অনুবাদ: রিটন খান
দ্য প্যারিস রিভিউয়ে প্রকাশিত হানিফ কুরেশি'র সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন হ্যারি কুনযুরু
১৯৫৪ সালে হানিফ কুরেশি লন্ডনের ব্রোমলিতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শৈশব কেটেছিল মায়ের দাদু-দাদির চালানো মুদি দোকানের উপরে সেখানেই তাঁর বেড়ে ওঠা। তাঁর মা-বাবা, অড্রে বাস ও রফিউশান কুরেশি, ছিলেন তখনকার ব্রিটেনে এক বিরল দম্পতি—একজন শ্বেতাঙ্গ ইংরেজ কর্মজীবী নারী এবং আরেকজন লন্ডনের পাকিস্তানি দূতাবাসে কর্মরত এক ভারতীয় সিভিল সার্ভেন্ট। কুরেশি কিশোর বয়স থেকেই লেখালেখি শুরু করেন এবং বিশের কোঠায় পৌঁছে রয়্যাল কোর্ট থিয়েটারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। সেখানে তাঁর লেখা বেশ কয়েকটি নাটক মঞ্চস্থ হয়, যেগুলোতে ব্রিটিশ এশীয় অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছিল—বিষয়টি সে সময়ে প্রায় উপেক্ষিত ছিল।
১৯৮৭ সালে তাঁর প্রথম চিত্রনাট্য মাই বিউটিফুল লন্ড্রেট (১৯৮৫) একাডেমি অ্যাওয়ার্ডে এবং দশকের অন্যতম আলোচিত ব্রিটিশ চলচ্চিত্রে মনোনীত হয়। এই চলচ্চিত্রে এক স্কিনহেড (ড্যানিয়েল ডে-লুইস) ও এক দক্ষিণ এশীয় উদ্যোক্তার (গর্ডন ওয়ার্নেকি) সম্পর্ক দেখানো হয়, যা শুধু সমকামী প্রেম তুলে ধরার জন্যই নয়, বরং তখনকার থ্যাচারপন্থী লোভী সংস্কৃতিকে বিদ্রূপ করার জন্যও বিতর্কিত হয়।
তাঁর প্রথম উপন্যাস, দ্য বুদ্ধা অব সাবার্বিয়া (১৯৯০), একজন কুরেশি-সদৃশ যুবকের আটের দশকের লন্ডনের শিল্প জগতে নিজের ঠাই করে নেওয়ার কাহিনি, তাঁকে জাতীয় ও সাংস্কৃতিক রূপান্তরের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। এই উপন্যাস দ্বিতীয় প্রজন্মের ব্রিটিশ এশীয়দের সাংস্কৃতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশের সময়ে লেখা হয়েছিল।
হানিফ কুরেশির তিন সন্তান—কার্লো ও সচিন, যাদের মা ট্রেসি স্কোফিল্ড, একজন চলচ্চিত্র প্রযোজক; এবং কিয়ার, যার মা মনিক প্রাউডলাভ। স্কোফিল্ডের সঙ্গে বিচ্ছেদকে তিনি তাঁর ১৯৯৮ সালের নভেল্লা ইনটিমেসি-তে কাল্পনিক রূপ দেন, যা পুরুষের কামনা ও দায়িত্বজ্ঞানহীনতার অনুসন্ধানের কারণে বিতর্কের জন্ম দেয়। কুরেশির ব্যক্তিত্বের মোহনীয় অথচ দুঃসাহসী প্রকাশ্য রূপ এই বিতর্ককে হয়তো আরও বাড়িয়ে তুলেছিল।
তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস দ্য ব্ল্যাক অ্যালবাম (১৯৯৫)-এ তিনি তরুণ ব্রিটিশ মুসলমানদের বিচ্ছিন্নতা ও উগ্রপন্থার দিকে ঝোঁকার বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন। এর পরবর্তী উপন্যাস ও ছোটগল্পগুলোতে তিনি মধ্যবিত্ত পিতাদের সংগ্রাম ও উদ্বেগকে কেন্দ্র করে লিখতে শুরু করেন। তাঁর জনপ্রিয় চিত্রনাট্যগুলোর মধ্যে পরিচালক রজার মিশেলের সঙ্গে তিনটি বহুল প্রশংসিত। এই চিত্রনাট্যগুলোতে মানব সম্পর্কের জটিলতা, ঘনিষ্ঠতা, আকাঙ্ক্ষা এবং বার্ধক্যের অনিবার্য সংগ্রামকে অনুসন্ধান করা হয়েছে। বিষয়গুলিকে তিনি এমন এক সৎ কিন্তু সূক্ষ্ম দৃষ্টিভঙ্গিতে তুলে ধরেন, যা প্রজন্মের পর প্রজন্মে গভীর প্রভাব ফেলে। ৯/১১ প্রসঙ্গে তিনি একবার বলেছিলেন, "যখন এই ঘটনা ঘটল, আমি দ্য মাদার (২০০৩)-এর চিত্রনাট্য লিখছিলাম। এতে সন্ত্রাসবাদ ছিল না, অথচ ড্যানিয়েল ক্রেগকে তার প্যান্ট খুলে রাখা অবস্থায় দেখানো হয়েছিল”।
আমাদের প্রাথমিক বৈঠকগুলো হয়েছিল কুরেশির শেফার্ডস বুশে তাঁর ভিক্টোরিয়ান বাড়িতে। সিঁড়ির বদলে সামনের র্যাম্পটি ছিল তাঁর জীবনের সাম্প্রতিক পরিবর্তনের প্রথম চিহ্ন—২০২২ সালের বক্সিং ডে-তে ভয়াবহ মেরুদণ্ডের আঘাতে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ হারানোর পরের জীবন। ২০২৩ সালের বেশিরভাগ সময় তিনি রোমের একটি আইসিইউতে এবং পরে লন্ডনের তিনটি হাসপাতালে কাটান। দুর্ঘটনার দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে তিনি তাঁর নতুন শারীরিক অবস্থার ওপর লিখতে শুরু করেন, পরিবারের সদস্যরা তখন তাঁর হয়ে লেখালেখি করতেন। এখনও তিনি সাপ্তাহিক নিউজলেটার প্রকাশ করেন, কার্লোর সহায়তায়, তাঁর সাবস্ট্যাক প্ল্যাটফর্মে, যার পাঠক সংখ্যা ত্রিশ হাজারেরও বেশি। আমার এই সফরের কিছু আগে প্রকাশিত একটি নিউজলেটারে কুরেশি লজ্জা নিয়ে তার চিন্তাভাবনা প্রকাশ করেন—যেখানে একজন পূর্ব পরিচিত তাঁকে বৈদ্যুতিক হুইলচেয়ারে এবং জয়স্টিক পরিচালনার জন্য ব্যবহৃত হাতের স্প্লিন্টসহ দেখে, তাঁর মাথায় তিনবার হাত বুলিয়ে দেন।
আমরা সামনের ঘরে বসে কথা বলেছিলাম, চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বোহেমিয়ান জিনিসপত্রের মাঝে। এক কোণে একটি হাসপাতালের বিছানা, পাশে একটি কম্পিউটার ও বড় মনিটর রাখা ছিল। দেওয়ালের পাশে ঠেস দেওয়া ছিল কুরেশির প্রাথমিক নাটক বর্ডারলাইন (১৯৮১)-এর একটি পোস্টার, আর অন্য দেওয়ালে ছিল এম. সি. এসচারের ছবি, ল্যারি ক্লার্কের সিনেমার সেটে তোলা একটি ফটো, এবং বোর্হেস ও ম্যাক্সিম গোর্কির প্রতিকৃতি। ম্যান্টেলপিসে রাখা ছিল ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডের সাবেক ম্যানেজার অ্যালেক্স ফার্গুসনের একটি প্লাস্টিকের আবক্ষ মূর্তি।
একজন নার্স আমাদের কথোপকথনের সময় দূর থেকে নজর রাখছিলেন এবং কুরেশির অনুরোধে তাঁকে স্ট্র দিয়ে কফি পান করাচ্ছিলেন, মগটির গায়ে ছিল কুরেশির নিজের ছবি—ফ্যাশন ডিজাইনার পল স্মিথের দেওয়া উপহার। মাঝে মাঝে তাঁর সঙ্গী ইসাবেলা দ্য অ্যামিকো ঘরে ঢুঁ মারতেন, একবার তো স্কটল্যান্ড থেকে একজন বন্ধুর পাঠানো তিনটি বড় কিপার আসার খবর শেয়ার করতে এলেন।
কুরেশি তখন তাঁর স্মৃতিকথা শ্যাটারড (২০২৪) প্রকাশ উপলক্ষে দুর্ঘটনার পর প্রথমবারের মতো একটি জনসমাগমে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ভেন্যু থেকে পাঠানো একটি প্রশ্নের জবাবে—তিনি কি শ্রোতারা আসার আগেই মঞ্চে উপস্থাপকসহ বসবেন?—কুরেশি তাঁর স্বভাবসিদ্ধ তীক্ষ্ণ রসিকতায় উত্তর দিলেন। বললেন, "না, আমি গাধার মতো সেখানে বসে থাকতে চাই না। রোলিং স্টোনস কি আগে মঞ্চে উঠে বসে, তারপর দর্শক আসে?"
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
আমি নিজেও সাবস্ট্যাক শুরু করার কথা ভাবছি।
হানিফ কুরেশি:
সাবস্ট্যাক অসাধারণ একটি প্ল্যাটফর্ম। এটি একটি বড় সুযোগ। আপনি যা চান, যা মাথায় আসে, তাই লিখতে পারেন। আপনাকে কোনো সম্পাদককে গিয়ে বলতে হবে না, "আমি এক্স, ওয়াই, জেড বিষয়টা লিখতে চাই, আপনি কি আগ্রহী?" তবে একটা সমস্যা আছে—এটি চালিয়ে যেতে হয়। যদি থেমে যান, পাঠকরাও সরে যাবে। তারা প্রত্যেক শনিবার বিকেলে তাদের ইনবক্সে কিছু না কিছু দেখতে চায়। আপনি যদি ছয় সপ্তাহ বিরতি নেন, তারা আর ফিরে আসবে না।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
আমি যে পাঁচ পাউন্ড দিয়ে আপনার নিউজ লেটারের সাবস্ক্রিপশন নিলাম সেটা তাহলে কিছুই না?
হানিফ কুরেশি:
বেশ করেছো। কিন্তু আমার জন্য সাবস্ট্যাক ভালোই। কার্লো সকাল দশটায় আসে আর থাকে দুপুর একটা পর্যন্ত। আমি বলি, "আমি জেন্ট্রিফিকেশন নিয়ে লিখতে চাই," আর সে আমার চিন্তাগুলো গুছিয়ে নিতে সাহায্য করে। গতকাল একটা নিউজলেটার প্রকাশ করেছি, আর এখন আরেকটা লিখতে হবে। কী লিখব, আমি নিজেই জানি না, কিন্তু কিছু একটা তো ভাবতেই হবে। হয়তো আপনার আমার সাথে দেখা করার কথা লিখব, বা হয়তো দুপুরে কোথাও লাঞ্চ করতে যাওয়ার গল্প। একটা ক্যাফে আছে বড় জানালাসহ, যেখান থেকে গোল্ডহক রোড দেখা যায়—গোল্ডহক রোডে কী কী দেখা যায়, সেটা একেবারেই পাগলাটে। ছোট ছোট বিষয়কে গল্পে রূপ দেওয়ার ভাবনাটা আমি পছন্দ করি, কারণ এখন আমি ভ্রমণ করতে পারি না, কোথাও যেতে পারি না।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
আপনি কি সবসময় ডায়েরি লিখতেন?
