অনুবাদ : কুলদা রায়
ইসাবেল আয়েন্দে লাতিন আমেরিকার অন্যতম প্রধান সাহিত্যিক। ১৯৪২ সালে পেরুর লিমায় জন্মগ্রহণ করলেও তিনি মূলত চিলির লেখক হিসেবে পরিচিত। শৈশব কেটেছে বিভিন্ন দেশে—চিলি, বলিভিয়া, লেবানন। চিলির সামাজিকতান্ত্রিক রাষ্ট্রপতি সালভাদোর আয়েন্দে ছিলেন তাঁর বাবার প্রথম চাচাতো ভাই। ১৯৭৩ সালে সামরিক অভ্যুত্থানে সালভাদোর আয়েন্দের পতন ও মৃত্যুর পর ইসাবেল দেশ ছেড়ে ভেনেজুয়েলায় চলে যান। পরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ায়।
১৯৮১ সালে মৃত্যুপথযাত্রী দাদার জন্য লেখা একটি চিঠি থেকে জন্ম নেয় তাঁর প্রথম উপন্যাস দ্য হাউস অফ দ্য স্পিরিটস। বইটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁকে তাৎক্ষণিক খ্যাতি এনে দেয়। এরপর একের পর এক লিখেছেন অফ লাভ অ্যান্ড শ্যাডোস, ইভা লুনা, দ্য স্টোরিজ অফ ইভা লুনা, দ্য ইনফিনিট প্ল্যান, পাওলা, ডটার অফ ফরচুন, পোর্ট্রেট ইন সেপিয়া, সিটি অফ দ্য বিস্টস-সহ আরও অনেক বই। তাঁর লেখা পঞ্চাশটিরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি পাঠক তাঁর সাহিত্য পড়েছেন। সমালোচকরা তাঁকে প্রায়ই `লাতিন আমেরিকার শেহেরজাদে' বলে অভিহিত করেন। সাংবাদিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন চিলির নারীবাদী পত্রিকা পাওলাতে। সারাজীবন সচেতন নারীবাদী হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিয়েছেন।
ইসাবেলা আয়েন্দে অনেক পাঠক অনুরাগীরা তার জীবন ও সাহিত্য কর্ম নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা প্রশ্ন করে থাকেন। সেগুলো থেকে কিছু প্রশ্ন বাছাই করে নিজের ওয়েব সাইটে উত্তরগুলো লিখেছেন সাক্ষাৎকার আকারে। এই দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে ইসাবেল আয়েন্দে বিস্তৃত পরিসরে নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন। লেখার প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে জানিয়েছেন, তিনি কোনো রূপরেখা ছাড়াই প্রতিদিন দশ থেকে বারো ঘণ্টা একা লেখেন। নিজেকে একটি মাধ্যম হিসেবে দেখেন যার ভেতর দিয়ে গল্প প্রবাহিত হয়। কল্পকাহিনি ও সত্যের সম্পর্ক নিয়ে তার মত হলো, কল্পকাহিনির প্রথম মিথ্যাটাই হলো জীবনের বিশৃঙ্খলাকে শৃঙ্খলায় সাজানো। কিন্তু সেই মিথ্যার ভেতর দিয়েই সত্যের কণা খুঁজে পাওয়া যায়। স্মৃতি ও সত্যের বিষয়ক আলোচনায় বলেছেন, তিনি ঘটনার তথ্য নয়, আবেগ ও অনুভূতি মনে রাখেন। আধ্যাত্মিক জগৎ নিয়ে বিস্তারিত বলেছেন, সেই জগৎকে তিনি লিঙ্গ, বর্ণ ও বয়সের বাইরে নিঃশর্ত ভালোবাসার জায়গা মনে করেন, যেখান থেকে তাঁর গল্পেরা আসে। কন্যা পাওলার মৃত্যুর পর স্মৃতিকথা পাওলা লেখার অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন। সাহিত্যিক প্রভাব প্রসঙ্গে গার্সিয়া মার্কেস থেকে দস্তয়েভস্কি, জেন অস্টেন থেকে হার্পার লি—বিশ্বসাহিত্যের বিস্তৃত পরিসরের উল্লেখ করেছেন। জাদুবাস্তবতা নিয়ে বলতে গিয়ে দাবী করেছেন, তিনি নিজের লেখাকে শুধুই বাস্তববাদী সাহিত্য মনে করেন। কাকা সালভাদোর আয়েন্দে ও চিলির রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করেছেন সংযতভাবে। এবং তরুণ লেখকদের উদ্দেশে তার পরামর্শ হলো, লেখা অ্যাথলেটিক্সের প্রশিক্ষণের মতো, প্রতিদিনের অনুশীলন ছাড়া গতি নেই।
প্রশ্ন :
আপনি আখ্যানধর্মী লেখার জন্য বিখ্যাত। এর বাইরে অন্য কোনো সাহিত্যধারায় লেখার আগ্রহ আছে কি?
ইসাবেলা আয়েন্দে :
ছোটবেলায় নাটক লিখতাম, খুব ভালো লাগত। ছেলেমেয়েরা ছোট থাকতে শিশুসাহিত্যও লেখার চেষ্টা করেছি। প্রতি রাতে তাদের গল্প বলতাম। এই অভ্যাসটা এখনও আছে। ২০০১ সালে সিটি অব দ্য বিস্টস লিখেছিলাম—এটাই ছিল শিশু ও কিশোরদের জন্য আমার প্রথম উপন্যাস। বছরের পর বছর ধরে হাস্যরসাত্মক লেখাও লিখেছি। আমার মতে এটাই সবচেয়ে কঠিন ধারা। কবিতা কখনো লিখিনি, ভবিষ্যতেও লিখব বলে মনে হয় না।
প্রশ্ন :
আপনি কি স্পেনীয় ভাষায় লেখেন?
ইসাবেলা আয়েন্দে :
কল্পকাহিনি শুধু স্পেনীয় ভাষাতেই লিখতে পারি। এটা আমার কাছে একটা স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া, মাতৃভাষায় ছাড়া যা সম্ভব নয়। সৌভাগ্যবশত বিশ্বজুড়ে চমৎকার সব অনুবাদক আছেন।
প্রশ্ন :
আপনার অনুবাদকের সঙ্গে কি ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেন? লক্ষ করলাম মার্গারেট সেয়ার্স পেডেন আপনার বেশিরভাগ বই ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন।
ইসাবেলা আয়েন্দে :
মার্গারেট আর আমি সবসময় যোগাযোগে থাকি। আমার মনে হয় আমাদের মধ্যে এক ধরনের মানসিক সংযোগ আছে। তিনি অসাধারণ কাজ করেন। তাঁকে শুধরে দেওয়ার কথা স্বপ্নেও ভাবি না। তবে অন্য ভাষায় কে আমার বই অনুবাদ করেন, সেটা আমি প্রায়ই জানিই না। প্রকাশকরাই সেটা দেখেন। মার্গারেট ২০১০ সালে অবসর নেন। এরপর থেকে আমার ইংরেজি অনুবাদক অ্যান ম্যাকলিন।
প্রশ্ন :
কল্পকাহিনি লেখার বিষয়টা একটু বিস্তারিত বলুন। সত্য বলা, মিথ্যা বলা, বাস্তবতা উন্মোচন—এই ধারণাগুলো কীভাবে একসঙ্গে কাজ করে বা পরস্পরের বিরুদ্ধে যায়?
