উৎসাহ গোবরারই বেশি। খ্যাংরাকাঠি চেহারা। চেক লুঙ্গির উপর চেক জামাটা চাপিয়ে নিলে দেখতে লাগে সব্জি ক্ষেতের কাকতাড়ুয়া। তবু দাপটে সেই ওস্তাদ। শুধু আজ নয়। সব দিন। সব কাজেই লখাই সর্দারের ছায়াসঙ্গী হয়ে পাড়া দাপানো তার স্বভাব। তবে আজ তার উৎসাহটা একেবারে মাত্রাছাড়া, কতদিন হয়ে গেল পাড়ায় যায়নি। যাবে কী! পাড়াই তো বসল চার-পাঁচ বছর পর। এতদিন ইচ্ছা থাকলেও পাড়া বসানোর সাহস পায়নি জঙ্গলের কোলে বেড়ে ওঠা মানুষগুলো। সবসময় আতঙ্কের ঘেরাটোপে আটকে ছিল। কাটাচ্ছিল অনিশ্চিত দিন। কখন কার গুলি এসে ঢুকে যায় কার বুকে-মাথায়! তার মাঝে পাড়া বসানোর মতো বিলাসী কলিজা ক’জনের থাকে!
তবে ইদানীং চিত্রটা পাল্টেছে। শঙ্কা ঝেড়ে আশ্বস্ত হতে চাইছে কেউ কেউ। তারই ফল হল আজকের পাড়া। অর্থাৎ মোরগ লড়াইয়ের মাঠ। তাই গোবরার ধৈর্য তর সইচে না। তিড়িংবিড়িং পা ফেলছে। নাচতে নাচতে ছুটছে লখাই সর্দারের আগে আগে।
হামল!
চিরলগাছের গোড়ায় মাদার-আঁকড় ঝোপটার কাছে আসতেই আচমকা হুংকার শুনে চমকে উঠল গোবরা। ধক করে উঠল বুকটা। পাঁশকাড়া খোলার মতো পানশে হনু উঁচু মুখের রং গেল হুস করে উড়ে। এতক্ষণের উৎসাহটাও মুহূর্তের মধ্যে উধাও।
থমকে ঢোক গিলল লখাই সর্দারও। বগলের ঝোলাটাকে চেপে ধরল। ঘাড় ঘোরাতে গেল শ্বাস আটকে। কিন্তু তার আগেই ঝোপটার আড়াল থেকে বেরিয়ে এল কানাই সিংসর্দার। দু’হাতে তালি দিতে লাগল। নাচতে নাচতে বলল,
হে-হে-হে– ডরাঁইচে, ডরাঁইচে! কাতকার ডরাঁইচে!
শালা হারামি!
বুকে আটকে থাকা শ্বাসটা হড়াস করে বেরিয়ে এল লখাই সর্দারের। সঙ্গে হুমুড়িয়ে বেরিয়ে আসতে চাইল গালাগাল। কিন্তু তা উচ্চারিত হওয়ার আগেই মনে পড়ল গুরু নিষেধাজ্ঞা,
ঘরল্যে বেমুখ করে বেরাঁই যাবি। পথে কারুর সঙে রা’টিঅ নাই কাড়বি। নাই ভালবি পেছন বেগে। তবে যাঁইয়ে চিঁইয়ান মন্তর কাজে লাগবেক। বুজলি, ন নাই বুজলি?