হানিফ কুরেশি:
আমার কাছে একটা ডায়েরি আছে, উপরের তলায়। সেটা আমি তেরো-চৌদ্দ বছর বয়স থেকে পাঁচ বছর ধরে লিখেছি। তাই যদি জানতে চাই ১৯৭০, ১৯৭১ বা ১৯৭২ সালের ২৩শে জুলাই আমি কী করছিলাম, সবকিছু সেখানে লেখা আছে। যেমন, "ব্রোমলি হাই স্ট্রিটে স্কিনহেডদের এক দল আমাকে তাড়া করেছিল," ইত্যাদি। কিছু অংশ আমি কার্লোকে পড়ে শুনিয়েছিলাম। শুনে ও বেশ হতবাক হয়েছিল। সত্তরের দশক লন্ডনের জন্য খুবই অন্ধকার সময় ছিল। ব্রোমলি ছিল ব্লিটজের সময় ইস্ট এন্ড থেকে আসা মানুষের শহর। আপনি কোনো রঙিন চামড়ার মানুষকে সত্তরের দশক সম্পর্কে জিজ্ঞেস করুন, সবাই হিংসার কথা মনে করবে। আমরা রাস্তায় দৌড়ে বেড়াতাম, কখনো কখনো ডাস্টবিনের আড়ালে লুকিয়ে থাকতাম।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
আমার জন্য ঠিক একই রকম ছিল এসেক্স। আপনার স্কুলজীবন কেমন ছিল?
হানিফ কুরেশি:
আমার হাই স্কুল ব্রোমলি টেকনিক্যালে আমি ছিলাম একমাত্র বাদামি ছেলে। প্রতিদিন কেউ না কেউ আমাকে লাথি মারত, অথবা বলত, “সরে যা, পাকি নর্দমার কীট।” এটা ছিল সেই পুরোনো ধাঁচের স্কুলগুলোর মতো, যেখানে শিক্ষক সামনে দাঁড়িয়ে বই থেকে পড়তেন, আর আমাদের সেটা হুবহু লিখে নিতে হতো।
তবে বাসায় আমি রোলিং স্টোন পড়তাম—সেখানে থাকত সঙ্গীত, ভিয়েতনাম যুদ্ধ, গর্ভপাত, নারীবাদ নিয়ে লেখা। দুনিয়ায় কত কী ঘটছিল, যা স্কুলের ক্লাসে কখনোই আসত না। আমি মাত্র তিনটা ও-লেভেল পাস করেছিলাম, তারপর ষোলো বছর বয়সে স্কুল ছেড়ে একটি আর্ট স্কুল-সংযুক্ত কলেজে গিয়ে এ-লেভেল শুরু করি। আমি সবসময় স্কুল ছাড়ার দিনটিকে আমার জীবনের অন্যতম সুখের দিন বলে মনে করি।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
আপনি কি কোথাও অন্য বাদামি বাচ্চাদের সঙ্গে দেখা করতেন?
হানিফ কুরেশি:
আমার পরিবারের সদস্যরাই ছিল একমাত্র বাদামি মানুষ, যাদের আমি চিনতাম। কিন্তু, হারি, এটা বছরের পর বছর ধরে চলেছে। ধরুন, আশির দশকের মাঝামাঝি কোনো প্রকাশনা পার্টিতে গেলে, সেখানে আমার মতো আর কোনো রঙিন চামড়ার মানুষ থাকত না, হয়তো সালমান [রুশদি] ছাড়া। চারপাশে তাকিয়ে ভাবতাম, সবাই কোথায়?
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
আমার মনে পড়ে, যখন লন্ডনে তরুণ লেখক হিসেবে প্রকাশনা পার্টিতে যাওয়া শুরু করি, প্রায়ই কেউ না কেউ আমাকে "হানিফ" বলে ডাকত। এমনকি অবজারভার-এ আমার ছবি ছাপা হয়েছিল, ক্যাপশনে লেখা ছিল “হানিফ কুনজরু, ঔপন্যাসিক।”
হানিফ কুরেশি:
অসাধারণ!
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
আপনারা কি বাসায় উর্দুতে কথা বলতেন? আমি হিন্দি শিখিনি—আমার বাবা চাইতেন না যেন মা বাদ পড়ে যান।
হানিফ কুরেশি:
আমার বাবা তাঁর ভাইবোনদের সঙ্গে উর্দুতে কথা বলতেন, তাই আমি কিছুটা বুঝতে পারি। সেদিন দোকানে, শুনলাম কেউ উর্দুতে বলছে, “এই লোকটা আসলেই বোকা।” ছোটবেলায় আমি আমার চাচাদের সঙ্গে অনেক সময় কাটাতাম, কারণ তারা ক্রিকেট দেখতে লন্ডনে আসতেন। কখনো লর্ডসে, কখনো ওভালে, আর কখনো টিভির সামনে, কারি খেতে খেতে আর বিয়ার পান করতে করতে পাঁচ-ছয় দিন ধরে ক্রিকেট দেখতেন। পুরো ব্যাপারটা ছিল স্করসিজি সিনেমার মতো। তারা ছিলেন একটু রাফ—গালি দিতেন, ধূমপান করতেন, টেবিলের ওপর পা তুলে বসতেন। চেঁচামেচির কারণে আমার মা তাঁদের খুব অপছন্দ করতেন।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
আপনার বাবা-মার সম্পর্ক কেমন ছিল?
হানিফ কুরেশি:
তারা সবসময় তুচ্ছ বিষয় নিয়ে তর্ক করতেন। আমি কখনো বুঝতে পারিনি, আমার বাবা, যিনি এত মেধাবী, আকর্ষণীয় এবং ভালো সঙ্গী ছিলেন, তিনি কেন মাকে এত পছন্দ করতেন। আসলে তিনি মায়ের প্রেমে পড়েছিলেন।
আমার মাকে নিয়ে আমার অনেক অভিযোগ ছিল। ট্রেসি আর আমি এটা নিয়ে অনেক তর্ক করতাম, কারণ ট্রেসি মাকে বেশ আকর্ষণীয় মনে করত, কিন্তু আমি কখনো তাঁর সঙ্গে ঠিক মতো সম্পর্ক স্থাপন করতে পারতাম না। তিনি হতাশ ছিলেন, আমি বলব, নিঃসঙ্গ এবং একঘরে। তিনি রয়্যাল কলেজ অব আর্টে ভর্তির সুযোগ পেয়েছিলেন—আমার বাসায় এখনো তাঁর কিছু চিত্রকর্ম আছে—কিন্তু তিনি যাননি। এমনকি আমি ছোট থাকতেই তিনি একেবারে ছবি আঁকা ছেড়ে দেন।
আমাদের জমজ হওয়ার কথা, কিন্তু আমার মা অন্য সন্তানটিকে হারিয়েছিলেন। তিনি প্রায়ই বলতেন, “ভালো হয়েছে যে তোমার মতো দুষ্ট আরেকজন নেই।” তবে আমি প্রায়ই ভাবি, এই ক্ষতি তাঁর সেই গভীর বিষাদের জগত তৈরিতে ভূমিকা রেখেছিল কিনা।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
আপনি কি সবসময় নিশ্চিত ছিলেন যে আপনি লেখক হতে চান?
হানিফ কুরেশি:
আমার এখনো মনে পড়ে, স্কুলে জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিলাম—তখন হয়তো চৌদ্দ বা পনেরো বছর বয়স, যথারীতি বোর হয়ে গেছি—হঠাৎ মনে হলো, আমি লেখক হতে পারি। এই চিন্তাটা ছিল যেন একটা নতুন পরিচয় পাওয়ার মতো। তবে এটা খুব অস্বাভাবিক কিছু নয়। আমার চাচা ওমর গার্ডিয়ান-এ পাকিস্তানি ক্রিকেট নিয়ে লিখতেন। আর আমার বাবা ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ছিলেন—তিনি ক্রিকেট আর স্কোয়াশ নিয়ে লিখতেন, এমনকি উপন্যাসও লিখতেন।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
আপনি কি ছোটবেলায় আপনার বাবার লেখা পাণ্ডুলিপি পড়তেন?
হানিফ কুরেশি:
না, পড়িনি, কিন্তু জানতাম যে তিনি লিখছেন। প্রতিদিন সকালে টাইপরাইটারের শব্দে ঘর ভরে যেত। সন্ধ্যায় কাজ থেকে ফিরে তিনি আবার সেই শব্দে ডুবে যেতেন। ওই বইগুলোর অসংখ্য খসড়া তৈরি হয়েছিল। তবে সেগুলো নিয়ে ছিল অনেক বেদনা—প্রকাশকদের কাছে পাঠানো হলে বারবার প্রত্যাখ্যাত হতো।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
আপনার বাবা কি গর্বিত ছিলেন যে আপনি খ্যাতিমান লেখক হয়েছেন, যা তিনি হতে চেয়েছিলেন?
হানিফ কুরেশি:
দ্য বুদ্ধা অব সাবার্বিয়া প্রকাশের পর একবার আমি তাঁকে সঙ্গে নিয়ে একটি পাঠচক্রে গিয়েছিলাম—তিনি সামনের সারিতে বসে পুরোটা সময় হেসে গেছেন। তিনি প্রায়ই বলতেন, “আমি-ই বুদ্ধ।” তবে তিনি একটু প্রতিযোগিতাপ্রবণ ছিলেন। যখন আমি মাই ইয়ার অ্যাট হিজ হার্ট (২০০৪) লিখছিলাম, তখন আমার এজেন্ট ডেবোরা রজার্স আমার বাবার একটি পাণ্ডুলিপি, অ্যান ইন্ডিয়ান অ্যাডোলেসেন্স, খুঁজে পান। সেটি তাঁর ডেস্কে রাখা ইয়ন ম্যাকইউয়ান আর কাজুও ইশিগুরোর পাণ্ডুলিপির নিচে চাপা পড়ে ছিল।
বাবার উপন্যাসগুলো ছিল অনেকটা স্মৃতিকথার মতো—টলস্টয়ের ঢঙে লেখা, প্রায়ই তাঁর শৈশবের ভারতের পরিত্যক্ত অভিজাত শ্রেণি নিয়ে। তিনি বোম্বের অ্যাঙ্গলিকান স্কুল ক্যাথেড্রাল স্কুলে পড়তেন, যেখানে সালমানও পড়েছিলেন। তিনি নিজেকে ভারতীয়ের চেয়ে ব্রিটিশ ভাবতেন বেশি। আমি যা লিখতাম—সমকামী সম্পর্ক, বোমা, স্কিনহেড, মাদক গ্রহণ, মখমলের প্যান্ট পরা মানুষ—এগুলোকে তিনি খুব গভীর কিছু মনে করতেন না, বা তাঁর ভাষায়, “ডিপ” মনে করতেন না।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
শৈশবে বাড়িতে কী বই ছিল?
হানিফ কুরেশি:
আমার বাবার কাছে প্রচুর বই ছিল, বেশিরভাগই উনিশ শতকের অনুবাদ। বালজাক, স্তাঁদাল, ভিক্টর হুগো—এবং অবশ্যই ইংরেজি সাহিত্য, প্রচুর ডি. এইচ. লরেন্স। পাশাপাশি হেনরি মিলারের লেখাও ছিল। সবই ওই ধরনের বই।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
হেনরি মিলার তো বেশ সাহসী লেখক। আপনার বাবা কি মুক্তমনা ছিলেন?
হানিফ কুরেশি:
তিনি বেশ সোজাসাপ্টা জীবনযাপন করতেন, মায়ের প্রতি বিশ্বস্ত ছিলেন, সবসময় স্যুট পরতেন। কিন্তু তিনি উত্তর-উপনিবেশবাদ সংস্কৃতির বড় ভক্ত ছিলেন। অ্যালান ওয়াটসের লেখা দ্য স্পিরিট অব জেন নিয়ে তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
ঐ Sausalito ফেরিতে যিনি থাকতেন?
