রশীদ করিমের প্রবন্ধ : শহীদুল্লা কায়সার-এর ‘সারেং বৌ’


দম সারেং সমুদ্রে গেছে। সেই গেছে তো গেছে। ফিরবার নাম নেই। এমন সে যায়। বছর দুই সমুদ্রে থাকে। আবার গ্রামে ফিরে আসে। তিন মাস অন্তর টাকা পাঠায়। চিঠি আসে। একবার বুঝি দু'বছরের জায়গায় ফিরতে তিন বছর করে ফেলেছিল। আগে এ রকম হয়নি। তিন বছর উতরে গেল। চিঠি নেই। টাকা-পাঠাবার নাম নেই। দেশের বাড়িতে তার স্ত্রী নবিতুন, নয় বছরের মেয়ে আককি-কে নিয়ে বড্ড চিন্তায় আছে। মরদ আসে না কেন? সংসার যে আর চলতে চায় না। ধান ভানার কাজ করে নবিতুন নিজের ও মেয়ের পেট চালাতো। কিন্তু গ্রামে এখন ধানের কল বসেছে। সুতরাং হাত-পায়ের কাজ বলতে গেলে ফালতু হয়ে গেছে। শরবতি বলে একটি মেয়ে আছে। সে এটা সেটা এনে দেয়। আধ-পেটা খেয়ে মা-বেটির দিন কাটে।

গ্রাম-ভিত্তিক সব উপন্যাসেই শরবতির মতো একজন কল্যাণময়ী থাকেই—সব গ্রামেই সেরকম মেয়ে থাকে কিনা জানি না।

বারো বছর বয়সে নাবিতুনের বিয়ে হয় কদমের সাথে। রীতিমত প্রেম-করা বিয়ে। এখন তার বয়স তেইশ।গ্রামে এক বৃদ্ধা আছে, এবং তার একটি ভূমিকা আছে। গ্রাম-ভিত্তিক উপন্যাসে একজন বৃদ্ধাও থাকবেই, এবং তাদের ভূমিকা বিভিন্ন হলেও, তারা বেশ একটু জায়গা জুড়েই থাকে। 'সারেং-বৌ'-এর বৃদ্ধা সগির মা গুজাবুড়ি। সে নবিতুনকে কুমন্ত্রণা দেয়। লুন্দর শেখ-এর চোখ আছে নবিতুনের উপর। তারই দূতী হয়ে সে আসে নবিতুনের কাছে। বলে, 'আর কতকাল নবিতুন। জোয়ানকির সুরুজ একবার ডুবে গেলে আবার কি উঠবেরে?' (রচনাবলী-পৃ. ১৩৮)।

নবিতুন অভিসম্পাত দেয় গুজাবুড়িকে। বলে, 'তুই কুটনী, তুই শয়তান, দূর হ দূর হ তুই।' (পৃ. ১৩৯)। পরে গুজাবুড়িকে আরো কঠোর তিরস্কার করবে নবিতুন।

কিন্তু গুজাবুড়ি অনেক দেখেছে, অনেক শুনেছে, এইরকম অনেক কর্মকাণ্ডে মধ্যস্থতা করেছে। তাই লেখকই বলছেন : 'সগির মা গুজাবুড়ি মনে মনে হাসে। প্রথম প্রথম এমনিই হয়। শরম করে। তেজ দেখায়। রাগ দেখায়। রাগের চোটে হাঁড়ি ভাঙ্গে, গালি ছোঁড়ে। তারপর আস্তে আস্তে নরম হয়। টোপ গেলে।' (পৃ. ১৩৯)।

গুজাবুড়ির জ্ঞানগর্ভ চিন্তার পরিচয় আমরা পেলাম। এবার একটু বুঝে নেওয়া যাক, নবিতুনের উপর সকলের এতো লোভ কেন? বর্ণনাটা চমৎকার দিয়েছেন শহীদুল্লা কায়সার। তাই পুরোটাই উদ্ধৃত করছি।লেখক বলছেন : 'সারেং বৌ নবিতুন, ঢেঁকির উপর ও যেন সুসঙ্গত এক তালের ছন্দ, নাচের ঝংকার। খলখলিয়ে হাসে ও। খলখলিয়ে নাচে ওর যৌবনপুষ্ট শরীরখানি।' (পৃ. ১৪১)।

এর মাঝেও রসিকতা করে শরবতি। সাধে কি চোখ লেগেছে লুন্দর শেখের। নবিতুন বুয়া, তোর গায়ে জোয়ানকির ঢল। আমারই চেয়ে থাকতে ইচ্ছে করে।

