২০১৫ সালের জুন মাসে নগুগি ওয়া থিয়োং’ও কেনিয়ার কেনিয়াত্তা বিশ্ববিদ্যালয় ও নাইরোবী বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ভাষণ দিলেন। সেটির শিরোনাম ‘আমাকে আমি হতে শেখাও’। যারা একসময় উপনিবেশিত ছিল, তারা রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন হলেও মনস্তাত্ত্বিকভাবে স্বাধীন হতে পারে কি না, বা কতটুকু পারে, তা নিয়ে নগুগির সংশয় রয়েছে। এই সংশয় মার্তিনিকের প্রখ্যাত রাজনৈতিক দার্শনিক, তাত্ত্বিক ফানোরও আছে। তিনি ক্ষমতা-কাঠামোর কলকাঠি নাড়া মধ্যবিত্তের ব্যাপারে বেশ সন্দিহান। এ বিষয়টি তিনি তাঁর দ্য রেচেড অব দ্য আর্থ গ্রন্থের তৃতীয় অধ্যায়ে খোলাসা করেছেন। ইতিহাস-বিশ্লেষণে দেখা যায়, বেশিরভাগ স্বাধীন দেশের ক্ষমতা-কাঠামো সাধারণত মধ্যবিত্তের হাতে এসে পড়ে। সহজাত বুর্জোয়া মনোভঙ্গির কারণে এদের চোখে সবসময় প্রাক্তন ঔপনিবেশিকদের চশমা আঁটা থাকে। সেই ধার করা চশমায় এরা নিজেদের দেখে। আর সমস্যাটা এখানেই। এই সমস্যা আত্মপরিচয়হীনতার। আত্মপরিচয়হীন যেকোন জাতি বিভ্রান্ত হয়, দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগে। এই দ্বিধার জায়গায় ভর করে একটি জাতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করে সাম্রাজ্যবাদ, নিওকলোনিয়ালিজম। দাসত্বের শৃংখল আর ছেঁড়ে না। থেকে যায়। এই শেকল বেয়ে শরীর, মন, মস্তিষ্কে বাসা বাঁধে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, ফ্যাসিবাদ, বিচারহীনতা, অন্যায় ও অন্যায্যতা। আর এইসব ব্যাধির উপসর্গ তো খুবই ভয়ানক।
দেশে দেশে আজ মানুষের পুঞ্জিভূত ক্ষোভ, রাগ রূপ নিচ্ছে আন্দোলনের। এ আন্দোলন আর কোনো কিছুর দাবীতে নয়, একেবারে ক্ষমতা-কাঠামোর বিরূদ্ধে চরম অনাস্থার বহিঃপ্রকাশ। এই আন্দোলনের অভিঘাতে ক্ষমতার হাতবদল হচ্ছে বটে, কিন্তু মানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হচ্ছে না। শীঘ্রই সব অর্জন বেহাত হয়ে যাচ্ছে। কারণটা কী? আমরা যে যার মতো করে কত শত যে কারণ আবিষ্কার করছি, তার কোনো শেষ নেই। তবে নগুগি যথার্থই এই কারণ নির্দেশ করেছেন তাঁর বক্তৃতায়। সেটি হলো শিকড়-বিচ্ছিন্নতা—‘আমি হতে না পারা’। ধার করা ধারণা, দর্শন, রূপরেখা বাহ্যিক চাকচিক্য বাড়ায় বটে, কিন্তু ভেতরটাকে একেবারে ভঙ্গুর করে দেয়। এই ভঙ্গুরতা কখনই আত্মবিশ্বাসের নির্মাণ করে না। আর আত্মবিশ্বাসহীন যেকোনো জাতি বারবার যে পথ হারাবেই, তা ইতিহাসের অনেক ঘটনায় প্রমাণিত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে শ্রীলংকা, বাংলাদেশ ও নেপালের ঘটনার বিশ্লেষণ করতে গেলে বারবার নগুগি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠেন। ইতিহাসের চরম সব সত্যের বলিষ্ঠ উচ্চারণ ও বয়ান হাজির করেছেন নগুগি ওয়া থিয়োং’ও। তবে একাজ সহজ নয়। ক্ষমতা-কাঠামো স্তুতি শুনতে চায়, সমালোচনা নয়। তাই নগুগি সারা জীবন নানাভাবে নির্যাতিত হয়েছেন, নিপীড়িত হয়েছেন। তাঁর এমন কিছু অভিজ্ঞতার অত্যন্ত শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত বয়ান ডিটেইন্ড: আ রাইটার’স প্রিজন ডায়েরি।
এ বছরের মে মাসের আটাশ তারিখে নগুগি ওয়া থিয়োং’ও মারা গেলেন। একটি যুগের সমাপ্তি ঘটল। জন্মেছিলেন কেনিয়ার কামিরিথুতে ১৯৩৮ সালের ৫ই জানুয়ারিতে। জাতীয়তায় কেনীয় হলেও দীর্ঘ জীবন কাটিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রে। নিজ দেশে ফিরতে পারেননি। দেশকে ভালোবেসেছেন; আফ্রিকা বিশ্বদরবারে নিজ পরিচয়ে পরিচিত হোক; সমৃদ্ধ ইতিহাস, বর্ণিল ঐতিহ্য, বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি, ঔদার্হ্যে অতুলনীয় আফ্রিকা ধার করা অথবা ঔপনিবেশিকদের চাপিয়ে দেওয়া কোনো পরিচয়ে নয়; বরং নিজ পরিচয়ে পরিচিত হয়ে উঠুক; আফ্রিকার সব মানুষের জন্য ন্যায় ও ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠিত হোক—এটিই ছিল তাঁর লেখক-জীবনের মিশন ও ভিশন। আত্মমর্যাদাবোধ ও আত্মসংকল্প ‘আমাকে আমি’ হয়ে উঠতে সাহায্য করতে পারে। বিশ্বায়নের অজুহাতে পুনঃউপনিবেশায়ন, সাহায্য-সহযোগিতার নামে তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর শোষণ ও প্রতারণা অব্যাহত রাখা এবং সেই কাজে স্থানীয় রাজনীতিকদের এদের দোসর হিসেবে কাজ করার কারণে অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদের মহাদেশ আফ্রিকা বর্তমানে দারিদ্রক্লিষ্ট, অপুষ্টিতে ভোগা, জাতিবিবাদে রক্তাক্ত এক ভূখণ্ডে পরিণত হয়েছে। নগুগির ভাষাভাবনা, সংস্কৃতি-চিন্তা, আত্মবিশ্লেষণ আফ্রিকাকে বিউপনিবেশায়নের পথ দেখায়, নয়া-উপনিবেশবাদের প্রতিপ্রপঞ্চ নির্মাণ করে। তাই একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, নগুগি ওয়া থিয়োং’ও ঔপনিবেশিক ও উত্তর-ঔপনিবেশিক কেনিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান, অকুতোভয় দেশপ্রেমিক, বিপ্লবী, কর্মিষ্ঠ বুদ্ধিজীবী ও লেখক। ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে বরাবরই তিনি বজ্রকণ্ঠ। আর উত্তর-ঔপনিবেশিক কেনিয়ায় তিনি যখন দেখেছেন যে, স্থানীয় শাসকগোষ্ঠী পরাজিত ঔপনিবেশিকদের লেগাসি বা উত্তরাধিকার বহন করে চলেছে, তখন তিনি তাঁদের বিরুদ্ধে তাঁর ক্ষুরধার কলম ব্যবহার করেছেন দুর্দান্ত সাহসিকতার সঙ্গে।
