নার্স এসে বললো, এক এক করে আসুন, উনি কথা বলবেন। জবা কে, জবা? আপনি আগে আসুন।
সেন্টু ও পলি মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। সবচেয়ে ছোট হয়ে জবা কেন সবার আগে? চিরকাল জবার দিক টেনে টেনেই মা গেল! অতনুর সঙ্গে ডিভোর্স হয়ে যাবার পর জয়া মুর্শিদাবাদে একটা মেয়ে ইস্কুলের হস্টেলে সুপার হয়ে আছে। থাকা খাওয়া ফ্রি। বাচ্চাকাচ্চা নেই, একা মানুষ। ওর আর কী লাগে! কিন্তু মায়ের সবসময়কার নাকে কান্না একদিনও বন্ধ হয়নি, ওর কেউ নেই, মেয়েটা সবসময় মুখ কালো করে থাকে, ওর কী হবে, ভবিষ্যতে ওকে কে দেখবে, এইসব নানা ঘ্যানঘ্যানানি।
শেষ অব্দি কার কী হবে, সেটা দেবতারাও জানে না, মানুষ তো কোন ছাড়। আর তেমন কিছু হলে সেন্টু আর পলি তো আছেই। ফেলে তো দিতে পারবে না। মায়ের পেটের বোন তো!
জবা মায়ের কেবিনে ঢুকে গেলে, পলি যেন হঠাতই মনে পড়ে গেল এইভাবে চোখ ছোট করে বললো, ভাই মায়ের গয়না সব সেফ জায়গায় আছে তো? মা নার্সিং হোমে চলে এসেছে। ঘর তো ফাঁকা। তাই বললাম।
সেন্টু উদাস মুখে জবাব দেয়, জানিনা ভালোদি। থাকবে মায়ের আলমারিতে কোথাও। মা তো বিশ্বাস করে কাউকে হাত দিতে দিত না।
কিন্তু সে খুব ভালো করেই জানে মা নার্সিং হোমে আসবার আগে তার বৌয়ের কাছে গচ্ছিত রেখেছে গয়নার বাক্স। বেশি কিছু নেই। বাড়ি করার সময় আর তাদের পড়াশোনাতেই গেছে সব। পড়ে আছে একজোড়া বাউটি, দুজোড়া কানের দুল আর একটা বিছে হার। তবে সোনার এখন যা দাম, এতেই কয়েক লাখ টাকার মাল। জবাকে মা তা বলে গেলেও ক্ষতি নেই। আলমারির চাবি সেন্টুর বৌ নিজের কাছে রাখে সবসময়।
অতো কথা বলতে নেই, সেন্টু বলেও না। উদাস ভাবটাকে ধরে রাখে চোখেমুখে, তবে মন দিয়ে জরিপ করতে থাকে সাদা ফ্রকের নিচে লম্বা মোজা পরা নার্সটিকে। ডবকা এবং চঞ্চল। হাতের ট্রেতে ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জ এম্পুল, কিন্তু সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসছে যেন মরালগামিনী। শুধু পা নয়, সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দিয়েই সে যেন উঠে আসার কাজটা করছে। মাথা নড়ছে, চোখ ছুটছে এদিক ওদিক, দেহকান্ডে সামনে পেছনে ঢেউ খেলছে। মুখে একটা মৃদু হাসি। মরালীটি সোজা এসে সেন্টুর সামনের ছোট ঘরটায় ঢুকলো। দরজাটা খোলা বলে দেখা যাচ্ছে টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে এক ছোকরা ডাক্তারের কাছ থেকে কিছু বুঝে নিচ্ছে। দুজনের মুখেই কান এঁটো করা হাসি।
