কী দেখে মানুষ ধ্বংসের ভিতর? চিতার গভীরে কোন আলোর লাশ খোঁজে? তারপর ধাতব দরজা! বন্ধ হয়ে যায় প্রিয়জনের শরীরের উপর! তখন সবাই হাডল করে দাঁড়ায়। চোখ ভরে আগাছা। লতাগুল্মে ঢেকে যাওয়া দৃষ্টি তবু বহাল। সময় এগিয়ে চলে, গুঁড়ি মেরে, নিঃশ্বাসহীন, কাহিনীহীন গদ্যের চুপিসারে! কাহিনি ভুলে যাওয়া গদ্য কি সত্যিই নিঃশ্বাসহীন নাকি প্রগাঢ় প্রশ্বাসে ডুম-স্ক্রোলিং চলতে থাকে? জঙ্গলের মধ্যে, পাহাড়ের মাঝে উপত্যকায়, মরে যাওয়া শহরে অথবা নির্জন কোন উপকূলবর্তী বাড়িতে : ভাঙা, পোড়ো! ভাঙা ভাষায় লেখা পোড়ো গদ্যের মতন!
কী দেখে মানুষ পরিত্যক্ত বাড়িঘরে? ফেলে আসা জিনিসপত্রের ফাঁকে? ছাদ ভেঙে পড়ছে একাকী পিয়ানোর ওপর! সিঁড়ির দল ওঠানামা করতে ভুলে গেছে। টেবিল চেয়ারগুলো অসহায় অপেক্ষায়, কবে সময় নিয়ে যাবে তাদের। কেউ তাদের খেলতে ডাকছে না আর। ধুলোর আদরে বিস্মৃত অনেক দিন আগের মরচে পড়া গাড়ি। এহেন পরিসরে নিজের অবশেষ খোঁজার ভ্রান্তি ছেড়ে যেতে যায় না। সে ভ্রান্তি নিজের অজান্তেই একদিন আলিঙ্গন হয়ে ওঠে অন্ধকারে।
ইন্সটাগ্রামে অ্যাবানডন সিকারস জাতীয় নামের একাধিক অ্যাকাউন্ট রয়েছে যেখানে নানা দেশের বিভিন্ন পরিত্যক্ত জায়গার ছবি আপলোড করা হয়। বিলীয়মান, বিনির্মীয়মান সেসব প্রাসাদ-বাড়ি-অট্টালিকা সময়ের গলনচিহ্নের মত একেকটা দালি-ঘড়ি! তাদের দেখতে দেখতে এই গদ্যের নামহীন চরিত্রের চোখে ঘোর লেগে যায়। তার স্বপ্নে হানা দেয় এইসব ভিরানা। ছবিমাত্রেই চুপ কিন্তু এই নির্জন জায়গার ছবিগুলোতে অন্য এক নিরবতা খুঁজে পায় সে। এমন এক নিরবতা যেখানে একসময় শব্দ ছিল। শব্দের ইতিহাসকে মনে করিয়ে দেওয়া এই চুপিসার সাধারণ ফটোগ্রাফিক সাইলেন্সের থেকে আলাদা। এই জায়গাগুলোতে একসময় মানুষ থাকত। গাড়ির শব্দ, পিয়ানোর শব্দ, চেয়ার টেবিল সরিয়ে খেতে বসার শব্দ, ঝগড়া করার শব্দ, আর তারপর অনেক বছর পর স্তব্ধতা। মোগল সাম্রাজ্যের পতনের কারণ কেউ জানে না।
সরব থেকে অরবে পরিবর্তন দিব্যি মানিয়ে গেছে লোকটার সঙ্গে। এই রদবদলে নিজের জীবনের প্রবাহপথ দেখতে পায় সে। তার জীবন ক্রমে ক্রমে পোড়ো হয়ে উঠেছে। বাসা বেঁধেছে নিরবতা। লোকজন আর ভালো লাগে না। অতি-সামাজিক সে কোনোদিনই ছিল না কিন্তু আজকাল প্রায় অসামাজিক হতে ইচ্ছে করে, কাজের প্রয়োজনের বাইরে। ঐসব জায়গায় যায়নি বা তার কাছে নয়নাভিরাম ছবি না থাকলেও নিজেকে একজন অ্যাবানডন সিকার মনে হয়। দিনরাত ইন্সটাগ্রামে পড়ে থাকে ঐসব অ্যাকাউন্টগুলোতে। কখন নতুন ছবি চলে আসে! মিস করে গেল না তো? নতুন আপডেট না আসলে পুরোনো পোড়ো ছবির মধ্যে নিজের পোড়ো হয়ে ওঠা জীবনের নির্যাস খোঁজার প্রকল্পে নিরত থাকে আমাদের এই ছবিমানুষ।
