ইমতিয়ার শামীম, একাধারে গল্পকার, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট ও সাংবাদিক। তাঁকে স্বতন্ত্র ধারার লেখক হিসেবে ধরা হয়। তিনি যে আঙ্গিকে গল্প বলেন সেটি তাঁর একেবারেই নিজস্ব। বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর যেমনটা বলেছেন, “তিনি গল্প বলতে বলতে গ্রামের ইতিহাস বলেন, তিনি গ্রামের ইতিহাস বলতে বলতে দেশের ইতিহাস বলেন, দেশের ইতিহাস বলতে বলতে তিনি দেশের রাজনীতির অভিজ্ঞতা বলেন এবং দেশের রাজনীতির অভিজ্ঞতার কথা বলতে বলতে তিনি বড় দাগে সত্য ও মিথ্যার উদ্ভবের কথা বলেন, মিথের কথা বলেন, এবং মিথ কীভাবে সময়কে জড়িয়ে আছে সেই প্রতিক্রিয়ার কথা বলে ফের আমাদের তাঁর নিদির্ষ্ট উদ্ভাবিত গ্রামের মধ্যে ফিরিয়ে আনেন। শামীম, একপক্ষে বঙ্গীয়, কৃষিজ কিসসাকাহিনীকে আধুনিক করেছেন, অন্যপক্ষে দক্ষিণ আমেরিকা সৃষ্ট জাদু-বাস্তবতার দিকে অগ্রসর হতে অনীহা প্রকাশ করেছেন তিনি তাঁর ধরনে ঝগড়া করেছেন বঙ্গীয় বাস্তবতার সঙ্গে এবং বঙ্গীয় বাস্তবতার কলোনিয়াল আধুনিকতার সঙ্গে।” নিবিড় পাঠে তাঁর লেখাজোখায় এই সত্য পাঠক স্পষ্টতই অনুভব করেন। তাঁর প্রথম প্রকাশিত বইটি ছিল উপন্যাস, ডানাকাটা হিমের ভেতর ( ১৯৯৬)। প্রকাশিত অন্যান্য বই : আমরা হেঁটেছি যারা, চরসংবেগ, অন্ধ মেয়েটি জ্যোৎস্না দেখার পর, মোল্লাপ্রজাতন্ত্রী পবনকুটির, তা হলে বৃষ্টিদিন তা হলে ১৪ জুলাই, আমাদের চিঠিযুগ কুউউ ঝিকঝিক, মৃত্যুগন্ধী বিকেলে সুশীল সঙ্গীতানুষ্ঠান, নীল কৃষ্ণচূড়ার জন্মদিনে, শাদা আগুনের চিতা, অন্তর্গত কুয়াশায়, যারা স্বপ্ন দেখেছিল, গ্রামায়ণের ইতিকথা, ইত্যাদি। কথাসাহিত্যে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারসহ জীবনানন্দ পুরস্কার, লোক ও প্রথম আলো বর্ষসেরা বই পুরস্কার পেয়েছেন। পেয়েছেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সাহিত্য পুরস্কার। গল্পপাঠের পক্ষ থেকে ইমতিয়ার শামীমের সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ এবং সম্পাদনা করেছেন তৃণার তৃণা।
গল্পপাঠ:
১৯৯৬ সালে আহমদ ছফা আপনার প্রথম উপন্যাস ‘ডানাকাটা হিমের ভেতর’ নিয়ে তৎকালীন পত্রিকায় তাঁর কলামে মুগ্ধতা প্রকাশ করে লিখেছিলেন, “একদম আলাদা, নতুন …আমাদের মতো বুড়োহাবড়া লেখকদের মধ্যে যা কস্মিনকালেও ছিল না।” কালের নিয়মে আপনি আর নতুনের সারিতে নেই। কিন্তু অপরাপর লেখকের চেয়ে ‘আলাদা’ এই ব্যাপারটি কি আপনার লেখার ভেতর এখনও সক্রিয় আছে বলে মনে করেন?
ইমতিয়ার শামীম :
দেখুন, আমি আলাদা কি না, এখনও আলাদা আছি কি না, এই প্রশ্নের মীমাংসা আমাকেই কি করতে হবে? লেখককেই কি তা করে দিতে হয়? আমার তো মনে হয় না, কোনও লেখকের এই দায় রয়েছে। তার পরও প্রশ্নটি যে তুলেছেন, তা থেকে পরিষ্কার, আমার আলাদা থাকার বিষয়টি নিয়ে আপনার কিংবা আপনার পরিমণ্ডলের অনেকের সংশয় রয়েছে। আর সেই সংশয়ই এরকম একটি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। যাই হোক, একজন লেখককে এরকম অনেক আত্মদ্বন্দ্ব এবং বাইরের অনেক পরস্পরবিরোধী প্রতিক্রিয়ার মধ্যে দিয়েই লিখে যেতে হয়। এই মুহূর্তে আমার কবি শামসুর রাহমানের কথা মনে পড়ছে, যার শেষ জীবনের লেখালেখি নিয়ে, আলাদা কিছু হচ্ছে না বলে অনেককেই অভিযোগ করতে দেখেছি। তাঁর ‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতাটি বহুল পঠিত এবং নির্দ্বিধায় বলা চলে, আরও অনেক-অনেক দিনই সেটি পঠিত হবে। অথচ এটি কিন্তু ‘গতানুগতিক কবিতা’ হিসেবে অভিযুক্ত। সমর সেন, মাহমুদুল হক তো নতুন কিছু আর হচ্ছে না বলে লেখালেখিই বাদ দিয়েছিলেন। মজার ব্যাপার হলো, যাকে আমরা একদম আলাদা বলি, কালোত্তীর্ণ বলি, তাও কিন্তু প্রতিদিন পঠিত হয় না। আবার একেবারে গতানুগতিক ধাঁচের অনেক লেখাই যুগের পর যুগ টিকে আছে। অনেক আগে আমি ‘চরসংবেগ’ নামের একটি উপন্যাস লিখেছিলাম। তাতে একটি নারী চরিত্র ছিল, যার নাম এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না, কিশোরী বা তরুণী থাকার সময় তার ইচ্ছা হয় উজ্জ্বল আমিত্বের আস্বাদ নেয়ার। তার পর বয়স যখন বাড়তে থাকে, তখন তার মনে হতে থাকে, আমি হয়ে ওঠায়, আলাদা হয়ে ওঠায় কোনও কৃতিত্ব নেই, বরং সবার সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে দেয়াটাই সবচেয়ে কঠিন কাজ, সবার রঙে রঙ মেশাতে পারাটাই বড় ব্যাপার। এ ব্যাপারে আমি শুধু একটা কথাই হয়তো বলতে পারি, গল্পকারের গল্পটাই বলে দেবে, তার আলাদা হয়ে ওঠা কতটুকু অনিবার্য, কতটুকু কাঙ্খিত, কতটুকু সম্ভব। আর আমরা নতুন বাঁকের কথা বলি বটে, নতুন ভাষার কথা বলি বটে, কিন্তু মনে রাখা দরকার, সাহিত্যে সংরক্ষণশীলতার স্রোতটাই সবচেয়ে শক্তিশালী এবং সাহিত্যের প্রবহমানতাকে টিকিয়ে রাখতে রক্ষণশীলতার ভূমিকাও কম নয়।
গল্পপাঠ:
আপনার বাবা চৌধুরী ওসমান, ভাই ইকতিয়ার চৌধুরী, এবং আপদমস্তক লেখক জ্যেষ্ঠ ভাই জুলফিকার মতিন সাহিত্যসংশ্লিষ্ট মানুষ। বাড়ির এমন নিবিড় সাহিত্যবান্ধব পরিবেশের প্রভাবেই কি আপনার সাহিত্যজগতে পা রাখা? নাকি প্রথম থেকেই লেখক হবেন এমনটা ভাবতেন?
