বনমালী মালের গল্প : কাহ্ন



কাল হতে না হতেই সমতলের সব মানুষ উধাও হয়ে যায়। কাছেপিঠেই কোথাও থাকে নিশ্চই। ফিসফিস কথার শব্দ আর জোর শ্বাস দেওয়া নেওয়া ছাড়া তাদের আর কিছু চিহ্ন শোনা যায় না। চোখে পড়ে তাদের নিংড়ে মিলে যাওয়া প্রাণহীন জামা কাপড়ের পত পত উড়তে থাকা আর প্রাণের মধ্যে নজরে পড়ে শুষে নেওয়া ছাঁদের এক আধটা গাভী। সেই ছাঁদে মুখ গুঁজে দু' একটা গুঁতো দিলে গরু কঁকিয়ে ওঠে আর তখন কঙ্কালসার বাছুরের পাশে এসে দাঁড়াতে দেখা যায় কাহ্নকে। উজ্জ্বল কান্তিময় তাঁর শরীর। প্রশস্ত হাতের চেটো দিয়ে তিনি ছাঁদ পানিয়ে দেন। এমনই হয়।

কাহ্ন বলেন, আমি পবিত্র। অমায়িক। আমার মত জ্ঞানী পুরুষ সমতলে কখনো আসেনি। আসবে না। হেন কোনো কর্ম নেই, যার ফল আমাকে বঞ্চিত রাখে।

সেদিন কাহ্নই বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, আমি একমাত্র সিদ্ধ। জীবন আর মৃত্যুর একমাত্র কারিগর। আমিই প্রণম্য।

দিনের আলোয় সমতলের সমস্ত মানুষ স্পষ্ট দেখেছে, যেদিন কাহ্ন এই ভূমিতে প্রথম পা রেখেছিলেন, সেদিনই ভূমিকম্পের কাঁপনে কেঁপে উঠেছিল এই অসীম প্রান্তর আর শস্যের বিস্তীর্ণ সবুজ আরো খেলে গিয়েছিল তরঙ্গের বাতাসে। সামনের পাহাড় থেকে ঝরে পড়েছিল পাথর আর প্রাণীর নিষ্প্রাণ শরীর। সব গাছ সব প্রাণী যারা তখনও আত্মরক্ষার কিছু শেখেনি, হারিয়ে গিয়েছিল সেদিন। পাউড়ি রেখে যেতে পারেনি বলে যারা আবার ফিরে এসেছিল, তারা আর তাদের বংশজেরা বুঝে গেল, কাহ্ন একটি শক্তি। যিনি সহজে অঘটন ঘটাতে পারেন।

কবেকার সেই ভূমিকম্প থেকে আজ পর্যন্ত কাহ্ন এই সমতলের সিদ্ধ পুরুষ। তাঁর কাছে মেগে পেতে চলে জীবন আর ভাগ্য। এমন কাহ্নকে বিশ্বাস না করে উপায় নেই।

ক্ষয় আর জরা হল না শুধু সমতল আর পাহাড়ের মাঝে থাকা একটা নিমগাছের। যদি কেউ ওই নিমগাছটার বয়স জানতে চায়, হিসেব করে কাহ্নর সেদিনের পদার্পণের দিন দিয়ে। শুধু রাতের অন্ধকারে বিস্ময় আর শ্রদ্ধা নিয়ে লোকেরা দেখে, যেন একটা বিশাল মানুষেরই অবয়ব যেন তার সর্বস্ব মিলে ধরে জানান দিচ্ছে। তাদের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে যা কিছু হয়, সেইসবে হাত আছে কাহ্নের আর এই নিমগাছের।

কেবল কাহ্ন জানে, গাছটার গোড়া আর রহস্যের কথা। সে তার নিজেরও শক্তি আর সিদ্ধির রহস্য। সেদিন ভূমিকম্পের পর যখন কাহ্ন তাঁর নিজের সিদ্ধি সম্পর্কে গর্ব করছিলেন, তখনই নিমগাছ থেকে ডাকিনী বলে উঠল,
"শোনো কাহ্ন, এই কম্পন আসলে এক মহাজাগতিক প্রক্রিয়া।"

নিরাশ হতোদ্যম কাহ্ন জানতে চেয়েছিলেন,
"তবে এই যে এত মানুষ, সমতলে যাদের এতদিনের বাস, ওরা আমার বশে এসে গেল কেন!"