সহজাত রসবোধ থেকেই তিনি তাঁর ডিটেইন্ড গ্রন্থের একেবারে প্রথম অধ্যায়ে উত্তর ঔপনিবেশিক কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট জোমো কেনিয়াত্তার সমালোচনা করে বলেছেন, “ব্রিটিশরা নিরপরাধ কেনিয়াত্তাকে জেলে পুরেছিল, আর এখন কেনিয়াত্তা স্বাধীন কেনিয়ার নিরপরাধ সাধারণ মানুষকে জেলে পুরছেন।” উত্তর ঔপনিবেশিক কেনিয়ার সাধারণ মানুষের হতাশা, বেদনা, ক্ষোভ ও রাগের পশ্চাতের কারণ অনুসন্ধান করতে গেলে এই উক্তির মধ্যে তার সূত্র খুঁজে পাওয়া যাবে। দেশ স্বাধীন হয়, শাসক পাল্টায়। কিন্তু শোষণ পাল্টায় না। দেশীয় শাসক, রাজনীতিকদের ঔপনিবেশিকতার উত্তরাধিকার বহন করার কারণে গণতন্ত্রের অপমৃত্যু হয়। তাই দেশ স্বাধীন হলেও স্বাধীনতা সব মানুষের হয় না; তাই মানুষেরও সংগ্রাম থামে না।
নগুগিরও সংগ্রাম থামেনি তাঁর জীবদ্দশায়। পাঠকের প্রতি দায়বদ্ধ লেখক কখনই ক্ষমতাকাঠামোর সঙ্গে সন্ধি করেন না। তাঁর অবস্থান সবসময় এর বিপরীতে। বিপরীতে মানে যে বিরুদ্ধে, তা কিন্তু নয়। কিন্তু ক্ষমতাকাঠামো সব সময় এক ধরনের স্নায়ু দৌর্বল্য বা নার্ভাসনেসে ভোগে। সত্য ভাষণ উচ্চারণকারী লেখক-শিল্পী-সাহিত্যিককে প্রতিপক্ষ বিবেচনা করে। নগুগির ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। যে জোমো কেনিয়াত্তা কেনিয়ার স্বাধীনতা বিপ্লব মাউ মাউ-এ (স্থানীয় ভাষায় এর অর্থ ‘বেরিয়ে যাও, বেরিয়ে যাও’) অংশ নিয়েছেন এবং যাঁর দেশপ্রেম ও অসীম সাহসিকতায় মুগ্ধ হয়ে নগুগি আরেক কেনীয় অধ্যাপক ও রাজনৈতিক লেখক আলী আল আমীন মাজরুই-এর সঙ্গে যৌথভাবে তাঁর জীবনী লেখারও পরিকল্পনা করেছিলেন, সেই জোমো কেনিয়াত্তা স্বাধীনতার পর কেনিয়ার প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েই নগুগিকে শত্রু গণ্য করতে শুরু করলেন।
আফ্রিকার অনেক দেশেরই গণতন্ত্রের দুর্বল গাঁথুনির অন্যতম প্রধান কারণ স্থানীয় শাসকদের ঔপনিবেশিক প্রভুদের উত্তরাধিকার বহন করা। এই উত্তরাধিকার বহন করতে গিয়ে তারা স্থানীয় শিল্পী-কবি-সাহিত্যিকদের শত্রু ভাবতে শুরু করেন। অনেককে জেলে পাঠান, কাউকে গুম করেন; কাউকে লোকদেখানো বিচারের পর ফাঁসিতে ঝুলানো হয়, আবার কাউকে কাউকে নিপীড়ন, নির্যাতন, আইনী হয়রানি ও পেটোয়া বাহিনি লেলিয়ে দিয়ে ভয় দেখিয়ে দেশ ছাড়া করা হয়। চিনুয়া আচেবে বায়াফ্রার যুদ্ধের পর নিজ দেশে থিতু হতে পারেননি। কেন্ সারো উইয়াকে লোকদেখানো বিচারের পর ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করেছে সানি আবাচার স্বৈরসরকার। তিনি নাইজেরিয়ার ওগোনী নৃগোষ্ঠীর অন্তর্ভূক্ত ছিলেন। স্থানীয় সরকারের সঙ্গে আঁতাত করে পশ্চিমা তেল কোম্পানিগুলো নাইজেরিয়ার পেট্রোলিয়াম নিয়ে যায় তাদের দেশে। আর বিষাক্ত বর্জ্য নিক্ষেপ করে নাইজার নদীতে। ফলে জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়। জেলেরা মাছের অভাবে বেকার হয়ে পড়ে। পরিবেশ বিপর্যয় ঘটে। কেন্ সারো উইয়া দাঁড়িয়েছিলেন স্থানীয়দের পক্ষে। তাঁকে বাঁচতে দেয়নি উত্তর ঔপনিবেশিক স্বাধীন নাইজেরিয়ার সরকার। ক্রিস্টোফার ওকিবো যিনি নাইজেরিয়ার অন্যতম প্রধান আধুনিক কবি, তাঁকেও হত্যা করা হয়েছে। ওলে সোয়িংকা প্রায় পুরোটা জীবন ছিলেন আমেরিকায় নির্বাসিত। নিজ দেশে জেল খেটেছেন দুই বছর। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথম মেয়াদে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে সোয়িংকা তাঁর গ্রিন কার্ড ছিঁড়ে ফেলেন এবং নিজ দেশে ফিরে আসেন। দ্য ফেমিস্ড রোড গ্রন্থের রচয়িতা ওকরিও স্বেচ্ছা নির্বাসিত হয়ে আছে ব্রিটেনে।
এমন ঘটনা আমাদের এ অংশেও আছে। সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদের মদদপুষ্ঠ ক্ষমতাকাঠামো বিরুদ্ধ-প্রপঞ্চ সহ্য করে না। একে দমন করতে প্রথমে লোভ দেখায়। তাতে কাজ না হলে পরে ভয় দেখায়। যাই হোক, নগুগিও পড়েছিলেন জোমো কেনিয়াত্তার রোষানলে। কেন? এর উত্তর অবশ্য নগুগি নিজেই দিয়েছেন। তার প্রিজন ডায়েরীতে তিনি লিখেছেন, “আমাকে বলা হয়, ১৯৭৭ সালের ডিসেম্বর মাসের কোন এক সময় দুজন উচ্চ পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা মোম্বাসায় যান এবং জোমো কেনিয়াত্তার সঙ্গে জরুরি ভিত্তিতে সাক্ষাৎ করার অনুমতি চান। তাঁদের প্রত্যেকের এক হাতে পেটাল্স অব ব্লাড, অপর হাতে নগাহিকা নদিন্দা। তারপর তাঁরা কেনিয়াত্তাকে গ্রন্থ দুটির প্রেক্ষাপট ও কিছু কিছু শব্দ, লাইন পড়ে শোনান এবং এগুলোকে রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর বলে উল্লেখ করেন।”
