দেবর্ষি সারগীর ঈশ্বর সন্ধান ও গল্পভুবন


পুরুষোত্তম সিংহ

জ্ঞানতত্ত্বের মননবীণাকে ভিন্ন কায়দায় বাজিয়েছেন দেবর্ষি সারগী (১৯৫৫)। গল্পজীবনের প্রথম থেকেই তিনি শব্দের নৈঃশব্দ্যের অনন্ত মায়াকে পরীক্ষিত সত্যে যেমন ধাবমান করেছেন তেমনি নৈঃশব্দ্যের মধ্যে নির্জনতা, নীরবতার পাঠ কতখানি পরিশীলিত নির্ভরযোগ্য হতে পারে সেই সমীকরণে নিজেকে আত্মনিয়োগ করেছেন। গত শতকের বিশ্বাসহীনতা, নিরীশ্বরবাদী পৃথিবীতে ঈশ্বরচেতনার পাঠ নানাভাবে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছেন। কোনো ধর্মীয় আবহ নয়, কোনো তাত্ত্বিক সমীক্ষা নয়, শব্দকেই ঈশ্বর করে অনুভবের এক পাঠ গড়ে তুলেছেন। বিংশ শতাব্দীর মার্কসীয় শ্রেণিচেতনা, হতাশা-পরাজয়-মৃত্যু-নৈরাশ্য বিবিধ মতাদর্শ দ্বারা যখন নাস্তিকতার পাঠ গড়ে উঠছে, আস্তিক-নাস্তিক নিয়ে নানা মতভেদ, মতবিবাদ সংগঠিত হচ্ছে, তখন নিরীশ্বরের ধারণাকে সামনে রেখে ঈশ্বর অনুভবের মধ্য দিয়ে এক জ্ঞানতত্ত্বের পাঠশালা তিনি গড়ে তুলেছেন। 

বস্তুপৃথিবীতে ঈশ্বর এক মায়া। আকারহীন সেই ঈশ্বরকে আমরা অস্বীকার করলেও বস্তু পৃথিবীর দেহে কোথাও যেন তা মিশে আছে। আবার একটা বড় পরিসরের মানুষ তো ঈশ্বর সাধনার মধ্য দিয়ে নিজেদের জীবনের আনন্দ-বিষাদ উপভোগ করছে। বাউল ঈশ্বর সাধনার মধ্য দিয়ে যেমন মনের মানুষকে পেতে চায়, তেমনি দেবর্ষি সারগীও ঈশ্বর সাধনার মধ্য দিয়ে জগত জীবনের সৃষ্টিরহস্য ব্যাখ্যা করতে চান। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের যে ‘জীবনদেবতা’ তত্ত্ব, উপনিষদিক জ্ঞানবীক্ষা দ্বারা যেমন জীবনকে ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হয়েছিল তেমনি দেবর্ষি সারগী জগতের জ্ঞানতত্ত্বকে উন্মোচন করতে চান। শব্দের শূন্যতা-অনুভব-উন্মোচন দ্বারা হিংসার বিপরীতে আরেক সত্যকে উদ্‌ঘাটন করতে সক্ষম হয়েছেন।

বাংলা গল্পের পালাবদলে প্রথম থেকেই দেবর্ষি সারগীর সচেতন উপস্থিতি ও মাত্রানিয়ন্ত্রিত স্নিগ্ধ পরিসর চোখে পড়ে। চিরঞ্জয় চক্রবর্তী গল্পজীবনের প্রথমে ফর্ম নিয়ে তমুল ভাঙচুরে অগ্রসর হলেও পরে শুদ্ধচেতনার গল্প লিখেছেন, সেখানে ঈশ্বর এক অনন্ত মায়ায় উপস্থিত হয়েছে। আমাদের বাউল গান, সুফীসাধনা, চৈতন্যতত্ত্ব, চৈতন্যজীবনী গ্রন্থগুলিতে ঈশ্বরকে জানা, উপাসনা, উপলব্ধির এক পাঠ দেখি। সেখানে সামান্য ধর্মমোহ থাকলেও দেবর্ষি সারগী ধর্মমোহ থেকে পুরোপুরি বিচ্যুত। প্রকৃতপক্ষে এ এক জীবনচেতনা। গোটা বঙ্গদেশের মানুষ যখন ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে স্বীকারে-অস্বীকারে মত্ত থেকে জীবনচেতনার নানাপাঠ গড়ে তুলছে তখন সেই শুদ্ধচেতনার পাঠকে নির্মাণ করে দেখা যাক বোধের পরিশীলিত সত্য কেমন। দেবর্ষি সারগী শব্দকে সামনে রেখে উপলব্ধির উপস্থিত-অনুপস্থিত, ক্রিয়ার মাত্রাকে ধরে বোধের উপস্থিত-অনুপস্থিত, চেতনার জন্ম-পুনর্জন্ম, লোকমণ্ডলী ও রাজা-প্রজারের সংলাপ-দৃশ্যচেতনায় জীবনের মাত্রাগণনা পদ্ধতি কতখানি শুদ্ধচেতনায় পর্যবসিত হয় এবং কোথায় বাধাপ্রাপ্ত হয় তার জরুরি খতিয়ান গড়ে তুলেছেন। বস্তুতপক্ষে বাংলা গল্পে দেবর্ষি সারগী এক নতুন ধাঁচের গল্পকার। দৃশ্যরচনা, চিত্রকল্প, উপমা নির্মাণ ও শব্দের সংবদেনের মধ্য দিয়ে শূন্যতাকে কতখানি পর্যবসিত করা যায় বা আয়তনের বৃত্ত থেকে কতখানি নিস্তব্ধতার পাঠে যাওয়া যায় তার এক জরুরি বয়ান গড়ে তোলেন।

ফ্যান্টাসির বাস্তব, জাদুবাস্তব, বিভ্রান্তির বাস্তব, অদৃশ্য বাস্তব, অনুপস্থিতির বাস্তব নিয়ে দেবর্ষি সারগীর আখ্যান বিবর্তিত হতে থাকে। আটের দশকে লিখতে আসা কথাকারদের (চিরঞ্জয় চক্রবর্তী, সোমক দাস, জয়া মিত্র, অনিতা অগ্নিহোত্রী, তৃপ্তি সান্ত্রা, তপনকর ভট্টাচার্য, আবুল বাশার) থেকে দেবর্ষি সারগীর আখ্যান উপস্থাপনের ঢং সম্পূর্ণ অভিনব। শুধু আটের দশক নয় সাতের দশক এবং নয়ের দশকের কথাকারদের থেকেও তিনি স্বতন্ত্র। শুধু জাদুবাস্তবতা নয় পশুপাখির রূপক, একাধিক চিত্রকল্প, বাক্যগঠনে হেঁয়ালি, একই বয়ানের দ্বিমুখী ক্রিয়া, অস্তিত্বের দ্বিরালাপে যে বিভ্রান্ত সুর রচিত হয় যা ক্ষণে ক্ষণে কেবলই বদলে যায় তার বহুমাত্রিক উদ্ভাসন বাংলা গল্পের এক নতুন ভূগোল। জাদুবাস্তবতা নিয়ে নানাভাবে সচেতন হয়েছেন সাধন চট্টোপাধ্যায়, ভগীরথ মিশ্র, অভিজিৎ সেন, অমর মিত্র, কিন্নর রায়, নবারুণ ভট্টাচার্য, শহীদুল জহির, শুভংকর গুহ, রবিশংকর বল। নবারুণ ভট্টাচার্যের আক্রমণ, নৈরাজ্যবাদী ইস্তেহার, শাসককের চূড়ান্ত ব্যভিচারকে ছিন্নভিন্ন করে দেওয়ার ধারালো বয়ান দেবর্ষি সারগীর নেই। আবার সাধন চট্টোপাধ্যায়, ভগীরথ মিশ্রের লোকায়ত পরিসরের মধ্য দিয়ে ভারতীয় জাদুবাস্তবতা গড়ার ঢঙও দেবর্ষি সারগীতে অনুপস্থিত। দেবর্ষি সারগী ফিরে গেছেন প্রাচীন ভারতে। তা ঠিক পুরাণ নয়। আমাদের মন্দির-মসজিদ-স্থাপত্য-গুহা-অট্টালিকা-স্মৃতিসৌধ-পরিত্যক্ত গৃহ নিয়ে যে পরিসর সেখানে অদৃশ্য সৌরভ তিনি খুঁজে চলেন। দেবর্ষি সারগীর বয়ানে সত্যের নানাস্তর ক্রিয়া করে। অদৃশ্য সত্য-আপেক্ষিক সত্য-বিভ্রান্ত সত্য-প্রচলিত সত্য-উৎপাদিত সত্য-সত্যের বিরুদ্ধে আরেক সত্য-সত্যের মধ্যে মিশে গিয়েও ভিন্ন সত্যে বিশ্বাস গল্পের বয়ানকে ভিন্নমুখী বাস্তবতায় প্রতিফলিত করে। তাঁর প্রথম গল্প ‘আরশোলা’ (আজকাল, ১৯৮৪)। ইতিমধ্যে প্রকাশিত গল্পগ্রন্থগুলি হল—‘রাজার জ্ঞানতৃষ্ণা’ (১৯৮৬), ‘দেবর্ষি সারগীর গল্প’ (১৯৯৮), ‘নির্বাচিত গল্প’ (২০০৫), ‘গল্পকুঞ্জ’ (২০০৫), ‘দশটি গল্প’ (২০০৮), ‘শ্রেষ্ঠ গল্প’ (২০২৪), ‘বেড়াল ও সেতারধ্বনি’ (২০২৫)। এছাড়াও ‘রচনাসমগ্র ১’তে কিছু গল্প আমরা পাব।

দেবর্ষি সারগী জীবনমন্থনের গল্প রচনা করেছেন। অধ্যাত্মবাদ-নিয়তিবাদ-জন্মান্তর-শূন্যতা-মৃত্যুচেতনা নিয়ে আমাদের যে ভাববিশ্ব সেখানে তিনি দীক্ষার প্রদীপ জ্বালিয়েছেন। আমাদের ভবচক্র নিয়ে নিত্য ক্রিয়ারত হতে চেয়েছেন। জীবনচক্রের নানাস্তরে উন্মোচিত অনুভব, ঈশ্বর সন্ধান, মৃত্যুচেতনা, আত্মহত্যা, শূন্যতার মধ্য দিয়ে জগত-জীবনকে উপলব্ধি এবং উপলব্ধি-চিন্তার শূন্যতা, ফাঁকফোকর দিয়ে জীবনজিজ্ঞাসার রোমন্থন বাংলা গল্পের নব্য ধারাপাত নির্মাণ করে। মনস্তত্ত্ব ও চেতনাকে ঈশ্বরের বিশ্বাস-অবিশ্বাস, মৃত্যু-জন্মান্তর, অনুভবের নানাচক্রে দোলায়িত করেছেন ‘গল্পকুঞ্জ’ (২০০৫) গল্পগ্রন্থের বিবিধ গল্পে। বস্তুতপক্ষে বাংলা গল্পের পথচলায় এটি একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন সংকলন। বাংলা গল্পের ভরা বাজারের উজানযাত্রাকে অনেকখানি তরান্বিত করেছে এই গ্রন্থের গল্পভাবনা। কোনো জটিল তাত্ত্বিক উপনিবেশ নয়, আমাদের চিন্তাসমূহকে খুঁতিয়ে খুঁতিয়ে অনুভবের পুনর্নির্মাণ কতখানি মননশীলতার দাবি করতে সক্ষম হয় তা সচেতনভাবেই প্রতিষ্ঠা করেছেন। আমাদের ঈশ্বরচেতনাকে দেবর্ষি সারগী নানাভাবে ফিরিয়ে আনতে চেয়েছেন। তা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মকেন্দ্রিক পাঠ নয়, জাতিতত্ত্বের পাঠ নয়। ঈশ্বর এখানে বিশুদ্ধতার ধারণা। জীবনের মার্গধারণাগুলিকে সঙ্গী করে যেন জীবনেরই রোমন্থন। সেই জীবনের কারিগর ঈশ্বর। নিয়তিবাদ-ধ্রুবসত্য-আপেক্ষিক সত্য-উপলব্ধির সত্য-প্রবাহিত সত্য ও সত্যের প্রত্যাবর্তনকে সামনে রেখে ভবচক্রের লীলাকে আত্মময় করে তোলা। বাংলা গল্পের বিশুদ্ধ জীবনচেতনার যে পাঠ সমরেশ রায়, চিরঞ্জয় চক্রবর্তী, অনিশ্চয় চক্রবর্তী, সোহারাব হোসেন, আনসারউদ্দিন দ্বারা বারবার লালিত হয়েছে সেখানে দেবর্ষি সারগী উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছেন। প্রজ্ঞাময় সংরূপকে লালন-পালনের মধ্য দিয়ে জীবনের প্রতিশ্রুত অন্ধকারকে পরাজিত করে আলোর পাঠ কতখানি সংহত নির্মাণে ধাবিত হতে পারে তার মননশীল ভাষ্য বাংলা গল্পের এক স্বতন্ত্র উচ্চারণ।

