তিন.
ফুকোর মতে, আমরা যখন ইতিহাস পড়ি বা লিখি, তখন আমরা না জেনেই কতগুলি সহজ ধারণার ওপর নির্ভর করি। আমরা ধরে নিই যে, ইতিহাসের একটা ধারাবাহিকতা আছে, একটা ঘটনা আরেকটা ঘটনার জন্ম দেয়, এবং সবকিছুর পেছনে একটা মূল কারণ কাজ করে।
ফুকোর মূল লক্ষ্য হল চিন্তার ইতিহাস, যেমন বিজ্ঞানের, দর্শনের ইতিহাস লেখা। আমরা ইতিহাসকে বুঝবার জন্যে কতগুলি আগে থেকে তৈরি ধারণা ব্যবহার করি। এইসব ধারণা আমাদের চিন্তাকে সহজ করে দেয়, কিন্তু সত্যিকে আড়াল করে। আমরা মনে করি অতীতের কোনো একটা কিছু একইভাবে বর্তমানেও চলছে, যেমন আমরা বলি বাঙালি ঐতিহ্য বা মুসলমান-ঐতিহ্য। ফুকো বলছেন, এই ঐতিহ্য শব্দটি আসলে একটা ধোঁকা। যখন আমরা শত শত ভিন্ন ঘটনাকে ঐতিহ্য নাম দিয়ে এক করে ফেলি, তখন আমরা প্রতিটি ঘটনার নিজস্ব নতুনত্ব বা পার্থক্যকে আর দেখতে পাই না। আমরা শুধু মিলগুলি খুঁজি। আমরা যখন বলি অমুক-ঐতিহ্য, তখন আমরা ধরে নিই যে, পরের সকলে শুধু সেই অমুককেই অনুসরণ করেছেন। কিন্তু হতে পারে, অন্যরা তমুক কথা বা সম্পূর্ণ নতুন কথা বলেছেন, যা অমুকের সঙ্গে মেলে না। ঐতিহ্য শব্দটি সেই নতুনত্বকে চাপা দিয়ে দেয়।
আমরা খুব সহজে বলি, অমুক কবির ওপর জীবনানন্দ দাশের প্রভাব আছে, অথবা নজরুলের ওপর রুমির প্রভাব আছে। ফুকো বলছেন, এই প্রভাব একটা জাদুকরী শব্দ। দুজন লেখকের লেখায় মিল পেলেই আমরা বলে দিই প্রভাব। কিন্তু কীভাবে সেই প্রভাব কাজ করল, তা আমরা ব্যাখ্যা করি না। এটা একটা অলস ব্যাখ্যা। যেমন আমিও একজন কবিতালেখক বলে এই জাতীয় কথার মুখোমুখি আমাকেও হতে হয় যে, আমার কবিতায় জীবনানন্দের প্রভাব আছে। কিন্তু যখনই জানতে চাই কেমন প্রভাব, কীভাবে প্রভাব, তার আর উত্তর পাই না। এই যে এমন কথা আমাকে শুনতে হয় এর কারণ কী? এর কারণ হল আমি প্রায় সময়ই বলি জীবনানন্দ দাশ আমার সবথেকে প্রিয় কবি, বলি তিনি পৃথিবীর সবথেকে বড়ো কবি, আরও বলি যে শৈশবে আমি জীবনানন্দ দাশের কবিতা থেকে অক্ষরবৃত্ত শিখেছি, বলি যে তখন জীবনানন্দের একটা কবিতা পাশে রেখে একই মাত্রায় আমিও আরেকটা কবিতা লিখতাম ইত্যাদি। ফলে এইসব কথা শুনে কারো কারো মনে হতেই পারে যে আমার কবিতায় জীবনানন্দের প্রভাব আছে। প্রভাব নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু কীভাবে আছে? এই ব্যাখ্যা কারো জানা নেই। রবীন্দ্রনাথ ও শেলী দুজনেই প্রকৃতি নিয়ে কবিতা লিখেছেন। তাই বলে কি রবীন্দ্রনাথ শেলীর দ্বারা প্রভাবিত? ফুকো বলবেন, এভাবে না দেখে আমাদের বরং খোঁজা উচিত, ওই নির্দিষ্ট সময়ে মানে ঊনবিংশ শতকে কলকাতা বা লন্ডনে এমন কী ঘটছিল, যার ফলে দুজন কবিই প্রকৃতি নিয়ে লিখতে বাধ্য হচ্ছিলেন? কারণটা প্রভাব না-ও হতে পারে।
