সর্বজিৎ সরকারের গল্প : নেকড়ে


প্রথম চিঠি

সময়টাই যে এরকম। কী আর করার আছে শান্তনুর! এই তো, সে যেই এটিএমে ঢুকেছে টাকা তুলবে বলে, রাত তো সবে সাড়ে দশটা, তাতেই গা ছমছম, কেমন ফাঁকা ফাঁকা হয়ে গেছে আজকাল শহরটা, রাস্তায় লোক চলাচল প্রায় নেই, নির্জন টুলে বসে একা একা কিছুই করার নেই বলেই হয়তো, সিকিউরিটির লোকটা চোখ বুজে চুলছিল, শান্তনু ঢুকতেই কাঁচের দরজায় ক্যাঁচক্যাঁচ আওয়াজ হতে, একটু যেন বিরক্ত হয়েই চোখ খুললো। তবু শান্তনুর সেটুকুই তো ভরসা, এই রাতে, এই অন্ধকারের সময়ে, তার ব্যক্তিগত পাসওয়ার্ড, তার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের নিজস্ব অধিকার সামলানোর কিছুটা আড়াল করা মুহূর্তটিকে সবদিক দিয়ে নিরাপত্তা দেওয়ার জন্যে। আর তখনই তার চোখ গেল সামনের, মানে মেশিনের পেছনে রূপালী ধাতব পাতের ওপরে কালো খোদাই করা অক্ষরের দিকে, সেখানে লেখা, 'হাসুন, কেউ না কেউ আপনাকে নজরে রেখেছে।' হাসিতো পেলই না শান্তনুর, বরং বিরক্তি আর ঠাণ্ডা কনকনে একটা শীত শীত অনুভূতি শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে এসে তলপেটের কাছে জমা হল। ডান আঙুলের চাপে বোতাম টিপে টিপে তাড়াতাড়ি পাসওয়ার্ডের সংখ্যাগুলো পাঞ্চ করতে থাকল সে। যান্ত্রিক সব কিছুই কেমন শিরশিরে। এত আধুনিক যন্ত্রও কেমন যেন প্রাগৈতিহাসিক, ভয় মেশানো, অজ্ঞাত আতঙ্কে ভরা, অন্তত এই মুহূর্তে, এই ফাঁকা রাস্তা, ঠাণ্ডা কুঠুরীর উজ্জ্বল আলো, ঘুমন্ত নিরাপত্তাকর্মীর তাকিয়ে থাকা, ধাতুর নির্দেশিকার আড়ালে লুকনো ক্যামেরার অদৃশ্য উপস্থিতিতে আটকে পড়ে, ঠিক এমনটাই কেন যেন মনে হ'ল তার।

আর তখনই, একথাও মনে হ'ল তার, যেন মেশিন থেকে টাকা নয়,টাকার বদলে... সেই মেয়েটা বেরিয়ে আসবে এই মুহূর্তে... আর বেরিয়ে তাকে বলবে... তাকে ফিসফিস করে বলবে... ভালবাসবে আর একটু আমাকে... ভালবাসবে আর একবার?

কেন যে গুনগুন করা থামে না। কেন যে হাওয়া ওঠে দূর দক্ষিণ সাগরের থেকে বারেবারে! এত তো শপিং মল, সুদ বৃদ্ধি, ডিওডোরেন্ট, ত্বকের যুবতী হওয়ার বিজ্ঞাপন,... তবু সে অস্ফুটে বলা কথার আলোড়ন... কেন কেন ফিরে আসে বারেবারে?

'এতো কাঁদেন কেন বলুন তো আপনারা? কাঁদেন কেন এতো?' বিশ্বামিত্র প্রথম যেদিন এসে কথাটা বলেছিল, সত্যি বলতে আমি প্রস্তাবটা ঠিক মতো বুঝতেই পারিনি। অনেক টাকার ঋণ। চাকরিটা হঠাৎ চলে না গেলে ঠিক সময়মতো হয়তো শোধ করে দিতেও পারতাম। কিন্তু অভাবটা চারপাশ থেকে এমন চেপে বসলো। দু'একজনকে বলে দেখেছিলাম। এটা ওটা অজুহাত দেখিয়ে পাশ কাটিয়ে গেল। দোষ দেবো না। সেটাই স্বাভাবিক। এই বাজারে নিজেরটা সামলে অন্যের জন্যে কিছু করা, তো সত্যি ভাবাই যায় না।

শুধু তাদের মধ্যে কেউ একজন যখন, 'এত টাকার ধার হল কি করে রে? নেশা না জুয়া... না কি অন্য কিছু?'... বলে চোখ টিপে এমন ইঙ্গিত করলো যে মেজাজটা পুরো খারাপ হয়ে গিয়েছিল। এই না হলে বন্ধু!

একবার ভেবেছিলাম, মেজোকাকা বা বড়মামার কাছে বলি। কিন্তু আত্মীয়স্বজনের ব্যাপার, দেবে তো না'ই, উলটে ব্যাপারটা নিয়ে আরও কেচ্ছা করবে, এই ভেবে পিছিয়ে এসেছিলাম। কি উপায়ে, কীভাবে ধার শোধ করবো কিছুতেই বুঝতে পারছিলাম না। সাথে সাথে নতুন চাকরির জন্যে চেষ্টা। সেখানেও বারবার এ দরজায় ও দরজায় ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসা। এক একটা সময়ে মনে হতো সত্যিই পাগল হয়ে যাব। সারাদিন এলোমেলো রাস্তায় ঘুরতাম। মাঝে মাঝে কোনও বন্ধুর অফিসে গিয়ে ধর্ণা দেওয়া। প্রথম প্রথম তারা যথেষ্ট খাতির করে বসাত। চা, সিগারেট, নিচে নেমে এসে বা অফিসে বসেই আড্ডা। কিন্তু চাকরির কথা বা টাকার প্রসঙ্গ উঠলেই তাদের ফাইল ঘাঁটা বেড়ে যেত। কেউ কেউ তো উঠতে হবে, মিটিং আছে রে, বলে সরাসরি বুঝিয়েও দিত, এবার যাওয়ার সময় হয়ে গেছে।

বিরক্ত লাগত। বিরক্তির থেকে ক্লান্তি। ক্লান্তির থেকে হতাশা। দুঃসময়ে না পড়লে সত্যিই যে মানুষ চেনা যায় না, এ কথাটা যে কত সত্যি হাড়ে হাড়ে টের পেতে শুরু করেছিলাম।

ক্রমে ওজন কমল। খিদে নষ্ট হল। রাতে ভাল ঘুম হত না। সকালে জোর করে উঠে বেরোতেই হত। গাড়ির হর্ন, ধুলো ধোঁয়ার আর ভীড়ের চিৎকারের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মনে হত, যেন টলছি, এক্ষুনি পড়ে যাব।

তবু, পড়িনি একদিনও।

দু'একদিন হয়েছিল, মেট্রোর লাইনের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। ট্রেন ঢোকবার সময়ে সাদা দাগটাকে পেরিয়ে যাবার মুহূর্তে কে যেন বলেছিল, সময় আসেনি এখনো। দুদিনই ফিরে এসেছিলাম।

পালিয়ে যাব? পালিয়ে যাব কেন?