ডাকিনী বললেন,
"ও তাদের ক্লান্তি। নিজেদের মত করে নিজেদেরকে বয়ে বেড়ানোর ক্লান্তি। তুমি নতুন। ওরা আসলে নিজেদের ভার আর চলার পথ অন্য কাউকে দিয়ে নিশ্চিন্ত হতে চায়।
তোমার সিদ্ধি এখনও পূর্ণ হয়নি কাহ্ন।"

সেদিন থেকে এই অপূর্ণতার কথা জানে শুধু কাহ্ন আর ওই নিমগাছের ডাকিনী। বছরের যেকোনো দিন যেকোনো সময় কাহ্ন নিজেকে সিদ্ধ প্রমাণ করার জন্য এক আধটা খেল খেলে আর সমতলের মানুষের দিকে চেয়ে নীরবে নিস্পৃহে বোঝার চেষ্টা করে। বুঝে গেছে এদের ওপর আর প্রয়োগ করবার কিছুই নেই। নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে তারা বের হয়। ঘুরে বেড়ায় আর চোখ বন্ধ করে। এখানে প্রাণের নানা চিহ্ন আছে কিন্তু প্রাণ কত নির্বল।

ডাকিনীর কথা ফেলে দিতে পারে না কাহ্ন। প্রকৃত সিদ্ধিতে যদি এখনও কোনো খামতি থেকে থাকে, তাকে সেটা পুরিয়ে নিতেই হবে। কারণ তার হাতেই – তার দেখানো পথেই সমতলের মুক্তি। নিজেকে নিয়ে আরো ভাবতে থাকে সে। সেই ভাবনা কেবল তার নিজের।

গোপন অন্ধকারে সে প্রতিদিন একটি সমাধির কল্পনা করে আর নির্জন বসে থাকে সেই যোজন উঁচু সমাধির উপর। চোখ বন্ধ করে তখন সে কেবল একটাই দৃশ্য দেখতে চায়, কত কত মানুষ তার সামনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অজস্র চোখ শুধু তারই দিকে চেয়ে আছে। তার একটি মুদ্রায় ওরা সুখী হতে পারে কিংবা মিলিয়ে যেতে পারে শূন্যের মত করে। লোকগুলোর কোনো ভিন্ন ভিন্ন রূপ নেই, চোখের দৃষ্টি বশীভূত। সম্মিলিত একটা গুনগুন শব্দ উঠছে তাদের থেকে অথচ স্বরের কোনো স্পষ্টতা নেই।

একদিন কাহ্ন সাদা পোশাকে নিজেকে ঢেকে বসে আছেন কম্বল আসনে। মেলার মত মানুষ। ঘাসের সবুজটুকুও দেখা যায় না। সবার ভক্তিমিশ্রিত চোখ পড়েছে তাঁর উপরে। কেউ সামনে এসে কেউ দূর থেকে প্রণাম করছে তাদের প্রিয় দেবতার চরণে। যে কাহ্নর সারা মুখে সর্বদা দিব্যতার জ্যোতি অটুট থাকে, তাঁর চোখ এখন কেমন নিষ্প্রভ। সবাই দেখল, সাদা পোশাকের পবিত্র গৃহ থেকে একটি কালো ছায়ার মত মুখ ভেসে আছে। চাউনিতে লেগে আছে অস্পষ্ট পর্দা। যেন ঐহিক কিছু দেখছেন না, তাঁর ভাবনা ভেদ করে যাচ্ছে পৃথিবীর সমস্ত স্তর। গাছ – গাছেদের বেঁচে থাকা, সমতলের চলাচল, বয়ে চলা বাতাসের হাওয়া আরো কত কিছু। এই কাহ্নই আসল। সবাই এমন কাহ্নকে দেখতেই অভ্যস্ত। কিন্তু তবু এখন অন্তরে এমন কিছু আছে, যা তাঁকে অপূর্ণ আর অসুখী করে রেখেছে।