ইমতিয়ার শামীম :
আমার মা-বাবা এবং ১১ ভাইবোন সকলেরই এমন অনেক প্রতিভাদীপ্ত গুণ রয়েছে, যা মুগ্ধ হওয়ার জন্যে যথেষ্ট। তারা নিঃসন্দেহে আমাকে নানা ভাবে প্রভাবিতও করেছেন। তারা সকলেই যার যার ক্ষেত্রে সৃজনশীল, তবে তাদের যে গুণটি আমাকে সবচেয়ে মুগ্ধ এবং সবচেয়ে প্রভাবিত করেছে, সেটি হলো, তারা এমন খ্যাতি চাননি, যা তাদের ব্যক্তিগত জীবনের নির্জনতাকে ভেঙে ফেলবে। সাহিত্যজগতে পা রাখার ক্ষেত্রে সাহিত্যবান্ধব পরিবেশ, অনুপ্রেরণা, প্রেরণা এমন অনেক প্রসঙ্গই থাকতে পারে; কিন্তু সাহিত্যচর্চার বিষয়টি শেষ পর্যন্ত কিন্তু মনে হয়, এসবের কোনওটার ওপরই নির্ভর করে না। এমনকি আমার এও মনে হয় না যে, লেখক হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে প্রেরণা কোনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আমি আমার বন্ধুদের অনেককেই দেখেছি, বন্ধু ও প্রেমিকাদের তীব্র অনুপ্রেরণার পরও যারা লেখালেখিতে আর এগুতে পারেননি।
আর জীবনে আমি অনেক কিছুই হতে চেয়েছি। কখনও বরফবিক্রেতা, কখনও মার্বেল খেলে সারাদিন কাটিয়ে দেয়া বালক, কখনও ঘোড়সওয়ার, কখনও-বা ষাড়ের পিঠে বসে সেটার দাউদে আক্রান্ত ঘাড় ঠোকরানো দুঃসাহসী পাখি, কখনও বা স্পাই, কখনও সিনেমার পরিচালক-অভিনেতা... এরকম কত কিছু। লেখক হওয়াটা ছিল সেই তালিকার সবচেয়ে নিচে। আর সবচেয়ে ওপরে ছিল এই রাষ্ট্র-সমাজটাকে পাল্টে ফেলার মতো এক সংগ্রামী হয়ে ওঠা। বুঝতেই পারছেন, মানুষ যা ভাবে, তা আসলে কতটুকু হয়!
গল্পপাঠ :
লেখালিখিতে কেন এলেন? এই জগতে না এলে অন্য কোন পেশায় আগ্রহী হতেন?
ইমতিয়ার শামীম:
আমাদের দেশে লেখা তো কোনও পেশা নয়। অতএব এই জগতে না এলে অন্য কোন পেশায় আগ্রহী হওয়ার বিষয়টি অপ্রাসঙ্গিক। আর কেন লিখি, লেখালেখিতে কেন এলাম, এ জাতীয় প্রসঙ্গে আমাকে এর আগে আরও কয়েকবার বলতে হয়েছে। বার বার এই প্রসঙ্গে কথা না বলাই ভালো।
গল্পপাঠ:
আপনার ‘আমরা হেঁটেছি যারা’ উপন্যাসে ব্যক্তি এবং সমষ্টির সঞ্চারপথের মিলে যাওয়ার আখ্যানটিকে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
ইমতিয়ার শামীম:
বিশদ ব্যাখ্যার কিছু নেই। আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধের সময় শিশুকিশোর ছিলাম, সত্তর-আশির দশকের মধ্যে দিয়ে এসেছি তাদের কাছে আমার মনে হয় ব্যক্তি ও সমষ্টির বিষয়টি এমনভাবে জড়ানো যে, তা আমাদের পক্ষে আলাদা করা সম্ভব নয় এবং তা একইসঙ্গে আমাদের কাছে অব্যাখ্যাতও। আপনি নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন, আমাদের সময়ের দুজন বড় কথাসাহিত্যিক শহীদুল জহির ও মামুন হুসাইনের অনেক গল্প-উপন্যাসেও ‘আমরা’ একটি মূল কিংবা অন্যতম চরিত্র হিসেবে উপস্থিত‘আমি’ না; অনেক গল্পে আবার এমন এক ‘আমি’র দেখা মিলছে, যে আসলে ‘আমরা’রই মতো। গল্প-উপন্যাসের উদ্ভবের সঙ্গে নাকি ব্যক্তি বিকাশেরও সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু সময় ও কালের কারণেই আমার কাছে হয়তো সমষ্টিই ব্যক্তি হয়ে হাজির হয়েছে; যাকে ব্যক্তি বলে ভাবা হচ্ছে তাকে হয়তো আমি দেখতে পেয়েছি আমাদের সময়ের প্রতিপক্ষ হিসেবে- ব্যক্তিরই প্রতিপক্ষ হিসেবে।
গল্পপাঠ :
এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্রের নাম ‘তথাগত’, এটি অমরাত্মা বুদ্ধের একটি উপাধি, আবার অন্যদিকে এটির মাধ্যমে অবর্ণনীয় বা অনুধাবন করা যায় না এমন বোঝায়। এরকম একটি প্রতীকী নাম ব্যবহারের পেছনে আপনার নিজস্ব দর্শন নিশ্চয়ই কাজ করেছিল? সেটা জানার আগ্রহ হচ্ছে।
ইমতিয়ার শামীম :
