রুখসানা কাজলের গল্প : অন্ধ চৈতন্য


এ অঞ্চলটা যেন ছিটমহল। জুলাই অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের মানচিত্র থেকে এই অঞ্চলকে ছেঁটে ফেলার ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। ক্ষমতাসীন সরকারের আকস্মিক পতনের পর অতিরিক্ত তুচ্ছতাচ্ছিল্যেসহ নানারকম আজেবাজে মন্তব্য করা হচ্ছে বিশেষ এই অঞ্চলটি নিয়ে। মন্তব্য যারা করছে তারা ফোকটে ক্ষমতা দখলকারীদের সমর্থক হলেও আদতে পতিত সরকারের কট্টর বিরোধী এবং স্বাধীন বাংলাদেশের বিপক্ষ শক্তি। এদের টার্গেট পতিত সরকার হলেও চুয়ান্নো বছরের পুরনো ক্ষোভ জমে আছে স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি সেই মহান নেতার বিরুদ্ধে। যাঁর জন্ম এই অঞ্চলের মাটিতে। যাঁর একটি আঙুল সহস্র কলমের শক্তি হয়ে একাত্তরে বাঙালির রক্ত মাংস হৃদয়ে লিখে দিয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের নাম।

পুকুরের পানিতে সাবান মাখা শরীর রগড়াতে রগড়াতে আশফাক মুন্সি বলে, ‘ভ্যালা বুঝিছে শালারা। এই বৈষম্য নিয়ে এরা দেশ শাসন করতি আসিছে নাকি অন্য কোন উদ্দেশ্য আছে এটা আমাগের বুঝতি হবেক দুদু।’ মুকুল খাঁ আশফাকের কথায় মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়, ‘শালার বাঙালি যদি ইডা বুঝত রে ভাগ্নে। হুজুগে মাতাল বাঙালির জাত। বেজন্মা মুশতাক হয়িছে সবাই।’

রাগে গজরাতে গজরাতে রয়নাতলার খাটালে গিয়ে বসে মুকুল খাঁ। আগে থেকেই সেখানে বসে আছে ইলিয়াস মুন্সি, বাসু মোক্তার, রমাপদ মন্ডল, শিবশংকর মৈত্র, নজির মিয়া, মিন্টু সাহা। সবার মুখেই চিন্তার ছাপ। দেশে হচ্ছেটা কি ?

এ অঞ্চলের শহর এবং গ্রামের মানুষরা কদিন ধরেই ঘুমহীন রাত কাটাচ্ছে। এক ইঞ্চি মাটি নেই যেখানকার মানুষ ‘কপালে যা আছে হবে’ বলে হাত গুটিয়ে বসে রয়েছে। সবাই তপ্ত গরম। উত্তেজনার উত্তুংগ শিখরে। মার খেয়ে মরার প্রতিজ্ঞায় উজ্জীবিত। প্রতিরোধের আগুনে উদ্দাম হয়ে সবাই ছুটে বেড়াচ্ছে গ্রাম থেকে গ্রামে। একমাত্র বিশ্বরোড খোলা রেখে অন্যান্য রাস্তাগুলো ব্লক করে ছেলে ছোকড়ারা দিনরাত পাহারা দিচ্ছে। যারা বিশেষ কোন দল বা রাজনীতি করত তারা কেউ স্পটে নেই। সবাই পলাতক কিম্বা গ্রেফতার হয়ে গেছে। তাতে স্থানীয় জনগণের প্রতিরোধ প্রক্রিয়ায় কোন বিচ্যুতি হয়নি। স্বতস্ফূর্তভাবে প্রতিরোধ চলছে। আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে এই প্রতিরোধ যারা সংগঠিত করছে তারা সবাই সাধারণ মানুষ। ক্ষুদ্র মানুষ। মাঝারী মানুষ। ধনী মানুষ। গরিব মানুষ। মুসলিমের সাথে হিন্দু, হিন্দুর সাথে খৃষ্টান সবাই একজোট এক আত্মা হয়ে লড়ে যাচ্ছে।
কিন্তু এই মানুষগুলো এভাবে ক্ষেপেছে কেন ? কিসে কামড়ালো এদের ?