শুনে যেন ফুতি আরো বেড়ে যায় নবিতুনের। মাথাটা ঝাঁকিয়ে কোমরখানি দুলিয়ে ঢেউটির মতো ঢলকে পড়ে ঢেঁকির উপর। মুগির বানানো মোটা শাড়িখানাও ধরে রাখতে পারে না ওর ছলকে ঝলকে উছলে পড়া জোয়ানকি। বাঁধন মানে না নিতম্বদোলা। শাসন মানে না জোড়া বুকের উদ্দাম নাচন। সারেং বৌর দেহের ভাঁজে ভাঁজে এ বুঝি জোয়ানকির উথালি নাচন, কলকল জোয়ার। আর সেই নাচের ছন্দে দ্রুত বোল তুলে যায় ঢেঁকিটা—ঢেকুর ঢুক, ঢেকুর ঢুক।' (পৃ. ১৪২)

আবার বলতে ইচ্ছে করে, চমৎকার বর্ণনাটা দিয়েছেন শহীদুল্লা কায়সার। সেই সঙ্গে পাঠকদের দিয়েছেন প্রশ্ন করবার সুযোগ। যে লুন্দর শেখ-এর নাম পর্যন্ত নবিতুন শুনতে চায় না, সেই লুন্দর শেখই নবিতুনের শরীরটাকে চায়, শরবতির মুখে সেই কথাটিই শুনে নবিতুনের শরীরটা এইভাবে জেগে উঠলো কেন? তিন বছরের উপর স্বামী গৃহছাড়া। নবিতুনের তুষিত শরীর কি তার অজান্তেই লুন্দর শেখ-এর আহ্বানে সাড়া দিলো? সগির-এর মা'র হাতছানিতে নবিতুন সাড়া দেবে না। নবিতুনের সচেতন মনও সেই আহ্বান শুনে গুটিয়ে যাবে। কিন্তু একদিয়েছেন শহীদুল্লা কায়সার। সেই সঙ্গে পাঠকদের দিয়েছেন প্রশ্ন করবার সুযোগ। যে লুন্দর শেখ-এর নাম পর্যন্ত নবিতুন শুনতে চায় না, সেই লুন্দর শেখই নবিতুনের শরীরটাকে চায়, শরবতির মুখে সেই কথাটিই শুনে নবিতুনের শরীরটা এইভাবে জেগে উঠলো কেন? তিন বছরের উপর স্বামী গৃহছাড়া। নবিতুনের তুষিত শরীর কি তার অজান্তেই লুন্দর শেখ-এর আহ্বানে সাড়া দিলো? সগির-এর মা'র হাতছানিতে নবিতুন সাড়া দেবে না। নবিতুনের সচেতন মনও সেই আহ্বান শুনে গুটিয়ে যাবে। কিন্তু এক নিভৃত কোণে অন্তরঙ্গ সখি-র মুখে সেই কথাটিই শুনে নবিতুনের অবচেতন মন তার শরীরকে মিলনাকাঙ্ক্ষী করে তুললো।

অবশ্য সচেতন নবিতুন তার স্বামীর প্রতি নিষ্ঠায় অবিচল। মন যখন দুর্বল হতে থাকে, অনেক সময় তখনই কি বাইরের আচরণ সব চাইতে কঠিন হয় না? যাই হোক আমরা নিম্নলিখিত দৃশ্যটি দেখতে পেয়েছি : 'এক নজরে ওর দিকে চেয়ে থাকে লুন্দর শেখ। নজর তো নয় যেন এক জোড়া লালাঝরা জিহ্বা। সে জিহ্বা দিয়ে নবিতুনের সারা গাটা চেটে গেল লন্দর শেখ। এস্তে উঠোনটা পেরিয়ে ঘরে এসে খিল দিল নবিতুন।' (পৃ. ১৫৫)। আরো একদিন গুজাবুড়ি নবিতুনের কাছে আসে। সে দেখেছে নবিতুন ও তার কন্যা এখন প্রায়ই শাপলা খেয়েই বেঁচে আছে। নবিতুনের মাথায় দারুণ দুশ্চিন্তা : 'নবিতুনের এবার চলবে কেমন করে?' (পৃ. ১৫৩)।

