মার্গারেট মিচেলের উপন্যাস : যেদিন ভেসে গেছে


অনুবাদ : উৎপল দাশগুপ্ত
পর্ব - ৪২
স্কারলেটের মেয়ে হল; পুচকে, ন্যাড়া একরত্তি একটা মেয়ে, লোমহীন বাঁদরের মত কুৎসিত, ফ্র্যাঙ্কের চেহারার সঙ্গে অদ্ভুত মিল। কেবল বাচ্চাটার অনুরক্ত বাবা ছাড়া আর কেউ ওর মধ্যে সৌন্দর্যের নামগন্ধ খুঁজে পায় না। অবশ্য প্রতিবেশীরা এই বলে সান্ত্বনা দিল যে সব কুৎসিত বাচ্চাই বড় হবার সঙ্গে সঙ্গে সুন্দর হয়ে ওঠে। ওর নাম রাখা হল এলা লোরেনা, দিদিমা এলেনের নাম থেকে এলা, আর লোরেনা, কারণ তখন মেয়েদের জন্য ওই নাম রাখাটাই কেতা হয়ে দাঁড়িয়েছিল, ঠিক যেমন রবার্ট ই লী আর স্টোনওয়াল জ্যাকসন ছেলেদের জন্য, এবং অ্যাব্রাহাম লিঙ্কন আর এমান্সিপেশন নিগ্রো বাচ্চাদের জন্য।

একটা সপ্তাহের মাঝখানে ওর জন্ম হল, যখন অ্যাটলান্টায় উত্তেজনার পারদ একেবারে ঊর্ধ্বমুখী, একটা বিপর্যয়ের আশঙ্কায় পরিবেশ একেবারে থমথমে। একটা নিগ্রো, যে ঢাক পিটিয়ে নিজের ধর্ষণ করার কথা প্রচার করে চলেছিল, তাকে সত্যি সত্যি গ্রেপ্তার করা হয়, তবে ওকে আদালতে বিচারের জন্য পেশ করার আগেই কু ক্লুক্স ক্ল্যান নাকি জেলে হানা দিয়ে চুপচাপ ওকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেয়। ধর্ষিতা রমণীটি, যার নাম এখনও জনসমক্ষে আসেনি, তাকে প্রকাশ্য আদালতে সাক্ষ্য দিতে আসা থেকে রেহাই দিতেই নাকি ক্ল্যান এই কাজটা করেছে। প্রকাশ্যে এসে বিড়ম্বনা আর লজ্জার ব্যাখ্যান করার চাইতে বরং মেয়েটিকে ওর বাবা আর ভাই মিলে গুলি করে মেরে ফেলাটাই যথাযথ হত, তাই নিগ্রোকে হত্যা করাটা শহরের লোকের কাছে বুদ্ধিগ্রাহ্য সমাধান বলেই মনে হয়েছিল, সত্যি বলতে কি, একমাত্র সম্মানজনক সমাধান। কিন্তু সেনাকর্তারা প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন। মেয়েটি কেন প্রকাশ্য আদালতে এসে সাক্ষ্য দিতে পারবে না, এটা কোনোমতেই ওঁদের বোধগম্য হল না।

জওয়ানরা হাতের কাছে যাদের যাদের পেল সবাইকে উঠিয়ে নিল। যে করেই হোক ক্ল্যানকে মুছে ফেলতে হবে, আর তার জন্য যদি অ্যাটলান্টার সব শ্বেতাঙ্গ নাগরিককেও জেলে পুরতে হয়, তাহলে তাই করতে হবে। ভয় পেয়ে নিগ্রোরা নিজেদের মধ্যে গুজগুজ ফুসফুস করতে লাগল যে বদলা নেবার জন্য ওরা বাড়ি বাড়ি আগুন জ্বালিয়ে দেবে। চারদিকে জোর গুজব ছড়িয়ে পড়ল যে যদি অপরাধীদের সনাক্ত করা যায় তাহলে পাইকারি হারে ফাঁসিতে লটকে দেওয়া হবে। আর এটাও শোনা গেল যে নিগ্রোরা নাকি শ্বেতাঙ্গদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে চলেছে। সবাই দরজা জানলা বন্ধ করে বাড়িতেই থাকতে শুরু করল। ছেলেরা কাজে যেতে ভয় পেত, কারণ তাহলে মহিলা আর বাচ্চাদের অরক্ষিত অবস্থায় বাড়িতে রেখে যেতে হয়।

বাচ্চা হওয়ার ধকল সামলাতে সামলাতে, বিছানায় শুয়ে স্কারলেট ক্ষীণ কণ্ঠে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিল যে অ্যাশলে বুদ্ধি করে এই ক্ল্যানের চক্করে পড়েনি, আর ফ্র্যাঙ্কও না, কারণ, এক তো ওঁর যথেষ্ট বয়স হয়ে গেছে, তার ওপর ওঁর এত দমও নেই। ইয়াঙ্কিরা যে কোনও মুহুর্তে ছোঁ মেরে এসে ওঁদের গ্রেপ্তার করতে পারে, এরকম সম্ভাবনার কথা ভাবলেই গায়ে কাঁটা দেয়! কেন যে ক্ল্যানের অকালপক্ক বাচ্চা ছেলেগুলো ইয়াঙ্কিদের এইভাবে ক্ষেপিয়ে না দিয়ে থাকতে পারে না? কে বলতে পারে, মেয়েটাকে হয়ত ধর্ষণ করাই হয়নি। হয়ত বুদ্ধুর মত ভয় পেয়েছে শুধু, আর ওর বোকামির জন্য কতগুলো মানুষকে প্রাণ দিতে হতে পারে!

বারুদের স্তুপের দিকে ধিকি ধিকি জ্বলতে থাকা আগুন এগিয়ে গেলে স্নায়ুর ওপর যেমন চাপ সৃষ্টি হয়, ঠিক তেমনই বিস্ফোরক পরিস্থিতির মধ্যেই স্কারলেট অত্যন্ত দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠল। এর গোপন রহস্য হল স্কারলেটের দুর্দান্ত মনোবল, যা ওকে টারার দুর্দিনেও সাথ দিয়েছে। ফলে এলা লোরেনার জন্মের দু’সপ্তাহের মধ্যেই ও বিছানায় উঠে বসার শক্তি সঞ্চয় করে ফেলল আর নিজের নিষ্ক্রিয়তার জন্য আক্ষেপ করতে শুরু করল। তিন সপ্তাহের মধ্যে বিছানা ছেড়ে দিল আর মিলে যাওয়া শুরু করবে বলে ঘোষণা করে দিল। মিলদুটো প্রায় বন্ধ হয়েই পড়ে আছে, কারণ অ্যাশলে বা হিউ কেউই পরিবারকে সারাদিনের জন্য একলা ছেড়ে যেতে ভয় পাচ্ছে।

আর আঘাতটা এল ঠিক এই সময়েই।

সদ্য পিতৃত্ব লাভের গরবে গরীয়ান ফ্র্যাঙ্ক মনে মনে যথেষ্ট বল সঞ্চয় করে স্কারলেটের ওপর বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে ফেললেন, যতদিন পর্যন্ত এই বিপজ্জনক পরিস্থিতি কেটে না যায়। এই নিষেধাজ্ঞায় অবশ্য স্কারলেটের দুশ্চিন্তা করার কোনও কারণ ছিল না, কারণ নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ওর কাজে যাওয়া আটকাত না, যদি না ফ্র্যাঙ্ক ওর ঘোড়া আর বগি তদারকি করার জন্য আস্তাবলে জমা না করে দিতেন আর হুকুম না জারি করতেন যে একমাত্র উনি ছাড়া আর কারও কাছে যেন সেগুলো ফেরত না দেওয়া হয়। ব্যাপারটা আরও ঘোরালো হয়ে দাঁড়িয়েছিল কারণ স্কারলেটের অসুস্থতার সময় ম্যামি আর উনি মিলে বাড়ি তন্নতন্ন করে খুঁজে ওর সঞ্চয়ের গোপন ভাণ্ডারের হদিস পেয়ে গেছিলেন। সেই সব টাকাকড়ি উনি ব্যাঙ্কে নিজের নামে জমা করে দিয়েছিলেন। ফলে স্কারলেটের পক্ষে এখন একটা গাড়ি ভাড়া নেওয়ার মত টাকাও নেই।

প্রথমে স্কারলেট ফ্র্যাঙ্ক আর ম্যামি দুজনের ওপরেই প্রবল চোটপাট করল, তাতে কোনও ফল না হওয়ার করুণ গলায় মিনতি করতে লাগল, তারপর তাতেও পাথর গলাতে না পেরে, একদিন সারা সকাল ধরে হাপুসনয়নে কেঁদেই চলল, ঠিক জেদি একটা বাচ্চার মত। এত কষ্ট পাওয়ার পরেও ওকে শুনতে হল, “কেঁদো না সোনা! তোমার শরীরটা যে একদম ভাল নেই।” আর, “মিস স্কারলেট, তুমি কান্না না থামালে যে বুকের দুধ সব টক হয়ে যাবে। সেই দুধ খেলে বাচ্চাটার যে পেট কামড়াবে!”