এরপর এঁরা পরামর্শ দেন যে, এই লেখককে থামাতে হবে এবং তাই তাঁকে জেলে পাঠানো জরুরি হয়ে পড়েছে। কেউ কেউ আগ বাড়িয়ে বললেন, তাঁকে চিরতরে নিস্তব্ধ করে দেওয়া হোক, অর্থাৎ হত্যা করা হোক। কিন্তু তাঁকে হত্যা করলে দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি হবে বলে জেলে পাঠানোই জোমো কোনিয়াত্তা শ্রেয় মনে করলেন। কাজেই, নগুগিকে কামিতির সর্বোচ্চ নিরাপত্তার কারাগারে পাঠানো হলো। এরকম কারাগারে সাধারণত খুব বড় বড় দুস্কৃতকারীদের আটকে রাখা হয়। নগুগির গ্রেফতার নিয়ে অনেক খবর ছাপা হলো। তবে সেগুলোর প্রায় সবগুলোই কল্পনানির্ভর। হিলারী নগেনোর পত্রিকা দ্য উইক্লি রিভিউ ১৯৭৮ সালের ৯ জানুয়ারীতে লেখে, “শোনা যাচ্ছে, গত বুধবার দুপুরে নগুগিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কারণ, পুলিশি তল্লাশির সময় তাঁর কাছে চাইনিজ ও অন্যান্য সাহিত্য পাওয়া গেছে।”
নগুগি উল্লেখ করেছেন, তাঁকে গ্রেফতার করার প্রধানতম কারণ ছিল যে, তিনি নাকি বামপন্থি। ১৯৭৭ সালের ২৯ শে ডিসেম্বর তাঁর গ্রেফতার আদেশে সই করেন কেনিয়ার ভাইস প্রেসিডেন্ট মি. ডেনিয়েল পি. আরাপ মই। সে অনুযায়ী পরের দিন, অর্থাৎ ৩০/৩১ ডিসেম্বরে তাঁকে গ্রেফতার করে জেলে পাঠানো হয়। রাত্রি দ্বিপ্রহরে পুলিশের বিশেষ মাখার সদস্যরা তাঁর বাড়িতে হানা দেয়। পুলিশ ভ্যানের লাল-নীল বাতি আশেপাশে ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি করে। পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের হাতে লং রেঞ্জের রাইফেল। বলা নেই, কওয়া নেই ওরা নগুগির বুকশেল্ফে মার্কস, লেনিন ও এঙ্গেল্সের বই খুঁজতে শুরু করে। নগুগি বুঝতে পেরে তাঁদের সাহায্য করার প্রস্তাব দেন। কিন্তু ওরা কর্ণপাত করে না। ওরা বরং নগুগিকে জেরা করতে থাকে।
এক পর্যায়ে নগুগি জানতে চান, তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছে কি না। ওরা উত্তর দেয়, ‘নাহ’। এক পর্যায়ে নগুগিকে বলেন, তাঁকে শুধু আজ রাতের জন্য ওরা তাঁকে থানায় নিয়ে যেতে চান। আগামীকাল সকালে তাঁকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে যাবে। নগুগি ওদের সঙ্গে থানায় যান বটে, কিন্তু বাড়ি আর ফেরা হয়নি। তাঁকে পাঠানো হয় জেলে। কামিতির উচ্চ নিরাপত্তার জেলে তাঁকে ১২ ডিসেম্বর ১৯৭৮ পর্যন্ত আটকে রাখা হয়। এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রযন্ত্র তাঁকে হত্যা করতে পারতো। কিন্তু করেনি। নগুগি অবশ্য বেশ চমৎকার করে বিষয়টির মূল্যায়ন করেছেন তাঁর ডিটেইন্ড-এ। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও বিচার ছাড়া রাষ্ট্র যখন কোন নাগরিককে শারিরীক ও মানসিক শাস্তি দেয়, তখন এর পেছনে রাষ্ট্রযন্ত্রের একটি উদ্দেশ্য থাকে, আর সেটি হলো মনস্তাত্ত্বিক সন্ত্রাস সৃষ্টি করা। সন্ত্রাস মানেই তো এমন কিছু যা শান্তিপ্রিয় মানুষের জন্য ভীতিকর। এভাবে রাষ্ট্রযন্ত্র একটি ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি করে মানুষকে প্রতিবাদ, প্রতিরোধ থেকে বিরত রাখে। স্বৈরতন্ত্রের এটি একটি বৈশিষ্ট্য। এ কাজে রাষ্ট্র যে শুধু তার আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকেই কাজে লাগায়, তা নয়। রাষ্ট্রের প্রসাদপুষ্ট কিছু ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সংবাদ বা প্রচার মাধ্যমও এ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে।
ঠিক এমনটি দেখা যায় নগুগির ক্ষেত্রেও। গ্রেফতারের পর হিলারী নগেনো লেখেন, নগুগি নাকি চীন ও উত্তর কোরিয়ায় যে নিপীড়ন-নির্যাতন চলছে তার নিন্দা জানাননি। তিনি আরো অভিযোগ করে বলেন, তিনি নাকি অনেকবার সোভিয়েত রাশিয়ায় গেছেন এবং সেখানকার কবি-সাহিত্যিকদের উপর যে নির্যাতন চলছে, তারও সমালোচনা করেননি। রাশিয়ার যে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন, সেটি নাকি সাম্রাজ্যবাদী শক্তির উত্থান এবং নগুগির নাকি তাতে সায় আছে। আসলে এ ধরনের বানোয়াট সব খবরের উদ্দেশ্য ছিল নগুগিকে বামপন্থি প্রমাণ করা। আর কেনিয়াত্তা সরকার মনে করে, বামপন্থীরা কেনিয়ার শত্রু।
তবে নগুগিকে গ্রেফতারের পেছনে যত কারণই দেখানো হোক না কেন, তাঁকে আটক করার প্রধান কারণ ছিল যে, তিনি নগুগি ওয়া মিরিকে সঙ্গে নিয়ে ১৯৭৭ সালে নগাহিকা নদিন্দা (I shall Marry when I Want) শিরোনামের নাটক স্থানীয় গিকুয়ু ভাষায় লিখে স্থানীয় কৃষক বা প্রান্তিক মানুষদের নিয়ে তা মঞ্চস্থ করেন। উত্তর-ঔপনিবেশিক কেনিয়াবাসীর স্বপ্নভঙ্গের আখ্যান এই নাটকটি। কামিরিথু গ্রামে ছয় সপ্তাহ ধরে এই নাটকটির মঞ্চায়ন হয়। এরপর কেনিয়াত্তার সরকার নাটকটি বন্ধ করে দেয়; মঞ্চ গুঁড়িয়ে দেয় এবং থিয়েটারের লাইসেন্স বাতিল করে দেয়। সে বছরেরই ডিসেম্বরে উভয় নাট্যকারকে আটক করে সর্বোচ্চ নিরাপত্তার কারাগারে পাঠানো হয়। ১৯৭৮ সালে আন্তর্জাতিক চাপে কেনিয়া-সরকার উভয় নাট্যকারকে মুক্তি দেয়। কিন্তু নিরাপত্তার কারণে নগুগি ওয়া মিরি পালিয়ে যান জিম্বাবুয়েতে। আর নগুগি প্রথমে যুক্তরাজ্যে, পরে যুক্তরাষ্ট্রে স্বেচ্ছা নির্বাসন বরণ করেন।