সংসরের অবস্থা যখন এই সেই সময়ই, একাদন সের আড়াই চাল, দুটো আণ্ডা, মরিচ পেয়াজ, একটু 'মিডা', 'বালা' তেল এবং সেই সঙ্গে একটি প্রস্তাব নিয়ে গুজাবুড়ি নবিতুনের কাছে আসে। প্রস্তাবটা এই; 'আজ রাত ঠিক দু'ঘড়ি বাদ, দরজাটা খোলা রাখিস। লুন্দর শেখ...' (পৃ. ১৫৬-৫৭)। 

নবিতুন অবশ্য খাদ্য, তৈল, প্রস্তাব ও সেই সঙ্গে গুজাবুড়িকেও ঠেলে ফেলে দেয়। কিন্তু এবার নবিতুনের মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে : এমন ক'রে কত রাত রক্ষা করে চলবে নবিতুন।... এত যন্ত্রণা এত অভাব, এত প্রলোভন।' (পৃ. ১৬৯)।

এবার লেখক আমাদের বলবেন, কদম শেখ ফিরলো না কেন, ফিরতে দেরী করছে কেন, তার হলোই বা কি। এবং দুঃখের সঙ্গে আমাকে বলতেই হচ্ছে, যে কাহিনী লেখক শুরু করেছিলেন রুদ্ধশ্বাস লিপিকুশলতায়, সেই কাহিনীই যখন আমাদের শোনাচ্ছে সমুদ্রে বন্দরে কদমের অভিজ্ঞতা তখন সেই অংশটাকে একটা 'পাপেট-শো' বা বড় জোর এক গ্রাম্য মঞ্চাভিনয় মনে হয়েছে। যাই হোক, ইতিমধ্যে কদম সারেং নিরপরাধ হয়েও স্মাগলিং ও খুনখারাপির দায়ে তিন বছর জেল খেটেছে। ছাড়া পাবার পর সে আবার তার পিতৃবন্ধু মন্ত সারেং-এর সঙ্গে নাবিক হয়ে সমুদ্র যাত্রায় বেরিয়েছে, আবার তার অজ্ঞাতেই মন্ত সারেংকে স্মাগলিং-এ সহায়তা করেছে, এবং একটি বন্দরে 'শঙ্খশুভ্র হাত'-এর অধিকারিণী এক শ্বেতাঙ্গিনীর সঙ্গে তলাতলি করতে করতে আরো অনেক দূর অগ্রসর হতে গিয়ে হঠাৎ মনশ্চক্ষে নবিতুনের মুখ দেখতে পেয়ে, একেবারে গহ্বরের মুখ থেকে ফিরে এসেছে। বন্দর সঙ্গিনী যে 'শঙ্খশুভ্র হাত'-এর অধিকারিণী ছিলো, সে সম্পর্কে পাঠকের মনে যাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ না থাকে সেই জন্যে লেখক বারবার 'শঙ্খশুভ্র হাত' শব্দ দুটি ব্যবহার করেছেন। যাই হোক, কদম সারেং এই বন্দর কন্যাটিকে পুরোপুরি ব্যবহার না করলেও, তার পকেটের সমস্ত কড়ি উজাড় করে মেয়েটিকে দান করে দিলো।

কিন্তু দেহ-পসারিনীরা অতো মন্দ মেয়ে নয় সে কথা বহু আগেই শরৎচন্দ্র আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন। তাই এই মেয়েটিও তার যতটুকু পাওনা মাত্র সেইটুকুই গ্রহণ করে বাকি টাকা ফেরৎ দিলো। এই অধ্যায়ের আরো একটি দৃশ্যের উল্লেখ করলে গোটা অংশটারই amateurish চিত্রটা বোঝা যাবে। এই রুতুন্দা জাহাজেই এক সাহেব আছেন। তিনি জাহাজেরই কাপ্তান। নাম হিকস সাহেব। দৃশ্যটি লেখকের ভাষাতেই উদ্ধৃত করছি। সেটা এইরকম।

‘কাছে এসে মনে হলো কদমের, কাঁদছে হিকস সাহেব। আরো কাছে এল কদম, দেখল ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে হিক সাহেবের চিবুক বেয়ে। যেন চোখে পড়বার জন্যেই একেবারে হিকস সাহেবের সামনে এসে রেলিং ধরে দাঁড়াল কদম। হঠাৎই বুঝি ওর দিকে নজর পড়ল হিক সাহেবের। আর ওকে দেখেই ফোঁটা ফোঁটা অশ্রুটা বাঁধ ভাঙ্গা সয়লাবের স্রোতের মতো নেবে আসে সাহেবের চোখ ঠেলে। চিবুকধরা হাতের তালু হয়ে কনুই বেয়ে নেবে যায় সেই অশ্রু সয়লাব।... অকস্মাৎ ডুকরে কেঁদে ওঠে হিক সাহেব। অশ্রুভরা গলাটা গোঁ গোঁ অস্ফুট এক শব্দ তুলে যায়।... কাঁদতে কাঁদতে অনেক কথাই বলে গেল হিক সাহেব। ও কডম। আমার ডালিং আমার ওয়াইফ আমার ডিয়ার রোজি বোধ হয় বেঁচে নেই।’ ইত্যাদি। (পৃ. ১৭৮)।

