অনেক আগে আমার একটা ছাদ ছিল। সেই যে মফস্বলি শহরের আদি বাড়িগুলোর ছাদ, যে ছাদগুলো বছরভর গাছের ছায়ায় থেকে বুকের ভেতর সোঁদা সময় পোষে ঠিক তেমন একটা ছাদ ছিল আমার।
তখন আমরা সবে শহরে এসেছি। মফস্বলের ঘ্রাণ তখনও মুছে যায়নি শহরটার গা থেকে। এ গলিতে ও গলিতে তখনও অনায়াসেই দেখা মিলতো দোচালা ঘরের। আর সেসব দোচালা ঘরের ওপর সশস্ত্র পাহারায় থাকতো প্রাচীন সব গাছগাছড়া। তেমনই এক প্রাচীন গাছের প্রকান্ড ছায়ার তলায় ছিল আমাদের পাড়া। হ্যাঁ, সত্যি বলছি। বিশাল সেই গাছের ছায়াটা কখনো পুবে আবার কখনো পশ্চিমে হেলে বেশ কায়দা করে সারাদিন পাড়াটাকে রোদের তীব্র আঁচ থেকে লুকিয়ে রাখতো। আর এজন্যই বুঝি গাছটার প্রতি কৃতজ্ঞাবদ্ধ হয়ে সকলে মিলে পাড়াটার নাম রেখেছিলো কড়ইতলা।
কড়ইতলার একটা পুরোনো লাল রঙের বাড়িতে শুরু হয় আমাদের শহুরে জীবন। আমরা বলতে বাবা, মা, আমি আর তোতন। তখন নিউক্লিয়াস পরিবার আমাদের কাছে একদমই অদ্ভুতুরে জিনিস ছিল। দাদা, দাদী, কাকা, ফুপু ছাড়া আমাদের চারজনের পরিবারটা আমাদের কাছেই খাপছাড়া লাগতো। তারসাথে যুক্ত শহুরে মাপজোখের জীবন, যা আমাদেরকে আরও অস্থির আরও বিষণ্ণ করে তুলতো। তাই আমি আর তোতন প্রায়ই লালবাড়ির ঘোরটোপ থেকে বেরিয়ে পড়তাম হুটহাট। পথের পাঁচালীর অপু দূর্গা হয়ে শহরের গলিটাকে নিশ্চিন্তিপুর বানিয়ে দৌড়ে বেরাতাম এমাথা ওমাথা।
না, না তোতন আর আমি পিঠেপিঠি নই মোটেও। তোতন এই পৃথিবীর বুকে থেকে এক ফালি রোদ হয়ে জন্মেছিলো কোন এক চৈত্রের দুপুরে।বাড়ির উঠোনে অস্থায়ী কুঁড়েঘরে ফুটফুটে আলোটার মুখ দেখা দাদাজান নাম রেখেছিলো দীপ্ত। এরপর উঠোন থেকে ঘর, ঘর থেকে বাড়িময় শুধুই দীপ্তর আদর আহ্লাদের গল্প। আর প্রকৃতিও হয়তো চাইছিলো দীপ্তর সেসব দিন দীর্ঘায়িত হোক। তাই বাড়ি ছেড়ে স্কুলের গন্ডিতে দীপ্ত না পৌঁছানো পর্যন্ত পৃথিবীতে আসার ছাড়পত্র আমার জোটেনি। ঠিক এই কারণেই আমি আর তোতন পাক্কা সাত বছরের ছোটবড়।
হ্যাঁ, দীপ্তর নামটি আমার আধোবুলিতে শুধু তোতো হয়ে গিয়েছিলো শুরুতে। এরপর সেখান থেকে সময়ের পরিক্রমায় যুক্ত হয়েছিলো ‘ন’। তাই বড় ভাই নয়, ভাইয়া নয়– দীপ্ত আমার তোতন। তবে তোতনের নাম নিয়ে দাদাজানের যত আগ্রহ ছিল, আমার বেলা ছিল ততই অনাগ্রহ। না, মেয়ে হয়ে জন্মাবার জন্য দাদাজান আমাকে অগাহ্য করেছেন তা নয় কিন্তু। তবে আমি তোতনের মতো ফুটফুটে হইনি বলে নাকী কুঁড়েঘরে আমার মুখ দেখে দাদাজান বলে উঠেছিলেন,
কালো মেয়ের আর কী নাম রাখবো?
সেদিন থেকে অদ্ভুতভাবে আমার নাম কালো! কাগজেকলমে অবশ্য নামটি কাকলী কিন্তু বাড়ির সবাই আমাকে কালো বলেই ডাকে। শুধু তোতন আমার কাকলী নামটা বাঁচিয়ে রেখেছিলো নিজের অদ্ভুত দায়িত্ববোধ থেকে।
দায়িত্ববোধের আগে আমি ‘অদ্ভুত’ শব্দটা যোগ করেছি কারণ তোতনের কাজগুলো অদ্ভুতই ছিল। এই যেমন: খড়খড়ে রোদের কোনো দিনে তোতন মাঠঘাট খুঁজে আমার জন্য একটা কাঁচামিঠা আম কুড়িয়ে নিয়ে আসতোঅথবা ভারী বৃষ্টির দিনে কোনো মজে আসা পুকুরে ডুব দিয়ে তুলে নিয়ে আসতো ঢ্যাঁপফল। সবকিছুতেই তার একটাই কথা ছিল,
কাকলী সেই কবে আমার কাছে চেয়েছিলো যে…
ভুলে যাওয়া অজস্র আবদার পূরণ করে দিয়ে তোতন আমাকে যে শুধু আনন্দ উপহার দিতো তাই নয়, মূল্যহীন সময়ে নিজের মূল্যটুকু বুঝে নেবার ইচ্ছেটাকেও জাগিয়ে দিতো।
আর শহরে আসার পর অতি সীমাবদ্ধ জীবনে তোতনই ছিল আমার বাঁধন ছেঁড়ার গান।
শহুরে গলিগুলোতে এক অদ্ভুত নীরবতা থাকে। আর থাকে বিমর্ষ ছায়া। আমাদের গলিতেও তেমন ছিল। আমি আর তোতন তাই মাঝেমধ্যে গলি পেরিয়ে সোজা পিচের রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াতাম।আর লক্ষ্য করতাম, গলি ফুরালেই ফুরিয়ে যায় সকল বিমর্ষতা। ফুরিয়ে যায় সকল নীরবতা। ঠিক জোনাই পোকার মতো অজস্র আনন্দআলো নিয়ে পিচের রাস্তাটা আমাদের দুই ভাইবোনকে বেঁধে ফেলতো মোহমন্ত্রে।
না, না, সেসময় শহুরে রাস্তা মানেই গাড়িঘোড়া, অজস্র মানুষ, নানারকম দোকানপাটে ভরা এমন ছিল না। তবে ছিল ক’খানা আলগোছে বেল বাজিয়ে হেলেদুলে চলে যাওয়া, দু’চারজন মানুষের আলস্যভরা হেঁটেচলা আর ছিল এখানে সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ক’খানা দোকান। আর মানুষজন, দোকানপাট থেকে আমি আর তোতন আলাদা করে নিয়েছিলাম রাস্তার পাশে সবচেয়ে জীর্ণ দোকানের নিরীহ মানুষটিকে।
জীর্ণ দোকানের মতো মানুষটিও খানিক জীর্ণই ছিল শরীরের দিক থেকে। গড়পড়তা লম্বার মানুষটি হালকা-পাতলা গড়নের সাথে একটু নুয়ে হাঁটতো। আর হাঁটার সময় মাথাটা এমনভাবে সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে রাখতো যেন মনে হতো চারপাশ নিয়ে পৃথিবীর সব অনাগ্রহ তাঁকে গ্রাস করেছে। তবে কথার প্রয়োজনে যখন মুখখানা তুলতেন তখন কাঁচাপাকা দাঁড়ির তলে সৌম হাসিটুকু ঢেকে দিতো তাঁর সব অসম্পূর্ণতা। আর আমাদের কাছে তিনি আরও সম্পূর্ণ হয়ে উঠতেন দোকানের তাকে তাকে সাজিয়ে রাখা কৌটার কাঠি লজেন্স কিংবা বেলা বিস্কুট দিয়ে,
কি বাবারা নতুন এসেছো শহরে?
