জাহিদ হায়দারের গল্প : র-ফলা


‘আগে নাম ছিল হলি ফ্যামিলি রেড ক্রস’,
‘এরশাদ করল রেড ক্রিসেন্ট’,
‘সে তো রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম করল, জিয়া সংবিধানে বসিয়ে দিল বিসমিল্লাহ।’
‘পবিত্র পরিবার ও লাল ঠিকই থাকল, যোগ হলো ক্রিসেন্ট’,
‘সামরিক শাসকরা জনগণকে শাসন করতে ধর্মকে ব্যবহার করে’,
‘অশিক্ষার দেশে ধার্মিকতার চেয়ে ধর্মান্ধতা বেশি বিক্রি হয়’,
‘আজকাল অনেক গণতান্ত্রিক সরকারও ক্ষমতায় থাকার জন্য ধর্মকে ব্যবহার করছে’,
‘ক্রিসেন্ট, অর্ধাকার চাঁদ। মনে হয় ক্রিসেন্ট ইরানের প্রথম বা দ্বিতীয় শাহ পাহলবি করেছিল’,
‘লাল বললেই প্রথমে রক্তের ছবি সামনে আসে,’
‘খ্রিষ্টানরা যিশুর ত্যাগকে মানবসেবা মনে করে। ভালোবাসা, মানবসেবা শ্রেষ্ঠ ধর্ম। মনে হয় যিশুর ক্রসকে লাল করবার চিন্তাটা ক্রুসেডকে মনে রেখে করা,’
‘এই হাসপাতালকে আমরা হলি ফ্যামিলিই বলি। যদিও হলি ফ্যামিলি বলতে বোঝায় যিশু, মেরি আর যোসেফকে’,
‘চিকিৎসকরা একটা পবিত্র পরিবার। সেবা তো পবিত্র কাজ,’
‘যে-জন সেবিছে মানুষ সে-জন সেবিছে ঈশ্বর।’

খুব মনোযোগ দিয়ে, একটু দূরে, দূরত্ব পাঁচ ছয় হাত হবে, সব কথা স্পষ্টভাবে শোনার পরও দুই তরুণের কথাবার্তার কোনো কিছুই, হাসপাতালের লম্বা বারান্দার রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা, গায়ের রং শ্যামলা, ষোলো বছর বয়সী, লাল-সবুজ সালোয়ার-কামিজের সঙ্গে হলুদ রঙের ওড়না পরা, পিঠের মাঝামাঝি পর্যন্ত নেমে আসা, যেন দুটি কালো বিষহীন সাপ পিঠের ওপর আলস্যে শুয়ে আছে, নারকেল তেল দেওয়া চুলের দুই বিনুনি করা হাফিজা বুঝতে পারছিল না।

‘ক্রিসেন্ট’, ‘ক্রুসেড’ ‘শাহ পাহলবি’ কী? খাবার না দেখার জিনিস? হাফিজা বোঝেনি। তবে কবিতার মতো আর একটা সুন্দর কথা : ‘যে-জন সেবিছে মানুষ সে-জন সেবিছে ঈশ্বর,’ এবং ‘ভালোবাসা’ শব্দটি কানে আসার পর হাফিজার চোখেমুখে গোধূলিবেলার ছাপ পড়েছিল। তরুণদের কথা শুনে তার মনে হয় : ‘আমিও একটা পবিত্র কাজ করছি। বুড়ো মানুষটার সেবা করছি। চৌধুরী খালু মানুষটা ভালো।’

দুই.
কেবিনের দরজার ওপর ছোট কার্ডে লেখা করিম চৌধুরী। অসুখের যে বিভিন্ন শ্রেণিমান আছে তার মধ্যে জনাব চৌধুরীর অসুখের শ্রেণি উচ্চ। মানুষকে, স্বরে ব্যক্তিত্ব ফুটিয়ে, হতে পারে ইংরেজি শব্দ বলবার সময় শব্দের ওপর স্বরের চাপ বেশি দিতে হয়, শুনে মনে হয়, তিনি বলেন সহজভাবেই, সহজ হওয়ার কারণ হতে পারে, বারবার কথাগুলো বলা, ‘পারকিনসন’, ‘হাইপারটেনশন’, ‘সুগার হাই’, ‘হার্টে দুটো রিং’, ‘প্রেশার।’