এই সমতলের সবাই বেশ জানে, আরো নিচের কোনো খাদ থেকে কিংবা কোনো অন্য সমতল থেকে একদিন স্পষ্ট দেখা আলোয় উড়ে এসেছিল এক জোড়া শঙ্খচূড় সাপ। সারা সমতল বুকে নিয়ে তারা ঘুরে বেড়িয়ে যথেচ্ছ সুখ পেল। ঘাস চিরে তাদের শিরশির এগিয়ে চলার শব্দে লোকজন জামা আর কাপড়ের ভাণ থেকে বেরিয়ে এসেছিল কাঙ্খিত একটি দৃশ্য দেখবার জন্য। ততক্ষণে ঘাড় আর গোটা শরীর হিলহিলে দুলিয়ে তারা সোজা হয়ে দাঁড়াল ঘাস ছেড়ে। লোকজনের যত আগ্রহ, তত আবেশ। মৃদু সুরের চর্চা থাকলে তারা বুঝতে পারত, এ এক সঙ্গীতই।

দুটো দীর্ঘ সবুজ সাপের দুলতে থাকা আর গায়ে গায়ে মিলিয়ে যাওয়া শঙ্খ মুহূর্ত – সমতলের কেউ বাকি রইল না সাপ দুটোর সঙ্গে মিলিয়ে যেতে। তারা বিষ বুঝল না – কাহ্নর সিদ্ধি চাইল না – শুধু চরাচরের আখ্যান সত্যি করে তারা মেনে নিল সাপের - সাপেদের সম্মোহন ক্ষমতা।

তখন কাহ্ন, তেমন কাহ্ন রইলেন না। তাঁর পবিত্র মুখে কালো ছায়া আর চোখে দুর্ভেদ্য অস্পষ্ট চাউনি।

হঠাৎ মেঘ এল। বৃষ্টির জল। আর খসে গেল এক শঙ্খচূড় থেকে আরেক সাপের শরীর।

লোকজন ফিরে এসেছিল কাহ্নর কাছে। শুকরিয়া জানিয়েছিল সময়ে বৃষ্টি আনবার জন্য। নাহলে সাপের জোড় শেষেই হয়তো সমতল বিষময় হয়ে উঠত কিংবা সাপেদের সম্মোহনে তারা সবাই তেমন স্থির দাঁড়িয়েই থেকে যেত আজীবন! তবে ভাবনায় পড়ে যেতে হত, কীভাবে তারা সারাদিন একে অপরের মুখ আর আলো দেখাদেখি করত! ভাগ্যিস তাদের কাহ্ন ছিলেন!

আজ কাহ্নর চোখেমুখে তেমন একটা সময় চেপে বসে আছে। ভয়ে বিস্ময়ে আরো কত কত মানুষ এসে দেখা দিল কাহ্নের আবেশে। সবাই নিজের নিজের মত করে প্রণামী আর মানসিক মানত করল। তাদের প্রিয় দেবতুল্য কর্তার এ কেমন অভিব্যক্তি! সহজ সুখের পথে কী এমন বাধা, যা তাদের কাহ্নকে এমন মনমরা করে রেখেছে!

সমতল ছেড়ে তিনি বাইরে কোথাও গিয়েছিলেন কি! জরা ব্যাধি কিংবা সমস্ত সমর্পণ না করা কোনো মানুষের সঙ্গে তাঁর মোলাকাত হয়েছে কি! হয়তো কোনো একজন না জেনেই কাহ্নর চোখে চোখ রেখেছিল!

মনে মনে এইসব বাতাস তাদের ফাঁপিয়ে তুলল। ছানভিন শুরু হল তখুনি।

ছত্রভঙ্গ হাটে পসরা পড়ে রইল। পোয়াতী বউয়ের থেকে কত সরল অথচ উন্মাদ মনে বেরিয়ে গেল একটা লোক। একজন নিজেকে ফেনিয়ে তুলল নিজ ভূমির যেকোনো অসুখ সারানোর কবিরাজ বলে। কারো কাছে খোলসা করে জবাব দিতেও হল না, কার অসুখের জন্য এমন তদবির? স্ত্রী পুরুষ নির্বিশেষে তারা বেরিয়ে পড়ল। সারা সমতল তন্ন তন্ন করে চষে ফেলল তারা। কী কারণ! কীসের গরমিল!