মনে হয়েছিল, এখনও অনেক বাড়তি কথার ভিড় আছে। আলো পড়ে এলে যেমন হয়। দূর, কোনও দূর স্টেশনে চলতে চলতে হঠাৎ নেমে পড়ার সময় আসবে এইবার। আর তখনি নেমে যেতে হবে। নয়তো ভিড় আমায় নষ্ট করে দেবে আরও।

তবে পরে মনে হয়েছে ভালোই হল। এই যে কেউ একটা ভেতর থেকে কথা বলে উঠে আমায় থামিয়ে দিল, আটকে রাখলো, এ বরং ভালই। এতো সামান্য কারণে লাইনে ঝাঁপ দেওয়ার কোনও মানেই হয় না। খুব বেশি নাটকীয়, চীপ্। সামান্য কয়েকটা টাকার জন্যে...। তাছাড়া এর থেকে অনেক বড় কারণ জানা আছে আমার। যদি ঝাঁপ মারতেই হয় তবে সেটা তো অনেকবার এর আগেই করতে পারতাম। শুধু লাইনে ঝাঁপ কেন? আরও যত রকমভাবে নিজেকে মেরে ফেলা সম্ভব, সবই কি মনে মনে নাড়াচাড়া করে দেখিনি এর আগে। অনেকবার দেখেছি। আর সেসবের কোনও স্পষ্ট, বলার মতো কারণ, কিছুই ছিল না তখন। শুধু একটা যেন অন্ধতা। খাদের কিনারে একা দাঁড়িয়ে থাকার মতো একটা মুহূর্ত। সে সব মুহূর্তে, নীচের থেকে উঠে এসে অতল গভীর খাদ, যেন ফুসফুসের ভেতর, মাথার কোষের মধ্যে, জমাট কুয়াশার মতো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। কেন কুয়াশা, কেন গহন তীব্র অতলের ডাক, কিছুই মনে পড়ে না তখন। অস্পষ্ট অজানা একটা কারণ, শুধু গভীর অন্ধকারের দেশ থেকে ডাক দিতে থাকে। সব ভালবাসাই তো আসলে আত্মহত্যা, রিমি বলেছিল আমাকে। মনে পড়ে যায়। আর এই হঠাৎ মনে পড়ে যাওয়া, এর থেকেই সব কিছুর শুরু, আর তারপর এইখানে এসেই ফের থমকে দাঁড়িয়ে পড়া। এরকমই কী নয়, বারবার।

আসলে, নিজেকে মারার কথা ভাবে যে মানুষটা, সে খুব ভালই জানে, এই একটা কাজ যাকে সে মনে প্রাণে ঘেন্না করতে পারে। প্রতিবার ফিরে আসার সময়ে তার মনে পড়ে যায়, সে চায়নি সে চায়নি আরও একবার এই রাস্তায় হেঁটে যেতে। আর একইসাথে, সে এটাও বেশ টের পায়, শেষবারের মতো নিজেকে শেষ করে ফেলার অনেক আগেই সে একটু একটু করে নিজেকে শেষ করতে করতে গেছে। সমাপ্তির যতগুলো চিহ্ন সে নিজেই দিয়েছে নিজের জীবনে, ততবার ততগুলো আয়নার জন্ম হয়েছে তার পথে। একটা আয়না এসে কোনও এক মুহূর্তে যদি তাকে নিঃশর্তে ডুবে যেতে বলে, আর একটা আয়না এসে তার রাস্তা আটকে দাঁড়ায়। এভাবেই চলতে থাকে যতক্ষণ না শেষ আয়নাটার ভেতরে সে অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে। সে শুধু জানে, সব কিছু তাকে ছেড়ে চলে গেলেও, অমোঘ তীব্র এই টান তাকে ছেড়ে যাবে না কখনও।


আসল কথাটা এই, এবারেও আমি ফিরে এসেছিলাম। ব্যাঙ্কের লোন শোধ করতে না পারার মতো একটা হাস্যকর কারণে নিজেকে শেষ করে ফেলাটা আমি মেনে নিতে পারিনি। নিজে থেকে মরতে চায় যে মানুষ, তার অহংবোধ, অনেকটা না হলেও, অন্যদের থেকে কিছুটা বেশী।

কিন্তু বিশ্বামিত্র আমাকে মরার কথা বলেনি। তাছাড়া আমি মরে গেলে বেকায়দা তার বা তার ব্যাঙ্কের লাভও হতো না কিছুই। আর রিমির কথাটা যদি সত্যি হয় তা হলে আমি হচ্ছি সেই ধরনের মানুষ যারা নিয়তিতাড়িতভাবে ভালবাসা আর মৃত্যুর মাঝখানে ঘুরপাক খেতে থাকে। ব্যাঙ্কের লোকেদের কাছে এই ধরনের মানুষদের টট্র্যাক রেকর্ড খুবই খারাপ।

আমার এক বন্ধুর কাছে জেনেছিলাম ব্যাঙ্কের পরিভাষায় আমার মতো কাস্টোমারদের ডেলিনক্যুয়েন্ট অ্যাকাউন্ট বলা হয়। ডেলিনক্যুয়েন্ট' এর বাংলা কি হবে? মতিচ্ছন্ন? কে জানে। এই ধরনের মানুষদের সব হিসেবেই সাধারণত গণ্ডগোল হয়ে যায়। ব্যয় করে অপরিমিত। ধার করে সময় মতো ধার শোধও করতে পারে না। খরচা করার সময় খেয়াল করে না কিসের জন্যে কতটা করছি, কেন করছি? সমাজের কাছে এরা এক ধরনের আপদ বিশেষ। ব্যাঙ্কের কাছে বিপজ্জনক।

আমার হাতটা এত ঠান্ডা যে সেটা দিয়ে কাউকে ছুঁতেও ইচ্ছে করে না আমার। মনে হয় আমি নিজেও এই শৈত্যের মধ্যে আটকে থাকতেই ভালবাসি। আমার ভাল লাগে বাজারে, ভিড়ে লোকজনের মধ্যে একা একা হাঁটতে। ভিড়ে হাঁটার একটা সুবিধে এই যে কেউ কাউকে লক্ষ্য করে না সেখানে। কত অনায়াসে ওই ভিড়ের মাঝে হারিয়ে যেতে পারি। কিন্তু আমার ভাললাগে মানুষ দেখতে দেখতে রাস্তা হাঁটতে। এত মানুষের মধ্যেও যে এভাবে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া যায়, রাস্তায় রাস্তায় এলোমেলো না হাঁটলে সে কথা জানতেই পারতাম না কোনওদিন। অদৃশ্য হয়ে যাওয়াটা জরুরি। আড়াল থেকে এই জনস্রোতকে দেখার মতো যেন। আড়াল কেন? লোকে কতরকম পোষাকে, কত রকমভাবে কথা বলতে বলতে, হাত পা নাড়তে নাড়তে, কত রকম মুখভঙ্গী করে আমার দুপাশ দিয়ে হেঁটে চলে যাচ্ছে, হারিয়ে যাওয়ার আড়ালটুকু না থাকলে, সেই হঠাৎ নদীর সঙ্গ, সেই জলধারার সঙ্গী হওয়া যেন সম্পূর্ণ হতো না আমার। আমি তাদের সাথে হাঁটি, তাদের সাথেই ভেসে যাই। অথচ আমি তাদের কেউ নই। এতটা কাছে থেকেও অনেকটা দূরের কেউ যেন। শুধু এই হারিয়ে যাওয়া, এই আড়াল রাখা, আমার নিঃসঙ্গতার চারপাশে একটা হালকা উষ্ণতার চাদরে যেন আমাকে জড়িয়ে রাখে। যেন এভাবে ছাড়া আর কোনওভাবেই আমি, নিজেকেও স্পর্শ করতে পারবো না আর। মাঝে মাঝে মনে হয় একটা নির্জন নেকড়ের মতো যেন, এই একলাপন, এই একা একা হাঁটাচলা আমার। সে নিজেই যেন তার শিকারী ও শিকার। কোনও দূর পাহাড়ের উপত্যকায় অনেক রাতে তাকে দেখা যায়, মাথার ওপরে জেগে থাকা গোল চাঁদের আলোয় ধাক্কা খেয়ে তার শরীরের ছায়া তার সাথে সাথে চলা ফেরা করে। বসে, উঠে দাঁড়ায়, শুয়ে পড়ে। তার সাথে থাকে। তাকে ছেড়ে যায় না কখনো। উপত্যকার কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়ার সাথে নেকড়ে আর তার অন্তহীন ছায়া, একা একা কথা বলে, নিজেদের সুখের কথা বলে, নিজেদের ব্যথার কথা বলে, একা একা হাসে... কাঁদে না কখনো। শুধু হঠাৎ কখনো, কোন কোন রাতে, আকাশের দিয়ে মুখ করে, সেই জন্তু, চীৎকার করে ডেকে ওঠে। দূরে লোকালয়ের মানুষ তখন ঘুমের মধ্যে জাগে। এই আর্তস্বরের মানে তারা বুঝতে পারে না।