হাফিজা খেয়াল করেছে, পেট খারাপ হলে, চৌধুরী বা তাঁর বাড়ির লোকেরা, মানে তাঁর মেয়ে রাইসা, ছোট ছেলে শিপলু, বিধবা বোন, যাকে হাফিজা বলে রিঙ্কু খালা, কখনো তারা বলে না, ‘পাতলা পায়খানা বা হাগা হচ্ছে।’ বলে, ‘পেটটা ডিজঅর্ডার হয়ে গেল, পটি হচ্ছে।’ ইংরেজি শব্দ দুটির অর্থ হাফিজা জানত না। জানবার কথাও নয়। একদিন শুনল, চৌধুরী ডাক্তারকে ফোনে বললেন, ‘অ্যাবডমিনাল ডিজঅর্ডার।’ কথাগুলো বারবার শুনে, ডাবের পানি, স্যালাইন আর পেট খারাপের ওষুধ খাওয়া দেখে তার মনে হয়েছে, হতে পারে কথাগুলোর মানে পেট খারাপ। দিনে কে কবার পায়খানায় গেছে সে-কথা না বলে, বলে, ‘বারবার টয়লেটে যাওয়া ভেরি ডিস্টার্বিং।’ পরে একদিন, রাইসার মেজাজ খুশিতে আছে বুঝে হাফিজা জিজ্ঞেস করেছিল, ‘অ্যাবডমিনাল ডিজঅর্ডার মানে কী?’ রাইসা প্রশ্নটা শুনে হাফিজার চোখের দিকে তাকায়, বোঝার চেষ্টা করে, মেয়েটি এই শব্দ দুটির অর্থ জানতে চায় কেন। ‘বললে মনে রাখতে পারবি?’ ‘হ্যাঁ পারব।’ হাফিজার উত্তর ফাঁপা ছিল না। ‘পেট খারাপ, পেট খারাপ।’ হাফিজার মনে পড়ে, সে যখন ক্লাস টু-এর ছাত্রী ছিল, স্যার ক্লাসে বলেছিল, পেটের ইংরেজি বেলি। রাইসার ইংরেজিজ্ঞান নিয়ে তার সন্দেহ হয়। কিছু বলে না।

সিদ্ধেশ্বরীতে চৌধুরীদের ১৮ শ’ স্কয়ার ফুটের ফ্ল্যাটে দুই বছর হলো হাফিজা কাজ করছে। এই বাসার যারই চুলকানি, পাচড়া, কানে পুঁজ ইত্যাদি নিম্নমানের অসুখ হোক না কেন, হচ্ছে তো, হলে অন্য এক ভাষায় জেনাজানা অচেনা মানুষকে বলে। হলো চুলকানি, বলে ‘হঠাৎ স্কিনে র‌্যাস উঠল’, ‘বারবার কেন যে পেটটা ডিজঅর্ডার হচ্ছে।’ হাফিজা মনে মনে হাসে। ‘ক্যান রাইতে খাওয়ার সময় মনে ছিল না কতটুক খাইতে হবে। খালি তো গিলছো। খিদা না লাগলেও তো খাও। আইসক্রিম খাচ্চ। শেষ হতে না হইতেই মোটা বার্গার। তারপর বড় মগে কফি। দাঁত জিহ্বা তখনো গরম, পাস্তা চাই। আমার তো ওই সব অসুখ হয় না।’

রাইসা চৌধুরী, করিম চৌধুরীর বড় মেয়ে, একটি আন্তর্জাতিক ব্যাংকের এইচআর হেড। সিলভি রাইসার মেয়ে। পাঁচ-ছয় বছর বয়স, কথায় কথায় ইংরেজি শব্দ বলে, পুরো বাক্য বলে না, এক ইংলিশ স্কুলে পড়ে, নানুর পেট খারাপ হলে বলে, ‘তুমি ডায়াপার পরো, সো, তোমাকে বারবার টয়লেটে যেতে হবে না।’ ডাবের পানি খেতে খেতে নানু বলে, ‘মাই ন্যটি ডার্লিং।’

তিন.
কেবিনের দরজা খুলল রাইসা। হাতের ইশারায় হাফিজাকে ভেতরে যাবার জন্য ডাকে। দুজন তরুণের কথা আরও কিছুক্ষণ শুনতে পারলে, হয়তো বেশির ভাগ কথার কিছুই বুঝত না কিন্তু হাফিজার ভালো লাগত।

হাসপাতালে হাফিজার ডিউটি সকাল সাড়ে আটটা থেকে রাত সাতটা পর্যন্ত। সারা দিনে কোনো না কোনো আত্মীয় বা চৌধুরীদের পারিবারিক বন্ধুরা করিম চৌধুরীকে দেখতে আসে। অনেক কথার ভেতর চিকিৎসার মান নিয়ে দু-তিনবার বলবেই। যে বলে, মনে হয় সে বড় ডাক্তার। হয়তো জুতোর ব্যবসায়ী। কেউ কেউ নামকরা হাসপাতালে, যেখানে সামান্য সর্দি হলেও পঞ্চাশ হাজার খরচ হয়, যেতে বলে।

রাইসা জানে, কখন ডাক্তার ভিজিটে আসবে। ওই সময়, বেশির ভাগ দিনই রাইসা অফিসে থাকে, তখন কেবিনে থাকে হয় রাইসার ছোট ভাই শিপলু, চাচা অথবা তার মেয়ে সাহানা চৌধুরী। ডাক্তার যা যা বলে সব কথা, ডাক্তার চলে যাবার পরই অফিসে ফোন করে জানানো হয় রাইসাকে। যেদিন সাহানা থাকে প্রায় সারাক্ষণ দু-তিনজন, হাফিজা বোঝে, ছেলের সঙ্গে কখনো হেসে, কখনো রাগ করে ইংরেজি ও বাংলায় কথা বলে, তুইতুকারি করে এবং কথার মধ্যে ‘ওহ শিট’ আর ‘ফাকিং’ বলে। হাফিজাকে পছন্দ করে না। সব কাজে ভুল ধরে।