হানিফ কুরেশি:
হ্যাঁ, তিনিই। তবে আসলে তিনি চিজলহার্স্টের মানুষ, আমার বাড়ি থেকে মাত্র দশ মিনিট দূরে। আমার স্কুলে আমার এক বছরের সিনিয়র ডেভিড গোটলি নামে এক ছেলে ছিল, দেখতে অসম্ভব সুন্দর। আমি ডেভিডকে পছন্দ করতাম, কিন্তু সে আমার চেয়ে বাবার প্রতি বেশি আগ্রহী ছিল। সে প্রায়ই আমাদের বাড়িতে আসত, বাবার সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জেন, বৌদ্ধধর্ম আর মেডিটেশন নিয়ে আলোচনা করত।
একদিন ডেভিড আমাদের তার বেকেনহামের বাড়িতে আমন্ত্রণ জানায়। তখন তার মা-ও আমার বাবার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েন। এখান থেকেই দ্য বুদ্ধা অব সাবার্বিয়া-র ধারণাটা আসে—রাস্তায় এই মানুষটি একজন ‘পাকি’, কিন্তু বেকেনহামে তিনি জেন নিয়ে আলোচনা করা এক ধর্মীয় প্রতীক হয়ে উঠেছেন। ব্রিটিশ সংস্কৃতিতে তখন ভারত সম্পর্কে দুই ধরনের ধারণা ছিল—একদিকে জর্জ হ্যারিসনের চোখে ভারত, আর অন্যদিকে সাধারণ মানুষের চোখে।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
আপনি কি নিজের অভিজ্ঞতা, পড়া বইগুলোর মধ্যে খুঁজে পেতেন?
হানিফ কুরেশি:
না, যে উপন্যাসগুলো আমি পড়তাম, সেগুলোতে কোনো ভারতীয় তো ছিলই না, আর আধা-ভারতীয় তো আরও নয়। কিন্তু হোল্ডেন কলফিল্ড আর আলেকজান্ডার পোর্টনয়—তারা আমার মতোই ছিল। রথ যেভাবে পোর্টনয়ের পরিবারকে বর্ণনা করেছেন, সেই লজ্জার অনুভূতি, পুরো সম্প্রদায়কে বিব্রত করার ভয়—যেমন, “তুমি এসব বিষয়ে কথা বলতে পারো না”—এগুলো খুবই পরিচিত লেগেছিল।
আমেরিকার যুদ্ধ-পরবর্তী সাহিত্য আমার খুব পছন্দ ছিল—প্রথম দিকের জোয়ান ডিডিয়ন, টম উলফ, পরে হান্টার থম্পসন, গোর ভিদাল, জন আপডাইক … পপ রাইটিং। আমি আইরিস মারডক পড়তে চাইনি, জানেন তো?
পরে ববি সিল, অ্যাঞ্জেলা ডেভিস, আর এলড্রিজ ক্লিভারের সোল অন আইস-এ আগ্রহী হয়ে উঠি। এই লেখকরা আমেরিকার বর্ণবাদ নিয়ে যা বলতেন, তা আমার মধ্যবিত্ত ব্রিটিশ শহরতলির জীবনের সঙ্গেও মিলে যেত।
জেমস বাল্ডউইনের লেখা আমার ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল, আর আমি রান হার্ড ব্ল্যাক ম্যান নামে একটি উপন্যাস লিখেছিলাম, যেখানে একটি জামাইকান ছেলের যুক্তরাজ্যে আসার গল্প ছিল। এটা ছিল কিছুটা টু স্যার, উইথ লাভ [ই. আর. ব্রেইথওয়েটের উপন্যাস]-এর মতো।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
উপন্যাসটি কি আপনার বাবাকে দেখিয়েছিলেন?
হানিফ কুরেশি:
না, আমি তাঁর পরামর্শ নিতে চাইনি। তবে আমার এক চাচার বান্ধবী ছিলেন, যিনি অ্যান্থনি ব্লন্ড নামের এক প্রকাশনা সংস্থায় সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করতেন। তাঁর মাধ্যমে আমি সেখানে জেরেমি ট্রাফোর্ড নামে এক সম্পাদকের সাথে পরিচিত হই। তিনি খুবই সদয় যুবক, এক সমকামী ব্যক্তি, যার বাবা-মা রাজ পরিবারের অংশ ছিলেন। ভারতীয়দের প্রতি তাঁর গভীর মমত্ব ছিল। যখন তিনি আমার বাবা এবং এই আধা-ভারতীয় ছেলেটিকে দেখলেন, তখন আমাদের নিয়ে তিনি ভীষণ আগ্রহী হয়ে উঠলেন।
জেরেমি ছিলেন ই. এম. ফস্টারের ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীর অংশ এবং ফস্টারের মতো করে “গোলাকার” চরিত্র নিয়ে কথা বলতেন। তিনি আমার একজন পরামর্শক হয়ে উঠলেন। তিনি প্রায়ই আমাদের বাড়িতে আসতেন, আমার শোবার ঘরে বসে আমার বই নিয়ে কাজ করতেন। তিনি কাহিনি, লেখার গতি, এবং এ ধরনের বিষয় নিয়ে আমাকে পরামর্শ দিতেন।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
তরুণ বয়সে কি নাটক দেখতে যেতেন?
হানিফ কুরেশি:
অনেক পরে গিয়েছিলাম। ব্রোমলি ছিল বেশ নির্জন আর বিষণ্ন একটা জায়গা—প্রতিটি শহরে থিয়েটার ছিল না। কিন্তু আমরা সংস্কৃতির অনেক কিছুতেই নিজেকেমেলাতে পারতাম। অ্যাস্টর সিনেমায় তখন সারা রাত ধরে সিনেমা দেখানোর আয়োজন হতো। এসিড নিয়ে অ্যা ক্লকওয়ার্ক অরেঞ্জ দেখে পুরো মাথা ঘুরে যেত।
এ-লেভেল করতে কলেজে পৌঁছানোর সময় আমি পুরোপুরি হিপি হয়ে গিয়েছিলাম। সবাই যেন নেশাগ্রস্ত। কিছু মেয়ে তখন লেকচারারদের সঙ্গে সম্পর্কে জড়াত, এমনকি অর্গিতেও যেত। আর আমি তখনও খবরের কাগজ বিলি করতাম। মেয়েরা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করত—“সকালে ছ’টায় উঠে গিয়েছিলে, হানি? কাগজ বিলি করেছ?”
আমরা সবাই স্টোনস, হু আর ভেলভেট আন্ডারগ্রাউন্ড শুনতাম। পাবের জুকবক্সে সবসময় বাউই বাজত—তিনি আমার স্কুলে পড়েছেন, আর ডেভিড গোটলি তাঁকে সামান্য চিনতেন।
আমি মূলত টেলিভিশনের মাধ্যমেই র্যাডিক্যাল থিয়েটারের সঙ্গে পরিচিত হই। বিবিসিতে দ্য ওয়েডনেসডে প্লে আর প্লে ফর টুডে চলত—যেগুলো স্টিফেন ফ্রেয়ার্স, রিচার্ড এয়ার, কেন লোচ, অ্যালান বেনেটের লেখা বা পরিচালনা করা। এগুলো সিনেমা ছিল না, টেলিভিশনের জন্য তৈরি নাটক। আর সেগুলো বিতর্কিত ছিল। ডেনিস পটার প্রায়ই খারাপ ভাষা বা শয়তান কারো মেয়েকে ধর্ষণ করছে—এমন বিষয় নিয়ে সমস্যায় পড়তেন।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
আপনার জীবনের ঘটনাগুলোকে কল্পকাহিনির উপাদান হিসেবে কবে প্রথম ভাবতে শুরু করেছিলেন?
হানিফ কুরেশি:
এটা শুরু হয়েছিল ল্যাঙ্কাস্টার ইউনিভার্সিটিতে। এখন পেছন ফিরে তাকালে মনে হয়, আমি দ্য বুদ্ধা অব সাবার্বিয়া-র প্রথমার্ধের ধারণা নিয়ে কাজ করছিলাম—ব্রোমলির কিশোরদের নিয়ে ঐতিহ্যবাহী উপন্যাস কীভাবে লেখা যায়, সেটা বোঝার চেষ্টা করছিলাম। এতসব কিছু একটা বইয়ের মধ্যে কীভাবে রাখা যায়? কারণ ডরিস লেসিং এ ধরনের বিষয় নিয়ে লেখেননি।
ব্রোমলি কলেজে আমার সিনিয়র এক মেয়ে বন্ধুর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল, নাম জোয়ানা। ল্যাঙ্কাস্টারে ভর্তি হওয়ার পর আমরা একসঙ্গে মোরক্যামে চলে যাই, যেখানে ককেল সংগ্রাহকরা ডুবে মারা গিয়েছিল। জায়গাটা অবিশ্বাস্যরকম সুন্দর ও নাটকীয়। অসম্ভব ঠান্ডা। আমার কাছে মনে হয়েছিল যেন ইজি রাইডার সিনেমার মতো কোনো জগতে আছি।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
মোরক্যাম নিয়ে কেউ এমন কথা আগে বলেনি।
হানিফ কুরেশি:
আমরা তখন সম্পূর্ণ স্বাধীন। সেখানে আমাদের একটা অ্যাপার্টমেন্ট ছিল। মদ ছিল। আমি আর সেই মেয়ে এক ঘরে থাকতাম, প্রুস্ত পড়তাম, আর আমি আমার উপন্যাস লিখতাম। জোয়ানা কলেজ ছেড়ে দিয়েছিল, আর আমরা একসঙ্গে এখানে-ওখানে ঘুরে বেড়াতাম। আমি কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখা করতাম না, তাই বছরের শেষে আমাকে বহিষ্কার করা হয়, কারণ আমি পরীক্ষায় উপস্থিতই হইনি।
আমার বাবা সত্যি সত্যি হার্ট অ্যাটাক করেছিলেন। তিনি জোর করে আমাকে কিংস কলেজে ভর্তি করান, এককালে সেখানে তাঁর বাবাও পড়তেন।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
তিনি কীভাবে সেখানে ভর্তি হলেন? পরিচিত কেউ ছিল?
হানিফ কুরেশি:
সেখানে তেমন পরিচিত কেউ ছিল না, কিন্তু উঁচু শ্রেণির পরিবার থেকে আসার কারণে তাঁর মধ্যে এক ধরনের স্বাভাবিক দাম্ভিকতা ছিল। সম্ভবত যখন তিনি ষষ্ঠবারের মতো ড্রাইভিং টেস্টে ফেল করলেন, তিনি রেস রিলেশনস বোর্ডের প্রধানের কাছে চিঠি লিখে অভিযোগ করলেন যে তিনি বৈষম্যের শিকার। পরেরবার পরীক্ষায় তিনি পাস করলেন, আর প্রায় পরের দিনই গাড়ি দুর্ঘটনায় পড়লেন। আমরা সবাই তখন হার্ন বে-তে ছুটিতে ছিলাম, আর শেষমেশ হাসপাতালে যেতে হলো।
আমার মধ্যেও হয়তো এই প্রবণতা কিছুটা আছে—যদি কোনো জুতো কিনে দেখি তা ঠিকমতো মাপে হচ্ছে না, আমি অ্যাডিডাসের প্রধানকে ফোন দিয়ে অভিযোগ করি।
যা-ই হোক, আমার বাবা ভাবতেন, যদি তিনি স্রেফ দর্শন বিভাগের প্রধানের কাছে গিয়ে বলতে পারেন, আমি ভালো মানুষ এবং কঠোর পরিশ্রম করবেন, যদিও জীবনে কিছু ভুল করেছেন। এবং তিনি ঠিকই ছিলেন। তখন কিংস-এ দর্শনে আমার মতো অনেক লোক পড়ত—একেবারে উদাসীন, বেখেয়ালি। বিভাগটি ছিল খুবই বিচিত্র।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
ইংরেজির বদলে দর্শন বেছে নেওয়ার কারণ কী ছিল?
হানিফ কুরেশি:
আমি মনে করতাম, ইংরেজি জানতে চাইলে লাইব্রেরিতে গিয়ে নিজেই পড়া যায়। কিন্তু দর্শন শেখার জন্য প্রকৃতপক্ষে ভালোভাবে পাঠ নেওয়া জরুরি। তখন ছিল ব্রিটিশ দর্শনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ সময়, উইটগেনস্টাইনের মৃত্যুর কিছু পরেই। তাঁর ছাত্ররা তখন কিংস-এ পড়াচ্ছিলেন।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
আপনি কি লজিক্যাল পজিটিভিজম নিয়ে পড়ছিলেন, নাকি ভাষার কৌশল সম্পর্কিত পরবর্তী চিন্তাগুলো?
