would be as futile as driving a nail in the sky."
পাহাড়ের গা জড়িয়ে ধীরে ধীরে সন্ধে নামছে। সূর্য ডুবে গেছে অনেকক্ষণ কিন্তু তার আলো এখনও পুরোপুরি হারিয়ে যায় নি। পাহাড়ের সন্ধ্যা আশ্চর্যজনক! সূর্য বড় পাহাড়ের ওপারে চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘন কালো হয়ে ওঠে পাইনগাছের শরীর। গাঢ় সবুজে নেমে আসে কালো অন্ধকার। পাহাড়ের রহস্য, রোমাঞ্চ এবং হালকা আঁধার মিলেমিশে আশ্চর্য রং। সেই রং রচনা করে খেলাঘর সমগ্র উপত্যকা জুড়ে।
যারা যারা ভিক্ষায় গেছিল তারা এখনও ফেরে নি। ফিরবে। বুদ্ধ আছেন তাদের সঙ্গে। তিনিই তাদের পথ দেখিয়ে ফিরিয়ে আনবেন মঠে। এতক্ষণে নিশ্চয়ই রাস্তায় আছে তারা। যারা ভিক্ষায় যায় নি তারা মঠে প্রার্থনার আয়োজন করছে। প্রার্থনা চক্র ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পশমের কাপড়ে মুছে দিচ্ছে ক্ষুদ্রতম ধূলিকণাটিকেও। তেল দিচ্ছে যাতে ঘুরতে পারে ভালোভাবে। কেউ আবার খালি পাত্রগুলিতে জল ভরে দিচ্ছে। উঠোন ঝাট দিচ্ছে কেউ। কেউ কেউ মঠের শিশুভিক্ষুদের বিদ্যাভ্যাস করাচ্ছেন। ভিক্ষার অন্ন নিয়ে ফিরে এলে ভিক্ষু ভিক্ষুণীর দল রান্না চাপাবে।
গোধূলি বেলায় মঠের শিশুরা ছুটে বেড়াচ্ছে এদিক ওদিক। তাদের দিকে তাকালে মনে হয় পৃথিবী কত উচ্ছল। জল, বায়ু, আকাশের মতো। একটু পরেই প্রার্থনা শুরু হবে। স্বাগত জানানো হবে অন্ধকারের রহস্যকে। পবিত্র মন্ত্রে পাহাড় আরও পবিত্র হয়ে উঠবে। স্থির, শান্ত। হিংস্র পশুরা হিংসা ভুলে যাবে। চিতা নেকড়ের দল শিকারের প্রতি দয়া দেখাবে! তারাও জানে বুদ্ধ তাদের অহিংস হতে বলেছেন। ইরা হাতে প্রদীপের সলতে নিয়ে সবকিছু দেখছে। পাইনবনের দিকে উড়ে যাচ্ছে কত নাম না জানা পাখি! আলো কমে আসছে। সবাই আশ্রয় চায়। আশ্রয়ে ফেরে। এ সমস্ত দৃশ্যের সামনে মুদিত চক্ষু বুদ্ধ! শান্ত, সমাহিত।
সবাই জানে, বুদ্ধ আছেন। বুদ্ধ তাদের অমঙ্গল কিছু চান না। অমঙ্গল হতে দেবেন না।
ইরা সারাদিনে মাত্র দু'চারটি শব্দ বলেছে আজ। তাও অতি প্রয়োজনে। 'আচ্ছা'; 'এসো' 'উঁহু'— উঁহু শব্দটাকে শব্দ বলা যাবে কী না; এটা নিয়ে ইরা যদিও নিশ্চিন্ত নয়; তবু সে এটাকে একটা শব্দ হিসেবে এখন ধরে নিচ্ছে। আরেকটি শব্দ কী ছিল, সেটা সে এখন মনে করতে পারছে না। এই ভুলে যাওয়াটা তার বেশ কিছুদিন ধরে হচ্ছে। এবং সে আজকাল বড় অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছে। যেটা হওয়া উচিত নয়, সেরকম কিছু হলে বড় তাড়াতাড়ি চোখে পড়ে। মনেও। ইরা নিজেকে নিয়ে নিজেই ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ছে। মনের ভেতর এত অস্থিরতা ভালো নয়। সে বুদ্ধের চোখের দিকে তাকাল। বুদ্ধ ধ্যানস্থ। ইরার চোখের সঙ্গে তাঁর চোখের মিলন হল না। এতে ইরা খানিকটা হলেও আশ্বস্ত বোধ করল। সে প্রদীপ গুছানোর কাজে মন দিল এব্বগ সলতেগুলো সরু এবং কঠিন করে ঘিয়ের মধ্যে ভিজিয়ে দিল। তুলো কঠিন হলে অনেকক্ষণ জ্বলে!