তাঁর সাথে আমাদের পরিচয় ঠিক এই কথার সূত্র ধরেই। তবে এগিয়ে দেওয়া কাঠি লজেন্স দু’টোকে অগ্রাহ্য করে আমি আর তোতন একইসঙ্গে বলে উঠেছিলাম,
ওখানে কে গান গায়?
হ্যাঁ, আমাদের রেডিও চাচার গল্পটা ঠিক এখান থেকেই শুরু হয়েছিলো।
গ্রামের বাড়িতে পালপাড়ায় মাঝেমধ্যে দাদাজানের সাথে যাওয়া হলে গীতা দিদিদের বাড়িতে থামা হতো। কালেভদ্রে গীতাদিদির হারমোনিয়ামও দেখার সুযোগ হয়েছিলো। সেটা বাজিয়ে গীতা গাইতো,
আমার শ্যামলা বরণ বাংলা মায়ের
রূপ দেখে যা আয় রে আয়…
তখন মনে হতো পৃথিবীতে গান গাইবার মতো কাজটি একমাত্র গীতা দিদিই করতে পারে। কিন্তু জীর্ণ দোকানের ভেতর একটা বাক্সমতন জিনিস থেকে অচেনা কোনো গান ভেসে আসছিলো তখন খুব অবাক হয়েছিলাম আমি আর তোতন। ভেবেছিলাম, অতটুকুন বাক্সের ভেতর গীতা দিদি ঢুকলো কীভাবে? আমাদের উৎসুক দৃষ্টি পড়ে হাতের কাঠি লজেন্স দু’টো কৌটোয় ফিরিয়ে রাখতে রাখতে মানুষটি উত্তর দিয়েছিলো,
এটা হলো রেডিও…
ব্যস্, সেদিন থেকে নাম না জানা মানুষটি আমাদের রেডিও চাচা হয়ে উঠেছিলো। হতে পারে অচেনা সেই সুরকে চিনে নিতে কিংবা কৌটোয় রাখা বেলা বিস্কুটের লোভে আমাদের নিস্তরঙ্গ দুপুর, অলস বিকেলগুলো ইজারা দিতে শুরু করেছিলাম গলির মাথার জীর্ণ সেই দোকানের নামে।
যদিও তখন আমরা জানতাম না সেই জীর্ণ দোকানের মলিন দেয়ালে জমা হয়ে ছিলো আমাদের জন্য অসং্খ্য গল্প। সেই গল্পগুলো অবধারিতভাবেই প্রকট হতো রেডিও চাচার রেডিও নামের সেই যাদুর বাক্স থেকে।
তবে গল্প শোনায় আমি যতটা মনোযোগী ছিলাম তোতন ঠিক ততটাই মনোযোগী থাকতো রেডিও নিয়ে। নব ঘুরিয়ে কীভাবে নানারকম স্টেশন ধরা যায়, মেগাহার্টজের কাঁটাটা কোথায় দাঁড়ালে বাতাস থেকে বিরামহীন শব্দ ধরে আমাদের সামনে ভাসিয়ে দেয়—এসবই ছিল তোতনের সকল আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। আর মাঝে মাঝে অতিরিক্ত আগ্রহ থেকে অত্যুৎসাহী হয়ে ওঠা তোতন স্কুল থেকে ফেরার পথে সময় ভুলে রেডিও চাচার দোকানেই পড়ে থাকতো।
সেসব সময়ে মা অস্থির হয়ে উঠতো। শহরে ছেলেধরা থাকে—এই গল্পে বিশ্বাসী মা লালবাড়ির সীমানা ছেড়ে গলিতে গিয়ে দাঁড়াতো। কিন্তু জানি না কোন অজানা কারণে মা কখনই কয়েক পা এগিয়ে গলির মাথায় গিয়ে দাঁড়াতো না। হতে পারে সাহসের অভাব অথবা বাবার কড়া নিষেধ। তাই ছটফট মন গলিতেই দাঁড়িয়ে থাকতো।
আমি জানতাম ছেলেধরার ঝোলা নয়, তোতন আটকে আছে রেডিও চাচার দোকানে। কিন্তু সে কথা বলা বারণ ছিলো। কয়েকটা বুনবুনির লোভ দেখিয়ে তোতন আমাকে বলতো,
কাকলী, মাকে বলে দিলে বুববুনি পাবি না কিন্তু…
আমি লাল-হলুদ সেই বুববুনির লোভে মায়ের অস্থিরতা উপেক্ষা করতাম। উপেক্ষা করতাম গড়িয়ে যাওয়া বেলাকেও। কারণ তখন আমার উপেক্ষা করারই বয়স। আমি তখন সবে অপেক্ষা করতে শিখেছি। অপেক্ষা করতে শিখেছি তোতনের ফিরে আসার জন্য, অপেক্ষা করতে শিখেছি রঙিন বুনবুনির জন্য তাই উপেক্ষাই ছিল আমার অপেক্ষার সময়কে নিরাপদ করার মন্ত্র।
তবে উপেক্ষা করতে পারতাম না যখন আমাদের সেই নিউক্লিয়াস পরিবারে তোতনকে নিয়ে সালিশি বসাতো মা। যখন পকেট ভরা বুনবুনি কোথায় পেলো এটার নিকেশ করতে বসতো বাবা প্রচন্ড রাগ নিয়ে। তখন কী ভেবে জানি না লালবাড়ির ফটক পেরিয়ে একছুটে চলে যেতাম রেডিও চাচার কাছে। অনুনয় একটাই,
তোতনকে আজ খুব মারবে বাবা, তুমি না গেলে…
সেই অনুনয়ই আমাদের পরিবারে যুক্ত করেছিলো রেডিও চাচাকে। দোকান থেকে রঙিন বুনবুনির পুরো কৌটোখানাই তিনি বয়ে আনতে তোতনকে মারের হাত থেকে বাঁচাতে।
আস্তে আস্তে রেডিও চাচার জীর্ণ দোকান শুধু আমাদের নয়, বাবারও সন্ধ্যার আড্ডাখানা হয়ে উঠলো।
আর এখানেও অনুঘটক সেই রেডিও।
প্রতি সন্ধ্যায় বাবা গিয়ে বসতেন রেডিও চাচার দোকানে। বাবার জন্য অবশ্য কোনো কৌটা থেকে কাঠি লজেন্স কিংবা বুনবুনি বের হতো না, কাগজে জড়ানো সুগন্ধি জর্দার পান বের হতো রেডিও চাচার পকেট থেকে,
একবার দিল্লি গিয়ে নবাবী পান খেয়েছিলাম…শরীরে সুবাস ছুটতো সেই পান খেয়ে…
কোথায় দিল্লি আর কোথায় গঞ্জের এক মফস্বলি শহর! তাই বাবা গঞ্জের পানে সুধা খুঁজে চোখ মুদতে মুদতে বলতো,
গানের যন্ত্রখানা চালান দেখি ভাই…
বাবার ধারণা ছিল রেডিও চাচার রেডিওতে শুধুই গান হয়। তাই যখন তখন গানের আর্জি নিয়ে হাজির হলেই রেডিওখানা গেয়ে উঠবে। কিন্তু তা তো নয়। কোনোদিন বাবার ভাগ্যে জুটতো বাটা’র গল্পের আসর আবার কোনোদিন হরলিক্সের সুচিত্রার সংসার। তবে যেদিন বাবার ভাগ্যে ওয়েসিস কিছু কথা কিছু গান জুটতো সেদিন পানের মধুরসের সাথে বাবার হাসিটাও মধুময় হয়ে উঠতো।
তবে এতকিছুর আড়ালে আমরা সবাই কি রেডিও চাচার বলে যাওয়া ধারাবিবরণীগুলো অবহেলা করে ফেলতাম?