হানিফ কুরেশি:
পরবর্তী চিন্তাগুলো, ভাষা কীভাবে কাজ করে তা নিয়ে—বিশেষত ফরাসি দর্শনে, যেমন লাকাঁ আর দেরিদার ক্ষেত্রে। [রিচার্ড] উলহাইম আমার অধ্যাপক ছিলেন, আর তিনি ফ্রয়েড নিয়ে লেকচার দিতেন, আমি সেগুলোতে যেতাম। মনোসমীক্ষণে (Psychoanalysis) আমার আগ্রহ ছিল, কারণ আমার বাবার বড় ভাই, আমার চাচা অ্যাচু, যিনি সমারসেটে একটি অটিস্টিক শিশুদের স্কুল চালাতেন, তাঁর দারুণ একটি লাইব্রেরি ছিল, যেখানে উইনিকট, জুং আর ফ্রয়েডের বই ছিল। তিনি আমাকে ওডিপাস কমপ্লেক্স কী তা বোঝানোর চেষ্টা করতেন। আমি ভাবতাম, এ নিয়ে কিছু শেখা যাক।
কিংস-এ আমি বিশেষত বামপন্থী ফ্রয়েডিয়ানদের পছন্দ করতাম—উইলহেম রাইখ, মার্কুস—যারা মনোসমীক্ষণে সামাজিক মাত্রা যোগ করেছিলেন। পাঠ্যক্রমের বাইরেও আমি নানা কিছু পড়তাম—আর. ডি. লেইং, ডেভিড কুপারের দ্য ডেথ অব দ্য ফ্যামিলি।
লন্ডনের কলেজে থাকার বড় সুবিধা ছিল, দিনের শেষে ক্লাব, কোনো অনুষ্ঠান বা থিয়েটারে যাওয়ার সুযোগ। তখন অনেক পুরোনো বিল্ডিংকে থিয়েটারে রূপান্তর করা হয়েছিল, যেমন অলমোস্ট ফ্রি আর ওপেন স্পেস। ছিল র্যাডিকাল পলিটিকাল থিয়েটার, যেমন 7:84। আর ছিল সমকামী থিয়েটার, ইউরোপীয় বিমূর্ত । এমনকি দুপুরের বিরতিতেও সেখানে যাওয়া যেত।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
আপনি নাটক লেখা কখন শুরু করেছিলেন?
হানিফ কুরেশি:
কিংস-এ থাকাকালীন আমি সোকিং দ্য হিট (১৯৭৬) নামে ছাত্রদের নিয়ে একটি নাটক লিখি এবং তা রয়্যাল কোর্টে পাঠাই। একদিন আমার বাবা আমার ঘরে ঘোরাঘুরি করতে গিয়ে তাদের একটি চিঠি খুঁজে পান এবং সঙ্গে সঙ্গে খুলে ফেলেন—তিনি সবসময় আমার চিঠি খুলে দেখতেন। সেখানে লেখা ছিল, তারা আমার কাজ নিয়ে আগ্রহী এবং একটি মিটিংয়ের সময় ঠিক করার জন্য যোগাযোগ করতে বলছে।
আমি ডোনাল্ড হাওয়ার্থের সঙ্গে দেখা করি, যিনি তখন রয়্যাল কোর্টের সাহিত্য ব্যবস্থাপক ছিলেন। তিনি আমাকে পাঠক হিসেবে চাকরি দেন। ওই সময় রয়্যাল কোর্টে তরুণ লেখকদের এভাবেই কাজ দেওয়া হতো। আমি সেখানে উদাসীনভাবে কাজ করতাম, এমনকি প্রপসের দায়িত্বেও ছিলাম। তখন রয়্যাল কোর্টে প্রচুর সমকামী ছিলেন, এবং যদি আপনি তরুণ ও আকর্ষণীয় হতেন, মানুষ আপনাকে কাজের প্রস্তাব দিত—ইস্ত্রি করা, পোশাক প্রস্তুত করা। আমার স্মৃতিতে আছে, কখনো কখনো আপনি নিজেকে কোনো বৃদ্ধ লোকের কোলে বসে দেখতে পেতেন, যিনি আপনার গাল টিপে বলতেন যে তিনি আপনার নাটক মঞ্চস্থ করতে সাহায্য করবেন।
সোকিং দ্য হিট ছিল কোর্টে সানডে-নাইট প্রোডাকশনের অংশ—এক সপ্তাহ ধরে মহড়া হয়, তারপর নাটকটি মঞ্চে পরিবেশিত হয়, প্রায় খালি মঞ্চে। আর্টিস্টিক ডিরেক্টর ও অন্যান্য পরিচালকেরা সেখানে আসতেন, আর আপনি বন্ধু-বান্ধব ও পরিবারকে আমন্ত্রণ জানাতে পারতেন। সেটাই ছিল প্রথমবারের মতো যখন আমি কোনো মহড়া কক্ষে বসেছিলাম। অভিনেতারা হাতে স্ক্রিপ্ট নিয়ে মঞ্চে হেঁটে আমার লেখা সংলাপ বলছিলেন। আমি মনে করেছিলাম, জীবনের বাকি দিনগুলো এভাবেই কাটলে মন্দ হয় না।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
কোন নাট্যকারদের প্রতি আপনার সবচেয়ে বেশি আগ্রহ ছিল?
হানিফ কুরেশি:
রয়্যাল কোর্টে স্যামুয়েল বেকেট ছিলেন প্রধান প্রতিভা। আপনি দর্শকসারির পেছনে বসে দেখতে পারতেন, তিনি কীভাবে বিলি হোয়াইটলর সঙ্গে মহড়া করতেন। ডেভিড হেয়ারের টিথ ’এন’ স্মাইলস নামে একটি দুর্দান্ত নাটক ছিল, যেখানে হেলেন মিরেন একজন লম্পট মদ্যপ রকস্টারের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। নাটকটি একটি রক ব্যান্ডকে নিয়ে, যারা কেমব্রিজে পারফর্ম করতে যায়। সেখানে তারা পুরোপুরি মাতাল হয়ে যায়, আর হিপি ও পুরোনো অ্যাকাডেমিকদের মধ্যে সংঘাত হয়। আমি নাটকটি দেখে হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম, আর ভেবেছিলাম, এটাই আধুনিকতা, এটাই বর্তমান সময়ের কথা।
কিংস থেকে বের হওয়ার পর আমার সেই সময়কার প্রেমিকা স্যালির সঙ্গে আমি স্টিভেন বারকফের ইস্ট দেখতে গিয়েছিলাম, যা ছিল ইস্ট এন্ডের একটি পরিবারের গল্প।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
আপনি কি আউটস্কার্টস (১৯৮৩) লেখার আগে বারকফের সঙ্গে কাজ করেছিলেন? আমার মনে হয়, সেই নাটকে ইস্ট এন্ড ককনি (ছন্দপুর্ণ স্ল্যাং) ভাষার তাঁর প্রায় রাবেলাইসীয় ধাঁচের কিছু প্রভাব ছিল।
হানিফ কুরেশি:
আপনার ধারণা একদম ঠিক। আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছিল যে এটি আমার বন্ধুদের পরিবারের মতো—রাফ স্কিনহেড বাবা আর স্কিনহেড ছেলেরা, যারা সবসময় কিছু চুরি করে পাব-এ বিক্রি করত। নাটকটি দেখার পর আমি স্টিভেনের সঙ্গে দেখা করি, আর তিনি আমাকে স্টেজ ম্যানেজার হিসেবে চাকরি দেন। স্টিভেন ছিলেন কিছুটা কঠিন ধরনের মানুষ, তবে আমার প্রতি সবসময় নম্র ছিলেন। আমরা দু’জন মিলে একটি ভ্যানে প্রপস আর অভিনেতাদের নিয়ে সারা দেশে ঘুরেছি। তবে স্টেজ ম্যানেজার হিসেবে আমি ছিলাম পুরোপুরি অপদার্থ, সবসময় কিছু না কিছু হারাতাম।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
কিন্তু আপনি কি থিয়েটারে কাজ করেই জীবন চালাচ্ছিলেন?
হানিফ কুরেশি:
প্রায় না বললেই চলে। আমি নাটক লিখছিলাম, কিন্তু খুব বেশি এগোতে পারছিলাম না। কারও কাছে কোনো টাকা ছিল না, আর স্যালি আর আমি খুবই কঠিন পরিস্থিতিতে বাস করতাম। মনে আছে, আমাদের বিল্ডিংয়ের সবাই যে টয়লেট ব্যবহার করত, সেটির জানালা ছিল ভাঙা, ফেব্রুয়ারির শীতে সেই টয়লেটে আমরা ঠকঠক করে কাঁপতাম।
আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু সিদ্ধান্ত নেয়, আমাদের জিগোলো হয়ে অর্থ উপার্জন করা উচিত। তার তত্ত্ব ছিল, ধনী মহিলারা আমাদের মতো চমৎকার ছেলেদের সঙ্গে সম্পর্কে জড়াতে মরিয়া হয়ে উঠবে। অবশ্য, আমাদের ময়লা হিপি পোশাক দেখে কোনো মহিলাই আমাদের ধারেকাছেও আসেনি।
এরপর আমি ম্যাগাজিনের জন্য পর্ন লেখা শুরু করি, অ্যান্টোনিয়া ফ্রেঞ্চ ছদ্মনামে। একটা ম্যাগাজিন ছিল, যার নাম ছিল সত্যিই অসাধারণ—বিগ ’আন্স। আমাদের কাছে এটি ছিল যেন দ্য নিউ ইয়র্কার। আপনি কি এর সঙ্গে পরিচিত?
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
আমি সেই ম্যাগাজিনের কপি কখনো দেখিনি। কী ধরনের লেখা লিখতেন?
হানিফ কুরেশি:
সবই খুবই ক্লিশে। সাধারণত কোনো বাস কন্ডাক্টর বা প্লাম্বার দরজায় টুলের ব্যাগ নিয়ে হাজির হতো—এ রকম গল্প। তখন মানুষ আসলে পর্নোগ্রাফি পড়ত। আজকের দিনে পর্ন চাইলেই কেউ বই পড়ে না, তাই না? কিন্তু তখন তারা চিত্রগুলোর পাশে গল্প চাইত। একেকটা লেখার জন্য পঞ্চাশ-ষাট পাউন্ড পাওয়া যেত, যা সেই সময়ে ভালো আয়ের উৎস ছিল।
এরপর আমি রিভারসাইড স্টুডিওতে সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করি। তবে সেক্রেটারি হিসেবে এতটাই খারাপ ছিলাম যে, তারা আমাকে বরখাস্ত করে স্টুডিওর বুকশপে কাজ দেয়। সেটি ছিল এক ছোট্ট দারুণ দোকান, এক রুমের। আমি ক্যাশ কাউন্টারে বসে বই পড়তাম আর আসা লোকজনের সঙ্গে গল্প করতাম।
এই কাজ ছেড়ে দিই যখন সোহো পলিতে আমার একটি নাটক মঞ্চস্থ হয়। তখন ভাবলাম, “এই তো হলো, মানুষ। এবার পেশাদার লেখক হয়ে গেলাম।”
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
তখন আপনার বড় সাফল্যটি কী ছিল?
হানিফ কুরেশি:
ওখানে (ঘরের দেওয়ালের দিকে ইঙ্গিত করে) বর্ডারলাইন-এর একটি পোস্টার রয়েছে—এটি রয়্যাল কোর্টের থিয়েটার ডাউনস্টেয়ার্সে মঞ্চস্থ একটি নাটক, যা সাউথহলে এশিয়ানদের নিয়ে লেখা। সম্ভবত এটি ছিল তথাকথিত এশিয়ান কমিউনিটিকে কেন্দ্র করে লেখা প্রথম নাটক। অনেক সমালোচক লিখতে শুরু করেছিলেন যে আমি এমন একটি বিষয় নিয়ে কাজ করছি, যা তখন কেউই করছিল না—ব্রিটেনের জাতিগত গঠন কীভাবে বদলে যাচ্ছিল, সেটি।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
এশিয়ান কমিউনিটির প্রতিনিধিত্ব বা তাদের জগতের উপস্থানকারী হিসেবে কাজ করতে কেমন লাগত?