লখাই বুঝেছিল সবই। এতদিন সে-আদেশ পালনও করে গেছে অক্ষরে অক্ষরে। উঠোনের ঈশানকোণে পাতা ঠাকুরথান। সেখানে দণ্ডবৎ হয়েছে ভক্তিভরে। রাতের চিঁয়ান কাত অর্থাৎ ইস্পাতের ফলা, যা লড়াইয়ের সময় মোরগের পায়ে বেঁধে দেওয়া হয়, সেগুলো একে একে তুলে নিয়েছে লাল শালুর ন্যাকড়ায়। সাবধানে গিঁট দিয়েছে তাতে। ঝোলায় ভরেছে। আরেকবার ঠাকুরথানের পোড়ামাটির হাতি-ঘোড়াগুলোর দিকে তাকিয়েছে। তারপর বেমুখ হয়ে বেরিয়ে এসেছে। পথে কারো সঙ্গে রা’টি কাড়েনি। একেবারে পাড়ায় বুড়ো মহুয়াগাছটির তলায় বসেছে। ঝোলা থেকে বের করেছে কাতের পুঁটলি। ঠেকিয়েছে কপালে। তবে গিয়ে খুলেছে মুখ।
সেই কবের থেকে মোরগের পায়ে কাত বেঁধে আসছে লখাই। জয়, যাকে বলে পাহুড় দেওয়া, তাও দিয়েছে একের পর এক। কখনও কোনো বিপত্তি ঘটেনি। কিন্তু আজ হঠাৎ–
লখাইয়ের বুকটা ধড়াস করে উঠল। মনে মনে গুরুর মুখ স্মরণ করল। ক্ষমা চাইল। মনে মনেই বলল,
ক্ষেমা কর হে ঠাকুর, অপরাদ কিছু লিঅ নাই বাপ হামার! জানেবুজে কিছুই নাই করি হামি।
তবু দুরুদুরু কাঁপন থামল না বুকের। গলার ভেতরটা শুকিয়ে কাঠ। অসহায় দৃষ্টিতে চাইল গোবরার পানে। কিন্তু সে কিছু বলার আগেই কানাই কুঁকিয়ে উঠল,
এ কাতক্যার, হাজার কতক টাকা দ্যা ন। হামার ব্যাটাটাকে ছাড়াঁই আনি। দে মাইর, দে।
নোংরা খড়ি ওঠা হাতে ঝপ করে ধরে ফেলল লখাইয়ের হাতজোড়া। কাচুমাচু মুখে বলল,
কী ভাবচিস হে কাতক্যার? তর টাকা হামি মারে দুব? হামকে অমন লোক নাই ভাবিস বাপ! টাকা দিতে নাই পারি, হামার ব্যাটাল্যে তর বিটির বিহা দিঁইয়ে তর দ্যানা শোদ করব। ব্যাটা হামার চাকর্যা বটে হে! তর বিটি জলে নাই পড়বেক। দ্যা মাইরি, দ্য।
দু’হাতে কচলাতে থাকল লখাইয়ের দুই হাত। বিচলিত হয়ে উঠল লখাইয়ের মনে উঁকি দিতে চাওয়া উদ্বেগের কণারা। টানাটানি করে ছাড়িয়ে নিতে চাইল নিজের হাতজোড়া। তাকাল গোবরার দিকে। কিন্তু এবারেও গোবরা কিছু বলার সুযোগ পেল না। তার আগেই কানাই ছেড়ে দিল লখাইয়ের হাত। লাফাতে থাকল তিড়িংবিড়িং করে,
হে-হে-হে– ডরাঁইচে, ডরাঁইচে। কাতক্যার ডরাঁইচে।
হঠাৎ থামিয়ে দিল নাচ। থামিয়ে দিল হাতের তালি। চোখজোড়া যথাসম্ভব বড়ো করল। হাত উঁচিয়ে তাড়া মারল লখাই সর্দারকে,
কী হে কাতক্যার! বগলে কাতের ঝলা, তাও এত ডর! যা যা, লড়াই নাই লাগাবি? তর বাঁদা কাত ছাড়া কি আর লড়াই জমবেক? পাড়ার সোবাইয়েই যে তর লাগে হাঁ করে পথপানে ভালে বসে রইচে হে!
শালা, ডর দ্যাখাবার আর লোক নাই পালি!
এতক্ষণে মুখ খুলল গোবরা। পায়ের কাছে পড়ে থাকা চিরল ডালটা তুলে নিল হাতে। তেড়ে গেল কানাইয়ের দিকে। বলল,
দাঁড়া শালা, আজকে তরেই একদিন কি হামারেই একদিন!
হাঁ ভাল, নাই মারিস বলচি, নাই মারিস!
দু’পা পিছিয়ে গেল কানাই। দু’পা এগিয়ে গেল গোবরা। বলল,
ক্যানে, মাল্লে কী করবি রে ব, আঁ? শালা, দেখচিস কাত চিয়াঁইয়ে সাঙাত হামার পাড়াকে যাচ্চে আর তুই পথের মাঝেই দিলি ত অযাত্তা করে!