ইসাবেলা আয়েন্দে :
কল্পকাহিনির প্রথম মিথ্যাটা হলো এই যে, লেখক জীবনের বিশৃঙ্খলাকে একটা শৃঙ্খলায় সাজান—কালানুক্রমিক বা অন্য যেকোনো ক্রমে। লেখক হিসেবে আপনি একটি বৃহত্তর সমগ্রের মধ্য থেকে কিছু অংশ বেছে নেন। আপনি ঠিক করেন কোন জিনিসগুলো গুরুত্বপূর্ণ আর কোনগুলো নয়। আপনার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সেগুলো নিয়ে লেখেন। কিন্তু জীবন এভাবে চলে না। সেখানে সবকিছু একসঙ্গে, এলোমেলোভাবে ঘটে। আপনার বেছে নেওয়ার সুযোগ নেই। আপনি কর্তা নন, জীবনই কর্তা। একবার যখন মেনে নেবেন যে কল্পকাহিনি মানেই মিথ্যা বলা, তখন আপনি মুক্ত হয়ে যাবেন। যা খুশি করতে পারবেন। তারপর বৃত্তাকারে হাঁটতে শুরু করবেন। বৃত্ত যত বড়, তত বেশি সত্য খুঁজে পাবেন। দিগন্ত যত প্রসারিত হবে—যত বেশি হাঁটবেন, যত বেশি সবকিছুর ওপর দৃষ্টি দেবেন—সত্যের কণা খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা তত বাড়বে।
প্রশ্ন :
অনুপ্রেরণা কোথা থেকে পান?
ইসাবেলা আয়েন্দে :
আমি মনোযোগ দিয়ে শুনি এবং গল্প খুঁজে বেড়াই। প্রত্যেকের একটা গল্প আছে। সঠিক সুরে বলতে পারলে সব গল্পই আকর্ষণীয়। খবরের কাগজ পড়ি। পত্রিকার ভেতরের পাতায় চাপা পড়া ছোট্ট একটা খবরও একটা উপন্যাসের অনুপ্রেরণা হতে পারে।
প্রশ্ন :
অনুপ্রেরণা কীভাবে কাজ করে?
ইসাবেলা আয়েন্দে :
প্রতিদিন দশ থেকে বারো ঘণ্টা একা একটা ঘরে বসে লিখি। কারো সঙ্গে কথা বলি না। ফোন ধরি না। মনে হয় আমি একটা মাধ্যম মাত্র। আমার ভেতর দিয়ে কিছু একটা প্রবাহিত হচ্ছে, কোনো কণ্ঠস্বর আমার মধ্য দিয়ে কথা বলছে। এমন একটা জগৎ তৈরি করছি যেটা কল্পনার, কিন্তু সেটা আমার নিজের নয়। আমি ঈশ্বর নই, আমি শুধু একটা যন্ত্র। এই দীর্ঘ, ধৈর্যশীল প্রতিদিনকার লেখার মধ্য দিয়ে নিজের সম্পর্কে এবং জীবন সম্পর্কে অনেক কিছু আবিষ্কার করেছি। শিখেছি। কী লিখছি সেটা নিয়ে সচেতনভাবে ভাবি না। বিষয়টা অদ্ভুত—কল্পকাহিনির মিথ্যার মধ্য দিয়ে নিজের সম্পর্কে, জীবন সম্পর্কে, মানুষ সম্পর্কে, পৃথিবী কীভাবে চলে সে সম্পর্কে ছোট ছোট সত্য আবিষ্কার হয়।
প্রশ্ন :
চরিত্র নিয়ে কিছু বলুন।
ইসাবেলা আয়েন্দে :
কোনো চরিত্র তৈরির সময় সাধারণত এমন একজন মানুষ খুঁজি যাকে আমি মডেল হিসেবে ব্যবহার করতে পারি। সেই মানুষটাকে মাথায় রাখলে বিশ্বাসযোগ্য চরিত্র তৈরি করা সহজ হয়। মানুষ জটিল এবং বহুমাত্রিক। তারা সাধারণত নিজের ব্যক্তিত্বের সব দিক প্রকাশ করে না। চরিত্রও তেমনই হওয়া উচিত।
চরিত্রগুলোকে বইয়ে নিজের জীবন নিজে বাঁচতে দিই। প্রায়ই মনে হয় তাদের ওপর আমার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। গল্প অপ্রত্যাশিত দিকে চলে যায়। আমার কাজ সেটা লিখে যাওয়া, আমার আগের পরিকল্পনায় জোর করে ঢোকানো নয়।
প্রশ্ন :
কম্পিউটারে লেখেন?
ইসাবেলা আয়েন্দে :
সবসময় নোট নিই। ব্যাগে একটা নোটবুক থাকে। কোনো আকর্ষণীয় কিছু দেখলে বা শুনলে লিখে রাখি। পত্রিকা থেকে কাটিং রাখি, টিভিতে শোনা খবরের নোট করি। মানুষের বলা গল্পও লিখে রাখি। কোনো বই শুরু করার সময় এই সব নোট বের করি, এগুলো আমাকে অনুপ্রাণিত করে। কোনো রূপরেখা ছাড়া, শুধু প্রবৃত্তির অনুসরণ করে সরাসরি কম্পিউটারে লিখি। পুরো গল্পটা স্ক্রিনে লেখা হয়ে গেলে প্রথমবার প্রিন্ট করে পড়ি। তখন বুঝতে পারি বইটা আসলে কী নিয়ে। দ্বিতীয় খসড়ায় ভাষা, টান, সুর আর ছন্দের দিকে মনোযোগ দিই।
প্রশ্ন :
একটা গল্পের ভালো সমাপ্তি কেমন হয়?
ইসাবেলা আয়েন্দে :
জানি না। ছোটগল্প আর উপন্যাসের ক্ষেত্রে বিষয়টা আলাদা। ছোটগল্প পুরোটা একসঙ্গে আসে। একটাই সঠিক সমাপ্তি থাকে। সেটা আপনি অনুভব করতে পারেন। সেই সমাপ্তি খুঁজে না পেলে আসলে কোনো গল্পই নেই। তখন আর কাজ করে লাভ নেই। আমার কাছে ছোটগল্প একটি তিরের মতো। শুরু থেকেই সঠিক দিকে যেতে হবে, কোথায় লক্ষ্য করছেন সেটা স্পষ্ট জানতে হবে।
উপন্যাসের ক্ষেত্রে কিছুই আগে থেকে জানা যায় না। এটা ধৈর্যশীল প্রতিদিনকার কাজ—অনেক রঙের সুতায় একটা কাপড় বোনার মতো। ধীরে ধীরে এগোনো, মাথায় একটা নকশা থাকে; কিন্তু হঠাৎ একদিন উল্টো দিক থেকে দেখলে বুঝতে পারেন সেটা আসলে অন্য কিছু হয়ে গেছে। এটা এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা, কারণ তার নিজস্ব একটা জীবন আছে। ছোটগল্পে নিয়ন্ত্রণ পুরোটা আপনার হাতে। কিন্তু ভালো ছোটগল্প খুব কমই আছে। স্মরণীয় উপন্যাস অনেক বেশি। ছোটগল্পে কী বলছেন তার চেয়ে কীভাবে বলছেন সেটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। রূপই আসল। উপন্যাসে ভুল থাকলেও খুব কম মানুষ ধরতে পারেন। সুখী সমাপ্তি সাধারণত আমার কাছে কাজ করে না। খোলা সমাপ্তি পছন্দ করি। পাঠকের কল্পনাশক্তির ওপর আমার আস্থা আছে।
প্রশ্ন :
কোন লেখকরা আপনাকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছেন?
