিলিটিতে ডাইস থ্রো করা হয় একবার... আর এখানে প্রতি মুহূর্তে আমরা কিছু না কিছু করছি... করব... যার এফেক্ট ভবিষ্যতের ফলে পড়বে। ফলে এটা শুধু বিয়ে করে ভালো থাকব না খারাপ এই সহজ গণিতে থেমে নেই। আর আমি অংকে লবডঙ্কা, তাই এই জটিল গণিতের সমাধান আমার কাছে নেই। তাই আমি এখন মনের কাছে হার মেনেছি। অন্তত এখন যেটা আমি মন থেকে চাই... সেটাই করছি!



কথাকলি আর কিছু বলে না। চায়ের কাপে চুমুক দেয়। ভাবে, হয়ত তমালী ঠিকই বলছে। জীবনের জটিল গণিতে কিছুই ধ্রুপদ নয়, সবই চল। তাই জটিল গণিতের সূত্র দিয়ে, জীবনের জটিলতর সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।


তুই কবে বিয়ে করছিস বল! তমালী পরিবেশ হালকা করার জন্য প্রসঙ্গ বদলায়। তবে, এই কথাগুলো বলে তমালী নিজেরও অনেক প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেলো, যে প্রশ্নগুলো প্রেতাত্মার মত ঘুরে বেড়াচ্ছিল তারও মনের অন্দরে। অনেক প্রশ্ন, অনেক দ্বিধা, কিন্তু কিছুতেই যেন সেসব মূর্ত হতে চায় না, প্রকাশিত হতে চায় না। আর মনও সেসব প্রেতাত্মার কথা ভাবতে যেন ভয় পায়, শুনতে ভয় পায়। ভাবে, ওসব প্রাণীদের পাত্তা দিলে তারা তেড়ে আসবে, জাপটে ধরবে, পারলে শুষে নেবে সমস্ত আনন্দরস। মৌহুর্তিক সমস্ত সুখাস্বাদন থেকে প্রতি মুহূর্তে তারা বঞ্চিত করতে চাইবে মনের মালিককে। অন্তত কথাকলিকে বলার অছিলায়, নিজের বিয়ের সিদ্ধান্তকে ওর কাছে জাস্টিফাই করতে গিয়ে, নিজের কাছেও যেন সে জবাবদিহি দিয়ে নিল। নয়ত যতই সে এসব প্রশ্নকে এড়িয়ে যাক না কেন, আগতপ্রায় অজানা ভবিষ্যতের ভয়, আশেপাশে অনেক নতুন অচেনা মুখ জমা হওয়ার ভয় যেন মনটাকে কেমন করে রেখেছিল তার। তমালী আগে যে ভাবেনি তা নয় যে সাম্যকে সে সাত-আট বছর চেনে, ওর বাড়ির লোককেও মোটামুটি চেনে, তাও বিয়ে করতে কেন কোনো আনন্দ হচ্ছে না তার? উত্তেজনা আছে, কিন্তু আনন্দ থাকার কথা – তা কৈ? কথাকলির সাথে কথা বলে, সম্পূর্ণটা না সরলেও, কি যেন একটা নেমে গেলো বুক থেকে। ভারী কিছু!


কথাকলি হাসে। কিছু বলে না। তমালী ঠ্যালা মেরে বলে, কেউ হয়েছে ওখানে!


নাহ... হয়নি! এমনি একজনের সাথে কথাবার্তা হয়...


কথাবার্তা হয় মানে কি!


কথাবার্তা মানে... ল্যাব থেকে বেরিয়ে মাঝেমধ্যে পাবে যাওয়া, একটা কথা বলার সঙ্গী....


কি বিদেশি? না এনারাই!


বিদেশি!


চুপে চুপে খুব তো... তা পাকা কথা বলে ফেল!


তুই আমাকে চিনিস তমাল... আমি কিছুতেই এত তাড়াতাড়ি...


তাড়াতাড়ি কোথায়? তিন সাড়ে তিন বচ... ওয়েট আ মিনিট, ভীষণ বর্ষায় বাজ পড়ার মত গম্ভীর মন্দ্রে তমালী বলল, তুই কি মেজদাদা'র থেকে এখনও মুভ অন করতে পারিসনি!


কথাকলি তমালীর চোখ এড়িয়ে যায়। কথা ঘুরিয়ে বলে, চ নীচে চ... কথাকলির অপ্রস্তুতির কারণ এই নয় যে সে সত্যিই এখনও সায়মের থেকে পুরোপুরি বেরোতে পারেনি। কারণ এটাও নয় যে সায়ম আজ বিবাহিত। তার চার মাসের একটি ফুটফুটে মেয়ে আছে। এই ব্যস্ত বিয়ে বাড়িতে সে কারণে অকারণে অহরহ সায়মের, সায়মের স্ত্রীয়ের মুখোমুখি হচ্ছে। কিন্তু এই কারণে যে সে একদিন যে দৃঢ়তায় সায়মের সাথে পাঁচ বছরের সম্পর্ক শেষ করে নিজের কেরিয়ার গড়তে বিদেশ গেছিল, তার সেই দৃঢ়তা আজ কেমন যেন ক্ষয়িষ্ণু।


না, নীচে যাবো না। দাঁড়া তুই এখানে...


ছাড় না এসব আলোচনা...


না ছাড়ব না। তুই বল... তুই মেজদাদার থেকে নিজে এখনও বেরোতে পারিসনি... কেন ব্রেকাপ করেছিলিস তাহলে!


তমাল প্লিজ... এই বিয়ে বাড়িতে এসব কথা তুলিস না৷ তোকে পরে আমি সব বলব!


তমালী কথাকলির কথার যৌক্তিকতা বোঝে। কিন্তু একবারের জন্যেও তার মনে হয় না বৌভাতের পরদিন সন্ধ্যেতেই কথাকলির ফ্লাইট। তার সাথে আবার এমন সামনাসামনি কথা কবে হবে, তার ঠিক নেই। তাই আদৌ এই প্রসঙ্গ তাদের মধ্যে আর উঠবে কি না, তা হলফ করে বলা যায় না।



সাধনা বোঝেন তো? প্রায় একশো বছর হতে চলল, কম না কিন্তু সময়টা! এই এত বছর ধরে চুপ করে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকাকে কিন্তু কিছু কম তপস্যা ভাববেন না। এ এক ভীষণ তপস্যা। আর তার সিদ্ধি স্বরূপই আমাদের মধ্যে, মানে গাছেদের মধ্যে, এক ধরণের সিদ্ধাই শক্তি আসে। আমার মধ্যেও তেমনই এক রকমের অলৌকিক … থুড়ি, অবৃক্ষীয় শক্তির আবির্ভাব ঘটেছে কিছু বছর হল – আমি এখন চাইলেই লোকের মন পড়তে পারি। বুঝতে পারি, তারা এখন কি ভাবছে, কার সম্বন্ধে ভাবছে। আপনারা ভাবছিলেন বুঝি কথাকলিকে নিয়ে আমি গালগল্প দিচ্ছি। আজ্ঞে না। আমি সত্যিই ওর মন দেখতে পাচ্ছি। একদম কাঁচের মত পরিষ্কারভাবে দেখতে পাচ্ছি, যেন মাঝে কোনো পর্দা নেই। আর শুধু কথাকলি কেন, তমালীর মনও তো পড়ে বললাম আপনাদের, বিয়ের আগে ওর মনে কি চলছে!




কথাকলিকে নিমন্ত্রণ করা নিয়ে এ বাড়িতে ছোটোখাটো একটা বাকবিতণ্ডা হয়েছিল। কিন্তু তমালী সাফ জানিয়ে দিয়েছিল, তার বিয়েতে তার বেস্টফ্রেন্ডকে ইনভাইট করা হবে না, তা কিছুতেই হতে পারে না! তমালীর জায়গায় অন্য কেউ হলে ওর বাবা জ্যাঠারা এক দাবড়ে থামিয়ে দিত। কিন্তু তমালী বাড়ির একমাত্র মেয়ে – খুব আদরের সবার। তাই ওর এই জিদের সামনে তারা আর আপত্তি করেনি।


যদিও সায়মের বৌয়ের সামনে কিছু বলেনি, তাও তমালীর মা কাকিমণি এরা কথা তুলেছিল, আরে ও তোর দাদার প্রাক্তন প্রেমিকা। কেন শুধু শুধু পরিস্থিতি জটিল করছিস?


ও আগে আমার বন্ধু মা! মেজদাদা কেন প্রেম করতে গেছিল ওর সাথে? আর আমাদের জেনারশনে এখন অত কিছু আর ম্যাটার করে না। ছিল একসময় রিলেশনে, এখন নেই, কি করা যাবে আর। ওদের কারোর জীবনই কি থেমে আছে? দাদা তো বিয়েও করে নিল, বাচ্চাও হয়ে গেলো!


