দেবতোষ দাশের গল্প : প্রতিবাদ ও একটি রোঁয়া-ওঠা কম্বল


স্টেশন থেকে বেরিয়ে ঋজু রিকশা স্ট্যান্ডে এসে দাঁড়াতেই ঘটনাটা ঘটল। অপেক্ষমাণ লাইনকে অগ্রাহ্য করে একটা লোক চড়ে বসল রিক্সায়। চালচলনে স্পষ্ট রোয়াব। রিকশাচালক লাইনে অপেক্ষারত প্রথমজনের মুখের দিকে ভ্যাবাচাকা দৃষ্টি দিয়ে মোটরের চাবি ঘোরান। সারির শুরুতেই মাঝবয়সী এক মহিলা। গজগজ করেন তিনি। বাকিরা চুপ। পিছন থেকে ঋজু চিৎকার করে ওঠে, ‘লাইন আছে ভাই, দেখতে পাচ্ছেন না!’ এতক্ষণ যারা চুপ ছিলেন, ঋজুর চিৎকারে তাঁদের কয়েকজন বল পান এবং চিৎকার করেন। রিকশা চালু করেন না চালক মানে করতে পারেন না। ইতস্তত করেন। সওয়ারী লোকটা ঘাড় ঘুরিয়ে লাইনের দিকে তাকায়।

ঋজু খানিকটা এগিয়ে এসে বলে, ‘নামুন, নামুন!’ লোকটা কিছু বলতে চাইলে ঋজু ডানহাতের তর্জনী উঁচিয়ে তাকে বলে, ‘লাইনের শেষে গিয়ে দাঁড়ান!’ তারপর দণ্ডায়মান প্রথমজনকে বলে, ‘ম্যাডাম, আপনি উঠুন!’ তারপরেও লোকটা রিকশা থেকে নামে না। লাইন ছেড়ে এগিয়ে আসে ঋজু। রিকশার পাশে গিয়ে লোকটাকে বলে, ‘কী ব্যাপার, লাইন আছে আপনি দেখতে পাচ্ছেন না! নামুন, নামুন! গেট ডাউন!’ রিকশাচালক বিব্রত। যাত্রী লোকটির মুখ মুহূর্তে থমথমে। ঋজুকে বলে,

‘দাদার বাইকটা এস্টাট নিচ্ছে না, ওই যে ওখানে দাঁড়িয়ে আছে –’ তর্জনী তুলে দেখায় দূরে, আবার বলে, ‘তাড়া আছে দাদার!’

তর্জনী-নির্দিষ্ট দিকে একবার চেয়ে ঋজুর ঠান্ডা স্বর, ‘ঠিক আছে, লাইনে দাঁড়ান, তাড়া সকলের আছে। ম্যাডাম উঠুন!’

লোকটা রিকশা থেকে নেমে লাইনে না-দাঁড়িয়ে চলে যায় তার ‘দাদা’র দিকে। এলাকার দাপুটে ব্যবসায়ী ও প্রোমোটার শম্ভু চ্যাটার্জি, সামান্য তফাতে, দাঁড়িয়ে আছে রিকশার অপেক্ষায়। আশেপাশে ঘুরঘুর করছে আরও দু’একজন সহচর। তবে সর্বক্ষণের সঙ্গী বাইক আজ নেই। লাইনে দাঁড়িয়ে লোকটার গতিবিধির ওপর নজর রাখে ঋজু। পরবর্তী নজরদারীর প্রয়োজন পড়ত না, আর পাঁচটা অকিঞ্চিৎকর ঘটনার মতো হয়তো ভুলেই যেত, কিন্তু শম্ভু চ্যাটার্জি নামটার জন্য ভুলে যেতে পারে না। লোকটা কাছে গিয়ে কিছু বলে, বিরক্তি প্রকাশ করে শম্ভু, দু’জন সহচর স্ট্যান্ডের দিকে এগিয়ে আসে। ওদের পিছনে আগের লোকটা। ঋজু বোঝে, তার দিকেই এগিয়ে আসছে ওরা।

রিকশা ঢুকছে এক-এক করে, অপেক্ষমাণ যাত্রীরা উঠে পড়ছেন এক-একটা রিকশায়। লাইন এগোয়। নিজেকে সংহত করে ঋজু এগোয় লাইনের সঙ্গে সঙ্গে।

‘কী ব্যাপার দাদা, কেউ মুখ ফুটে কিছু বলল না, আপনার ফাটছে কেন?’
শম্ভুর এক সঙ্গী ঋজুকে বলে। সরাসরি। ‘আমার একার নয়, সকলের ফেটেছে! আপনি লাইনে থাকলে আপনারও ফাটত!’ মৃদু হেসে বলে ঋজু। লাইনের কয়েকজনও হাসেন।

প্রতিপত্তি আর যাই হোক, অবজ্ঞা সহ্য করতে পারে না। মুখখিস্তি করে এক সঙ্গী। মারমুখী। তাকে ঠেলে সরায় আরেকজন। লাইন থেকে বেরোয় ঋজু। ডানহাতের মধ্যমা আর বুড়ো আঙুলে তুড়ি দিয়ে বলে, ‘এই চল ফোট, আর একটা কথা বললে থানায় ফোন করব! চল, চল!’

ট্রেন-ভাঙা যাত্রী আর দোকান-বাজার করতে আসা পথচলতি মানুষ মিলে স্টেশন চত্বরে সন্ধ্যায় একটা গতিময়তা তৈরি হয়। উদ্ভূত উত্তেজনায় সেই গতিময়তা রুদ্ধ হয় সাময়িক। ঋজুর পাল্টা আক্রমণ উপস্থিত জনতাকে সোচ্চার করে। প্রায় হাতাহাতি লেগে যায় শম্ভুর এক সাকরেদের সঙ্গে ঘটনাস্থলে উপস্থিত দুই মাথাগরম-পথচারীর। ঋজু ও আরও দু’একজন কোনোক্রমে মারামারি আটকায়। অত্যন্ত অপমানিত হয়ে তিন সাকরেদ কথা না-বাড়িয়ে এলাকা ছাড়ে। সামান্য ফোনাফুনি শেষে, এক স্যাঙাত বাইকে চেপে হাজির, হঠাৎ-আবির্ভূত সেই বাইকে চেপে শম্ভু চ্যাটার্জিও তার গন্তব্যের দিকে ক্রমশ অদৃশ্য।

আরাম পায় ঋজু। সমবেত জনতাও। প্রতাপের সামনে দাঁড়িয়ে পাল্টা হিম্মত, আরাম দেয়। পালা আসে ঋজুর। রিক্সায় চড়ে। চালক গতি তুলতেই টের পায় বাতাসে হিম। জড়সড় হয়ে বসে। কিছুদূর যেতেই মনে পড়ে মেয়ের জন্য কমলালেবু বা কলা, কোনও ফলপাকড়াই কেন হল না। ফালতু ঝামেলায় পড়ে ভুলে গেল সব। রাস্তার গাড্ডা, জ্যাম এড়িয়ে মোটর-চালিত রিকশা যেন উড়িয়ে নিয়ে যাবে গন্তব্যে। সদ্য ঘটে-যাওয়া ঘটনাপ্রবাহ মাথার ভিতরে ছবির পর ছবি হয়ে ফিরে আসে, দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঋজু। শ্বাসের সঙ্গে অস্ফুটে বেরিয়ে যায় গালাগাল। খিস্তি দিয়েও খুব আরাম হয়। ঋজু বুঝতে পারে, শরীর একটা কাথারসিস চাইছিল।

রিকশাচালক শুনতে পেলেন কিনা কে জানে, তিনি বলে উঠলেন, ‘অঘ্রাণের আর দু’দিন আছে, এখন এত জল হলি, ধানের কী থাকে! কেটে মাঠেই ফেলা আছে, জল হলি সেই ভেজা ধান থেকে কত্‌টুকুন চাল পাব! কেবল ধান তো নয়, কিছু সবজি করিচি, পোকা লেগে যাবে!’