কিন্তু কেন যে সে অতগুলো টাকা ধার করেছিল, এখন আর তা পরিস্কার মনেও পড়ে না, কতগুলো জিনিষ কেনার জন্যে? সব থেকে বড় মাপের এলসিডি টিভি... বড় মাপের ফ্রীজ, নতুন দামী মোবাইল... বড় মাপের গাড়ি মাপ মাপ... মাপ সুখ সুখ সুখ। কত বড় সুখ দরকার ছিল তার এই এক জীবনকে ভালবাসি বলবার জন্যে? কিন্তু সত্যি কি এটাই নয় যে, মধ্যবিত্তের এই সবকিছুকে সাপটে ঘেন্না করতেই শিখিয়েছিল সে নিজেকে, এতদিন। অসাড়, অর্থহীন, মনে হয়নি কি তার এই সবকিছুকেই। কার সুখের কথা মনে পড়েছিল তার? তার নিজের? বিদিশার? তাদের ছেলেমেয়েদের? ব্যাপারটা এমন নয়তো, যে, আজ ব্যাঙ্কের সাঁড়াশী এসে তার টুটি চেপে ধরেছে বলেই প্রিয়জনের কাছে আশ্রয়, সংসারের কাছে পরিত্রাণ খুঁজছে সে। কে প্রিয়জন? কোনটা তার সংসার?

বিশ্বামিত্রের সাথে প্রথম মোলাকাতটা এখনো আমার স্পষ্ট মনে আছে। মাস দুয়েক ব্যাঙ্ক থেকে অনবরত ফোন আসছিল, প্রথম দিকে মোবাইলে, কাঁহাতক আর 'এখন নয়, কয়েকটা দিন অপেক্ষা করুন', বলতে ভাল লাগে। তাই পরের দিকে ফোন ধরাই বন্ধ করে দিয়েছিলাম। ফলে যেটা হল, বাড়িতে ফোন আসা শুরু হল ঘরের ফোনে। আমি না থাকলে, বাড়ির লোককে বলা। শেষে বাড়ির লোককে বিরক্ত করাটা এই পর্যায়ে পৌঁছল, যে বাধ্য হয়ে আমাকে বাড়ির বাইরে বাইরেই কাটাতে হচ্ছিল বেশিটা সময়। এভাবেই দশ পনেরো দিন আরো কেটে যাওয়ার পর হঠাৎ একদিন ভোর সাড়ে ছটা নাগাদ, একটা সাদা ভাড়া করা অ্যামবাসাডর এসে দাঁড়াল বাড়ির সামনে।

গাড়ির ভেতরে সাত আটটা ছেলে, খুব জোরে আর ঘনঘন বেলের আওয়াজ পেয়ে আমিই খুলেছিলাম বাইরের দরজাটা। তিনটে ছেলে গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়িয়েছিল দরজার সামনে। বাকিরা গাড়ির ভেতরে। তাদের কারো হাতে মোটা লোহার বালা, কারো সোনার মোটা চেন পরা হাত, গাড়ির জনালা দিয়ে বাইরে ঝুলছিল। তিনটে ছেলের মধ্যে যে একটু ষণ্ডামার্কা, মাথায় ছোট ছোট করে ছাঁটা চুল, কানে একটা পুতির মতো দুল, সকালের রোদে চিক্‌চিক করে উঠছিল, সেই বিশ্বামিত্র। আমি জনতাম, সেই মুহূর্তেই, ছেলেগুলো ঝামেলা চাইছে। বিশ্বামিত্র'র গায়ে একটা ডোরাকাটা গোলগলা টি শার্ট, চোখ দুটো ছোট, কুৎকুতে, তীক্ষ্ণ ক্ষুধার্ত আর হিংস্র। বাঁদিকের ছেলেটার কলারটা সামান্য তোলা। ডানদিকের ছেলেটা বাঁহাত দিয়ে ক্রমাগত চুলের মধ্যে হাত চালাচ্ছে। আমার প্রতিটা রোমকূপ জানান দিচ্ছিলো, শিকারীরা তৈরি।

লক্ষ্য করে দেখেছি, যে কোনও সঙ্কটের মুহূর্তেই আমার মাথা আশ্চর্য্যরকম ঠাণ্ডা আর ধারালো হয়ে যায়। কোনঠাসা বেড়াল যেমন স্থির হিংস্রতায় টানটান হয়ে ওঠে, অনেকটা সেইরকম। বিশ্বামিত্রর ঠাণ্ডা চাহনির দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে আমি শুধু বলেছিলাম, 'কতো টাকা?'
‘তিরিশ হাজার। আজকে। এক্ষুনি।’

বিশ্বামিত্রর কণ্ঠস্বরে কোনও উত্তেজনা নেই। শীতল, কাটাকাটা, সাপের ছোবলের মতো।
‘অত টাকা এই মুহূর্তে নেই।’

আমিও ততটাই সহজ স্বরে বলার চেষ্টা করি। আমার বাঁ পায়ের বুড়ো আঙুলের থিরথির কেঁপে ওঠা ছাড়া, আমার কোনও কিছুতেই কোনও
উত্তেজনা ধরা পড়ে না।
‘না থাকলে আমাদের কিছু করার নেই।’ বিশ্বামিত্র এবার বেশ ঝাঁঝিয়ে কথাটা বলে ওঠে। একবার পাশের ছেলেদের দিকে তাকিয়ে নির্দেশ দেয়, 'দেখতো আর কি কি আছে।'
আমি আরও শান্ত সংযত স্বরে বলি, 'ভেতরে আসুন।'

বিশ্বামিত্র চেয়ারে বসলে বাকি দুজন পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। আমি বলি, 'দেখুন, আমার কাছে দশহাজার মতো আছে। দেবো বলেই জোগাড় করে রেখেছিলাম।'
‘তিরিশ লাগবে।’
‘নেই। দশই আছে।’