হবে হয়তোো! নতুবা তিনি সেই একই বিবরণী বারবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দিতেন না,
খবর পড়ছি নীলিমা স্যানাল…
আকাশবাণীতে শুরু হতেই রেডিও চাচার গল্প শুরু হয়ে যেতো। যে গল্পের উপাত্ত যোগার হতো আকাশবাণীতে পঠিত সংবাদ থেকেই,
ওই দেখেছো বসিরহাটে খুব ঝড় হয়েছে বললো! বসিরহাটে ছিল আমার ফুফুর বাড়ি। গিয়েছিলাম একবার খুব ছোটবেলা আব্বার সাথে। স্কুলে তখন পূজার ছুটি চলছিলো। ইছামতি নদীতে জোয়ার এলে নদীটা ঠিক সমুদ্দুর হয়ে যায়…একদিন জোয়ারের জলে সাঁতার কাটতে নেমে কি হয়েছিলো জানো?
না, আমাদের জানা হয়নি ইছামতীতে জোয়ার এলে কি হয়।
জানা হয়নি রেডিও চাচার গল্পের খাঁজে খাঁজে লুকিয়ে থাকা বেদনার ঢেউগুলো।
কারণ তখন তোতন আর আমার কারোরই সেসব বোঝার বয়স হয়নি। আমাদের কাছে রেডিও চাচার গল্পগুলো ছিলো ঠিক তাঁর দোকানে রাখা রঙিন বুনবুনির মতো, যা মুখে দিতেই হাওয়ার মতোন মিলিয়ে যায়। মিলিয়ে যাওয়া সেসব গল্প ছেনে রেডিও চাচার জীবন টেনে বের করে আনার মতো আগ্রহ তোতন বা আমার কারোরই ছিল না।
শুধু বাবাই ছিল ব্যতিক্রম। রেডিও চাচার মুখে শোনা সেসব গল্প বাবা বয়ে আনতেন বাড়িতেও। এরপর কোনো আলসে সময়ে মায়ের কাঁথার ফোড়ে লাল-নীল সুতোর সাথে সে গল্প জড়িয়ে যেতো বাবার দীর্ঘশ্বাস হয়ে,
আহা! সব ছেড়ে আসতে হয়েছে লোকটাকে…কত কি ছিল জানো সেখানে? সব ফেলে চলে একা চলে আসতে হয়েছে…কলুটোলাতে চারপুরুষের ঘর ছিল ওর..
বাবার গল্পে ঢিমে হয়ে আসতো কাঁথার গা জুড়ে ফোড়ের উঠানামা।রঙিন সুতোয় জট বেঁধে যেতো অসাবধানী মায়ের অমনোযোগী সময়কে টেক্কা দিয়ে। সেসবে অলক্ষ্য মা রেডিও চাচার গল্পকে টেনে নেবার জন্য আলগোছে যুক্ত করতো,
রায়ট…
বাবা শব্দটাকে মুখে বসাতেই চেহারায় ফুটে উঠতো নিদারুণ যন্ত্রণার চিত্রকল্প,
বেশ কয়দিন ধরে চলেছিলো সে রায়ট…মানুষ উন্মাদ হয়ে উঠে হয়েছিলো নাকি সেই সময়…কত প্রতিবেশী আগুন দিয়েছে পাশের ঘরে…কত বন্ধুর তরোয়ালের নিশানা হয়েছে অন্য বন্ধু…সবাই যেন সবার শত্রু…
দম নিতে থেমে যাওয়া বাবাকে অস্থির মা তাড়া দিতো,
তাহলে উনি…
সেও পড়েছিলো তরোয়ালের নিচে…কিন্তু হায়াত ছিল যে তার…
কথাগুলো বলতে বলতে বাবার শ্বাস ভারী হয়ে যেতো, যেন সেই তরোয়ালের অব্যর্থ নিশানার চেয়ে রেডিও চাচার এই নি:সঙ্গ জীবন বেশী যন্ত্রণার।
কেন নি:সঙ্গ হলো রেডিও চাচার জীবন?
এই প্রশ্নের উত্তর অবশ্য কোনো এক চৈত্রের ঠা ঠা দুপুরে মাথার উপর সেই প্রকান্ড কড়ইগাছের ছায়া নিয়ে রেডিও চাচা বলেছিলেন আমাকে আর তোতনকে,
গঙ্গার মতোন এমন প্রকান্ড নদী আর কোথাও কি আছে বলো? কত বিশাল বিশাল জাহাজ এসে থামতো সেই নদীতে! কত ফিরিঙ্গি এসে নামতো সেই গঙ্গার তীরে! কত রঙবেরঙের ফিরিঙি! সেসব ফিরিঙিদের জন্যই বুঝি শহরটাও বড় ছিলো গো…
কথাগুলোর আড়ালে আমি যখন রেডিও চাচার চোখে অদ্ভুত উজ্জ্বলতা খুঁজে পেতাম তখন সেই যাদুর বাক্সখানায় বেজে চলতো,
হৃদয়েরও কুঞ্জ মাঝে রাধারও নুপূর বাজে
জীবনেরও মধুবনে মধুঋতু জাগে
জীবনেরও মধুবনে মধুঋতু জাগে
চম্পা চামেলী গোলাপেরই বাগে…
তবে তোতন তো আমার মতো ছিল না। সবকিছুতেই ছিল ওর অনিবার্য আগ্রহ,
সেই রঙিন শহর ছেড়ে কেন চলে এসেছো তুমি?