টিঙ্কু, রাইসার বড় ভাই, থাকে অস্ট্রেলিয়ায়। প্রায় প্রতিদিন অসুস্থ বাবা ও বোনের সঙ্গে ফোনে কথা বলে। বাপের চিকিৎসার জন্য টাকার চিন্তা যেন রাইসা না করে, বলে দিয়েছে টিঙ্কু।

এখন করিম চৌধুরীর স্যুপ খাবার সময়। রাইসা অনেকবার দর্শনার্থীদের সামনে বলেছে, ‘হাফিজা ভালো করে স্যুপটা খাওয়াতে পারে।’

করিম চৌধুরী বেশি খুশি হতেন, যদি মেয়ে তাঁকে স্যুপটা খাওয়াত। খাবার সময় দু-একটি কথা, ‘তোরা আসার পরই আমি অনেকটা ভালো হয়ে যাই’, ‘কালকে সিলভিকে আনিস্, ওকে এক সপ্তাহ দেখি না।’ প্রায় প্রতিদিনই একই রকম কথা, যা শুনে শুনে রাইসার শ্রবণ অভ্যস্ত হয়ে গেছে, ভেতরে বিরক্ত হয়, বুড়োরা বেশি স্নেহভাব দেখায়, বাবাকে বিরক্তিটা বুঝতে দেয় না, বলে : ‘বাচ্চাদের হাসপাতালে আসা ঠিক না, ওদের ইমিউনিটি তো বড়দের লেভেলের না। হাফিজা স্যুপটা খাইয়ে দে।’

চার.
দুপুরের কিছুক্ষণ পর থেকে সন্ধ্যা ছয়টা-সাতটার মধ্যে, হাফিজা হাসপাতালে ডিউটি করবার অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছে, অনেক লোক, ফল, স্যুপ, বিস্কুট, ভাতের সাথে মাছ, মুরগি নিয়ে রোগী দেখতে আসে। দু-একজন আসে ফুল নিয়ে। তারা নাকি বিদেশে থাকে।

কিছু দর্শনার্থী রোগীর ঘরে বসে কমলা খায়, আপেল খায়। এবং আপেল খেতে খেতে হেসে হাফিজাকে, আপেল কী ভাবে কাটতে হয়, বলে। ‘চার ফালি করলাম। কামড়ায়ে খাইলে তো দাঁতের জোরও বাড়তো?’ আপেল কাটার মধ্যে কীভাব আছে, হাফিজা বোঝে না। রাইসা আপা বলেছে বলেই হাফিজা দর্শনার্থীদের খেতে বলে। ‘শোন, যারা বাবাকে দেখতে আসবে তাদের খেতে দিবি, এত ফল, বিস্কিট, জুস খাবে কে? নষ্ট হবে। তোর যখনই কিছু খেতে ইচ্ছে করবে, খাবি, স্যুপটা কাউকে দিবি না, বাবা স্যুপ পছন্দ করে।’

একটা ব্যাপার হাফিজা তার সাধারণ বুদ্ধিতে কিছুতেই মেলাতে পারে না। রোগীকে দেখতে আসবে ভালো কথা, তবে কেউ কেউ সেজেগুজে, গায়ে পারফিউম লাগিয়ে আসে কেন। হাসপাতাল কি একটা বেড়াবার জায়গা? দুদিন আগে রাইসার ছোট খালা, সে নাকি কানাডায় থাকে, এসেছিল। বয়স চল্লিশের ওপরে হবে। খুব কথা বলে, কথা মাটিতে পড়তে দেয় না। যেকোনো কথায় হাসে। তার সঙ্গে ছিল রাইসার মেজ খালার ছেলে পিল্টু, সাধারণ কাপড় পরা, জামাটা ময়লা, জিন্সের প্যান্টও ময়লা, মাথায় ঝুঁটি বাঁধা চুল, বাঁম হাতে পীরের দরগার লাল-সাদা ফিতা বাঁধা, মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। ‘মেজ খালাম্মাকে দেখে এলাম। পিল্টু বাসায় ছিল। ওকে নিয়ে আসলাম। শিপলুকে ফোন করেছিলাম আসতে, এখান থেকে চায়নিজে যাবো, বলল কি একটা জরুরি কাজ আছে,’ বলল কানাডার খালা।

খালা খুব সাজ দিয়ে এসেছিল। পাতলা ঠোঁটে হালকা গোলাপি লিপস্টিক, বড় কপালে নীল টিপ, শাড়ির আঁচল নীল, বাঁম হাতের ঘড়ির ফিতা নীল, ডান হাতে সোনার দুটি চুড়ি, স্যান্ডেলের ফিতা নীল। কালো চুল কাঁধ পর্যন্ত। খালা যখন কথা বলে, মাথা এদিক-ওদিক করে, দোলে চুল। হাফিজা দেখেছে আর ভেবেছে, আসবার আগে এত নীল মিলাতে, আয়নার সামনে খালা কতক্ষণ ছিল। ‘দুলাভাই আপনাকে, এই রাইসা, শেভ ছাড়া, আপনি তো, আপা বলত, প্রতিদিন সকালে শেভ করবেনই, কেমন ডাল লাগছে, মুখটা স্যাড লাগছে, এই রাইসা, দুলাভাইকে শেভ করাবি, র্বার্বাকে কল করলেই এখানে আসবে। দাড়ি বড় হলে আরও রোগী রোগী লাগে, রোগীর মনে একটা সাইকোলজিক্যাল ইফেক্ট পড়ে।’