হানিফ কুরেশি:
সত্যি বলতে, আমি জীবনে কখনো সাউথহলে যাইনি। ওখানে বেশিরভাগই শিখ, মুসলমান খুব একটা নেই। তবে পরিচালক ম্যাক্স স্ট্যাফোর্ড-ক্লার্ক আর আমি সেখানে গিয়ে অনেক মানুষের সঙ্গে কথা বলি—এটাই ছিল ম্যাক্সের পদ্ধতি, যাকে তিনি মানুষের ইতিহাস নেওয়া বলতেন। এটা কিছুটা আমাদের এই আলাপের মতো। আপনি কারও সাথে পরিচিত হলে বলেন, “আপনার জন্ম কোথায়? আপনার বাবা-মা কী করতেন? ওহ, আর আপনি কোথায় থাকতেন? কোন স্কুলে পড়েছিলেন?”
এভাবে মানুষ তাদের জীবনের সবচেয়ে আশ্চর্যজনক গল্পগুলো বলে, যা তারা আগে কখনো কাউকে বলেনি, কারণ আপনি সত্যি তাদের কথা শুনছেন। এরপর আমি ছয় সপ্তাহের ছুটি নিই, ওয়েস্ট কেনসিংটনের ঘরে বসে সব একসঙ্গে সেলাই করি। এটা পুরোপুরি তাৎক্ষণিক এক কাজ ছিল। কিন্তু সফল হয়েছিল।
ম্যাক্সের সঙ্গে কাজ করা আমার জন্য খুবই উপকারী হয়ে ছিল। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বুদ্ধিমান, বেশ কঠিন, আর কোনো দৃশ্য বা আচরণ অপছন্দ হলে প্রচণ্ড বকাঝকা করতেন। এটা স্কুলে থাকার মতো ছিল। তিনি আমাকে ড্রেসিং রুমে পাঠাতেন, দৃশ্যগুলো আবার লিখতে বলতেন, যতক্ষণ না সেগুলো তাঁর পছন্দমতো হতো। যা ছিল খুবই বাস্তবভিত্তিক।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
তখন থিয়েটারের রাজনৈতিক পরিবেশ কেমন ছিল? আপনার কাজের অনেকটা রাজনৈতিক, কিন্তু আপনি কোনো গোষ্ঠীর সক্রিয় সদস্য ছিলেন বলে মনে হয় না।
হানিফ কুরেশি:
আমি গ্রানউইক ধর্মঘটের দিকে নজর রেখেছিলাম—এটি পরে সমথিং টু টেল ইউ (২০০৮)-এর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ক্রিস্টোফার হিচেনসের মতো মানুষ ভোর পাঁচটায় সেখানে যেতেন এবং ফ্যাক্টরির গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতেন। প্রচুর মিছিল ও প্রতিবাদ ছিল, যেগুলোর অনেকটা আমি মাঝপথে ছেড়ে লাঞ্চে চলে যেতাম। আমার অনেক বন্ধু, যারা অভিনেতা, তারা এসডব্লিউপি (সোশালিস্ট ওয়ার্কার্স পার্টি) এবং ডব্লিউআরপি (ওয়ার্কার্স রেভলিউশনারি পার্টি)-র সদস্য ছিল। সেটা ছিল অত্যন্ত রাজনৈতিক একটি সময়।
কিন্তু পুরো থিয়েটারই তখন অভিজাত ছেলেদের দখলে। এটি ছিল একটি হাস্যকর ব্যাপার। তবুও জায়গাটি ছিল চমৎকার, সেখানে খুবই বুদ্ধিমান মানুষরা থিয়েটার নিয়ে তুমুল বিতর্ক করত। লুক ব্যাক ইন অ্যাঙ্গার, জন অসবর্নের নাটক, একটি বিপ্লব ঘটিয়েছিল। তারা থিয়েটারে কৃষ্ণাঙ্গ লেখকদের নিয়ে আসতে চেয়েছিল। মুস্তাফা মতুরা আমার বন্ধু ছিল—তিনি একজন ক্যারিবিয়ান লেখক, যিনি ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রেক্ষাপটে নাটক লিখতেন।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
তখন কি দর্শকরা বদলাচ্ছিলেন?
হানিফ কুরেশি:
আসলে না। থিয়েটারের কর্মীরা খুবই বিরক্ত হতো, কারণ দর্শকরা ছিল আমাদের মতোই—লম্বা চুলওয়ালা তরুণ-তরুণী, যারা নিউক্যাসেলের দারিদ্র্য নিয়ে নাটক দেখতে আসত। তবে আমার উত্তর ছিল, সিনেমার জন্য লিখুন। আমি আসলে মাই বিউটিফুল লন্ড্রেটরয়্যাল কোর্টে নাটক নয় সিনেমা করতে চেয়েছিলাম….
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
মাই বিউটিফুল লন্ড্রেট কীভাবে শুরু হলো?
হানিফ কুরেশি:
ডেভিড রোজ ছিলেন ফিল্ম অন ফোর-এর প্রধান, আর তিনিই প্রকল্পগুলো অনুমোদন করতেন। আমি ভাগ্যবান ছিলাম—আমার কপালে “এথনিক গিগ” (ফ্রি ল্যান্স কাজ) জুটেছিল।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
কিশোর বয়সে চ্যানেল ফোর আমার জন্য আশির দশককে সংজ্ঞায়িত করেছিল।
হানিফ কুরেশি:
এটি সত্যিই সময়টাকে আলোকিত করেছিল। তখন ব্রিটিশ ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি মূলত বড়, মহাকাব্যিক সিনেমা বানানোর চেষ্টা করত। মনে আছে, এ প্যাসেজ টু ইন্ডিয়া তখন মাই বিউটিফুল লন্ড্রেট-এর সময়েই মুক্তি পেয়েছিল, আর সেখানে অ্যালেক গিনেস ব্রাউনফেস করেছিলেন।
চ্যানেল ফোরকে থ্যাচার বানিয়েছিলেন টেলিভিশনকে বাণিজ্যিক করার জন্য—এটি ছিল একটি নতুন চ্যানেল, যেখানে স্বাধীন প্রযোজনা সংস্থাগুলো নতুন ধাঁচের কাজ করত। তারা ডেরেক জারম্যান, স্টিফেন ফ্রেয়ার্স, নিল জর্ডান, অ্যাঞ্জেলা কার্টার, ইয়ান ম্যাকইউয়ানদের সিনেমা বানাচ্ছিল। তারপর তারা আমার কাছে এসে বলল, "আমাদের জন্য একটি সিনেমা লিখুন।"
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
মাই বিউটিফুল লন্ড্রেট-এর ধারণাটি কোথা থেকে এল?
হানিফ কুরেশি:
আমার পরিবারের কিছু সদস্য মনে করতেন, লেখালেখি আর্থিকভাবে তেমন সফল হচ্ছে না, যা সত্যি, যদিও আমার তিন-চারটি নাটক মঞ্চস্থ হয়েছিল। আমার চাচারা তাদের এক বন্ধুর বন্ধুর সঙ্গে আমাকে যোগাযোগ করান, ভেবেছিলেন আমি তাঁর সঙ্গে কাজ করতে পারি।
এই ব্যক্তি বিভিন্ন ব্যবসা করতেন—লন্ড্রেট চালাতেন, বাড়ির মালিক ছিলেন। তিনি আলসেশিয়ান কুকুর সঙ্গে নিয়ে ভাড়া সংগ্রহ করতে যেতেন। তাঁর বড় গাড়ি ছিল, আমাকে সেখানে ঘুরিয়ে দেখাতেন, আর সবসময় নিজের কাজ নিয়ে গর্ব করতেন আর দৌড়ঝাঁপ করতেন।
তখন আমার মাথায় এল, একজন ভারতীয়-পাকিস্তানি ব্যক্তিকে নিয়ে সিনেমা লিখি, যে একটি লন্ড্রেট চালায়। তারপর ভাবলাম, সে একা লন্ড্রেট চালাবে না, বরং ছোটবেলার এক স্কিনহেড বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করবে। স্কুলে আমার এমন বন্ধুরা ছিল, যারা চৌদ্দ-পনেরো বছর বয়সে চুল ছোট করে কাটত, বুট পরত আর স্কিনহেডের পোশাক পরত। এটি সবসময় অদ্ভুত লাগত, কারণ আমি তাদের মায়েদের চিনতাম, তাদের সঙ্গে অনেক সময় কাটিয়েছি।
তাই এই ভিত্তি—একজন স্কিনহেড আর একজন পাকিস্তানি একসঙ্গে লন্ড্রেট চালাচ্ছে—আমার কাছে অসম্ভব কিছু মনে হয়নি।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
চ্যানেল ফোর কি আপনাকে পরিচালক স্টিফেন ফ্রেয়ার্সের সঙ্গে যুক্ত করেছিল?
হানিফ কুরেশি:
প্রথমে তারা আমাকে অন্য এক পরিচালকের সঙ্গে যুক্ত করেছিল, যাকে আমি পছন্দ করিনি—তিনি লন্ড্রেট-কে একধরনের অন্ধকার, কাটিং-এজ সমালোচনায় পরিণত করতে চাচ্ছিলেন, যেখানে আমি এটিকে একধরনের গে কমেডি হিসেবে দেখেছিলাম, যা উদ্যোক্তাবাদ নিয়ে মজা করত। আপনি থ্যাচারপন্থী হতে চান? এই গে ছেলেগুলো আপনার রাস্তায় একটা লন্ড্রেট খুলে ফেলবে, আর সেটা দারুণ সফল হবে!
স্টিফেনও আমার মতো রয়্যাল কোর্ট থেকে এসেছিলেন। আমি তাঁর ঠিকানা খুঁজে বের করি, আর স্ক্রিপ্টটি তাঁর চিঠির বাক্সে রেখে আসি। তিনি সেটা পড়েন এবং রাজি হন। লেখাটি বেশ উচ্চমানের, অনেকটা কবিতার মতো, বড় মাপের—এটি “কেমন আছ, বন্ধু? তোমার মা কেমন আছেন?” ধরনের নয়। স্টিফেন এর জন্য একটি এমন শৈলী খুঁজে বের করেছিলেন, যা আমার উপাদানের সঙ্গে সত্যিই মানানসই ছিল—এটি আরও কল্পনাপ্রসূত, অনেক বেশি রূপকথার মতো, যেখানে এই দুই ছেলে, যারা স্বাভাবিকভাবে শত্রু, ভালোবাসতে শেখে।
তিনি সত্যিই নোট দিতেন না, বরং বলতেন, “এটাকে আরও ভয়ংকর করো,” “আরও হিংস্র করো,” “আরও মজার করো,” “আরও চরম করো।” মাই বিউটিফুল লন্ড্রেট-এই প্রথম আমার লেখায় সবকিছু একসঙ্গে মিলে গিয়েছিল।
আমার কাছে সিনেমায় কাজ করার আসল আনন্দ ছিল পরিচালকদের সঙ্গে কাজ করা। স্টিফেন, রজার মিশেল বা উদয়ন প্রসাদ বলতেন, “ওই দৃশ্যটা রেস্টুরেন্টে করা যাক না কেন?” আর আমি ভাবতাম, হ্যাঁ, দারুণ ধারণা! ঠিক আছে, এটা লিখতে পারি।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
আপনি কি সাধারণত আপনার লেখা সিনেমার শুটিং সেটে থাকেন?
হানিফ কুরেশি:
রজার চাইতেন না আমি সেটে থাকি। তিনি বলতেন, আমি তাঁর স্নায়ুর ওপর চাপ সৃষ্টি করি। স্টিফেন, উল্টোভাবে, এটি পছন্দ করতেন, কারণ তিনি পাকিস্তানি সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। তাই মাই বিউটিফুল লন্ড্রেট-এর পুরো সময় আমি সেটে ছিলাম। শুটিং শুরুর আগে ড্যান (ড্যানিয়েল ডে-লুইস) আর গর্ডন (গর্ডন ওয়ার্নেকি)-এর সঙ্গে অনেকটা সময় কাটিয়েছি। আমার ফ্ল্যাটে ভিএইচএস-এ মিন স্ট্রিটস আর প্রথমদিকের স্করসিজির সিনেমা দেখে সময় কাটাতাম। ড্যান ক্লিন্ট ইস্টউডকে খুব পছন্দ করতেন।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
সিনেমার সাফল্যে কি আপনি অবাক হয়েছিলেন?