আপনার মনে হতে পারে, এর পেছনে না জানি কত চিন্তা ও প্রস্তুতি আছি; কিন্তু আমি নিরুপায়, সত্যিটা হলো এর পেছনে তেমন কোনও দর্শন কাজ করেনি। ওই সময়টায় আমি ব্যক্তিগত জীবনে খুব টালমাটাল সময় পেরুচ্ছিলাম। একদিন অফিসে আনন্দবাজার পত্রিকা পড়তে গিয়ে সেটায় সুমনের ‘জাতিশ্বর’ বাজারে আসার বিজ্ঞাপন দেখতে পেলাম। আজিজ মার্কেটের নিচ তলায় তখন এক নারী উদ্যোক্তার একটি ক্যাসেট-সিডির দোকান ছিল। সন্ধ্যায় সেখানে গেলাম সেই ‘জাতিশ্বরের’ খোঁজে। তিনি তখন একটা বড় কার্টন খুলছিলেন। আমি বললাম, ‘জাতিশ্বর’ নেই? তিনি সোজা হয়ে দাঁড়ালেন এবং অবাক হয়ে বললেন, এটার কথা আপনি জানলেন কোত্থেকে? তার পর কার্টনের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, আমিই তো এখনও ওটার চেহারা দেখিনি। এইভাবে সেদিন আমি এই দেশে জাতিশ্বরের প্রথম ক্রেতা হলাম, প্রথম শ্রোতা হলাম। আমার ইচ্ছা ছিল ক্যাসেটটা বিশেষ একজনকে দেব। কিন্তু সেটা আর হয়ে ওঠেনি। জাতিশ্বর শুনতে শুনতে ‘তথাগত তার নিঃসঙ্গতা দিলেন অস্তরাগে’ মনের মধ্যে একেবারে গেথে গিয়েছিল। এর পর যখন ‘আমরা হেঁটেছি যারা’ লিখতে শুরু করলাম, তখন আপনাআপনিই ওই নামটা চিন্তায় চলে এসেছিল এর বেশি কিছু নয়।
গল্পপাঠ :
এই উপন্যাসে ব্যবহৃত ‘রাতবাহিনী’ বলতে কাদের বুঝিয়েছেন? এবং এই আড়াল বা রূপকের আশ্রয় নেওয়া কী নিছকই নিরাপত্তা জনিত?
ইমতিয়ার শামীম:
না, নিরাপত্তাজনিত কোনও ইস্যু এর সঙ্গে যুক্ত নয়। আর ‘রাতবাহিনী’ রূপকটি যে আমিই প্রথম ব্যবহার করেছি, তা-ও কিন্তু নয়। যাই হোক, বিভিন্ন দলে-উপদলে বিভক্ত হলেও শেষ পর্যন্ত যারা গোপন রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং আত্মগোপনে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন সাধারণভাবে তাদেরই রাতবাহিনীর সদস্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
গল্পপাঠ:
আমরা হেঁটেছি যারা’ উপন্যাসটিকে আপনি আপাদমস্তক রাজনৈতিক উপন্যাস বলবেন কি?
ইমতিয়ার শামীম:
কবি আবুল হাসানের একটা কবিতার কথা মনে পড়ল, ‘অসভ্য দর্শন’; তিনি লিখেছিলেন তিনি, ‘দালান উঠছে তাও রাজনীতি, দালান ভাঙছে সেও রাজনীতি/ দেবদারু কেটে নিচ্ছে নরম কুঠার, সেও রাজনীতি ...তীব্র এক বেদেনির সাপ খেলা দেখছি আমি, তাও কি রাজনীতি? আমার তো মনে হয়, মানুষগুলো শুধু মায়ের বেড়ে দেয়া ধোয়াওঠা রোয়া রোয়া ভাতের স্বপ্ন দেখেছিল, একটু হাঁটতে চেয়েছিল। একে রাজনীতি বলা হবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত পাঠকই না হয় নিক।
গল্পপাঠ:
একজন লেখকের রাজনীতি সচেতনতাকে আপনি কীভাবে দেখেন?
ইমতিয়ার শামীম:
একজন লেখক রাজনীতিকে ঘৃণা কিংবা অপছন্দ করতে পারেন, এড়িয়ে চলতে পারেন বা উপেক্ষা করতে পারেন; কিন্তু তার মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা না থাকলে লেখালেখি না করাই ভালো।
গল্পপাঠ:
’ইমতিয়ার শামীমের প্রায় গল্পই ছোটগল্পের সীমিত পরিসরের আঙিনাতে থেকেও উপন্যাসের যথাসুলভ গভীরতার সাথে খেলা করে।’ এই বক্তব্যের সপক্ষে আপনার মতামত জানতে চাই।
ইমতিয়ার শামীম:
হ্যাঁ, আমিও এরকম শুনেছি বইকি। তা ছাড়া ‘গ্রামায়নের ইতিকথা’র ফ্ল্যাপে কথাসাহিত্যিক প্রশান্ত মৃধাও বইটি সম্পর্কে লিখেছিলেন, ওটা ‘একই সঙ্গে ছোটোগল্প আবার উপন্যাসের বিশাল প্রেক্ষাপটের মাত্রাকে ছুঁয়ে গেছে’। এই ধারণার চিত্রকল্পটি কিন্তু বেশ চমৎকারই বলতে হবে। এটা সক্ষমতা নাকি অক্ষমতা, সে সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া গেলে হয়তো এ নিয়ে বিশেষভাবে চিন্তা করা যেত। আমি নিজেও বিশেষভাবে এই ধারণা সম্পর্কে, এর উপসংহার সম্পর্কে জানতে আগ্রহী। মানে শেষ পর্যন্ত গল্পটি কি উপন্যাসের এত বেশি গভীরতায় চলে যায় যে তার মৃত্যু ঘটে কিংবা সে নিখোঁজ হয়ে যায়? নাকি অনেক গভীরতার ইঙ্গিত দিয়েও সে শেষ পর্যন্ত আবারও নিজের সীমিত পরিসরে ফিরে আসে? গল্পটি কি এর ফলে পাঠের অযোগ্য হয়ে পড়ে? নাকি এসবের মধ্যে দিয়ে শেষ পর্যন্ত গদ্যের নতুন এক প্রকরণের জন্ম হয়? সেই প্রকরণ কতটা গ্রহণযোগ্য?