কয়েক মিনিট কেউ কথা বলি না। গুঁড়ি মেরে এগিয়ে আসা একটা অতর্কিত নিস্তব্ধতা আমাদেরকে ঘিরে ফেলে।
বিশ্বামিত্রই প্রথম সেই নিরেট স্তব্ধতাকে ভাঙে, 'ঠিক আছে দিন। বাকিটা কবে দেবেন?'
বুঝতে পারি, বরফ গলছে। বলি, 'আরো মাসখানেক লাগবে।'
'ততদিনে সুদ আরো বাড়বে। ব্যাঙ্ক অতদিন অপেক্ষা করবে না।'

বিশ্বামিত্র'র শব্দ ব্যবহারে কোনও জানলা দরজা নেই। ব্যাঙ্কের ভল্টের মতোই অন্ধকার, থমথমে, অব্যর্থ। আমি যে অত সহজে ভাঙবো না, এটা বিশ্বামিত্রকে আমার মোটামুটি বোঝানো হয়ে গেছে। তাই একটু জায়গা দেবার মতো করেই এবার একটু নরম হয়ে আসি। বলি, 'দেখুন, আমি আপনাদের সমস্যাটা বুঝতে পারছি, কিন্তু আমার সত্যি কোনও উপায় নেই। মাসখানেক সময় পেলে আমি নিশ্চয়ই দিয়ে দিতে পারবো।'

বিশ্বামিত্রও কিছুটা নরম হয়ে আসে এবার, `ঠিক আছে। তা হলে বাকিটা দুটো চেক এ দিয়ে রাখুন। পনেরো দিন পরে পরে দুটো দশ করে। আমরা এক সাথেই ডিপোজিট করবো।'
‘ঠিক আছে।’ আমি বলি।

চেক লিখে হাতে দেওয়ার সময় বিশ্বামিত্র আর একবার কঠিন চোখে আমাকে দেখে। তারপর সেই একই কাটাকাটা স্বরে বলে, 'আমি মাঝে মাঝে এসে খোঁজ নিয়ে যাবো।'

এরপর মাঝে সত্যিই কয়েকবার এসেছিল বিশ্বামিত্র। এক মাস না হলেও এক মাস দশ দিনের মাথায় পুরো কুড়ি হাজার তাকে দিয়েও দিয়েছিলাম। বেশ কয়েকবার যাতায়াতের সূত্রে পরিচয়টা আরও একটু গাঢ় হয়েছিল।

তিরিশ হাজারের পরেও অনেক টাকা বাকি। সেটা কখন কিভাবে দিতে হবে, সে ব্যাপারেও সেই পরামর্শ দিচ্ছিলো বেশ। বিশ্বামিত্র থেকে কখন সে বিশু হয়ে গেছে আমার কাছে, আপনি থেকে কখন তুমি হয়ে গেছে, সেটা এখন আর স্পষ্ট মনে নেই। তবে এভাবে, মাঝে মধ্যেই কিছুটা করে টাকা শোধ দিতে দিতে, বিশুর সাথে সম্পর্কটা অনেকটাই সহজ আস্থার হয়ে উঠছিল দিনে দিনে।

শেষে সেই একদিন প্রস্তাবটা এনে দিয়েছিল আমার কাছে। অনেকটা ঋণ শোধ হলেও বেশ কিছুটা তখনও বাকি। সে সময়ে একদিন বিশু এসে হাসতে হাসতে বললো, 'বসকে অনেক ধরে করে এবার একটা ব্যবস্থা করেছি আপনার জন্যে।'
‘কি?’
‘আপনাকে একটা আবেদনপত্র লিখে দিতে হবে ব্যাঙ্কের কাছে।’
‘কি লিখতে হবে সেখানে?’
‘আপনাকে লিখতে হবে, মানে লিখে প্রমাণ করতে হবে যে, এই জীবনটাকে আপনি ভালবাসতে জানেন।’

আমি জীবনে এতটা হচকিয়ে যাইনি কখনো। ভাবলাম, বিশ্বামিত্র কি আমার সাথে মজা করছে? বললাম, `মানে?'
‘মানে যা বললাম তাই। একটা লেখা লিখুন যেটা বুঝিয়ে দেবে যে আপনি ভালবেসেছেন, আর তা হলেই আপনার বাকি ঋণ মকুব হয়ে যাবে।’

তখনো আমার বিস্ময়ের ঘোর কাটেনি দেখে সে এবার ব্যাঙ্কের একটা কাগজ আমাকে দেখায়। সেখানে সে যা বললো সেই কথাটা স্পষ্টভাবে লেখা। নিচে ম্যানেজার'এর সাক্ষরও পরিস্কার দেখা যাচ্ছে।

সেই শুরু। সত্যি মিথ্যে জানি না, কিন্তু এই খেলাটা না খেলে আমার আর উপায় ছিল না। কেন না ধার শোধ যেমন সম্পূর্ণ হচ্ছিল না, তেমনি সুদ বাড়তেই থাকছিল। ক্রমে পুরো ব্যাপারটাই সেই তেল মাখানো বাঁশ আর বাঁদরের অন্তহীন কর্মকাণ্ডের মতো হয়ে দাঁড়াচ্ছিল শেষ অবধি।

কিন্তু প্রথম চিঠিটা পছন্দ হয়নি বিশ্বামিত্র'র। তার মতে ওই নাকিকান্না আর সেন্টিমেন্টাল ঘ্যানঘ্যান দিয়ে ভজানো যাবে না ব্যাঙ্কের কর্তাকে। ঘ্যানঘ্যান, নাকি কান্না, বিশুরই শব্দ। আমি হলে হয়তো অন্যভাবে বলতাম। বস্-এর কাছে নিয়ে যাওয়ার আগে, সে নিজেই তাই চিঠিটাকে বাতিল করে দিয়েছিল। আমি অগত্যা দ্বিতীয় চিঠিটা লিখে এনে দেখালাম তাকে।


দ্বিতীয় চিঠি

বুড়ো আঙুল আর তর্জনী, তার মাঝখানে তিন ইঞ্চির মতো একটা ফাঁকা জায়গায়, আরও স্পষ্ট করে বললে, ওই যে বর্গক্ষেত্র দেখা যাচ্ছে, ওখানে এখন হালকা অস্পষ্ট কুয়াশা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে। পুরো রাস্তাটাই কংক্রীটে বাঁধানো। দূরে বোঝা যায় বাস চলাচলের রাস্তা। রাস্তার গ্যাস লাইটের আলো আর তার লম্বা ছায়া সেই ধূসর চরাচরের ভেতর, কিছু চেনা দিন কিছু অচেনা রাতের, শব্দহীন লুকোচুরির মতো, কিছুটা এলোমেলো হাওয়ায় আর অন্যমনস্ক স্মৃতির দূরাগত স্পর্শের সাথে, মাঝেমাঝেই কেমন কেঁপে কেঁপে উঠছে। লোকটা, বড় শীত করে উঠল যেন এভাবে, লম্বা ওভারকোটের কলারটা আর একটু টেনে নিল। এবার বেশ কান অবধি ঢাকা দেওয়া গেছে। হাওয়া যে উত্তরের সেটা বেশ বোঝা যায় হাড়ের ভেতর থেকে মাঝেমাঝেই কেঁপে ওঠা অনুভব করে। দাঁতে দাঁত লাগে,। কানের ভেতর হাওয়া তীব্র শ্বাসাঘাত করে। সে হাওয়া স্মৃতি মেদুর, বরফ শীতল। লোকটা তাড়াতাড়ি হাতদুটোকে কোটের পকেটে আরও একটু ভালো করে ঢুকিয়ে দেয়। মুঠি করে রাখে। তার অল্প ফাঁক করে রাখা ঠোঁটের ভেতর থেকে, পুরনো শরীরের ধোঁয়া নতুন কুয়াশার শরীরে বারেবারে মিশে যায়।