চোখ উঁচিয়ে আকাশের দিকে তাকায় ঋজু। মেঘে-মেঘে ছয়লাপ। আবার কি নিম্নচাপের পালা? অন্যদিন হলে রিকশাচালকের ধান-চালের কথার সূত্র ধরেই চলে যেত বাকি পথ, কিন্তু আজ কথার পরে আর কথা সাজাতে ইচ্ছে করছে না, মাথায় চারিয়ে যাচ্ছে আলতো একটা উত্তেজনা। আরাম হচ্ছে বটে, আরামের সঙ্গী হিসেবে উৎকণ্ঠাও যে পায়ের পাতা থেকে মাথার দিকে ক্রমে উঠে আসছে না, হলফ করে বলতে পারছে কই! প্রতিহিংসার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে, অত সহজে কি ঝামেলা মিটিয়ে ফেলবে শম্ভু চ্যাটার্জি ও তার দলবল? মাথার ভিতর বিজবিজে একটা টেনশন নিয়ে বসে থাকে রিকশায়। মাথার ওপর ঝড়-জলের সম্ভাবনাময় আকাশ নিয়ে গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যান রিকশাচালক।

দুই.
হাত-পা ধুয়ে ট্রাউজার্স আর টি-শার্টের ওপর একটা পাতলা চাদর জড়িয়ে সোফায় বসে। টিভির খবরের চ্যানেলগুলো পাল্টে-পাল্টে দেখে। কাজের মাসি মুড়ি-মাখা আর কফি দিয়ে যান। শালুক এসে বসে বাবাইয়ের গা ঘেঁষে। মেয়েকে ডান হাত দিয়ে বুকের কাছে টেনে আদর করে ঋজু। ক্লাস নাইন। দেখতে দেখতে কত বড় হয়ে গেল মেয়েটা। বনানী রিমোট কন্ট্রোলারটা হাতে তুলে নিয়ে টিভির দিকে তাকিয়ে যখন বলে, ‘লেবু-টেবু কিছু আনোনি!’, ঠিক তখনই বেজে ওঠে ফোন। অচেনা নম্বর। দোনামনা করে ফোনটা ধরে।

‘ঋজুদা আমি জয়ন্ত – সখের বাজার – সুমন্ত’র ভাই –’ পরিচয় দেন ফোনের ওপারের কণ্ঠস্বর।
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ বলো!’ ঋজুর জবাব।
‘স্টেশনে আজ যা করেছেন, স্যালুট টু ইউ ঋজুদা, ইস্কুলেও আপনি আমাদের হিরো ছিলেন - ’
‘তুমি ছিলে নাকি তখন?’
‘না, পোস্ট দেখলাম!’
‘পোস্ট! কে পোস্ট করল!’
‘চিনি না ঋজুদা, তবে ঘটনার মাঝখানেই তিনি ছিলেন – পরিষ্কার ভিডিও! শম্ভুর দলকে যেভাবে তুড়ি মেরে তাড়ালেন, ব্যাপক দাদা! শেয়ার করেছি।’

ফোন ছেড়ে কিছুক্ষণ গুম হয়ে বসে থাকে। তারপর মুড়ি খেতে খেতে ফোনের পর্দায় আঙুল ছোঁয়ায়, পৌঁছে যায় সোশ্যাল মিডিয়া সাইটে। নিজের নিউজ ফিডে খুঁজে পায় না কোনও ভিডিও। জয়ন্ত’র নাম খুঁজে ঢুকে পড়ে ওর সময়রেখায়। স্পষ্ট ভিডিও। পোস্ট করেছেন জনৈক সুমন মিত্র। প্রোফাইলে গিয়ে ছবি দেখে। বাচ্চা ছেলে। মুখটা চেনা লাগে কিন্তু নির্দিষ্ট করে চিহ্নিত করতে পারে না। তবে এলাকার ছেলে, এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। সুমন ভিডিওটা কেবল পোস্ট করেনি, রিকশা স্ট্যান্ডের ঘটনার বিবরণ দিয়ে লিখে দিয়েছে – মানুষের সম্মিলিত প্রতিবাদের সামনে লেজ তুলে পালালো এলাকার প্রভাবশালী প্রোমোটার ও তার বাহিনী। কোথাও ঋজুর নাম নেই কিন্তু ভিডিও’য় সে-ই মধ্যমণি। মন্তব্যে অনেকেই লিখেছেন, এ তো আমাদের ঋজুদা! প্রাউড অফ ইউ ঋজুকাকু! বিদ্যানিকেতন হাই স্কুল থেকেই ঋজু প্রতিবাদী ইত্যাদি প্রশস্তিসূচক বাক্য। মন্তব্যকারীদের আরও অনেককেই ঋজু চিনতে পারে। ভিডিওটার ভিউজ ইতোমধ্যে হাজার পেরিয়েছে। এক ঘন্টা অতিক্রান্ত, পোস্টটি শেয়ার করেছেন বাহান্ন জন।

পোস্টে মন্তব্যকারী এক পরিচিতকে ফোন করে। কে সুমন মিত্র, জানা দরকার।
‘আরে সুমন আমাদের রঞ্জনদার ছেলে, রঞ্জনদাকে চিনিস তো, বোসপাড়ার, ওই যে রেলে চাকরি করে – ভালো ফুটবল খেলত! সুমন কলেজ থেকে ফিরছিল, ট্রেন থেকে নেমে দেখে ওই কাণ্ড – ছাত্র, বুঝতেই পারছিস, ভিডিও তুলে পোস্ট করে দিয়েছে! বাপিদার দিদি আমায় সবটা বললেন, উনিও লাইনে ছিলেন, তোর পেছনে।’

ফোনটা ছেড়ে কফিতে চুমুক দেয়। বনানী ভুরু কুঁচকে তাকায়। কিছু একটা গোলমাল আন্দাজ করে জিজ্ঞেস করে, ‘কী ব্যাপার গো!’

