মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকেই অবস্থাটা খারাপ হয়ে উঠল। গুজবের তো অন্ত নেই। দিনভর গলির মোড়টাতে উত্তেজিত আলোচনা ও সন্ধ্যায় বিবিসি শোনা। ঢাকা থেকে কোনো রকমে পালিয়ে চলে আসতে পারা আমার মেজ শ্যালকের ভাষায় : “এ ডেঞ্জারাস সিভিল ওয়ার সিচুয়েশন!” অবশ্য এ মফস্বল শহরটাতে যুদ্ধের আঁচটা তখনও তেমন লাগেনি। তবে যেদিন পাকিস্তানী সৈন্যরা এ শহরের সাতজন বিশিষ্ট হিন্দু ভদ্রলোককে গুলি করে মেরে সার্কিট হাউজের কাছে পুরনো শিরীষ গাছটার নিচে সারাদিন ধরে ফেলে রাখল, সেদিনই দলে দলে মানুষ, বাক্স-প্যাঁটরা নিয়ে শহর ছেড়ে পালাতে শুরু করল।
কার্ফু সন্ধ্যা ছয়টা থেকে। শেষ বিকেলে বারান্দায় বসে দেখছি মানুষের এস্ত পদক্ষেপে হাঁটা, পাড়ার দু-একজনের যেতে যেতে জরুরিভাবে দু-একটি কথা বলে যাওয়া, সবার মধ্যেই পলায়নের ব্যস্ততা। এমন সময় সাইকেল নিয়ে প্রায় হাঁফাতে হাঁফাতে এসে নামল এ বাড়িতে খবরের কাগজ দেবার ছেলেটি। সাইকেলটা গেটের পাশে দোপাটি গাছগুলোর পাশে দেয়ালে হেলান দিয়ে রেখে একটু কুন্ঠিতভাবে কাছে এগিয়ে এসে আমাকে বলল : “স্যার, একটা কথা ছিল”। এ মাসের বিলটা তো দিন কয়েক আগেই দিয়ে দিয়েছি। এটা মনে হওয়ার কারণ বিল নেবার সময় ছেলেটা ওই ভঙ্গিমাতেই এসে নীরবে দাঁড়ায়। তাই মনের ভেতর কিছুটা কৌতূহল চেপেই বললাম : “বল।” ছেলেটা চারপাশে একটু তাকিয়ে নিজের মনে একটু সাহস সঞ্চয় করে বললো : “স্যার, আমার এই সাইকেলটা যদি দিন কতক আপনার বাসায় রাখেন?” রাজি না হওয়ার কিছু ছিল না। বললাম :“কোথাও যাচ্ছ নাকি?” ছেলেটা একটু ম্লান হেসে বলল : “কয়েক দিন স্যার একটু সরে থাকি। আমাদের গ্রামের অবস্থা তত ভাল না!” সাইকেলটা এ বাড়ীতে রেখে ছেলেটা চলে গেল।
প্রায় কিশোর বয়সের ছেলেটা গত কয়েক মাস ধরেই এ বাড়িতে নিয়মিত কাগজ দিয়ে আসছে। নদীর ওপারে কোন্ গ্রামে যেন ওর বাড়ি, এটুকুই জানতাম। বেশ কর্তব্যপরায়ণ। মানে সকালে কলেজ যাওয়ার বেশ আগেই আমার কাগজটা হাতে পেয়ে যাই। চা খাবার আগেই। ছেলেটার সঙ্গে বস্তুত দেখা হয় ওই মাসে একবার ওর বিল নেবার সময়ই। হকার্স সমিতির ছাপানো বিলের ওপরে দেখেছি গোটা গোটা করে নাম লিখত “বিনয়”।
বন্দুক- পিস্তল-বোমা নয়, একটা সাইকেল মাত্র। কিন্তু আমার মেজ শ্যালক বেশ উত্তেজনা প্রকাশ করল : “দুলাভাইয়ের আজও কোনো সেন্স হল না। একটা মাইনরিটি লোকের জিনিষ! কী না কী প্রবলেম হয় শেষে!”