সকালবেলা, ইরা ভেবেছিল তার এই অশান্ত মনকে শান্ত করার জন্য, বুদ্ধের কাছাকাছিই আজ সারাদিন থাকবে। বুদ্ধই পারবেন তাকে শান্ত করতে। তাছাড়া বুদ্ধ তো অন্তর্যামী। হৃদয় পড়তে পারেন। নিশ্চয়ই ইরা কাছাকাছি থাকলে, তিনি ইরার হৃদয় দেখতে পাবেন। ইরার অবস্থা বুঝে কিছু একটা উপায় নিশ্চয় বলে দেবেন!
অনেকদিন পর আজ তাকে ভিক্ষার জন্য পাহাড়ের গ্রামগুলোতে যেতে হয় নি। অনেকদিন পর তার মনে হল, একটা ছুটির দিন। ইরা যখন স্কুলে পড়ত, সারা সপ্তাহের ক্লাসের পর রোববারকে মনে হত উন্মুক্ত ডানা। আজ তার সেরকম লাগছিল। অবশ্য তাকে আগামীকালও ভিক্ষার জন্য যেতে হবে না। বিগত দিনগুলোতে সে অনেক ভিক্ষা সংগ্রহ করেছে। তাই হয়তো মঠাধ্যক্ষ দু'দিন তার জন্য ভিক্ষাবিরতি ঘোষণা করেছেন। এই ঘোষণা নিশ্চয়ই সম্মানের। আনন্দের। বাকি ভিক্ষুণীর দল যখন ইরার দিকে তাকিয়েছিল, তখন কি ইরার হৃদয় খানিকটা হলেও প্রসারিত হয় নি! হয়েছিল বৈকি! এই আত্ম অহংকার বুদ্ধের নীতির বিরুদ্ধে জেনেও এটা হয়েছিল। ইরা বহুদিন এই মঠে আছে। যখন তার বয়েস ষোল তখন থেকে।
কিন্তু এত বছর, আজ যখন সে বিয়াল্লিশ, একটা স্বপ্ন তাকে হঠাৎ করেই বুদ্ধ থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে না তো! সে আরেকবার সন্ধের প্রদীপ পরিষ্কার করতে করতে বাইরের দিকে তাকাল। সন্ধে নেমে এসেছে প্রায়! নিশ্চয়ই ভিক্ষু-ভিক্ষুণীর দল ভিক্ষা সংগ্রহ করে মঠে ফিরে এসেছেন!
সে প্রদীপ জ্বালিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল মঠাধ্যক্ষের। তিনি এলেই প্রার্থনা শুরু হবে।
বুদ্ধের সামনে চোখ বন্ধ করে বজ্রচেধিক সূত্র আবৃত্তি করতে শুরু করল—
"এভাবেই... এভাবেই ঠিক
এই ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীতে-
ভোরের তারার মতো,
নদীর বিনুনিতে আটকে থাকা একটি বুদবুদ,
মেঘের চাওয়ার মতো বিদ্যুৎ চমকায়,
একটা ঝিকিমিকি বাতি, অথবা একটা ভূত,
অথবা একটি ভুলে যাওয়া স্বপ্ন... তথাগত! তথাগত! "
স্বপ্নের কথা মনে আসতেই সে আবার চমকে উঠল। তার শরীর শীতল হতে আরম্ভ করল।
জৈষ্ঠ্য দুপুর
এ শরীর শেতল
গরম কিন্তু
ইরা ক্রমশ নদী হয়ে উঠছে। স্বচ্ছ সবুজ পাহাড়িয়া নদী। ঝরঝর কলকল শব্দ। তার মনে হচ্ছিল, তার শরীরের জমে ওঠা মেদ ঝরে গেছে অনেকটা। প্রৌঢ়ত্বের আলস্য কেটে যাচ্ছে। সে যেন আবার সেই ষোল বছরের তরুণী হয়ে উঠছে। উচ্ছল, উন্মুক্ত জলের মতো। লাফিয়ে লাফিয়ে ছুটে চলা ঝিলম, তিস্তা কিংবা...