দুই.
লোহাপট্টির গদাধর কামার দুদন্ডের জন্যও রেহাই পাচ্ছে না। এ ডাকছে কাগা, ও ডাকছে দুদু, কেউ দাদা। সবার এক কথা হাপর জ্বালাও, নেহাইয়ে বাড়ি দাও―আমাদের রাইফেল, মেশিনগান, ট্যাংক কামানের বিরুদ্ধে লড়তে হবে। এইসব অস্ত্র ত আমাদের নাই। নাইবা থাকলো―হাতে বানানো অস্ত্র দিয়েই আমরা লড়ব। কতগুলো ছেলে একবস্তা লোহা এনে দিয়েছে সড়কি, বর্শা, রামদা বানিয়ে দেওয়ার জন্য। হাপর জ্বলছে আর নেহাইতে কিংক্যাং কিংক্যাং শব্দ হচ্ছে। শব্দের কোন বিরাম নেই। ‘কাগা, যত ধারালো পারেন, জম্মের ধারালো--- বানায়ে দেন কাগা। মরার আগে য্যান বিশ্বাসঘাতকগে বুকডারে ফালাফালা করি ফেলাতি পারি’―লিটু মোল্লার কথা শেষ হতেই ফুঁসে উঠে ওর বন্ধুরা, ‘জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু’ ‘সাবধান হুঁশিয়ার, পাকির বেটা রাজাকার’ ‘রক্ষা নাই, রক্ষা নাই, এ মাটিতে রাজাকারের ঠাই নাই’ ‘জয় বাংলা’―যতটা আবেগে বুজে আসে এই তরুণদের গলা তারচ নীরবে গদাধরের চোখ ঝাপসা হয়ে যায় কান্নায়।

গদাধর কামারের চোখে মোটা কাঁচের চশমা। সেই চশমায় রোদ্দুর পড়লে অথবা কখনও হাপরের আগুনের ছায়া পড়লে, চোখ দুটো নাই হয়ে ডিমের কুসুমের মতো নিভু নিভু আলো জ্বলে ওঠে। হাপরে বাতাস দিয়ে গদাধর ভাবে, ‘আবার বুঝি পলানোর দিন আসি পড়িছে।’ একাত্তরে ইন্ডিয়ায় পালিয়ে প্রাণে বেঁচে গেছিল। বংশের কেউ আর ফিরতে চায়নি বাংলাদেশে। গদা ফিরেছিল। এবার কি হবে এই চব্বিশে ? ছাত্রদের আন্দোলন থেকে শ্লোগান উঠেছে, ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’। পাকিস্তানী পতাকার উঁকিঝুঁকিও নাকি দেখা গেছে। একাত্তরে যে পাকিস্তানীরা পালিয়ে গেছিল এই চব্বিশে তারা কি আবার বাঙালী সেজে ফিরে এলো! তবে ত হিন্দুদের আর রক্ষা নাই! এই গন্ডগোলের প্রথম দিকে বারাসাতের বাজারে বাপদাদার পেশা ছেড়ে সব্জী বিক্রেতা খুড়তুতো ভাই কেশব মোবাইল করেছিল, ‘দাদারে চলে আয়। বাংলাদেশ এখন জঙ্গী ফঙ্গি মোল্লা মুসলমানদের টুল্লা হয়ে গেছে, হিন্দুদের আর ঠাই নাই’।

