ফজলুল কবিরীর গল্প : জনযুদ্ধের ভাষা




ই গল্প আপনার কাছে বিশ্বাসযোগ্য না হলেও এটি আদতে ফুল-পাখি-বৃক্ষরাজি ও একটা সবুজ গ্রামের টিকে থাকার লড়াইয়ের গল্প।

ভাঙা ও মরচেপড়া একটি ট্রাঙ্ক হাতে নিয়ে যুবক বদিউর রহমান দাঁড়িয়ে আছে। অনেক বছর আগে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া এক গ্রামের সন্ধানে তার এই ফিরে আসা। পুরনো ট্রাঙ্কটিতে সে বোঝাই করে এনেছে ফুল-পাখি-বৃক্ষ ও সবুজ ঘাসের দরদি স্মৃতিসমূহ। জনযুদ্ধের গণযোদ্ধাদের হাতে এদেশ মুক্ত হওয়ার পর গ্রামটির বিলুপ্তি ঘটেছিল। কিন্তু এমন গ্রামের হদিশ পাওয়া এখন আর সহজ কাজ নয়।

তার বাবার গল্প কি কেউ মনে রেখেছে?

অনেক ঘোরাঘুরির পরও কেউ তাকে এ বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারে না। বহুকাল পর সেই হারানো জনপদের খোঁজে মাছুয়াঘোনা সমবায় সমিতির মাঠ-লাগোয়া সরু রাস্তাটা ধরে তবু সে ফিরে আসে। তাকে নিতান্তই বিভ্রান্ত এক যুবক মনে হয়। পথের ধুলাওড়া বাতাসে মাঝেমধ্যে চোখে পড়া মানুষের বিনীত সালামের জবাব দিয়ে সে যখন দীর্ঘ পথ ক্লান্তিহীনভাবে হাঁটে, তাকে আরও অনেক গ্রাম্য যুবকের মতো সাধারণ ও আটপৌরে না ভেবে কোনো উপায় থাকে না।

তার গ্রাম কি আদৌ কখনো ছিল?

প্রথমবারের মতো এসেছে সে এই গ্রামে। কিন্তু তার মনে হয়, এই জনপদে আরও অসংখ্যবার তাকে আসতে হবে। মনে মনে সে ভাবছে, মানুষ সারাজীবন ফেরা নামক অনিশ্চিত এক খাদের ভেতর আটকে থাকে—তারপর ভাগ্যফেরতা যুবক হয়ে প্রত্যাবর্তনের জটিল বিন্যাসকে যাচাই-বাছাই করে।

দু’পাশে ঘাসের আস্তরণে ঢাকা-পড়া এই ইটের সলিন দেয়া রাস্তাটায় চলতে-ফিরতে যে-কজন পথচারী চোখে পড়ে, তাদের কাছে এর কোনো জবাব পাওয়া যায় না। তবু সে খেই হারিয়ে ফেলে না। দু’চারটি বিরক্ত মুখের দুর্ভাবনা উপেক্ষা করে সে পুনরায় নিজের উদ্যমকে সচল করে। কিন্তু বিলুপ্ত এক জনপদ সম্পর্কে স্থানীয়দের সে আশ্বস্ত করতে পারে না।

বিষয়টাকে তারা যুবকের খামখেয়ালি ভাবতে শুরু করে। প্রথম দিকে খানিকটা পুলক অনুভব করলেও, শেষমেষ তারা বিরক্ত হতে শুরু করে। তারা ভাবে এ হয়তো এবাদুর মিয়ার ঔরসে জন্ম নেয়া সেই শিশু নয়। কোনো দুরভিসন্ধি নিয়ে এই গ্রামে এসেছে আর নিজেকে নুরবানর পুত্র বলে দাবি করছে।