যাই হোক, এর পর কদম সারেং-এর কিছু এ্যাডভেঞ্চারের পর আবার আমরা ফিরে আসবো তারই গ্রামে। চলুন, সেখানেই যাওয়া যাক। তার আগে বলে নিই যে কদম তার জাহাজের কাপ্তান হিকস সাহেবকে বরাভয় দিয়েছিলেন যে সাহেবের ডালিং ওয়াইফ মরবেন না। সাহেব তখন কথাটি বিশ্বাস করেননি। কিন্তু পরে কদমের কথাই সত্য প্রমাণিত হলো। 
শহীদুল্লা কায়সার যখন গ্রামের মাটির উপর দাঁড়িয়ে থাকেন, তখনই দেখতে পাই, তিনি নিজের মাটির উপর দাঁড়িয়ে আছেন। 
খবর রটেছে কদম সারেং ফিরে এসেছে গ্রামে।

'আসছে? বাইরে? ঘরের দরজায় দু'দুটো ঠোককর খেয়ে বিস্রস্ত শাড়ির আঁচলটা কুড়োতে কুড়োতে বেরিয়ে এলো নবিতুন। কই, কইরে?...পড়িমরি নবিতুন ছুটে এলো ঘাটার দিকে। সেই রাস্তা ধরেই আসে সারেং। দূর থেকে দেখা যায় তার হাতের টিনের সুটকেস, কাঁধে মাজারি গোছের গাঁটরি। এক সময় রাস্তাটা ছেড়ে সারেং নেবে যায় ধান ক্ষেতে। ধান ক্ষেতের আলে আলে কোণাকুণি পথ নেয় সারেং বাড়ির ঘাটার দিকে। কুমে স্পষ্ট হয় তার রং-করা টিনের সুটকেসটা! স্পষ্ট হয় গোলাপী সবুজে অথবা অন্য কোন রংয়ের বৈচিত্র্যে থোপ খোপ তবনটা, তবন দিয়ে বাঁধা কাঁধের সেই গাঁটরিঠা। আর খুব পরিষ্কার চেনা যায় কদম সারেংয়ের মুখটা।’ (পৃ. ১৯৫)।

কদম সারেং যখন বন্দর থেকে গ্রামে ফেরে, তখন এইভাবেই ফেরে-যেভাবে উপরের বর্ণনাটা দিয়েছেন শহীদুল্লা কায়সার।

এরপর কদমের প্রত্যাশায় দাঁড়িয়ে থাকা নবিতুনের প্রতিক্রিয়ার একটা সুন্দর বর্ণনা দিয়েছেন লেখক। কিন্তু সারেং আসেনি। তবু নবিতুনের আশা মরতে চায় না। লেখক বলছেন : 'তবু স্থির নজরে তাকিয়ে থাকে নবিতুন। নবিতুন কি ভাবে, ধূ ধূ রোদের ধাঁ ধাঁ থেকে এখুনি উঠে আসবে ওর প্রবাসী নাবিকের মুখ?' (পৃ. ১৯৭)। 
আশা ও আশা ভঙ্গের বর্ণনাটা খুব সুন্দর হয়েছে।

ইতিমধ্যে নবিতুনকে চৌধুরী-বাড়িতে দাসীর কাজ নিতে হয়েছে। ছোট-চৌধুরীও লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে নবিতুনের দিকে। মেয়ে আককির গড়ন বাড়ন্ত। দশে পড়বে। এগারোয় বিয়ে। এইসব দুশ্চিন্তা আছে। 

হঠাৎ এরই মধ্যে কোনো বৃথা বাক্য ব্যয় না করেই, কোনো রঙ না চড়িয়েই আশ্চর্য সংযম ও শিল্পবোধের পরিচয় দিয়ে সেই পাপের দূতী কুটনি গুজাবুড়ির চরিত্রের একেবারে বিপরীত একটি দিক লেখক বিদ্যুত চমকের মতো দেখিয়ে দিলেন।