সাধারণ মানুষকে নাটকের সঙ্গে যুক্ত করার মানে হলো বঞ্চিত, নিপীড়িত সাধারণ মানুষকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করে তোলা। আর সাধারণ মানুষ যদি রাজনৈতিকভাবে সচেতন হয় তবে তারা ক্ষমতাকাঠামোকে প্রশ্ন করবে; এর অন্যায়-অপকর্মের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে। এটি ক্ষমতা চিরস্থায়ী করতে চাওয়া শাসকগোষ্ঠীর জন্য ভীতির কারণই বটে। শুধু তাই নয়, ১৯৭৭ সালে জেলে যাবার আগেও নগুগি যেসব সাহিত্যকর্ম সৃষ্টি করেন, সেগুলোর পরতে পরতে সাধারণ মানুষের বঞ্চনার আখ্যান রয়েছে। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ক্ষমতাকাঠামোর লাগামহীন দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, দেশের সম্পদ লুট করে ইউরোপ, আমেরিকার দেশসমূহে পাচার করা এবং সেসব স্থানে প্রাসাদতুল্য গৃহনির্মাণ করে বিলাসবহুল জীবনযাপন করা।
১৯৬৩ সালে কেনিয়া স্বাধীন হলেও এর স্বাধীনতা সব জনতার হয়ে ওঠেনি। এই স্বাধীনতা বেহাত হয়ে যায় এবং কতিপয় অসৎ রাজনীতিকের পকেটে আটকে যায়। যেখানে ক্ষুধা, দারিদ্র, চিকিৎসাহীনতা, অশিক্ষা, শিশুমৃত্যু নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়, সেখানে ক্ষমতার কেন্দ্রে বসে থাকা কতিপয় মানুষ বিলাসী জীবন যাপন করে। এমন ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ-রাগ দানা বাঁধতে শুরু করে। আর এই জায়গাতেই নগুগির লেখা সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বরে পরিণত হয়। তাঁর পেটাল্স অব ব্লাড (১৯৭৭)- এও একই বয়ান হাজির হয়েছে। দেশ স্বাধীন হলেও কৃষক ও মেহনতি মানুষের ভাগ্য আর বদলায় না। দেশীয় বর্জুয়া শ্রেণি ধনসম্পদ কুক্ষিগত করে। বিদেশি প্রভুরা বিনিয়োগ করার অজুহাতে ঢুকে পড়ে দেশে উন্নয়নের ডিসকোর্স নিয়ে। এই ডিসকোর্সের মাদকতায় আসক্ত হয়ে স্থানীয় ক্ষমতাকাঠামো তাদের জন্য বড় বড় রাস্তা নির্মাণ করে। এই রাস্তা আবার ধাবিত হয় কৃষকের জমির বুক চিরে। কৃষক জমি হারায়। সহায় সম্বল হারিয়ে ভূমিহীন মানুষ শহরে যায় এমপি., মন্ত্রীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। মন্ত্রী, এমপিরা গ্রামের মানুষের ভোট নেয়, কিন্তু এরা গ্রামে সাধারণ প্রান্তিক মানুষদের কাছাকাছি থাকে না। শিকড়ের সঙ্গে এদের তেমন যোগাযোগ নেই। গ্রামের মানুষ আশায় বুক বেঁধে সাহায্য-সহযোগিতার জন্য শহরে এঁদের সঙ্গে দেখা করতে এলেও এঁদের সাক্ষাৎ পায় না। পায় অবহেলা, বাজে আচরণ, প্রতারণা।
কিন্তু মানুষের অভিমান যখন ক্ষোভ, আর ক্ষোভ যখন ক্রোধে পরিণত হয় তখন এরা আইন নিজের হাতে তুলে নিতে দ্বিধা করে না। সুযোগ পেলে মন্ত্রী-এমপিকে গুলি করে হত্যা পর্যন্ত করে। এমনই ঝাঁঝালো গল্পের আখ্যান নির্মাণ করেছেন নগুগি তাঁর পেটাল্স অব ব্লাড নামক উপন্যাসে। এই যে গল্প, তার কিন্তু বাস্তব প্রতিফলন উত্তর-ঔপনিবেশিক অনেক দেশেই দেখা যায়। নগুগি তাঁর দেশ কেনিয়াসহ আফ্রিকার অনেক দেশেই এমন চিত্র প্রত্যক্ষ করেছেন। ঔপনিবেশিকতার উত্তরাধিকার বহনকারী স্থানীয় নেতৃবৃন্দের মানসিক দাসত্বের জন্য অনেক উত্তর-ঔপনিবেশিক দেশে গণতন্ত্রের শক্ত ভিত্তি দাঁড়ায়নি। গণতন্ত্রের এমন দূর্বল কাঠামোর নানা ফাঁটলের মধ্য দিয়েই স্থানীয় দুর্নীতিগ্রস্থ নেতাদের নির্মম পরিণতির অনুষঙ্গও উৎসারিত হয় ।
ফলে, ইতিহাসের পাতা উল্টালেই দেখা যায়, অনেক দেশেই স্বাধীনতাত্তোর কালে অনেক নেতা, মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি খুন হয়েছেন। এর পেছনে অনেক কারণ থাকলেও গণমানুষের অসন্তোষও অন্যতম প্রধান কারণ। কাজেই, নগুগির পেটাল্স অব ব্লাডের গল্প যেন উত্তর-ঔপনিবেশিক কালের অনেক দেশের জন্যই প্রযোজ্য। এমন সত্য ভাষণ সাহিত্যের পাতায় কোন রাখ-ঢাক না করে নগুগি হাজির করার জন্য শাসকগোষ্ঠীর চক্ষুশূলে পরিণত হয়। এই পেটাল্স অব ব্লাড-এরও পূর্বে উইপ নট চাইল্ড উপন্যাসে নগুগি একই রকম রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শোষণের আখ্যান হাজির করেন। ১৯৬৪ সালে প্রকাশিত হওয়া এটিই নগুগির প্রথম উপন্যাস। এই উপন্যাসের প্রচ্ছদে নগুগি তার খ্রিস্টান নাম ‘জেম্স নগুগি’ লেখেন। কিন্তু শীঘ্রই তিনি এই নাম ত্যাগ করে তাঁর গোত্র-নাম ব্যবহার করেন। নাম রাখার মধ্যেও যে উপনিবেশায়নের মজবুত চর্চার অপপ্রয়াস বিদ্যমান, তা তিনি তাঁর মুভিং দ্য সেন্টার গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। কতিপয় উদাহরণ দিয়েছেন। রবিনসন ক্রুসো নির্জন দ্বীপে কৃষ্ণাঙ্গ একজনকে নরখাদকদের হাত থেকে বন্দুকের ভয় দেখিয়ে রক্ষা করে তার নাম দেন ফ্রাইডে। বন্দুক, কামান, উড়োজাহাজ, জাহাজ, জেলখানা—এগুলো ঔপপনিবেশিক প্রকল্পের হার্ডওয়ার। যাই হোক, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের জারকরস থেকে যে নাম নিঃসৃত হয়, তাকে হটিয়ে দিয়ে ঔপনিবেশিকদের নির্মাণ করা নামারোপ করা অপরায়ন করার কৌশলও বটে। এই অপরায়ন প্রক্রিয়া উত্তর-ঔপনিবেশিককালেও অব্যাহত রয়েছে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীদের যে কারিকুলামে শিক্ষা দেওয়া হয়, সেটিও অপরায়নের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
এমন পর্যবেক্ষণ থেকেই ১৯৭২ সালে নগুগি লেখেন তাঁর বহুল আলোচিত প্রবন্ধ ÔÔOn the Abolition of