“আর গল্প যেহেতু যে-কোনও সংকট নিয়েই লেখা হতে পারে, তাই আমি চেষ্টা করেছি দার্শনিক সংকট নিয়েও কিছু গল্প লিখতে। ‘ঈশ্বর’ প্রসঙ্গ বেশ কিছু গল্পে এসেছে। আমি মনে করি মানুষ একটা কিছু তো এমন খুঁজছেই হাজার হাজার বছর ধরে—তার সমস্ত সভ্যতার মধ্য দিয়ে, সমস্ত বিজ্ঞানসাধনার মধ্য দিয়ে, যা শাশ্বত ও অবিনশ্বর। এমন একটা কিছু, যা সব কিছুর উৎপত্তির কারণ এবং যার ধ্বংস নেই। এরকম একটা কিছু আছে—এই বিশ্বাস ছাড়া তো সব সাধক, সব বৈজ্ঞানিক, সব দার্শনিক, সব সাধারণ মানুষ যেন দিশেহারা হয়ে যায়। আর প্রতিটি কাল্পনিক ও দুর্বোধ্য বস্তুরও যেহেতু আমরা একটা নাম দিই, তাই এটাকে ‘ঈশ্বর’ বলে সম্বোধন করলে আপত্তির কিছু নাও থাকতে পারে।”
—দেবর্ষি সারগী/ আমার কথা/ ‘গল্পকুঞ্জ’।

দেবর্ষি সারগী পাঠককে একটা বোধের জগতে উপনীত করেছেন। গল্পের বয়ানে নানা জীবনচেতনার পাঠ রেখে আমাদের যাপনের সমীকরণকে বড় বিন্যাসে দেখতে চেয়েছেন। আমাদের বাঁচা, অভিজ্ঞতা, দৈনন্দিন স্বরলিপির মধ্যে অজস্র বিভ্রান্ত প্রবণতা বর্তমান। যে প্রবণতাগুলি মানুষকে হিংস্র, লোভী, হত্যাকারী, নৈরাজ্যবাদী আচরণে মত্ত করে। এমনকি সেই আচরণের জন্য মানুষ নিজের কার্যকে নিজেই উপলব্ধি করতে অক্ষম। হত্যা-দখল-কায়েমি স্বার্থে মত্ত হয়ে মানুষ কী করে নিজেই জানে না। রিপুতাড়িত মানুষকে দেবর্ষি সারগী মুক্ত করেন। জীবনের দীক্ষাকুঞ্জে পবিত্র করেন। সেই ব্রতের জন্য অন্ধকার-মৃত্যু-আত্মহত্যা-ষড়যন্ত্র-মৃত্যুচেতনা উপস্থিত হয়। নঞর্থক প্রবণতা এবং জীবনের কালো দিকগুলি মন্থন করে মানুষকে আলোর পাঠে ফেরান। সেখানে যত না মৃত্যু ঘটে ততাধিক মৃত্যুর পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়। মৃত্যুর রঙে লীন করে মানুষকে জীবনের পাঠ কত সুন্দর তা উপলব্ধি করান। দেবর্ষি সারগীর গল্প একটি পরিস্থিতির ভাষ্য, মুহূর্তের ভাষ্য। অস্তিবাদী দর্শনেরই আরেক পাঠ। মানুষকে তিনি জঘন্য উপসাগরে নামিয়ে জীবনের ধ্রুবতারা দেখান। হত্যাকারী এবং যাকে হত্যা করা হবে এক সারিতে এসে দাঁড়ায়। দুইজনেই দুইজনকে জীবনের পাঠ শেখান। সেখানে নানা ফুল-পাখি-পশুর খেলা থাকে। চিত্ররূপময় উপমা থাকে। দেবর্ষি সারগীর গল্প অনুভবের এক তীর্থ থেকে আরেক তীর্থে যাত্রা। পাপবিদ্ধ মনকে পবিত্র জীবনচেতনায় সমুজ্জ্বলের উৎকৃষ্ট ভাষ্য। ‘আত্মহত্যা’ (দেশ, ১৯৮৯) গল্পের শেষে পাই :

“বেঁচে থেকে ওরা এসবই করবে, শ্যাম ভাবছিল। এবং বেঁচে থাকলে সেও তো তাই করত। কিংবা উলটোভাবে বলা যায়, বেঁচে থাকলে সে যা যা করত, ওরাও তো তাই করবে। ভাবনাটা শ্যামের মনকে হঠাৎ একটা দুর্বোধ্য, বেদনার্ত, অথচ প্রগাঢ় ভালবাসার উপলব্ধিতে আচ্ছন্ন করে দিল। সে স্পষ্ট করে কিছু বুঝতে পারল না। ঠিক হল ঘাড়ে নয়, গলায় কোপ মারা হবে। শ্যামকে চিৎ করে ওলটানো হল। দীনু ও তারিণী একটু দূরে গিয়ে দাঁড়াল। নারান যখন শ্যামের মাথার কাছে এসে কুড়োলটা উঁচু করে ধরে, শ্যাম গামছা বাঁধা মুখের ভেতর দিয়ে চেঁচিয়ে বলতে চাইল, নারান থামো থামো! নিজেকে হত্যা কেন করছ গো?” 
(গল্পগুচ্ছ, দ্য কাফে টেবল, দ্বিতীয় প্রকাশ, এপ্রিল ২০২৫, পৃ. ৪৯)

দেবর্ষি সারগীর গল্পে যত না মৃত্যু ঘটে তার থেকে বেশি মৃত্যুময় পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। মৃত্যুর বিভীষিকা জীবনকে শুদ্ধতার পাঠ শেখায়। সেখানে একটা মানবদর্শন আছে। আমাদের বোধ চেতনা উপলব্ধি নানাবিন্দুতে সীমাবদ্ধ। কোথাও অভিজ্ঞতার অভাব, কোথাও পরিদর্শনের অভাব, কোথাও উপলব্ধির অভাব। এইসব অভিজ্ঞানের নিমিত্তে দেবর্ষি সারগী একটা বৃত্ত আঁকেন। সেখানে চরিত্র পাক খেতে খেতে, মৃত্যুচেতনায় লীন হতে হতে, আত্মহত্যার পিপাসা জাগতে জাগতে একটা আয়ুধে পৌঁছে যায়। সেই পরিমিত মাত্রাজ্ঞানই দেবর্ষি সারগীর গল্পযাত্রা।

“বাংলা সাহিত্যে দেবর্ষির নায়করা যেন নতুন প্রজাতি। ওদের আমরা ভুলতে পারিনা। কথাসাহিত্যের আধুনিক লক্ষণ সম্পর্কে বলতে গিয়ে প্রখ্যাত মার্কিন সমালোচক লাওনেল ট্রিলিং মন্তব্য করেছিলেন, ‘আমাদের সময়ের সাহিত্যের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল, ‘নায়ক’-কে হটিয়ে ‘অ-নায়ক’ (anti-hero)-কে নিয়ে আসা।’

দেবর্ষি সারগী তাঁর গল্পের পর গল্পে এবং উপন্যাসে গোড়া থেকেই যে অ-নায়কদের সৃষ্টি করে চলেছেন, তাদের মতো মানুষ বাস্তবে তবু দু’চারজন মেলে কিন্তু সাহিত্যে বিরল। বাংলা কথাসাহিত্যের লেখক হিসেবে তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান সম্ভবত এখানেই।”—রবিন পাল/ কিছু কথা/ শ্রেষ্ঠ গল্প/ করুণা প্রকাশনী।

দেবর্ষি সারগীর গল্প জ্ঞানতত্ত্বের পাঠশালা। চিরঞ্জয় চক্রবর্তীর গল্পেও জ্ঞানতত্ত্বের বিন্যাস আছে। কিন্তু দুইজনের চিন্তা পৃথক। চিরঞ্জয় চক্রবর্তী গল্পকে বারেবারে টেনে নিয়ে গেছেন শুভচেতনায়, কল্যাণবোধে। চরিত্রকে শুদ্ধ করতে চেয়েছেন। দেবর্ষি সারগীতেও তা আছে কিন্তু অনেক বেশি করে আছে উপলব্ধির নির্মাণ। মৃত্যু-ঈশ্বর-আত্মহত্যা নিয়ে এতো প্রকরণ চিরঞ্জয় চক্রবর্তীর গল্পে নেই। চিরঞ্জয় চক্রবর্তী মুক্তচিন্তার পথিকৃৎ, মানবতাবাদের মহৎ মন্ত্র প্রতিষ্ঠার উদ্‌গাতা। দেবর্ষি সারগী জোর দিয়েছেন রিপুতাড়িত জীবনের ঐশ্বর্য ও দুরভিসন্ধিকে। সেখানে নানা চিত্রকল্প, উদ্ভট, উদ্দেশ্য, প্রকরণ আছে। তিনি জীবনের ব্যাখ্যাকর্তা ও সারমর্মকে আরেক বৃত্তান্তে ব্যক্ত করতে চান। জগতের চালক ঈশ্বরের সঙ্গে যেন এক বোঝাপড়া দেখি। প্রশ্ন, উত্তর অন্বেষণ, কুজ্‌ঝটিকা, দ্বিরালাপের মধ্য দিয়ে জীবনের গূঢ়তত্ত্বকে জানান দেবার যে প্রত্যয় দেখি তা বাংলা গল্পের এক মাইলস্টোন।

সমস্তকিছুর মধ্যে অর্থহীন-অর্থপূর্ণ ক্রিয়া অন্বেষণ ‘ধ্বংসদর্শন’ (প্রতিদিন, ১৯৯৭) গল্পকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। দেবর্ষি সারগী মানব মনস্তত্ত্বের নিপুণ বিশ্লেষক ও ব্যবচ্ছেদক। মানব সভ্যতার বৃহত্তর ধারাপাতকে তিনি খণ্ড খণ্ড করে দেখতে চান মানুষের অভিজ্ঞতার প্রয়োজনে, মানুষের ধ্বংস-নির্মাণের কার্যকারণে। প্রেম-ধ্বংস-নির্মাণ-মৃত্যু-আত্মহত্যা-দখল-নৈরাজ্যবাদ-আধিপত্যের মধ্য দিয়ে যে সভ্যতা চলছে যার প্রধান কারিগর মানুষ এবং অস্তিত্বে নিবিড়ভাবে বিরাজমান ঈশ্বরের উপস্থিত-অনুপস্থিত যে ধারণা তার ব্যাখ্যা কেমন এবং প্রয়োগগত ধারাপাত কেমন। ধ্বংস ও নির্মাণের মধ্য দিয়ে যে পৃথিবী এগিয়ে চলেছে বা কোথাও পিছিয়ে যাচ্ছে, যেখানে কেবলই অভিযোগের তীর রচিত হচ্ছে তারা যদি ঈশ্বরকে কাছে পান তবে প্রশ্ন কেমন হবে? ঈশ্বর কি তার সৃষ্ট মানুষের ভাষা বুঝবেন? নাকি জীবনের প্রয়োজনে ভাষা ও বোধের যে অন্তর্ঘাত প্রতিমুহূর্তে রূপবদল করছে তার মাত্রা বুঝবেন? অর্থহীনতার মধ্য দিয়ে অর্থের অন্বেষণ অথবা অর্থের অন্বেষণের মধ্য দিয়ে অর্থহীনতার দিকে যাত্রা দেবর্ষি সারগীর গল্পে এক নব্য ধারাপাতের পত্তন করেছে। বাংলা গল্পে অস্তিত্বের নানামাত্রিক চর্চাকে দেবর্ষি সারগী একার হাতেই অনেকখানি এগিয়ে দিয়েছেন। এমনকি গত শতকের নয়ের দশক এবং এশতকে বাংলা গল্পের প্রত্যয়শালী উচ্চারণ যাদের হাতে বারবার উচ্চস্তম্ভ স্পর্শ করেছে তাদের মধ্যে এক স্বয়ম্ভু আত্মা দেবর্ষি সারগী। তাঁর গল্প যেহেতু জ্ঞানতত্ত্বের উন্মোচন এবং বোধিলাভের যথার্থ নির্যাস তাই বহুক্ষেত্রে গল্পকথকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। সেই নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে। সেখানে স্মৃতির একটা বড় ভূমিকা আছে। স্মৃতি-বিভ্রান্ত স্মৃতি-স্মৃতিনাশ-স্মৃতির পুনর্জাগরণের মধ্য দিয়ে জীবনের নিয়ন্ত্রিত-অনিয়ন্ত্রিত সৌরভ যে আলোছায়া রচনা করে তা বাংলা গল্পের ধুপছায়াকে বহুদূর প্রসারিত করে। ‘ধ্বংসদর্শন’ গল্পে শুনতে পাই :