উগ্র মূর্তি ধারণ করে, স্কারলেট দাপাতে দাপাতে পেছনের ঊঠোন দিয়ে মেলানির বাড়ি এসে হাজির হল, আর মনের যত ঝাল চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে মেটাতে লাগল। বলল যে ও হেঁটেই মিলে যাবে, অ্যাটলান্টাময় রাষ্ট্র করে দেবে যে কী একজন জঘন্য লোকের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে ওর, ওকে একটা দুষ্টু বাচ্চার মত মনে করা কিছুতেই মেনে নেবে না। সঙ্গে একটা পিস্তল রাখবে, কেউ ওকে বাধা দিতে চাইলেই গুলি চালিয়ে দেবে। একটা লোককে গুলি করে ও মেরেছে, আর প্রয়োজন হলে খুশি মনেই – হ্যাঁ খুশি মনে আরেকজনের ওপর গুলি চালিয়ে দেবে। ও – ।

যে মেলানি সামনের বারান্দাতে যেতেও ভয় পায়, সে এই সব হুমকি শুনে রীতিমত আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।

“না, না, তুমি এরকম ঝুঁকি নিতে যেও না! তোমার কিছু হলে আমি মরেই যাব! প্লীজ়, প্লীজ় – ”
“আমি নেব, নেব, নেব! আমি নেব! আমি হেঁটেই যাব – ”

মেলানি ওর চোখের পানে চেয়ে দেখে। এ কোনও সদ্য সন্তান জন্মদাত্রী মায়ের দুর্বলতাজনিত প্রলাপোক্তি নয়। স্কারলেটের চোখেমুখে সেই একই রকম একগুঁয়ে হঠকারি সঙ্কল্পের চিহ্ন যেটা জেরাল্ড ও’হারা কোনও ব্যাপারে মনস্থির করে ফেলার পর মেলানি ওঁর চোখেমুখে দেখেছে। বাহুপাশে স্কারলেটের কটিদেশ শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।

“তোমার মত সাহসী হতে না পারা আর মিলে যেতে না দিয়ে অ্যাশলেকে এতদিন ঘরে আটকে রাখা – এই সব দোষ আমারই। কী ভিতু আমি যে কি বলব! আমি অ্যাশলেকে বলব যে আমি একটুও ভয় পাচ্ছি না, আর আমি তো তোমার আর আন্ট পিটির কাছে থাকতেই পারি, যাতে অ্যাশলে কাজে ফিরে যেতে পারে, আর – ”

আর কারও কাছে দূরের কথা, এমনকি নিজের কাছেও স্কারলেট কখনও স্বীকার করতে চায়নি যে অ্যাশলের পক্ষে একা একা পরিস্থিতি সামালানো মোটেই সম্ভব নয়। ও চেঁচিয়ে উঠল –

“তুমি এরকম কিছু মোটেই করবে না! কাজে ফিরে গিয়ে অ্যাশলে কী এমন মহাভারত উদ্ধার করে ফেলবে শুনি, যদি প্রতি মুহুর্তে তোমাদের নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকে? এত স্বার্থপর হয়ে গেছে সকলে! এমনকি আঙ্কল পিটারও আমার যঙ্গে যেতে রাজি নয়! কুছ পরোয়া নেই! একাই যাব আমি! হেঁটেই যাব পুরো রাস্তা, আর এক দল ডার্কিও জোগাড় করে নেব যে কোনও জায়গা – ”

“না, না! তুমি এটা করতেই পার না! বিপদ ঘটে যেতে পারে তোমার। শুনতে পেয়েছি ডেকাট্যুর রোডের বস্তি বখাটে ডার্কিতে একদম ভরে গেছে, তোমাকে ওখান দিয়েই যেতে হবে। দাঁড়াও, একটু ভাবতে দাও – কথা দাও আমাকে, সোনা, আজ তুমি এমন কিছুই করবে না। একটা উপায় আমি ভেবে বের করবই। কথা দাও তুমি এখন বাড়ি ফিরে যাবে আর শুয়ে পড়বে। তোমাকে খুবই রুগ্ন দেখাচ্ছে। কথা দাও।”

তর্জন-গর্জন করে স্কারলেট এতটাই অবসন্ন হয়ে পড়েছিল যে মুখ গোমড়া করে মেলানিকে কথা দিয়ে বাড়ি ফিরে গেল। তবে বাড়ির সকলের সব রকম শান্তি স্থাপনের প্রচেষ্টা স্কারলেট সদর্পে প্রত্যাখ্যান করল।

সেদিন বিকেলে এক অদ্ভুতদর্শন লোক পিটির পেছনের উঠোনের দিক দিয়ে মেলানির দিকের হেজের বেড়া ডিঙিয়ে ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে ভেতরে ঢুকল। ম্যামি আর ডিলসি যাদের ‘মিস মেলির রাস্তা থেকে উঠিয়ে এনে সেলারে ঘুমোতে দেওয়া ভিখিরিদের’ বলে উল্লেখ করত, তাদেরই একজন কেউ হবে।

মেলানিদের বাড়ির বেসমেন্টে তিনটে কামরা, আগে যেগুলো ভৃত্যদের থাকার জায়গা হিসেবে ব্যবহার করা হত। আর ছিল একটা সুরাকক্ষ। আজকাল একটা কামরা ডিলসির দখলে। বাকি দুটো কামরা বিপদে পড়া গরীব মানুষদের অস্থায়ী আবাস হিসেবে নিত্যদিন ভরে থাকত। কোথা থেকে ওরা এসেছে, কোথায় যাবে, মেলানি ছাড়া আর কেউ তা জানত না। মেলানি কোথা থেকে ওদের নিয়ে আসে, সেটাও না। নিগ্রোরা হয়ত ঠিক কথাই বলে, রাস্তা থেকেই মেলানি ওদের তুলে নিয়ে আসে। মেলানির ছোট্ট বসার ঘরে যেমন মহান এবং বিখ্যাত ব্যক্তিদের সমাবেশ ঘটত, ঠিক তেমনি ভাগ্যহীন মানুষ মেলানির সুরাকক্ষে আশ্রয় পেত, যেখানে ওদের খাওয়ার এবং ঘুমোনোর বন্দোবস্ত করা হত, এমনকি বিদায় নেওয়ার সময় হাতে একটা খাবারের প্যাকেটও দিয়ে দেওয়া হত।

সাধারণত, এই সব কক্ষের আশ্রিতরা এক সময় কনফেডারেট সৈন্য ছিল, একটু হয়ত অমার্জিত, অশিক্ষিত প্রকৃতির, হয়ত এদের কোনও পরিবার নেই, গ্রাসাচ্ছদনের জন্য রুজি-রোজগারের আশা নিয়ে গ্রামগঞ্জের দিকে যাচ্ছে।

তামাটে চেহারার অসহায় মহিলারা, একপাল অযত্নে বেড়ে ওঠা বাচ্চাকাচ্চাদের নিয়েও মাঝে মাঝে এখানে রাত কাটিয়ে যায়। যুদ্ধ এদের স্বামীদের ছিনিয়ে নিয়েছে, জমি জায়গা বেহাত হয়ে গেছে। আত্মীয়স্বজন যারা ছিটকে পড়েছে বা হারিয়ে গেছে, তাদের খোঁজে। কখনো কখনো বিদেশি, যারা ইংরেজি ভাল বলতে পারে না, বা একদম বলতেই পারে না, তাদের উপস্থিতি এলাকায় আলোড়ন সৃষ্টি করে। দক্ষিণে সহজেই ভাগ্য ফেরানো যায়, এই রকম সব কিংবদন্তি শুনে এরা দেখানে ছুটে আসে। একবার একজন রিপাবলিকানও নাকি ওখানে আশ্রয় পেয়েছিল। অন্তত, ম্যামির সেই রকমই মনে হয়েছিল, ও নাকি গন্ধ শুঁকে রিপাবলিকান চিনে ফেলতে পারে, যেমন গন্ধ শুঁকে ঘোড়া বিষাক্ত সাপ চিনে যায়। তবে ম্যামির কথা কেউ বিশ্বাসই করতে চায়নি। মেলানির খয়রাতিরও তো একটা সীমা মেনেই চলে। অন্তত সবাই সেরকমই আশা করত।

নভেম্বর মাসে রোদের ম্লান আলোয় উঠোনের একপাশে বসে স্কারলেটের সেরকমই মনে হল। ঠিকই বলে ওরা, লোকটা মেলানির ল্যাংড়া কুকুরদের একজনই হবে। আর লোকটা বাস্তবিকই ল্যাংড়া!

যে লোকটা পেছনের উঠোন দিয়ে ঢুকছে, সে ঠিক উইল বেন্টিনের মতই কাঠের পায়ে ভর করে ল্যাংচাচ্ছে। লোকটা বৃদ্ধ। লম্বা, রোগা, মাথা জোড়া চকচকে টাক, আর সাদা দাড়ি, এতটাই লম্বা যে বেল্টে গুঁজে ফেলা যায়। ওর রুক্ষ দাগে ভরা মুখ দেখে মনে হয় ষাট বছরের ওপর বয়স। তবে শরীরে সেভাবে বয়সের ছাপ পড়েনি। কৃশ চেহারায় কোনও সৌষ্ঠব নেই, কিন্তু একটা পা কাঠের হলেও, চলাফেরার ব্যাপারে সাপের মতই ক্ষিপ্র।

লোকটা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে ওর দিকে এগিয়ে এল। কথা বলতে শুরু করলেই ওর নাকি স্বর আর ‘র’ বর্ণের উচ্চারণে অস্পষ্টতা ধরা পড়ে যেত। কারণ সমতলের লোকেদের মধ্যে সচরাচর এটা দেখা যায় না। কিন্তু মুখ খোলার আগেই স্কারলেট বুঝে নিয়েছিল যে লোকটার জন্ম পাহাড়ি অঞ্চলে। পোশাক পরিচ্ছদ ময়লা আর শতছিন্ন হলেও, ওর হাবভাবে পাহাড়ি মানুষদের মত একটা বেপরোয়া কিন্তু নীরব অহঙ্কার। কোনও রকম নির্বুদ্ধিতা বা অতিরিক্ত স্বাধীন হাবভাব সহ্য করে নেওয়া ওদের ধাতে নেই। দাড়িতে তামাকে পিক গড়িয়ে পড়ার দাগ। চোয়াল আর গালের ফাঁকে একদলা তামাক ঠেসে রাখায় মুখটাও বিকৃত। নাকটা সরু আর এবড়োখেবড়ো। ভুরুদুটো ঘন ঝোপের মত, আর পাকানো। কানের ভেতর থেকে বনবেড়ালের মত লকলকিয়ে লোমের গোছা বেরিয়ে আছে। চোখের একটা কোটর শূন্য, সেখান থেকে একটা গভীর দাগ কোণাকুণিভাবে গাল অবধি নেমে এসে দাড়ির ভেতর পর্যন্ত চলে গেছে। অন্য চোখটা কুতকুতে, শীতল ম্লান অনুতাপহীন নিষ্পলক দৃষ্টি। ট্রাউজ়ারের বেল্ট থেকে একটা ভারি পিস্তল ঝুলছে, আর ওর জীর্ণ বুটের ভেতর থেকে একটা বাঁকানো ছুরির হাতল উঁকি মারছে।

স্কারলেটের চাউনির জবাবে লোকটা শীতল দৃষ্টিতে স্কারলেটকে দেখল। তারপর রেলিংএর বাইরে একদলা থুতু ফেলল। সবেধন নীলমণি ওই একটি মাত্র চোখে একরাশ অবজ্ঞা, শুধু স্কারলেটের প্রতি নয়, যেন সমগ্র নারীজাতির প্রতি।

“মিসেজ় উইলক্স পাঠালেন আমাকে, আপনার কাছে কাজ করার জন্য,” কোনও রকম ভণিতা না করেই লোকটা বলল। তবে কথা বলতে খুব একটা যে অভ্যস্ত নয়, সেটা ওর কথা আটকে যাওয়া থেকেই বোঝা যাচ্ছিল। “আমার নাম আর্চি।”

“দুঃখিত, তোমার জন্য আমার কাছে কোনও কাজ নেই, মিস্টার আর্চি।”

“পদবী নয়, আর্চি আমার নাম।”

“বুঝলাম। তা তোমার পদবীটা কী?”