কফি আর মুড়ি-মাখা খেতে খেতে ঋজু রিকশা-পর্ব বলে। শালুক ও বনানী দু’জনেই ভিডিও দেখতে চায়। আঙুলের ছোঁয়ায় আবার ভিডিও খুঁজে মেয়ের হাতে ফোন ধরিয়ে দেয়।

সাকুল্যে একমিনিট একান্ন সেকেণ্ডের ভিডিও, মা ও মেয়ে দু’বার করে দেখে। শালুক উত্তেজিত। এমনিতেই বাবার ন্যাওটা, আলোকোজ্জ্বল ও জনাকীর্ণ স্টেশন চত্বরে বাবার হিরোসুলভ রূপ তাকে মোহিত করে। সোফা ছেড়ে উঠে ডানহাতের মধ্যমা আর বুড়ো আঙুলে তুড়ি দিয়ে বাবার নকল করে বলে, ‘এই চল ফোট, আর একটা কথা বললে থানায় ফোন করব! চল, চল!’ মেয়ের কাণ্ড দেখে ঋজুর মুখে লজ্জামিশ্রিত হাসি। বনানী ক্রমশ গম্ভীর। স্বামীর পৌরুষজনিত কোনও শ্লাঘা অনুভূত হয় না অন্দরে, বরং অজানা আশঙ্কায় কেঁপে ওঠে বুক। মেয়েটা বড় হচ্ছে, ওর নিরাপত্তার জন্যও তো সতর্কতা দরকার। যত্রতত্র ফণা না-তুলে, শামুকের মতো নিজেকে গুটিয়ে নেওয়াটাও আয়ত্ত করতে হয়, অন্তত জীবনের একটা পর্বে এসে, আত্মরক্ষার উপায় রপ্ত করা জানতে হয়।

সোফায় বসে টিভির আওয়াজ কমিয়ে, ঋজুর দিকে তাকিয়ে বনানী বলে, ‘পোস্ট করার আগে তোমার অনুমতি নেওয়া উচিত ছিল! ঠিক হয়নি বিষয়টা এইভাবে পাবলিক করা!’
‘হুঁ, আমিও তাই ভাবছি!’

বলতে বলতে মেয়ের হাত থেকে ফোন নেয় ঋজু। ফের ফোন করে পোস্টে-মন্তব্যকারী পরিচিতকে। আশঙ্কার কথা বলে তাকে। প্রাথমিকভাবে উত্তেজনায় সে ফুটলেও, শেষপর্যন্ত ঋজুর আশঙ্কায় সায় দেয় সে-ও। ফোন নম্বর দেয় সুমনের।

সুমনকে তৎক্ষণাৎ ফোন করে ঋজু। নিজের পরিচয় দিয়ে আপত্তির কথা জানায়।
‘কাকু প্লিজ ভয় পাবেন না, শম্ভু চ্যাটার্জিরা রাজ চালাবে আর মানুষ মুখ বুজে সব মেনে নেবে, ওসব দিন চলে গেছে, আমরাও মুখতোড় জবাব দিতে পারি – আপনি প্রতিবাদের মুখ কাকু!’ সুমনের কণ্ঠে দৃপ্তভাব।
‘এর কনসিকোয়েন্স কী হবে তোমার ধারণা আছে! রিমুভ দ্য ভিডিও ইমিডিয়েটলি!’ ঋজু কঠোর।
সুমন হেসে বলে, ‘ভিডিওটা অনেকেই ডাউনলোড করে নিজেরা পোস্ট করেছে, আমি ডিলিট করলেই ব্যাপারটা থেমে থাকবে না কাকু! ইটজ গট ভাইরাল!’
‘ঠিক আছে, তুমি ডিলিট করো, তাহলেই হবে!’ শান্ত গলায় বলে ঋজু।
‘আপনি ফালতু ভয় খাচ্ছেন কাকু!’
‘তুমি রঞ্জনদার ছেলে তো?’

সুমন এবার হাসে। অনুচ্চ স্বরে বলে, ‘আমি একটা ঘটনার ভিডিও করেছি, নিজের দায়িত্বে পোস্ট করেছি, কোথাও আপনার নাম দিইনি, তাছাড়া আরও অনেকেই ভিডিওতে আছে – আপনি একা নন!’

সুমনের কথায় রাগ ছলকে ওঠে মাথায়। সংযত করে নিজেকে। ‘আচ্ছা, ঠিক আছে’ বলে ফোন রাখে। রাগের সঙ্গে কাঁকরের মতো মিশে আছে একটা অস্বস্তি। ঠিক অস্বস্তি নয়, একটা নীচতা যেন ফুটে উঠছে নিজের আচরণে। একটা অন্যায়ের প্রতিবাদ সে করেছে, নিজের বিবেকের তাড়নাতেই করেছে। শম্ভু চ্যাটার্জির ওপর কোনও পূর্ব-রাগ তার নেই, বস্তুত লাইন-বহির্ভূত রিকশা-পাকড়ানো লোকটা যে শম্ভুর লোক, তাও সে আগে জানত না। বিনা প্ররোচনায়, সম্পূর্ণ নিজের সাহস ও বিবেক-প্রসূত প্রতিবাদ সে করেছে এবং তা করে ফেলে, এখন ঘটনার পাঁচকান হওয়ার ভয় সে পাচ্ছে কেন? নীচ মনে হয় নিজেকে কারণ সুমনের কথায় যুক্তি আছে। রাগটা যতটা-না সুমনের ওপর, নিজের ওপর কিঞ্চিৎ বেশি, বুঝতে পেরে লজ্জিত হয়। একটা বাচ্চা ছেলের কাছে নিজের ভাবমূর্তিতে কালি মাখালো নিজেই। ফোন ছেড়ে চুপ করে বসে থাকে ঋজু।
‘ডিলিট করবে?’ জিজ্ঞাসা বনানীর।
‘ছাড়ো তো, করলে করবে! খামোকা ভয় পেয়ে লাভ নেই!’
‘যেভাবে লোকটার দিকে তেড়ে গেলে, ওটাও গুণ্ডাদের ভাষা ও ভঙ্গি! ভদ্রলোকের নয়!’

বনানীর কথায় ঘরময় স্তব্ধতা। সোফায় বসে পায়ে মোজা পরতে পরতে বলে বনানী। টিভিতে ঘ্যানঘ্যান করছে সিরিয়ালের লোকজন। তাদের কোনও কথাই কানে ঢুকছে না বনানীর। ঋজুরও। গোড়ালি থেকে শাড়িটা সামান্য তুলে মোজা পরছে বনানী। তার নিটোল নির্লোম পায়ের দিকে চোখ যায় ঋজুর। মোজা পরে স্লিপারে পা গলিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রান্নাঘরের দিকে চলে যায় বনানী।

চ্যানেল ঘোরায় ঋজু। আজ আইএসএল-এ ইস্টবেঙ্গলের খেলা আছে। মেয়ে ভিতরের ঘরে গিয়ে বসে যায় অনলাইন টিউশন ক্লাসে। সান্ধ্যকালীন নিত্যকার কর্মমুখরতা। টিভিতে খেলার ধারাভাষ্য আর রান্নার আওয়াজে মিশে যায় শীতের নৈঃশব্দ। দেওয়াল ঘড়িটা টিক-টিক করে পার করছে সময়। ঋজুর মনে হয় টাইমবম্ব! কখন বিস্ফোরণ হবে কেউ জানে না।