the English Department”. নাইরোবী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের কারিকুলামের কেন্দ্র জুড়ে কেবলই ইউরোপের গ্রন্থ। ইউরোসেন্ট্রিজম বা জ্ঞানকাঠামোর কেন্দ্রে ইউরোপ। আর দেশি শিল্প-সাহিত্যকে একেবারে প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। এটি নিওকলোনিয়াল পরিস্থিতিরই একটি অনুষঙ্গ। ঔপনিবেশিকরা গায়ে-গতরে দেশ ছেড়েছে বটে, কিন্তু তাদের ব্যবস্থা স্থানীয়দের জ্ঞানকাণ্ড, শিক্ষা, সংস্কৃতি দখল করে রয়েছে। একটি জাতির ভাবনাব্যবস্থাকে ঔপনিবেশিত করা গেলে তাকে ভৌগলিক ভাবে উপনিবেশিত না করা হলেও সেটি দুর্লঙ্ঘনীয় ভাবেই উপনিবেশায়নের শিকার হয়। এমন উপলব্ধিই নগুগিকে প্রাগুক্ত প্রবন্ধটি লিখতে প্রণোদিত করে। এডওয়ার্ড সাঈদের ওরিয়েন্টালিজম প্রকাশিত হয় ১৯৭৮ সালে। তার বেশ আগেই নগুগির ঔপনিবেশিকদের ভূরাজনীতি ও সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদের গভীর পর্যালোচনা সত্যিই তাঁকে উপনিবেশায়ন, সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদী তৎপরতা-বিরোধী চিন্তক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
তবে নগুগির এমন অবস্থান জমো কেনিয়াত্তার ক্ষমতাকাঠামোর বিরুদ্ধে যায়। স্থানীয় ক্ষমতাকাঠামো যখন সাম্রাজ্যবাদের পৃষ্ঠপোষকে পরিণত হয় তখন নগুগি সেটিরও বিপরীতে দাঁড়িয়ে যান। এ কারণেই ১৯৭৭ সালে তাঁকে গ্রেফতার করে জেলে পাঠানোর ঘটনা কোন আকস্মিক বা তাৎক্ষণিক ব্যাপার নয়। নগাহিকা নদিন্দা তো একটি কারণ ছিলই। কিন্তু পেছনের আরো সব বিষয় যেগুলোর কিছু উল্লেখ করা হলো, সেগুলোও তাঁকে গ্রেফতারের প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল।
এত কিছুর পরও নগুগি আমৃত্যুই ছিলেন আপোষহীন বুদ্ধিজীবী। সেই আন্তোনিও গ্রামসির ‘অর্গানিক ইন্টেলেকচুয়াল।’ কর্মিষ্ঠ বুদ্ধিজীবী। তিনি যে সমাজ এবং যে জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকে উঠে এসেছেন, সারা জীবন তাঁর সব বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাকে তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করেছেন। নগাহিকা নাদিন্দা লিখেছিলেন গিকুয়ু ভাষায়। এটি তাঁর মাতৃভাষা। সে ভাষায় লিখে তিনি তার ভাষাভাষি সাধারণ মানুষকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করার সংগ্রাম করেছেন সারাটা জীবন। এই ভাষার কথ্যরূপ ছিল। লেখ্য রূপ ছিল না বললেই চলে। এই ভাষায় সাহিত্য রচনা করার মতো সমৃদ্ধ ও উপযুক্ত শব্দভান্ডারও ছিল না। নগুগি একই সঙ্গে ভাষার নির্মাণ এবং সেই ভাষায় সাহিত্য রচনারও সংকল্প করেন। এই সংকল্প তিনি সারা জীবন কঠোর ভাবে রক্ষা করেছেন। লিখেছেন গিকুয়ু ভাষায়। পরে আন্তর্জাতিক পাঠকের কথা বিবেচনা করে তা ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন। গিকুয়ু ভাষায় লেখার ঝুঁকি আছে। কারণ এই ভাষার লেখা ছাপানোর প্রকাশক পাওয়া প্রায় অসম্ভব। পাঠকের সংখ্যা একেবারেই কম। তাই এই ভাষায় গ্রন্থ ছাপিয়ে আর্থিক ভাবে লাভবান হবার কোন সম্ভবনা নেই। কিন্তু নগুগি জেনেশুনেই সেই ঝুঁকি নিয়েছেন। তিনি কারাগারে বসেও টয়লেট পেপারে লিখে ফেলেন তার বিখ্যাত উপন্যাস, যার গিকুয়ু শিরোনাম কাইতানি মুথারাবা ইনি। এর ইংরেজি নাম ডেভিল অন দ্য ক্রস। এই উপন্যাসে উত্তর-ঔপনিবেশিক স্বাধীন কেনিয়ার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শোষণ-নিপীড়নের বয়ান নির্মাণ করা হয়েছে।
১৯৭৭ সালের ৩১ শে ডিসেম্বর নগুগিকে ডিটেনশনে পাঠানো হয় এবং ১৯৭৮ সালের ১২ই ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি আটক ছিলেন। এ সময় তাঁকে কখনও কখনও এখানে সেখানে নিয়েছে কারা কর্তৃপক্ষ। নগুগি বলেন, তার সঙ্গের কাউকে কাউকে রাস্তায় গাড়ি থেকে নামিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। তিনি নিজেও সবসময় তটস্থ থাকতেন। ভাবতেন, হয়ত তাঁকেও মেরে ফেলা হবে। তাঁর উপর কেনীয় সরকারের এতটা ক্রোধ বা রাগের কারণ একটাই এবং তা হলো তিনি স্বাধীনতাত্তোর কেনিয়ার সরকারের পশ্চিমা শক্তির লেজুরবৃত্তি এবং স্থানীয় মানুষদের বঞ্চিত করার কড়া সমালোচক।
১৯৭৬ সালে নগুগি প্রকাশ করেন তাঁর বিখ্যাত নাটক দ্য ট্রায়াল অব দিদান কিমাথি। সঙ্গে সহলেখক ছিলেন মুগো। কিমাথি ছিলেন মাউ মাউ বিপ্লবের গেরিলা নেতা। কেনিয়াকে ১৯৬৩ সালে স্বাধীনতার পথে এগিয়ে দিতে তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য। অথচ জমো কেনিয়াত্তা কিমাথিসহ সাধারণ মানুষের বিপ্লবী চেতনা ও অবদানকে খাটো করে দেখে। নগুগি কেনিয়াত্তার জনগণের লোক থেকে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের উত্তরাধিকার বহনকারীতে পরিণত হওয়ার কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে নয়া-ঔপনিবেশিক পরিস্থিতির বয়ান হাজির করেছেন তাঁর উপন্যাসের আখ্যানে। তিনি কেনিয়াত্তাকে জিম্বাবুয়ের প্রধানমন্ত্রী মুজোওয়েরার সঙ্গে তুলনা করেছেন। ১৯৫৬ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকার কিমাথিকে বন্দী করে এবং ১৯৫৭ সালে লোকদেখানো বিচারের পর হত্যা করে। নগুগি তাঁর নাটকে দেখাতে চেয়েছেন যে, কিমাথির বিচার এমন হওয়ার কথা নয়। তিনি ছিলেন প্রকৃত দেশপ্রেমিক। স্বাধীনতাত্তোর কেনিয়ায় নয়া উপনিবেশবাদের প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে দেশপ্রেমিকদেরও এভাবে নিগৃত হতে হয়। এমন ঝাঁঝালো সত্যের অকুতোভয় উচ্চারণ সত্যিই কেনিয়ার সরকারকে ক্ষেপিয়ে তোলে।