ইসাবেলা আয়েন্দে :
আমি লাতিন আমেরিকান লেখকদের প্রথম প্রজন্মের একজন যারা অন্য লাতিন আমেরিকান লেখকদের পড়ে বড় হয়েছি। আমার আগে এই লেখকদের বই আমাদের মহাদেশেই ঠিকমতো পাওয়া যেত না। চিলিতে অন্য লাতিন আমেরিকান লেখকদের বই পড়া খুব কঠিন ছিল। লাতিন আমেরিকান সাহিত্যের বুম-এর সব বড় লেখকরা আমাকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছেন গার্সিয়া মার্কেস, ভার্গাস ইয়োসা, কোর্তাসার, বোর্হেস, পাস, রুলফো, আমাদো এবং আরও অনেকে।
রুশ ঔপন্যাসিকরাও আমাকে অনেক প্রভাবিত করেছেন—দস্তয়েভস্কি, তলস্তয়, চেখভ, নাবোকভ, গোগোল এবং বুলগাকভ। কৈশোরে ইংরেজি লেখকদের মধ্যে প্রভাব ফেলেছেন স্যার ওয়াল্টার স্কট, জেন অস্টেন, ব্রন্টি বোনেরা, চার্লস ডিকেন্স, বার্নার্ড শ, অস্কার ওয়াইল্ড, জেমস জয়েস, ডি.এইচ. লরেন্স এবং ভার্জিনিয়া উলফ। রহস্য উপন্যাস খুব ভালো লাগত—আগাথা ক্রিস্টি আর কোনান ডয়েলের সব বই পড়েছি। মার্ক টোয়েন, জ্যাক লন্ডন, এফ. স্কট ফিটজেরাল্ডের মতো কিছু আমেরিকান লেখকও স্পেনীয় ভাষায় জনপ্রিয় ছিলেন। হার্পার লির টু কিল আ মকিংবার্ড পড়ে গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলাম। প্রতি দশ বছরে একবার করে বইটা আবার পড়ি। এই সব বই থেকে কাহিনিবিন্যাস ও শক্তিশালী চরিত্র তৈরির জ্ঞান পেয়েছি।
চোদ্দ বছর বয়সে লেবাননে এক হাজার এক রাত পড়ে কল্পনা আর কামনার জগৎ আবিষ্কার করি। সেই সময়ে সেখানে মেয়েদের সামাজিক জীবন বলতে কিছু ছিল না—শুধু স্কুল আর পরিবার। সিনেমায়ও যেতে পারতাম না। পারিবারিক জটিলতা থেকে একমাত্র মুক্তি ছিল বই পড়া। সৎ বাবার তালাবন্ধ আলমারিতে চারটে রহস্যময় চামড়ার বাঁধানো বই ছিল—নিষিদ্ধ বই, কারণ সেগুলো নাকি ‘অশ্লীল’। অবশ্যই চাবির নকল বানিয়ে তাঁর অনুপস্থিতিতে আলমারি খুলতাম। টর্চ জ্বেলে পড়তাম, পাতায় দাগ দেওয়া যেত না, তাই দ্রুত পড়তাম—পাতা উল্টে উল্টে শুধু ‘নোংরা’ অংশগুলো খুঁজতাম। তখন হরমোনের ঝড় চলছিল, সেই অদ্ভুত গল্পগুলো পড়ে কল্পনা ডানা মেলত। সমালোচকরা যখন আমাকে ‘লাতিন আমেরিকার শেহেরজাদে’ বলেন, খুব গর্ব লাগে।
বিশ বছর বয়সে আমেরিকান আর ইউরোপীয় নারীবাদী লেখকদের পড়ে একটা স্পষ্ট ভাষা পেলাম—পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে যে রাগ ভেতরে জমে ছিল সেটা প্রকাশ করার ভাষা। চিলির নারীবাদী পত্রিকা পাওলা-তে কাজ শুরু করলাম। পুরুষতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে চ্যালেঞ্জ করতে করতে চিন্তা আর লেখার ধার শানালাম। জীবনের সেরা সময় ছিল সেটা।
সিনেমা সবসময় ভালো লাগে। কোনো দৃশ্য, কোনো চরিত্র কখনো কখনো বছরের পর বছর মনে থাকে, লেখার সময় অনুপ্রেরণা দেয়। যেমন ফ্যানি অ্যান্ড আলেকজান্ডার-এর জাদু, বা শেক্সপিয়ার ইন লাভ-এর গল্পের ভেতরে গল্পের কাঠামো।
প্রশ্ন :
উপন্যাস শুরু করার সময় কী হয়?
ইসাবেলা আয়েন্দে :
শুরুতে আমি পুরোপুরি শূন্যের মধ্যে থাকি। গল্প কোথায় যাবে, কী ঘটবে, কেন লিখছি—কিছুই জানি না। শুধু জানি যে গল্পটার সঙ্গে একটা সংযোগ আছে, যদিও সেটা তখন নিজেও বুঝতে পারি না। সেই গল্পটা বেছে নিয়েছি কারণ এটা অতীতে বা ভবিষ্যতে আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশ্ন :
অনেক সম্পাদনা করেন?
ইসাবেলা আয়েন্দে :
হ্যাঁ, ভাষা আর টানের জন্য করি, কিন্তু কাহিনির জন্য নয়। গল্প আর চরিত্রের নিজস্ব জীবন আছে। তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। চাই চরিত্রগুলো সুখী হোক, বিয়ে করুক, সন্তান নিয়ে সুখে থাকুক—কিন্তু তা কখনো হয় না। আগেই বলেছি, সুখী সমাপ্তি আমার কাছে কাজ করে না।
প্রশ্ন :
লেখার নিরাময়ী শক্তি নিয়ে বলুন। বিশেষত পাওলা লেখা নিশ্চয়ই খুব কঠিন আর কষ্টের ছিল।
ইসাবেলা আয়েন্দে :
পাওলা লেখার সময় সহকারী অফিসে এসে আমাকে কাঁদতে দেখত। সে জড়িয়ে ধরে বলত, ‘এটা লিখতে হবে না।’ আমি বলতাম, ‘কাঁদছি কারণ সেরে উঠছি। লেখা আমার শোক প্রকাশের পথ।’ বইটা লেখা হয়েছিল অশ্রু দিয়ে, কিন্তু সেই অশ্রু ছিল নিরাময়ের। বই শেষ হওয়ার পর মনে হলো মেয়ে আমার হৃদয়ে বেঁচে আছে, তার স্মৃতি সংরক্ষিত হয়ে গেছে। লেখায় যা থাকে, তা মনে থাকে। আমি বিস্তারিত, নাম, জায়গা মনে রাখতে পারি না—তাই প্রতিদিন মাকে চিঠি লিখি। পাওলাকে নিয়ে আর আমাদের একসঙ্গে কাটানো জীবন নিয়ে লিখে চিরকালের জন্য সংরক্ষণ করেছি। কখনো ভুলব না। এটাই আত্মার জীবন।
প্রশ্ন :
পাওলা পড়ে অবাক হয়েছিলাম—এত নিজেকে উন্মোচন করা। মানুষ সাধারণত এই ধরনের যন্ত্রণার কথা বলে না। মৃত্যু, অসুস্থতা, বিয়োগান্তের এই অভিজ্ঞতা অনেকের জন্য উপহার হয়ে গেছে।
ইসাবেলা আয়েন্দে :
যে পাঠকরা আমাকে চিঠি লিখেছেন তাদের সঙ্গে নিজেকে সংযুক্ত মনে করি। যন্ত্রণা সর্বজনীন। বেদনা, ক্ষতি, মৃত্যু—সবাই একইভাবে অনুভব করি। চিকিৎসকরা লেখেন যে বইটা পড়ার পর রোগীদের আগের চোখে দেখতে পারবেন না। তরুণরা লেখে যারা পাওলার সঙ্গে নিজেদের মেলায় এবং প্রথমবার নিজের মৃত্যুর কথা ভাবে। অনেক চিঠি আসে তরুণ মেয়েদের কাছ থেকে যারা কখনো বড় ক্ষতির মুখোমুখি হয়নি, কিন্তু পরিবার বা সম্প্রদায়ের আশ্রয় নেই বলে একাকী বোধ করে। তারা পাওলার মতো একজন সঙ্গীর সঙ্গে সম্পর্ক চায়। সন্তান হারানো মায়েরা লেখেন যারা মনে করেন শোকে মরে যাবেন। কিন্তু মানুষ মরে না। সন্তান হারানো পৃথিবীর প্রাচীনতম মাতৃশোক। যুগ যুগ ধরে মায়েরা সন্তান হারিয়েছেন। সব সন্তান বাঁচবে—এটা আশা করতে পারেন শুধু হাতে গোনা কিছু সৌভাগ্যবান মানুষ।
প্রশ্ন :
অনেক সমালোচক পাওলাকে আপনার সেরা বই মনে করেন। এই বইটা কি অন্য সব বইয়ের চেয়ে বেশি গভীরভাবে আপনাকে স্পর্শ করেছে?