তিন.
প্রিয় দলের খেলা দেখার সময় মাথায় অন্য কোনও চিন্তা আসে না। খেলা দেখতে দেখতে বুকের ভিতর হঠাৎ-জমা চাপ কমে যায় ঋজুর। শেষমুহূর্তে গোল হজম করে খেলা অমীমাংসিত অবস্থায় শেষ হতেই মনখারাপ এলো বটে, বচসা-জনিত উৎকণ্ঠা নয়। ভুলেই গেল ঋজু রিকশা-স্ট্যান্ডের ঘটনা। সদ্য-কেনা এক বাংলা উপন্যাসের পাতা-প্রতীক খুলে শুরু করে পড়া। বনানী এসে দিয়ে যায় ক্ষীরের পুর দেওয়া গরম-গরম পাটিসাপটা। টিউশন শেষ হতেই মেয়ে শুরু করে হল্লা। পড়া মাথায় ওঠে ঋজুর। বই বন্ধ করে সে-ও মেতে ওঠে মেয়ের সঙ্গে ফুটবলে।

ভঙ্গুর জিনিসপত্র ভেঙে বা উল্টে যাওয়ার ভয়ে শঙ্কিত বনানী, বিরক্ত মুখে চেয়ে থাকে, বেআক্কেল দুই অসমবয়সী খেলোয়াড়ের দিকে। মেয়ের একটা শট পোর্সেলিনের ফুলদানির কান ঘেঁষে বেরিয়ে যেতেই চিৎকার করে ওঠে বনানী, তখনই ফোন বেজে ওঠে ঋজুর। প্রায় দশটা বাজে। শীত ক্রমশ জাঁকিয়ে বসছে অন্ধকারের বুকে। এখন আবার কে ফোন করল? বনানী চকিতে তাকায় সোফায় পড়ে থাকা শব্দমুখর ফোনের দিকে।

খেলা থামিয়ে ফোন তোলে ঋজু। সুমন মিত্রের খোঁজ ও ফোন নম্বর সরবরাহকারী পরিচিতের নাম পর্দায়। আঙুলের টোকায় ফোন ধরে। তারপর নিশ্চুপ শ্রবণ। বনানী কেবল ঋজুর মুখে একটা ছোটো বাক্যই শুনতে পায় – ‘সে কী!’ ফোন ছেড়ে সোফায় বসে ঋজু। উৎকণ্ঠা চোখেমুখে। বনানীর হাঁ-চোখ বরের মুখের দিকে।

‘সুমন হাসপাতালে। ক্লাব থেকে খেলা দেখে ফেরার সময় অন্ধকারে কয়েকজন মেরে মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে!’

হয়তো এই খবরটুকুরই অপেক্ষা ছিল, প্রতি-আক্রমণ বা প্রতিহিংসার আশঙ্কা মিলিয়ে যায় মুহূর্তে, মা-বাবা-মেয়ের গৃহকোণে ঢুকে পড়ে ভয়। বনানী দৌড়োয় সদর দরজার দিকে। কলাপসিবল গেটে তালা দেয় দ্রুত। দরজা বন্ধ করে। পরখ করে জানালাগুলো। কাচের প্যানেল ভেদ করে দৃষ্টি যায় দূরে। এলইডি আলোর চ্ছটায় প্লাবিত রাস্তায় জনমনিষ্যি নেই। কুয়াশার চাদর সেই ধবধবে শাদা আলোর আগামাথা ঢেকে দিতে তৎপর। বেশিক্ষণ সেই আলোকিত কুয়াশার অন্দরে তাকিয়ে থাকতে পারে না বনানী। পর্দা টেনে দেয়। চাপা গলায় ঋজুকে বলে, ‘পার্থ পালকে একবার ফোন কর, জানিয়ে রাখা দরকার।’

পার্থ পাল এলাকার ওয়র্ড কাউন্সিলর। স্বভাবত প্রভাবশালী। হোমড়চোমড়া। ঋজুকে চেনেন, এলাকার বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে বনানীকেও। কিঞ্চিৎ হতচকিত ঋজু, পার্থ পালের নম্বরে আঙুল ছোঁয়াতে যাবে, আবার বেজে ওঠে ফোন। অচেনা নম্বর। ল্যান্ড লাইন। ফোন ধরে ঋজু।
‘ঋজু সরকার বলছেন?’
‘হুঁ বলছি।’
‘থানা থেকে বলছি, একবার একটু থানায় আসবেন।’
‘থানায়! কেন?’
‘একটা এফআইআর হয়েছে আপনার নামে –’
‘এফআইআর! কেন?’
‘আজ সন্ধ্যায় স্টেশনের রিকশা-স্ট্যান্ডে মিহির মণ্ডলকে মেরেছেন, সে হাসপাতালে ভর্তি, মিহিরের বাবা এফআইআর করেছেন!’
‘কে মিহির মণ্ডল! কী বলছেন, আমি তো কাউকে মারিনি!’

আর কোনও কথা ঢোকে না কানে। অত্যন্ত সুভদ্র কন্ঠস্বর প্রয়োজনীয় নির্দেশটুকু দিয়ে কেটে দেয় ফোন। ঋজুর কানে বাজে শেষ কথাটা।
‘একবার আসবেন প্লিজ, বাড়িতে পুলিশ গেলে ভালো দেখায় না!’

নির্বাক বনানীর বিস্ফারিত চোখ ঋজুর দিকে। শালুক কিছুটা-বুঝে, বেশিটা না-বুঝে, ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে বাবার দিকে। বনানী ও মেয়ের দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নেয় ঋজু। নিজেকে অপরাধী মনে হয়। নীরবতা। আবহাওয়া-জনিত নাকি ভয়, কোন শীতলতার মাত্রা বেশি আপাতত বোঝা যায় না। গম্ভীর গলায় বনানী ফের বলে, ‘পার্থবাবুকে ফোনটা করো!’ এ যেন আগাম জামিনের আবেদন।

ঋজু বউয়ের দিকে তাকায়, বনানী সংকটের সময় নিজেকে পরিস্থিতির ঢেউয়ে ভাসিয়ে দেওয়ার মেয়ে নয়। বিপর্যয়ে নিজেকে সংহত করতে জানে ঋজুও। কিন্তু থানা থেকে পুলিশি ঠাণ্ডা স্বরে, ‘একবার আসবেন প্লিজ, বাড়িতে পুলিশ গেলে ভালো দেখায় না!’ শোনার পর, ভিতরে কাঁপুনি টের পায়।

সব শুনে, কাউন্সিলর পার্থ পাল অত্যন্ত সহৃদয়তায় বলেন, ‘ইয়ার্কি নাকি! এফআইআর করলেই হলো! কারণ থাকবে না! প্রতিবাদ করেছ, বেশ করেছ, করাই উচিত! শম্ভু বাড়াবাড়ি করলে, কী করে টাইট দিতে হয় আমি জানি! চিন্তা কোরো না, বড়বাবুকে আমি ফোন করে দিচ্ছি, তবে বলেছে যখন একবার ঘুরে এসো থানায়! তবে হ্যাঁ, একা যেও না। চেনা উকিল আছে তোমার? থাকলে নিয়ে যেও।’

এই রাতে সে উকিল কোথায় পাবে? কোনও চেনা উকিল বন্ধুও নেই। বনানী যেতে চায়। বাধা দেয় ঋজু। শালুককে তো আর একা বাড়িতে রেখে যাওয়া যাবে না, তাকেও নিয়ে যেতে হয়, কিন্তু শালুককে নিয়ে থানায় যেতে চায় না সে। ফোন করে ভোলাকে। রাত-বিরেতে অটো নিয়ে বেরোয় একমাত্র ভোলা। বনানী থমথমে মুখে দ্রুত ভাত বাড়ে। দু’টি ভাত মুখে না-দিয়ে ঋজু বেরোতে পারবে না। বউয়ের চাপাচাপিতে ভাত খেতে বসে সে।