তমালীর মা ভেবে কূলকিনারা না করতে পেয়ে বলেছিল, যা খুশি কর! কাকিমণি-বৌদিরা তমালীর গায়ে হাত বুলিয়ে বলেছিল, কিন্তু তাও মেজদাদাকে একবার অন্তত জানাস!


সায়মসকে আলাদা করে জানানোটা তমালীর বাহুল্যতা মনে হয়েছিল, তবুও একবার বলে দিয়েছিল ঘরে ডেকে এনে, দাদা আমি কিন্তু কথাকে ইনভাইট করছি।


সায়ম তাতে খুবই ডোন্ট-কেয়ার-স্বরে বলেছিল, করছিস কর… দেখ আসে নাকি!


কথাগুলো বলার সময় সায়মের ভাব ছিল এমন যেন সে যেভাবে কথাকে চিনেছে আর কেউ চিনবে না। আর যদি ভেবে থাকে চিনেছে, তাহলে তারা ভুল ভেবেছে। এ বিশ্বসংসারের গড়পড়তা বয়ফ্রেন্ড নিজেদের চিরাচারিত পুরুষ-বুদ্ধিতে যতদূর তাদের গার্লফ্রেন্ডকে চেনে, সায়মও তেমনই চিনেছিল কথাকলিকে। আর সেই বোধের সীমানাতেই তার মনে হয়েছিল, ওসব ওভার অ্যাম্বিসাস মেয়েরা সম্পর্কের মানে টানে বোঝে না! একটা বিয়ের জন্য এত টাকা খরচা করে সে সেই সুদূর আমেরিকা থেকে নাকি আসবে? তমালীটা সত্যিই, সরলই থেকে গেলো! এমনিতেও তার আর কথাকলির ব্রেকাপ হয়ে যাওয়ার পরও কেন তমালী ওর সাথে সম্পর্ক রাখত এটা নিয়েই সায়মের বিরক্তির শেষ ছিল না। সায়মের খালি মনে হত, আমি তো ওর নিজের দাদা। কথাকলি তো পরের মেয়ে। তমালীটা একটা ঘর-শত্রু-বিভীষণ!


সায়ম খুব করে চেয়েছিল কথাকলি যেন না আসে। এবং তার কাছে যুক্তিযুক্ত কারণও একটা ছিল যে কথাকলি জানে যে তার বিয়ে হয়ে গেছে। ফলে ও হয়ত এখানে এসে ওর মুখোমুখি হতে চাইবে না। কিন্তু পরক্ষণেই সে এ’ও ভেবেছিল, কথাকলি যেমন মেয়ে, চলে আসতেও পারে। তখন গত্যান্তর না পেয়ে সায়ম নিজেকে এটুকুই বলেছিল – সে যে কারণেই হোক, কথাকলি যেন না আসে। তাহলেই সে তমালীকে বুঝাতে পারবে, দেখ কাকে বন্ধু পাতিয়েছিলিস! সবাই ইমোশনের দাম দেয় না’রে—ইত্যাদি বলে শেষ কথাটা সায়মই বলবে।


কথাকলি যখন তমালীকে কনফার্ম করল যে ও আসবে, তখন সায়মের অহমিকাভার কিছুটা যেন খেই হারাতে বসেছিল। কিন্তু, ছেলেরা কখনও হার মানে নাকি! বিশেষ করে তার প্রাক্তনের কাছে? অতএব তখন থেকেই সায়ম মনে মনে হিসাব কষতে থাকে, কি করে সে কথাকলিকে বোঝাবে যে সে তাকে ছেড়ে গিয়ে কত বড় ভুল করেছে? এমনটা যে ভাবেনি তা নয় যে কথাকলিকে এখন বুঝিয়েও কোনো লাভ নেই -- কারণ সে ঝোঁকের বশে বিয়ে করে নিয়েছে। এবং তারপর সে নিজেকে আটকেও রাখতে পারেনি তার স্ত্রীয়ের সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়া থেকে। ফলস্বরূপ, সে আর পিউ এখন একা না। তাদের মাঝে আছে একটি কন্যাসন্তানের সেতু – দিতি। সে সেতু ভেঙে, আবারও কোনোদিন কথাকলিকে পাওয়া তার আর হবে না। তবু, প্রেমিকের হৃদয় কিসের তাগিদে যে প্রাক্তনের কাছে নিজেকে সবসময় যোগ্যতর প্রমাণের আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকে – তা আমি জানি না। আমার মানুষের হৃদয় নয়, তাই হয়ত।

কথাকলির বিয়েতে আসা নিয়ে এ বাড়ির অনেকের মনেই সংশয় ছিল, তবু তমালীর মুখ চেয়ে কিছু বলেনি তারা। তবে, তারা যে কথাকলির ওপর বিরক্ত তা’ও নয়। প্রাথমিকভাবে বিরক্তি থেকে থাকলেও, আজ তিন বছর পর, যখন সায়ম বিবাহিত, এবং এক সন্তানের পিতা – তখন আর সেই বিরক্তি পুষে রাখার কোনো অর্থ তাদের কাছে নেই। কথাকলি পড়াশোনায় ভালো। স্নাতক, স্নাতকোত্তর দুইয়েই সে ফার্স্টক্লাস ফার্স্ট। এহেন মেয়ে যে তাদের বাড়িতে গৃহবধূ হয়ে সারাজীবন কাটিয়ে দিতে চাইবে না, এ তো অলিখিতভাবে জানাই ছিল সবার। কথাকলির বাবা মা দুজনেই স্কুলশিক্ষক। সে তাদের একমাত্র সন্তান। বৃদ্ধ বয়েসে তাদের পাশে সে থাকতে চাইবে – এতো অস্বাভাবিক নয়। বরং, এই অতিস্বাভাবিকতার দ্যোতনা নারীহৃদয়ে, বিশেষত সায়মের মায়ের হৃদয়ে, এতই গভীরভাবে রেখাপাত করছিল যে তাকে বহন করা যেন তারপক্ষে দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছিল অনেকটা সময়ের জন্য। সায়মের মা যখন পরে চুপিচুপি কথাকলিকে বাড়িতে ডেকেছিলেন ওকে বুঝাতে, তখন কথাকলি তাকে বলেছিল, কাকিমা আমার নিজের জীবনেরও কিছু স্বপ্ন আছে… আমি আরো পড়াশোনা করতে চাই, চাকরি করতে চাই। আমার বাবা মায়ের তো আমিই একমাত্র সন্তান, তাদের পাশে তাদের শেষ বয়েসে দাঁড়াতে চাই… এবং তার জন্য আমি তোমার ছেলের কাছে হাত পাততে নারাজ, বলোতো আমার এ চাওয়ায় কি অন্যায় আছে? সায়মের মায়ের মনে পড়ে গেছিল তার মায়ের কথা। তাকে এই শর্তে বিয়ে দিয়ে এই বাড়িতে নিয়ে আসা হয়েছিল যে বিয়ের পর বাপের বাড়ির সাথে তার আর কোনো সম্পর্ক থাকবে না। সায়মের মা যখন কথাকলির কথাগুলো শুনছিল, সে যেন নিজের সামনে সেই মেয়েটিকে দেখছিল যা সে কোনোদিনও হতে পারেনি। শুধু এ সংসারে থাকাকালীন সকল দুঃখ, সকল অপমানের মুহূর্তে খালি ভেবেছে আজ যদি সে দুটো টাকা রোজকার করতে পারত – থোড়াই কেয়ার করত এই ভটচায্‌ বাড়িকে, সায়মের বাবাকে! কবেই ছেড়েছুড়ে দিয়ে মায়ের কাছে, দাদার কাছে চলে যেত। তারা ফিরিয়ে নিতে না চাইলে, নিজে থাকত নিজের মত, তবু এ অপমানের অন্ন তো মুখে তুলতে হত না। কথাকলির নিজের জীবন, সিদ্ধান্ত, স্বপ্নপূরণে নিজের অধিকারের এহেন দৃঢ় দাবীতে সেদিন অভিভূত হয়ে গেছিল সায়মের মা। কথাকলিকে আশীর্বাদ করে বলেছিল – আমি তোকে আটকাবো না, তোর সব আশা পূর্ণ হোক!