ইসাবেলা আয়েন্দে :
হ্যাঁ। বাকি সবকিছু ছিল মহড়া। পাওলা শেষ করার পর আবার লেখা শুরু করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কী লিখব? তিন বছর লেখকের অবরোধের পর আবার লিখতে পেরেছিলাম।
প্রশ্ন :
আপনি মনে করেন লেখক বিষয় বেছে নেন, নাকি বিষয় লেখককে বেছে নেয়?
ইসাবেলা আয়েন্দে :
গল্পই আমাকে বেছে নেয়।
প্রশ্ন :
তাহলে আপনি প্রথমে গল্পকার, তারপর লেখক?
ইসাবেলা আয়েন্দে :
হ্যাঁ। গল্প বলাটা আনন্দের অংশ। লেখাটা অনেক পরিশ্রমের।
প্রশ্ন :
সাংবাদিকতার পটভূমি কি সাহায্য করে?
ইসাবেলা আয়েন্দে :
আমি আবেগ নিয়ে কাজ করি, ভাষা সেখানে হাতিয়ার মাত্র। গল্প সবসময় এমন কোনো গভীর আবেগকে ঘিরে যা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। লেখার সময় সাংবাদিকের মতো ভাষাকে দক্ষভাবে ব্যবহার করার চেষ্টা করি। জায়গা আর সময় কম, তাই পাঠকের ঘাড় ধরে টেনে রাখতে হবে—ছেড়ে দেওয়া যাবে না। ভাষা দিয়ে টান তৈরি করি। সাংবাদিকতা থেকে আরও কিছু ব্যবহারিক জিনিস শিখেছি—কোনো বিষয় নিয়ে গবেষণা করা, সাক্ষাৎকার নেওয়া, রাস্তার মানুষকে দেখা আর তাদের সঙ্গে কথা বলা।
প্রশ্ন :
যখন বলেন অভিজ্ঞতার প্রতি নিজেকে উন্মুক্ত করেন—সেটা কি একটা জাদুর জগতে প্রবেশ করা? সত্যিই কি কোনো আত্মা আসে, শব্দ আর দৃশ্য আর চিত্র সুপারিশ করে?
ইসাবেলা আয়েন্দে :
হ্যাঁ, একটা অর্থে। অবশ্যই বুদ্ধিবৃত্তিক প্রক্রিয়াও আছে। কিন্তু গল্প বলায় একটা জাদু আছে। অন্য একটা জগতে প্রবেশ করা যায়। গল্প সম্পূর্ণ হয় যখন সেই সামষ্টিক গল্পে পৌঁছানো যায়—যখন অন্যদের গল্প লেখার অংশ হয়ে যায় এবং বোঝা যায় এটা শুধু আমার গল্প নয়। মনে হয় আমি কিছু আবিষ্কার করছি না। কোনো অন্য মাত্রা থেকে জিনিসগুলো আসছে। সেগুলো আগে থেকেই আছে, আমার কাজ শুধু খুঁজে বের করে পাতায় নিয়ে আসা। আমি সেগুলো তৈরি করি না। বছরের পর বছর ধরে জীবনে আর লেখায় এমন ঘটনা ঘটেছে যা প্রমাণ করেছে যে সবকিছু সম্ভব। আমি সব রহস্যের প্রতি উন্মুক্ত। প্রতিদিন যতগুলো ঘণ্টা আমি একা নীরবে কাটাই, সেই একাকিত্ব আর নিস্তব্ধতায় সেই জগৎটা দেখা যায়। যারা দীর্ঘ সময় ধরে প্রার্থনা বা ধ্যান করেন, বা কোনো আশ্রমে বা নিরিবিলি জায়গায় থাকেন—তারাও শেষ পর্যন্ত কণ্ঠস্বর শুনতে পান, দৃশ্য দেখতে পান, কারণ একাকিত্ব আর নীরবতা সেই সচেতনতার ভিত্তি তৈরি করে।
কখনো কখনো কিছু লিখি যেটা নিছক কল্পনা বলে মনে হয়। মাস বা বছর পরে জানতে পারি সেটা সত্যি ছিল। আর যখন এটা হয়, ভয় পেয়ে যাই। মনে হয়, ‘এটা কী? লিখলেই কি সেটা সত্যি হয়ে যায়? শব্দ নিয়ে সাবধান থাকতে হবে।’ কিন্তু মা বলেন, ‘না, লিখলেই সেটা ঘটে না। তোমার সেই ক্ষমতা নেই। এত অহংকার কোরো না। আসলে তুমি সেটা দেখতে পাও, অন্যরা পারে না। কারণ তাদের সময় নেই, তারা পৃথিবীর কোলাহলে ব্যস্ত।’ আমার নানি ছিলেন দূরদর্শী। লেখালেখি না করলেও তিনি অনেক কিছু আন্দাজ করতে পারতেন, অজানা ঘটনা আর অনুভূতি ধরতে পারতেন। তিনি সচেতন ছিলেন। আমার মনে হয় এটা শুধু সচেতনতার ব্যাপার।
প্রশ্ন :
আপনার সৎ বাবা আপনাকে মিথোম্যানিয়াক বলেছেন।
ইসাবেলা আয়েন্দে :
হ্যাঁ। তিনি বলেন আমি মিথ্যুক। পাওলা লেখার সময় প্রথমবার স্মৃতিকথা লিখলাম। স্মৃতিকথায় সত্য বলাটাই প্রত্যাশিত। কিন্তু আমার দৃষ্টিতে শৈশব আর জীবনের যে ছবি, সৎ বাবা আর মা সেটা একেবারে অন্যভাবে দেখেন। তাই তারা প্রতিটি পাতায় আপত্তি জানাতেন। আমি দেখি আলোর ঝলক, আবেগ, আর একটা অদৃশ্য জাল—সূত্র যা কোনোভাবে সবকিছু সংযুক্ত করে রাখে। এটাও এক ধরনের সত্য।
প্রশ্ন :