খালা যাওয়ার সময় হাফিজার দিকে তাকিয়ে, দৃষ্টিতে একটা নিরীক্ষণ ভাব নিয়ে রাইসাকে বলে : ‘গুড গার্ল, স্যুইট। এই মেয়ে এদিকে এসো।’ হাফিজা খালার সামনে গেলে, খালা তার নীল ব্যাগ থেকে একশ টাকার দুটো নোট বের করবার সময় দশ ডলারের একটি নোট পড়ে গেল। হাফিজা নোটটা তুলে খালার হাতে দেয়। খালা বলে ‘থ্যাঙ্কউ।’ হাফিজা মাথা নাড়ে। অর্থাৎ আচ্ছা। ‘এই শোনো, তোমার নাম কী যেন বললে, ও হ্যাঁ হাফিজা, শোনো কেউ থ্যাঙ্কিউ বললে, ইউ আর ওয়েলকাম বলতে হয়।’ খালার কথা শুনে হাফিজা বলল,‘ ইউ আর ওয়েলকাম।’ খালা হেসে বলে, ‘শি ইজ ইনটেলিজেন্ট।’ রাইসা হাসে। হাফিজার হাতের দিকে দুশো টাকা এগিয়ে দেওয়ার সময় সোনার দুটি বালা থেকে টুংটাং মৃদু শব্দ হয়, খালা বলে, ‘নাও।’ হাফিজা মাথা নাড়ে। টাকা নেবে না। ‘খালা ও নেবে না।’ রাইসার দিকে খালা তাকায়, বলে : ‘তুই বললেই নেবে।’ রাইসা বলে : ‘না ও অন্য রকম। বাবা এই জন্য ওকে পছন্দ করে।’ ‘ওকে’ বলে খালা ব্যাগে টাকাটা রেখে ব্যাগ থেকে গোলাকার তিনটি চকলেট বের করে বলে : ‘নাও, এটা খেতে পারো।’ রাইসা বলে ‘খালা ওগুলো ওকে দিও না।’ খালাকে হাত ধরে টেনে জানলার দিকে নিয়ে যায় রাইসা। স্বর ফিসফিস। ‘খালা চকলেটগুলোর মধ্যে অ্যালকোহল আছে তো।’ ‘সরি’ আমার খেয়াল ছিল না। খালা হাফিজাকে বলে, ‘তোমার জন্য অন্য চকলেট আনবো।’ রাইসা খালার সঙ্গে বাইরে যায়। ফিরে এসে হাফিজাকে বলে, ‘খালা তোর খুব প্রশংসা করল।’ পিল্টুর দিকে তাকিয়ে বলে : ‘কালকে তুই তিনটের দিকে আসতে পারবি? আমার অফিসে একটা ইমপরটেন্ট মিটিং আছে। এখানে আসতে সাতটা হয়ে যাবে।’ পিল্টু বলল, ‘ঠিক আছে।’

রাইসা ডান পাশের কানের ওপর থেকে চুল সরিয়ে বলল : ‘হাফিজা শোন, কালকে দুপুরে শিপলু আর পিল্টু মামা আসবে, আমার আসতে দেরি হবে।’

পাঁচ.
কেবিনের দরজায় পরপর তিনটি টোকা দিল পিল্টু। শিপলু আসেনি। পিল্টু বেলা তিনটের আগেই হাসপাতালে চলে এসেছে। দরজা খুলে হাফিজা বলল, ‘আসেন।’ গতকালকে যে জামা ও প্যান্ট পরা ছিল আজও সেই পোশাক। পিল্টু ঘরে ঢুকেই তাকায় খালুর দিকে। তিনি দিবানিদ্রায় ব্যস্ত। সব ঘুমন্ত মানুষের, সে-মানুষ খুনি বা বদমাইশ হলেও, মুখে একটা পবিত্র ভাবের ছায়া পড়ে।

‘কেমন আছ?’ হাফিজাকে প্রশ্নটা করে, উত্তরটা শুনল কি শুনল না, হাফিজা ‘ভালো আছি’ বলেছিল, পিল্টু দ্রুত হেঁটে চলে যায় বাথরুমে। যাওয়ার সময় হাতের ব্যাগটা রোগীর বাঁম দিকের দেয়ালের সঙ্গে লাগোয়া বিছানার ওপর ছুড়ে মারে। হাফিজার হাসি পায়। ‘পিল্টু মামা আসছে’, পিল্টু আসলে রাইসা হাফিজাকে ফোন করে জানাতে বলেছিল।