হানিফ কুরেশি:
এটি মূলত টেলিভিশনের জন্য বানানো হয়েছিল, সিনেমা হলে মুক্তির কোনো পরিকল্পনা ছিল না। এতে খুব বেশি টাকা ছিল না। কেউ খুব ভালো পারিশ্রমিক পাননি। কারও আলাদা ট্রেলার ছিল না, আমাদের শুধু একটা পুরনো বাস ছিল। আর এই সীমাবদ্ধতাগুলো আমাদের জন্য আশীর্বাদ হয়েছিল, কারণ কেউ আমাদের কাজে বাধা দেয়নি।
সিনেমাটি সুপার ১৬-এ শুট করা হয়েছিল, পরে সেটি ৩৫ মিমিতে উন্নীত করা হয় এবং আমেরিকায় এর স্বত্ব বিক্রি করা হয়। মনে আছে, নিউ ইয়র্কে যাওয়ার সময় এক নারী এয়ারপোর্টে আমাকে লিমোতে নিয়ে ম্যানহাটনে পৌঁছে দিলেন। তখন ভাবছিলাম, “এটাই জীবন, বন্ধু!”
উৎসবগুলো টিকিট পাঠিয়ে বলত, “আগামীকাল টরন্টোতে এক সপ্তাহের জন্য আসুন, ফার্স্ট ক্লাসে।” খ্যাতি যদি এভাবে আসে, তবে এটি সেরা উপায়, কারণ তখন আমি একদম নির্দোষ। আমি সিনেমা থেকে খুব বেশি উপার্জন করিনি, কিন্তু আসল বিষয় সেটি ছিল না, কারণ এরপর থেকে প্রতিটি কাজের জন্য ভালো পারিশ্রমিক পেয়েছি। এবং তখন লন্ডনে তরুণ, সচ্ছল এবং স্বাধীন জীবনযাপন করার জন্য এটি ছিল একটি দুর্দান্ত সময়।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
তবুও, থ্যাচারের সময়টা ছিল সামাজিক দমন-পীড়নের যুগ।
হানিফ কুরেশি:
সেকশন ২৮, মনে আছে?
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
এটি “সমকামিতা প্রচারের” ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল।
হানিফ কুরেশি:
হ্যাঁ, এটি মাই বিউটিফুল লন্ড্রেট-এর পরের ঘটনা। কিন্তু আশির দশকের মাঝামাঝিতেও সমকামীদের নিয়ে সিনেমা লেখা ছিল খুবই বিতর্কিত। অনেকেই বলত, “আমার বাবা পাগল হয়ে গিয়েছিলেন, যখন দেখলেন আমি এমন একটা সিনেমা দেখছি, যেখানে একজন স্কিনহেড একজন পাকিস্তানি ছেলেকে চুমু খাচ্ছে।” তখন টেলিভিশনে কখনোই দুই পুরুষকে চুমু খেতে দেখা যেত না, বিশেষ করে পাকিস্তানি পুরুষদের।
অন্যদিকে, সোহো, যা একসময় বেশ অগোছালো এবং জরাজীর্ণ ছিল, তখন ঝলমলে এক জায়গায় পরিণত হচ্ছিল, যেখানে আপনি সারা রাত মজা করতে পারতেন, গ্রাউচো ক্লাবে বসে মাদক নিতে পারতেন। প্রকাশনা সংস্থাগুলো তখন কর্পোরেট কনগ্লোমারেটগুলো গিলে নিচ্ছিল, ফলে প্রচুর অর্থ ঘুরে বেড়াচ্ছিল। সেই সময় লন্ডন সত্যি এক সাহিত্যিক শহর ছিল—ভালো লেখালেখি হচ্ছিল, যার বেশিরভাগই গ্রান্টাকে কেন্দ্র করে, যেটি তখন বিল বাফোর্ড পরিচালনা করতেন।
আমি সালমানের সঙ্গে রিভারসাইড স্টুডিওতে দেখা করেছিলাম, আর তাঁর ও তাঁর বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতে শুরু করি—অ্যাঞ্জেলা কার্টার আর কাজুও ইশিগুরো প্রায়ই আশপাশে থাকতেন। জুলিয়ান বার্নস, জিনেট উইন্টারসন, অ্যালান হলিংহার্স্ট... সবাই সেই সাহিত্যিক জগতের অংশ ছিল।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
তাদের সঙ্গে সময় কাটানো কি আবার গদ্য লেখার প্রেরণা জুগিয়েছিল?
হানিফ কুরেশি:
হ্যাঁ, আমাকে করতে হতো। আর মিডনাইটস চিলড্রেন-এর প্রভাব ছিল যেন ভূমিকম্প। আমি ভাবলাম, “ওহ! এখানে মান বাড়াতে হবে, বন্ধু।” সিনেমার ব্যাপার হলো, আপনি সবসময় অন্যদের সঙ্গে কাজ করছেন। দর্শক আপনাকে দেখছে না—তারা ড্যানিয়েল ডে-লুইসকে দেখছে। আমাকে নিজেকে প্রমাণ করতে হতো।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
দ্য বুদ্ধা অব সাবার্বিয়া কি দ্রুত লেখা হয়েছিল? আপনার কি কোনো পরিকল্পনা ছিল?
হানিফ কুরেশি:
প্রথম অধ্যায়টি আমি কানাডা যাওয়ার পথে প্লেনে লিখেছিলাম। প্রথমে এটিকে একটি ছোটগল্প হিসেবে ভেবেছিলাম, পরে বুঝলাম এটি বইয়ের জন্য দারুণ শুরু হতে পারে। আগের চেষ্টাগুলোর সমস্যা ছিল, আমি সবসময় তৃতীয় পুরুষে লিখেছিলাম। যখন প্রথম পুরুষে লিখতে শুরু করলাম—যা আগে কখনো করিনি—সবকিছু জমে উঠল, কারণ এটি ছিল এক সতেরো বছর বয়সী ছেলের দৃষ্টিকোণ থেকে। এটি মজার হয়ে উঠেছিল।
পরে আমি ভাবলাম, বর্ণনাকারী একজন অভিনেতা হবে, কারণ তখন পর্যন্ত থিয়েটারের অভিজ্ঞতা আমার হয়ে গিয়েছিল। ট্রেসি, যিনি তখন আমার প্রেমিকা ছিলেন, আমাকে এলেনর চরিত্রটি তৈরি করতে সাহায্য করেছিলেন—একজন অভিজাত প্রেমিকা।
আমি কখনোই জানতাম না গল্প কোথায় যাবে, কিন্তু এক বন্ধু বলল, আমি একটি পিকারেস্ক লিখছি, যার অর্থ মূলত কোনো নির্দিষ্ট প্লট নেই। তাই সেটাই ঠিক ছিল। আমি আজ পর্যন্ত এভাবেই লিখি—যেখান থেকে শুরু হয়, কখনো মাঝখান থেকে, আর সেরা কিছুর আশায় থাকি। খুব আঁটসাঁট প্লটে আমার বিশেষ আগ্রহ নেই—ফলাফল হয় খানিকটা এলোমেলো, অগোছালো, কিন্তু আমি তা উপভোগ করি।
প্রথমে আমার শেষটা ছিল না। পরে আমার সম্পাদক রবার্ট ম্যাকক্রাম বললেন, “এটি কোন ধরনের লেখা?” আমি বললাম, এটি একটি কমেডি। তিনি বললেন, “তাহলে কমেডির নিয়ম হলো শেষটায় একটা বিয়ে থাকতে হবে।” এটা আগে কখনো শুনিনি, কিন্তু ভেবেছিলাম, এটা ভালো ধারণা।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
সম্পাদকদের সঙ্গে কাজ করার আপনার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
হানিফ কুরেশি:
আমি ছিলাম বাফোর্ডের দলের একজন। বিলকে আমি ভালোবাসতাম, এখনও বাসি, কিন্তু তখন তিনি ছিলেন ভীষণ কঠোর। একবার তাঁর সামনে যদি পেন্সিল শানাতে দেখতেন, তাহলে একশো শব্দের মধ্যে তিনটি বাঁচলে আপনি ভাগ্যবান। আমি যে একজন আমেরিকান মিনিমালিস্ট ছিলাম, তা বিলের সঙ্গে দেখা না হওয়া পর্যন্ত বুঝিনি। সেটা ছিল হৃদয় ভাঙার মতো।
ন্যান গ্রাহাম বুদ্ধা-র কাঠামো নিয়ে অনেক কাজ করেছিলেন, যখন আমি পাণ্ডুলিপি নিয়ে নিউ ইয়র্ক গিয়েছিলাম। আমরা বড় বন্ধু হয়ে গিয়েছিলাম, আর তিনি লন্ডনে আমার সঙ্গে সময় কাটাতেন। আমরা মদ্যপান করতাম, এসিড নিতাম, পার্টিতে যেতাম।
রবার্টের সঙ্গে গেলে তিনি হয়তো বাড়িতে বসে ক্রিকেট দেখতেন আর বলতেন, “আমি মনে করি এখানে একটু এই যোগ করা উচিত,” তারপর আবার ক্রিকেট দেখতে চলে যেতেন।
আমি বুদ্ধা ফাবারকে চল্লিশ হাজার পাউন্ডে বিক্রি করেছিলাম, যা তখন বিশাল অঙ্ক ছিল। এখনও তা বিশাল।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
নব্বইয়ের দশক আপনার জন্য চমৎকার সময় ছিল—উপন্যাস, সিনেমা, ছোটগল্প…
হানিফ কুরেশি:
’৯৩ সালের মধ্যে, ট্রেসি আর আমার যমজ সন্তান হয়েছিল, আর আমি ভাবলাম, “সব শেষ, এবার তাদের দায়িত্ব নিতে হবে।” এটা ছিল বড় একটা পরিবর্তন —হঠাৎই আপনাকে বাচ্চাদের স্কুলে পাঠাতে হবে, ছুটিতে নিয়ে যেতে হবে। দ্য নিউ ইয়র্কার-এর জন্য একটা প্রবন্ধ লিখে জীবন চালানো সম্ভব নয়, তাই আমি সিনেমা লিখেছি, টেলিভিশনের জন্য লিখেছি, উপন্যাস লিখেছি, ছোটগল্প লিখেছি—যা আমার সবসময় ভালো লাগে, যদিও ছোটগল্প লিখে কোনো টাকা হয় না, আর কেউ সেগুলো পড়ে না।
আমি প্রচুর কিছু লিখেছি, শুধু পুরো আয়োজনটা চালিয়ে নিতে। আমি ট্রেসির সঙ্গে একই বাড়িতে থাকতাম, কিন্তু ওয়েস্ট কেনসিংটনে আমার নিজের একটি অ্যাপার্টমেন্ট ছিল, যেখানে আমি লিখতে যেতাম। সেখানেই আমি দ্য ব্ল্যাক অ্যালবাম নিয়ে কাজ করেছিলাম।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
আপনি কীভাবে লন্ডনের বিচ্ছিন্ন মুসলিম যুবসমাজ নিয়ে লেখার চিন্তা করলেন? তখন কি রুশদির উপর ফতোয়া জারি হয়ে ছিল?
হানিফ কুরেশি:
হ্যাঁ, ১৯৯০ বা ১৯৯১ সালের দিকে আমি একটি কনফারেন্সে গিয়েছিলাম। সেখানে জন বার্জার এবং তাঁর কিছু বন্ধুর সঙ্গে সালমান নিয়ে কথা বলি, তাঁকে সমর্থন করে। কিন্তু ঘরে কেউ-ই আমার দৃষ্টিভঙ্গি সমর্থন করেনি। আমি বুঝতে পারছিলাম না, কীভাবে এই মুক্তমনা মার্কসবাদীরা এমন একটি গোষ্ঠীকে সমর্থন করতে পারে, যারা বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনের একটি অংশ ধ্বংস করতে চায়।
এই লোকটা আমাদের সহযোদ্ধা, আর তাঁকে একটি বিদেশি রাষ্ট্র থেকে হুমকি দেওয়া হয়েছে। তারা তাঁকে তাড়া করছে, আর তাকে ধরতে পারলে তারা সত্যিই তাঁকে হত্যা করবে। আপনি তাঁর রাজনীতির সঙ্গে একমত হন বা না হন, কেন আপনি এমন একজনকে সমর্থন করবেন না?
