জয়শ্রী সরকারের গল্প: পিয়াইনে রাত্তির নেমে এলে মারিয়া আসে







।।১।।

চাঁদ তুই কার? ডাউকি, শিলং, জাফলং না আমার?’

মেনজপের এই প্রশ্নের উত্তর চাঁদ দেয়না। তবু সে এটা ওটা প্রশ্ন করেই যায়। এপাড়ে জাফলং, ওপাড়ে ডাউকি। মাঝখানে বয়ে চলেছে পিয়াইন। পিয়াইনের আসমানে দুলছে ঢলমল একখানা চাঁদ। কাঁসার থালার মত গোল। চারদিকে রোশনাই ছড়াচ্ছে। ডাউকি ব্রীজে বুদ হয়ে আছে সারিবাঁধা সোডিয়াম বাতি। ঝিকঝাক পাহাড়ি রাস্তা ঝুঁপ করে হারিয়ে গেছে শহরের বুঁকে। যেনো একটি ক্যানভাস, শহুরে বাবুদের ড্রয়িং রুমে যেমন থাকে। এমন রাতে মেনজপের পিয়াইন ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করে না। পিয়াইনের জলে চাঁদের আলো দেখে ভাবে, একটাই পৃথিবী, তার একখানা চাঁদ! ঐটুকু চাঁদের আলোর এত শক্তি, অথচ আমাদের কোন শক্তি নেই কেন! ওরা আমাদের সব নিয়ে যায় কেন!

মেঘালয়ের সীমান্ত ঘেষা জৈন্তা পাহাড়ের পাদদেশের এই রূপ সেই কতকাল ধরে সে দেখছে তবু আশ মিটেনা। বিয়ের কথাবার্তা চলছে মেনজপের। সনাতন সম্প্রদায়ে সমন্ধ করাতে চায় মেনজপের মা। কিন্তু এই পুঞ্জি ছেড়ে সে থাকবেটা কেমন করে! তাছাড়া মারিয়া, তার কি হবে! হৃদয় ভেঙ্গে আসে। পাহাড় চুইয়ে আসা ঝর্নার জল পিয়াইনের বুকে যে দোল দেয় তার চেয়ে লক্ষ কোটি গুন বেশি দোল যেন তার বুকে লাগে। এখনো বর্ষা নামেনি, পুঞ্জির পাড় ঘেষে পিয়াইন ছুটে গেছে ডাউকীর ব্রীজের দিকে। মেনজপ তিরতির জলে পা ডুবিয়ে সেইদিকেই হেঁটে যায়। জলের ছলাৎছলাৎ শব্দটি দোলনচাঁপার মত ঘোরমাখা। সেই ঘোরে ঘুরতে ঘুরতে মেনজপ রাতের ভাঁজ খুলে খুলে দেখে। রাতের ঘোর মেনজপকে উন্মাদের মত টানে। মেনজপ সেই টানেই সামনে ছুটে যায়।

পাথর খেঁকোরা না ঘুমানো পর্যন্ত পিয়াইনের জাদুময় এই সুর শোনা যায়না। ওরা সারাদিন পিয়াইনের হৃদপিÐ খুঁড়ে পাথর খাবলে নেয়। বোমারুর মেশিনের ধারালো দাঁত পাথর পিষে চূর্ণবিচুর্ণ করে দেয়। মৃত পাথরে কোটি টাকা ঘরে তোলে মহাজন। মুনাফাখেকো বণিকের গোলায় হিরা মুক্তা জহরত। আর শ্রমিক কেবল একথালা গরম ভাতের আশায় খেটে মরে। পাথর টেনে টেনে শ্রমিকের হাতে ফোসকা পড়ে পেকে গলে শক্ত কালোমতন হয়ে যায়। নিশ্বাসে পাথরকণা ঢুকে শ্বাসটানে ভোগে। বাজারে দরবেশ পাগলার দশ টাকার তাবিজ ছাড়া ইনহেলার কেনবার টাকা ওদের কোনদিন হয়না। অথচ সকাল সন্ধ্যা ওরা খেটে মরে। এই যে পাথর খুঁড়ে খুঁড়ে শেষ করে দিলে, তাতে শ্রমিকরা পেল কি? এই আদিবাসী জনপদ, পিয়াইন, চাঁদ, তারা, আকাশ, শ্রমিকেরই তাতে কি! পিয়াইনই বা কি পেল? আর এই যে খাসিয়া পুঞ্জিটি কেবল ক্ষয়ে যাচ্ছে পিয়াইনের গর্ভে!