প্রশ্নটায় খানিক অধৈর্য্য হয়ে পড়েছিলো রেডিও চাচা। খানিক উষ্মাও জমেছিলো মনে হয় কন্ঠে,
শহর কোথায় দেশই তো তাড়িয়ে দিলো আমাকে। যে দেশে আমার সব ছিল সে দেশটাই তো পর করে দিলো আমাকে…উদ্বাস্তু করে দিলো সারাজীবনের জন্য…
রেডিও চাচার কথা থেমে গিয়েছিলি এরপর।
কড়ইতলার নিস্তব্ধ খা খা দুপুরে আমাদের তিনজনের মধ্যে নেমে এসেছিলো অদ্ভুত নীরবতা, যেন উদ্বাস্তু শব্দটা আমাদের তিনজনকে একসাথে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলো জীবনের অন্যতম সত্যের সামনে।
আমি আর তোতনও সেই অচেনা শহরে তখন উদ্বাস্তু!
জানো, সেদিন আগস্টের ১৭ তারিখ ছিল। হ্যারিসন রোডে আগেরদিন রায়ট লাগার খবর পেলেও বিশ্বাস হয়নি যতক্ষণ না বড় খালা সবাইকে হারিয়ে কোনোমতে জীবন নিয়ে আমাদের বাড়িতে চলে আসে। তবুও চেনা কলুটোলাকে নিয়ে বড়াই করে বলেছিলাম,
আমাদের এলাকায় কেউ দাঙ্গা ফ্যাসাদ করে না…
মনে হয় ঢোক গিলেছিলো রেডিও চাচা তখন, শূন্যে তাকিয়ে থাকা চোখের পাতায় কাঁপুনি দেখেছিলাম স্পষ্ট।
গল্পে আবিষ্ট তোতন নিচু স্বরে বলে উঠেছিলো,
কলুটোলাতেও রায়ট হয়েছিলো?
রেডিও চাচার চোখ দুটোয় এরপর আমি সন্ধ্যা নামতে দেখেছিলাম,
রায়ট…হ্যাঁ হয়েছিলো রায়ট…কলুটোলা আমার অচেনা হয়ে গিয়েছিলো হুট করে। তরোয়ালের ধারে যত মানুষ মরেছিলো তারচেয়েও বেশী মরেছিলো পাশের ঘরের মানুষগুলোকে যমদূত হতে দেখে। আগুনের তাপে গলে গিয়েছিলো মানুষ কিন্তু পুড়েছিলো আপন বন্ধুর বিশ্বাসঘাতকায়…
রেডিও চাচা থেমে যেতেই আমি তাকিয়েছিলাম তোতনের দিকে ,গল্প এগিয়ে নেবার তাড়া প্রত্যাশা করে। কিন্তু নিশ্চুপ তোতনকে দেখে আমি কেন জানি না সেসময় দায়িত্বটা নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলাম,
তোমার বন্ধুও এমন করেছিলো?
আমার কথার উত্তরে কিনা জানি না চেহারায় একটা বিষাদ জেগেছিলো রেডিও চাচার,
না চাইলেও সবাইকে শত্রুই হতে হয়েছিলো সেইদিন। কলুটোলায় তখন বাড়িতে বাড়িতে আগুনে জ্বলছিলো মানুষের আজন্ম সংসার। আমার বন্ধু গৌর বিশ্বাস আগুনের হাত থেকে সংসার নয় শুধু বাঁচাতে চেয়েছিলো আমাদের কয়েকজনকে, তাই চারপাশের নৃশংস সময় থেকে গা বাঁচিয়ে এসেছিলো আমাদের কাছে। বাড়ির সবাইকে নিয়ে পার করে দিতে চেয়েছিলো কলুটোলার আগুনপথ। কিন্তু ওই যে সময়টাই অদ্ভুত ছিল! কলুটোলাতেই পথ আগলে দাঁড়িয়েছিলো ওরা। মুখ বাঁধা হাতে তরোয়াল নিয়ে মানুষগুলোর হুংকারে আমরা বুঝে গিয়েছিলাম আমাদের পথ সেখানেই শেষ। কিন্তু গৌর বিশ্বাস হয়তো জানতো এমন কিছু হবে তাই, পেছন থেকে হ্যাঁচকা টানে আমাকে ধরিয়ে দিয়েছিলো নতুন এক পথ। আমি যখন নতুন পথে জীবনের দিকে ছুটছিলাম তখন একে একে কলুটোলার পথে লুটিয়ে পিড়েছিলো আব্বা, আম্মা, বড় খালা, দাদাভাই আর আপা…
থেমে গিয়েছিলো এরপর রেডিও চাচা। বিষাদ তখন জল হয়ে জমেছিলো তাঁর চোখে। আমি আর তোতন বুঝে গিয়েছিলাম রায়টের বিভৎস গল্প বলার জন্যই রেডিও চাচা সেদিন নতুন পথে হেঁটেছিলেন,
হেঁটে হেঁটে চলে এসেছিলেন এই শহরে?
আমার বোকা বোকা প্রশ্নে তোতন চোখ গোল গোল করে তাকিয়েছিলো তখন আমার দিকে। আর রেডিও চাচা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেছিলেন,
হেঁটেই তো চলেছি সেই থেকে। সেদিনও কতপথ হেঁটে, গঙ্গা-পদ্মা হয়ে এই শহরে এসে থেমেছিলাম একটু জিরিয়ে নেবার জন্য। কিন্তু অবাক হয়ে দেখলাম এই দেশের মানুষও হেঁটে চলেছে ওইপাড়ের দিকে। ঠিক সেদিনই বুঝে গেলাম অদলবদল এই জীবনে থেমে থাকার আসলে কোনো উপায় নেই।
দুপুরের গায়ে গায়ে বিকেল টোকা দিতেই সেদিন বাবা তাড়াহুড়ো করে এসে দাঁড়িয়েছিলেন আমাদের সামনে। রায়টের গল্পে বিরাম লাগিয়ে বলে উঠেছিলেন,
আকাশবাণীতে কিছু বললো ঢাকার খবর?
রেডিও’র অর্থ ঠিক সেইদিন থেকে আমাদের কাছে বদলে গেলো পুরোপুরি।
সেদিন বাবার মুখে অন্ধকার জমেছিলো কীনা তা দেখার সময় হয়নি কিন্তু ইথারে ভেসে চলা সময়গুলো কালোই ছিল। বাবা সেদিন সন্ধ্যায় আবার গিয়েছিলো রেডিও চাচার দোকানে।
না, নিত্যদিনের আড্ডা, মিষ্টি মশল্লার পান কিংবা সন্ধ্যা মুখোপধ্যায়ের গানের বোলে মন ভরাতে নয়। গিয়েছিলো ঢাকার খবর জানতে। ওয়াপদা অফিসে বাবার কলিগরা সারাদিন লুকিয়েচুরিয়ে যা বলেছিলো তার মর্ম উদ্ধার করে বাবা বুঝেছিলো ঢাকায় সাংঘাতিক কিছু হতে চলেছে। তাই বলতে গেলে আসন্ন বিপদের সব আশংকা বিশ্বাস করেই বাবা গিয়েছিলো রেডিও চাচার দোকানে খবর শুনতে।
কিন্তু রেডিও পাকিস্তানে ঢাকার কোনো খবর না পেয়ে রেডিও চাচা নব ঘুরিয়েছিলো আকাশবাণীর দিকে।
এরপর সন্ধ্যা ফুরালে বাবা ফিরে এসেছিলো আমাদের লাল দালানের বাড়িটায়। বিষণ্ণ বাবার ঝুঁকে পড়া কাঁধের ওপাশে রাতটুকু সেদিন খুব নিস্তব্ধই ছিল। শুধু বিছানায় শুয়ে আমি তোতনকে প্রশ্ন করেছিলাম,
ইয়াহিয়া কে রে তোতন? পার্লামেন্ট থামিয়ে দিলে কি খুব খারাপ কিছু হয়?