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
তাদের দৃষ্টিভঙ্গি কি তৃতীয় বিশ্বের মার্কসবাদী রাজনীতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল?
হানিফ কুরেশি:
ঠিক তাই। তাদের দৃষ্টিতে, এরা ছিল দরিদ্র, শ্রমজীবী, নিপীড়িত মুসলিম, আর সালমান ছিলেন এক অভিজাত, ক্যামব্রিজ-শিক্ষিত লেখক।
তবে আমার দৃষ্টিকোণ থেকে সালমানকে সমর্থন করাই যথেষ্ট ছিল না। আমি জানতে চেয়েছিলাম, এই উনিশ-বিশ বছর বয়সী ছেলেরা কেন লন্ডনে মৌলবাদী হয়ে উঠছিল। তারা এত রাগান্বিত কেন? তারা এত হিংস্র হয়ে উঠল কেন?
আমি হ্যামারস্মিথের একটি কলেজে যাওয়া শুরু করলাম—তখন সেখানে ঢুকতে আইডি লাগত না—আর বর্ডারলাইন-এর মতো ইতিহাস সংগ্রহ করতাম। ইসলামী সোসাইটি মধ্যাহ্নে মিলিত হতো, আর আমি সেখানে গিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলতাম, একসঙ্গে লাঞ্চ করতাম, তাদের বাড়িতে যেতাম, আর তারা যা বলত সব লিখে রাখতাম।
আমি হোয়াইটচ্যাপেলের মসজিদে এক বক্তাকে দেখতে যেতাম। দুপুরে তিনি তিন ঘণ্টা ধরে বক্তব্য দিতেন। তাঁর দুর্দান্ত ক্যারিশমা ছিল, একেবারে অবিশ্বাস্য। তিনি নারীদের, কুকুরদের নিয়ে কথা বলতেন, বলতেন “আদম এবং ইভ, আদম এবং স্টিভ নয়।” এই প্রথমবার আমি এমন চরমপন্থী কথা শুনেছিলাম।
শেষ পর্যন্ত আমাকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। তারা বলল, “তুমি সালমান রুশদির সঙ্গে যুক্ত একজন সহযোগী এবং গুপ্তচর।”
আমি যাদের চিনতাম, তাদের বেশিরভাগই ছিল বেখেয়ালি ও অপটু। এই ছেলেরা বোমা বানাবে—এই ধারণা শুনে মনে হতো, তারা নিজেদের প্যান্ট উড়িয়ে দেবে। কিন্তু আপনি জানেন, এটা দ্রুতই খুবই গুরুতর হয়ে উঠেছিল।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
মনে আছে, ৭/৭ হামলার পর একদিন টিউবে বসে অন্যান্য বাদামি রঙের ছেলেদের সঙ্গে চোখাচোখি হয়েছিল—আমরা সবাই ব্যাকপ্যাকের বদলে প্লাস্টিকের স্বচ্ছ ব্যাগ নিয়ে চলছিলাম।
হানিফ কুরেশি:
৯/১১-এর পর পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল। আমেরিকায় তখন যারাই বাদামি চামড়ার ছিল, তারা নিশ্চয়ই আতঙ্কে ছিল।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
দ্য ব্ল্যাক অ্যালবাম লেখার সময় কি আপনি এর ফলাফল নিয়ে চিন্তিত ছিলেন?
হানিফ কুরেশি:
আমার মনে হয়, এর মধ্যে একটা ওডিপাল উদ্বেগ (শিশুদের তাদের বিপরীত লিঙ্গের পিতামাতার প্রতি আবেগপ্রবণ আকর্ষণ) ছিল। আমি তখন ব্রিটিশ, ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পাকিস্তানের সমালোচনা করছিলাম—একটি ইসলামিক রাষ্ট্র, যা বিভাজনের পর মুসলমানদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
পরে বুঝেছি, তখন আমি কিছুটা মানসিক ভাঙনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম। আমার বাবা-মা, বিশেষ করে মায়ের মানসিক সমস্যাগুলো নিয়ে আমি প্রচণ্ড হতাশা আর যন্ত্রণার শিকার ছিলাম। আমি তখনও বাড়ি ছাড়িনি।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
আপনার মানসিক অবস্থার কথা বলছেন?
হানিফ কুরেশি:
হ্যাঁ। আমার এক বন্ধু, যাকে আমি কিংসের সময় থেকে চিনতাম, সে গিয়েছিল এক অসাধারণ তরুণ থেরাপিস্ট, অ্যাডাম ফিলিপসের কাছে। আমি অ্যাডামকে ফোন করি, আর তিনি বলেন, “কাল বিকেল পাঁচটা ত্রিশে দেখা করতে আসুন।”
আমি গেলাম, দেখলাম সেই কাউচ। ভাবলাম, যাক গে, আর শুয়ে পড়লাম। শুরু করলাম আমার বাবা-মা আর লেখালেখি নিয়ে কথা বলা।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
অনেক লেখক বিশ্লেষণে যাওয়ার সময় চিন্তিত থাকেন যে এতে লেখালেখির জন্য প্রয়োজনীয় সৃষ্টিশীলতা হারিয়ে যেতে পারে। আপনি কি এ নিয়ে ভীত ছিলেন?
হানিফ কুরেশি:
আমি দেখেছি, অ্যাডাম আমার ভেতরের মননকে মুক্ত করে দিতেন। আপনি কাউচে শুয়ে পড়ে ফ্রয়েডীয়কে কোনো স্বপ্নের কথা বলবেন, আর তিনি সেই স্বপ্নের কোনো তুচ্ছ বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করবেন। তারপর আপনি সেই ছবির সঙ্গে বিভিন্ন স্মৃতি ও ভাবনার যোগসূত্র তৈরি করবেন, এবং অনেক কিছু উঠে আসবে যা আগে কখনো ভাবেননি।
আমি প্রায় পঁইত্রিশ বছর ধরে অ্যাডামকে আমার সমস্যাগুলো নিয়ে অভিযোগ করে যাচ্ছি, কিন্তু লেখালেখি কখনো থেমে যায়নি। বরং, আমি অ্যাডামের সঙ্গে দেখা করার পর আরও বেশি লিখেছি, আর তখন থেকে কোনো লেখার প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হইনি।
তার চেয়েও বেশি, আমার লেখালেখি আরও ব্যক্তিগত হয়ে উঠল। আমি তখন একজন সম্মানজনক ব্যক্তি, উপার্জন করে পরিবার চালাচ্ছি, কিন্তু ভেতরে ভেতরে সেই জীবনের সঙ্গে পুরোপুরি দ্বন্দ্বে ছিলাম। আমি আসলে অপ্রথাগতভাবে প্রথাগত একটি জীবন যাপন করতে চেয়েছিলাম।
আমি পিতা হই অনেক দেরিতে—আটত্রিশ বছর বয়সে। তার আগে পর্যন্ত আমি ছাত্রের মতো জীবন কাটিয়েছি—এমন এক উড়নচণ্ডী ছেলে, শহরে ঘুরে বেড়াচ্ছি, যা খুশি করছি। হঠাৎ এই যমজ সন্তানদের ঘিরে আমার পুরো জীবন আবর্তিত হচ্ছে, এটা ভীষণ ভীতিকর ও আতঙ্কজনক মনে হয়েছিল।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
আমিও জীবনের অনেকটা পেরোনোর পর বাবা হয়েছি, যা আমাকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছিল। নিজেকে কেন্দ্র না ভেবে চলার বিষয়টি বেশ ভিন্ন। আমাদের নিজ আনন্দ তখন আর মুখ্য থাকে না।
হানিফ কুরেশি:
অথবা আমার অভিজ্ঞতায়, তা আর কারও আগ্রহের কেন্দ্রেও থাকে না। আপনি বাস চালাচ্ছেন পেছনের সিট থেকে । আমি এই বিষয়টি নিয়ে খুব আগ্রহী হয়ে উঠেছিলাম—একটি পরিবার আসলে কী।
আমি চিন্তিত ছিলাম, যেন আমি আমার বাবা-মায়ের জীবন নতুন করে গড়ে তুলছি। চল্লিশের কাছাকাছি বয়সে একদিন ঘুম থেকে উঠে ভাবতে শুরু করলেন, আমি কীভাবে বাঁচব? কী করব? আমি এই বিষয়গুলো নিয়ে লেখা শুরু করলাম।
আমি লিখলাম ইনটিমেসি, লাভ ইন এ ব্লু টাইম (১৯৯৭), এবং মিডনাইট অল ডে (১৯৯৯)।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
ট্রেসির সঙ্গে বিচ্ছেদের পর কত দ্রুত আপনি ইনটিমেসি লিখেছিলেন?
হানিফ কুরেশি:
মনে হয় একই সময়ে। বইটি কিছুটা শ্যাটারড-এর মতো, যার গুণ যদি কিছু থাকে, তা হলো এটি সরাসরি "ট্রেঞ্চ" থেকে লেখা—যখন যুদ্ধটা বাস্তবেই চলছিল। আমি তখন নিজের সঙ্গে, দুনিয়ার সঙ্গে, এসবে আমার ভূমিকা নিয়ে প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ ছিলাম। আমি প্রচুর যন্ত্রণা ভুগছিলাম, অন্যদেরও কষ্ট দিচ্ছিলাম। এই বইটা আমি সেই ক্রোধের ভেতর থেকেই লিখেছি, যা আগে কখনো করিনি।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
লেখাটা কি আপনার জন্য চিত্তশুদ্ধির মতো ছিল?
হানিফ কুরেশি:
আমি মনে করি না লেখালেখি বিশেষভাবে চিত্তশুদ্ধির কাজ করে। এটি প্রয়োজনীয়। ইনটিমেসি লেখার সময় আমি অনুভব করেছিলাম, আমার যে অভিজ্ঞতা হচ্ছে, তা হয়তো এমন পরিস্থিতিতে অন্য মানুষের অভিজ্ঞতার প্রতিনিধিত্বও করতে পারে। আর এই পরিস্থিতিতে আপনি এমন অনেক কিছু অনুভব করেন এবং ভাবেন, যা খুবই বিতর্কিত।
আপনার ভয়, ক্রোধ, হতাশা, এবং যন্ত্রণা একেবারে চরম মাত্রায় থাকে। আমি ভেবেছিলাম, “একটি বই লিখি, যেখানে আমি এই অনুভূতিগুলোকে ঠিক যেমন আছে, তেমনই ধরে রাখতে পারি।”
আমি তখন নোটস ফ্রম আন্ডারগ্রাউন্ড-এর বর্ণনাকারীর কথা ভাবছিলাম—সেই অপ্রিয়, মসোকিস্টিক লোক—“আমি একজন অসুস্থ মানুষ… আমি একজন দুষ্ট মানুষ।”
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
ইনটিমেসি কি আপনার পিতৃত্ব এবং সঙ্গী হিসেবে উপযুক্ততা নিয়ে জনমত তৈরি করবে, তা কি আপনি জানতেন?
হানিফ কুরেশি:
লেখক হওয়া একটা শয়তানের চুক্তির মতো। অর্থের বিনিময়ে আপনি নিজেকে এবং আপনার পরিবারকে বাইরের দুনিয়ার সামনে উন্মোচন করতে বাধ্য । ইনটিমেসি-র আগে আমার কাজগুলো বেশ আকর্ষণীয় এবং মজার বলে পরিচিত ছিল—এই বইয়ের পর মানুষ সত্যিই আমার বিরুদ্ধে চলে গিয়েছিল। পরিস্থিতি খুবই উত্তপ্ত এবং ভয়ানক হয়ে উঠেছিল।
তবে আমার চামড়া কিছুটা পুরু। আর একটা সময় আসে, যখন এটি আপনার এবং আপনার বিবেকের মধ্যে একটি ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। আপনার বিবেক যতটা অনুমতি দেয়, ততটাই ঝুঁকি নিয়ে আপনি এমন কিছু তৈরি করেন, যা আপনাকে সন্তুষ্ট করে।
আপনি ঝুঁকির প্রান্তে কাজ করেন, যদি আপনি ভাগ্যবান হন। লেখাটা সহজেই প্রাণহীন হয়ে যেতে পারে—ঘরে বসে লিখতে গিয়ে আপনি উত্তেজনা অনুভব করতে চান, যেন হাড়-মজ্জায় তা স্পন্দিত হয়। আপনি সেই তরঙ্গটি ধরতে চান।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
আপনার কি মনে হয়, একজন লেখক হিসেবে ঝুঁকি নেওয়া, এবং পুরুষের দৃষ্টিকোণ থেকে বিপরীতলিঙ্গের প্রতি আকাঙ্ক্ষা নিয়ে লেখার যুগ হয়তো শেষ হয়ে এসেছে?