কিন্তু বুকের ভিতরে দুরুদুরু উত্তেজনা নিয়ে, গলা দিয়ে ভাত নামায় কার সাধ্য! সামান্য খেয়ে উঠে পড়ে। বাইরে অটোর আওয়াজ, ভোলার মিসড কল, ঋজু দ্রুত জ্যাকেট আর মাথায় একটা উলের টুপি গলিয়ে দরজা খোলে। দরজায় এসে দাঁড়ায় বনানী আর শালুক। শীতের রাত। পাড়ার সব বাড়িতে আলো জ্বললেও সবাই অন্দরে, সদর শুনশান।

ভোলা চালু করে অটো। হাত নাড়ে ঋজু। কোলাপসিবল গেটসহ দরজা বন্ধ করে বনানী। আলো নেভায়। অন্ধকার আর হিম, তাকে জড়িয়ে ধরে একসঙ্গে।

চার.
থানাগুলো এখন বেশ ঝকঝকে, বাইরে সুদৃশ্য চেয়ার, হেল্প ডেস্ক, খোয়া-যাওয়া মোবাইলের জন্য নালিশ দাখিলের আলাদা কাউন্টার, ভদ্র ব্যবহার – বহুদিন পরে কোনও থানায় এসে পরিবর্তন লক্ষ করে ঋজু। শেষ কবে বা কেন এসেছিল আজ আর মনে নেই, কিন্তু হলুদ বাল্বের আলোয় খিস্তাখিস্তিসহ থানার নোংরা পরিবেশ, বেশ মনে আছে। বড়বাবু মানে আইসি নেই। মেজবাবুর ঘরে বসে। কোনও এক মিহির মণ্ডলের বাবা অজিত মণ্ডল নিখুঁত এফআইআর, ডাক্তারের শংসাপত্রসহ, করেছেন ঋজুর বিরুদ্ধে। তাঁর ছেলেকে তীব্র প্রহারে হাসপাতালে পাঠিয়েছে ঋজু। মিহিরের শরীরের বিভিন্ন জায়গায় প্রহারের চিহ্ন নাকি প্রকট। তার নাম, বাবার নাম, বয়স – সবই যথাযথ লিখেছেন অজিত মণ্ডল। খুঁটিয়ে এফআইআর ফর্মটি দেখে ঋজু।

‘এটা ডাক্তারের প্রিলিমিনারি রিপোর্ট! মিহির এখন ভর্তি আছে হাসপাতালে – আঘাত গুরুতর হলে অ্যাটেম্পট টু মার্ডারের কেস যুক্ত হবে। আইপিসি তিনশো সাত। নন বেইলেবল। বছর দশেকের জেল হতে পারে। আর মরে গেলে তো কথাই নেই! এখন তিনশো তেইশ আছে।’
‘কিন্তু এটা তো ফলস অ্যালিগেশন! শম্ভু চ্যাটার্জি - ’
‘হতে পারে, কিন্তু ছ’জন সাক্ষী দিয়েছে। দেখুন।’

মেজবাবু একতাড়া কাগজ এগিয়ে দেন। সাক্ষীদের প্রত্যেকের আধার কার্ডের ফোটোকপি।
‘পার্থ পাল বড়বাবুকে ফোন করবেন বলেছিলেন –’
‘কাউন্সিলর আর শম্ভু এক গেলাসের ইয়ার!’ হেসে বলেন মেজবাবু।
‘আমার এখন কী করণীয়?’ ঋজু স্পষ্ট জানতে চায়।
‘ওয়েট করুন, বড়বাবু আসুন, উনি বলবেন।’

ঘরের বাইরে আসে। অপেক্ষাগৃহে ঢুকে চেয়ারে বসে। ফোনের পর্দায় চোখ যায়। এগারোটা দশ। থানায় আসার আগে টেনশন হচ্ছিল না এমন নয়, কিন্তু ইন্ডিয়ান পেনাল কোডের ধারাগুলো শুনে নার্ভাস লাগে ঋজুর। কী করবে মাথায় তৎক্ষণাৎ কিছু আসে না। বনানীর ফোন আসে। দু’চার কথা বলে ছেড়ে দেয়।

আইসি এলেন বারোটা বাজার মিনিট পাঁচ-সাত আগে। তার ঘরে ডাক পড়ে ঋজুর। টেবিলের সামনে একটা চেয়ারে বসে। এক সহকর্মীকে ডেকে কিছু নির্দেশ দিলেন আইসি। কাগজ টেনে খসখস করে কিছু লিখলেন। তারপর সামনে রাখা একটা ফাইল খুলে শুরু করলেন পড়তে। খানিকটা জড়সড় হয়ে চেয়ারে বসে থাকে ঋজু। চোখ আইসি’র দিকে। ঋজু সামনে বসে আছে, যেন খেয়ালই নেই, কাজ করে চলেছেন একমনে। আচরণে উপেক্ষা স্পষ্ট।

কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার পর ঋজু সরাসরি জিজ্ঞাসা করে, ‘আমায় এখন কী করতে হবে স্যার?’
মাথা তুলে তাকান আইসি। তারপর আবার ফাইলে চোখ নামিয়ে বললেন, ‘বসুন। এসডিপিও সাহেব রাউন্ডে আছেন, এখানে আসবেন, যা-বলার উনি বলবেন।’

স্থানীয় থানা পেরিয়ে তার কেস সাব-ডিভিশনে চলে গিয়েছে! অবাক হয় ঋজু।
‘ঘন্টাখানেকের ওপর হয়ে গেল বসে আছি স্যার!’
‘যাকে মেরেছেন সে হসপিটালে শুয়ে আছে।’
‘কারুকেই মারিনি স্যার, ফলস অ্যালিগেশন!’
‘ভিডিওটা দেখেছি, যেভাবে মাস্তানি করছিলেন, ওটাকে বলে ইনসাইটমেন্ট অফ ভায়োলেন্স!’ সামান্য থেমে আবার বলেন, ‘ওয়েট করুন!’

আইসি’র ঘর থেকে বেরিয়ে আবার অপেক্ষা। বনানীর দুটো মিসড কল দেখে ফিরতি-কল করে। আশ্বস্ত করে মেয়ে ও বউকে। বনানী বন্ধু মারফৎ এক সাংবাদিককে জানিয়েছে। ফোন করেছে ডিআইকে। এমনকী ফোনে ধরতে পেরেছে এলাকার এমএলকেও।

এসডিপিও এলেন সাড়ে বারোটা নাগাদ। তটস্থ হয়ে উঠল থানা। এসেই ফাঁকা একটা ঘরে বসলেন ঋজুকে নিয়ে। যেন ঋজুর জন্যই এসেছেন সাব-ডিভিশন থেকে গাড়ি উজিয়ে। খাকি পোশাক। কাঁধে ধাতুলেখ – ডব্লুবিপিএস। সৌম্যকান্তি কমবয়সী অফিসার।

‘রিক্সাস্ট্যান্ডে হঠাৎ অত ইমোশনাল হয়ে গেলেন কেন?’ সরাসরি প্রশ্ন এসডিপিও’র।
‘ন্‌—না, মানে লোকটা লাইন ছাড়াই –’
‘তাতে কী হয়েছে! খুব তাড়া থাকায় লোকটা আগে উঠেছে, পরপর রিক্সা আসছে, দু’তিন মিনিটের তো ব্যাপার – অথচ কত রাগ হয়ে যায় আমাদের, তাই না!’