গুজাবুড়ি আসে একদিন। সে ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত। বলে, 'পান্থা আছে রে নবিতুন, পান্থা? একমুঠ পান্থা খাওয়াবি?' (পৃ. ২০৬)। 
নবিতুন তাকে পান্থা দেয়। তারপর কাজে বাইরে যায়।
‘ঘরে এসে দেখল নবিতুন, খেয়ে দেয়ে আককির পান্থাটা পাহারা দিচ্ছে গুজাবুড়ি। গুজাবুড়ির চোখে নেই কুটনামির কুটিল নাচন। গুজাবুড়ির জিবে নেই প্রলোভনের ডাক। গুজাবুড়ির লোলচর্ম মুখে নেই গোপন হাসি। এ যেন এক তাজ্জব ব্যাপার।’ (পৃ. ২০৮)। এই পরিবর্তনটা বিনা আড়ম্বরে আসলেও, খুব বিশ্বাস্য হয়েছে। গুজাবুড়িকে পাঠকের মনে থাকবে। তার এই মোনাজাত-ও : ‘‘আল্লা তোর হায়াত দারাজ করুক, ইজ্জতে হুরমতে রাখুক।’ (পৃ. ২০৯)

কিন্তু লুন্দর শেখ সহজ বান্দা নয়। সে জানে সে কি চায়-এবং সে যা চায় তা পেতেই সে অভ্যস্ত। এবার সে এক নতুন চাল চাললো। শরবতির বাপের কাছে এসে, কদম সারেংয়ের মুরুব্বির-র ভূমিকা নিয়ে, এবং তার মতো হিতাকাঙ্ক্ষী সারেং-বাড়ির আত্মীয় থাকতেও, নবিতুন যে চৌধুরী বাড়িতে দাসীবৃত্তি করে, সে সম্পর্কে আপত্তি জানিয়ে, লুন্দর শেখ নবিতুনকে কিছু টাকা পাঠায়। টাকা স্পর্শ করে নবিতুন যে কাণ্ডটা করলো, সেটাকে অনেকেই নাটকীয় বলবেন। লেখক বর্ণনাটা দিয়েছেন এইরকম : ‘ছোঁ মেরে আককির হাত থেকে টাকাগুলো ছিনিয়ে নিলো নবিতুন। দ্রুত পায়ে এসে দাঁড়াল লুন্দর শেখের মুখোমুখি। ঘোমটা তার খসে লুন্দর শেখের পড়ছে। কাঁধ ছেড়ে নীচের দিকে ঢলে পড়েছে আঁচলটা। লুব্ধ চোখ লেহন করে যায় সারেং বৌ-র রূপের সুধা। লুন্দর শেখের উপর এসে গড়ল মোড়ানো কাগজের দলাগুলো। দুমড়ানো নোটগুলো ছড়িয়ে পড়লো এদিক ওদিক।’ (পৃ. ২১১)।

বর্ণনা এখানেই শেষ। আমরা বুঝতে পারি, লুন্দর শেখ সাক্ষী রাখলো। সাক্ষী রাখলো যে সে টাকা দিতে চেয়েছিলো। নবিতুন নেয়নি। না নিয়ে চৌধুরী বাড়িতেই কাজ করেছে।

অতঃপর জঙ্গলের সেই স্মরণীয় দৃশ্য। ‘কোন প্রয়োজন নেই, তবু জানোয়ারটা অথবা মানুষটা তার হাতের থাবা চেপে রাখল নবিতুনের মুখের ওপর। বিশাল ভারি আর শত্রু দুটো বাহুর চাপে যেন ভেঙ্গে ফেলল নবিতুনের গায়ের হাড়, বুকের হাড়’ (পৃ. ২১৩)।

এই আখ্যানটি বেশ দীর্ঘ-কিন্তু আমি আপত্তি করবো না। অরণ্য এবং মানুষের মধ্যে আরণ্য প্রকৃতিটা ফুটেছে ভালো। তবে একটি দৃশ্য সম্পর্কে সামান্য আপত্তি করবো। সেই দৃশ্যটি এই : ‘খাপ থেকে যেমন করে বেরিয়ে আসে তলোয়ার তেমনি সড়াক করে মাটি থেকে উঠে লক্ষ্যের দিকে ছুটে গেল নবিতুনের ডান হাতখানি। সে হাত ধরে ফেলল জানোয়ারটার অণ্ডকোষ।... টিপে ধরল, চেপে ধরল নবিতুন। শক্ত করে, আরো শক্ত করে। আরো জোরে। প্রাণপণে ‘ (পৃ. ২১৪)। এখানেই শেষ নয়। পাশবিকতার বিরুদ্ধে নবিতুনের পাশবিক প্রতিরোধ প্রয়োজনকে ছাড়িয়ে যায় বলেও না হয় আপত্তি করলাম না কিন্তু আপত্তি করবো, এই বিশেষ অস্ত্র প্রয়োগটি মোরাভিয়াকে মনে করিয়ে দেয় বলে।