গল্পপাঠ:
আপনার গল্প অনেক পাঠকের কাছে নাকি খাপছাড়া মনে হয়, বিশেষ করে ‘গ্রামায়ণের ইতিকথা’র গল্পগুলো নিয়ে অনেক পাঠকই এমন অভিযোগ করেছেন– তার সপক্ষে আপনি কোনো যুক্তি দেবেন কি?
ইমতিয়ার শামীম:
খাপছাড়া কি না জানি না, তবে এমন অভিযোগ পেয়েছি, এগুলোকে ঠিক একই শিরোনামের নিচে কেন রাখতে গেলাম। কেউ কেউ আবার এটিকে উপন্যাসেরই আদল বলার পক্ষপাতি। যদিও সে ক্ষেত্রে চরিত্র ও কাহিনীর ধারাবাহিকতা না থাকার বিষয়টিকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে, তা বলা মুশকিল। এই শিরোনামের প্রথম গল্পটি ছাপা হয়েছিল সাপ্তাহিক ২০০০ পত্রিকায় ১৯৯৯ সালে। বইয়ে সেটি দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। প্রথম গল্প হিসেবে বইয়ে যেটি রয়েছে, সেটিই আসলে লেখা হয়েছে সবচেয়ে শেষে। ১৯৯৯ সালে আমি যে গল্পগুলো লিখেছি, সেগুলোর সবই বোধকরি এই শিরোনামের। আমি আসলে চেয়েছিলাম, মানুষের জীবনযাপন ও বসতিপত্তনের কিংবা স্থানান্তরিতহওয়ার বিষয়টিকে অবলোকন করতে। সেই হিসেবে শহরায়নও আসলে একধরনের গ্রামায়নই। এই শিরোনামের সর্বশেষ গল্পে আপনি নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন, ভয়ঙ্কর প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটছে, কেবল প্রাকৃতিক না মানবিক বিপর্যয়ও, নারী মা হতে পারছে না, পুরুষ তার পিতৃত্বের দাবি করতে পারছে না, কিন্তু তারা চাইছে কোনও না কোনওভাবে টিকে থাকুক মানব প্রজাতির ধারাবাহিকতা। বিপর্যয়ের মধ্যে দিয়ে তারা শুরুর বিন্দুতে ফিরে আসছে। আমি চেয়েছি, প্রতিটি গল্পের দুই বাক্যের মধ্যে যেমন, তেমনি পর পর দুটি গল্পের মধ্যেও পাঠকদের জন্যে চিন্তার পরিসর থাকুক। সেই পরিসর তিনি সৃষ্টি করবেন, নাকি এড়িয়ে যাবেন-সেটা একান্তই তার নিজস্ব ব্যাপার। হতে পারে, এটিই বিষয়টিকে কারও কারও কাছে খাপছাড়া করে তুলেছে।
গল্পপাঠ:
৬টি শিরোনামহীন গল্প নিয়ে ‘গ্রামায়ণের ইতিকথা’র মতো একটি বই প্রকাশের পেছনে আপনার ভাবনা কি ছিল?
ইমতিয়ার শামীম:
আমার মনে হয়, আগের প্রশ্নেই এর উত্তর দেয়া হয়ে গেছে। আর একটু সংযুক্তি হলো, বয়স তখন কম ছিল। দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা ও তাড়না ছিল। এরকমও তো করা যায়, এরকম ভেবেছিলাম। সঙ্গে সঙ্গে তা করেও ফেলেছিলাম। এখন হলে হয়তো দিনের পর দিন ভাবতাম। না, এমন নয় যে বিষয়টিকে নিঁখুত করার জন্যে সময় নিতাম। তাড়িয়ে তাড়িয়ে ভাববার যে আনন্দ, সেটার আস্বাদ পেতেই বিষয়টিকে ঝুলিয়ে রাখতাম। গত কয়েক বছর আগে থেকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক একটা উপন্যাসকে আমি এভাবেই ঝুলিয়ে রেখেছি, তাড়িয়ে তাড়িয়ে লেখার আস্বাদ নিচ্ছি।
গল্পপাঠ:
আপনার লেখালিখিতে গ্রাম বা গ্রামীণ জীবন নিয়ে একধরনের নস্টালজিয়া ঘুরে ফিরে আসে, – এই ধারণা কতটুকু সঠিক?
ইমতিয়ার শামীম:
নস্টালজিয়া তো কথাসাহিত্যের একটা স্বাভাবিক প্রবণতা। আপনার অজান্তেই আপনার লেখায় তা হাজির হবে। আমার কোনও কোনও লেখায় তো শহর ও মফঃস্বলের জীবন নিয়েও নস্টালজিয়া আছে। তবে আমাদের লেখায় গ্রামীণ জীবন নিয়ে নস্টালজিয়া অনেক উচ্চকিত, কারণ আমরা গ্রাম বা মফঃস্বল থেকে নগরে প্রতিনিয়ত স্থানান্তরিত হচ্ছি; কিন্তু নগর থেকে কেউ গ্রামে আসছে না। যদি সেরকম হতো, তা হলে দেখতেন নগর বা নগর জীবনকে নিয়েও নস্টালজিয়া ঘুরে ফিরে আসছে।
গল্পপাঠ:
কখনও কি এমন হয়েছে, কোনো একটি উপন্যাস/গল্পের সমাপ্তি টানতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়েছে, আবার কোনো লেখা অনায়াসেই সমাপ্তিতে পৌঁছে গেছে?
ইমতিয়ার শামীম:
হ্যাঁ, হয়েছে। কখনও হিমশিম খেতে হয়, কখনও অনায়াসেই পৌঁছে যাওয়া যায় তেমন হওয়াই তো স্বাভাবিক।
গল্পপাঠ:
কোন ধরনের লেখা চ্যালেঞ্জিং মনে হয়?
ইমতিয়ার শামীম:
আমি তো সব রকমের লেখালেখি করি না। আমার দৌড় গল্প-উপন্যাস পর্যন্ত। সব্যসাচী লেখকরা এ প্রশ্নের উত্তর ভালো দিতে পারবেন।
গল্পপাঠ:
কোনো লেখার সমাপ্তিতে কী ঘটতে পারে সেই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে না পারার কারণে লেখা ছেড়ে উঠে পড়তে হয়েছে?