হঠাৎ সেন্টুর মনে হলো ওর ঐ রকম চিতল হরিণীর মতো ফিগারে এই বিচ্ছিরি, বুড়োটে, হাঁটুর ওপর হঠাৎ শেষ হয়ে যাওয়া সাদা পোশাক একেবারে মানাচ্ছে না। তুকে এক্কেবারে মানাইছে না রে! মেয়েটা পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে আছে, সেন্টু দেখছে কী গভীর কোমরের খাঁজ, তার নিচে ছড়ানো বিশাল উপত্যকা। ঐ শরীরে নার্সের পোশাক, ঐ খাটো ঝুল সাদা জামা, যেন একটা সুন্দর গল্পকে হঠাত মাঝপথে শেষ করে দিচ্ছে। পা অব্দি ঢাকা পোশাকে ওকে আরও উত্তেজক লাগবে! সে মনে মনে ওকে হলুদ ব্রা কাটের ব্লাউজ আর কুরুসভায় দ্রৌপদীর মতো একটা অনিঃশেষ লাল কাতান শাড়ি পরিয়ে জোড়া ভ্রুর ঠিক মাঝখানে বিন্দি লাগিয়ে দিচ্ছিলো, এমন সময় জবা কেবিন থেকে বেরিয়ে এলো।
জবার চোখ লাল, সাদা রুমাল দিয়ে ঘন ঘন চোখ মুছছে। সে কিছু বলার আগেই সেন্টু গা ঝাড়া দিয়ে দাঁড়ালো, এবার সে যাবে, মা তাদের একই দিনে আলাদা আলাদা করে কিছু বলতে চায়, এটা জানার পরই তারা তিনজন নার্সিং হোমে এসেছে একসঙ্গে। এইরকম উল্টোদিক থেকে ডাকাডাকির কারণ কী সেন্টু বোঝেনি অবশ্য, হয় সিরিয়ালি ডাকো, নয় গুরুত্ব অনুযায়ী ডাকো। তা নয়, প্রথমেই সবচেয়ে ছোট জবা, যে কিনা এখানে থাকেই না। মা এইরকমই। উল্টো পালটা কাজই করে গেল সারা জীবন! লোক খ্যাপাতে ওস্তাদ। যাই হোক, এখন নিশ্চয়ই মেজ সন্তান সেন্টুর পালা, একমাত্র ছেলেও বটে, আবার মায়ের অভিভাবকও। মাথার চুলে আঙুল চালিয়ে সেন্টু তৈরি হয়ে নিলো, তারপর পছন্দসই নার্সটির দিকে আর একটু তাকিয়ে ভেতরে ঢোকবার জন্য পা বাড়ালো।
হঠাতই জবা বলে উঠলো, ভালো দাদা, তুই না, তুই না, এবার ভালোদি যাবে।
সেন্টু হতভম্ব হয়ে এদিক ওদিক তাকায় তারপর সোজাসুজি ছোট বোনকে জিজ্ঞাসা করে, এটা কে ঠিক করলো, তুই?
জবা আবার নাক টানে। কান্নাবসা গলায় বলে, মা বলল যে!
সাদা চাদরে শুয়ে, নাকে অক্সিজেনের নল নিয়ে এক ব্যক্তিত্বহীন অসুস্থ মহিলা ঠিক করে দিচ্ছে কে আগে তার সঙ্গে দেখা করবে! যার আয়ু ডাক্তারের মতে খুব বেশি হলে এক হপ্তা। সেন্টুর আপাদমস্তক রাগে জ্বলে যায়, এইসব মা বুঝেশুনে তাকে অপমান করবার জন্যই করছে। অতো দরদ তো ভালোদির বাড়ি গিয়ে থাকলেই পারতেন উনি। সেন্টুকে এখন এতো দৌড়োদৌড়ি করতেই হতো না। এই জন্যই বলে, যারা শিল, যার নোড়া, তারই ভাঙি দাঁতের গোড়া।
কেবিনের দরজায় অল্প শব্দ হতে সেন্টু দ্যাখে ভালোদির সাদা শাড়ির আঁচল ভেতরে অদৃশ্য হয়ে গেল!