এইসব ছবিতে কোন মানুষ থাকে না। অন্য কোন প্রাণীও চোখে পড়ে না। অথচ প্রকৃতিও বিশেষ নেই। যা আছে তা মূলত মনুষ্যকৃত কিন্তু বর্তমানে মানবহীন। পোড়ো গদ্যের মত সেসব স্পেস কাহিনীহীন হয়েও বারবার জানান দিচ্ছে যে কাহিনী একটা ছিল কিন্তু তারপর একদিন সে গল্প যেদিকে দুচোখ যায় চলে গেল। লোকটা তাকে আটকায়নি। সে জানত ওকে আটকানো যাবে না। ছবিতে বিভোর হয়ে ত্যক্ত স্থানিকতায় আসক্ত ছবিমানুষ ঐসকল জায়গায় নিজেকে দেখতে শুরু করল। ঠিক ঠাহর হল না স্বপ্ন নাকি বাস্তব সেই দেখা। দালি-ঘড়ি গলে যেতে লাগল স্বপ্ন আর বাস্তবের মধ্যিখানে। পলেস্তারা ওঠা দেওয়ালের সামনে, তুলো বের করা গাড়ির সিটে, পিয়ানো-চেয়ারে, ফুটো হয়ে যাওয়া কার্পেটের ওপর, সিঁড়ির শরীরে এক যুগ পর উঠে আসা পদধ্বনির মত, প্রত্যেক ছবির ভেতর নিজেকে দেখতে পেতে লাগলো লোকটা। ছবির ভেতর সেঁধিয়ে যাওয়াটা তাকে বনলতা সেনের মত দুদণ্ড শান্তি দিতে পারতো কিন্তু তার বদলে এই ঘটনায় আমাদের ছবিমানুষ বিরক্ত হয়ে উঠতে লাগলো। মনে হল, সে ছবিগুলোর নিরবতা ভেঙে দিচ্ছে। ফাঁকা জায়গায় মানুষ ঠুকে পড়লে অ্যাবানডন কি আর অ্যাবানডন থাকে? নিজের ফ্যান্টাসিতে রাগান্বিত ছবিমানুষের এবার নিজেকে অ্যাবানডন ব্রেকার মনে হতে লাগল।
কয়েক মাসে অন্তত হাজারখানেক ত্যক্তছবি দেখার পর লোকটার মাথায় এক সমাধানসূত্র এল। মাথায় এলো নাকি কানেকানে কেউ ফিসফিসিয়ে বলে গেলো, বলা মুশকিল। যেভাবেই হোক, সব ছবির ভেতর খোলা-বন্ধ চোখ নির্বিশেষে নিজেকে দেখে ফেলার এই নারসিসিসটিক গেরো থেকে বেরোতেই হবে। ছবিগুলো চোখের সামনে থেকে সরিয়ে কেবল মগজের ভিতরকার মাল্টিপ্লেক্সে রেখে দিলে কেমন হয়? তাহলে কি ছবিগুলোর ভেতর ছবিমানুষের এই অযাচিত অনুপ্রবেশ বন্ধ হবে? চেষ্টা করে দেখতে ক্ষতি নেই! লোকটা ইন্সটাগ্রাম অ্যাকাউন্ট ডিলিট করে দিল। সেদিন রাতে ঘুম একটু দেরি করে এল কিন্তু যখন এল, গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। কিন্তু না, মনে করার মত কোন স্বপ্ন সে দেখল