নগুগি তাঁর প্রিজন ডায়েরিতে যে বিষয়টি জোর দিয়ে উল্লেখ করেছেন, তা হলো স্বাধীনতাত্তোর কেনিয়ায় নয়া-উপনিবেশবাদ বা নিওকলোনিয়ালিজমের উত্থান। যে জমো কেনিয়াত্তা স্বাধীনতার পূর্বে ছিলেন জনতার লোক, তিনি স্বাধীন কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট হয়ে পরিণত হলেন অত্যাচারী, স্বৈরশাসকে। নগুগি যখন ইংরেজি ছেড়ে তাঁর মাতৃভাষা গিকুয়ু গ্রহণ করলেন তাঁর লেখালেখির মাধ্যম হিসেবে, তখনই তিনি কেনিয়ার নয়া-উপনিবেশবাদের মুখোমুখি হলেন। রাষ্ট্র তার সব শাসনবস্ত্র নিয়ে নগুগির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেল। জেলে পাঠালো। শেষ পর্যন্ত দেশছাড়া করল। নগুগি ফিরতে চেয়েছিলেন তার প্রিয় জন্মভূমিতে। পারেননি। তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে হেনস্তার শিকার হয়েছেন। তার স্ত্রীও শারীরিকভাবে নিগৃত হয়েছেন। পুরো পুরবার অনিশ্চয়তার মধ্যে নিক্ষেপিত হয়েছে। কিন্তু নগুগি যুক্তরাষ্ট্রে থিতু হয়েও আগাগোড়াই ছিলেন কেনীয়, আফ্রিকান, জগতের সব নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর। একজন সাহিত্যিকের অনুভূতির জায়গাটাই মূলত শক্তির জায়গা। এটিকে বাদ দিলে তাঁর অস্তিত্বই অর্থহীন হয়ে ওঠে। শুধু তার নয়, সমগ্র মানুষ, সমাজ ও বিপুল সভ্যতাই অর্থহীন হয়ে পড়ে। সাহিত্যিকের অনুভব তাকে করে তোলে একটি পুরো জনপদের প্রতিনিধি। পুরো মানব সমাজ, জনপদ ও সভ্যতার মানচিত্রের তিনি হয়ে ওঠেন এক বিরাট অবিচ্ছেদ্য অংশ। তখন সভ্যতার ভাগ্য সাহিত্যিকের নিজের ভাগ্যের সঙ্গে জুড়িয়ে যায়। নগুগিও আজীবন সেই উপলব্ধিই লালন করেছেন।
ডিটেইন্ড গ্রন্থটির প্রথম অংশে নগুগি তাঁর জেলজীবন, কেনিয়ার ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি ও সমসাময়িক রাজনীতি নিয়ে সবিস্তারে বলেছেন। একেবারে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বর্ণনা করেছেন জেলের প্রতিটি অনুষঙ্গের কথা। জেলখানায় তাঁকে যে খাবার দেওয়া হতো, তা ছিল পরিমাণে অনেক কম। পঁচা। বাসি। দিনে তের থেকে তেইশ ঘন্টা পর্যন্ত ছোট্ট একটি সেলে তাঁকে আটকে রাখা হতো। একশ ওয়াটের চকচকে বাতি সবসময় মাথার উপর জ্বালিয়ে রাখা হতো। যে কারণে তিনি ঠিকমতো ঘুমাতেও পারতেন না। দুনিয়ার কারো সঙ্গে যোগাযোগ করা ছিল অসম্ভব। শুধু মাঝে মাঝে পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে জেল-কর্তৃপক্ষের পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ করে অনুমোদিত চিঠি আসতো তাঁর কাছে। কাউকে কাউকে দশ বছর যাবৎ এই জেলে আটকে রাখা হয়েছে।
নগুগিও জানতেন না কত বছর তাঁকে থাকতে হবে অন্ধকার, অস্বাস্থ্যকর কারাপ্রকষ্ঠে। তবে বন্দীদের কেউই আশা হারাতেন না। সবাই ভাবতেন, মুক্তি একদিন আসবেই। জেলখানায় কেউ রোগাক্রান্ত হলে সেটিকেও নিপীড়নের অনুষঙ্গ হিসেবে ব্যবহার করা হতো। চরম খারাপ অবস্থায় না পৌঁছলে তাঁকে চিকিৎসা দেওয়া হতো না। তারপরও যদি চিকিৎসা সেবা দেওয়া হতো, সেটি আসতে আসতে দেখা যেত অনেক দেরি হয়ে গেছে। নগুগিও একবার দাঁতের ব্যাথায় আক্রান্ত হন। অনেক চেষ্টার পর কারাকর্তৃপক্ষকে চিকিৎসার ব্যবস্থা করাতে রাজি করাতে পারলেও কারাকর্তৃপক্ষ শর্ত দেয় যে, নগুগিকে হাতে-পায়ে শিকল পরিয়ে হাসপাতালে নেওয়া হবে। নগুগি অবশ্য সেই শর্তে রাজি হন নি। পরবর্তীকালে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার অনুমতি চাইলে কারা কর্তৃপক্ষ একই রকম শর্ত দেয়। নগুগি রাজি হননি। নগুগির আত্মবিশ্বাস ছিল যে, তিনি কোন অপরাধ করেননি। স্বাধীনতা মানুষের অধিকার। কোন সুযোগ নয়। তিনি সেই অধিকার আদায়ের সংগ্রামে লক্ষ লক্ষ মানুষের সহযাত্রী মাত্র। এ কাজ কোন অপরাধ নয়। এটি গৌরবের। তিনি পরাধীনতার শেকল পরবেন কেন? এই শেকল ভাঙ্গার সংগ্রামই তো তিনি সারা জীবন করেছেন।
জেলে থাকার সময় নগুগি সবসময় মনে করতেন, তার দুরাবস্থা ব্যক্তিগত কোনো বিষয় নয়, এটি কেনিয়ার সামগগ্রিক ইতিহাসেরই একটি অংশ। ক্ষমতাকাঠামো আপামর কেনীয়দের স্বাধীনতা দেবে না। ক্ষুধা, দারিদ্র, বঞ্চনা, বেকারত্ব, অপমৃত্যু, চিকিৎসাহীনতা এদের নিয়তি। অথচ এদের ভোটে নির্বাচিত নেতারা বিদেশের ব্যাংকে টাকা জমায়; লণ্ডন, প্যারিস, নিউইয়র্কের মতো শহরে প্রাসাদতুল্য বাড়ি নির্মাণ করে আরাম-আয়েশ করে। সাধারণ মানুষ এদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ কিছুই নয়। এরা বিদেশি সংস্থার কাছে, কোম্পানির কাছে নিজের দেশের তেল, গ্যাস, পেট্রোলিয়াম, এমনকি রেইনফরেস্ট পর্যন্ত বর্গা দেয়। কমিশন খায়। স্বাধীনতার পর কেনিয়াসহ আফ্রিকার অনেক দেশেই যেন কন্ট্রাক্টরদের সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়; জনগণের নয়। এ কথা চিনুয়া আচেবে তাঁর ট্রাবল উইথ নাইজেরিয়া গ্রন্থেও উল্লেখ করেছেন। স্বাধীনতার পর অবস্থ দৃষ্টে তাঁর মনে হয়েছিল, নাইজেরিয়ায় যে সরকার দেশ চালাচ্ছে, তা আসলে কন্ট্রাকটরদের সরকার, জনগণের নয়। “Government of the contractors, by the contractors, for the contractors.”