করিম চৌধুরীর মাথার দিকে হাফিজা বসে টিভি দেখছে। শুধু ছবি। শব্দ বন্ধ। কান সতর্ক। ‘বাথরুমে কী করতেছে এতক্ষণ?’ কৌতূহল হাফিজাকে ধাক্কায়। টিভিতে দুজন তরুণ-তরুণী হাতে হাত রেখে, ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে, হেসে হেসে কথা বলছে। হাফিজা পা টিপে টিপে বাথরুমের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। কানে আসে পানি পড়ার শব্দ। পিল্টু কী একটা গান গাইছে। কথা বোঝা যাচ্ছে না। ‘মনে হয় গোসল করতেছে।’ হাঁটায় কোনো শব্দ না করে আগের জায়গায় ফিরে আসে হাফিজা। টিভিতে অন্য দৃশ্য : নদীতে পাল তোলা নৌকা। ঘাটে মানুষ। টিভিতে কিছুক্ষণ আগে দেখা তরুণী অনেক মানুষের মধ্যে একা দাঁড়িয়ে আছে। মুখটা শুকনো। চিন্তিত। হাত নাড়ছে। নৌকায় কোথাও যাচ্ছে ছেলেটা। হাত নাড়ছে।

‘ক্যা যে দুই দিনের জ্বরে আর প্যাট খারাপে বাপটা মইরে গেল। ঘরামি ছিল। মাটির ঘর বাপের মতো কেউ বানাইতে পারতো না। মা পাঁচ ভাইবোনরে নিয়া কী কষ্ট করতেছিল। বাপ নৌকায় আমাগো কত চড়াইছে। বাপ এক পুন্নিমার রাইতে মারে নিয়া, আমাগো নিয়া, হামিদ চাচার নৌকা নিয়া বাইছিল। গ্রামের আবুল মাস্টের ভালো মানুষ। এই চৌধুরী বাড়িতে আমারে কাজ দিল।’ বাথরুমের দরজা খোলার শব্দ শুনে হাফিজার চোখ থেকে পূর্ণিমার রাতে নৌকাভ্রমণ না দেখার দূরে ভেসে যায়।

পিল্টু গোসল করেছে। বড় চুল। বোঝাই যায় চিরুনি নয়, আঙুল দিয়ে চুল আঁচড়ানো। ভালো করে মুখ, হাত, কাঁধও মোছেনি। চুলের আগা থেকে পানি পড়ছে। হতে পারে বাথরুমের তোয়ালে দিয়ে শরীরের ওপর আলতো করে ছুঁয়েছে মাত্র। গলার ওপরে কয়েক ফোঁটা পানি। মুখ ভেজা।

‘কিছু খাবার আছে? তোমার নাম যেন কী?’ হাফিজা নাম বলে। ‘আপেল, কলা, আঙুর, পাউরুটি, জুস আর বিস্কুট আছে।’ হাফিজার ভালো লাগে পিল্টু তাকে তুই বলেনি। খাবারের তালিকা শুনে পিল্টু বলল, ‘কলা আর রুটি।’ হাফিজা কলা আর রুটি যখন আনতে যাচ্ছে, ‘না না আপেল, জুস আর বিস্কুট।’ আপেলে কামড় দিয়ে পিল্টু বিছানা থেকে ব্যাগ নেয়। দ্রুত চেইন খোলে। স্মার্টফোন অন করে। ‘শিট।’ ফোন করে পিল্টু। তিন চারবার বলে ,‘সরি, সরি, আমি শাওয়ার নিচ্ছিলাম, কী বলছ, তোমার ফোন কেন ধরব না।’ কামড়ানো আপেল বাঁম হাতে নিয়ে বারান্দায় যায়। কিছুক্ষণ পর ফিরে আসে। মুখ প্রসন্ন। কলা আর জুস হাতে নিয়ে বলে, ‘ওগুলো খাবো না। তুলে রাখো।’

পিল্টুর চোখগুলো ঘোলা ঘোলা। হলুদ হলুদ। কারও দিকে একবার তাকালে, যার দিকে তাকায়, তার মনে হয়, ওই চোখ হার্টের রক্ত চলাচলও দেখছে। হাফিজা ভয় পায়। হাফিজার মুখের দিকে পিল্টু সরাসরি দুবার তাকিয়েছিল। এবং একবার এগিয়ে আসে। হাফিজা সরে যায়। মুখে রক্ত জমে। পিল্টু রিমোট নিয়ে টিভি বন্ধ করে। তাকায় ঘুমন্ত খালুর দিকে। এবং বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ে। মোবাইল অফ করে। ঘুমাবে। হাফিজার শ্বাস পড়ে। স্বস্তির শ্বাস।

ছয়.
সাড়ে চারটে বাজে। দরজায় টোকা পড়ল। পিল্টুর ঘুম ভেঙে যায়। তখনো করিম চৌধুরীর ঘুম ভাঙেনি। নার্স ঢোকে। রোগীর মুখ দেখে নিচু স্বরে বলে, ‘ভালো আছে।’ পিল্টুকে দেখে। ‘তুমি কেমন আছ?’ হাফিজাকে জিজ্ঞেস করে নার্স চলে যায়।