আমার স্ত্রী খোদেজা, যে আমার মেজ শ্যালকের চেয়ে বয়সে কিছুটা বড়, ধমকে দিয়েছিল :“তুই থাম্ তো! ভারী তো একটা সাইকেল! থাকবে পড়ে এক কোণে। তোর সবটাতেই বাড়াবাড়ি!”
সাইকেলটা রয়ে গেল। রান্নাঘরের পাশে যে একটা বাড়তি ঘর আছে এ বাড়িতে, যেখানে মাসিক লাকড়ি থেকে বাচ্চাদের ভাঙ্গা ক্যারামবোর্ড সব কিছু রাখা হয়, সেখানেই আশ্রয় জুটল সাইকেলটার। বেশ পুরনো একটা র্যালে সাইকেল। পুরনো, কিন্তু রডে বা মাডগার্ডে, কোথাও কোনো জং-টং নেই। সীট কভারটাও বেশ পরিষ্কার। বোঝা যায়, ছেলেটা বেশ যত্ন করে সাইকেলটার।
আমার কলেজ প্রায় না চলারই মতো। ছাত্ররা বেশির ভাগ শহর ছাড়া। হোস্টেল তো একেবারেই ফাঁকা। আমার সহকর্মী কয়েকজন শিক্ষক, যাঁরা একটু রাজনীতিঘেঁষা ছিলেন, মায় সহকারী প্রিন্সিপাল পর্যন্ত, এরা কেউই আর কলেজে আসেন না। শোনা যায় এঁরা কেউ কেউ দেশ ছেড়েছেন বা গ্রামের দিকে কোথাও চলে গেছেন। তবে প্রিন্সিপাল সাহেব নিয়মিত বসেন। কলেজে ক্লাস তেমন না হলেও কলেজের অফিস খোলা রয়েছে।
মে মাসের মাঝামাঝি থেকেই বর্ষা এবারে বেশ জোরেশোরেই নামতে শুরু করল। এদিকে শহরের অবস্থাও ক্রমেই খারাপ হচ্ছে। পাড়ার প্রায় অধিকাংশ মানুষই ঘরবাড়ি ছেড়ে কোথায় কোথায় যেন সব চলে গেছে। বাড়িগুলো তালাবদ্ধ বা হয়তো দু’একজন বুড়ো-বুড়ি শুধু রয়ে গেছে। চারিদিকে শুধু শোনা যায় নানা রকম গুজব। বিশেষ করে যে গুজবটা মাঝে মাঝেই পাড়ার অবশিষ্ট মানুষদের আতঙ্কিত করত, তা হচ্ছে, আজ রাতেই ফেরিঘাট থেকে দল বেঁধে বিহারীরা আক্রমণ করতে আসছে। রাতে গোটা পাড়াটা হয়ে পড়ে নীরব সুনসান। ইদানীং পাড়ার কুকুরগুলোও যেন ডাকতে ভুলে গেছে। শুধু গভীর রাতে কেমন যেন বিষণ্ন এক সুরে ডাকে মাঝে মাঝে। মনে হয় যেন কাঁদছে।
কয়েক দিন পর আমার মেজ শ্যালক “ইট ইজ অ্যান ইমপসিবল সিচুয়েশন” বলে ফের ঢাকায় চলে গেল আবার ওর চাকুরিতে জয়েন করার জন্যে।
সাইকেলটা এককোণে পড়েই রইল এবং ধীরে ধীরে বাড়ির অন্যান্য আসবাবের সঙ্গে এমনভাবে মিশে গেল যে ওটার আলাদা কোনো অস্তিত্ব আমরা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। মাঝে মাঝে খোদেজা অবশ্য বলত : “ছেলেটা তো আর এল না! বাড়ি সার্চ করলে সাইকেলটা নিয়ে কোনো অসুবিধা হবে না তো?” বললাম : “কী আর অসুবিধা? অস্ত্র তো আর নয়!” স্ত্রীকে আশ্বস্ত করলাম বটে, কিন্তু মনে একটা খচখচি রয়েই গেল যে, সাইকেলটার কোনো লাইসেন্স তো নেই আমার কাছে। মিলিটারি যদি সার্চ করতে এসে লাইসেন্স দেখতে চায়? তবে মনে মনে এটাও আশা করতাম যে, সাইকেলের লাইসেন্স বা কেনার রশীদ নিশ্চয়ই খোঁজ করবে না। ফলে সাইকেলটা ওরকমই পড়ে রইল।