আবার একদলা থুতু ফেলল লোকটা। “সেটা আমার ব্যাপার। আমাকে আর্চি বলে ডাকলেই চলবে।”

“বেশ, তোমার পদবী কী তা নিয়ে আমার কোনও মাথাব্যথা নেই! তোমাকেও আমার কোনও দরকার নেই!”

“আমার মনে হয় দরকার আছে। আপনি নাকি বোকার মত একা একা ঘোরাঘুরি করতে চান। মিসেজ় উইল্কস সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তা করছেন। তাই আমাকে পাঠালেন, আপনার গাড়ি চালানোর জন্য।”

“তাই নাকি!” স্কারলেট চেঁচিয়ে উঠল। লোকটার বেয়াদবি আর মেলানির অযথা নাক গলানোয় খুব চটে গেল।

একটি মাত্র চোখ দিয়ে স্কারলেটকে দেখে নিল, উদাসীন বিদ্বেষ নিয়ে। “হ্যাঁ, পুরুষমানুষ যখন মহিলাদের নিরাপদ রাখার জন্য জান লড়িয়ে দিচ্ছে, তখন মহিলাদের কোনও অধিকার নেই ওদের কথার অবাধ্য হবার। আপনার যদি ঘোরাঘুরি শখ জেগে থাকে তাহলে আমিই আপনার গাড়ি চালাব। নিগারদের আমি ঘেন্না করি! ইয়াঙ্কিদেরও!”

লোকটা তামাকের দলাটা এক গাল থেকে অন্য গালে ঠেলে দিল। তারপর জবাবের অপেক্ষা না করেই, সিঁড়ির ওপরের ধাপে বসে পড়ল। “মহিলাদের নিয়ে গাড়ি চালানো খুব যে আমি পছন্দ করি, তা নয়, কিন্তু মিসেজ় উইল্কস খুবই ভাল মহিলা, ওঁর সেলারে আমাকে থাকতে দিয়েছেন, আর আপনার গাড়ি চালানোর জন্য আমাকে পাঠিয়েছেন।”

“কিন্তু – ” স্কারলেট অসহায় ভাবে শুরু করেও থেমে গিয়ে লোকটাকে ভাল করে লক্ষ্য করল। একটু পরেই ওর মুখে হাসি ফুটল। এই বুড়ো মস্তানটা দেখতে যেমনই হোক না কেন, ও সঙ্গে থাকলে অনেক ব্যাপারই সহজ হয়ে যাবে। লোকটা সঙ্গে থাকলে, ও নিশ্চিন্ত মনে শহরে ঘোরাঘুরি করতে পারবে, মিলে যাতায়াত করতে পারবে, গ্রাহকদের সঙ্গে দেখা করতে পারবে। ও সঙ্গে থাকলে কেউ ওর নিরাপত্তা নিয়ে সংশয় করবে না, আর চেহারাটাও এমন যে কেউ আজেবাজে কথাও রটাবে না।

“বেশ, তবে কথা হয়েই রইল,” স্কারলেট বলল। “অবশ্যই, যদি আমার স্বামীর আপত্তি না থাকে।”

আর্চির সঙ্গে আলাদা করে কথা বলে ফ্র্যাঙ্ককে অনিচ্ছাসত্ত্বেও রাজি হতে হল। তদারকি করার আস্তাবলে খবর পাঠিয়ে ঘোড়া আর বগিটা ছেড়ে দিতে বললেন। মনে মনে আঘাত পেলেন, হতাশও হলেন খুব, এই জন্য যে মাতৃত্বও স্কারলেটকে টলাতে পারল না, যেটা উনি খুবই আশা করেছিলেন। তবে ওই হতচ্ছাড়া মিলগুলোতে যাওয়ার ব্যাপারে যদি স্কারলেট নাছোড় হয়, তাহলে আর্চি নিশ্চিতভাবে ঈশ্বর প্রেরিত।

এইভাবেই অ্যাটলান্টাতে স্কারলেট আর আর্চির সহাবস্থান শুরু হল। এক উদ্ভট জুটি – স্কারলেট আর আর্চি – একটা বর্বর, ময়লা, বুড়ো লোক বগির সামনে কাঠের পা ঝুলিয়ে বসে আর পেছনে ভুরু কোঁচ করে বসে থাকা সুবেশা একজন সুন্দরী মহিলা। অ্যাটলান্টায় এবং অ্যাটলান্টার আশেপাশের সব জায়গায় ওদের সর্বদা এক সাথে দেখা যাবে, বাক্য বিনিময় প্রায় হয়ই না বলতে গেলে, বোঝাই যায় কেউ কাউকে পছন্দই করে না, কিন্তু পারস্পরিক প্রয়োজনে দুজনের মধ্যে একটা বন্ধন তৈরি হয়েছে – টাকার প্রয়োজনে লোকটার আর নিরাপত্তার স্বার্থে মহিলার। শহরের সবাই বলাবলি করত যে বাটলার লোকটার সাথে যাওয়া আসা করার চেয়ে বরং এই লোকটার সঙ্গে ঘোরাঘুরি করাটা বেশি ভাল। রেট এখন ঠিক কোথায় আছেন সেটা নিয়েও এদের কৌতুহলের অন্ত নেই। উনি হঠাৎই শহর ছেড়ে গেছেন মাস তিনেক আগে, আর কোথায় যে গেছেন সেটা কারুরই জানা নেই, এমনকি স্কারলেটেরও না।

আর্চি ছিল খুব চুপচাপ। কথাবার্তা খুব একটা বলত না, অন্তত কেউ ওর সঙ্গে কথা না বললে। আর সে ক্ষেত্রে বেশিরভাগ সময়েই জবাবে শুধু ঘোঁতঘোঁত করত। প্রতিদিন সকালবেলা মেলানির সেলার থেকে এসে পিটির বাড়ির সামনের সিঁড়িতে এসে বসত, স্কারলেট বেরিয়ে আসার আগে পর্যন্ত এক মনে তামাক চিবিয়ে থুতু ফেলতে থাকত। আস্তাবল থেকে পিটার ঘোড়া আর বগি বের করে দিত। আর্চিকে আঙ্কল পিটার বেশ ভয় করত, প্রায় শয়তান আর কু ক্লুক্সদের মতই। এমনকি ম্যামিরও ওর পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় পা কাঁপতে থাকত। মুখ দিয়ে টুঁ শব্দটি বের করত না। আর্চি যে নিগ্রোদের ঘেন্না করে সেটা ওরা জানত আর তাই ভয়ও করত। নতুন আরেকটা পিস্তল জোগাড় করে ওর পিস্তল আর ছুরির অস্ত্রভাণ্ডারকে আরও শক্তিশালী করে নিয়েছে। কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের মধ্যে ওর কুখ্যাতি ভালই ছড়িয়ে পড়েছিল। ওকে একদিনের তরেও পিস্তল বের করতে হয়নি বা বেল্টের ওপর হাত রাখারও দরকার পড়েনি। সঙ্গে আছে সেটাই যথেষ্ট। আর্চির শ্রবণপরিধির মধ্যে কোনও নিগ্রো ভুলেও হাসত না।

একবার স্কারলেট কৌতুহলী হয়ে জানতে চেয়েছিল ওর নিগারদের ঘেন্না করার কারণটা কী। ওর জবাব শুনে স্কারলেট খুব অবাক হয়েছিল। “সেটা আমার ব্যাপার।”

“সব পাহাড়ি লোকদের মতই আমিও ওদের ঘেন্না করি। আমরা কখনোই ওদের পছন্দ করতাম না, আর আমাদের নিগ্রো ক্রীতদাসও ছিল না। ওই নিগ্রোরা – ওদের জন্যই তো লড়াইটা বাধল। ওদের ঘেন্না করবার সেটাও একটা কারণ।”

“কিন্তু যুদ্ধের সময় তুমিও তো লড়াই করেছ।”

“সেটা একজন পুরুষমানুষ হিসেবে আমার সুবিধে। আমি ইয়াঙ্কিদেরও ঘেন্না করি, নিগারদের থেকেও বেশি। যে মেয়েছেলেরা বেশি বকবক করে তাদেরও আমি ঠিক ততটাই ঘেন্না করি।”

মুখের ওপর এই রকম অসভ্যভাবে কথাটা বলে দেওয়ায় রাগে স্কারলেটের বাক্যস্ফূর্তি হল না। ইচ্ছে হল এখনই এই আপদটাকে বিদায় করে দেয়। কিন্তু এই লোকটাকে ছাড়া ওর চলবে কেমন করে? আর কীভাবে এই স্বাধীনতাটুকু উপভোগ করতে পারবে? লোকটা বেয়াদব, নোংরা, মাঝে মাঝে দুর্গন্ধে টেঁকা যায় না, কিন্তু স্কারলেটের কাজ চলে যাচ্ছে। গাড়ি চালিয়ে ওকে মিলে নিয়ে যাচ্ছে, খদ্দেরদের সঙ্গে দেখা করাতে নিয়ে যাচ্ছে। যখন স্কারলেট কোনও কথা বলে বা নির্দেশ দেয় তখন মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে থুতু ফেলে। বগি থেকে নামলেই লোকটাও নেমে গিয়ে ওকে ছায়ার মত অনুসরণ করে। স্কারলেট যখন অভব্য মজুর, নিগ্রো বা ইয়াঙ্কি সৈন্যদের সঙ্গে কথা বলে, তখন লোকটা একেবারে ওর কনুইয়ের দূরত্বে দাঁড়িয়ে থাকে।