কত ভাবনা আসে মেনজপের মনে, কিন্তু কোনটারেই সুরাহা হয় না। নূড়িপাথরে চলতে থাকা তিরতির জলপথ ধরে সে পিয়াইনে ঘুরে বেড়ায়। রাতের বিরহী কুজনে মারিয়ার স্মৃতি মনে পড়ে। কোন এক জোছনা রাতে মারিয়াকে নিয়ে মেনজপ পিয়াইনে ঘুরে বেড়াবে। মেনজপের গড়িয়ে দেয়া রূপার নূপূরে পা দোলাবে মারিয়া। আলতা পরা পায়ে টলমল পিয়াইনে পা দোলাবে। পিয়াইনের জলে সে আলতা রঙ ছড়াবে। দুজনে মিলে সারারাত জোছনা দেখবে।

মেঘ কেটে কেটে চাঁদ উড়ে উড়ে যায়। মেনজপ একটি পাথরের উপর বসে। এই পাথর এপাড়ের সাথে ওপাড়ের বিচ্ছেদ ঘটিয়েছে। সেই বিচ্ছেদ টিকিয়ে রাখার ব্রত নিয়ে দুইজন সিপাহী এখনো ডিউটি করে যাচ্ছে। ওদের কাজই পাহাড়া দেয়া। জাফলং ঘুরতে আসা দর্শনার্থীরা যখন আনন্দে খেই হারিয়ে জল পাথরে মাতোয়ারা হয়ে সীমানা ভুলে যায়। ওরা বারবার বাঁশি বাজিয়ে সর্তক করে।

‘নেহি নেহি। রুখ যাও! বর্ডার আছে।’

কিসের বর্ডার কিসের কি! দর্শনার্থীরা আত্মহারা হয়ে ভাসতেই থাকে। তারাও বাঁশিতে হুইসেল বাজাতেই থাকে। সন্ধ্যা নেমে এলে দর্শনার্থীরা ঘরে ফিরে। পিয়াইন থিতু হয়। লাল-নীল-হলুদ-বেগুনি গাড়িবহর ডাউকি থেকে ঝুলন্ত ব্রীজ দিয়ে শিলংয়ের কোন এক শহরপানে সাঁইসাঁই ছুটে যায়। কেবল ওরা দাঁড়িয়ে থাকে। পালা বদল করে আসে যায়। আয়রণের মত কঠিন হৃদয় নিয়ে, বাঁশি ও রাইফেল হাতে দাঁড়িয়ে থাকে।

কোন কোন রাতে ওরাও ক্লান্ত হয়। টলমলে চাঁদের ঘোরে পড়ে। সেই সুযোগে এপাড় ওপাড় একপাড় হয়ে যায়। পিয়াইনে রাত্তির নেমে এলে ওদেরও মন কেমন করে। ওরাও জলের আলিঙ্গন প্রার্থণা করে। চাঁদের আলোর ছটায় দেখতে পায় দূর গাঁয়ে কুঁড়ে ঘরে অপেক্ষায় বসে থাকা মায়ের মুখ। ওদেরও প্রিয়সীর জন্যে মন পোড়ে। ইস্পাতের মত মুখখানি তখন নরম হয়ে আসে। সাইরেন, রাইফেল ভুলে নিশাচর পাথরের সঙ্গে ওরাও আলাপ জুড়ে। সীমানা নির্দেশক পিলারে বসে মনের কথা ভাসিয়ে দেয় পিয়াইনের বুকে।