তবে সাইকেলটার প্রতি কারো যদি সত্যিকারে কোনো আগ্রহ থেকে থাকে সে আমার নয় বছরের পুত্র বিপুল ও ভাইয়ের সকল কাজে পিছু পিছু থাকা পাঁচ বছরের মেয়ে নিম্মী। বিপুল কখনও সাইকেলটার পাশে বসে সাইকেলের প্যাডেলটা ঘোরায়, বোনটাকেও মাঝে মাঝে ঘোরাতে দেয়, আর সাইকেল সম্পর্কে বেশ জ্ঞান দেয়। ওর যে সাইকেলটাতে চড়বার খুব শখ তা আমি বেশ বুঝতে পারি, যদিও ওর মাথাটা কেবল সাইকেলের সীটের কাছাকাছি পৌঁছয়। বিপুলই একদিন আবিষ্কার করল : “আব্বু দেখ দেখ, সাইকেলে নাম লেখা!” দেখলাম সত্যি সত্যিই কালো সাইকেলটার গায়ে খুব হাল্কা করে সবুজ রংয়ে লেখা “বি-ন-য়”। সহজে চোখে পড়ে না। দেখে খোদেজা খুব হৈ চৈ করল। কি জানি, সার্চ করতে এসে আর্মিরা যদি এ নাম দেখে! একটা শিরীষ কাগজ দিয়ে কাজের ছেলেটা একদিন ঘন্টাখানেক ঘষে ঘষে শেষের দু’টো অক্ষর তুলে ফেলতে পারল—“ন” আর “য়”। কিন্তু বিপুল কিছুতেই “বি”-টা আর তুলতে দিল না। খোদেজা আর আমি এ নিয়ে কিছুটা হাসাহাসি করলাম। শেষে আমি বললাম : “থাক্। শুধু “বি” বেশ নিরাপদ। ব্যাখ্যা করা যাবে।”
অক্টোবর-নভেম্বরে পাড়ায় লোকজন আবার কিছু কিছু ফিরে এসেছে। কলেজও চলছে। তবে ছাত্রছাত্রী খুবই কম। আর আগের মতোই, নানা ধরনের গুজব। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে আতঙ্ক আবার বাড়তে শুরু করল। যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে সরে এসে পাকিস্তানি সৈন্যরা শহরের প্রান্তে আশ্রয় নিয়েছে। সবাই বলছে এ শহরে নাকি বড় একটা যুদ্ধ হবে। কারফিউয়ে নিস্তব্ধ শহরের রাস্তাগুলোতে পাকিস্তানি সৈন্যরা খুব দ্রুত চালিয়ে যায় জিপগাড়ি। মাঝে মাঝে দূর থেকে ভেসে আসে “গুম গুম” গম্ভীর আওয়াজ। এত দিনে সবাই জানে, ওগুলো ভারতীয় গোলন্দাজ বাহিনীর শেল। যুদ্ধ চলছে ফুলতলা-শিরোমনি অঞ্চলে। শহর থেকে বেশ কয়েক মাইল দূরে। কিন্তু শেলের আওয়াজ শহর থেকে পরিষ্কারই শোনা যায়, বিশেষ করে রাতে ওই “গুম” “গুম” আওয়াজটি কেমন যেন একটা আধিভৌতিক অনুভূতি সৃষ্টি করে। পাড়ায় একটা চাপা উত্তেজনা। শহরে বড় যুদ্ধ কি হবে? সব কিছু কি মিসমার হয়ে যাবে, না পকিস্তানিরা ভালোয় ভালোয় আত্মসমর্পন করবে? নাকি আত্মসমর্পণের আগে পাকিস্তানিরা সব কিছু ধ্বংস করে দেবে? মেরে ফেলবে সবাইকে।