তোতন খুব আস্তে শব্দটি উচ্চারণ করেছিলো,
যুদ্ধ…
একটু থেমে অর্থ না জানা অচেনা শব্দটির সাথে তোতন আর একটি শব্দ যোগ করেছিলো সে রাতে,
স্বাধীনতা যুদ্ধ…
না, সে রাতে নয় স্বাধীনতা যুদ্ধ শব্দবন্ধের অর্থ আমার কাছে পরিষ্কার হয় তার কিছুদিন পরেই। ততদিনে আমাদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো বাবার অফিসে যাওয়াও। শহরটা হয়ে গিয়েছিলো মিছিলের শহর,
তুমি কে
আমি কে
বাঙালি
বাঙালি…
মিছিলে যেদিন স্কুলের আপাদের দেখেছিলাম সেদিন দৌড়ে তোতনের কাছে গিয়ে বায়না ধরেছিলাম,
চল, আমরাও মিছিলে যাই…
কিন্তু মায়ের অগ্নিদৃষ্টিতে সেই আবদার ভস্ম হয়ে গেলেও লাল দালানের ছাদে সারাদিন শ্লোগান দিয়েছিলাম,
আমি কে
তুমি কে…
আমরা বাঙালি হলে স্কুলের এসেম্বলিতে কেন গাই,
পাকিস্তান জিন্দাবাদ, পাকিস্তান জিন্দাবাদ, পাকিস্তান জিন্দাবাদ…
তোতন বেশ বিজ্ঞের মতোন আমাকে বলেছিলো,
আর কখনও আমাদের ওই গান গাইতে হবে না। রেডিও চাচার দোকানে ওইদিন রেডিওতে শেখ মুজিবের ভাষণ শুনলি না,
এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম…
স্বাধীনতা শব্দটি তারপরের দিনগুলোতে আমাদের সকলের বাতিঘর হয়ে উঠলো।
স্কুলে যাওয়া তো আগেই বাদ হয়ে গিয়েছিলো তার ওপর বাবার কড়া নিষেধে বন্ধ হয়েছিলো যখন তখন গলি পেরিয়ে পিচের রাস্তায় গিয়ে দাঁড়ানোও। বিকল্প হিসেবে তখন আমাদের লাল বাড়ির ছাদটাই ভরসা ছিল। ডাংগুলি, চারগুটি খেলার চেয়েও আমরা সেসময় ছাদে অপেক্ষায় থাকতাম কখন মিছিল রাস্তা পেরোয়,
বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো
বাংলাদেশ স্বাধীন করো…
তোতন যুদ্ধ করতে অস্ত্র লাগে তাই না রে?
আমার সহজ প্রশ্নটার সেদিন একটা কঠিন উত্তর পেয়েছিলাম।
যুদ্ধ করতে সাহস লাগে কাকলী…দেখছিস না আমরা সবাই ভয়ে মিছিলেও যাই না…আর কত মানুষ যুদ্ধ করবে বলে মুক্তি হয়েছে…ওরা আমাদের মতো না…অনেক সাহসী…
তুই মুক্তি দেখেছিস তোতন? কেমন দেখতে ওরা?
আমার কথায় খুব বিরক্ত হয়েছিলো তোতন,
মুক্তি দেখতে তোর মতো…মুক্তি দেখতে আমার মতো…তুই কি জানিস সেলিমের বড় ভাই মুক্তির দলে যোগ দিয়েছে…
শেষ বাক্যটায় তোতনের স্বর নেমে এসেছিলো। কারণ ততদিনে আমরা বুঝে গিয়েছি মুক্তিদের কথা গোপনে বলতে হয়, মুক্তিদের পরিচয় লুকিয়ে রাখতে হয়, মুক্তিদের খবর শুনতে হয় রাতের বেলা ঘরের আলো নিভিয়ে।
এতোসব বিঘ্নতার কথা জেনেও আমি হুট করে তোতনকে অপ্রস্তুত করে দিয়েছিলাম,
তোর মুক্তির দলে নাম লেখাতে ইচ্ছে করে না তোতন?
অপ্রস্তত তোতন কেমন যেন গা ছাড়া একটা উত্তর দিয়েছিলো,
ধুস…আমি তো ভীতু…
যে তোতন স্কুল থেকে ফেরার পথে ইচ্ছে করেই অচেনা পথ ধরতো, যে তোতন সন্ধ্যার পর বয়াম নিয়ে অন্ধকার ছাদে একলা দাঁড়াতো জোনাই পোকা ধরতে, যে তোতন গোরস্তানের মাটি নিয়ে আসতো আমার জ্বরের বাড়বাড়ন্ত হলেই—সে তোতন যে ভীতু তা আমার বিশ্বাস হয়নি সেদিন।
আর আমার সেই অবিশ্বাসকে পুঁজি করেই তোতন একদিন মিছিলে চলে গেলো! বাবার মারের ভয়, মায়ের অস্থিরতা সব অগ্রাহ্য করে। তোতন সেদিন মিছিলে গিয়েছিলো,
তোমার আমার ঠিকানা
পদ্মা, মেঘনা,যমুনা…
তোতন মিছিল থেকে ফিরেছিলো সন্ধ্যার মুখে। বাবার হাতের বেতটাকে পাশ কাটিয়ে ছুটে গিয়েছিলো ছাদে,
জানিস কাকলী এটা আমাদের বাংলাদেশের পতাকা…
জামার ভেতরে লুকোনো পতাকায় লেপ্টে ছিলো তোতনের ঘাম। বাঁশের মাথায় সেই পতাকা বেঁধে দিতেই লাল বাড়ির ছাদটা হয়ে উঠেছিলো একটা বাংলাদেশ।
বাবাকে সেদিন প্রথম কাঁদতে দেখেছিলাম। বেত ধরা হাতে পতাকা ছুঁয়ে অস্পষ্ট বলে উঠেছিলো,
স্বাধীনতা…
না, এতো সহজে কি স্বাধীনতা আসে। এরপরের দিনগুলোতে স্কুল অফিসের মতো মিছিলও বন্ধ হয়ে যায়। আশেপাশের বাড়িগুলো হয়ে যায় মানুষ শূন্য। সবাই তখন ছুটছিলো গ্রামে,
গ্রামের দিকে মিলিটারি যাবে না…এই শহরেই যত ভয়…সব শহরেই নাকি ক্যাম্প হবে…
তাহলে উপায়?
গ্রামে চলে যান পরিবার নিয়ে ভাই…শহর কিন্তু নিরাপদ নয়…
রেডিও চাচা কথাগুলো বলতেই অবধারিত প্রশ্নটি এসেছিলো বাবার কাছ থেকে,
আর আপনি?
উত্তরে মাথা নেড়েছিলো রেডিও চাচা,
আর কতবার উদ্বাস্তু হবো?