কথাকলির বিদেশে পিএইচডি করতে যেতে চাওয়ার প্রশ্নে সায়মের প্রধান অসুবিধা ছিল, সে একা একা অতদূর থাকবে কি করে! আসলে কেউ না জানলেও আমি তো জানি, সায়মের মনে চলছিল, ওখানে গিয়ে যদি কথাকলির অন্য কাউকে মনে ধরে যায়? আর মনে না ধরলেও সে যদি অন্য পুরুষের সাথে শারীরিকভাবে ঘনিষ্ঠ হয়? ওখানে ওসব তো খুব চলে! সে যে কথাকলির যোগ্য নয়, এ ধরণের এক চিন্তা তার মনে তাদের সম্পর্কের প্রথম থেকেই ছিল। কিন্তু এও আমি বলতে পারি না যে সায়ম খুব হিসাব কষে কথাকে ভালোবেসেছিল। তবে বন্ধুমহলে সুন্দরী, কৃতী প্রেমিকা থাকার গর্বও যে তার ছিল না তা নয়। তাতেই আরো তার মনে হত, কথা যদি অন্য কাউকে পেয়ে তাকে ছেড়ে দেয়, তাহলে সে বন্ধুদের সামনে মুখ দেখাবে কি করে? যে কথা সে তার বন্ধুদের পিছনে লাগার জন্য বলে – কি রে দিল তো ল্যাং মেরে? – সে কথা তার দিকেই ফিরে আসবে, এ যেন সে ভাবতেই পারত না। তার বিদেশ যাওয়ার আগে তাদের রেজিস্ট্রির কথাও উঠেছিল। কথাকলি রাজি হয়নি। আদতে সে রাজি হত। কাউকে না বললেও, কথাকলির মাথাতেই এ চিন্তাটা প্রথম এসেছিল। কিন্তু সেই সময়ের এক তর্কাতর্কির মুহূর্তে সায়মের একটি কথা শুনে কথাকলির একটু খটকা লেগেছিল। কথাগুলো আমার তলায় দাঁড়িয়ে হয়েছিল বলে, সেদিনের সেই কথোপকথনের সাক্ষী ওদের দুজন বাদে আমিও।

প্লিজ সায়ম, হাজার হাজার মেয়ে একা বিদেশে পড়াশোনা করতে যায়!

… জানা আছে কত পড়াশোনা করতে যায়!

কেন কি করতে যায় তাহলে?

সায়ম এ কথার কোনো জবাব দেয় না। শুধু বলে, যাও বাড়ি যাও… এখানে এখন ঝামেলা কোরো না। এখনি বাবা বা কাকান নেমে আসবে!

না না … তুমি বলো, তোমার কি মনে হয়, যেসব মেয়েরা একা বাইরে পড়তে যায়, তারা আদতে কি করতে যায়!

তুমি কি করতে যাচ্ছ?

পিএইচডি করতে। তারপর পোস্ট ডক্‌। তারপর যদি জব পেয়ে যাই তাহলে তাও করব…

তাহলে দেখো… সায়ম কথা ঘুরিয়ে বলে, তোমার আসল মতলব হচ্ছে আমাকে যেনতেনপ্রকারে ছেড়ে যাওয়া! আর ভালোই তো… বাইরে যাবে, আমার থেকে কত ভালো ছেলে পাবে… আমার থেকে সব পাওয়া হয়ে গেছে, আর কি এখন ভালো লাগবে!

প্লিজ সায়ম… বাড়াবাড়ি কোরো না! এভরিথিং ইজ নট্‌ অ্যাবাউট ইউ! আমার নিজের কিছু স্বপ্ন আছে, নিজের জীবন নিয়ে কিছু আশা আকাঙ্ক্ষা আছে। সেখানে তুমি অনেক পরে এসেছ। আমার পড়াশোনা… আমার কেরিয়ার… এগুলো অনেক আগে থেকে আমার জীবনে এক্সিস্ট করে!

বালবিচি বোকো না… পাতি আমাকে আর পোষাচ্ছে না সেটা বলো!

সায়ম, তুমি ভুলে যেও না আমি তোমার গার্লফ্রেন্ড… তোমার ভাষা সংযত করো!

এই তুমি আমাকে ভাষা শেখাতে এসো না!

তুমি যদি গার্লফ্রেন্ডকে সম্মান দিয়ে কথা বলতে না জেনে থাকো, তাহলে তা তোমাকে শিখতে হবে। তুমি এখনই এমনভাবে কথা বলছ, বিয়ের পর কিভাবে কথা বলবে, এ ভেবেই তো আমার … বলে থেমে যায় কথা!

বললাম না, তোমার এখন আমার সব খারাপ লাগবে!

সায়ম, তুমি যে আমার একা বিদেশ যাওয়ার সাথে তোমার প্রতি আমার লয়ালটিকে জুড়ে দিচ্ছ, তা বোঝার মত বড় কিন্তু আমি হয়েছি। কিন্তু একটা কথা শুনে রেখে দাও… আমি তোমাকে আমার লয়্যালটির পরীক্ষা দেবো না। এই পাঁচ বছরেও তোমার আমার প্রতি এই বিশ্বাস যদি না এসে থাকে… তাহলে তা তোমার ব্যর্থতা, আমার না!

আসলে কি জানেন, এই পুরো ব্যাপারটায় আমার যা বিশ্লেষণ, যে সায়ম ভেবেছিল কথাকলি আর পাঁচটা মেয়ের মত। ইমোশানাল ব্ল্যাকমেলে ভেসে যাওয়ার মত মেয়ে যে কথাকলি নয় সায়ম আসলে বুঝতে পারে নি। বুঝতে না পারাটা দোষের কিছু না। বোঝার মত অবকাশ কখনও তৈরীও হয়নি। ও ভেবেছিল, কথাকলি পিএইচডির কথা বলে, বিদেশ যাওয়ার কথা বলে…ভাবে… যেমন অনেক ভালো ছাত্রছাত্রীরাই ভাবে। তাই বলে যে সত্যি সত্যিই সায়মকে না জানিয়ে সে বিদেশে অ্যাপ্লাই করে ফেলবে, এবং চান্সও পেয়ে যাবে, সায়মের তা ভাবনার মধ্যে ছিল না। আর সত্যি বলতে, কথাকলিকে বাইরে থেকে দেখলে ওর ভেতরের আগুনটা বোঝা যায়না। সায়মও বোঝেনি। বা বুঝলেও, অদেখা করেছে। কারণ সেই আগুন একবার দেখে ফেললে, সায়ম তার এই কন্ট্রোলিং মানসিকতা নিয়ে ওর সামন দাঁড়াতে পারত না। যেমন সেদিনও পারেনি।

সেদিন শেষ কথা হয়েছিল এই – কথাকলি বলেছিল, দেখো এই ঝামেলা প্রতিদিন আমার পোষাবে না। বেটার আমরা আলাদা হয়ে যাই… আপাতত!

আপাতত মানে কি? আমি তোমার জন্য সারাজীবন অপেক্ষা করব নাকি!

না করতে পারলে তোমার বিবেচনায় যা সঠিক মনে হয় কোরো। আমি তোমাকে কোনো শর্তেই বাঁধছি না…

তাহলে আজ থেকে আমরা আর কিছু না!

কিছু না কেন! এই যে আমরা একে অপরের সাথে পাঁচটা বছর কাটালাম… এতে তো কোনো মিথ্যা নেই!

সায়ম বিরক্তিতে হেসে ফেলেছিল। হয়ত চোখে জলও এসেছিল ওর। তা কথাকলিরও চোখ এড়ায়নি। কথাকলি ওকে বলেছিল, সায়ম… আমরা একে অপরের সাথে এতদিন ছিলাম… সবকিছুর ওপরে তা আমাদের শান্তি দিত। আমার মনে হয়না, তোমার মনে আর সেই শান্তি আছে বলে। আর সেই অশান্তির ছাপ আমার মনেও পড়ছে। আমি এ অশান্তি নিয়ে এগোতে চাই না। তাই শুধু শান্তিটুকু নিয়ে… শান্তির স্মৃতিটুকু নিয়েই এগোতে চাই…

তাহলে আমাকে তুমি আমাকে ছেড়ে দিলে…?

সেটা দুজনের সিদ্ধান্তে হলে ভালো হয়। তবু যদি আমাকে এ দোষের সম্পূর্ণ ভাগিদার করতে চাও… তাহলে তাই সই! আমার তাতে কোনো সমস্যা নেই। আমি আমার স্বপ্নের সাথে কম্প্রোমাইজ করতে পারব না। তোমাকেও আমি ছাড়তাম না। কিন্তু তুমি যখন একপ্রকার আমাকে একটা বেছে নিতে বলছ… আমি আমার কেরিয়ারকেই বাছবো!

এটা তোমার ফাইনাল সিদ্ধান্ত?