অবশেষে একদিন—পাঁচ বছর পর—কদম সারেং তার গ্রাম বামনছাড়িতে ফিরে এলো। শুরু হলো নবিতুনের নিশ্ছিদ্র সুখের দাম্পত্য জীবন। লেখকের ভাষায় : ‘কদম অনুভব করে তুলতুলে নরম কুসুম কুসুম গরম ওর নবিতুন। কদম অনুভব করে ওর বুকের উমে কেমন নিশ্চিন্ত নবিতুন। পার্টিপাতা ডাঁটির মতো চিকনচাকন মসৃণ কালচে-সবুজ দুখানি বাহু নবিতুনের। কদমের গলায় লতিয়ে রয়েছে সে বাহু।’ (পৃ. ২৩৪)।

নবিতুনের ব্যবহারও স্বামী-সোহাগিনীর। সারেং-এর আনা নতুন শাড়ি, চুড়ি, সুবাসিত তেল, স্নো, পাউডার, সুগন্ধ ইত্যাদি সে আত্মীয়া, সখি, পরিচিতা যাকেই সামনে গায় তাকেই নানাছলে দেখায়। দেখানো তার সুখ আর আনন্দ।

সারেং জানেও না যে নবিতুনকে দুঃসহ দুঃখকষ্টে দিন কাটাতে হয়েছে। কারণ সালেক সাহেবের সঙ্গে তার ব্যবস্থা করাই ছিলো। তিন মাস অন্তর কোম্পানীর কাছ থেকে টাকা নিয়ে নবিতুনকে পাঠিয়ে দেবে। নবিতুন যে টাকাও পায় না, চিঠিও পায় না-সে খবর জানা নেই সারেং-এর। (পৃ. ২২৩)।

হঠাৎ ছোটখাটো কয়েকটি জিনিস সারেং-এর চোখে পড়ে। পাকা-বাঁশের বেড়া। দশ বছরেও কিছু হবার কথা নয়। কিন্তু এখানে সেখানে সামান্য মেরামত লাগে। সেটা পর্যন্ত নবিতুন করেনি। (পৃ. ২৪২)। পেতলের বদনাটা নেই। নেই তার সখের চিনেমাটির পাত্র দুটি। এনামেলের বাটিটাও নেই। (পৃ. ২৪৫)।

সে নবিতুনকে জিজ্ঞেস করে, টাকা দিয়ে সে করলো কি? চিঠির জবাব দেয়নি কেন? নবিতুন কিছু বলে না। অন্য কথা বলে, অন্য কাজ করে। পোস্টমাস্টারকে জিজ্ঞেস করে, বৌ-কে সে যে চিঠি লিখলো সেগুলো গেল কোথায়। পোস্টমাস্টার জবাব দেয়ঃ বৌ-কেই জিজ্ঞেস করো। সারেং বলে, বৌ তো কিছুই বলে না। পোস্টমাস্টার রহস্যময় কণ্ঠে জবাব দেয়, 'ও, কয় না কিছুই, তাই না?'

সারেং যায় লুন্দর শেখের কাছে। লুন্দর শেখ বলে... 'ধীরে সুস্থে সব কথাই হবে।' (পৃ. ২৪৩)। লুন্দর শেখ বাইরে যাচ্ছে মাসখানেকের জন্যে। বলে, 'ফিরে এসে হবে সব কথা।' বৌটার উপর নজরও রাখতে উপদেশ দিল সে। (পৃ. ২৪৪)।

আমাদের মনে পাঠক হিসাবে আশঙ্কা জন্ম নেয়ঃ তবে কি, নবিতুনকে সীতার মতোই অগ্নিপরীক্ষা দিতে হবে। একটা কিছুর ধোঁয়া সারেং-এর মনেও জমতে থাকে।