নার্স আসবার আগে হাফিজা সোফায় বসে একটি পত্রিকার পাতা ওল্টাচ্ছিল। ছবি দেখছিল। দরজায় টোকা পড়ার শব্দে যখন পিল্টুর ঘুম ভেঙে যায়, তার চোখ পড়েছিল হাফিজার দিকে। ‘মেয়েটা পড়তে পারে নাকি?’ পড়তে পারে কি না পিল্টু জিজ্ঞেস করেনি। পিল্টু যে হাফিজার দিকে তাকিয়েছিল, হাফিজা বুঝেছে। ‘আপনি কি চা খাবেন? চা আর গরম পানি আছে।’ পিল্টু বলল, ‘গুড। দাও।’ বিছানায় শুয়ে ব্যাগ থেকে কী একটা বই নিয়ে পিল্টু পড়া শুরু করে।

চা আনবার পর, ‘হাফিজা তুমি পড়তে পারো?’ সহজ সরল গলায় পিল্টুর আন্তরিক প্রশ্ন। হাফিজা দু-তিন ক্লাস পর্যন্ত পড়বার সুযোগ পেয়েছিল। গ্রামে পাকা আর টিনের ঘর তোলার কাজ শুরু হলে মাটির ঘর আর কে বানায়। বাপের কাজ কমতে থাকে। আয় কমতে থাকে। স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়। বাড়িতে উপোস বাড়ে।

সাত.
তিন দিন পর হাসপাতালে পিল্টুর আবার ডিউটি পড়েছে। সকাল দশটার দিকে এলো। করিম চৌধুরী ওকে দেখে খুশি। ‘ছেলেটার বুদ্ধি পরিষ্কার। ট্রটস্কি পড়ে।’ জনাব চৌধুরী তিন দিন আগে সন্ধ্যায় তার এক বন্ধুকে বলেছিলেন। ‘ওটা কি রকম নাম, বিদেশি নাম? মানুষের এ রকম নাম হয়।’ হাফিজার হাসি পায়। পিল্টু আজ শেভ করা। চোখ দুটি ঘোলা নয়। কাপড় পরিষ্কার।

করিম চৌধুরী আর পিল্টু দেশের রাজনীতি নিয়ে অনেক কথা বলল। দেশে মৌলবাদীদের শক্তি বাড়ছে। বামপন্থিরা যেন মৌলবাদীদের সঙ্গে ভিড়ে না যায়। ইরানে বামপন্থিরা খোমেনিকে সাপোর্ট করেছিল। কী হলো? খোমেনি ক্ষমতা নেওয়ার পর প্রথমে বামপন্থিদের মারল, তাড়াল।

দুজনের কথার কিছুই বোঝে না হাফিজা। এক কোনায় একটি প্লাস্টিকের, হলুদ রঙের, টুলের ওপর বসে কোনো এক পত্রিকার পাতা ওল্টায়, ছবি দেখে। পিল্টু আড় চোখে হাফিজাকে ‘ইরান‘, ‘বামপন্থি’, ‘মৌলবাদী’ বলবার সময় দু-একবার দেখেছে। এবং একসময় খালুকে বলেছে, ‘মেয়েটি পড়তে চায়।’ ‘হ্যাঁ পড়তে চায় কিন্তু সময় দেবে কে? আমি চেষ্টা করেছিলাম, এখন আমার আর ধৈর্য নেই।’

পাঁচজন ডাক্তার ঢুকল। চারজন এক বড় ডাক্তারের পেছনে। ভিজিট চলছে। হাফিজা জানে ডাক্তার এলে প্রেসক্রিপশনের ফাইলটা বড় ডাক্তারের হাতে দিতে হয়, দিল। পাতা ওল্টাচ্ছেন আর বড় ডাক্তার বলছেন ‘আপনি ভালো হয়ে যাচ্ছেন। তিন-চার দিন পর চলে যেতে পারবেন, অ্যামলোপিন কত খান?’ রোগী বলবার আগেই সঙ্গের এক তরুণী ডাক্তার বলল, ‘স্যার টেন।’ ‘এখন থেকে পাঁচ খাবেন। আপনি বেশি কথা বলবেন না। সুস্থ হয়ে অনেক কথা বলবেন। ওকে, আজ হাসি।’ বলে ডাক্তারদের দল সাদা অ্যাপ্রন দুলিয়ে চলে গেল।

করিম চৌধুরীর পাশে ছিল খবরের কাগজ। হাতে নিলেন। পড়বেন। পিল্টু চেয়ার থেকে উঠে চলে যায় সোফায়। মোবাইল খোলে। কী সব দেখে। হাসে। শব্দ নেই। কিছু লিখছে। একবার হাই তুলল। হাফিজা দেখল হলুদ দাঁত। ‘ঠিকমতো মাজে না নাকি? মনে হয় সিগারেট খায় খুব।’

‘এই মেয়ে তুমি তো পড়তে পারো না। শুধু ম্যাগাজিনের ছবি দেখ।’ পিল্টুর কথা শুনে খালু বলেন, ‘অল্প অল্প পারে, থ্রি পর্যন্ত পড়ছিল, তবে যুক্তাক্ষর, য-ফলা, র-ফলা, রেফ বোঝে না, হসন্ত মনে রাখতে পারে না। কিংবা চায় না। আমি তো একবার চেষ্টা করছিলাম। পড়তে পারলে ভালো হতো। খবরের কাগজটা পড়াতাম।’