এর মধ্যে একদিন বারোই ডিসেম্বর তারিখে আকাশে ভেসে এল একটা মস্ত প্লেন। আকাশের অনেক উঁচুতে থাকা প্লেনটা থেকে অসংখ্য কাগজ ছড়িয়ে দেয়া হলো গোটা শহরে। আকাশে সূর্যের প্রখর আলো পড়ে সেসব কাগজগুলো সাদা ডানার পাখির মতো চিকমিক করছিল। আমাদের পেছনের দেয়ালের নালার কাছেও একটা কাগজ এসে পড়ল। কাজের ছেলেটা কাগজটা কুড়িয়ে আনল। দেখতে অনেকটা লিফলেটের মতো। তাতে পাকিস্তানি সৈন্যদের উদ্দেশ্যে ইংরেজি ও উর্দূতে লেখা : “আত্মসমর্পণ কর।” মাঝে মাঝে দু-একটা দ্রুতগতি যুদ্ধবিমান শহরের ওপর দিয়ে উড়ে যায় আজকাল। ভারতীয় বিমান এগুলো। পাকিস্তানি সৈন্যদের ইদানীং আর তেমন চোখে পড়ে না। রাজাকারগুলো রাস্তায় দাঁড়িয়ে ওদের পুরনো থ্রি নট থ্রি রাইফেল দিয়ে ওসব ভারতীয় জেট বিমানের দিকে আকাশমুখী গুলি ছোড়ে। দেখে আমার প্রতিবেশী ফুড ডিপার্টমেন্টের মকবুল সাহেব দেয়ালের ওপাশে এসে দাঁড়িয়ে বললেন : “পাকিস্তান শেষ”।
ষোলো তারিখ ভোরবেলায় কত দিন পরে আবার শুনলাম “জয় বাংলা” আওয়াজ। প্রথমে ক্ষীণভাবে কোনো দূরাগত ধ্বনির মতো। তারপর ধীরে ধীরে সে আওয়াজ বাড়তেই থাকল এবং ক্রমশ তা পরিণত হলো গোটা শহরজুড়ে এক সাগর গর্জনের মতো। শহরের সকল গলি-ঘুপচি থেকে হাজার হাজার মানুষ পিপঁড়ের মতো বের হতে লাগল। এত মানুষ যে এ শহরে ছিল তা এতদিন বোঝাই যায়নি! সবার মুখেই কেমন এক বিহ্বল আনন্দের আভা। শোনা গেল, সকালেই সার্কিট হাউসের মাঠে মিত্রবাহিনীর কাছে পাকিস্তানি সৈন্যরা সব আত্মসমর্পণ করেছে। ঘুড়ির কাগজ কেটে বিপুল দুটো সবুজ পতাকা বানিয়েছে। মাঝে দিয়েছে লাল গোলাকার একটা আকৃতি। তার ভেতরে বাংলাদেশের ম্যাপটা আর আঁকতে পারেনি বলে সে চেষ্টাটা আর করেনি। কাঠির আগায় লালসবুজ ও দুটো পতাকা লাগিয়ে বিপুল আর নিম্মী বারান্দায় দাঁড়িয়ে ওদের ছোট ছোট হাত দিয়েই প্রবল উৎসাহে শ্লোগান দিতে থাকল : “জয় বাংলা!”, “জয় বাংলা!” দুপুরের পর বিপুল এক সময় রাস্তায়ও বেরিয়ে পড়ল। আজ ওদের মায়ের শাসনও ওদের ওপর কিছুটা হাল্কা। খোদেজার মুখেও আজ খুশির কেমন যেন এক আরক্তিম আভা এবং আনন্দের কোনো কারণ ঘটলে ও সচরাচর যা করে থাকে, সারাদিন তা-ই করছে। অনেক বেশি কথা বলছে আর ঘর-বারান্দায় ছুটোছুটি করছে যেন ওর বয়স অনেকটাই কমে গেছে। আমাদের প্রথম যৌবনে বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে কোনো বিয়ের মিছিল গেলে, বা পাড়ার ছেলেরা কোনো খেলায় জিতে ট্রফি নিয়ে পাড়ায় ফিরলে, ও এরকমই ঘর-বারান্দায় ছুটোছুটি করত আর হাসত।