ছ' মাস পর লুন্দর শেখ ফিরলো সদর থেকে। সে বলে, বড় মামলায় জড়িয়ে পড়েছিলো। অন্যলোকে বলে, জেল খেটে এলো। (পৃ. ২৫৫-৫৬)।

কিন্তু কদম জানতে চায়, কি কথা বলতে চেয়েছিলো লুন্দর শেখ তাকে। কদমের কথার কোনো স্পষ্ট জবাব না দিয়ে বক্তব্যকে আসলে আরো বাঙ্ময় করে তুলে লুন্দর শেখ শুধু জানতে চেয়েছিলো, সারেং তার বৌ-এর উপর চোখ রেখেছিলো কি না। কদমের কিছু চোখে পড়েছে কি না? এদিকে কদম আট মাস গ্রামেই আছে। নবিতুনের পেটে বাচ্চা। সারেং বাইরে গেলেই ফিসফাস শোনে আর তার মনের ভেতর সন্দেহটা সাপের মতো ফণা তুলতে থাকে।

একদিন বাইরে থেকে ফিরে এসেই সে নবিতুনকে কঠোর কন্ঠে প্রশ্ন করে, কেন সে চৌধুরীদের বাড়িতে কাজ করেছে? কেন সেখানে রাত কাটিয়েছে? কেন নবিতুন সারেং-এর পাঠানো টাকা গ্রহণ করেনি? এই বলে পকেট থেকে মুঠোখানেক টাকা সে ছুড়ে মারলে নবিতুনের মুখে। এই সেই টাকা যা দিয়ে লুন্দর শেখ কিনতে চেয়েছিলো নবিতুনকে। নবিতুন অসহ্য বিস্ময় ও বেদনায় মাটিতে পড়ে গেল। পরদিন সকালে সকলে দেখলো, একটি মরা ছেলেকে পায়ের কাছে নিয়ে ঘুমিয়ে আছে নবিতুন। এবং কদম আবার সমুদ্রে যাবার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছে। (পৃ. ২৫৯-৬০)।

কিন্তু তাকে ফিরে আসতে হলো। আকাশের চেহারা ভালো নয়। বৃষ্টি পড়ছে। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। গরম হাওয়া ছুটছে।

‘বৃষ্টির শব্দেই ঘুম ভাঙ্গলো কদমের। ঘুম ভেঙ্গে দেখল ওর বুকের উপর মাথা রেখে অঘোরে ঘুমোচ্ছে নবিতুন।... বড় দুঃখ হলো কদমের' (পৃ. ২৬২)।

আবার প্রায় আগের মতোই সংসার চলছে। তিনদিন আগেই নবিতুন মৃত বাচ্চা প্রসব করেছে। কিন্তু সে বাড়ির সব কাজই করছে। স্বামীকে রান্না করে খেতে দিচ্ছে।

কদমের মনে এখন বিপরীত সন্দেহ। সে কি ভুলই করেছে? যেন সে নিজেকেই তিরস্কার করবার জন্যে চীৎকার করে নবিতুনকে প্রশ্ন করেঃ 'লস্কর মামু পোস্ট-মাস্টার ওরা কি মিথ্যা বলেছে? চুপ কেন তুই?.. চুপ কেন তুই? বল, বল এসব মিথ্যা?' (পৃ. ২৬৪)।

কিন্তু নবিতুন ও কদমের কাহিনী আপাতত তুচ্ছ হয়ে গেল।
‘পরপর তিনবার বাজ পড়ল। তিনবার আকাশ ফাটল। তিনবার দুনিয়াটা ঝাঁকুনি খেল।’ (পৃ. ২৬৫)।

ঝড় বৃষ্টি বিদ্যুৎ ও বন্যার যে সুদীর্ঘ বর্ণনাটা আছে তা বাংলা সাহিত্যের এক দুর্লভ সম্পদ। ঈর্ষণীয় কৃতিত্বের সঙ্গে শহীদুল্লা কায়সার বিপর্যয়ের ছবিটা এ'কেছেন। এতোটা সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ পারেননি।

শেষ দৃশ্যে এই প্লাবন—যাকে লেখক বলেছেন—‘বুঝি মহাসৃষ্টির ধ্বংস আজ’—তাকে, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ-এর মজিদ-পীর এর মতো, 'সারেং-বৌ'-এর কামিজ বুড়োও, 'আল্লার গজব' বলেছে (পৃ. ২৭০), 'পাপে ভরে গেছে দেশ। এত পাপ সইবে কেন আল্লা?' (পৃ. ২৭৩)।