‘স্যার ইন্ডিয়ান বিড়ি আছে? দেওনা একটা খাই।’

পাতার বিড়ি মেনজপের খুব প্রিয়। ওদেরও প্রিয় মেনজপের গান। প্রহরী একখানা পাতার বিড়ি বাড়িয়ে দেয় মেনজপের দিকে। সে বিড়ি নিয়ে অভিবাদন জানায়। তারপর গলা ছেড়ে গান ধরে।

‘জিংইম জং উ ব্রিউ কা, লং জিং ফহউি,

শিসিন বা লাখা উ দেয় বান য়াপ..।’

গানের এক তাল ফাঁকে মেনজপ বয়াতির মত তর্জমা জুড়ে গানের। ‘মানুষের জীবন ঠিক একটা স্বপ্নের মতো। জন্ম নিলে মৃত্যুকে বরণ করে নিতেই হবে।’ মৃত্যুর কথা মনে হতেই সকলে আবেগঘন হয়। দূর গাঁয়ে রেখে আসা স্বজনের জন্যে মন কেমন করে তাদের। বাড়ির কথা মনে পড়ে। সেই কবে মায়ের হাতের শেষ রান্না খেয়েছিল! প্রিয়তম স্ত্রী, কন্যা বলেছিল তাড়াতাড়ি ফিরতে অথচ ছুটিই মেলা ভার! মেনজপের গান ওদের পোশাকী রুক্ষতাকে আত্মসমর্পণ করাতে বাধ্য করে। ওরা কাঁদে, হাসে। গানে স্মৃতিতে দুুখের রাত্রিতে ভেসে যায়। পিয়াইনের জলে বিচ্ছেদের সুর খেলা করে।দীর্ঘশ্বাস আর প্রণয়ের মিশেলে পাথর কেটে পিয়াইন হুসহুসসসস শশশশহহহ শশশশশশশব্দে কোথা থেকে কোথায় ছুটে চলে যায়।

রাত গভীর হলে ওদের জলসা ভাঙ্গে। মেনজপ উঠে দাঁড়ায়। তিরতির জলে যেন আলতা রঙের পা দেখতে পায়। মেনজপ দেখে মারিয়াও হেঁটে চলেছে তার পাশে। নির্জন রাতে পুঞ্জি ছেড়ে কোন খাসিয়া যুবতী কখনো পিয়াইনে নামবে না। আর মারিয়ার ঘরতো নিরালা পুঞ্জিতে। এখানে সে আসবে কেমন করে! মেনজপ এক আজলা জল নিয়ে নিজের চোখেমুখে ছিটিয়ে দেয়। এ ভ্রম, পুরনো বেশ, তবু পুলক জাগে মনে। আনন্দে সে আবারো সুর তোলে লা লা. . . লা . . .লা শিসিন বা লাখা উ দেন বাই ইয়াপ..।’

গানটি শেষ করে সে কেমন অস্থির হয়ে যায়। কি একটা খুঁজতে খুঁজতে আবার উল্টোপথে হাঁটা দেয়।

পানজুম থেকে মাতাল করা গন্ধ আসছে। পুঞ্জি ঘিরে আছে হু হু করা আঁধার। ছায়াছায়া গাছের সারি আকাশ ছুঁইছুঁই। ঝিঁঝিঁ পোকার আলোতে হনুমানের ছায়া দোলে। পিয়াইন থেকে নকসিয়ার পুঞ্জিতে ঢোকবার দুপাশে সারিসারি পাম ও সুপারি গাছগুলো আঁধারে ঢাকা। গাছগুলোতে তরতর করে উঠে গেছে পানের বরজ। কাঁচা সুপারি আর পানের গন্ধে দিনশেষে পাখপাখালিরা মন খুলে গান গাইতে বসেছে। মেনজপ নিকুঞ্জ পথে পুঞ্জির দক্ষিণ দিকে যায়। কাঠ ও বাঁশের মাঁচায় বারান্দাসহ কুঁড়েঘরগুলো ঝিমিয়ে গেছে। ঐদিকের ঐ দুতলা কুঁড়েঘরটিতে মারিয়ার কাকা থাকে। শীতে মারিয়ার গাঁয়ে যখন কুয়ার জল অনেক নীচে নেমে যায়। ঐ খাড়া উচু পাহাড় থেকে নেমে জল সংগ্রহ করতে ভীষণ কষ্ট হয় মারিয়ার। ঐসময়ে সে এদিকে বেড়াতে আসে। আর এখন তো সে এখানেই থাকে।