পিল্টু জানে, রোগীর ঘরে ডিউটি করা খুব কষ্টের কাজ। রোগীর সঙ্গে বেশিক্ষণ কথা বলাও বিরক্তিকর। দ্বন্দ্বটা সুস্থ আর অসুস্থতার মধ্যে। সময় কাটাবার জন্য মেয়েটাকে এখন পড়ানো যেতে পারে। আজিজ মার্কেটের পাশের রাস্তায় পিল্টু ও তার বন্ধুরা বস্তির বাচ্চাদের বর্ণমালা পড়ায়। পিল্টু ব্যাগ থেকে কাগজ বের করে। কলম নেয়। হাফিজাকে ডাক দেয়, ‘টুল নিয়ে এদিকে এসো, তোমাকে পড়াই।’ ‘ভালো কাজ, পড়াও’ খালু বললেন।

পিল্টু কাগজে লেখে পছন্দ, খাদ্য, নষ্ট, বাদ্য, ভ্রান্ত, শিপ্রা। শিপ্রা লিখে কেটে দিল। শুধু একটানে কাটা নয়। যেন কাটা শব্দটি একটি গোল অক্ষি। তাকিয়ে আছে পিল্টুর দিকে। শূন্যতা কেঁপে ওঠা একটা শ্বাস পড়ে। লিখল পূর্ব, পশ্চিম, প্রার্থনা, অন্যায়, দ্বন্দ্ব। র-ফলা, য-ফলা আর রেফের চিহ্ন লেখে। এবং হসন্ত চিহ্ন দিয়ে লেখে পছন্দ=পছন্দো, খাদ্য=খাদ্দো, নষ্ট=নস্টো, পশ্চিম=পশ্চিম, প্রার্থনা=র্প্রাথনা, অন্যায়=অন্ন্যায়, পূর্ব=র্পূবো।

পিন্টুর কণ্ঠ সহজ, স্নেহপূর্ণ, বলে, ‘দ্যাখো এটা হলো যুক্তাক্ষর, একটা অক্ষর আর একটা অক্ষরের মাথার ওপর বসলেই হয় যুক্তাক্ষর, যেমন পছন্দের দন্ত-ন বসেছে দ-এর মাথার ওপর, বুঝলে তো?’ হাফিজা মাথা নাড়ে। বুঝেছে। ‘আবার দেখ এটা হলো ভ।’ বলে পিল্টু ভ-এর নিচে র-ফলা লিখল। ভ-টাকে অর্ধেক দেখে হাফিজা হেসে দেয়। পিল্টু এমন চোখে তাকাল, তার অর্থ পড়ার সময় হাসি নয়। ‘ভ-এর নিচে র-ফলা দিলে একসাথে ভ আর র-এর উচ্চারণ হবে ভ্র, এই দেখ লিখেছি। তুমি দেখ কষ্ট, পশ্চিম, পছন্দ’র যুক্ত অক্ষরগুলোর উচ্চারণমতো লিখলে (কাগজের ওপরে লেখা দেখিয়ে) এমন হবে। খেয়াল করো লিখেছি। অন্যায়-এর দন্ত-ন-এর সাথে য-ফলা দিয়েছি। য-ফলার আর একটা উদাহরণ দিই, যেমন বিখ্যাত বললে প্রথম উচ্চারণটা ক এবং পরেরটা খ্যা, এখানে খ-এর সাথে য-ফলার উচ্চারণ হবে এ্যা।’ পিল্টু কাগজে লেখাগুলো দেখায়। ‘মামা একটা কথা বলি।’ ছাত্রীর প্রশ্ন ভালো শিক্ষককে আনন্দ দেয়, ‘বলো, কী বলবে?’ হাফিজা তর্জনী দিয়ে অন্যায় শব্দটি দেখায় এবং বলে, ‘অন্যায়’-এর সামনে স্বরে অ বাদ দিলে তখন তো হয় ন্যায়, দুইটা দন্ত-ন তো বলে না।’ পিল্টুর চোখ, বুদ্ধি, বাংলা ধ্বনিতত্ত্ব বিষয়ে সামান্য জ্ঞান হোঁচট খায়। ‘তোমার বুদ্ধি খুব ভালো। আমি সত্য বলছি এর ব্যাখ্যা আমি জানি না।’

হাফিজার মনে সাহস জন্মায়। ভাবে, মানুষটা ভালো। প্রশ্ন করা যায়, করলে গ্রামের স্কুলের স্যারের মতো ধমক দেয় না। হাফিজা দ্বন্দ্ব শব্দটি পিল্টুকে দেখায়। বলে, ‘এটা এমন কেন?’ প্রশ্ন শুনে পিল্টু হাসে। ‘বলেছি তোমার তো বুদ্ধি ভালো, এই শব্দে দুটো ব আছে, এটা বুঝতে তোমার আরও সময় লাগবে, দ-এর নিচে ওই ব দুটি বাবা ও বোবা বলবার সময় যে-স্বরে ব উচ্চারণ করা হয়, দ দুটির নিচে যে দুটি ব আছে তার উচ্চারণ-ধ্বনি আলাদা, অনেক পড়ার পর দু’রকম ব-এর ব্যবহার তুমি বুঝবে। ‘আমার ইশকুলে বাংলার স্যার কইছিল বড় ব, ছোট ব। ব আবার দুইটা হয় ক্যামনে?’ পিল্টু হাসে। ‘ছোট ব-এর উচ্চারণ হয় খুবই নিচু স্বরে ওয়া, এর থেকে আমি বেশি জানি না। তুমি পড়তে পড়তে বুঝবে। আমি যতটুক জানি বলছি। যাহোক, এখন মনোযোগ দিয়ে যুক্তাক্ষর, র-ফলা, য-ফলা, রেফ-এর কাজ বোঝার চেষ্টা করো, তুমি পারবে। স্পষ্ট উচ্চারণ পড়বে। কথাও বলবে।’ পড়া আরও চলত। দুপুর হয়ে গেছে। রাইসা বাবার খাবার নিয়ে ঢুকল।