হ্যাঁ…

কথাকলির মত শক্ত মেয়ে আমি খুব কম দেখেছি। এই কথাগুলো যখন ও বলছিল ওর মুখ চোখে কোনো তাপ-উত্তাপের ছাপ ছিল না। আমি ওর কথাগুলো শুনতে শুনতে ভাবছিলাম, কি নিষ্ঠুর মেয়েরে বাবা! মেয়ে মানুষের পরাণ এত পাষাণ হয়? কিন্তু এই ধারণা বদলে গেলো একটু পরেই।

কথাকলি কথা শেষে সায়মকে জড়িয়ে ধরতে গেছিল, সায়ম তা ছাড়িয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকে আসে। তখন পৌনে এগারোটা বাজে। রাত হলে এদিকে অটো টোটো সেরকম কিছু পাওয়া যায় না বলে আগে সবসময়ই সায়ম কথাকলিকে বাইকে ছেড়ে দিয়ে আসত। আজ সেসবের ভ্রুক্ষেপ না করে যখন সায়ম বাড়ির ভেতর ঢুকে গেলো কথাকলিও ধীরে ধীরে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে রাস্তায় গিয়ে দাঁড়ায় অটো ধরবে বলে। সেই হলুদ আলোতে ঘামে চকচক করছিল কথাকলির খোলা পিঠ, আর স্লিভলেস-কুর্তি শোভিত হাত দুটি। আমি ওর মুখ দেখতে পাইনি। তবু সেদিন ওর শরীরে মানুষের পেশি সংস্থানের এক আমানুষিক প্রদর্শনী দেখেছিলাম। ওর শুক্ল ত্বকে বয়ে যাওয়া পেশি আন্দোলনের স্রোত যেন সেদিন তার মনে চলতে থাকা ভীষণ ঝড়ের এক নির্বাক প্রকাশ। মেয়েটার ক্ষণে ক্ষণে ঝুঁকে পড়তে চাওয়া কাঁধ, আর মনের জোরে দাঁড় করিয়ে রাখতে চাওয়া শিরদাঁড়া, আমায় সেদিন বুঝিয়ে দিয়েছিল, মেয়েদের মধ্যে ছোটো থেকে স্বপ্ন ভরে দিলে, আত্মসম্মানের বোধ ও তাকে বাঁচিয়ে রাখতে চাওয়ার জিদ ঢুকিয়ে দিলে তারা বাহ্যিকভাবে কতটা সবল হয়ে উঠতে পারে! সেই আত্মসম্মান তার কাছে একাকী ক্রন্দনকেও অভিপ্রেত করে তুলতে পারে। তার এতদিনের ভালোবাসাকেও ছেড়ে দিতে শক্তি জুগাতে পারে এই বিশ্বাসে যে অল্পে সন্তুষ্ট থাকার মধ্যে আলাদা করে কোনো মহত্ব নেই, বরং অল্পে সন্তুষ্ট থাকার মধ্যেই একপ্রকার হীনতার কাছে বশ্যতাস্বীকারের দ্যোতনা থেকে যায়।



কথাকলি ছাদে পায়চারি করছিল। যদিও মতলব ছিল সবাই শুয়ে পড়লে, বাড়িটা একটু নিঃস্তব্ধ হয়ে এলে, একটা সিগারেট ধরাবে। সারাদিন ধরে এত মানুষ, এত কথাবার্তা, মাথাটা জাস্ট ঝাঁঝাঁ করছে। আর আজ সারাদিনে একটাও খাওয়া হয়নি। মনটা যেন আনচান আনচান করছিল। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে সে একটা সিগারেট ধরিয়েই নিল। সে তমালীকে বলেই এসেছে। তমালীও জানে কথাকলির অনেক মানুষজনে একটু অসুবিধা হয়, তাই সে কোনোভাবেই এখন এসে ওকে বিরক্ত করবে না। কথাকলির বাড়ি এখান থেকে বেশিদূর না। একটা অটো। কথাকলি বলেছিল, আমি বাড়ি থেকেই যাতায়াত করব। তমালী বলেছিল, একদম না। আমার বিয়ে। আমার বিয়ের জন্য আসছিস। অতএব, এয়ারপোর্ট থেকে একদম আমার বাড়িতে ঢুকবি, আর আমার শ্বশুরবাড়ি থেকে এয়ারপোর্ট যাবি। তমালীর বৌভাতের পরেরদিন কথাকলির ফ্লাইট, সন্ধ্যেবেলা। কথাকলি তার বাবাকে বলে রেখেছে, বৌভাতের পরেরদিন সকালে এসে সাম্যদের বাড়ি থেকে তাকে নিয়ে যেতে। একবেলা বাড়িতে থেকে বিকেলে এয়ারপোর্ট চলে যাবে সে। সাম্যদের বাড়িও বেশি দূরে না। বাইকে করে এখান থেকে পনেরো-কুড়ি মিনিট মত।

হঠাত ছাদের দরজা ঠেলার আওয়াযে সে একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছিল, ঘুরে তাকিয়ে দেখলো, পিউ। পিউও ওকে সিগারেট খেতে দেখে একটু বিস্মিত হয়েছে। এমন না যে সে আগে কখনও কোনো মেয়েকে সিগারেট খেতে দেখেনি, তবু, তার যেন মেয়েদের সিগারেট খেতে দেখলে মনে হয়, তারা আর মেয়ে নেই। অন্তত তার স্তরের মেয়ে না। তারা অনেক বেশি স্মার্ট, কেতাদুরস্ত, উপরের কেউ। মুহূর্তেই সে ভেবে নেয়, কথাকলি তো সত্যিই স্মার্ট, কেতাদুরস্ত। কার সাথে আজ সকালে ইংরেজিতে কথা বলছিল ওর ট্যাবে। শুনে মনেই হয়না বাংলাও বলতে পারবে, কিন্তু কি সুন্দর গুছিয়ে কথা বলে সবার সাথে। তারপর কাল? তমালী ওকে কত করে বলল মেহেন্দি পরার জন্য। কি সুন্দর বুঝিয়ে সুঝিয়ে এড়িয়ে গেলো কথাকলি। সে হলে তো এত আবেদনের জবাবে না বলতেই পারত না। কথাকলি পেরেছে। কথাকলিরা সব পারে। আর শুধু তাই কেন? আজ সকালেই পিউ তমালীর কাছে দিতিকে দিয়ে গেছিল পাঁচ মিনিটের জন্য। রান্নাঘরের ভাঁড়ারে কিছু কাজ ছিল। এসে দেখে কথাকলি কি সুন্দর দিতিকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে কাঁধে শুইয়ে। পিউ যে জানেনা কথাকলির সাথে সায়মের সম্পর্কের কথা, তা কিন্তু না। তাকে কেউ বলেনি, ঠিকই। তবু সে যে কিছুই বোঝে না, এমনটাও তো নয়। আর কিছু না বুঝুক, নিজের স্বামীর চোখ তো এই দুই বছরে একটু হলেও পড়তে শিখেছে সে।

পিউকে দেখে হেসে ফেলে কথাকলি। কিছুটা নিজেকে ডিফেন্ড করেই বলল, ও তুমি। আমি ভাবছিলাম বড়দের কেউ হবে!

পিউও লজ্জার হাসি হেসে বলল, সবাই শুয়ে পড়েছে প্রায়। সারাদিনের ব্যস্ততায় আর দেখা হয়নি ছাদের জামাকাপড়গুলো কেউ তুলেছে কিনা, তাই দেখতে এলাম! পিউ বলল বলে কথাকলিরও চোখে পড়ল, ছাদের ওদিকে বেশ কয়েকটা শাড়ি মেলা।

ও, দিতি ঘুমিয়ে পড়েছে?

হ্যাঁ… এই ওর বাবার কাছে দিয়ে এলাম। বলতে বলতে পিউ শাড়ি ও অন্যান্য যা কাপড় মেলা ছিল সেগুলো তুলে নিয়ে হাতে পাকিয়ে নেয়।

কথার কি বলা উচিত সে বুঝতে পারেনা। পিউ তার পাশে এসে দাঁড়ায়। উভয়েরই দৃষ্টি দূরের আকাশে। পিউ অনেকক্ষণ ধরেই ভাবছে জিজ্ঞাসা করবে। কিন্তু লজ্জা পাচ্ছিল। শেষে জিজ্ঞাসা করেই ফেললো, ভাল্লাগে খেতে?

কথাকলি হাসে। ধোঁয়া উড়িয়ে বলে, হ্যাঁ, ভালো তো লাগেই… তুমি কখনও খেয়েছো?

না বাবা… মেয়েরা আবার এসব খায় নাকি!

কথাকলি এবারও হাসে। পিউ নিজের ভুল বুঝতে পেরে বলে, না না দিদি, আমি ওভাবে বলতে চাইনি। আমাদের আসলে ছোটো থেকে…

না না পিউ… আমি বুঝেছি। তোমাকে কিছু বলতে হবে না। কথা খুঁজে না পেয়ে কথাকলি এমনিই জিজ্ঞাসা করে, তোমার খাওয়া হয়ে গেছে?