এতদিন সহজ সুখ আর রাত-দিন নিশ্চিন্তে কেটে যাওয়া সময় তাদের আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। ঘরের বাইরে যা কিছু দৃশ্য আর শব্দ – সেসবের জন্য এতদিন তারা সবাই কাহ্নকেই বিশ্বাস করে এসেছে। এখন এমন খোঁজে বেরিয়ে তারা দেখল, সমতলের পশ্চিম ঘিরে এক বিস্তৃত নাতিউচ্চ পাহাড়। স্পষ্ট দেখা যায় সেই পাহাড়ের চূড়া। আর সেখানেই এতদিন বাস করে আসছে কে এক ডোম রমণী। হয়তো চাল নেই। উনুন নেই। সমতলে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সমস্ত লোক অবাক হয়ে দেখল, পাথরের সঙ্গে প্রায় মিশে যাওয়া একটি মেয়েমানুষ কঠোর নিস্পৃহ দম্ভ নিয়ে সমতলের দিকে তাকিয়ে আছে। তার ক্ষীণ অথচ নরম চোখ চারিয়ে আছে গোটা সমতলে।

পাহাড়ের জটিল প্যাঁচের পাকদন্ডী বেয়ে যেখানে ওঠা সহজ নয় – সেখানে ডোমনী থাকে। কুঁড়েঘরের বাস। কোনোদিন হাঁড়ি চড়ে। কোনোদিন আগুনই জ্বলে না। প্রতিবেশী কেউ নেই। সমতল থেকে কারো যাতায়াত নেই। তবু সমতলের নাড়ি নক্ষত্র জানে সে।

পাহাড়ের উঁচুতে বাতাসের বেগ বেশি থাকলে আলুথালু ডোমনীকে ঘিরে এক সুন্দরের আবেশ তৈরি হয়। বেশের মধ্যে তার উদোম নাভী অব্দি ঝোলে গুঞ্জা ফলের মালা। ডোমনী অদ্বিতীয় সুন্দরী নয়। সমতলে স্বজাতি এমন অনেক কন্যা আর মহিলা আছে, যারা ফিনকি দিয়ে তাদের রূপ ঝরিয়ে বেড়ায়। তাদের গায়ের আভরণে অবিরাম ছটা বিচ্ছুরিত হয়। আঁখিপল্লবে ঈশারা করে তারা অবাধে সমতলে ঘাসের বিছানা বইয়ে দিতে পারে কিন্তু কাহ্নর মন অক্লান্ত মেতেছে পাহাড়ি ডোমনীর প্রতি।

কোনো কোনোদিন আকাশে মেঘ আর আলো কম থাকলেও সে কুঁড়ের বাইরে এসে দাঁড়ায় না। প্রশস্ত দৃষ্টিতে নীচের সবকিছু কত স্পষ্ট দেখতে পাওয়ার কথা অথচ সে সমতলের দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে থাকে না। তবু আলোয় ভরা সমতলের সব মানুষের যাবতীয় সজ্জা আর ভাণ তার মুখস্থ। নিজেকে না দেখিয়েও সে চরাচর লক্ষে রাখতে পারে। আলো ফোটা থেকে অন্ধকার গড়িয়ে যাওয়া অব্দি সে শুধু জানে তার নিজের সহজ যাপনের সুখ। কাহ্নকে সে দেখেছে। উঁচু চূড়া থেকে যেমন দেখা যায়। কী ক্ষুদ্র কাহ্ন আর শূন্য লোকজন! অস্বীকার করতে চায় বলেই হয়তো ডোমনী আগাগোড়া তাদের চর্যা শিখে ফেলেছে। মুখে নির্বিকার ভাব নিয়ে সে শুধু দেখে আর দেখে না।

ভ্রু কুঁচকে সমতলের সবাই সেই ডোমনীর দিকে চেয়ে রইল। তাদের চাউনিতে বিস্ময়। সারা শরীরে শিথিলতা। মানুষ কীভাবে এমন হতে পারে! একজন স্ত্রীলোক এরকম সঙ্গীহীন পাহাড়ের চূড়ায় কীভাবে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে চলতে পারে!

