পিউ শ্রীপর্ণা
মেঘা মজুমদার সমসাময়িক ইংরেজি সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নাম। কলকাতায় জন্ম ও বেড়ে ওঠা এই লেখিকা শৈশবেই ভাষা, সমাজ ও ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য খুব কাছ থেকে দেখেছেন। পরবর্তীকালে উচ্চশিক্ষার জন্য হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে যান। সমাজ-নৃবিজ্ঞানে পড়াশোনা করে তিনি বুঝতে পারেন, মানুষের গল্প শুধু রাজনীতি বা ইতিহাসে নয়, প্রতিদিনের জীবনের ভেতরেই লুকিয়ে আছে। পরে জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে স্থায়ী হন নিউ ইয়র্কে। সেখানেই লেখালেখির পাশাপাশি সম্পাদনার কাজ শুরু করেন, এবং ক্রমে গড়ে তোলেন এক স্বতন্ত্র সাহিত্যিক কণ্ঠ।
২০২০ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম উপন্যাস A Burning—যা তাঁকে বিশ্বসাহিত্যের আলোচনায় নিয়ে আসে। বইটির কাহিনি ভারতের এক তরুণ মুসলিম মেয়েকে ঘিরে, যে ভুল সময়ে একটি ফেসবুক পোস্ট করে, এবং রাষ্ট্র সেই পোস্টকে সন্ত্রাসের সমর্থন হিসেবে ধরে নিয়ে তার জীবন ধ্বংস করে দেয়। এই বইয়ের ভাষা সহজ, গতি সিনেমার মতো, কিন্তু প্রশ্নগুলো গভীর ও রাজনৈতিক। জেমস উড এই উপন্যাসকে ‘সাহসী ও অসাধারণ’ বলেছিলেন। A Burning–এর পর থেকেই পাঠকরা অপেক্ষায় ছিলেন তাঁর পরবর্তী কাজের জন্য। আর পাঁচ বছর পর, ২০২৫ সালে, তিনি প্রকাশ করলেন তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস আ গার্ডিয়ান অ্যান্ড আ থিফ (A Guardian and a Thief), যা তাঁর সাহিত্যিক পরিপক্বতার এক নিদর্শন।
এই নতুন উপন্যাসটি এক নিকট ভবিষ্যতের কলকাতাকে কেন্দ্র করে রচিত। শহরটি জলবায়ু বিপর্যয়ে ধ্বংসপ্রায়। তাপদাহ, বন্যা, খাদ্যাভাব আর অনিশ্চয়তা সর্বত্র। গল্পটি সাত দিনের মধ্যে ঘটে। একদিকে মা নামের এক নারী, যিনি তার বাবা ও ছোট মেয়ে মিষ্টিকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নিতে চান; অন্যদিকে এক তরুণ চোর, বুম্বা—যে নিজের অনাহারী পরিবারকে বাঁচাতে খাবার খুঁজতে এসে সেই মায়ের বাড়ি থেকে চুরি করে ফেলে তাদের ‘ক্লাইমেট ভিসা।’ বুম্বা ভাবে, তার পরিবারও তো জীবনের সামান্য নিরাপত্তা পাওয়ার যোগ্য। সে প্রশ্ন তোলে, যাদের ঘরে বৃষ্টির পানি ঢোকে, মশা কামড়ায়, যারা প্রতিদিন ক্ষুধায় কাতর, তারা কি মানুষের মতো বাঁচার অধিকার রাখে না? এই প্রশ্নেই উপন্যাসের কেন্দ্রবিন্দু—কে যোগ্য, কে অযোগ্য, আর কে সিদ্ধান্ত নেয় কে বাঁচবে আর কে মরবে।