খবর যা পাচ্ছে, তাতে হিন্দুর বেঘোরে হয়ত মরতে হবে। ইন্ডিয়া ত সেই আগের ইন্ডিয়া নাই। তাই কিভাবে কোথায় যাবে গদাধর ? কাঁটাতার দিয়ে বর্ডার ঘিরে ফেলেছে ইন্ডিয়া। তাছাড়া যদি যেতেও পারে, সেদেশে কি আর পার্মানেন্টলি থাকতে পারবে ? সেখানেও ত বাঙালী খেদাও চলছে। সে খাদানোর জোশে ওরা নিজেদের নাগরিকদেরই অনুপ্রেবেশকারী ছাপ্পা মেরে ঠেলে ছুঁড়ে দিচ্ছে বাংলাদেশে―আর ও ত খাস বাঙাল, রক্তে মাংসে ভালোবাসায় বাংলাদেশি।

তাছাড়া দেশের এই দুর্দিনে ও পালিয়ে যাবে স্বার্থপর কুসন্তানের মতো !
ছেলেবেলার বন্ধু মুকুল খাঁ আজকাল ওর কামারশালে এসে বসে থাকে, ‘তুইই ভালো করিছিস গদা―কাজ করি যাতিছিস। আর আমাগের দ্যাখ— কাজকাম ছাড়ি দিসি―অবসর য্যান কাটে না। ঘরে বসি থাকলি খালি মনে হয়, মরার জন্য অপেক্ষা করতিছি। অই বুঝি আজরাইল আসি জান ধরি টান দেলো।’ তারপর ‘এই ছ্যামড়া তুই সর ত দেখি বাপ, হাপরটা দে দিনি―একটু টানি দেই’―বলে কামারশালার যোগালী ছেলেটাকে সরিয়ে এক সময়ের ছাত্রনেতা, তুখোড় উকিল, ঘরে-বাইরের কে কি বলল কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে মাঝে মাঝে এসে কামার বন্ধুর কাজে হাত লাগাতে চেষ্টা করে...

গদা জিগ্যেস করে, ‘কি বুঝছিস মুকু―ওরা কারা ? নেতার মূর্তি ভাঙ্গি দেচ্ছে, পেচ্ছাপ করতিছে, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ধ্বংস করতিছে―এসব কি হতিছে?’
মুখ খারাপ করে গালি দেয় মুকুল, ‘বাল হচ্ছে―বুঝিস না কিচ্ছু? চোদনা পাকিস্তানের প্রেতাত্মা ভর করিছে বাংলাদেশের কান্ধে—এইবার বাঙালি বুঝবিনে স্বাধীনতা কারে কয়, কত প্রকার ও কী কী, খায় না কচলায় !’

তিন.
কামারশালার কাছে রয়নাগাছের ছায়ায় বাঁশের খাটালে বসে আছে মুন্সিবাড়ির ইলিয়াস মুন্সিসহ কয়েকজন বয়স্ক মানুষ। একদল তরুণ হ্যান্ড মাইক নিয়ে শ্লোগান দিতে দিতে চলে গেল। শ্লোগান শুনে বুড়োদের মনে চকিতে উঁকি মেরে গেল, সেই কবে তাদের জোয়ান বয়সে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল সেইসব স্মৃতি। তবে কি আবার পাকিস্তানি মিলিটারিরা এসে গেল! মোক্তার পাড়ার বাসু মোক্তারের মুখ বেঁকে গেছে ব্রেন স্ট্রোকের পর। ডান চোখে সবসময় পানি জমে থাকে। বুকের উপর হাত চাপা দিয়ে গোঁ গোঁ করে কিছু বলার চেষ্টা করে। সেদিকে তাকিয়ে মুকুল খাঁ প্রায় ভেংচে ওঠে, ‘কি, কিছু কি বুঝতি পারতিসো ইলিয়াসভাই? কইছিলাম না, এ আন্দোলনের পিছনে খচ্চর আমেরিকা আর চোদনা পাকিস্তানের হাত আছে?’