আমরা ভাবি, ইতিহাস একটা সরলরেখায় উন্নতি বা বিকাশের দিকে এগিয়ে যায়, যেমন একটা বীজ থেকে গাছ হয়। ফুকো বলছেন, চিন্তার ইতিহাস এমন সরল নয়। এমন নয় যে, চিকিৎসাবিজ্ঞান প্রাচীন কবিরাজি থেকে ধাপে ধাপে উন্নত হয়ে আজকের জায়গায় এসেছে। ইতিহাস আসলে অনেক আঁকাবাঁকা, এখানে অনেক ভুল পথ আছে, অনেক কিছু শুরু হয়েও হারিয়ে গেছে। আমরা ভাবি, গণতন্ত্রের বিকাশ। ফুকো বলবেন, প্রাচীন গ্রিসের গণতন্ত্র আর আজকের গণতন্ত্র এক ব্যাপার নয়। এটা সরল বিকাশ নয়, বরং একটা ধারণার সম্পূর্ণ রূপান্তর।
আমরা বলি, মুসলমান মানস বা একাত্তরের চেতনা। আমরা ভাবি, একটা নির্দিষ্ট সময়ের সব মানুষ বুঝি একই রকমভাবে চিন্তা করত। ফুকো বলেন, এটা একটা কাল্পনিক ধারণা। কোনো যুগেই সব মানুষ একভাবে ভাবে না। যুগচেতনা বলে আমরা আসলে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের চিন্তাকে সবার ওপর চাপিয়ে দিই।
আমরা খুব সহজে বলি মধ্যযুগের সাহিত্য বা সপ্তদশ শতাব্দীর বিজ্ঞান। ফুকো বলছেন, সাহিত্য বা বিজ্ঞান শব্দগুলির অর্থ সব যুগে এক ছিল না। আজ আমরা সাহিত্য বলতে যা বুঝি, যেমন উপন্যাস, কবিতা, ৩০০ বছর আগে ইউরোপে লিটারেচার বলতে বোঝাতো যেকোনো ধরনের লিখিত জ্ঞান, তা হতে পারে ইতিহাস, দর্শন বা রসায়ন। তাই আমাদের আজকের চশমা দিয়ে অতীতকে দেখাটা বড়ো ভুল।
আমরা ভাবি, একটা বই হল একটা একক, সম্পূর্ণ জিনিস। ফুকো বলছেন, একটা বইয়ের শুরু বা শেষ কোথায়? একটা বই কি মলাটের ভেতরেই শেষ? না। প্রতিটি বই অন্য হাজারটা বইয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। একটা কবিতার সংকলন, একটা উপন্যাস, আর একটা রান্নার বই, এই তিনটাকে কি একইভাবে বই বলা যায়? যায় না। ফুকো বলছেন, বই কোনো স্বয়ংসম্পূর্ণ বস্তু নয়, এটা আসলে একটা জালের একটা গাঁট।
ফুকো বলছেন, প্রতিটি কথা বা লেখা, যাকে তিনি বলেন বক্তব্য, তাকে একটা ঘটনা হিসেবে দেখতে হবে। আমাদের প্রশ্ন এটা নয় যে, লেখক কী বোঝাতে চেয়েছিলেন? ফুকোর প্রশ্ন হল কীভাবে এটা লেখা সম্ভব হল যে, এই নির্দিষ্ট কথাই ওই নির্দিষ্ট মুহূর্তে বলা হল? অন্য কোনো কথা কেন বলা হল না?