মা এবার যাবেই, কিন্তু যাবার আগে বড় ভুগিয়ে যাবে। নার্সি হোমের খরচের অনেকটাই তার কম্পানি দেবে, ভালোদি আর জবার দেওয়া টাকা মিলিয়ে বাদবাকিটা হয়ে যাবে। কিছু কম পড়লে তবেই তাকে বার করতে হবে। তা হোক, টাকার জন্য সে তেমন ভাবে না, ভাবে অফিসে তার প্রেসটিজ নিয়ে। বস মানুষ ভালো নয়, আর স্টাফ খুব কমে যাওয়ায় কিছু অপারগও বটে, কিন্তু সেন্টু যে ইচ্ছে করে বাড়িতে বসে নেই, সেটা তো বুঝবে! সেদিন রেগে গিয়ে অনেক উল্টো সিধে কথা শোনালো, সেন্টু ছাড়া অন্য কেউ হলে লেগে যেতো নারদ নারদ।
বাইরে সেন্টুর শান্ত ভদ্র বলে সুনাম আছে। এই সুনামটা বড় কাজের। তার নামে উল্টোসিধে কেউ কিছু বললে অন্যেরা মানতে চায় না। সেন্টুর হয়ে ফাইট করে। তাই বাড়িতে মায়ের সঙ্গে চেঁচামেচি করতে হলে আগে সে দরজা জানালা এঁটে নেয়। পাড়ায় প্রত্যেকের দু জোড়া করে কান। এক কান থেকে আরেক কানে কথা চালাচালির হিসেব ধরলে সব গোণাগুনতির বাইরে চলে যাবে। মনে হবে মানুষ নেই, আছে শুধু পাড়া ভর্তি বড় বড় ল্যাতপেতে কান। অন্যের কেচ্ছা শোনার জন্য খাড়া হয়েই রয়েছে।
অবশ্য আর চেঁচামেচির দরকার হবে না। ওষুধ খাওয়া নিয়ে ঝামেলা, পাতলা মাছের ঝোলে অরুচি, কাজের লোকের কাছে ছেলেবৌ অযত্ন করছে বলে নালিশ, মায়ের সঙ্গে বেদম চিৎকার চেঁচামেচি করে পরিস্থিতি বাগে রাখতে হতো সেন্টুকে। যার জন্য এইসব করতে হতো, সে তো ছোটবেলায় ছেলেমেয়েরা স্কুলে যাবার সময় যেমন হাত নেড়ে টা টা করতো, এখন প্রায় তেমনই করছে নার্সিং হোমের বেডে শুয়ে। ছেলেমেয়েদের সঙ্গে কথা বলতে চাই। তাও আলাদা আলাদা। কেন রে বাবা, গুপ্তধন তো নেই কোথাও পোঁতা যে সুলুকসন্ধান বলে দিয়ে যাবে। চিরকালই মা নাটক করে করেই গেল!
ভাবনাগুলো লোকাল ট্রেনের মতো, দ্রুত যায় আসে, তার ফাঁকে ভালোদি সামনে এসে দাঁড়ায়। চোখ ভেজা, তবে জবার মতো অতটা নয়। ভালোদি অজিতদার পাল্লায় পড়ে আগের থেকে অনেক ঘাগু হয়ে গেছে। সেরকম আর ভাই ভাই করে না।
-কী বলে, বুড়ি?
সেন্টু চারপাশের গুমোট হালকা করার চেষ্টা করে। ভালোদি হাসে না, বলে তুই যা এবার। এবার তো তোর পালা। মা অপেক্ষা করছে।
সেন্টু কেবিনের ভেতর ঢুকে দ্যাখে মায়ের বেডের চারপাশে সাদা পর্দা টাঙানো হয়ে গেছে। সেই সুন্দরমতো নার্সটি যন্ত্রপাতি সাজাচ্ছে সাইড টেবিলে। সেন্টুকে দেখে বলে, ভিজিটিং আওয়ার্স শেষ হয়ে গেছে। এখন রোগীকে ব্লাড দেব। আপনি বাইরে যান।
মেয়েটা দেখতে যতটা সুন্দর, গলার আওয়াজটা ঠিক ততোখানি বিশ্রি। যেন কাস্তে কেউ খড় কাটছে, খ্যাসখেসে, ওঠাপড়াহীন। আর বলার ভঙ্গিটাও খুবই অপমানজনক। রাস্তার ভিখিরি তাড়াচ্ছে নাকি! সেন্টুর এইসবে জ্ঞানের নাড়ি খুব টনটনে। নাহয় থাকে সে মায়ের বাড়িতে, কিন্তু মা একদিন রেগে গিয়ে এইভাবে কথা বলেছিল বলে…। নাঃ, সেসব থাক। যে মানুষটা চলে যাচ্ছে তাকে নিয়ে পুরনো রাগের কথা ভাববে সেন্টু এতো বড় পাষণ্ড নয়।
বরং দুটো পর্দার জোড়ের ফাঁকে মায়ের খোলা চোখ দেখে তার মায়াই হলো, সেই ছোটবেলার মা যেন, যতদূর তাকে দেখা যায় চেয়েই আছে। অথচ সেন্টু হয়তো তখন কোচিংয়ে যাচ্ছে বা স্কুলের সবার সঙ্গে পিকনিকে। একবার তার মায়ের হাতটা মুঠোয় নিতে ইচ্ছে করলো, খুব রোগা হয়ে গেছে হাতটা, চামড়া কুঁচকে ঝুলে পড়েছে, ঐ হাত দিয়ে মা কখনো তাকে ঠাঁই ঠাঁই করে মেরেছে বা আদর করেছে, এখন বিশ্বাস করা খুব শক্ত। এতো দূর থেকেও পরিষ্কার বোঝা যায় মায়ের খোলা চোখের কোণ বেয়ে জল গড়াচ্ছে। বেডের ওপরে লাগানো লাইটের সাদা আলোয় চকচক করছে। কী বলতে চায় মা তাকে?