জয়েস ক্যারল ওটস একটি দীপ্তিমান স্মৃতির কথা বলেন—যেন কোনো একটি জায়গায় আলো এসে পড়ে। শৈশবের ঘটনা মনে রাখার পার্থক্যের কথা ভাবছি। যেমন, মাথা নিচু করে ঝুলিয়ে রাখার সেই ভয়ঙ্কর স্মৃতি—আপনি বলেন এটা ছিল ভয়ানক, আর আপনার সৎ বাবা বলেন ওটা একটা নিরাপদ যন্ত্র। হয়তো আপনি শুধু সেই অনুভূতিটাই মনে রেখেছেন।
ইসাবেলা আয়েন্দে :
ঠিক। আমার লেখায় এ ধরনের অনেক কিছু আছে। যেমন, কোনো একটা গল্প মনে থাকে, কিন্তু জায়গা, তারিখ, মানুষ বা নাম মনে থাকে না। মনে থাকে গল্পের কোনো একটা আঘাত করার মতো বিষয়।
প্রশ্ন :
কেউ কেউ তারিখ বা সেদিন কী পরেছিলেন সেটা মনে রাখেন।
ইসাবেলা আয়েন্দে :
অথবা শুধু তথ্যটুকু মনে রাখেন। আমি হয়তো শুধু মনে রাখি সেই ঘটনা নিয়ে আমি কী কল্পনা করেছিলাম—সত্যের আমার নিজস্ব সংস্করণ।
প্রশ্ন :
কিন্তু শেষপর্যন্ত, ইভা লুনা-র মতো—প্রথমে এক কথা বলেন, তারপর বলেন—
ইসাবেলা আয়েন্দে :
“হয়তো এভাবে হয়নি।” সবসময় মনে হয় হয়তো ঘটনাটা এভাবে হয়নি। স্বামী উইলির সঙ্গে কীভাবে পরিচয় হয়েছিল তার পঞ্চাশটা সংস্করণ আছে আমার কাছে। উইলি বলে সবগুলোই সত্যি।
প্রশ্ন :
আপনার প্রথম দিকের উপন্যাসগুলোতে লাতিন আমেরিকার রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার চিত্র আছে—সরকার অবিশ্বস্ত, অস্থির। একটা কাফকাসুলভ অনুভূতি আছে যে যাই করুন না কেন, সরকারকে বোঝা যাবে না। পৃথিবী নড়বড়ে, অনিশ্চিত। আত্মার জগৎকে কি আপনি আরও নির্ভরযোগ্য মনে করেন? সেখানেই কি সব কিছুর অর্থ খুঁজে পাওয়া যায়?
ইসাবেলা আয়েন্দে :
কঠিন প্রশ্ন। আধ্যাত্মিক জগতে ভালো আর মন্দের বিভাজন নেই। বাস্তব জগতের মতো সাদা-কালো নেই। কোনো কঠোর নিয়ম নেই। সেই অর্থে এটা দ্য ইনফিনিট প্ল্যান উপন্যাসের সেই যাজকের প্রস্তাবিত অসীম পরিকল্পনার—যেটা আসলে একটা রসিকতা—থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। আধ্যাত্মিক জগতে শুধু আছে উদ্দেশ্য, শুধু আছে অস্তিত্ব। সঠিক বা ভুলের কোনো বোধ নেই। সবকিছু শুধু আছে—এক স্থির, শান্ত ভঙ্গিতে। এই অর্থে সবকিছু এতটাই দ্ব্যর্থবোধক, এতটাই কোমল আর অনির্দিষ্ট যে এটা একটা নিরাপদ জায়গা। কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হয় না। সবকিছু শুধু আছে, আর আপনি কোনোভাবে ভাসতে থাকেন—ঠিক কীভাবে বলব জানি না—শুধু সেখানে থাকেন। এক অতি কোমল রূপে। আমার কাছে এটা খুব নিরাপদ জায়গা। গল্পগুলো সেখান থেকে আসে। এটা ভালোবাসার জায়গা।
শুনতে আবেগী মনে হতে পারে, কিন্তু আমার জীবন নির্ধারিত হয়েছে দুটো জিনিসে—ভালোবাসা আর সহিংসতা। দুঃখ আছে, যন্ত্রণা আছে, মৃত্যু আছে। কিন্তু আরেকটা সমান্তরাল মাত্রা আছে—ভালোবাসা। ভালোবাসার অনেক রূপ আছে, কিন্তু আমি যেটার কথা বলছি সেটা নিঃশর্ত। যেমন একটা গাছকে যেভাবে ভালোবাসি। গাছ নড়াচড়া করুক বা সুন্দর হোক—এটা প্রত্যাশা করি না। গাছ শুধু গাছ, আর গাছ বলেই ভালোবাসি। পশুপাখিকে সেভাবে ভালোবাসি। শিশুদের সেভাবে ভালোবাসি। সম্পর্ক যত জটিল হয়, তত বেশি দাবি করা শুরু হয়। ভালোবাসার বিনিময়ে কিছু চাই। প্রত্যাশা আর কামনা জন্মায়, নিজে যতটা ভালোবাসি ততটাই ভালোবাসা পেতে চাই।
এই আধ্যাত্মিক জগতে, যেটা ভালোবাসার জগৎ, কোনো শর্ত নেই। যেমন নাতি-নাতনিদের ভালোবাসি। মনে হয় তারা নিখুঁত। তারা বাড়ুক বা এখন যেমন আছে তেমন থাকুক—কিছু যায় আসে না। কারণ তাদের দেখতে পাই শিশু হিসেবে যেমন ছিল, কিশোর বা প্রাপ্তবয়স্ক হলে যেমন হবে—সবভাবেই। আত্মার কোনো বয়স নেই। হয়তো এটাই বলতে চেয়েছিলাম। কোনো কিছুকে যখন গভীরভাবে আর সম্পূর্ণরূপে ভালোবাসি, তখন তার সারাটুকু ভালোবাসি।
প্রশ্ন :
আপনি যেটার কথা বলছেন সেটা কি অতিক্রমণ—এই বাস্তব জগতের ওপরে উঠে অনুভূতি আর আবেগের এক উচ্চতর বোঝাপড়ায় পৌঁছানো? আপনার উপন্যাসগুলো কি অন্য যেকোনো বৈশিষ্ট্যের চেয়ে এই দিক থেকে বেশি সংজ্ঞায়িত?