কবে কোন্ সময় থেকে যে সে এই পাশেরই পাহাড়ের চূড়াটায় নিজেকে সুখী রাখতে পেরেছিল – হিসেবে গরমিল হয় তাদের।

যারা বয়স্ক ছিল, তারা মুচকি হাসি উড়িয়ে পাহাড়ের দিকে পেছন ফিরে দাঁড়াল। এমনিই চোখ মেলে রাখল দিগন্তের আকাশ কিংবা কেউ কেউ নিজেদের পায়ের পায়ের আঙুলের দিকে। আর সাবালক পুরুষ স্ত্রী প্রথমে একে অপরের হাতে হাত রাখল তারপর জোড় হাতে পাহাড়ের চূড়ায় নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকা ডোমনীর দিকে চেয়ে রইল।

প্রায় সারাদিন দাঁড়িয়েও তারা ডোমনীকে গলে যেতে দেখল না। এমনকি কুঁড়েঘরের দশদিক থেকে ধোঁয়া ওঠার কোনো চিহ্নও দেখা গেল না। কারো কারো মন চাইল, কাহ্নর কাছে গিয়ে পরামর্শ নেয় কিন্তু ওই মুহূর্তে সেই কবিরাজের মনে পড়ল, আমাদের প্রিয় মানুষের কাছে এমন একটি ব্যর্থ কাজের জন্য কর্তব্য চাইতে গেলে তিনি আরো কষ্ট পাবেন।

পাশের জন যেন কত সহজেই কবিরাজের মনে মনে ভাবা কথা জেনে ফেলল, আর বলল –
"তোমার তো অন্তত জানা উচিত, আমাদের মাথার উপর যিনি আছেন, তিনি গাছেদের মত কত নরম আর সবুজ।"

একদিন আলোর সকাল আসতেই সমতলের সবাই দেখল, পাহাড়ের যত দম্ভ আর উচ্চতা সব ভেঙে তছনছ হয়ে গেছে। সমান হয়ে গেছে ডোমনী আর তারা।

সকালের নির্মল স্বচ্ছতায় দ্বিধাহীন কাহ্ন চাইলেন সমতল হয়ে যাওয়া পাহাড় আর ডোমনীর দিকে। চাইলেন নিমগাছটার দিকে।

এবার!

কাহ্নর সেই একটাই চাওয়া। এই একজনের কাছেই।

ডাকিনী বললেন –
"এখনো তোমার সিদ্ধি পূর্ণ হয়নি কাহ্ন।"

কাহ্ন ঘুরে বেড়াতে লাগলেন সমতলের বাতাসে। গৃহহীন সুখহীন অস্থিরতায় তাঁর মাথা নত হয়ে রইল নীল আকাশের দিকে।

তাঁর এই চেয়ে থাকা সমতলের সবাই দেখল, বুঝল – তারা আবার এসে দাঁড়াল সমান উচ্চতার ডোমনীর কাছে। আরো স্পষ্ট। যেন আরো কাছের। যেন এবার তারা তাদের সুখের রাজাকে নিশ্চিত সুখী করতে পারবে।

রাতারাতি যে পাহাড়টা ধ্বসে সমান হয়ে গেল, যে কুঁড়েটা আর ঘর রইল না – সেই পাহাড়ের ডোমনী তবু তার নির্বিকার শরীরে আর মনে বাতাস লাগিয়ে আলো আর অন্ধকার দেখে যেতে লাগল।

সমতলের সবাই দেখল,
গাদা গাদা পাথর এখনো সমতলের সঙ্গে একটা ভেদ করে রেখেছে।
সমতলের সবাই ভাবল,

কাহ্ন এত করলেন, যদি পাথরগুলোকে নিশ্চিহ্ন করে দিতেন! অন্তত ডোমনীকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র ব'লে ভাবা যেত।

তবুও তাদের ভেতর থেকে একজন কামার তার কুতকুতে চোখ ছোটো আর তীক্ষ্ম করে বলল –
"আমাদের কাহ্ন উত্তম শয্যা প্রস্তুত করতে জানেন।"