হঠাৎই সে বুঝতে পারে ঊরু সঙ্গম চ্যাটচ্যাটে। ভেজা। যেটা সে এই মুহূর্তে কিছুতেই চাইছিল না, তাই সে খানিকটা বিরক্ত হল। মনের মধ্যে ক্রোধকে জাগিয়ে তোলা ঠিক নয়! মনে মনে সে বুদ্ধের কাছে বলল,
—বুদ্ধ ক্ষমা করো! তুমি ভুলে যেও না, আমি তোমার ভিক্ষুণী। কিন্তু তার আগে আমি একজন নারীও... ক্ষমা করো...
তারপর সে ভাসতে ভাসতে চলল সমতলের দিকে। নদীর জল খানিকটা লাল হয়ে উঠল! কিন্তু সমতলে পৌঁছানো কী এত সোজা! মাঝে মাঝে পাথর, কাদা, বালি। গাছের শেকড়ে জড়িয়ে গেল চুল। কোষাবস্ত্র ছিঁড়ে ফালা ফালা হয়ে গেল! তার খোলা স্তনে ছোট ছোট মাছের দল এসে সুড়সুড়ি দিতে লাগল। তার নাভির কাছে চুপ করে বসে থাকল একটি ছোট্ট শামুক। ইরা বহুদিন পর তার শরীরের দিকে তাকাল। একবার তার মনে হল, শরীর সুন্দর! শরীর ছাড়া আত্মা অধুরা। শরীরকে চেনা উচিত। সে মনে মনে শিহরিত হল। কেঁপে উঠল ইরা।
কিন্তু ভেসে যাওয়া থামল না তার! উলঙ্গ শরীরে জল-স্পর্শের গভীর শিহরণ তাকে অবশ করে দিল। পার্থিব ও শারীরিক সুখকে পুরোপুরি অনুভব করার জন্য সে তার চোখ বন্ধ করে শুধু ভেসে যেতে চাইল! পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে!
চোখ খুলে দেখে, সমতলে পৌঁছে গেছে। তার চোখের ওপর চোখ রেখে তাকিয়ে আছে আরও দশ বারোটি চোখ। ষোল বছর বয়েসের বান্ধবীদের দল। ইশা, কামিনী, মোহু সবাই। ইরা বাকিদের নামগুলো পর্যন্ত ভুলে গেছে। সে মনে মনে লজ্জিত হল। তারা ইরাকে একটা পোশাক দিল। ইরা বুঝতে পারল, বান্ধবীরা সবাই বনভোজনে এসেছে। বনের কাঠে আগুন জ্বালিয়েছে। আগুনের ধিকিধিকি আঁচে সেদ্ধ হচ্ছে বুনো শুকরের মাংস। নরম। তুলতুলে। একটা শ্যাম্পেনের বোতল খুলছে মোহু। পাশে পড়ে আছে সিগারেটের প্যাকেট। তারা ইরাকে খানিকটা শ্যাম্পেন ঢেলে দিল একটা গ্লাসে। পাতার প্লেটে শুকরের মাংসের একটা স্লাইস। ওপরে খানিকটা গোলমরিচের গুঁড়ো ছড়িয়ে দিল। এসব খাওয়ার পর ইরা বুঝতে পারল, সে তার শরীরের উষ্ণতা ফিরে পাচ্ছে। এখন তার খুব ইচ্ছে করছে সিগারেটে একটা ফুঁ দিতে।
বান্ধবীরা ততক্ষণে সবাই পোশাক খুলে ফেলেছে। আগুনের চারপাশে ঘুরে ঘুরে নাচছে। যেহেতু সেখানে কেউ পুরুষ ছিল না, ইরাও তাই করল। পোশাকছাড়া নাচে সবাই যেন এক একজন স্বর্গ থেকে নেমে আসা পরী। সবাই খুব খুব হাসছিল। হাসির শব্দে ফুটে উঠছিল ব্রহ্মকমলের পাপড়ি। পাইনজঙ্গলের ভয় পালাচ্ছিল।
আর তখনই, ইরা আশ্চর্য হয়ে দেখল, সে বিয়াল্লিশে পৌঁছে গেলেও বান্ধবীরা সেই ষোলতে আছে। তাদের চকচকে ত্বক, মাথা ভর্তি চুল, মুখে চোখে হাসির লহর। তারা তাদের প্রেমিকদের কথা বলছে। প্রেমিকদের কথা বলতে বলতে তারা হয়ে উঠছে একেকটি আশ্চর্য তিতলি। হলুদ, লাল, সবুজ, নীল...
—সাঁতার জরুরি জীবনে...
—কিন্তু বুদ্ধ এসব পছন্দ করেন না...
—বুদ্ধ কী কখনো সৃষ্টির বিরুদ্ধে যেতে চেয়েছেন?