উঁ– অযাত্তা কীসের হে, আঁ? বলি, অযাত্তাটা কীসের বটে শুনি? কাত বাঁদবেক ত কতকগুলা নিরিহ পাখের পায়ে, তার আবার অযাত্তা!
তুই শালা খ্যাপাচাঁদি যাত্তা-অযাত্তার কী বুজিস রে? পালা বলচি, পথ ছাড়ে পালা। নাইলে ঠাঙ্গাইয়ে তর চাম ছাড়াঁই দুব।
হাতের ডালটা উঁচিয়ে গেল গোবরা। অমনি তিড়িং করে একটা লাফ দিল লখাই। হাঁক পাড়ল,
মরবি হে কাতক্যার, তরাও একদিন মরবি। কতকগুলা নিরিহ পাখকে লিজদের সঙে লড়াঁই দিঁইয়ে মজা লিচ্চিস! উয়ারাও যে তেমনি কতকগুলা হাবাগবা লোকের হাতে বন্দুক ধরাঁই দিঁইয়ে মজা লিচ্চে, ইটা নাই বুজিস? হামার ব্যাটাটাকে শ্যাষ করে ভাবেচিস তদের ভাল হবেক? তা নাই হবেক, ইটা হামি বলে রাখলি।
তবে রে!
ও-বো-বো-বো– মরবি হে কাতক্যার, তরাও মরবি। আর হামি বগল বাজাব– ও-বো-বো-বো–
কুলকুলি দিতে দিতে চোঁ-চাঁ দৌড় লাগল কানাই। সেদিকে তাকিয়ে হাতের ডালটা ফেলে দিল গোবরা। লখাইকে তাড়া দিল। বলল,
চল ত সাঙ্যাত। শালা, খ্যাপামি মারাতে আইচে হামার সঙে! খ্যাপা আছিস, লিজের ঘরে থাক গা যাঁইয়ে। চল সাঙাত।
কিন্তু গোবরার তাড়ায় কোনো সাড়া দিতে পারল না লখাই। নিথর দাঁড়িয়ে রইল। ধরার চেষ্টা করল খ্যাপা কানাইয়ের ইঙ্গিত। ছেলেটা মাস্টারি করতে গিয়ে খুন হয়েছে। কেউ বলে বনপার্টির কাজ। কেউ বা বলে হার্মাদদের, হার্মাদরা বলে সবুজ ভৈরবদের, ভৈরবরা বলে হার্মাদদের। এই বলাবলির জঞ্জাল সরিয়ে কাজটি যে ঠিক কাদের তা কেউ বের করতে পারেনি। তবু সকলে সান্ত্বনা দিতে চেয়েছে। পেতে চেয়েছে। শুধু কানাই কাউকে দেয়ওনি, নিজে পায়ওনি। এমনিতেই উদামাদা লোকটা তখন থেকে পথেঘাটে যাকে পায়, তারই পথ আটকায়। টাকা চায়। বলে, ছেলেকে ছাড়িয়ে আনবে। বলে, তার বিটির সঙ্গে ছেলের বিয়ে দেবে। বলে, বেকার নয়, চাকর্যা ছেলে তার ব্যাটা। কিন্তু তার সঙ্গে কাত বাঁধার কী সম্পর্কে! লখাইয়ের মাথায় ঢুকল না। শুধু মনজুড়ে কু-ডাকটা চেপে বসতে চাইল। একে অযাত্রা। তার উপর বাসি কাপড়ে ছুঁয়ে দিল কানাই। কী যে হবে!
লখাইকে চুপচাপ ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অবাক হল গোবরা। জিজ্ঞাসা করল,
কী হলেক হে সাঙাত! চল। উদিগে আবার বিলম্ব হঁইয়ে যাচ্চে ন! চল চল।
লখাইকে তাড়া দিল গোবরা। নিজেই এগিয়ে গেল দু’পা। কিন্তু তাতেও লখাইয়ের কোনো ভাবান্তর দেখতে পেল না। বলল,
আবার কী হলেক হে সাঙাত?