নির্বাক ঋজু। অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস গড়িয়ে যায়। নামিয়ে নেয় চোখ।
‘বিশাল বিশাল ক্রাইম ঘটে চলেছে দেশে – ব্যাঙ্ক লুঠ করে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে কতজন! শ’খানেক লোকের ওপর গাড়ি চালিয়ে পিষে দিয়ে বেঁচে যাচ্ছে, চাকরির প্যানেলে যোগ্য প্রার্থীকে বাদ দিয়ে ঢুকে যাচ্ছে অযোগ্যের নাম – অন্যায়ের পর অন্যায় – আমরা সেইসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে না-পেরে ছোট ঘটনা নিয়ে হম্বিতম্বি করি – রিক্সা স্ট্যান্ডে এসে ঠেকেছে আমাদের প্রতিবাদ!’ ব্যঙ্গ আধিকারিকের কণ্ঠে। সামান্য বিরতি নিয়ে ফের বলেন যেন সিদ্ধান্ত জানাচ্ছেন, ‘আসলে বড় অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে না-পারার হতাশায় পেটি ম্যাটারে নিজেদের রাগ মেটাই - ’

মহকুমা পুলিশ আধিকারিক ‘আমাদের-আমাদের’ করে কথা বলছেন, সরাসরি ঋজুকে দুষছেন না। বলার ভঙ্গিমার অভিঘাতে সামান্য থমকায়, কিন্তু দ্রুত নিজেকে ফিরে পায় ঋজু।

‘পেটি ম্যাটার, পেটি রাগ – বিরাট কোনও রাগ তো দেখাইনি স্যার, যার জন্য এই মাঝরাতে, শীতের মধ্যে আমাকে থানায় বসে থাকতে হবে!’ ঋজু বলে।
‘আপনার ঠান্ডা লাগছে?’
‘ঠিক আছে, ইটস ওকে!’ জ্যাকেটের পকেটে হাত ঢুকিয়ে, হেসে বলে ঋজু।

বেল বাজান এসডিপিও। সেন্ট্রি আসেন। তাঁকে একটি কম্বল আনার নির্দেশ দেন।
‘স্যার, এমএলএ সাহেবকে জানিয়েছি – পার্থদাকেও – আমাদের কাউন্সিলর –’ কিছুটা মরিয়া হয়েই তালিকা পেশ করে ঋজু।

হাসেন মহকুমা পুলিশ আধিকারিক। একটা সিগারেট ধরান। সেন্ট্রি নিয়ে আসেন একটি কম্বল। ঋজুর পাশের চেয়ারে রাখেন।
‘সেলের কম্বল। এর থেকে ভালো কিছু আপনাকে এই মুহূর্তে দিতে পারলাম না।’
‘সেলের কম্বল’ শুনে হালকা একটা কাঁপুনি আবার চারিয়ে যায় ঋজুর সারা শরীরে। সেলের কম্বল মানে থানার মধ্যে যে গারদ আছে সেই কয়েদখানার কম্বল। ডানদিকের চেয়ারে কম্বলটার দিকে একবার চোখ দিয়ে, ফের ফেরে অফিসারের দিকে।
‘এখন তৃণমূল, সিপিএম, বিজেপি, কংগ্রেস, লিবেরাল, নকশাল – কোনও কিছুতেই কোনও লাভ হবে না বুঝলেন, কোনও নেতার নাম বলে লাভ নেই।’ ফুরফুর করে ধোঁয়া ছাড়েন পুলিশ অফিসার, গলায় যথেষ্ট আন্তরিকতা, আবার বলেন, ‘আপনার নামে একটি এফআইআর হয়েছে – এবার আইন আইনের পথে চলবে! আপনাকে কোর্টে তুলতে হবে, কোর্ট বেল দিলে আপনি মুক্ত। আপাতত।’
‘থানা থেকে বেল হতে পারে না?’
‘পারে। বেল বন্ড দিয়ে ছাড় পেতে পারেন। ল-ইয়ার আছে?’

একজন কনস্টেবল একটি কাগজ দিয়ে যান টেবিলে। এ-ফোর পাতায় পরপর ছাপা হরফ। পাতাটা তুলে নেন মহকুমা আধিকারিক। পাতায় চোখ বোলাতে বোলাতেই বলেন,
‘কেবল মিহির মণ্ডল তো নয়, সুমন মিত্রের মাথাতেও গুরুতর আঘাত, পুলিশ কেস হয়েছে – পুরো ঘটনাটা ঘটেছে স্ট্যান্ডে আপনার আচরণের পর।’ দু’দিকে মাথা নাড়তে নাড়তে কথা শেষ করেন। না, শেষ হয় না তাঁর কথা, মৃদু শ্বাসাঘাতে বলেন, কিছুটা বিড়বিড়িয়েই, ‘মুশকিল, খুব মুশকিল!’

দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ বন্ধ করেন অফিসার। কণ্ঠস্বর শুনে ও আচরণে মনে হয়, প্রাণপণ চেষ্টা করছেন ঋজুকে বাঁচাতে কিন্তু গুঢ় আইনী প্যাঁচে বেকায়দায় পড়েছেন। পাশের চেয়ারে পড়ে আছে সেলের কম্বল। মাঝেমাঝেই চোখ না-গিয়ে পারে না। খুব অস্বস্তি তৈরি করছে ওই রোঁয়াওঠা শীতবস্ত্র। কিন্তু কেন? কেন কম্বলটা অস্বস্তিদায়ক? ভিতরে ভিতরে কি ভেঙে যাচ্ছে ঋজু? নিজেকে কিছুটা গুছিয়ে অফিসারের কথার পিঠে বলে,

‘স্যার, পুরোটাই ফেক অভিযোগ, আশাকরি আপনিও বুঝতে পারছেন –’
‘সেটা ঠিক করার দায়িত্ব কোর্টের, আমাদের নয়।’ পাতায় চোখ রেখেই বলেন এসডিপিও।
‘আমার সন্দেহ শম্ভু চ্যাটার্জি এটা করিয়েছে!’
‘পার্থ পাল করিয়েছে। একই দল করে দু’জনেই। শম্ভু যাতে মিউনিসিপ্যাল ইলেকশনে টিকিট না-পায়, তাই এই আয়োজন। এমএলএ-ও সব জানে। খুব সহজ কাজ! সামান্য খরচ। পোস্টদাতা সুমন মিত্রের রক্ত আর একটা ফলস এফআইআর, আপনার বিরুদ্ধে, ব্যস, শম্ভুর টিকিট আটকে যাবে!’