খুবই তাড়াতাড়ি অ্যাটলান্টা স্কারলেট আর ওর দেহরক্ষীকে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ল। আর অভ্যস্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লেডিরা স্কারলেটের এই চলাফেরার স্বাধীনতাকে ঈর্ষা করতে শুরু করল। কু ক্লুক্সের নিগ্রোটাকে ফাঁসিতে ঝোলানোর ঘটনার পর থেকেই লেডিরা নিজেদের প্রায় গৃহবন্দী করে ফেলেছেন। জনাছয়েক মহিলা একসাথে না হলে ওঁরা শহরে কেনাকাটা করার জন্যও বের হচ্ছেন না। সামাজিক মেলামেশায় অভ্যস্ত এই সব মহিলারা ক্রমাগতই অধীর হয়ে উঠতে লাগলেন। অহঙ্কারকে শিকেয় তুলে ওঁরা স্কারলেটের কাছে আর্চিকে ধার দেবার জন্য আবেদন নিবেদন জানাতে শুরু করলেন। নিজের প্রয়োজন না থাকলে, স্কারলেটও খুশি মনেই আর্চিকে অন্যান্য লেডিদের কাজে লাগতে দিত।

অল্প দিনের মধ্যেই আর্চি অ্যাটলান্টার এক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হল। লেডিদের মধ্যে ওর অবসর সময়ের জন্য রেশারেশি বেধে গেল। এমন কোনও দিন যেত না যখন কোনো না কোনো বাচ্চা বা নিগ্রো চাকর ব্রেকফাস্টের সময় একটা চিরকুট নিয়ে হাজির না হত, যাতে বলা থাকত, “আজ বিকেলে আর্চিকে তোমার যদি দরকার না থাকে, তাহলে আমার কাছে পাঠিও, প্লীজ়। ফুল নিয়ে সমাধিস্থলে যেতে হবে।” “বিউটি পার্লারে আজ আমাকে যেতেই হবে।” “আর্চি যদি আন্ট নেলিকে হাওয়া খাওয়ানোর জন্য নিয়ে যেতে পারে।” “পিটারস স্ট্রীটে যাওয়ার খুব দরকার। গ্র্যান্ডপা’র শরীর জুতের নেই, তাই সঙ্গে যেতে পারছেন না। যদি আর্চি – ”

আর্চি সবার জন্যই গাড়িতে চালাত – কুমারী মেয়েদের নিয়ে, বয়স্কা মহিলাদের নিয়ে, বিধবাদের নিয়ে – তবে ওর আপোষহীন অবজ্ঞা সবাইকেই সহ্য করতে হত। একমাত্র মেলানি ছাড়া কোনও মহিলাকে যে ও পছন্দ করে না, সে ব্যাপারে কারোর মনে কোনো সন্দেহ রইল না। মহিলা, নিগ্রো আর ইয়াঙ্কি সবাই ওর চোখে বরাবর। প্রথম প্রথম ওর বেয়াদবিতে অবাক হলেও, শেষ পর্যন্ত লেডিরা অভ্যস্ত হয়ে গেল। এমনিতে লোকটা টুঁ শব্দটিও করত না, স্রেফ মাঝে মাঝে সশব্দে তামাকের পিক ফেলা ছাড়া। ঘোড়া হাঁকিয়ে চলার সময় সবাই ওর অস্তিত্বটাই ভুলে যেত, ফলে ওকে মানিয়ে নিতে অসুবিধে হয়নি। এমনকি মিসেজ় মীডের কাছে মিসেজ় মেরিওয়েদার যখন ওঁর ভাইঝির গর্ভাবস্থা নিয়ে আলোচনা করছিলেন তখন তো উনি ভুলেই গেছিলেন যে গাড়িটা আর্চি নামে একজন পুরুষমানুষ চালাচ্ছে।

অন্য কোনও সময় হলে সকলের পক্ষে ব্যাপারটা মেনে নেওয়া সম্ভব হত না। যুদ্ধের আগে হলে ওকে লেডিদের কিচেনে পর্যন্ত ঢুকতে দেওয়া হত না। খিড়কি দরজা দিয়ে ওর হাতে খাবার দিয়ে পত্রপাঠ নিজের কাজে পাঠিয়ে দেওয়া হত। কিন্তু এখন ওর উপস্থিতিতে ওঁরা ভরসা পান, তাই ও থাকলে ওঁরা খুশিই হন। অসভ্য, অশিক্ষিত এবং নোংরা হওয়া সত্ত্বেও লেডিদের আর পুনর্নির্মাণের আতঙ্কের পরিবেশের মধ্যে আর্চি যেন একটা সুরক্ষার দেওয়াল। ও বন্ধু নয়, চাকরও নয়। ও হল ভাড়া করা দেহরক্ষী। যখন পুরুষমানুষরা নিজের নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন বা রাতের বেলা বাড়ির বাইরে থাকেন, তখন ও মহিলাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।

স্কারলেট লক্ষ্য করল, আর্চি কাজে লাগার পর থেকে ফ্র্যাঙ্ক প্রায়ই রাত্রে বাড়ি থাকেন না। বলেন যে স্টোরের হিসেবপত্র মেলানোটা খুব জরুরি হয়ে পড়েছে। দিনের বেলায় এত খদ্দের আসে যে তখন আর পেরে ওঠেন না। এছাড়া ওঁর কিছু অসুস্থ বন্ধুবান্ধব রয়েছেন, যাঁদের জন্য ওঁকে কিছু সময় দিতে হচ্ছে। তাছাড়া প্রতি বুধবার ডেমক্রেটদের নিয়ে যে সংঘ স্থাপন করা হয়েছে, তার মিটিং থাকে। উনি কোনও ভাবেই সেই মিটিংয়ে হাজিরা দিতে ভোলেন না। যাতে ওঁরা আবার ব্যালটের অধিকার ফিরে পান, সেটাই ওই সংঘ করবার চেষ্টা করছে। স্কারলেট নিশ্চিত জানে ওখানে তর্কাতর্কি ছাড়া কাজের কাজ কিছুই হয় না। তর্কাতর্কির মোদ্দা বিষয় হল একমাত্র জেনারাল লী ছাড়া, জেনারাল জন বি গর্ডনের সমতূল্য আর কোনও জেনারাল নাকি হননি। আর লড়াইটা নাকি আবার নতুন করে লড়া দরকার। ব্যালটের অধিকার ফিরে পাওয়া নিয়ে খুব কিছু একটা অগ্রগতি স্কারলেটের নজরে আসেনি। তবে ফ্র্যাঙ্ক যে এই মিটিংগুলোতে হাজির থাকতে ভালবাসতেন, সেটাতে কোনও সন্দেহ নেই। আর এই সব মিটিং চলত সারা রাত ধরে।

অসুস্থ বন্ধুবান্ধবদের অ্যাশলেও কিছু সময় দেয়। আর ডেমক্র্যাটিক সংঘের মিটিংয়েও যায়। ফ্র্যাঙ্ক যেসব রাতে বাড়ি থাকেন না, অ্যাশলেও সেই সব রাতে বাড়ি থাকে না। এই সব রাত্রে, আর্চি পিটি, স্কারলেট, ওয়েড আর ছোট্ট এলাকে নিয়ে পেছনের উঠোনের ভেতর দিয়ে মেলানির বাড়িতে নিয়ে আসত, আর দুই পরিবার একসাথে সন্ধ্যেটা ওখানেই কাটাত। মেয়েরা সেলাই নিয়ে ব্যস্ত থাকত, আর আর্চি বসার ঘরের সোফাতে টানটান হয়ে শুয়ে নাক ডাকাত। নাক ডাকার সময় ওর পেকে যাওয়া গোঁপে ঝাপটা লাগত। আসবাবপত্রের মধ্যে সব থেকে সুন্দর ওই সোফায় শরীর ফেলে দিতে কেউই বলেনি। যতবারই ওই সোফাতে শুয়ে পড়ে ওর বুটশুদ্ধ পা সোফার ঢাকার ওপর তুলে দিত, মহিলারা গোপনে দীর্ঘশ্বাস ফেলত। তবে এর জন্য ওকে বকাবকি করার সাহস কারও ছিল না। বিশেষ করে ও যখন একদিন বলেই ফেলল যে অনায়াসে ও ঘুমিয়ে পড়তে বলেই বাঁচোয়া, নইলে মুর্গির মত মেয়েদের কিচিরমিচিরে নিশ্চিতভাবে ওর মাথা খারাপ হয়ে যাবার জোগাড় হত।

কখনো কখনো স্কারলেটের জানতে ইচ্ছে হত, আর্চি এসেছে কোথা থেকে আর মেলির সেলারে এসে পৌঁছনোর আগের জীবনটা ওর কেমন ছিল। তবে জিগ্যেস করে উঠতে পারেনি। ওর কানা চোখে এমন একটা হিংস্র ভাব থাকত যে কোনো রকম কৌতুহলের সেখানে প্রশ্রয় ছিল না। ওর কথাবার্তা থেকে স্কারলেট এটুকু বুঝতে পেরেছে যে লোকটা উত্তরের পার্বত্য অঞ্চলের, সৈন্যবাহিনীতে ছিল, আর আত্মসমর্পণের অল্প আগে একটা পা আর একটা চোখ খুইয়েছে। তবে একদিন রাগের মাথায় হিউ এলসিংকে দু’কথা শুনিয়ে দেওয়ার সময় আর্চির অতীত নিয়ে আসল সত্যিটা বেরিয়ে এল।

একদিন সকালবেলা বুড়ো মানুষটার সঙ্গে স্কারলেট হিউয়ের মিলে এল। দেখল কাজকর্ম সব বন্ধ। নিগ্রোরা সব বেপাত্তা, আর হিউ একটা গাছের তলায় হতাশ হয়ে বসে আছে। সকাল থেকে ওর লোকজন মুখই দেখায়নি, আর কী করবে সেটা হিউ ভেবেই পাচ্ছে না। স্কারলেটের রাগ গেল চড়ে, আর বিন্দুমাত্র সঙ্কোচ না করে সেটা হিউয়ের ওপরেই ঝরিয়ে দিল। চেরাই কাঠের একটা বড়সড় অর্ডার স্কারলেটের হাতে এসেছে – এবং জরুরি ভিত্তিতে দিতে হবে। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে, নিজের যাদু কাজে লাগিয়ে, অনেক দরকষাকষির পরে অর্ডারটা পাওয়া গেছে, আর মিলটা কিনা একদম নিস্তব্ধ!