বলেই সে তটস্থ হয়ে কিছুর জন্য অপেক্ষা করল। হয়তো ডোমনীর হালচাল বুঝতে। পাশাপাশি সবাই তার কথা শুনে আবেশে অতীতে নিজের নিজের চোখ মুদে রইল। অগণন দৃশ্য বয়ে যেতে দিল অন্ধকারে। যদি তেমন তেমন দৃশ্য, সেইসব পড়ে পাওয়া সুখ এখন তারা ডোমনীকে দেখাতে পারত…

কিন্তু প্রিয় কাহ্ন তাদেরকে এখনও বেতাল বশীকরণ বিদ্যাটা শিখিয়ে দেননি। চোখের মৃদুতা মেলে প্রতিবার বলেছেন, একদিন ঠিক প্রতি মানুষের জন্য একজন করে বেতালের নিয়োগ হবে।

"শোনো ডোমনী, মনে করো, হয়তো আমাদের কাহ্ন তোমাকেই প্রথম শিখিয়ে দেবেন সেই বিদ্যা। কাহ্ন বলেন, বেতালের সাহচর্যে সুখ আর সম্পদের অনটন হয় না।"

এত দিন-রাতের সময়কে এক করে তারা ডোমনীকে সমতলের সমান করে নিতে পারেনি, এতেও তারা অবাক হয়েছে কিন্তু সমতলের মানুষজন অবাক হতে জানে। অবাক হতে তারা ক্লান্ত হয় না। অথচ তারা কোনোদিন দিন বা এমনকি রাতের আকাশের দিকে তাকিয়েও দেখেনি কারণ সেই নীল আকাশ তাদের পরম প্রিয় কাহ্নর উপাস্য।

সপ্তাহের শনি আর মঙ্গলবার হাটের ঈশান কোণে এক বেদীর মত মঞ্চে কাহ্ন বজ্রাসনে বসেন। তখনও কোমল তাঁর মুখমণ্ডল। সাদা ধবধবে একটা চোপকানে ঢাকা তাঁর গোটা শরীর। তারই ভেতর থেকে কাহ্ন বের করে আনেন সুন্দর ক্ষুদ্র পুতুল। কাহ্ন চাইলেই যেন সেগুলো প্রাণ পেতে পারে। কেউ কেউ কেবল অসুখের প্রলাপের মত করে ভাবতে পারে, এমন পুতুল তারা কবে কোথাও দেখেছে হয়তো। কোনো আড়ি করা জাগ্রত শিশুর কান্না ছাড়িয়ে কারা যে কবে সেই পুতুলগুলো নিয়ে গেল!

তবে কাহ্নর এই পুতুলগুলো নিশ্চই তাঁর নিজের। শুধু সমতলের লোকজন অবাক হয় যেন কাহ্নরই ঈশারায় সেগুলো নিষ্প্রাণ হয়ে পড়ে আছে – তাঁরই মায়ায় তারা প্রাণ পাবে।


ভেবে দেখো ডোমনী, একবার শুধু এই সমতলের সমান হয়ে দেখো, সবকিছু পাবে।

– আমাদের কাহ্ন বিচিত্র বেশ ধরতে জানেন।

– কাহ্ন আমাদেরকে সুগন্ধি আতর প্রস্তুত করতে শিখিয়েছেন।

– আমরা আসলে আমাদের অতীতের কথা শুনতে চাই না, নাহলে, তিনি আমাদের শুক-সারি সংবাদ শোনার ক্ষমতাও দিয়েছেন।

তবু ডোমনীর কোনো বিকার দেখা যায় না। দিন দিন ডোমনীকে মানানোর জন্য সমতলে ভিড় বাড়তে থাকে। তাদের কাছে আরো যে অনেক সহজ পন্থা আছে, বোঝা যায়, তাদের সর্বাঙ্গ ঢেকে রাখা পোশাকের বাহার দেখে।

এখন আলোর মাঝেই কাহ্ন নিমগাছটার দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। সমতলের সবাই ভাবে, অসুখী কাহ্ন এখন ঘন ঘন তাঁর উপাস্য নীল আকাশের শরণ নেন।

নিমগাছ থেকে ডাকিনীর স্বর ভেসে আসে –
"এমনই সহজ পথে থাকো কাহ্ন। একদিন সিদ্ধি আসবেই।"

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