মূলত জনযুদ্ধের ভয়াবহতা শেষ হওয়ার পর ডিসেম্বরের এক বিধ্বস্ত দিনে এবাদুর রহমানের পোড়া দেহ উদ্ধার করা হয়। একইসময়ে এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তি গুলাল আজমের গায়েব-হয়ে-যাওয়া রূপবতী বউ নুরবানকেও দেখা গিয়েছিল এবাদুর রহমানের ছাইভষ্ম জড়িয়ে ধরে কাঁদতে।

সেই নুরবানও শিশুপুত্রসহ একদিন নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। পাড়া-পড়শিরা তাদের আর কোনো খোঁজ পায়নি। আজ এতদিন পর সেদিনের পুঁচকে শিশুকে এই যুবকের সাথে তারা মেলাতে পারে না।

তারা যুবককে স্নেহ-খাতিরের পরিবর্তে ধীরে ধীরে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। বার্ধক্যের গড়পরতা হিসেবে বয়সে প্রবীণ যারা তারাও যুবকের প্রত্যাবর্তন ও পরিচয় নিয়ে সন্দীহান হয়ে ওঠে। বদিউর রহমান কোনোভাবেই নিজেকে তাদের বিভ্রমের খোলস থেকে ছাড়িয়ে নিতে পারে না। সন্দেহ ও সংশয়ভরা দৃষ্টি নিয়ে গ্রামের মানুষ তাকে মাপতে থাকে।

কেউ কেউ ধারণা করে সে নিছক পিতার হদিশ জানতে এই জনপদে আসেনি—বরং এই উছিলায় ইতিহাসের হারিয়ে যাওয়া এক সংগ্রামের দলিল ঘাঁটতে এসেছে।

বদিউর রহমান তাদেরকে একটি পুকুরের কথা বলে। পুকুরটি ছিল মূলত তার জন্মের ইতিহাসের সাক্ষী। পুকুরের পুবকোনাটা দেখিয়ে সে বলে, ওখানে ছিল রক্তবর্ণের বিশাল এক কড়ইগাছ। গাছটিতে বসত গেড়েছিল হাজার হাজার মায়াবি পাখি।

মায়ের জঠরে থাকাকালীন বদিউর রহমান এসব পাখির সাথে সখ্যতা গড়ে তুলেছিল। কিন্তু পাখিগুলো যে তার অকৃত্রিম সহপাঠী হয়ে উঠেছিল এ-কথা সে কাউকে বোঝাতে পারে না। তার কথা সাধারণ মানুষ অনুধাবন করতে পারে না, কারণ তাদের কেউই জন্মের আগে পাখির এমন নিবিড় সাহচর্য পায়নি।

সে তারপরও বলে, গাছটি ছিল সত্যিকার অর্থেই বিশাল। প্রতিদিন সকালে এটি ঘুমিয়ে পড়ত, আর সন্ধ্যা ঘনালে জেগে উঠত। সে-সময়টাতে গাছে ভিড় করত নানা জাতের অসংখ্য পাখি। কিন্তু পরবর্তীতে ভয়াবহ এক হত্যাযজ্ঞে গাছটির সব পাখ পুড়ে অঙ্গার হয়ে যায়।

গ্রামবাসী বিস্ময় ও জিজ্ঞাসা নিয়ে পরস্পরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে। তারা পাখিদের এই বিনাশ ও বিলুপ্তির গল্প নিয়ে মুখ খোলার আগ্রহ দেখায় না।

জনযুদ্ধের সাথে কী সম্পর্ক ছিল এই কড়ইগাছ ও পাখিদের গল্পের?