ইসাবেলা আয়েন্দে :
অদ্ভুত ব্যাপার হলো আমার লেখাকে জাদুবাস্তবতা বলে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়, অথচ আমি আমার উপন্যাসগুলোকে শুধুই বাস্তবধর্মী সাহিত্য মনে করি। বলা হয়, কাফকা যদি মেক্সিকোতে জন্মাতেন তাহলে বাস্তববাদী লেখক হতেন। জন্মস্থানের ওপর এত কিছু নির্ভর করে।
প্রশ্ন :
অফ লাভ অ্যান্ড শ্যাডোস-এ উপন্যাসের শেষে ইরেনে আর ফ্রান্সিসকোকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে গড়ে উঠতে হয়। তারা গাড়িতে বসে পরস্পরের দিকে তাকায়, একে অন্যকে চেনে না। শারীরিকভাবে না চিনলেও আত্মায় চেনে। উপন্যাসটা এই কথাটা খুব বাস্তবভাবে বলে।
ইসাবেলা আয়েন্দে :
অফ লাভ অ্যান্ড শ্যাডোস নিয়ে আমাকে অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ আর বেশি রাজনৈতিক বলে সমালোচনা করা হয়েছিল। কিন্তু বইটার প্রতি আমার সহানুভূতি আছে। প্রথমত, এই গল্প সত্যি। মূল ঘটনাটা চিলিতে ঘটা একটা রাজনৈতিক অপরাধ, যেটা নিয়ে গবেষণা করেছিলাম। চরিত্রগুলো সত্যিকারের। দ্বিতীয়ত, এই বই উইলিকে আমার জীবনে এনেছে। উইলি বইটা পড়ে প্রথমে বইটার প্রেমে পড়েছিল, তারপর আমার প্রেমে। আর তৃতীয়ত, এই বই আমাকে বুঝিয়েছে লেখা কতটা শক্তিশালী হতে পারে, কীভাবে সেই জগতে প্রবেশ করা যায় এবং এমন জিনিস আবিষ্কার করা যায় যা লেখার মধ্য দিয়ে আসা সেই সামষ্টিক জ্ঞানের সংযোগ ছাড়া জানা অসম্ভব ছিল।
প্রশ্ন :
আপনি একবার বলেছিলেন এত রক্ষণশীল পরিবেশে বড় হয়েছেন যে কামনাময় দৃশ্য লিখতে কষ্ট হয়। ফ্রান্সিসকো আর ইরেনের প্রেমের দৃশ্যের সঙ্গে পরবর্তী বইগুলোর দৃশ্য তুলনা করলে মনে হয় আপনি সেই সংকোচ কাটিয়ে উঠেছেন, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যভাবে লেখার ক্ষমতা অর্জন করেছেন। এটা কি সচেতন?
ইসাবেলা আয়েন্দে :
না, মনে হয় এটা বইয়ের ব্যাপার। প্রতিটি বইয়ের লেখার একটা নিজস্ব ধরন আছে। প্রতিটি গল্পের বলার একটা নিজস্ব পথ আছে। গল্পই ঠিক করে দেয় কোন সুরে বলতে হবে। ফ্রান্সিসকো আর ইরেনে দুজন অল্পবয়সী মানুষ—প্রথমে একে অন্যের প্রতি আকৃষ্ট, তারপর প্রেমে পড়ে। যখন তারা শারীরিকভাবে মিলিত হয়, তখন সত্যিকার ভালোবাসায় পড়ে গেছে। আর সেই প্রথমবারের মতো মৃত্যু, অত্যাচার, দমন আর সহিংসতার নির্মমতা স্পর্শ করেছে তাদের। প্রেমে মিলিত হওয়া তাদের নরক থেকে জীবনে ফিরিয়ে আনে, ভালোবাসার স্বর্গে। পরে ঘটনাপ্রবাহ তাদের ভেঙে দেবে। দৃশ্যটা এইভাবে লেখা হয়েছে কারণ আমি খুব বেশি সচেতন না থাকলেও মনে হয় এটা ইউরিডিসির পুরাণের মতো—অর্ফিয়াস নরকে নেমে যান প্রিয়তমাকে ফিরিয়ে আনতে।
প্রশ্ন :
এক বক্তৃতায় বলেছিলেন আর ছোটগল্প লিখবেন না। এই সিদ্ধান্তে কি অটল আছেন?
ইসাবেলা আয়েন্দে :
জানি না। কখনো বলা উচিত নয় যে কিছু কখনো করব না। ছোটগল্প পুরোটা একসঙ্গে আসে। উপন্যাস হলো কাজ—কাজ, কাজ, আর কাজ। তারপর একদিন শেষ হয়। কিন্তু ছোটগল্প আপনার কাছে ঘটে—ফ্লুতে আক্রান্ত হওয়ার মতো। ছোটগল্পের জন্য অনুপ্রেরণা লাগে। হঠাৎ এক ঝলক স্বচ্ছতা আসে—কোনো একটা ঘটনাকে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত কোণ থেকে দেখা যায়। এটা ইচ্ছা করে ঘটানো যায় না। এটা আপনার সঙ্গে ঘটে। কোথাও যান, কিছু মানুষকে নাচতে দেখেন, আর হঠাৎ সেই মানুষগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক বুঝে ফেলেন, বা এমন কিছু অনুভব করেন যা ঘরের আর কেউ দেখতে পাচ্ছে না। তখন একটা ছোটগল্প জন্ম নেয়।
প্রশ্ন :
দ্য স্টোরিজ অফ ইভা লুনা নিয়ে বলুন।
ইসাবেলা আয়েন্দে :
গল্পগুলো লেখা হয়েছিল ইভা লুনার কণ্ঠে—আমার আগের উপন্যাসের নায়িকার কণ্ঠে। শেষেরটা বাদে। সেটা লেখা হয়েছিল রলফ কার্লের দৃষ্টিকোণ থেকে—কীভাবে সে কাদার মধ্যে একটি মেয়েকে খুঁজে পায় আর তাকে মৃত্যুর দিকে সাহায্য করে। ঘটনাটা সত্যি, ১৯৮৫ সালের কলম্বিয়ায়। নেভাদো রুইজ নামের একটি আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতে ধসে পড়া কাদা একটি গ্রাম সম্পূর্ণ ঢেকে দেয়। হাজার হাজার মানুষ মারা যায়। বেশিরভাগ মৃতদেহ উদ্ধার করা যায়নি। শেষে পুরো জায়গাটাকে কবরস্থান, পবিত্র ভূমি ঘোষণা করা হয়। অনেক শিকারের মধ্যে ছিল নয় বছরের একটি মেয়ে—ওমাইরা সানচেজ। ছোট কোঁকড়া কালো চুল আর বড় বড় কালো চোখের এই মেয়েটি চার দিন ধরে কাদায় আটকে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিল। কর্তৃপক্ষ পানি সেঁচার পাম্প উড়িয়ে আনতে পারেনি। কিন্তু গণমাধ্যম হেলিকপ্টার, বিমান, বাসে করে টেলিভিশন ক্যামেরা নিয়ে গেছে। চার দিন ধরে সারা পৃথিবীর দর্শক সেই শিশুর যন্ত্রণা দেখেছে।
প্রশ্ন :
আপনি স্পেনীয় ভাষায় লেখেন কিন্তু আমেরিকায় ইংরেজিতে জীবনযাপন করেন। বেশিরভাগ মানুষ দ্বিতীয় ভাষায় বেঁচে থাকাটাকে প্রান্তিকতা মনে করত। কিন্তু আপনি সেটাকে শক্তিতে পরিণত করেছেন।
ইসাবেলা আয়েন্দে :
এটাই তো দারুণ। মূলধারায় থাকতে কে চায়? কিছুদিন আগে টেলিভিশনে একটা চমৎকার কথা শুনলাম। আমেরিকার আগামী দশ বছরের সমস্যা নিয়ে আলোচনা চলছিল—অপরাধ, সহিংসতা, মূল্যবোধের অবক্ষয়, পারিবারিক ভাঙন, কিশোরী মায়েদের সমস্যা, মাদক, এইডস। তখন কেউ একজন অসাধারণ কথা বললেন, "লক্ষ করেছেন কি যে নতুন অভিবাসীদের এই সমস্যাগুলো নেই? কারণ তারা এই দেশে আসে আমাদের প্রপিতামহদের মতো একই চিন্তা আর একই শক্তি নিয়ে।" প্রান্তিক থাকা অনেকটা নতুন অভিবাসী হওয়ার মতো। প্রান্তিকতাকে নেতিবাচক হিসেবে না দেখে ইতিবাচকভাবে রূপান্তরিত করতে পারলে এটা শক্তির এক অসাধারণ উৎস হয়।
প্রশ্ন :
সাহিত্যে নারীর কণ্ঠের কথা আমরা প্রায়ই বলি। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে আপনি খুব সফলভাবে লেখেন। দ্য ইনফিনিট প্ল্যান-এ পুরুষের কণ্ঠে লেখা কি কঠিন ছিল?