“জীবনে এমন মুহূর্তও আসে যখন মানুষের সামনে স্বয়ং ঈশ্বর এসে দাঁড়ালেও মানুষ সম্পূর্ণ অবিচলিত থাকে। আমাদের কারও ভেতর কোনও চাঞ্চল্য বা রোমাঞ্চ বা বিস্ময় বা আনন্দ দেখা গেল না। এমনকি, অবিশ্বাসও না। জগতের অন্তিম মুহূর্তে ঈশ্বর মানুষকে দেখা দেবেন, তাতে অবিশ্বাস করার কিছু নেই, বিশেষত এটা মনে রাখলে যে একটু পরেই তো ঈশ্বরদর্শনের কোনও স্মৃতিই কোথাও থাকবে না। এবং ঈশ্বর নিজেও তা জানেন বলেই হয়তো দর্শন দিয়েছেন।” (তদেব, পৃ. ৮৭)

বাস্তব-অবাস্তব-বিভ্রান্ত বাস্তবের খেলা যেমন আছে তেমনি মানব অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িত যে ঈশ্বরকে কেন্দ্র করে জীবনের পদ্ধতি আবিষ্কারে মগ্ন থাকেন। মানুষ কেন ধ্বংস সাধনে উন্মত্ত হয়। সেই লোভ, নৈরাজ্যের উৎপত্তি কোথা থেকে। ঈশ্বরই যদি নির্মাতা হন তবে হত্যাকারীকে রোধ করতে পারেন না কেন? নাকি জগতকে আরো বড়ভাবে উপলব্ধির জন্য ধ্বংস-নির্মাণের ক্রিয়ায় মত্ত থাকেন। নির্বাক ঈশ্বর শুধু শ্রোতা-দর্শক না নির্ধারক-নিয়ন্ত্রকও? ঈশ্বর দর্শনের মধ্য দিয়েই জীবনের সমাপ্তি নাকি স্মৃতিরই পুনর্জাগরণের মধ্য দিয়ে ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভ? তবে স্মৃতিহীন মানুষ কি কেবলই আগন্তুক? নাকি মানুষের স্মৃতিকে ক্ষত করতেই ধ্বংসের প্রলয়সাধন? এইসব জরুরি প্রশ্ন ও উত্তর অন্বেষণের যে ধারাপাত গল্প বীভঙ্গে দেবর্ষি সারগী জিইয়ে রাখেন যা বাংলা গল্পের নান্দনতাত্ত্বিক পরিসরকে নানামাত্রায় প্রতিষ্ঠা করেছে।

আধুনিক পৃথিবীর রূপকথা রচনা করেছেন দেবর্ষি সারগী। দুই বিশ্বযুদ্ধ অতিক্রান্ত পৃথিবীতে সাম্রাজ্যবাদ, নৈরাজ্যবাদ, সন্ত্রাসবাদ, আধিপত্যবাদ মাত্রাতিরিক্তভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে যা একুশ শতকে আরো ঊর্ধ্বমুখী। ‘গল্পকুঞ্জ’ (যা পূর্বে ‘রাজার জ্ঞানতৃষ্ণা’, ‘দেবর্ষি সারগীর ছোটগল্প’ গ্রন্থে পেয়েছি) গ্রন্থের বহু গল্প গড়ে উঠেছে রূপকথা, উপকথা, লোককথার ঢঙে। যুদ্ধ-ক্ষমতা-আগ্রাসন-মৃত্যুকে লেখক নির্মাণ করেছেন উপকথা, লোককথা, রূপকথার ভঙ্গিতে। সেখানে ইতিহাসের একটা পটভূমি আছে। আছে ভারতের উপনিষদিক জীবনচিন্তা। জন্মান্তর-নিয়তিবাদ-কর্মযোগ-আধ্যাত্মবাদ-আত্মার অবিনশ্বর বিনাশক্রিয়া নিয়ে তিনি হরেকরকম গল্পছক গড়ে তোলেন। আধুনিক পৃথিবীর গল্পকে দেবর্ষি সারগী অন্য গোলার্ধে নিয়ে যেতে চান। তার বয়ান একালের হলেও উপস্থাপন সেকালের। এমনকি জীবাত্মা-পরমাত্মাকে ধরে জীবনের ব্যভিচারকে যেমন স্পষ্ট করেন তেমনি সেখান থেকে আত্মাকে শুদ্ধ করেন। আবার সে গল্প আধ্যাত্মিকতার নয়। দেবর্ষি সারগী মানুষকে শুদ্ধ করতে চান। জীবনের হিংসা, হানাহানি, লালসা, কাম ক্রোধ বিসর্জন দিয়ে ভালোবাসার স্রোতে ফেরাতে চান। এই ভালোবাসা বৃহত্তর অর্থে জীবনকেই ভালোবাসা। আর সে উপলব্ধির জন্য মৃত্যু-মৃত্যুর প্রেক্ষাপট-মৃত্যুর রহস্যময়তা-মৃত্যু পূর্ববর্তী পৈশাচিকতা-যন্ত্রণার পটভূমি নির্মাণ অনিবার্য। বস্তুত মানুষ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে শিক্ষালাভ করে, ভুল থেকে নিজেকে সংশোধন করে। ‘মৃত্যুজ্ঞান’ (শারদীয় আজকাল, ১৯৯১) গল্পে যুবকের পিতার মৃত্যু, বেদনা, নিজের রাজা হওয়া, নিজের সন্তানের মধ্যে পিতৃছায়া দেখতে পেয়ে পিতা হারানোর বেদনা লাঘব, রানির পূর্ব প্রেমিককে বন্দি, মৃত্যুদান, এমনকি পরে রাজার ভিন্ন রাজার কাছে পরাজয়, বন্দি এবং তার মৃত্যুদানের পূর্বে জীবনভিক্ষা প্রার্থনা, কেননা সে এই পৃথিবীর সৌন্দর্য উপভোগ করতে চায়, পৃথিবীকে দেখতে চায়। এই বৃত্তান্তের মধ্যে নৈতিক শিক্ষার পাঠ আছে। দেবর্ষি সারগীর এই পর্যায়ের প্রায় গল্পের মধ্যেই নৈতিক শিক্ষার পাঠ আছে কিন্তু নৈতিকতা গল্পের মাধুর্যকে নষ্ট করেনি। দেবর্ষি সারগী খুব সচেতনভাবে জীবনতত্ত্বের পাঠমালা আবিষ্কার করতে চান। জীবন কী, জীবন কেমন, জীবনের প্রেম কোথায়, জীবনের প্রণালি কোন পথে এবং কোন পদ্ধতিতে তরান্বিত হবে সেই পাঠ আবিষ্কার করতে চান। সেখানে নিয়তিবাদ, অলৌকিকতা, ঈশ্বরচেতনা যেমন থাকে তেমনি আমাদের আধ্যাত্মিকতার নিগূঢ় বিন্যাস থাকে। ‘মৃত্যুজ্ঞান’ গল্পে শুনতে পাই :

“এখানকার উপজাতিরা বিশ্বাস করে মানুষ ঈশ্বরের বাগান থেকে অতর্কিতে ঝরে পড়া এক একটা ফল। ফলগুলোকে আবার ঈশ্বরের কাছে পাঠিয়ে দিলে ঈশ্বর খুশি হন, এবং যে পাঠায় সে মহাপুণ্যের অধিকারী হয়। একজন রাজা যেহেতু হাজার হাজার মানুষের প্রতিনিধি, তাই তাঁকে হত্যা করার অর্থ হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করা। এই যুক্তিতে, পৃথিবীতে কেউ যদি রাজাকে হত্যা করতে পারে তবেই ঈশ্বর সবচেয়ে বেশি খুশি হন।” 
(তদেব, পৃ. ১২০)

যে রাজা পিতার মৃত্যুতে শোকার্ত হয়েছিলেন, এমনকি সেই শোক থেকে মুক্ত করতে তপস্বী জানিয়েছিল রানির গর্ভের সন্তানের মধ্যেই রাজার পুনরাবৃত্তি ঘটবে। মৃত্যুর শোক রাজা ভুলেছিলেন নবজাত সন্তানকে দেখে। যে রাজা মৃত্যুতে শূন্যতা উপলব্ধি করেন সেই রাজাই রানির পূর্ব প্রেমিককে খতম করেন। তিনি মনে করেন দুর্বৃত্ত, শয়তানের শাস্তি পাওয়া উচিত। এমনকি এও জানিয়েছিলেন তিনি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করবেন পরের জন্মে যেন আর শয়তান না হয়। এমনকি এই রাজা যখন অন্যের হাতে বন্দি হলেন তখন তিনি জীবন প্রার্থনা করছেন। মানুষ অন্যকে পরামর্শ, পথ দেখালেও নিজে বিভ্রান্ত। আবার আমরা যা বিশ্বাস করি তা প্রয়োগ করি না। আবার যা প্রয়োগ করি তা নিজের জীবনচেতনায় মানি না। মধ্য থেকে জগত-জীবনের কোনো সারসত্যই উপলব্ধি করা হয় না। দেবর্ষি সারগী মানুষকে নরককুণ্ডে পর্যবসিত করেন। সেখান থেকে জীবনের আরোগ্যসেতু যেমন নির্মাণ করেন তেমনি চরিত্রকে পরাজিত করে মোহমুক্ত করেন।

দেবর্ষি সারগীর গল্পে আত্মবিশ্বাস-অবিশ্বাসের দ্বন্দ্ব একটা বড় মাত্রায় ক্রীড়ারত। আত্মবিশ্বাস-অবিশ্বাসের মধ্য দিয়ে ভালোমন্দের প্রভেদ যেমন নির্ধারিত হয় তেমনি ঈশ্বরকে মানা-না মানার মধ্য দিয়ে জীবনবেদ আবিষ্কৃত হয়ে চলে। সেখানে নানামাত্রিক বিরোধাভাসের খেলা দেখি। অনুভবের বৈপরীত্য ধরে বেঁচে থাকার নন্দনপ্রণালী কতরকমভাবে বাঁক নিতে পারে তার এক আশ্চর্য আবিষ্কারক দেবর্ষি সারগী। সেখানে ঈশ্বরের নানা রূপক—প্রভু, ক্ষমতাবান, শয়তান, শুভচিন্তক, নিয়ন্ত্রক, নির্ধারক। ঈশ্বরের নানামাত্রিক অবস্থান আমাদের পৃথিবীতে বর্তমান। কেউ ঈশ্বর সাধনা করে নিজেদের মুক্ত, পবিত্র করে চলেছে কেউ নিজেকে শয়তান, দানব প্রমাণে বদ্ধপরিকর। ঈশ্বর কোথাও নীরব হাসি দেন, কোথাও পথ নির্দেশক, কোথাও ঝঞ্ঝাটের সৃষ্টিকর্তাও বটে। ‘ঈশ্বরের প্রতিনিধি’ (শারদীয় আজকাল, ২০০০) গল্প থেকে দুটি বয়ান তুলে ধরি :

ক. রাজার বয়ান—“আমি নিজেকে ঈশ্বরের প্রতিনিধি ভাবি’, হাসিতে মুখ ভরিয়ে শাসক বললেন। ‘ওকে হত্যা না করলে ঈশ্বরের প্রতি আমার কর্তব্যের অবহেলা করা হবে।” (তদেব, পৃ. ১৫১)

খ. কবিরাজের বয়ান—“আমি নিজেকে ঈশ্বরের প্রতিনিধি ভাবি না’, কোবরেজ বললেন। ‘তবু আপনার চিকিৎসা না করতে এলে ঈশ্বরের প্রতি আমার কর্তব্যের অবহেলা করা হত।” (তদেব, পৃ. ১৫৩)