গ্রামের প্রবীণরা পুকুর, কড়ইগাছ ও পাখিদের গল্প নিয়ে আগ্রহ প্রকাশ না করলেও তারা জানে পুকুরমালিক এবাদুর রহমানের পাখিপ্রেমের গল্প। সেসব দিনে তারা ছিল উদ্দাম কিশোর।

গ্রামের আগন্তুক বদিউর রহমানের জিজ্ঞাসার জবাবে তারা নিজেদের বিস্ময় ও অতীতের স্মৃতিগুলো আড়াল করে রাখলেও একটা সমাধানহীন জটিলতার মুখোমুখি তাদেরকে হতেই হয়।

প্রথম অবস্থায় বিষয়টা গুরুতর মনে না হলেও ক্রমশই তা অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। গল্পটি বহুকাল ছাইচাপা হয়ে পড়েছিল। এই ফাঁকে নবীন প্রজন্ম তরতর করে বেড়ে উঠেছে এবং প্রবীণদের অনেকেই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে। কিন্তু গল্পটি এতদিন পর ফের জেগে উঠতে শুরু করেছে।

গাছটির শাখা-প্রশাখায় যেসব পাখি আশ্রয় নিয়েছিল, সেসব পাখির ডিম ও ফুটফুটে বাচ্চাগুলোর সেবাযতেœ যুবক এবাদুর রহমানকে প্রায়শই ব্যস্ত থাকতে দেখা যেত। কিন্তু এতকিছুর পরও মাঝমধ্যে সেসব পাখির ডিম ও বাচ্চাগুলো কে বা কারা চুরি করে নিয়ে যেত।

এ-বিষয় নিয়ে গ্রামবাসীর বিবিধ কৌতূহল প্রথমদিকে তেমন ডালপালা বিস্তার না করলেও ধীরে ধীরে তা সাবার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে থাকে। পুকুর-মালিক এবাদুর রহমানের মুখ থেকে সবাই বিষয়টি জানতে পারে।

তখন ছিল জনযুদ্ধের কাল। আরও অনেকের মতো এবাদুর রহমানেরও রক্তে তখন যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছিল।

গ্রামে তার প্রধান প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে এলাকার মান্যজন ও মোড়ল গুলাল আজম। পাখি চুরির এই দুষ্কর্ম তার লেলিয়ে দেয়া লোকের কাজ এ বিষয়ে তার কোনো সন্দেহ থাকে না।

বস্তুত তাদের এই পারস্পরিক শত্রæতার ইতিহাস দীর্ঘ ও পুরনো। পাখির প্রতি এবদুরের প্রেমের কারণেই এটা হয়েছে বিষয়টা তা নয়। পুকুরসহ জায়গাটির প্রতি গুলাল আজমের লোভ ছিল শুরু থেকেই। কিন্তু জায়গাটি হাত বদলের কোনো অভিপ্রায় এবাদুর রহমানের ছিল না। পিতৃমাতৃহীন এবাদুর রহমানের শৈশব থেকে টিকে থাকাই এই লড়াইয়ে মোড়ল গুলাল আজমের আভিজাত্য হোঁচট খায়।

কড়ইগাছের আশ্রয় ছাড়াও এবাদুর রহমানের ভিটেমাটির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা মাটির ঘরটিতেও যেসব পাখি পোষ মেনেছিল তাদের সংখ্যাও ছিল অগুণতি। তাই ক্রমশ পাখিভর্তি হয়ে ওঠা কড়ই গাছের কাণ্ডকীর্তি কিছুটা সময় গ্রামবাসীর কাছে গুরুত্ব হারায়। যুদ্ধের জটিলতর সংগ্রাম ও টিকে থাকার লড়াই সবাইকে কাবু করতে শুরু করে।

এরই মধ্যে একদিন আচমকা শত শত পরিত্যক্ত ডিমের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা অসংখ্য মৃত পাখির ছানা পুকুরপাড়ে পড়ে থাকতে দেখা যায়। এবাদুর রহমানকে এই দৃশ্য বিচলিত ও ক্ষুব্ধ করে। এমন নিষ্ঠুর ও বর্বর কাজের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হয়ে ওঠে। পাড়ার ক্ষমতাবান মোড়ল গুলাল আজমের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের আগুন শাণিত করে।