ফুকো এটা জিজ্ঞেস করবেন না যে, রাজা রামমোহন রায় সতীদাহ প্রথা নিয়ে কী ভেবেছিলেন। ফুকো জিজ্ঞেস করবেন, ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে এমন কী কী সামাজিক, রাজনৈতিক, বা জ্ঞানতাত্ত্বিক পরিবর্তন ঘটল, যার ফলে সতীদাহ প্রথা অমানবিক, এই কথাটা বলা সম্ভব হল? এই কথাটা ৫০০ বছর আগে কেন বলা সম্ভব হল না?
ফুকো এই বলা সম্ভব হবার পেছনের নিয়মগুলিকেই খুঁজছেন। একটা নির্দিষ্ট যুগে কোন কথাগুলি বলা যাবে, কোনগুলি বলা যাবে না, কে কথা বলবে ডাক্তার, না কি কবিরাজ, এবং কোথা থেকে বলবে, হাসপাতাল, না কি মন্দির থেকে, এই সবকিছুর নিয়ম মিলিয়েই তৈরি হয় ডিসকোর্স বা ভাষ্য।
ফুকো ইতিহাসকে একটা মসৃণ, ধারাবাহিক নদী হিসেবে দেখতে চান না। তিনি ইতিহাসকে দেখতে চান একটা প্রত্নতাত্ত্বিক ক্ষেত্রের মতো, যেখানে বিভিন্ন স্তর আছে, এক স্তরের সঙ্গে আরেক স্তরের কোনো মিল নেই, বরং প্রতিটা স্তরের নিজস্ব আলাদা নিয়ম আছে। তিনি আসলে ইতিহাস লেখার পুরো পদ্ধতিটাকেই ওলটপালট করে দিতে চেয়েছেন। তিনি বলছেন, ইতিহাস মানে হল যা ঘটে গেছে তার হুবহু বর্ণনা দেওয়া নয়। ইতিহাস লেখার মানে হল, আমরা কোন কোন ধারণার ওপর ভিত্তি করে ওই বর্ণনা দিচ্ছি, সেটাকে আগে প্রশ্ন করা।
ফুকো ঐতিহ্য, প্রভাব, বিকাশ, লেখক ইত্যাকার সহজ শব্দের ব্যবহার বন্ধের কথা বলেছেন। বলছেন এগুলি মানুষকে অন্ধ করে রাখে। এর বদলে, প্রতিটি বাক্যকে, প্রতিটি লেখাকে একটা আকস্মিক 'ঘটনা' হিসেবে দেখে এমন প্রশ্ন করা উচিত যে এই ঘটনাটা ঘটার পেছনের আসল নিয়মগুলি কী ছিল।
চার.
নিৎসের মতো ফুকোও মান্য করতেন যে, পৃথিবীতে নিত্য সত্য বা সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ জ্ঞান বলে কিছু নেই। ফুকো দেখিয়েছেন যে, যাকে আমরা জ্ঞান বা যুক্তি বলি, তাও আসলে নির্দিষ্ট সময়ের ক্ষমতার দ্বারা তৈরি। জ্ঞান ও ক্ষমতা পরস্পরের পরিপূরক, যেমন ঔপনিবেশিক আমলে ব্রিটিশরা যখন ভারতের ইতিহাস লিখেছে, তারা যুক্তি দিয়েই দেখিয়েছে যে ভারতীয়রা অসভ্য আর ব্রিটিশরা সভ্য। তখন সেটাই ছিল জ্ঞান বা যুক্তি। আজ আমরা সেটা মানি না।