নগুগি আসলে এই নিওকলোনিয়াল পরিস্থিতিই তাঁর নাটক নগাহিকা নদিন্দাতে অংকন করতে চেয়েছিলেন। যে কামিরিথু গ্রামের কৃষকরা মদ খেয়ে বুদ পড়ে হয়ে থাকতো বলে সবাই তাদের দুর্নাম করতো, সেই গ্রামের কৃষকদের নিয়ে নগুগি ওয়া থিয়োং’ও ও নগুগি ওয়া মিরি ছয় মাস রিহিয়ার্সাল করলেন। এই ছয় মাসে কাউকে মদ খেয়ে মাতলামি করতে দেখা গেল না। তারা সৃজনশীলতার বহি:প্রকাশ ঘটালো। কৃষকরা নাটকের নানান দৃশ্য এবং সংলাপ নিজেদের মতো করে ঠিকঠাক করে নিলো। কেউ কেউ নাটকটিকে আরোও বেশি প্রভাবশালীরূপে উপস্থাপন করার জন্য খুব ফলপ্রসূ পরামর্শ দিলো। সবাই অবাক হলো সাবলটার্ন, প্রান্তিক মানুষদের অসাধারণ সৃজনশীলতা দেখে। তারা শৃংখলাবদ্ধ হতে থাকলো। দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন দলে দলে আসতে লাগলো রিহিয়ার্সালে অংশ নেওয়ার জন্য, আর নাটক উপভোগ করার জন্য। বিষয়টি সরকারের লোকজনের চোখে পড়ে গেল। সাধারণ মানুষ রাজনৈতিকভাবে সচেতন হয়ে উঠলে তা নিপীড়নকারী সরকারের ভবিষ্যতের জন্য ঝুঁকিকর। কাজেই এদের থামাতে হবে। এই ‘থামানোর’ প্রকল্পের অংশ হিসেবেই নগুগিকে জেলে পাঠানো হয়েছিল।
শুধু তাই নয়, প্রাগুক্ত নাটকের আরেকটি বিষয় ক্ষমতাকাঠামোকে বিচলিত করে তুলেছিল। সেটি হলো নাটকের হিরোইন বা প্রধান নারী চরিত্র ওয়ারিঙ্গার রাজনৈতিক সচেতনতা। নারীরা সংগ্রামী জনতার মধ্যে সবসময়ই অবমূল্যায়নের শিকার। এরা পুরুষের পাশাপাশি সংগ্রাম করে, যুদ্ধ করে, দেশ স্বাধীন করে। কিন্তু এদের কৃতিত্ব বেশিরভাগ সময় বেহাত হয়ে যায়। নগুগি কেনিয়ার প্রান্তিক নারীদের অসাধারণ ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে ওয়ারিঙ্গার চরিত্রটিকে বিশেষভাবে নির্মাণ করেছেন। মাউ মাউ বিপ্লবে যেসব মহিয়সী নারী অংশ নিয়েছিলেন, তাঁদের অন্যতম মে কিতিলিলি, মুরা ওয়া নগিতি, মেরি মুতোনি নায়ানজিরু প্রমুখ।
নগুগির মা-ও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই বিপ্লবের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এজন্য নিপীড়িতও হয়েছেন। তার এক ভাই এই বিপ্লবে শহিদ হয়েছেন; আরেক ভাই যোদ্ধা ছিলেন। এ কারণে মাউ মাউ বিপ্লবে নারীর অবদান বিষয়ে নগুগি খুব ভালো করেই জানতেন। এমন অভিজ্ঞতা থেকে তিনি ওয়ারিঙ্গার চরিত্র নির্মাণ করেন। কিন্তু গোটা জনগোষ্ঠীর অর্ধেক যখন নারী এবং সেই নারীকে যদি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বাইরে রাখা যায়, তবে ক্ষমতাকাঠামো অনেক প্রতিরোধ-প্রতিবাদ থেকে রক্ষা পায়। এই প্রান্তিক নারীদের যখন নগুগি রাজনৈতিকভাবে সচেতন করার কাজে নামলেন, তখন স্বভাবতই তিনি ক্ষমতাকাঠামোর নিষ্ঠুর বৈরিতার শিকার হলেন।
১৯৭৮ সালে জোমো কেনিয়াত্তা মারা না গেলে হয়তো নগুগির কারাবাস আরো দীর্ঘায়িত হতো। এ পর্যায়ে একটি বিষয় পরিষ্কার যে, স্বাধীনতা পরবর্তী কেনিয়ার সরকার দৃশ্যমান ভাবেই চায় নি দেশে বিরোধী কোন রাজনৈতিক দল তৈরি হোক বা মাথাচাড়া দিয়ে উঠুক। ১৯৮২ সালে স্বাধীন কেনিয়ার সর্বপ্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম প্রসিদ্ধ নেতা জারামোগি ওগিন্দা ওদিঙ্গা (১৯১১-১৯৯৪) দেশে গণতান্ত্রিক ধারা সূচনার জন্য বিরোধী দল গঠনের তৎপরতা চালিয়েছিলেন। কিন্তু তাকে গৃহবন্দী করে রাখা হয় এবং তাঁর ছেলেকে রাষ্ট্রদ্রোহীতার অভিযোগে বন্দী করা হয়।
তবে নগুগি প্রিজন ডায়েরিতে ল্যাণ্ড এলিয়েনেশনের বিষয়টি উল্লেখ করেননি। স্থানীয় কৃষক যারা প্রকৃতপক্ষে জমির মালিক তাদের কাছ থেকে উর্বর কৃষি জমি কেড়ে নিয়ে তা শ্বেতাঙ্গদেরকে বরাদ্দ দেওয়া স্বাধীনতাত্তোর কেনিয়ার সরকারের একটি বড় সমস্যা। কাগিয়া ও কারিউকি যারা মাউ মাউ বিপ্লবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন, তাঁরা এর সমালোচনা করেন। স্বাধীনতার পরেও কেনিয়া স্বাধীনতার পূর্বে যে উদ্দেশ্য নিয়ে সংগ্রাম করেছিল, কারিউকি সেই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যান। ফলে ১৯৭৫ সালে তিনি গুপ্তহত্যার শিকার হন। কাগিয়া ও কারিউকি উভয়েই জেল খেটেছেন। কারিউকি খুন হবার পর নগুগি তাঁর প্রিজন ডায়েরির একটি সাপ্লিমেন্টারি লেখেন এবং এর পুনঃপ্রকাশ করেন।
মাউ মাউ বিপ্লব কেনিয়ার ইতিহাসে একটি বড় ঘটনা। কিন্তু কতিপয় পশ্চিমা বুদ্ধিজীবী ও বিশেষজ্ঞ এটিকে নিছক একটি মিথনির্ভর হাঙ্গামা বলে চিহ্নিত করার অপচেষ্টা চালিয়েছে। আমাদের উপমহাদেশেও তাই হয়েছে। ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিপ্লব ঘটে। এটিই এই উপমহাদেশের ঔপনিবেশিকতা বিরোধী প্রথম স্বাধীনতা আন্দোলন। অথচ ইংরেজরা এটিকে সিপাহী বিদ্রোহ বলে চালিয়ে দিয়েছে। যাই হোক, মার্জারী পারহাম, যিনি ঔপনিবেশিকতাবাদ বিষয়ক একজন বিখ্যাত বিশেষজ্ঞ তিনি মনে করেন মাউ মাউ ‘বিদ্রোহ’ একটি নিছক কল্পকাহিনি নির্ভর হট্টগোল ছাড়া আর কিছুই নয়। তিনি পরোক্ষ শাসনব্যবস্থার উপর জোর দেন। ঔপনিবেশিকরা আফ্রিকায় বা কেনিয়ায় কী কী অবকাঠামোর উন্নতি করেছে, তার ফিরিস্তি তুলে ধরেন। অর্থাৎ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকরা কেনীয়দের উপর নিপীড়ন-নির্যাতনের যে স্টীমরোলার চালিয়েছে, তা যে তাদের কল্যাণার্থে করা হয়েছে, সে-কথাই পারহাম প্রতিষ্ঠিত করার প্রকল্প চালিয়েছেন। ঔপনিবেশিকরা কীভাবে স্থানীয়দের সব সম্পদ লুটপাট করেছে এবং তাদের সর্বশান্ত করেছে, সেটি তার বয়ানে ধরা পড়েনি।