রাজার ঈশ্বরের প্রতি অগাধ বিশ্বাস থেকে মানুষ হত্যা এবং কবিরাজের ঈশ্বরের প্রতি অবিশ্বাস থেকে মানুষকে বাঁচানোর প্রক্রিয়ায় জীবনের নন্দনতত্ত্বকে প্রতিষ্ঠা করেছেন লেখক। ঈশ্বর কোথাও কোথাও ক্ষমতার প্রতিনিধি। মানুষ ঈশ্বরকে সামনে রেখে নিজের ঔদ্ধত্যকে যেমন প্রতিষ্ঠা করে তেমনি কেউ ঈশ্বরকে অবিশ্বাস করেও মানব সমাজের কল্যাণসাধনে মেতে আছে। দেবর্ষি সারগীর গল্প উজ্জীবনের পাঠচক্র। মানুষকে তিনি ভুলভুলাইয়া থেকে শুদ্ধ জীবনচেতনায় যেমন ফেরান তেমনি বিভ্রান্ত বোধ থেকে পরিশুদ্ধ বোধে ফেরান। প্রজারা রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল বলে, স্বাধীনতা চেয়েছিল বলে রাজা সবাইকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। এমনকি কবিরাজের ভাইও সেই মৃত্যুদণ্ড থেকে রেহাই পায়নি। আবার সে মৃত্যু অত্যন্ত পৈশাচিক। গাছের ডালে ঝুলন্ত খাঁচায় বন্দি থেকে তিলে তিলে মৃত্যু। জীবনের বোধ সৌন্দর্য উপলব্ধি করতে করতে মৃত্যু সংবরণ করা। অন্যদিকে রাজা যখন মৃত্যুসজ্জায় তখন আর লজ্জায় কবিরাজকে ডাকেননি। কেননা কবিরাজ পূর্বে ভাইয়ের প্রাণভিক্ষা চেয়েছিল। লোকমুখে শুনে কবিরাজ এসে রাজাকে বাঁচিয়েছে। এই উপলব্ধি থেকে রাজা আর সিংহাসনে বসেনি। দেবর্ষি সারগীর গল্পে ঈশ্বরের যেমন ভূমিকা আছে তেমনি নীতিকথা, নিয়তিবাদের বড় ভূমিকা আছে। ভুল বৃত্তান্ত থেকে মানুষকে মহৎ পবিত্র উদারচেতনায় ফেরানোর পাঠে একটা ভাববাদ আছে। তা আধুনিক নৈরাশ্যজনক হতাশা পরায়ণ পৃথিবীর বিপরীতে আরেক পাঠ। তা কতখানি বাস্তবসমস্ত সে নিয়ে বিস্তর প্রশ্ন আছে। কিন্তু শিল্পের ভাষায়, আর্টের সত্যে অনেকখানি তাৎপর্যমণ্ডিত।

দেবর্ষি সারগীর এই পর্যায়ের গল্পে প্রায়ই একটা রাজার উপস্থিতি চোখে পড়ে। একটা জনপদ নানা সংস্কারে বিশ্বাসে উপকথা লোককথায় ভেসে যায়। কেউ কেউ রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে, কেউ কেউ রাজার নির্দেশ মেনে নেয়। সেখানে কথকতার একটা পাঠ থাকে। গল্পকথক রাজার ইচ্ছা, নির্দেশ, আবহমান ঘটনাকে টেনে আনেন। এতকাল ঘটে যাওয়া ঘটনার সঙ্গে আখ্যানে একটা বিরুদ্ধতার স্বর গড়ে ওঠে। তা মূলত জীবনতাত্ত্বিকের পাঠ। জীবন-মৃত্যুর দোলায় গল্পকে দুলিয়েছেন দেবর্ষি সারগী। মৃত্যুর অনাকাঙ্ক্ষিত সৌরভকে স্পর্শের মধ্য দিয়ে জীবনের স্পর্ধিত সৌন্দর্য কত আবেগঘন, বাঁচার আর্তনাদ কত প্রবল, এমনকি মানুষ এক সত্য থেকে আরেক সত্যে কীভাবে উত্তীর্ণ হচ্ছে সেই নির্যাস গল্পকে নতুন পরিমণ্ডল দান করে।

দেবর্ষি সারগীর গল্প একটা দার্শনিক পাঠতত্ত্বের নন্দন। বাংলা গল্পের যে দার্শনিক ধারা গত শতকের সাত-আটের দশকে নানামাত্রায় প্রসারিত হয়েছে মানিক চক্রবর্তী, আশিস মুখোপাধ্যায়, তপনকর ভট্টাচার্য, চিরঞ্জয় চক্রবর্তীর হাতে সেখানে দেবর্ষি সারগী এক উল্লেখযোগ্য সংযোজন, এমনকি ব্যতিক্রম ও বিচ্ছিন্ন। ভারত বিভিন্ন দার্শনিক মতবাদের দেশ। সেই দার্শনিক মতবাদের ভিতর গল্পের দ্বন্দ্বময় আবরণ উন্মোচন করলে উত্তর আধুনিক পাঠতান্ত্রিক ক্রিয়া কেমন হতে পারে তার এক আশ্চর্য আবিষ্কারক দেবর্ষি সারগী। আবার পূর্বোক্ত গল্পকারদের থেকে দেবর্ষি সারগী একারণেই পৃথক এখানে কোনো বিনির্মাণ বা মোটিভ নেই। নেই পুরাতন ধারার অনুবর্তন। তিনি খুব সচেতনভাবেই আধুনিক গল্পের পাঠমালা গড়ে তুলছেন, যার খোলসটা শুধু প্রাচীন ভারত। সেই প্রাচীন ভারতের নানা রাজতন্ত্র, গুহা, মসনদ, স্থাপত্য, ঐতিহ্যকে দেবর্ষি সারগী এই পর্যায়ের গল্পের পটভূমি করেছেন। এমনকি সেই পটভূমির দ্বান্দ্বিক ক্রিয়া ঘটিয়ে ঈশ্বরের উপস্থিত-অনুপস্থিতির অভ্যন্তরীণ সত্যকে পরিমাপ করতে করতে গল্পের যে সংকট রচিত হয় তা আধুনিক গল্পের মূল ধারা থেকে যেমন বিচ্ছিন্ন তেমনি মূল ধারার এক উত্তর অবয়ববাদী পাঠ।

এখানে ঈশ্বর সৃষ্ট পৃথিবীর এক চালিত ক্রিয়া, তার বার্তাবাহক মানুষের মাত্রাগণনা পদ্ধতি এবং ঈশ্বরের সৃষ্ট হয়েও জগত-জীবনের পরিদর্শক হিসেবে ঈশ্বরের উপস্থিতি মান্য করেও জীবন নিয়ন্ত্রক হিসেবে অমান্য করা মানুষের জীবনপ্রণালী যে দ্বন্দ্বময় বাস্তবতার জন্ম দেয় তা শুধু জ্ঞানতাত্ত্বিক পাঠমালা নয় বাংলা গল্পের ঐশ্বর্য ও অহংকার। ‘ঈশ্বরের আকাঙ্ক্ষা’ (মুক্তাক্ষর ২০০২) গল্পের বয়ানে পাই—

“তার যে মূল তত্ত্বটা অন্যদের পছন্দ হয়েছে সেটা হল : জগৎ ও জীবনে আদপে একটা উদ্ভট বস্তু, অথচ মানুষের মধ্যে একটা অর্থ ও উদ্দেশ্য খোঁজার স্পৃহা আছে। মানুষের সমস্ত দুঃখ ও যন্ত্রণার প্রধান ভিত্তিটা এই দ্বন্দ্বেই। তবু বাঁচতে বাঁচতে, সময় কাটাতে কাটাতে, নানা কাজ করতে করতে যতটা সম্ভব একটা অর্থ ও উদ্দেশ্যের ভ্রম মাথার ভেতর জাগ্রত রাখতে হবে। সুখী হবার ওটাই পথ। অর্থহীন জগতে যে যত অর্থপূর্ণ কাজ কর‌ছে বলে মনে করতে পারে সে তত সুখী।” (তদেব, পৃ. ৩০১)

নিরাকার ব্রহ্মাণ্ডের রূপনিকেতনে কত মতাবাদের জন্ম হচ্ছে এবং খণ্ডিত হয়ে যাচ্ছে। প্রাচীন ভারতের জ্ঞানতত্ত্বের পাঠশালায় পূর্বোক্ত দার্শনিকের মতবাদ পরবর্তী দার্শনিক দ্বারা প্রায়ই খণ্ডিত হয়ে গেছে। তবে এতকাল মানুষ বেঁচে এসেছে কোন তত্ত্বে? জীবন সম্পর্কে নানা দার্শনিক কোলাহলের মধ্যে যে নীরব আর্তনাদ, সংযত উত্তেজনা তাই দেবর্ষি সারগী কাব্যিক মোহে ধরতে চান। অর্থহীন-অর্থপূর্ণ অবস্থানে ঈশ্বরকে স্বীকার-অস্বীকারের মধ্য দিয়ে আস্তিক-নাস্তিক দর্শনের কবচকুণ্ডল বয়ে নিয়ে জীবনের পিপাসাকে যেমন ব্যক্ত করেন তেমনি এইসব দার্শনিক পরিমণ্ডলের মধ্যে থেকেও মানুষ কীভাবে নিজস্ব চিন্তায় মশগুল আছে তার মনোবীণা গল্পের বয়ানে যে তারে ভাসে তা প্রশংসার দাবিদার। এই দার্শনিক পাঠতন্ত্রের মধ্য দিয়ে দেবর্ষি সারগী হয়ে ওঠেন বাংলা গল্পের এক উত্তর পুরুষ। যার কোনো পূর্বসূরী ছিল না, উত্তরসূরী আজও নেই। বাংলা গল্পের যে প্রবহমান ধারা যা ব্যক্তিভেদে ক্রমেই বাঁকবদল করেছে সেখানে দেবর্ষি সারগী একাই এক আশ্চর্য নদী, যার তরঙ্গে বাংলা গল্পের জয়পতাকা তুফান তুলেছে গত চারদশক জুড়ে।

হাংরি লেখক সুভাষ ঘোষ লিখেছিলেন ‘যুদ্ধ আমার তৃতীয় ফ্রন্ট’ আর দেবর্ষি সারগী লিখেছেন ‘যুদ্ধের তৃতীয় রাতে’ (সৃষ্টি, ২০০৩)। বস্তুত এক যুদ্ধবিরোধী আখ্যান রচনা করেছেন দেবর্ষি সারগী। তাঁর উপন্যাসেও এই সাম্রাজ্যবাদ, যুদ্ধ বিরোধিতা নানামাত্রায় এসেছে। দেবর্ষি সারগী এই পর্যায়ে বারবার পুরাণ, প্রাচীন ভারত, রূপকথা, উপকথার জগতে ফিরে গেছেন। সেই জীবনক্রিয়ায় একটা দার্শনিক উপলব্ধি সঞ্চার গল্পকে নতুন সমীকরণে উপনীত করে। যুদ্ধ মানে ভ্রাতৃহত্যা, পড়শি হত্যা, বন্ধু হত্যা। কৌরব-পাণ্ডব পক্ষকে সামনে রেখে পরগণার গভীরে তিনি প্রবেশ করেন। যেখানে সাধারণ সৈনিক যুদ্ধক্ষেত্র থেকে জীবনের সৌন্দর্য খুঁজে পেয়েছিল। হিংসার বিরুদ্ধে মানবতার এক সম্মিলিত পাঠ দেবর্ষি সারগী দাঁড় করিয়েছেন নানামাত্রায়। কোথাও উচ্চ দার্শনিক অভিলাষ, মার্গ দর্শনের ঊর্ধ্বে গিয়ে লোকায়ত পাঠের ভিতর থেকে জীবনদর্শনের অন্বেষণ বাংলা গল্পের প্রত্যয়ী আত্মাকে ভিন্নার্থক বয়ানে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। গত শতকের সাত-আট-নয়ের দশকে রাঘব বন্দ্যোপাধ্যায়, স্বপ্নময় চক্রবর্তী, আবুল বাশার, আফসার আমেদ. আশিস মুখোপাধ্যায়, অলোক গোস্বামী, আনসারউদ্দিন, গৌতম সেনগুপ্তরা যখন ধর্মমোহকে প্রবলভাবে কটাক্ষ, ব্যঙ্গ বিদ্রুপে কুসংস্কারের পাঠ ভেঙে ফেলতে বদ্ধ পরিকর ঠিক তখনই মিথের জগতে ভেসে গেছেন দেবর্ষি সারগী, চিরঞ্জয় চক্রবর্তী, পীযূষ ভট্টাচার্য, সোহারাব হোসেনরা। পুরাণ ও লোকায়ত পরিসরের অচিহ্নিত স্কন্দে জীবনবোধের আলো জ্বালিয়ে পুরাণের আরেক পাঠ নির্মাণ করেন। যা বাংলা গল্পের প্রবাহিত স্রোতকে নতুন বীক্ষণে উপনীত করেছে বারেবারে। আর দেবর্ষি সারগীর স্বতন্ত্রতা হল উত্তর আধুনিক বয়ান নির্মাণ করেও সেখানে অস্তিত্ববাদ ও আস্তিক্যবাদী দর্শনের পুনর্বীক্ষণের প্রজ্বলিত আলো পুনরাবিষ্কার।