লোকটা আস্তে আস্তে বাস স্টপের দিকে হাঁটতে থাকে। ছ মিনিট চোদ্দ সেকেন্ডে এসে বর্গক্ষেত্র কালো অন্ধকারে ঢাকা পড়ে। কালো পর্দায় এখন লাল, রক্ত লাল অক্ষরেরা ফুটে ওঠে এক এক করে। পুরোটা ভেসে উঠে এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়ালে পুরো নামটা পড়া যায়... ইটার্নিটি অ্যান্ড আ ডে। গ্রীক পরিচালক থিও আঞ্জেলোপুলসের ছবি।

বুড়ো আঙুল এইবার মোবাইলের মাঝখানের বোতামটা টেপে। ছবি দাঁড়িয়ে যায়। ডান দিকের বোতামটা ব্যাক্ বাটন। বুড়ো আঙুল সেখানে আলতো চাপ দেয়। কালো পর্দায় এবার অন্য একটা জানলা ভেসে ওঠে।

ইউ টিউব। আর একবার ডান বোতামে চাপ দিলে, সেই শীত, সেই কুয়াশা, সেই জনহীন চৌরাস্তা, সেই ভেজা হাওয়ার অস্পষ্ট স্মৃতি আর নিঃসঙ্গ লোকটার ধীরে ধীরে হেঁটে যাওয়ার দৃশ্যপট থেকে বেরিয়ে, মোবাইলের পর্দায় এখন শুধুই একটা নাম্বার উজ্জ্বল ভেসে ওঠে। সবুজ বোতামটা টিপতেই ওপারে কন্ঠস্বর স্পষ্ট বলে ওঠে, ভিএসএক্স ব্যাঙ্ক থেকে বলছি, স্যার, আপনি কি ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করেন...



আজ একটা অদ্ভুত কথা বললো বিশু। বললো, 'আমরা কিভাবে অপারেশন করি জানেন?'
বললাম, 'তার মানে?'
‘আমরা মানে আমরা। মানে এই যাদের আপনারা অর্গানাইজেশন বলেন। ব্যাঙ্কও এমনি একটি সংগঠন।’
‘কিভাবে?’
‘লোভ আর ভয়। সব মানুষের জন্যে এই দুটোই মেরু। আমরা সেটারই বেসাতি করি। বেসাতির বসতি আমাদের।’

বলেই কি খিলখিল করে ঠিক কোন কিশোরের মতো হাসতে থাকে বিশ্বামিত্র। যেন দারুণ একটা মজার কথা বলেছে সে। পর মুহূর্তেই হঠাৎ গম্ভীর হয়ে যায়। আমি বলি, 'কি হল?' 
বিশু আমাকে ভ্যাংচানোর মতো করে বলে, 'কি হল, আপনি বলুন।’
‘কিভাবে অপারেট করি আমরা?’
‘দল বেঁধে। একপাল লোক এক সাথে ঘুরে বেড়িয়ে। ভয় দেখিয়ে।’

বেশ আত্মবিশ্বাস নিয়ে এবার আমি বলি বিশ্বামিত্রকে। বিশু এ কথায় দাঁত বার করে হাসে। তার চোখ দুটো আরও ছোট হয়ে যায়, বলে, ভুল, ভুল, ভয় দেখানোটা আমাদের লক্ষ্য নয়। আমাদের আসল লক্ষ্য অপরাধবোধ তৈরি করা। অপরাধ নয়, অপরাধবোধ।

আমার ভেতরে কি যেন একটা চাপা উল্লাস, ফাঁদে ধরা পড়া শিকারকে দেখে শিকারীর গোপন নৃশংসতার মতো একটা আদিম অনুভূতি আস্তে আস্তে ছড়িয়ে যেতে থাকে। এইতো সে, বিশ্বামিত্র, এখন আমার এলাকার মধ্যে, আমার বধ্যভূমিতে, আমার ভাবনা কল্পনার জালের বৃত্তের ভেতর ধরা পড়ে গেছে।

আমি ওকে বলি, 'অপরাধ নয় কেন?'
‘না, অপরাধ নয়। ক্রাইম বড়ো বেশি আঠালো, চ্যাট্যাটে, গাঢ়, সহজে ধোওয়া যায় না, শুকিয়ে গেলেও খয়েরি দাগ থেকে যায়, আঁশটে গন্ধ লেগে থাকে। ক্রাইম একলা মানুষের জিনিষ।’

এবারে ক্রমশই আমার জেদ চাপতে থাকে। বিশু আমার এতদিনের পড়াশোনা ধ্যানধারণা সব কিছুকেই যেন চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। বলি, 'তুমি যেভাবে বর্ণনা করছো, ক্রাইম তার থেকে অনেক বেশি কিছু।' আমার মনে হয়, ক্রাইম আসলে সবকিছুকে বোঝার একটা রাস্তা। অনন্তকাল ওইভাবেই বর্তমানকে বুঝে নিতে চেষ্টা করে।'

আমার কথায় একটুও রাগ করে না বিশ্বামিত্র। বরং হো হো করে হাসতে হাসতে বলে, 'ওই, ওই, ওটাই আপনাদের মতো মানুষদের সমস্যা। এত কঠিন করে কী সব বলছেন, না তো আমি বুঝছি, না আপনি নিজে। শুনুন স্যার, সত্যি কথাটা হল, আপনার মাথাটা ঘেঁটে 'ঘ' হয়ে গেছে। সব কিছু অত বুঝতে যাবেন না। অত বোঝাবুঝির কিস্যু নেই, দুনিয়াতে।'

এবার আমার সত্যিই মাথাটা গরম হয়ে যায়। বিশু নিশ্চই বুঝতে পারে। ফের ঝাঁঝিয়ে উঠে বলে, 'নিজেকে সব সময় এত বাড়িয়ে দেখান কেন আপনি? কি মনে করেন নিজেকে? সকলের থেকে আলাদা? জেনে রাখুন আপনাদের ওই বিদ্যে আর জ্ঞান দিয়ে কিছু এসে যায় না কারও।'

আমার মাথা গরম হয়ে আসে। কান দুটো ঝাঁ ঝাঁ করে, বুঝতে পারি চোখটাও এখন লাল হয়ে উঠছে। মুখে কিছু বলি না। বিশ্বামিত্র থামে না, বলে চলে '...একটা কথা জেনে রাখুন স্পষ্ট করে, আপনি হচ্ছেন সেই ধরনের মানুষ, যারা নিজের কথাটাও পরিস্কার করে বলতে পারে না কারও কাছে। আপনার কোনও অস্তিত্বই নেই যতক্ষণ না অন্য কেউ আপনার গল্পটা বলছে অন্যদের কাছে।'

এ কথায় কিছুটা যেন গুটিয়ে যাই ভেতরে। মিন মিন করে শুধু বলি, 'ঠিক আছে। কিন্তু একটা প্রশ্ন আছে আমার।'
'বলুন', বিশু বলে।
'ঋণ মকুব করার এই পদ্ধতিটা আমার জন্যেই কেন রাখা হয়েছে, এটাই ঠিক বুঝলাম না।'