তবে নগুগি তার প্রিজন ডায়েরিতে পশ্চিমা সংস্কৃতির আগ্রাসনের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করেছেন। কারিউকি পারহামের মতো যেসব colonial apologists বা পরোক্ষ ঔপনিবেশিক শাসনের কথা উপস্থাপন করেছেন, তাঁদের নির্মমভাবে ব্যবচ্ছেদ বা কাটাছেঁড়া করেছেন। ঔপনিবেশিক সরকার কেনিয়ায় বসবাসরত কয়েকশ নৃগোষ্ঠীকে একে অপরের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলো। ‘ভাগ করো, শাসন করো’ নীতিতে এরা তাদের শাসন কায়েম করেছিল। শুধু তাই নয়, কারিউকি যখন থ্রি-ডে হিল্স ক্যাম্প নামক জেলে বন্দি ছিলেন, তখন সেখানকার ডিস্ট্রিক্ট কমিশনার তুরকানা এবং সাম্বুরু নৃগোষ্ঠীর মধ্যে প্রচার করেন যে, গিকুয়ু নৃগোষ্ঠীর বন্দীরা জঘন্য। এরা মহিলাদের স্তন চিবিয়ে খেয়ে ফেলে। এমনকি গর্ভবতী মহিলার পেট চিরে বাচ্চা বের করেও খেয়ে ফেলে। এরকম বানোয়াট মিথ প্রচার করে ঔপনিবেশিকরা স্থানীয়দের একে অপরের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন। এটিও ঔপনিবেশিক ক্ষমতাকাঠামো চিরস্থায়ী করার একটি প্রভাবশালী অথচ অসৎ কৌশল।
যাই হোক, প্রিজন ডায়েরির দ্বিতীয় সেকশনে নগুগি কিছু চিঠি সংযোজন করেন। এই চিঠিগুলোতে তিনি তাঁকে গ্রেফতার করার বিস্তারিত বর্ণনা ও কারণ উল্লেখ করেন। তিনি মূলত যেটিকে তাঁর গ্রেফতার হওয়ার পেছনের প্রধান কারণ বলে চিহ্নিত করেন, সেটি হলো তার গিকুয়ু ভাষার নাটক নগাহিকা নদিন্দা। তাঁকে গ্রেফতার করার ঘটনাকে তিনি শাসকগোষ্ঠীর কেনিয়ার ইতিহাসের পাতা থেকে প্রতিবাদ, প্রতিরোধ ও প্রতিপ্রপঞ্চ মুছে ফেলার অপচেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়। মুখের তিল আড়াল করতে কেউ যদি কেউ আয়না ভেঙ্গে ফেলে, তবে কি তিল মুছে যায়? বরং শত শত আয়না সামনে এসে হাজির হয়। এই আয়নায় বাস্তবতার প্রতিফলন ঘচে।
জেল থেকে মুক্তির পর নগুগি কী অবস্থার সম্মুখীন হন, সেটিরও বর্ণনা দিয়েছেন। তৃতীয় অধ্যায়ে নগুগি ডিটেনশন থেকে মুক্তি পাওয়ার পরের অবস্থা বর্ণনা করেছেন। জেল থেকে বেরিয়ে নগুগি তাঁর আগের কর্মস্থল নাইরোবী বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে যান। কিন্তু তাঁর ডিপার্টমেন্টে তিনি আর যোগ দিতে পারলেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত আইনানুযায়ী কর্তৃপক্ষ এটি করতে পারে না। কিন্তু কর্তৃপক্ষ তাঁকে যোগ দিতে দেয় না। ডিপার্টমেন্টের নাম তিনিই ‘ডিপার্টমেন্ট অব ইংলিশ’ থেকে ‘ডিপার্টমেন্ট অব লিটারেচার’ এবং ‘ডিপার্টমেন্ট অব লিঙ্গুইস্টিক্স অ্যান্ড আফ্রিকান ল্যাঙ্গুয়েজেস’ এ পরিবর্তন করেছিলেন। অথচ তাঁর প্রিয় ডিপার্টমেন্টে তাঁকে যোগ দিতে অনুমতি দেওয়া হয় না। বরং সরকারের ইচ্ছেনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কঠোর নিয়ম-কানুন আরোপ করে যাতে কোন শিক্ষক বা ছাত্রছাত্রী সরকার-বিরোধী কোন কথা, কাজ বা আলোচনায় অংশ নিতে না পারে। শিক্ষক সমাজ নগুগিকে জোরালোভাবে সমর্থন করে। এ সময় সরকার এক দল, এক দেশ, এক নেতা-নীতি গ্রহণ করে। জনগণের পক্ষ থেকে প্রেসিডেন্ট আরাপ মই এর কাছে গণভোটের দাবী পেশ করা হয়। কিন্তু কোন কাজ হয়নি।
১৯৮২ সালে বিমান বাহিনী ক্যু করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলে সরকার বেপরোয়া হয়ে ওঠে। অসংখ্য মানুষকে হত্যা করা হয়, গুম করা হয় ও জেলে পুরা হয়। সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরীগুলো তন্ন তন্ন করে খুঁজে বামপন্থী সব বই বের করে পুড়িয়ে ফেলে। ১৯৮২ সালে থিয়েটারের লাইসেন্স বাতিল করা হয়। ১৯৮২ সালে জিম্বাবুয়ে সরকারের আমন্ত্রণে নাটকের কলাকুশলী সেখানে যেতে চাইলে কেনীয় সরকার তাঁদের পাসপোর্ট দিতে অস্বীকৃতি জানায়। নগুগি এসময় উপন্যাস লেখায় মনোনিবেশ করেন।
আসলে নগুগির ডিটেইন্ড শুধু তাঁর কারাগারের রোজনামচা নয়, এটি ১৯৭০ ও ১৯৮০ এর দশকের বিপর্যস্ত কেনিয়ার বিশ্বস্ত ইতিবৃত্ত। নগুগির জনগণের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা তাঁকে জনগণের একটি জনপদের এবং একটি সভ্যতার প্রতিনিধিত্বে পরিণত করেছে। কারাবরণ তার জীবনে যেমন একদিকে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে, তেমনি এর অভিঘাতে নগুগি সারা জীবন গিকুয়ু ভাষায় সাহিত্য রচনা করেছেন। তার পূর্বে গিকুয়ু ভাষার লেখ্যরূপ তেমন ছিল না। তিনি একাধারে ভাষা তৈরি করেছেন এবং লিখেছেন গিকুয়ু ভাষার লেখ্যরূপ তাঁর হাত দিয়েই স্থায়ী রূপ লাভ করেছে। আবার তাঁর ডিটেইন্ড জগতের সকল নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বরও বটে। সব মিলিয়ে বলা যায়, নগুগির ডিটেইন্ড একটি শক্তিশালী প্রপঞ্চ যা আমাদের সময়, বাস্তবতা, ও অভিজ্ঞতার শরীরে প্রচণ্ড অভিঘাত তৈরি করে। ·
লেখক পরিচিতি : এলহাম হোসেন অধ্যাপক গবেষক, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও সাহিত্য সমালোচক। তাঁর পিএইচডি গবেষণার বিষয় নাইজেরীয় সাহিত্যিক চিনুয়া আচেবের উপন্যাস। বসবাস করছেন ঢাকায়।


0 মন্তব্যসমূহ