“অন্য মিলটাতে নিয়ে চল,” স্কারলেট আর্চিকে নির্দেশ দিল। “জানি যেতে অনেক সময় লাগবে, ডিনার খাওয়ার সময়ও হয়ত পাওয়া যাবে না। কিন্তু কী জন্য আমি তোমাকে মাইনে দিচ্ছি? মিস্টার উইল্কসকে বলতে সব কাজ বন্ধ রেখে এই চেরাই কাঠের কাজটা ধরতে হবে। জানি না ওর লোকজনও কাজ করছে কি না! নিকম্মার দল যত সব! এই হিউ এলসিংয়ের মত একটা গাধা আমি আর একটাও দেখিনি! জনি গ্যালাঘার যে স্টোরটা তৈরিতে ব্যস্ত, সেটা শেষ হলেই হিউকে ছাঁটাই করে ওকেই লাগাব। গ্যালাঘার ইয়াঙ্কি সেনাবাহিনীতে ছিল কী ছিল না, তাতে আমার কী এসে যায়? করিৎকর্মা লোক। এখনও আমি কোনও আইরিশম্যানকে অলস দেখিনি। আর এই স্বাধীন ডার্কিদের নিয়ে কাজ চালানো – ঢের দেখে নিয়েছি! একদম ভরসা করা যায় না! জনি গ্যালাঘারকে লাগাব আর কিছু কয়েদিকে আমার জন্য লীজ় নিতে বলব। ও ঠিক পারবে ওদের থেকে কাজ বের করে নিতে। ও ঠিক – ”

ঘুরে গিয়ে আর্চি হিংস্র চোখ মেলে স্কারলেটকে দেখল। ফ্যাসফেসে গলায় যখন কথা বলল, তখন ঠাণ্ডা রাগ ফুটে বেরোচ্ছে।

“যেদিন থেকে আপনি কয়েদিদের লাগাবেন, আমি আপনার কাজ ছেড়ে দেব,” বলল ও।

স্কারলেট চমকে উঠল। “হে ঈশ্বর! কিন্তু কেন?”

“কয়েদি লীজ় নেওয়া আমার ভালমতই জানা আছে। আমি বলি কয়েদি খুন করা। মানুষ ভাড়া নেওয়া হবে – অথচ ওদের খচ্চরেরও অধম ভাবা হবে। খচ্চরের থেকেও খারাপ ব্যবহার পাবে ওরা। মারো, পেটো, খেতে দিও না, খুন কর! কারও কিছ যায় আসে না! সরকারের মাথাব্যথাই নেই। লীজ়ের টাকা পেলেই হল। যারা লীজ় নিল, তাদেরও মাথাব্যথা নেই। ওদের একমাত্র উদ্দেশ্যে হল যত কম খাইয়ে ওদের থেকে যত বেশি কাজ আদায় করা যায়! ছিঃ, ম্যা’ম! মহিলাদের সম্বন্ধে আমার উঁচু ধারণা কখনোই ছিল না, এখন আরও কমে গেল।”

“এটা কি তোমার মাথা ঘামানোর মত কোনও ব্যাপার?”

“হওয়ারই কথা,” আর্চি বলল, তারপর একটু দম নিয়ে বলল, “আমিও কয়েদি ছিলাম, তা প্রায় চল্লিশ বছর।”

স্কারলেট ঢোঁক গিলল। কিছুক্ষণ ভয়ে কাঁটা হয়ে কুশনে হেলান দিয়ে বসে রইল। তাহলে এই জনই আর্চি ওর পদবী বলতে চায়নি। কোথায় ওর জন্ম, ওর অতীত এসব নিয়ে কথা বলার ব্যাপারেও এত অনীহা। এই জন্যই দুনিয়ার ওপর এত রাগ ওর, আর এই জন্যই ওর কথাবার্তায় এত ঘেন্না বেরিয়ে পড়ে! চল্লিশ বছর! যখন জেলে গিয়েছিল, তার মানে, তখন ও যুবক ছিল! চল্লিশ বছর! নিশ্চয়ই যাবজ্জীবনের সাজা ছিল – আর যাবজ্জীবনদের –

“কী করেছিলে – খুন?”

“হ্যাঁ,” আর্চি সংক্ষেপে জবাব দিল, লাগামের রশি টানতে টানতে। “আমার বউ।”

ভয়ে স্কারলেটের চোখ পিটিপিট করে উঠল।

মনে হল দাড়িতে ঢাকা মুখটা নড়ে উঠল। ওর ভয় দেখে লোকটা নিশ্চয়ই হাসছে। “আপনাকে আমি খুন করতে যাচ্ছি না, ম্যা’ম, যদি আপনি এই জন্য ভয় পেয়ে থাকেন! একটাই মাত্র কারণ আছে একজন মহিলাকে খুন করার।”

“কিন্তু তুমি বউকে খুন করেছিলে।”

“আমার ভাইয়ের সঙ্গে শুতো। ভাইটা পালিয়ে গেল। ওকে খুন করেছি বলে আমার কোনও দুঃখ নেই। যে সব মহিলার চরিত্র নেই, তাদের খুন করাই উচিত। এর জন্য একজন মানুষকে জেলে পাঠানোর কোনও অধিকারই আইনের নেই। কিন্তু তাও আমাকে পাঠানো হয়েছিল।”

“জেল থেকে বেরোলে কী করে? পালিয়েছিলে? না তোমাকে ক্ষমা করা হয়েছিল?”

“ক্ষমাই বলতে পারেন।” মোটা ভুরু কোঁচ করল, যেন কথাগুলো গুছিয়ে নিতে অসুবিধে হচ্ছে।

“চৌষট্টি সালের কথা, ওই যেবার শেরম্যান হানা দিল। মিলেজভিল জেলে ছিলাম, তা প্রায় চল্লিশ বছর তো হবেই। ওয়ারডেন সব কয়েদিদের এক জায়গায় ডাকল। বলল, ইয়াঙ্কিরা এসে পড়েছে, আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে, খুন করছে। যদি নিগার বা মহিলাদের থেকেও আমি কাউকে বেশি ঘেন্না করি, তবে সেটা হল ইয়াঙ্কিদের।”

“কেন? তোমার কি – তুমি কি কোনো ইয়াঙ্কিকে জানতে?”

“না, ম্যা’ম। তবে ওদের নিয়ে অনেক কিস্‌সা শুনেছি। শুনেছি ওদের নাকি নিজের চরকায় তেল দেওয়ার অভ্যেসটাই নেই। আর যাদের নিজের চরকায় তেল দেওয়ার অভ্যেস নেই, তাদের আমি ঘেন্না করি। কী করেছে ওরা জর্জিয়াতে? আমাদের নিগারদের ছেড়ে দিয়েছে, আমাদের বাড়ি ঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে, আমাদের পশু পাখি মেরে ফেলেছে! যাই হোক, ওয়ারডেন বললেন সেনাবাহিনীতে আমাদের আরও লোকের খুব দরকার, যারা যারা যোগ দেবে, যুদ্ধের পরে তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে – যদি আমরা বেঁচে ফিরি। কিন্তু আমরা যারা যাবজ্জীবন করছিলাম – আমরা খুনিরা – ওয়ারডেন বললেন সেনাবাহিনী নাকি আমাদের চায় না। আমাদের অন্য কোথাও পাঠানো হবে – অন্য কোনও জেলে। আমি ওয়ারডেনকে বললাম, অন্য যারা যাবজ্জীবন করছে, তাদের অনেককেই আমি পছন্দ করি না। আমার বউকে খুন করার জন্যই আমার যাবজ্জীবন হয়েছে, আর ওকে খুন করার দরকার ছিল। আর বললাম আমি ইয়াঙ্কিদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে চাই। ওয়ারডেন আমার কথা বুঝতে পারলেন, তাই অন্যান্য কয়েদিদের সঙ্গে আমাকেও বের করে দিলেন।”

আর্চি একটু থেমে ঘোঁতঘোঁত করল।

“হুঁহ্‌। বেশ আজব ব্যাপার! খুন করার জন্যই ওরা আমাকে জেলে পুরল, তারপর হাতে একটা বন্দুক ধরিয়ে ছেড়ে দিল, ক্ষমাও করে দিল! কেন? না যাতে আমি আরও খুন করি! হাতে একটা রাইফেল নিয়ে ছাড়া পেয়ে যাওয়াটা খুবই আনন্দের, সন্দেহ নেই। মিলেজভিলের আমরা – জোরদার লড়াই করে অনেককে মেরেছি – আমাদের মধ্যে কয়েকজনও মরেছে। কেউ পালিয়ে গেছিল বলে শুনিনি। আর যখন আত্মসমর্পণ করা হল, তখন আমরা মুক্ত হয়ে গেলাম। একটা পা ছেড়ে আসতে হল, একটা চোখও গেল, তবে আমার দুঃখ নেই।”

“ওহ!”, খুব দুর্বলভাবে স্কারলেট বলল।

শেরম্যানের বাহিনীকে প্রতিরোধ করার জন্য মিলেজভিলের কয়েদিদের মুক্ত করে যে শেষ মরিয়া প্রচেষ্টা হয়েছিল, স্কারলেট সেটা মনে করার চেষ্টা করল। ১৮৬৪’র বড়দিনের সময় ফ্র্যাঙ্ক কিছু একটা বলেছিলেন। কী যেন বলেছিলেন? কিন্তু ওর ঐ সময়ের স্মৃতিটা বড়ই ওলটপালট হয়ে আছে। সেই বিভীষিকাময় আতঙ্কের পরিবেশ, কামানের কানফাটানো আওয়াজ, লাল মাটির ওপর রক্তের রেখা টেনে ওয়াগনগুলোর চলে যাওয়া, হোমগার্ডরা পালিয়ে যাচ্ছে, ফিল মীডের মত কিশোররা আর আঙ্কল হেনরি আর গ্র্যান্ডপা মেরিওয়েদারদের মত বৃদ্ধরা লড়াই করতে যাচ্ছে। আর কয়েদিরাও কুচকাওয়াজ করে যাচ্ছে, কনফেডারেসির অন্তিম প্রহরে, মরবার জন্য, তুষারপাতে আর টেনেসির শেষ অভিযানের সময় শিলাবৃষ্টিতে জমে যাবার জন্য।