না। স্বপ্নে জনহীন কোন উপত্যকা, কোন হানাবাড়ি উঁকি দিল না। সকালে ঘুম থেকে উঠে লোকটা ভাববার চেষ্টা করলো, মনে করার চেষ্টা করলো, অ্যাবানডন সিকারদের ছবির স্তিমিত দৃশ্যসকল। আশ্চর্যের বিষয় একটা ছবিও সে মনে করতে পারলো না! ছবির মধ্যে সে ঢুকবে নাকি ঢুকবে না, সে তো পরের কথা! তার আগে দেখতে হবে ছবিগুলো আছে না নেই! ত্যক্তছবিগুলোই তার স্মৃতির স্ক্রিন থেকে নেই হয়ে গেছে। অথচ এত মাস ধরে বুঁদ হয়ে ছিল সেইসব ছবিতে! আউট অফ সাইট হতেই আউট অফ মাইন্ড! কেন জানি না আর ইন্সটাগ্রামে ফিরে যেতে ইচ্ছে করলো না। যাক যা গেছে তা যাক! এতোই যদি ঠুনকো হয় সেসব ছবি তার নিজের মনের কাছে, তবে দরকার কি আর ফেরত যাবার?
চিত্রক্ষণিকত্বের বোধে পীড়িত ছবিমানুষ একদিন সন্ধ্যারাতে বাড়ির ছাদে উঠে আকাশ দেখছিল। আকাশের থেকে বড় অ্যাবানডন আর কি হতে পারে? অথচ সেখানে প্রাণের সম্ভাবনার কথাও উড়িয়ে দেওয়া যায়না! এতশত তারা, গ্রহ, উপগ্রহ, সৌরজগৎ, অথচ ন্যাড়া চোখে সব কেমন নিষ্প্রাণ! ঘাড় উঁচু করে স্টারগেজ করতে থাকা ছবিমানুষের নিরবতা ভেঙে কোনোদিন কি কোন ভাঙাচোরা বুড়োগলা কিম্বা আধোশব্দের শিশুকণ্ঠ তাকে শুধোবেঃ ‘তারা দেখছো?, আমিও তারা দেখতে ভালোবাসি’? কে সেই বৃদ্ধ অথবা শিশু? কোন সময় সাক্ষাৎ দেবে তারা? অবলোকনের নিরবতা কি ভাঙতে পারবে তারা? নাকি আদৌ এমন কোন কণ্ঠ শোনা যাবে না কোনোদিন?
কি দেখে মানুষ সৃষ্টির আঁতুড়ঘরে? আকাশগঙ্গায় ভেসে কোথায় চলে যেতে চায় অপলক দৃষ্টি? অন্যত্র প্রাণপৃথিবী খুঁজে উপনিবেশ গড়বার দুরাশা পেয়ে বসে বিনির্মীয়মান মনে। পোড়ো গদ্য ত্যক্তছবির মত। গল্প হতে হতেও হয়না! গল্প নক্ষত্রবীথির অপরপারে যাত্রা করেছে। পরিত্যক্ত গদ্য ইন্সটাগ্রামের পর্দায় উই খাওয়া গল্পের অবশেষ ধরে রাখতে চাইছে অন্য আরেক সৌরমণ্ডলের অপেক্ষায়। ·
লেখক পরিচিতি : অর্ক চট্টোপাধ্যায় এই শতকের প্রথম দশকে লেখালেখি শুরু করেন। পেশায় অধ্যাপক। পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলার উত্তরপাড়ার স্থায়ী বাসিন্দা। পেশাসূত্রে বাস করেন গুজরাতের গান্ধীনগরে। সম্পাদনা করেছেন ‘অ্যাশট্রে’ পত্রিকা। প্রকাশিত গল্প ও উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে : পিং পং গন্ধ, সাইজ জিরো, অলিখিত হ্রস্বস্বরের সন্ধানে, উপন্যস্ত, আতশবাজি ছায়াপথে ফিরে যাও।


0 মন্তব্যসমূহ