সেন্টু আমতা আমতা করে। উনি আমার সঙ্গে কিছু কথা বলতে চান, এইরকম কিছু বলার চেষ্টা করতেই নার্স আবার খিঁচিয়ে উঠল, ওসব পরে হবে। এখন কাজ করতে দিন।
সেন্টু তাড়াতাড়ি বাইরে চলে এলো। পেছনে কেবিনের দরজা ভালো মতো বন্ধ হলো কিনা ফিরে দেখল না বিরক্ত হয়ে। মা যে তার সঙ্গে কথা বলতে পারেনি, সেটা সে বোনেদের মোটেও বলতে যাচ্ছে না। একেই তো ডেকেছে সবার পরে, তারপর কথাও হয়নি শুনলে অন্তত ভালোদি খুব মজা পাবে। সবাইকে চেনা হয়ে গেছে সেন্টুর।
গেটের বাইরে এসে জবা বলল, ভালো দাদা, আসার সময় পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখি, ঠিক মুখোমুখি বিছানায় মা এপাশ ফিরে তাকিয়ে আছে, দেখছে তার তিন ছেলেমেয়ে উল্টো দিকের সিঁড়ি বেয়ে নেমে যাচ্ছে। প্রথমে তুই, মাঝে ভালোদি, শেষে আমি। জানিস ভালো দাদা, মায়ের মুখে এক টুকরো হাসিও দেখলাম যেন! তুই কি কোনো মজার কথা বলে এলি মা-কে?
একনাগাড়ে এতোগুলো কথা বলে জবা হাঁপাতে থাকে। চশমা খুলে আঁচল দিয়ে চোখ মোছে।
ভালো রে ভালো, হাসি দেখলেই ভালো, সেন্টু ভুলেও বলবে না যে মা তাকে দেখে কাঁদছিলো। ফোনে বৌকে বলতে সেও বারণ করলো। এই এখুনি শুরু হয়ে যাবে বোনেদের হা হুতাশ। কেন, কাঁদছিলো কেন? আরো কি কিছু বলতে চেয়েছিলো মা? কই আমাদের দেখে কাঁদলো না, আর তোকে দেখেই কান্না পেলো, এইসব নানা প্রশ্নে জেরবার হতে হবে। তার থেকে এইই ভালো, জবা দেখেছে মা ফিকে হাসছিলো।
তবে মা এক হপ্তায় গেল না। ছেলেমেয়েদের যা বলার ছিলো, বলা হলো, আবার হলোও না, কিন্তু যেন মায়া কাটাতে পারলো না। দেখা করে আসার পরদিনই কথা বলা বন্ধ হয়ে গেলো, জ্ঞান নেইই প্রায়, মা মা বলে অনেকক্ষণ ডাকলে উঁ বলে সাড়া দিতো। নার্সিং হোম থেকে বললো, নিয়ে যান। আমাদের আর কিছু করার নেই। যে ক'টা দিন থাকবেন, বাড়িতেই থাকুন।
যেদিন মা শেষমেশ গেল, সেদিন প্রচন্ড বৃষ্টি। সন্ধেবেলায় জবা মায়ের ঘরে ছিলো আয়ার সঙ্গে। ভালোদি অজিতদাকে টিকেট কাটতে বলছিলো ফোনে। অনেকদিন তো হলো, অজিতের প্রস্টেট গ্ল্যান্ডের অপারেশনে আর দেরি করলে চলে না। বৌ ছেলের সঙ্গে সেন্টু পাশের ঘরে টিভি দেখছিলো। এমন সময় জবার চিল চিৎকার, ভালো দাদা, দেখে যা, মা কেমন করছে।