পিল্টু আর রাইসা কী কী সব গল্প করল। বিকালে পিল্টু বস্তির বাচ্চাদের পড়াতে যাবে। রাতে বাবার কাছে থাকবে শিপলু। করিম চৌধুরী দুপুরের খাবার খেয়ে প্রয়োজনীয় অষুধগুলো খেলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়বেন।

আট.
দুদিন পর আবার বিকালে ডিউটি পড়েছে পিল্টুর। কেউ বেকার হলে আত্মীয়রা তাকে কাজে অকাজে ব্যবহার করে। তবে পিল্টু মানুষের সেবা করাকে উত্তম কাজ মনে করে। কেবিনে ঢুকে দেখলো, খালু ঘুমাচ্ছে। টিভি চলছে। নাচ হচ্ছে। শব্দ নেই। ‘কেমন আছ?’ পিল্টু মুখে নয়, হাতের ইশারায় জানতে চেয়েছে তার ছাত্রীর কুশল। টিভিতে চোখ রেখে হাফিজা হাত নাড়ে। ভালো আছি। পিল্টু আসাতে সে খুশি হয়।

বিছানার ওপর ব্যাগ রেখে পিল্টু নিচু কণ্ঠে হাফিজাকে ডাকে। ইশারায় বলে টিভি বন্ধ করতে। সামনে আসবার পর বলে, ‘যুক্তাক্ষর কত দূর?’ হাফিজা মাথা নিচু করে আস্তে বলে, ‘বুঝি না।’ ‘ঠিক আছে সমস্যা নেই, আমি মুখ ধুয়ে এসে আবার বোঝাচ্ছি।’ পিল্টু বাথরুমে গেল। ফিরে এসে বলল, ‘আপেল থাকলে দাও। এই নাও বর্ণমালা পরিচয়, খাতা, কলম।’

প্রায় এক ঘণ্টা ধরে পিল্টু খুব যত্নে, এক আদর্শ শিক্ষক, হাফিজাকে বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণমালা পরিচয়’ খুলে বোঝালো যুক্তাক্ষর, র-ফলা, য-ফলা, রেফ। এবং বলল, ‘এক ঘণ্টা পড়ো। যুক্তাক্ষর, র-ফলা, য-ফলা আর রেফ দিয়ে চারটি করে শব্দ লিখবে, পড়া ধরব।’

পিল্টু বিছানা থেকে দেখে হাফিজা খাতায় কী সব লিখছে। হাতের বইটা বালিশের পাশে রেখে ডাক দেয়। বাঁম হাতের মধ্যমা ফোটায়। ‘এক ঘণ্টা হয়ে গেছে, এই মেয়ে খাতা আনো, দেখি কী লিখেছ?’ ‘এই মেয়ে’ শুনে হাফিজার ভালো লাগে।

সাদা পাতার ওপর নিচে ডানে বাঁমে নীল কালিতে, নীল কালির কলমই পিল্টু দিয়েছিল, দুই, তিন, চার পাপড়ির অনেক রকম ছোট বড় ফুল আঁকা। একঝাঁক উড়ন্ত পাখি আঁকা। পাশে মেঘ। নিচে নদী, নৌকা আঁকা। অদূরে একটি গ্রাম। একটি মাটির ঘর। দুটো গরু। একটি ছাগল। অনেক গাছ আঁকা। এবং ছবিগুলোর মাঝখানে বৃত্তের মতো সাদা জায়গায় ব-এর নিচে র-ফলা দিয়ে শুদ্ধ বানানে একটি নাম লেখা : ইব্রাহিম।

‘ইব্রাহিম কে?’ পিল্টুর প্রশ্ন। ‘আমার ভাইয়ের বন্ধু,’ হাফিজার উত্তর দ্বিধাহীন। স্পষ্ট। কালো চোখে, শ্যামলা রঙের মুখে নিঃশব্দ প্রসন্ন্ হাসি। পিল্টু নিশ্চুপ। শিপ্রার সঙ্গে অনেক দিন দেখা হয় না, মনে পড়ে।

খোলা জানালার দিকে হাফিজা দ্রুত চলে যায়। পিঠের ওপর দুই বিনুনি দুলে ওঠে। আকাশে চোখ।
যুবতীর প্রসন্নতা গোধূলির নরম আলোতে উজ্জ্বল।


লেখক পরিচিতি : জাহিদ হায়দার। কবি ও গল্পকার। বসবাস করেন ঢাকায়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