সমব্যথী প্রতিবেশিরা তার ক্ষোভে সমর্থন জানালেও ভয়ে মুখ খোলার সাহস দেখায় না। মূলত সে-সময় তারা নিজেদের মুখ সেলাই করে রাখত। গুলাল আজমের এমন নিষ্ঠুরতায় সবাই তাকে সান্ত¡না দিলেও এবাদুর রহমানের ক্ষোভ ও প্রতিশোধপরায়ণতা আরও বেশি মাথাচাড়া দেয়।

আদতে গুলাল আজম ও এবাদুর রহমানের বিরোধের গল্পটি ধীরে ধীরে আরও স্পর্শকাতর হয়ে ওঠে। একদিকে বদিউর রহমান নিজের সংকল্পে অবিচল থাকে ও অন্যদিকে গুলাল আজম অহমের আগুনে পুড়তে থাকে।

এমতাবস্তায় একদিন আচমকা যুদ্ধের দামামার মধ্যেই গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো গুলাল আজমের কনিষ্ঠ বিবি নুরবানর গায়েব হওয়ার সংবাদ বাতাসে কৌতূহলের বারুদ ছড়ায়। গ্রামবাসীর আশঙ্কা সত্য হয়।

যৌবনে গুলাল আজমের ফাঁদে আটকা পড়ে যেসব কিশোরী নিজেদের সতীত্ব হারিয়েছিল তারা এই সংবাদে পুলকিত হয়। পড়ন্ত বয়সেও তারা বার্ধক্যে কাবু স্বামীদের কানে সংবাদটি দেয়। তাদের স্বামীরা খানিকটা শরমিন্দা হয়। এসব জরাগ্রস্ত স্বামী এখন অলস ও অচল হলেও যৌবনে তারা গুলাল আজমের লালসার শিকার রমণীদেরকে মোটা অংকের উপঢৌকণ নিয়ে স্ত্রী হিসেবে কিনে নিয়েছিল।

অনেকদিন পর গুলাল আজমের এই দুর্গতির রসালো খবরে এসব নিপীড়িত নারী অতীতের অপমানের জ্বালা অল্পসময়ের জন্য হলেও ভুলে যায়। একধরনের সুখ অনুভব করে। একইসাথে তরা গুলাল আজমের নতুন লালসার শিকার কিশোরি মেয়েটির পালিয়ে যাওয়ার পরিণতির কথা ভেবে খানিকটা আশঙ্কাও অনুভব করে।

এবাদুর রহমানকে গ্রামের নারী-পুরুষ তেজী ও প্রতিবাদী যুবক হিসেবে দেখে এসেছে। তার ছিল স্বাধীনচেতা ও প্রতিবাদী স্বভাব। গাঁয়ের মুরুব্বি গুলাল আজম হয়ে ওঠে তার সমস্ত ক্ষোভ ও ঘৃণার লক্ষ্যবস্তু।

গুলাল আজমের পাপ ও অপরাধের ফিরিস্তি সে সবাইকে জানাত আর প্রতিবাদের করার জন্য উস্কে দিত।

গুলাল আজম ছিল সারা জনপদের মুষ্টিমেয় ক্ষমতাধরদের একজন। সামাজিক ও জীবিকার বিবিধ পাকে গ্রামের বেশিরভাগ লোক তার কাছে মাথা নত করতে বাধ্য হতো। স্বাধীনচেতা ও পাখিপ্রেমিক যুবক এবাদুর রহমান তার শোষণকে মেনে নেয়নি কৈশোর থেকেই। মানুষকে সে শিরদাঁড়া সোজা করে চলার কথা বলে। বিষয়টা গুলাল আজমের অহমকে প্রতিনিয়ত খুঁচিয়ে বেড়াত। তাদের এই সংঘাত চূড়ান্ত রূপ নেয় আরও কিছুকাল পর।