থমকে দাঁড়াল গোবরা। দেখল, শীতবেলার নরম রোদেও লখাইয়ের মুখ চকচক করছে ঘামে। তাতেই কাছে সরে এল গোবরা। বলল,
এ সাঙাত, কী ভাবচ বল ন? ই বাবা! উ শালা খ্যাপাচাঁদির কথাতে ঘাবড়াঁই গেলে নকি! ধুর, উয়ার কি মাথার কনু ঠিক রইচে! ব্যাটার শোগে শালা একবারেই পাগলাই গেছে। চল চল, নাই ঘাবড়াইঅ ত। পাহুড় তুমার পাবেকেই হে।
অন্যান্যবার সে-বিশ্বাস পুরোমাত্রায় থেকেছে লখাইয়েরও। পাড়ায় আসা লোকদেরও। কিন্তু আজ যে পথের মাঝেই অযাত্রা হয়ে গেল!
লখাই একটা দীর্ঘশ্বাস ভাঙল। তাকাল সামনের দিকে। টলমলানো দৃষ্টিটাকে ছুঁড়ে দিল পলাশ ঝাড়ে ঘেরা ডাঙার দিকে। নাঃ, পাখিগুলো চোখে আসছে না একটাও। শুধু এলোমেলো মাথা। মানুষের মাথা। কোনোটার বাবরি চুলে তামাটে গাব ধরা। কোনোটা আবার বিবর্ণ গামছায় পাগ বাঁধা। লখাই আনমনে পা বাড়াল পথের দিকে। সঙ্গে সঙ্গে কানে এসে ঢুকল– কুঁক-কুঁক-কুকড়ুচ্চু–
সঙ্গ নিল গোবরাও। কণ্ঠে উৎসাহ ছলকে দিল। বলল,
কেমন মিঠা ডাক বল ন সাঙাত! বাবারি, মনে লেয় জম্মকাল বাদে শুনলম ই-ডাক।
এদিক ওদিক ঘাড় উঁচাল গোবরা। সেভাবেই বলল,
লোক ত ভালোই হঁইচে মনে লিচ্চে। কিন্তুক জোড় কতগুলান আইচে–
শালা ই-ডাক ত গাঁয়ে হরদমেই শুনচিস রে ব!
মনে মনে গোবরার আগের কথাতে কথা যোগ করতে গেল লখাই। অন্যদিকে ঘোরাতে চাইল মনের গতিটাকে। কিন্তু মুখে কিছুই বলল না। বলবেও না। একবার যা হবার হয়েছে। আর নয়। গুরুর মানা। গোবরাও জানে সে-কথা। পাড়াতে না পৌঁছানো পর্যন্ত তার সাঙাত রা’টিও কাড়বে না। তবু ভাতভর্তি বল্কানো হাঁড়ির মতো বগবগিয়ে চলল আপন মনে,
ধর ক্যানে, গাঁয়ে ত ই-ডাক হরদমেই কত শুনচি। তবু পাড়ার পারা অমন মিঠা কভুঅ নাই লাগে, নকি বল সাঙাত?
জিজ্ঞাসা করল বটে। কিন্তু উত্তরের অপেক্ষা করল না। বদলে গুনগুনিয়ে উঠল একটা ঝুমুর গানের কলি নিয়ে– বছর বাদে বনের ধারে পাড়া বসিচে / এমন দিনে ঘরে বড় কুটুম আসিচে / আস কুটুম বোস ঘরে মালা পরাব হে / সাঁঝের বেলা তুমার লাগে কুঁখড়া মরাব হে...
গানের মাঝেই আবার শোনা গেল একটা মোরগের চিৎকার– কুঁক-কুঁক-কুঁকড়ুচ্চু–
একটার ডাক শেষ হতে না হতেই ডেকে উঠল আরও একটা। আরও একটা। আরও। আরও...