মুকুলের মুখ এরকমই। আজন্মের পুরীষযুক্ত। কিন্তু লজ্জা না পেয়ে ইলিয়াস মুন্সির বুক কেঁপে উঠল শঙ্কায়। দুই হাজার চার সালের কোন একদিনের কথা। একাত্তরের আল বদর বাহিনীর সর্বোচ্চ কমান্ডারের সঙ্গে দৌলতদিয়া ঘাটে দেখা হয়ে গেছিল ইলিয়াসের। সে তখন মন্ত্রি। তার গাড়িতে লাল সবুজ পতাকা। ইলিয়াস মুন্সিকে দেখে প্রোটোকল ভেঙে এগিয়ে এসেছিল। হাসতে হাসতে ইলিয়াসের পিঠে সজোর চাপড় মেরে বলেছিল, ‘দোস্ত কেবল লালসবুজ পতাকা পেয়েছি; একদিন সমগ্র বাংলাদেশ পেয়ে যাব। মোকাম বেশী দূর নয় দোস্ত।’ তারপর কানের কাছে মুখ এনে আস্তে করে বলেছিল, ‘আমরা কখনও প্রতিজ্ঞা ভুলিনা দোস্ত। পাকিস্তান জিন্দাবাদ।’

ইলিয়াস মুন্সির মনে আচমকা ভয় নেমে আসে। বহুদিনের জমানো ভয়। চুয়ান্নোটা বছর বুকের ভেতর জমিয়ে রেখেছিল যে ভয়ের কাল সাপ, আজ কি তবে সুযোগ বুঝে সে ফণা তুলেছে ? তার দ্বিতীয় ছেলে আশিকের জোয়ান ছেলে আরমান শহরের সরকারী কলেজে পড়ে। এখনও বাড়ি ফিরে আসেনি। হাতের মুঠোয় শক্ত করে তাসবিহ আঁকড়ে ধরে বন্ধুদের কাছে বিদায় নিয়ে দ্রুত বাড়িতে চলে আসে ইলিয়াস। বাড়িতেও সমান উত্তেজনা। উঠান ভরে গেছে নারী আর শিশুতে। পুরুষরা যুদ্ধংদেহী হয়ে এখানে সেখানে জটলা বেঁধে আলোচনা করছে। মাঝে মাঝে নানা জায়গা থেকে সমবেত শ্লোগানে শোনা যাচ্ছে সেই অমর ধ্বনিদ্বয়, “জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’’। 

মাথা ঘোরে ইলিয়াস মুন্সির। আসমা কোথায়, আসমা ? অধীর আকুলতায় স্ত্রীকে খুঁজতে থাকে। এরমধ্যে বড় ছেলে আশফাক বাড়ি ফিরে এসেছে। গোহালে গোরু দুটিকে তুলে দানাপানি দিতে দিতে ছেলে মোটা ভ্রু তুলে জটলাকারী একজনকে জিগ্যেস করে, ‘তোরা রেডি আছিস ত ?’
‘হ কাকা। রেডি। তয় ইদ্রিশ মাষ্টার বলিছে, ওরা যদি শান্তিপূর্ণ মিটিং করে ত কিছু বলবি না। করে চলে যাক। কিন্তু যদি...’
‘একদম জয়বাংলা করে দিবি। মরবি কিন্তুক ছাড়বি না।’ শুনে ইলিয়াস মুন্সির ভয় এবার বুকের ভেতর পাখা মেলতে শুরু করে। এ কোন আশফাক! ওর চোখদুটিতে যেন আগুন ঝলকাচ্ছে! এত আগুন কোথায় লুকিয়ে রেখেছিল এতদিন ? তার দুটি ছেলের কেউই রাজনীতি করে না। দুজনেই নিরীহ শিক্ষক। শিক্ষকতা আর জমি ঘরগেরস্থির কাজ করে শান্তমনে। আজ যেন আশফাকের রূপান্তর ঘটেছে! 