এরপর মাস দেড়েক কেটে গেছে। কলেজ আবার শুরু হয়েছে। ঠিক মত কেরোসিন তেল, চিনি এসব সব সময় পাওয়া যেত না বলে খোদেজা মাঝে মাঝে উম্মা প্রকাশ করলেও দিন আমাদের চলে যাচ্ছিল ভালই। শুধু সাইকেল নিতে ছেলেটা আর ফিরে এল না। মাঝে মাঝে খোদেজার সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হতো। কিন্তু আমরা আশা করছিলাম যে ছেলেটা হয়তো যে কোনো দিন এসে পড়বে। তবে বিপুলকে আর ঠেকানো যায়নি। সাইকেলের তালাটা ও আর কাজের ছেলেটা মিলে কীভাবে যেন খুলেছে। মাঝে মাঝেই সাইকেলটা নিয়ে বিপুল বাড়ির সামনের রাস্তায় হাফ-প্যাডেলে ওটা চালিয়ে বেড়াত। একদিন তো পড়ে গিয়ে হাঁটুর কাছে কিছুটা ছিলেই ফেলল। বেশ রক্ত! খোদেজার বকাবকি। কিন্তু সপ্তাহখানেক পরেই সাইকেলটা নিয়ে বিপুল আবার বের হওয়া শুরু করল। খোদেজা হৈ চৈ করত, কিন্তু আমি মানা করা ছেড়ে দিয়েছি। কারণ ও বয়সে একটা সাইকেল হ্যাফ-প্যাডেলে চালানো ও মানুষজনদেরকে তা দেখানোতে যে কি অপার আনন্দ, সেটা তো আমি জানতাম। ও বয়স তো আমারও একদিন ছিল এবং আমার শিক্ষক-পিতার কাছে পড়তে আসা ছাত্রদের সাইকেল নিয়ে দুপুর রোদে আমিও তো বিপুলের মতোই রাস্তায় রাস্তায় কম ঘুরে বেড়াইনি।
সেদিন ছুটির দিন দুপুর গড়িয়ে বিকেল আসছে আসছে ভাব। বারান্দায় বসে পড়া পত্রিকাটাই আবার নেড়েচেড়ে দেখছিলাম। এমন সময় বাগানের গেট খুলে ধুতিপরা গ্রামীণ চেহারার একজন মানুষ কিছুটা দ্বিধাগ্রস্থভাবে বারান্দাটার দিকে এগিয়ে এল। আমার নাম জিজ্ঞেস করে বলল, এটা অমুক মাস্টার সাহেবের বাড়ি কি না? বললাম : “হ্যাঁ। আপনার কাকে চাই?” বলল : “আমি বিনয়ের বাবা।” প্রথমে আমি ঠিক বুঝতে পারিনি। অবশ্য কয়েক মুহূর্ত পরেই বিষয়টা পরিষ্কার হলো। মানুষটাকে বসতে বললাম। বেশ সঙ্কোচের সঙ্গে বেতের চেয়ারটায় বসলেন। বললাম : “বিনয় কেমন আছে? ও এল-টেল না! সাইকেলটা রেখে গেছে।”
প্রৌঢ়ের মুখে শ্রাবণের মেঘের মতোই ম্লান এক ছায়া দেখলাম আমি। মাথাটা নীচু করে শুধু বললেন : “বিনয় তো আর নেই।”
“নেই! মানে?” আমার সশঙ্কিত প্রশ্ন।
শীতের সেই বিকেলে এরপর আমি এক কাহিনি শুনলাম। এক তরুণের কাহিনি, এক পরিবারের কাহিনি, এক পিতার কাহিনি। আমি জানি একাত্তর সালের ওই নয় মাসে, যারা বাংলাদেশের মানুষ, তাঁরা সবাই-ই এ জনপদ ঘটে যাওয়া এ ধরণের অনেক কাহিনিই জানেন।
আমার বাড়িতে সাইকেলটা রেখে বিনয় নদীর ওপারে ওদের বাড়িতে ফিরে গেলে পরদিন সকালেই ওরা দেশত্যাগ করবে এরকমই পরিকল্পনা ছিল পরিবারটির। কিন্তু এ বাড়ি থেকে যাবার পথে ওই দিন বিকেলেই শহরের জেলখানার খেয়াঘাটে পাকিস্তানি সৈন্যদের হাতে ধরা পড়ে বিনয়। কথাটা খেয়ানৌকার যাত্রী ওদের গ্রামের অন্য মানুষদের কাছে শোনা। বিনয় আর কয়েকটি তরুণ ছেলেকে পাকিস্তানি সৈন্যরা হাত পিছমোড়া করে বেঁধে ট্রাকে উঠিয়ে নিয়ে যায়। এরপর পরিবারটি আশায় আশায় থেকেছে ও হয়তো ফিরবে। ফেরেনি। জুন মাসে গ্রামের অবস্থা যখন চরম খারাপ, তখন ওরা দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়।