হ্যাঁ, এই খেয়ে দেয়ে, খাওয়ার-দাওয়ার ফ্রিজে ঢুকিয়ে এলাম! মেয়েটা ঘ্যানঘ্যান করছিল। অন্যদিন ওর বাবাই ঘুম পাড়িয়ে দেয়। আজ ওদিকে ব্যস্ত ছিল। তাই আমাকেই আজ ঘুম পাড়াতে হল…

বেশ। এটুকুর বেশি কি বলতে হবে কথাকলি ভেবে পায়না। তারপর পিউ নিজে থেকেই বিদেশের কথা জিজ্ঞেস করল। ওখানকার লোকজন কেমন। ওখানে কথাকলি কি খায়? বন্ধুবান্ধব হয়েছে কিনা? ওখানে বাংলা বলার জন্য মন হাঁকুপাঁকু করে না? সবসময় ইংরেজি বলতে ভালো লাগে? এসবের উত্তর দিতে দিতে কথাকলি আরেকটা সিগারেট ধরালো।

পিউ অবাক হয়ে দেখে কথাকলির সিগারেট ধরানোর কায়দা অনেকটা সায়মের মত। পিউ হঠাত বলে, দিদি একটা কথা জিজ্ঞেস করব?

এই তুমি আমাকে দিদি বোলো না… আমাদের একই বয়েস! আর এক বয়েস না হলেও… বিয়ে হয়ে গেলে লোকজন সিনিয়র হয়ে যায়। এই যেমন দেখো… তমালের বিয়ে হয়ে গেলে, আমার মনে হবে, ও আমার সিনিয়র… বলে হাসে কথাকলি!

পিউ এই কথায় হাসির কিছুই খুঁজে পায়না। তবু ওর চোখে কথাকলির জন্য যে চটক, তাতেই কথাকলির সাথে তাল মিলিয়ে সে’ও হাসে অল্প। কিন্তু কিছু বলেও না। থেমে থাকে। কথাকলি বলে, বলো কি জিজ্ঞাসা করবে বলছিলে!

বলছি… রাগ করবে না তো?

না না… রাগ করব কেন?

পিউ কিন্তু কিন্তু করে জিজ্ঞাসা করেই ফেলে, তুমি ওকে বিয়ে করলে না কেন গো!

এ প্রশ্ন কথাকলি আশা করেনি। তাতে তার মুখের হাসি কিছুটা মিলিয়েই গেলো। তমালী বলেছিল যে পিউ জানেনা। কিন্তু এ প্রশ্নের এখন কি উত্তর দেবে ও? তাও আবার পিউকে! কথা সিগারেটে টান দিয়ে বলে, তোমাকে কেউ কিছু বলেছে? সায়ম কিছু বলেছে?

না… কেউ কিছু বলেনি। বলো না, কেন তুমি ওকে বিয়ে করলে না?

কথাকলি দীর্ঘশ্বাস ফেলে। জিজ্ঞাসা করে, নিজের স্বামীর নামে খারাপ কথা শুনতে পারবে তো?

দিদি ও তো তোমারও প্রেমিক ছিল… প্রাক্তন হলেও, একদিন তো ভালোবাসতে…

কথাকলির কাছে এ কথার কোনো উত্তর নেই। সে এই সরল মেয়েটির এই কোমলভাবে বলে ফেলা কথার অভিঘাত বুকে শুষে নিতে একটু সময় নেয়। পিউ রাতের অন্ধকারেও কথাকলির চোখ যে নিমেষে একটু বেশি চকচকে হয়ে উঠেছে বুঝতে পারে। সে কথার গায়ে হাত দিয়ে বলে, দিদি তোমায় আমি কষ্ট দিতে চাইনি।

না না… তুমি আমায় কষ্ট দাওনি, কথাকলিও পিউর হাত চেপে ধরে। তারপর ধীরে ধীরে বলে, তোমাদের বিয়ে হয়ে গেছে, এসব আগের কথা ভেবে তুমি আর মনখারাপ কোরো না। সবারই তো অতীত থাকে। সায়ম আর আমারও একটা অতীত ছিল। কিন্তু ওর বর্তমান… ওর ভবিষ্যৎ… তুমি… আর দিতি।

পিউর চোখেও জল আসে। জল আসে কথাকলির ছোঁয়ায়। কথাকলির ছোঁয়াতে পিউ বুঝতে পারে সে ভেতরে ভেতরে কাঁপছে। কথাকলি নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, সায়ম এমনিতে খুবই ভালো ছেলে পিউ। আমি কিছুটা নিজের স্বার্থেই ওকে ছেড়েছিলাম বলতে পারো… আরো পড়াশোনা করব… বিদেশ যাবো… পড়াবো বা বড় চাকরি করব… সংসার করার কথা ভাবিনি, তা না। ভেবেছিলাম, নিজের সময়ে… নিজের শর্তে। আর সম্পর্কে থাকলে সবসময় নিজের শর্ত তো চলে না… অতএব…

পিউ কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, হঠাত ছাদের দরজা খুলে সায়ম উঠে এল। খালি গা। পরনে পাজামা। ইদানিংকালে ব্যয়াম করে শরীর তার এখন সুঠাম। সুপুষ্ট বুকে সোনার চেনটি এক কুহক তৈরি করেছে। যে কোনো নারীই সেই কুহকে মন্ত্রমুগ্ধ হতে বাধ্য।

সায়ম দুজনকে একসাথে দেখে বলে, অনেকক্ষণ এসেছ ছাদে, তাই ভাবলাম, কি হল!

কথা হাতের সিগারেটটা ফেলে, পিউকে বলল, আসি, কাল আবার অনেক সকালে উঠতে হবে। বলে মাথা নীচু করে নেমে যায় নীচে। নেমে যাওয়ার পথে তাকে পাড় করতে হয় মানুষের ভেজা গায়ের গন্ধ। যে মানুষটা, তার ভেজা গা – সবটুকু তার ছিল একদিন।

পিউর নিজেকে এই অবস্থায় ব্রাত্য লাগার কথা। যে ব্রাত্যতা সে অনুভব করেছে কথাকলি আসার পর থেকেই। সায়মের চোখে। তার অন্যমনস্কতায়। তার দিতিকে কোলে দোলাতে দোলাতে হঠাত উদাস হয়ে যাওয়ায়। তবু, সায়মের ছাদে তাকে ডাকতে আসা, দেখতে আসা, তার খোঁজ নিতে আসা তার সামনে খুলে দেয় যেন এক সমুদ্রের পাড়। যেখানে এলোমেলো হাওয়া। উত্তাল ঢেউ। সমুদ্রের পাশবিক গর্জন। তবু সব মিলে যেন এক অপূর্ব প্রশান্তি। এক অতিন্দ্রিয় কিছু খুঁজে পাওয়ার সম্ভবনা।

কথাকলি সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসতে আসতে ভাবে এই তো সায়ম বেশ বৌ সোহাগী হয়েছে। একটু দেরী হচ্ছে দেখে নিজেই খোঁজ নিতে চলে এসেছে ছাদে। তার বুকে কি যেন একটা চাপ দিতে থাকে। যেন হৃদপিণ্ডটা বেরিয়েই যাবে ছালচামড়া ছিঁড়ে। কিন্তু তা বেরোয় না। শুধু চাপটা বাড়ে। আর মাথাটা কেমন করে দেয়। কি যেন চাপিয়ে দেয় গলার কাছটায়। এভাবেই তো অতীতকে ফেলে এগিয়ে যাওয়ার কথা তারও। সে তো কৈ পারেনি! কথাকলির হঠাত চার্লির কথা মনে পড়ে। আজ সকালে চার্লির সাথেই কথা বলছিল কথাকলি, যখন পিউ তাকে ইংরেজি বলতে শুনেছিল। যদিও সে খুবই কেজো কথা। চার্লি ভালো ছেলে। কেয়ারিং। আন্ডারস্ট্যান্ডিং। সেন্সিটিভ। পেলব। সে যে কথাকলিকে বন্ধুর থেকেও অতিরিক্ত কিছু ভাবে, তা সে কথাকলিকে জানিয়েওছে। অন্তত কথাকলির মন পড়ে তো তেমনটাই আমার মনে হচ্ছে। তবু চার্লির বিষয়ে ভাবতে গিয়েও বারংবার এসে পড়ছে সায়মের মুখটা। আর এক্ষুণি দেখে আসা সায়মের খোলা বুকটা। ওর দাড়ি, রিমলেস চশমা শোভিত মুখটা। ইসসস… আমি যদি কথা বলতে পারতাম মানুষদের সাথে। আমি চিৎকার করে বলতাম কথাকলিকে, মা’রে আর পিছনে ফিরে দেখিস না… এগিয়ে পড়েছিস। আরো এগিয়ে যা। যে শৃঙ্খল ভেঙে একবার উড়ে গেছিস, সেই শৃঙ্খলকে আর লোভ্যবস্তু ভাবিস না। শৃঙ্খল কখনও মহৎ নয়… তা কখনও মহৎ হতে পারে না।