ছেলেগুলো ‘জয় বাংলা’ বলে চেঁচিয়ে উঠতে ইলিয়াস মুন্সি আবার চমকে ওঠে, ‘এরা কেনো মাটির নীচে খুন হয়ে যাওয়া সেই মানুষকে জাগাতে চাইছে ? তবে কি পাকিস্তানি আর্মিরা আবার এসেছে ধ্বংসযজ্ঞের পাঁয়তারা নিয়ে?’ গোহাল ঘরের দিকে যেতে যেতে মুন্সি ভাবে, সে কি করে সম্ভব? তারা যে আত্মসমর্পণ করে মিত্র বাহিনীর মধ্যস্থতায় পাকিস্তান ফেরত চলে গেছিল! সে প্রায় চুয়ান্নো বছর আগে। তাইলে এরা কারা? কারা আসছে এই অঞ্চলের খোল নলচে পালটে ধুলিস্যাৎ করে দেওয়ার হুমকি ধামকি দিতে? এদের সাথে কেনো, কাদের মারতে এসেছে মিলিটারি ট্যাঙ্ক আর বিভিন্ন মারণাস্ত্রসহ প্রশিক্ষিত বাংলাদেশি সৈন্যবাহিনী?

চার.
বুড়ো ইলিয়াস মুন্সির চোখে সারাক্ষণ ডোবার পানির মতো ঘোলা পানি জমে থাকে। আশফাক গোসলের জন্য চলে যাচ্ছে বাইরের পুকুরে। শান বাঁধানো ঘাটের সিঁড়ি বেয়ে নেমে যাচ্ছে চুয়ান্নো বছরের সুঠাম শরীরের পুরুষসিংহ আশফাক। যারা বলে একাত্তরে কোন ধর্ষণ হয়নি, প্রায় ত্রিশ লক্ষ বাঙালির শহীদ হওয়ার কথা সত্য নয়―তারা একবার আশফাকের মায়ের কাছে এসে শুনে যেতে পারে কিভাবে শহর আর গ্রাম থেকে মেয়েদের তুলে এনে বন্দীশালা বানিয়ে রেখেছিল পাকিস্তানী সৈন্যবাহিনীরা। আসমাকে যখন পাকিস্তানী সৈন্যদের বন্দীশালা থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল, সে ছিল মৃতপ্রায়। খুলনা থেকে স্বামী আর দুধের শিশু আশফাককে নিয়ে পালিয়ে আসার সময় অনেকের সাথে ওরাও রাজাকারদের হাতে ধরা পড়ে গেছিল। আসমার স্বামী, ইলিয়াস মুন্সীর বড়ভাই ছিল এক ইংরেজী পত্রিকার খন্ডকালীন সাংবাদিক। স্বামীকে মেরে তার লাশের পাশেই শিশু আশফাককে ছুঁড়ে ফেলে আসমাকে নিয়ে চলে গেছিল পাকিস্তানী আর্মি। ঘটনার তিনদিন পর এক চেনা রাজাকারের কাছে খবর পেয়ে ফরিদপুরের এক গ্রামে আশফাককে খুঁজে পেয়েছিল তারা। সেই যে বুকে তুলে নিয়েছিল ইলিয়াস, সেই থেকে তার বুকের মধ্যেই আছে আশফাক।

পানিজমা চোখে ইলিয়াস মুন্সী তাকিয়ে দেখল, স্ত্রীলোকগুলো ভয় আতংকে একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরে বুড়ি আসমাকে বলছে, “ও চাচীম্মা আর্মি যদি ঘরে ঢুকে পড়ে...যদি পাকিস্তানীগো লাহান...চাচীম্মাগো এহন কে বাঁচাবে গো আমাগের? আমাগের ছেলেরা যে পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলতিসে ও মাগো।’’