এক পলকের জন্য ওর মনে হল এই বুড়ো লোকটা কী বোকা! যে রাষ্ট্র ওর জীবন থেকে চল্লিশটা বছর কেড়ে নিয়েছে, সেই রাষ্ট্রের জন্যই ও লড়াই করতে গেছে। জর্জিয়া এমন একটা অপরাধের জন্য ওর যৌবন আর মধ্য বয়সকে কেড়ে নিয়েছে, যেটা ওর চোখে কোনও অপরাধই নয়! তবুও জর্জিয়াকে ও একটা পা দিয়েছে, একটা চোখ খুইয়েছে। যুদ্ধের শুরুর দিকে রেট তিক্তভাবে যে কথাগুলো বলেছিলেন, স্কারলেটের মনে পড়ে গেল। যে সমাজ ওঁকে একঘরে করেছে, তার জন্য উনি কিছুতেই লড়াই করবেন না। অথচ যখন অবস্থা সঙ্গীন হয়ে পড়ল, উনি সব ভুলে সেই সমাজের জন্যই লড়াই করতে চলে গেলেন। যেমন আর্চি করেছে। ওর মনে হল, দক্ষিণের সব মানুষই – সে উঁচু হোক বা নীচু – ওরা আসলে সবাই আদর্শবাদী আহম্মক। ওরা কিছু অর্থহীন আবেগের জন্য নিজের জীবনের পরোয়াও করে না।

আর্চির গাঁঠে ভরা হাতদুটোর দিকে তাকাল স্কারলেট, পিস্তলদুটো আর ছুরিটার দিকেও। ওর আবারও ভয় করতে লাগল। আর্চির মত কত না খুনি, মস্তান, চোর কনফেডারেসির স্বার্থে ছাড়া পেয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে, কে জানে? রাস্তায় এরকম নাম না জানা কত লোক ঘুরে বেড়াচ্ছে, যারা কিনা আসলে খুনি! ফ্র্যাঙ্ক একবারও যদি আর্চির আসল রূপটা জানতে পারেন, তাহলে তো শোরগোল বেঁধে যাবে। আন্ট পিটি জানতে পারলে? আতঙ্কেই পিটি মরে যাবেন! আর মেলানি? স্কারলেটের খুব ইচ্ছে হচ্ছিল মেলানিকে আর্চির সত্যিটা বলে দেয়। ঠিক হবে তাহলে! যেখান সেখান থেকে জঞ্জাল তুলে এনে বন্ধুবান্ধব আর আত্মীয়স্বজনদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া বেরিয়ে যাবে!

“আমি – তুমি সব খুলে বললে, আর্চি – আমি খুব খুশি হয়েছি। আমি কারুকে বলব না। মিসেজ় উইল্কস বা অন্যান্য মহিলারা জানতে পারলে খুবই আঘাত পাবেন।”

“হুঁহ্‌। মিজ় উইল্কস জানেন। যে রাতে উনি আমাকে সেলারে শুতে দিলেন, আমি তখনই ওঁকে সব বলে দিয়েছি। ওঁর মত এমন একজন মহান লেডিকে কিছু না জানিয়েই ওঁর কাছে আশ্রয় নেব, সেটা কী করে ভাবলেন?”

“হে ভগবান রক্ষে কর!” হতবুদ্ধি হয়ে স্কারলেট চেঁচিয়ে উঠল।

লোকটা যে একজন খুনি – একজন মহিলাকে খুন করেছে – সেটা জেনেও মেলানি ওকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়নি। নিজের ছেলেকে ওর হাতে নিশ্চিন্তমনে ছেড়ে দেয় যেমন আন্টির কাছে, স্কারলেটের কাছে বা বন্ধুদের কাছে ছেড়ে দেয়! আর মেলানি কিনা ভিতুর ডিম একটা মেয়ে, তাও লোকটার সঙ্গে বাড়িতে একা থাকতে ওর ভয় করে না!

“মিজ় উইল্কস খুব সমঝদার মানুষ, মহিলা হলেও। উনি বুঝতে পেরেছেন আমি সত্যি কথা বলেছি। উনি বোঝেন যে মিথ্যেবাদীরা সব সময় মিথ্যে কথা বলে, চোর চুরিই করে চলে, কিন্তু খুন মানুষ জীবনে একবারই করে। উনি এটাও বোঝেন, কনফেডারেসির জন্য যে লড়াই করেছে সে আগে কোনও খারাপ কাজ করে থাকলেও এখন সেটা ধুয়েমুছে সাফ হয়ে গেছে। তবে … বউকে খুন করে আমি যে কিছু খারাপ কাজ করেছি – সেটা আমি মনে করি না। হ্যাঁ, মিজ় উইল্কস খুবই সমঝদার, মহিলা হলেও … আর বলে রাখছি – যেদিন আপনি কয়েদিদের লীজ় নেবেন, আপনার কাজ ছেড়ে দেব।”

মুখে কিছু বলল না স্কারলেট, কিন্তু মনে মনে ভাবল, “যত তাড়াতাড়ি তুমি বিদেয় হও, ততই মঙ্গল। খুনি কোথাকার!”

মেলানি কী করে পারল – কী করে – যাহোক, মেলানির এই কাজের কোনও জবাব নেই – এই গুণ্ডাকে ঘরে তোলা – আর ও যে জেলঘুঘু – সেটা বন্ধুদের জানানোর দরকারই মনে করল না! সেনাবাহিনীতে কাজ করল আর অতীতের সব পাপ ধুয়ে মুছে গেল! ভালমানুষি দেখাতে গিয়ে মেলানি ভাল মন্দ গুলিয়ে ফেলেছে! অবশ্য মেলি কনফেডারেসি, প্রাক্তন সেনা, আর এদের সম্পর্কিত যে কোনো ব্যাপারেই একেবারে অন্ধ। স্কারলেট মনে মনে ইয়াঙ্কিদের গালি দিল, আর ওদের বিরুদ্ধে ওর তিক্ততার মাত্রা আরও এককাঠি ওপরে উঠে গেল। ওদের জন্যই তো আজ মেয়েদের নিরাপত্তার জন্য খুনিকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরতে হচ্ছে!

******

আর্চির সঙ্গে শীতের বিকেলে বাড়ি ফেরার পথে স্কারলেট ‘গার্ল অফ পিরিয়ড’ সেলুনের বাইরে দেখল বেশ অনেক জিন চড়ানো ঘোড়া, বগিগাড়ি আর ওয়াগন ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে। অ্যাশলে ওর ঘোড়ার ওপর বসে আছে, চোখেমুখে ক্লান্ত অথচ সচকিত ভাব; সিমন্স ভাইয়েরা ওদের বগি থেকে ঝুঁকে পড়ে ইশারায় কিছু বোঝানোর চেষ্টা করছে; হিউ এলসিংয়ের সোনালি চুল চোখের ওপর এসে পড়েছে, ও হাত নাড়ছে। গ্র্যান্ডপা মেরিওয়েদারের পাই-ওয়াগন এই জটলার একেবারে মধ্যিখানে। আরও একটু কাছে আসতেই স্কারলেট দেখতে পেল টনি ওয়েলবার্ন আর আঙ্কল হেনরিও ওঁর পাশেই গাদাগাদি করে বসে আছেন।

“আঙ্কল হেনরি,” স্কারলেট একটু চিন্তিতভাবে ভাবল, “যেন গাড়িতে এমন বিদঘুটে ভাবে বসে বাড়ি ফেরার চেষ্টা না করেন। কেউ দেখতে পেলে ভারি লজ্জার ব্যাপার হবে। যেন ওঁর নিজের কোনও ঘোড়া নেই। আসলে কাজটা এই জন্য করেন যাতে প্রতি রাতে উনি গ্র্যান্ডপার সঙ্গে একসাথে সেলুনে যেতে পারেন।”

ভিড়ের কাছাকাছি পৌঁছতেই জনতার উত্তেজনার রেশ ওর মধ্যেও সঞ্চারিত হল। যদিও খুব একটা অনুভূতিপ্রবণ স্কারলেট নয়, তবুও ওর ভেতরটাও কেঁপে গেল।

“ওহো!” স্কারলেট ভাবল। “নতুন কাউকে ধর্ষণ করা হয়নি, আশা করি! কু ক্লুক্স আর একটাও ডার্কিকে খুন করলে ইয়াঙ্কিরা আমাদের নিশ্চিহ্ন করে দেবে একেবারে!” তারপর আর্চিকে বলল, “দাঁড়াও একটু। কিছু একটা ঝামেলা হয়েছে।”

“কোনও সেলুনের বাইরে আপনি দাঁড়াতে পারেন না,” আর্চি বলে উঠল।

“কী বললাম, শুনতে পেলে না? গাড়ি দাঁড় করাও। শুভ সন্ধ্যা, সবাইকে। অ্যাশলে – আঙ্কল হেনরি – নতুন কোনও ঝামেলা হয়েছে নাকি? আপনাদের কেমন যেন – ”

জনতা ওর দিকে ফিরে তাকাল, টুপি নামিয়ে, হাসল, কিন্তু ওদের চোখেমুখে খুব উত্তেজনার ছাপ।

“কোনো কিছু ঠিক আবার কোনো কিছু ভুল,” আঙ্কল হেনরি খেঁকিয়ে উঠলেন। “কী চোখে তুমি দেখবে, তার ওপর নির্ভর করে। আমি যতটুকু বুঝেছি, আইনসভার অন্য কিছু করার ছিল না।”

ওহ্‌ আইনসভা? স্কারলেট একটু স্বস্তির নিঃশাস ফেলল। এই আইনসভা নিয়ে ওর কোনই মাথাব্যথা নেই। ওরা যাই করুক না কেন, স্কারলেটের কোনও সমস্যা হবে না। ইয়াঙ্কি সৈন্যদের তাণ্ডব হতে পারে ভেবে ও ঘাবড়ে গেছিল।

“কী করতে চাইছে আইনসভা?”