কথাকলি তো জানে না, শুধুমাত্র তাকে জেলাস ফিল করাবে বলেই, কি-হারিয়েছ-দেখো—শুধু এই দ্বন্দ্বে দীর্ণ করবে বলেই সায়ম জিমে যাওয়া শুরু করেছিল। বাড়িতে অবশ্য বলেছিল, একমাত্র বোনের বিয়ে, একটু ফিট দেখাতে হবে না? কথাকলির বিয়েতে আসার কনফার্ম খবর এসে গেছিল ছ’মাস আগেই। তারপরই সায়ম অনেক ভেবে এই পথ বের করেছে। অবশ্য কথাকলির কাছে নিজেকে যোগ্যতর প্রমাণের এ কৌশল বোধয় সায়মকে অতটাও ভেবে বার করতে হয়নি। কিছুদিন আগে – তাও প্রায় ছ’সাত মাস আগে – নিরু, সায়মের এক বন্ধু, সায়মের জন্য অপেক্ষা করছিল। এই তো আমার তলাতেই নিরু বাইকটাকে স্ট্যান্ড করে তার ওপর বসে ফোন ঘাঁটছিল। রিল দেখছিল। নিরু যদিও নিজে প্যাংলা, কিন্তু দেখলাম, বসে বসে একের পর এক বডি বিল্ডিং-র ভিডিও দেখছে। জানি লোকের ফোনে উঁকিঝুঁকি মারা বদভ্যাস। তবু সে নিয়ম তো মানুষের জন্য। গাছেদের জন্য তো না। সেখানেই একটা দুটো ভিডিওর ভাষা প্রায় একইরকম – আমাকে ছেড়ে গেছিল আমার রূপের জন্য, আর আমি এখন – বলে দেখাচ্ছে তারা এখন আগের থেকে অনেক বেশি সুপুরুষ। পেশিবহুল ইত্যাদি। সায়মও নিশ্চই এসব ভিডিও দেখেই অনুপ্রাণিত হয়েছে। না, সায়ম এমনিতে সুপুরুষ। জিম করে আরো আকর্ষণীয় লাগছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবু, এ তো নিজেকে ফিট রাখার জন্য নয়। নিজেকে নিজের আয়নার সামনে দেখে ভালো লাগবে – এ ভাব নিয়েও নয়। এ তো একপ্রকারের প্রতিশোধ স্পৃহা থেকে নিজেকে বদলানোর চেষ্টামাত্র! এতে গঠনাত্মক কিছু থাকতে পারে? আমার যেন মনে হয় কর্তা নিজেই তো এই প্রক্রিয়ায় অনুপস্থিত। শুধু মনে থাকে যার ওপর প্রতিশোধ নিতে হবে তার চিন্তা… আর শরীরকে কিভাবে, কতটা সু-আদল দিলে সেই প্রতিশোধ নেওয়া সম্পূর্ণ হবে তার চিন্তা। এখানে সে নিজে কোথায়? নিজের ভালো লাগা, নিজের তৃপ্তি, নিজের সাথে নিজের বন্ধনটা কোথায়? আর একটু আগে – সায়ম তো নিজের শরীর দেখাতেই গেছিল ছাদে। আর কেউ না জানুক, আমি তো জানি। সায়ককে দিতির কাছে বসিয়ে রেখে ও নীচে গেছিল ওদের ড্রাইভার পলাশকে বলতে যে কালকে সকালে ফুলের বাজারে যেতে হবে, যেন সাড়ে পাঁচটার মধ্যে রেডি হয়ে থাকে। উঠতে গিয়ে দেখলো তমালীর ঘরে ও একা। তাই খোঁজ নেওয়ার ভান করে ওই ঘরে ঢুকল। কি তোর বন্ধু কই? আমি তো দরজা বন্ধ করতে বলে এলাম নীচে? বারণ করব? তমালী ফোনে সাম্যর সাথে কথা বলছিল। ও অতটা গা না করেই বলল, না না, কথা ছাদে গেছে। হাত দিয়ে দেখালো—সিগারেট খেতে। সায়ম বেরিয়ে এল ঘর থেকে। ঘরে এসে দেখলো সায়ক ঘুমন্ত দিতির পাশে শুয়ে ফোন ঘাঁটছে। উফফফ… কি গরম লাগছে বলে সে জামাটা খুলে ফেললো। সায়ম জানতোও না পিউ ছাদে এসেছে। দিতিকে দিয়ে চলে যেতে ভেবেছিল হয়ত কাল কাকভোরে তমালীর দধি মঙ্গল, তারই কিছু কাজ গুছিয়ে রাখতে গেছে। তাই সে সেই সুযোগে ছাদে উঠেছিল—কথার সাথে একটু একা কথা বলবে বলে। যদি একটু কাছাকাছি আসারও সুযোগ ঘটে! কথাকলি তাকে এই সুঠাম দেহে, নগ্ন গাত্রে দেখেও কি ফেরাতে পারবে? কথাকলি যদি সায়মের এতসব কেরামতির কথা জানতো…

আমি কথাকলিকে বলতে চাই, এসব ভেবে মন খারাপ করিস না, মা। তুই সায়মের থেকে অনেক ভালো ছেলে পাবি। ভালোবাসায় সব হয়না। সম্মান … বিশ্বাস… এসব না থাকলে ভালোবাসা ফুরিয়ে যেতে বেশিদিন লাগে না। তখন “ভালোবাসা” শুধু গালভরা কথা হয়ে থেকে যায়। এই বাড়িতে আমি প্রায় একশো বছর আছি। এ বাড়ির সবার বৈবাহিক জীবনের ভিতরের কথা আমি জানি। জানি, সেই সম্পর্কে লিপ্ত দু’দিকের দুটো মানুষের মনের কথাও! আমি কারোর পক্ষ নিয়ে কথা বলতে চাইনা… কিন্তু মেয়েদের পক্ষ না নিলেই নয়। তারা তো আদৌ এই বাড়ির পুরুষ সদস্যদের সাথে সম্মানে, শিক্ষাদীক্ষায়, পারিবারিক প্রতিপত্তিতে এক আসনে বসে নেই। তাদের বোধয় বাছাই করে আনাই হয় এই দেখে যাতে এ বাড়ির বৌ’রা কোনোভাবেই তাদের বরদের ছাপিয়ে যেতে না পারে। তাহলে আমি দুদিকের অসুখের কথা জেনেও, কেন মেয়েদের দিকে ঢলে থাকবো না, বলতে পারেন?

এ বাড়ির ছেলেরাও অসুখী। আমার তাদের জন্যেও খারাপ লাগে। কিন্তু আজ এত বছর পরেও কে তাদের মাথার দিব্যি দিয়েছে তাদের পারিবারিক সংস্কারের এই বোঝা বয়ে নিয়ে যেতে? কে সুদীপকে, সায়মের বড় জেঠুর ছেলে, বারণ করেছিল তার আর নাসিফার সম্পর্কের কথা বাড়িতে বলতে? কিন্তু সে বলতে পারেনি। ভয়ে। জানে যে মুসলিম মেয়ের সাথে তার প্রেমের সম্পর্ক বাড়িতে কেউ মানবে না। সুতীর্থ, সুদীপের ছোটোভাই, কে তাকে আটকেছিল বাড়িতে বলতে যে সে বাড়ির ব্যবসায় যোগ দিতে চায় না, সে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়তে চায়। তার নিজের ভয়, বাবা-কাকার রক্তচক্ষুর ভয় ছাড়া তাকে আটকানোর আর কেউ ছিল না। সায়ন, সায়মের ছোটোভাই, কেন সে বলে উঠতে পারল না কোনোদিন যে সে বিয়ে করতে চায় না? তার যৌনভাবে ঘনিষ্ঠ হওয়া পছন্দ হয়না। বাড়ির লোকেদের ভয়, সংস্কার, ভট্টাচার্য বাড়ির সম্মান – এসবের সাথে ছায়াযুদ্ধ করতে গিয়ে সে একটা মেয়ের জীবন শুধু শুধু নষ্ট করল। কে তাদের শেখালো, মানুষের দাম, একটা রক্ত মাংসের মানুষের মনের দাম এই ইঁট-সুরকির দেওয়াল, আর তার আনাচেকানাচে লুকিয়ে থাকা রক্তলোলুপ ঐতিহ্যের থেকে কম? – তাদের ভয়! সবশেষে সায়ক, সায়মের কাকানের একমাত্র ছেলে, সায়নের সমবয়সী প্রায়, কেন বলতে পারছে না এখনও যে সে ছেলেদের পছন্দ করে! সে কোনোদিনও কোনো মেয়েকে ভালোবাসতে পারবে না নিজের সবটা দিয়ে। তার এখনও বিয়ে হয়নি। কিন্তু তমালীর বিয়েটা হয়ে গেলেই তার বিয়ের ব্যবস্থা শুরু হবে। বারংবার সে আলোচনা এই বিয়ের বিভিন্ন পর্যায়ে উঠেছে। সে যদি সাহস না দেখাতে পারে, তাহলে তার কি হবে আমি জানি না, কিন্তু আরেকটি মেয়ের জীবন নষ্ট হবে—এতে কোনো সংশয় নেই। এ তো শুধু গেলো সায়মদের প্রজন্মের কথা। অন্যদের কথা আর না’ই বা বললাম!