তাতেই ছলকে উঠল গোবরা। মোরগগুলোকে উদ্দেশ্য করে বলল,
আঃ, অত হড়বড় কীসের লাগে রে বাপ! টুকু আর তর নাই সইচে নকি! আসেই ত গেছি।
কথা ক’টা বলতে বলতেই পলাশ ঝোপে ঘেরা পাড়ার ডাঙায় পা দিল গোবরা। লখাই সর্দারের সঙ্গে কোমর ভেঙে হাতে তুলে নিল ধুলো। ঠেকাল কপালে। তিনবার। তারপরই খুশির ঝিলিক তুলল। হাঁক পাড়ল,
আসে যা সোব, আসে যা। অস্তাদ কাতক্যার আসে গেছে।
গুঞ্জনের একটা দোলা হালকা চালে বয়ে গেল সারা পাড়ার উপর দিয়ে। লখাই সর্দার ড্যামরা মহুয়াগাছটার তলায় নিজের নির্দিষ্টি জায়গায় বসল পাছা পেতে। কাতের ঝোলাটা ঠেকাল কপালে। বিড়বিড় করল,
দেখিস মা বনবুড়ি, মুখ রাখিস মা, মুখ রাখিস। সোব অপরাদ মাজ্জনা করিস মা।
নামাল ঝোলাটা। বের করল লাল শালুর পুঁটলি। তার গিঁট খুলল। কাতগুলো একে একে গুনতে গেল। অমনি চনমন করে উঠল উদ্বেগের কণারা। ভ্রূজোড়া কুঁচকে গেল। দশটা কাতের একটা নেই। থান থেকে তোলার সময় গুনে নেওয়ার কথা মনে আসেনি। এখন হঠাৎ নিজের উপর বিরক্ত হতে গিয়েও কুঁকড়ে গেল রাগটা। সব অলক্ষণের লক্ষণ। কাতগুলো হাতে নিয়ে লখাই সর্দার মনে করার চেষ্টা করল, রাতে চিঁয়ানোর সময় দশটাই ছিল কিনা। কিন্তু মনে আসার আগেই লখাইকে ঘিরে গোল হয়ে দাঁড়াল ভিড়টা। একজন কোলের মোরগটার গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে এগিয়ে এল। বসল উবু হয়ে। বলল,
লে অস্তাদ, জবরদস করে বাঁধ ন অস্তরটা।
লখাই সর্দার ভাবনায় পড়ে গেল। কী করা উচিত! কাত বাঁধা তো যে-সে কম্ম নয়। মনে ভক্তি থাকা চাই। শুদ্ধ রাখা চাই নিজেকে। জোর থাকা চাই চিঁয়ানো মন্ত্রে, যার তেজে মোরগরা হয়ে উঠবে একে অপরের শত্রু। যারা ছিল জাতভাই, তাদের সঙ্গেই মেতে উঠবে মরণ-মারণের খেলায়। এমন অবস্থা সৃষ্টি করবে, যাতে মারা, না হলে মরা ছাড়া অন্য উপায় না থাকে। লখাই সর্দার তাই বিশ্বাস করে। চিঁয়ানো মন্ত্রই পাখিগুলোর মনে ঢোকায় এ-মারণ বিষ। তারপরেও চাই মনের জোর। বিশ্বাসের জোর। কিন্তু আজ সেখানেই ফাটল ধরিয়ে দিয়েছে খ্যাপা কানাই। তখন থেকে ঘটনাগুলো যা ঘটছে– আবার গোটা পাঁচেক পাহুড় দিতে পারলেও পাঁচ ত্রিশে দেড়শো টাকা। আর পাহুড় না হলে খালি হাতেই ঘর। অথচ দশ নম্বর কাতটা যে কোথায় গেল! লখাই সর্দারকে চিন্তিত দেখে লোকটা আবার বলল,
কী হলে হে অস্তাদ! বাধ ন। ই শালা যে কোলে আর থাকতে নাই খুঁজে। এহ্! লড়ব্যার লাগে একবারেই হাঁকপাকাঁই গেছে হে, আঁ!