দেবর্ষি সারগীর এই পর্যায়ের গল্পে অনুভব-উপলব্ধি-বোধ-চেতনা নিয়ে রীতিমতো সমীক্ষা আছে। আমাদের উৎপাদিত বোধ, বোধের নবনির্মাণ, বোধের স্থানান্তর, মানুষের সংস্পর্শে বোধের রূপান্তর নিয়ে নানা সমীক্ষা গল্পের ধারাপাতকে বীক্ষণপ্রবণ যেমন করে তুলেছে তেমনি পাঠককে গভীরভাবে ভাবাতে সমর্থ হয়েছে। সেখানে মানবজীবনের বিবিধ ধারাপত, মানুষের বিভিন্ন ক্রিয়া এবং অস্তিত্বের নানা প্রবহমান সুরকে তিনি অনেকান্তিক বীভঙ্গে বাজিয়ে যে সুর রোমন্থন করেন তা বাংলা গল্পের চৈতন্যের পাঠকে আরো পরিশুদ্ধ করে তোলে। সেখানে ইউনিট হিসেবে আছে মৃত্যু, আত্মহত্যা, ঈশ্বর, সঙ্গ-নিঃসঙ্গতার নানা খেলা। মৃত্যু সম্পর্কে বিশ্বাস-অবিশ্বাস, মৃত্যুচেতনায় লীন হয়ে যাওয়া, মৃত্যুদণ্ড, মৃত্যু নিয়ে ভাববিহ্বল, মৃত্যুর পরে জন্মান্তর না সমস্ত শূন্য ইত্যাদি নিয়ে নানা বোধের উন্মোচন ও ব্যাখ্যা গল্পকে উচ্চ দার্শনিক সুরে বেঁধে দেয়। দেবর্ষি সারগী একই ঘটনা বা বিন্দুকে সামনে রেখে অনুভব, বোধের নানা প্রসারিত-কুঞ্চিত সৌরভ ছড়ান। বিবিধ প্রবৃত্তির মানুষ বিবিধ ভাবসঙ্গে বিরাজ করে। স্বীকার-অস্বীকার, সদর্থক-নঞর্থক, মানা-না মানার মধ্য দিয়ে একটা জীবনচেতনায় বিরাজ করে। সেই জীবনচেতনা অন্যের স্পর্শে হয় উজ্জীবিত না হয় আরো মুহ্যমান হয়ে যায়। যার মধ্য দিয়ে জীবনের ধারাপাতের চোরাতল্লাশি চালিয়ে যান তিনি। ‘অমরতার সন্ধানে, কিংবা মৃত্যুর’ (শারদীয় আজকাল, ১৯৯২) গল্পের বয়ানে পাই :

“কারণ মৃত্যু বিশ্বাস না করলে বেদনা রচিত হয় না, কিংবা বিরহ, বা বর্ষার গান, যা নির্জন সন্ধ্যায় কোনও একাকিনী গায়। রচিত হয় না প্রেম, যুবতীর চোখ, শুভেচ্ছাসহ একটা উপহার, মায়ের উদ্বেগ, পুরাণের বিস্ময়, রাজার কবরের সৌন্দর্য, চোখের জল এবং ওটার ব্যথা ও সুখ, অন্বেষণ, আর ওটার ফলস্বরূপ ঈশ্বর বা ঈশ্বরহীনতা। এবং কাব্য, যা প্রকাশ করে এইসব বিষয়কেই। ভুলে যাও তুমি কখনও আমাদের লোকালয়ে এসেছিলে।” (তদেব, পৃ. ১৯৫)

সেই পরগণার লোকেরা মৃত্যু বিশ্বাস করে না। ফলত স্বাধীনভাবে যেমন বাঁচে তেমনি কোনোকিছুতেই ভয় পায় না। গল্পকথক একজনের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন। ‘বন্ধু’ চিহ্নিত মানুষটির কাছে গল্পকথক পরগণার নানা কথা শুনে, মৃত্যু সম্পর্কে অস্বীকার, উপলব্ধিহীনতার কথা শুনে ভাববিহ্বল হয়ে পড়েন। সেই বন্ধুকে হত্যা করে গল্পকথক এমন অবচেতন সত্তায় প্রবেশ করেন যা থেকে কিছুই করতে পারেন না, তখন মনে হয় মৃত্যুই শ্রেয়—“কিশোরটির কথা ভেবে অবিরাম পীড়িত হই। এই পীড়া থেকে আমাকে মুক্তি দিতে পারত একমাত্র মৃত্যুই, কিন্তু এখন আমার ভয় হয় মৃত্যুর পরও আমি পীড়িত হতে থাকব। অনন্তকাল ধরে।” একদিকে মৃত্যুকে অস্বীকার অন্যদিকে মৃত্যু ঘটিয়ে মৃত্যুর অভিঘাত ব্যক্তিমননে যে নৈরাশ্যের প্রভাব ফেলে যা থেকে ব্যক্তি কিছুতেই মুক্তি পাচ্ছে না তার অমোঘ স্বরলিপি গল্পকে নবমাত্রায় উন্নীত করে। বিবিধ মানুষ বিবিধ বোধ, উপলব্ধিতে মত্ত। এমনকি সেই বোধের উপর পরিবেশ, ভূগোল, ঐতিহ্য, জনপদ নানাভাবে প্রভাব ফেলে। কেউ উগ্র, কেউ স্থিতিশীল, কেউ জেদি, কেউ বেপোয়ারা, কেউ সংবেদনশীল। অন্য মানুষ সেই বৃত্তে গিয়ে সেই বোধের আলোড়নে মিশে যেতেও পারে বা বাতিল হয়েও যেতে পারে। মানব প্রবৃত্তির বহুবিধ প্রবণতাকে মনস্তাত্ত্বিক সমীক্ষণে ধরেছেন দেবর্ষি সারগী। আমাদের কথাবৃত্তের যে মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতা নানা সময়ে নানাভাবে গড়ে উঠেছিল আধুনিক গল্পে, জগদীশ গুপ্ত থেকে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সুবোধ ঘোষ, নরেন্দ্রনাথ মিত্র, জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী হয়ে আরো পরে দেবেশ রায়, সাধন চট্টোপাধ্যায়, সমরেশ রায়, জয়া মিত্র, অনিতা অগ্নিহোত্রী, অনিশ্চয় চক্রবর্তী, সোমক দাসের হাতে সেখানে দেবর্ষি সারগী এক অচেনা বাঁকের পথিকৃৎ। গল্পকে উচ্চ দার্শনিক মনোবীণায় বাঁধতে আমাদের পুরাণ, ঐতিহ্য, উপকথা, কথকতার স্থিতধীকেন্দ্রে প্রবেশ এবং সেখানে নতুন জীবনচেতনার খোঁজ বাংলা গল্পকে যান্ত্রিকতা থেকে মুক্তি দিয়েছে বলিষ্ঠ ঢঙে।

মৃত্যু, ঈশ্বর নিয়ে দেবর্ষি সারগী যেমন নানা জীবনচেতনা ব্যক্ত করেন তেমনি ভয়-বেদনা-স্বাধীনতা-মানব প্রেম-সভ্যতা-ক্লেদ নিয়ে জীবনের তাগিদকে অনন্তলীলায় ভাসমান করেন। দেবর্ষি সারগী প্রকৃতপক্ষে জীবনের ব্যাখ্যাকর্তা, বিশ্লেষক ও সংগ্রাহক। একাধিক জীবনের প্রতিচ্ছবি এবং সেই অস্তিত্বের মধ্যে উৎপাদিত চেতনা-বিভ্রান্ত চেতনাকে চেতন-অবচেতন-অর্ধচেতন স্তরে যেমন দোলায়িত করেন তেমনি মানুষকে অন্ধবৃত্ত থেকে মুক্ত করে সুস্থ জীবনচেতনার পাঠে ফিরিয়ে আনেন। অস্থির অবিশ্বাসের ভাঙন বেলায় দেবর্ষি সারগী যেমন পুরাতন বিশ্বাসের জগতে ফিরে গেছেন তেমনি বিভ্রান্ত বোধে আক্রান্ত মানুষের মনে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে আলোর প্রদীপ জ্বালিয়েছেন। অলীক ব্রহ্মাণ্ডের মানুষ নানা রিপুতাড়নায় ক্লেদ-বিষণ্ণতা-লোভ-ক্ষমতা-অস্থিরতা-চেতনাহীনতায় ডুবে আছে। সেই অস্থিরতা তাদের জীবনে, চলনে কখনো বাধা সৃষ্টি করছে কখনো করছে না। প্রাত্যহিক খতিয়ানে মানুষ ভুল বোধকেই সঠিক ধরে একটা মানদণ্ড দাঁড় করিয়েছে বা সভ্যতার চলমানখাতে সেইভাবেই বয়ে গেছে। সেখানে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে প্রশ্নহীন একটা অবয়ব যেমন আছে তেমনি ঐতিহ্যগতভাবে বিশ্বাস, সংস্কারের পাঠ আছে। সেখানে নবাগত কেউ অথবা গল্পকথক বা পড়শিদেশের কেউ প্রবেশ করে জীবনচেতনার পাঠকে ভাঙছে। বা সেই অচলায়তনের মধ্যে প্রবেশ করে নিজেই হারিয়ে যাচ্ছে। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের যে নতুন সময় বা ভাঙন কাল, যার মধ্য থেকে নবাগতরা নব্যচেতনা নিয়ে সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যায় তার সঙ্গে দেবর্ষি সারগীর বিস্তর প্রভেদ আছে। দেবর্ষি সারগী নির্ধারিত চেতনা বা উত্তরণের বদলে সেই ক্রিয়ার মধ্যে নবাগতকে প্রবেশ করিয়ে হয় শুদ্ধতার সত্য গড়ে তোলেন বা অস্তিত্বকে অস্থিরতায় ভুগিয়ে বাতিল করে দেন। প্রকৃতপক্ষে একটা বিস্তৃত পরিসর তা সঠিক বা বিভ্রান্তির বদলে একটা মানদণ্ড, তা যতই ভুল হোক তাকে ধরেই একটা গুহাবাসী, একটা পরগণা, একটা জনপদ বেঁচেছিল, আছে। সেখানে সত্যান্বেষীর ভূমিকা যেমন গ্রহণযোগ্য তেমনি বাতিলযোগ্যও। এইভাবেই চলছে আমাদের সভ্যতা। আর তারই চিত্ররূপময় সংশ্লেষক দেবর্ষি সারগী।

দেবর্ষি সারগীর এই পর্যায়ের গল্পে রাজা, শয়তান, ঈশ্বর, প্রভু, পুরাণের নায়কের উপস্থিতি বারবার চোখে পড়ে। তাদের একটা চিন্তাবৃত্ত আছে। জগত জীবন সম্পর্কে একটা বিভ্রান্ত বোধ আছে। নিজেকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করা বা নিজেকে টিকিয়ে রাখার একটা অশ্লীল আকাঙ্ক্ষা আছে। কোথাও জগত সংসারের সাধারণ নিয়মকে ভেঙে, মহাকালের সত্যকে ডিঙিয়ে একটা ভিত্তিহীন স্বপ্ন, সাম্রাজ্য গড়ে তোলার ঔদ্ধত্য আছে। সেই বিভ্রান্ত বোধ, ভ্রমকে কাটাতে গল্পে একজন কথক বা বিপরীত জীবনচেতনার মানুষের আবির্ভাব ঘটান। পারস্পরিক সংঘর্ঘ, আক্রমণ, বিতর্ক, আলোচনা থেকে একটা সৃষ্টিশীল সত্য আবিষ্কৃত হয় বটে কিন্তু কোথাও তা বাস্তবের সঙ্গে মেলে না। আবার দীর্ঘদিন একটা ভুল পদ্ধতিতে আক্রন্ত হয়ে মানুষ সঠিক পথের সন্ধান পেয়েও ফিরতে অক্ষম হয়। দেবর্ষি সারগী প্রকৃতপক্ষে জীবনের প্রয়োগিক দিককে নানাসূত্রে রোমন্থন করে চলেন। আর্টের সত্য অপেক্ষা জীবনমন্থনের সত্যকেই আর্ট করে তোলেন। শিল্পের সত্যকে জীবনের বিভঙ্গ দোলায় কখনো পরাজিত করেন কখনো শুদ্ধ করেন। শয়তান, ভিলেন কখনো শুদ্ধ হয় কখনো বিভ্রান্তিতেই আটকে থাকে। বাংলা গল্পের কৃত্রিম আর্টকে দেবর্ষি সারগী একলহমায় এই পর্যায়ের গল্পে (বিশেষ করে—‘শয়তান’, ‘ঈশ্বরের আকাঙ্ক্ষা’, ‘পাপমুক্তি’) ভেঙে ফেলেন। গল্পকে শিল্পের দাসত্বে উত্তরণের কৌশলে তাঁর বিশ্বাস নেই। বরং জীবনের স্পৃহাকে ধরে, জ্ঞানতত্ত্বের প্রায়োগিক দিকের প্রতিবন্ধকতা ধরে এবং পরিবেশ পরিস্থিতি চিন্তার ক্ষেত্রে কীভাবে বাধার সৃষ্টি করে তা শুষে নিয়ে যে পরিমণ্ডল গড়ে ওঠে তা গত শতকের শেষ দশক এবং এই শতাব্দীর প্রথম দশকের গল্পকে একটা মজবুত পাটাতন দান করেছে।