এমনই এক সংঘাতময় দিনে আকস্মিকভাবে সত্তরোর্ধ্ব গুলাল আজম শতশত ফুটফুটে পাখির ছানা ও দামি সোনাদানা বোঝাই করে যুদ্ধের মধ্যেই দরিদ্র কৃষক মোতালেব মিয়ার রূপবতী মেয়ে নুরবানকে বিয়ে করে ঘরে তোলে।

নুরবান ছিল এবাদুর রহমানের গোপন হৃদপিণ্ড। হৃদয়ের মানুষ হারানোর এই আঘাত এবাদুর রহমানকে স্তব্ধ করে দেয়। সে বুঝতে পারে তাকে বশ মানানোর চূড়ান্ত কৌশল প্রয়োগ করে গুলাল আজম তার স্বপ্নকে টুকরো টুকরো করার পঁয়তারা করেছে।

এরপর থেকে অনেকদিন এবাদুর রহমানকে গ্রামের মানুষ প্রকাশ্য হতে দেখে না। অথচ জনযুদ্ধের আগের দিনগুলোতে এবাদুর রহমানের দিনগুলো ছিল অন্যরকম। কোনো কোনো নির্জন দুপুরে কিংবা সন্ধ্যার পড়ন্ত আলোয় তাকে পুকুরপাড়ের কড়ই গাছের নিচে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাখির সাথে কথা বলতে দেখত সবাই। প্রতিবাদী ও টগবগে যুবকের স্বপ্নভঙ্গের এই জ¦ালা গুলাল আজমকে পুলকিত করে; নিজের মধ্যে একটা আলগা শিরশিরানি অনুভব করে।

একসময় প্রতিবেশিরা বুঝতে পারে এবাদুর রহমান ও গুলাল আজমের এই দ্বৈরতে একজনকে হারতে হবে। যুদ্ধে একজনই বিজয়ী হবে।

কিন্তু গুলাল আজম কিছুদিন পর একটা আশঙ্কা নিজের মধ্যে টের পায়। কিশোরী স্ত্রী নুরবানর রূপগুণ তাতিয়ে উঠতে না উঠতে একটা সন্দেহ তাকে ঘিরে ধরে। নিজের ভেতরটা অপমানে ফুঁসে উঠতে শুরু করে। গুলাল আজম বুঝতে পারে আত্মগোপনে থাকা এবাদুর রহমানের সাথে তার কিশোরী স্ত্রী নুরবানর পুরনো প্রণয়ের রেশ এখনো সজীব রয়ে গেছে।

ততদিনে যুবকের পুকুর পাড়ের কড়ই গাছটিতে ধীরে ধীরে আরও অসংখ্য নতুন পাখি জড়ো হয়। এবাদুর রহমানকে প্রকাশ্যে দেখা না গেলেও এসব পাখির কলরব জানান দেয় তার গোপন উপস্থিতির কথা।

এমন যুদ্ধদিনেও কোত্থেকে এসব অগুণতি পাখি সেখানে জড়ো হয়েছে গ্রামের লোকেরা তা বুঝতে পারে না। তারা এটাও বুঝতে পারে না যে কড়ইগাছের ঝাঁক ঝাঁক পাখির হট্টগোল গুলাল আজমের রাতের ঘুম হারাম করতে শুরু করেছে। এবাদুর রহমান ও তার স্ত্রী নুরবানর গুপ্ত সম্পর্কের কথা লোকলজ্জার ভয়ে গুলাল আজম কাউকে বলতে পারে না। কিন্তু দুশ্চিন্তা ও প্রতিহিংসার জ¦ালা তাকে পেয়ে বসে।

কিশোরী স্ত্রীর উপর তার অবিশ্বাস মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু নুরবানর ছিল পাখির প্রতি তীব্র আকর্ষণ। ক্লান্তি ও ঈর্ষায় গুলাল আজম নিজেকে অসহায় ভাবে। এবাদুর রহমানের এই অপমানের পাল্টা জবাব দিতে গুলাল আজম নানারকম ফন্দিফিকির করতে থাকে।