বন্যায় ঘরবাড়ি, মেয়ে-পুরুষ, গরু-ছাগল, গাছপালা সব ভেসে যাচ্ছে। কদম নবিতুন আর আককি একটি গাছে উঠে প্রাণরক্ষার শেষ চেষ্টা করছে। এই সর্বনাশের মুহূর্তেই নবিতুন বললো, লুন্দর শেখ আর পোস্ট মাস্টার চিঠি বিলি করেনি, কদমের পাঠানো টাকা তাকে দেয়নি, তার নামে মিথ্যা কুৎসা রটিয়েছে। (পৃ. ২৭৫)।

বন্যার পানি এখন সরে গেছে- রেখে গেছে শুধু ধ্বংস আর মৃত্যু।
নবিতুন ধ্বংসের মধ্যে, মৃতের মধ্যে কাউকে খুঁজছে। খুঁজে পেলো সে সেই লোকটিকে কদম যার নাম। এক ফোঁটা পানির জন্যে কাতরাচ্ছে সে। নবিতুন সমুদ্রের পানি এনে দিলো। থু থু করে ফেলে দিলো কদম। এবার লেখকের ভাষার আশ্রয় নেব।

'মুহূর্তের বেশী ইতস্ততঃ করল না নবিতুন। কদমকে কোলে নিয়ে বুকের কাছে তুলে আনল কদমের মুখ। সে মুখে পরম যত্নে পুরে দিলো স্তনের বোঁটা।... নবিতুন স্তনটা টিপে টিপে দুধ ঝরিয়ে দিল কদমের মুখে।... শিশুর মতন নবিতুনের বুকটা আঁকড়ে থাকল কদম। উদার আকাশে বুঝি আজ অনেক স্নেহ। উদার আকাশটা সূর্যস্নেহ মাখা হাতে প্রলয় বিধ্বস্ত এ পৃথিবীর ক্ষতে বুলিয়ে চলেছে প্রীতি-উষ্ণতার আরোগ্য-পরশ। বুঝি মুছে দেবে সব ক্ষত, সব ক্ষতি।' (পৃ. ২৮১)।

উপন্যাস শেষ হতে চলেছে এইভাবে : ‘হাঁটতে গিয়েই ওরা দেখল ওরা নগ্ন। লজ্জা পেয়ে দু'জন দু'দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল। গন্ধম উদ্যানে প্রথম প্রেমের লগ্নে তরুণ আদম আর বিবি হাওয়া নগ্নতার চকিত প্রকাশে এমনি করেই বুঝি লজ্জাকে আবিষ্কার করেছিল।' (পৃ. ২৮৩)।

লেখক বামনছাড়ি গ্রামের এই সর্বগ্রাসী প্লাবনের কথা বলতে গিয়ে আগেই বলেছেন, 'বুঝি মহাসৃষ্টির ধ্বংস আজ।' (পৃ. ২৭৩)।

তাই নবিতুন আর কদম সারেং আবার একেবারে শুরু থেকেই জীবনযাত্রা শুরু করলো। একেবারে শেষে কদম বলছে : ‘আর একটু জিরিয়ে নে রে নবিতুন। হাঁটতে হবে অনেক দূর।’

নাবিক হিসাবে সমুদ্রে আর বন্দরে কদমের অভিজ্ঞতা গুলোকে গণ্য না করলে, 'সারেং বৌ' নিঃসন্দেহে একটি অসামান্য উপন্যাস। এবং নবিতুন-এর মতো একটি চরিত্র যিনি সৃষ্টি করতে পারেন-তিনি তাঁর সৃষ্টিকর্মের শেষে, একটা তৃপ্তির হাসি হাসতে পারেন। ·


লেখক পরিচিতি : রশীদ করীম খ্যাতিমান কথাসাহিত্যিক। জন্ম : ১৪ আগস্ট ১৯২৫ এবং মৃত্যু ২৬ নভেম্বর ২০১১। ‘উত্তম পুরুষ’ তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস। এটি তাঁর প্রথম উপন্যাস। তাঁর অন্যান্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে : প্রসন্ন পাষাণ, আমার যত গ্লানি, প্রেম একটি লাল গোলাপ, মায়ের কাছে যাচ্ছি ইত্যাদি। প্রবন্ধটি নেওয়া হয়েছে তাঁর ‘আর এক দৃষ্টিকোণ’ বই থেকে। প্রকাশক : বাংলা একাডেমি, প্রকাশকাল : এপ্রিল ১৯৮৯। বানানরীতি অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