আজকের এই ধর্মান্ধ সময়ে দেবর্ষি সারগীর ঈশ্বরচেতনা এক উদার মানবতাবোধের যেমন পথিকৃৎ তেমনি উচ্চ জীবনচেতনাও। ঈশ্বরের অনুভবকে সঙ্গী করে সমস্ত উপাসনালয় ধ্বংস করার কথা বলেছিলেন ‘নিষিদ্ধ ধর্ম’ (শারদীয় আজকাল, ২০০২) গল্পের এক কথক। সমস্ত উপাসনালয়গুলো ভেঙে ফেললেও মানুষের ঈশ্বর অনুভব একটুও টলবে না। আমাদের দেশে প্রথমে উপাসনালয়গুলো গড়ে উঠেছে তারপর ঈশ্বরের অস্তিত্ব-অস্তিত্বহীনতার পাঠচর্চা প্রসারিত হয়েছে। কিন্তু উপাসনালয়গুলি গড়ে ওঠার আগে যদি ঈশ্বরচর্চা শুরু হত তবে সেগুলির আর প্রয়োজন হত না। গত শতকের শেষ দশক জুড়ে দেবর্ষি সারগী যখন এইসব গল্প লিখছেন তখন বাবরি মসজিদ যেমন ধ্বংস হয়ে গেছে তেমনি তা নিয়ে বিস্তর রাজনীতি চলছে। এই শতকের দুই দশক অতিক্রান্ত সময়ে উগ্র ধর্মান্ধতার কারণে যে পরিমাণে মন্দির-মসজিদের রেওয়াজ আজ গড়ে উঠেছে সেখানে প্রকৃত ধর্ম অন্বেষণই সংকটের মুখে। যেমন সংকটের মুখে পড়েছিলেন ‘নিষিদ্ধ ধর্ম’ গল্পের উদারচেতা ঈশ্বর অন্বেষক নায়ক। দেখে নেওয়া যাক গল্পের বয়ান :

“ঈশ্বর না থাকলে গোটা জগৎ, প্রাণের জন্ম ও মৃত্যু সবই অর্থহীন হয়ে যায়। মানুষ হয়তো তবু বেঁচে থাকবে। কিন্তু কোনও কিছুর স্থায়ী অর্থ খুঁজে পাবে না। এই যুক্তিতে তাঁর কাছে ঈশ্বর সেই সত্তা যা সব কিছুকে অর্থ প্রদান করে। কিন্তু যে উপলব্ধির জন্য তাঁকে শেষপর্যন্ত প্রাণ দিতে হল সেটা হল : ঈশ্বরের জন্য কোনও উপাসনালয় নির্মাণ করার দরকার নেই। তাঁকে পুজো করার দরকার নেই। তাঁকে পেতে কোনও দীর্ঘ, জটিল, ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করার দরকার নেই। কোনও অবতারের অনুগামী হওয়া দরকার নেই। কোনও তীর্থস্থানে যাওয়ার দরকার নেই। যা দরকার তা শুধু এটুকু স্মরণ করা যে জগতে তিনি আছেন।” (তদেব, পৃ. ১৪৩-১৪৪)

ঈশ্বর সম্পর্কে শ্রদ্ধাশীল হয়েও, ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্পর্কে পূর্ণ আস্থা রেখেও শুধুমাত্র উপাসনালয়ের বিরোধিতায় সেই ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল রাজা। আবার যে সৈনিকদের সেই ব্যক্তিকে গুলিবিদ্ধ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তারা ইচ্ছাকৃতই গুলিবিদ্ধ করেনি। সেই ব্যক্তির কথা রাজ্যে যেন কোনোভাবে প্রচার না হয় সেই ইস্তেহার ঘোষণা করেছেন রাজা, এমনকি কেউ প্রচার করলে তার মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে। এক বিদেশী পর্যটক গ্রাম্য বৃদ্ধকে বারবার অনুরোধ করায় সে সেই গল্প বলেছিল কিন্তু তাও সৈনিকদের চোখে ধরা পড়ে যায়। এমনকি এই গল্পকথনের জন্য সৈনিক গ্রাম্যবৃদ্ধকে রাজ নির্দেশিত মৃত্যুদণ্ড দেবে। পূর্বে যে সৈনিকরা ঈশ্বরভক্ত ব্যক্তিকে ইচ্ছাকৃত হত্যা করেনি রাজার আজ্ঞাবহ দাস হওয়া সত্ত্বেও তাদেরই পরের প্রজন্মের এক বংশধর আজকের সৈনিক। বিদেশী পর্যটক তো এই গল্প দেশে ফিরে করবে, তখন যেন এই সৈনিকদের কথাও উল্লেখ করে। ধর্মকে কেন্দ্র করে জীবনের সংঘাতকে দেবর্ষি সারগী স্পষ্ট করতে চেয়েছেন। দেবর্ষি সারগীর ঈশ্বরকেন্দ্রিক গল্পগুলি আজকের সময়ে আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে আমাদের দেশ বহুধর্মতান্ত্রিক, বহু মতাদর্শকেন্দ্রিক বলেই। ঈশ্বরকে কেন্দ্র করে উদারতা, মহৎ জীবনচেতনা, জীবনদর্শন ছাড়া সভ্যতার বৃহত্তর পাঠ অসম্ভব। সেই পাঠেরই আবিষ্কারক দেবর্ষি সারগী। জীবনের বহুস্তর, মতাদর্শের বহুস্তর, উপাসনার বহুস্তরকে কেন্দ্র করে ধর্মের বৃহত্তর পাঠ যা মানুষকে ক্রমেই মুক্ত উদার পবিত্র করে তারই আশ্চর্য উদ্ভাবক দেবর্ষি সারগী।

দুই.
দেবর্ষি সারগী ভাষাকে অনুভবের গহিন গাঙে প্রবেশ করিয়েছেন। ভাষার শুদ্ধরূপকে ধরে বিরোধাভাস, দ্ব্যর্থবোধক, বাচনের বহুবিস্তারী রূপচ্ছায়ায় এক অলীক ভুবন গড়ে তোলেন। ভাষিক পরিমণ্ডলে বাস্তব-অবাস্তব, বাস্তব-স্বপ্ন, স্বপ্ন-বাস্তব, রূপমোহ, ইন্দ্রিয়চেতনা, ভক্তিবাদ, চেতন-অবচেতন-অর্ধচেতন ও জীবনের সংহত-অসংহত রূপের মধ্য দিয়ে যে বয়ান গড়ে ওঠে তা বাংলা গদ্যের নবাগতরূপ। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বাক্য, কাব্যিক রূপচ্ছবি, চিত্রকল্প-উপমার বহুবিস্তারী মায়া ও অর্থকে সদর্থক-নঞর্থক, বিস্তার-সংকোচ, অর্থপূর্ণ-অর্থহীনের মধ্য দিয়ে যে ভাষাজাল গড়ে ওঠে তা বাংলা গল্পের আধুনিকতাকে ভিন্ন বাঁকে জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠা করে।

দেবর্ষি সারগীর গল্প মতাদর্শের গল্প। তা আপাতভাবে দলীয় রাজনীতির নয় কিন্তু গভীরভাবে রাজনৈতিক। ঈশ্বরের উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে দুই উপভোক্তা শিবিরের খণ্ডযুদ্ধ, সংকটের গল্প। সেখানে চিন্তা, মতাদর্শের সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘুপন্থী রয়েছে। দেবর্ষি সারগী নিজেও মতাদর্শের সংখ্যালঘুপন্থীদের দিকেই ঝুঁকে থাকেন। তা হল ঈশ্বরকে কেন্দ্র করে প্রকৃত অনুভব, অন্যদিকে ঈশ্বরকে ধরে উপাসনালয়, ভক্তমণ্ডলীর হইচই, বাণিজ্য ও অন্য মতালম্বীকে পরাজিত করার ঔদ্ধত্য। দেবর্ষি সারগীর ঈশ্বরচেতনা আত্মকামী মানুষের অনুপস্থিতির শূন্যতাকে বৃহৎ অর্থে যেমন অনুভব তেমনি নির্জনতার অনুভব। ঈশ্বর আছেন একথা ঈশ্বর যেমন জানেন তেমনি মানুষও জানেন। আবার ঈশ্বর যে নেই তা ঈশ্বর যেমন জানেন মানুষও জানেন। ঈশ্বর এখানে একটা শক্তির আধার। যাকে কেন্দ্র করে মানুষ মুক্ত হতে চায়, সাধক হতে চায়, নির্জন হতে চায়, নিমগ্ন হতে চায়, জগতের ভোগবাদী জীবনতৃষ্ণা থেকে নিজেকে পবিত্র করতে চায়। অথচ এই উপাসনাকে কেউ কেউ কলুষিত করে, এমনকি প্রমাণ করতে চায় ঈশ্বরের সাধক কিনা এই পরীক্ষায়। ঈশ্বরকে কেন্দ্র করে একদিকে নির্জনতায় আত্মমগ্নতা অন্যদিকে প্রদর্শন—এই দুই দ্বন্দ্ব গল্পকে উচ্চ দার্শনিক সুরে বেঁধে দেয়। এইসব গল্প আধুনিক বাংলা গল্পের সম্পূর্ণ বিরুদ্ধ অবস্থানে রয়েছে। উচ্চ দার্শনিকতা, অস্তিত্বের নিগূঢ়তা, চরিত্রশূন্য অবয়ব এবং জীবনচেতনার ঐশ্বরিক ভাবমন্থন গল্পকে যে পরিসর দান করে তা আধুনিকতার দ্বন্দ্বমথিত সংকটময় জীবনকে রীতিমতো চ্যালেঞ্জ করে। ‘একটি নীরব সম্প্রদায়’ (গল্পের কাগজ, ২০০৩) গল্পের বয়ানে পাই :

“ওইরকম চুপ করে বসে বসে সারাদিন তোমরা কী করো? সে তার পুরনো প্রশ্নটাই আবার করে। ‘এমনকি সারারাত? রাতেও তোমাদের ওভাবে বসে থাকতে দেখেছি।’
‘ঈশ্বরের সঙ্গে মিলিত হই, ‘অনিচ্ছা সত্ত্বেও লোকটা বলল।
‘আমি সেরকমই শুনেছি’, একটু কম্পিত গলায় যুবকটি বলে। ‘যদিও ঈশ্বরকে তোমাদের আশপাশে কখনও দেখিনি।’
‘কী করে বোঝাই তোমাকে বলো তো?’
‘আচ্ছা এটুকু বলো—কেমন লাগে তখন?’
‘এত তৃপ্ত যে মন আর কিছু চায় না।’
‘শুধু ঈশ্বর ছাড়া, তাই না?’
‘না, তখন ঈশ্বরকেও চায় না।’

যা আশ্চর্যের, হতভম্ব যুবকটি চকিতে বুঝতে পারল লোকটার কথা। সে বুঝল, ঈশ্বরের সঙ্গে মিলিত হবার মুহূর্তে এরা নিজেরাও কিছুক্ষণের জন্য ঈশ্বর হয়ে যায়। এবং তখন ঈশ্বর খোঁজার ইচ্ছেটাও আর থাকে না, কারণ জগতে একমাত্র ঈশ্বরই ঈশ্বর খোঁজেন না।” 
—(একটি নীরব সম্প্রদায়, তদেব, পৃ. ৩১২)