সবুজ গাছগাছালি ঘেরা বাড়িটির সামনে জোসেফ লামিনের বুট মুড়ির দোকান। দোকানটি বন্ধ হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। কাজের বাইরে মেনজপ ঐ দোকানেই বসে থাকে। ছোলা মুড়ি খাওয়ার ছলে মারিয়াকে দেখে। দোকান খোলা থাকলে মারিয়া ঠিক একবার আসতো। সে জানে মেনজপ জুম পাহাড়ায় যাওয়ার আগে ঠিক একবার আসবে। কিন্তু ঘর থেকে ছিঁটেফোঁটা আলো বাইরে আসছে না, তার মানে মারিয়া ঘুমিয়ে গেছে। মেনজপের রাগ হয়, সে জুম পাহাড়ায় না গিয়ে বাড়ির দিকে হাঁটা দেয়।

কামিনি ফুলের সুবাস বইছে মেরি লামিনের বাগানে। পোষা টম ঘুমুচ্ছে বসে দরোজায়। মানুষের গন্ধ পেয়ে সে চোখ মেলে তাকায়। লেজ নাড়ায়। ঘেউ ঘেউ করে ছুটে আসে। মেনজপ বেঁড়ার ফাঁক দিয়ে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। টম খুশিমনে লেজ গুটিয়ে ফিরে যায়। মেনজপ বাড়ির দিকে হাঁটা শুরু করে। লালসবুজ রঙের কাঠের বাড়িটি তাদের।

সিঁড়ি বেয়ে সে উঠে যায়। ঘরে আইহুন লামিন ঘুমাচ্ছিল। পাশেই ছেলের জন্য খাবার ঢাকা দেয়া। পাশে বাতি জ¦লছে। মেনজপ খাবার থালাটা নিয়ে বারান্দায় এসে বসে। থালায় ভাত শুটকি আর শূকরের মাংস রাখা। খিদে পেয়েছিল অনেক। তাই হাত পা না ধুইয়েই খাওয়া শুরু করে। শুটকির গন্ধে টনি উঠে আসে। মেনজপ থালা থেকে একটু শুটকি আর মাংস ওর সামনে দেয়। এরপর এটাসেটা নিয়ে অভিযোগ দেয়া শুরু করে। টনি মেনজপের ছোটবেলার সাথী। বংশ পরম্পরায় টনি এই বাড়ির সৈন্য। এই রাত্রিতে দুটো খাওয়ার আদুরে সে লেজ নেড়ে নেড়ে মেনজপের মনের দুঃখ শুনে।

‘তুই বল টনি, মারিয়ার সাথে বিয়ে দিলে মায়ের সমস্যা কি? আমি সনাতনি ধর্মই মানবো, ও খ্রিস্টান ধর্ম মানুক। তুই মাকে বুঝিয়ে বল। অন্যকোথাও বিয়ে করবোনা আমি!’ টনি লেজ নেড়ে নেড়ে যেন মেনজপকে আশ্বাস দিল। মেনজপ খুশিতে গুনগুন করতে থাকে। টনি কিছুক্ষণ মেনজপের কোলে লুটোপুটি খেয়ে আবার সিঁড়ি বেয়ে নেমে যায়।