মায়ের সর্বাঙ্গ কাঁপছিলো, যেন ভুতে ঝাঁকাচ্ছে শুকিয়ে ছোট্ট হয়ে যাওয়া শরীরটাকে। প্রায় ন্যাড়া হয়ে যাওয়া মাথা থেকে পায়ের আঙুল অব্দি থির থির করে কাঁপছিলো, যেন ঝড়ের মুখে হলুদ পাতার উড়াল, যেন বিরাট দিঘিতে অনেকটা জায়গা জুড়ে জল ফুলে ফেঁপে উঠছে, কোঁচকানো ছোট ছোট ঢেউ, কী ঘন সেই আন্দোলন! তারপর ধুপ করে হঠাত সব থেমেও গেল। পরিশ্রান্ত শরীরটা সুতো কাটা ঘুড়ির মতো গোঁত্তা খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়লো জবার কোলে। পাছা আর কোমরের দগড়া দগড়া বেড সোরগুলো গভীর লাল চোখ মেলে দেখতে লাগলো বিছানা ঘিরে ধরা হতভম্ব মানুষগুলোকে।
বাড়িতে মারা গেলে কোনো ডাক্তার ডেথ সার্টিফিকেট দিতে চায় না। নার্সিং হোমে ভালো চেনাশুনো হয়ে গিয়েছিলো, কয়েক লাখ টাকা তো নিয়েইছে। ওদের পুরনো রোগি, তাই ওদের এম্বুলেন্স এসেই নিয়ে গেল। বডি আর ওপরে তুলতেও হলো না। অন ডিউটি ডাক্তার এসে স্টেথো লাগিয়ে বললো, একটু অপেক্ষা করুন, রাউন্ড থেকে এসে সার্টিফিকেট ইসু করছি।
অপেক্ষা তো করতেই হবে, সেন্টু ভাবে,তবু মফস্বলে এই মুখ চেনাচিনিগুলো হয় বলে বাঁচোয়া!
মায়ের বডি নিয়ে সেন্টু যখন ফিরে এলো তখন রাত দেড়টা। মফস্বলে সুবিধে যেমন অসুবিধেও তার থেকে কম নয়! পাশের বাড়ির মেসোমশাই বারান্দা থেকে হেঁকে বললেন, কি হে সেন্টু, বডি এখন এই দুপুর রাত্রে ঘরে ঢোকাবে নাকি?
-বৃষ্টি হচ্ছিল বলে বাড়িতেই নিয়ে এলাম, মেসোমশাই। এতো রাতে বৃষ্টির মধ্যে ডোম পাব না। নার্সিং হোমেই শুনলাম ইলেক্ট্রিক চুল্লিটা খারাপ হয়ে আছে।
- তা বেশ করেছো। কিন্তু মৃতদেহ একবার ঘরের বাইরে বার করলে ফের তা ঢোকাতে নেই। মৃত তাতে প্রেতযোনি প্রাপ্ত হয়ে বাসস্থানেই আটকে থাকে। তার সমূহ কষ্ট হয়।
গেটের সামনে থেকেই সেন্টু তাকিয়ে দেখলো বৌয়ের মুখ বারান্দার আলোতে ছাইয়ের মতো সাদা। তার ভগবানে আর ভুতপ্রেতে অগাধ বিশ্বাস। বাঁ হাতে, কোমরে কমসে কম চারটে মাদুলি। এদিকে মেসোমশাই শুধু পুজো আচ্চাই করেন না, হাত দেখা, কোষ্ঠি বানানো, সবেতেই সিদ্ধহস্ত। পাড়ায় লোকে খুব মান্যিগণ্যি করে। সেন্টুর কাচুমাচু ভাব দেখে উনি নিজেই সদয় হয়ে সমাধান দিলেন,
-আমার কথা যদি শোনো বাপধন, আর চার পাঁচ ঘন্টা তো মোটে, তোমরা বডি ঘরের বাইরেই রাখো। একজন না একজন ছুঁয়ে বসে থাকো, তাহলে ঐ আকাশপথে সতত যারা বিচরণ করছেন, তারা কেউ মৃতদেহে প্রবিষ্ট হতে পারবেন না। আর হ্যাঁ, মাথার কাছে একটি প্রদীপ জ্বেলে রেখো।
জবা মৃদু আপত্তি করেছিলো, মা কে শেষবারের মতো ভেতরে নিতে পারব না! নিজের বাড়িতে, নিজের ঘরে ঢুকবে না মা! সেন্টু কড়া চোখে গলা নামিয়ে বললো, তুই তো চলে যাবি মুর্শিদাবাদ। আমাকে এ পাড়ায় থাকতে হবে রে।
ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘ আকাশে, ঠান্ডা হাওয়া। পায়ের নিচে মাটি প্যাঁচপ্যাঁচ করছে। গেটের পাশে মায়েরই পোঁতা শিউলি গাছের নিচে মায়ের ছোট্ট হয়ে যাওয়া দেহটা বৃষ্টির ভয়ে পলিথিনে মুড়িয়ে রাখা হলো। নিম পাতা দাঁতে কেটে, লোহা আর আগুন ছুঁয়ে সেন্টুকে মাঝখানে রেখে দুই বোন ঘেঁষাঘেঁষি করে বসলো আরেকটা পলিথিনের টুকরোর ওপরে। জবার আঙুল মাকে জড়ানো পলিথিনের ফাঁকে মায়ের হাঁটু ছুঁয়ে আছে প্রেতযোনি প্রাপ্তি আটকাতে।
খুব বিড়ি খেতে ইচ্ছে করছিলো সেন্টুর, একটা ঝাঁজালো বিড়ির তার খুব দরকার ছিলো। কিন্তু শ্মশানে লাশ না নেওয়া অব্দি মেসোমশাইয়ের কড়া নজরবন্দী সে, এটা সেন্টু ভালো করে জানে। এদিকের জানালাটা একটু ফাঁক করে তিনি সারা রাত পাহারা দেবেন, এটা ধরেই নেওয়া যায়। তাই ছোটবেলার মতো লক্ষ্মী হয়ে বসে রইল তিন ভাইবোন। এর কনুই ওর কনুইয়ে খোঁচা দিচ্ছিলো, ওর ভাঁজ করা হাঁটু এর পা ছুঁয়ে যাচ্ছিলো। পরস্পরের শরীরের ওম পেতে পেতে ভাইবোনেরা নিঃশব্দে একই প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছিলো একে অন্যের দিকে, ভালোদি তোকে সেদিন মা কী বললো রে? আর জবা তোকে? আর তুই বলবি না বুঝি, মা তোকে সবশেষে কী বলে গেলো?
প্রথমে শুধু জিজ্ঞাসা, তারপর অনুনয় বিনয়, শেষে রীতিমতো নিঃশব্দে তুমুল ঝগড়া করছিলো তারা। বেশি খোঁচা লাগলে, অন্যের হাঁটু কেউ সজোরে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিচ্ছিলো, কনুই দিয়ে ঠেলছিলো আর মনে মনে সারাক্ষণ চলছিলো ছোটবেলাকার মতো ঝগড়া, যা যা তোকে চিনতে বাকি নেই... ভালো মানুষের মতো মুখ করে থাকবি কতো... তুই, তুই বলছিস এ কথা...আরে তোকে সেদিনই চিনেছি যেদিন তুই…।
তিনজনের বেদম ঝগড়া চলছিলো, অস্থির নড়াচড়ায়, পা বদলে বসার অস্বস্তিতে মাটিতে মৃদু কাঁপন হচ্ছিলো নিশ্চয়ই, যা শুধু পিঁপড়ে আর মৃতেরা টের পায়। কারণ জবা দেখছিলো শিউলি গাছের গোড়া থেকে লম্বা পিঁপড়ের সারি উঠে আসছিল মোড়ানো পলিথিনের দিকে। মায়ের পা যেখানে সে আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে ছিলো সেখানটায় যেন অদ্ভুত এক দানা উষ্ণতা জমাট হয়ে আছে। ছেলেমেয়েদের এই নিঃশব্দে কথা কাটাকাটির পরও মা সম্পূর্ণ ঠান্ডা হচ্ছে না কেন! তার কী আরও কষ্ট পাবার ইচ্ছে, আরও