অফিসারের কথায় হতবাক ঋজু।
‘সুমন মিত্রও এমনি-এমনি ওই ভিডিও পোস্ট করেনি, অ্যাজেন্ডা আছে। ওর বাবা সদ্য রিটায়ার্ড। এবার মিউনিসিপ্যাল ইলেকশনে দাঁড়াবে। ছেলের মাথার ব্যান্ডেজ কাজে লাগবে!’
ঋজু ক্রমাগত হাঁ। মুচকি হাসি এসডিপিও’র মুখে।

‘প্রত্যেকের অ্যাজেন্ডা আছে, কেবল আপনার কিছু ছিল না! প্রোটেস্ট করে বিপদে পড়ে গেলেন!’ কাগজে চোখ রেখেই সামান্য থেমে ফের বললেন, ‘কিন্তু কার কী অ্যাজেন্ডা আছে, কে এইসব করালো, এখন সেটা বড় ব্যাপার নয়, আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ হয়েছে, আপনাকে সেই অভিযোগ থেকে মুক্ত হতে হবে, দায় আপনার।’ তারপর কাগজ থেকে চোখ তুলে বলেন, ‘পাঁচ বছর আগে দীঘি ভরাটের চক্রান্তের বিরুদ্ধে যে-আন্দোলন হয় সে-ই আন্দোলনে আপনি ছিলেন, জমায়েতে বক্তৃতা দিয়েছেন, দীঘির সামনে সেই জমায়েতের পুলিশ পারমিশন ছিল না, অংশগ্রহণকারী প্রত্যেকের নামে মামলা হতে পারে। বছর তিনেক আগে নো-এনার্সি মুভমেন্টে, স্টেশন চত্বরের জমায়েতে আপনি স্পিচ দিয়েছেন, পারমিশন ছিল না ওই মিটিং-এরও। মামলা হতে পারে। আরও আছে, সব প্রমাণ আপনিই রেখে দিয়েছেন সোশ্যাল মিডিয়ায়, লম্বা লিস্ট! এগুলো তো রিসেন্ট পাস্ট, বছর পনের আগে একটা মেয়েকে নোংরা ইঙ্গিত করার অপরাধে, ঘটনাস্থলে উপস্থিত আপনি মেরে নাক ফাটিয়ে দিয়েছিলেন একটি ছেলের। আইন নিজের হাতে তুলে নিয়েছিলেন। লোকাল কমিটির হস্তক্ষেপে ব্যাপারটা মিউচ্যুয়াল হয়ে যায়। থানা-পুলিশ করেনি কোনও পক্ষ। কিন্তু আপনি ক্রাইম করেছিলেন। ছেলেটি বা তার বাড়ির লোক এখনও থানায় অভিযোগ করতেই পারে।’

ক্রমশ নিথর ঋজু। কোথা থেকে কোথায় চলে যাচ্ছেন এসডিপিও! অতীত খুঁড়ে তুলে আনছেন ইতিহাস। ঠিক কী চাইছেন উনি, বুঝে উঠতে পারে না সে। ধীরে, কিছুটা নির্ল্পিতি নিয়েই বলে যাচ্ছেন অফিসার। পরক্ষণেই সেই উদাসীনতা অতিক্রম করে গলায় নিয়ে আসছেন অন্তরঙ্গতা। দীর্ঘ ফর্দ পেশ করে, সামান্য বিরতি নিয়ে, মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন, ‘খুব মুশকিলে ফেললেন, কী করি বলুন তো!’ তো শব্দটা যোগ করেই মিশিয়ে দিলেন আন্তরিকতা। ঋজু অফিসারের আচরণে ক্রমশ বিভ্রান্ত।

ফোন বাজে। বনানী। এসডিপিও’র দিকে তাকায়। চোখের ইশারায় ফোন ধরতে বলেন তিনি। ফোন ধরতেই বনানীর চিন্তিত গলা, ‘তুমি কোথায়?’ মাত্র কয়েকটি কথার আদানপ্রদান, ফোন কাটে।
‘আমার বাড়িতে পুলিশ কেন?’ সরাসরি প্রশ্ন করে অফিসারকে।
‘আপনার নামে এফআইআর হয়েছে, পুলিশ তো যাবেই!’
‘এখান থেকে ফোনে আমায় বলা হয়েছিল থানায় আসতে, বাড়িতে পুলিশ গেলে ভাল দেখায় না!’

কোনও কথা বলেন না এসডিপিও। গভীর অভিনিবেশে ফের পড়তে শুরু করেন কাগজটা। তারপর ধীরে মাথা তুলে তাকান ঋজুর চোখের দিকে।

‘বাড়ি গিয়ে পুলিশ যদি আপনাকে না-পায়, তাহলে আপনার বউ বা মেয়েকে বা দু’জনকেই তুলে আনতে পারে। পুলিশ জানে কান টানলে মাথা আসে।’ হেসে বলেন পুলিশ আধিকারিক।
‘কী বলছেন স্যার, আমি তো এখন থানায়! আমাকে না-পেয়ে মানে?’ চরম বিভ্রান্তিতে ঋজু।
এসডিপিও হাসেন। মাপা সেই হাসি। আমলাতান্ত্রিক। বিহ্বল ঋজু চেয়ে থাকে অফিসারের দিকে।

পাঁচ.
‘একটা বিখ্যাত মামলা আছে, কেস নং তিন হাজার দু’শো পঁচাশি বাই সাতাত্তর। কলকাতা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের কোর্টে। ছোটভাইকে বাড়িতে না-পেয়ে পুলিশ দিদিকে তুলে নিয়ে আসে থানায়। ভাই ছিল নকশাল, রাতে পুলিশ রেইড হয় বাড়িতে, উনিশ শো চুয়াত্তর, মোস্ট প্রোবাবলি জুলাই মাস। বর্ষাকাল। প্রসিকিউশন উইটনেস মানে ওই দিদির বয়ান রেকর্ড আছে আদালতে। টর্চারের মাত্রা শুনলে পাগলা হয়ে যাবেন!’

অফিসারের ঠোঁটে হাসি, গল্প বলার ঢং তার গলায়। হঠাৎ বাইরে সামান্য শোরগোল। একটা গাড়ি এসে যেন থামল। দরজা খোলা ও বন্ধের আওয়াজ। ঋজুকে হতবাক করে দু’জন মহিলা পুলিশকর্মী ঘরে ঢোকেন, তাদের সঙ্গে বনানী! ভয়ার্ত মুখ। ঋজু লাফিয়ে ওঠে চেয়ার ছেড়ে। কিন্তু আরও দু’জন পুলিশ ততক্ষণে এসে গিয়েছেন, তাঁরা চেপে ধরেন তাকে।

একজন মহিলা কনস্টেবল বনানীর শাড়ি ধরে তুলে দেন হাঁটুর ওপর। নগ্ন নির্জন নির্লোম পা। বিস্ফারিত চোখে চেয়ে থাকে ঋজু। হতচকিত বনানী বাধা দেওয়ার আগেই শাড়ির সামনের অংশ দুপায়ের পেছনে কাছার মতো বেঁধে দেন কনস্টেবল। শক্ত করে আঁচল বেঁধে দেন আর একজন। মুহূর্তে দড়ি দিয়ে বাঁধা হয়ে যায় বনানীর দু’হাতের কব্জি ও পা। তারপর দুই হাঁটু আর দুই কনুইয়ের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় একটা লাঠি। এরপর দু’টো চেয়ারে লাঠির দুপ্রান্ত রেখে মাঝখানে ঝুলিয়ে দেওয়া হয় বনানীকে। মাথা নীচে, পা ওপরে। এক কনস্টেবল, পুরুষ, এবার লাঠি দিয়ে বনানীর পায়ের তলায় সমানে মারতে থাকে। এত জোর সেই মারের, বনানীর মাথার শিরাগুলো ফুলে উঠে, যেন ফেটে যাবে!