ইমতিয়ার শামীম:
ঠিক এ কারণে নয়, তবে লেখা এগুচ্ছে না বলে অনেক লেখাকেই হত্যা করতে হয়েছে, অনেক লেখা অনেক সময় দীর্ঘ দিন ফেলে রাখতে হয়েছে। আমাকে, বলতে পারেন, ঘষামাঁজা করা লেখক; ভালো কিছু হয় না, বার বার ঘষামাজা করে ধুয়ে মুছে কোনও মতে পাতে তোলার উপযোগী করি আরকি। তাই হত্যার কিংবা পরিত্যক্ত করার ঘটনাই বেশি ঘটে থাকে।
গল্পপাঠ:
কখনও কি এমন হয়েছে, ঘুমোতে গেছেন, ঠিক তখন ভাবনায় কোনো প্লট এসে উপস্হিত হলো। সেরকম মুহূর্তে আপনি কী করে থাকেন?
ইমতিয়ার শামীম:
না, এরকম হয় না। ঘুমাতে যাওয়ার আনন্দ আমার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অবশ্য ধরুন, সন্ধ্যায় কি রাতের প্রথম দিকে লিখতে বসেছি, টানা লিখে যাচ্ছি, বিছানায় যাওয়ার সময় চলে এসেছে, এমন সময় আমার চোখে ঘুম আসে না।
গল্পপাঠ:
লেখালিখি, মূলতঃ উপন্যাস শুরুর প্রস্তুতি হিসেবে আপনি কি কোনো টুকরো ধারণা বা ছকের তালিকা তৈরি করে থাকেন?
ইমতিয়ার শামীম:
প্রথম দিকে যেসব উপন্যাস লিখেছি, সেগুলোর জন্যে এমন করতে হয়নি, করবার কথা মনেও হয়নি। এটা যে বেশ গুরুত্বপূর্ণ কাজ সেটা উপলব্ধি করি ‘অন্ধ মেয়েটি জ্যোৎস্না দেখার পর’ লিখতে গিয়ে। এখন মনে হয়, শুধু লেখা শুরুর প্রস্তুতি হিসেবে নয়, সেটিকে এগিয়ে নেয়ার জন্যেও টুকরো টুকরো ধারণার নোট নেয়া ভালো, চরিত্রগুলোর একটা তালিকা করে ফেলাও ভীষণ দরকারি।
গল্পপাঠ:
মানুষ হিসেবে আপনি নিজেকে কতটা সামাজিক জীব ভাবেন? লেখালিখিতে সেটি আদৌও কোনো ভূমিকা রাখে কি?
ইমতিয়ার শামীম:
আমাকে বোধহয় ঠিক সামাজিক জীব বলা যায় না। তবে আমার যারা বন্ধু, ব্যক্তিগত বন্ধু তারা তাদের আড্ডায় ও আয়োজনে আমার অংশগ্রহণ ভীষণভাবেই চান এবং আমার উপস্থিতি নিশ্চিতও করে থাকেন। আমি সামাজিক কি না জানি না, তবে তারা যে তাদের সামাজিক আয়োজনে ও আড্ডায় আমাকে মনে করেন, যেতে পারি বা না পারি আমাকে ক্রমাগত আমন্ত্রণ জানিয়ে থাকেন, তাদের ওই আন্তরিকতা নিঃসন্দেহে আমার বড় পাওয়া। আমি নিজে রাস্তার পাশে, ঘাটে, খোলা চায়ের দোকানে কিংবা টং দোকানে দাঁড়িয়ে-বসে সময় কাটাতে এবং কোনও কারণ ছাড়াই রাস্তায় মানুষের আসা যাওয়া দেখতে ভালোবাসি। আর ভূমিকার কথা যদি বলেন, আমার মনে হয়, লেখকদের সঙ্গে সময় কাটানোর চেয়ে অলেখকদের সঙ্গই আপনার লেখালেখিতে বড় ভূমিকা রাখে। আরেকটি কথা, লেখালেখি করতে গেলে আপনাকে কিন্তু খানিকটা অসামাজিকও হয়ে পড়তে হয়। আপনি এটা এড়াতে পারবেন না।
গল্পপাঠ:
কোন কোন লেখক আপনাকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছেন?
ইমতিয়ার শামীম:
যতদূর মনে পড়ে, জীবনের প্রথম আমি তিনটি বই উপহার পেয়েছিলাম তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় বড় ভাইয়ের কাছ থেকে। যেগুলোর মধ্যে ছিল কাজী আবুল হোসেনের ‘ডাক দিয়ে যায় সংগ্রাম’, এএফএম আবদুল জলিলের ‘সুন্দরবনের কাহিনী’ আর দেব সাহিত্য কুটিরের ওই বছরের পূজাবার্ষিকী ‘অনামিকা’। বইগুলো হারিয়ে গেছে, পুরানো বইয়ের দোকানেও পাই না, কিন্তু আমি এখনও খুঁজে বেড়াই। ‘ডাক দিয়ে যায়’ বইটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের কয়েকজনকে নিয়ে। আমার দুই ভাই সরাসরি সশস্ত্র যুদ্ধ করেছেন, বড় ভাই এক গেরিলা দলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে দেশের ভেতরে থেকেই পত্রিকা বের করতেন, সিরাজগঞ্জ শহর থেকে প্রেস নিয়ে গিয়ে স্থাপন করা হয়েছিল তখনকার বিবেচনায় দুর্গম এক গাঁয়ের জঙ্গলে। আমাদের পুরো পরিবারই কোনও না কোনওভাবে যুদ্ধে সম্পৃক্ত ছিলেন। আমি শিহরিত হতাম, উত্তেজিত হতাম, কখনও কাঁদতামও-আমার ভাই বোন কিংবা মা-বাবা কেউ মারাও তো যেতে পারতেন! বইটির লেখাগুলো পড়তে গেলে আমার ভাইদের কাছ থেকে শোনা রণাঙ্গণের বিভিন্ন যুদ্ধের ঘটনাও মনে পড়ত। কত বার যে পড়েছি ওই বই! ‘সুন্দরবনের কাহিনী’ বইটি বুঝতেই পারছেন, প্রকৃতির সঙ্গে বসবাসের এক আখ্যান। আর ‘অনামিকা’ ছিল নানা রকম গল্পের সমাহার। একসময় আমার ধ্যানজ্ঞান ছিল ওই তিনটি বই। জীবনে অনেক বাঁক বদল হওয়ার পরও কেন যেন মনে হয়, এই বইগুলোর প্রভাব আমার ওপর সবচেয়ে বেশি। কিছুদিন আগে আমি হঠাৎ পুরানো কাগজপত্রের মধ্যে কৈশোরে ছাপা হওয়া গল্পগুলোর একটা খাম পাওয়ার পর দেখলাম, দশম শ্রেণি থেকে ফার্স্ট ইয়ারের পড়ার সময়কালে আমি যেসব গল্প লিখেছি সেগুলোর ৪/৫ টিই মুক্তিযুদ্ধের গল্প। অবশ্য সচেতনভাবে যদি প্রভাব পড়ার হিসেবনিকেশ করতে যাই, তা হলে হয়তো প্রভাব মূল্যায়নের উপসংহার অন্যরকম হবে। যেমন, আমার সংগ্রহে অনেকের উপন্যাস ও বিভিন্ন বই আছে, কিন্তু রচনাসমগ্র আছে মাত্র তিনজনের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অমিয়ভূষণ মজুমদার ও সৈয়দ মুজতবা আলীর। মনে হয় না, তাদের ভাষা-ফর্ম আমাকে প্রভাবিত করে, কিন্তু মনে হয় তাদের আদ্যোপান্ত পড়া আমার জন্যে ভালো। আবার একটা মাত্র উপন্যাসের কথা যদি বলতে বলেন, তা হলে প্রথমেই আমার মনে আসবে মানিকের ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’র কথা। কিন্তু এটাই বা আমি অস্বীকার করি কী করে যে, নিকোলাই অস্ত্রভস্কির ‘ইস্পাত’ আমার মধ্যে জীবনযাপনের একটা আদর্শবোধ তৈরি করে দিয়েছিল? মর্তুজা বশীরের ‘আলট্রামেরিন’ কিশোর আমাকে যত কাঁদিয়েছে, আর কোন বই কাঁদাতে পেরেছে তেমন করে?