মেঘা মজুমদার এখানে নৈতিকতার সীমারেখা মুছে দেন। মা নিজের অল্প সম্পদও রক্ষা করতে চায় মেয়ের জন্য। সে ভিক্ষুকের মুখ ফিরিয়ে নেয়, কারণ তার কাছে নিজের সন্তানের ভবিষ্যৎই সব। লেখিকা লেখেন, “মা ভিক্ষুকের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে মিষ্টির দিকে তাকালেন—তার চোখে মেয়েই তখন ভিক্ষুকের চেয়েও বেশি মানুষ।” অপরদিকে বুম্বা মিষ্টিকে অপহরণ করে এক ধনী দাতার কাছ থেকে সাহায্য পাওয়ার আশায়। কিন্তু মজুমদার বলেন, “বুম্বা কোনো দানব নয়, সে শুধু এমন এক মানুষ যার নৈতিক দিকনির্দেশ সব সময় নিজের পরিবারের দিকে ঘোরে।” পাঠক বুঝতে পারে, রক্ষক আর চোর, মা আর বুম্বা, আসলে একই মুদ্রার দুই পিঠ। সমাজের অন্যায় পরিস্থিতি তাদের অবস্থান পাল্টে দিয়েছে মাত্র।
লেখিকার নিজের ভাষায়, “আমরা প্রতিদিনই নৈতিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছি—কী খাব, কী কিনব, কোথা থেকে আসছে সেই জিনিস। আমরা জানি এর পেছনে আছে অমানবিক শ্রম আর শোষণ, তবু বেঁচে থাকার প্রয়োজনে আমরা চোখ ফিরিয়ে নিই।” এই ভাবনাটিই উপন্যাসের মূল সুর—জীবনের টানাপোড়েনে ন্যায় আর অন্যায় আলাদা করে বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। জলবায়ু পরিবর্তনের মতো ভয়াবহ বাস্তবতায় সেই প্রশ্ন আরও জটিল হয়। লেখিকা বলেন, “এই বই এক ঝলক দেখায়, আমরা কেমন মানুষ হয়ে উঠতে পারি—যখন আমাদের চারপাশের পৃথিবী ভেঙে পড়ছে।”
আ গার্ডিয়ান অ্যান্ড আ থিফ কেবল নৈতিক প্রশ্ন নয়, ভাগ্য নিয়েও এক গভীর চিন্তা। কেউ সুযোগ পায়, কেউ পায় না। কিন্তু প্রাপ্যতা আর ভাগ্য সব সময় এক জিনিস নয়। লেখিকা নিজেও বলেন, “এই পৃথিবীতে অনেক ভালো বই আছে, যেগুলো নিঃশব্দে প্রকাশিত হয়। ভাগ্য না থাকলে কেউ সেগুলো দেখে না।” তাঁর নিজের সাফল্য নিয়েও তিনি বলেন—গর্ব আছে, কিন্তু সেটি ভাগ্যের সৌভাগ্যও। এমন বিনয় ও সচেতনতা তাঁর সাহিত্যিক ব্যক্তিত্বের একটি দিক হয়ে উঠেছে।
মজুমদার সাত বছর কাজ করেছেন Catapult Books–এ—প্রথমে সহকারী সম্পাদক, পরে প্রধান সম্পাদক হিসেবে। ২০২২ সালে তিনি সেই চাকরি ছাড়েন, কারণ তখন মনে হয়েছিল, এবার নিজের সমস্ত শক্তি লেখায় দিতে হবে। তিনি বলেন, “আমি সব সময় ভাবতাম, একটা স্থায়ী চাকরি ছাড়া জীবন কল্পনা করা যায় না। কিন্তু তখনই বুঝলাম, লেখার জন্য ঝুঁকি নেওয়ার সময় এসেছে।” তখনই তিনি লিখছিলেন আ গার্ডিয়ান অ্যান্ড আ থিফ–এর পান্ডুলিপি। এই বইই পরে তাঁকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এনে দেয়।
লেখিকা হিসেবে তাঁর পথ চলা সহজ ছিল না। ছোটবেলায় ইংরেজি ভাষা তাঁকে ভয় পাইয়ে দিত। বাড়িতে ছিল বাংলা ভাষার পরিবেশ, স্কুলে ইংরেজি। হার্ভার্ডে গিয়ে তিনি প্রথম শিখলেন কীভাবে কোনো লেখা নিয়ে প্রশ্ন করা যায়, মত তৈরি করা যায়, নিজের ভাবনা প্রকাশ করা যায়। কিন্তু সেই শিক্ষা এসেছিল নিঃসঙ্গতার মধ্যে দিয়ে। তিনি বলেন, “হার্ভার্ডে সবাই জানত কীভাবে বন্ধুত্ব করতে হয়, কীভাবে সম্পর্ক গড়ে ভবিষ্যতে কাজে লাগানো যায়। আমি জানতাম শুধু এইটুকু—যার সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগে, তার সঙ্গেই সময় কাটাও। তাই আমি প্রায়ই একা থাকতাম।” কিন্তু সেই নিঃসঙ্গতাই তাঁকে চিন্তা শিখিয়েছে। আফ্রিকার রাজনীতি, লাতিন আমেরিকার ইতিহাস, রুশ সমাজ—এই বিষয়গুলো তাঁর চোখ খুলে দিয়েছিল।