হানিফ কুরেশি:
এটি ভালো প্রশ্ন। ফিলিপ রথ পুরুষের ভোগকে সাহিত্যের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছিলেন—তিনি একেবারেই নির্লজ্জ ছিলেন। আজকের দিনে, সেই ধাঁচের কিছু লিখলে… আপনার বন্ধুত্ব শেষ। সরাসরি ‘বাতিল সংস্কৃতি’-র (cancel culture) ফাঁদে পড়ে যাবেন।
ষাট ও সত্তরের দশকে জানালাটা সত্যিই খুলে গিয়েছিল, যখন যৌবনের জন্য যৌনতা ছিল মুক্তির একটি মাধ্যম—পুরুষ ও নারীদের জন্যই। তখন যৌনতার সঙ্গে আদর্শিক বোঝা অনেক ছিল এবং প্রচুর যৌন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলত। বুদ্ধা-র অর্গির মতো—যা সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল—যেখানে করিম তাঁর বন্ধুর সঙ্গে যৌনমিলনে লিপ্ত হয়, থিয়েটার পরিচালক করিমের প্রেমিকার সঙ্গে করিমের সামনেই যৌন সম্পর্ক করে, আর করিম এতে বেশ অস্বস্তিতে পড়ে। এসব বেশিরভাগই ছিল অসম্ভব বিব্রতকর।
এখন আমি যেন এক নতুন জগতে আছি—যৌনতা নিয়ে এখন চিন্তা করা মানে যেন আমি এক মার্সিয়ান, যে একটি কথা বলা জিরাফকে পর্যবেক্ষণ করছে।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
এবং আপনি এমন এক শরীরে বাস করার অভিজ্ঞতা পেয়েছেন, যা অন্যদের জন্য একটি…
হানিফ কুরেশি:
বেশিরভাগ সময় করুণার বস্তু। হ্যাঁ। আমি এখন এনিমা নেওয়া নিয়ে লিখছি। শ্যাটারড-এ এমন অনেক কিছু আছে—আসলেই, সেখানে আছে নানা বিবরণ যা আমার শরীর নিয়ে, কিন্তু আমার যৌনজীবন শেষ। হাসপাতালে শুয়ে থাকলে আপনি কেবল মাংসপিণ্ড। নার্সরা এসে আপনাকে ঘোরায়, পরিষ্কার করে, ওষুধ দেয়, তাদের কাজ করে চলে যায়।
রোমের হাসপাতালে আমি যখন প্রায় মৃত একজন পক্ষাঘাতগ্রস্ত মানুষ হিসেবে শুয়ে ছিলাম, তখন একমাত্র উত্তেজনার বিষয় ছিল এই চিন্তাটি যে আমি এসব কিছু লিখে ফেলতে পারব। সেটাই আমার একমাত্র অবলম্বন ছিল।
আপনি হয় পুরোপুরি থেমে যান, অথবা আমার ক্ষেত্রে, নতুন উদ্দীপনায় লিখতে শুরু করেন। দুর্ঘটনার কয়েকদিন পরেই আমি ইসাবেলাকে ব্লগটি ডিকটেশন দিতে শুরু করি। তারপর পরের দিন আরও একটি, তার পরের দিন আরও একটি।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
আমাদের মতো পড়ুয়াদের জন্য এটি ছিল ভীষণ তীব্র এবং তাত্ক্ষণিক অভিজ্ঞতা।
হানিফ কুরেশি:
হঠাৎ পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়ে নিজেকে এক "কথা বলা উদ্ভিদে (গেছো)" পরিণত হওয়া, প্রতিটি অন্ত্রের নড়াচড়া বা এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা বর্ণনা করা—এমন এক মধ্যমপরিচিত লেখক কীভাবে এই অবস্থায় পৌঁছাল, তা নিয়ে মানুষের প্রবল কৌতূহল ছিল।
ইসাবেলা আমার হাসপাতালের বিছানার পায়ের কাছে বসে ফোন বা আইপ্যাডে টাইপ করত। প্রক্রিয়াটি ছিল ভীষণ ধীর—স্বাভাবিকভাবেই ইংরেজি তার প্রথম ভাষা নয়, তাই আমি প্রায়ই চেঁচিয়ে বলতাম। পরে ছেলেরা, কার্লো, সচিন বা কিয়ের, রোমে আসতে শুরু করল, আর আমি তাদের সঙ্গেও ব্লগ লেখা শুরু করলাম।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
এখন এটা কীভাবে করেন? আপনি কীভাবে পোস্ট লেখেন এবং সম্পাদনা করেন?
হানিফ কুরেশি:
কার্লো কম্পিউটার খুলে বসে, আর আমি আমার হুইলচেয়ারে তার পিছনে গিয়ে বসি, তার সঙ্গে জোরে জোরে লেখা পড়ে দেখি। তারপর আমি বলি, “তোমার কি মনে হয়, এই প্যারাগ্রাফটি ঠিক জায়গায় আছে? নাকি এটি পুরোপুরি কেটে দেওয়া উচিত?”
তখন সে বলে, “এর মধ্যে দুটো বাক্য রাখা উচিত, বাকিগুলো বাদ দেওয়া যায়।” আমি বলি, “ঠিক আছে, সেগুলো অন্য কোথাও বসানোর চেষ্টা করি।”
আমাদের সবকিছু স্পষ্টভাবে বলতে হয়, একে অন্যকে বুঝিয়ে দিতে হয়, যাতে সহযোগিতাটা অব্যাহত থাকে।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
আপনি কি স্পিচ-টু-টেক্সটের মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করার পরিকল্পনা করেছেন?
হানিফ কুরেশি:
হয়তো আমাকে ব্যবহার করতে হতে পারে, কিন্তু আমি চাই না। আমি সঙ্গ পছন্দ করি, আমার সঙ্গ প্রয়োজন। হাসপাতালে থাকার সময় একা থাকাটা অসহ্য লাগতে শুরু করেছিল, কারণ আমার চিন্তাগুলো এতটাই অন্ধকারময় এবং বেদনাদায়ক ছিল।
আমি করুণা, শোক এবং গভীর বিষণ্ণতায় ডুবে যাচ্ছিলাম। আমি আগে কখনো এভাবে কারও সঙ্গে লেখালেখি করিনি—বিশ্বে কতজন লেখক এটা করতে পারেন, তা আমি জানি না। কিন্তু আমাকে করতে হচ্ছে।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
মিল্টনের তুলনা মনে আসে, তাই না? মিল্টন আর তাঁর কন্যারা। এটি এক ধরনের ভালোবাসার কাজ।
হানিফ কুরেশি:
আমার খুব ভালো লাগে যে আমার ছেলে তার প্রতিটি সকাল উৎসর্গ করে আমার কথা শুনতে আর আমাকে সাহায্য করার জন্যে। যা সত্যিই মুগ্ধকর।
এবং এই লেখাগুলো, যা অসুস্থতা নিয়ে আমার অভিজ্ঞতা, আমার আগের যেকোনো লেখার চেয়ে অনেক বেশি ডিরেক্ট। এটি মানুষের সাধারণ নিয়তি—আমার সঙ্গে যা ঘটেছে তা তেমন বিরল নয়। রয়্যাল ন্যাশনাল অর্থোপেডিক হাসপাতালে, যাকে আমি দুর্ঘটনার হাসপাতাল বলি, ওয়ার্ডের সবাই মজার, ভয়ংকর এবং বোকামি-ভরা দুর্ঘটনার শিকার।
একজন লোক সম্পূর্ণ মদ্যপ অবস্থায় ঘুমাতে গিয়েছিলেন, বিছানা থেকে পড়ে গলায় আঘাত পেয়ে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হন। একজন তরুণ পার্টিতে বাগানের ট্রাম্পোলিনে খেলতে গিয়ে লাফিয়ে পড়ে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়। হি ওয়াজ আ বিউটিফুল কিড, ওয়ার্ডে সবসময় গাঁজা খেত।
আরেকজন বাগানে কাজ করছিলেন, হঠাৎ পিছনে ঘুরে গিয়ে রেকে পড়ে মাথায় আঘাত পান—তিনি এখন সম্পূর্ণ বিকল। অনেকেই সাঁতারের দুর্ঘটনার শিকার। একজন বোকা লোক পুলে ঝাঁপ দিয়েছিল—পুল ছিল খালি। রাতে পানি সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
আমার এক বন্ধুত্ব হয়েছিল একজন রক ক্লাইম্বারের সঙ্গে, যিনি পাহাড় থেকে পড়ে গিয়েছিলেন। তাঁর ঘাড় ভেঙে গিয়েছিল, হাতও। বয়স ছিল চৌত্রিশ। তিনি মরতে চেয়েছিলেন, আমাকে বলেছিলেন তাঁকে সাহায্য করতে। কিন্তু হাসপাতালে আত্মহত্যা করা খুবই কঠিন।
আমরা পরিকল্পনা করেছিলাম, তিনি সব কাপড় খুলে বাগানে চলে যাবেন এবং ঠান্ডায় জমে মারা যাবেন। আমি তাঁকে বলেছিলাম, “শুনুন, বন্ধু, আবহাওয়া পাল্টে গেছে। এখন বাইরে গরম। আপনি মরতে পারবেন না।”
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
আপনার কি মনে হয়, আবার কথাসাহিত্যের দিকে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে?
হানিফ কুরেশি:
না, সত্যি বলতে নেই। যা ঘটেছে, তার পর সুস্থ-সবল মানুষদের নিয়ে কিছু কল্পনা করে লেখা আমার জন্য বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে। আর আমার কাছে উপাদানের কোনো অভাব নেই। আমি আবার একটি সিনেমা করতে চাই। শ্যাটারড-এর ওপর ভিত্তি করে একটি সিনেমা বানানোর চেষ্টা করব।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী:
আপনার চরিত্রে একজন অভিনেতা থাকবে?
হানিফ কুরেশি:
আপনি কি দ্য ডাইভিং বেল অ্যান্ড দ্য বাটারফ্লাই সিনেমাটি দেখেছেন? তেমনই হবে এটি —তার আগের জীবন, দুর্ঘটনা, এবং হাসপাতালের অভিজ্ঞতা দেখানো হবে। সিনেমাটি বড় সফল হয়েছিল।
আমি কার্লো আর সচিনের সঙ্গে কাজ করব। তাদের দিয়ে কাঠামো তৈরি করাব, একটি রূপরেখা ঠিক করব, আর মাঝের অংশগুলো আমি পূরণ করব। ব্যাস কাজ শেষ!
*****
অনুবাদক পরিচিতি: রিটন খান যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী লেখক। নেশা বই পড়া ও বই সংগ্রহ করা। নিজের মৌলিক লেখালেখির পাশাপাশি নিয়মিত বুকরিভিউ এবং বইসম্পর্কিত লেখা ও অন্যান্য গদ্য অনুবাদ করে যাচ্ছেন।লেখক, প্রকৌশলী এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশেষজ্ঞ। তিনি প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা এবং সমাজের উপর প্রযুক্তির প্রভাব নিয়ে গবেষণা করছেন। লেখালেখিতে তিনি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে মিলিয়ে সহজ ভাষায় চিন্তাশীল আলোচনা করেন। তার লেখায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নৈতিকতা, গোপনীয়তার প্রশ্ন, এবং প্রযুক্তি-নির্ভর জীবনের চ্যালেঞ্জ উঠে আসে।


0 মন্তব্যসমূহ