হঠাৎ মেনজপ দেখে ঝলমলে লালনীল বাতিতে জ¦লে উঠেছে উঠান। মারিয়া দাঁড়িয়ে আছে। পরনে একটা ধবধবে সাদা গাউন। মেনজপ ভাতের থালাটি রেখে ছুটে যায় ঘরে। লাল মখমলে জড়ানো জরির পাগড়িটি নিয়ে সে বের হয়ে আসে। এমন সময় ঘর থেকে মা মেনজপকে ডেকে ওঠে।

মেনজপ মেনজপ. . . যেয়োনা

মেনজপ আঁতকে উঠে। সে ছুটে গিয়ে মারিয়াকে জড়িয়ে ধরে। এরপর মায়ের ভয়ে প্রিয়তমাকে নিয়ে দৌড় দেয় পিয়াইনের দিকে। সিঁড়ি ভাঙ্গার শব্দে আইহুন ঘুমচোখে এসে বারান্দায় দাঁড়ায়। অন্ধকারে তার একমাত্র সন্তান দৌঁড়ছে চিলতে পুঞ্জির পথে। ডেকেও কোন লাভ নেই, তাই একখানা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে আবার ঘরে গিয়ে শুইয়ে পরে। এপাশ ওপাশ করে। ঘুম আসেনা। বোমারু মেশিন যেনো তাঁর স্মৃুতি খুঁড়ে খুঁড়ে বেদনা জাগায়।

।।২।।

ছয় বছর আগের কথা।

বর্ষায় পিয়াইন থৈথৈ করছে। পাহাড়ি ঢলে বেলায় বেলায় বাড়ছে জল। এরমধ্যে দর্শনার্থী কমে গেছে। গেছে সপ্তাহেই যেখানে ঘুরে বেড়ানো গেছে, জল পাথরে বসে রাত দেখা গেছে সেখানে এখন স্রোত। বিশাল পাথরগুলো ডুবে গিয়েছিল জলের গহীনে। বর্ষনের দেখা পেয়ে পুঁঞ্জির রূপ উছলে পড়ছে। ব্যস্ততা বেড়েছে খাসিয়াদের। নতুন জুমের জমি পরিস্কার হচ্ছে, পতিত জমিতে চারা রুইছে, পাকা পানজুম পাহাড়া চলছে। মেনজপের বাঁশের ব্যাংকটি পয়সায় ভরে গিয়েছে। সবমিলিয়ে হাজার সাত টাকা।

মারিয়াকে একজোড়া রূপার নূপূর গড়িয়ে দিবে মেনজপ। মেনজপ সনাতনধর্মী, মারিয়া খ্রিস্টান। তাই শুরুতে আইহুন লামিনের অমত ছিল। কিন্তু একরোখা ছেলে, মারিয়াকে ছাড়া বিয়ে করবেনা। মারিয়ার মা মারা গেছে ছোটবেলায়। ঘরে সৎমা, তাই বিয়ের পর মেনজপ চাইলেই মায়ের কাছে থাকতে পারবে। মারিয়াও রাজী নকসিয়ার পুঞ্জিতে এসে থাকতে। ছেলেকে কাছে রাখার সুযোগ থাকায় অবশেষে আইহুন না রাজী মতন করে রাজী হয়।

ফসল ঘরে উঠলেই ধুমধাম করে বিয়ে হবে। দোআঁশ মাটির জমি ভরা থোকা থোকা পান। গত ভাদ্রে পানজুম করা হয়েছিল। আসছে আশি^ন। মেটে সবুজ পাতা গাঢ় হচ্ছে। পশ্চিমের পানজুমটির বয়স আড়াই বছর, এবার ঘরে পান উঠবে। রাজার ঘর মম করবে পানে। সকলেই লাভের খুশিতে দিনরাত কাজ করছে। পারিশ্রমিক মিলবে, উৎসব হবে। আধাঁরে কচি পানপাতার পাশ দিয়ে হেঁটে হেঁটে মেনজপ কল্পনা করে তার বিয়ের কথা। হ্যাডম্যানের কাছে আড়াই বছরের পারিশ্রমিক জমেছে। জমানো টাকায় সে মায়ের ঘরের পাশেই আরো একটি ঘর তুলবে। ওখানেই মারিয়ার সাথে সংসার গুছাবে সে।