রেডিও চাচাকে শহরের জিম্মায় রেখেই আমাদের উঠতে হয়েছিলো খেয়ায়। কিন্তু সে যাওয়ার নিমিত্তেই ছিল তোতন।
ততদিনে শহর হয়ে গিয়েছিলো আরোও থমথমে। মিছিল হারিয়ে শহরের পথগুলো হয়েছিলো আরোও নীরব।আশেপাশের মানুষের চোখেমুখে জমেছিলো ভয়ের এক সমুদ্র অন্ধকার।
শুধু বিহারিপাড়া ছিল সবকিছু থেকে ভিন্ন। স্কুলে যাবার পথে রেলস্টেশন পার হলেই বিহারি পাড়া। ওই পাড়ার সবাই হ্ঠাৎ করেই হয়ে উঠেছিলো হিংস্র। স্কুলে যাওয়া বন্ধ ছিল তাই বিহারি পাড়ার দিকে যাওয়াও তখন বন্ধ ছিল। কিন্তু তোতনকে কোনো এক কাজে সেদিকে যেতে হয়েছিলো। কিন্তু সাধারণ এ পাড়া থেকে ও পাড়ায় যাবার খুব স্বাভাবিক ঘটনাটা আমাদের জীবনে অস্বাভাবিক এক ঘটনা হয়ে উঠলো।
বিকেল গড়াচ্ছিলো কিন্তু তোতন ফিরছিলো না। কোথাও ‘ডাংগুলি খেলছে’ এই বাক্য দিয়ে বাবাও অপেক্ষা করেছিলো সন্ধ্যা অব্দি। কিন্তু যখন সন্ধ্যা গড়িয়ে গেলে তোতনের পায়ের আওয়াজ লালবাড়ির ফটকে পৌঁছালো না তখন বাবা হন্তদন্ত হয়ে বেড়িয়ে গিয়েছিলেন। এরপর ফিরেছিলেন রক্তাক্ত তোতনকে নিয়ে। বিহারি পাড়ার কিছু ছেলেপেলে নাকী তোতনকে দেখে ‘গাদ্দার’ ডেকেছিলো। তোতনও রেগেমেগে ছুটে গিয়ে ওদেরকে বলেছিলো ‘জুলুমবাজ’। এরপর দু’পক্ষের মারামারি। ওরা কয়েকজন ছিল। কিন্তু তোতন তো ছিল একা। তাই কিলঘুষিতে ঠোঁট ফাটিয়ে তোতন হয়েছিলো রক্তাক্ত। বাবার ভয়ে বাড়িতে ঢুকতে না পেরে স্কুলের মাঠে বসেছিলো তোতন। রেডিও চাচাই খুঁজে পেয়েছিলো সেদিন তোতনকে,
আর দেরী করেন না, বিহারিগুলো দিনরাত রাম দা আর ছুড়ি ধার দেয় এখন। ছেলে প্রাণে বেঁচে আছে আজ, কাল এমনকিছু হলে আর ছেলে ফিরে পাবেন কীনা জানি না। পরিবার নিয়ে গ্রামে চলে যান এসব ঝামেলা ততদিন কমুক খানিক…
আসলে মৃত্যূর অপেক্ষায় বসে থাকা নিরাপত্তাহীন শহর থেকে আমাদের পালাতেই হতো। যদি তোতন সেদিন বিহারীপাড়া থেকে মার খেয়ে ঠোঁট ফাটিয়ে নাও আসতো, তবুও হয়তোো আমাদের গ্রামে পালাতেই হতো, যদি শহরের বুকে মিছিল থেকে মানুষগুলো হারিয়ে যেতে না শুরু করতো, তবুও আমাদের গ্রামে পালিয়ে যেতেই হতো।
কারণ তোতনের সঙ্গে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে যাওয়ার দু’দিনের মাথায় শহরের মসজিদ থেকে মাইকে ভেসে আসে মোয়াজ্জেমের ঘোষণা,
আমবাগান থানা কলোনিতে আর্মির ক্যাম্প বসেছে। তাদের আগমন শহরবাসীর জানমালের নিরাপত্তার জন্য, তবে কেউ যদি পাকিস্তানবিরোধী কিছু করে থাকে তবে তা শক্ত হাতে মোকাবিলা করাও পাকিস্তান আর্মির লক্ষ্য। আপনারা সকলে আইন মেনে চলিবেন… দেশদ্রোহিদের খবর ক্যাম্পে পৌঁছে দিয়ে নিজেকে ঈমানদার প্রমাণ করিবেন…
সেদিন অন্ধকারে বাবার মুখটি খুব অস্পষ্ট ছিল। সেই মুখ থেকে একটা শব্দই বেরিয়েছিলো,
রাজাকার…
সেদিন শহর জেগেছিলো সারারাত। মুহূর্মুহু গুলির শব্দ আর আর্তচিৎকার থেকে বাঁচতেই মনে হয় আমি সিঁটিয়ে যাচ্ছিলাম মায়ের বুকে। খানিক পরপর বিহারীদের উল্লাসিত চিৎকার আমাদেরকে মৃত্যূর ঘ্রাণ দিয়ে যাচ্ছিলো অবলীয়ায়। সে রাতেই বুঝে গিয়েছিলাম শহরের বুক থেকে স্বাধীনতা শব্দটিকে খুন করে ফেলা হচ্ছে এক একটি আত্মচিৎকারের সাথে।
বাবা সিদ্ধান্ত নিলেন,
শেষরাতের দিকে গোলাগুলি একটু কমে এলেই আমরা শহর ছেড়ে চলে যাবো।
আচ্ছা, কোথায় চলে যেতে চেয়েছিলাম আমরা সেই শেষরাতে? মৃত্যূপুরী শহর ছেড়ে জীবনের দিকে? নাকী জীবন বলে আমরা যার দিকে প্রাণপণে ছুটেছিলাম সেটাও ছিল মৃত্যূরই নামান্তর?