২০২১ সালে জন্ম নিল তাঁর প্রথম সন্তান, আর ২০২৫ সালে দ্বিতীয়। মাতৃত্ব তাঁর লেখাকে আরও গভীর করেছে। তিনি বলেন, “মাতৃত্ব আমাকে নিজের লেখার কেন্দ্র খুঁজে দিয়েছে। আমি বুঝেছি, ভালোবাসা তখনই সত্য, যখন তা চাপের মুখেও টিকে থাকে।” এই অভিজ্ঞতা উপন্যাসে প্রতিফলিত হয়েছে। মা এবং বুম্বা দুজনই নিজেদের পরিবারকে বাঁচাতে গিয়ে নৈতিকতার সীমা পেরিয়ে যায়। তাঁদের মধ্যে যেমন ভালোবাসা আছে, তেমনি আছে ভয়, অপরাধবোধ ও আত্মরক্ষার তাগিদ।
বইটি প্রকাশের পর প্রশংসায় ভরে গেছে বিশ্বমাধ্যম। Kirkus Reviews লিখেছে, “এটি মর্যাদা ও নৈতিকতার ওপর নির্মম আঘাতের এক উজ্জ্বল চিত্র।” Publishers Weekly বলেছে, “নিকট ভবিষ্যতের কলকাতায় এক পরিবারের সংগ্রামের আলোয় লেখা এক উজ্জ্বল গল্প।” Washington Post একে বলেছে “একটি নিখুঁত ক্ষুদ্র উপন্যাস, যেখানে অল্প পৃষ্ঠায়ও বিস্তৃত এক পৃথিবী ধরা দিয়েছে।” আর ওপ্রাহ উইনফ্রে একে তাঁর বুক ক্লাবের পছন্দ হিসেবে ঘোষণা করেন, বলেন, “আমরা এমন বই আগে কখনও পড়িনি।” এর আগে বইটি National Book Award–এর শর্টলিস্টে এবং Kirkus Prize–এর ফাইনালিস্ট হিসেবেও নির্বাচিত হয়।
মেঘা মজুমদার এই উপন্যাসে আসলে বর্তমান পৃথিবীকেই ভবিষ্যতের আয়নায় দেখিয়েছেন। জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্যসংকট, অভিবাসন, বৈষম্য—সব একসঙ্গে মিশে গেছে এখানে। তিনি রাজনৈতিক স্লোগানের মতো কিছু বলেন না, বরং সাধারণ মানুষের ভেতর দিয়ে দেখান এই সংকটের বাস্তবতা। তাঁর ভাষা সহজ, কিন্তু সেই সরলতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক ধরনের আবেগীয় ও নৈতিক তীব্রতা। পাঠক যখন গল্পের ভেতর ঢোকে, তখন কেবল বুম্বা বা মা’র কথা নয়, নিজের কথাও ভাবতে বাধ্য হয়।
শেষে মেঘা মজুমদার বলেন, “শিল্প আমাদের প্রতিদিনের জীবনের ঝামেলা থেকে কিছু সময়ের জন্য মুক্তি দেয়। এটি আমাদের এমন জায়গায় নিয়ে যায়, যেখানে প্রশ্নগুলো বড় হয়ে ওঠে—আমি কেন এখানে আছি? জীবনের শেষে ফিরে তাকালে কী দেখতে চাই? আমি কেমন জীবন বাঁচতে চাই?” এই কথাগুলো তাঁর শিল্পবোধের কেন্দ্র। শিল্প কেবল বিনোদনের বিষয় নয়, এটি আত্মার অনুসন্ধান।
আ গার্ডিয়ান অ্যান্ড আ থিফ তাই শুধু গল্প নয়—এটি এক নৈতিক আয়না, যেখানে মানুষ নিজের মুখোমুখি হয়। জলবায়ু ও ভাগ্যের সংকটে দাঁড়িয়ে মেঘা মজুমদার আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন—রক্ষক ও চোর, উভয়ই আমাদের ভেতরেই বাস করে। শিল্প আমাদের সেই মুখ দেখতে শেখায়, যাকে আমরা প্রতিদিন আড়াল করে রাখি।·


0 মন্তব্যসমূহ