গল্পপাঠ:
আপনার লেখার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কোনটিকে চিহ্নিত করতে চাইবেন স্মৃতিকাতরতা না কি বর্তমানমুখীতা?
ইমতিয়ার শামীম:
আমাকে, যতদূর জানি, সমসময়কে নিয়ে লেখার দায়ে অভিযুক্ত করা হয়ে থাকে। এইসব বিচারবিবেচনার দায়িত্ব মনে হয় সাহিত্যের সমালোচকদের হাতেই ছেড়ে দেয়া ভালো।
গল্পপাঠ:
অনেক লেখক প্রতিটি বইয়ে সম্পূর্ণ নতুন কিছু করার চেষ্টা করেন। এবং অনেক লেখক যে কৌশলটি তার পক্ষে সহজসাধ্য সেটাই চেষ্টা করেন। আপনি কোনটির পক্ষে?
ইমতিয়ার শামীম:
সহজসাধ্য কিংবা কঠিন, যেটিই হোক না কেন, নিশ্চয়ই যে কৌশলটি আপনার লেখার সঙ্গে যায়, ভাবনার সঙ্গে যায়, সেটাকেই ব্যবহার করা উচিত। আপনার যদি মনে হয়, আপনি বিষয়গুলোকে পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে এগুতেই হচ্ছে এমন এক পথে যে, পরিভ্রমণটাকে সহজ-সরলভাবে উপস্থাপনের কোনও সম্ভাবনা বা সুযোগ নেই, তাহলে আপনাকে জটিল পথেই হাঁটতে হবে। আপনি নিজেই রক্তাক্ত হবেন, ক্ষত বিক্ষত হবেন। আর আপনি রক্তাক্ত হবেন, ক্ষত বিক্ষত হবেন, অথচ পাঠক হবেন না, তা তো হয় না। তাকেও হতে হবে। নতুন কিছু করার নামে অহেতুক কৃত্রিমতা সৃষ্টির মানে হয় না, আবার পাঠক আপনাকে দুর্বোধ্য ভাববে, এই ভয়ে কাহিনী বা বিষয়টা বলার জন্যে আপনার হৃদয়ে যে ভাষাভঙ্গি তৈরি হয়েছে তাকে পরিত্যক্ত এবং অস্বীকার করারও মানে হয় না। কোনও কিছু পড়তে যাওয়ার মানেই কিন্তু কোনও না কোনওভাবে কৃত্রিম কথকতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হওয়া, পাঠকেরও সেটা জানা আছে তিনি নিশ্চয়ই শেষ পর্যন্ত আপনার ওপর অবিচার করবেন না। যদি করতেন, তা হলে মধুসূদন, বঙ্কিমরাও অপঠিত থেকে যেতেন। তখন কিন্তু কথ্য ভাষার সঙ্গে লিখিত ভাষার দূরত্ব আরও বেশি ছিল। বাংলায় জনসমাজে প্রচল শব্দও অনেক অবহেলিত ছিল।
গল্পপাঠ:
কঠিন ও জটিল জিনিসগুলো খুব সহজ শৈলীতে না লিখে কিছুটা ঘুরিয়ে লেখার প্রবণতা আপনার মধ্যে লক্ষ্যণীয়–এটি কি সচেতনভাবে করে থাকেন না কি আপনার সহজাত প্রকাশ ভঙ্গিটিই ওরকম?
ইমতিয়ার শামীম :
এর আগের প্রশ্নের উত্তরেই এ নিয়ে বলা হয়ে গেছে।
গল্পপাঠ:
পে্শাগত জায়গায় আপনি লেখালিখি কেন্দ্রিক বাতাবরণের ভেতর থাকেন– এই অবস্হানকে আপনি কীভাবে কাজে লাগিয়ে থাকেন?
ইমতিয়ার শামীম:
অনেকেরই ধারণা, সংবাদপত্রে আমি বোধহয় সম্পাদকীয় কিংবা সাহিত্য বিভাগে কাজ করি; যে কারণে লেখালেখি কেন্দ্রিক বাতাবরণেই থাকি। কিন্তু আমার মূল কাজের জায়গা নিউজ ম্যানেজমেন্ট টিমে। এই অবস্থানকে লেখালেখির কাজে লাগানো আসলে কঠিন। আমরা যন্ত্রের মতো অসংখ্য নিউজ পড়ি, নিউজের খোঁজ করি, কোনটার গুরুত্ব কতটুকু তা যাচাই করি এবং তা খুব দ্রুত গতিতেই করি। আজকের ভাবনা নিউজ ম্যানেজমেন্ট টিমে আগামীকালের জন্যে ফেলে রাখার উপায় নেই। সাহিত্যে এমন যান্ত্রিকতার সুযোগ নেই। আমি জানি, আপনি গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের প্রসঙ্গ টানতে পারেন। যিনি বলেছিলেন, যত দিন যাচ্ছে, ততই তার এই বিশ্বাস দৃঢ় হচ্ছে যে, সাহিত্য ও সাংবাদিকতার মধ্যে সম্পর্ক খুবই নিবিড়। কিন্তু আমাদের এটাও মনে রাখতে হবে যে, সাংবাদিকতার পেশায় তাঁর এমন একটি সময় ছিল যখন তাঁর চিন্তাভাবনাকে সংবাদপত্রের স্বার্থে প্রবাহিত করতে হতো। কথাটি তিনি নিজেই বলেছেন। বলেছেন, কেবলমাত্র একজন ঔপন্যাসিক হিসেবে সামগ্রিক স্বাচ্ছন্দ্য পাওয়ার পরও তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়েছে নিজের পছন্দসই ও ভাবনার অনুরুপ বিষয় নিয়ে কাজ করা।
গল্পপাঠ:
একজন পাঠক হিসেবে হারুকি মুরাকামি অন্যান্য লেখকের লেখা পাঠের মাধ্যমে যেসব বিষয়গুলো জ্ঞাত হন বা শিখে থাকেন, তাঁর লেখালিখির সময় সেগুলো নিজের লেখায় ঢুকে না যায় সেব্যাপারে খুব সচেতন থাকেন– এক্ষেত্রে আপনি কী পন্থা গ্রহণ করে থাকেন?