ইসাবেলা আয়েন্দে :
না, মোটেই কঠিন লাগেনি। দ্য হাউস অফ দ্য স্পিরিটস-এও একজন পুরুষের দৃষ্টিকোণ থেকে পুরুষের কণ্ঠে লিখেছিলাম। এস্তেবান ত্রুয়েবা বইটার কিছু অংশ বর্ণনা করে। দ্য ইনফিনিট প্ল্যান-এ সহজ ছিল কারণ স্বামী উইলি পথ দেখিয়েছিলেন। তখন বুঝলাম লিঙ্গের বিষয়ে পার্থক্যের চেয়ে মিলই বেশি। মূলত মানুষ খুব কাছাকাছি, কিন্তু আমরা মিলের দিকটা না দেখে পার্থক্যেই আটকে থাকি। পুরুষ চরিত্রের ভেতরে ঢুকে—যে চরিত্রটি আমার স্বামী উইলি গর্ডনের ছায়ায় তৈরি—তাকে ত্রিশ বছর একসঙ্গে বেঁচে থাকার চেয়ে অনেক ভালো চিনতে পেরেছিলাম।
প্রশ্ন :
তাহলে আত্মার জগতের কথায় ফিরে যাই। সেই জগৎ কি লিঙ্গবিহীন?
ইসাবেলা আয়েন্দে :
সম্ভবত আধ্যাত্মিক জগতে লিঙ্গ কোনো বিষয় নয়, যেমন বর্ণ বা বয়সও নয়। সারাজীবন নারীবাদী হিসেবে নারীবাদী আন্দোলনে লড়েছি। তরুণ বয়সে যোদ্ধার মতো লড়েছিলাম। এখন আরও সচেতন হচ্ছি সেই মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে যেগুলো নারী-পুরুষ উভয়কেই একসঙ্গে খুঁজে বের করতে হবে। তবে ভুল বুঝবেন না—আমি নারীবাদী এবং এটা নিয়ে অত্যন্ত গর্বিত।
প্রশ্ন :
সমালোচকরা আপনার লেখার ধরনকে ‘জাদুবাস্তবতা’ বলেন। আপনার সব বই কি এই ধারায় লেখা?
ইসাবেলা আয়েন্দে :
মনে করি প্রতিটি গল্পের বলার একটা নিজস্ব পথ আছে, প্রতিটি চরিত্রের একটা নিজস্ব কণ্ঠ আছে। একই ছাঁচে বারবার ঢালা যায় না। দ্য হাউস অফ দ্য স্পিরিটস-এ জাদুবাস্তবতা প্রবলভাবে ছিল, কিন্তু দ্বিতীয় বই অফ লাভ অ্যান্ড শ্যাডোস-এ তা নেই। কারণ দ্বিতীয় বইটা সালভাদোর আয়েন্দের হত্যার পর চিলিতে ঘটা একটি রাজনৈতিক অপরাধের ওপর ভিত্তি করে লেখা—এটা বরং সাংবাদিকতার ধারার ইতিহাস। দ্য ইনফিনিট প্ল্যান, অ্যাফ্রোদিতে, ডটার অফ ফরচুন বা পোর্ট্রেট ইন সেপিয়াতে জাদুবাস্তবতা নেই। তবে শিশুদের জন্য প্রথম উপন্যাস সিটি অফ দ্য বিস্টস-এ অনেক আছে।
জাদুবাস্তবতা কখনো কাজ করে, কখনো করে না। তবে এই ধারা শুধু লাতিন আমেরিকার নয়, সারা পৃথিবীর সাহিত্যে পাওয়া যায়। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান সাগাস, আফ্রিকান কবিতা, ইংরেজিতে ভারতীয় সাহিত্য, আমেরিকার সংখ্যালঘু লেখকদের সাহিত্যে এটা আছে। সালমান রুশদি, টনি মরিসন, বার্বারা কিংসলভার, অ্যালিস হফম্যান—সবাই এই ধারায় লেখেন।
এক সময় আমেরিকা আর ইউরোপে সাহিত্যে যুক্তিবাদী আর বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি প্রাধান্য পেয়েছিল, কিন্তু বেশিদিন টেকেনি। কারণ জীবন রহস্যে ভরা। আর সাহিত্যের লক্ষ্যই হলো সেই রহস্যগুলো অন্বেষণ করা। এটা দিগন্তকে প্রসারিত করে। স্বপ্ন, দর্শন আর পূর্বাভাসকে প্রতিদিনের জীবনে আর লেখায় জায়গা দিলে বাস্তবতা যেন আরও বিস্তৃত হয়।
প্রশ্ন :
আপনার পরিবার বেশ অসাধারণ। আপনার কাকা সালভাদোর আয়েন্দে আপনার জীবনকে কীভাবে প্রভাবিত করেছেন?
ইসাবেলা আয়েন্দে :
তাঁর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমার জীবনে তাঁর প্রভাব তেমন ছিল না, যদিও সবসময় গভীর শ্রদ্ধা ছিল। ১৯৭৩ সালে চিলিতে সামরিক অভ্যুত্থান হলো। অভ্যুত্থানই বদলে দিয়েছিল এত চিলিবাসীর জীবন, তিনি নন। সালভাদোর আয়েন্দে ছিলেন আমার বাবার প্রথম চাচাতো ভাই। সপ্তাহান্তে, কখনো ছুটিতে দেখা হতো, কিন্তু একসঙ্গে থাকিনি। অভ্যুত্থানের পর বুঝলাম তাঁর একটা ঐতিহাসিক মাত্রা আছে। চিলি ছাড়ার পরেই সেটা দেখতে পেলাম। অভ্যুত্থানের পর চিলিতে তাঁর নাম নিষিদ্ধ ছিল। ভেনেজুয়েলায় গিয়ে যখনই নিজের পরিচয় দিতাম, মানুষ সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করত সালভাদোর আয়েন্দের সঙ্গে সম্পর্ক আছে কিনা। তিনি এখন কিংবদন্তি, নায়ক।
প্রশ্ন :
সালভাদোর আয়েন্দেকে নিয়ে কি কখনো বই লিখবেন?
ইসাবেলা আয়েন্দে :
না, মনে হয় না। জীবনী লেখায় আমি ভালো নই, আর এ ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ থাকাও সম্ভব হতো না।
প্রশ্ন :
ভাগ্য বা কর্মে বিশ্বাস করেন?
ইসাবেলা আয়েন্দে :
ভাগ্যে বিশ্বাস করি। মনে করি আমাদের হাতে একগুচ্ছ তাস দেওয়া হয়েছে, জীবনের খেলায় যতটা সম্ভব ভালো খেলতে হবে। আর প্রায়ই তাসগুলোতে দাগ থাকে।
প্রশ্ন :
আপনার কাকার পরিণতি কি ভাগ্যনির্ধারিত ছিল?
ইসাবেলা আয়েন্দে :
হ্যাঁ। তবে এর মানে এই নয় যে যারা তাঁকে হত্যা করেছে তারা দায়মুক্ত। অত্যাচারীরা আর খুনিরা দায়ী—এটা আমি বিশ্বাস করি। আর তাদের থামানোর চেষ্টা করা উচিত।
প্রশ্ন :
চিলিতে কি কখনো ফিরে যাবেন?