“পরিবারে আর কে কে আছেন?” জিজ্ঞেস করলাম আমি।
“ছিল। আমার স্ত্রী আর মেয়ে।” আমার জিজ্ঞাসু মুখের দিকে না চেয়ে, বারান্দার ওপাশে দোপাটি আর গাঁদাফুলগাছগুলোর দিকে তাকিয়ে মানুষটি বলে চললেন : “অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল তো! বর্ডারে যাওয়ার পথে মাগুড়ার কাছে মেয়েটাকে ধরে রাখে। এক রাজাকার কমান্ডার। পরে খবর পাই, মেয়েটা গলায় দড়ি দিয়েছে।”
“আর বিনয়ের মা?” আমার সশঙ্কিত প্রশ্ন।
“বনগাঁয়ে ক্যাম্পে আমার সঙ্গে ছিল। শ্রাবণ মাসের দশ তারিখে কলেরায় ...”। মানুষটি আর বাক্যটা শেষ করলেন না।
দুঃখ যখন বড় হয়, সান্ত্বনা অর্থহীন। তবুও দু-চারটি কথা আমি বলার চেষ্টা করলাম। “আপনাদের গ্রামের বাড়ি?” এক পর্যায়ে জিজ্ঞেস করলাম। জানলাম চারটে গাই-গরু, কিছু আবাদি জমি ছিল। তাই দিয়েই বিনয়কে কিছুটা লেখাপড়া শেখানো। পরিবারটির ইচ্ছে ছিল বিনয় কলেজ পাস করে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে। তা সবই ভগবানের ইচ্ছা!
“তা আপনি এখন কী করছেন?” আমার এ প্রশ্নের জবাবে বিনয়ের বাবা বললেন : “এখন তো আমি একদম ঝাড়া হাত-পা। বেলুড় মঠে আছি। জানেন তো, হাওড়ায়। ওখানেই স্বামীজীর সেবায়েত হয়ে বাকি জীবনটা কেটে যাবে। ...একটাই পেট আমার।”
ক্রিং ক্রিং, এমন সময় সাইকেল নিয়ে গেটের সামনে এসে নামল বিপুল। মহাউৎসাহে গেট দিয়ে ঢুকতে ঢুকতে বলল : “আব্বা, আজ গল্লামারীর ব্রীজটা পর্যন্ত গিয়েছিলাম। সীটে বসে!” এই শীতবিকেলেও ওর মুখটিতে পরিশ্রমের ঘাম আর চোখে সাফল্যের আভা। বিপুল সাইকেলটা নিয়ে এভাবে উপস্থিত হওয়াতে আমি বেশ বিব্রতই হলাম। পরের জিনিস! কিন্তু বিনয়ের বাবার দিকে তাকিয়ে দেখি কি রকম বিচিত্র এক দৃষ্টিতে উনি সাইকেলটা আর বিপুলের দিকে চেয়ে রয়েছেন। কিছুটা কৈফিয়তের ভঙ্গিমায় আমি বললাম : “সাইকেলটা পড়েছিল, তাই ও মাঝে মাঝে চালায়। আপনি আজ ওটা নিয়ে যান।”
কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইলেন মানুষটা। মাথাটা বুকের দিকে ঝুঁকিয়ে। তারপর ধীরে ধীরে বললেন : “সাইকেলটা নিতেই আমি এসেছিলাম। ভেবেছিলাম আমার এক জ্ঞাতির ছেলেকে দেব। তা খোকাবাবু যখন ওটা চালায় তখন ওটা আপনার কাছেই থাকুক।”
“না, না, তা হতে পারে না,” আমি ঘোর আপত্তি জানাই। সাইকেল একটা মূল্যবান জিনিস, কেউ বললেই হুট্ করে আমি তা নিতে পারি না। আপনার ছেলের সাইকেল, আপনাকে নিয়ে যেতে হবে।” একটু দৃঢ়তা নিয়েই বললাম।
মানুষটি এবার উঠে দাঁড়ালেন, “না স্যার, ওটা এখানেই থাকুক। তা হলেই আমার মন শান্তি পাবে।”