ইমতিয়ার শামীম:
হারুকি মুরাকামির আগেও বিভিন্ন লেখক এরকম করেছেন। লেখক যত সচেতন হয়ে ওঠেন, ততই নিজের জায়গাটিকে আলাদা করতে চান কিংবা নিজের অজান্তেই আলাদা হয়ে যায়।
গল্পপাঠ:
পাঠকের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া কতটা উপভোগ করেন?
ইমতিয়ার শামীম:
শুধু পাঠকের সঙ্গে কেন, একজন লেখককে তো সবার সঙ্গের মিথস্ক্রিয়াই উপভোগ করতে হয়। আলাদাভাবে পাঠকের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া উপভোগ করার অনেক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও আছে। যেমন, আপনার মধ্যে পাঠকপ্রিয় হওয়ার লোভ জেগে উঠতে পারে এবং আপনার লেখার বিষয়বস্তু, ভাষাভঙ্গি থেকে শুরু করে সব কিছুই তার ইচ্ছাপূরণের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে। পাঠক আপনার ব্যক্তিগত জীবনে এসে হাজির হতে পারেন। পাঠকের ইচ্ছা থেকে আপনি কিভাবে আত্মরক্ষা করবেন, তার আকাঙ্খার চাপকে কতটা দক্ষতার সঙ্গে খর্ব করবেন এবং নিজের মধ্যে জেগে ওঠা লেখাটিকে নিজের মতো করে এগিয়ে নেবেন, তার ওপর নির্ভর করছে পাঠকের মিথস্ক্রিয়া আপনি কতটা উপভোগ করবেন।
গল্পপাঠ:
লেখক হিসেবে আপনাকে যদি অন্তর্মুখী বলা হয়, আপনি তার সঙ্গে সহমত হবেন না কি দ্বিমত পোষণ করবেন?
ইমতিয়ার শামীম:
যে মুহূর্তে আপনি লেখার জন্যে কাগজে কলম চালালেন কিংবা কম্পিউটারের কি-বোর্ডে চাপ দিলেন, তখন থেকেই তো আপনি বহির্মুখী হতে থাকলেন! লেখকের অন্তর্মুখী হওয়ার সুযোগ কোথায়? বড়জোর তার বিষয়বস্তু কিংবা চরিত্রগুলো অন্তর্মুখী হতে পারে। তেমন বিষয়বস্তু কিংবা চরিত্র বোধহয় আমার লেখায় একটু কমই আছে। অবশ্য লেখকের অন্তর্মুখিনতা বলতে যদি আপনি সভা-সমিতি, বিবৃতি-সাক্ষাৎকার দেয়া, ফেসবুকে নিয়মিত পাবলিক পোস্ট দিয়ে জাতির বিবেক হয়ে ওঠার প্রচেষ্টা ইত্যাদি বিষয়গুলো থেকে দূরে থাকাকে বুঝিয়ে থাকেন, তা হলে অন্য কথা। সে ক্ষেত্রেও কিন্তু কোনও না কোনও সময় লেখককে নিজেকে, নিজের অবস্থানকে সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করতে হয়। বুদ্ধদেব বসুর মতো সাহিত্যিকও কিন্তু সোমেন চন্দের মৃত্যুর পর এত আত্মপীড়নে পড়েছিলেন যে, ঘটনাটির প্রতিবাদে একটি কবিতা লিখে ফেলেছিলেন। আসলে শেষ পর্যন্ত অন্তর্মুখী থাকার সুযোগ তার নেই বললেই চলে।
গল্পপাঠ:
লেখক মুরাকামিকে এক সাক্ষাৎকারে প্রশ্ন করা হয়েছিল– আপনার কাছে দেশ ও জনগণ, এই দু-টি জিনিসের মধ্যে পার্থক্য কী? উত্তরে তিনি বলেছিলেন– পাঠক আমার বই কেনেন, দেশ নয়, একই প্রশ্ন যদি আপনার কাছে রাখা হয় আপনার উত্তর কি হবে?
ইমতিয়ার শামীম:
মুরাকামির উত্তরটা আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। তাঁর এ কথার মানে কি শেষ পর্যন্ত এই যে, দেশ যেহেতু আমার বই কেনে না এবং পাঠক যেহেতু কেনে, সেহেতু দেশ নয় বরং পাঠকই আমাকে বিলং করে? মানে কি এই যে, জনগণের সঙ্গে তার সম্পর্ক আছে কিন্তু দেশের সঙ্গে নেই? তিনি আন্তর্জাতিক, কিন্তু দেশ একটা গণ্ডিতে আবদ্ধ? উত্তরটা সত্যিই আমি বুঝতে পারছি না। তার পরও বলি, তাঁর ও আমাদের দেশ ও জনগণের পরিপ্রেক্ষিত ঢের আলাদা। লেখালেখির জগতে আমাদের অনেক নষ্ট সময়ের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। এখানে অনেক লেখককেই পাবেন, দেশ ও জনগণের কথা বলতে অজ্ঞান; কিন্তু তারা না জানেন দেশকে, না চেনেন জনগণকে। অনেক লেখকের ক্ষেত্রেই বলা চলে, পাঠক তাদের বই কেনেন না, কিন্তু রাষ্ট্র কেনে। মানে জনগণের টাকায় বই কিনে রাষ্ট্র সেসব বইকে বিভিন্ন প্রকল্পে কিংবা পাবলিক লাইব্রেরিতে গছিয়ে দিয়েছে, কিন্তু পাঠক তা ছুঁয়েও দেখেননি। একবার এক ঘাড়ত্যাড়া সরকারি কর্মকর্তা নাকি এক প্রকাশনীর একটি ব্যয়বহুল ক্রয়াদেশ অনুমোদন করছিলেন না; তাকে সঙ্গে সঙ্গে বদলি করে অনুমোদন করবেন এমন একজন কর্মকর্তাকে সেখানে নিয়ে আসা হয় এবং তিনি তা অনুমোদন করার পর তাকে আবারও পূর্বের মন্ত্রণালয়ে পূর্বের কর্মস্থলে নিয়ে ফিরিয়ে নেয়া হয়। এসব ঘটনা শুনলে মুরাকামি দৌড়াদৌড়ি করতে গিয়ে আচমকা মূর্তি হয়ে যাবেন।
গল্পপাঠ:
পাঠক হিসেবে কোন শ্রেণিটি আপনার লেখালিখির বিশেষ ভক্ত বলে মনে করেন–তরুণেরা না কি বয়স্ক পাঠকেরা?