ফুকো বলছেন, যাকে আজ আমরা মানসিক রোগ বলে চিকিৎসার আওতায় আনছি, মধ্যযুগে তাকেই হয়তো অন্য দৃষ্টিতে দেখা হত। বিজ্ঞান এখানে ধ্রুব সত্য নয়, বরং সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করবার একটা হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। তাই আপনি যখন বিজ্ঞানসম্মত ইতিহাসের কথা বলছেন, ফুকো প্রশ্ন করবেন, কার বিজ্ঞান? কোন সময়ের বিজ্ঞান? ইতিহাস কেবল ঘটনার সমষ্টি নয়, ইতিহাস হল কে সেই ঘটনা লিখছে এবং কার স্বার্থে লিখছে, তার বিশ্লেষণ।
ফুকো দেখান যে, আধুনিক যুগে সংস্কারের নামে মানুষকে আসলে আরও বেশি নিয়ন্ত্রিত করা হয়েছে। আগে রাজারা প্রকাশ্যে শাস্তি দিতেন, আর আধুনিক সমাজ স্কুল, হাসপাতাল, কারাগার তৈরি করে মানুষের মনকে নিয়ন্ত্রণ করে। বিদ্যাসাগর বা রামমোহন যখন শিক্ষা বা সতীদাহ প্রথা নিয়ে কাজ করেছেন, তখন তারা অজান্তেই একটা ঔপনিবেশিক আধুনিকতার পত্তন করেছেন। এর ফলে আমরা নিজেদের ঐতিহ্যকে বর্বর ভাবতে শিখেছি এবং ইউরোপীয় কায়দায় সভ্য হতে চেয়েছি। ফুকোর চিন্তানুসারে আপনি যাকে অন্ধকার দূর করা বলছেন, সেটা আসলে ক্ষমতার এক নতুন বিন্যাস। এর মাধ্যমে এক ধরনের শাসনব্যবস্থার উত্থান হয়েছে। ইতিহাসকে শুধু ভালো বনাম মন্দের সরলরেখায় না দেখে, ক্ষমতার পালাবদল হিসেবে দেখতে হবে।
তাহলে ফুকোর কথা শুনে ইতিহাস লিখলে কি আমরা তার দ্বারাই প্রভাবিত হচ্ছি? না, ফুকো নিজেকে কোনো নবি বা গুরু হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাননি। তিনি তার বইগুলিকে এক একটা ছোটো বোমা বা চশমার সঙ্গে তুলনা করেছেন, যা ব্যবহার করে প্রত্যেকে তার নিজের সময়কে বিশ্লেষণ করতে পারে। আর তার চিন্তাকে ব্যবহার করা মানে তাকে অন্ধভাবে পূজা করা নয়, বরং তিনি জ্ঞানের দিকে যাবার যে পথ দেখিয়েছেন, সেই পথে দাঁড়িয়েই করে প্রচলিত সত্যকে প্রশ্ন করা যায়। তার পদ্ধতি ব্যবহার করে ইতিহাস লেখা মানে তার চিন্তার অনুগামী হওয়া নয়, বরং প্রচলিত ইতিহাস যে অমোঘ সত্য বলে দাবি করে, সেই দাবির মুখোশ খুলে দেওয়া।
ফুকো নিজেও স্বীকার করেন যে তার কথা শেষ কথা নয়। তিনি বলছেন যে প্রতিটি সমাজের নিজস্ব সত্যের রাজনীতি থাকে। আপনি যে চশমা দিয়ে দেখছেন, তা আসলে বর্তমান যুগের প্রভাবশালী চশমা। ফুকো কেবল আপনাকে সচেতন করছেন যে, আপনার চোখেও একটা চশমা আছে, যা আপনি হয়তো খেয়াল করছেন না।