এতক্ষণে বিশু অনেক সহজ হয়ে এসেছে। মিটমিট করে হাসতে হাসতে বলে, 'সেকি, আপনাকে কেউ কোনওদিন বলেনি কথাটা?'
‘কোন কথা?’
‘আপনার ঠোঁটে এখনও ভোরবেলার রঙ লেগে আছে। আর আপনার চোখে শুধু গোধূলীর রঙ। আমার বসেরা এই কথাটা জানে, সেই জন্যেই আপনাকে বেছে নিয়েছে।’

বুঝতেই পারছিলাম না এ কথার কী জবাব দেবো। বিশ্বামিত্র ব্যাঙ্কের ঋণ আদায়কারী না কি অন্য কিছু! বিশু এবার হঠাৎ উঠে পড়ে। যাবার জন্যে তৈরি হয়ে ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে নেয়। যাবার আগে বলে, 'এবারের লেখাটাও পাস হবে না। কিছুই প্রমাণ করতে পারেননি এখনো, যান আবার লিখে আনুন।'
‘কোথায় যাবে এখন?’ আমি প্রশ্ন করি।
‘বাড়ি যাবো। লাস্ট মেট্রো নটা কুড়িতে। এরপরে দোকানও বন্ধ হয়ে যাবে। আর দেরি করা যাবে না।’
‘কিসের দোকান?’
‘ক্যাডবেরী কিনে নিয়ে যেতে হবে। না নিয়ে গেলে মেয়েটা রাতে খাবেই না।’
‘তোমার মেয়ে? আমি জিজ্ঞাসা করি।’
'হ্যাঁ'। বিশু আর দাঁড়ায় না। প্রায় লাফ দিয়ে হনহন্ করে হাঁটতে থাকে ময়দান মেট্রো স্টেশনের দিকে।

এত রাতে অফিস ফেরত লোকজনের ভীড় একেবারেই নেই। রাস্তা প্রায় শুনশান। বাড়ি ফিরে যেতে কোনও ইচ্ছেই করে না। তবু অভ্যাসের বশেই আস্তে আস্তে পা ফেলে বাসস্টপের দিকে এগোতে থাকি। ফাঁকা রাস্তায় দু একটা গাড়ি দরকারের থেকে বেশি দ্রুতগতিতে চলে যায়।


অনেকগুলো জীবন একসাথে বাঁচাটা এক ধরনের অভিশাপের মতন। যেন আয়নায় ঘেরা একটা শহরের মাঝে আটকে আছি। নিজেকে খুঁজছি শুধু। পাইনি কখনো। বিশ্বামিত্রের মতো মানুষদের সুখের ঠিকানা আমি আজও খুঁজে পেলাম না। খারাপ লাগে।

বাড়ি ফিরে আসি। শেষবারের মতো লেখাটা লিখবো বলে ভাবি। বিশ্বামিত্র আর তার বসেরা যেভাবে চেয়েছে সেভাবে নয়। নিজের ভালবাসার কথা আমি শুধু নিজের মতো করেই বলে যেতে পারি। সে আবেদন পাস্ হোক বা না হোক, আমার আর কিছু আসে যায় না।

কিন্তু অতগুলো টাকার ঋণ, বড় সহজ বোঝা নয়। এই ভাবনাটার থেকে কিছুতেই বেরোতে পারছি না। ব্যাঙ্ক যেভাবে চাইছে সেভাবে যদি সত্যি বোঝাতে না পারি। আবার সেই ধিক্কার, অপমান, আত্মকরুণার মধ্যে বেঁচে থাকা। এসবের থেকে কি সত্যিই পরিত্রাণ নেই আমার?

কিন্তু এটা ছাড়াও, বিশ্বামিত্র'র শেষ কথাটা আমি চাইলেই মুছে ফেলতে পারবো না। ধাঁধার মতো লাগছে সব কিছু, তবু, ওই গোধূলীর আলো আর ভোরবেলার আলোর মাঝখানে একটা অদৃশ্য সেতু, কোথাও একটা রয়ে গেছে এখনও। যেভাবেই হোক ওই সেতুর রাস্তাটা আমাকে খুঁজে পেতেই হবে। যেভাবেই হোক।

পাতা ঝরে যাবার দিনে, পাতা ঝরে যাবার সময়েই বুঝি, এমন উৎসবের দিন আসে? রাত কতটা গাঢ় হলে তবেই গাছের পাতায়, ল্যাম্পপোস্টে, দোকানের সাইনবোর্ডের চারপাশে, এই ফুটপাথ থেকে ওই ফুটপাথের মাথার ওপরে আলোর মালা পড়ে, রোশনাইয়ে, এমন উজ্জ্বল তরুণীর মতো সেজে উঠতে পারে শহরের পার্কস্ট্রীট। আজ বড়দিন। চৌরঙ্গীর আধো অন্ধকারের দিক থেকে হেঁটে আসতে আসতেই সমুদ্রের শান্ত গর্জনের মতো রাস্তার ডাক শুনতে পাচ্ছিলাম। শেষ লেখাটা নেবার জন্যে বিশ্বামিত্র কেন আজকের দিনটা, আজকের সময়ইটাই বেছে নিল, কে জানে?

বিদিশার কথা মনে পড়ে খুব, বাচ্চাদের কথা। দূরে ফেলে আসা নিজের জীবনের জন্যে কষ্ট হয় খুব। কোনও কাজেই এল না এই একটা গোটা জীবন।

বেশ ভালই ঠাণ্ডা পড়েছে আজ। বিশু যে কেন এই রাস্তায় দেখা করতে চাইল। সকালেই ওকে ফোন করে বলেছিলাম লেখাটা শেষ হয়ে গেছে। বলল, 'সারা দিনে সময় পাবো না, আপনি বরং রাত সাড়ে দশটা, এগারোটার দিকে পার্ক স্ট্রীটে থাকবো, ওখানেই চলে আসুন।