ইমতিয়ার শামীম:
সেই ২০০৬ সালের দিকে আমি নারায়ণগঞ্জের একজন লিটলম্যাগ সংগঠকের কাছে শুনেছিলাম, তিনি বন্ধ হয়ে যাওয়া আদমজী জুট মিলের এমন একজন কর্মহীন শ্রমিককে চেনেন, যিনি আমার লেখা পড়েন এবং যার কাছে আমার তখন পর্যন্ত প্রকাশিত সব বই-ই আছে। আবার ইউরোপের কোনও সমুদ্র সৈকতে শুয়ে কেউ আমার বই পড়ছেন ফেসবুকে এমন পোস্টও আমার চোখে পড়েছে। এরকম অনেক পড়ুয়ার কথাই বলতে পারব, যাদের অস্তিত্ব, উপস্থিতি ও আমাকে গ্রহণ করার উদারতা আমাকে আনন্দিত করে। তবে ‘বিশেষ ভক্ত’ হওয়ার কারণে কেউ আমার লেখা পড়েন, সেরকম কখনো মনে হয় না। তা ছাড়া কেউ ভক্ত হলো তো, মনে রাখবেন, আপনার দুঃসময়ও চলে এলো; কারণ সে যাতে আপনার ভক্তই থাকে, সেজন্যে আপনাকে ২৪ ঘন্টাই ব্যতিব্যস্ত থাকতে হবে।
গল্পপাঠ:
বিশ্ববরেণ্য মনোবিজ্ঞানী কার্ল গুস্তাভ ইয়ুং বলেছেন, শিল্পী একটি ফর্ম সৃষ্টি করে খালাস, সেই ফর্ম নিয়ে কূটকচাল চালাবেন ব্যাখ্যাপরায়ণ ব্যক্তিবর্গ। অর্থাৎ সমালোচকদের ওপরই সেই দায়িত্ব বর্তায়। তাঁদের সেই দায়িত্ব অর্থাৎ সমালোচনাকে কীভাবে দেখেন?
ইমতিয়ার শামীম:
আমি সংক্ষেপে এটুকুই বলতে চাই, আমি যেমন এখন, তেমনি ভবিষ্যতেও পাঠকের কাছে সরাসরি যেতে চাই। পেছন ফিরে তাকালে দেখতে পাই পাঠকরাই আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন, বার বার বাঁচিয়ে তুলেছেন। আমাদের সেতুবন্ধন তৈরির জন্যে তৃতীয় পক্ষের দরকার নেই। সমালোচকরা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু লেখকদের পক্ষ থেকে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভাবার কারণ আছে বলে মনে হয় না।
গল্পপাঠ:
‘আপনার লেখালিখি কমিক রিলিফের অনুপস্থিতির জন্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বলা যায়, আনন্দময় ও প্রফুল্লতার মুহূর্তও খুব বেশি থাকে না।’ পাঠকের এমন মতামতের কী ব্যাখ্যা দেবেন? এই প্রবণতা কি আপনার লেখালিখির বিশেষ কাঠামোগত শৈলী?
ইমতিয়ার শামীম:
গবেষকরা এ সম্পর্কে ভালো বলতে পারবেন।
গল্পপাঠ:
কষ্টস্বীকার করে উত্তরগুলো লিখে পাঠিয়েছেন, গল্পপাঠের পক্ষ থেকে সেজন্য আপনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ।
ইমতিয়ার শামীম:
গল্পপাঠকে ধন্যবাদ এবং শুভেচ্ছা।
*****
[লেখকের বানানরীতি অক্ষুণ্ন রাখা হয়েছে]


3 মন্তব্যসমূহ
প্রশ্ন ও উত্তর খুব ভালো লেগেছে।
উত্তরমুছুনপ্রশ্নকারী খুব ভালো প্রশ্ন সাজিয়েছেন।
এরপরও--
“বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর তাঁর একটি লেখা শুরু করেছিলেন এভাবেঃ
ভাষা তো তৈরি করে কমলকুমার…………
ভাষা তো তৈরি করে অমিয়ভূষণ………
ভাষা তো তৈরি করে ইমতিয়ার শামীম…….“।
কাজেই সেই ভাষা তৈরির কারিগরের কাছ থেকে এ নিয়ে দুয়েকটি কথা শোনার ছিল ।
প্রশ্ন উত্তর খুব ভালো লেগেছে। প্রশ্নকারী খুব ভালো করে প্রশ্নগুলো সাজিয়েছেন।বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর লিখেছিলেন,
উত্তরমুছুন’’শব্দ দিয়ে মানুষ কত কিছু তৈরি করে, যেমন কমলকুমার মজুমদার...
শব্দ দিয়ে মানুষ কত কিছু তৈরি করে, যেমন অমিয়ভূষণ মজুমদার...
শব্দ দিয়ে মানুষ কত কিছু তৈরি করে, যেমন ইমতিয়ার শামীম...’
এ বিষয়ে কিছু শুনতে চাইতাম।
প্রশ্ন উত্তর খুব ভালো লেগেছে। প্রশ্নকারী খুব ভালো করে প্রশ্নগুলো সাজিয়েছেন।বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর লিখেছিলেন,
উত্তরমুছুন’’শব্দ দিয়ে মানুষ কত কিছু তৈরি করে, যেমন কমলকুমার মজুমদার...
শব্দ দিয়ে মানুষ কত কিছু তৈরি করে, যেমন অমিয়ভূষণ মজুমদার...
শব্দ দিয়ে মানুষ কত কিছু তৈরি করে, যেমন ইমতিয়ার শামীম...’
এ বিষয়ে কিছু শোনার ছিল।