—হয়ত না... তবু
—বুদ্ধ জীবনকে জানতে চেয়েছেন...
—ভিক্ষুণীরাও তাই করে
—তারা জীবনকে উপেক্ষা করে যায়...
ইরা কিছু বলল না আর। তাকে আরও মৌন হতে হবে। কোনও কথার উত্তর দেওয়া উচিত না। উত্তর নেইও। শুধু চুপচাপ দেখে যাওয়া আর সমগ্রের সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে নেওয়া।
মঠের প্রার্থনা ঘন্টায় ঘুম ভেঙে গেল। সে বুঝতে পারল ঊরু সন্ধিক্ষণে চটচটে দাগ ছাড়া বাকি সব ভ্রম।
আসলেই তোমাকে
গভীর করে"
সেদিনের স্বপ্নের পর ইরা আর ইরা ছিল না। স্বপ্ন আসলে যে অবচেতন মনের ঘটনা, সে এতদিন ধরে সেটাই জানত! আর জানত বলেই মনে মনে মরমে মরে যাচ্ছিল। তার শরীরটা কয়েকদিন ধরে অসুস্থ! ভিক্ষার পালা এলেও সে ভিক্ষার জন্য যায় নি। মঠাধ্যক্ষের কাছে নিজের অক্ষমতার কথা জানিয়েছে। মঠাধ্যক্ষ তাকে অন্য কাজ দিয়েছেন। প্রার্থনা ঘরের কাজ। বুদ্ধের সম্মুখে বসে কাজ। ইরা দিনভর বুদ্ধের সেবায় নিয়োজিত থেকেছে। মৌনতা এবং নির্জনতা পালন করছে।
সকালের প্রার্থনার পর, মঠ মোটামুটি খালি। কেউ বা ভিক্ষার জন্য বেরিয়ে পড়েছেন। কেউ বা নিজ পাঠে অধ্যয়নরত। কেউ কেউ বাগানের ফুল, ফল এবং সব্জি গাছগুলোর দেখাশোনা করছেন। শিশুরা এখন পাঠাভ্যাস করছে। মঠ প্রাঙ্গণ নির্জন। একটা পাহাড়ি পাখি ডাকছে। দূরের ঝর্ণার শব্দও শোনা যাচ্ছে।
ইরা এককাপ চা এবং এক টুকরো কেক নিয়ে বসল খোলা জানলার কাছে। এই অবসরটুকু তার কাছে নিজেকে যাচাই করে নেওয়ার মোক্ষম সময়। সে মোটামুটি কেকের টুকরোটি শেষ করে ফেলেছে। চায়ের কাপে চুমুক দেবে। জিরা, আদা, গোলমরিচ, সামান্য বিটনুন দিয়ে এই চা। খুব ভালো লাগে তার। বাইরের আকাশ আজ খুব সুন্দর! অবশ্য পাহাড়ে নিশ্চিয়তা কিছু নেই, এখুনি হয়তো ঝেঁপে বৃষ্টি আসবে!
"শীত এলেই
তোমার পদচিহ্ন
বরফে ফোটে"
আর তখনই সামনের গেটে কোলাহল শোনা গেল। প্রথমে সে ভেবেছিল কোনো দুঃস্থ তার দুঃখের খবর নিয়ে বুদ্ধের কাছে ছুটে এসেছে। কিন্তু ওটা কোনও একা মানুষের কান্না ছিল না। ইরা খানিকটা আশ্চর্য হল। চা ফেলে ছুটে গেল সদরের দিকে।
পাহাড় প্রদেশের গাঁয়ের লোকজনও ছিল। তারা মেঘাকে পাঁজাকোলা করে বয়ে আনছিল। মেঘার ঊরু সন্ধিক্ষণে চ্যাটচ্যাটে রক্ত। গেরুয়া বস্ত্রে পেঁজা পেঁজা রক্তের দাগ। মেঘার হাত দু'টো ঝুলে পড়ছিল নীচে! শুধু এটুকু বোঝা যাচ্ছিল, মেঘার জ্ঞান নেই।
মেঘা এই মঠে ভিক্ষুণী হয়ে এসেছে মাত্র তিনবছর। কিন্তু সে ইরার বন্ধু হয়ে উঠেছিল। যখনই মনখারাপ হত ইরার কাছে এসে বসে থাকত। মেঘার বয়েস ঊনিশ। তার বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ে। বড় দুই ভাই। মেঘার বাবা একজন প্রতিষ্ঠিত বিজনেস ম্যান। মেঘা বলেছিল, সে ভিক্ষুণী হোক তার বাড়ির কেউ-ই এটা চাননি। কিন্তু বুদ্ধ চেয়েছিলেন। বুদ্ধ চেয়েছিলেন এবং এই ইচ্ছের কথা মেঘার স্বপ্নে বারবার বলতেন। মেঘা বুদ্ধকে স্বপ্নে দেখেছে এবং বুদ্ধের ইচ্ছেয় সে ভিক্ষুণী হয়েছে এই তথ্যটি মঠের মঠাধ্যক্ষও জানতেন। মেঘা এটা ভেবে নিশ্চিন্ত থাকত, বুদ্ধ নিশ্চয়ই কোনও মহৎ উদ্দেশ্যের কথা ভেবে তাকে ভিক্ষুণী হতে বলেছেন। মঠের সবাই মেঘাকে আগলে রাখার চেষ্টা করতেন। মেঘা খুবই নরম, শান্ত এবং সুন্দর একটা মেয়ে। সে আজ সকালে বাকি ভিক্ষুণীদের সঙ্গে ভিক্ষায় গেছিল পাহাড় তলির গ্রামে।
আর হঠাৎই এই ঘটনা! অজ্ঞান। অর্ধমৃত। রক্তে ভেসে যাওয়া ঊরুক্ষেত্র।
—তারা কি পর্যটক ছিল?