কেউ যে ঈশ্বরকে মানেন, শ্রদ্ধা করেন, বিশ্বাস করেন তা আজকের ভোগবাদী, মুনাফাবাদী সমাজে বারবার প্রমাণ দিতে হচ্ছে। দেবর্ষি সারগী এই পন্থার বিরুদ্ধে নীরব যুদ্ধ করেন। তাঁর এই গল্পভাবনায় একটা নিজস্ব পৃথিবী আছে। সেই অলীক পৃথিবীতে বেশি সংখ্যক মানুষ নেই। জগত যেহেতু ঈশ্বরের সৃষ্টি, জগত যেহেতু ঈশ্বরের পরীক্ষাস্থল তাই বেশি সংখ্যক মানুষের প্রয়োজন নেই। এমনকি যে জনসমাজের কথা দেবর্ষি সারগী নির্মাণ করেন তা প্রাচীন জনসমাজ। সেখানে একটা স্থিরতা আছে। ভোগবাদের ইস্তেহার সেখানে তেমনভাবে প্রবেশ করেনি। কিন্তু আজকের সভ্যতার সঙ্গে তার একটা যোগসূত্র আছে। বলা ভালো আজকের সভ্যতার এই ব্যভিচারী পরিণাম কীভাবে তরান্বিত হচ্ছিল সেই গুপ্তপথটি দেবর্ষি সারগী চিহ্নিত করে চলেন। সে বয়ান এমনই নিস্পৃহ, এমনই নিরালা যে তার কোনো জয়-পরাজয়ের বাসনা নেই। শ্রেণিসংঘাতের বদলে তা দাঁড়িয়ে থাকে মতাদর্শের সংঘাতে। আবার মতাদর্শের সংঘাতকে কেউ যদি শ্রেণিসংঘাত বলে চিহ্নিত করতে চান সেখানেও আপত্তির কিছু থাকে না। বস্তুতপক্ষে দেবর্ষি সারগী কিছুই স্পষ্ট করেন না। একটা অস্পষ্টতার বেড়াজাল দিয়ে জীবনের দ্বন্দ্বময় ভাবসংঘাতের রূপনিকেতন কত আশ্চর্য মণিমুক্তায় ভরা হতে পারে তার সন্ধান দিয়ে যান।

দেবর্ষি সারগীর চরিত্ররা উদাসীন। জগত জীবন সম্পর্কে মোহমুক্ত। ভোগ আকাঙ্ক্ষা থেকে বিচ্যুত। এমনকি মৃত্যু সম্পর্কেও বৈরাগ্যময়। ফলত তাদের কোনো দুঃখ নেই, ক্লেদ নেই। কেউ জন্মান্তরে বিশ্বাস করে, কেউ করে না। তবে কারো পাপবোধ নেই। আত্মার অবিনশ্বর ক্রিয়া সম্পর্কে কেউ যেমন সচেতন তেমনি কেউ মৃত্যু নিয়ে ভীত নয়। সকলেই প্রাজ্ঞ, জীবনচেতনায় ভরপুর। আমাদের দেশের যে দার্শনিক ধারা বা বঙ্গদেশের মধ্যযুগের যে আধ্যাত্মিক ও বাউল মার্গের দর্শন তা মানুষকে একটা সুনির্দিষ্ট জীবনচেতনায় উপনীত করতে সক্ষম হয়েছিল। দেবর্ষি সারগীর চরিত্ররা সেই পর্যায়ের। দেহবাদ, জ্ঞানবাদ, আত্মতত্ত্ব, পরমার্থিক ক্রিয়া সম্পর্কে এরা সকলেই সচেতন। ফলত গল্পে যে ভাবমণ্ডল গড়ে ওঠে তা জীবনেরই গূঢ়তত্ত্বকে নানা ঐশ্বর্যময় বিন্যাসে জানান দেয়। দেবর্ষি সারগী প্রকৃতপক্ষে ঐশ্বর্যেরই শিল্পী। মৃত্যুও এখানে আনন্দময়, পবিত্রময়। পরাজয় এখানে কোনো ক্লেদ বিষণ্ণতার জন্ম দেয় না। বরং পরাজিত মানুষ জীবনের নতুন তত্ত্ব খোঁজে, নিজেকে মোহমুক্ত করে জীবনের ঐশ্বর্যকে পবিত্র করে। ‘মৃত্যু’ (আকাশদীপ, ২০০২) গল্পের নায়ক নিজের ভিত্তিহীন মৃত্যুর বিরুদ্ধে কোনো প্রতিরোধই গড়ে তোলেনি। এমনকি জীবনে মৃত্যু ঘটবেই তা আজ বা কাল ধরে নিয়ে মৃত্যুকেই বরণ করতে চাইছে। শুধুতাই নয় জন্মান্তরকেও সে অস্বীকার করছে, কেননা তবে তো আবার মৃত্যুর মুখে যেতে হবে। এক্ষেত্রে দেবর্ষি সারগী কি পলাতক শিল্পী? প্রশ্ন থেকে যায়। তাঁর গল্পে বহুক্ষেত্রেই প্রতিরোধের বয়ান নেই। বরং মানুষ আত্মসমর্পন করছে। আত্মসমর্পনের মধ্য দিয়েই পবিত্র আত্মার মুক্তি খোঁজেন তিনি। বৈষ্ণবীয় ভাববাদ, চৈতন্যজীবনী গ্রন্থের জ্ঞানতত্ত্ব, সাধনমার্গ, বাউলের বৈরাগ্য, উপনিষদের জীবনচেতনা ও গীতার কর্মযোগ, আত্মার পিপাসা দ্বারা তিনি হয়ে ওঠেন ভারতীয় গল্পকার। ভারতের আত্মা, দার্শনিক মননভূমি ও জ্ঞানতত্ত্বকে তিনি গল্পবীক্ষণে ধারণ করেছেন নিজস্ব সক্ষমতায় ও সাবলীলতায়। যা বাংলা গল্পের ক্রমমুক্তি ঘটিয়েছে আপন ছন্দে, ভাবনিকেতনের উচ্চ দার্শনিক অভিলাষে।

দেবর্ষি সারগীর গল্পে বোধের উন্মোচন, বোধের মীমাংসা, বোধের উৎপাটন, বিভ্রান্ত বোধের অণুচিন্তন, বোধের প্রতিবন্ধকতা ব্যাপক ভূমিকা গ্রহণ করে। মানব জীবনের রিপুময় প্রবৃত্তি, ইন্দ্রিয়জ পিপাসা, ভোগতাড়িত জীবনের নানা প্রবণতা, উৎস অভিমুখে যাত্রা এবং পরিণতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল অস্তিত্বের নানা উত্থান-পতন গল্প শরীরে যে বয়ানে ও ভাষিক বিন্যাসে মিশে থাকে তা বাংলা গল্পের যথার্থই নতুন স্বর। যে পরিচ্ছন্ন বোধ মানুষকে মুক্ত করে, মানুষকে মহৎ করে, পবিত্র করে তার জাগরণ গল্পে যেমন ভাববাদের জন্ম দেয় তেমনি তার বৈপরীত্য জীবনের দাবিকে অক্ষমভাবে প্রতিষ্ঠা দিয়ে যায়। দেবর্ষি সারগী কোনোকিছুকেই চূড়ান্ত বলে মেনে নেন না। এক গল্পে এক উৎপাদিত সুর, জীবনচেতনা, বিন্যাস অন্যগল্পে ভেঙে যায়। আসলে মানুষের বোধের উৎপাদন পরিস্থিতি, ভাষ্য, পরিণতি, পরিবেশ, জীবনচিন্তা, উপলব্ধি অনুসারে বদলে যাচ্ছে। কেউ বিভ্রান্ত চিন্তাকেই সঠিক ভেবে মশগুল হয়ে আছে। তিনি সেখানে নীতিনির্ধারক নন। সেই বিভ্রান্ত বোধ দ্বারাই একটা পরিবেশ সৃষ্টি করে, একটা পরিণতি রচনা করে দেখান জীবনের বিন্যাস এমনও হওয়া সম্ভব। মহাপৃথিবীর মানুষকে একছকে বাঁধতে চাননি দেবর্ষি সারগী। ফলত গল্পে সুনির্দিষ্ট দার্শনিক সত্যকেও তিনি কোনো কোনো প্রেক্ষাপটে ভেঙে ফেলেন। পরিস্থিতির সঙ্গে যেখানে ভাববন্ধন মিলছে না, আদর্শবাদ প্রতিফলিত হচ্ছে না তার রূপমোহ তিনি স্বেচ্ছায় ভেঙে ফেলেন। ‘ফাউস্ট-এর প্রামাণ্য ও সংক্ষিপ্ত আত্মজীবনী’ (এবং মুশায়েরা, ১৯৯৬) গল্পে শুনতে পাই :

“বিশ্রামকে আমি যেমন অপছন্দ করি তেমনি প্রজ্ঞাকেও। এ দুটো অবশ্য পরস্পরের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত, কারণ বিশ্রাম ছাড়া প্রজ্ঞা অর্জন করা যায় না এবং প্রজ্ঞার প্রাপ্তি জীবনকে ধীরে ধীরে বিশ্রামের দিকেই ঠেলে দেয়। প্রজ্ঞা মানুষের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ধ্বংস করে, কৌতূহল ধ্বংস করে, এমন কি ঐশ্বর্য ধ্বংস করে। ধ্বংস করে মানুষের অহমিকাকে, সর্বশক্তিমান হবার অভিলাষকে। আমি শুনেছি প্রজ্ঞাবানরা তাদের আঙুলিমেয় জ্ঞান ও স্বপ্ন নিয়ে সারাজীবন অদ্ভুত হতশ্রী, কাপুরুষোচিত ও অপরিসীম ক্লান্তিকর (হাস্যকরভাবে তারা মন্তব্য করে যে তারা নাকি গভীর আনন্দ ও তৃপ্তিতে দিন কাটায় এবং তারা নাকি আমার চেয়েও শক্তিশালী) জীবন অতিবাহিত করে। তাদের উট ও মেষসুলভ শান্ত মুখগুলোকে আমি ঘৃণা করি, তাদের কোমল, অসহায় প্রেমকে ঘৃণা করি, উপহাস করি তাদের কল্পনাশক্তিকে। আমার টাওয়ারে নির্মিত অসংখ্য সিঁড়ির একটা সিঁড়িও নির্মাণ করার শক্তি তাদের আছে বলে আমি বিশ্বাস করি না।” (তদেব, পৃ. ৩২২)

সমাজের নানাস্তরের মানুষের চিন্তা, বোধ, উপসর্গ, মনস্তত্ত্ব, চিন্তার স্তরকে তিনি গল্পশরীরে প্রতিফলিত করেছেন নানা আঙ্গিকে। এমনকি শতাব্দী শতাব্দীতে মানুষের বোধ, চিন্তা, ভাবকল্পনা কীভাবে বদলে যাচ্ছে তার নিগূঢ় বয়ান মহাকালের ধারাপাতকে এত যথার্থভাবে প্রত্যয়িত করে যার দোসর বাংলা গল্পে অনুপস্থিত। ফাউস্টের আত্মজীবনীর ধারাপাত এবং শতাব্দী শতাব্দীতে তাঁকে কেন্দ্র করে বদলে যাওয়া বিনির্মাণকে যে ভঙ্গিমায় লেখক উপস্থাপন করেন তা বাংলা গল্পের আধুনিকতাকে আরো জোরালোভাবে প্রমাণ করে। একদিকে মহাকাব্যের নায়ক, কল্পনা, শতাব্দীর ভাবকল্পনায় বিনির্মাণের সংগঠিত প্রয়াস, অন্যদিকে ফাউস্ট নিজেই বৃত্তকে বারবার বদলে দিচ্ছেন। দেবর্ষি সারগীর গল্প পেঁয়াজের খোলস উন্মোচনের মতো এক বয়ান। তবে সেখানে ঝাঁজালো গন্ধ নেই আছে স্নিগ্ধ সুর। উপস্থিত-অনুপস্থিত, সফল-ব্যর্থতা, সদর্থক-নঞর্থক, দক্ষতা-দক্ষতাহীনতা, জড়বাদ-ক্রমেই বদলে যাওয়া পরিসরের মধ্যে তা খুঁজে নেয় মহাকালের গতিময় তরঙ্গ। দেবর্ষি সারগীর গল্প মহাকালেরই চিরকালীন বিভঙ্গের আশ্চর্যময় ধারাপাত। তা ক্ষণে ক্ষণে রূপবদল করে বটে কিন্তু কালিক সত্যের মাধুর্যকে আলিঙ্গন দিয়ে যায় বিচিত্র গতিতে।