স্বপ্ন বুনে বুনে মাস গরায়। আম-কাঁঠালের সিজন চলে যায়। দারুন বর্ষা শেষে পিয়াইন শান্ত হয়। আকাশে শরৎ আসে। শরতের আকাশে সাদা মেঘ ভেসে বেড়ায়। দূরের বনে কাশফুল ফোটে। পানজুম মম করে পানপাতায়। দূরের শহর থেকে খাসিয়াদের জীবন দেখতে আসে বাঙালীরা। খাসিয়ার পল্লীর তেমাথার মোড়ে রিকশা অপেক্ষা করে দর্শনার্থীদের জন্যে। চুক্তিমতে গ্রাঁম, রাজার বাড়ি, পানজুম দেখিয়ে দর্শনাথিদের আবার ঘাটে ছেড়ে দিয়ে আসে। পানজুমে এসে সকলে ছবি তোলে। ফসলের আনন্দে খাসিয়ারা অতিথিদের পান সুপারি খাওয়ায়।

পান তোলার দিন আসে। মাসের শেষ বৃহস্পতিবার, দিন ভালো। ঐদিন থেকে পান রাজার গোলায় উঠবে। গাঁ জুড়ে খুশির বন্যা। হেডম্যানের বাড়িতে দিনরাত চুলা জ¦লছে। চায়ের হাড়ি নামছেই না। এছাড়া, কৃষকদের খাওয়া দাওয়া। আর মাত্র একটি রাত। বুধবার দুপুরে হ্যাডম্যান সকলকে ডাকলো।

‘ শোন সবাই, আজকের রাতটা ভালো করে ঘুমিয়ে নাও। কাল থেকে বিশ্রাম নেই।’ হেডম্যানের চোখেমুখে বিজয়ের উল্লাস।

কৃষক ওয়ানফ্রাং জিজ্ঞাসা করে, পানজুম পাহাড়ায় তাহলে কারা থাকবে?

হেডম্যান পানজুম পাহাড়ার জন্য দশজনকে ঠিক করে দেয়। সকলে একসাথে রাত জেগে শক্তি ক্ষয়ের প্রয়োজন নেই। এরপর কোনদিকে কে থাকবে, কারা পান বাঁছবে, কোনদিকে পান রাখা হবে ইত্যাদি বিষয় ঠিক করে রাখে। ফসলের আনন্দে সকলে সুখে ভাসতে থাকে।

ভালোয় ভালোয় ফসল তুলে মারিয়ার সাথে জীবন শুরু করতে পারলে দেবতা উবøাই নাংথউকে পূজা দেওয়ার মানত করে মেনজপ। এরপর রাতের খাবার খেয়ে জুম পাহারায় চলে যায়। যারা পাহাড়ায় যায়না তারাও সেদিন তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে যায়। ঘুমানোর আগে পোষা কুকুরদের বেশি বেশি খাবার দিয়ে নেয়। ওরাও খেয়ে দেয়ে পাহাড়ায় বসে। গ্রামবাসী নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে যায়।

প্রহরে প্রহরে পানজুমে বাঁশিবাজে। মধ্য আকাশের চাঁদ ধীরে ধীরে হেলে পড়ে। ঝিঁঝিঁ পোকার পাখায় শেষ রাতের বাতাস বয়ে যায়। আকাশে পূর্ণিমার ঝকমকে একটা চাঁদ। সুখের হাওয়ায় সকলে শান্তির ঘুমে তলিয়ে যায়। শেষরাতের দিকে হঠাৎ পুঞ্জির কুকুরগুলো উদভ্রান্তের মত ঘেউঘেউ শুরু করে। ঘুমে থাকা কৃষকরা বিরক্তি নিয়ে এপাশ ওপাশ করে। কিন্তু আকাশের পাখী, উঠানের কুকুর সমস্বরে ডাকতে থাকে। ওদের ডাকে সকলে হুরমুর করে উঠে বসে। গভীর অরণ্যের সাদামাটা মানুষ বুঝে উঠতে পারেনা, লাঠির চেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র নিয়ে মানুষ ঢুকে গেছে পুঞ্জিতে। কারো কোন প্রস্তুতিই নেই। যারা পাহাড়ায় ছিল তারাও প্রস্তুত ছিলোনা। তবু বিপদ বুঝে সকলেই লাঠিসোঠা, বল্লম, হারিক্যান নিয়ে পানজুমের দিকে ছুটে। পৌঁছতে পৌঁছতে সব নিস্তেজ হয়ে গেছে।