—কী ফারাক পড়ে তাতে? কিন্তু বুদ্ধ কী তবে দেখছেন না...
—তোমরা কি তাদের ধরতে পেরেছ?
—বুদ্ধ তবে কি তাদের শাস্তি দেবেন না?
—মেঘাকে বুদ্ধ নিয়ে এসেছিলেন এই মঠে। বুদ্ধ ছাড়া সে কিছুই জানত না!
ইরার শরীর গুলিয়ে উঠল। বমি পাচ্ছিল। নড়তে পারছিল না। ভিক্ষু-ভিক্ষুণীর দল ছোটাছুটি আরম্ভ করে দিল। মঠাধ্যক্ষ স্থির, নির্বাক, অসহায়!
—গরম জল আনো...
—শুকনো কাপড়...
—বিশল্যকরণী লতা বেটে আনো...
—এরা কি শয়তান একজন ভিক্ষুণীকেও ছাড়ে না!
—এরা নারীখাদক...
সেদিন সন্ধের প্রদীপ জ্বালানো হল। প্রার্থনা মন্ত্র ছড়ালো না মঠের বাতাসে। এক গুম মারা, দমবন্ধ বাতাস ঘুরে বেড়াল চারপাশে।
পরের দিন ভোরবেলায় জ্ঞান ফিরল মেঘার। সে তার সন্ন্যাসিনী বেশের দিকে তাকাল। অর্ধমুদিত চক্ষু বুদ্ধের দিকে। তার নিশ্বাস ফুলে ফুলে উঠতে লাগল। হৃদয়ের শব্দ শোনা যাচ্ছিল গেটের বাইরে পর্যন্ত। সে তার সর্বশক্তি দিয়ে শেষবারের মতো চিৎকার করে বলল,—তারা আমার সঙ্গে যা যা করল, এসবও বুদ্ধের ইচ্ছা? বলো, ইরা মা বলো...
উত্তরহীন প্রশ্নচিহ্ন বড় কঠিন, কঠোর এবং নির্বাক... ·
লেখক পরিচিতি : বেবী সাউ-র জন্ম ২৯ অক্টোবর, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ঝাড়গ্রামে। থাকেন জামশেদপুরে। ওখান থেকেই বাংলা এবং ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। পিএইচডি। বর্তমানে সাউথ এশিয়া জার্নাল (নিউ জার্সি, আমেরিকা)-এর অ্যাসোসিয়েট এডিটর এবং জামশেদপুর আকাশবাণীতে কর্মরত। তিনি বাংলা, হিন্দি এবং ইংরেজিতে নিয়মিত লেখালেখি এবং অনুবাদের কাজ করেন। সম্পাদনা করেন ‘আবহমান’ পত্রিকা। তাঁর এ পর্যন্ত আঠেরোটি কাব্যগ্রন্থ, তিনটি প্রবন্ধগ্রন্থ, দুটি উপন্যাস এবং ৬টি অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।


3 মন্তব্যসমূহ
গল্পটি ভালো। চমৎকার লেগেছে স্বপ্ন দৃশ্য।
উত্তরমুছুনnice to meet u
উত্তরমুছুনপড়লাম। পরিবেশ-প্রতিবেশ চমৎকারভাবে বর্ণিত হয়েছে।
উত্তরমুছুন