ততদিনে গাছভর্তি পাখির আস্তানাটা যুবকের অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে পরিণত হয়; হয়ে ওঠে এবাদুর ও নুরবানর গুপ্ত প্রণয়ের সাক্ষী। যুদ্ধের শেষে একটা পাখিপূর্ণ সংসারের কথা তারা ভাবতে শুরু করে।

গুলাল আজমের ভেতর অক্ষম আক্রোশ ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে।

যেসব সন্তান গুলাল আজমের ঔরসে জন্ম নিয়ে অন্যের ঘরে বেড়ে উঠেছে তাদের অনেকেই প্রকৃত বাপের কুকীর্তির কথা জানত। তাদের পিতৃত্বের এই গোপনীয়তাকে তারা ঘৃণা করত। তবু সমাজ ও লোকলজ্জার ভয় তারা মুখ বন্ধ রাখতে বাধ্য হতা।

গুলাল আজম সত্তোরোর্ধ্ব বয়সেও অতীতের গোপন পাপ থেকে মুক্ত ছিল না। কিন্তু কিশোরী বউ নুরবানর অবাধ্যতা তাকে দিশেহারা করে তোলে। অপমানের ষোলোকলা পূর্ণ করে নুরবান একদিন সন্ধ্যার আঁধারে গায়েব হয়ে যায়।

পাড়াপড়শি থেকে শুরু করে মাঠ-ঘাট-বিলের পশুপাখি—সবাই গুলাল আজমের বউ খোয়ানোর সংবাদে মুখ লুকিয়ে হাসার উপলক্ষ পায়।

বউ হারানোর অপমান সহজে মেনে নেওয়া গুলাল আজমের পক্ষে সম্ভব ছিল না। স্ত্রীর এই হঠকারিতায় তার ভেতর ঘৃণা ও খুনপরায়ণতা জেগে ওঠে।

এভাবে আরও অনেকদিন কেটে যায়। একদিকে যেমন এবাদুরের গোপন ও প্রকাশ্য উপস্থিতি কেউ টের পায় না, অন্যদিকে নুরবানর হদিশও কেউ দিতে পারে না। গ্রামের মানুষজন এবাদুর রহমান ও নুরবানর খোঁজ না পেলেও পুকুরপাড়ের কড়ই গাছটির অগুণতি পাখির কলরব কমতে দেখে না।

কিন্তু একদিন হঠাৎ এক ভয়ঙ্কর দুঃসংবাদ সবাইকে স্তব্দ কর দেয়।

যখন পাড়া-পড়শি ও শিশু-কিশোরের স্মৃতিতে গুলাল আজমের স্ত্রী খোয়ানোর সংবাদটি মলিন হতে শুরু করে—যখন যুদ্ধের দামামা শেষে একটা নতুন পতাকার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে সবাই, তখন ডিসেম্বরের এক তীব্র শীতের রাতে পাখিপ্রেমিক যুবক এবাদুর রহমানের প্রিয় কড়ই গাছটিতে আগুন লাগে। যেসব পাখি বংশপরম্পরায় কড়ই গাছের ডালে বেড়ে উঠেছিল, সেসব পাখি ঘুমন্ত অবস্থায় আচমকা ছাইভস্মে পরিণত হয়। এবাদুর রহমান আত্মগোপনের আগে-পরে তার মাটির ঘরের ভেতরেও যেসব পাখি আশ্রয়-প্রশ্রয় পেয়েছিল, সেসব পাখিরও একই পরিণতি হয়।

এবাদুর রহমানের ঘরের আগুন নিভাতে গিয়ে প্রতিবেশিরা চোখ কপালে তোলে। যে ঘরে অনেকদিন ধরে কেবল পোষা পাখির হইচই ছাড়া আর কিছু নজরে আসত না, সেখানে তারা দেখে এবাদুরের পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাওয়া লাশ পড়ে আছে।