তখন মনে ছিল না, আজ ক্রিসমাস। পার্ক স্ট্রীটে হাঁটাই এক দায় হবে।

আগে খেয়াল থাকলে ওকে মানা করতাম আসতে। সারা শহর ঘুমিয়ে পড়েছে, আর এই রাস্তাটা ক্রমশই আরও প্রবলভাবে জেগে উঠছে যেন, রাত বাড়ার সাথে সাথে। ফুটপাথে অনর্গল মানুষের ঢল, রাস্তায় গায়ে গায়ে লেগে থাকা গাড়ির স্রোত, তারই মাঝখানে আলোর, শব্দের, হাসির, অর্থহীন চিৎকারের ঢেউ শুধু উঠছে আর নামছে। নানা বয়সের মানুষের ভীড়ের মধ্যে দিয়ে চেষ্টা করি ফ্লুরিজের দিকে এগিয়ে যেতে। ওরই সামনের গাড়ি বারান্দার নিচে বিশ্বামিত্রর দাঁড়ানোর কথা। এত ভীড়ের মধ্যে হাঁটার উপায় নেই। লোকের গায়ে ধাক্কা লেগে যাচ্ছে। তবে তাতে কারও কোনও ভূক্ষেপ নেই। যে যার নিজের বন্ধু বান্ধবী স্ত্রী বা ছেলেমেয়েদের নিয়ে যেন অন্ধকার নিকষ এক কালো আকাশের নিচে, আলোর সমুদ্রের ওপর কোনও দ্বীপের চরাচরে, এ জন্মের কোনও প্রাচীন উৎসবের আয়োজনে মাতাল হতেই আজ এইখানে এসেছে। হাসছে তারা। একে অপরের গায়ে গড়িয়ে পড়ছে। তাদের মাথায় নানা রঙের টুপি, কোনওটায় জরি দেওয়া, কোনওটায় শুধুই হরেক রঙের কাগজের ঝালর। কেউ কেউ কাগজের ভেঁপু মুখে, অনেক বয়স তবু, বাচ্চাদের সাথে মনের ফুর্তিতে তাই বাজিয়ে চলেছে। ভিড় ঠেলে সামনের দিকে এগোতে থাকি। গাড়ি বারান্দার নিচে প্রচুর ভিড়। এক কোণে একটা থামের আড়ালে দেখি বিশ্বামিত্র দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে দেখে হাসল কি না ঠিক বুঝতে পারি না, কারণ ওর মাথায় একটা ঝলমলে কাগজের টুপি, চোখে একটা প্লাস্টিকের লাল-নীল চশমা, তার সাথে লাগানো প্লাস্টিকের গোলাপি রঙের নকল নাক। সব মিলিয়ে তাকে মজার এবং করুণ দুটোই মনে হচ্ছে একসাথে। যেন সে চারপাশের এই বয়ে চলা সার্কাসের এরিনায় দারুন সব ভেল্কির আসল জাদুকর, আসল জোকার, যে সব খেলা জানে তবু সব খেলা ভেঙে দেয়। নিজেকে নিয়ে হাসে, যাতে দু'এক মুহূর্ত তার চারপাশের মানুষেরা সব কিছু ভুলে হেসে উঠতে পারে। ঝর্ণার মতো মানুষের হাসি, কলরোল, আমাদের দু'জনের চারপাশে বয়ে যাচ্ছে এখন। মাঝে মাঝেই কোথায় যেন জোরে বাজনা বেজে উঠছে, তার সঙ্গে সমবেত মানুষের হাততালি আর সিটির আওয়াজ। জনস্রোত আমাদের কখনও কাছে নিয়ে আসছে, কখনও বা সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে অনেকটা দূরে।

বিশ্বামিত্র চোখ থেকে চশমা নামিয়ে এইবার, বেশ জোর দিয়েই বলে, 'পড়ুন, পড়ুন, লেখাটা শুরু করুন এবার।'
'এতো চেঁচামেচির মধ্যে কিছু শুনতে পাবে?' আমিও বেশ চিৎকার করেই বলি।
বিশু ছাড়া আর কেউ আমাদের সে কথা শুনতে পায় বলে মনে হয় না।
বিশ্বামিত্র আমাকে হাতের ইশারা করে আবার পড়তে বলে। আমি পকেট থেকে বার করে লেখাটা পড়তে শুরু করি।

তৃতীয় চিঠি

‘বালির ওপর রোদের রঙ সোনালী সাক্ষরতায় ছিল। এই ভিজে বালি আর তার অপার স্বর্ণপ্রভা তোমার শরীরে, তোমার ত্বকের ছায়াপথে মিশে যাক। তিতাস মনে মনে, মানে প্রায় না বলা স্বগত সংলাপে, এমনটাই কি চায়নি, তিতলির নরম হয়ে আসা, গহন শরীরের জন্যে। এই চাওয়ায় তার অপরাধবোধ কেন থাকবে? কেন নিজেকে নষ্ট ভাবতে বাধ্য করবে সে নিজেই, অনেক ভেবেও এর কোনও জবাব পেল না তিতাস।

আর সেদিন রাতে, সে রাতে, তাদের বিবাহের রাতে, অঝোরে বৃষ্টি পড়েছিল; আর এতটাই জোরালো ছিল সেই বর্ষণের আওয়াজ, যে, খোলা সমুদ্রের সুঠাম, গম্ভীর ডাকও তাতে ঢাকা পড়ে যাচ্ছিল। জল ও ডাঙার খেলা ছিল সে রাতে। তারাদের নিচে, জোৎস্না ভাঙা বালিয়াড়ির পাশে, সাদা অন্ধকার মাখা ঘরের ভেতর। ভেতরে থেকেও যেন তারা, শুধু বহুদিন আগে দেখা গুহাচিত্রের মতো, মন্দিরের গায়ে খোদাই করা পাথরের নর্তক নর্তকীর মতো একে অপরের টানে আকীর্ণ হয়ে যেতে যেতে, জল, আকাশ, বালির চোরাটানে, ক্রমশই হারিয়ে যেতে চাইছিল। চেয়েছিল... পেয়েওছিল... অনেক, প্রচুর, আকণ্ঠ তীব্রতায়। তারা। একে অপরকে। সে রাতে।‘

পড়তে পড়তে আমাকে বেশ কয়েকবার ভিড়ের ধাক্কায় মাঝখানে থামতে হয়েছে। নিজেই বুঝতে পারছিলাম এভাবে পড়াটা ঠিক হচ্ছে না। কিন্তু বিশ্বামিত্রর কোনও হেলদোল নেই। সে দিব্যি চুপ করে পুরোটা শুনেছে। মাঝে মধ্যেই টুপিশুদ্ধু মাথা নেড়ে তারিফও করেছে। কিন্তু পড়াটা শেষ হতেই তার সেই কুতকুতে চোখ আরও ছোট করে বলে উঠল, 'হয়নি হয়নি এবারও ফেল।'

কী করব বুঝতে পারছি না। এবার আমার সত্যিই অসহায় লাগছে। মাথার ভেতরটা কেমন ফাঁকা আর শূন্য মনে হচ্ছে। চুপ করে থাকি। একদল সুন্দরী যুবতী আর তাদের সঙ্গী পুরুষেরা হইহই করতে করতে আমাদের পাশ দিয়ে চলে যায়। যাবার সময় তাদের হুল্লোড় আর হাসির ঢেউ এসে ধাক্কা দেয় আমাকে। আমি ক্রমাগত সরে যেতে থাকি। বিশু এগিয়ে এসে আমার হাতটা ধরে ফেলে। মাথার ওপরে অন্ধকার আকাশ, তার একটু নিচে আলোর উৎসব, রাস্তার সব কোণ থেকে ভেসে আসা হাসি আর গান আর উচ্চকিত কণ্ঠস্বরের মধ্যে বিশ্বামিত্র আমার চোখের দিকে সরাসরি তাকায়। তার চোখে চশমা নেই শুধু সেই নকল নাকটি তখনও যথাস্থানে আছে।

বিশ্বামিত্র বলে, 'কিছু দেখতে পাচ্ছেন?' 'হ্যাঁ, সরে যাওয়া মুহূর্তদের।' আমি বলি।
'আর কী দেখছেন?'
'মৃত্যুকে।'
বিশ্বামিত্র এইবার আরও একটু কাছে এগিয়ে আসে। স্থির দৃষ্টিতে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে এক মুহূর্ত। তারপর প্রায় ফিসফিস করে বলে, 'কিছু দেখতে পাচ্ছেন এইখানে?'