প্রায় ছুটে এসেছে বলে বুক ঢিবঢিব করছে ইলিয়াস মুন্সির। আরমানের বাবা মা একটু পর পর মোবাইল করে জেনে নিচ্ছে গঞ্জের পরিস্থিতি। আরমান প্রায় বাড়ির কাছাকাছি চলে এসেছে বলে তারা নিশ্চিন্ত। এরমধ্যে খান বাড়ির মোতালেব এসে খুব খারাপ খবর জানালো। যারা আসছে তারা পাকিস্তানি মিলিটারি নয়। এরা বাংলাদেশেরই মিলিটারি। কয়েকজন ছাত্রনেতাকে পাহারা দিয়ে এনেছে গঞ্জের মাঠে মিটিং করবে বলে। তারা যা বলবে, তাই নাকি শুনতে হবে। মোতালেব খাঁ, হাতের মুঠোয় দাড়ি ধরে রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলছে, ‘ওরা অই কবরটাকে ধ্বংস করে দিতে চাচ্ছে। কি এক শক্তি আছে নাকি অই কব্বরে। ওরা তাই ভয় পাচ্ছে। আরে সারা পৃথিবীর মানুষ জানে অই নামের শক্তি আর এ ত মাটির কব্বর।’

আরমান গঞ্জ থেকে হেঁটে রওনা দিয়েছিল বাড়ির দিকে। কদিন ধরেই গঞ্জের অবস্থা ভালো নয়। রাজধানী থেকে কারা যেন আসবে। মিটিং করবে। মিটিং করবে করুক।  কিন্তু যে কথাগুলো লিখে ফেসবুক ছেয়ে ফেলেছে এই ছাত্রনেতাদের কর্মী সমর্থকরা তা মেনে নেওয়া যায় না। ছাত্রদের কোটা আন্দোলনে সেও অংশ নিয়েছিল, কিন্তু আন্দোলনের পরবর্তী চালিকা শক্তি ওদের বিভ্রান্ত হতবাক করে দিয়েছে। আন্দোলনের ধারা এখন বিভক্ত। একটি ধারা অই কবরটাকে ধ্বংস করে এই জেলার নাম পালটে টুকরো টুকরো করে মুছে দিতে চাইছে আশেপাশের জেলার সাথে। এত সস্তা নাকি সবকিছু। ট্রমায় চলে গেছিল অনেকেই। ওরা ত ছোট, অনভিজ্ঞ। অনেক ঝানু লোকও বিভ্রান্ত হয়ে গেছিল। এমন নয় যে ক্ষমতাসীন দল ছিল ধোয়া তুলসিপাতা। ক্রমশঃ দুর্বিনীত হয়ে উঠেছিল তারা। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে জেগে উঠা সেই ক্ষোভ আলাদা আর একটি জাতিকে স্বাধীন করে বিশ্বের দরবারে স্বতন্ত্র সম্মানের আসনে প্রতিষ্ঠিত করা একজন মহান মানুষকে মুছে দেওয়ার অপচেষ্টাকে তো সার্থক হতে দেওয়া যায় না। বড়চাচা ফোন করেছিল রাতে। নির্দেশ দিয়েছে একদল অবিশ্বাসী পাকি মনোভাবের আমলা, সুবধাবাদী রাজনীতিক আর বিশ্বাসঘাতক সেনা সদস্যদের হাতে নিহত মহান নেতার কবর পাহারা দিতে হবে ওদের। স্ট্যাচু বা স্মৃতিসৌধ ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দিলে সেই মানুষটাকে যে মুছে ফেলা যাবে তা নয়। তবে অসম্মানের একটি যথোচিত জবাব দেওয়া দরকার। আরমান আর ওর বন্ধুরা ভাবে, নাহ্‌, আর ছাড় দেওয়া যাবে না। তবু সংযম রাখতে হবে। অপেক্ষা করতে হবে, এই ছাত্রনেতারা তাদের নতুন দলের উদ্দেশ্য, লক্ষ্য নিয়ে কি বলে সেটা জানতে হবে। সিদ্ধান্ত একটাই, অসম্মানজনক কিছু বললে রেহাই দেওয়া হবে না। প্রতিবাদ হবেই। তাতে মৃত্যু যদি হয় হোক।