সেদিন গোলাগুলি চলেছিলো রাতভর। দুই একটা বোমার শব্দও পেয়েছিলাম। কিন্তু মানুষ নয় গুলির তান্ডব কমিয়েছিলো প্রকৃতি। রাত ফুরাবার আগেই আকাশ থেকে ঢল নেমেছিলো সব রক্তের দাগ মুছে দিতে। আর্মিরা সব খরার দেশের মানুষ। তাই জলকাঁদায় একাকার হতে হতে সে রাতের অপারেশন অসমাপ্ত রেখে ওদের ফিরতে হয়েছিলো আমবাগানের ক্যাম্পে।
এরপর শহরের বুকে নেমেছিলো খা খা নীরবতা। সেই নীরবতায় নিজেদের লুকিয়ে আমরা পৌঁছে গিয়েছিলাম খেয়াঘাটে। খেয়াতে ছিলো আমাদের মতোই ত্রস্ত আরও কিছু মানুষ। আকাশ থেকে তখনও ঝড়ছিলো অকালের জল। সবাই ভিজে জুবুথুবু। অবিশ্বাস আর ভয় মিলেমিশে সবার দৃষ্টিগুলো ছিলো খুব অচেনা। সেই অচেনা দৃষ্টির মানুষগুলোর সাথেই আমাদের পাড়ি দিতে হয়েছিলো জীবনের সবচেয়ে বন্ধুর পথটি।
মাথাগুণে নয় সেদিন মুখ দেখে খেয়াতে তোলা হয়েছিলো আমাদের। চেনা হলে তবেই খেয়াতে ঠাঁই নতুবা নয়। তবে খেয়া ভরে গেলেও মাঝি বাঁশের খুটা থেকে খেয়ার বাঁধন খুলতে কালবিলম্ব করছিলো,
দিন ফুঁটে উঠবে তো আরেকটু পর , দেরী করছো ক্যান মাঝি…নাওয়ের বান্ধনে ঢিল দাও..আরেহ আরেহ বাচ্চাটারে থামান…এতো চেঁচামিচি করলে তো আর্মির গাড়ি নদীর দিকেই নিশানা করবে…বউ এতো খচমচ না করে চুপচাপ বসো…আল্লাহ চাইলে কিচ্ছু হবে না দেখো…আব্বা একটু মুখ চেপে কাশেন…এতো আওয়াজ করলে ওদের চোখে পড়তে দেরী লাগবে না…
ফিসফিসানি আওয়াজগুলো একত্র হয়ে অদ্ভুত এক হট্টগোলের সৃষ্টি হয়েছিলো তখন খেয়ায়। ঠিক তখনি থানার পাশে বেজে উঠেছিলো সাইরেন। কেন সাইরেন বাজে সে কথার অর্থ না জানলেও ভয়াবহ কিছুর ইঙ্গিত ছিল সেই তীক্ষ্ণ আওয়াজে। খেয়ার সব আওয়াজ এক নিমেষে মৃত্যূর মতো স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলো কোনো অশুভ আশংকায়।
তখন অবশ্য জলের ভেতর বৈঠা ঠেলার আওয়াজটুকুতে বুঝছিলাম আমরা জীবনের দিকে এগোচ্ছি!
কিন্তু আমারই পাশে বসে থাকা নিঃশ্চুপ তোতন তখন কেন যে জীবনের পথটুকু অগাহ্য করলো, তা আজ অব্দি আমার জানা নেই।
খেয়া থেকে নদীর ভেতর ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে তোতনের কয়েকটা শব্দ বাতাসে এলোমেলো ভেসেছিলো সেদিন অনেকক্ষণ,
পতাকা আনা হয়নি…বাংলাদেশের পতাকাটা…দেশ স্বাধীন হলে ছাদে উড়াতে হবে…আমাদের পতাকা…
এরপর ঝপাৎ…
বুকের ভেতর সেই শব্দটা এখনো পাড় ভাঙে। এখনো চোখ বুজলেই দেখতে পাই অন্ধকার নদীর কালো জলে তোতন সাঁতরে চলে যাচ্ছে আমাদের থেকে একটু দূরে…আরেকটু দূরে…অনেক দূরে…
বাবা অনেক অনুরোধ করেছিলো খেয়া কাছের ঘাটে থামাতে। কান্নাকাটি করে ব্যর্থ হয়ে লুকিয়ে আনা গয়নার টোপলা মেলে দিয়েছিলো মাঝির সামনে। একটাই অনুনয়,
আমার ছেলেটা পানিতে তলিয়ে যাবে রে…
না, সেদিন কোনো অজুহাতেই খেয়া থামেনি আমাদের গ্রামের ঘাটে পৌঁছার আগে। আসলে সন্নিকট মৃত্যূর হাতছানিটুকু সেসময় সকলেই দ্রুত পেছনে ফেলতে চাইছিলো। তাই তোতনকে ছাড়াই সেদিন পৌঁছাতে হয়েছিলো আমাদের গ্রামে।
তোতনকে অনিশ্চয়তার কাছে রেখে সেদিন আমরা পৌঁছেছিলাম নিশ্চিত একখন্ড জীবনের কাছে।
তবে অদ্ভুতভাবে সেই জীবনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল তোতনই। সে রাতে গ্রামের ঘাটে খেয়া বাঁধলেও পরদিন ভোরেই বাবা যেতে চেয়েছিলো শহরে। মাকে বুঝিয়ে শান্ত করা হয়েছিলো শহরে অন্তত রেডিও চাচা তো আছে, তোতনকে ঠিক নিজের কাছে নিরাপদে রেখে দিবেন উনি।
তোতনকে ঘিরে এতোসব পরিকল্পনা কিংবা কল্পনা পুরোটাই ভেস্তে গিয়েছিলো সে রাত ভোর হতে হতে। এক একটি সর্বহারা দল, এক একটি বিভ্রান্ত পরিবার, এক একটি নিরন্ন মানুষ গ্রামে জমা হতে শুরু করলো শহরের বীভৎস ধ্বংসের কান্না নিয়ে।
সেই কান্নায় পুড়ে যাওয়া শহর, বেয়োনেটের ক্ষত আর ডোবা-নালায় ভেসে ওঠা গলে যাওয়া লাশের আজাহারি থেকে আমরা বুঝে গিয়েছিলাম তোতনের সাথে আমাদের দূরত্বের নাম স্বাধীনতা!
আর তোতনকে ফিরে পাওয়ার জন্যই বুঝি স্বাধীনতার জন্য আমাদের হাহাকার বেড়ে গিয়েছিলো কয়েকগুণ। ততদিনে শহুরে উদ্বাস্তুদের কাছ থেকে গ্রামের সবাই জেনে গিয়েছিলো মুক্তিদের কথা, জেনে গিয়েছিলো ক্র্যাক প্লাটুনের নাম, জেনে গিয়েছিলো স্বাধীন বাংলা বেতারের নাম।
হ্যাঁ, আমাদের উদ্বাস্তু জীবনে তখন আবার ফিরে এসেছিলো রেডিও। তিন ব্যান্ডের একটা ছোট্ট রেডিও। সেই রেডিও আমার অপ্রকৃতিস্থ মায়ের আশ্চর্য জীয়নকাঠি হয়ে উঠেছিলো সে সময়। তোতন কোথায় আছে, কার সাথে আছে কিংবা আছে কি নেই—-এমন অনিশ্চয়তায় আমরা যখন দিশেহারা তখন মা ব্যাস মুনির মতো ধ্যানে থাকতো, নীরব শীতল। আর কখনো কখনো সেই নীরবতা ভেঙে সংযোগ বিয়োগের হিসেব কষে বলে উঠতো,
তোতন আসবে…পতাকাটা পেলেই চলে আসবে…কেন যে হারিয়ে ফেললাম আমি পতাকাটা…