আমি দেখি তার চোখের তারায় এই পার্ক স্ট্রীটের আলোকিত মধ্যরাত, তার জনস্রোত, তার আলোর সাজ, তার গাড়ির মিছিল, তার রং, তার সুর, তার কথা সব, সব কিছু নিমেষে ভেসে উঠছে আর পর মুহূর্তেই মিলিয়ে যাচ্ছে। যেন মহাকাশ, মহাসমুদ্র আর মহাপৃথিবী একসাথে জেগে উঠছে ওই স্থির নয়নতারায়।

আর অস্ফুট স্বরে বিশ্বামিত্র বলে, 'মৃত্যুর একটা ঘর দরকার, জানেন। সেও আমার আপনার মতো একা।' একটু থেকে আবার সেই প্রায় হারিয়ে যাওয়া গলায় বিশু বলে, 'আচ্ছা মৃত্যু ঘর কোথায় পাবে বলতে পারেন?'
'যেখানে আনন্দ আছে সেইখানে।' কিছু না ভেবেই আমার মুখ থেকে কথাটা বেরিয়ে আসে।


নিমেষে যেন কোথাও অদৃশ্য পর্দা সরে যায়। বিশ্বামিত্র একপাক ঘুরে নিয়ে অদ্ভুত একটা নাচের ভঙ্গি করে, হঠাৎ চিৎকার করে ওঠে, 'ঠিক, ঠিক। এইটা ঠিক বলেছেন। যেখানে আনন্দ আছে সেইখানে মৃত্যুর ঘর থাকে।'

তার পরক্ষণেই আবার গলা নামিয়ে বলে, 'ঠিক, কিন্তু আনন্দ কোথার থাকে তা হলে?'
এর উত্তরটা আমার জানা নেই। আমি চুপ করে থাকি।
এবারে বিশ্বামিত্রই কথা বলে, 'আনন্দের বাড়ির নাম মুহূর্ত। সেখানে থাকে সে।'

আমি অবাক হয়ে কালেকশন এজেন্ট বিশ্বামিত্রর দিকে তাকিয়ে থাকি। বড়দিনের মধ্যরাত, পার্ক স্ট্রীটের আলো, যুবক যুবতী, শিশু ও বয়স্কের আলোড়িত পৃথিবী, এই প্রথমবার, অন্তরতর নিবিড় টানে, আমাকে আরও একটু কাছে টেনে নেয় যেন। নিস্তব্ধ পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকি।

'লেখাটা কিন্তু এখনও শেষ হয়নি আপনার।' বিশ্বামিত্রর কথায় আমার চমক ভাঙে।
'এবারে আমি একটা গল্প বলছি আপনাকে। মন দিয়ে শুনুন। একটা লোক ছিল, পুতুল বানাতো। একবার সে দুটো পুতুল বানাল। মাটির পুতুল। একটা ছেলে, অন্যটা মেয়ে। মাটির পুতুল, দেখতে খুব সুন্দর কিন্তু কথাও বলে না, নড়াচাড়াও করে না। এই নিয়ে লোকটার বউয়ের খুব দুঃখ। সে পুতুল দুটোকে মাঝে মধ্যেই সাজায়, তাদের সাথে গল্প করে, খেলা করে, নিজের মনের মতো করে তাদের খেতে দেয়, রাত হলে ঘুম পাড়িয়ে শুইয়ে দেয়। বউয়ের যেদিন খুব সুখ হয় সেদিন পুতুলদের কাছে এসে সে তার সুখের কথা বলে। আর যেদিন তার মনে মেঘ জমে, বৃষ্টি ভার হয়ে আসে, সেদিন সে তাদের কাছে এসে লুকিয়ে কাঁদে। পুতুলেরা তো কথা বলে না, শুধু তাদের শান্ত চোখের মায়া দিয়ে তারা বউকে আগলে রাখে।

পুতুলওয়ালা লোকটা এমনিতে ভাল ছিল। শুধু তার একটাই সমস্যা ছিল। তার যে ছায়াটা ছিল, সেটা সব সময় সব কিছুকেই নষ্ট করতো আর ভেঙে ফেলতে চাইতো। পুতুলওয়ালা তার ছায়ার নষ্টামি ভালই জানতো। সে তাই ছায়াকে কখনওই কাছ ছাড়া করতো না। কিন্তু তার ভয় আর দুশ্চিন্তা তাকেও কাটছিল না। পুতুলদের তার বউ এতো ভালবাসে, কোনওভাবে তার ছায়া যদি ওই পুতুল দুটোর কোনও ক্ষতি করে দেয়, এই দুর্ভাবনায় মাঝে মধ্যেই মাঝরাতে তার ঘুম ভেঙে যেতো। এইভাবে কিছুদিন যাওয়ার পর, সে ঠিক করল, শহরে গিয়ে সেখান থেকে লোহার বল-বিয়ারিং কিনে পুতুল দুটোর মধ্যে বসিয়ে দেবে। আসলে তার ধারণা ছিল বল-বিয়ারিং লাগালে পুতুলদের প্রাণেও বল আসে। তাতে তারাও অমর হয়ে যায়। যাই হোক, যেদিন সে শহরে গেল সেদিন ভয়ঙ্কর ঝড় উঠল আকাশে। ঝড়ের ধুলোয় ঢেকে গেল চারদিক। কিন্তু ঝড় হলেও বৃষ্টি তেমন হল না সেদিন। দু'এক ফোঁটা হয়ে থেমে গেল। এক সময় ঝড় থেমে গেলে, বৃষ্টি থেমে গেলে, বউ পুতুলদের কাছে এসে দেখল, ধূলোয় ধুলো, এক্কেবারে ঢাকা পড়ে আছে তার ছেলেটা মেয়েটা। বউ কী করে? ঘরের বাইরে এল। দেখল সামনেই দিঘিতে পদ্মপাতার বুকে দু'ফোঁটা জল টলটল করছে। বউ পদ্মপাতা আর তার জলটুকু নিয়ে ঘরে এল। ঢেলে দিল ছেলে পুতুল আর মেয়ে পুতুলের মাথায়, গায়ে। আর আশ্চর্য ব্যাপার জল গায়ে পড়তেই, পুতুল দুটো হঠাৎ গান গাইতে আর নাচতে শুরু করল। তারা নাচে, গায়, দৌড়ে দৌড়ে ঘরের মধ্যে ছুটে বেড়ায়। বউয়ের আনন্দ আজ সারা ঘরে নাচছে ছুটছে দৌড়ে বেড়াচ্ছে। সে তখনই মনে মনে ঠিক করে নিল, পুতুলওয়ালাকে বলবে বল-বিয়ারিঙের আর দরকার নেই তার। কী করবে সে অমরতা নিয়ে? এই এতো হাসি, এতো গান, এতো নাচ আছে তার পুতুলদের জন্যে, সারা ঘর জুড়ে আছে। এই তো যথেষ্ট তার কাছে।'

একনাগাড়ে গল্পটা বলে বিশ্বামিত্র এবার হাঁপায়। আমাকে বলে, 'যান এই লেখাটাই লিখে আনবেন কালকে।'

কিছু একটা ক্রমে স্পষ্ট হয়ে আসে আমার কাছে। গোধূলীর রঙ আর উষাকালের রঙের মাঝখানে একটা রাস্তা, তার ধূসর কুয়াশা কাটিয়ে ধীরে ধীরে ফুটে উঠতে থাকে। আমি তাড়াতাড়ি একটা বেলুন আর একটা রঙিন হুইসিল কিনি। একটা বড় দেখে চকোলেটও কিনে ফেলি রাস্তার পাশের দোকান থেকে। আমাকে এখনই বাড়ি যেতে হবে। বিশাখা এখনও নিশ্চয়ই জেগে আছে। এখনও, হয়ত। ·

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