পড়শিরা দেখতে পায় গুলাল আজমের পালিয়ে যাওয়া রূপবতী বউ নুরবান একহাতে স্ফীত পেট চেপে ধরে প্রসববেদনা আটকিয়ে অপর হাত দিয়ে এবাদুর রহমানকে প্রাণপণে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করছে।

আশ্চর্যের বিষয় আগুনের আঁচ নুরবানর দুধে-আলতা শরীরে একবিন্দুও দাগ কাটতে পারেনি। উদ্ধার হওয়ার পর নুরবানর কোলজুড়ে আসে ফুটফুটে এক স্বর্গীয় শিশু।

গুলাল আজমের গল্পও মানুষ ভুলে যায় পরবর্তী দশকগুলোতে; যদিও কিছুদিন পালিয়ে থাকার পর ফের তাকে গ্রামে প্রত্যাবর্তন করতে দেখা যায়। অতীতের কলিমা তাকে তাড়িয়ে বেড়াত না বলেই সবাই জানে। বরং মানুষ সেসব গল্প ভুলে গিয়ে নতুন নতুন গল্পের ভেতর অতীতকে মুছে ফেলে। ততদিনে কোলের শিশুটিকে বুকে নিয়ে নুরবান নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়ার গল্পও সবাই ভুলে যায়। এরপর দীর্ঘদিন সেই জনপদে কোনো নারী সন্তানধারণ করতে পারেনি বলে গুজব রটে।

যুবক বদিউর রহমান এসেছে সেই গ্রামে; পুরনো সেই কড়ই গাছের খোঁজে। কিন্তু গুম হয়ে যাওয়া জনপদে এমন কোনো গাছের হদিশ কেউ তাকে দিতে পারে না।

মরচে পড়া ট্রাঙ্কটির ভেতর থেকে যে-ঠিকানা সে বের করে তার পাঠোদ্ধার কেউই করতে পারে না।

জনযুদ্ধের এমন গল্প তাদের নিত্যদিনের জীবনযাত্রায় কোনো প্রভাবই ফেলতে পারে না।          

*****

লেখক পরিচিতি : ফজলুল কবিরীর। কথাসাহিত্যিক ও সমালোচক ফজলুল কবিরীর জন্ম ০৯ অক্টোবর। বেড়ে উঠেছেন চট্টগ্রামের হাটহাজারী থানাধীন হালদা নদীর তীরবর্তী গ্রাম উত্তর মাদার্শায়। পড়াশোনা করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। লেখালেখি সাথে সম্পৃক্ততা আড়াই দশকের। সাহিত্যকর্মসমূহ কথা, উলুখাগড়া, পুষ্পকরথ, সূনৃত, ছান্দস, চারবাক, সমুজ্জল সুবাতাস, ঘুড়ি, উত্তরাধিকারসহ বিভিন্ন ছোটকাগজ, জাতীয় দৈনিক ও ওয়েবজিনে প্রকাশিত । গল্পগ্রন্থ : বারুদের মুখোশ, প্রকাশকাল : একুশে গ্রন্থমেলা, ২০১৫, প্রকাশক: বাঙলায়ন, প্রকাশিতব্য, গল্পগ্রন্থ: ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া গল্প, প্রকাশক: জেব্রাক্রসিং, প্রকাশকাল: একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৮, গল্পগ্রন্থ: ডোরাকাটা ক্যাডবেরি, প্রকাশক: জলধি, প্রকাশকাল: একুশে গ্রন্থমেলা ২০২২, গান্ধর্ব গল্পগুচ্ছ, প্রকাশক: দ্বিমত, একুশে গ্রন্থমেলা ২০২৫। উপন্যাস: ঔরসমঙ্গল, প্রকাশকাল: একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৭, প্রকাশক: বেহুলাবাংলা। প্রবন্ধগ্রন্থ: লেখকের বুদ্ধিবৃত্তিক দায় ও দর্শনের খোঁজে। প্রকাশক: দ্বিমত, একুশে গ্রন্থমেলা ২০২৩।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