এই কুৎসিত কথাগুলো শোনবার ইচ্ছে? সবটাই মনের ভুল জবা জানে, তবু মাথার ওপরের কালো মেঘের টুকরোটি মায়ের পলিথিনের ওপর সশব্দে দু এক ফোঁটা বৃষ্টি ঝরিয়ে দিলে ছেলেমেয়েরা সবাই চমকে উঠলো! এই রে, এবার কি ঘন্টার পর ঘন্টা এখানে বসে ভিজতে হবে! সেন্টু উঠে গিয়ে গ্রিলে আওয়াজ করে ঘরের ভেতরে জেগে থাকা বৌকে বললো তিনটে ছাতা আর বৃষ্টিতে প্রদীপ নিভে গেলে জ্বেলে রাখার মতো একটি টর্চ যেন সে আলগোছে বারান্দার নীচে নামিয়ে দেয়।
পাশের জায়গাটা খালি হতেই জবার দিকে কোন শূন্য থেকে হু হু হাওয়া ছুটে এলো। সে কেঁপে ঝেঁপে উঠলো, মনে পড়ে গেল দশ বছরের বড় দাদা তাকে ছোটবেলায় ছাতার নিচে কোলে তুলে স্কুলে নিয়ে যেতো পাছে ভেজা ফ্রকে তার ঠান্ডা লাগে। বার বছরের বড় ভালোদি জ্বরের সময় অপটু হাতে জলপটি দিতে গিয়ে তার গলার কাছটা ভিজিয়ে ফেলেছিলো বলে মা তাকে এক চড় মেরেছিলো। আবার তিনজনের জন্মদিনেই আর কিছু না হোক একবাটি পায়েস রেঁধে মা সামনে বসিয়ে খাওয়াবেই। মায়ের সেই পরিতৃপ্ত স্নেহকাতর মুখ মনে পড়তে জবা আর নিজেকে সামলাতে পারলো না, হু হু করে কেঁদে উঠলো। মাঝের শূন্যতা পেরোতে গিয়ে মাথা অনেকটা ডাইনে ঝুঁকিয়ে পলিকে বললো, তোদের সঙ্গে আর ঝগড়া করব না রে ভালোদি।
সেকথা সেন্টুও শুনতে পেল, ছাতা নামাতে এসে তার বৌও। সে খুব অবাক হয়ে শাশুড়ির মাথার কাছে নিবু নিবু প্রদীপের দিকে তাকিয়ে বললো, তোমরা এতোক্ষণ ঝগড়া করছিলে নাকি!
সেন্টু ছাতা টর্চ তুলে নিতে নিতে বললো, ছাড়ো না, বাবা, সবকথা তোমায় বুঝতেই হবে নাকি !
*****
[পূর্ব প্রকাশিত: জলঘড়ি পত্রিকা]
লেখক পরিচিতি: প্রতিভা সরকার একজন ভারতীয় ঔপন্যাসিক এবং ছোট গল্পকার। অনুবাদ কর্মেও তিনি আগ্রহী। ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র এবং অধ্যাপক প্রতিভা নিজের পাঠ এবং পেশাসূত্রেই অনেক অনুবাদের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন। রতিভা সরকারের প্রথম উপন্যাস মানসাই। প্রকাশিত হচ্ছে আরও দুটি, রসিকার ছেলে এবং কমলেকামিনীর কিসসা। প্রবন্ধের বই মেয়েদের কথা এবং হননকাল। ছোট গল্প সংকলন ফরিশতা ও মেয়েরা, গুনিন ও বেলেহাঁস, শ্মশানবন্ধু, সদাবাহার।


1 মন্তব্যসমূহ
পড়তে পড়তে একের পর এক দৃশ্যগুলো যেন আমারই চোখের সামনে ঘটে যাচ্ছে মনে হচ্ছিল।
উত্তরমুছুনএত বাস্তবতা প্রত্যেকটা গল্পে কি করে ফুটিয়ে তোল, একটু বলবে দিদি?❤️❤️❤️❤️🙏