ফুকোর চিন্তানুসারে আমরা কি চাইলেই বর্তমানের চশমা খুলে ফেলতে পারি? না, পারি না। ফুকো তার পদ্ধতিকে বলেছেন বর্তমান সময়ের ইতিহাস। তিনি জেনেশুনেই বর্তমানের চশমা দিয়ে অতীতকে দেখেছেন, কেননা আমরা অতীতে ফিরে যেতে পারি না। আমরা যা পারি, তা হল বর্তমান সমস্যাগুলির শেকড় খোঁজার জন্যে অতীতকে ডিসকোর্স বা সন্দর্ভ করতে পারি।
ফুকোর মতে, খালি চোখ বলে কিছু নেই। আপনি ফুকোর চশমা খুললে হয়তো হেগেল বা মার্ক্সের চশমা পরবেন, অথবা আপনার নিজস্ব সংস্কারের চশমা পরবেন। তাই ফুকো লুকোছাপা না করে বর্তমানের লেন্স দিয়েই অতীতকে ব্যবচ্ছেদ করবার পক্ষে। এটা কোনো ভুল পদ্ধতি নয়, এটাই বাস্তব পদ্ধতি।
ফুকো নিৎসের মতো মান্য করতেন যে, কোনো জ্ঞানই বক্তার অবস্থান ছাড়া তৈরি হয় না। ফুকো যদি জেলখানার ইতিহাস লেখেন বন্দিদের প্রতি সহানুভূতি থেকে, তবে সেটা তার দুর্বলতা নয়, সেটাই তার শক্তি।
প্রচলিত ইতিহাস সবসময় বিজয়ীর বা শাসকের পক্ষপাত দুষ্ট। ফুকো সচেতনভাবেই উলটো দিকের পক্ষপাত তৈরি করেছেন। তার তথ্যে ঘাটতি থাকতে পারে, কিন্তু তার বিশ্লেষণে যে ঝোঁক আছে, সেটা অনিচ্ছাকৃত ভুল নয়, সেটা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ। তিনি আপনাকে নিরপেক্ষ সত্য দিতে আসেননি, তিনি আপনাকে ধাক্কা দিতে এসেছেন। তাই তার পক্ষপাত তার দর্শনেরই অংশ।
আপনি যদি মেনে নেন যে জ্ঞান ও ক্ষমতা অবিচ্ছেদ্য, তবে আপনি আর কখনোই পুরনো পদ্ধতিতে নিরপেক্ষ ইতিহাস লিখতে পারবেন না। আপনি বলতে পারেন না, একটু ফুকো নিলাম, আর একটু প্রথাগত পদ্ধতি নিলাম। কারণ ফুকো প্রথার ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন।
ফুকো কোনো ধর্মগ্রন্থ লিখেননি। তিনি তার বইতে দেখিয়েছেন যে, আমরা যা কিছুকে স্বাভাবিক বা চিরন্তন বলে মনে করি, তা আসলে কৃত্রিমভাবে তৈরি।
ফুকো ইতিহাসকে বাতিল করেন না। তিনি ইতিহাসের একপেশে ভঙ্গিটাকে ভেঙে দেন। তার চিন্তানুসারে, রাজা রামমোহন রায় বা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মহানুভবতার আড়ালে ঔপনিবেশিক ক্ষমতার যে জটিল সমীকরণ ছিল, সেটা অস্বীকার করলে ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। আপনি যদি বলেন, মানুষের মৃত্যু হয়, এটা বিজ্ঞান, আর এটাই সত্য, ফুকো তাতে আপত্তি করবেন না। কিন্তু আপনি যদি বলেন, ‘পাশ্চাত্য শিক্ষাই একমাত্র আলো এবং আমাদের অতীত ছিল অন্ধকার’, তখন ফুকো বলবেন, ‘দাঁড়ান, এই আলো আর অন্ধকারের সংজ্ঞা কে তৈরি করল? এর পেছনে রাজনীতিটা কী?’