স্বপ্ন-বাস্তব-মতিভ্রম-বিভ্রান্ত বাস্তব-কল্পিত বাস্তব নিয়ে দেবর্ষি সারগীর আখ্যান। সেখানে নানা পশুপাখি ঘুরে ফিরে আসে। স্বপ্নময় কল্পনা এবং কল্পনাময় বাস্তবকে তিনি নানা পরিসরে প্রদক্ষিণ করে চলেন। মানুষ একটা ধারণাকে আঁকড়ে ধরে যেমন বাঁচতে চায়, বাঁচে তেমনি কোনো কোনো ধারণা, বিভ্রম মানুষকে ক্রমেই একটা মানসিক অবসাদ, অতৃপ্তি, মতিভ্রমে পর্যবসিত করে। অলক্ষ্য থেকে অদৃশ্য নিয়ন্ত্রক হয়ে মানুষের মনে এমনভাবে চেপে বসে যে মানুষ জগত সংসারের সমস্ত সত্যকেই ভুলে যায়। একটা পাপবোধ, একটা শূন্যতাবোধ, একটা অস্থিরতা এমন চিত্তবিকার ঘটায় মানুষ জীবনের আশু উদ্দেশ্যই খুঁজে পায় না। ‘স্বপ্নের বুড়ো’ (শারদীয় আজকাল, ১৯৯৩) গল্পের নায়ক নিজেকে অজ্ঞ ভাবে কেননা সে যে নিজের পিতাকে হারিয়েছে তা নিজেই জানে না। এই জ্ঞানহীনতা তাকে ক্রমেই এক পাপবোধে আক্রান্ত করে। আর এরমধ্য দিয়েই দেবর্ষি সারগী শূন্যতা, স্বপ্নের উদ্ভাসন গড়ে চলেন। দেবর্ষি সারগীর গল্প জীবনের নিত্যতার সূত্রকে বিভঙ্গিল গতিতে বিবিধ এককে পরিমাপ করে নিতে চায়। সেখানে কাহিনি অস্তিত্বের গূঢ়তত্ত্বকে নানামাত্রিক পরিভাষায় সমীক্ষণ করে চলে। সেখানে গল্পের কাহিনি পাঠককে বলে দেওয়া অর্থহীন। দেবর্ষি সারগী পাঠককে একটা উপলব্ধির স্রোতে ভাসাতে চান। মানব জীবনের স্বপ্ন-স্বপ্নহীনতা-বাস্তব-বাস্তবহীনতা-নগ্ন বাস্তব-অর্ধবাস্তব-বিকৃত বাস্তব-শূন্যতা-মতিভ্রম-চিন্তা-চিন্তাহীনতা দ্বারা জীবনের ভুলভুলাইয়াকে যেমন নির্ধারণ করেন তেমনি জীবনের আয়ুধকে পরিমাপ করে নেন।

তিন.
দেবর্ষি সারগী আর্টের সত্যে বিশ্বাস রেখেছেন। ফলত ইচ্ছাকৃতভাবে বাস্তবকে ভাঙতে সক্ষম হয়েছেন। সমান্তরাল বাস্তবের পাশে এক অদৃশ্য বাস্তব, স্বপ্ন, মতিভ্রমের বাস্তবকে প্লটে রেখে বাস্তবের রুদ্ধশ্বাস চিত্রকে যে ভঙ্গিতে নির্মাণ করেন তা বাংলা গল্পের যথার্থই নতুন স্বর। শুধু নতুনই নয় বাংলা গল্পের এক যথার্থস্থল। বহুক্ষেত্রেই সমান্তরাল বাস্তবে তিনি বিশ্বাস রাখেননি। বাস্তবের ক্লেদ বিষণ্নতা ব্যভিচার, চূড়ান্ত অনৈতিকতাকে তিনি বুনে দিয়েছেন এক অদৃশ্য বাস্তবে, স্বপ্নের বাস্তবে। যা বাস্তবের অনেক ঊর্ধ্বে, এমনকি ভিত্তিহীন কিন্তু তার সুপরিকল্পিত বয়ান এমন সুবিন্যস্ত ও পরিপাটি যা প্রতীয়মান বাস্তবকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করে। ‘ঘুমন্ত খুনি’ (আরম্ভ, ২০০৩) গল্পের চরিত্ররা খুনের নেশায় এমনই মত্ত হয়েছিল যে ঘুমের ভিতরই খুনের প্রক্রিয়া চালিয়ে যায়। এমনকি যে শেষপর্যন্ত আড়ালে বেঁচেছিল সে নিজেই নিজেকে খুন করে রক্তের পিপাসা মেটায়। মানুষ কখনো কখনো একটা ট্যাবুতে আক্রান্ত হয়ে যায়। যা থেকে কোনোভাবেই মুক্ত হতে পারে না। এমনকি বাস্তবের নেশা, ক্রিয়া স্বপ্নকে এমনভাবে আক্রান্ত করে যে তারমধ্যেও সেই প্রক্রিয়া চলতে থাকে। দেবর্ষি সারগী ব্যক্তির চেতন-অবচেতন-অর্ধচেতন সত্তায় নানামাত্রায় বীক্ষণ চালান। কখনো অবচেতনের আর্তনাদ, বিবমিষাকে ভাষায় রূপ দেন। জীবনের অস্থিরতা ব্যক্তিকে কোন গোলার্ধ থেকে কোন গোলার্ধে নিয়ে যাবে ব্যক্তি নিজেও জানে না। সেখানে হঠকারিতা, যেমন আছে তেমনি আছে প্রলাপ। ক্রমেই এক বিভ্রান্ত বোধ, হ্যালুসিনেশনে বন্দি হওয়া। তার আশ্চর্য আবিষ্কারক গল্পকার দেবর্ষি সারগী।

দেবর্ষি সারগী ঈশ্বর নিয়ে এতো বিচিত্ররকম উপলব্ধি, নির্মাণ ও মাতোয়ারা থাকেন যে তা যেন আমাদের ধর্মতন্ত্রের নব্যপাঠ বলে মনে হয়। এমনকি কোথাও কোথাও এতটাই ঈশ্বরচেতনায় মত্ত যে গল্প নিরুদ্দেশ। কোথাও যেন কথক জীবনের ভাষ্য শুনিয়ে যাচ্ছেন। নৈতিকতার পাঠ সেখানে বড় হয়ে ওঠে। গল্প হারিয়ে যায় ঈশ্বরের কোলাজে। আমাদের আধুনিকতার দ্বন্দ্বময় ভাষ্যে তা কোথাও বাতিল বলেও বিবেচিত হতে পারে। প্রকৃতপক্ষে দেবর্ষি সারগীর বলয় এক সাধকের গল্প বলয়। প্রেম-যৌনতা-রাজনীতি-ক্ষমতা অপেক্ষা তা অনেকবেশি মূল্যবোধ, ভাববাদ, জীবনচেতনা ও ঈশ্বর সম্পৃক্ত ভাবনার। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, পরবর্তীতে আরো অনেকে ধর্মতত্ত্ব, বেদ-উপনিষদ নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা, উপলব্ধিতে পৌঁছেছেন। আবার ‘কল্লোল’ পরবর্তী যুগের লেখকরা ঈশ্বরের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে যুদ্ধোত্তর পৃথিবীর নবভাষ্য রচনা করেছেন। দেবর্ষি ঈশ্বরকে কেন্দ্র করেই এক শুদ্ধ জগত রচনা করতে চান। হানাহানি, রক্তপাত, দাঙ্গা, ধ্বংসের মধ্য দিয়ে যে পৃথিবী ক্রমেই বিলীয়মান হচ্ছে সেখানে নতুন সৃষ্টির গান শোনাতে চান। ‘অপেক্ষা’ (প্রতিদিন, ২০০২) গল্পে শুনতে পাই :

“ধর্মহীন নব্যপ্রস্তুর যুগের মানুষের মতো সেও বিশ্বাস করে ঈশ্বর মানুষকে সৃষ্টিই করেছেন যাতে মানুষের দ্বারা উপলব্ধ হবার আনন্দটা উপভোগ করতে পারেন। কিন্তু তাঁকে উপলব্ধি করতে গিয়ে মানুষ যদি নিজেদেরই নিঃশেষ করে ফেলে তবে সেটার কী অর্থ দাঁড়ায় সে বুঝতে পারছে না। তার আবার মনে হল মধুর নিষ্ক্রিয়তায় আবিষ্ট ঈশ্বর হয়তো জানেনই না জগতে মানুষ একে অপরকে হত্যা করতে করতে নিশ্চিহ্ন হয়ে চলেছে। ভাবনাটার আতঙ্ক এবার তাকে রীতিমতো পর্যুদস্ত করে দিচ্ছিল।” (তদে, ১৩৯)

দেবর্ষি সারগী মানুষকে একটা আদর্শনগরীতে পৌঁছে দিতে চান। যেখানে ঈশ্বর চিন্তা থাকবে কিন্তু কোনো উপাসনালয়, হানাহানি থাকবে না। বাস্তবে আমরা দেখে এসেছি যুগ যুগ ধরে ধর্মমত, ঈশ্বরকে কেন্দ্র করেই যাবতীয় হানাহানি ঘটেছে। তবে দেবর্ষি সাগরীর চিন্তা ভিত্তিহীন না ভাববাদ? তিনি ঈশ্বরকে শুদ্ধতার স্বরে প্রমাণ করতে চান। যা মানুষের আত্মার সঙ্গে সংযুক্ত। যা মানুষকে নির্মল করে, একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা, সহানুভূতি, মর্মানুভূতি সৃষ্টি করে। ঈশ্বরের অস্তিত্বকে ধরেই তিনি মানুষের মুক্তি চান। গত শতকের সাত-আটের দশকে নানাভাবে নাস্তিকতার চর্চা, বিজ্ঞানবাদ, কুসংস্কার বিরোধী আন্দোলন শুরু হয়েছে বিভিন্ন পত্রপত্রিকাকে কেন্দ্র করে। ঠিক সেই সময়ে দেবর্ষি সারগী বিপরীত পিঠের গল্প লিখছেন। আশ্চর্যজনকভাবে তা কোনো ধর্মমতালম্বী নয়, কোনো ধর্মমতকে প্রতিষ্ঠা বা কারো প্রতি বিদ্ধেষ নয়। প্রকৃতপক্ষে দেবর্ষি সারগী সংবেদনশীল শুদ্ধতার শিল্পী। জীবনের বিশুদ্ধতাকে কীভাবে কোন পথে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব, পঙ্কিলতার অন্ধকার থেকে জীবনকে কীভাবে পবিত্র নির্মল করা সম্ভব তারই অভ্রভেদী নির্মাতা।

দেবর্ষি সারগীর গল্প আত্ম অন্বেষণের গল্প। স্মৃতির সূত্র সেখানে বড় ভূমিকা পালন করে। বেদ পাঠের দেশে, কথকতার দেশে, লোকশ্রুতির দেশে মানুষকে যেমন স্মৃতিময় করে তোলেন তেমনি স্মৃতিনাশ, বিভ্রান্ত স্মৃতির মধ্য দিয়ে উজ্জীবনের স্রোতে ভাসিয়ে দেন। হারানো, নিরুদ্দেশ অভিযান, আত্মময় রোমন্থনের মধ্য দিয়ে জীবনেরই বৃহত্তর পাঠ নির্মিত হতে দেখি। দেবর্ষি সারগীর গল্পের পরিসর একেবারেই ক্ষুদ্র। সেখানে চরিত্রের উপস্থিতি অপেক্ষা মানব মনের একটা জারণ প্রধান। তা স্মৃতি-মৃত্যু-আত্মহত্যা-মৃত্যুচেতনা-যুদ্ধ-ঈশ্বর সন্ধান-উপাসনা যাই হোক না কেন। সেখানে কোলাহল নেই। একটা স্তিমিত ভাবকেন্দ্রই মুখ্য। গল্প নিয়ে অতিরিক্ত চালাকি নেই। নেই পাঠককে বাজিমাত করার কায়দা কৌশল। বাংলা গল্পের নন্দনতত্ত্বকে ভারতীয় পরম্পরা ধরে কতখানি নিখাদ স্বচ্ছ সোনায় পরিণত করা সম্ভব তার এক সুদক্ষ স্বর্ণকার দেবর্ষি সারগী।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