মহাঝামেলায় পড়া গেল! কি কুক্ষণেই না বিপুলকে সাইকেলটায় চড়ার অনুমতি দিয়েছিলাম। তখন হঠাৎ করেই আমার মাথায় বুদ্ধিটা এল। আচ্ছা, সাইকেলটা তো আমি কিনে নিতে পারি। পুরনো র্যালে সাইকেল। ছয় শ, বড়জোড় সাত শ টাকা দাম হতে পারে এই বাজারে। মাসের প্রথম, হাতে টাকা কিছু আছে আমার কাছে। আর খোদেজা ভাল গিন্নী। ওর কাছেও দু-একশ সব সময় থাকে। টাকাটা হয়ে যাবে। বললাম : “আপনি একটু দাঁড়ান। আমি ভেতর থেকে আসছি।”
খোদেজাকে পুরো ব্যাপারটি বুঝিয়ে বলতে, রাজি করাতে ও টাকাগুলো নিয়ে ভেতর থেকে বারান্দায় ফিরে আসতে কিছুটা সময় পার হল। এসে দেখি বারান্দাটা ফাঁকা। মানুষটি নেই। শুধু বিপুল গেটের কাছে সাইকেলটা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ওর মুখে কিছুটা হতভম্ব ভাব। “লোকটা কই গেল রে?” আমার এ প্রশ্নের জবাবে বিপুল বলল : “ওই বুড়ো মানুষটা?...আজব লোক! জান আব্বা, সাইকেলটাকে কিছুক্ষণ আদর করে, আমার মাথায় কিছুক্ষণ হাত বুলিয়ে বিড়বিড় করে কী সব বলে লোকটা চলে গেল। ...লোকটা কে আব্বা?”
আমি দ্রুতপায়ে গেটের বাইরে এসে গলিটার এ প্রান্ত ও প্রান্ত চাইলাম। ফাঁকা। শুধু শীতবিকেলের ধোঁয়াশা ভাবটা আমার চশমার কাঁচের অস্পষ্টতা আরো বাড়িয়ে দিয়ে আমার দূরের দৃষ্টিটা আস্তে আস্তে ঝাপসা করে দিল। ·
লেখক পরিচিতি : তানভীর মোকাম্মেল খ্যাতিমান চলচ্চিত্রকার, কবি, গল্পকার ও প্রাবন্ধিক। জন্ম ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে, বাংলাদেশের খুলনায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। শিল্পকলায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বাংলাদেশ সরকার তাকে ২০১৭ সালে একুশে পদকে ভূষিত করে। তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্রগুলো হচ্ছে : নদীর নাম মধুমতি, চিত্রা নদীর পাড়ে, লালসালু, লালন, রাবেয়া, এবং জীবনঢুলি।


2 মন্তব্যসমূহ
ভাল লাগল। বিশেষ, গল্প বলার অনায়াস ধরন। বিনয় যে ফিরে আসবে না, নিহত হবে, অনুমান করছিলাম। গল্পকার কিন্তু নৃশংসতার দৃশ্যরূপ দেখাননি, দেখাননি বিনয় দেশের জন্যে যুদ্ধ করে জীবন বিসর্জন দিয়েছে, যেমন কেউ কেউ না লিখে পারতেন না। এইজন্যে যন্ত্রণা অন্যভাবে তীক্ষ্ণ হয়েছে। আরও এক জিনিস লক্ষ করলাম। বি মুছে দেয়া যায়নি। বিনয়ের বি আর বিপুলেরও বি।
উত্তরমুছুনএমনভাবে মন ভারাক্রান্ত হলেও ভালো লাগে। সকালটা এভাবে শুরু হল। একটি মূল্যবান সম্পদ পরবর্তী প্রজন্মের কাজে লাগুক এই তো আনন্দ বাবাদের। সন্তান যে কোন ধর্মের হোক না কেন তাতে তার ছেলেই জীবিত থাকলো।
উত্তরমুছুন