“সংশোধনটার আনুষ্ঠানিক মান্যতা দিতে ওরা সরাসরি অস্বীকার করেছে,” গ্র্যান্ডপা মেরিওয়েদার বললেন। গলার স্বরে গর্বের ছোঁয়া। “খুব শিক্ষা হবে ইয়াঙ্কিদের।”

“বরং এর মূল্য চোকাতে আমাদের জান কয়লা হয়ে যাবে – কিছু মনে কোরো না, স্কারলেট,” অ্যাশলে বলল।

“ওহ্‌, সংশোধন নিয়ে ব্যাপার?” স্কারলেট জিগ্যেস করল। নিজেকে একটু স্মার্ট দেখানোর চেষ্টা।

রাজনীতি ব্যাপারটা স্কারলেট একেবারেই বোঝে না, আর তা নিয়ে মাথা ঘামিয়ে সময় নষ্টও করে না। কী যেন একটা তেরো নম্বর সংশোধন নাকি ওটা ষোলো নম্বর হবে, কিছুদিন আগে মান্যতা পেয়েছিল, কিন্তু এই মান্যতা পাওয়ার ব্যাপারটা কী সেই ব্যাপারে ওর কোনও ধারণাই নেই। পুরুষমানুষরা সর্বদা এই সব জিনিস নিয়ে খুব উত্তেজিত হয়ে পড়ে। ওর এই না বোঝার ব্যাপারটা হাবভাব দেখে বোঝা যাচ্ছিল। অ্যাশলে হেসে ফেলল।

“ওই ডার্কিদের ভোট দেওয়ার অধিকার দেওয়া নিয়ে যে সংশোধনীটা,” ও ব্যাখ্যা করে বলল। “আইনসভায় ওটা পেশ করা হয়েছিল। ওরা ওটাকে মান্যতা দিতে অস্বীকার করেছে।”

“কী বোকার মত কাজ! ইয়াঙ্কিরা মোটেই অত সহজে ছেড়ে দেবে না!”

“সেই জন্যই বললাম এর মূল্য চোকাতে আমাদের জান কয়লা হয়ে যাবে,” বলল অ্যাশলে।

“আইনসভাকে নিয়ে আমার গর্ব হয়, আমি ওদের সাহসের তারিফ করি!” আঙ্কল হেনরি চেঁচিয়ে উঠলেন। “ইয়াঙ্কিরা অত সহজে বাজিমাত করতে পারবে না। আমরা কিছুতেই সেটা করতে দেব না।”

“ওরা পারবে, আর করেই ছাড়বে,” শান্তস্বরে বলল অ্যাশলে, কিন্তু ওর চোখে অশান্তি। “আর তখন আমাদের জন্য পরিস্থিতি আরও ঘোরালো হয়ে উঠবে।”

“না, অ্যাশলে, সেটা নিশ্চয়ই হবে না! পরিস্থিতি এখনকার চেয়ে আর কত ঘোরালো হতে পারে?”

“হ্যাঁ, হতেই পারে ঘোরালো, এখনকার থেকেও খারাপ। ধরা যাক ডার্কিরা হল আইনসভার সদস্য! একজন ডার্কি গভর্নর হল! ধরা যাক, এখনকার থেকেও খারাপ মিলিটারি শাসন চাপিয়ে দেওয়া হল!”

পরিস্থিতি খানিকটা স্কারলেটের বোধগম্য হল। আতঙ্কে ওর চোখ বড় বড় হয়ে উঠল।

“কোন পথ নিলে জর্জিয়ার মঙ্গল, আমাদের সকলের মঙ্গল, সেটাই ভেবে যাচ্ছি আমি,” অ্যাশলের মুখ থমথমে। “আইনসভা যেভাবে লড়ে গেল, আমাদের কি সেই পথ নেওয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে – পুরো উত্তর আমাদের বিপক্ষে চলে যাবে আর ইয়াঙ্কি সেনাবাহিনী লেলিয়ে দিয়ে ডার্কি ভোট আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে – আমরা চাই বা না চাই? নাকি, জোর করে আত্মমর্যাদা শিকেয় তুলে রেখে আত্মসমর্পণ করে দেওয়া যাতে ব্যাপারটা সহজেই মিটে যায়? যে পথই নেওয়া হোক শেষ পর্যন্ত ফল তো একই হবে। আমরা অসহায়। যে তেতো পাঁচন ওরা আমাদের গেলাতে চাইবে, সে তো আমাদের গিলতেই হবে। মেনে নিলে হয়ত মারটা পড়বে না।”

এত কথা স্কারলেটের কানেই ঢুকল না, আর কথাগুলোর তাৎপর্যও ওর মাথার ওপর দিয়েই বেরিয়ে গেল। শুধু এইটুকু বুঝল, স্বভাবমত, অ্যাশলে সমস্যার দুটো দিকই তলিয়ে দেখতে চাইছে। ও কেবল একটা দিকই দেখতে পারছে – এই যে ইয়াঙ্কিরা সপাটে একটা চড় খেল, তাতে ওর ওপর কী প্রভাব পড়বে।

“তার মানে রাতারাতি র‍্যাডিক্যাল বনে গিয়ে রিপাবলিকানকে ভোট দেওয়া, অ্যাশলে?” গ্র্যান্ডপা মেরিওয়েদার শ্লেষের সঙ্গে বললেন। গলার স্বরে রুক্ষতা।

টানটান নীরবতা। স্কারলেট দেখল আর্চির হাত খুব ক্ষিপ্রতার সঙ্গে পিস্তলের দিকে এগোলো, তারপর থেমে গেল। আর্চির মতে, আর যেটা ও ঢাক পিটিয়ে বলেও থাকে, গ্র্যান্ডপা হলেন চুপসে যাওয়া পুরোনো একটা বেলুন। আর মিস মেলানির স্বামীকে কেউ অপমান করলে, সেটা ও কোনোমতেই বরদাস্ত করবে না, এমনকি মিস মেলানির স্বামী যদি বোকার মত কথা বলে থাকেন, তাহলেও।

সহসা অ্যাশলের চোখ থেকে হতবুদ্ধিতার ভাব কেটে গিয়ে ক্রোধে জ্বলে উঠল। তবে ও কিছু বলে ওঠার আগেই আঙ্কল হেনরি গ্র্যান্ডপাকে শাসালেন।

“হতচ্ছাড়া – শয়তান – আমাকে ক্ষমা কোরো, স্কারলেট – নিরেট, মূর্খ কোথাকার – খবরদার অ্যাশলের সম্বন্ধ এরকম কথা উচ্চারণ করবেন না, গ্র্যান্ডপা!”

“অ্যাশলে নিজের খেয়াল নিজেই রাখতে পারে। ওর পক্ষ নিয়ে তোমার লড়াই না করলেও চলবে,” খুব শীতলস্বরে কথাটা বললেন গ্র্যান্ডপা। “ও তো স্ক্যালাওয়াগদের মত কথা বলছে। আত্মসমর্পণ কর! নিকুচি করেছে! কিছু মনে কোরো না, স্কারলেট।”

“দেশভাগ আমি চাইনি,” অ্যাশলে বলল, প্রচণ্ড ক্রোধে ওর গলা কাঁপছে। “তবুও জর্জিয়া যখন আলাদা হয়ে গেল, আমি মেনে নিয়েছিলাম। যুদ্ধেও আমার বিশ্বাস ছিল না, তবুও আমি লড়াই করেছি। আমি ইয়াঙ্কিদের আরও চটিয়ে দেওয়ার পক্ষেও নই, এখনই যথেষ্ট খেপে আছে ওরা। কিন্তু আইনসভা যদি তাই চায়, তাহলে আমি আইনসভার পাশেই থাকব। আমি – ”

“আর্চি,” কথার মাঝখানেই আঙ্কল হেনরি বলে উঠলেন, “স্কারলেটকে বাড়ি নিয়ে যাও। এখানে ওর থাকাটা ঠিক নয়। রাজনীতি মহিলাদের মাথা ঘামানোর বিষয় নয়, তার ওপরে, একটু পরেই গালিগালাজ শুরু হয়ে যাবে। গাড়ি চালাও, আর্চি। শুভ রাত্রি, স্কারলেট।”

পীচট্রী স্ট্রীট দিয়ে যাবার সময়, ভয়ে স্কারলেটের বুক ঢিপঢিপ করতে লাগল। আইনসভা যে বোকার মত এই কাজটা করল, এতে কী কোনওভাবে ওর নিরাপত্তা নিয়ে টানাটানি পড়বে? ইয়াঙ্কিরা কি এতই ক্ষেপে যাবে যে ওর মিলগুলো হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে?

“তা বেশ,” আর্চি গুড়গুড় করে বলে উঠল। “শিকারি কুকুরের মুখের ওপর খরগোশের থুতু ছিটিয়ে দেবার গল্পই শুনে এসেছি এতদিন, তবে এবার দেখতে পেলাম। আইনসভার লোকগুলো গর্জন করে বলে উঠতেই পারে, ‘জয়, জেফ ডেভিসের জয়, জয় দক্ষিণের কনফেডারেসির জয়’! ওরাও স্বস্তি পাবে, আমরাও! ওই নিগার-প্রেমী ইয়াঙ্কিরা উঠেপড়ে লেগেছে নিগারদের আমাদের হর্তাকর্তা বানানোর জন্য! কিন্তু আইনসভার লোকদের সাহসের তারিফ করতেই হয়!”

“তারিফ করতে হবে? যত সব অলক্ষুণে কথা! তারিফ করব ওদের? গুলি করে মারা উচিত ওদের! এর ফলে ইয়াঙ্কিরা টুপ করে নেমে এসে আমাদের ওপর চড়াও হবে। কেন – কেন ওরা ওটাকে মন – মান – কী যেন – যেটা ওদের করার কথা ছিল – করে ইয়াঙ্কিদের মানিয়ে নিল না? উলটে ওদের খেপিয়ে তোলার কী দরকার ছিল? সেই তো ওরা আমাদের পায়ের তলায় দাবিয়ে রাখবে, সেটা এখনই হোক বা পরে।”

আর্চি স্কারলেটের পানে শীতল দৃষ্টি হানল।

“পায়ের তলায় দাবিয়ে রাখবে? বিনা যুদ্ধেই? ছাগলদেরও যেটুকু গর্ববোধ থাকে, মেয়েদের সেটুকুও থাকে না!”