পাঁচ.
গঞ্জের রাস্তায় ভয়াবহ খণ্ড যুদ্ধ হয়ে গেল। অনেক রক্ত ঝরার পর এটা পরিষ্কার হলো, নতুন দলের ছাত্রনেতারা আদতে গন্ডগোল বাঁধাতেই এসেছিল। তাই দেশের অন্যান্য অঞ্চলে শান্তিপূর্ণ পদযাত্রার মাধ্যমে তারা যেভাবে তাদের দলের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে, এখানে সেভাবে ঘোষণা না করে উস্কানিমূলক কথা বলে সাংঘার্ষিক পথ নির্বাচন করেছে। এরা জানত এ অঞ্চলের মানুষদের কাছে মহান নেতা সম্পর্কে কটুক্তি করলে দলমত নির্বিশেষে সবাই ক্ষেপে উঠবে। মধুমতি নদী এই অঞ্চলের মানুষদের মধ্যে গড়ে তুলেছে এক অভিন্ন ঐক্যের সম্প্রীতি। এদের অন্তর জুড়ে রয়েছে অপরিসীম মায়া আর মমতা। কিছু কিছু ক্ষেত্রে স্বার্থ ভুলে এরা মুহূর্তের মধ্যে একাত্ম হয়ে যায়। লুটেরাদের লুটেরা বলতে এদের কোন দ্বিধা নেই, তা সে নিজেদের লোক হলেও রেহাই নেই। লালনের স্নেহধন্য গড়াই নদীর কন্যা মধুমতি এখানকার মানুষদের মন ও মননকে মরমী করে গড়ে তুলেছে। প্রত্যকের হৃদয় মধুমতির মধুরিমায় মধুর। প্রত্যেকেই স্বতন্ত্র কিন্তু এদের সম্মানের উপর আঘাত এলে এরা প্রত্যেকেই নির্দ্বিধায় ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রস্তুত।

নতুন দলের ছাত্রনেতারা প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়েই এ অঞ্চলের মানুষদের হৃদয়ে আঘাত দিয়ে বক্তৃতা করেছে। ধৈর্য্যের বাঁধ ভাঙতে বার বার শ্লোগান দিয়ে স্থানীয়দের ক্ষেপিয়ে তুলেছে। সংঘর্ষ তাই অনিবার্য হয়ে গেছিল। মরতে ভয় কি! কিন্তু মরতে মরতে এ অঞ্চলের অনেকেই দেখতে পেল, বাংলাদেশের সেনাবাহিনী জননিরাপত্তা ভুলে উচ্চমূল্যে বিক্রিত এইসব ছাত্রনেতাদের সার্বিক সহযোগিতা করছে, যা অনৈতিক, রাজনীতির ইতিহাসে বিরলতম ঘটনা। স্থানীয়দের জনরোষে ছাত্রনেতারা পালিয়ে বাঁচলেও সেনাবাহিনী ডাইরেক্ট গুলি করেছে শহর এবং গ্রামের জনপদগুলিতে। গাড়ি ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ইত্যাদি অভিযোগের বিপক্ষে সেনাবাহিনীর জিরো টলারেন্স ভূমিকা দেখে বুঝতে অসুবিধা হয় না, এটিও ছিল এই নেতাদের পক্ষে জবরদখল সরকারের মেটিকুলাস ষড়যন্ত্রের একটি অংশ মাত্র।