এ বাড়ির দিকে তাকালে আপনারা হয়ত দেখবেন ঝাঁ চকচকে এক বিশাল অট্টালিকা। বনেদী বাড়ি। সামনে গাড়ি বারান্দা। বাগান। আমি দেখি সারা বাড়িময় এক জেলখানা। প্রত্যেক ঘরে উঁকি মারলে দেখতে পাই শিকল দিয়ে বাঁধা অসুখী মানুষজন। তারা কেমন যেন যন্ত্রের মত কথা বলে, হাঁটে, চলে, ঘুমায়, মৈথুনে রত হয়…

আমি কথাকলিকে বলতে চাই, চেঁচিয়ে বলতে চাই, উড়ে যা, উড়ে যা… এই প্রাণহীন বাড়িতে একদম না। সায়মের যে সিক্ত হৃদয়ের স্পর্শ সে পেয়েছে, তা চিরকাল থাকত না। সে বিদেশ না গিয়ে এখানে থেকে গেলেও, তা থাকত না।



বনেদী বাড়ির ঐতিহ্য মেনেই এ বাড়ির বৌ’রা সবাই আটপৌরেভাবে শাড়ি পরেছে। কথাকলি এ বাড়ির সদস্য নয়, ফলে সে’ই একমাত্র নিজের মত সেজেছে। হালকা গহনা। স্লিভলেস কালচে মেরুন রঙের ব্লাউজ। পরণে ঘিয়ে রঙের একটা শাড়ি। চুল খোপা করে বাঁধা। খোপাকে মাঝে রেখে চারিপাশে সাদা গোলাপের সার। ঠোঁটে ব্লাউজের রঙেরই লিপস্টিক। কি যে দারুণ লাগছে ওকে! সায়মের মা পর্যন্ত দেখে নিজের চোখে থেকে কাজল তুলে চুলের গোড়ার দিকে লাগিয়ে দিয়েছে কথাকলির। বাড়িতে আসা ইস্তক কথাকলির মনে হচ্ছিল সায়মের মা যেন তাকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছেন। কাকিমা সত্যি কথাকে খুবই ভালোবাসতেন। এখনও যে বাসেন তার প্রমাণ এই কাজল লাগানোতেই কথাকলি টের পেলো। কথাকলি আবেগে সায়মের মা’কে জড়িয়ে ধরেছিল। একটু আবেগবিহ্বল হয়ে পড়েছিল বটে, কিন্তু মেকাপ নষ্ট হয়ে যাবে বলে নিজেকে সামলে নেয় সে।

কথাকলিকে নিয়ে সারা বিয়ে বাড়ি জুড়ে ছেলেদের মধ্যে যে একটা চাপা গুঞ্জন যে উঠেছে তা বেশ বোঝা যাচ্ছিল। তাকে আজ ভারী সুন্দর লাগছে বলে তো বটেই, কিন্তু সায়মের এক্স, সায়মের বোনের বিয়ে উপলক্ষ্যে তার বাড়িতেই এসে আছে, সায়মের বন্ধুদের চোখে এ এক বড় আধুনিক বিষয়। সায়ম আর কি বলবে এদের সামনে? সে তো কোনোদিন তার ভালো লাগার কথা বলতে পারবে না – সে বলে, শুধু বোনের মুখ চেয়ে রে! অনেক বলা হয়েছিল, শোনেনি। বেচারার বিয়ে… তাই আর আপত্তি করা হয়নি!

আজ ওদের যেন একপ্রকার রিউনিয়ন। কথা আর তমালীর প্রায় সব বন্ধুই কমন্‌। আর তাদের বেশিরভাগই সব ছেলে বন্ধু। দু’একটা যা মেয়ে বন্ধু আছে। তারাও বাড়ির আশেপাশেই থাকে। ফলে সব মিলিয়ে এক দারুণ হৈচৈ চলছে। কথার তমালীর পাশে পাশে থাকার কথা। কিন্তু বিয়েতে তমালীর দুইপাশে ওর দুই বৌদি, সুদীপ আর সুতীর্থর বৌ এমনভাবে গ্যাঁট হয়ে বসে আছে, সেখানে যেতে কথাকলির ইচ্ছা করল না। তমালীও বিরক্ত হচ্ছিল, বার বার সেই বিরক্তি সে চোখের ইশারায় তাকে বোঝাচ্ছিল। কথাকলিই একবার এসে কানে কানে বলে গেলো, ওদের দিকে কনসেন্ট্রেট না করে বিয়েটা এঞ্জয় কর! জীবনে একবারই করবি… কোনো দরকার হলে ফোন করিস বা ডাকিস! আমি রয়েছি এখানেই।

মাঝে বাধ সাধল কথার শরীর। যে ভয়টা পাচ্ছিল, সেটাই হল। সে বুঝতে পাচ্ছিল, কিন্তু এই মুহূর্তেই যে ঝামেলা পাকাবে সেটা সে ভাবেনি। ওর পিরিয়ড শুরু হয়েছে বুঝতে পেরে, ও হাতের ইশারায়, তমালীকে বলল, ওপর থেকে আসছি একটু! তমালী চোখের ইশারা সম্মতি জানালো।

বাড়িতে এখন প্রায় কেউ নেই। অন্তত এই দোতলায় কেউ নেই। সে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে, দরজা খুলতে যাবে, একটা চাপা গুঞ্জন কানে এল। অনেকক্ষণ ধরেই পাচ্ছিল, কিন্তু সেটা যে কথাকাটাকাটির মত কিছু সেটা সে বোঝেনি ঘরের ভেতর থেকে। অনুষ্ঠান বাড়িতে কত রকমের লোক, কত রকমের আলাপ-আলোচনা—এই ভেবে সে পাত্তা দেয়নি এতক্ষণ! তমালীদের ঘরটা অন্ধকার। অনেক ঘরই অন্ধকার এ-তলার। বারান্দাতে আলো জ্বলছে যদিও। সে চোখ বুলিয়ে বুঝতে পারল, সেই গুঞ্জনের উৎস পিউদের ঘর। কি মনে হতে সে ঘর থেকে না বেরিয়ে, দরজাটা অল্প ফাঁক করে দাঁড়িয়ে রইল ওদের কথা শুনবে বলে। ফাঁকা বলেই বোধয় ওদের কথা যেন স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিল কথাকলি।

শোনো আমাকে কন্ট্রোল করতে এসো না… সায়মের গলা।

পিউকে খুবই বিনীতভাবে বলছে শোনা গেল, আমি তোমাকে কিছুই বলিনি। আমি তোমাকে শুধু বলেছি, কালকেও অনেক কাজ আছে। আজ বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে বেশি খেয়োনা!

আমার বোনের বিয়ে, আমি জানি না আমার কি কাজ, তুমি বেশি জানো?

বেশি জানা, কম জানার প্রশ্ন না… আমি জাস্ট বলার কথা বলেছি! সায়মের কথা বলার কায়দার সামনে কিভাবে পিউ নিজেকে শান্ত রাখতে পারছে সে কথা ভেবেই তো কথাকলির অবাক লাগছে। আমারও। ঠাঁসিয়ে একটা দিতে পারছে না?

বলবে কেন তুমি?

কেন, আমি বলতে পারিনা? আমি তো তোমার স্ত্রী!

স্ত্রী? স্ত্রী?... স্ত্রী এসেছে বড়! নিজেকে আয়নায় দেখেছো? তোমার বয়েসী মেয়েরা কি সুন্দর করে সেজেছে, আর তুমি মা কাকিমাদের মত …

কথা দিদি? পিউর এই শান্ত প্রশ্নে কথাকলির যেন মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছা করল। কথাকলি ভাবছিল, হে ভগবান, আমি যদি এই মুহূর্তে ছুট্টে বাড়ি চলে যেতে পারতাম! ইসস… ছি ছি!

আমি কি ওর কথা বলেছি!

কার কথা বলছ তবে? তুমি জানোনা, বিয়েতে বা কোনো শুভ অনুষ্ঠানে, এ বাড়িতে এভাবেই শাড়ি পরার নিয়ম?

সায়ম হাম্বড়িয়া ভাব নিয়ে বলল, বাজে বোকো না! সাজতে জানতে হয়… অবশ্য জানবেই বা কি করে! অজপাড়াগাঁয়ে সেসবের চল ছিল নাকি!

না… ছিল না। এখনও পিউর গলা শান্ত। কিন্তু এবারে তার গলায় যেন বড্ড অভিমান। সে অভিমানী গলা বলে চলে, আমি তো নিজে আসতে চাইনি তোমাদের বাড়িতে। তোমাদের বাড়ির লোক… তুমি… পছন্দ করেছিলে… তাই আমাদের বিয়ে হয়েছে। তখন ভাবোনি কেন তোমার কথা দিদির মত সাজার কায়দা জানবে … এমন মেয়ে পছন্দ?