ফুকো কখনোই বলেননি যে তার জ্ঞানের পদ্ধতি ব্যবহার করলে ইতিহাসের সব অন্ধকার দূর হয়ে যাবে, বরং তার চিন্তা ঠিক উলটো।
ফুকোর চিন্তা ইতিহাসকে আরামদায়ক বা নিশ্চিত করতে আসেনি, এসেছে ইতিহাসকে অস্থিতিশীল করতে। তিনি দেখাতে চান যে, ইতিহাস কোনো সোজা রাস্তা নয়, বরং এটা খাপছাড়া, ভাঙাচোরা এবং দুর্ঘটনার সমষ্টি।
ফুকো নিৎসে দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন, যিনি মনে করতেন ইতিহাসের কোনো অন্তিম গন্তব্য নেই। তাই ফুকোর উদ্দেশ্য অন্ধকার দূর করা নয়, বরং অন্ধকারটা কেন তৈরি হল, সেটা দেখানো। ফুকো কোনো মিথ্যা আশা দেন না। তাই তার ওপর আশা ভঙ্গের দায় চাপানো যায় না।
ফুকোর মতে, ইতিহাসে তথ্যের অভাব বা হারিয়ে যাওয়া তথ্য কোনো কাকতাল বা দুর্ঘটনা নয়, এটাও ক্ষমতার খেলার অংশ।
আর্কাইভে কী রাখা হবে আর কী ফেলে দেওয়া হবে তাও ঠিক করে ক্ষমতা। যারা ক্ষমতায় থাকে, তারা তাদের পক্ষের তথ্যই সংরক্ষণ করে। যখন আপনি দেখছেন কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর, যেমন কৃষক, নারী বা তথাকথিত পাগলের কোনো তথ্য নেই, তখন সেই অনুপস্থিতিটাই সবথেকে বড়ো প্রমাণ। এটা প্রমাণ করে যে, তাদেরকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলবার একটা প্রক্রিয়া চালু ছিল। তথ্য নেই বলে আমাদের আস্থা বা আত্মবিশ্বাস হারানোর দরকার নেই, বরং আমরা পূর্ণ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারি যে, এইখানে এই সম্পর্কে তথ্য নেই, কারণ ক্ষমতা চায়নি এইখানে এই জাতীয় তথ্য থাক। এই ‘কেন নেই?’ এটাই ফুকোর কাছে ইতিহাস।
ফুকোর চিন্তানুসারে সত্য হল বহুমাত্রিক। ফুকোর কাছে ইতিহাস কোনো রত্ন উদ্ধার করা নয়, যা মাটির নিচে লুকানো আছে। ইতিহাস হল বর্তমানের প্রয়োজনে অতীতকে তৈরি করা। তিনি চান আমরা যেন সক্রিয়ভাবে প্রশ্ন করি, ‘এই ইতিহাস এখন কেন আমাদের সামনে এইভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে?’
তথ্য নেই মানে কোনো সীমাবদ্ধতা নয়, এটাই ইতিহাসের চরিত্র। আমরা জানি না আসলে কী ঘটেছিল, কিন্তু আমরা জানি কীভাবে আমাদের ভুলানো হয়েছে বা কীভাবে সত্য তৈরি করা হয়েছে। ঘরটা অন্ধকার করে রাখা হয়েছে, এটাই তো আসল তথ্য। কে আলো নিভিয়ে দিল এবং কেন করল, সেটা বের করাই আমাদের কাজ, ঘরের আসবাবপত্র গোনা কোনো কাজ নয়।
ফুকো হলেন চোখের সেই অপারেশন, যা একবার হলে আপনি আর পৃথিবীকে আগের মতো দেখতে পাবেন না। আপনি ফুকোকে যে লাইব্রেরির একটা বই হিসেবে দেখছেন, তিনি নিজেকে সেই লাইব্রেরিতে আগুন লাগানোর বারুদ হিসেবে দেখতেই পছন্দ করতেন।
মিশেল ফুকোর দর্শন আমাদের ইতিহাসের তথাকথিত নিরপেক্ষতার মোহ ভেঙে দিয়ে এক নতুন দৃষ্টির সন্ধান দেয়। তিনি শেখান যে, ইতিহাস মানে কেবল অতীতের ঘটনার বিবরণ নয়, বরং বর্তমান ক্ষমতার স্বার্থে নির্মিত এক বয়ান, যেখানে ‘কী ঘটেছে’ জানার চেয়ে ‘কেন ও কার স্বার্থে’ এই সত্য তৈরি হল, তা বোঝাই জরুরি। ফুকোর চিন্তার জগৎ আমাদের কোনো স্বস্তিদায়ক সমাধান দেয় না, বরং প্রশ্ন করতে শেখায়। তার চিন্তা হল সেই ছুরি, যা আমাদের চিন্তার স্থবিরতাকে ফালি ফালি করে কেটে প্রচলিত সত্যের পেছনের রাজনীতি ও ক্ষমতার খেলাকে উন্মোচন করতে বাধ্য করে। ·
লেখক পরিচিতি : নির্ঝর নৈঃশব্দ্য কবি, চিত্রী ও গল্পকার। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ২৭টি। ঢাকায় বসবাস করছেন।


0 মন্তব্যসমূহ