এই সংঘর্ষের পর আরমান ওর তিনজন বন্ধুসহ তিন দিন ধরে পালিয়ে আছে মধুমতি নদীর গর্ভে এক মাছধরার বড় নৌকায়। দিনের বেলা বড় মধুমতির তীর ছেড়ে চলে আসে মাঝ নদীতে। মাছ ধরার ভান করে আর গভীর রাতে তীরবর্তী কোন বাড়ির কাছে নৌকা ভিড়িয়ে মোবাইল চার্জ করে, কিছু খেয়ে খবরাখবর নিয়ে আবার নৌকায় ফিরে আসে। কারও ঘরে রাত্রিবাস করে না। যে খবরগুলো ওরা পাচ্ছিল তা ভয়াবহ। জবর দখল সরকার অঞ্চলটি নদীনালা খালবিলে পূর্ণ জেনে সেনাবাহিনীর সঙ্গে কোস্টগার্ড নামিয়ে দিয়েছে। সাঁড়াশি বেষ্টনে আবদ্ধ করে রেখেছে পুরো অঞ্চল। লাগাতার কারফিউ চলছে। কেউ কোথাও পালাতে পারছে না। কারফিউর ভেতর বাড়ি বাড়ি তল্লাসি করে পুরুষ এবং সদ্য তরুণদের দাবড়ে খুন করে লাশ সরিয়ে ফেলছে। মহিলাদের অসম্মানিত করছে। গুপ্ত খবরে জানা গেছে, এরা রেপ করতেও দ্বিধা করেনি। একাত্তরের পাকিস্তানি সৈন্যদের মতো নির্দ্বিধায় অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে। গণগ্রেফতার তো করেছেই।

এছাড়া অসংখ্য দৃশ্য অদৃশ্য লোকের নামে মামলা করে রেখেছে। এরমধ্যে নদীতে লাশ ভেসে যেতে দেখেছে ওরা। জবর দখল সরকার মৃতদের সংখ্যা নিয়ে সত্য চেপে গেলেও নির্বিচার এই হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদ উঠেছে দেশ ও বিদেশে। মানুষ মুখ খুলতে শুরু করেছে। খোদ রাজধানীতে এখন শোনা যাচ্ছে ধোঁকা খাওয়া বিক্ষুব্ধ ছাত্রদের প্রতিবাদী স্বরধ্বনি।

আরমানসহ চারটি তরুণ বুঝতে পারে ধোঁকা ওরাও খেয়েছে। সেই সাথে ধোঁকা খেয়েছে বাংলাদেশ। ধোঁকার কুচক্রে পড়ে গেছে দেশ ও জাতি। কালো ধোঁয়ার অন্তরালে থাকা দেশি-বিদেশি প্রতারক খেলোয়াড়দের চেহারাগুলো উদ্ভাসিত হয়ে উঠছে আর আন্তর্জাতিকভাবে তৈরি বড়সড় একটি মজবুত ধর্মীয় খাঁচার মধ্যে হামাগুড়িঁ দিয়ে ঢুকে যাচ্ছে ওদের উলঙ্গ মাতৃভূমি। চোখ নেই, ঠোঁট শক্ত করে সেলাই করা, কনুই থেকে হাত কাটা, হাঁটুর নীচে পা নেই, গর্ভ জরায়ুহীন ওদের মাতৃভূমি বাংলাদেশ আজ অন্ধ বদ্ধ বধির। শব্দহীন বোবা কান্নার অভিশাপ ঝরছে রোম রোম থেকে। বিশ্ববাসী দেখছে, স্বপুত্রদের দ্বারা ধর্ষিতা বাংলাদেশ খাঁচার মধ্যে বসে আছে বেআব্রু, নতমুখ, আশাহীন নিরবলম্ব হতাশা নিয়ে।

মধুমতির মধ্যভাগে ঢেউ ছলাৎছল শব্দের সঙ্গে হুহু করে কেঁদে উঠে চারটি তরুণ প্রাণ। এবার কি হবে এই দেশের? তবে কি বাংলাস্তান? রক্ত যে মানে না! ওরা কারা? ইতিহাস বই থেকে কবে, কখন উঠে এলো এত এত মীর জাফর আর খুনী মুশতাকের প্রেতাত্মা! ·


লেখক পরিচিতি : রুখসানা কাজল কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক। জন্মেছেন গোপালগঞ্জে। একটি বেসরকারি কলেজের অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত। বসবাস করছে ঢাকায়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