হঁ, এই য বাঁদি।
দোনামনা করেও পাহুড়ের ত্রিশটাকার লোভ সামলাতে পারল না লখাই সর্দার। লাল শালুর ন্যাকড়া থেকে তুলে নিল একটা কাত। ঠেকাল নিজের কপালে। বন্ধ করল নিজের দু’চোখ। বিড়বিড়িয়ে স্মরণ করল বনবুড়িকে। আবার চোখ মেলল। কাত বাঁধল মোরগটার পায়ে। বিড়বিড়িয়েই চিঁয়ানো মন্ত্র আওড়াল। ধুলো তুলে দিল মোরগটার মাথায়। তিনবার। অমনি শিউরে উঠল মোরগটার শরীর। কুঁক কুঁক শব্দ করতে করতে চাইল এদিক ওদিক।
যা যা, হঁইয়ে গেছে। লড়াইয়ে নামা গা যা ইবারে।
আগ বাড়িয়ে তাড়া মারল গোবরা। মোরগ কোলে মাঠে ঢুকল লোকটা। ধুলো তুলে নিল নিজের মাথায়। দিল মোরগটার মাথাতেও। অন্যদিক থেকে একইভাবে ঢুকল আরেকজন। দু’জনেই মুখোমুখি হল। উপরদিকে তুলল মোরগদের। মুখোমুখি করল। তারপর ছেড়ে দিল মাঠে। অমনি মোরগ দুটো নিজের নিজের গলার পালক ফুলিয়ে ফুঁসতে লাগল। হঠাৎ অন্য মোরগটা ডানা ঝাপটে তেড়ে গেল লাল মোরগটার দিকে। নিজের ডানা ঝাপটে আক্রমণ সামলাল লাল মোরগটাও। উড়ে গেল অন্য মোরগটার উপর দিয়ে। সঙ্গে সঙ্গে অন্য মোরগটা চেঁচিয়ে উঠল– কুঁ-ক-ড়ু-চ–
দ্যা শালার বুকটা হাবড়াঁইয়ে। এ হে-হে-হে– পাশ কাটাই গেল যে রে ব। কানা বটিস নকি?
দাঁতে দাঁত ঘষে খেঁকিয়ে উঠল লাল মোরগটার মালিক। দু’চোখের দৃষ্টিতে লকলক করে উঠল লোভী হিংস্রতা।
লাগ-লাগ-লাগ– লাগ ভেল্কি লাগে যা–
এই সময় কোথা থেকে ছুটে এল খ্যাপা কানাই। গলা ফেড়ে চেঁচিয়ে উঠল,
বনপাটির সঙে হার্মাদ, হার্মাদের সঙে ভৈরব– তর ব্যাটার সঙে হামার, হামার ব্যাটার সঙে তর– মার, মার কাত শালার প্যাটটাতে।
এই খ্যাপা, চুপ দ্যা শালা! ঝোপ-ঝাড়েরঅ কান থাকে সে-কথা নাই জানিস? উ-সোব কথা নাই বলতে আছে রে ব!
একটা বুড়ো গোছের লোক ফিসফিসিয়ে সাবধান করতে চাইল কানাইকে। কিন্তু তাতে কান দিল না কানাই। দড়িবাঁধা মাঠের চারিদিকে দৌড়াতে থাকল। মুখের লালা ছিটিয়ে চিৎকার করতে থাকল,
মার শালার বুক হাবড়াঁই। যে মারবি সেই পাবি পাহুড়। ও-বো-বো-বো– হলই বা তর সাঙাত– তর জাতভাই! তবু মার, মার হারামিটাকে। নাইলে যে উ শালা তখে মারবেক রে! মারলেই পা-হু-ড়! আর মালিকের পাতে গরম গরম ঝোল। এ হে-হে-হে– একবারেই ভাঁপ উড়চে রে বাপ! আর তর কত আদর! কত সুয়াগ! ও-বো-বো-বো– এই শিখাঁইচে হে, কাতক্যারে এই শিখাঁইচে। মার, নাইলে মর– ও-বো-বো-বো– পা-হু-ড়–
হঠাৎ কোথা থেকে একটা কান ফাটানো শব্দে থরথরিয়ে কেঁপে উঠল পাড়াটা। ঢাকা পড়ে গেল খ্যাপা কানাইয়ের প্রলাপ। ঝট করে মোরগ দুটো ধরে যে যার কোলে তুলে নিল মালিক দু’জন। লাল মোরগটার বাঁদিকের ডানার নিচ থেকে গলগল করে রক্ত ঝরছে। রক্তে লাল হয়ে উঠছে অন্য মোরগটার মালিকের কোলও। কিন্তু সেদিকে কারোর খেয়াল নেই। শব্দের উৎসের দিকে লক্ষ্য রেখে উভয়েই নির্বাক। পাড়াতে জমায়েত বাকি লোকেরা এদিক সেদিক ছুটে আশ্রয় নিল পলাশ ঝোপের আড়ালে। হামাগুড়ি দিয়ে আত্মগোপনের চেষ্টা করল। মুহূর্তের মধ্যে নিথর নীরবতা বিছিয়ে গেল সারা পাড়ায়। সেই নীরবতাকে খান খান করে চেঁচিয়ে উঠল খ্যাপা কানাই,
লাগে গেছে হে, বনবেগেও লাগে গেছে কুঁখড়া লড়াই। লাগ-লাগ-লাগ– লাগ ভেল্কি লাগে যা!