এই মার যখন চলছিল, এসডিপিও ঘরে নেই। মেজবাবু মাঝেমাঝে আসছিলেন, এসেই বনানীর পিছনে লাথি মারছিলেন উন্মত্তের মতো। জ্বলন্ত সিগারেট চেপে ধরছিলেন বনানীর কনুইয়ে, পায়ের তলায়, পায়ের বুড়ো আঙুলের নখে। কেউ কোনও কথা বলছেন না। নীরবে কেবল মেরে যাচ্ছিলেন বনানীকে।
উন্মত্তের মতো চিৎকার করে ঋজু। আশ্চর্য, বনানীর মুখেও কোনও শব্দ নেই। বনানী কেবল যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাচ্ছে, যেন এক্ষুনি অজ্ঞান হয়ে যাবে! ঋজু কোনও শব্দ শুনতে পারছে না কেন? তাকে কি ওরা কোনও কাচের ঘরে বন্দি করে রেখেছে? দু’জন কনস্টেবলের থাবা ছাড়ানো তো দূরের কথা, নড়াচড়া করাও কঠিন।

মার থামে। বনানীকে বাঁধন খুলে, চ্যাংদোলা করে, মেঝেয় শোয়ানো হয়। জলের ছিটে দেন একজন চোখেমুখে। সামান্য বিরতি। তারপর আবার পা বেঁধে, মাথা নীচে, পা ওপরে করে ঝুলিয়ে দেওয়া হয় বনানীকে। একজন কনস্টেবল এবার বনানীর কপালে ঠান্ডা জলের ফোঁটা ফেলা শুরু করেন। ঠান্ডা ফোঁটা দেওয়া শুরুর পরপরই বনানী কেমন মৃগীরোগীর মতো আচরণ করতে থাকে, মুখ দিয়ে ফেনা বেরোতে শুরু করে বনানীর। দম যেন বন্ধ হয়ে যাবে ঋজুর। চিৎকার করতে থাকে সে। কিন্তু কেউ শোনার নেই। হঠাৎ মেয়েটার কথা মনে পড়ে। শালুক কোথায়? ওরা শালুককে কী করল? শা-লু-উ-উ-ক!
আবার বনানীকে নামিয়ে শুইয়ে দেওয়া হয় মেঝেয়। বনানী কি বেঁচে আছে? মাথা সামান্য নাড়াতেই বুঝতে পারে বনানী মরেনি, বেঁচে আছে বনানী। এবার বনানীকে তুলে চেয়ারে বসান এক কনস্টেবল, যে চেয়ারে কিছুক্ষণ আগে বসেছিল সে। পাশের চেয়ারে সেলের কম্বলটা এখনও পড়ে আছে। চেয়ারে বসিয়েছে মানে অত্যাচার বুঝি শেষ হয়েছে। হাঁফ ফেলে ঋজু। কিন্তু না, শেষ হয়নি! বনানীর চুলের মুঠি ধরে কনস্টেবলটি তাকে চেয়ার থেকে টেনে তোলে, তারপর বনানীর মাথাটা দেওয়ালের দিকে ছুঁড়ে দেয়। দেওয়ালে মাথা তীব্র ধাক্কা লাগার ঠিক আগের মুহূর্তে, চুল ধরে হ্যাঁচকা টান মেরে নিজের দিকে নিয়ে আসে কনস্টেবল। এই পদ্ধতি কতক্ষণ চলে কে জানে, বনানীর মুখে গ্যাঁজলা বেরোচ্ছে, চোখ ঠেলে বেরিয়ে আসছে, আর পারে না ঋজু। অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার আগে কেবল কানে আসে একটা কণ্ঠস্বর,
‘বা-বা-আ-আ-ই!’

ছয়.
‘আপনার শরীর কি খারাপ লাগছে মিস্টার সরকার, কফি খাবেন এক কাপ, এক কাপ গরম কফি খান, বেটার লাগবে।’ বেল বাজিয়ে সেন্ট্রিকে ডেকে কফি আনতে বলেন এসডিপিও। তারপর বলেন, ‘পুলিশ হয়েও, টু টেল দ্য ট্রুথ –’ হাসিমাখা দৃষ্টি বুলিয়ে, সামান্য থেমে বলেন এসডিপিও, ‘ওই রিপোর্ট পড়ে আমিও সহ্য করতে পারিনি! আর হ্যঁ, আপনাকে আমরা এতক্ষণ অফিসিয়ালি অ্যারেস্ট করিনি, সামান্য ফর্মালিটিজ, এখন আপনি অ্যারেস্টেড!’

ঋজু হাঁ-করে তাকিয়ে থাকে অফিসারের দিকে।

শীত-নীরবতা ভেদ করে হঠাৎ বাইরে গাড়ির আওয়াজ। একটা গাড়ি এসে যেন থামল। দরজা খোলা ও বন্ধের জোরাল ধ্বনি। ঘরে ঢোকে বনানী, সঙ্গে আরও একজন লোক! শালুকও। বনানীর গায়ে চেক-চেক চাদর। ভদ্রলোক নিজের পরিচয় দেন এসডিপিওকে। আইনজীবী। হতভম্ব ঋজু বুঝতে পারে বনানী উকিল নিয়ে তাকে উদ্ধার করতে এসেছে। বন্ডে সই করেন উকিলবাবু। ঋজু। বনানীও। আগামিকাল আদালতে হাজির হতে হবে। বন্ডের টাকা ও উকিলের টাকা মিটিয়ে ঋজুকে নিয়ে ভোলার অটোতে ওঠে বনানী। অপেক্ষায় ছিল ভোলা।

পথে একটাও কথা বলে না ঋজু। শালুক শক্ত করে ধরে আছে বাবার হাত। শীত, কুয়াশা আর বিভ্রম ভেদ করে এগিয়ে চলে ভোলা।

বাড়ি ফিরে ঋজু এগিয়ে যায় বেসিনের দিকে। ওয়াক ওঠে। বার তিনেক ওয়াক-ওয়াক করার পর সামান্য টকজল আর ভাত বেরোয়। সোফায় এসে বসে। মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় মেয়ে। নিস্পন্দ দাঁড়িয়ে থাকে বনানী। ঋজু খোঁজার চেষ্টা করে বনানীর পায়ের কালশিটে, কনুইয়ের ছ্যাঁকা! বনানীর মুখ দিয়ে কি গাঁজলা বেরোচ্ছে?

ওর গায়ে চেক-চেক চাদর নাকি রোঁয়া-ওঠা কম্বল? সেলের কম্বল!
ওয়াক ওঠে ফের। বেসিনের দিকে আবার এগিয়ে যায় ঋজু। ·


লেখক পরিচিতি : দেবতোষ দাশ কথাসাহিত্যিক। জন্ম সত্তুরের দশকে, পশ্চিমবঙ্গে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তুলনামূলক সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। প্রকাশিত উপন্যাসের সংখ্যা আট। গল্প সংকলন দু্টি। লেখেন নাটকও। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