******

স্কারলেট যেই দশজন কয়েদির লীজ় নিল – একেকটা মিলের জন্য পাঁচজন করে – আর্চিও ওর হুমকি মত ওর সঙ্গে সব সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করে ফেলল। মেলানির শত অনুরোধ উপরোধ সত্ত্বেও, ফ্র্যাঙ্কের মাইনে বাড়িয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখানো সত্ত্বেও, স্কারলেটের গাড়ি জুততে ওকে রাজি করানো গেল না। মেলানি, পিটি আর ইন্ডিয়াকে বা ওদের বন্ধুবান্ধবদের স্বেচ্ছায় শহরে বা তার আশেপাশে ঘোরাতে নিয়ে যেত। তবে গাড়িতে যদি স্কারলেটও থাকত, তাহলে অন্য মহিলাদের জন্যেও গাড়ি চালাতে ও অস্বীকার করে দিত। ব্যাপারটা খুবই অস্বস্তিকর। বুড়ো মস্তানটা স্কারলেটের কৃতকর্মের বিচার করতে বসেছে! এর চেয়েও যেটা বেশি অস্বস্তিকর সেটা হল স্কারলেটের পরিবারের লোকজন, আর ওর বন্ধুবান্ধবরা সবাই বুড়ো লোকটারই পক্ষে।

ফ্র্যাঙ্ক স্কারলেটকে এই পদক্ষেপ নেওয়া থেকে নিরস্ত করেছিলেন। প্রথমদিকে, অ্যাশলেও কয়েদিদের দিয়ে কাজ করাতে রাজি ছিল না, তবে অনিচ্ছাসত্ত্বেও শেষে রাজি হল। অবশ্য অনেক কান্নাকাটি, মিনতি আর সময় একটু ভাল হলেই আবারও স্বাধীন নিগারদেরই ভাড়া করা হবে, এই প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে। প্রতিবেশীরাও এই নিয়োগের বিরুদ্ধে এমন সোচ্চার আর সরব হয়ে উঠলেন যে ফ্র্যাঙ্ক, পিটি আর মেলানির পক্ষে মাথা উঁচু করে রাখাটা মুশকিল হয়ে পড়ল। এমনকি পিটার আর ম্যামিও বলে দিল কয়েদিদের দিয়ে কাজ করানো দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার। এর থেকে কোনও মঙ্গল হওয়ার নয়। সবাই বলল যে অন্যের দুর্দশা আর ভাগ্যহীনতার ফায়দা ওঠানো মোটেই ঠিক কাজ নয়।

“অথচ ক্রীতদাসদের দিয়ে কাজ করানোয় তোমাদের আপত্তি ছিল না!” ক্রুদ্ধস্বরে স্কারলেট চেঁচিয়ে উঠল।

মানছি, তবে সেটা তো অন্য রকম ব্যাপার ছিল। ক্রীতদাসরা কেউই দুর্দশাগ্রস্ত ছিল না, বা দুর্ভাগা ছিল না। মুক্তি পাওয়ার পর নিগ্রোরা যেমন আছে, ক্রীতদাস হিসেবে ওরা তার থেকে অনেক ভাল ছিল। যদি বিশ্বাস না হয়, নিজের চারদিকে তাকিয়ে দেখ, তাহলেই বুঝতে পারবে! কিন্তু যতই স্কারলেট এই ধরণের বিরোধের সম্মুখীন হয়, ততই স্কারলেটের সঙ্কল্প দৃঢ়তর হতে থাকে। হিউয়ের হাত থেকে মিল পরিচালনার দায়িত্ব সরিয়ে নিয়ে ওকে চেরাই কাঠের ওয়াগন চালানোর কাজে লাগিয়ে দেয়। আর জনি গ্যালাঘারের সাথে কথাবার্তা পাকাপাকি করে নেয়।

জনিই ওর জানা একমাত্র লোক, কয়েদিদের কাজে লাগানোর ব্যাপারে যার পূর্ণ সমর্থন ছিল। ওর বুলেটের মত মাথাটা সামান্য নাড়ল আর বলল যে এটা খুবই চতুর পদক্ষেপ। স্কারলেট ধনুকের মত বাঁকানো পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়ানো প্রাক্তন জকি’র ইস্পাতকঠিন মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবল, “ওকে যারা নিজেদের ঘোড়ায় চড়তে দেয়, তারা ঘোড়ার ভালমন্দ নিয়ে মোটেই চিন্তা করে না। আমার কোনও ঘোড়ার দশ ফুট দূরেও ওকে ঘেঁষতে দিচ্ছি না।”

অথচ কয়েদিদের ওর হাতে ছেড়ে দিতে ওর বিবেকে বাঁধল না।

“কয়েদিদের কাজ করানোর ব্যাপারে আমার পুরো স্বাধীনতা থাকবে?” লোকটা জিগ্যেস করল। ধূসর হিমশীতল দৃষ্টি।

“হ্যাঁ, পুরো স্বাধীনতা। আমি চাইব শুধু মিল সচল থাকুক আর যেমন যেমন দরকার পড়বে চেরাই কাঠ যেন যোগান দেওয়া যায়, আর যে পরিমাণ চাইব সেটা যেন পাই।”

“আমি আছি আপনার সঙ্গে,” জনি বলল। “মিস্টার ওয়েলবার্নকে জানিয়ে দিচ্ছি যে আমি ইস্তফা দেব।”

লোকটা রাজমিস্ত্রী, ছুতোর আর জোগাড়েদের ভিড়ে মিলিয়ে যেতে যেতে স্কারলেটের মনটা উৎফুল্ল হয়ে উঠল, নিশ্চিন্তবোধ করল।

জনি সত্যি সত্যি ওর মনের মত লোক। কড়া ধাতের মানুষ, কোনও রকম ধানাই পানাই পছন্দ করে না। “এক উদ্ধত আইরিশ আস্তাকুঁড়বাসী”, অত্যন্ত ঘৃণার সঙ্গে ফ্র্যাঙ্ক ওর সম্বন্ধে এই কথা বলতেন। অথচ স্কারলেটের কাছে ওর মূল্য ঠিক এই কারণেই। স্কারলেট জানে যে উচ্চাকাঙ্খা সম্পন্ন একজন দৃঢ়সঙ্কল্প আইরিশম্যানকে পাওয়া খুব ভাগ্যের ব্যাপার, আর যাই দোষ থাকুক না কেন ওর চরিত্রে। নিজের বেরাদরির মানুষজনের থেকেও এই লোকটার সঙ্গেই স্কারলেট অনেক বেশি একাত্মবোধ করে, কারণ জনি টাকার মূল্য বোঝে।

মিলের পরিচালনার ভার বুঝে নেওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই জনি যে ওকে নিরাশ করবে না সেটা স্কারলেট বুঝে গেল। পাঁচজন কয়েদিদের কাছে থেকে এত কাজ আদায় করে ফেলল যেটা হিউ দশজন স্বাধীন নিগ্রোদের দিয়ে কখনওই করাতে পারেনি। তাছাড়া গত বছর অ্যাটলান্টা আসার পর থেকে এই প্রথম আগের চেয়ে বেশি অবসর যাপন করার সুযোগ পাচ্ছে। কারণ মিলে স্কারলেটের উপস্থিতি জনির মোটেই পছন্দ নয়, আর সেটা ও খোলাখুলি বলেও দিয়েছে।

“আপনি মাল বিক্রি বাড়ানোর ব্যাপারে মনযোগ দিন আর আমাকে মাল চেরাই করার কাজে মন দিতে দিন,” জনি বলে দিল। “কয়েদিদের মধ্যে একজন লেডির থাকার জায়গা নয়, আর একমাত্র জনি গ্যালাঘার যে কথাটা আপনাকে এখন বলছে, আর কেউ বলবে না। আমি আপনাকে চেরাই কাঠের যোগান দিয়ে যাচ্ছি, ঠিক কিনা? আমি চাই না মিস্টার উইল্কসকে আপনি যেমন ঠেলা দিতে থাকেন, সেরকম আমাকেও দেবেন। মিস্টার উইল্কসকে ঠেলা দেওয়ার দরকার আছে, আমাকে নেই।”

অতএব, অনিচ্ছাসত্ত্বেও স্কারলেট জনির মিলে বড় একটা যেত না। আশঙ্কা করত, বেশি বেশি গেলে জনি কাজ ছেড়ে দেবে, আর সর্বনাশ হয়ে যাবে। অ্যাশলেকে ঠেলা দিতে হয়, জনির এই মন্তব্য ওর আঁতে লাগল। যদিও ও জানে কথাটা মিথ্যে নয়, তবু সেটা পুরোপুরি স্বীকার করে নিতে ওর ভাল লাগে না। মুক্ত শ্রমিকদের দিয়ে যতটা কাজ অ্যাশলে ওঠাতে পারত, কয়েদিদের দিয়ে তার থেকে সামান্য বেশি কাজ ওঠাতে পারছে। অবশ্য এটা কীভাবে সম্ভব হল, সেটা অ্যাশলে বলতে পারে না। তার ওপরে, ওকে দেখে মনে হয়, কয়েদিদের দিয়ে কাজ করাতে ওর লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে। স্কারলেটকেও ওর বিশেষ কিছু বলার থাকে না।

অ্যাশলের মধ্যে যে পরিবর্তনটা এসেছে, সেটা লক্ষ্য করেও স্কারলেট একটু চিন্তায় পড়ে যায়। মাথার চুলে পাক ধরেছে। ক্লান্তিতে কাঁধ ঝুঁকে পড়েছে। হাসতেও আজকাল তেমন দেখা যায় না। ঝকঝকে চেহারার যে অ্যাশলেকে বহু বছর আগে ওর ভাল লেগে গেছিল, তাকে আর খুঁজেই পাওয়া যায় না। দেখে মনে হয় কোনও গোপন যন্ত্রণা নীরবে সহ্য করে চলেছে। গোমড়া হয়ে থাকে, যেটা দেখে স্কারলেটের মনে কষ্ট হয়। ইচ্ছে হয় ওর মাথাটা জোর করে টেনে এনে নিজের কাঁধের ওপর রাখে। পাকধরা চুলে হাত বুলিয়ে দিয়ে কেঁদে কেঁদে বলে, “তুমি একবারের জন্য আমাকে বল, কী নিয়ে তোমাকে এত ভাবাচ্ছে! আমি তোমার ভাবনা কমিয়ে দেব! তোমার যাতে মঙ্গল হয় সেটা দেখব!”

কিন্তু অ্যাশলে সব সময় ওর সঙ্গে একটা নিয়মনিষ্ঠ দূরত্ব বজায় রেখেই চলে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