ধীরে ধীরে আঁধার কাটে। মৃদু আলোয় লন্ডভন্ড পানপুঞ্জী দেখতে অসুবিধা হয়না কারো। জুমের অর্ধেক পানগাছ উধাও। এদিক সেদিক লোকজন পড়ে আছে। মেনজপের মাথা থেকে রক্ত ঝরে জমে গেছে। সকলে ভেবেছিল মরেই গেছে। চারিদিকে কান্নাকাটি, আহাজারি। সকালে থানাপুলিশ হলো, আহতদের হাসপাতালে নেয়া হলো। কিন্তু পানজুমে আর পান ফিরলো না। আর মেনজপ ফিরে এলো অবুঝ শিশুর মত হয়ে। দুই বছর অপেক্ষার পর মারিয়াকেও বিয়ে করে নিতে হয়েছে।

সেই থেকে অমন রাত দুপুরে ছুটে বেড়ায় ছেলেটি। বিরবির করে, গল্প করে, গানও গায়। সারারাত সে পিয়াইন আর মারিয়ার ঘোরে ঘুরে ঘুরে মরে। ছেলের তছনছ হয়ে যাওয়া জীবনের কথা ভেবে ভেবে এপাশ ওপাশ করে। নিরবে চোখের জল ফেলে আর মনে মনে ইশ্বরের কাছে অনুযোগ দেয়।

একা ঘরে অদৃশ্য পরমশক্তির সাথে কথা কয়। ‘কত দিন তো চলে গেলো। অথচ পুলিশ এখনো তাদের ধরতে পারলো না! এমনও হয় নাকি ইশ্বর!

*****

লেখক পরিচিতি: জয়শ্রী সরকার। জন্মতারিখ ১১ আষাঢ়। জন্মমাটি নেত্রকোনা জেলা। মা শংকরী ঘোষ ও বাবা ননী গোপাল সরকার। সমাজকর্মে স্নাতোকোত্তোর। বাংলাদেশ উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর একজন সাংস্কৃতিক কর্মী। একজন গবেষক ও কথা সাহিত্যিক।
 জয়শ্রীর প্রকাশিত গ্রন্থগুলো হলো-
কাব্য গ্রন্থ : শূন্যতা, অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০০৬, বইপত্র গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স।
গবেষণা গ্রন্থ: প্রান্তবাসী হরিজনদের কথা, জুন, ২০১২, অ্যাডর্ন পাবলিকেশন।
গবেষণাগ্রন্থ: বাংলাদেশের মূলধারার চলচ্চিত্রে সহকারী নারী অভিনয় শিল্পীদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার তুলনামূলক চিত্র, ২০১৭-২০১৮ অর্থবছর, বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ, তথ্য মন্ত্রণালয়।
উপন্যাস: অম্বা আখ্যান, অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৫, অ্যাডর্ন পাবলিকেশন।
ছোটগল্প গ্রন্থ: ফিরে আয় মাটির পুতুল অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৬, চিত্রা প্রকাশনী।
ছোটগল্প গ্রন্থ: উদ্বাস্তুদের মিছিল অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২২, চিত্রা প্রকাশনী।
ছোটগল্প গ্রন্থ: ইশ্বরকে বল দুখী ডাকছে ২০২৪, ডিসেম্বর, অনুপ্রাণন প্রকাশনী।














একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