ইসাবেলা আয়েন্দে :
প্রতি বছরই যাই মাকে দেখতে, সেখানে স্বস্তি লাগে। কিন্তু এখন আর সেখানে থাকতে পারতাম না, বিশেষত আমেরিকায় ঘর হয়ে যাওয়ার পর। ছেলে আর নাতি-নাতনিরা এখানে। চিলিকে তেমন মিস করি না, কারণ এখন যখন খুশি যেতে পারি।
প্রশ্ন :
সব বই ৮ জানুয়ারি শুরু করেন কেন?
ইসাবেলা আয়েন্দে :
১৯৮১ সালের ৮ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলায় থাকার সময় ফোন এলো—প্রিয় দাদা মারা যাচ্ছেন। তাঁর জন্য একটা চিঠি লিখতে শুরু করলাম। পরে সেই চিঠিই হয়ে গেল আমার প্রথম উপন্যাস দ্য হাউস অফ দ্য স্পিরিটস। শুরু থেকেই বইটা এত সৌভাগ্যবান ছিল যে সেই শুভ তারিখটাই ধরে রেখেছি।
প্রশ্ন :
নতুন বই শুরু করার সময় কোনো আচার-অনুষ্ঠান পালন করেন?
ইসাবেলা আয়েন্দে :
৮ জানুয়ারি আমার কাছে পবিত্র দিন। খুব সকালে একা অফিসে আসি। আত্মা আর মিউজদের জন্য কিছু মোমবাতি জ্বালাই। কিছুক্ষণ ধ্যান করি। সবসময় তাজা ফুল আর ধূপ থাকে। আর সেই মুহূর্তে যে অভিজ্ঞতা শুরু হচ্ছে তার জন্য নিজেকে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে দিই। ঠিক কী লিখব জানি না কখনো। হয়তো মাস কয়েক আগেই একটা বই শেষ করেছি এবং কিছু একটার পরিকল্পনাও আছে, কিন্তু দুবার এমন হয়েছে যে কম্পিউটার চালু করে বসতেই অন্য কিছু বেরিয়ে এসেছে। মনে হয় যেন কিছু একটা গর্ভে ধারণ করে আছি—হাতির গর্ভধারণের মতো, অনেক দিন ধরে সেখানে বেড়ে উঠছে। তারপর যখন সম্পূর্ণ শিথিল হয়ে লেখার জন্য নিজেকে উন্মুক্ত করতে পারি, তখন আসল বইটা বেরিয়ে আসে। প্রথম বাক্যটা এক ধরনের ঘোরের মধ্যে লেখার চেষ্টা করি—যেন অন্য কেউ আমার ভেতর দিয়ে লিখছে। সেই প্রথম বাক্যটাই সাধারণত পুরো বইটা নির্ধারণ করে দেয়। এটা একটা অজানা ভূখণ্ডের দরজা—যেখানে চরিত্রদের নিয়ে যেতে হবে। ধীরে ধীরে লিখতে লিখতে মনে হয় গল্পটা আমার অজান্তেই নিজেই উন্মোচিত হচ্ছে। শুধু ঘটতে থাকে।
আমি এমন লেখক নই যে রূপরেখা তৈরি করতে পারি, লেখা নিয়ে কারো সঙ্গে কথা বলতে পারি, বা চলমান লেখার অংশ পড়ে শোনাতে পারি। প্রথম খসড়া তৈরি হওয়ার আগ পর্যন্ত—আর সেই খসড়া তৈরি হতে মাসের পর মাস লাগে, সাধারণত অনেক দীর্ঘ হয়—বুঝতে পারি না বইটা কী নিয়ে। প্রতিদিন বসি আর গল্প ঢেলে দিই। মনে হলে শেষ হয়েছে, তখন প্রিন্ট করে প্রথমবার পড়ি। তখন বুঝতে পারি গল্পটা আসলে কী নিয়ে। তারপর শুরু হয় সেসব ছেঁটে ফেলা যার সঙ্গে গল্পের কোনো সম্পর্ক নেই।
প্রশ্ন :
লেখক হতে চাওয়া তরুণদের কী পরামর্শ দেবেন?
ইসাবেলা আয়েন্দে :
লেখা অনেকটা অ্যাথলেট হওয়ার প্রশিক্ষণের মতো। প্রতিযোগিতায় নামার আগে অনেক অনুশীলন আর পরিশ্রম করতে হয়, যা কেউ দেখে না। লেখককে প্রতিদিন লিখতে হবে, যেমন অ্যাথলেটকে প্রতিদিন অনুশীলন করতে হয়। অনেক লেখাই কখনো ব্যবহার হবে না, কিন্তু সেটা করা জরুরি।
তরুণ শিক্ষার্থীদের বলি প্রতিদিন অন্তত একটা ভালো পাতা লিখতে। বছর শেষে অন্তত ৩৬০টা ভালো পাতা হয়ে যাবে। সেটাই একটা বই।
লেখার প্রক্রিয়া কারো সঙ্গে ভাগ করি না। পাণ্ডুলিপি শেষ হলে মাত্র কয়েকজনকে দেখাই, কারণ নিজের প্রবৃত্তিকে বিশ্বাস করি, আর লেখায় বেশি হাতের ছোঁয়া চাই না।
প্রশ্ন :
দ্য সাম অফ আওয়ার ডেজ পড়ে অনেকে জানতে চেয়েছেন তাবরার গহনা কোথায় পাওয়া যায়।
ইসাবেলা আয়েন্দে :
তাবরার ওয়েবসাইট দেখুন—tabra.com।
প্রশ্ন :
আমার একটা পাণ্ডুলিপি আছে। আপনি কি পড়ে দেখবেন এবং প্রকাশে সাহায্য করবেন?
ইসাবেলা আয়েন্দে :
আন্তরিকভাবে দুঃখিত, কিন্তু পাণ্ডুলিপি পড়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। সময়ই নেই। থাকলেও আইনি ঝুঁকি আছে। আর যাই হোক, পাণ্ডুলিপি প্রকাশ করিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই। সেই ক্ষমতা থাকলে ভালো হতো!
আমেরিকার প্রকাশনা জগৎ খুব জটিল হয়ে গেছে। আমার অভিজ্ঞতায়, পরিচিত লেখক না হলে এজেন্ট ছাড়া প্রকাশিত হওয়া প্রায় অসম্ভব। প্রতি বছর হালনাগাদ হওয়া সাহিত্য-এজেন্টের তালিকাসহ গাইডবই দেখতে পারেন। মাইকেল লার্সেনের হাউ টু গেট আ লিটারারি এজেন্ট আর ডন প্রুয়েসের দ্য গাইড টু লিটারারি এজেন্টস—দুটো সহায়ক বই। লাইব্রেরিতে বা পছন্দের বইয়ের দোকানে পাবেন।·
অনুবাদকের পরিচিতি : কুলদা রায় কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক। বাংলাদেশের গোপালগঞ্জে তাঁর আদিবাড়ি। বর্তমানে তিনি নিউইর্য়কে বসবাস করছেন। পড়াশুনা করেছেন ময়মনসিংহ কৃষিবিশ্ববিদ্যালয়ে। কবিতা দিয়ে লেখালিখির শুরু। একসময় তিনি বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রবন্ধ নিবন্ধ লিখেছেন। সেই সময়টাতে শিশুদের জন্যেও তিনি বেশ কিছু গল্প লিখেন। এরপর কিছু সময়ের জন্য লেখালিখিতে বিরতি পড়ে। ২০০৬-৮-এর দিকে ব্লগে লেখালিখি শুরু করেন। তারপর আবার লিখতে শুরু করেন গল্প। এখনো লিখে চলেছেন নিরন্তর।


0 মন্তব্যসমূহ