খুব পিনিক মেরে কথা বলতে শিখেছ না! আজকে এই অনুষ্ঠানের দিনে খেতে চাও? – সায়মের এই কথায় যে পাশবিকতা ছিল তাতে কথাকলির সারা গা যেন নেচে উঠল। তার পায়ের বুড়ো আঙুল পর্যন্ত নিসপিস করতে লাগল!

সে শুনতে পেলো সায়ম ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো এই বলে যে, কান্নাকাটি থামাও। দেবো বলেছি খালি… দি নি!

কথাকলি এখনই বেরোনো সমীচীন মনে করল না। সে অন্ধকার ঘরে দাঁড়িয়ে রইল। তার সারা দেহ কাঁপছে। একবার একবার যেন মনে হচ্ছে, সে’ই পিউ। পরক্ষণেই বুঝতে পারছে সে পিউ নয়… কথাকলি! তবু যেন তার বিশ্বাস হচ্ছে না। সে ভেবে পায় না তার ভেতরে যে কষ্টটা হচ্ছে সেটা কি পিউর জন্য? নাকি নিজের জন্য? ব্রেকাপের তিন বছর পরও তার অতিপ্রিয়, খুব সাধের কিছু একটা, যা মনের কোনায় তখনও রাখা ছিল সযত্নে, সেটা অবশেষে পুরোটা হুরমুড়িয়ে ভেঙে পড়ল – এ কষ্ট কি তার জন্য? পিউর মুখটা সে ভুলতে পারে না। সেই সরল চোখ দুটো তাকে কাল রাত্রে ছাদে জিজ্ঞাসা করেছিল, তুমি ওকে বিয়ে করলে না কেন গো? – কথাকলির কাছে কাল এ প্রশ্নের কোনো উত্তর ছিল না। অন্তত যে উত্তর সে নিজেও বিশ্বাস করে, তেমন কোনো উত্তর। তবু আজ সে প্রশ্নের যে উত্তরের হাতছানি তার মনে ঘুরছে, তা কথাকে এক অন্য অপরাধবোধে ভোগায়। পিউর জায়গায় আজ কথাকলি থাকলে ঘুরিয়ে সায়মকে দুটো কথা বলে দিতে পারত। কিছু না হোক, অন্তত অনেকদিন জানাশোনা, প্রেম করার সুবাদে এই অভদ্র ব্যবহারের জন্য তাকে দুটো চড় কষিয়ে দিতে পারত। কিন্তু পিউ তো তা পারল না। সে তো নিজেকে স্বাধীন করে, পিউকে সারাজীবনের মত পরাধীন করে দিয়ে গেলো!

এই চিন্তা আসতেই কথাকলির মনে এক চিমটে আনন্দ যেন কেউ ঢেলে দিল। ঠিকই তো! ভাগ্যিস তার সাথে সায়মের বিয়ে হয়নি। সে এই বাড়িতে আসা থেকে বারংবার এই দ্বন্দ্বে দীর্ণ হয়েছে যে তিন বছর আগে যে কঠিন সিদ্ধান্ত সে নিয়েছিল, তা কি ভুল ছিল? তার সিদ্ধান্ত কি সত্যিই ভীষণ আত্মকেন্দ্রিক ছিল? তমালী বিয়ের ব্যাপারে যা বলল সেদিন, হয়ত তা’ই সত্যি! সে একবার ভাবতে শুরুও করেছিল, চাকরিবাকরি না করে এ বাড়ির বৌ হলে, সায়মের স্ত্রী হলেই ও কি বেশি ভালো থাকত? অন্তত ভালোবেসে সায়মকে ছেড়ে দেওয়ার যে কষ্ট সে পেয়েছে – সেটা সে পেত না। এই যে দ্বন্দ্ব, ঈর্ষা তার হচ্ছিল সায়ম, পিউ আর দিতির ছোট্ট সুন্দর পরিবারটিকে দেখে – সেইসব অনুভূতির মধ্যে দিয়ে তাকে আজ যেতে হত না। এই বিদেশে পড়তে যাওয়া, চাকরি, কেরিয়ার – এসব যেন এক মুহূর্তের জন্য খুব ছোটো লাগছিল তার। তার বারংবার মনে হচ্ছিল আজ এই সবকিছু, যা কিছু পিউর, সব একদিন তার হওয়ার কথা ছিল। অথচ কি অবাক কান্ড – এখন এই অন্ধকার ঘরে দাঁড়িয়ে, কথাকলি যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে এই ভেবে ভাগ্যিস এই যা কিছু—যা কিছু পিউর – তা তার নয়!

সে দেখলো পিউ ঘর থেকে বেরোচ্ছে। এই সুযোগে কথাও ঘর থেলে বেরোলো। পিউ কথাকে দেখে কিছুটা হকচকিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল, দিদি তুমি এখানে?

কথাকলি তার পিরিয়ডের ব্যাপারে জানাতে, পিউ বলল, পেয়েছ তো প্যাড?

হ্যাঁ হ্যাঁ… আমার কাছে ছিল!

তারা একসাথে সিঁড়ি দিয়ে নামছিল, আর কথাকলি যেন নিজেকে দুটো পরিস্থিতিতে তুলনা করে দেখতে পাচ্ছিল। তাতে তার পিউর জন্য এক নিদারুণ কষ্ট অনুভূত হতে থাকে। তবে সে জানে সবাইকে সে এই নরক থেকে উদ্ধার করতে পারবে না। পিউকে নিজেকেই এর থেকে নিজেকে বের করে আনতে হবে। বিয়ে ভেঙে না হোক – অন্তত সায়মের চোখে চোখ রেখে কথা বলে। দরকার পড়লে, সায়মের একটা রুঢ় বাক্যের বিনিময়ে দশটা রুঢ়বাক্যে তাকে জর্জরিত করে। কিন্তু এ লড়াই তার নয় – এ লড়াই পিউরই। তাকেই এ লড়াই লড়তে হবে। তার নিজের ভাগের লড়াই সে লড়েছে ইতোমধ্যেই, এখনও লড়ছে, আরো লড়াই সামনে বাকি – এই ভাবনায় কথাকলির পাপবোধ খানিক কমে, তবে ক্ষত নির্মূল হয়না। তবু কিসের এক আনন্দ যেন তার মনে সেই দুঃখেও খোলা আকাশের হাতছানি উপস্থিত করে—খাঁচার বাইরে বসে পাশাপাশি খাঁচার ভেতর আর আকাশ দেখার মত।

আমি খুশিতে নাচতে থাকি। হাওয়ায় দোলাতে থাকি আমার শাখা-প্রশাখা, পল্লবরাজি। আহা… কথাকলি সারসত্যটা বুঝেছে। আহা… এ যে কি আনন্দ! কাউকে স্বাধীনতা পেতে দেখার থেকে আনন্দ আর কিছুতে নেই। আমি সারাদিন দঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কেবল আকাশ দেখি। উড়ে যেতে পারি না। তাই যারা উড়ে যায়, তাদের দেখে আমার মন এক অদ্ভুত আনন্দে ভরে যায়। তাদের উড়তে দেখলে মনে হয়, যেন আমিই উড়ছি। আর তারা যখন উড়তে উড়তে হাঁপিয়ে গিয়ে আমার ডালে বসে, তারা তখন ওড়ার গল্প বলে। তাদের চোখ চিকচিক করে। হয়ত আমারও। আজ কথাকলি সিঁড়ি থেকে হেঁটে যাচ্ছে, ঘুরে বেরাচ্ছে, লোকজনের সাথে কথা বলছে, হাসছে – সে নিজে অনুভব করতে পারছে কিনা জানি না, আমি দেখতে পাচ্ছি কথাকলির পিঠের কাছে তার ডানাদুটো যেন খোলা বাতাসের ছোঁয়া মেখে উড়ছে। উড়ে যা… উড়ে যা! অন্তত যারা ওড়ার সাহস দেখাতে পারছিস … তারা সবাই উড়ে যা! ডানা মেলে উড়ে যা। কিন্তু হায়! ক’জনই বা কথাকলির মত স্বাধীন হওয়ার প্রত্যাশী হয়? ক’জন এই সত্যকে মেনে নিয়ে সেই মুক্তির সন্ধানে এগিয়ে যেতে পারে – এ জীবন কঠিন হবে, কারণ এ জীবন অচেনা?

*****

লেখক পরিচিতি: শঙ্খদীপ মুসাফিরানা। জন্ম ১৯৯৬ সালের ১৪ই মার্চ। জন্মস্থান, কলকাতা। বাড়ি নিমতা, বেলঘরিয়া। বর্তমান ভাষাবিজ্ঞান নিয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণারত। লেখার বিষয়বস্তু মূলত সামাজিক এবং মনস্তাত্ত্বিক — বিশেষত লিঙ্গ ও যৌনতার রাজনীতি বিষয়ক।



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