এরপর যথারীতি চিৎকার, চেঁচামেচি, বাবাকে কটুকথা।
বাবা মাথা নিচু করে সব শুনতো। কে জানে হয়তোো তোতনকে ফিরিয়ে আনতে না পারার অপারগতায় বাবা লজ্জিত হতো। কিন্তু আমি ততদিনে জেনে গিয়েছিলাম মাকে নীরব করার মন্ত্র। তিন ব্যান্ডের রেডিওটা মায়ের আঁচলের তলায় লুকিয়ে দিয়ে বলতাম,
মুক্তিদের কথা বলবে…পতাকার কথা বলবে…
আর কিছু নয়, শুধুমাত্র মুক্তিদের কথা শোনার লোভে মায়ের উদভ্রান্ত চোখ শান্ত হয়ে আসতো। রেডিওটা বুকের ভেতর জড়িয়ে ঘরের অন্ধকারে তলিয়ে যেতে যেতে অস্ফুট কয়েকটি শব্দ পেছনে ফেলে যেত মা,
পতাকাটা…কোথায় গেলো…তোতন…
আমরা তখন অন্ধকার আগলে বসে থাকতাম। কারণ মায়ের আঁচলে লুকোনো রেডিওর বেজে ওঠার অধিকার ছিল শুধুমাত্র রাতেই। কারণ গ্রামেও মানুষজন যতই জেনেছে স্বাধীনতা যুদ্ধের কথা ততই যেন স্পষ্ট হতে শুরু হয়েছিলো বিভেদ। মুক্তিদের পক্ষে বিভেদ, স্বাধীনতার পক্ষে বিভেদ। কেউ কেউ তো আবার
“পাকিস্তান জিন্দাবাদ, পাকিস্তান জিন্দাবাদ, খাইবার ধারে তার পতাকাবাহী, মেঘনার কূলে যত বীর সিপাহী, প্রাচ্য-প্রতীচ্যের মিলন গাহি, ঝা- জাগে যে আজাদ” গাইতে গাইতে শান্তিবাহিনীতে নাম লিখিয়ে আসতো।
তাই তিন ব্যান্ডের রেডিওটায় বাবা নব ঘুরাতো রাতের অন্ধকার ঘন হলে। মায়ের কোলে খুব নিচু আওয়াজে বেজে চলতো,
ভেবো না গো মা
তোমার ছেলেরা হারিয়ে গিয়েছে পথে…
নীরব মায়ের দীর্ঘশ্বাস তখন কান্না হয়ে ঘুরে বেড়াতো রাতের গায়ে। আর আমি চোখ মুছে ভেজা গলায় ফিসফিসিয়ে উঠতাম,
পতাকাটা পেলেই ফিরবে তোতন…
তোতনের ফিরে আসার প্রতীক্ষায় জমতে থাকে দিনের পরে দিন। রেডিওর প্রতিও বাড়তে থাকে মায়ের একতরফা দখলদারিত্ব। নব ঘুরিয়ে নিজের কানের সাথে লেপ্টে রাখা রেডিওতে জল্লাদের দরবার শুনতে শুনতে মায়ের চেহারায় জেগে ওঠা রেখা গুণে মাপতে শিখে গিয়েছিলাম আমি স্বাধীনতার দূরত্ব। মরা কার্তিকের পূর্ণিমা ফুরাতেই আমরা বুঝে গিয়েছিলাম স্বাধীনতা আসছে।
আর স্বাধীনতার পতাকা নিয়ে তোতনও ফিরে আসবে, এ যেন আমাদের কাছে অবধারিতই ছিল।
এরপর ডিসেম্বর। সবাই ফিরছে ঘরে। কিন্তু আমাদের অপেক্ষায় বিরাম টেনে তখনও ফেরেনি তোতন।
ততদিনে গ্রাম ছেড়ে শহরে ফিরেছি আমরা। লালবাড়িটা তখন পুরে যাওয়া এক কংকাল। সেই কংকালে ঘর পেতেছে কতক অচেনা মানুষ। না, তারা কেউ চেনে না তোতনকে। তারা কখনো শোনেনি তোতনের নাম।
তাহলে তোতন কোথায়? রাস্তার পাশে রেডিও চাচার দোকানটা তখন পুরোপুরি উধাও ঠিক মানুষটার মতোই।
বাবা এখানে খোঁজে ওখানে খোঁজে কোথাও নেই তোতন! খোঁজ পাওয়া যায় না রেডিও চাচারও। শুধু প্রতিবেশীদের ফিসফাসে উদ্ধার হয় বিহারি পাড়ার বধ্যভূমির নাম, যেখানে অনেক আগে একটা ডোবা ছিলো।
কিন্তু কংকাল আর আধাগলা লাশের ভিড়ে কেন তোতন থাকবে? তোতন তো কিচ্ছু করেনি শুধু নিজের পতাকাটা খুঁজে বের করা ছাড়া!
নদী সাঁতরে আর্মির গাড়ির চোখ বাঁচিয়ে সেদিন তোতন ঠিকই ফিরেছিলো লালবাড়িতে। পতাকাটা নিজের কোনো এক প্যান্ডোরা বাক্স থেকে খুঁজেও পেয়েছিলো। কিন্তু কোনো এক অজানা লেনদেনের হিসাব মেটাতে তোতনের সামনে সেদিন পড়েছিলো বিহারি পাড়ার সেই ছেলেগুলো। হিসেবের অংকে ওরা আগুন দিয়েছিলো রেডিও দোকানে। আর তোতনের জন্য অনুনয়ের হিসেবটকু বরাবর করতে রেডিও চাচাকেও ওরা তুলে নিয়েছিলো তোতনের সঙ্গেই।
তোতনকে কি ওরা মেরে ফেলেছে?
এই উত্তর জানা ছিল না কারোরই। তাই আমরা তখন তোতনকে খুঁজছি নাকী তোতনের গলিত দেহকে, এই ব্যাপারটা পরিষ্কার করতে চেয়েছিলো মা,
তোতনকে খুঁজতে বিহারি পাড়ার ওই ডোবায় কেন যেতে হবে?
বাবা অপ্রস্তুত হয়েছিলো। নিজের অস্বস্তিটুকু ঢাকতে ঢোক গিলেছিলো কয়েকবার,
সবাই বলছে ওই বধ্যভূমির কথা…
অসমাপ্ত বাক্যটায় হাহাকার জুড়ে দিয়ে চেঁচিয়ে উঠেছিলো মা,
পতাকাটা পেলেই ফিরবে তোতন…ওই তো ওই পতাকাটা…
এরপর মা একদম নীরব হয়ে গিয়েছিলো। কী ভেবেছিলো কে জানে। শুধু যখন তখন রেডিওর নব ঘুরিয়ে একমনে বলতে থাকতো,
জল্লাদের দরবার…জল্লাদের দরবার…
আমি কিংবা বাবা এরপর কখনই আর রেডিওটার প্রয়োজন অনুভব করিনি। কারণ ততদিনে আমরা জেনে গিয়েছিলাম রেডিওতে রণাঙ্গনের কোনো খবর আর আসবে না। তোতনের মতো পতাকা আনতে গিয়ে যারা হারিয়ে গেছে তারাও আর ফিরবে না।
কিংবা ফিরবে না রেডিও চাচা, যার কাছে সারাটা জীবন দেশ শব্দটা ছিল এক অচিনপাখি।
তবে আজ আমার কাছে দেশ কোনো অচিনপাখি নয়। এমনকি হুবহু সেই লালবাড়ির মতো একটা ছাদও আছে আমার।
যে ছাদে দাঁড়িয়ে আমি এখনো খুঁজতে থাকি মিছিল।এখনো শুনতে চাই গগনবিদারী শ্লোগান। কারণ আমি জানি এই শহরে তোতন অথবা রেডিও চাচারা বারবার ফিরে আসে, কখনো উদ্বাস্তু আবার কখনো মুক্ত একটা পতাকা হয়ে। ফিরে আসে একটি দেশ হয়ে।


1 মন্তব্যসমূহ
অসাধারণ একটা গল্প!
উত্তরমুছুন