নিজের বগল বাজাতে বাজাতে লুকিয়ে পড়ল একটা পলাশ ঝোপের আড়ালে। হঠাৎ লাল মোরগটা মালিকের কোল থেকে বেরিয়ে গেল। ডানা ঝাপটাল দু’বার। ফিসফিস করল মালিকটা,
শালা, মরবি নকি! কাছকে আয় বলচি!
হাত বাড়াল। কিন্তু নাগালের মধ্যে আসার আগেই মোরগটা একটা কর্কশ আর্তনাদ ছেড়ে উড়ে গেল পাশের ঝোপটার দিকে। সেখানে লুকিয়ে ছিল একটা বছর দশকের ছেলে। সে একটা ঝাপট মারল মোরগটার উপর। কিন্তু লড়াইয়ের কৌশলে মোরগটা বাঁচিয়ে নিল নিজেকে। আরেকটা আর্তনাদ ছেড়ে উড়ে বসল ছেলেটার কাঁধে। কিছু বোঝার আগেই ফালা-ফালা হয়ে গেল তার ঘাড়। সময়ের অসহায়তা ভুলে আর্ত চিৎকারে কুঁকড়ে গেল ছেলেটার শরীর,
আ---
মোরগটা উড়ে বসল মহুয়াগাছের ডালে। গোবরা পাশের পলাশ ঝোঁপ থেকে খেঁকিয়ে উঠল,
কী হলেক কী রে ব?
কিন্তু তার জিজ্ঞাসার কোনো উত্তর দিতে পারল না ছেলেটি। তার ঘাড়ের দিকে তাকিয়ে আঁতকে উঠল গোবরা। একঝাঁপে পৌঁছে গেল ছেলেটার কাছে। চেপে ধরল ক্ষতস্থান। চিৎকার করল,
ই বাবারি, ই যে একবারেই পাঁঠাকাটা করে দিলেক রে ব! এ তরা সোব আসবি রে–
কাছাকাছি যারা ছিল তারা ছুটে এল। ততক্ষণে রক্তে ভেসে গেছে গোবরার হাত। ছুটে এল লখাই সর্দারও।
এঁ-হে-হে-হে– শালার ছাঁয়ের বাড় দ্যাখ! মরদাঙ্গি মারাতে গেছে লড়াইয়া পাখের সঙে। ইটাও নাই জানিস, লড়াইয়া মরগ ধরার ক্ষ্যামতা অস্তাদ কাতক্যার ছাড়া আর কারু নাই থাকে?
লখাই সর্দারের পাশ থেকে হাঁক পাড়ল এক বুড়ো। তার সঙ্গে যোগ দিল আরও নানান কণ্ঠ। কিন্তু সে-সব বিবিধ শব্দের ঝনাৎকার কানে ঢুকল না লখাই সর্দারের। তার বদলে দু’কান জুড়ে জেগে উঠল শত শত মোরগের মিলিত চিৎকার– কুঁক-কুঁক-কুঁকড়ুচ্চু– সে-শব্দ কানে নিয়েই লখাই সর্দার তাকাল যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাওয়া শরীরটার দিকে। দেখল, তার কাতের নিপূণ ক্ষত। তার উপর ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরে পড়ছে মহুয়াগাছের ডালে বসে থাকা লাল মোরগটার লাল রক্ত।


0 মন্তব্যসমূহ